
তোর মাথা খারাপ হয়েছে ?
না, আমার মাথা ঠিক আছে, দৃঢ়তার সঙ্গে জবাব দেয় শিবলি।
বড় ভাই কামরুল হোসেনের শরীর মোটাসোটা। মুখ ভরা দাড়ি। থাকে সৌদি আরবের দাম্মামে। শিবলি থাকে রিয়াদে। সঙ্গে ছোটভাই জাফর। দুই শহরের দূরত্ব সাড়ে তিন শত কিলোমিটার। দাম্মাম থেকে বাসে উঠে সাড়ে আট ঘণ্টায় এসেছে কামরুল হোসেন। যদিও বছর তিনেক আগে সৌদি আরবে চাকরি নিয়ে প্রথম আসে বড় ভাই কামরুল হোসেন। আসার এক বছরের মাথায় নিয়ে আসে মেঝো ভাই শিবলিকে, পরের বছর নিয়ে আসে জাফরকে। বাড়িতে থাকে মা আর বোন। বোনের বিয়ে হয়ে গেছে দুই বছর আগে। বরিশাল শহর থেকে সত্তর আশি কিলোমিটার দূরের পথে তিন ভাইয়ের বাড়ি। গ্রাম উজানগাও।
এইটা কোনও কাজ ? আমরা গরিব মানুষÑঅনেক কষ্ট করে সৌদিতে আইছি, দুইটা পয়সার মুখ দেখতেছি তিন ভাই মিলে! আর তুই কইতেছিস, দালান করতে ? জানিস দালান করতে কত টাকা লাগে ? এত কষ্টের টাকায় দালান বানাইয়া টাকা শেষ করে ফেলব ?
দালান করতে তো টাকা লাগবেই, সেজন্য কেউ কী দালান করে না ? পাল্টা প্রশ্ন ছোটভাই শিবলির। আমাদের গ্রামে এখনও কেউ দালান করে নাই, আমরা তিন ভাই মিইল্ল্যা করব। এলাকার লোকেরা বলবে, দালানঅলা বাড়ি।
দালানঅলা বাড়ি ? অস্ফুট স্বরে উচ্চারণ করে কামাল হোসেন।
ঢুকে যায় ছোট ভাই জাফর হোসেন, এলাকায় আমাদের কেউ চেনে ? জন্মের পর থেকে পরের বাড়িতে কাজ করতে দেখেছি মাকে আর বাজানরে। সেই সকালে উঠে মায় চইলা যাইতো মৃধা বাড়ি। বড় মৃধার ঘরের হাড়ি পাতিল ধুইয়া যে বাসি ভাত তরকারি পাইত, থালা ভরে লইয়া আসত। মনে আছে, তিন ভাই হাসের মতো গিলতাম। মায়ে পাশে বইসা চাইয়া চাইয়া দেখত।
সত্যি! মায় আমাগো লাইগা অনেক কষ্ট করছে, বড় ভাই কামরুল হোসেনের চোখে পানি। মায়ের কষ্ট ভোলা যায় না। মনে পড়লে বুকটা ফাইটা যায়…
মায়ে যাতে এই শেষ বয়সে একটু ভালো থাকতে পারে, হের লাইগাই তো দালান বানাইতে চাই, নরম গলায় বলে বড় ভাইকে নিজের অনুকূলে আনার চেষ্টা করে শিবলি। বয়স হইচে মায়ের। চোখেও তেমন দেখে না। তিন ভাই মিলে যদি বড় একটা দালান বানাই, মায়ের মনে শান্তি পাবে। সারাটা জীবন কাটিয়ে দিলো মায় নাড়ার ছোট একটা ঘরে। বৃষ্টির পানি পরে মায়ের সব যায় ভিজে।
বুঝলাম মায়ের লাইগা বড় একটা দালান বানাবি, বানা। ছয় তলা দালান বানাবি কেনো ? আর জানো দালানের খরচা পাতি ? শোনো নাই, মুরব্বিরা বলেন, ঘর, বিয়া আর মামলার টাকার হিসাব মেলে নাÑছোট দুইভাইকে নিজের জ্ঞানের মধ্যে আটকে ফেলতে চায় কামাল হোসেন।
সবার ছোট জাফর সবসময়ে ঘাড় ত্যাড়ামি করে, সেই ঘাড় বাঁকা করে জবাব দেয়Ñভাইজান, মাইজা ভাই যা বলেছে সেটাই করব। যদি আমরা গ্রামে দালান বানাই, ছয়তলা দালানই বানাব। ছয়তলা দালান হলে পুরো এলাকায় আমাদের বাড়ির নাম কইবেÑ
হ্যাঁ, কইবে দালানআলা বাড়ি। উজানগাও গ্রামের সবাই, আশপাশের তেলিখালি, পশারিপাড়া, বেগমবাড়ি গ্রামের সবাই কইবে ছয়তলা দালান বাড়ি। মৃধাবাড়ির নাম আর কেউ কইবে না, ছোটভাইকে দৃঢ়তার সঙ্গে সমর্থন করে মেঝ ভাই শিবলি। আপনের মনে আছে, আমি তখন মৃধা বাড়ির মাইঝা মৃধার গরু রাখতাম। একদিন একটা গরুতে পাশের বাড়ির রহমানের কলাই খেতের কলাই খেয়েছিল, আমারে কী মারটাই না দিয়েছিল মাইঝা মৃধা! আমারে রাস্তার উপর ফেলে গরুর পাঁচন দিয়া পিটিয়েছেÑআমি চিৎকার কইরা কানছি, আশপাশের মানুষ খাড়াইয়া দেখছে কিন্তু সাহস কইরা ছাড়ায় নাই, বলতে বলতে গলা ভিজে আসে শিবলির।
হারা রাইত মায়ে গরম তেল মালিশ করেছিল আর কানছিল, মনে আছে ভাইজান ? জাফর তাকায় বড় ভাইয়ের দিকে।
কামরুল হোসেন, শিলবী আহমেদ আর জাফর হোসেন পিঠেপিঠি ভাই। যা ঘটেছেÑসবই চোখের সামনে ঘটেছে। কামরুল একটু ভীতু টাইপের মানুষ। এসব দেখত আর ভয়ে সিটিয়ে যেত। ছোটভাইকে যখন মা দগ্ধ পিঠে গরম তেল মালিশ করে দেয়, তখন তেল চিটচিটে কাথা মুড়ি দিয়ে পাশে শুয়ে ছিল কামরুল হোসেন। বাতের ব্যথায় বিধ্বস্ত হয়ে সামনের ছোট আর একটা ঘরে কেবল শুয়ে শুয়ে হাপায় বাপ সোলেমান ঘরামি। আর থেকে থেকে আহত বিড়ালের গলায় চিৎকার করে ওঠে।
মৃধা বাড়ির সোহাগ মৃধাতো একবার আপনাকেও মেরেছিল, মনে আছে ? বড় ভাইয়ের বুকের মধ্যে মৃধা বাড়ির বিরুদ্ধে জেগে উঠাবার জন্য স্মৃতির অপমান জাগিয়ে তোলার চেষ্টা করে। তুমি অগো বাড়ির পুকুরে মাছ ধরছিলাÑমাছ তো দেয় নাই, উল্টো মাইরা তোমার কান ফাটাইয়া দিছিল।
মাথা নুয়ে আসে কামরুল হোসেনের, সেসব দিনের বেদনা আর লাঞ্চনার ঘা ভুলে থাকতে চায়। অথচ সেই দাম্মাম থেকে ডেকে এনে ভাই দুটো সেই দগদগে ঘা জাগিয়ে তুলছে। মনে আছে কামরুল হোসেনের, ছেলেকে মারার জন্য পরের দিন মৃধা বাড়ি কাজে যায়নি মা রাবিয়া বেগম। কিন্তু দুপুরের পরে বড় মৃধা এসে হাজির, সঙ্গে লাঠিয়াল বারেক মুন্সি।
কী হইল কামরুলের মা! তোমারে খবর দিলাম হেরপরও গেলা না যে! বাড়ির কাম কেডায় করবে ? কুঁড়ে ঘরের সামনে দাঁড়িয়ে বাজখাই গলায় বলে খবির মৃধা। তোমার পোলায় না বলে পুকুর থেকে মাছ ধরছে, হের লাইগা সোহাগ দুইটা না হয় চর থাপ্পর দিছে, সোহাগ তো বয়সে বড় তোমার পোলার চাইয়া। বড় ভাইতো শাসন করতে পারেÑলুঙ্গির খোট থেকে একটা পাঁচ টাকার নোট বের করে ঘরের মধ্যে ছুড়ে বলে, আমি যাইতেছি। রান্ধন সব পইরা রইচেÑআহো, তাড়াতাড়ি আহো…।
মা রাবেয়া বেগম চোখ মুছতে মুছতে চলে যায় মৃধা বাড়ি। তিন ভাই ঘরের পিড়ার উপর দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে মায়ের চলে যাওয়া দেখে। এখনও সেই দৃশ্যটা দেখতে পায় কামরুল হোসেন। তিন ভাইয়ের মধ্যে বড় হওয়ায় মৃধা বাড়ির অনেক নিপীড়নের ঘটনা মনের দেয়ালে রঙিন ছবির অঙ্কে আঁকা।
সৌদি আরবের খেজুরের বাগানে তিন ভাই কাজ করে। তিন ভাইয়ের মাসিক বেতন প্রায় লাখ টাকার কাছাকাছি। মানুষের পকেটে টাকার আমদানি ঘটলে মনের মধ্যে জাগরণের পরিবর্তন ঘটে, প্রতিশোধের আগুন জ¦লে, এক সময়ে পরাজয়ের প্রতিরোধ গড়বার তীব্র আকাক্সক্ষা জাগে। তিন ভাইÑকামরুল হোসেন, শিবলি আহমেদ ও জাফর হোসেন ফেলে আসা দিন রাত্রির পথ রেখায় একটি সূচাগ্র বিন্দুতে দাঁড়িয়েছে, যদিও মৃধা বাড়ির সেই প্রতিপত্তি আগের মতো নাই। বড় মৃধা, মেঝো মৃধা মারা গেছে। সোহাগ মৃধা অসুস্থ হয়ে বিছনায়। বাড়ির জৌলুস আগের মতো নেই। কিন্তু বড় মৃধার বৌ হাসিনা বেগম এখনও রাবেয়া বেগমকে স্নেহ করে, প্রশ্রয় দেয়। ছেলেরা বিদেশে যাবার পর, টাকা পয়সা আয় করায় আর পরের বাড়ি কাজ করে না রাবেয়া বেগম। ছেলেরাই করতে দেয় না। প্রয়োজনও হয় না। পানের ডালা নিয়ে বসে বসে পান খায় আর প্রতিবেশীদের সঙ্গে গল্প করে। বাড়ির পাশের প্রতিবেশী নারীরা গল্প করে , পান খায় আর মনে মনে ঈর্ষার কাপড়ে পুড়তে থাকে।
আহারে, কামরুলের মায়ের এহন কত্ত সুখ! কয় বচ্ছর আগেও মৃধা বাড়িরতে কাম কইরা খাইছে, এহন পোলারা বড় অইয়া বিদেশ গিয়া বস্তায় বস্তায় টাহা পাঠায়… পাশের বাড়ির ঝুমুর মা মনে মনে আওড়ায় আর পান মুখে জিহ্বা নাড়ে।
হুনলাম ভাবি, বাড়িতে নাহি দালান দেবেন ? প্রশ্ন করে জহিরুলের মা।
খুব আয়েশ করে মুখের মধ্যে পান ঢুকিয়ে কয়েকটা কামড় দিয়ে, একটু সময় নিয়ে রাবেয়া বেগম হাসি হাসি মুখে জবাব দেয়, পোলারা তো কয়, বাড়ি দালান দেবে। আমি কইচি, মাডির মানুষ মাডিতে একদিন মিইশা যামু, দালান ফালানের কাম কী ? মাডির ঘরে আছি, এইতো ভালো। কী কন আপনেরা ?
তো পোলারা কী কয় ?
মাসুরার মায়ের প্রশ্নে রাবেয়া বেগমের মুখের হাসি আরও প্রসারিত হয়, আগামী মাসে বড়ভাই আর ছোটভাই এক লগে আইবে। আইয়া দালান গাঁথার ব্যবস্থা কইরা যাবে। পরের মাসে আইবে মাইজাডা, শিবলি। ওই দালান দেয়ার লাইগা পাগল। সুখের দীর্ঘশ^াস ছাড়ে রাবেয়া বেগম, আমাগো এই সুখের সমায় পোলার বাপটা বাইচা নাই। হে থাকলে কত খুশি অইতো! আবেগে চোখ মোছে রাবেয়া বেগম, সবই আল্লার কুদরত!
হয়, ঝুমুর মা ডালা থেকে আর একটু পান মুখে দিয়ে বলে, সবই হের ইচ্ছা। তয়, দালান দেওয়ার সমায় আমাগো খাওয়াইবেন না চাচি ?
হেউডা তো আমি জানি না। পোলারা জানেÑ
না না, প্রতিবাদ করে প্রতিবেশী মহিলারা, আমাগো খাওয়াইতে অইবে। আল্লায় দিলে আপনের তিন পোলা মিইল্লা আমাগো গেরামে পেরথম দালান দিতাছে, না খাওযাইলে চলবে না…
অনেকটা প্রতিবাদ মিছিলের মতো প্রতিবেশী মহিলারা আবদার করে। রাবেয়া বেগম এক ধরনের আনন্দ প্লাবনে ভাসতে ভাসতে সায় দেয়, তোমরা এমন কইরা যহন দাবি করচো, পোলারা আসুকÑআমি কমুনে। আর জানোত, আমার পোলারা আমার কতা হালায় না। মন দিয়া হরে।
জানি তো, আপনের রাজ কপাল! ভেতরের ঈর্ষা তরল রেখে মন্তব্য করে ঝুমুর মা।
গল্পে-স্মৃতিতে সময় কেটে যায়। সৌদি আরব থেকে দুই ভাইÑকামরুল হোসেন এবং জাফর এসে গ্রামের মধ্যে সাড়া ফেলে দেয়। থানা শহর থেকে ইট বালু সিমেনট আসছে। রড আসছে। রাজমিস্ত্রিরা উঠানে টিনের ছোট ঘর বানিয়ে কাজ শুরু করেছে। যেদিন প্রথম ইট রাখা হয়, সেদিন মিলাদ পড়িয়ে দোয়া করা হয়েছিল। গ্রামের প্রায় সকল লোক এসেছে, ইটের দালান দেখতে। মিলাদ আর দোয়া পড়ে জিলাপি খেতে খেতে ফিরে গেছে কেউ আনন্দে, কেউ ঈর্ষায়। দেখতে দেখতে তিন মাসের মাথায় ছয়তলা দালানের তিন তলা দাঁড়িয়ে যায়। ভেতরের কোনো দরজা জানালা না দিয়ে, কেবল সোজা উপরের দিকে কলাম করে দালান তুলতে থাকে। দুই ভাইয়ের দুই মাসের ছুটি প্রায় শেষ। সৌদি আরবে যাবার আট দিন আগে বিয়ে করে কামরুল। বাড়িতে এসে দুটো কাজই একসঙ্গে শুরু করেছিল কামরুল, মেয়ে দেখা আর দালান তোলার যাবতীয় ব্যবস্থা করা। জাফর কথায় যতটা এগিয়ে কাজের ক্ষেত্রে ততটাই পিছিয়ে। সব দায় পড়ে বড় ভাই কামরুলের উপর। নিজের বিয়ে আর দালান তোলার যাবতীয় কাজ একার হাতেই হ্যান্ডেল করে কামরুল। বিয়ে করে নতুন বৌ নতুন দালানের নীচের তলায় তিনটে থাকার মতো রুম করে নিয়ে আসে। নতুন বউ বাড়িতে রেখে চলে যায় কামরুল হোসেন সৌদি আরবে, সঙ্গে ভাই জাফর।
মাস দেড়েক পর দেশে আসে শিবলি। দালানের কাজ আরও গতি পায়। কয়েকজন জোগালদার নিয়ে কাজ দ্রুত এগিয়ে চলে। গ্রামের সবাই জানে, তিন ভাইয়ের মধ্যে শিবলি বুদ্ধিমান আর টাকাঅলা। উজানগাও গ্রামের দালান হচ্ছে শিবলির পরামর্শে। যাদের বিয়েযোগ্য কন্যা আছে, তারা ভিড় করতে থাকে রাবেয়া বেগমের কাছে। রাবেয়া বেগম বেশ উপভোগ করছে। গ্রামের যেসব মানুষ পথে দেখা হলে ফিরেও তাকাত না সেসব মান্যগণ্যরা বাড়ির মধ্যে এসে বসে, কীভাবে ইটের উপর ইট রেখে দালান গড়ে তোলে, গভীরভাবে দেখে, চোখে মুখে ছড়িয়ে পড়ে ঈর্ষার ক্লেদ!
রাবেয়া বেগম পানের ডালা নিয়ে আসে, নেন পান খান।
পান খেতে বাধ্য হয় বটে কিন্তু বাড়ির বাইরে গিয়ে পানটা মুখের মধ্যে থেকে থুক করে ফেলে দেয়, ইস দালান ফুটায়! মানি লোকদের কাজ মানি লোকরা করে যায়।
পাশের গ্রামের সাবেক চেয়ারম্যার ইউসুফ মিয়ার আগের অবস্থা নেই, পরতির দিকে। কিন্তু সাবেক চেয়ারম্যান, কিছুটা হলেও ঠাঁটবাঁট আছে। সেই ঠাঁটবাঁটের আলোয় তার মেয়ে হেনা সুলতানার সঙ্গে বিয়ে হয় শিবলির। বিয়েতে মোটামুটি ধুমধামই হয়েছেÑকারণ দালানঅলা বাড়ির বিয়ে! গ্রামের মানুষদের খাওয়াতে হয়েছে। শিবলি বিয়ে করে বড় ভাইয়ের মতো নিজের বউ হেনা সুলতানাকে বাড়িতে রেখে মাস খানেক পর ফিরে যায় সৌদি আরবে, কর্মস্থলে। যাবার পর পর তিনটি ঘটনা ঘটে প্রায় পাশাপাশি সময়ে বাংলাদেশের উজানগাও গ্রামে আর সৌদি আরবের দাম্মাম শহরে। প্রথম ঘটনাÑবড় ভাই কামরুল হোসেন রোড এক্সিডেন্ট করে মারা যায় সৌদি আরবেই। বড় ছেলের মৃত্যুর খবর জেনে হার্ট অ্যাটাক করে মা রাবেয়া বেগম। হাঁটাচলা করতে পারে না, সারাদিন দালানের নিচতলায় একটা রুমে শুয়ে থাকে। আর শিবলির নিজের বউ সাবেক চেয়ারম্যান ইউসুফের কন্যা হেনা সুলতানা শ^শুর বাড়ি থেকে পালিয়ে গেছে, খালাতো ভাই খালেদের সঙ্গে, এখন ওরা ঢাকায়।
বড় আশ্রয়ের জায়গা বড় ভাই কামরুল হোসেনের মৃত্যু, নিজের বৌয়ের অন্যর সঙ্গে পলায়ন এবং মা রাবেয়া বেগমের অচল অবস্থা মানসিকভাবে পঙ্গু করে দেয় শিবলীকে। কিন্তু জাফর সাদেক নিজের মতো চলমান থাকে। বলা যায়, সংসারের দায় জাফরই মেটায়। কোনও কাজে মন বসাতে পারে না শিবলি। মালিকের কাছে মায়ের মৃত্যুর সংবাদ জানিয়ে এক মাসের বিশেষ ছুটিতে বাড়ি আসে, কিন্তু আর ফিরে যায়নি। তিন ভাইয়ের সৌদি আরবে এখন এক ভাই জাফর থাকে। খেজুর বাগানে কাজ করে বেতনটা বাড়ি পাঠিয়ে দেয়। শিবলি ছয়তলা দরজা জানালা দেয়াল বিহীন দালানের মধ্যে রাতে দিনে হাঁটে আর পঙ্গু মায়ের পাশে বসে থাকে।
দূর থেকে দেখা যায়, ইটের বিশাল একটা স্তূপের আকার নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে দালানটা, রঙ না করায় লাল দেখায়। তিন ভাই আশা করেছিল, গ্রামের মানুষ বলবে দালানঅলা বাড়িÑউজানগাও গ্রাম থেকে মুছে যাবে মৃধা বাড়ির নাম নিশানাÑকিন্তু কেউ বলে না, দালানঅলা বাড়ি! আয় রোজগার, জমানো টাকা দুটি বিয়ে আর দালানের পিছনে ব্যয়ের পর শিবলি দাঁড়িয়ে এখন শূন্যেরও মাঝারে। আয় একমাত্র ছোটভাইÑজাফর।
গ্রামের অনেকে পরামর্শ দিয়েছে, রাবেয়া বেগমকে ঢাকায় এনে চিকিৎসা করাতে। বড় ডাক্তারের কাছে চিকিৎসা করালে ভালো হবার সম্ভাবনা আছে।
গেন্দু মৃধা তো বলেছে আরও এককাঠি বাড়িয়ে, তোমার মাকে ইন্ডিয়া লইয়া যাও। টাকা পয়সা যহন আছে তহন মায়ের ভালো চিকিৎসা করাইবা না ?
দেখি, কী করা যায়! পরিস্থিতির ভূগোল থেকে সরে যেতে চায় শিবলি।
আবার দেহি কী ? গেন্দু মৃধা প্রায় খেকিয়ে ওঠে, তোমার মায়ে তোমাগো লাইগা কম কষ্ট করছে ? আমাগো বাড়ি কাম কইরা তোমাগো ভাত খাওইয়াচে। হেই মায়রে কষ্ট দিবা ?
শিবলির শরীর জ¦লে ওঠে, হারামজাদা আবার হেগো বাড়িতে মায়ের কাম করার ঘটনা তুলছে। আরে শুয়োর, তোদের সঙ্গে পাল্লা দেওয়ার লাইগাইতো দালান তুলতে গেছিলাম। দালানটা তুলতে পারলে… শ^াস নিতে পারে না শিবলি। ক্রোধে ফাটা ভাঙির ঢঙে ফেটে যেতে চায়।
আবার ফোটায় হুল গেন্দু মৃধা, আমাগো বাড়ি একেক সময় কাম করতে করতে তোমার মায়ের শ^াস কষ্ট উটত। আমি কইতাম, চাচি একটু জিরাইয়া লন। হেই মায়ের চিকিৎসা করাবি না তো কী আবার বিয়া করবি ? আবার বিয়া হরলে যদি হেই বউ ভাইগা যায় ?
উজানগাও বাজারে জাকিরের চায়ের দোকানে চা খেতে খেতে আড্ডার মধ্যে এসব কথার মুড়ি ফুটছিল। উপস্থিত সবাই গ্রামের মানুষÑএকে অপরকে খুব ঘনিষ্ঠভাবে চেনে। তিন ভাই যে দালান দিয়েছে, অনেক সমালোচনা ও সরস গল্পের ডালপালা গ্রামের এখানে সেখানে চলছেই, জানে শিবলি। কারণ দুই বছর বিদেশে থাকলেও মানুষতো গ্রামের, জানে সকলের নারী নক্ষত্র। গেন্দু মৃধার কথায় জাকিরের চায়ের দোকানের মধ্যে হাসির হল্লা বয়ে যায়। মুহূর্ত মাত্র, শিবলি আগুনের জন্য রাখা কাঠ তুলে বাড়ি মারে গেন্দু মৃধাকে।
গেন্দু মৃধার মেদবহুল থলথলে শরীর। বাড়ির আঘাতে টচ করে মাটিতে পড়ে যায়। উপস্থিত লোকজন হৈ চৈ করে ওঠে। কাঠ মাটিতে ফেলে জাকিরের চায়ের দোকান থেকে হনহন বের হয়ে যায় শিবলি। লোকজন ধরাধরা তরে গেন্দুকে ভ্যানে তুলে, থানা শহর ভানডারিয়া নেয়ার পর, ডাক্তার জানায় অনেক আগেই গেন্দু মৃধা মারা গেছে। থানায় হত্যা মামলা হয় শিবলির নামে, সাক্ষীর অভাব নেইÑএই সাক্ষী অনেকটা ছয়তলা কিন্তু চিরকালের জন্য একটি অসামাপ্ত দালানের বিরুদ্ধেও।
গেন্দু হত্যাকাণ্ডের আসামি শিবলি পালিয়ে বেড়াচ্ছে। অথর্ব হয়ে বিছনায় পড়ে থাকা রাবেয়া বেগম জানে না। কিন্তু মাঝ রাতে অনুমান করে, শিবলি দরজা জানালা খাটবাঁট ছাড়া খোলা ছয়তলা দালানের মধ্যে হাঁটে আর গান গায় গলা ছেড়েÑমা আমার সাধ না মিটিল আশা না পুড়িল…।
সচিত্রকরণ : শতাব্দী জাহিদ



