আর্কাইভগল্পপ্রচ্ছদ রচনা

পলায়ন : মাহবুব ময়ূখ রিশাদ

বিশেষ গল্পসংখ্যা ২০২২ : বাংলাদেশের গল্প

দরজাটি যেন ঘুমিয়ে আছে ভুল জায়গায়। প্রথমে চোখের ভুল মনে হতে পারে কিন্তু একটু ভালো করে তাকালেই দেখা যাবে, ছোট বর্গক্ষেত্রের মতো বাদামি রঙয়ের দরজাটি আড়াআড়িভাবে ফ্লোরের মোজাইকের ওপর সত্যিই আছে এবং আচমকা দেখলে মনে হবে নিচে হয়তো বেজমেন্টের দিকে কোনও সিঁড়ি নেমে গেছে।

১ জুলাইয়ের পরেই বিষয়টি প্রথম নজরে আসে মোহনের। যেহেতু এই ঘরে মোহন দীর্ঘদিন আছে, সেই ছোট থেকে বড় হওয়া অবধি―সুতরাং মোহন জানে সে কিছুই দেখছে না, সব তার চোখের ভুল, গুলশানের নারকীয় হত্যাকাণ্ডের পর মানসিক চাপ থেকে হ্যালুসিনেশন হওয়াটা খুব বিচিত্র কিছু নয় নিশ্চয়। ইচ্ছে করেই শান্তা কিংবা বাবা-মার সঙ্গে শেয়ার করেনি বিষয়টি। চিকিৎসক বন্ধুকে বললে, তাকে সাইকোথেরাপির জন্য কারও কাছে পাঠিয়ে দেবে অথবা নানা ধরনের সান্ত্বনার কথা বলে এর সমাধান করতে চাইবে নিজেই।

ব্যাপারটা যদি, হলি আর্টিজানের হামলার সঙ্গে স¤পর্কিত হতো, তবে শুধু একটি দরজার ছবি কেন ভেসে উঠবে চোখের সামনে ? এটা কি সেই দরজা যে পথে হোস্টেজরা পালিয়ে যেতে পারত নাকি এটি সেই পতনের দরজা, যে পথে গেলে অবলীলায় বিশজন মানুষকে গর্দান থেকে আলাদা করে ফেলা যায় ? ভেবে কুলকিনারা পেল না মোহন। 

তার মনে পড়ল রঞ্জু ভাইয়ের কথা। দীর্ঘশ্বাস বের হয়ে এল সঙ্গে সঙ্গে। রঞ্জু ভাইকে মেরে ফেলা হয়েছে আজ প্রায় দশমাস। ভুলেই গিয়েছিল। গুলশান ট্র্যাজেডি নতুন করে সামনে নিয়ে এসেছে তাকে। ঘটনার শুরু থেকেই রঞ্জু ভাইসহ অল্প কিছু মানুষ বলেছিল যে, আমাদের একটু শিকড়ে যাওয়া দরকার, শিক্ষার শিকড়ে, মূল্যবোধের গভীরে। ছেলেমেয়েরা কোথায় যাচ্ছে, তাদের বিনোদনের উৎস কি, তারা কীভাবে বড় হচ্ছে, কোন চিন্তা দানা বাধছে তাদের মাথায়―সবকিছু মূল্যায়ন করা দরকার। অথচ মোহন নিজেই তখন উড়িয়ে দিয়েছিল।

‘কী যে বলেন, রঞ্জু ভাই। দু-একটা বিচ্ছিন্ন ঘটনা, এতটা প্যানিক্ড্ হবেন না।’

‘তোদের এই ডিনায়্যাল প্রবণতা ডোবাবে আমাদের।’

রঞ্জু ভাইয়ের চেঁচামেচিতে টং দোকানের সবার দৃষ্টি তাদের দিকে চলে এসেছিল। সেবার কোনওমতে রঞ্জু ভাইকে শান্ত করে বাড়ি পাঠিয়েছিল মোহন। সেদিন কি জানত, আর কয়েকদিন পর তাকে সান্ত্বনা দেওয়ার কেউ আর থাকবে না অথবা যারা থাকবে তাদেরকে সে বিশ্বাস করতে পারবে না ? যে বন্ধুটির সঙ্গে ছোটবেলা থেকে বড় হয়েছে একসঙ্গে, তাকে দেখলে এড়িয়ে যেতে হবে ? যে রুমমেটের সঙ্গে দীর্ঘ পাঁচ বছর ভার্সিটি লাইফে থাকা হলো, তাকে রিমুভ করে দিতে হবে ফেসবুক থেকে ? এত এত কাটানো ভালো সময়ের স্মৃতিই বা মুছে ফেলে কীভাবে মানুষ ?

কিছুই মুছে ফেলতে হয়নি, জীবনও থেমে থাকেনি। রঞ্জু ভাইকে হত্যার খবর যখন ব্রেকিং নিউজ হিসেবে আসছিল স্থির দৃষ্টিতে টিভি চ্যানেলে তাকিয়েছিল মোহন। তারপর দুটো স্লিপিং পিল খেয়ে ঘুমিয়ে পড়েছিল। ফোন বন্ধ রেখেছিল কয়েকদিন। তখন যদি পাত্তা দেওয়া হতো, সত্যি কি কিছু বদলাতো ? কে জানে। স্যান্ডেল পায়ে গলিয়ে এসব ভাবনার ভেতরে বাথরুম থেকে হাতমুখ ধুয়ে আসতেই শান্তাকে দেখতে পেল, রেডি হচ্ছে।

‘তুমি যাবে না ?’

চিৎকার দিয়ে উঠল মোহন। ¯পষ্ট দেখতে পেল দরজাটির ভেতরে শান্তার পা ডুবে যাচ্ছে । ধাক্কা দিয়ে সে সরিয়ে দিতে চাইল শান্তাকে।

‘আশ্চর্য! হচ্ছেটা কী ? তোমার মাথাটা কি একেবারে গেল ? নাকি ভাবছ যে কেউ আমাদের অ্যামবুশ করবে ? আমরা সাধারণ মানুষ, ভয় কিসের এত ? কাম ব্যাক টু লাইফ।’

প্রথমে ব্লগার, এরপর প্রকাশক, ইমাম, পুরোহিত, বিদেশি―আর কে বাকি আছে বলো তো ? কথাটা বলতে গিয়েও বলল না মোহন। পুরো শরীর ঘামছে। মনে হচ্ছিল, চোখের সামনে তলিয়ে যাবে শান্তা, সে কিছুই করতে পারবে না।

‘ঠিক আছে, তুমি বাসায় থাকো, আমি যাচ্ছি। কোথাও যাওয়া লাগবে না তোমার।’

নীরবে মেনে নিল মোহন। এমন নয় যে গুলশানের ঘটনা বিচলিত করেনি শান্তাকে। করেছে কিন্তু এখন হয়তো এসকেপ রুট খুঁজছে সে।

খানিক রাগ করে শান্তা বের হয়ে গেলে মোহন ভাবে একটু হেঁটে আসবে রাস্তা থেকে। ১ তারিখের পর আর বের হয়নি, অফিস ছুটি নিয়েছে। ভয়ের কারণে বের হচ্ছে না―ঠিক তাও নয়, কেন যে গুটিয়ে যাচ্ছে, কারণটা নিজেও ধরতে পারছে না। এমনিতেই শান্তার সঙ্গে সময় ভালো যাচ্ছে না তার। কেবল যেন থাকার জন্যই থাকছে, আছে তারা। অফিসেও গোলমাল হচ্ছে। এই তো সেদিন চানখারপুল থেকে যাত্রাবাড়ি ফ্লাইওভারে ওঠার সময় বিনা কারণেই রোড ডিভাইডারের সঙ্গে ধাক্কা খেয়ে গাড়ির বারটা বাজাল। ছোট ছোট দৈনন্দিন ঘটনা কি বড় কিছুর ইঙ্গিত দিচ্ছে ব্যক্তিগত জীবনেও ?

বের হওয়ার সময় আড়চোখে মেঝের দিকে তাকাল মোহন। দরজাটা বেমালুম গায়েব হয়ে গেছে। বাইরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়ার পরই হ্যালুসিনেশন থেকে মুক্তি পেল কিনা―এমন চিন্তায় ডুবে যাওয়ার আগেই পায়ের কাছ থেকে শুনতে পেল মিয়াও ডাক। ছোটভাই দীপ্তর বিড়াল। কেনা নয়, রাস্তা থেকে ধরে এনেছিল দীপ্ত। কে বা কারা ইটের টুকরো ছুড়ে মেরেছিল বিড়ালটিকে। বাসায় এনে সুস্থ করে তুলেছিল সে। এখন বিড়ালটির চেহারাই পরিবর্তন হয়ে গেছে। দীপ্ত নাম রেখেছে―লিও।

মোহনের অবশ্য পশুপাখির প্রতি তেমন কোনও বাড়তি আগ্রহ নেই। কেন জানি, বিড়ালটিও বেশ ভয় পায় মোহনকে। মাঝে মাঝে দৌড় দিয়ে পালিয়ে কোথায় যেন চলে যায় ওকে দেখলেই। আজ কীভাবে পায়ের কাছে চলে এল একেবারে ? দীপ্ত বলে ডাক দিয়ে থেমে গেল মোহন। বাসায় নেই। খালার বাসায় গেছে। গুলশানের ঘটনার দিন কাছাকাছি ছিল সে। সারারাত বাবার ছটফটানি। না ঘুমিয়ে কাটিয়ে দিলেন পুরো রাত। এত কিছুর মাঝে বিড়ালটার কথা মনে হয়েছে কারও ? খেতে দিয়েছে কেউ ? বিপদে পড়ে এভাবেই তো মানুষও যায় অপছন্দের মানুষের কাছে। আমাদের বিপদে তবে কার কাছে যাব আমরা ? মোহন ভাবে।

করিডোরে চলে এল মোহন। বিড়ালটাও ছাড়ল না পিছু। একবার খেতে দেওয়ার কথা ভাবলেও, পরে এসে খাওয়াবে ঠিক করল।

থেমে থেমে বৃষ্টি হচ্ছে কদিন ধরেই। আকাশ মেঘে ঢাকা। ঈদের চাঁদ দেখা যাবে কিনা কে জানে। একটা সময় ছিল যখন মফস্সলের ঈদের আগের দিনের সন্ধ্যায় পটকা, বাজির আওয়াজে মানুষ পরদিন ঈদের প্রস্তুতি নিতে বসত। মায়ের কাছে বকা খেত প্রচুর, তারপরেও পটকা ফুটাতে পিছ পা হতো না মোহন। নতুন জামার ঘ্রাণ নিত একটু পর পর। মধ্যবিত্ত পরিবারে বছরে কয় দিনই আর ভালো রান্না হয়! বাজি ফুটিয়ে, সারা মহল্লা টই টই ঘুরে রাতের বেলা রান্নাঘরের চারপাশে ঘুরঘুর করত মোহন। সেসব মায়াবী  রাত বদলে গেছে অনেক আগেই। আর এবার মোহনের মনে হচ্ছে এতটা তীব্র, বীভৎস অন্ধকার সে কোনওদিন দেখেনি। নিরীহ পটকা, বাজির শব্দ শুনলে মানুষ এখন ঘরের দরজা-জানালা সব আটকে দেয়।

পাতাবাহার ছুঁয়ে আছে রেলিং। বৃষ্টিস্নাত হয়ে সেগুলো জ্বলছে, যেন তাদের জš§ হচ্ছে নতুন করে। আর নিজেকে দেখে মোহনের মনে হলো ক্রমশ পতনের দিকে যেতে যেতে এখন আর তল খুঁজে পাচ্ছে না কোথাও, যেখানে সে একা নয়, নিচে নামছে পুরো দেশটাই। পিচ্ছিল হয়ে আছে মোজাইক। সাবধানে পা ফেলতে ফেলতে মুচকি হেসে ফেলল। আহা! এই সাবধানতা যদি থাকত সবার!

আবার রঞ্জু ভাইয়ের কথা মনে হলো তার।

‘আমাদের পালা শেষ হলে তারপর অন্যরা। এ তো কেবল শুরু, মোহন। একটু খোঁজ-খবর নে নিজের আত্মীয়স্বজনের ভেতর কেউ নিখোঁজ কিনা। পরে পালানোর সুযোগ পাবি না।’

নিজেকে দোষী মনে হচ্ছিল দেখে পুরো স্মৃতির ওপর ফেলে রেখেছিল পর্দা। রঞ্জু ভাইয়ের মৃত্যু যেভাবে ভুলে বসেছিল, চাইলেই কি এখন এড়িয়ে যাওয়া যাবে ? সবাই হয়তো চুপ ছিল কিন্তু নিজের জায়গা থেকে কিছুই করা হয়নি―এসব ভাবনা প্রতি মুহূর্তে মোহনকে মেরে ফেলছে। একবার মনে হলো, এটা হয়তো একটা ভান―অন্যদের সঙ্গে তার  খুব একটা পার্থক্য নেই, নিজেই এক ধরনের ইল্যুশন তৈরি করেছে সে, যেন নিজের কাছে ভালো সেজে খানিকটা আত্মপ্রসাদ লাভ করা যায়। তাছাড়া এতগুলো জবাই হয়ে থাকা মানুষের কথা ভুলতে আনুমানিক কতদিন লাগতে পারে কেউ কি বলতে পারে ?

ধানমন্ডির রাস্তা শূন্য। বৃষ্টি নেই এখন। বৃষ্টির গন্ধও নেই। অথচ একটা সময় গন্ধটা থাকত অনেকক্ষণ ধরে। সমাজের মতো প্রকৃতিও বদলে যাচ্ছে। রাস্তার  একপাশে ফুটপাত ঘেঁষে জমে থাকা পাতা-জমা জল, ভেজা রাস্তার বুক চিরে বের হয়ে যাওয়া প্রাইভেট কারের টায়ারের দাগ, কুকুরের ছোট ছোট পায়ের ছাপ, বলে দিচ্ছে বৃষ্টি থেমেছে বেশ কিছুক্ষণ। একটা কমবয়সি ছেলে হুঁশ করে পাশ কাটিয়ে চলে গেল। ভয় পেয়ে গিয়েছিল মোহন। ক্ষণিকের জন্য ভেবেছিল, কেউ বুঝি মেরে গেল।

ধানমন্ডি সাত নাম্বার রোডের আলিশান মসজিদের সামনে পুরো এলাকার নীরবতা আচমকা মিলিয়ে গেল, বেশ ভিড় এখানে। নামাজের সময় এখন। মানুষ কি নিশ্চিন্ত মনে নামাজে যেতে পারছে ? ধানমন্ডি আট নম্বর ব্রিজের দিকে আগায় মোহন। হাতের ডান পাশে রাশিয়ান কালচারাল সেন্টারে ভিড় নেই। দূর থেকে রবীন্দ্র সরোবর মঞ্চের সামনে ঝুলে থাকতে দেখে সাদা কাপড়। কোনও অনুষ্ঠান হবে হয়তো। আচ্ছা, কেউ কি মঞ্চটিকেও পর্দা পরিয়ে দিতে চাচ্ছে ?

একটা সিগারেট ধরিয়ে মোহন ভাবে কোনদিক যাবে। ঈদের শপিংয়ের জন্য বসুন্ধরা কিংবা যমুনায় আর যাওয়া হয়নি। প্রতিবারের মতো সিনেপ্লেক্সে মুভিও দেখা হবে না।

            বিড়ালটা এখনও বিশ্বস্ত বন্ধুর মতো পাশে হাঁটছে। বিড়ালের ক্ষমতা নেই তার ঘাড়ে কোপ দেওয়ার―এটুকু ভরসা পেয়ে জীবনে প্রথমবারের মতো বিড়ালটিকে আপন মনে হলো মোহনের।

এতকিছু ঘটে যাচ্ছে, চোখের পলকে রঙ বদল হচ্ছে―অথচ কথা বলার একজন মানুষও নেই। তার আচমকা মনে হলো, বিড়ালটি কথা বলতে পারে। তাকে দেখলে যে ভূত দেখার মতো চমকে দূরে সরে যেত, সে আজ দিব্যি পায়ে পায়ে ঘুরছে; গোপন কোনও সংকেত লুকায়িত না থাকলে এমন হয় ? ঘুমন্ত দরজা যদি দেখা যায়, তবে বিড়ালের কথা বলতে দোষ  কী ?

স্বাভাবিকভাবে মোহন প্রশ্ন করল, ‘তুই কথা বলতে পারিস ?’

এক বাক্যে বিড়ালটি উত্তর দিল, ‘পারি।’

নিজের ধারণা সত্য হতে দেখে, খুশি হলো সে। খানিকটা পথ হাঁটল আরও। বলল, ‘মানুষ কি বিড়াল, সব শালার অভিনেতা। তুই ও কি ভয় পাচ্ছিস ?’

বিড়ালটি তার সাদাটে শরীরের পুরোটা একবার বাঁকায়, মানুষের আড়মোড়া ভাঙার মতো করে। তারপর বলল, ‘মেরে ফেলবে।’

ঝুঁকে ফুটপাতে বসল মোহন। জানতে চাইল, ‘কে মারবে ?’

কত বিড়াল আছে। সবাই বিদ্রোহী। মানুষের স্পর্শ বড় খারাপ।

রাগ হলো মোহনের। কোথাকার কোন হতচ্ছাড়া প্রাণী এসে মানুষ স¤পর্কে যা-তা কথা বললেই মেনে নেওয়া যায় ?

সে ভাবল, বিড়ালটি রেখে সে চলে যাবে, তার কোনও বন্ধুর দরকার নেই।

 উঠে বসতেই দেখল ঘরের ভেতর দেখতে পাওয়া দরজাটির ভেতরেই ডুবে যাচ্ছে বিড়াল। দরজাটি এখানে এল কী করে ? ঘটনার হতবিহবলতায় কিছু বুঝে ওঠার আগেই মোহনের চারপাশ শূন্য হয়ে গেল। সে দেখতে পেল, কেবল বিড়াল নয়, ছোট্ট এই দরজা ভেদ করে মানুষের পর মানুষ চলে যাচ্ছে, বিল্ডিং সংকুচিত হয়ে ঢুকে যাচ্ছে, এমনকি কারেন্টের তারে বসে থাকা কয়েকটি কাককেও চোখের পলকে হারিয়ে যেতে দেখল মোহন।

দৌড়ে বাসায় ফিরতে ফিরতে তার মনে হলো একটা দুঃস্বপ্নের ভেতর দিয়ে যাচ্ছে সে। এসব ভাবনার ভেতরে ঘুরে ফিরে আবার বাসার গেটে আসতেই করিডোর শান্তা ও মা-বাবার সঙ্গে দেখা হয়ে গেল মোহনের। পুরো সময়ের সঙ্গে বেমানানভাবে সবার মুখ ঝলমল করছে আনন্দে। বিভ্রান্তিতে ডুবে মোহনের মনে হয়, আসলেই কি তারা আনন্দিত নাকি  সে নিজেই এত বিষণ্ন হয়ে আছে যে তুলনায় অন্য সবাইকে স্বাভাবিকের চাইতে খুশি মনে হচ্ছে ? শান্তা কিছু বলার সুযোগ না দিয়েই হাত টেনে আবার বাসার দিকে নিয়ে চলল। বাবা-মার মুখে হাসি। একবার শান্তার দিকে তাকাল, একবার বাবা-মার দিকে। কিছুই বুঝতে পারল না। রহস্যময় হাসি মুখে রেখেই, ঘরের দরজা লাগিয়ে দিল শান্তা আর তখনই বিকট শব্দে বাজ পড়ল কোথাও। সবসময় বাজের শব্দ শোনা না গেলেও এখন ঠিক শোনা গেল আর মোহনের নার্ভাসনেসও যেন বেড়ে গেল প্রায় সঙ্গে সঙ্গে।

‘এত নাটক কীসের ?’

‘কী হয়েছে তোমার বলো তো ? ১ তারিখের পর থেকেই দুনিয়া বন্ধ করে বসে আছো। লাভ কী হচ্ছে এসব করে ?’

শান্তাকে কিছু বলতে ইচ্ছে হলো না মোহনের। সে চুপচাপ বিছানায় বসল। ঘরের ভেতর গুমোট গন্ধ। ফ্লোরের ভেতর আংটা লাগানো দরজাটি দেখতে পেল আবার। চমকে গিয়ে জানতে চাইল, ‘এটা তবে সত্যি আছে ?’

‘কোনটা কী ? কোনটা সত্যি আছে ?’ শান্তা খুব একটা পাত্তা দেয় না মোহনের কথা। বলল, ‘তুমি এখনও কিছু বুঝতে পারছ না ? উই আর গোয়িং টু বি প্যারেন্টস।’

মোহনের মাথার ভেতর পাগলা ঘণ্টা বেজে উঠল যেন। ঢং ঢং। কোনও প্যাটার্ন ছাড়া ঘণ্টাটি বাজতেই থাকল। আর ফ্লোরের আংটা লাগানো ছোট্ট দরজা যেন বড় হতে হতে পুরো ঘরকেই দখল করে ফেলল। ঘণ্টার শব্দে আর কিছু শুনতে পেল না মোহন। সে কানে হাত দিলে শব্দ যেন তার মগজের ভেতর ঢুকে গেল।

‘শান্তা, তুমি কি সিমোনার কথা জানো ? সেই সিমোনা যে কয়েকদিন পর মা হতো ? যাকে মেরে ফেলা হলো, জবাই করা হলো―সেই সুদূর ইতালির ম্যাগলিয়ানো সাবিনো শহর, যা রোম থেকে এক ঘণ্টা দূরের পথ―সে তার জš§ভূমি থেকে বহুদূরের এক রেস্তোরায় নিহত হলো ? তোমাকেও তো আমি বলেছিলাম, সিমোনার কথা। দুই তারিখে। চোখ ভিজে উঠেছিল তোমার। আজ তুমি হাসছ ? যে শহরে আকাশে-বাতাসে শকুনের দল, বিষাক্ত বিষবাষ্প নিয়ে উড়ে বেড়াচ্ছে মানুষের বেশে, মানুষের হাতে তলোয়ার-চাপাতি। সেখানে তুমি আরেকজন নতুন মানুষ আনতে চাও, শান্তা ? সে এসে দেখবে, কতগুলো জঙ্গি ঘুরছে ফিরছে, একে অপরের উপর হামলা করছে ?’

মোহন ঠিক নিশ্চিত হতে পারে না, এসব কথা সত্যিই সে বলে নাকি বলে না। তার দুচোখে ঘুম নেমে এল। শান্তা বুঝল না, এমন একটা খুশির খবরে এত অদ্ভুত প্রতিক্রিয়া কেন দেখাল, মোহন ? সে বলল, ‘তুমি আর মানুষ নেই মোহন।’

মোহন বলল, মানুষ নেই তো কোথাও। বিড়ালেরাও ছেড়ে যেতে চাইছে আমাদের। এর ভেতর, নতুন আরেকজন।

ঘর থেকে বের হয়ে যাচ্ছিল শামা। মোহনের কথা শুনে বাধ্য হলো দাঁড়াতে।

‘বিড়ালেরাও আজকাল কথা বলছে তোমার সাথে ?  আর আমি এতটাই পরিত্যাজ্য তবে ? আই উইল

কিল দ্যাট ব্লাডি ক্যাট। সেই নিশ্চয় তোমাকে বলেছে বাচ্চা নেয়া অযৌক্তিক। তাই না ?’

অবাক বিস্ময়ে মোহন দেখল, মেরে ফেলা বিষয়ক বিড়ালের চিন্তাটি অবান্তর নয়। ঘরেই আছে হন্তারক। কে জানে, তখন সে নিজেই হয়তো মেরে ফেলত বিড়ালটিকে, দরজার ভেতরে ডুব না দিলে। আর কিছু না বলে চুপ হয়ে গেল সে।

শান্তা রেগে, ভাষা হারিয়ে অন্য ঘরে চলে গেলে আধো ঘুম, আধো জাগরণে রহস্যের দরজাটি খোলে মোহন। তার ও শান্তার জীবনে নতুন মানুষ যেহেতু আসছে, তাকে তো বাঁচিয়ে রাখতে হবে। হয়তো ওই আংটার ভেতরে, দরজার ভেতরে অন্য পৃথিবী লুকিয়ে আছে। নাহয় তখন সবাইকে অমন হুড়মুড় করে যেতে দেখল কেন ?

অন্ধকারের সিঁড়ি বেয়ে নেমে একটি রক্তনদী দেখতে পেল মোহন। সঙ্গে সঙ্গে এসে হাজির হলো বিড়ালটি। এই অচেনা জায়গায় চেনা কিছু দেখে ভরসা পেল যেন। তবে তা ক্ষণিকের জন্য। বিড়ালটি দৌড় দিয়ে পালিয়ে গেল চোখের পলকেই―যেন লুকোচুরি খেলছে। তা দেখে অহেতুক  মন খারাপ হলো মোহনের। এই যে সমস্ত জীবন স্থবির হয়ে উঠছে, সন্তান আসবে এই খবরেও উচ্ছ্বসিত হতে পারছে না অথচ তার কি না বিড়াল চলে যাওয়ার কারণে মন খারাপ হচ্ছে ?

রক্তনদীর তীর ধরে হেঁটে যেতে যেতে মোহন দেখতে পেল, এখানেও পড়ে আছে জবাই করা লাশ। লাশের স্তূপ। পালাবে কোথায় ? শান্তার অবস্থাও তবে সিমোনার মতো হবে ? ফেরানোর কোনও উপায় নেই ? আর এ মুহূর্তেই মোহন বুঝতে পারল, বিড়ালটি চলে যাওয়ায় কেন মন খারাপ হয়েছিল তার―অন্য সবাই পালিয়ে যেতে পারলেও এ দেশের মানুষের যে আর পালানোর সুযোগ নেই। আছে কি ? জিজ্ঞেস করার জন্য নিজের ছায়াকেও দেখতে পেল না মোহন।

ঢাকা থেকে

সচিত্রকরণ : ধ্রুব এষ 

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button