যেই মাত্র তুমি লেখা শুরু করবে, দেখবে, লেখাটাই তোমাকে চালিত করছে : নগুগি ওয়া থিয়োংওর আলাপচারিতা

বিশেষ আয়োজন : দুটি দীর্ঘ সাক্ষাৎকার
অনুবাদ : এলহাম হোসেন
[নগুগি ওয়া থিয়োংও একজন বিপ্লবী। রাজনৈতিক বিষয়-আশয় তাঁর লেখার প্রধান ক্ষেত্র। কারাবাসের ভয়ানক অভিজ্ঞতা, ঔপনিবেশিকদের স্থানিক পরিচয় মুছে ফেলার অপতৎপরতা, দরিদ্রদের উপর ক্ষমতা-কাঠামোর কেন্দ্রে থাকা মানুষদের নিপীড়ন, শ্রমজীবী শ্রেণির মানুষের অধিকার, নয়া-উদারতাবাদের কার্যকরী প্রভাব ইত্যাদি তাঁর রচনার কেন্দ্রবিন্দুতে বিদ্যমান। তাঁর উপন্যাসগুলো সত্য ভাষণে ঝাঁজালো হয়ে ওঠে। তাঁর নাটক শিকড়ের সঙ্গে ওৎপ্রোতভাবে জড়িয়ে থাকা মানুষের কণ্ঠস্বর ধ্বনিত করে। তাঁর প্রবন্ধ ও বক্তৃতা সত্য ও ন্যায়ের অনুসন্ধান করে। তিনি মার্কসবাদী চিন্তক, ২০২১ সালের প্রথম দিকে গ্রহণ করা এই সাক্ষাৎকারে নগুগি সাক্ষাৎকার গ্রহণকারীকে জানান, ‘আমি অনেক সংগ্রামের কথা বলি। এই সংগ্রাম দ্বিরালাপীয় সংগ্রাম। এটি মার্কসের দ্বিরালাপ। এটি হেগেলের দ্বিরালাপের কথা বলে।’ আসলে দ্বিরালাপ ছাড়া জ্ঞানের প্রসার ও উৎপাদন হয় না। তাই নগুগি দ্বিরালাপের কথা বলেন।১৯৩৮ সালে নগুগির জন্ম কেনিয়ার লিমুরুর একটি গ্রামে। প্রথম দিকে তাঁর খ্রিস্টান নাম ছিল জেম্স নগুগি। কিন্তু পরবর্তীসময়ে তিনি খ্রিস্টান নাম ছেড়ে স্থানীয় গিকুয়ু ভাষার নাম গ্রহণ করেন। তাঁর নাম হয় নগুগি ওয়া থিয়োংও। মিশনারি স্কুলে পড়শোনা করেন। পরে বৃত্তি নিয়ে পড়তে যান উগান্ডার ম্যাকারেরে বিশ্ববিদ্যালয়ে ১৯৫৯ সালে। ১৯৬৪ থেকে ১৯৬৭ সাল পর্যন্ত ইংল্যান্ডের লিডস বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশুনা করেন। নাইরোবি বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনাকালে ১৯৭২ সালে তিনি লেখেন তাঁর অত্যন্ত সাহসী প্রবন্ধ On the Abolition of the English Department. প্রবন্ধে তিনি যুক্তি দিয়ে বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ্যক্রমের কেন্দ্রে ইংরেজি সাহিত্য নয় বরং স্থানীয় সাহিত্য থাকা উচিত। উত্তর-ঔপনিবেশিক যুগেও আফ্রিকার বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ্যক্রমের কেন্দ্রে ইংরেজি সাহিত্য থাকা মানে হলো এখনও ঔপনিবেশিকতা সাম্রাজ্যবাদের রূপ ধারণ করে প্রাক্তন উপনিবেশিতদের উপর হেজেমনি অব্যহত রেখেছে। ১৯৭৩ সালে নাইজেরিয়ার সাহিত্যিক চিনুয়া আচেবে প্রকাশ করেন তাঁর সাহসী প্রবন্ধ
An Image of African Racism in Conrad’s Heart of Darkness. নগুগি বিশ্বাস করেন, কনরাডের বয়ান আসলে কল্পনা-নির্ভর আর এই কল্পনার পুরোটা জুড়ে আছে আফ্রিকার ব্যাপারে নেতিবাচক ধারণা যা আফ্রিকাকে উপস্থাপন করেছে বর্বর, সভ্যতাহীন ও আদিম জনগোষ্ঠী হিসেবে। কনরাড আফ্রিকা নিয়ে যে বয়ান নির্মাণ করেন তাতে এমনও মনোভাব ব্যক্ত হয়েছে যে, আফ্রিকার সংস্পর্শে ইউরোপের সবচেয়ে ভালো মন ও মস্তিষ্কও দুষিত হয়ে যেতে পারে।
সত্তরের দশকে নগুগি মনস্থির করলেন, মাতৃভাষায় লিখবেন। এ সময়ে তিনি Decolonizing the Mind নামে একটি তাত্ত্বিক গ্রন্থ রচনা করেন। তাঁর মাতৃভাষা গিকুয়ুতে রচনা করেন নগাহিকা নন্দিন্দা। এর ইংরেজি ভাষান্তরে নাম ও I will Marry When I Want. এই নাটক মঞ্চায়নে তিনি স্থানীয় কৃষকদের সংশ্লিষ্ট করেন। তাদের নিপীড়িত হওয়ার চিত্র ফুটিয়ে তোলেন অত্যন্ত দরদ দিয়ে। শাসকগোষ্ঠী নড়েচড়ে বসেন। নগুগি কেনীয় সরকারের কোপানলে পড়েন। তার নাট্যশালা গুড়িয়ে দেয় সরকারের বুলডোজার। ১৯৭৭ থেকে ১৯৭৮ সাল পর্যন্ত এক বছর তিনি বিনা বিচারে জেল খাটেন। এরপর তিনি পাড়ি জমান প্রথমে ইংল্যান্ডে, পরবর্তীসময়ে আমেরিকায়।
২০১২ সালে প্রকাশিত হয় নগুগির Globalectics : Theory and the Politics of Knowing. এই গ্রন্থে নগুগি নিজের ক্যারিয়ারকে Poor Theory বা ‘দরিদ্র-তত্ত্বের’ প্রেক্ষিতে বিশ্লেষণ করেন। তাঁর মতে, ‘দরিদ্র’ মানে হলো অত্যন্ত সৃজনশীল ও বাস্তববাদী হওয়া কারণ যখন কেউ দারিদ্রের সঙ্গে বসবাস করে তখন সে নানা উপায় আবিষ্কার করার প্রাণন্তকর চেষ্টা করে বেঁচে থাকার তাগিদে। ন্যামওয়ালি সার্পেল বলেন, যখন আমি তাঁকে (নগুগি) জিজ্ঞেস করলাম, তাঁর উপন্যাসে Poor Theory কীভাবে এসেছে তখন তিনি কাষ্ঠহাসি হেসে বলেন, আমি মনে করি, আমার গিকুয়ু ভাষায় লেখা উপন্যাসগুলোতে এর প্রতিফলন হয়েছে, তাই নয় কি ? Poor Theory হলো―
বেঁচে থাকার তাগিদে যৎসামান্যকে অকিঞ্চিৎকরে পরিণত করা।
নগুগি তাঁর উপন্যাসের বিষয়বস্তুতে মার্কসীয় ভাবধারার প্রতিফলন ঘটিয়েছেন। তিনি তাঁর উপন্যাসে ঔপনিবেশিক ও উত্তর-ঔপনিবেশিক যুগের দুর্নীতি, অপশাসন, নিপীড়নের নির্মম ও সত্যনিষ্ঠ চিত্র অংকন করেছেন। ২০০৪ সালে গিকুয়ু ভাষায় প্রকাশিত হয় তাঁর অন্যতম প্রধান উপন্যাস Wizard of the Crow. এর ইংরেজি অনুবাদ তিনি নিজেই করেন ২০০৬ সালে। উপন্যাসটি মার্কসবাদী ভাবনায় উদ্ভাসিত। এটি বর্তমান বিশ্বের পুঁজিবাদী ব্যবস্থার কড়া সমালোচনা ও ব্যঙ্গ করেছে। নগুগি বর্তমান উত্তর-ঔপনিবেশিক অর্থনীতি ও রাজনীতির সমালোচনা করে একে Corpolonialism বলে আখ্যা দিয়েছেন। ২০১৮ সালে তিনি গিকুয়ু ভাষায় মহাকাব্য রচনা করেন। ২০২০ সালে এর ইংরেজি অনুবাদ করেন তিনি নিজেই। নাম দেন The Perfect Nine. এই মহাকাব্যের প্রধান চরিত্র একজন প্রতিবন্ধী নারী। এই চরিত্রটি নেওয়া হয়েছে স্থানীয় গিকুয়ু মিথ বা উপকথা থেকে।
নগুগি মনে করেন, রাজনীতি থেকে শিল্পকে আলাদা করার ব্যাপারে কোনও প্রশ্ন নেই কিন্তু রাজনীতি ও শিল্পের মধ্যকার মিথস্ক্রিয়াকে আত্মপরিচয় নির্ধারণের মানদণ্ডে নামিয়ে আনাও যায় না। আসলে নগুগির যে বৈশিষ্ট্য তাঁকে বিশেষত্ব দিয়েছে তা হলো―তাঁর সব রচনায় দরিদ্র ও জীবন সংগ্রামে লিপ্ত কৃষ্ণাঙ্গ নারী ও পুরুষের কথা বলেছেন; তাদের জন্য এক অকুতোভয় কলমযুদ্ধে অবতীর্ণ হয়েছেন।

তবে এই কলমযুদ্ধ করতে গিয়ে তিনি নানা শারীরিক ও মানসিক বিপর্যয় সহ্য করেছেন। তাঁর সত্য ভাষণের জন্য শাসক গোষ্ঠী তাঁকে জেল খাটিয়েছে। অসহনীয় পরিবেশ তৈরি করে তাঁকে দেশছাড়াও করেছে। জেলে বসে তিনি Devil on the Cross উপন্যাস লিখেছেন। ১৯৮৭ সালে কেনিয়ার রাষ্ট্রপতি ডেনিয়েল আরাপ মই তাঁর উপন্যাস মাটিগারি নিষিদ্ধ ঘোষণা করেন। এই উপন্যাসের কাল্পনিক নায়ক মাটিগারির বিরুদ্ধে কেনিয়ার সরকার হুলিয়া জারি করে। গোয়েন্দা সংস্থাকে লেলিয়ে দেয় কল্পিত মাটিগারির পেছনে। কারণ মাটিগারির জিজ্ঞাসা―‘কোথায় পাব আমি সত্য, কোথায় পাব আমি ন্যায় বিচার’―তৎকালীন স্বৈরশাসকদের হৃৎকম্পন বাড়িয়ে দেয়। আত্মনির্বাসনের দুই দশক পরে নগুগি যখন নিজ মাতৃভূমি কেনিয়ায় এলেন তাঁর Wizard of the Crow উপন্যাসের গিকুয়ু ভাষার সংস্করণ প্রকাশ অনুষ্ঠানে যোগ দিতে তখন বন্দুকের মুখে নগুগি ও তাঁর স্ত্রী নিগ্রহের শিকার হলেন।
গত কয়েক বছর ধরে সম্ভাব্য নোবেল প্রার্থী মনোনীত সাহিত্যিকদের সংক্ষিপ্ত তালিকায় তাঁর নাম থাকছে। বিশ্বের নানা দেশের বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ্যক্রমে উত্তর-ঔপনিবেশিক সাহিত্যের কোর্সে তাঁর রচিত গ্রন্থের নাম থাকছে। তবু কেন তাঁর বৈপ্লবিক কাজকর্ম অস্বীকৃত রয়ে যাচ্ছে ? এটি একটি বড় প্রশ্ন। সম্ভবত কিছু ব্যক্তি মনে করেন, তিনি সংখ্যালঘুদের ভাষায় সংখ্যালঘু অল্প কয়েকজন মানুষদের জন্য লেখেন। আবার কেউ কেউ মনে করেন, তার উত্তর-ঔপনিবেশিক ধারণা আধুনিক নয় বরং অতীত চিন্তা ও ধারণার কাঁটাতারে প্যাঁচানো।
যাই হোক, নগুগির জন্ম, বেড়ে ওঠা ও অভিজ্ঞতাই তাঁর লেখকসত্তা তৈরি করেছে। যে বাস্তবতায় তিনি লেখক হয়ে উঠেছেন সেখানে তাঁর পাঠকের প্রতি প্রতিশ্রুতিই তাঁকে বিপ্লবীতে পরিণত করেছে। তাঁকে বুর্জোয়া স্বার্থবাদীদের কট্টর সমালোচকের ভূমিকায় অবতীর্ণ করেছে। তিনি সত্যিকারের শিল্পী কারণ তিনি শিল্পীর দায়বদ্ধতার জায়গাটির ব্যাপারে সচেতন। এখানেই তিনি আমাদের সময়ের, এখানেই তিনি আমাদের সবার।
―নামওয়ালি শারপেল
নামওয়ালি শারপেল : উপন্যাসের শিরোনামগুলো কি আপনার কাছে গুরুত্বপূর্ণ ?
নগুগি ওয়া থিয়োংও : মজার ব্যাপারটা হলো, আমি সব উপন্যাসের একই শিরোনাম দিতে চাই। এটিকে বলতে পারেন, ঈশ্বরের সঙ্গে মল্লযুদ্ধ। এরপর যখন লেখা শুরু করি তখন বুঝতে পারি, আরে ব্যাপারটা তো আসলে পুরোপুরিভাবে তা নয়।
নামওয়ালি শারপেল : ঐ শিরোনাম কেন ?
নগুগি ওয়া থিয়োংও : আমি বেড়ে উঠেছি ওল্ড টেস্টামেন্ট পড়ে পড়ে। গিকুয়ুতে অনুবাদ হওয়া আমার হাতের কাছে পাওয়া ওটাই ছিল একমাত্র গ্রন্থ। ওটা পড়ার ফলে যা হলো―আমি চাইলে যেকোনও সময় গল্প বলতে পারতাম। সন্ধ্যায় কাজ শেষে আমার গোত্রের লোকেরা যেসব গল্প করত, ওটা ছিল সেগুলোর বর্ধিতাংশ। গল্পগুলো জাদুবাস্তবতার ঢংয়ে লেখা গল্পগুলোর মতো ছিল। কল্পনা করুন, মাছের পেটে থাকা জোনাহ নামে এক লোকের গল্প। অথবা সিংহের গুহায় দানিয়েলের গল্প। অথবা ডেভিড হার্প বাজিয়ে সাউলকে আহ্বান করছে তাকে প্রচণ্ড বিষণ্নতা থেকে মুক্তি দেওয়ার জন্য। জেকব যে ফেরেশতাদের সঙ্গে মল্লযুদ্ধে লিপ্ত হয়েছে কল্পচিত্রটি আমাকে আচ্ছন্ন করে রেখেছিল। দৃশ্যটা আমার মনে প্রচণ্ড শক্তির উদ্রেক ঘটায়।
আজকাল আমি উইলিয়াম ব্লেইকের দ্য মারেজ অব হেভেন অ্যান্ড হেল আবার পড়ছি। অডিও টেপে প্রতি রাতেই শুনি। মানুষের সংগ্রাম করার যে শক্তি, তার বিশালত্ব আমাকে টানে। বিরোধিতা করার ধারণাই মানুষকে অগ্রগতির দিকে নিয়ে যায়। লিডস বিশ্ববিদ্যালয়ে আমি যখন মার্কস আর এঙ্গেলস পাঠ করি তখন এই ধারণা আমার মনে গেঁথে যায়।
নামওয়ালি শারপেল : কোন পরিস্থিতিতে ক্ষমতা-কাঠামোর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে অস্ত্র ধরা যায়, সেই প্রশ্নই আপনার উপন্যাসগুলোর মধ্যে একটি যোগসূত্র স্থাপন করেছে।
নগুগি ওয়া থিয়োংও : মনে রাখতে হবে, আমি সংগ্রামের পরিবেশেই বেড়ে উঠেছি। আমার জন্ম ১৯৩৮ সালে ব্রিটিশ-আফ্রিকান সৈন্য ও ইতালীয় যুদ্ধবন্দি বেষ্টিত এলাকায়। ঔপনিবেশিকতার শিকড় এতটাই শক্ত ছিল যে, ব্রিটিশরাই সেনাবাহিনীকে নিয়ন্ত্রণ করছিল। বিচারব্যবস্থা এবং সবকিছুকে। আর মাউ মাউ বিদ্রোহী ও ফ্রিডম আর্মি, যারা এদের বিরুদ্ধে ১৯৫২ সালে অস্ত্র হাতে তুলে নিয়েছিল, তারা সবাই ছিল সাধারণ কৃষক ও শ্রমজীবী মানুষ। এদের একজন ছিল আমার ভাই।
আমাদের পরিবার ছিল বড়। বাবার ছিল চার স্ত্রী। আমরা সবাই একে অপরকে খুব ভালোবাসতাম। কারণ আমরা একই জায়গায় পরস্পরের মধ্যে সবকিছু ভাগাভাগি করে থেকেছি। কিন্তু রাজনৈতিকভাবে আমরা ছিন্নভিন্ন হয়ে পড়ি। গুড ওয়ালেস ছিল পাহাড়ে। ওখানে ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করছিল। আমার সৎ ভাই তাম্বো ঔপনিবেশিক সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করছিল। এক রাতে ওরা আলাদাভাবে সিদ্ধান্ত নিল যে, ওরা আমাদের অন্য আরেক ভাইয়ের সঙ্গে দেখা করবে। সে তখন জুতার ফ্যাক্টরিতে কাজ করছিল। ওদের মধ্যে যখন দরজার কাছে দেখা হলো তখন ওরা দুজন দুদিকে দৌঁড় দিল। একজন ঔপনিবেশিক সৈন্যদের কাছ থেকে দিল দৌড়, আরেকজন দৌড় দিল আরেক দিকে। ভাবল, মাউ মাউ বিপ্লবীরা হয়তো ওকে মেরে ফেলবে। আমি যুদ্ধরত বাহিনীর দ্বারা বেষ্টিত ছিলাম। সংগ্রামের ধারণার সঙ্গে আমার যোগসূত্রের সেটা একটা কারণ হতে পারে।
নামওয়ালি শারপেল : আপনি কি কখনও বক্সিংয়ের প্রেমে পড়েননি ?
নগুগি ওয়া থিয়োংও : হ্যাঁ, একবার আমি আলায়েন্স হাইস্কুলের এক বন্ধুর সঙ্গে বক্সিংয়ের সময় হাতে দস্তানা পড়েছিলাম। কিন্তু আমার প্রথম ঘুষিতেই ও কুপোকাত। আমি এতই ভয় পেয়ে গিয়েছিলাম যে, এরপর আর কখনও মল্লযুদ্ধের ময়দানে ফিরে যাইনি।
নামওয়ালি শারপেল : আপনার জীবনী এবং আপনার পরিবারের কাহিনি প্রায়ই আপনার লেখালেখিতে প্রতিফলিত হয়। তাহলে ব্যাপারটাকে কি আপনার দায়িত্ব মনে করেন ?
নগুগি ওয়া থিয়োংও : সচেতনভাবে নয়। উদাহরণস্বরূপ, আমার দ্বিতীয় উপন্যাস Weep Not, Child (১৯৬৪) একটি আত্মজীবনীমূলক উপন্যাস, আবার আত্মজীবনীমূলকও নয়। নিজোরোগের কিন্তু দুজন মাত্র মা আছে। আর আমার চারজন। তবে উপন্যাসের প্রথম দৃশ্যটির আমার দ্বিতীয় স্মৃতিকথা (২০১০) আমার জন্মদাত্রী মা এবং আমার বাবার তৃতীয় স্ত্রী যে আমাকে স্কুলে পাঠায় পড়াশুনা শিখতে তাঁর সঙ্গে মিল আছে। মায়ের নাম ছিল ওয়ানজিকু। লেখাপড়ার স্বপ্ন ছিল প্রথমে আমার মায়ের; পরে এটি আমার হয়েছে। মা আমার বাড়ির কাজের খোঁজখবর নিতেন। পরে আমি বুঝতে পারি, মা লেখাপড়া জানতেন না। আমি কী করছি, সে-ব্যাপারে প্রশ্ন করে তিনি ধারণা পেতেন। পরে যখন আমি সরকারের সঙ্গে ঝামেলায় জড়িয়ে পড়ি তখন তিনি-ই ছিল একমাত্র ব্যক্তি যে আমাকে কখনও আমার নীতি থেকে সরে যাওয়ার জন্য কোনওরকম পীড়াপীড়ি করেনি। সে আমার যুক্তিতর্ক শুনত। যদিও কখন মা বলেননি যে, ওহ, এগিয়ে যা; এ কাজ কর, ও কাজ কর তবু তিনি ছিলেন খুবই সহায়ক। আমি বুঝতে পারতাম।
নামওয়ালি শারপেল : আপনার ভাইবোনদের কথা আপনার এই পুস্তকে প্রায়ই এনেছেন।
নগুগি ওয়া থিয়োংও : হ্যাঁ, আমি আমার সৎ ভাই গিতোগোর কথা বলেছি। ও ছিল সুন্দর, শক্তপোক্ত, সুদর্শন ও বয়সে তরুণ। ও শুনতও না, বলতও না। ওর হাত কথা বলত। আমরা সবাই ওকে ভালোবাসতাম। আমাদের গ্রাম আক্রমণ করলে ব্রিটিশ সেনাবাহিনী তাকে হত্যা করে। স্কুল থেকে ছয় মাইল বা এরকমই হবে, পথ হেঁটে বাড়ি ফিরে দেখি কোনও খাবার নেই। আমি বাড়ি থেকে বেরিয়ে যাবার চেষ্টা করছিলাম। ঠিক সেই সময় আমি আর আমার এক বোন গুলির শব্দ শুনলাম। গিতোগো কানে শুনতো না। ব্রিটিশ সৈনিক ওকে থামতে বলেছে কিন্তু ও তো শোনেনি। দৌড়াচ্ছিল। তখন ওরা ওকে গুলি করে।
আমার বোন ওয়াবিয়া আমার বিভিন্ন সাহিত্যকর্মে নানাভাবে হাজির হয়েছে। ও চোখে দেখতে পেত না। হাঁটার সময় লাঠি ব্যবহার করত। সেকালে আমাদের তো আর হুইল চেয়ার ছিল না। আমার মনে আছে, ওর শরীরে যেন কোনও হাড় ছিল না। রাতে ঘুমানোর সময় ও আমাদের গল্প শোনাত। ওর স্মরণশক্তি ছিল প্রখর। আমার অন্য ভাইবোনেরা যখন গির্জার গান গাইতে গাইতে ভুলে যেত তখন ও মনে করিয়ে দিত। ও ছিল শিল্পী। আমাদের গোত্রের গায়িকা। আমাদের পরিবারের ও ছিল হোমার। ওর তেমন কিছুই ছিল না। কিন্তু ওর যা ছিল তার সবই ও উজার করে দিয়েছে। ওর স্মৃতি আমাকে কষ্ট দেয়।
নামওয়ালি শারপেল : The Perfect Nine-এর সর্বকনিষ্ঠ ওয়ারিজিয়ার কথা আমার মনে পড়ে যায়। ও নিজে হাঁটতে পারে না কিন্তু অন্যকে সে পরিশুদ্ধ করে। ওয়াবিয়ার সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার জন্য ঐ রকম চরিত্রের প্রতি আপনার বিশেষ একটা টান আছে।
নগুগি ওয়া থিয়োংও : থাকতে পারে। ওয়ারিজিয়া আমাকে সবসময়ই মুগ্ধ করেছে। বেড়ে ওঠার পর আমরা গিকুয়ুদের মিথের উৎস সম্বন্ধে জানতে পেলাম। এগুলোর উৎস গিকুয়ু আর মাম্বিদের মধ্যকার মেয়েরা। অন্য বোনেরা যখন বিয়ের বয়সে পৌঁছত তখন পাণিপ্রার্থীরা ওদের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করতে আসত। তবে ওয়ারিজিয়া সবসময়ই চুপচাপ। ওর ব্যাপারে বিস্তারিত কিছু নেই। কাজেই The Perfect Nine আমার গল্পের পুনঃব্যাখ্যা। ও তো সেই ব্যক্তি যাকে প্রতিবন্ধিতা, শরীরের সীমাবদ্ধতাকে চ্যালেঞ্জ করে করে চলতে হয়। অবশেষে সে প্রেম এবং সাহসিকতার প্রতীক হিসেবে প্রতীয়মান হয়। সে মহাকাব্যিক বীরে পরিণত হয়।
নামওয়ালি শারপেল : আপনার কখন মনে হলো যে, আপনার জীবন, কেনিয়ার রাজনীতি এবং ফ্রিডম আর্মি আপনার ঔপন্যাসের বিষয়বস্তু হতে পারে ?
নগুগি ওয়া থিয়োংও : কাম্পালার ম্যাকারেরে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় আমি লিখতে শুরু করেছিলাম। নাইরোবিতে আফ্রিকানদের বিদেশি হিসেবে গণ্য করা হতো। আমার এখনও মনে পড়ে, আমি যখন কাম্পালায় পৌঁছলাম তখন সবকিছু দেখে আমার তো চোখ চরকগাছ। আফ্রিকার লোকজন এখানে যে এতটা হয়রানির শিকার হয়, সে-ব্যাপারে তাদের কোনও ভ্রুক্ষেপ নেই। আমার মনে হয় না, ম্যাকারেরেতে না গেলে আমি বুঝতে পারতাম যে, আমি সত্যিই একটা ট্রমার মধ্যে আছি। যা কিছু ঘটেছে তার ব্যাপারে ম্যাকারেরে আমাকে ভাবার সময় দেয়।
নামওয়ালি শারপেল : আপনার In the House of the Interpreter Ges Dreams in a Time of War গ্রন্থে আপনি কেনিয়াতে ঔপনিবেশিক শাসকগোষ্ঠীর হাতে নিপীড়িত হওয়ার ব্যাপারে বলেছেন। একবার আপনি প্রাইমারি স্কুলে পড়ার সময় এক তরুণ সৈনিক আপনার মুখে ঘুষি মারে। আরেকবার স্কুলের ইউনিফর্ম পড়া অবস্থায় আপনাকে বাস থেকে নামিয়ে দেওয়া হয়। এজন্য ওকে জেলে পুরা হয়। এসব ব্যাপার আপনার উপর কী প্রভাব ফেলেছে ?
নগুগি ওয়া থিয়োংও : ব্যাপারগুলো এখনও আমার মনে তাজা রয়ে গেছে। আমার বয়সি একজন আমার মুখে ঘুষি মারল। ওর হাতে বন্দুক ছিল; ওর ক্ষমতা ছিল। পরে আমি যখন ম্যাকারেরে যাওয়ার জন্য অপেক্ষা করছিলাম তখন আমাকে গ্রেফতার করা হয়। পুলিশ বাসে তল্লাশি চালাচ্ছিল। ওরা অভিযোগ করল, আমি নাকি ট্যাক্স ফাঁকি দিয়েছি। কিন্তু আমার তো কোন ট্যাক্স শোধ করার কোনও ফাইলই ছিল না কারণ আমি তো তখন ছাত্র। এটা প্রমাণ করার জন্য আমার কাছে কাগজপত্র ছিল। ওই ব্যাপারটা ছিল আদালতে আমার প্রথম অভিজ্ঞতা। নিজের পক্ষে সাফাই গাইতে হয়েছিল। আপনি যখন ছোট থাকবেন তখন ভাববেন, বড়রা মিথ্যা কথা বলে না। কিন্তু পুলিশ যখন বিবৃতি পেশ করল তখন দেখলাম, সেটা একেবারে ডাহা মিথ্যা।
যখন আমার নিজের পক্ষে সাফাই গাওয়ার সুযোগ এল তখন আমি চিৎকার করে আমার গল্প বলতে চাইলাম। ওদের বানানো গল্প শুধরে দিতে চাইলাম। জজ সাহেব আমাকে প্রধান তদন্ত কর্মকর্তাকে জেরা করতে বললেন। আমি তো প্রশ্ন পাল্টা প্রশ্নের কিছু বুঝি না। তখন অ্যালাইয়েন্স হাইস্কুলে আমি যে বিতর্কের কৌশল শিখেছিলাম সেটা মনে পড়ল। বুঝতে পারলাম, তাঁকে প্রশ্ন করে আমি নিজেকে রক্ষা করতে পারি। ‘আপনার কি মনে আছে ঘটনাটা কখন ঘটেছিল ? আপনার কি মনে আছে ?’ প্রশ্নের উত্তরে পুলিশ কর্মকর্তা একেক বার একেক রকম তথ্য দিতে লাগলেন। কাজেই, আমি ছাড়া পেয়ে গেলাম।
সত্য আমাকে সবসময়ই শক্তি দিয়েছে। যখন আপনি সত্যের পক্ষে থাকবেন তখন আপনি অটল থাকবেন। এরপর যখন আমাকে কামিতিতে নিয়ে যাওয়া হলো তখন দেখলাম, আমি আদালতের পাঁচজন জজ সাহেবের সঙ্গে কোনও লিখিত ডকুমেন্ট ছাড়াই কথোপকথন করতে পারছি। এর কারণ―আমি নিশ্চিত ছিলাম, আসলে কী ঘটেছে। সত্য আমকে কিছু একটার সন্ধান দিল যার সঙ্গে আমি রয়ে গেলাম।
নামওয়ালি শারপেল : আপনি তো একটি উপন্যাস লিখেছেন। কারাগারের রোজনামচাও লিখেছেন। সত্যকথনের জন্য কোনও সাহিত্য-প্রকরণকে আপনি অধিকতর বেশি পছন্দ করেন ?
নগুগি ওয়া থিয়োংও : আমি গল্পের ঢংয়ে ভাবতে চাই, তা সেটা উপন্যাসেই হোক আর রোজনামচাতেই হোক।
নামওয়ালি শারপেল : নাটকের ব্যাপারে কী বলবেন ?
নগুগি ওয়া থিয়োংও : আমার নাটকগুলো মূলত গল্প। আমি ‘হাওয়া থেকে পাওয়া’র মতো কোনও বিষয় নিয়ে নাটক লিখিনি। যখন আমি ম্যাকারেরের ছাত্র ছিলাম তখন বিভিন্ন ছাত্র-হলের মধ্যে আন্তঃপ্রতিযোগিতা হলো। আমার হলের মান-সম্মান তখন যায় যায় অবস্থা। এটি আগের বছর ভালো করতে পারেনি।
The River Between (১৯৬৫) উপন্যাসটির জন্ম হয়েছে প্রতিযোগিতার মধ্য দিয়ে। এটি লেখার পেছনের প্রণোদনার বেশির ভাগই ছিল টাকা। তখনকার দিনে পুরস্কার হিসেবে এক হাজার কোরিয়ান শিলিং পাওয়ার হাতছানি, যা আজকের দিনের বাজার মূল্যে পাঁচ আমেরিকান ডলারের সমান। পুরস্কারটি এতটাই আকর্ষণীয় ছিল যে, ভাবলাম, খুব দ্রুত একটা উপন্যাস লিখে শেষ করে ফেলতে পারব। তবে লেখা শুরু করে দেখলাম, গল্পটাই আমাকে বেশি টানছে। এজন্যই আমি তরুণ লেখকদের বলি, তোমাকে লিখতে কোন জিনিসটা উৎসাহিত করে তা নিয়ে চিন্তা করো না। তোমার মেয়ে বন্ধুকেও যদি মুগ্ধ করার জন্য লেখ তবে সেটাও ঠিক আছে। যেই মাত্র তুমি লেখা শুরু করবে, দেখবে, লেখাটাই তোমাকে চালিত করছে।
নামওয়ালি শারপেল : আপনি কীভাবে উপন্যাস শুরু করেন ? আপনি কি পরিকল্পনা করে এগোন ?
নগুগি ওয়া থিয়োংও : পরিকল্পনা করি না। শুরু করলে উপন্যাস তার চেহারা নিয়ে নেয়। সাধারণত শুরু করতে সমস্যায় পড়ি। কিন্তু শুরুটা করলে এটা একটা রোডম্যাপ ধরে চলতে থাকে। কখনও কখনও এমন একটি কল্পচিত্র হতে পারে যে, কেউ একজন রাস্তা ধরে হাটছে। উদাহরণ হিসেবে বললাম আর কি। কখনওবা কোন স্মৃতিকথা দিয়ে শুরু হতে পারে। ঘানার সমাজবিজ্ঞানী কে. এ. বুসিয়ার সঙ্গে আলাপ করতে করতে Weep Not Child উপন্যাসের প্রথম লাইনটি মাথায় এসেছিল। দক্ষিণ কোরিয়ার কবি কিম চি-হা’র বর্ণনাধর্মী কবিতা ‘Five Bandits’ থেকে আমার উবারষ Devil on the Cross উপন্যাসের রসদ সংগ্রহ করেছিলাম। সত্তরের দশকে যখন টোকিওতে গিয়েছিলাম তখন তাঁর সাহিত্যকর্মের ব্যাপারে অবগত হলাম। শুনলাম, তিনি তাঁর লেখার জন্য জেল খেটেছেন। কবিতাটি পড়ে দেখলাম, এক পার্টিতে ব্যবসায়ী, রাজনীতিবিদ এবং এমন আরও অনেকে সমবেত হয়ে তাঁদের কে কত বেশি দুর্নীতি করেছেন, তা নিয়ে আস্ফালন করছেন। কবিতাটি আমি সঙ্গে করে নিয়ে এলাম। ১৯৭৬ সালে আমি তাঁর রচনা নাইরোবি বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ্যক্রমের অন্তর্ভূক্ত করলাম। দক্ষিণ কোরিয়ার কূটনীতিক আমার অফিসে এলেন। বললেন, কিম চি-হা খুব সাংঘাতিক একজন লেখক। আমি তাঁকে বললাম, দেখুন, আমরা কেনিয়াতে কোন লেখককে কারাগারে আটকাই না। এরপর অল্প সময়ের মধ্যেই আমাকে উচ্চ নিরাপত্তার কারাগারে আটকে রাখা হলো। ওখনেই লিখলাম Devil on the Cross.
নামওয়ালি শারপেল : জেলে যাবার পূর্বে তো আপনি কেনিয়ায় ইউরোপীয় ঔপনিবেশিকদের সামাজিক জীবন-যাপন পদ্ধতি নিয়ে লিখছিলেন। সেটা কখনই ছাপলেন না কেন ?
নগুগি ওয়া থিয়োংও : একজন সাহিত্যের এজেন্টের সঙ্গে পরিচয় হয়েছিল। তাঁর কাছ থেকেই ধারণাটা পাই। এর নাম হতে পারত A Colonial Affair. তিনি আমাকে অনেক টাকা দিয়েছিলেন। কোনও উপন্যাস লিখেও আমি এত টাকা পাইনি। আর্কাইভগুলোতে পুরাতন সংবাদপত্রের খোঁজে অনেক সময় ব্যয় করেছিলাম। ওদের স্মৃতিকথার খোঁজ করছিলাম। ওরা কেমন আনন্দে বসবাস করত সেগুলোর জানার জন্য এসব উপকরণ খুঁজছিলাম। কিন্তু এরপর আমার আর এই শ্বেতাঙ্গ ঔপনিবেশিকদের ব্যাপারে খোঁজ-খবর করার আগ্রহও থাকল না, আর্থিক সঙ্গতিও থাকল না। এদের আমি স্বর্গের পরজীবী নাম দিয়েছিলাম। খায়-দায় আর অন্যের বউদের সঙ্গে ফুর্তি করে। সব টাকা খুইয়ে অবশেষে এই কাজে ক্ষান্ত দিলাম। রয়ালটি থেকে অগ্রিম টাকা নিয়েছিলাম।
নামওয়ালি শারপেল : আপনার ড্রাফ্টটা কি কাউকে দেখাবেন ?
নগুগি ওয়া থিয়োংও : আজকাল আমি এখান থেকে অনুচ্ছেদগুলো জোরে জোরে পড়ি, বিশেষ করে আমার সন্তানদের পড়ে শুনাই। ওরা অবশ্য সবসময় শুনতে চায় না। ‘যে কাজ নিয়ে এগিয়ে চলছি আমি অবশ্য সে কাজের বিষয়ে কারও সঙ্গে কিছু বলি না। কিন্তু ১৯৬২ সালে Weep Not, Child উপন্যাসের পাণ্ডুলিপি চিনুয়া আচেবেকে দেখিয়েছিলাম। ম্যাকারেরেতে তিনি আমার ক্লাস ভিজিট করতে এসেছিলেন। আবার বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘African Writers of English Expression’ শিরোনামের কনফারেন্সেও তিনি এসেছিলেন। তিনি অল্প কয়েক পাতা পড়ে দাগ-টাগ দিয়েছিলেন। আমার মনে আছে, তিনি একটা শব্দবন্ধ ব্যবহার করেছিলেন। সেটি হলো ‘মরা ঘোড়ার পিঠে চাবুক কষে লাভ নেই।’ এর অর্থ হলো, আমার নিজস্ব বিষয় নিয়েই আমাকে এগোতে হবে। সেটিই ভালো। এরপর তিনি আমার এই পাণ্ডুলিপি তাঁর প্রকাশক হ্যানিম্যানকে দেখান। হ্যাঁনিমান এটি ছাপায়।
নামওয়ালি শারপেল : আপনি কি বার বার ঘষামাজা করেন ?
নগুগি ওয়া থিয়োংও : মাঝে মাঝে বেশ অনেক বার। আমার মনে আছে, The River Between-এর লেখা ভালোই এগোচ্ছিল। হঠাৎ এক জায়গায় এসে আটকে গেলাম। বুঝতে পারলাম, আমাকে সময় মতো পেছনে, যতে হবে। কয়েক বছর পেছন থেকে বয়ানটি শুরু করতে হবে। এটি দীর্ঘলম্ফ দেওয়ার মতো। আমার গতি সঞ্চয়ের জন্য কয়েক ধাপ পেছনে যেতে হবে।
নামওয়ালি শারপেল : এই গ্রন্থে মুথোনি নাম্নি এক তরুণী খৎনার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে। আপনার প্রথমদিকে সাংবাদিকতা পেশায় থাকাকালে খৎনা-প্রথাকে আপনি পাশবিক বলে উল্লেখ করেছেন। কিন্তু উপন্যাসে বিষয়টাকে আপনি যেভাবে দেখেছেন তাতে আপনি খৎনার প্রশ্নটিকে অনেক দিক থেকে বিবেচনা করেছেন।
নগুগি ওয়া থিয়োংও : খৎনা-প্রথাকে আপনি উৎসাহিত করতে চাইবেন না। আবার যারা এই কাজ করে তাদের আপনি বোকা বা বিধর্মীও বলতে পারবেন না। শয়তান মনে করে, কোনও মানুষকে আপনি আক্রমণ করতে পারবেন না। মানুষের নিজেকেই এটি উপলব্ধি করতে হবে। তাকে শিক্ষিত হতে হবে। সাংবাদিকতায় আমি আরও বেশি সুনির্দিষ্ট করে বলেছি কারণ লেখকের সরাসরি মন্তব্যের মধ্যে কোনও ফাঁক-ফোকর থাকে না। কিন্তু উপন্যাসে তো দ্বন্দ্ব থাকে। সমস্যা থাকে। যার ফলে The River Between উপন্যাসে নারীদের খৎনার নিন্দাও নেই আবার সমর্থনও নেই। আমার উপন্যাসের আখ্যানে মুথোনি মারা যায়। তবে আমি কিন্তু তাকে শাস্তি দিচ্ছি না। আমি শুধু বলতে চাই, এটি ঘটতে পারে।
রাজনৈতিকভাবে স্বাধীনতার জন্য সংগ্রামে অংশ নেওয়া উভয় পক্ষই এবং কেনিয়াতে যে মিশনারিরা স্কুল চালায়, তারাও এই প্রথার বিরোধিতা করেছে যেমনভাবে এরা জাতীয়তাবাদী সংগ্রামের বিরোধিতা করেছে। তারা কিন্তু বলছে না যে, এটি ক্ষতিকর। এটা এক ধরনের লিটমাস টেস্টের মতো। আপনি খ্রিস্টান কি না, তার পরীক্ষা করার জন্য।
নামওয়ালি শারপেল : আপনি কখন উপলব্ধি করতে শুরু করলেন যে, ধর্ম নিপীড়নের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হতে পারে ? Birth of a Dream Weaver (২০১৬) এ যখন আপনি জন নিউটনের স্তোত্রগীত নিয়ে আলোচনা করছিলেন তখন লিখলেন, যে মুহূর্তে সম্রাটগণ বুঝতে পারলেন, তাঁরা যতখুশি পাপ করতে পারেন, যত সংখ্যক খুশি মানুষের জীবন নিতে পারেন এবং এরপর মৃত্যুশয্যায় পাপস্খলন করা যায়, ঠিক সেই মুহূর্ত থেকেই খ্রিষ্টধর্ম সাম্রাজ্যবাদের ধর্ম হয়ে গেল। জন নিউটন যিনি মানুষকে দাসে পরিণত করেছেন, তিনি ‘বিস্ময়কর করুণার কথা লিখেছেন।’
নগুগি ওয়া থিয়োংও : এটা ধীরে ধীরে হয়েছে। কৈশোরে আমি খুব ধার্মিক ছিলাম। কিন্তু যে সময়ে The River Between লিখছিলাম সে সময় নাগাদ খ্রিস্টধর্মের ব্যাপারে সন্দিহান হয়ে উঠলাম। বিশেষ করে কেনিয়ায় খ্রিস্টান মিশনারির কর্মকাণ্ড এবং উপনিবেশিকতার যোগাযোগের ব্যাপারে। কিছু কিছু ক্ষেত্রে বড় পার্থক্য রয়েছে। আপনি যদি বেশির ভাগ ধর্মীয় আন্দোলনের কথা ভাবেন তাহলে দেখবেন, এগুলো সাধারণ খেটেখাওয়া মানুষের জন্যই হয়েছে। যিশুর শিষ্যরা ছিলেন সমাজের অবহেলিত মানুষ। যেমন জেলেরা সে-সময় ছিল অন্ত্যজদের মধ্যেও অন্ত্যজ। রোমান সাম্রাজ্যের অভিযোগের ব্যাপারে তিনি ছিলেন বিপ্লবী। লোকজনের কাছে ছিলেন, যাকে আমরা ভণ্ড বলে থাকি। বৌদ্ধ ধর্মেও আমরা তাই দেখি। বুদ্ধ ধনী পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। কিন্তু তিনি সব ত্যাগ করেন। তিনি বনে চলে যান যাতে তার শিষ্যরা একই ব্রত অনুসরণ করতে পারেন। মহিলারা ছিলেন মুহাম্মাদের সবচেয়ে বিশ্বস্ত অনুসারী। কারণ, তিনি সেই প্রথার বিরোধিতা করেন যেখানে একজন একশত মহিলাকে বিয়ে করতে পারত। তিনি এই সংখ্যা চারে স্থির করে দিলেন। সমস্যাটা হলো, সব ধর্মই আনুষ্ঠনিকতা শুরু করে দেয়। পরবর্তীকালের ঐসব অনুষ্ঠান আধ্যাত্মিকতার চাইতে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে যায়। এটি তখন প্রশ্নে আশ্রয় নেয়―আপনি কি দিনে চারবার প্রার্থনা করেন ? এইসব আনুষ্ঠানিকতা কব্জা করে ফেলে সমাজের ধনীক শ্রেণির মানুষেরা।
নামওয়ালি শারপেল : তাহলে কি আপনি বুঝতে চাচ্ছেন, যে আধ্যাত্মিকতা নিয়ে ধর্ম শুরু হয় তা জন্মগতভাবে বৈপ্লবিক ?
নগুগি ওয়া থিয়োংও : আপনি বাইবেলের দিকে তাকান। আফ্রো-আমেরিকানদের মধ্যে এটি প্রতিরোধ তৈরি করতে ভূমিকা রেখেছে। আপনি কি ‘মুক্তির গান’ জানেন। এটি তো খুবই শক্তিশালী, খুবই আধ্যাত্মিকতাপূর্ণ। দাসদের শিক্ষা এবং ভাষাও যে শেখানো হতো না, সে-কথা তো ঐতিহাসিকভাবেই সত্য। উপনিবেশগুলোতে আফ্রিকার ভাষা নিষিদ্ধ হয়েছিল। তারা তাদের ঐতিহ্যের মেলবন্ধন তৈরি করে ইংরেজি ভাষার সঙ্গে। আপনি একটি নতুন ভাষা-ব্যবস্থা পেলেন। এটিই আপনার আধ্যাত্মিকতার নির্মাণ করলো। পল বরসনের গান ‘চলে যাও মুসা’ এর কথা মনে করুন। আমি বলতে চাচ্ছি, আফ্রো-আমিরিকার ইতিহাসে বাইবেল বৈপ্লবিক ভূমিকা পালন করেছে। আমাদের আফ্রিকার ইতিহাসেও। জোমো কেনিয়াত্তার মতো কেনীয়রা নিজেদের প্রায়ই তুলনা করেছেন ইজরালের সন্তানদের সঙ্গে যারা মুসার দ্বারা পরিচালিত হয়। এই মুসা ফারাওয়ের কর্তৃত্ববাদের শিকার হয়েছিলেন। অনেক স্তোত্রগীত স্বাধীনতার গানে পরিণত হয়েছে।
নামওয়ালি শারপেল : আপনার লেখায় আপনি আফ্রো-আমিরিকী সংগ্রামের সঙ্গে আফ্রিকার সংগ্রামের যোগসূত্র দেখিয়েছেন। উদাহরণ স্বরূপ, জেসি ক্যারোথারসের কথা বলা যায় যিনি মাউ মাউ বিপ্লবকে জনগণের উন্মাদনা বলে চিহ্নিত করেছেন এবং ইউএসের কার্টরাইট যিনি দাসত্বের শৃঙ্খলে আবদ্ধ মানুষের স্বাধীনতার জন্য সংগ্রামকে মানসিক বৈকল্য বলে চিহ্নিত করেছেন। আপনি কি সবসময়ই এই ডায়াসপোরাগত সম্পর্কের ব্যাপারে সচেতন ?
নগুগি ওয়া থিয়োংও : বড় হয়ে আমি হ্যারি থুকুর গল্প ও গান শুনেছি। তিনি ঐ সময়ের অনেক বড় বীর। তিনি কেনিয়ার প্রথম দিকের সংগ্রামের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। তাঁর বন্ধু ও উপদেষ্টা মনিলাল দেশাই একজন গান্ধীবাদী কর্মী। থুকুর মার্কাস গার্ভের সর্বজনীন নিগ্রো কল্যাণ সংস্থার সঙ্গে যোগাযোগ ছিল। আমার মনে হয়, সেজন্যই ব্রিটিশরা তাঁকে জেলে পাঠিয়েছিলেন।
কেনিয়ার ইতিহাসের মিথলোজির একটি অংশ হিসেবে থুকু আমাকে সবসময়ই মুগ্ধ করেছেন। কিন্তু জেলে থাকার পর তিনি ভেঙে পড়েন। যে আদর্শ দিয়ে তিনি শ্রমিকদের একত্র করেছিলেন তা হারিয়ে ফেলেন। পরবর্তীসময়ে কেউ একজন আমাকে তাঁর জীবনী লিখতে বলেন। আমি তার বাসায় গিয়ে দেখা করি। আমার মনে হলো, এ কাজ আমাকে দিয়ে হবে না।
নামওয়ালি শারপেল : আপনি শ্বেতাঙ্গদের প্রতিষ্ঠান কর্তৃক নিপীড়ন ও নির্যাতনের প্রেক্ষিতে কালোদের আবিষ্কার করেছেন। এ কাজ করেছেন ইস্ট আফ্রিকান অ্যাগ্রিকালচার অ্যান্ড ফরেস্ট্রি রিসার্চ অরগানাইজেশনে কাজ করার সময়। আবার পড়াশুনার মধ্য দিয়েও। লেখকদের মধ্যে কারা এই আবিষ্কারের ব্যাপারে আপনাকে অবহিত করেছেন ?
নগুগি ওয়া থিয়োংও : আমি বুকার টি ওয়াশিংটনের Up From Slavery at Alliance পড়েছি। তবে যখন ম্যাকারেরে গিয়েছিলাম তখনই আমি আফ্রো-আমেরিকি সাহিত্য ও ক্যারিবীয় সাহিত্যের ব্যাপারে জেনেছি। ইংরেজি বিভাগে ঐসব লেখকের কোনও উল্লেখ ছিল না। তবে ওখানে একজন ইতিহাসের শিক্ষক ছিলেন যিনি আমাকে সিএল এবং জেমসের মতো কিছু চিন্তকের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেন। জর্জ ল্যামিংয়ের উপন্যাসের সঙ্গেও। তখনও মনে হয়েছে এখনও মনে হয় ল্যামিংয়ের উপন্যাস In the Castle of My Skin কী অবিশ্বাস্য রকমের চমৎকারভাবে লেখা একটি গ্রন্থ। অনেকভাবে এটি আমার Weep Not, Child উপন্যাস লেখার পেছনে উৎসাহ দিয়েছে। আমার মনে আছে, তখন আমার মনে হয়েছিল যে, তিনি যদি বারবাদোসের একটি গ্রামের জনগোষ্ঠীকে এতটা প্রাণবন্ত করে তুলতে পারেন, তাহলে কেনিয়াতে আমিও এ কাজ করতে পারব।
লিড্স বিশ্ববিদ্যালয়ে আমি ল্যামিংয়ের উপর অভিসন্দর্ভ লিখেছি। রাজনীতি, দাসপ্রথা ও বিপ্লবের প্রেক্ষিতে লিখেছি। সেটিই ছিল আমার প্রথম তাত্ত্বিক অনুসন্ধান। সে সময় লিডস অক্সফোর্ড ও ক্যামব্রিজকে টক্কর দিচ্ছিল। ওখানে থাকার মজাই ছিল আলাদা। লেবার পার্টি ছিল তখন ক্ষমতায়। লিডস ইউনিয়ন তখন সবে সাউথ আফ্রিকার ফুটবলার আলবার্ট লুইস জোহানেসকে পরিচয় করিয়ে দিয়েছে। ক্যাম্পাসের সর্বত্র মার্কসবাদী সংঘ। আমার মনে পড়ে, ম্যাকারেরে থেকে একজন কেনীয় ছাত্র কোনও এক ছুটিতে ফ্রান্সে গিয়েছিল। সেখান থেকে লিডসে ফেরার পথে সে সঙ্গে করে নিয়ে এসেছিল ফ্রানৎস ফানোর The Wretched of the Earth বইটি। ঔপনিবেশিক দেশগুলোর সব ছাত্রের হাতে হাতে বইটি ফিরেছিল। মার্কস এবং ফানোর মুখোমুখি হওয়ার আগ পর্যন্ত আমি কখনও বুঝিইনি যে, কেন স্বাধীনতার পরেও প্রতারণার ধরন পাল্টায়নি। ফানো আফ্রিকার পরিস্থিতিতে শ্রেণি সংগ্রামের বিষয়গুলো সামনে এনে আমাদের চোখ খুলে দেন। সেই ভাবনা আমার Petals of Blood উপন্যাসে প্রতিফলিত হয়েছে পরিষ্কারভাবে। A Grain of Wheat এও।
নামওয়ালি শারপেল : A Grain of Wheat এবং Petals of Blood গঠনের দিক থেকে আপনার প্রথম দিকের রচনার তুলনায় অধিকতর বেশি উদ্ভাবনী শক্তি সমৃদ্ধ উপন্যাস। আপনার প্রথম দিকের রচনাগুলো একটি মাত্র চরিত্রের চারপাশে ঘুরপাক খায়। এই যে পরিবর্তন, এটি কীভাবে হলো ?
নগুগি ওয়া থিয়োংও : শৈলীর দিক থেকে বলতে গেলে দুটি উপন্যাস আমার লেখাপড়ার ফল। আমি যখন ম্যাকারেরের ছাত্র তখন আমি ঊনবিংশ শতাব্দীর উপন্যাস পড়তাম। এগুলো ছিল বাস্তবনির্ভর লেখা। আসল কথা হলো―সে সময় আমি শুধু ইংরেজি উপন্যাসই পড়েছি। তা সেটা ল্যামিংয়েরই হোক আর আচেবেরই হোক। কিন্তু আমার সেখানে চার বছর সময়ের শেষের দিকে আমার অভিসন্দর্ভের জন্য আমি কনরাড পড়ি। কিছু কিছু দিক থেকে তিনি গতানুগতিক গল্পকথক। যে কাদায় তিনি উপন্যাস লেখেন অর্থাৎ একজন গল্প শুরু করেন। তারপর এটি আরেকজন, তারপর আরেকজনে স্থানান্তরিত হয়, সেটি আমাদের সংস্কৃতির মৌখিক সাািহত্যের ব্যাপার মনে করিয়ে দেয়। একটি কেন্দ্রীয় সরলরৈখিক বয়ান অনেককে যুক্ত করে, অতীতের অনেকের সঙ্গে, অনেক স্থানের সঙ্গে যুক্ত করে।
নামওয়ালি শারপেল : কনরাডের প্রভাব কি আপনাকে Grains of Wheat লিখতে উদ্বুদ্ধ করেছিল। উপন্যাসের গল্পটি কয়েকদিনের। কিন্তু এর ফ্ল্যাশব্যাক একে একটি মহাকাব্যিক ব্যাপ্তি দিয়েছে।
নগুগি ওয়া থিয়োংও : এটা সম্ভব কারণ আমি তখন সবে কনরাডের Under Western Eyes পড়েছি। সচেতনভাবে নয় তবে কীভাবে বিভিন্ন স্থান, সময় ও স্মারক একসঙ্গে জুড়িয়ে দেওয়া যায় তা সত্যিই চমৎকার। যখন আপনি এটা পারবেন তখন আপনি আপনার গল্পকে পৃথিবীর শেষ পর্যন্ত নিয়ে যেতে পারবেন। অথবা এর গঠন প্রক্রিয়ার কাছেও। Petals of Blood এ আমি এই কৌশলকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেছি। এখানে একটি গ্রামের চারজন মাত্র চরিত্র। এরা পুরো কেনিয়ার গোটা ইতিহাসকে পূর্ণতা দিয়েছে। যখন কারাগারে থাকালীন আমি Devil on the Cross লিখা শুরু করি তখন আমি বেশ সাদামাটা গঠনকাঠামো ব্যবহার করি। ওয়ারিংগাও একটি পথে যাত্রা করে। এ শহর থেকে সে শহর এবং নাইরোবিতে পর্যন্ত। মোট তিনবার।
নামওয়ালি শারপেল : মাটিগারি তো আরও সরলরৈখিক। এটি সময়ের সন্ধান করেছে, স্থানের নয়।
নগুগি ওয়া থিয়োংও : হ্যাঁ, এতে কোনও কিছুই আসলে ঘটেনি। অথচ এখানে সবই আছে।
নামওয়ালি শারপেল : Devil on the Cross এবং Matigari-তে যে সরল রচনাশৈলী ব্যবহৃত হয়েছে তা কি গিকুয়ুতে লিখবেন বলে সম্ভব হয়েছে ? একদিক থেকে বলতে গেলে আপনি আপনার সাহিত্যিক ক্যারিয়ারের পুরোটা জুড়ে এই সরল রচনাশৈলীই ব্যবহার করেছেন।
নগুগি ওয়া থিয়োংও : মাটিগারি মজা করে লেখা। কিন্তু Devil on the Cross লেখার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সবকিছু জটিল। কারণ আমি তখন আমার ইংরেজি ভাষার উপর নির্ভরশীলতা থেকে মুক্ত হচ্ছিলাম। কারাগারে যে সমস্যাটির আমি মুখোমুখি হতাম তা হলো―একটা শয়তান ইংরেজদের পোশাক পরে আমার কাছে আসত। গিকুয়ু ভাষায় তখন লিখিত কিছু ছিল না বললেই চলে। শব্দভাণ্ডারের জন্য আামাকে পরিশ্রম করতে হতো। তখনই সেই ছোট্ট শয়তানটা এসে বলত, কেন এত খাটাখাটি করছ ? এই তো আমি এখানে।
গিকুয়ু ভাষায় এক ধরনের তেলতেলে ভাব আছে। একটা বাক্য আজ হয়তো লিখলাম। পরের দিন সকালে পড়লে মনে হতো এটা তো ভিন্ন একটা অর্থ দিচ্ছে। সবসময়ই বাদ দেওয়ার প্রলোভন কাজ করত। তবে আর একটি কন্ঠস্বর যেন আমাকে বলত, গিকুয়ু ভাষাতেই চেষ্টা করে যাও।
নামওয়ালি শারপেল : কারাগারে থাকাকালে আপনার গিকুয়ু ভাষায় উপন্যাস লেখার ধারণা কীভাবে মাথায় এল ?
নগুগি ওয়া থিয়োংও : নগুগি ওয়া মিরির সঙ্গে গিকুয়ু ভাষায় ও I Will Marry When I Want নাটকটি লেখার জন্য ১৯৭৭ সালে আমাকে জেলে যেতে হয়েছিল। নাটকটি ১৯৮০ সালে প্রকাশিত হয়। এর অনুবাদ অবশ্য ছাপা হয় ১৯৮২ সালে। ইংরেজি ভাষায় লেখার জন্য পুলিশ প্রশ্ন করেনি। যখন গিকুয়ু ভাষায় লিখলাম তখন জেলে পাঠাল। ভয়ংকর অভিজ্ঞতা হলো। যখন আমি নিজেই নিজেকে প্রশ্ন করলাম নাটকটির জন্য কেন আমাকে জেল খাটতে হলো তখন ভাষার বিষয়টি আমার ভাবনার কেন্দ্রবিন্দুতে আসে। সে সময় আফ্রিকায় একটি সরকারের রাষ্ট্রপতি খুব ভালো গিকুয়ু বলতেন। যখন আমি Devil on the Cross লিখি তখন এসব বিষয় আমার মাথায় ঘুরপাক খেতে থাকে।
নামওয়ালি শারপেল : তাহলে আপনি বলছেন, নাটকটির বিষয়বস্তু নয় বরং ভাষাই সরকারকে ক্ষেপিয়ে দেয় ?
নগুগি ওয়া থিয়োংও : আমার মনে হয়, যে গ্রামে আমরা নাটকটির মঞ্চায়ন করেছিলাম সেখানকার সবাই আমাদের বাহবা দিয়েছিল। কামিরিথু কমিউনিটি এডুকেশন অ্যান্ড কালচারাল সেন্টারকে শুরু থেকে সাম্প্রদায়িক মনে হতো। অভিনেতা-অভিনেত্রীরা এই কমিউনিটির সদস্য ছিলেন। দৃশ্যগুলো তৈরি করতে তাদের অবদান গুরুত্বপূর্ণ। জ্ঞান ও দক্ষতা ঔপনিবেশিক ব্যবস্থায় যেভাবে ধোঁকা দেওয়া হয়, তার একটি বিরুদ্ধ-প্রপঞ্চ আমরা তৈরি করতে চেয়েছিলাম। অভিনয়ে ওদের যে চূড়ান্ত অর্জন তা ছিল দীর্ঘদিনের কঠোর পরিশ্রমের ফল। এই সবকাজ করার জন্য আমাদের ঐ কমিউনিটির ভাষা ব্যবহার করতে হয়েছিল।
জেলের ঘটনায় আমি হতবিহ্বল হয়ে পড়েছিলাম, কারণ আমি তো অন্যান্য আরও নাটক লিখেছি যেখানে উত্তর ঔপনিবেশিক কালের সরকারের সমালোচনা করা হয়েছে। Petals of Blood এর কথা নাই বা বললাম। সেটা তো আরও সাংঘাতিক। Devil on the Cross ভাষায় রচনা করা আমার একটি সচেতন প্রতিবাদ। এমন সচেতনতায় আমি ঐ নাটকটিও কিন্তু লিখিনি। আমাকে দিনরাত পাহারা দিলেও জেলে আমার মনে হয়েছে, যে কাজের জন্য আমাকে জেলে ঢুকানো হয়েছে আমাকে সেই কাজই করে যেতে হবে। তাই গিকুয়ু ভাষায় আমি শ্রেণির সংগ্রাম নিয়ে একটি উপন্যাস লিখলাম। ঐ ভাষাই তখন আমার উপর ভর করেছিল। তাই জেল কর্তৃপক্ষ আমাকে যে কলম ও কাগজ সরবরাহ করেছিল, তা দিয়ে লিখে ফেললাম। কারারক্ষীরা বুঝতেই পারছিল না যে, শুধু লেখার কারণে আমার জেল হয়েছে। ওরা ভাবল, অন্য কোনও কারণ আছে নিশ্চয়। আমি জানতাম জেলের বাইরে কী ঘটছে, সে ব্যাপারে ওদের বলার জন্য শক্ত করে নিষেধ করা হয়েছে। আমি ওদের কাছে খবর জানতে চাইতাম না। আমি ওদের গিকুয়ু ভাষা সম্বন্ধে এটা-সেটা জিজ্ঞেস করতাম। শ্লেষাত্মকভাবে কারারক্ষীদের কেউ কেউ তো আমার গিকুয়ু ভাষার শিক্ষক হয়ে গেলেন।
নামওয়ালি শারপেল : ঔপনিবেশিকদের স্কুলে গিয়ে আপনি যে বিতর্ক করা শিখেছেন তা আপনাকে আদালতে মামলার প্রয়োজনে জেরা করতে সাহায্য করেছে। কারারক্ষীরা জেলখানায় আপনার উপন্যাস লেখার ব্যাপারে সাহায্য করেছে। আপনি নিপীড়নকারীদের অস্ত্রই তাদের বিরুদ্ধে ব্যবহার করেছেন।
নগুগি ওয়া থিয়োংও : কারগারে যে কাগজ দেওয়া হতো তা যে খুব ভালো টয়লেট পেপার তা কিন্তু নয়। এই কাগজ প্যাকেটে আসত। সত্য কথা বলতে কী, এটি লেখার জন্য খুব ভালো ছিল।
নামওয়ালি শারপেল : Globalectics পড়ার সময় আপনার Poor Theory এর কথা মনে পড়ে যায়। অর্থাৎ সীমিত সামর্থ্যরে মধ্যে চলার ধারণা। স্যামুয়েল বেকেট বলেছেন, প্রথমে ফরাসি ভাষায় লিখে তারপর ইংরেজিতে অনুবাদ করতে গিয়ে তিনি এক ধরনের ‘প্রয়োজনীয় সৃজনশীল প্রতিবন্ধকতা’র মুখোমুখি হয়েছেন। গিকুয়ু ভাষায় লিখতে গিয়ে আপনারও কি একই অবস্থার মুখোমুখি হতে হয়েছে ?
নগুগি ওয়া থিয়োংও : বেকেট আইরিশ ভাষায় লেখার চেষ্টা করতে পারতেন। অবশ্যই গিকুয়ু ভাষায় লিখতে গিয়ে অনেক চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হয়েছে। শুধু যে প্রকাশক খুঁজে পাওয়া, তা নয়। এমনকি কেনিয়াতেও অনেক বড় বড় সমস্যার সঙ্গে লড়াই করতে হয়। আপনি আপনার কাজের কথা কীভাবে আলোচনা করবেন; স্কুলে কী পড়াবেন বা কী বই পড়বেন তার সবকিছুকে ইংরেজি ভাষা কুক্ষিগত করে ফেলেছে। ১৯৫২ সালে ব্রিটিশরা আফ্রিকার নিজস্ব সব স্কুল বন্ধ করে দেয়। এখন তো আফ্রিকার নিজস্ব ভাষায় রচিত গ্রন্থ সেই সময়ের চাইতেও অনেক অনেক কম। ধীরে ধীরে কেনিয়ার সংস্কৃতি ও বুদ্ধিবৃত্তিক জনগোষ্ঠীকে ইংরেজি ভাষা দখল করে নিচ্ছে। গিকুয়ু ভাষায় আগে যা কখনও হয়নি এখন আমার উপন্যাসের মাধ্যমে আমি তা করছি। একটি নতুন ধারার ভিত্তিপ্রস্তর বলে বিবেচনা করা হয় আমার গিকুয়ু ভাষার গ্রন্থসমূহ।
নামওয়ালি শারপেল : অনেক দিন যাবৎ বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ্যক্রমকে ঔপনিবেশিকতার প্রভাব মুক্ত করার জন্য কাজ করেছেন। ইংরেজি বিভাগের বিলুপ্তির ডাক দিয়ে ১৯৬৮ সালে নাইরোবি বিশ্ববিদ্যালয়ে আপনি বিতর্কের মুখে পড়েন।
নগুগি ওয়া থিয়োংও : এক দিক থেকে বলতে উত্তর ঔপনিবেশিক ও বিউপনিবেশিক তত্ত্বের গৌরচন্দ্রিকা হয় ১৯৬৮ সালে নাইরোবিতে। নাইজেরিয়ার ইতিহাসবিদ কেনেথ ডাইক এবং কেনিয়ার ইতিহাসবিদ বেথওয়েল ওগোট কিনি ঘটনাক্রমে আমার গণিতের শিক্ষক ছিলেন। এদের কাছ থেকে আমি এবং আমার সহকর্মী অভিজ্ঞতা নিই। তিনি অ্যালায়েন্স স্কুলে আমার গণিত শিক্ষক ছিলেন। কাচামাল হিসেবে মৌখিক সাহিত্যের উপকরণ গ্রহণ করার ব্যাপারে ওরা আমাকে উৎসাহ দেন। সে সময় আমরা যে প্রশ্নটি করেছিলাম তা হলো―আপনি যখন কেনিয়াতে আছেন তখন আপনার অভিজ্ঞতার কেন্দ্রে নাইরোবি না কি লন্ডন থাকা উচিত ? কেউ কেউ আমাদের উপর ক্ষেপে গেলেন আমরা ইংরেজির আধিপত্যের ব্যাপারে প্রশ্ন করছি বলে। কেনিয়ার সংসদ তো বলেই ফেলল, আমরা নাকি শেক্সপিয়রকে উচ্ছেদ করে তদস্থলে ক্যারিবীয় কমিউিনিস্টদের নিয়ে আসতে চাই! ভিএস নাইপলকে কমিনিস্ট বলা সত্যিই হাস্যকর!
কারাগারে থাকাকালীন আমার যে ভাষা-ভাবনা তা আদতে শুরু হয়েছিল ১৯৬৬ সালে। তখন আমি নিউইয়র্কে গিয়েছিলাম PEN ইন্টারন্যাশনাল কনগ্রেসে যোগ দিতে। সেখানে একটি প্যানেলে সভাপতিত্ব করেছিলেন আর্থার মিলার। ঐ প্যানেলে অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে পাবলো নেরুদা ও ইগনাজিও সিলোনও ছিলেন। আমার মনে আছে, সেখানে সিলোন ইতালীয় উপন্যাসের ইংরেজি ভাষায় অনুবাদের যে স্বল্পতা আছে তা নিয়ে অভিযোগ করেন। তিনি বললেন, ইতালীয় ভাষা বান্টু ভাষার মতো নয় যে, যার শব্দভাণ্ডারে মাত্র দুই-তিনটি শব্দ আছে। ব্যাপারটি আমাকে আঘাত করে। আমার মনে পড়ে, পুরো দর্শক শ্রোতার সামনে দাঁড়িয়ে আমি তাকে সংশোধন করে দিয়েছিলাম। আমার খুব খুব রাগ হয়েছিল। এরপর যখন লিডসে গেলাম তখন তো আমি A Grain of Wheat উপন্যাসটি লিখতে লিখতে মাঝ পথে। মনে হলো, ইংরেজিতে লিখে আমি তো সিলোনকেই সত্য প্রমাণ করছি। ঐ ঘটনা আমার মনের মধ্যে তোলপাড় তৈরি করল।
নামওয়ালি শারপেল : বিউপনিবেশিক আন্দোলন পশ্চিমে প্রচুর মনোযোগ আকর্ষণ করেছে। হলিউডে, সাংবাদিকতায়, বইপত্রে এবং বিশ্ববদ্যালয়গুলোতেও। আপনি কি মনে করেন, এতে আপনার যথার্থতা প্রমাণিত হয়েছে ?
নগুগি ওয়া থিয়োংও : ১৯৮৬ সালে যখন আমার Decolonizing the Mind প্রকাশিত হলো, আমার মনে আছে তখন আমি আফ্রিকার নেতৃস্থানীয় বুদ্ধিজীবীদের কাছ থেকে এক ধরনের ঘৃণা পেয়েছিলাম। একজন এ রকম কিছু একটা বলেছিলেন যে, নগুগি পেছনে দেখার আয়নার দিকে তাকিয়ে গাড়ি চালাতে বলছেন। আমার মনে পড়ে, তিনি অনিচ্ছাকৃতভাবে আফ্রিকার ভাষার পশ্চাৎপদতার ধারণাকে প্রতারিত করছেন। এই ব্যক্তি তাঁর ইংরেজি ভাষার কাজে বেশ অগ্রসর। আরেকবার লন্ডনে এক কনফারেন্সে আমি আমার বইয়ের পক্ষে সাফাই গাচ্ছিলাম। তখন কেউ একজন আমাকে জুলু ভাষায় প্রশ্ন করলেন। তিনি আসলে আফ্রিকার ভাষায় কথা বলার ব্যাপার নিয়ে ঠাট্টা করতে চেষ্টা করছিলেন।
পরবর্তীসময়ে ব্রেইকের শব্দবন্ধ ‘একটি মাত্র ধূলিকণাতে বিশ্বটাকে দেখা’ আমাকে উৎসাহিত করে। আমার Globalectics-এর সারমর্ম নিহীত আছে এই শব্দবন্ধে। যখন আপনি আপনার নিজের অভিজ্ঞতাকে একটি ধূলিকণা হিসেবে দেখেন তখন ঐ কণার মধ্য দিয়ে আপনি বিশ্বটাকে দেখতে পাবেন। আপনার নিজস্ব ইতিহাসের মধ্য দিয়ে, আপনার নিজস্ব ভাষার মধ্য দিয়ে, তা সেটা কিশোয়াহিলি হোক আর ইংরেজিই হোক। এটি একটি ক্রমাধিকার ব্যবস্থা। আমি এটিকে ঘৃণা করি। আমাদের একটি ভাষার উপরে আরেকটি ভাষাকে স্থাপন করা উচিৎ নয়।
নামওয়ালি শারপেল : আপনি আপনার স্মৃতিকথা কেন ইংরেজিতে আর উপন্যাস কেন গিকুয়ুতে লেখেন ?
নগুগি ওয়া থিয়োংও : ভেবেছিলাম Decolonizing the Mind আমার ইংরেজিতে লেখা সর্বশেষ গ্রন্থ। এরপর থেকে সব লেখা গিকুয়ু এবং কিশোয়াহিলি ভাষায় লিখব। কিন্তু আমার মনে হলো, আমি অন্যান্যদের মধ্যে বিতর্ক উস্কে দিয়েছি। যেন অন্যদের কাছে ছেড়ে দিয়েছি যে ওরাই আমার সংজ্ঞা ঠিক করবেন যে, আমি কে এবং কী করছি। উদাহরণ স্বরূপ, আমি যখন আচেবের উদ্ধৃতি দিলাম যে, ইংরেজি ভাষাকে আমরা গিফ্ট হিসেবে পেয়েছি তখন আচেবে রাগ করলেন। তিনি যা বলেছেন আমি শুধু তাই বলেছি। কিন্তু তিনি সেটা ভালোভাবে নিলেন না।
আমি জানতাম, গিকুয়ু ভাষার উপন্যাস আরও বেশি বেশি গিকুয়ু ভাষাভাসি পাঠকের কাছে পৌঁছবে। কিন্তু আমি তো ইংরেজির অধ্যাপক। আমাকে দেখাতে হতো যে, আমি এই বিতর্কের অংশ এবং যে ভাষাটা আমি শিখাই, সেই ভাষায় এখনও কিছু করতে পারি। আসলে স্মৃতিকথাটি আমি লিখেছি সারাবিশ্বে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা আমার ছেলেপেলে ও নাতিপুতির জন্য।
নামওয়ালি শারপেল : Decolonizing the Mind গ্রন্থে আপনি বলেছেন, আসলে আপনি যেখান থেকে এসেছেন সেখান থেকে শুরু করা গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু Globalectics-এ মনে হলো আপনি মতটা শুধরে নিলেন।
নগুগি ওয়া থিয়োংও : ২০০২ সালে নিউইয়র্ক বিশ্ববিদ্যালয় ছেড়ে যখন আমি আরভিনে এলাম, তখন সেখানে ইন্টারন্যাশনাল সেন্টার ফর রাইটিং অ্যান্ড ট্রানস্লেশনের প্রতিষ্ঠাতা পরিচালকের দায়িত্ব নিলাম। ভাবছিলাম, নতুন কী শুরু করতে পারি। আমি কি আরভিনে কেনিয়াকে নিয়ে এসে শুরু করব ? সিদ্ধান্ত নিলাম ক্যালিফোর্নিয়াতে ইতোমধ্যে যা আছে তাই নিয়ে ভাবার। কাজেই, আমাদের প্রথম পাবলিক ইভেন্টের জন্য আমি স্থানীয় আমেরিকান এবং হাউয়াইয়ান লেখকদের কাম্পাসে নিয়ে এলাম। তারপর আলোকপাত করলাম আফ্রো-আমেরিকান লেখকদের উপর। আমেরিকার সংস্কৃতি ও কথার উপর এদের প্রভাব এবং সর্বশেষ বাকি বিশ্বের লেখকদের আমরা নিয়ে এলাম। দুই বছরের মধ্যে আমরা ফিজি, সামোয়া, আইসল্যান্ড ও ভারত থেকে লেখকদের আমন্ত্রণ জানালাম। এই দেশগুলোতে আমাদের প্রজেক্টসমূহ চলছে। আমরা একে অপরকে কীভাবে সংজ্ঞায়িত করছি, তা দেখাই আমার উদ্দেশ্য।
হ্যাঁ, আমি সবসময়ই নিজের চিন্তাভাবনাকে শুধরে নিচ্ছি। আমি এখনও বলি, আপনি যেখানে আছেন সেখান থেকেই শুরু করুন। তারপর নিজেকে বিশ্বের সঙ্গে যুক্ত করুন। সম্প্রতি ইয়েলে ঔপনিবেশিকরণের উপর একটি বক্তৃতা দিয়েছি। টিএস ইলিয়টকে নিয়ে অনেক সময় ধরে ভেবেছি। আমার মনে পড়ে, যখন প্রথম আমি শুনলাম যে, তিনি আমেরিকায় জন্মগ্রহণ করেছেন তখন খুব কষ্ট পেয়েছিলাম। এর মানে কী তাহলে, Tradition and the Individual Talent-এর লেখক ইংল্যান্ডে গেছেন সম্ভবত ঐতিহ্যের সঙ্গে নিজেকে যুক্ত করতে ? এখানে কি কোনও ঐতিহ্য নেই ? তাহলে আপনি মেসো আমেরিকান জনগোষ্ঠীর লিখনপদ্ধতিসমূহ সম্বন্ধে কী বলবেন ?
ইয়েলের স্থাপত্যকৌশল সবসময়ই আমাকে অবাক করে। এটি অক্সফোর্ড ও ক্যামব্রিজের মতো। শুনেছি, ওরা নাকি পাথরে এসিড দিয়ে একে পুরাতন করে দেখায়। আপনি ঔপনিবেশিকতার প্রভা দেখতে পারেন। এমনকি এখানেও ঔপনিবেশিক প্রক্রিয়া লোকজনকে তাদের জায়গা থেকে সরিয়ে দিয়েছে।
নামওয়ালি শারপেল : আপনি স্বীকার করেছেন যে, যখন আপনি কনরাডের সাম্প্রদায়িক রাজনীতির সমালোচনা করেছিলেন তখন তার দ্বারা প্রভাবিত হয়েছিলেন। সাহিত্যে ঔপনিবেশিক মনস্তত্ত্বের সমালোচনা করার ক্ষেত্রে ঔপনিবেশিক বুদ্ধিজীবীদের ভূমিকা কী ?
নগুগি ওয়া থিয়োংও : আপনি যা দেখেন ঔপনিবেশিক দেশের পাঠক তা দেখেন না। আপনার প্রেক্ষাপট ও দৃষ্টিভঙ্গি আলাদা। উদাহরণস্বরূপ আপনি দেখবেন যে, জেন অস্টেন তাঁর এক ধনী চরিত্রকে ওয়েস্ট ইন্ডিজের একজন নতুন বাসিন্দা হিসেবে বর্ণনা করেছেন। এরপর আপনি জানতে পারবেন যে, সে আসলে একজন দাসরক্ষক।
আমি Wuthering Heights খুব পছন্দ করি এ কপর্দকহীন, এতিম হিথক্লিফ আমাকে বেশ কৌতূহলী করে তোলে। আমরা জানি, ওকে লিভারপুলের রাস্তা থেকে কুড়িয়ে আনা হয়েছিল। আমরা এও শুনি যে, ছেলেটা অন্যান্যদের থেকে আলাদা―শরীরের রংয়ে, এমনকি চুলেও। আমি যখন এই উপন্যাস পড়ি তখন অন্যান্যদের থেকে আমার ভাবনা-চিন্তা আলাদা হয় কারণ আমি জানি, লিভারপুল ছিল তখন দাস ব্যবসায়ের কেন্দ্রস্থল। ইংল্যান্ডের কারও কাছে ব্যাপারটা যেরকম আমার কাছে সেরকম নয়। অনেকদিন এমিলি ব্রন্টি এর উপর কোনও আলোকপাত করেননি। কিন্তু আমি মনে করি না যে, হিথক্লিফ যে দাস ছিল বা কোন দাসের সন্তান ছিল তা বিশ্বাস করা কঠিন।
নামওয়ালি শারপেল : আমি শুনেছি, আপনি বলেন, ‘সাংস্কৃতিক সাহচর্য অক্সিজেনের মতো’।
নগুগি ওয়া থিয়োংও : অ্যামে সিজেয়ারের Discourse on Colonialism গ্রন্থে শব্দবন্ধটি আছে। শব্দবন্ধটি আমাকে ভাবায়, যে, আমি কীভাবে একই সঙ্গে গিকুয়ু ভাষায় যখন আমার শিকড়কে আলিঙ্গন করি তখন আবার কীভাবে শেক্সপিয়রের মূল্যায়ন করি। যখন দেখি শেক্সপিয়র কত গভীরভাবে ইংরেজি ভাষাকে বদলে দিয়েছেন তখনও এ ব্যাপার ঘটে। এর আগে আমি বুঝতাম না যে, তিনি নিজে ব্যাপারটা কতটা উপভোগ করেছেন। গিকুয়ু ভাষায় কাজ করার সময়ও আমি এমনটা বোধ করি।
নামওয়ালি শারপেল : আমি মনে করি Wizard of the Crow আপনার শ্রেষ্ঠতম কাজ এবং এই উপন্যাস লেখার সময়ও আপনি মজা পেয়েছেন। এতে আছে উৎসবের আমেজ। আবার বিদ্রুপের ঝাঁজ। প্রচুর বিষোদগার। এত উপহাস-পরিহাস কৌতুকের উৎস কোথায় ?
নগুগি ওয়া থিয়োংও : ওটা ছিল একটা অদ্ভুত সময়। ১৯৯৭ সালের দিকের কথা, তখন আমি নিউজার্সিতে থাকি। স্বাস্থ্য পরীক্ষার জন্য একজন ডাক্তারের কাছে গেলাম। আমি এমন এক সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলের মানুষ যেখানে রোগে কাতর না হলে কেউ ডাক্তারের কাছে যায় না। কিন্তু আমেরিকায় আপনি যখন অসুস্থ নন তখন আপনি ডাক্তারের কাছে যান। ডাক্তার পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেন। ওরা আমার প্রস্টেট ক্যান্সার সনাক্ত করেন। তখন আমার অ্যান্টিজেন এত বেশি ছিল যে, একজন ডাক্তার বললেন, আমার হাতে আর তিন মাস সময় আছে। সে রাতেই যখন বাড়ি ফিরছিলাম তখনই Wizard of the Crow উপন্যাসের প্রথম লাইনটা আমার মাথায় আসে। ভাবলাম, এটিই হবে আমার জীবনের শেষ উপন্যাস। পুরো উপন্যাস তিন মাসে শেষ করার পরিকল্পনা করলাম। কিন্তু এটিকে টেনে হিচড়ে এগিয়ে নিতে থাকলাম। এর বেশিকিছু আর করতে পারলাম না। অনবরত লিখছিলাম। আগের অন্য যেকোন উপন্যাসের চাইতে এটিতেই বেশি মজে গেলাম। সবসময় চিন্তা করছিলাম। আমাকে অবশ্যই শেষ করতে হবে। অবশেষে এটি শেষ করতে আমার ছয় বছর লাগলো। তারপর এর ইংরেজি অনুবাদে লাগলো আরও কয়েক বছর।
নামওয়ালি শারপেল : আমি খুবই দুঃখিত। ক্যান্সার কি সেরে গেছে ? আপনি কি এখন ঠিক আছেন ?
নগুগি ওয়া থিয়োংও : ওরা আমাকে যেসব ট্যাবলেট দিয়েছিলেন ওগুলো তো খুব ভালো ছিল। এমনকি আজও যেসকল ডাক্তার আমার রেকর্ড দেখেন তারা তো রীতিমতো অবাক হয়ে যান।
নামওয়ালি শারপেল : আমি কল্পনাও করিনি যে, Wizard of the Crow আপনার এমন বিষণ্ন ও ভয়ানক একটা জায়গা থেকে উৎসারিত হয়েছে। বইটি খুবই মজার এবং খুব যত্ন করে লেখা।
নগুগি ওয়া থিয়োংও : এটা লিখতে মজা পেয়েছিলাম। হেসেও ছিলাম। আমার আগের গিকুয়ু ভাষায় লেখা উপন্যাসগুলো আমাকে এই উপন্যাসের জন্য তৈরি করেছিল। এর ভাষায় আছে প্রচুর রস। আপনার কি তাজিরিকা নামের চরিত্রটির কথা মনে আছে যার ‘যদি’ নামে একটি রোগ হয়েছে ?
নামওয়ালি শারপেল : ‘শ্বেত ব্যথা’ হ্যাঁ!
নগুগি ওয়া থিয়োংও : আপনি জানেন, ওর অসুস্থতা হলো, ওর গলায় একটা শব্দ আটকে গেছে। গিকুয়ু ভাষায় শব্দটি হলো কড়ৎঁড় যার অর্থ হলো ‘যদি’ অর্থাৎ ‘যদি আমার গায়ের চামড়া সাদা হতো।’
নামওয়ালি শারপেল : দুই ভাষাতেই এটি বেশ ভালো যায়। Koruo শব্দটি খকখক কাশির মতো শোনায়। আর যদি! যদি! যদি! হাঁপানোর শব্দের মতো বা হাঁপানিতে আক্রান্ত হলে যে অবস্থা হয় আর কি। আমার মনে হয়, আপনি যখন গিকুয়ু ভাষায় লেখেন তখন শব্দগুলো স্বাভাবিকভাবেই আপনার লেখায় খেলা করে। যখন আপনি অনুবাদ করেন তখন কি আপনি শব্দের খেলা যথাযথভাবে ধরতে চেষ্টা করেন ?
নগুগি ওয়া থিয়োংও : নাহ! আপনাকে এর সমতুল্য একটি শব্দ বা কিছু একটা নিতে হবে যা একই ধারণা বহন করে। আপনি যদি আক্ষরিক অনুবাদ করেন তবে কোনও অর্থই খুঁজে পাবেন না। উদাহরণটি ছিল কঠিন। একটা দৃশ্যে পুলিশ যখন তাজিরিকাকে জিজ্ঞাসাবাদ শুরু করে তখন ওরা ওর Koruo শব্দটি শুনে দৌঁড়ে পালিয়ে যেতে শুরু করেন, কারণ Koruo শব্দের আর একটি অর্থ হলো ‘ওরা তোমাদের খোঁজে আসছে।’ অবশ্য ওরা পালিয়ে যায়নি, কারণ কেউ একজন বলল, Koruo শব্দের অর্থ ‘যদি’। এই উপন্যাসের ইংরেজি অনুবাদে কৌতুকটা জমানোর জন্য আমি তাজিরিকার মুখে নুতন কয়েকটা ইংরেজি বাক্য দিয়ে দিয়েছি।
নামওয়ালি শারপেল : মাটিগারি তো আপনি অনুবাদ করেননি। এটি অনুবাদ করেছেন ওয়াংগুই ওয়াগোরো। আপনি কি মনে করেন, এর অনুবাদ আপনি করলে তা আরও মূলানুগ হতো ?
নগুগি ওয়া থিয়োংও : জানি না। আমার সন্দেহ হয়, যখন আপনি আপনার নিজের লেখার অনুবাদ করেন তখন আপনি বরং আলসেমি প্রদর্শন করেন।
নামওয়ালি শারপেল : আপনি কি নিজেকে পুরোপুরিভাবে দ্বিভাষিক মনে করেন ?
নগুগি ওয়া থিয়োংও : নাহ। গিকুয়ু ভাষাকেই আমি বেশি অনুভব করি। ইংরেজি শুধু এ রকম একটি ভাষা যাতে আমি এখন অভ্যস্ত হয়ে উঠেছি। এটি আমার মা বা বাবার ভাষা নয়। আমার ছেলেমেয়েরা যারা এখানে বেড়ে উঠেছে ওরা যেভাবে ইংরেজি ভাষা ব্যবহার করে আমি সেভাবে ইংরেজি ব্যবহার করি না।
নামওয়ালি শারপেল : গুকুয়ু ভাষার বই নিয়ে সম্পাদকের সঙ্গে কীভাবে কাজ করেন ?
নগুগি ওয়া থিয়োংও : হ্যাঁ, খুব অল্প কয়েকজন গিকুয়ু ভাষা বিশেষজ্ঞ আছেন। তাই আমি নিজেই লেখক, নিজেই অনুবাদক। নিজেই সম্পাদক। ব্যতিক্রম ঘটেছিল যখন আমি Wizard of the Crow লিখছিলাম। এরোল ম্যাকডোনাল্ডকে এর ইংরেজি অনুবাদ দিয়েছিলাম। এ যাবৎ যাঁদের সঙ্গে কাজ করেছি তাদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ সম্পাদক তিনি। তবে বিস্ময়করভাবে তিনি স্লো। কিন্তু কষ্টসহিষ্ণু। তিনি আমাকে দেখালেন, উপন্যাসটা বড় হয়ে গেছে। কিছু কিছু পাতার পুরোটা জুড়ে তিনি লাল দাগ কাটতেন। ঐসব কাটা লাইন আমি মূল গিকুয়ু ভাষায় লেখা উপন্যাসে ব্যবহার করতাম।
নামওয়ালি শারপেল : আপনি কি আপনার উপন্যাস নিয়ে গবেষণা করেন ?
নগুগি ওয়া থিয়োংও : লেখার প্রক্রিয়ায় ঢুকে গেলে গবেষণা করতে পারি। তবে আগেভাগে না। আমি গল্পের ব্যাপারে বেশি আগ্রহী। একবার বয়ান শুরু হয়ে গেলে যেখানে যেখানে আমার প্রশ্ন করার থাকে, এটি আমাকে সেখানে সেখানে নিয়ে যায়। আমি মানুষকে প্রশ্ন করতে পছন্দ করি। Wizard of the Crow তে একটি চরিত্র আছে যে পড়াশুনা করতে ভারতে যায়। আমার ভারতীয় পণ্ডিত বন্ধুগণ আমাকে মহাভারত পড়ার পরামর্শ দিয়েছিলেন। এটি বেশ সমৃদ্ধ ও অবিশ্বাস্য মহাকাব্য। প্রথমে দেখলাম বইটিতে যে সংস্কৃতির কথা বর্ণিত হয়েছে তা রক্ষণশীল। তারপর এক গরিব ছেলের গল্প পেলাম। ওর নাম একলব্য। থাকে বনে। গল্পের অগ্রযাত্রার সঙ্গে সঙ্গে সে এক গুরুর সাক্ষাৎ পায়। তিনি তির-ধনুক বিদ্যায় পারদর্শী। একলব্য গুরুকে বলে তাকে ধনুবিদ্যা শেখাতে। কিন্তু গুরু অস্বীকার করে। ছেলেটি বাড়ি ফিরে আসে। তারপর তার গুরুর একটি মূর্তি গড়ে। এই মূর্তির শিষ্যত্বে একলব্য অনেক বড় বড় রাজার চাইতেও বড় তিরন্দাজ হয়ে ওঠে। এরপর সে তার গুরুকে ধন্যবাদ জানাতে যায়। কিন্তু গুরু তার ওপর সন্তুষ্ট নন। তিনি বলেন, ‘গুরুকে কিছু দান করে তুমি তোমার কৃতজ্ঞতা প্রদর্শন কর।’ তখন তরুণ বলে, ‘আমি আপনাকে যে কোন কিছু দিতে প্রস্তুত। আপনি আমার শিক্ষক। গুরু তখন একলব্যের বৃদ্ধাঙ্গুল দাবি করে বসেন যাতে সে আর কখনও তির চালাতে না পারে। এই যে অকেজো বানিয়ে ফেলাÑএটি আমাকে মুগ্ধ করেছিল। আমি এটিকে খেটে যাওয়া শ্রেণির মানুষ বা কৃষকদের খোঁড়া বানিয়ে রাখার কৌশল বলে ব্যাখ্যা করি। এর মধ্যে আমি তৃতীয় বিশ্বের রাজনীতি দেখি। এটি পশ্চিম আফ্রিকা ও এশিয়ার মানুষকে অকেজো বানায়।
The Perfect Nine লেখার জন্য আমি লোককাহিনি বিশেষজ্ঞ ওয়ানজিকু কাবিরার সঙ্গে আলোচনা করেছিলাম। গিকুয়ু ভাষার গল্পের রাক্ষস―খোক্ষসদের ব্যাপারে তিনি অনেক কিছু জানেন।
নামওয়ালি শারপেল : বইটির ধারণা কি সহজে এসেছিল ?
নগুগি ওয়া থিয়োংও : এটা রীতিমতো আবিষ্কারের মতো, প্যাসিফিক কোস্ট হাইওয়ের কাছে যখন আরভিনে ছিলাম তখন দোলনায় বসে বাইরের দিকে তাকিয়ে থাকতাম। সমূদ্রের বিশালত্ব আমাকে আমার শৈশবের স্মৃতি মনে করিয়ে দিত। গিকুয়ু ভাষার উপকথা নতুন করে আমাকে নাড়া দেয়। এসব নারীর ভাই নেই। এদের বাবারা এদের নিয়ে সবখানে যেতে পারে না। আমি এই মহিলাদের কথা পুনঃবিবেচনা করতে লাগলাম। কীভাবে এরা নিজেরাই নিজেদের পোশাক-আশাক তৈরি করত; কীভাবে অস্ত্র তৈরি করত, কীভাবে এরা শিকার করত এবং বন্য প্রাণীর হাত থেকে নিজেদের রক্ষা করত। এদের মন, শরীর ও আত্মার মধ্যে একটি সৃজনশীল সমন্বয় ছিল বলে আমার কাছে মনে হয়। ওরা সবকিছু করত। ওরাই ছিল প্রকৃত নারীবাদী। আমি বইটা দ্রুত লিখে ফেলি। সম্ভবত তিন মাসে।
একটা উপন্যাস লিখে শেষ করার অনূভূতি বা সন্তুষ্টির ব্যাপার আসলেই অসাধারণ। এর মতো অনুভূতি আর আছে বলে আমার মনে নেই। আমার ছেলেমেয়েদেরও আমি এ কথাই বলি যে, যখন তুমি কোন উপন্যাসের প্রথম পাণ্ডুলিপিটা লিখে ফেল তখন এর মধ্যে তোমার আত্মাটাই ঢুকে পড়ে। আমি উপন্যাসগুলো লিখেছি সেগুলো আমাদের আত্মার ধারক। পাঠককে এর সঙ্গেই যুক্ত হতে হয়।
নামওয়ালি শারপেল : আপনি এখানে তিন দশক ধরে বসবাস করছেন। আপনি কি আমেরকার নাগরিক ?
নগুগি ওয়া থিয়োংও : নাহ। আমি আমার কেনিয়ার নাগরিকত্ব হারাতে চাই না। আমি আমেরিকাকে পছন্দ করি। পৃথিবীর প্রায় প্রত্যেক জনগোষ্ঠী ও প্রত্যেক ধর্ম কোনওনা কোনওভাবে এখানে নিজেকে উপস্থাপন করতে পারে। আমি এর ঔদার্যের প্রশংসা করি। এর নিয়ন্ত্রণ ও ভারসাম্য রক্ষার কৌশলকেও আমি পছন্দ করি। তবে আমি আমেরিকার সাম্রাজ্যবাদ পছন্দ করি না। পৃথিবীতে আমেরিকা যে ভূমিকা পালন করছে, তাও আমি পছন্দ করি না। আফ্রো-আমেরিকানরা এখানে যে আচরণের শিকার হয় অর্থাৎ কৃষ্ণাঙ্গরা এখানে যে পরিস্থিতির মোকাবেলা করে তা খুবই খুবই অস্বস্তিকর।
নামওয়ালি শারপেল : পড়েছিলাম, সানফ্রানসিসকোর একটি হোটেলে যেখানে কৃষ্ণাঙ্গদের বসা নিষেধ সেখানে গিয়ে আপনি হেনস্থার শিকার হয়েছিলেন।
নগুগি ওয়া থিয়োংও : Wizard of the Crow উপন্যাস নিয়ে একটি ট্যুরে গিয়েছিলাম। আমার প্রকাশক আমাকে খুব সুন্দর একটা হোটেলে আমার থাকার ব্যবস্থা করে দিয়েছিলেন। সকালের নাস্তার আগে আমি ডাইনিং এরিয়াতে বসে খবরের কাগজ পড়ছিলাম। একজন সুন্দর পোশাক পরা, খুব ভদ্রলোক আমার কাছে এসে বললেন, জায়গাটা শুধু হোটেলের অতিথিদের জন্য নির্ধারিত। আমি তাকে জিজ্ঞেস করলাম, ‘আপনি কেন আমাকে এই হোটেলের গেস্ট মনে করছেন না ?’ তখন উত্তরে তিনি বললেন, ‘দেখুন, আপনাকে এখন এই স্থান ত্যাগ করতে হবে।’ এভাবে চলতে থাকল। তিনি কোনও গালমন্দ করেননি। কিন্তু তার যে আত্মবিশ্বাস যে, আমি ওখানে থাকতে পারি না, তা আমাকে এটা সেটা বলার চাইতে বেশি ভয় পাইয়ে দিল। শেষে এই উপসংহারে পৌঁছলাম, যদি সামান্য আলাদা কোনও পরিস্থিতিতে এই ব্যক্তির হাতে একটি বন্দুক থাকত তবে ঐ আত্মবিশ্বাসের জোরেই তিনি আমার বুকে গুলি চালিয়ে দিতেন।
নামওয়ালি শারপেল : আপনি প্রায়ই সাম্প্রদায়িকতার পিতৃতান্ত্রিক দিকটা সম্বন্ধে লেখেন অর্থাৎ আপনার উপন্যাসে শ্বেতাঙ্গ সাম্প্রদায়িক আত্মবিশ্বাসের কথা লেখেন। আপনি কীভাবে এই মনস্তত্ত্ব ধরতে পারেন ?
নগুগি ওয়া থিয়োংও : আমার মনে হয়, এর সঙ্গে আমার পচিয়ের সূত্র অন্বেষণ করলে যেতে হবে আমার সেই অ্যালাইয়েন্স স্কুলের প্রধান শিক্ষক ই. ক্যারি ফ্রান্সিসের কাছে। তিনি পুরোপুরিভাবে বৈপরীত্যে ভরা একটি চরিত্র। ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের ঔরসে জন্ম তাঁর। আদর্শ বাস্তবায়ন করতে না পারার জন্য তিনি প্রায়ই এই সাম্রাজ্যবাদের সমালোচনা করতেন। মাউ মাউ বিপ্লব তাঁর কাছে ছিল পাপীতাপীদের শয়তানি। কিন্তু মানুষের আবার দুর্দশার কথাও বুঝতেন। আপনি দেখবেন, তিনি তার জীবন নিয়োজিত করেছিলেন তার স্কুলের জন্য, আফ্রিকার মানুষেদের লেখাপড়া শেখানোর জন্য। আবার একই সঙ্গে তাঁর কাছে একজন আফ্রিকার ছাত্র কখনও ইংরেজ ছাত্রের মতো ভালো নয়।
নামওয়ালি শারপেল : Birth of a Dream Weaver-এ ম্যাকারেরে বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি ঘটনা উল্লেখ করেছেন। জেরাল্ড মুর উল্লেখ করেছিলেন যে, The River Between উপন্যাসের প্রথম দিকের পাণ্ডুলিপিতে একজন কালো নারী চরিত্রকে আপনি সুন্দর নীল চোখ দিয়ে অঙ্কন করেছেন। আপনি এতটা ব্যথিত হয়েছিলেন যে, আপনি আর তার অবশিষ্ট আলোচনা শোনেননি। মনকে ঔপনিবেশিকতামুক্ত করার আপনার নিজস্ব প্রক্রিয়া কী ?
নগুগি : আমার মনে হয়, যিনি ঔপনিবেশিক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে গেছেন তিনি তাঁর মনকে ঔপনিবেশিকতার প্রভাবমুক্ত বলে দাবি করতে পারেন। যে কাজ আমরা করতে পারি তা হলো―আমরা ঐসব প্রবণতার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে পারি। মনের ক্ষতচিহ্ন মুছতে অনেক সময় লাগে।
লেখক : অনুবাদক



