আর্কাইভগল্প

বাংলাদেশ-ভারত-আফ্রিকার গল্প : নানা রঙে একই পৃথিবীর গল্প : শফিক আশরাফ

ক্রোড়পত্র : সাহিত্য-বিশ্লেষণ

বাংলাদেশ, ভারত ও আফ্রিকার শ্রেষ্ঠ গল্পকারগণের গল্প সংকলনের যে দুঃসাহস শব্দঘর দেখিয়েছে সেটাকে শুধু সাধুবাদ জানালে বিশেষ কিছুই বলা হয় না! আমরা ভারত, বাংলাদেশের গল্প সম্পর্কে কমবেশি সবাই ধারণা রাখি কিন্তু তার সঙ্গে মিলিয়ে আফ্রিকার গল্পকারদের মেলবন্ধন ঘটানো দুঃসাহস বলছি। ভারতবর্ষের মতো আফ্রিকাও দীর্ঘদিন কলোনিয়াল শাসনের দুঃস্বপ্নের ভেতর দিয়ে গিয়েছে, কাজেই এসব দেশের মানুষের সমাজ ও মনোজগৎ, পরিণতি ও বেড়ে ওঠা ইত্যাদি অভিজ্ঞতা প্রায় কাছাকাছি। দুটো দেশ অনেক দূরে অবস্থান করলেও, মানুষগুলোর বাহ্যিক গড়ন অনেক আলাদা হলেও, পরিবার ও সমাজ কাঠামো ভিন্ন হলেও মনোজগতের গঠন প্রায় একইরকম তা এসব সংকলনের গল্পগুলো প্রমাণ করেছে। এ ধরনের গল্প সংকলন না হলে তুলনামুলক সাহিত্যের স্বরূপটা হয়তো আমাদের চোখ এড়িয়ে যেত।

আফ্রিকার গল্পকার আবদু ওবেইর যখন, ‘তুমি কি কখনও আলেকজান্দ্রিয়া স্টেশন দেখেছ ?’ নামে গল্প লেখেন, সেখানে তিনি তুলে ধরেন খুব ছোট্ট একটা গল্প কিন্তু তার ব্যাপ্তি, অতীত, তার স্মৃতি ইত্যাদির ব্যাপ্তি কি বিশাল! মানুষের জীবনে বাস্তবতা ও কল্পনার মিশেলে যে জগৎ তৈরি হয় একটা সময় সেই দুটো জগৎ একে অপরের ভেতর এতবেশি একাকার হয়ে যায় যে, তখন দুটোকে সত্যিকার অর্থে আলাদা করা কঠিন। কিন্ত কি আশ্চর্য! আফ্রিকায় বসে আবদু ওবেইর যে গল্প লেখেন ভারতে বসে সেই একই গল্প লেখেন অলোক গোস্বামী, ‘চুপকথা’ নামে। সেই নাড়ি ছেঁড়ার গল্প, সেই স্মৃতিকারতরতার গল্প, সেই অতীত ও বর্তমান মিলেমিশে একাকার হওয়ার গল্প। সত্যিই আশ্চর্য! অথচ মনে করার কোন কারণ নেই একজন আরেকজনের গল্প দেখে প্রভাবিত হয়ে এই গল্প লিখেছেন। গল্পের পটভূমি, গল্পবয়ন, কাহিনি সম্পূর্ণ আলাদা। কিন্তু তাদের হাহাকার, বাস্ত হারানো, নাড়ি ছেঁড়ার যন্ত্রণা সবই আবার এক। প্রতিনিয়ত নানা কারণে মানুষ বাস্তুত্যাগ করছে। কিন্ত মননে, স্বপনে গেঁথে থাকে তার বাস্তুম্মৃতি। মানুষ কখনো ফিরে আসে তার স্মৃতির কাছে, এসে খোঁজে তার হারানো আনন্দ, বেদনা, পাওয়া না পাওয়ার হাহাকার, ফিরে এসে সন্ধান করে তার অতীতকে―সে কখনও খানিকটা পায় কিংবা কখনও ব্যর্থতার বেদনায় নীল হয়ে ফিরে আসে! ‘চুপকথা’ গল্পে বাস্তুত্যাগী নীলেশ স্ত্রী সন্তানের বাধা সত্ত্বেও মাদারিপুরে ফিরে আসে। ফিরে এসে অতীত খোঁজেজ। এসে দেখে সেখানকার বেশির ভাগই বড় অচেনা, মানুষজন ঘরবাড়ি। পরিচিত মুখগুলোও কোন বিবর্তনের চক্করে হারিয়ে গেছে। কিন্তু ঘটনা সবটাই হারিয়ে যায় না, বৌঠানের কোকিল ডেকে আনার ম্যাজিক, বৌঠানের সন্তান ভবশঙ্করের সঙ্গে নীলেশের চেহারার অসম্ভব মিল, বিদায়বেলা রেলস্টশনে কোকিলের কুহুতান―এ এক অন্যন্যসাধারণ গল্প হয়ে ফুটে ওঠে যা, আফ্রিকার গল্পকার আবদু ওবেইরের আলেকজান্দ্রিয়া রেলস্টেশনে বসে তার প্রেম, বাস্তুত্যাগ এমনকি অতীত-বর্তমান মিলেমিশে একাকার হয়ে যাওয়ার সঙ্গে এক অদ্ভুত যোগসূত্র।

শুধু তো বাস্তুত্যাগ বা নস্টালজিক জীবনই তাদের গল্পে ফিরে আসেনি, ফিরে এসেছে এত এত বহুবিচিত্র বিষয় যা আঞ্চলিক ঘটনাকে অতিক্রম করে হয়ে ওঠেছে আন্তর্জাতিক বা তাবৎ পৃথিবীর মানুষের গল্প। অ্যালেন মাবানকো যখন ‘শ্যে জেনেট’ গল্প লিখেন তখন সেটা আফ্রিকার আঞ্চলিক ঘটনা ও জীবনকে প্রতিফলিত করেছে কিন্তু অ্যালেন মাবান বৈঠকি ঢংয়ে একজন কথকের মুখ দিয়ে আফ্রিকার নির্বাচন, শাসক মনোবৃত্তি, বৈদেশিক আগ্রাসন, যুদ্ধের ভেতর তাদের টিকে থাকা ও ফিরে আসা ইত্যাদি বহুবিধ যেন একটা গল্প এবং সেটাই আফ্রিকা মহাদেশের প্রতিচ্ছবি হয়ে তাবৎ পৃথিবীকে এমনভাবে বেষ্টন করে ধরে যেন মনে হয় আমরাও এই ঘটনার একেকটা চরিত্র। ফলে সেটা পৃথিবীর সকল বঞ্চিত মানুষের গল্প হয়ে ওঠে। তেমনি আবার বাংলাদেশে বসে শিমুল মাহমুদ যখন ‘বিশ^াসের ভাইরাস’ লেখেন তখন গল্পের আক্কাস আলি যে ধর্ম ভাইরাস দ্বারা আক্রান্ত হয়ে নিজের মস্তিস্কের উপর নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে নিজের সন্তান হত্যায় উজ্জীবিত হয় এই মনোবিকলন আফ্রিকার গ্রামের যুদ্ধ থেকে বেঁচে ফেরা মধ্যবয়স্ক মানুষটির যৌন-সঙ্গমের তীব্র ইচ্ছার মতোই ক্রিয়াশীল। পৃথিবীতে প্যারাসাইটস ভাইরাস আক্রান্ত লক্ষ লক্ষ মানুষের আচরণ শিমুল মাহমুদ এক আক্কাসের ভেতর তুলে ধরে যে গল্প আমাদের শোনান সেটা আসলে হয়ে ওঠে পৃথিবীর অসুখের গল্প।

ভারতের জয়ন্ত দে ‘আমাদের দাদা’ গল্পে ভারতবর্ষের রাজনৈতিক ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্ব নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুর গল্প বলতে চান। নেতাকে নিয়ে অনেক গল্প, গাথা, চলচ্চিত্র নির্মিত হয়। দাদার গল্প আর নেতাজির গল্প মিলেমিশে যে নতুন বিনির্মাণ হয় সেটা নিঃসন্দেহে স্বতন্ত্র দৃষ্টিভঙ্গি। দেখানো হয়েছে নেতাজি বা দাদারা শুধুই মানুষের হিতসাধনের কথা ভাবেন তখন সেটা ব্যক্তিগত ক্ষুদ্র স্বার্থসিদ্ধির ঊর্ধ্বে উঠে সার্বজনীনতা পায়। নেতা অনেকটা প্রাকৃতিক নির্বাচন, মানুষের চরম ক্রাইসিসের সময় নেতৃত্ব গুণ নিয়ে কেউ উঠে আসে। নেতাজিরা সেভাবেই এসেছিলেন। প্রান্তিক পর্যায়ে সেভাবেই নেতৃত্ব গড়ে ওঠে। মোহিত কামাল ‘কার্তিকে বসন্তের ছোঁয়া’ গল্পে নিতান্ত প্রান্ত-গ্রামীণ পরিবেশে একজন নারী কীভাবে অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদী প্রতিরোধী হয়ে নেতৃত্বগুণে বিকশিত হয় সেই গল্পই আমাদের শুনিয়েছেন। জয়ন্ত দে-র দাদা, মোহিতের চন্দা আসলে একই মানুষ। পার্থক্য শুধু একজন নারী আর অপরজন পুরুষ। আবার এরকম আরেকটি গল্প একটু ভিন্ন আঙ্গিকে শোনান ভারতীয় লেখক অহনা বিশ^াস তার ‘এক গাঁয়ের মেয়ের রূপকথা’ গল্পে। এই একবিংশ শতকে নারী শুধুই একজন নারী, পুরুষ তাকে নারী ব্যতীত মানুষ হতে দেয় না, এমনকি তার প্রেম-কামকেও নিজের অধিভুক্ত করে রাখে পুরুষ! কিন্তু নারী তার সেই বৃত্তভাঙায় সদা ক্রিয়াশীল, সে পতনের মুখেও ঘুরে দাঁড়াবার সাহস রাখে এবং শেষ পর্যন্ত দাঁড়ায়। অহনা বিশ^াস সেই দাঁড়ানোর গল্প বলেন।

এই সময়ের গল্পকারগণ সাম্প্রতিক সময়কে ধারণের যে চেষ্টা করেছেন সেটাও গল্পের উল্লেখযোগ্য একটা দিক। মঞ্জু সরকারের ‘উৎসমূলে আগুন’ গল্পে বর্তমান ভার্চুয়াল জগৎকেন্দ্রিক যে গল্প বলেছেন―তা গল্পের বাইরেও একজন অবসরপ্রাপ্ত আমলার ব্যক্তিগত জীবন, প্রেম, কামসহ এ বিষয়ে ফেসবুকে অভিযোগ নিয়ে গল্পটা অন্যরকম হয়ে উঠেছে। ভার্চুয়াল জীবনকেন্দ্রিক এই জীবন আমাদের যেমন তাবৎ পৃথিবীর সঙ্গে অহর্নিশি যোগাযোগের মাধ্যম হিসেবে আপডেট রাখছে তেমনি মানুষের প্রাইভেসিকেও খড়গতলে বিছিয়ে রাখছে!

বিভিন্ন দেশে বাস করলেও মানুষ শেষ পর্যন্ত তার সমাজ, তার ধর্ম, তার বিশ^াস ও সংস্কৃতি এবং ঔপনিবেশিক সামাজিক ও অর্থনৈতিক আগ্রাসনে প্রায় একইরকম অভিজ্ঞতা ও যাতনার ভেতর দিয়ে যায়। যেহেতু তাৎক্ষণিক মানুষের সামাজিক ইতিহাসের লিখিত রূপ পাওয়া যায় না, সেহেতু কথাসাহিত্য থেকে সেই উপাদান সংগ্রহ হতে পারে। বিভিন্ন দেশের গল্পকারদের গল্পের সংকলন গুচ্ছভুক্ত করে উপস্থাপন করার কষ্টটা বৈশি^ক ও সামাজিক দায়বদ্ধতারই প্রকাশ। এই দায়বদ্ধতার কষ্টটা নিজ ঘাড়ে তুলে নিয়ে একটা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকায় রাখল শব্দঘর। এছাড়াও ভারত ও  আফ্রিকার প্রেক্ষাপটে আমাদের গল্প-সাহিত্যের অবস্থান কি, গল্পের বিষয় ও ভাষায় কতটা অগ্রসর সেটাও পরিষ্কার বোঝা গেল।

শব্দঘর যে বৈচিত্র্য ধারণ করে তিনটি দেশের গল্প সংকলন বের করেছে সেটা নিশ্চয়ই ভবিষ্যতে তুলনামূলক সাহিত্য নিয়ে কাজ করার বিষয়টা উৎসাহিত করবে। গল্প যেহেতু সমাজমনস্তত্বকে ধারণ করে সেহেতু একটা দেশের ব্যক্তিগত ও সামাজিক সমস্যার স্বরূপ ও প্রকৃতি সে দেশের লেখকদের লেখায় উঠে আসে, সমসাময়িককালে অন্যদেশের লেখকগণ কীভাবে সেই সময়কে প্রতিফলিত করে সেটা জানাও জরুরি। এই জরুরি কাজটি করে শব্দঘর আমাদের জন্য মাইল ফলক হয়ে রইল―একথা বলাই যায়।

 লেখক : বাংলা সাহিত্যের সহযোগী অধ্যাপক,

রংপুর

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button