লিগ্যাল এলিয়েন : মূল : রুতানগাই ক্রিস্টাল বুতুনগি : অনুবাদ : মনোজিৎকুমার দাস

বিশেষ গল্পসংখ্যা ২০২২ : আফ্রিকান গল্প
[রুতানগাই ক্রিস্টাল বুতুনগি―বর্তমান প্রজন্মের আফ্রিকার লেখিকা। আফ্রিকা-উগান্ডার এ লেখিকা লেখাপড়া করেন ইউনির্ভাসিটি অফ স্টার্লি, স্কটল্যান্ডে। তিনি বুক লাভার হিসেবে বিশেষভাবে খ্যাত। কমনওয়েলথ স্কলারসিপ লাভ করেন। আফ্রিকান রাইটারস ট্রাস্ট এবং ব্রিটিশ কাউন্সিলের সঙ্গে সম্পৃক্ত আছেন। তাঁর ‘লিগ্যাল এলিয়েন’ গল্পটি ইংরেজি ভাষা থেকে ভাষান্তর করা হয়েছে।]আ মার গোত্রের মানুষ হওয়ায় রিসিপশনিস্ট কনসাল্টেশন ফি নিতে চাইবে না এটা আমি মনে করি না। রাজনীতিবিদ ও ব্যবসায়ীদের দুর্নীতির কথা ভাবলাম। এখানে স্মল টাউন নামে একটা ক্লিনিক আছে। আমি একজন দুর্নীতিগ্রস্ত ডাক্তারের রিসিপশনিস্টের কাছে যাচ্ছি চিকিৎসা সুবিধা লাভের জন্য। নির্ধারিত ফরমের জন্য আমি দিনটা অফিসে অফিসে দৌড়াদৌড়ি করেছি। চেক আপের জন্য আমাকে একজন ডাক্তার কাছে যেতে হবে। চেক আপের পর মেডিক্যাল ফরমটা অ্যাপ্রুভ করে সিল দিয়ে নিতে হবে। মেডিক্যাল চেক আপের জন্য কনসাল্টেশন ফি জমা দিয়ে বাইরে যাওয়ার কথা। রিসিপশনিস্ট ফরমে আমার নামের প্রতি তাকিয়ে বলল, ‘ওহ, তুমি আমাদের গ্রাম থেকে এসেছ! কেন তুমি এতক্ষণে তোমার উপাধি বলনি। তোমাকে যতটা পারি খাতির করতাম।’ তারপর রিসিপশনিস্ট মেয়েটি আমাদের ভাষায় আলাপ করতে থাকল। ‘যদি তুমি আমাকে বলতে তুমি কোথা থেকে এসেছ, তবে এত বেশি কনসাল্টেশন ফি তোমার কাছ থেকে চাইতাম না।
প্রকৃতপক্ষে, আজ ভালোই আয় হয়েছে, আগে বললে কাজ হতো। একটু অপেক্ষা করো রোগীটা বের হয়ে এলে তুমি তোমার চেক আপের জন্য ভেতরে যাবে। কথাগুলো সে ইংরেজিতে বলল। পরে সে আবার আমাদের ভাষায় কথা বলতে থাকল।
আমি তাকে জানাতে সাহস করলাম না যে সে যা বলছে তার একটা শব্দও আমি বুঝছি না তবে আমি তার কাছে প্রকাশ করলাম না যে ১৯৯৩ সালে আমি শিশু অবস্থা থেকেই আমি আমার মাতৃভাষা থেকে বঞ্চিত হই।
বাবা আমাকে ক্লাসরুমে রেখে আসার পর শিক্ষক ক্লাসরুমে এলে আমি আমার কান্না থামাতাম। ক্লাসরুমটা ছিল খুব বড়সড়! একশোরও বেশি ছেলেমেয়ে ক্লাসে ছিল। সবার বসার মতো বেঞ্চ ছিল না। দেওয়ালগুলো অপরিষ্কার। ক্লাসে কোনও কাপবোর্ড নেই, শিক্ষকদের ডেক্স নেই। সামনের দিকে একটামাত্র যেনতেন প্রকারের ব্লাকবোর্ড, ওখানকার সবকিছুই পুরানো। ক্লাসরুমের পেছনে ব্যাগ গাদি করে রাখা। মেঝেতে কার্পেট নেই। আমি লোকটার দিকে তাকিয়ে অনুমান করলাম তিনিই আমাদের ক্লাস টিচার। বাবা আমাকে রেখে আসার সময় তাকে মি. মুহাঙ্গাজাইমা বলে সম্বোধন করে বললেন, ‘আপনাদের ফ্রিজ কোথায় ?’
বাবার কথা শুনে ছেলেমেয়েরা হাসাহাসি করতে শুরু করল। আমি আবার কান্না শুরু করলাম। মি. মুহাঙ্গাজাইমা মাথা নিচু করে শান্ত কণ্ঠে বললেন, ‘এটা একটা ক্লাসরুম। আমরা ক্লাসরুমে ফ্রিজ রাখি না। আমাদের স্কুলের ক্যান্টিনে শুধু একটা ফ্রিজ আছে। আর সেটা আছে কিচেনে।’
‘তাহলে বিরতির সময়ের জন্য স্ন্যাক্স আমি কোথায় রাখব ?’ ‘ক্লাসরুমের পেছনের দেওয়ালের হুকে ওইগুলো রাখো।’ তিনি আমাকে ক্লাসের পেছনের দিকে নিয়ে গিয়ে একটা হুক থেকে একটা ব্যাগ টান দিয়ে মেঝেতে টেনে ফেলে আমার ব্যাগটা সেখানে রাখলেন। নতুন পরিবেশের সম্বন্ধে আমি কিছুই বুঝতে পারলাম না।
অস্ট্রেলিয়াতে আমার গ্রেড ২ ক্লাসে পড়াকালে আমাদের ক্লাসে বত্রিশ জন ছাত্রছাত্রী ছিল। আর সেটা ছিল পুরো স্কুলের মধ্যে সবচেয়ে বড় ক্লাস। বিরতির সময়ে স্ন্যাস্ক খাবার জন্য প্রতি ক্লাসে একটা করে ফ্রিজ ছিল, আর সেগুলো প্রয়োজনে গরম করে নেওয়ার জন্য একটা করে মাইক্রেওভেন ছিল। আমার অস্ট্রেলিয়ান ক্লাসের মেঝেয় কার্পেট বিছানো ছিল। লেখালেখি করার জন্য টেবিলের পর টেবিল সাজানো ছিল। অ্যালজেবরা শেখার জন্য লাল ও নীল বিল্ডিং ব্লক টেবিলে সাজানো থাকত। ছবি আঁকার জন্য একটা পেন্টিং কর্নার একটা ইমাজিনারি কর্নার, আর বিকালের দিকে একটু ঘুমিয়ে নেবার জন্য একটা স্লিপিং কর্নার ছিল। আর আমরা এখানে আমাদের ইচ্ছেমতো জামা কাপড় পরতে পারতাম। আমাদের আগের স্কুলটা এটার মতো ছিল না, ওখানে আমি আমার মোজা পরতাম, যা টানলে হাঁটু পর্যন্ত আসত। ওখানে সবুজ আর সাদায় মিশানো চেকের পোশাক পড়তাম।
মি. মুহাঙ্গাজাইমা আমাকে ক্লাসরুমের পেছনের দিকে একটা বেঞ্চে বসালেন। বেঞ্চটাতে পাঁচজন ছাত্রী বসে ছিল।
‘এ হলো ডেইজি, ও খুব ভালো মেয়ে।’ ঠোঁট চিকন একটা মেয়ের পাশে আমাকে বসিয়ে তিনি আরও বললেন, ‘ও তোমার বন্ধু হবে।’ তিনি তার মনের হাসি চেপে ওখান থেকে চলে গেলেন। আমি ওখানে বসলাম।
সম্ভবত পরের বারে আমি এমন জায়গায় যাব যেখানে লোকদের সঙ্গে ইংরেজিতে কথা বলতে পারব। প্রথমদিন আমি স্কুলে গিয়ে এমনটাই ভেবেছিলাম। তারপরের গল্প ডেইজিকে নিয়ে, এক সময় অন্য বেঞ্চ থেকে হাসিঠাট্টা শুরু হলো। মেয়েটি তার বইয়ের দিকে তাকিয়ে বোর্ডে মি. মুহাঙ্গাজাইমার লেখা অঙ্ক তুলে কষতে লাগল। আমি কখনও পনেরোর সঙ্গে বারো যোগ করতে পারি না বিল্ডিং ব্লক ব্যবহার না করে।
প্রত্যেক বারে আমি ডেইজির কাছ থেকে জানার জন্য জিজ্ঞেস করার চেষ্টা করি। সে একটু একটু করে আমার থেকে দূরে থাকছিল। সে যেন আমার সঙ্গে সম্পর্ক রাখতে চাইছিল না। আমি বুঝতে পারলাম আমাকে একটা বাধার মধ্যে ফেলে দেওয়া হচ্ছিল।
আমি আমার কথা থামিয়ে রিসিপশনিস্টের দিকে তাকালাম। আমার প্রতি দয়াপরবশ হয়ে সে তার ডেস্কের সামনের ডান দিকে ওয়েটিং এরিয়াতে বসতে দিল।
এটা ২০১১ সাল। আমি এখনও অনুভব করি প্রতিবন্ধকতা ছিল। সে আমাকে কি বলছে ? আঠারো বছর আগের কথা আমি এখনও অনুভব করি আমার ক্লাসমেট মেয়েরা আমার থেকে দূরে ছিল। এই বাধার কারণে আমি নির্দিষ্ট সোশাল সার্কেলসকে ভাঙতে পারি না। আমি লোকজনের জীবনের সঙ্গে সম্পর্ক ভেঙে ফেলার চেষ্টা করেছি, কিন্তু তারা নিজেদের সঙ্কুচিত করে বলল, ‘হ্যালো’। ডেইজি আমাকে প্রায় ধাক্কা দিয়ে ফেলে দিয়েছিল কারণ তারা আমাকে বুঝতে পারেনি কিংবা আমি লোকজনদের দূরে ছিলাম কারণ আমিও লজ্জিত ছিলাম নিজেকে প্রকাশ করতে কারণ আমি তাদের বুঝতে পারিনি।
এখন রিসিপশনিস্ট থেকে নিজেকে লুকিয়ে থাকতে আমি ইচ্ছা করলাম। যদি সে আমার সঙ্গে আলাপ করতে চায় তবে আমি কি আমাদের ভাষায় কথা বলতে পারব ? এখনও সে কি আমাকে গ্রামবাসী কিংবা সুবিধা দেওয়ার জন্য আমাকে কনসাল্টেশন ফি ফেরত দিতে চাচ্ছে ? আমি অনেক অনেক বাধা প্রতিরোধ করেছি, শিক্ষালাভের বাধা, লিঙ্গ বৈষম্য কিন্তু ভাষার বাধা ছাড়া কোনওটাই আমাকে দাবিয়ে রাখতে পারেনি। কেউই উপলব্ধি করতে পারে না একজন মহিলা তার অধিকারের জন্য লড়াই করে, কিন্তু কম মানুষই হৃদয়ঙ্গম করতে পারে কেমন করে একজন তাদের নিজের ভাষা শিখতে ব্যর্থ হতে পারে।
সে সময় অনেক রোগী ভেতরে গেল। তখন রিসিপশনিস্ট তাদের সঙ্গে কথাবার্তা বলে তাদের কাছ থেকে বেশি কনসাল্টেশন ফি আদায় করতে ব্যস্ত হয়ে উঠল। একজন রোগী কেনিয়ান ভাষার টানে বলছে। প্রত্যেকেই বুঝতে পারে কেন মহিলাটি উগান্ডার ভাষায় কথা বলতে পারে না।
শিক্ষিকা ছিলেন রোগা পাতলা ও লম্বা। তিনি ক্লাসের সামনে এসে বললেন, ‘সুপ্রভাত’, ‘সুপ্রভাত মিস নাকানওয়গি!’ ক্লাসের প্রত্যেকেই তাকে স্বাগত জানানোর উদ্দেশে উঠে দাঁড়াল। ‘ভালো আছ তো সবাই। বস তোমরা। নতুন মেয়েটি কোথায় ?’ প্রত্যেকেই পেছন ফিরে আমার দিকে তাকাল। ‘ওহ! তোমার চুল এখনও কেটে দেয়নি ? এত লম্বা চুল নিয়ে তোমাকে ক্লাসে আসবার জন্য হেডমাস্টার অনুমতি দিয়েছেন ?’ আমি এতক্ষণ যে লক্ষ করিনি কোনও মেয়ের মাথায়ই চুল নেই। শিক্ষিকা ক্লাসের সামনে বসা একটা ছেলেকে তার সিট থেকে উঠিয়ে আমাতে তার সিটে বসতে বললেন। সামনের বেঞ্চে এসে, আমি অনুভব করলাম, আমার পেছনে বসা ছেলেমেয়েরা আমার দিকে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। আমি নিজেকে নির্বোধ বলে অনুভব করতে শুরু করলাম কারণ আমি কোনও প্রশ্নের উত্তর দিতে পারছিলাম। শিক্ষিকা পৃথিবীর প্রথম মানুষ ‘মুন্তু’ ও ‘সেরা’ সম্বন্ধে জিজ্ঞেস করছিলেন এবং তারপর গিপির ও লাবোং সম্বন্ধে কিছু গল্প বললেন। তারপর তিনি পৃথিবীর আকার সম্বন্ধে জিজ্ঞেস করলেন। পরিশেষে আমি প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার জন্য হাত তুললাম। আমি সঠিকভাবে প্রশ্নটার উত্তর জানতাম। ‘হ্যাঁ নতুন মেয়েটি, দাঁড়িয়ে আমাদের কাছে উত্তর দাও। ‘পৃথিবী গোলাকার।’ আমি উচ্চ কণ্ঠে বলে উঠলাম। ক্লাসের সবাই আমার উত্তর শুনে হট্টহাসি করে উঠল।
আমার নতুন ক্লাসমেটরা আমার উচ্চারিত উত্তর বুঝতে না পারা পর্যন্ত শিক্ষিকা আমাকে বললেন, ‘পুনরায় বল!’ আমি পুনরায় উত্তর না দিয়ে হতাশ হয়ে বসে পড়লাম। এতে সবাই আমাকে ঠাট্টা করতে লাগল। বিরতির পর আমি স্বস্তিবোধ করলাম। আমার ইচ্ছে হলো ক্লাস থেকে স্কুলের অন্য কোথায় গিয়ে লুকাই। খেতে যাওয়ার আগে আমি ক্লাসের বারান্দায় বসে শিক্ষকদের ধন্যবাদ জানাতে গেলাম। তাদের ধন্যবাদ জানানোর পর শিক্ষকদের মধ্যে বিতর্ক দেখা দিলো। শিক্ষকদের মাঝ থেকে একজন বললেন, ‘ওহ, মেয়েটা দেশের বাইরে থেকে এসেছে, তাই এখনও এত ভদ্র আচরণ।’ ‘আপনি কি বলতে চাচ্ছেন এখানকার লোকজনের আচারণ খারাপ ?’ মি. মুহাঙ্গাজাইমাকের কথা শুনে আমার মনে হলো তিনি দয়ালু ও অমায়িক। তিনি বললেন, ‘অন্য ছেলেমেয়েদের দেমাগই আলাদা কিন্তু এই মেয়েকে দেখেছেন সে আমাদের ধন্যবাদ জানাতে এসেছে।’
আমি বসার জন্য একটা জায়গা খুঁজছিলাম। সব ছেলেমেয়ে আমাকে তাচ্ছিল্য করে আসছিল বলে আমার ইচ্ছে ছিল মি. মুহাঙ্গাজাইমাকের সঙ্গে থাকার, স্কুলটি ছিল খুবই বড়। স্কুলের মেইন গেটের চারপাশ ঘুরিয়ে রাস্তাটি চলে গেছে। রাস্তার বাঁ দিকে লোয়ার প্রাইমারি সেকশন। স্কুলের বাকি অংশটা রাস্তার ডান দিকে। এর মাঝে স্কুল কিচেন, প্রশাসনিক ভবন, মেইন হলো এবং স্টাফ রুম। প্রত্যেক ক্লাসে পাঁচ সেকশন: এনপিএস কে এবং ইউ, যা নেওয়া হয়েছে এন-একাসেরো, পি- প্রাইমারি, এস-স্কুল কে-কামপালা , ইউ-উগান্ড।
বাবা ও আমি সেদিন সকালে হেডমাস্টারের মুখোমুখি হলে হেডমাস্টার জিজ্ঞেস করেছিলে হলুদ, নীল, লাল, সবুজ ও সাদার মধ্যে আমি কোন রঙ পছন্দ করি। আমি ‘সবুজ’ বলেছিলাম কারণ অস্ট্রেলিয়ার স্কুলেও আমি ছিলাম সবুজ হাউসে। সুতরাং তিনি আমার জন্য স্কুলে সবুজ হাউসের পি ৩ কে বরাদ্দ করলেন। সুন্দরভাবে স্কুলটি ডিজাইন করেছিলেন কারণ ক্লাসগুলো পাঁচটা সেকশনে পাঁচটা করে ক্লাসরুম তৈরি করা হয়েছে।
মায়ের প্যাকেট করে দেওয়া ব্রেড ও কেক খেতে শুরু করলাম। তরপর আর একটা ছেলের সঙ্গে ডেইজি আমার কাছে এসে জিজ্ঞেস করল, ‘ওয়াম্মা, তুমি কি এডাই মারফির সঙ্গে কথা বলেছিলে ?’
‘এডাই মারফি কে ?’ আমি জবাবে বললাম।
‘আমেরিকা থেকে ফিরে এসে সে যেন অভিনয় করে যাচ্ছে।’ ‘আমি এডাই মারফিকে চিনি না। আমি অস্ট্রেলিয়া থেকে এসেছি, আমেরিকা থেকে নয়।’ ডেইজির সঙ্গের ছেলেটি বলল, ‘তোমার বাবা তো একজন কৃষ্ণাঙ্গ আমেরিকান! তোমাকে এখানে নিয়ে আসবার সময় তোমার বাবাকে দেখেছি, এমনকি তাকে আমেরিকানদের মতো কথা বলতেও শুনেছি।’
‘না, আমার বাবা উগান্ডান, কিন্তু আমরা অস্ট্রেলিয়াতে থাকতাম।’
‘আমিও তো তোমাকে সেটাই বলেছিলাম।’
ডেইজি কথাটা বলে ছেলেটির সঙ্গে মিলে যুক্তি দেখাতে শুরু করল। তারপর সময় গড়িয়ে যেতে থাকল।
ইংরেজি বিষয়ের শিক্ষিকা ছিলেন রাগী স্বভাবের। তিনি আমার বেঞ্চের সামনে। তিনি আমার হোমওয়ার্ক চাইলে আমি তা দিতে পারলাম না, ওইটা ছিল আতা উগান্ডা স্কুলের প্রথম দিন; আসলে আমার কোনো হোমওয়ার্ক দেওয়া ছিল না। শিক্ষিকা যেভাবে ক্লাসের ছেলেমেয়েদের হোমওয়ার্কের জন্য হেনস্তা করছিলেন তাতে আমি চাইলাম না তার মুখোমুখি হতে, কিন্তু তার থেকে দূরে থাকা আমার সম্ভব হলো না, আমার মনের মধ্যে ভয় দানা বেঁধে উঠল আমার বেঞ্চের চারজনের হোমওয়ার্ক চাওয়ার আমার পালা এল। তিনি আমাকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘তোমার হোমওয়ার্ক কোথায় ?’
আমি জানতে চাইলাম, ‘আমার—?’
‘ননসেন্স ! তোমার হোমওয়ার্ক ? আমি তার প্রশ্নের জবাব দেওয়ার আগে তিনি আমার গালে একটা চড় মেরে বললেন, ‘তুমি শুনতে পাওনি তোমাদের বেঞ্চের সবাইকে হোমওয়ার্কের খাতা খুলতে বলছি।’
ক্লাসের সবাই এক সঙ্গে চিৎকার করে উঠল যে আমি তাদের ক্লাসের নবাগত। আজই প্রথম ক্লাসে এসেছে। তাদের কথা শুনে, ‘ওহ , দুঃখিত।’ বলে তিনি পরের জনের দিকে গেলেন। আমি সুপারম্যান হওয়ার চেষ্টা করার জন্য একটা কাপবোর্ডের উপর থেকে লাফ মেরে হাঁটু ভেঙে গেছে বলে মরার ভান করলে মায়ের হাতে থাপ্পর খাওয়া ছাড়া আর কখনও এমন থাপ্পর খাইনি।
শিক্ষিকা একই সময়ে ভয়ংকর, রাগী ও খোসমেজাজি ফলে তিনি আমাকে থাপ্পর মেরে ভয় পেয়ে গেলেন। আমার মনে প্রশ্ন জাগল কেন একজন শিক্ষক ছাত্রছাত্রীদের প্রহার করবে ?
অস্ট্রেলিয়াতে একজন শিক্ষক একবার একটা শিশুকে আঘাত করায় সেই শিক্ষক গ্রেফতার হয়েছিলেন। সেখানে শিশুদের মারধর করা নিষিদ্ধ, এমন কি মা বাবারাও। পিতামাতা তাদের ছেলেমেয়েদের মারধর করতে পারে অস্ট্রেলিয়াতে ভাবাই যায় না। একটা অদ্ভুত ব্যাপার আমি অস্ট্রেলিয়ার বাড়িতে থাকাকালে কখনও বাড়ির বাইরের অকর্মণ্য লোকেদের পুলিশের মারধরের শব্দ শুনিনি।
রিসিপশনিস্ট অন্যান্য রোগীর কাজ শেষ করে আমার দিকে নজর দিল। মহিলাটির হাবভাব লক্ষ করার পর আমি বুঝতে পারলাম তিনি চলমান দাঙ্গা সম্বন্ধে কিছু বলতে চাচ্ছে। মুয়াম্মার গাদ্দাফি মারা যাওয়ার পর থেকে আমাদের প্রেসিডেন্টের মনেও চিন্তা দেখা দেয়। এ কারণে প্রত্যেক সোমবারে তারা ‘ওয়াক টু ওয়ার্ক নির্দেশনা দেওয়ার জন্য বৈঠক করতে লাগে। বিরোধী দলগুলোর সদস্য ও পার্লামেন্টিরিয়ানরা তাদের অফিসে নিয়মিত যেতে লাগলেন। শহরের অকর্মণ্য লোক ও শ্রমিকরা রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে তাদের জয়ধ্বনি দিত কিংবা জনতার সঙ্গে যোগ দিত। প্রত্যেক সোমবারে পুলিশ ও আর্মি টহল দিয়ে টিয়ার গ্যাস ছুড়ত এবং জনতার উপর গোলাপি রঙের জল স্প্রে করত। সে সময় দোকানদারেরা কয়েক ঘণ্টার জন্য চুরিচামারির ভয়ে দোকান বন্ধ রাখে, যে পর্যন্ত না বিক্ষোভকারীরা গ্রেফতার হয়, তারপর জামিনও পেয়ে যায়। ‘ওয়াক টু ওয়ার্ক’ ক্যাম্পেন ব্যবসায় ক্ষতি করায় ব্যবসায়ীরা প্রতিবাদ করে, তারপর বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রেরা ধর্মঘটের ডাক দেয় কারণ লেকচারারেরা ক্যাম্পেনে যোগ দিয়ে তাদের পড়ানো থেকে বিরত থাকে। এ অবস্থা মাসের পর মাস চলতে থাকে। মেডিক্যাল ওয়ার্কার, টিচার ও আইনজীবীরাও ধর্মঘটে যায়।
আমি বাড়িতে একটা রুটিন মেপে নিরাপদে থাকতে অভ্যস্ত হলাম। কিন্তু এই সপ্তাহেই পেপারগুলো পাঠানোর তারিখ। সূর্য ওঠার পূর্ব মুহূর্তে বিক্ষোভকারীরা রাস্তায় বের হওয়ার আগে আমি একটি ট্যাক্সি নিলাম। আমি সকালে বাড়ি থেকে বের হয়ে জ্ঞানীর মতো কাজ করেছিলাম, কারণ ওই সময় শহরে গণ্ডগোল ছিল না। বিকেলের দিকে আমি সাহস করে শহরের অফিসগুলোতে গেলাম, তখন সেখানে বিশৃঙ্খলা চলছিল। কমার্শিয়াল বিল্ডিংগুলোর টয়লেটে লোকজনে ভরা, আমিও সেখানে লুকিয়ে আমার চোখদুটো থেকে টিয়ার গ্যাস ধোয়ার জন্য একটা ট্যাপ খুলে চোখে পানির ছিটা দিলাম। প্রত্যেকেই অফিসগুলোয় ছিল, কারণ তারা টিয়ার গ্যাসে আচ্ছন্ন রাস্তায় বের হতে সাহস করেনি।
আমার মেডিক্যাল ফরম ছাড়াও আমার সবকিছুতে সইসাবুদ করাতে হবে। আমাদের ফ্যামিলি ক্লিনিকে যাওয়ার জন্য ট্যাক্সি পার্কে যাওয়ার কোনও উপায় দেখছি না। সন্ধ্যা না নামার আগে তারা দাঙ্গাহাঙ্গামা থামিয়ে ফিরবে না। তাই আমি প্রথমে টাউন ক্লিনিকে অপেক্ষা করাই নিরাপদ মনে করেই ওখানে প্রবেশ করি। আমি এখন রিসিপশনিস্ট এর বকবক করা মুখের দিকে তাকিয়ে আছি, আমাদের সত্যমিথ্যা কথোপথনে বিঘ্ন ঘটল একদল লোক নার্সিং করার জন্য একটা রক্তাক্ত শিশুকে নিয়ে রিসিপশনে হাজির হলো। আমি বুঝতে পারলাম না শিশুটির কপাল থেকে না চোখ থেকে ব্লিডিং হচ্ছে। শিশুটির নাক থেকে বের হওয়া শ্লেষ্মা রক্তের সঙ্গে মিশে শিশুটির মুখের বাদিকটা একাকার হয়ে গেছে। শিশুটির মা কান্নাকাটি করছে। আহত ছোট্ট মেয়েটির চেয়ে তার মাকে বেশি ভীত দেখাচ্ছিল। সে মেয়ে এ অবস্থার জন্য ফুঁফিয়ে ফুঁফিয়ে কাঁদচ্ছিল। বালিকাটির বয়স বছর আটেক হবে। তাকে তাড়াতাড়ি করে এমার্জেন্সি রুমে নিয়ে গেল। আমি ভাবলাম ভীতিকর দৃশ্যেও রিসিপশনিস্ট শেষ পর্যন্ত নীরব ছিলেন। কিন্তু আমার ধারণা ভুল ছিল। আসলে তিনি আহত মেয়েটির বিষয় নিয়ে ব্যস্ত ছিলেন। আমি ভাবলাম, তিনি হয়তো মহিলা ও মেয়েদের কান্না থামাতে বলছিলেন। আমি সেদিন আমার ইংরেজির ক্লাসটাতে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে নীরবে কেঁদেছিলাম।
আমিনের যেসব গল্প আমি শুনেছিলাম সে সম্বন্ধে আমার ভাবার সুযোগ করে দিলেন। প্রেসিডেন্ট আমিন আর প্রেসিডেন্ট নেই এ কারণে আমাদের উগান্ডাতে ফিরে এলাম, বাবা বলেছিলেন। এইচই মুসেভেনি শান্তি ফিরিয়ে আনলেন, তাই আমাদের নির্বাসনে আর থাকতে হলো না। যদি আমিনের এমনটা ঘটত, তবে আমি আমার দেশে এবং নতুন স্কুলে আসার অভিজ্ঞতা লাভ করতাম না। আমার বড় বোনেরা সিডনিতে আরও কয়েক বছর থাকতে চেয়েছিল, কিন্তু বাবা বললেন, ‘মৃত্যু যখন আসবে তখন তা নিজের দেশেও আসতে পারে বাইরে থাকলেও আসতে পারে।’ তিনি গত দুবছর অর্থকড়ি উগান্ডায় পাঠিয়েছিলেন আমাদের জন্য একটা বাড়ি তৈরির উদ্দেশে। অস্ট্রেলিয়াতে থাকাকালে বাবা টিচারস ট্রেনিং কলেজের ভাইস প্রিন্সিপাল ছিলেন, মেকারেরে ইউনিভার্সিটি বাবার একটা বড় চাকরির অফার দিলে তা তিনি ফিরিয়ে দেন।
আমি ভেবেছিলাম উগান্ডাতে শান্তি প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। বাবাও এমনটাই ভাবছিলেন। কিন্তু পরিবর্তে, ইলিশ টিচার আমাকে থাপ্পর মারলেন। আমি মনঃস্থির করলাম আমি আর কখনও স্কুলে ফিরে আসব না। কিন্তু শিক্ষিকা তার ক্লাস শেষ করে যাওয়ামাত্র আমাদের ক্লাসের ছেলেমেয়েরা আমাকে ঘিরে বসে সরি বলে মিষ্টি খেতে দিয়ে আমাকে বলল কীভাবে তারা সবাই মারধরের শিকার হয়েছে। হঠাৎ করেই তাদের সঙ্গে আমার বন্ধুত্ব গড়ে উঠল। ছেলেমেয়েরা আমার সঙ্গে কোনও কথাই বলতে সাহস করল না। সেই থেকে আমার দেশ উগান্ডাতে আমার কাজ শুরু। প্রথম দিকে উগান্ডা ছিল ভয়ংকর যখন আমরা এখানে তিন সপ্তাহ আগে পৌঁছানোর আগ থেকে উগান্ডার স্কুল ডে শুরু হয়। আমাদের গলিতে দুদিন বিদ্যুৎ ছিল না। তারপর বিদ্যুৎ এলেও প্রত্যেক রাতেই বিদ্যুৎ থাকত না। আমাদের উগান্ডাতে দুটো টিভি সেন্টার ছিল: ইউটিভি ও সিটিভি। ওই দুটো টিভি স্টেশনের মধ্যে মাত্র পাঁচটা কার্টুন; পিঙউ, সুপারবুক, কিসিস্ফার, ডাক টেলস ও ডিডি। তবে ডিডি কার্টুন ছিল ক্লাউনের কৌতুকে ভরা।
অস্ট্রেলিয়াতে, বছরে এক কিংবা দুবার গিয়েছিল।পাওয়ার না থাকার তারিখ কমপক্ষে ছয় মাস আগে কর্তৃপক্ষ ঘোষণা করেছিল। সেখানে টিভির দুটো চ্যানেলে রাত দিন সারা ক্ষণ কার্টুন চলত। আর উগান্ডার টিভিতে শুধু ছুটির দিনগুলোর সন্ধ্যায় কার্টুন দেখানো হয়। এ কারণে আমি আমার উইকএন্ড কাটাতাম এবং প্রতিবেশিদের সঙ্গে শিখতাম কীভাবে কেওয়েপেনা (ডজবল) খেলতে হয় এবং ডুল (মার্বেল ছোড়া)।
তারপর থেকে বছরের পর বছর ধরে অনেক কিছু শিখেছি কীভাবে বয়স্কদেরকে হাঁটু গেড়ে সম্মান জানাতে হয় তা আমি শিখেছি। আমি শিখেছি কীভাবে কলার খোসা ছড়াতে হয়। আর শিখেছিলাম যে সময় বিদ্যুৎ ছিল না সে সময় আমি কয়লা কিংবা কাঠের কয়লা দিয়ে জামা কাপড় ইস্ত্রি করা। আমার স্কুল ইউনিফরমের নিচে তিনটা সর্ট, তাতে শিক্ষকদের বেত্রাঘাত থেকে রক্ষা পাওয়া যায়। উগান্ডার ওয়াইনো মার্কেটে দামাদামি করে জিনিস পত্র কিনতে হয়। কেমনভাবে কেওয়েপেনা (ডজবল) কিনতে হয় তাও জানলাম।
আমার কথায় এখন আর অস্ট্রেলিয়ান উচ্চারণ নেই। আমার বন্ধুবান্ধবরা আমাকে অনেককিছু শিখিয়েছে। তারা অস্ট্রেলিয়ান ও আমেরিকান উচ্চারণের পার্থক্য জানত। তারা জানত বিদেশে প্রত্যেক উগান্ডান টয়লেট এবং হাসপাতালের বেডপ্যান পরিষ্কার করে না। তারা জানত না যে বিদেশ থেকে আসা প্রত্যেক শিশু কিছু নষ্ট করে না। গাছেও চড়ে না। প্রকৃত পক্ষে, বুলাআয়া থেকে আসা শিশুরা তাদের সৌখিন খেলনা নিয়ে খেলতে ভালোবাসে। তারা জানত যে কারও সঙ্গে মাতৃভাষায় কথা বলা বিফলে যায়, তাদের ক্ষেত্রে যারা বিদেশি উচ্চারণে জীবনের প্রথম নয় বছর ইংরেজিতে কথোপকথন করে।
প্রকৃত পক্ষে আমরা উগান্ডাতে ফিরে আসার পর অসংখ্য আত্মীয় স্বজন আমাদের বিখ্যাত বাড়িতে কয়েক বছর অবস্থান করে। আমি সম্ভবত লুগান্ডা ভাষায় এখন সামান্য বলতে পারি। আমরা লুগান্ডা ভাষায় বলি এই কারণেই যে লুগান্ডা আমাদের মাতৃভাষা। বাবার নতুন চাকরি রাজধানী শহর বুগান্ডল্যান্ডে। দেশের প্রত্যেকটা ট্রাইব যখন এখানে বাস করার সময় লুগান্ডান ভাষা শিখে নেয়। তাদের প্রত্যেকেই কিন্তু তাদের নিজের ভাষাও জানত। আমার মতো অল্প কয়েকজন কিন্তু আমাদের গ্রামগুলোতে বছরে দু-একবার গিয়েছি। আর আমাদের মতো মানুষই কথাবার্তা বলতে সংকটে আছি। প্রত্যেক সময়ই কেউ না কেউ আমাকে জিজ্ঞেস করে, ‘তুমি তোমার নিজের ভাষা বলতে পার না!’ কিন্তু আজ, আমি নিজের মাতৃভাষায় কথা বলছি। আমি এখন আমাদের মাতৃভাষায় রিসিপশনিস্ট এর বকবানি শুনছি। ব্যয় বহুল কনসাল্টেশন ফি ছাড়াই আমি ডক্টরের রুমে যাওয়ার অনুমতি পেয়ে স্বস্তিবোধ করে অল্প হাসলাম। তারপর ডাক্তার আমার মেডিক্যাল ফরম পূরণ করে তাতে সিল মোহর দিলেন। আমার মেডিক্যাল ফরম এবং অন্যান্য পেপার অ্যামবেসিতে জমা দিলাম। কয়েক দিন পরে তারা আমাকে ডাকল এবং আমাকে অস্ট্রেলিয়া থেকে মাস্টার ডিগ্রি নেওয়ার জন্য ভিসা দিলো।
মাগুরা, বাংলাদেশ থেকে
সচিত্রকরণ : নাজিব তারেক



