আর্কাইভদেশে দেশে বইমেলাবইকথা

বর্ণাঢ্য আয়োজনে ষোলোতম : টরেন্টো বাংলা বইমেলা উদ্যাপিত : ফারজানা নাজ শম্পা

দেশে দেশে বইমেলা ২০২২

‘রুটি মদ ফুরিয়ে যাবে, প্রিয়ার কালো চোখ ঘোলাটে হয়ে আসবে, কিন্তু বইখানা অনন্ত-যৌবনা যদি তেমন বই হয়।’ কথাসাহিত্যিক সৈয়দ মুজতবা আলী ভালো বইয়ের গুরুত্বের দিকটা বিশ্লেষণের প্রেক্ষিতে ইরানের দার্শনিক কবি ওমর খৈয়ামের অমর একটি রুবাইয়াকে এভাবে বিশ্লেষণ করেছেন। একটি ভালো বই প্রজন্ম হতে প্রজন্মান্তরে মানুষের জীবনবোধের বিকাশ ঘটিয়ে প্রেরণার অমলিন উৎস হয়ে বেঁচে থাকে আর মানবতার সুকুমার বোধগুলো বিকশিত করে।

বাংলা বই ও বাংলা ভাষা বৈশ্বিক প্রসারের নিরিখে আমাদের হাজার বছরের ঐতিহ্যে লালিত কৃষ্টি সম্প্রসারণের ব্রত নিয়ে প্রবাসে অনেকেই নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছেন। একটি সমৃদ্ধ বই আমাদের মননের বিকাশে ঘটায়, কল্পনাশক্তিকে প্রসারিত করে আত্মশুদ্ধির সহায়ক―তাই এর আবেদন প্রজন্ম হতে প্রজন্মান্তরে অমøান থাকে।

কানাডায় বাংলা ভাষা ও বাংলা বই এবং সাহিত্যের মূলস্রোতকে অম্লান রাখার দৃপ্ত অঙ্গীকার নিয়ে গত ৬ ও ৭ আগস্ট দুই দিনব্যাপী বর্ণাঢ্য রুচিশীল আয়োজনের মাধ্যমে উৎসবমুখর পরিবেশে উদযাপিত হলো ‘ষোলতম টরেন্টো বাংলা বইমেলা’। দীর্ঘ পনেরো বছররের দীর্ঘ পথ পরিক্রমায় টরেন্টো বইমেলা বাঙালির অন্যতম সাংস্কৃতিক উৎসবে পরিণত হয়েছে।

কানাডায় বাংলা বইয়ের প্রথম দোকান ও প্রতিষ্ঠান ‘অন্যমেলার’ এবং সেই ধারাবাহিকতায় বাংলা বইয়ের জনপ্রিয় এই প্রতিষ্ঠান ও বাংলা বইমেলার মূল রূপকার দেশাত্মবোধের আলোকে লালিত শেখ সাদী আহমেদ ভাইয়ের ঐকান্তিক ও সফল নেতৃত্বে এবং সংশ্লিষ্ট উদ্যমী কয়েকজনের নিরলস প্রচেষ্টায় বাংলা বইমেলা স্থাপন করেছে বাঙালির ঐতিহ্যের সুদৃঢ় ভিত্তি। দুই দিনের এই আনন্দমুখর সাংস্কৃতিক উৎসবে এক হাজারের বেশি অতিথির সমাগম ঘটে। দীর্ঘপথ পরিক্রমায় টরেন্টো বাংলা বইমেলা একটি অন্যতম সাংস্কৃতিক উৎসবে পরিণত হয়েছে। দুই দিনব্যাপী এই বর্ণিল তথ্যবহুল মেলা উদ্যাপনে বাংলা লেখক এবং বই পরিচিতির পাশাপাশি বর্ণিল শোভাযাত্রা, সাহিত্য, সংস্কৃতি বিষয়ক বিশেষ আলোচনা, কবিতা উৎসব, নৃত্যসহ পরিবেশিত হয় বহুমাত্রিক বাংলা কৃষ্টি নির্ভর সাংস্কৃতিক আয়োজন।

এই উৎসবে শুধু টরেন্টো শহর হতেই নয় কানাডার বিভিন্ন শহর হতে যোগদান করেন বরেণ্য লেখক, চিন্তাবিদ, সাহিত্যিক কয়েক হাজার অধিবাসী। বইমেলার অনুষ্ঠানের প্রথম দিনে বাংলা সাহিত্যের বরেণ্য কবি আসাদ চৌধুরীর নেতৃতে অন্যান্য কথাসাহিত্যিক, লেখকদের সমন্বয়ে একটি বিশেষ উদ্বোধনী শোভাযাত্রার মাধ্যমে টরেন্টোর ডেন্টোনিয়া পার্কে বাংলাদেশের শহীদ মিনারের আদলে স্থাপিত মাদার ল্যাংগুয়েজ মনুমেন্ট-এ শ্রদ্ধাঞ্জলি জ্ঞাপন করেন এবং বইমেলার আবহ সংগীত পরিবেশন করেন।

বইমেলার প্রথম দিন কানাডার মূলধারার জনপ্রতিনিধিদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত কানাডিয়ান এমপিপি ডলি বেগম।

ছয়ই আগস্টের রৌদ্রকরোজ্জ্বল উজ্জ্বল সকাল এগারোটার সময় সমবেত শোভাযাত্রার মাধ্যমে টরেন্টোর ডেন্টোনিয়া পার্কে অমর একুশের শহীদ মিনারের আদলে নির্মিত মাতৃভাষা মনুমেন্টের দিকে যাত্রা শুরু হয়।

এরপর তাঁরা বইমেলার আবহ সংগীত গাইতে গাইতে মূল অনুষ্ঠানস্থলে যাত্রা করেনÑদুপুর বারোটায় ৯ ডজ রোডে রয়েল কানাডিয়ান লিজিয়ন হলের মেইন ফ্লোরে মূল অনুষ্ঠান স্থলে ফিতা কেটে বইমেলার আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন  কবি আসাদ চৌধুরী, তার সাথে ছিলেন বইমেলার রূপকার শেখ সাদী আহমদ এবং আমন্ত্রিত ও আগত লেখক চিন্তাবিদসহ অগণিত অতিথিবৃন্দ। এরপর শেখ সাদী আহমদের রচিত ও বিজয় মামুনের সুরারোপিত বইমেলার আবহ সংগীত পরিবেশিত হয়। সমাগত অতিথিরা সবাই কণ্ঠ মেলান, দুই দিনের টরেন্টো বাংলা বইমেলার আয়োজন ছিল সার্বিকভাবে রুচিশীল।

এই আয়োজন সেজেছিল বাংলাদেশ ও বাঙালি সংস্কৃতির ঘরানার এক পূর্ণাঙ্গ আবহে।

সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান পর্বে দুপুর বারোটা তিরিশ মিনিটে সুকন্যা নৃত্যাঙ্গনের আয়োজনে নৃত্য পরিবেশিত হয়। তারপর সুললিত কণ্ঠে সংগীত পরিবেশনা করেন টরেন্টোর জনপ্রিয় শিল্পী ফারহানা সান্তাÑবেলা একটায় মীর সাব্বির পরিচালিত আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন ‘রাত জাগা ফুল’ এই চলচ্চিত্র উপস্থাপিত হয়, বিকেল তিনটায় অনুষ্ঠিত হয় জনপ্রিয় সাংষ্কৃতিক সংগঠন ‘উদীচী’র বিশেষ পরিবেশনা, বিকেল সাড়ে তিনটার পরিবেশনায় ছিল কবি তাজুল ইমাম ও কবি জিন্নাহ চৌধুরীর স্মৃতিচারণ ও অসাধারণ কবিতা আবৃত্তি। চিন্তাবিদ ও প্রাবন্ধিক হাসান মাহমুদ তাঁর বহুল প্রচারিত ও জনপ্রিয় জীবনবোধের সত্যদর্শন সম্বলিত ‘জিহবা’ কবিতাটি পরিবেশনা করেন।

বিকেল চারটায় পরিবেশিত হয় কবি ও মুক্তিযোদ্ধা মেহরাব রহমানের উদ্যোগে নান্দনিক উপস্থাপনা ‘উত্তর আমেরিকা কবিতা উৎসব’। উল্লেখ্য যে এই উৎসবে ছিল তার উদ্যোগে আয়োজিত ষষ্ঠ কবিতা উৎসব যাতে উত্তর আমেরিকাবাসী কবিরা প্রাণবন্ত ভঙ্গিমায় কবিতা আবৃত্তি করেন ।

বিকেল পাঁচটায় উপস্থাপিত হয় নৃত্যানুষ্ঠান, এর পর বিকেল ছয়টায় পর্যায়ক্রমে জনপ্রিয় ‘কণ্ঠচিত্র’ আবৃত্তিসংগঠন ও ‘অন্যস্বর’ আবৃত্তি সংগঠন তাদের প্রাণবন্ত উপস্থাপনা করেন। ‘অন্যস্বর’ আবৃত্তি সংগঠনটি তাঁদের পোস্টারটি বিশেষ ‘সম্মাননা’ হিসেবে বইমেলার রূপকার শেখ সাদী আহমেদের হাতে আনুষ্ঠানিকভাবে হস্তান্তর করেন।

বিশেষ অতিথি আলোচনা পর্বে মূল্যবান ও প্রাসঙ্গিক বক্তব্য রাখেন বাংলা  কবি আসাদ চৌধুরী, টরেন্টোর বাংলাদেশ কনসুলেটের কনসল জেনারেল লুৎফর রহমান, এমপিপি ডলি বেগম, চয়নিকা দত্ত, সুলতানা হায়দার এবং সাদী আহমদ।

‘অভিবাসী বাঙালির সাহিত্য ও সংস্কৃতি চর্চা’ শীর্ষক আলোচনায় বক্তব্য ও সুচিন্তিত, গঠনমূলক মতামত দেন বরেণ্য লেখক ও চিন্তাবিদ  সালমা বাণী, হাসান মাহমুদ, জসিম মল্লিক, আশরাফ আলী, নাজমুন নেসা পিয়ারী, ফরিদা রহমান, সিরাজুল ইসলাম মুনির, শাম্মি আখতার হ্যাপি ও আশরাফ আলী। রাত নয়টায় পরিবেশিত হয় গান নতুন প্রজন্মের শিল্পী প্রতিষ্ঠার প্রাণবন্ত গান। শিল্পী অমিত শুভ্রর অসাধারণ রাগপ্রধান ও আধুনিক সংগীত পরিবেশনা মন্ত্রমুগ্ধের মতো শ্রোতারা উপভোগ করেন।

প্রথম দিনের আয়োজনের স্বতঃস্ফূর্ত ও সুচারুভাবে সঞ্চালনার দায়িত্ব পালন করেন হিমাদ্রি রায়, অজন্তা চৌধুরী ও অনন্যা।

বাংলা বইমেলার দ্বিতীয় দিন ৭ আগস্ট সাংস্কৃতিক আয়োজন শুরু হয় বিকেল তিনটায়। প্রথমেই রাসেল রানার ‘হাউসের ধুয়া’ ডকুমেন্টরি চলচ্চিত্র প্রদর্শিত হয়। ডকুমেন্টরির মূল বিষয়বস্তু হলো ‘বাংলাদেশের গ্রামীণ পরিবেশে সংগীতের জন্যে নিবেদিত প্রাণ’ কিছু মানুষের ভূমিকা বিকেল চারটা হতে এক ঘণ্টার জন্য শুরু হয়। লেখক, লেখা ও নুতন বই বিষয়ক উপস্থাপনা ও আলোচনা। এই পর্যায়ে ঔপন্যাসিক জসিম মল্লিকের পরিচালনায় ‘নতুন বই’ শীর্ষক আলোচনা অনুষ্ঠানে অংশ নেন মুক্তিযুদ্ধের যুদ্ধশিশু গবেষক মোস্তফা চৌধুরী, জিন্নাহ চৌধুরী, মেহরাব রহমান এবং সিরাজুল ইসলাম মুনির। দুইদিনের এই সুন্দর আয়োজনে আগত অতিথিরা টেবিলে সাজানো বই দেখার ও কেনার পাশাপাশি এই সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান বিশেষভাবে উপভোগ করে।

গত দুই বছর মহামারির কঠোর বাস্তবতায় অবরুদ্ধ পরিস্থিতিতে বইমেলা আন্তর্জালে আয়োজিত হয়েছিলÑদীর্ঘ সময় অবরুদ্ধ-অপেক্ষার পর সরাসরি এই আনুষ্ঠানিকতার আয়োজনে অবধারিতভাবে তাই প্রচুর অতিথির সমাগম ঘটেছিল।

বিকেল পাঁচটায় মহরম এবং রবীন্দ্র মৃত্যুবার্ষিকী মূল প্রতিপাদ্য করে দরাজকণ্ঠে অসাধারণ কবিতা উপস্থাপন করেন কবি শফিক আহমেদ। এরপর দেবব্রত সিংহের ‘তেজ’ কবিতা অসাধারণ আবৃত্তি করেন জ্যোতি সাত্তার।

এরপরেই ‘আলো দিয়ে যাই’  শিরোনামের টরেন্টোর শিল্পীরা সুন্দরভাবে তাঁদের কবিতা ও গান উপস্থাপন করেন। জনপ্রিয় আবৃত্তির সংগঠন বাচনিক-এর আবৃত্তিশিল্পীরা তাঁদের প্রাণবন্ত উপস্থাপনা করেনÑবাচনিক তাঁদের পোস্টার ‘আমরা যখন বই সংগ্রহ করি তখন আনন্দকে সংগ্রহ করি’ এই থিমে বইমেলার পোস্টার সাজিয়েছিলেন।

বিশেষ আলোচনা পর্বে ‘অভিবাসীর সেকাল একাল’ শীর্ষক আলোচনায় আলোচক ছিলেন কবি আসাদ চৌধুরী, মনীষ রফিক, সৈয়দ নাজমুল হোসেন, মোস্তফা চৌধুরী, ড. জহির সাদেক, শহীদ খন্দকার টুকু, জিন্নাহ চৌধুরী বিশিষ্ট বক্তারা তাঁদের তাৎপর্যময়, গুরুত্বপূর্ণ, প্রবাসের বাস্তবভিত্তিক অভিজ্ঞতা ও নির্দেশনাসমৃদ্ধ সময়োপযোগী মতামত দিয়ে সকলকে ঋদ্ধ করেন।

টরেন্টোর সুকণ্ঠী সংগীত শিল্পী শিখা রউফ ও ফারজানা শান্তা কয়েকটি গান পরিবেশন করেন। সমাজকর্মী, সংস্কারক ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব শহীদ খন্দকার টুকু ভাইয়ের একটি অসাধারণ ও বিশেষ সংগীতানুষ্ঠান পরিবেশিত হয়।

দ্বিতীয় দিনের সামগ্রিক সঞ্চালনার দায়িত্বে ছিলেন দিলার নাহার বাবু ও কামরান করিম। তাঁদের প্রাণবন্ত সঞ্চালনা অনুষ্ঠানে অসাধারণ মাত্রা আনেÑষোলতম বইমেলা অনুষ্ঠান উপলক্ষে একটি বিশেষ সাহিত্য সংকলন প্রকাশ হয়Ñকানাডা ও বিশ্বের বিভিন্ন দেশের বাঙালি লেখকদের লেখা ও কানাডার প্রধানমন্ত্রী, বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীসহ কানাডার বিভিন্ন পর্যায়ের প্রতিনিধি স্বনামধন্য প্রকাশকদের শুভেচ্ছার সন্নিবেশ ঘটেছে। সাহিত্য সংকলনটি যৌথভাবে সম্পাদনার দায়িত্বে ছিলেন কথাসাহিত্যিকক অনিরুদ্ধ আলম ও  ফারজানা নাজ।

শক্তি, সমৃদ্ধি ও বিশ্বাস বৈভবে বই এই শুদ্ধ প্রত্যয়কে প্রতিপাদ্য করে দুই দিনব্যাপী উদযাপিত টরেন্টো বইমেলা  নবীন প্রবীণ লেখক, চিন্তাবিদ ও বাংলাভাষী সাংস্কৃতিককর্মীর সমন্বয়ে পরিপূর্ণ রূপ লাভ করেছিল। বইমেলা আমাদের উপলদ্ধি করতে শেখায় শক্তি দেয় এক বিশেষ সত্যের ‘এই দূর পরবাসেও বাঙালি এবং বাংলাদেশিরা স্বতন্ত্র কৃষ্টিনির্ভর ঐতিহ্যকে আর মননে ধারণ করেন জন্মভূমি বাংলাদেশকে’। কানাডার পরবাসী জীবনে এইভাবে ঐক্যবদ্ধ সৃষ্টিশীল উদ্যোগের আলোকে বেঁচে থাকবে বাংলা ভাষা। আবহমান কাল ধরে লালিত বাংলার আলোক বিচ্ছুরণ ঘটুক বৈশ্বিক পরিমণ্ডলে সেই প্রত্যাশা আমাদের সবার।

হ্যালিফ্যাক্স, কানাডা থেকে প্রেরিত

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button