আর্কাইভগল্প

গল্প : কালাক্ষর : সারওয়াৎ জাবীন লুবনা

খস-খস-খস!

‘আমাকে নিয়ে লেখো! ভালো কাটতি হবে!’

অন্ধকারে টেবিল ল্যাম্পের হালকা আলোয় তাকিয়ে আমি হতভম্ব! কী সব লিখছি এসব ? ঘুমের ঘোরে দেখছি না তো সব ?

আবছায়া আলোয় রুলটানা খাতার লাইনগুলোর দিকে অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকি। কপার রাঙা এন্টিক কলমটা খাতাটার একপাশে পড়েছিল! কালি নেই অথচ আমার আঙুলগুলো নিয়ে কলমটাই যেন কী অদ্ভুত দুলে দুলে টেনে টেনে লিখে চলেছে! হাতটা সরিয়ে দুহাতে চোখ দুটো ভালো করে ডলে নিই। মাথার উপর লাইটটাও জ্বালিয়ে দিই। স্পষ্ট আলোয় দেখলাম কলমটা একা একাই লিখে চলেছে, ‘বোঝোনি ? আমি বাজ, তোমার দক্ষ কলম, ভাবতে পারো ? আমাকে নিয়েই লিখে ফেলো না! ভালো একটা ফিকশন হবে!’

আমি সিহান রাব্বি, ছোটখাটো একজন লেখক। সেদিনই পত্রিকা অফিসে কথা দিয়ে এসেছি তিন-চার দিনের মধ্যে ফিকশনের একটা গল্প লিখে দেব। অথচ গত কয়েকদিন ধরে কিছুই বেরুল না! আজ হঠাৎ অন্ধকার ঘরে নিজের অজান্তেই ঘুম ঘুম চোখে এসব দেখে কিছুক্ষণ অবাক হয়ে তাকিয়ে রইলাম। এসবের মানেটা কী ? হচ্ছেটা কী আসলে ?

গেল রবিবার ‘কি ওয়েস্টে’ এ ‘আর্নেস্ট হেমিংওয়ে মিউজিয়াম’-এ ছোটখাটো একটা লেখক সম্মেলনে যাচ্ছিলাম। তাড়াহুড়ায় লেখালেখির আসল ফাইলটা ফেলেই রওনা দিয়ে দিয়েছিলাম। যার জন্য পথে ‘কি লার্গো’-তে গাড়ি থামালাম। একটা কলম আর একটা নোট প্যাড নিয়ে নিতে চাচ্ছিলাম। ওখানে এন্টিক টুরিস্ট যে দোকানটা ছিল, ওটাতে ঢুকেই ভীষণ থমকে গেলাম। কী অদ্ভুত সুন্দর এন্টিক সব জিনিস দিয়ে সাজানো সম্পূর্ণ দোকানটা! দোকানটার এনটিক মরচে মরচে ব্যাপারটা মুহূর্তেই আচ্ছন্ন করে ফেলল আমাকে! সবার প্রথমে এক কোনায় ঝুলানো এই লালচে কপার কলমটাতেই চোখ আটকে গিয়েছিল! লম্বা চৌকো অদ্ভুত সুন্দর দেখতে আকর্ষণীয় একটা কলম, যেন ইশারায় আমাকে ডেকে চলেছে, ‘আয়! আয়!’

দোকানি লোকটা প্রথমেই আমাকে নিরুৎসাহিত করার চেষ্টা করল, ‘ভাই, এটায় কিন্তু কোনও কালি নাই। শুধু সাজিয়ে রাখতে পারবেন।’

আমি তো আবার শৌখিন লেখক, আমার খুবই ভালো লেগে গিয়েছিল। বললাম, ‘দিয়ে দেন। অসুবিধা নাই, আমি নিয়ে নিচ্ছি। কত দিতে হবে বলেন ? আমি কালির ব্যবস্থা করে নেব।’

লোকটা একটু বোকা হয়ে গেল, ‘ভাই, এটা আমার ভাইয়ের দোকান। ঠিক মনে করতে পারছি না তবে আমার ভাই সম্ভবত কিছু একটা বলে গিয়েছিল কলমটার ব্যাপারে, এখন মনে করতে পারছি না। এটাই নেবেন ?’

আমি হ্যাঁ-সূচক মাথা নাড়ি। খুব সস্তাতেই কলমটা কিনে চলে এসেছিলাম।

আমি লেখক মানুষ। যেকোনও ধরনের কলমের সঙ্গে আমার আজীবন প্রেম। থাকি সাগর পাড়ের পেনিনসুলা মায়ামিতে। ঘুরে বেড়াই পোর্ট থেকে পোর্টে, থেমে থাকা ছোট ছোট জাহাজ বা ক্রজগুলোয় দ্বীপ দ্বীপান্তরে। আজ বাহামা, কাল কিউবা আর তারও পর হাইতি, জামাইকা ইত্যাদি ইত্যাদি আশেপাশের দ্বীপের পরে দ্বীপে। লেখালিখি তাই সবসময় সাগরের উত্তাল ফেনিল ঢেউ সঙ্গী করে হয় ঢেউ ছোঁয়া দমকা আবহাওয়াতেই। হাজারটা কলম থাকলেও যেকোনও দোকানে ঢুকে সেই কোনও না কোনও একটা কলমই তুলে নিই। যা হোক তাড়াহুড়োয় সেদিনও তাই করেছিলাম।

সেমিনার শেষে ফিরে এসেছি কবেই। ব্যাচেলার মানুষ। ঘরের কানি কাঞ্চি এখানে ওখানে হাজারটা কলম  সবসময় পড়েই থাকে। গুছানোর সময়ও মেলে না, শুধু যুথিকা বেড়াতে আসলে একটু-আকটু গুছিয়ে দিয়ে যায়। আজও রাতের খাওয়া শেষে ঘুমিয়ে পড়েছিলাম প্রতিদিনকার মতোই। মনের ভেতর একটা জিদ ঘুরছিল, একটা কিছু ফিকশন লিখতে হবে, লিখবই! ঘুমের মাঝেই কখন কলমটা বের করে এনেছি নতুন মোড়ক খুলে! কখনই বা কলমটা এভাবে লেখা শুরু করেছে, তা-ও এই অদ্ভুত কয়েকটা লাইন! বুঝতেই পারলাম না। শুধু কেমন একটা অস্বস্তিকর অনুভূতি জেঁকে বসল!

‘আমাকে নিয়ে লেখো! ভালো কাটতি হবে!’

কেউ নিজের চোখে না দেখলে ঠিক বিশ্বাসই করবে না যে এভাবে একটা জড় কলম লেখার শক্তি পেয়ে টানা লিখে যেতে পারে! কলমটা কাকে নিয়ে লিখতে চাচ্ছে ? কি চিন্তা করে লিখছে ? কথাগুলোর মানেটাই বা কী ? তাছাড়া কলমটিতে তো এখনও কোনও কালির ব্যবস্থা করা হয়নি। বুঝে না-বুঝে আবার ঘুমিয়ে পড়লাম। এভাবেই শুরু হলো নতুন কলমটিকে নিয়ে আমার প্রথম দিনের প্রথম অসচেতন কার্যকলাপ।

পরের দিন বাসে ওয়েস্ট ‘পাম বিচ’-এ যাচ্ছিলাম। লেখক বিধায় খাতা-কলম আমার সারাক্ষণেরই সঙ্গী। হঠাৎ আবারও বাসের মধ্যেই যেন নিজের মনের জোরের বিরুদ্ধে আবারও লিখতে লাগলাম, ‘বাস ড্রাইভার বদ্ধ মাতাল অবস্থায় গাড়ি চালাচ্ছে। এক্ষুনি বাস উল্টাবে! পারলে নেমে যাওয়াই ভালো!’

চমকে ড্রাইভারের দিকে তাকিয়ে ভড়কে গেলাম। ড্রাইভার বেটা সত্যি সত্যি প্রায় দুচোখ বন্ধ করে নেশায় বুদ হয়ে ঝুঁকে ঝুঁকেই গাড়ি চালাচ্ছে। চিৎকার করে গাড়ি থামালাম, নেমেও গেলাম। আর অবাক ব্যাপার রাতে টিভিতে ঠিকই খবর পেলাম বাসটার এক্সিডেন্টের কথা। নিজের অতিপ্রাকৃত শক্তিতে নিজেই খুব অস্থির হয়ে উঠলাম।

তারও পরের দিন সন্ধ্যায় আগে থেকেই কথা ছিল ডাউনটাউনে বিচ কনসার্টে যাওয়ার। দুপুরের পর ওদিকটায় চলে গেলাম। এই সুযোগে খাতা কলমও নিয়ে গেলাম। বরাবরের মতো আটলান্টিকের ধার ছুঁয়ে শ্বেত বালুকণায় খাতা কলম নিয়ে বসে গেলাম, সে রাতের গেঞ্জাম ভুলে কিছু যদি বেরোয়। অন্যান্য দিনের তুলনায় অপেক্ষাকৃত শান্ত হয়ে আছে আজ আটলান্টিক। ঢেউগুলোরও কোনও বৈচিত্র্য নেই, একইভাবে উঠছে আর নামছে। দু-একটা সিগাল আর শান্ত লম্বা পায়ের সাদা বক শুধু এদিক-সেদিক উড়ছে আর পানিতে মাছ ঠুকরে বেড়াচ্ছে। আগের রাতে ঘুম ভেঙে গিয়েছিল, ঠিকভাবে ঘুম হয়নি। সেজন্য ঠাণ্ডা বাতাসে লিখতে শুরুর আগেই একটু একটু ঝিমিয়েও পড়ছিলাম। হঠাৎ সেই একই ধরনের ঘটনা! আমি লিখছি না আমার সেই চৌকো কলম লিখছে বুঝতে পারি না! ভালো করে তাকিয়ে দেখলাম সাগর পাড়ে আমি আপন মনে বসেই আছি, আর কলমটা লিখেই চলেছে, ‘আমি প্রকৃতির প্রেমিক। বার বার প্রকৃতি আমাকে ফিরিয়ে দেয়। আজও হয়তো দেবে। সামনে সাগর ফুঁড়ে ওটা কি উঠে আসছে বুঝতে পারছি না! কী প্রাণী ওটা ? হাঙরও না, ডলফিনও না!  কী ভীষণ আজব আকৃতির একটা বিশাল প্রাণী! আশেপশের সব দৌড়ে পালাচ্ছে। আমি পাথর হয়ে জমে বসে আছি। হঠাৎ মনে হলো ওটা আমাকেই লক্ষ্য করে আসছে!’

এটুকু পড়েই থমকে গেলাম আমি। সামনের শান্ত আটলান্টিকের বিশ-ত্রিশ ফুট ফুঁড়ে ফুলেফেঁপে ওঠা উঁচু ঢেউ ছাপিয়ে হঠাৎ সত্যি সত্যিই প্রাণীর মতো কি যেন একটা এগিয়ে আসছে আমার দিকেই! সবাই এদিক-সেদিক দৌড়াচ্ছে। আমাকে ছাড়াই আমার অদ্ভুত কলম একা একাই লিখে চলেছে, খস-খস-খস, ‘আমাকে পালাতে হবে। লেখার চাইতে জীবন জরুরি!’

দাঁড়িয়ে গেলাম ! মনে ভীষণ ভয় কাজ করা শুরু করল। কোনওরকমে খাতা-কলম ব্যাগে ঢুকিয়ে দৌড়াতে লাগলাম। হাপাতে হাপাতে পাশের খোলা টুরিস্ট মলে ঢুকে পড়লাম।

ভীত সন্ত্রস্ত হয়ে ভাবতে লাগলাম কীসের পাল্লায় পড়লাম! কনসার্ট ভেনুতে যাব কি যাব না চিন্তা করতে করতে চলেও গেলাম। সেখানে তখনও কেউ আসেনি। শুধু কয়েকজন ছেলে ছোকরা মাইক্রোফোন, স্পিকার, পোস্টার ইত্যাদি সব ঠিকঠাক করছে।

সামনের দিকে বসে চিন্তায় ডুবে গেলাম। কলমটায় কালি ভরলাম না, ঠিক করলাম না অথচ দিব্যি লেখা বের হয়ে হয়ে আসছে। আমি লিখছি না, যেন অন্য কেউ কলমটায় ভর করে লিখছে। আবার যা লেখা হচ্ছে সেসব বাস্তবে ফলেও যাচ্ছে। ভয়ে লোম খাড়া হয়ে গেল আমার!

কলমটা ব্যাগে ঢুকিয়ে ফেললাম। এনরিখ ইগলসিয়াসের গান আমার খুব বেশ প্রিয়, ওরই কনসার্ট। কনসার্ট শুরু হওয়ার পর একের পর এক গান শুনছিলাম। ভালোই লাগছিল তখনকার গানটা, ঝড়সবনড়ফু ষড়াবং ুড়ঁ… (কোনও একজন ভালোবাসে তোমায়)! ’

কিন্তু কিছুক্ষণ পর, আবারও সেই একই বিপত্তি! অবাক হয়ে লক্ষ্য করলাম আবারও কলমের শব্দ হচ্ছে―খস-খস-খস! লেখা শুরু হয়েছে আবারও, আমি গান শোনা বাদ দিয়ে ভয়ে খাতার দিকে তাকিয়ে থাকি দেখার জন্য যে কি পরিস্থিতিতে পড়তে যাচ্ছি এর পরবর্তীসময়ে! কালিবিহীন অবস্থায় লেখা হয়েই যাচ্ছে―হয়েই যাচ্ছে, ‘কোনও একজন ভালোবাসে তোমায়! কিন্তু আমার মালিক তুমি, আমি ভালোবাসি শুধু তোমাকেই, তোমার নিরাপত্তা দেখার দায়িত্বই আমার একমাত্র দায়িত্ব!’

কিছুক্ষণ থেমে আবারও লেখা শুরু, ‘কী আজব! সময়ের আগে কনসার্টে চলে এসেছি। অনেক লোকের আয়োজন। একদম শুরুর সারিতে বসে আমি। হঠাৎ স্টেজের লাইটিংয়ের মাঝে লালচে কুণ্ডলী একটা ধোঁয়া ছড়িয়ে পড়তে লাগল।’

এটুকু পড়তেই অস্বস্তিতে চারপাশে লক্ষ্য করা শুরু করলাম। দেখলাম ঠিকই আশেপাশের লোকজন ‘আগুন’ ‘আগুন’ করে চেচাচ্ছে, প্যানিক হয়ে দৌড়াচ্ছে! কলমটা থেকে যা যা সাবধান করে লেখা বের হচ্ছে, তাই তাই ফলে ফলেও যাচ্ছে। শেষের দিকে একসময় দিগি¦দিক জ্ঞানশূন্য হয়ে আমিও দৌড়াতে লাগলাম!

বাসায় পৌঁছতে না পৌঁছতেই যুথিকার ফোন পেলাম― ‘রাব্বি… ডাক্তারের চেম্বারে বসে আছি। শরীরটা খুব খারাপ লাগছিল, তোমাকে ফোনে পেলাম না! এম্বুলেন্স ডেকে চলে এসেছি হাসপাতালে! তুমি একটু আসতে পারবা ?’

অবাক হই, ‘এত রাতে ? অনেক বড় ব্যাপার ?’

যুথিকা আমার ভালোবাসার মানুষ। আজ কয়েকদিন ধরে কিছুটা অসুস্থ, আজ আবার নিজে নিজে হাসপাতালেও ভর্তি। খুব ক্লান্ত লাগছিল। বললাম, ‘ঠিক আছে কাল সকাল সকালই চলে আসছি। তুমি একটু ঘুমানোর চেষ্টা করো তো প্লিজ।’

ফোনটা রেখে ক্লান্তিতে ঘুমিয়ে পড়লাম। শেষ রাতের দিকে আবার সেই খস-খস শব্দে ঘুম থেকে উঠে বসলাম। লাইট জ্বালিয়ে স্তব্ধ হয়ে গেলাম, ঘুম চোখেই দেখলাম কলমটা দ্রুত অন্ধকারেই একা একা লিখে চলেছে, ‘জীবনটা খুব ছোট। একই জীবনে বার বার সুযোগটা ফিরে ফিরে আসে না। হয়তো আমার জীবনের ভালোবাসার মানুষটার সঙ্গে আমার আর এই জীবনে কখনওই দেখা হবে না, কাল তো হঠাৎ করে সব নাইও হয়ে যেতে পারে। সব উপর ওয়ালারই কারসাজি!’

ভড়কে গেলাম। কেন লিখছে এসব ? যুথিকা তো হাসপাতালে ভর্তি! মনের কোনে মুহূর্তেই ভয় এসে ভর করল। ঝটপট  তৈরি হয়ে গাড়ি নিয়ে রওনা দিয়ে দিলাম জ্যাকসন মেডিকেলের পথে।

রাত সাড়ে তিনটার দিকে যখন হাসপাতালে পৌঁছলাম, তখন যুথিকার শরীরটা খুব বেশিরকম ঠাণ্ডা হয়ে গেছে। ডিউটি ডাক্তার এসে আমাকে জড়িয়ে ধরলেন, ‘তুমি মি. সিহান ?’

আমি বোকার মতো উপর-নিচ মাথা নাড়ালাম। আমাকে সান্তনা দিয়ে বলতে লাগলেন―‘মেয়েটার অবস্থা কাল সন্ধ্যা থেকেই খুব একটা ভালো ছিল না। হার্ট, কিডনি, ফুসফুস―সব একসঙ্গে কাজ করছে-করছে না এমন অবস্থা! আমরা বার বার কাছের লোকজনের যোগাযোগের ঠিকানা চাচ্ছিলাম। আর তিনি বার বারই বলছিল যে তিনি ফোন দিয়েছেন। চলে আসবে।’ আমি যুথিকার ঠাণ্ডা শরীরটার সামনে স্তব্ধ হয়ে বসে রইলাম। ওরা যুথিকার ডিসচার্জের সব কাগজপত্র ঠিকঠাক করে ওর বডিটা কাছাকাছি একটা ফিউনারেল হোমে রাখার ব্যবস্থা করতে লাগল।

মাথাটা আমার ভীষণ ঝিমঝিম করছিল। কলমটা কেনার পরপরই এসব হচ্ছে। দোকানের লোকটা অবশ্য বলছিল যে কলমটার কি একটা ব্যাপার যেন আছে!

প্রাণহীন হয়েও কলমটা কীভাবে যা যা লিখছে তা সব  সত্যি সত্যিই হয়ে হয়েও যাচ্ছে একের পর এক! ইচ্ছা করেই অদ্ভুত এনটিক কলমটা পাশের সাইড টেবিলে ফেলে রেখে যুথিকার ডেড বডির সঙ্গে হাসপাতাল থেকে বেরিয়ে এলাম। আসলে ঐরকম কলম চাই-ই না আর আমার! 

পরের দিন আবার ফোন এল জ্যাকসন মেমোরিয়াল থেকে। ওরা যুথিকার জিনিসগুলো গুছিয়ে রেখেছে। আমাকে তুলে নিতে হবে। ওকিচোবিতে যুথিকার সমাধি শেষে ভীষণ রকম অবসন্ন অবস্থায় বাসায় ফিরে এলাম। এই জীবনে এক আমি ছাড়া আর কেউই ছিল না যুথিকার। গোসল শেষে গরম কফিতে চুমুক দিতে দিতে হঠাৎ মনে হলো আজকের বিয়োগাত্মক দিনটাকে একটা স্ট্যাটাস দিয়ে স্মরণীয় করে রাখা দরকার! ডায়েরি নিয়ে বসলাম। তখনই চোখ আটকে গেল আবার কলমটার উপর। হাসপাতাল থেকে আনা যুথিকার প্যাকেটটার ভেতর থেকে মাথা বের করে যেন তাকিয়ে আছে এদিকটাতেই। ওরা ভুলে ফেলে এসেছি ভেবে একসঙ্গে দিয়ে দিয়েছে! কলমটা যেন মানুষের মতো তাকিয়ে হাসছে আমারই দিকে। ইচ্ছা করেই কলমটা আবার বের করে নিলাম। একটু বুকটা দুরুদুরু করছে ঠিকই। এর পর কী হবে ? কী লেখা বেরুবে কলমটা থেকে… ভয় লাগছে আবার খুব জানতেও ইচ্ছা করছে। কলম হাতে খাতা খুলে বসলাম। আশ্চর্য ব্যাপার! একটা লাইনও লিখতে পারলাম না অথবা কলমটাই লিখল না! প্রায় সারাদিন এটাওটা নানা কাজের ফাঁকে ফাঁকে কলমটা হাতড়াতেই লাগলাম। মনে হলো যেন কলমটায় কেউ একজন ভর করে বসে আছে! আর আমার মনোভাব বুঝতে পেরে সেই একজন আমার সঙ্গে বেশ মজা করে ‘হাইড এন্ড সিক’ খেলে খেলেও যাচ্ছে!

সন্ধ্যার দিকে টালাহাসি থেকে মার ফোন এল! ফোনের শব্দে সঙ্গে সঙ্গেই কলমটা যেন হঠাৎ দাঁড়িয়ে গেল। ফোনটা ধরতে গিয়েও আর ধরলাম না। ফোনটা বাজতে বাজতে থেমে গেল। আর কোনও ঘটনার পুনরাবৃত্তি চাই না। দোতলার জানালা দিয়ে একসময় কলমটা ছুড়ে ফেলে দিলাম নিচে। আবার পরক্ষণেই কী এক অমোঘ টানে নিচে নেমে খোঁজাখুঁজি করে উপরেও নিয়ে এলাম।

শেষ রাতের দিকে আবারও কলমটা লেখা শুরু করল! দিনের আলো অবধি লিখতেই লাগল! আমি যেটা করলাম―অন্ধকারে হাতড়ে-পাতড়ে বাকি রাতটা খাতার কলমের লেখার পৃষ্ঠাগুলো দলা পাঁকিয়ে পাঁকিয়ে লাইটারে আগুন জ্বালিয়ে পুড়িয়ে দিতে লাগলাম। আর কিছু পড়তেই চাই না আমি!

পরের দিন অফিস ছুটির পর হন্তদন্ত হয়ে কি লার্গোর সেই দোকানে গিয়ে হাজির হলাম। সৌভাগ্যক্রমে দোকানের প্রকৃত মালিককে পেয়ে গেলাম। গিয়ে যখন বললাম, ‘আপনার দোকানের কলমটা আমি আর চাই না। কোনও ডলার ফেরত দিতে হবে না। শুধু ফেরতটা নিয়ে নেন।’

লোকটা শীতল হাসি দিয়ে বুক পকেট থেকে একই রকম আর একটা কলম বের করে দেখিয়ে বললেন, ‘এরই আর একটা গত দুই-দুইটা বছর বুক পকেটে বয়ে বেড়াচ্ছি। খুব সম্ভবত মৃত্যু ছাড়া মালিকানা পরিবর্তন হবে না! কলমটা ব্যবহার শুরু করার পর আমার ছোট বোনটা মারা গেছে। মাও গেছে আগুনে পুড়ে। আপনার আশেপাশের সবার জন্য সুসংবাদ না দিলেও… আপনাকে ঠিকই রক্ষা করে রাখবে এটি। তবে আমি জানি না আপনি যে কলমটি ফেরত দিতে এসেছেন, পরবর্তীসময়ে আপনাকে কোন পরিস্থিতিতে পড়তে হয়!’

ফিরে আসতে আসতে লোকটার শেষের কথাগুলো বার বার কানে বাজতে লাগল, ‘বিভিন্ন জাহাজ ডুবিতে উদ্ধার কর্মীদের উদ্ধারকৃত নানা এন্টিক জিনিস পাবেন আমার দোকানে। বারমুডা ট্রায়াংগেলের নাম শুনেছেন নিশ্চয়ই! ঐ ট্রায়াংগেলের একটা কোনা পড়েছে এই ফ্লোরিডাতেই। কলম দুটাও ঐ বারমুডা ট্রায়াংগেলেই ডুবে যাওয়া এক জাহাজের পাগল এক বিজ্ঞানীর! শুধু  এটুকু বলে দিচ্ছি যখন কলম দুটো ওরা নিয়ে এসেছিল, তার মধ্যে তখন ওয়াটার প্রুভড কাগজে কিছু নোট ছিল!’

আমি জিজ্ঞাস্য দৃষ্টিতে তাকাতে দোকানদার রহস্যময় হেসে বললেন, ‘নিজেকে ভালোবাসলে কখনও কলমটি ফেরত বা বিক্রির কথা আর চিন্তা করবেন না প্লিজ! এটা হয়তো কোনও স্বাভাবিক কলম নয়। আর আজকের পর সাবধানে থাকবেন প্লিজ!’

দোকান থেকে বেরিয়ে গাড়ি নিয়েই পাশের বিচে বসে থাকলাম কিছুক্ষণ। যুথিকার কথা খুব মনে হচ্ছিল। আমার পাশে থাকার কেউ নেই! আজ আমার কিছু একটা হয়ে গেলে, কান্না করার মানুষটা পর্যন্ত নেই! এই ছোট্ট একটা কলম! অথচ কী ভীষণ ভাবিয়ে তুলেছে আমাকে!

বাসায় ফেরার সময় এক্সিট ইলেভেন দিয়ে যখন কাটলার বে-র দিকে গাড়িটা বাঁক নিলাম, খেয়াল করলাম জিপি-এসের শব্দ ছাপিয়ে গাড়ির স্পিকারে আবার সেই  লেখার শব্দ―খস্-খস্-খস্! মাথটাও যেন তখনই ধরে গেল, যেন তক্ষুনি বিস্ফোরিত হবে, দৃষ্টি অস্পষ্ট হয়ে আসতে লাগল! একসময় গাড়ির ব্রেক ফেল করে ব্যালেন্স হারিয়ে পাশে চলমান বিশাল ভ্যানগাড়িটার পিছনে খুব স্পিডে গিয়ে লাগিয়ে দিলাম! মনে পড়ে গেল, গত মাসে গাড়ির এয়ার ব্যাগগুলো ঠিক করতে গিয়েও আর ঠিক করা হয়নি! প্রচণ্ড ঝাঁকুনিতে বুকের পাঁজরের কিছু একটা মচ করে যেন ভেঙে গেল! অতল অন্ধকারে তলিয়ে যেতে যেতে দেখলাম গাড়ির ফ্রন্ট গ্লাসে কলমটা আমার ছিটকে যাওয়া রক্ত দিয়েই লিখে চলেছে, ‘ভয়াবহ এক্সিডেন্ট! সব স্ম্যাসড! ড্রাইভার, স্পট ডেড…!’

সচিত্রকরণ : শতাব্দী জাহিদ

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button