
এই বয়সে সুদীপ্তকে আবার পেছনে ফিরে অতীতকে দেখতে হবে এমনটা কখনও ভাবেননি। আসলে এটা বয়সের ব্যাপার ছিল না, হয়তো এই বয়সে নয়, এটা যেকোনও সময় ঘটতে পারত। ঘটেনি, কারণ এটাকে তিনি নিজের ভুলের শাস্তি হিসেবে কবুল করেছেন। অরুণিমাকে বুঝতেও দেননি তার একটি গোপন ব্যথা আছে, আর এই ব্যথার ভার তিনি একাই বহন করেছেন, এর ভাগ তিনি আর কাউকে দিতে চাননি, অরুণিমাকে তো নয়ই।
গতকাল থেকে এক অদ্ভুত কষ্ট বুকের সম্পূর্ণটা অচ্ছন্ন করে ফেলেছে। সম্প্রতি অরুণিমার এটা-সেটা কথায় মাঝে-মধ্যে মন খারাপ হয়েছে, কিন্তু সেটা এত তীব্রভাবে তাকে আক্রান্ত করেনি। একটা সাদা চাদরে ঢেকে অতীতের ভুলটাকে কাফনের মতো চাপা দিয়ে রেখেছিলেন তিনি। কিন্তু সম্প্রতি, চাকরি থেকে অবসরের পর অরুণিমা তার অজান্তেই চাদরে হিমশীতল হাওয়া দিয়ে ফেলেছে, তাতে সুদীপ্ত বিষণ্ন হয়েছেন, বেদনায় নীল হয়েছেন। কখনও ক্ষেপে উঠেছেন, অরুণিমাকে অপমান করেছেন। কিন্তু তারপরও সাদা চাদরটাকে জোর করে চেপে ধরে রেখেছেন যাতে করে হাওয়ায় উড়ে গিয়ে অতীতের লজ্জা ও ভুলগুলো প্রকাশিত হয়ে না পড়ে।
অরুণিমা আর তিনি এক অফিসেই চাকরি শুরু করেছিলেন। সহকর্মী। চাকরি শুরুর আগে ট্রেনিং সেন্টারে চার মাসের ট্রেনিং। ট্রেনিং ব্যাচে অরুণিমা একজনই মেয়ে।
সহকর্মীদের মধ্যে বিশেষ করে নবীন সহকর্মী যারা, তাদের পরস্পরের মধ্যে সম্পর্কের একটা অলিখিত অধিকার গড়ে ওঠে। তখন বিয়ে করবে বলে সুদীপ্ত কনে দেখাদেখি করছিল। একদিন এক বন্ধুর কল্যাণে এক কনের সন্ধান এল। সুদীপ্তর কেন যেন মনে হলো অরুণিমাকে সঙ্গে নিয়ে যাই।
অরুণিমাকে বলায় সে বলল, আমি দেখলে সেটা সফল হবে না। আমার বিয়ের কন্যা দেখতে নেই।
কেন দেখতে নেই, সেটা জানতে চায়নি সুদীপ্ত। তাকে জোর করেই নিয়ে গেল।
কনে দেখে সুদীপ্ত ভালোমন্দ কিছুই বুঝল না। না বুঝল কন্যার রূপ-লাবণ্যর কথা, না জানল গুণপনার হদিস। হয়তো প্রথম কনে দেখার এই বিড়ম্বনা সব ছেলেরই হয়।
অরুণিমা বলল, এই বিয়ে হবে না। অনেকটা বড়বোনের শাসনের সুরেই।
সুদীপ্ত ভেবে পেল না, অরুণিমা কোথায় সমস্যা দেখল। তাকে জিজ্ঞেস করে না কিন্তু তার মনে হলো, অরুণিমা হয়ত ঠিকই বলেছে। সুদীপ্তর বিয়ের ভাবনায় আপাতত ভাটা পড়ে।
সুদীপ্তরা যে ডরমিটরিতে থাকে, তার চারতলায় থাকে অরুণিমা। চারতলাটা মেয়েদের জন্য বরাদ্দ। অন্য কোনও মেয়ে না থাকায় সে একাই থাকে। সুদীপ্ত থাকে দোতলায়। দোতলা-তিনতলায় ব্যাচের অন্য ছেলেরা থাকে।
একদিন বিকেলবেলা ছিপছিপে গড়নের লম্বা ফর্সা একজন যুবক এল। সুদীপ্তর সঙ্গে দেখা হলো অ্যাডমিন ভবনের সামনে। যুবক অরুণিমার খোঁজ করে। সুদীপ্তই তাকে চারতলায় পৌঁছে দেয়।
তাকে দেখে এক অনির্বচনীয় আলোয় রাঙা হলো অরুণিমার মুখ। তখনও তাদের সম্পর্কটুকুর কথা জানতে চায়নি সুদীপ্ত। তাকে পৌঁছে দিয়েই সুদীপ্ত নিজের ঘরে ফিরে আসে।
অরুণিমা বলল, বসো, চা খেয়ে যাও।
সুদীপ্ত বলল, পরে আসব।
দিনের আলো দ্রুতই ফুরিয়ে আসছিল। অন্ধকার নামছিল ধীর পায়ে। সুদীপ্ত চারতলায় উঠল অরুণিমার গেস্টের সঙ্গে পরিচিত হবে আর চা খেতে খেতে গল্প করে কিছুটা সময় কাটাবে বলে।
কিন্তু বিস্ময় অপেক্ষা করছিল সুদীপ্তর জন্য। অরুণিমাকে গভীর চুম্বনে আবদ্ধ করে জড়িয়ে রেখেছে যুবক। মুহূর্ত মাত্র, পায়ের আওয়াজ পেয়েছিল হয়ত, তারা ছিটকে পড়ে দুজন।
ফিরেই যাচ্ছিল সুদীপ্ত। অরুণিমা ডাক দিল, সুদীপ্ত, যেও না। এস।
সুদীপ্ত কিছুটা অপরাধ বোধ নিয়েই অরুণিমার ঘরে যায়।
অরুণিমা বলল, তোমাদের পরিচয় হয়নি, না ?
সুদীপ্ত বলল, না।
পরিচয় না জেনে একজন অচেনা লোককে তুমি আমার ঘরে দিয়ে গেলে ?
সরি!
এখন আর সরি বলে কী হবে ? অঘটন যা হবার তা তো হয়েই গেছে।
সেটা কী যা দেখেছি সে-ই পর্যন্তই, নাকি আরও বেশি কিছু ?
আমাকে কি সে-রকম মনে হয় ?
একটা গান আছে না, আরও একটু বেশি কিছু হলে ক্ষতি কী!
তুমি ঠিক সময় মতো এসেছ, না হলে ক্ষতি হয়ে যেতে পারত।
অরুণিমা কথা বলছিল কিন্তু লজ্জাও তাকে আড়ষ্ট করে রাখছিল।
অরুণিমা বলল, তোমার সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিই। ওর নাম প্রিন্স। আমার ছোটবোনের বন্ধু। ছোটবোন মানে ওর হাজবেন্ডের বন্ধু। ওহ, তোমাকে তো কখনও বলাই হয়নি, আমার ছোট দুই বোনের বিয়ে হয়ে গেছে। আমার একটা দুর্ঘটনা আছে। তারপর থেকে আমি পড়াশোনা নিয়ে ব্যস্ত হয়ে গেলাম। এখন প্রিন্স পিছু নিয়েছে। পারিবারিকভাবে কথা ফাইনাল হয়ে গেছে। শীতকাল আর কত দিন ? এই শীতের শেষে বিয়ে। আমার দাদারা দেশের বাইরে থাকেন, তখন তারা আসবেন। ওদের জন্যই অপেক্ষা।
অরুণিমা একটানা কথা বলল। প্রিন্স তখনও মাথা নিচু করে বসে আছে। হয়তো লজ্জা কাটিয়ে উঠতে পারছিল না।
সুদীপ্ত হাত বাড়িয়ে দিল। প্রিন্স উঠে দাঁড়ায়। সুদীপ্তর বাড়িয়ে দেওয়া হাত দুহাতে জড়িয়ে ধরে, অনেকটা ক্ষমা চাওয়ার বিনত ভঙ্গি।
অরুণিমা বলল, আজ রাতটা তুমি ওকে তোমার রুমে থাকতে দাও। রাতের বেলায় আর কোথায় যাবে। কাল সকালে চলে যাবে।
সুদীপ্ত বলল, ঠিক আছে। এখনই নিয়ে যাব ?
হ্যাঁ, এখনই। রাতের খাবারটা দুজনেই একসঙ্গে খেয়ে নিও।
পরদিন সকালের আলো ফোটার আগেই প্রিন্স চলে গেল। অরুণিমাকেও বলে গেল না। কিন্ত সুদীপ্ত সেই সন্ধ্যার স্মৃতি কিছুতেই মন থেকে মুছে ফেলতে পারে না। সুদীপ্তর মনে হয়, কেবল চুম্বন নয়, আরও বেশি কিছু হলেও হতে পারে! তার মনও কখনও কখনও চোরা স্বভাবের হয়ে ওঠে, অরুণিমা তার কল্পনাকে রাঙিয়ে দেয়।
অরুণিমার সঙ্গে সুদীপ্তর সম্পর্কটা নিবিড় হতে থাকে। সেটা যতটা না সুদীপ্তর পক্ষ থেকে, তার চেয়ে ঢের বেশি অরুণিমার পক্ষ থেকে। এর একটা কারণ অবশ্য বের করেছে সুদীপ্ত। সেদিনের কথাটা যাতে সুদীপ্ত কাউকে বলে না দেয়, হয়ত এই তার ভয় ছিল। আর কোনও ব্যতিক্রম ছাড়া দিনগুলো স্বাভাবিক নিয়মে পার হচ্ছিল।
মাঝখানে সাতদিনের ছুটিতে বাড়ি গেল অরুণিমা। ফিরে এল বিষণ্ন প্রতিমা হয়ে। পরবর্তী সাত দিনেও তার এই বিষণ্নতার হদিস করতে পারল না সুদীপ্ত।
প্রতিদিনের ক্লাস শেষ করে ফিরতে ফিরতে সন্ধ্যা হয়ে যায়। শীতের বিকেল দ্রুত পার হয়, রাতও নামে ঝুপ করে। অরুণিমার সঙ্গে ঠিক মতো কথা হয় না, মনে হয় তাকে যেন এড়িয়ে চলছে সে।
একদিন সন্ধ্যার পর ইচ্ছে হলো, একটু যাই। এককাপ চা খাবে আর তার মন খারাপের কারণটাও যদি জানতে পারে!
অরুণিমার ঘরের দরজা বন্ধই ছিল। দরজায় টোকা দেবার বেশ পরে দরজা খুলে দাঁড়ায় অরুণিমা। তাকে দেখে অবাক হয় সুদীপ্ত। তার চোখের কোল ভেজা, এইমাত্র ওড়নায় অশ্রু মুছে এসেছে কিন্তু তার ভেজা দাগ রয়ে গেছে শ্যামলা গালে।
অরুণিমা দরজা আগলেই দাঁড়িয়ে থাকে। এমনই ইচ্ছে তার, সুদীপ্ত এখন অনাহূত, কাজেই যা বলার বলে ফিরে যাও।
কিন্তু সুদীপ্ত জেদ ধরে, মনে মনে।
বলল, কী ভেতরে আসতে বলবে না ?
অনিচ্ছায় দরজা থেকে সরে দাঁড়ায় অরুণিমা।
সুদীপ্ত ভেতর ঢুকতে ঢুকতে বলল, তোমার হাতের চা খাওয়া হয়নি অনেকদিন। তাই চা খেতে এলাম। কিন্তু তোমার তো অশ্রুবিসর্জন পর্ব চলছে।
অরুণিমা কেবল বলতে পারল, বসো। তারপর ত্রস্ত পায়ে ভেতরে চলে গেল।
একা একা অনেকটা সময়ই বসে থাকল সুদীপ্ত। অরুণিমা ফিরে আসতে বেশ সময় নিল। এবার মুখমণ্ডল ধোয়া, কান্নার চিহ্ন নেই সেখানে। ধোঁয়া ওঠা দুকাপ চা আর কয়েকটা বিস্কুট ট্রেতে সাজিয়ে নিয়ে এসেছে।
চা-টা তারা নিঃশব্দে খায়। অরুণিমার চোখ গেঁথে থাকে চায়ের কাপে। আর চোরা চোখে অরুণিমাকে দেখে সুদীপ্ত। তার মনে বিচিত্র ভাবনা।
সুদীপ্ত বলল, প্রিন্স সাহেবের খবর কী ?
পলকেই সুদীপ্তকে দেখল অরুণিমা। ‘দেখল’ না বলে ‘পাঠ করল’ বললেই ভালো হয়। প্রিন্সকে নিয়ে তার মনের ভাবনাটাকেই কী পাঠ করল অরুণিমা! সেটা কি উপহাস, নাকি কৌতূহল, নাকি অকারণ আগ্রহ, কোনটা, সেটা পড়ে নিল নিমিষে।
অরুণিমা পালটা প্রশ্ন করে, তার খবর জানা কি তোমার খুব দরকার ?
ঠিক তা নয়, তোমার একটা গতি হওয়ার কথা ভাবছিলাম।
অরুণিমা ক্ষুব্ধ হলো। বলল, আমার গতি হওয়া নিয়ে তুমি ভাবছ কেন ? আমি কি জলে পড়ে গেছি ?
কিছুটা বোকা হয়ে গেল যেন সুদীপ্ত। সহসা অরুণিমার কথার জবাব দিতে পারে না। মাথা নিচু করে চুপচাপ বসে থাকে।
সেদিন অরুণিমা বলেছিল, তার ছোট দুই বোনের বিয়ে হয়ে গেছে। সুদীপ্তর তখন মনে হয়, অরুণিমাকে ‘গতি’ হওয়ার কথাটা বলার পেছনে আসলে এই কথাটাই কাজ করেছিল।
সুদীপ্ত বলল, খুব চাঁচাছোলাভাবেই, তুমি বললে না, তোমার ছোটবোনদের বিয়ে হয়ে গেছে। তোমার তো বিয়ের বয়স হয়েই গেছে। প্রিন্স সাহেব দেখতেও বেশ। অনেক দূর তো এগিয়েছ, এবার শুভকাজটা শেষ কর। আমরা একটু আনন্দ-টানন্দ করি, ভালো-মন্দ খাই।
মাথা নিচু করেই বসেছিল অরুণিমা। সুদীপ্তর কথা শুনছিল। সুদীপ্তর কথা শেষ হলে জলভরা চোখে তার দিকে তাকায়।
অরুণিমা বলল, তুমি না বিয়ের কনে দেখছ! আমাকে বিয়ে করবে ?
চারতলা দালানটা ভেঙে পড়লেও অবাক হতো না সুদীপ্ত, অরুণিমার কথায় তার চেয়েও বেশি অবাক হয়। তারপর মনে হলো, অরুণিমা হয়ত তার সঙ্গে তামাশা করছে কিন্তু তার চোখের জল!
বিভ্রান্তি কেটে গেলে সুদীপ্ত বলে, প্রিন্স সাহেব…
সুদীপ্তর কথাকে শেষ করতে দিল না অরুণিমা। বলল, ওকে ‘না’ বলে দিয়েছি।
‘না’ বলেছ ? কেন ?
শোনা কি জরুরি ?
তা হয়ত নয়! তবু তুমি হুটহাট একজনের স্বপ্ন ভেঙে দিলে, আবার আরেকজনকে প্রপোজ করছ, বিষয়টা কেমন না ?
ওহ সরি! তোমাকে আমার এভাবে বলা ঠিক হয়নি।
দুজনের নীরবতা। বাইরের অন্ধকারে পাখিদের কিচির-মিচির থেমে এসেছে। আজ বোধহয় চাঁদের দেরি করে আসবার কথা। এই ঘরটার জানালায় পর্দা নেই। খোলা জানালায় ঠাণ্ডা বাতাসের মৃদু উঁকিঝুঁকি।
উঠবে বলে মনস্থির করে সুদীপ্ত। আর তখনই অরুণিমার কান্নার শব্দ।
সুদীপ্তর অসহায় লাগে। এমন পরিস্থিতির মুখোমুখি আর কখনও পড়েনি সে। অরুণিমার কথার জবাব দেয়নি সে, সেটাই কি তবে তার কান্নার কারণ হয়েছে? সে কী এমনটা ভেবেছে, তাকে অপমান করেছে সুদীপ্ত ?
এই মুহূর্তে তাকে একা ফেলে চলে যেতে পারছে না সুদীপ্ত। সেটা খুব অমানবিক হবে। হাত বাড়িয়ে তার মাথায় বা পিঠে হাত রেখে সান্ত্বনা দেবে, সেটাও তার পক্ষে সম্ভব নয়, সেই অধিকার তার নেই।
সুদীপ্ত কেবল বলতে পারে, প্লিজ কেঁদো না।―তুমি কেন কাঁদছ জানি না। আমার কথায় দুঃখ পেয়ে থাকলে ক্ষমা করো।
না না সুদীপ্ত, তোমার কথায় আমি দুঃখ পাইনি। আমার নিয়তিটাই এমন, আমি দুঃখই পাই কেবল। আমার দুখের অনেক কারণ। কয়টা তোমাকে বলব। আর বলেই বা কী হবে! এই তো মাত্র কিছুদিনের পরিচয়। এই ডরমিটরির জীবনও ফুরিয়ে যাবে। তারপর আবার যে যার মতো চলে যাব নিজেদের কর্মস্থলে।
প্রিন্সের ব্যাপারটা তাকে রহস্যের মধ্যে ফেলে দেয়। বিষয়টা যেন না জানলেই নয়। সুদীপ্ত বলল, যদি বন্ধু ভাবো, বলতে পার।
অরুণিমা ভেজা চোখ মেলে তাকায়। সুদীপ্তর চোখে চোখ রাখে। সুদীপ্ত চোখ নামায় না, নির্লিপ্তও থাকে না, এই ভেবে যে পাছে সে তাকে অবিশ্বাস করে।
অরুণিমা বলল, জানো, আমার একবার বিয়ে হয়েছিল। বয়স কম ছিল, তখনও বিয়েটা কী, ঠিক মতো বুঝতে পারিনি। কিন্তু হঠাৎ করে সুজিত হারিয়ে গেল। অনেকদিন তার খোঁজ মিলল না। কেউ বলল, কোথাও বেঘোরে প্রাণ হারিয়েছে, কেউ বলল, ভারতে চলে গেছে। যা-ই হোক, সুজিত আর ফিরল না।
সুদীপ্ত ম্লান চোখে অরুণিমার দিকে তাকিয়ে থাকল। প্রিন্সের কথা জানতে চেয়েছিল সে কিন্তু এখন শুনতে হচ্ছে সীতার বনবাসের কথা।
অরুণিমা বলতে থাকে, আমার জন্য তো আর জগত-সংসার বসে থাকবে না! আমার দুই বোনের বিয়ে হয়ে গেল। ছোট বোন প্রেম করে। তারও বিয়ে হয়ে যাবে সহসা। সুজিতের জন্য আমার স্বজনের অপেক্ষা হয়ত ছিল, কিন্তু আমি পড়াশোনায় মন দিলাম। কলেজ পাশ করলাম তারপর বিশ্ববিদ্যালয় পার হয়ে এলাম। তার কথা আমি ভুলেও গেলাম। এরমধ্যে কয়েকজন প্রেমের প্রস্তাবও দিল। আচ্ছা তুমিই বল, আমার কি প্রেম করা সাজে ?
অরুণিমা উঠে দাঁড়াল।
বলল, আরেক কাপ চা খাবে ?
সুদীপ্তর আসলে তেষ্টা পেয়েছে অনেক্ষণ আগে। বলতে পারছিল না।
বলল, একগ্লাস পানি এনো।
দ্রুতই ফিরে এলো অরুণিমা। এবারও চায়ের সঙ্গে বিস্কুট। তবে এগুলো অন্যরকম।
অরুণিমা বিস্কুট নেয় না। পানি খায় পুরো গ্লাস। তারপর ধীরে ধীরে চায়ের কাপে ঠোঁট ছোঁয়ায়। সুদীপ্তর তাড়াহুড়ো নেই। আর সীতার বনবাসের গল্পের অপেক্ষা করে।
চা খাওয়া শেষ হলে অরুণিমা বলল, আজ না হয় প্রিন্সের কথাটা থাক। আরেকদিন বলি।
সুদীপ্ত বলল, না না, বলেই ফেল।
পরের গল্প শুনে তোমার সময় নষ্ট হচ্ছে।
পর কোথায় পেলে! আগে তো বন্ধু বানিয়ে নিলে।
এবার ম্লান হাসল অরুণিমা। বলল, প্রিন্সের কথা শোনার আগে তোমাকে আরেকটা কথা বলে রাখি। সেদিন তোমার সঙ্গে পাত্রী দেখতে যেতে আমি চাইনি। আমি তো অপয়া, স্বামী চলে যায় অথবা হারিয়ে যায়। অপয়া বলেই তোমার শুভকাজে বাধা হতে চাইনি।
দূর! আমি এসব কুসংস্কারে বিশ্বাস করি না। বাদ দাও, প্রিন্সের কথা বল।
অরুণিমা নীরব থাকে কিছুটা সময়। হয়ত নিজের মধ্যে কথা গুছিয়ে নিতে থাকে। তারপর সরাসরি সুদীপ্তর দিকে তাকাল। বলল, প্রিন্স মনে করেছে আমি সস্তা কিছু। ভেবেছে, আমি তো অনাঘ্রাতা নই, শরীরের স্বাদ আমি বুঝি। সে চাইলেই আমি শরীরটা তাকে দিয়ে দিতে পারি। তোমাকে ধন্যবাদ, সেদিন তুমি ঠিক সময়ে আমার ঘরে এসেছ। না হয়, তার জোরাজোরি চলত, হয়তো অঘটন কিছু ঘটত।
কেমন অঘটন ? প্রিন্সের ইচ্ছাপূরণ হতো ?
তোমরা পুরুষরা না! একটা খুন-খারাবি হতে পারত। সাক্ষী হিসেবে এতদিনে তোমাকেও আদালতে যেতে হতো।
একটু সময় চুপ থাকল অরুণিমা। বলল, আমার বোনজামাইয়ের বন্ধু হিসেবে আমাদের বাড়িতে তার যাতায়াত। আমার সবকিছু জেনেশুনেই বিয়ের প্রস্তাব সে দিয়েছে। কিন্তু সে বিয়ের তারিখ পাকা করে না। অথচ আমাকে নিয়ে অনেকবার সে কোথাও ঘুরতে যাবার প্রস্তাব করে। আমি আমাকে নিয়ে সচেতন ছিলাম। তার সঙ্গে বাইরে কোথাও যাইনি।
একটু যেন দম নিল অরুণিমা। বলল, আচ্ছা তুমি বল, এই ডরমিটরিতে আসা কি তার ঠিক হয়েছে ? আমি অনেক ভেবেছি, এখানেও সে বিশেষ উদ্দেশ্য নিয়ে এসেছিল। সেদিন এখান থেকে চলে যাওয়ার পর থেকে তার আচরণ পালটেছে। সে আমাকে খোলাখুলি প্রস্তাব পাঠিয়েছে। অবাক ব্যাপার কী জানো, সে তোমাকেও সন্দেহ করেছে। তার মানস-গঠনে সমস্যা আছে। একবার পুরুষের সংস্পর্শ পাওয়া মেয়েরা বহুগামী হয়ে যায়। এমনটা ভাবলে তো সে আমার কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় জীবন এমন কী সারাটা জীবন নিয়েও সংশয়ে থাকবে, আমাকে অবিশ্বাস করবে। বলো, এমন লোককে কী আমি বিয়ে করতে পারি ?
সুদীপ্তর সামনে বিশাল এক প্রশ্নবোধক চিহ্ন এঁকে দিয়ে অরুণিমা বলল, এবার তাহলে যাও।
সুদীপ্ত নিজের ঘরে ফিরে আাসে।
‘আমাকে বিয়ে করবে ?’―অরুণিমার কথাটা সারারাত ভাবিয়ে রাখল সুদীপ্তকে। ঘুমোতে দিল না। যদিও কথাটার একটা পরিপ্রেক্ষিত ছিল, কিছুতেই এটাকে প্রস্তাবনা বলা যাবে না, তবু রাতের করপুটে ছোট্ট পাখির ছানার মতো কথাটা আদুরে পালক মেলে লুটোপুটি খেলল। আর আশ্চর্যের ব্যাপার ঘটল, পরদিন থেকে সে আর স্বাভাবিকভাবে অরুণিমার সামনে দাঁড়াতে পারল না। কথা বলা তো দূরের কথা, তার চোখের দিকেও তাকাতে পারল না। কিন্তু তার মনের সেই চোরা স্বভাবটা আরও জেঁকে বসল, অরুণিমাকে সে নানা ভাঁজে ভাঁজ করল পোশাকের মতো, তারপর যত্ন করে রেখে দেয় আলমারিতে। কী জানি কারণ হয়তো এটাই, সুদীপ্ত অরুণিমার সামনে স্বাভাবিক হতে পারে না। কখনও কাজের অবসরে এমনটাও ভাবে সুদীপ্ত, অরুণিমাকে কী সে ভালোবাসতে শুরু করেছে ? কিন্তু তার জবাব পায় না সে। দূর কৈশোরে স্বপ্নার সঙ্গে তার ভালোবাসা হয়েছিল। স্বপ্নার মুখটা সারাক্ষণ তার মনের পর্দায় ভেসে থাকত। সে ছিল এক অদ্ভুত অনুভূতির সময়। সে প্রেম ছিল ক্ষণস্থায়ী কিন্তু তার রেশ রয়ে গেছে আজ অবধি। সুদীপ্ত ভেবে পায় না, অরুণিমার মুখটা সারাক্ষণ কেন মনজুড়ে থাকে না। আবার এমন করেও ভাবে, হাঁ হতে পারে, আজকাল তার কৈশোরের মতো অলস ভাবনার সময় কোথায়, এখন সে পরিপূর্ণভাবে একজন দায়িত্ব সচেতন মানুষ। সুদীপ্ত অনেক ভেবে বের করেছে, সাম্প্রতিক রাতের ভাবনা আর কৈশোর প্রেম―দুটো আলাদা বিষয়।
সুদীপ্তর আচরণ অরুণিমার দৃষ্টি এড়ায় না। খুব অবাক লাগে। সুদীপ্তর সঙ্গে তার এমন কী হয়েছে যে সে তাকে এড়িয়ে চলবে। বরং উল্টোটা হতে পারত, কারণ সে-ই দুর্বল মুহূর্তে তার জীবনের অনেক গোপন কথা তার কাছে বলে দিয়েছে। সেটা যে তার কাছ থেকে কোনও স্বার্থ আদায় অথবা তার প্রতি কোনও ভালো লাগার মুহূর্তে আবেগ-বিহ্বল হয়ে বলা তা কিন্তু নয়। অরুণিমার মনে হয়, সুদীপ্তর এই নির্লিপ্ত থাকার কোনও মানে নেই, এটা অকারণ। এভাবে কী চলা যায় ? সুদীপ্তকে তার একবার বাজিয়ে দেখতে ইচ্ছে হলো।
বিকেলের সেশনে একটাই ক্লাস ছিল। ক্লাস শেষে সবাই হুড়মুড় করে বের হয়ে যায়। অধিকাংশের লক্ষ্য ডরমিটরি। সে দলে সুদীপ্তও আছে। কয়েকজন দলবেঁধে মূল ফটক পার হয়ে রাস্তার দিকে চলে যায়, তারা ধূমপায়ীর দল। ওখানে কয়েকটা ছোট ছোট টংঘরে চা-সিগারেটের দোকান আছে। ওরা ওখানে চা-টা খায়, ফালতু আড্ডা দেয়।
অরুণিমা কোথায়ও যায় না। সে একলা একটা মেয়ে। অন্যদিন ডরমিটরিগামীদের অনুগামী হয় সে। ধীর পায়ে সবার শেষে সে হাঁটে, সবার শেষে সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠে যায়। তার যাওয়া-আসা কারও দৃষ্টিকে আকৃষ্ট করে কি না জানে না অরুণিমা। তবে সে সবার দৃষ্টিকে উপেক্ষা করেই ডরমিটরি আর অ্যাডমিন বিল্ডিংয়ের পথটুকু যাতায়াত করে।
আজ অরুণিমা ডরমিটরির পথে গেল না। বাইরের গেটের পথেও কোনওদিন যায় না, আজও গেল না। অ্যাডমিন বিল্ডিংয়ের কর্মকর্তা ও কর্মচারীরাও চলে যেতে শুরু করেছে। অরুণিমা একা একা নিচতলার টানা বারান্দা, সামনের ফুলের বাগানে হেঁটে বেড়ায়। একসময় ধূমপায়ী পার্টি হইচই করতে করতে ফিরে আসে। তাদের সঙ্গে দেখাও হয়ে যায়। ছোটখাটো আলফ্রেড সবসময় হাসিখুশি থাকে, প্রাণবন্তও। অরুণিমার ভালো লাগে ছেলেটাকে। দেখলেই মনে হয়, বাড়ির সবার ছোট ছেলে, আদুরে আর প্রগলভ।
আলফ্রেড বলল, দিদি যাবেন না ?
অরুণিমা বলল, তোমরা যাও। আজ একটু ইভিনিং ওয়াক করব।
আলফ্রেড আঙুল তুলে দেখাতে দেখাতে বলে, ওই দিকে একটা বড় দিঘি আছে, জায়গাটা সুন্দর। ভালো লাগবে আপনার।
অরুণিমা মিষ্টি হাসি দিয়ে বলে, থ্যাংক ইউ ভাই।
আলফ্রেড আবার বলল, দিদি, আমি কী সঙ্গে যাব ?
না ভাই, একা একা হাঁটতে ভালোই লাগছে।
আলফ্রেডরা চলে গেল।
দিঘির দিকে কোনওদিন যায়নি অরুণিমা। আজ তার খুব ইচ্ছে করল, দিঘির দিকে যাবে। দিঘির পাড়ে একা একা হাঁটবে। আলফ্রেড বলেছে, ভালো লাগবে।
অরুণিমাও একটু শান্তি চায়। সেদিন তার বাড়ি যাওয়ার খবর পেয়ে অফিস শেষে বিকেলেই এসে উপস্থিত হয় প্রিন্স।
দোতলার ছাদে চেয়ার পাতা থাকে। সেখানেই বসেছিল তারা। সন্ধ্যার পরে অন্ধকার নেমে এলে প্রিন্স তার হাত ধরে। আজ যেন সে বেপরোয়া, জড়িয়ে ধরে তাকে। সেদিন ডরমিটরিতে যেখানে সে শেষ করেছিল, আজ সেখান থেকেই শুরু করতে চায়।
এক ঝটকায় নিজেকে সরিয়ে নেয় অরুণিমা। একটু কঠিন হয়েই বলল, প্রিন্স, তুমি নানাভাবে আমাকে ইনসিস্ট করেছ। আমি তোমার মনোভাব বুঝতে পেরেছি। কিন্তু সেটা আমার পক্ষে সম্ভব নয়। আজ শুনলাম, তুমি বিয়ের তারিখ অনির্দিষ্ট সময়ের জন্য পিছিয়েছ। আমার মনে হয়, এ নিয়ে আমাদের আর কথা আগানোর দরকার নেই। প্রিন্স, এরকম হলে তোমার সঙ্গে আমার ঘরবাঁধা সম্ভব নয়। তুমি চলে যাও।
প্রিন্সও কথা না বলে ছাড়ে না। কিন্তু তার কথা শুনে তাজ্জব বনে যায় অরুণিমা।
প্রিন্স বলল, তুমি কী মনে কর, আমি কিছু বুঝি না! রক্ত খেকো বাঘিনী রক্তের নেশায় ছুটবেই। আমাকে আর তোমার প্রয়োজন কী, এখন তো তোমার সুদীপ্তরা জুটেছে। দেখতেও বেশ, রসগোল্লা।
অরুণিমার আর রুচিতে কুলোল না সেখানে দাঁড়ায়। সিঁড়ির দিকে ইশারা করে কেবল বলতে পারল, বের হ। এই মুহূর্তে বের হ।
প্রিন্স সিঁড়ির ধাপে নামার আগে সে নিজেই নেমে আসে দোতলায় তার নিজের ঘরে। প্রিন্স সিঁড়ির ধাপগুলো ধীর পায়ে পার হয়, তারপর গেট পার হয়ে চলে যায়।
ট্রেনিং সেন্টারের বিশাল চত্বরটা শহর থেকে বেশ দূরেই। রাস্তার সামনের দিকটা বেশ ফাঁকা। রাস্তার পাশের বাড়িগুলোর ওপর দিয়ে বিশাল ধানী মাঠ চোখে পড়ে। হেমন্তের শুরু। ধান পাকা শুরু হয়েছে। শেষ বিকেলের সূর্যটা আলো ফেলছে। সে কারণে মনে হচ্ছে, মাঠজুড়ে যেন কাঁচাসোনার একটা পাতলা প্রলেপ পড়েছে।
অরুণিমার জানালা থেকেও দৃশ্যটা দেখা যায়। ভোরবেলায় কুয়াশাঝরা মাঠে যখন সূর্যটা আলো ফেলে তখন এক অনির্বচনীয় দৃশ্য চোখে পড়ে। বিশাল মাঠটাকে কেউ যেন সোনার জলে ধুয়ে রেখেছে।
আলফ্রেড যেভাবে হাত উঁচু করে দেখিয়েছিল, তাতে বেশ দূরেই মনে হয়েছিল দিঘিটা। কিন্তু এটা খুব কাছেই, ট্রেনিং সেন্টারের দেয়ালের বাইরে। মাঝখানে দুটো বাড়ি, সেকারণে তার চোখে পড়েনি। তার জানালা থেকেও অবশ্য এটা দেখা যায় না।
দিঘির পাড়ে বিশাল এক পাকা ঘাট। দিঘির পাড় জুড়ে নারকেল বীথি। ওই পাড়জুড়ে অনেকগুলো বাড়ি। বাড়িগুলোর ঘাট দিঘিতে নেমে এসেছে। এসময়টা সুনসান। ঘাটে বাড়ির বউ-ঝিদের নড়াচড়া দেখা যায়।
আকাশের গোধূলির রং যতক্ষণ ছিল, সাঁঝের মায়াও যেন লেগেছিল ভুবনে। এখন ভর সন্ধ্যা। একটা মিহি বাতাস ভেসে আসছে ওই পাড় থেকে। দিঘির জল রং পালটে ফেলেছে, কালো জল তিরতির শব্দতরঙ্গে আছড়ে পড়ছে এই পাড়ে।
প্রথম দেখার এই সুন্দর আয়োজন শেষ হলে বিশাল জলভরা দিঘি এবার ভয়ের কারণ হয়ে যায়। দিঘির মাঝখানে প্রবল আলোড়ন তুলে বড় মাছ ঘাই মারে। অরুণিমার মনে হয় শৈশবের গল্পে শোনা জলদেও এই ভরসন্ধ্যায় লাফিয়ে উঠেছে জলের গভীর থেকে। চারপাশে ঝিঁঝিঁ পোকারা ডেকে ওঠে। ভয়ে অরুণিমার হাত-পা অবশ হয়ে আসে। অরুণিমা চিৎকার করে কাউকে ডাকতে চায়। কিন্তু তার কণ্ঠ চিরে শব্দ বের হয় না।
অরুণিমা পেছন ফিরে তাকায় না। প্রাণপণে সে দৌড়াতে থাকে, নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে আসে। আর বেশি দূর নয়, আর কিছু দৌড়ালেই বড় রাস্তায় উঠে যাবে সে। অরুণিমা দৌড়ায় শরীরের সর্বশক্তি নিয়ে, তার তখন মনে হতে থাকে মিশমিশে কালোরঙের জলদানো তার পেছনে দৌড়াচ্ছে, এক থাবাতেই তাকে তুলে নিয়ে যাবে। অরুণিমা তার পায়ের শব্দ শুনতে পাচ্ছে, ভয়ে সে চোখ বন্ধ করে ফেলে।
তখনই তাকে সামনের দিক থেকে দুহাতে ধরে ফেলে কেউ। অরুণিমা চোখ খোলে না,তার মনে হতে থাকে জলদেওটা তাকে জাপটে ধরেছে। তার কবল থেকে মুক্তি পেতে হাত-পা ছুড়তে থাকে অরুণিমা, তার কণ্ঠ চিরে এক ভয়ার্ত গোঙানির শব্দ বের হতে থাকে। জ্ঞান হারিয়ে ফেলে অরুণিমা। সুদীপ্তর কোলেই লুটিয়ে পড়ে সে।
সুদীপ্ত পালিয়ে বেড়াচ্ছিল অরুণিমার কাছ থেকে এবং সেটা তার মানসিক বৈকল্যজনিত সমস্যা। অরুণিমা তার তল খুঁজে পায় না। সুদীপ্তর সঙ্গে স্বাভাবিক সম্পর্ক হারিয়ে গেছে, ওটা ফিরে পেতে চায় সে-ও।
সুদীপ্ত যদিও অরুণিমা থেকে পালিয়ে বেড়াচ্ছিল কিন্তু তার চোখ দুটো সারাক্ষণ তাকে পাহারা দিয়ে রাখে। এ তার এক অদ্ভুত মানসিকতা। আজও যখন সে অন্যদের সঙ্গে ডরমিটরিতে ফিরছিল, আড়চোখে সে অরুণিমাকে লক্ষ্য করছিল। ঘরে ফিরে পর্দার পেছনে দাঁড়িয়ে একপর্যায়ে তাকে দিঘির রাস্তা ধরে একা একা যেতে দেখে। প্রথম তার কাছে খুব রহস্যজনক মনে হয়। এর আগে কখনও তাকে ওদিকে যেতে দেখেনি সুদীপ্ত। কেন যেন তার এ কথা মনে হয়, প্রিন্সের ঘটনায় মানসিকভাবে বিপর্যস্ত অরুণিমা। অরুণিমা কী এই জনমানবহীন সন্ধ্যায় দিঘির জলে ডুবে মরতে চলল! তখন তার এমনও মনে হয়, হতে পারে কথা প্রসঙ্গে তাকে দেওয়া বিয়ের প্রস্তাবের জবাব না দেওয়াকে সে তার আত্মসম্মানে লাগে ভেবেছে, আর সেজন্যই সে আত্মহননের পথে চলেছে।
সুদীপ্তর নিজেকেই তখন অপরাধী মনে হতে থাকে। অরুণিমার জন্যও মনের কোথাও এক অদ্ভুত দহনে পুড়তে থাকে। সুদীপ্ত তার অদ্ভুত খেয়ালের খোলস ভেঙে বেরিয়ে আসে। অরুণিমাকে বাঁচাতে সে ত্রস্ত পায়ে ছুটতে থাকে।
দিঘির রাস্তা থেকে ডরমিটরির পুরো পথটা সুদীপ্ত পাঁজাকোলা করে নিয়ে এলো অরুণিমাকে। এরই মধ্যে অন্যান্য সহকর্মীরাও ছুটে এসেছে। চোখেমুখে জলের ছিটা দিল, বাতাস করল তারা। জ্ঞান ফিরলে চারপাশে ঘিরে থাকা সহকর্মীদের দেখে কিছুটা সময় বেভোলার মতো তাকিয়ে থাকে। তারপর ধীরে ধীরে তার সবকথা মনে পড়তে থাকে। তখন কিছুটা লজ্জামিশ্রিত কণ্ঠে বলে, আমি ভয় পেয়েছিলাম।
তখন সব দোষ গিয়ে পড়ে আলফ্রেডের ওপর। আলফ্রেডই তাকে দিঘিতে যাওয়ার জন্য প্ররোচিত করেছে।
আলফ্রেড সবার এধরনের অভিযোগের মধ্যে পড়ে ম্রিয়মাণ হয়ে যায়।
অরুণিমা ততক্ষণে উঠে বসেছে। আলফ্রেড তার সামনেই ছিল। হাত বাড়িয়ে আলফ্রেডের দুহাত নিজের হাতে নিয়ে বলল, না না, ওর কোনো দোষ নেই। ও তো আমার সঙ্গে যেতেই চেয়েছিল।
আলফ্রেডের বিব্রত ভাবটা কাটানোর জন্য একটু বাড়িয়েই বলল, তোমাকে আমি ছোটভাইয়ের মতোই দেখি। তুমি আমার ছোট ভাই। তোমার কথায় দিঘির পাড়ে গিয়েছি। ওটা অনেক সুন্দর জায়গা তবে ভয়ানক সুন্দর।
অরুণিমা বলল, আচ্ছা, ওখান থেকে আমি এখানে এলাম কী করে ?
সবাই বলল, সুদীপ্তই তো নিয়ে এল ?
কিন্তু সুদীপ্তকে সেখানে আর দেখা যায় না।
সে রাতে সুদীপ্তর সঙ্গে আর দেখা হয় না অরুণিমার। পরদিন সাপ্তাহিক ছুটির দিন। ডরমিটরি ছেড়ে সবাই যে যার মতো বাইরে চলে গেছে। কেউ গেছে শহরে আত্মীয়-স্বজনের সঙ্গে দেখা করতে আবার কেউ কেউ দল বেঁধে সিনেমা দেখতে। আজ বিকেল পর্যন্তও দেখা হলো না সুদীপ্তর সঙ্গে। কাল সারারাত, আজকের সারাটা দিন তার কেবলই সুদীপ্তর মুখটা মনে পড়েছে। তার একটু একটু আবছায়া মনে পড়তে থাকে, জলদানো তাকে জাপটে ধরেছে, তারপর তার আর কিছু মনে নেই। তাকে কী সুদীপ্তই জাপটে ধরেছিল ? তার কাছে মনে হয়েছিল, জাপটে ধরা। হয়তো সেটা জাপটে ধরা ছিল না, হয়তো তাকে আগলে নিয়েছিল।
দুই
তারপর পুরোটা পথ তাহলে সে-ই তাকে কোলে উঠিয়ে নিয়ে এসেছিল। যখনই ভাবনাটা ঘুরেফিরে মনে আসে তখন লজ্জা তাকে আড়ষ্ট করে। এক ভিন্ন রকমের অনুভূতিতে শরীর-মন ছেঁয়ে যায়। তাকে একবার খুব দেখতে ইচ্ছে করছে।
প্রায় শূন্য ডরমিটরির সিঁড়ি ভেঙে দোতলায় সুদীপ্তর দরজার সামনে এসে দাঁড়ায় অরুণিমা। আজ তার পোশাকে কিঞ্চিৎ পরিবর্তন হয়েছে। সালোয়ার কামিজের জায়গা নিয়েছে নরম সিল্কের শাড়ি। অফ-হোয়াইট জমিনে লাল বুটি তোলা প্রিন্ট। লাল রঙের ব্লাউজ। তার শ্যামলা রঙের সঙ্গে দারুণ মানিয়ে গেছে।
দরজায় মৃদু টোকা দেয় অরুণিমা।
দরজা খুলে দাঁড়ায় সুদীপ্ত। তাকে কিছুটা উদভ্রান্ত দেখায়। সুদীপ্ত তাকে আহবান করার আগেই ভেতরে ঢুকে পড়ে অরুণিমা। নিজেই দরজার সিটকিনি লাগিয়ে সুদীপ্তর মুখোমুখি দাঁড়ায়।
সুদীপ্তর দুই হাত নিজের হাতে নিয়ে রুদ্ধশ্বাসে বলতে থাকে, নিজেকে তুমি কী ভাব ? আমি কি কিছুই বুঝি না ? আমাকে কেন বাঁচাতে গেলে ? আমি ভয়ে মরে যেতাম ওই অন্ধকার রাস্তায়। কার কী এসে যেত আমি মরে গেলে ? আমি মরে যেতাম, মরেই যেতাম।… কান্নায় ভেঙে পড়ে অরুণিমা।
বিহ্বল সুদীপ্ত কী করবে হঠাৎ করে বুঝে উঠতে পারে না। সে অরুণিমাকে নিজের বুকের সঙ্গে আগলে রাখে। তার পিঠে হাত রেখে এক আশ্চর্য সম্মোহনী কণ্ঠে বলে, অরু, প্লিজ!
অরুণিমা যেন নিজের কানকে বিশ্বাস করতে পারছে না। এ যে ভালোবাসার ডাক। এই ডাককে অগ্রাহ্য করার শক্তি তার নেই, কোনও মেয়ের পক্ষেই সম্ভব নয়।
অরুণিমার কী হলো, সে নিজেই বুঝতে পারছে না। আবেগে ভালোবাসায় সে সুদীপ্তকে জড়িয়ে ধরে। সুদীপ্তরই বা কী হলো! তার চোরা মনটায় এতদিন দোল খাওয়া আলো-আঁধারির খেলাটা জেগে উঠেছে।
যখন তারা পৃথিবীতে প্রত্যাবর্তন করে তখন পৃথিবীর রং গাঢ় অন্ধকারে ভরে গেছে। ডরমিটরির সিঁড়ি থেকে পায়ের আওয়াজ ভেসে আসছে। দরজার সিটকিনি খোলার আগে অরুণিমা সুদীপ্তর বুকে চুমু খেয়ে কেবল বলল, দীপ, আমি তোমাকে ভালোবাসি।
জবাবে তার ঠোঁটে ঠোঁট রেখে বলল সুদীপ্ত, অরু!
সেদিন এক আশ্চর্য সন্ধ্যা এসেছিল তাদের জীবনে। ভালোবাসা নামক এক অদ্ভুত মায়া তাদের জীবনকে বেঁধে দিল।
ভালোবাসা বোধ হয় প্রবল নেশা, সেই নেশার মধ্যেই তারা স্বপ্ন সাজায়। কিন্তু তারপরও সুদীপ্তর হৃদয়ের কোথাও সূক্ষ্ম রেখার মতো একটি দাগ রয়ে যায়, তার মনে হলো, সে ভুল করেছে, তাকে আরও সতর্ক হওয়া উচিত ছিল।
ডরমিটরির জীবন শেষ হবে দুই মাস পর। তারপর তারা নতুন জীবন শুরু করবে, সংসার সাজাবে। নতুন সংসারের জন্য কিছু টুকিটাকি জিনিসপত্র তারা কিনতে থাকে। কখনও কখনও এমন হয়, দুজনই একই জিনিস কিনে নিয়ে এসেছে। তখন দুজনের চিন্তার সমান্তরালে তারা দীর্ঘ চুম্বন উপহার বিনিময় করে। অরুণিমা তার পরিবারের একটা মৌন সম্মতি আগাম পেয়ে গেছে। সহকর্মীদের অনেকেই এখন জানে, সুদীপ্ত-অরুণিমার বাসররাত আর বেশি দূরে নেই। আলফ্রেডের আনন্দটা একটু ভিন্নরকম। সে না চাইতেই একটা দিদি পেয়ে গেছে। মাঝেমধ্যে সুদীপ্তকে বিব্রত করার জন্য সবার সামনেই ডেকে বসে, জামাইবাবু।
বাড়িতে বিয়ের কথা বলার সময় সুদীপ্ত অবশ্য বাধার মুখে পড়ে। পিতামহের পছন্দের পাত্রী আছে, তিনি কোনও ছাড় দিতে রাজি নয়। তার বাবা, কাকু, জেঠু, মেসো, খুড়ো সব একদল হয়ে ঠাকুরদার পক্ষে দাঁড়ান। নারীর ক্ষমতায়ন তখনও শুরু হয়নি, ফলে সংশ্লিষ্ট নারীসকল মাথাগুঁজে থাকেন। কিন্তু একজন বিদ্রোহ করেন। তিনি সুজাতা, সুদীপ্তর মা। সুজাতা যেদিন এই পরিবারে বউ হয়ে এলেন, সেদিন থেকেই তিনি শ্বশুর মহাশয়ের কলিজার কোথাও জায়গা করে নিয়েছিলেন। কারণ তার নামটাই কেবল সুজাতা নয়, প্রকৃত অর্থেই তিনি সুজাতা। তিনি সুশীলা, সুলক্ষণা। তারপর সুখে-দুঃখে ভালো-মন্দে দীর্ঘদিন এই সংসারের জালে নিজেকে জড়িয়ে রেখেছেন কিন্তু শ্বশুর মশায়ের প্রতি শ্রদ্ধাভক্তির এতটুকু কমতি হতে দেয়নি। আজ নিজের সন্তানের প্রশ্ন যখন এসেছে, তখন ঘুরে দাঁড়িয়েছেন। সংসারের অন্য নারীরা তার দুঃসাহস দেখে অবাক হয়ে যায়। তাদের বুক দুরুদুরু কাঁপে।
এক সপ্তাহ অচলাবস্থা চলল, তারপর বুড়ো সুজাতাকে ডাকলেন। সবার ভয় আর উৎসুক্যের মধ্যে সুজাতা বিনা অস্ত্রে সামনে গিয়ে দাঁড়ালেন।
শ্বশুর মশায় বললেন, তোর ছেলে, তোর অধিকার আগে। আমার কথার ওপর কেউ কোনওদিন কথা বলেনি, কিন্তু তোর কথা ভিন্ন। তুই আমার মা, মা লক্ষ্মী। তোর ইচ্ছার বিরুদ্ধে আমি কথা বলব না।
অচলাবস্থা কেটে গেল।
বিয়ের আয়োজনের কমতি ছিল না। আলফ্রেডরা এলো দলবেঁধে। আলোকসজ্জা ছিল চোখে পড়ার মতো।
বিবাহে আমন্ত্রিত ছিল না প্রিন্স। কিন্তু নির্লজ্জের মতো সে এল। পারিবারিক বন্ধুর মতো অভ্যাগতদের সঙ্গে আহার গ্রহণ করল।
চলে যাওয়ার আগে সুদীপ্তর বন্ধু পরিচয়ে ঠাকুরদার কানে কানে অরুণিমার প্রথম বিবাহের কথাটা বলে গেল। একথাও বলল, সুদীপ্ত স্টুপিড, সে জেনেশুনেই বিয়েটা করছে।
অরুণিমার প্রথম বিবাহের সংবাদটি স্বজনদের কাছে গোপন করেছিল সুদীপ্ত কিন্তু তার মায়ের কাছে গোপনে কথাটা বলেছিল। সবার বিরোধিতার মুখে মা সত্য কথাটা আর প্রকাশ করেননি। তাতে সমস্যা বাড়ত বই কমত না। হয়তো বিয়েটাই হতো না। তারপরও তিনি তাঁর জেদ নিয়ে একাই নীরবে লড়লেন।
কিন্তু বিয়ের আসরে প্রিন্সের বলে যাওয়া কথাটায় ঠাকুরদা যারপরনাই দুঃখ পেলেন। নিজের ছেলের কানে কানে বললেন। কিন্তু কোনো শব্দ করতে নিষেধ করে দেন। নির্বিঘ্ন ছিল সবকিছু। লগ্ন ধরে মন্ত্র পাঠ করলেন পুরোহিত। সাত পাক ঘুরল দুজন। দুজনের স্বপ্নভরা চোখমুখ।
বিয়ের আসর থেকে বরপক্ষের অতিথিরা চলে যাওয়ার পর বরকনেকে ঘিরে কন্যাপক্ষের মেয়েরা নানা খুনসুটিতে মেতে ওঠে। পরিচয় পর্বও চলতে থাকে। কিন্তু অরুণিমার ছোটবোনরা তাদের বড়সড় ছেলেমেয়ে আর বয়স্ক অবয়ব নিয়ে নিজেদের পরিচয় দিয়ে যখন ঠাট্টা-মশকরা করতে থাকে, তখন সুদীপ্তর মেজাজ গরম হয়ে যায়।
বাসর রাতটা তাদের কেটে গেল দীর্ঘ নিঃশ্বাস আর অশ্রু বিসর্জনে, পাশাপাশি বালিশে শুয়েও যেন তারা যোজন দূরের বাসিন্দা। হঠাৎ কী হলো সুদীপ্তর, অরুণিমা তার কারণ খুঁজে পায় না। তার মান ভাঙাতে কত মেকি ছল করে, তাকে কাছে পাওয়ার ব্যাকুল আহ্বান বারবার ব্যর্থ হয়ে ফিরে আসে।
কিন্তু থেমে থাকে না পৃথিবীর হাওয়া, সূর্য ওঠা, সূর্য ডোবা কিংবা চাঁদের জোছনা। সুদীপ্ত-অরুণিমার জীবনও থেমে থাকে না। সুদীপ্ত কাফনের মতো একটা সাদা চাদরে ঢেকে তার জীবনের ভুলটাকে চাপা দিয়ে রাখে। অরুণিমাও সেটা কোনওদিন জানতে পারেনি।
জীবন বয়ে চলে। প্রতিদিন তারা নিয়ম করে অফিস করে, নিয়ম করে ঘরে ফেরে। জীবন বহমান থাকে, তাদেরও বাচ্চা হয়, তারা বড় হয়। বাচ্চারা তাদের ভালোবাসে, তারাও বাচ্চাদের ভালোবাসে।
একদিন নিয়ম ভঙ্গ হলো। নিয়ম করে অফিসে যাওয়ার দিন ফুরিয়ে গেল সুদীপ্ত-অরুণিমার। তাদের মনে হলো, ব্যর্থ জীবনটা নিয়ে তারা ঘরে ফিরে এসেছেন। কিন্তু ঘর কোথায়! এতদিন অফিসই তাদের ঘর ছিল। সারাদিন স্টেক-হোল্ডারদের স্বার্থরক্ষা আর সেবা-পরিষেবার মধ্য দিয়ে পার হয়ে যেত। কাজ শেষে ক্লান্ত হয়ে যখন তারা ঘরে ফিরত তখন সেটা বরফকলের উৎপাদন ফ্লোর। আর এখন ঘর ভেবে ফিরে এল যেখানে, সেটা হয়ে উঠেছে কুরুক্ষেত্র। আগে কুরক্ষেত্রে যোদ্ধা অনুপস্থিত ছিল, লড়াই ছিল না। এখন তারা কুরুক্ষেত্রে ফিরেছে, যুদ্ধ অবশ্যম্ভাবী হয়ে উঠেছে। মনের ভেতর লুকনো-চাপানো কষ্টগুলো প্রবল পরাক্রমে লাফিয়ে উঠেছে। আগে কখনও কখনও শীত-বসন্তে শরীর জাগলেও প্রতিনিয়ত অচর্চায় তা ম্রিয়মাণ হয়ে গেছে কবে, জানেই না তারা। দুঃখ অথবা ক্ষোভ প্রকাশের জন্য হাত-পা ব্যবহার তারা করেনি, কখনও না, কষ্টকে জমা রাখার জন্য হয়ত কোনও অতল সমুদ্র রয়েছে বুকের কোথাও। এখন কুরুক্ষেত্রে যা সচল হয়েছে তা কেবল জিহ্বার সঞ্চালন।
অরুণিমার মনে হয়, তার জীবনটা ব্যর্থ হয়ে গেছে, ভরে আছে শূন্য হাহাকারে। মাঝেমধ্যে স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের বন্ধুদের সঙ্গে দেখা হতো, তারা তাকে আহ্লাদ করে বলত, বেশ তো আছিস সুন্দর বর নিয়ে।
গালভরা হাসি দেখাতে কৃপণতা করত না অরুণিমা। তারা ভেবেই বসত পৃথিবীর সবচেয়ে সুখী মেয়েটির নাম অরুণিমা। অরুণিমা ভাবত, পৃথিবীর সবচেয়ে বড় ঠাট্টাটা তাকে ঘিরে আছে।
এতদিন ঠাট্টাকে সঙ্গী করে জীবনের বিশাল পথ পাড়ি দিয়ে এসেছে অরুণিমা। কুরুক্ষেত্রে পা রেখে তার মন বিদ্রোহী হয়ে উঠেছে। এতদিন পর তার মনে হলো জীবন এভাবে চলে না। না, লোক হাসাবার মতো কোনো কাজ সে করবে না। তবে সুদীপ্তর দম্ভ, অহংকারকে সে আছাড় মেরে চূর্ণবিচূর্ণ করে দিতে চায়।
সুদীপ্তর অহংকারে আঘাত করার আগে অরুণিমা নিজেই বোকার মতো একটা সমস্যা তৈরি করে ফেললেন। এবং সেটাই তাদের কুরুক্ষেত্রে লড়াইয়ের সূচনা করে দিল।
অরুণিমা তার স্বল্প পরিচিত এক ব্যবসায়ী বন্ধুকে তাদের দুজনের যৌথ অ্যাকাউন্টে জমানো সব টাকা ধার দিয়ে দিলেন। সে সব টাকা মেরে পালিয়ে গেল।
সুদীপ্ত জানতে চাইলে অরুণিমা বলল, আমার টাকা, আমি যা খুশি, আমি করব।
অরুণিমার এই ভাষার সঙ্গে পরিচিত নয় সুদীপ্ত। সুদীপ্ত বললেন, তোমার মাথা খারাপ হয়ে গেছে।
হ্যাঁ তাই। মাথা খারাপের সঙ্গে তোমাকে থাকতে কে বলেছে ?
ল্যাঙ্গুয়েজ ঠিক করে কথা বল।
কীসের ল্যাঙ্গুয়েজ! তোমার সঙ্গে ? তোমার মতো একটা বদমাশকে বিয়ে করে আমি কী পেয়েছি। আমার সর্বনাশ করেছ তুমি। তারপর সারাজীবন অপমান আর অবহেলা। একটা চাষা-মূর্খের পরিবার।
সুদীপ্ত চিৎকার করে বলেন, বেয়াদপের মতো কথা বোলো না।
―তুই বেয়াদব, তোর বাপ বেয়াদব, তোর মা বেয়াদব।
সুদীপ্তর মনে হলো এবার সীমা লঙ্ঘন করছে অরুণিমা। অরুণিমা সুদীপ্তর টাকাকেও সে নিজের টাকা বলছে। তার নিজের জীবনের যা কিছু উপার্জন, সব সে অরুণিমার হতে তুলে দিয়েছিল। কোনওদিন জানতেও চায়নি, কোথায় খরচ হচ্ছে তার উপার্জিত অর্থ।
সুদীপ্ত খুব অবাক হয়ে যাচ্ছে, অরুণিমাকে সে কখনও এমন দেখেনি। টাকা হারিয়ে সত্যি কী তার মাথা খারাপ হয়ে গেছে ? না কি নিজের ভুলের বৈধতা দেবার জন্য তার ওপর চড়াও হচ্ছে! কিন্তু এই কী তার ভাষা! এতটুকু সম্মান, এতটুকু মর্যাদা দিয়ে সে কথা বলছে না!
সুদীপ্ত ঝগড়া এড়াতে দরজা বন্ধ করেন। তখন অরুণিমার স্বগত সংলাপ শোনা যায়, তীক্ষ্ম, তাতে যুক্ত হয় ভারী কান্না। অরুণিমা বলতে থাকেন, বাসর রাত থেকে শুরু করে আজকের দিনটি পর্যন্ত অপমান, অবহেলায় তুই আমার জীবনটাকে নরক বানিয়ে দিয়েছিস। কী আমার অপরাধ ছিল ? তোকে কে বলেছে আমাকে দয়া দেখাতে ? সম্মান যখন করতেই পারবি না কে বলেছে তোকে বিয়ে করতে ? আমি কী তোর দয়া চেয়েছি, বলেছি, আয় আমাকে বিয়ে কর। তোর মতো ফালতু লোকের আমার দরকার নেই, মর তুই।
এভাবেই একই বিষয়ের পুনরাবৃত্তি চলছে। চলছে সুদীপ্তর মৃত্যুকামনা।
কখনও অরুণিমা এমন ভাষায় কথা বলতে পারে এমনটা কল্পনায় ছিল না। তার মাকেও সে অপমান করেছে। অথচ এই মাই তার নিজের ছেলেকে বিয়ের অনুমতি দিয়েছেন, পরিবারের সবার বিরুদ্ধে একা লড়েছেন। তিনিই তাকে তার অনিশ্চিত জীবন থেকে মর্যাদার জীবনে প্রতিষ্ঠিত করেছেন।
আজ জলসিক্ত চোখে বহুবছর পর কাফনের মতো সাদা চাদরটা হাতে তুলে নেন সুদীপ্ত। তার ভেতরে একটা কিম্ভুত পশু জেগে ওঠে। মনে মনে তিনি জোর করে অরুণিমার সিঁথির সিঁদুর মুছে দিলেন, অরুণিমাকে পরিত্যাগ করলেন।
কিন্তু সহসা তার চোখের সামনে বাচ্চাদের করুণ মুখগুলো ভেসে ওঠে। গতকালই তো তার বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ুয়া মেয়েটা একটা ছেলেকে সঙ্গে নিয়ে এসেছে, তার সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিয়েছে।
বন্ধ দরজার ভেতরে বসে সুদীপ্তর মনে হয় অরুণিমার সিঁথির রঙ গড়িয়ে পড়ছে মেঝেতে আর তার সঙ্গে মিশে যাচ্ছে তার হৃদয় থেকে ঝরে পড়া রক্তস্রোত।
সচিত্রকরণ : ধ্রুব এষ



