আর্কাইভগল্পপ্রচ্ছদ রচনা

মুক্ত, স্বাধীন : মুম রহমান

বিশেষ গল্পসংখ্যা ২০২২ : বাংলাদেশের গল্প

আমি শুনলাম আব্বা বলতেছে, কার না কার বাচ্চা, তুমি এখন আমার ঘাড়ে চাপাইতাছ! তুমি তো পাড়ায় পাড়ায় গান গাইয়া বেড়াও, ছেনালিপানা করো, তোমার কোনও ঠিক-ঠিকানা আছে। তোমার মতো মেয়ের সাথে পিরিত করা যায়, যৌনমিলন করা যায়। এর বেশি প্রশ্নই আসে না। তোমারে আমি কোনও দিন কইছি ? বিয়া করমু!

আম্মা মাথা নিচু করে আছে। বুড়ো আঙুলের নখ দিয়া মেঝে ঘষতেছে। মেঝে ঘষলে কী হয় ?

আব্বা বলেই যাচ্ছে, তোমার মতো মেয়েরা এত বোকা হয় কেন! কত রকম সিস্টেম আছে আজকাল! প্রোটেকশন নিবা না ? কী আশ্চর্য। কথা নাই বার্তা নাই, এখন আইসা কইবা আমি প্রেগন্যান্ট। এখন কী করুম তোমারে নিয়া আমি ? আচার বানায়া চাটমু। তোমারে তো আমি এত ইম্মেচিউর ভাবি নাই। কি দিই নাই তোমারে আমি! এখন তুমি আমারে বিপদে ফেলার চেষ্টা করতেছ!

আমার খুব রাগ উঠল। আব্বারে কষে একটা লাথি দিলাম। কিন্তু আমার তখনও পা হয়নি। মাত্র একটা ছোট্ট মাংসের দলার মতো আমি। আমি ছোট্ট এক টুকরা মাংস। আমি বেড়ে উঠছি আমার মায়ের পেটে। কিন্তু আব্বা চায় না, আমি বেড়ে উঠি। আব্বা চায় আমাকে টেনে মায়ের পেট থেকে বের করে ফেলে দিতে। মাংসের দলার মতো আমি পেটের মধ্যে কেমন মোচড় দিয়ে উঠলাম। ইচ্ছা করে, বের হয়ে আব্বাকে একটা লাথি দিই। আমি খুব একটা পাক খাওয়ার মতো ভঙ্গি করলাম। আম্মার পেটের ভেতর কি মোচড় লাগলো! আহা, আমি তো আম্মাকে কষ্ট দিতে চাই না। আম্মাই তো আমার সব। আম্মার পেটটা আমার বাসা। আমার নিরাপদ আশ্রয়। আমি জানি, আম্মা আমাকে এখানে যত্নে রাখবে। আম্মা উহ করে উঠল।

আব্বা বলল, আবার কী হইল ? উহ, আহ করো কেন! শোনো, নাটক কইরো না। কালকে রেডি থাইকো। তোমারে নিয়া নেহালের ওইখানে যাব। এইটারে খালাস কইরা আসব।

আম্মা মাথা তুলল। আব্বার দিকে ঠান্ডা চোখে তাকাল। আব্বা লোকটা ভিরু। সে কুকড়ে গেল। আম্মা ঠান্ডা গলায় বলল, রেজা, তোমার যা মনে হয়, যা খুশি করতে পারো। কিন্তু আমি আমার সন্তানকে হত্যা করব না!

আব্বা ঠাস করে আম্মার গালে চড় মারল। ভিতু লোক তো কোনও কিছু বেশি দূর আগাতে পারে না। ধুমধাম সিদ্ধান্ত নেয়। ধুমধাম হাত-পা চালায়। মুখ চালায়।

আব্বা বলল, খানকি মাগি, তোর এসব গান অন্যখানে শুনাইস। সন্তান পাইলি কই! দেড়মাসও তো হয় নাই। নাইলে সর্বোচ্চ দুইমাস হইছে মনে কর। এইটা কি এখন! একটা মাংসের দলা। এইটারে গুরুত্ব দেয়ার কিছু না। এখন কত সহজ তুই জানোস। একটা দুইটা ওষুধ দিব নেহাল, অটোমেটিক সব খালাস হয়া যাবে। ‘আমি আমার সন্তানকে হত্যা করব না’Ñ এসব নেকামি সুর তুলবি না। আমি চেতলে কেমন তুই তো জানোস।

তোমার চেতা লাগব না। তুমি আর আইসো না এখানে।

আব্বা এই কথায় আরও রেগে গেল। আমি উপলব্ধি করছি আব্বা রাগে কাঁপছে। তার ঘাড়ের, গলার রগগুলো টনটন করছে। আব্বা বলল, কী! তোর এত্ত সাহস। আমি আসব না। এই ফ্লাটের ভাড়া আমি দিই। ওই যে খাট, ওই চেয়ার, ডেসিং টেবিল সব আমার কেনা। আর তুই আমারে কস তুমি আর আইসো না। খুব তেল হইছে তোর! ঘানিতে নিয়া চিপতে হবে তোরে।

ঠিকাছে রেজা, আমিই চলে যাচ্ছি। তুমি তোমার ফ্লাট, চেয়ার, টেবিল নিয়া থাকো।

আম্মা বেরুতে নেয়। আমার আব্বা হারমাজাদা আমার আম্মার গলা টিপে ধরে। আম্মার দম বন্ধ হয়ে আসতে থাকে। আমি একটা মাংসের দলা। কিন্তু জীবিত। আমারও নিঃশ্বাস নিতে কষ্ট হতে থাকে। আমি চিৎকার করে বলতে চাই, আম্মা কিছু একটা করো। আমারে বাঁচাও। তুমিও বাঁচো।

আম্মা হাটুটা দিয়ে আব্বার দুই ঊরুর মাঝখানে মারে। আব্বা ‘বাবাগো’ বলে বসে পড়ে। এইবার তার শ্বাসকষ্ট হতে থাকে। কিন্তু আব্বা সামলে নেয়। উঠে বলে, তোর এত্ত সাহস মাগি, তুই আমারে মারোস, তোরে আমি।

আম্মা আবার তার ঠান্ডা চোখ বড় বড় করে মেলে দেয়। তার কণ্ঠ আরও ঠাণ্ডা। আম্মা ঠান্ডা কণ্ঠে প্রত্যেকটা অক্ষর বানান করার মতো করে বলতে থাকে, শোনো রেজা। আমি সত্যিই চলে যাচ্ছি। আমার পেটে যে আসছে সে আমার প্রথম সন্তান। সে সন্তান তোমার মতো হারামির দেয়া। কিন্তু সে আমার সন্তান। সে যদি জারজ হয়, নোংরা হয়, পঙ্গু হয়, প্রতিবন্ধী হয়, হোক। আমি তাকে পালব, বড় করব। আমার নিজের অংশ সে। যতটুকু তোমার অংশ ততটুকুর জন্য আমি লজ্জিতও না। কারণ তুমি আমার সাথে সেক্স করছ, দিনের পর দিন, রাতের পর রাত, তুমি আমারে খাইতে দিছো, পড়তে দিছো। কিন্তু ভালোবাসো নাই। আমি বাসছি। আমি তোমারে ভালোবাসছি। তুমি একটা পাক্কা হারামি। তবু তোমারে আমি ভালোবাসছি। বাসব। জগতে এমন কোনও নিয়ম নাই যে একটা হারামজাদারে ভালোবাসা যাবে না। আমি তোমারে ভালোবাসি হারামজাদা।

আব্বা এগিয়ে আসে। তার হাতে একটা পিতলের ফুলদানি। আম্মা ঘাবড়ায় না। আমি মনে মনে বলি, সাবাশ আম্মা। কিন্তু আমার কি মন তৈরি হইছে, আমি কি কথা বলতে পারি ? আম্মা কি আমার কথা শুনতে পায়, বুঝতে পায় ? কোনও স্বর কি বের হয় আমার ভেতর থেকে। আমি একটা মাংসের দলা। আব্বা হারামজাদা এগিয়ে আসে। আম্মাকে মারবে। আম্মা হাতটা সামনে বাড়ায়, হাতের ভঙ্গিতে আব্বাকে থামতে বলে।

আম্মা বলতে থাকে, শোনো রেজা, মারধোর কোরো না। আমি মরে গেলে তুমি বিপদে পড়বে। আমার সঙ্গে কোনও জোরও খাটিও না। এতকাল তুমি যা বলেছ আমি তাই শুনেছি। এইবার আমি বলি, তুমি শোনো―আমি কথা দিচ্ছি, আমি তোমাকে কোনও বিপদে ফেলব না। আমার বা আমার বাচ্চার কোনও দায় তোমাকে নিতে হবে না। এমনকি পরিচয়ের দায়ও না। তুমি নিশ্চিত থাকো, আমি কোনও দিন তোমার সামনে, তোমার বউ-বাচ্চার সামনে গিয়ে দাঁড়াব না। কোনও দিন কাউকে বলতে যাব না, আমার বাচ্চার বাবা তুমি।

তুই বললেই হবে ? এত্ত সহজ না। তুই বললেই আমি মানব কেন, এইটা আমার বাচ্চা। তুই কত বেডার সঙ্গে শুইছস তার হিসাব করাও তো মুশকিল। তুই নিজেও তো গ্যারান্টি দিয়া কইতে পারবি না তোর বাচ্চার বাপ কোনটা।

পারব রেজা। এখন ডিএনএ টেস্ট বলে একটা ব্যাপার আছে। কিন্তু এসব আমি করব না। আমি বললাম তো, সব শেষ করে দাও। তোমাকে আমি চিনি না, তুমি আমাকে চেনো না। আমি একটা বাজে মেয়ে। বাপ-মা, বাড়ি-ঘর ছেড়ে এসেছি এই শহরে, বড় লোকদের বিয়েতে, জন্মদিনে, সুন্নতে খৎনায় গান গাই। হিন্দি গান, বাংলা গান, লালন, লুঙ্গি ডান্স সবই গাই আমি। আমার গানের মতো আমিও বাজাইরা। কাজেই আমাকে নিয়ে তোমার ভাবতে হবে না। আমাকে কেউ জিজ্ঞেস করলে আমি বলব, বাচ্চার বাবা মারা গেছে। তুমি প্লিজ আমাকে বিরক্ত  কোরো না। আমি তোমার কাছে কোনও দিন আসব না।

২.

আমার বয়স এখন আটমাস।

পৃথিবীতে নয়, আম্মার পেটেই আমার বয়স আট মাস। আমার এখন হাত হয়েছে, পা হয়েছে, চোখ হয়েছে, মগজ হয়েছে। আমি এখন মাংসের দলা নই। একটা আস্ত মানুষ। আর কয়দিন পরই আমি আম্মার পেট থেকে বেরিয়ে আসব। আমি আম্মার পেটের বাইরের দুনিয়াটাকে দেখব।

কিন্তু আমার ভয় করতে থাকে।

আম্মার পেটের বাইরে যে দুনিয়া সেটা ভালো না। দুনিয়াতে আসার আগেই আমি সেটা টের পেয়েছি। আমাকে পেটের ভেতরে নিয়ে আম্মা কত জায়গায়ই না গেল। আব্বা হারামজাদা পিছু ছাড়েনি। সবসময় খোঁজ খবর রেখেছে। দুয়েকদিন আম্মার সামনে এসেছে। বোঝাতে চেয়েছে, আমাকে মেরে ফেলতে চেয়েছে। এমনকি আমার সাত মাসের সময়ও বলেছে, শোন, আমি তোরে ক্ষমা করে দিব। রাজরানি বানিয়ে রাখব। ফ্লাটটা তোর নামে করে দিব। তুই বাচ্চাটা ফেলে দে। কী দরকার বাচ্চা-কাচ্চার। আমরা সারা জীবন আনন্দ-ফুর্তি করে কাটাব। কেন তুই এত কষ্ট করছিস! বাচ্চা হলে কিন্তু তোর ফিগারও ঠিক থাকবে না। তলপেটে চিরস্থায়ী দাগ হয়ে যাবে। চামড়া ঝুলে যাবে। শরীর ভারী হয়ে যাবে। তুই না গায়িকা হইতে চাইছিস, আমি তোর গান রেকর্ড করাব। রিলিজ করাব। শুধু এই বাচ্চা…

আম্মা শোনেনি এসব কথা। আব্বা রাগ দেখিয়েছে, মেরেছে, ফুসলিয়েছে কিন্তু আম্মাকে টলাতে পারেনি। এমনকি আম্মা যেখানে যেখানে গেছে সেখানে সেখানে গিয়ে আব্বা নানা রকম তামশা করছে। আম্মাকে এক বাড়ি থেকে বেরও করে দেয়া হয়েছে। কিন্তু আম্মা আমাকে মারেনি। মারবে না।

আম্মা একদিন মলি খালাকে বলেছে, শোন মলি, আমার সন্তান আমার। যতদিন সে আমার পেটে আছে, যতদিন সে পৃথিবীতে নিজে চলার মতো বড় না হয় ততদিন সে আমার। সে সামর্থবান হয়ে উঠলে সে স্বাধীন। সে হবে এই পৃথিবীর একমাত্র স্বাধীন সন্তান। আমি কোনও দিন ওর উপরে কোন দাবি, আশা ভরসা রাখব না। ও ওর মতো চলবে। ওর যা খুশি মন চায় ও চলবে। ও আমার মতো বন্দি হয়ে থাকবে না। ও হবে স্বাধীন, মুক্ত। আমি ওকে উড়তে শেখাব।

মলি খালা শুধু বলেছে, তুই একটা আস্ত পাগল রে!

মায়ের পেটে আট মাস বয়স হলেও মানুষ সব বুঝতে পারে। এমনকি মায়ের পেটে মাংসের দলা পাকানো থেকেই আমি সব বুঝতে পেরেছি। আমি বুঝেছি, আমার আম্মা পাগল না। সে মানুষ। আব্বা হারামজাদা আমার আম্মাকে যত গালি দিক, আমার আম্মা সত্যিকারের মানুষ। আর আমি বুঝতে শিখেছি, সত্যিকারের মানুষকে বিপদে ফেলে লাভ নেই। আমার জন্মটা আম্মার জন্য বিপদ। আম্মার পেটের বাইরে যে দুনিয়া আছে তা সুন্দর নয়। আমি অসুন্দর দুনিয়ায় এলে আম্মার ঝামেলা আরও বাড়বে। আমাকে নিয়ে আম্মা গত কয়েক মাস লড়াই করে ক্লান্ত। আমি জন্মালে আরও কত বছর আম্মাকে লড়াই করতে হবে ? কবে আমি সামর্থবান হয়ে মুক্ত, স্বাধীন হব ? কবে আমার আম্মা স্বাধীন, মুক্ত হবে ? আমি তো কিচ্ছু পারি না। পারব না। আমি জন্মাব। আরও দিন যাবে, মাস যাবে, বছর যাবে, তারপর কোনও দিন একদিন আম্মার জন্য কিছু একটা করতে পারব। কিন্তু কবে সেটা ? আদৌ পারব তো ? আমি জানি না।

আমি যেটা জানি, আমি এখনই মরে গেলে, আম্মা স্বাধীন হয়ে যাবে। আম্মা কাঁদবে অনেক। আম্মা হয়তো তার অহংকারের লড়াইটাতে হেরেও যাবে। কিন্তু জেতার কী দরকার। মানুষকে এত জিততে হবে কেন ? আম্মা বরং আমাকে জন্ম দেয়া, বড় করার লড়াইটা ছেড়ে দিক। আম্মা বরং আবার তার সুরের দুনিয়ায় ফিরে যাক। আম্মা বরং গানের মধ্যে আমাকে খুঁজুক।

আমি আম্মার পেটের মধ্যে ঘুরতে থাকি। নাড়ির মধ্যে জড়াতে থাকি নিজেকে। আমি চাই, আমার গলার মধ্যে নাড়িটা পেঁচিয়ে যাক। তারপর আমার নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে আসুক।

আম্মা আমাকে ক্ষমা করো, আমি তোমাকে হারিয়ে দিচ্ছি আম্মা। কিন্তু আমি জানি, আমি তোমাকে মুক্ত করে দিচ্ছি, স্বাধীন করে দিচ্ছি। তুমি কষ্ট রেখো না আম্মা। আমি অনেক সুখে ছিলাম। তোমার পেটের মধ্যে অনেক ওম আর আরাম। আমি এই ওম আর আরামের স্মৃতি নিয়েই চলে যাই আম্মা। তুমি আমাকে ধারণ করার স্মৃতি নিয়ে থেকো। তারপর শোক কমলে, শরীর সুস্থ হলে তুমি গান গেয়ে ওঠো, তোমার সুরে, তোমার কণ্ঠে আমি থাকব আম্মা। আই প্রমিজ।

ঢাকা থেকে

সচিত্রকরণ : নাজিব তারেক

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button