আর্কাইভগল্পপ্রচ্ছদ রচনা

চুপকথা : অলোক গোস্বামী

বিশেষ গল্পসংখ্যা ২০২২ : ভারতের গল্প

কু উ উ উ।

স্বরটা কানে যেতেই চমকে উঠলেন নীলেশ। কোথা থেকে ভেসে এল তীক্ষè অথচ মধুর এই ডাক ? ঠিক শুনেছেন তো! ক্যালেন্ডারের হিসেব ধরলে এখন হেমন্তকাল। এবং সেটাও সদ্য শুরু হয়েছে। এখনও শীতকাল বাকি পড়ে রয়েছে, তারপর তো বসন্তের পালা। এই ডাকের মালিকের তো এত বেহিসেবি হওয়ার কথা নয়!

অবশ্য এই মহানগর থোড়াই নিয়ম মাফিক পালা বদলের ধার ধারে। জীবন এখানে দুরন্ত এক্সপ্রেস। যানবাহন, মানুষ, সবাই ছুটছে। কোথায় ? সেটা কারও জানা নেই। কেন ? সেটাও জানা নেই। তবু ছুটছে পড়িমরি। ছুটছে। ছোটাতেই আনন্দ। হুমড়ি খেয়ে পড়ে গেলে, গাড়ি পিষে দিলে, পেছনের লোক মাড়িয়ে চলে গেলেও দুঃখ নেই। বরং শহিদের আনন্দ।

সঙ্গদোষে শহরটাও এই গতির চক্করে ঢুকে পড়েছে। সবার দেখাদেখি সেও ছুটছে। বর্ষঋতুর ছয় কন্যার বিবরণ এখানে শুধু বাংলা মিডিয়ম স্কুলে রচনা বইয়ের পাতায় বন্দি। বর্ষা কিংবা শীতের জন্যই যার সময় বরাদ্দ করা নেই সে কি না শরৎ, হেমন্ত কিংবা বসন্তের পরোয়া করবে ? হোতো মাদারীপুর তাহলে স্পষ্ট বোঝা যেত ঋতুর পট পরিবর্তন। ক্যালেন্ডারের দিকে তাকাতেই হতো না। শুধু গাল বাড়িয়ে বাতাসের স্পর্শ নিয়ে কিংবা আকাশের দিকে চোখ মেলে তাকিয়েই বলে দেয়া যেত কোন ঋতু চলছে।

হঠাৎ মাদারীপুরের নামটা মাথায় এল কেন ? এই মুহূর্তে ঝর্না উপস্থিত থাকলে অবধারিত ধমক খেতে হতো নীলেশকে। স্মৃতি রোমন্থন দুচোখের বিষ ভদ্রমহিলার। এসবই নাকি বার্ধক্যকে ডেকে আনে। আশ্চর্য যুক্তি বটে! পঁয়ষট্টি বছরের এক মানুষ বৃদ্ধ ছাড়া আর কী ? এই বয়সে পৌঁছেও যদি বার্ধক্যের লক্ষণ না ফুটে ওঠে তাহলে তো মানসিক রোগের চিকিৎসা করা উচিত।

অবশ্য ঝর্নাকে এক তরফা দোষারোপ করাটাও অন্যায়। নীলেশ নিজেও তো বয়স এবং বুড়োমিকে একাকার করে দেখতে পছন্দ করেন না। নাহলে বাড়ির কাছাকাছি অত সুন্দর একটা পার্ক এবং সেখানে সমবয়সি প্রাতঃভ্রমণকারীদের দল থাকা সত্ত্বেও পথে পথে ঘুরছেন কেন ? এই সাতসকালেই দুচাকা, চার চাকার মৃদু রেষারেষি শুরু হয়ে গিয়েছে। সুতরাং রাস্তা যতই চওড়া হোক সতর্ক হয়েই তো হাঁটতে হচ্ছে। সেক্ষেত্রে পার্কে এই মুহূর্তে যারা হাঁটছেন তারা দিব্যি হেসে খেলে, গল্প করতে করতে ভোরের মজা লুটছেন।

নীলেশের আপত্তিটা সেখানেই। ওদের গল্প মানে তো কার মেয়ে কার সঙ্গে ভেগেছে, কার ছেলেকে কোন্ মেয়ের সঙ্গে কোথায় দেখা গিয়েছে, দুপুর বেলার নির্জনতার সুযোগে কার ফ্ল্যাটে অচেনা লোক ঢুকছে, সেসব গল্প। গল্প, নাকি অক্ষমের হাহুতাশ ?

শুধু পরনিন্দা পরচর্চা হলেও হয়তো এতটা আপত্তির কারণ হোত না কিন্তু লোকগুলো স্বজনকেও রেহাই দেয় না। নিজের ছেলে, ছেলের বউ, মেয়ে, জামাই, এমন কী খুদে খুদে নাতি নাতনিগুলোর মুণ্ডুপাত করতেও দ্বিধা দেখায় না। বোঝার ওপর শাকের আঁটি, অসুস্থতা। ‘কেমন আছেন ?’ সামান্য ভদ্রতা সূচক এই প্রশ্ন করলেই ফেঁসে যেতে হয়। শুরু হয়ে যায় ধারা বর্ষণ। কত রকমের যে উপসর্গ আর কত ধরনের যে অসুখ! ওষুধের পাশাপাশি কি আজকাল রোগেরও আবিষ্কার চলছে ? অসুখগুলো যে সম্পূর্ণ মনগড়া, তা তো নয়। টুপটাপ খসেও তো পড়ছেন কেউ কেউ। বাধ্য হয়ে পার্কে যাওয়া ছেড়ে দিয়েছেন নীলেশ। কেমন যেন আতঙ্ক জাগে! মনে হয় চারপাশ থেকে বাতাসটাকে তিলে তিলে গ্রাস করে দম আটকে মেরে ফেলার এক অশুভ চক্রান্ত চলছে। কে করতে পারে ?

কু উ উ উ উ উ উ।

এবারের ডাকটা এতটাই প্রলম্বিত যে শোনার ভুল ভাবার সুযোগ থাকে না। বিভ্রান্ত নীলেশ ইতিউতি সন্ধান চালাতে থাকেন। না হোক বসন্তকাল তবু ডাকটা চিনতে কোনো মাদারীপুর নিবাসীর অসুবিধে হওয়ার কথা নয়। কিন্ত কোথা থেকে ডাকছে পাখিটা ? এই রাস্তার কোণে কোণে যেসব গাছ আছে সেগুলো নিতান্তই বামন সাইজের। ডালপালার বহর তেমন বেশি নয়। একটা চড়াই যেখানে নিজেকে আড়াল করতে পারবে না সেখানে একটা কোকিল পারবে নিজেকে লুকাতে!

কা হুই বাবু ?

ভ্যানে ময়লা তুলতে ব্যস্ত থাকা সাফাইওয়ালা যে তাকে লক্ষ করছে সেটা বুঝতে পারেননি নীলেশ। ধরা পড়ে গিয়ে লজ্জা পেলেন। তবু নিজেকে লুকোতে চাইলেন না। যাচাই করে নিতে চাইলেন যা শুনছেন সেটা সত্যি কি না।

পনছি কা ডাক শুনা ?

হা বাবু। কোয়েল কা বোল। হর টায়েম শুনি।

উত্তর শুনে ডবল অবাক নীলেশ। লোকটা পাখির ডাক চেনে! সবসময় শোনে!

উঁহা হ্যায় বাবু, দেখিয়ে।

নীলেশের বিস্ময় ঘোচাতে লোকটা ঝাঁটাসহ হাতটাকে তুলে ধরে ওপরে। ঝাঁটা অনুসরণ করেন নীলেশ। চোখে পড়ে যায় পাশের বহুতলের দিকে। চারতলার ব্যালকনিতে একটা বেতের খাঁচা। তার ভেতর থেকে পাখিটা ঘাড় নিচু করে দেখছে নীলেশকে। খাঁচা দুলিয়ে পাখিটা ফের ডেকে উঠল, ‘কু উ উ।’

ফের ডেকে উঠল কেন! পাখিটা কি চাইছিল নতুন মানুষের সঙ্গে পরিচিত হোতে ? আশ্চর্য কিছু নয়। পাখিদের মধ্যে কোকিল খুব মানুষ ঘেঁষা। পোষ মানানো সহজ। কে জানে, হয়তো বেচারির খুব শখ মানুষ সাজার! তাই চটপট মানুষের ভাষা রপ্ত করার চেষ্টা চালায়। তবে সবচে রেগে যায় যখন মানুষ তার ডাকটাকে নকল করার চেষ্টা করে। শুরু হয়ে যায় লড়াই। কে কতবার ডাকতে পারে। মানুষ ক্লান্ত হয়ে থেমে গেলে কোকিলের আনন্দ দেখে কে। রীতিমতো বিজয় ঘোষণা চলে, চলতেই থাকে।

নীলেশের মনটা উশখুশিয়ে ওঠে, একবার ডেকে উঠবেন নাকি ? কী করবে তবে এই ফ্ল্যাটপালিত শহুরে কোকিল ? রেগে উঠবে, নাকি শহুরে নিস্পৃহতা দিয়ে উপেক্ষা করবে এই বাতুল বৃদ্ধকে।

উত্তেজনা চরমে ওঠা সত্ত্বেও নিজেকে সামলালেন নীলেশ। নাহ! বড্ড বাড়াবাড়ি হয়ে যাবে। বলা যায় না, লোকটাই হয়তো তাকে পাগল ভেবে ভ্যান, ঝাড়ু ফেলে দৌড় লাগাবে। কিংবা হয়তো কোকিলের মালিক ব্যাপারটা স্বাভাবিকভাবে নেবে না। এই পাথুরে শহরে আবেগের কোনও মূল্য নেই। সেটার জন্য উপযুক্ত স্থান মাদারীপুর। সেখানে প্রেস্টিজ পাংচারের ভয় নেই। প্রতিভার কদর জানে সেখানকার মানুষজন, সেটা যত তুচ্ছই হোক।                              

দুই

ঘুম ভাঙার পর খুব স্বাভাবিক নিয়মেই নীলেশের মনে পড়েনি কোথায় শুয়ে আছেন। প্রতিদিনের মতোই বালিশের পাশে রাখা হাতঘড়িটা তুলে সময় দেখেছিলেন। প্রথম ধাক্কাটা আসে সেখান থেকেই। ছ’টা। অর্থাৎ একঘণ্টা লেট ? এত বছরের অভ্যেস হঠাৎ বদলে যাবার সাহস পেল কোথা থেকে!

কম্বল সরিয়ে ধড়মড়িয়ে উঠে বসতে গিয়ে দ্বিতীয় ধাক্কা পেলেন। কোথা থেকে এল কম্বলটা ? ফুলস্পিডে ফ্যান চলার বদলে কম্বল! নীলেশ রাতারাতি পাগল হয়ে যাননি তো ?

দুটো জবরদস্ত ধাক্কা নীলেশকে ধাতস্থ করে দিল। পাশে তাকালেন। কম্বলের অন্যপ্রান্ত শরীরে জড়িয়েও গুটিসুটি মেরে শুয়ে আছেন ঝর্না। শোয়ার ভঙ্গিতেই পরিষ্কার বোঝা যাচ্ছে সকালের ওমটা দিব্যি উপভোগ করছেন ভদ্রমহিলা। কে বলবে, তাকে এখানে টেনে আনতে বিস্তর কাঠখড় পোড়াতে হয়েছে।

ঝড় যে উঠবে, সেটা জানা থাকায় কিছু না জানিয়ে রিজার্ভেশান করিয়েছিলেন নীলেশ। মেয়ে, জামাই, নাতিকে ছুতো করে নিমন্ত্রণ করেছিলেন। তারপর সকলের সামনে বেশ নাটকীয় ঢঙে প্রস্তাব পেশ করেছিলেন।

মাদারীপুর যাচ্ছি।

খুশি হয়েছিল খুকু, ‘মাকে নিয়ে যাচ্ছ তো ?’

নীলেশ কোনও উত্তর দেয়ার আগেই ঝর্না রীতিমত নেত্রীর মতো কোনও প্রোটোকল না মেনে সরাসরি প্রস্তাব নাকচ করে দিয়েছিলেন।

আমি কোথাও যাচ্ছি না।

শুধু এটুকুই নয়, জামাইকে আদেশ করেছিলেন, ‘রাজু, ইম্মিডিয়েট কোনও সাইকিয়াট্রিস্টের সঙ্গে অ্যাপয়েন্টমেন্ট করো।’

রাজু ওরফে রাজিব, বাজার থেকে বাছাই করা পাত্র নয়। মেয়ের নিজের পছন্দ। একমাত্র মেয়ের পছন্দকে যদি বা উড়িয়ে দেয়া যেত কিন্তু একমাত্র স্ত্রীর পছন্দকে উড়িয়ে দেয়ার সাহস নীলেশের হয়নি। না হওয়ার কারণ স্ত্রীকে ভয় পাওয়া নয়। কী যুক্তি দিতেন নীলেশ ? ঝর্না এবং খুকুর দেয়ার মতো অনেক যুক্তি ছিলো। উচ্চ শিক্ষিত, হাইফাই চাকরি, নির্ঝঞ্ঝাট এবং উচ্চবিত্ত পরিবারের একমাত্র ছেলে। জামাইয়ের মধ্যে আর কোন্ গুণ খুঁজতে পারে নীলেশের মতো একজন মানুষ ?

এরপর কি স্ত্রী, কন্যার মুখের সামনে বলে দেয়া যায় অমন ক্ষয়াটে চেহারা, হাই পাওয়ার চশমা-চোখো ছেলেরা চিরকাল নীলেশের বিলকুল না পসন্দ। পঞ্চাশে পৌঁছনোর আগেই এরা রোগে ভোগে, কাবু হয়ে পড়ে। সবচে খারাপ লেগেছিল ছোকরার নাকটা, বিলকুল খড়গের মতো। এই ধরনের ছেলেরা শুধু উন্নাসিকই হয় না, বাতাসে স্বার্থের গন্ধ খুঁজে বেরায়।

চিন্তার শেষাংশটুকু স্ত্রীর কাছে রয়ে সয়ে পেশ করেছিলেন নীলেশ কিন্তু লাভ হয়নি। মামলা নিমেষে খারিজ হয়ে গিয়েছিল।

―কাগজে বিজ্ঞাপন দিয়ে পাত্র জোগাড় করতে হলেও তো তোমায় এই কথাগুলোই লিখতে হোত। অর্থাৎ টোপগুলো তোমায় দেখাতেই হোত। তাছাড়া তুমি এভাবে ভাবছ কেন ? মানুষ তো সঞ্চয়ই করে বংশধরদের জন্য। টাকা পয়সা নিয়ে কি স্বগগে যাবে ?

ঝর্না দাম্পত্যের ন্যূনতম গোপনীয়তাটুকুকে মান্যতা দিয়েছিল কি না জানা নেই। হয়তো দিয়েছিল। একটা শিশুও যখন ভালোবাসা বুঝতে পারে তখন রাজিব নামক ধেড়ে খোকাও যে অপছন্দের আঁচটা টের পাবে, তাতে আশ্চর্যের কী! এবং এই ধরনের ছেলেদের অহংকার যেহেতু যুক্তিতর্কের ধার ধারে না সুতরাং পাল্টা অপমান করার সুযোগ তো খুঁজবেই। সুতরাং শাশুড়ির কথায় বিলকুল ন্যাকা সেজেছিল।

সয়কিয়াট্রিস্ট দিয়ে কি হবে মামনি!

হাত মুখ নাড়িয়ে ঝাঁঝিয়ে উঠেছিলেন ঝর্না, ‘আমাকে দেখাব। আমি তো পাগল, নাহলে এ রকম একটা লোকের সঙ্গে এতবছর ঘর করলাম কীভাবে!’

ফের আগুনে ঘি ঢালতে যাচ্ছিল রাজু, তার আগেই কেসটা গ্রহণ করেছিল খুকু, ‘তুমিই বা এত আপত্তি করছ কেন মা! অনেকদিন তো কোথাও বের হওনি, যাও না, কদিনের জন্য ঘুরে এস। দেখবে, মনটা অনেক ফ্রেশ লাগবে।’

কিন্তু অত সহজে শান্ত হওয়ার পাত্রী ঝর্না বসু নয়।

ন্যাকামো করিস না খুকু। মন ফ্রেশ করার জন্য মানুষ কাশ্মীর, সিমলা, দার্জিলিং যায়। মুরোদে না কুলোলে অন্তত কাছেপিঠে দীঘা, মন্দারমণি যায়। মাদারীপুর যায় কেবল পাগলেরা।

আগুনটা ফের জ্বলে উঠতে দেখে দ্বিগুণ উৎসাহে এগিয়ে এসেছিল রাজু, ‘মাদারীপুর! হোয়ার ইজ ইট ?’

ঝর্ণার সটান জবাব, ‘নরকের পরের স্টেশান।’

এবার নীলেশ বাধ্য হয়েছিলেন প্রতিবাদ করতে।

কোনটাকে নরক বলছ ঝর্না! এখানকার ছেলে মেয়েরা জন্মানোর পর মা বাবা বলতে শেখার আগে অ্যাসিড, গ্যাস, অ্যাজমা, পেস মেকার বলতে শিখে যায়। আমাদের ওখানে নব্বই বছরের বৃদ্ধের কাছেও এসব শব্দ অচেনা।

অশিক্ষিতেরা অজ্ঞানই হয়ে থাকে। এটাই তাদের জীবনের অভিশাপ।

এবার রেগে উঠেছিলেন নীলেশ। জামাইয়ের সামনে অসভ্যতা করা হচ্ছে জেনেও পাল্টা চিৎকার করে উঠেছিলেন, ‘কে কতটা শিক্ষিত সেটা তার আচার-ব্যবহার দিয়েই বোঝা যায়। মাদারীপুরকে অশিক্ষিত বলছ ? জানো, আমাদের ব্রজনাথ মেমোরিয়াল স্কুল কতজন ডাক্তার, এঞ্জিনিয়ার, সায়েন্টিস্ট সাপ্লাই করেছে ? তুমি বেইমান, তাই ভুলে গেছ মাদারীপুর তোমায় কী দিয়েছে।’

শাশুড়িকে আচমকা পিছিয়ে পড়তে দেখে পরিস্থিতি সামাল দিতে চেয়েছিল জামাই, ‘স্যরি টু অবজেক্ট। এই শহরও আপনাকে যথেষ্ট দিয়েছে। নাহলে মাদারীপুর ছেড়ে এখানে সেটল করতেন না। সেটল করলেও মাঝে মধ্যে যেতেন সেখানে। পুরো ভুলে থাকতে পারতেন না।’

এরপর কিন্তু জ্বলে ওঠেননি নীলেশ। জামাই একদিকে পুত্রসম অন্যদিকে সম্মানীয়। তার সঙ্গে কি ঝগড়া করা যায় ? তাছাড়া কথাটা তো মিথ্যে নয়। হঠাৎ সামান্য কোকিলের ডাক শুনে এতটা আবেগগ্রস্ত হয়ে পড়াটা তো অর্থহীনও। তাই লজ্জিত স্বরে বলেছিলেন, ‘আই অ্যাডমিট। তবে কী জানো, এতদিন পর মনে হচ্ছে এ কোন গাড্ডায় এসেছিলাম আমি! কাদের সঙ্গে কাটিয়ে গেলাম এতগুলো বছর ? মনে হচ্ছে, চারপাশে শুধু অতৃপ্ত প্রেতাত্মাদের হাহুতাশ। বাতাসে শুধু মরণের আকাক্সক্ষা। ভেবেছিলাম, কয়েকদিনের জন্য একটু টাটকা বাতাস ফুসফুসে ভরে নিয়ে আসব। জাস্ট নিজেকে একটু রিচার্জ করে নেয়া।’

মেয়ের হাতে রেল টিকিটটা তুলে দিয়ে বলেছিলেন, ‘ফেরত দিয়ে দিস খুকু। নিয়তি কেন বাধ্যতে।’

শেষ লাইনটাতে হয়তো নাটকীয়তা ছিলো, হয়তো সেটাকে ইমোশনাল ব্ল্যাকমেলও বলা যেতে পারে কিন্তু তাতে যে আদৌ কাজ হবে সেটা বিশ্বাস করেননি নীলেশ। এখানে আসার সময় ট্রেনে বারবার স্ত্রীর দিকে আড়চোখে তাকিয়েছেন। বিশ্বাস হতে চায়নি, এই যাত্রা কি সত্যি, নাকি স্বপ্ন! ইচ্ছে হয়েছিল ঝর্ণাকে দিয়ে একটা চিমটি কাটিয়ে বুঝে নেয়ার। কিন্তু সাহস পাননি। কেননা যেমন মুখ করে বসেছিলেন ঝর্না তাতে হয়তো অমন প্রস্তাব পেলে মাংস উঠিয়ে আনতেন।

তিন

বাড়িটা অনেক বদলে গিয়েছে। প্রায় এক বিঘে জমির ওপর বসত বাড়িটা ছিলো একদম পূর্বপ্রান্তে। ফলে তিনদিকের জমি জুড়ে ছিল ফুল, ফল, শাক-সবজির বাগান। এমন কী ভিত উঁচু করার মাটির ব্যবস্থা করতে গিয়ে একটা পুকুরও খোড়া হয়েছিল। এখন উত্তর, দক্ষিণে অনেকগুলো বাড়ি। মাঝখানে প্রাচীর নেই ঠিকই তবু গঠন দেখেই বোঝা যাচ্ছে ভাগাভাগি করে নিয়ে যে যার মতো ব্যবস্থা করে নিয়েছে। আচ্ছা, এর মধ্যে একটা ভাগ তো নীলেশেরও প্রাপ্য। বেশি জায়গার দরকার ছিল না। দুটো মাত্র ঘর তোলার জন্য যেটুকু প্রয়োজন। হয়তো সেটুকুর প্রয়োজনেই মাঝে মধ্যে আসা যেত।

ঝর্না সঙ্গে থাকলে অবধারিতভাবেই ভাগাভাগির কথা তুলতেন। তখন অবশ্য নীলেশকে সামাল দেয়ার চেষ্টা করতেই হোত, ‘আহা, যারা আছে তারা তো আমার সন্তানেরই মতো। তাদের সঙ্গে লাঠালাঠি করতে যাব কেন ? তাছাড়া আমাদের তো কোনও অভাব নেই।’

ঝর্না বলতেন, ‘সে ঠিক আছে তবে মিনিমাম পারমিশনটুকু তো নেবে।’

কথাটা যেহেতু অযৌক্তিক নয় সুতরাং নীলেশকে শাক দিয়ে মাছ ঢাকতেই হোত, ‘হয়তো ভেবেছে, আমরা যদি অন্যকিছু ভাবি। দেখলে না, কাল আমাদের পেয়ে কেমন করছিল! হাবভাব দেখে মনে হচ্ছিল হাতের কাছে চাঁদ পেয়েছে। অথচ ওদের অনেকেই তো আমায় আগে দ্যাখেনি। সুখে-দুখে যে ওদের ছায়াটাও মাড়ায়নি তাকে দেখে মুখ ঘুরিয়ে নিতেই পারত।’

এবারের যুক্তি ঝর্না মেনে নিতেন কি না কে জানে। আপাতত সেই কল্পিত বচসা স্থগিত রেখে গেট খুলে রাস্তায় নামলেন নীলেশ। কিন্তু এবার কোনদিকে ? সময়ের অমোঘ নিয়মে মাদারীপুর অনেকটাই বদলে গিয়েছে। কাল রাতেই পরিবর্তনটা টের পাওয়া গিয়েছিল। তখন মনে হয়েছিল, অন্ধকার নেমে যাওয়ায় হয়তো এরকম মনে হচ্ছে। তাছাড়া বাজারের দিকটায় খানিক বদল হওয়াটা তো স্বাভাবিকই। লোকসংখ্যা বাড়লে দোকানপাট বাড়বেই। পাড়াগুলো নিশ্চয়ই একই রকম আছে। কিন্তু এখন বোঝা যাচ্ছে পরিবর্তনটা তলে তলে অনেক দূরই সেঁধিয়েছে। যেখানে হরসুন্দরী সাধারণ পাঠাগার থাকার কথা সেখানে তিনতলা বাড়ি। কোনদিন যে সেখানে লাইব্রেরি ছিল সেই প্রমাণও নেই। এভাবেই উধাও মিলেমিশে ক্লাব এবং তার পাশে বুক চিতিয়ে পড়ে থাকা মস্ত মাঠটা, সাহাদের কালী মন্দির। সবচে বড় বিস্ময়ের যেটা তা হলে প্রাসাদ মার্কা ঘোষাল ভবনও বিলকুল উধাও। তার বদলে আছে সুন্দর সুন্দর দুতলা, তিনতলা বাড়ি। এছাড়াও গজিয়ে উঠেছে ফাস্ট ফুড কর্নার, বাহারি সেলুন। এমন কী একটা নার্সারি স্কুলও চোখে পড়ল।

তবে একটা ক্ষেত্রে এখনও বদলায়নি মাদারীপুর। সেটা হলো অলস জীবন যাত্রা। এখনও বিছানা ছাড়েনি কেউ। পথ বিলকুল ফাঁকা। এই বদলটা হলে ভালোই হোত। জিজ্ঞেস করে করে নীলেশ ঠিক পৌঁছে যেতেন পরিচিত ঠিকানায়। ক্বচিৎ দু-একটা বাইক ছুটে যাচ্ছে বটে কিন্তু সেগুলোর আরোহীর হাবভাব দেখে থামানোর সাহস হচ্ছে না।

বাধ্য হয়েই ফিরলেন নীলেশ। প্রথমদিনই এতটা ঝুঁকি নেয়া ঠিক হবে না। অনেক দূর চলে গেলে ফিরতে দেরি হতে পারে। তাতে ঝর্না চটে যেতে পারেন। বাড়ির লোকেরাও বিব্রত হবে। সুতরাং পাড়ার মধ্যেই খানিকটা ঘোরাফেরা করা ভালো।

হাঁটতে হাঁটতে একটা বাড়ির সামনে দাঁড়ালেন নীলেশ। বাড়িটার সারা শরীরেও প্রাচীনত্বের কোনও চিহ্ন নেই। টিনের চাল দেয়া কাঠের বাড়ির বদলে ছিমছাম দোতলা। গেটের ওপরে মাধবীলতার ঝাড়ও নেই। এমন কী কোথাও, ‘আভাকুঞ্জ’ নামে কোনো বোর্ড লাগানো নেই। তবু গেটের আগলে হাত না রেখে পারলেন না নীলেশ। শৈশব, কৈশোরের অনেকটা সময় এই বাড়ির চৌহদ্দিতে কেটেছে। যদি মালিকানার পরিবর্তন হয়ে গিয়ে থাকে তবু মাটিটা তো একই আছে। রাষ্ট্রপতি পুরস্কার প্রাপ্ত শিক্ষক সুধীন দত্তের পদস্পর্শ যে মাটি পেয়েছে সেটা তো দেবভূমি তুল্য। সেই মাটি একটি বার মাথায় না ঠেকাতে পারলে তো মাদারীপুরে আসাটাই যে মিথ্যে।

বার তিনেক বেল বাজানোর পর যে সদ্য যুবক বেরিয়ে এল দেখেই বোঝা যাচ্ছে নীলেশ তার সাধের প্রভাতি ঘুমটার বারোটা বাজিয়ে দিয়েছেন। আজকালকার ছেলে, কে জানে কী বলে বসে, তাই সাত তাড়াতাড়ি প্রশ্ন করলেন, ‘এটা সুধীন স্যারের বাড়ি তো ?’

অচেনা মানুষ দেখে যুবকটি রাতারাতি বিরক্তি গিলে মাথা হেলালো। সাহস পেয়ে আরেক ধাপ এগোলেন নীলেশ, ‘ কে হোতেন তোমার ?’

না, মাদারীপুর সত্যি সত্যি বদলায়নি। এখনও শেখেনি অচেনা মানুষকে সন্দেহ করতে। গেট খুলে বেরিয়ে এল যুবক। স্মিত হেসে জবাব দিলো, ‘আমার ঠাকুর্দা।’

তুমি সুভাষের ছেলে ?

না, সুধাংশুর।

প্রশ্নটা করেই অবশ্য নিজের ভুলটা বুঝতে পেরেছিলেন নীলেশ। সুভাষ তো সমবয়সী, তার ছেলে এত ছোট হয় কিভাবে! সুধীন স্যারের পাঁচ সন্তানের মধ্যে সবচে ছোট ছিল সুধাংশু। নীলেশ যখন এ বাড়িতে আসতেন তখন সুধাংশু ছিল নিতান্তই দুগ্ধপোষ্য।

সুভাষ আছে বাড়িতে ?

জেঠু তো এ বাড়িতে থাকেন না। দিল্লিতে থাকেন। এটা আমাদের বাড়ি।

অবাক হয়ে সুধাংশুর ছেলের দিকে তাকালেন নীলেশ, এই বয়সে বেশ মালিকানা বোধ গড়ে উঠেছে। এটা তো মাদারীপুরের ঐতিহ্য নয়! এখানে কাকা, জ্যাঠারা পিতৃতূল্য।

যুবার চোখে বিরক্তি আর রাগের যুগপৎ মিশেল দেখে নীলেশ বুঝলেন অনেক তিক্ত অভিজ্ঞতাকে অতিক্রম করে যেতে হয়েছে। কে জানে এই অধিকার কায়েম করতে আদালতের চত্বরও মাড়াতে হয়েছে কি না!

এরপর কথা চালানো শ্রেয় হবে না বিবেচনা করে বেরিয়ে আসছিলেন নীলেশ, সুধাংশুর ছেলে আচমকা পিছু ডাকল, ‘বাবার সঙ্গে দেখা করে যাবেন না ?’

সুধাংশুর সঙ্গে দেখা করে কী লাভ! সে তো চিনতেই পারবে না। পরিচয় দিলে যদি বা চেনে তাহলেও কি দাদার বন্ধুকে মর্যাদা দেবে ? তবু দাঁড়ালেন নীলেশ।

তরু কেমন আছে ?

সুধাংশুর ছেলের চোখে বিভ্রান্তি স্পষ্ট। সেটাই স্বাভাবিক। বুঝে উঠতে পারছে না এই উটকো বুড়োটার সঙ্গে এই বাড়ির সম্পর্ক কতটা! কার সঙ্গে দেখা করতে এই সাত সকালে আপদটা হাজির হয়েছে ?

পিসি তো তিন বছর হলো মারা গিয়েছে। লিভার ক্যানসারে। অনেক চেষ্টা করা হয়েছিল, বাঁচানো যায়নি।

বেরিয়ে পড়লেন নীলেশ। এরপর দাঁড়ালে আরও অনেক প্রশ্ন করতে হোত। এবং প্রশ্নগুলো করলে অবধারিত গলা ধাক্কা খেতে হোত। কেননা এই ছোকরা নিশ্চয়ই জানে না পিসিকে নিয়ে তার ঠাকুর্দার কত গর্ব ছিল। সেই গর্বে পিসিও নিজেকে সত্যিকারের তরু দত্ত ভাবত। অহংকারে মাটিতে পা পড়ত না। একথাগুলো বলা যাবে না। বলা যাবে না, অহংকার খানিকটা কম হলে হয়তো এমন পরিণতি হতো না।

প্রথম সকালের জন্য এটুকু অভিজ্ঞতাই যথেষ্ট বিবেচনা করে বাড়ি ফেরার পথ ধরলেন নীলেশ। আচমকা কেউ একজন পায়ের কাছে পড়ে যেতেই চমকে উঠে কয়েক পা পিছিয়ে গেলেন। রীতিমতো পায়ের ধুলো মাথায় ঠেকিয়ে উঠে দাঁড়াল আগন্তুক।

ক্যামন আছেন নীলু কাকা ?

নীলেশ বুঝলেন এটা কোনও পাগলের কাণ্ড কিংবা ভ্রান্তি নয়। অত্যন্ত পরিচিত কেউ। হয়তো আত্মীয় গোত্রভুক্ত। কিন্তু ময়লা পোষাক, রুক্ষ চুল, মুখময় খোঁচা খোঁচা পাকা দাড়িঅলা কে এই তালপাতার সেপাই ?

আপনে যে আইছেন সেই খবর কাইল রাতেই পাইছি। তক্ষুনি ছুইটা আইতাম। আপনের বউমা বাধা দিলো। কইলো, আনধারে তো দেখতে পাও না, ফির একবার পা ভাঙবা নাকি! আমি কই, ভাঙে ভাঙুক। তবু একবার যামুই নীলু কাকার লগে দ্যাখা করতে। বউ কইলো, আরে বোকা মাধাই, বাচ্চা ছেলেপিলের মতন করো ক্যান ? তোমার নীলু কাকা যখন অ্যাদ্দিন পরে আইছে তখন কি সক্কালবেলায় পলায় যাইব নাকি! কাইল যাইও। আপনেরে কী কই নীলু কাকা, সারা রাত্র ঘুমাই নাই। খালি উইঠা উইঠা দেখি, আলো ফুটল কি না।

প্রণামে যত না বিব্রত হয়েছিলেন নীলেশ, এখন তার দ্বিগুণ। লোকটার যে হাঁপানি আছে সেটা স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে। উত্তেজনায় এক নাগাড়ে কথা বলে যাওয়ায় চোখ দুটো ঠেলে বেরিয়ে আসার উপক্রম। অথচ সেটাকে ধর্তব্যের মধ্যেই আনছে না। যাকে ঘিরে লোকটার এত শ্রম, এত কষ্ট সে কি না চিনতেই পারছে না ? ছি ছি। অথচ এই ভালোবাসা, এই আত্মীয়তাকে চাখতেই কি না মাদারীপুর আসা!

আপনে আমারে চিনতে পারেন নাই না, নীলু কাকা ?

চোখ তো মনের আয়না। এই যে এক জোড়া ঘষা মার্বেল নীলেশের দিকে সরাসরি তাকিয়ে আছে সে দুটো যতই পিটপিট করুক, স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে, ওতে মাখামাখি হয়ে আছে অস্তিত্বের সংকট। নীলেশের একটা মন্তব্যের ওপর নির্ভর করে আছে ওদুটো ফেটে বেরিয়ে আসবে কি না। কিন্তু কীভাবে বাঁচাবেন নীলেশ সেই দুর্ঘটনার হাত থেকে ? তারও তো একই দুর্দশা। এ না হয় গ্রাম্য, অশিক্ষিত লোক, এর চোখ দুটো মনের আয়না হতেই পারে। তা বলে নীলেশের চোখ দুটো কেন অশিক্ষিতপণা করবে ? সে দুটোর তো উচিত মনের ভাবটাকে খানিকক্ষণের জন্য গোপন করা! অন্তত চেষ্টাটুকু তো করা উচিত।

চেষ্টা করতে হলো না। রেহাই দিলো আগন্তুক।

আমি ভব, ভবশঙ্কর, হরশঙ্কর বসুর ছেলে।

আচমকা বিদ্যুতের ছোবল খেলেন নীলেশ। অতটা হীনমন্যতায় ভোগা উচিত হয়নি। বোঝা যাচ্ছে, সময়ের বিষাক্ত ছোবল মাদারীপুরকেও রেহাই দেয়নি। এখানেও ঠগ-জোচ্চরের জন্ম হয়েছে। বোস বাড়ির মেজে ছেলে বহুদিন পর যে বাড়ি এসেছে হয়তো সেই খবরটা গোটা মাদারীপুরে রটে গিয়েছে। তিলকে তাল করতে অভ্যস্ত মানুষজন কে জানে, নীলেশকে কোটিপতি বানিয়ে তুলেছে কি না! হয়তো সেই লোভেই এই টাউটটা হাজির হয়েছে। ধরা পড়ে যাবার ভয়ে হয়তো বাড়িতে ঢোকেনি। রাস্তায় অপেক্ষা করছিল। দু-একটা কথাবার্তার পরই মেয়ের বিয়ে, স্ত্রীর অসুস্থতার দোহাই দিয়ে সাহায্য চাইবে। তবে কাঁচা কাজ করে ফেলেছে গেঁয়ো জোচ্চরটা। এই চেহারা কখনও হরদার ছেলের হতে পারেনা। কোথায় সেই কন্দর্পকান্তি রাজপুত্র, আর কোথায় এই পকেটমার!

যদি বা ধরে নেয়া যায় বদমাশটা বাপের রূপ পায়নি তবু মায়ের কিছু তো পাবে ? নিখুঁত সুন্দরী না হলেও দারুণ চটক ছিল বৌঠানের। ঠিক যেন ঝলসে ওঠা বিদ্যুৎচ্ছটা। অমন বিভাময়ীরা শুধু স্বপ্নেই ধরা দেয়। সেটাও শেষ রাতের স্বপ্নে। কয়েক পলের জন্য।

নিজের দাদারে মনে আছে তো, নাকি তারেও ভুলছেন ?

কথাটা শুনে হাসলেন নীলেশ। হরশঙ্কর মোটেও নিজের দাদা ছিল না। জ্ঞাতি দাদা। সম্পর্কের ভেতর অনেক ভুলভুলাইয়া। তবু নিজের দাদার চে অধিক ছিল। যাকে বলে ছোটবেলার আইডল। হাঁটাচলায়, কথাবার্তায় বিলকুল নায়ক ছিল হরদা। হাসিটা ছিল অবিকল উত্তমকুমারের মতো। দোষের মধ্যে ছিল হঠাৎ হঠাৎ উধাও হয়ে যাওয়া। সাইকেল ছিল হরদার ময়ূর। বাহনে চেপে কোথায় কোথায় চলে যেত। দিনের পর দিন লা পতা।

প্রথম প্রথম সবাই দুশ্চিন্তা করত, পরে হাল ছেড়ে দিয়েছিল। নিজে থেকেই ফিরে আসত হরদা। কোথায় গিয়েছিল জিজ্ঞেস করলে মিটিমিটি হাসত, কিচ্ছু বলতে চাইত না।

একবার মারাত্মক কাণ্ড করে বসেছিল হরদা। সেবারও বহুদিন নিরুদ্দেশ থেকে ফিরে এসেছিল তবে সেই ফেরা দেখতে হামলে পড়েছিল গোটা মাদারীপুর। কারণ সেবারের চমক ছিল সাইকেলের সামনের রডে ঘোমটা টেনে বসে থাকা একটি মেয়ে। এমন অভিনব ঘটনা মাদারীপুরের কেউ সাতজন্মে দেখা তো দূরের কথা ভাবতেও পারেনি। সাইকেলের পেছন পেছন দৌড়ে আসা জনতার কোনও প্রশ্নের জবাব না দিয়ে শুধু মুচকি হেসেছে হরদা।

সাইকেলসহ মেয়েটিকে বাইরে রেখে নিজে গিয়ে দাঁড়িয়েছিল বাপের মুখোমুখি।

আপনার বউমারে নিয়া আইছি।

শিবু জ্যাঠা তেড়ে এসেছিল, ‘অজাত কুজাত লইয়া আমার বাড়িতে ঢুকলি কোন সাহসে ?’

পিছু হঠেনি হরদা। পাল্টা চিৎকারও করেনি। মুচকি হেসে জবাব দিয়েছিল, ‘ঢুকি নাই তো, অনুমতি নিতে আইছি। না দিলে চইলা যামু।’

এহেন ডায়লগে স্তম্ভিত শিবু জ্যাঠা উত্তর খুঁজে পাননি। পেলেও অবশ্য লাভ হোত না। কারণ জেঠিমা ততক্ষণে শাঁখ, উলু, ধান, দুব্বোসহ বধূবরণ করে ফেলেছিলেন।

গোটা মাদারীপুর ছ্যা ছ্যা করেছিল, কে জানে কোথা থেকে মেয়েটাকে ধরে এনেছে হর! মেয়েটা যে খারাপ সেই বিষয়ে সবাই নিশ্চিন্ত ছিল। কারণ কোনও ভদ্রঘরের মেয়ে ওরকম চালচুলোহীন ছেলের সাইকেলে চেপে শ্বশুরবাড়ি আসে নাকি ? যদি ভদ্রঘরের হয়ে থাকে তাহলে তো আরও বিপদ। মেয়েকে ভাগিয়ে আনার জন্য হরর শ্বশুরবাড়ির লোক পুলিশ নিয়ে হানা দিল বলে।

তবে অস্বীকার করার উপায় নেই এই বিয়ের কল্যাণে রাতারাতি বিখ্যাত হয়ে উঠেছিল মাদারীপুর। আশপাশ থেকে কত লোক যে কুটুম্বিতার ছল করে হরদার বউকে দেখতে এসেছিল তার ইয়ত্তা নেই। সবার একটাই কৌতূহলো, মেয়ের পিতৃপরিচয়। কিন্তু সেই রহস্য রহস্যই থেকে গিয়েছিল। হরশঙ্কর কিংবা তার স্ত্রী, এ ব্যাপারে মুখ খোলেনি। এমন কী নীলুর কাছেও না। যদিও নীলুর এই কৌতূহলের পেছনে কোনও শূচিবায়ুগ্রস্ততা ছিল না। সে শুধু জেনে নিতে চেয়েছিল কোন সে জায়গা যেখানে ভোরের স্বপ্নে উঁকি দিয়ে যাওয়া মেয়েরা বাস করে! নীলু একবার অন্তত সেই স্বপ্নরাজ্যে হানা দেবেই। বিয়ে করতে নয়, শুধু চোখের দেখা দেখতে। কিন্তু সেখানকার সুলুক সন্ধান প্রিয় শিষ্যকেও দেয়নি হরশঙ্কর। হেসে বলেছে, ‘দ্যাবতাদের ঘর থিকা চুরি কইরা আনছি তোর কাকিমাকে।’

সাক্ষী মেনেছে বউকে, ‘কী গো, ঠিক কইছি না ?’

উত্তরে খিলখিলিয়ে হেসেছে বৌঠান।

বৌঠানের হাসিটাও ছিল অন্যরকম। ঠিক যেন আচমকা ধেয়ে আসা পাহাড়ি বান। খড়কুটোর মতো ভেসে যেত বেচারি নীলু। সেই ভাসানের আনন্দ উপভোগ করতে যখন তখন এসে হাজির হোত শিবু জ্যাঠার দুয়ারে।

হরদা বলেছিল, ‘জানিস নীলু, তর বউদি একটা দারুণ মেজিক জানে।’

বৌঠান যে ম্যাজিক জানে সেটা নীলুর থেকে ভালো আর কে জানে! লেখাপড়া, খেলাধুলো ভুলিয়ে দিয়ে যে প্রতি মুহূর্তে আকর্ষণ করতে পারে তারচে বড় ম্যাজিসিয়ান আর কেউ আছে নাকি ? অন্য কী ম্যাজিক জানে বৌঠান সেটা জানার আগ্রহে জেদ ধরেছিল।

আঁতকে উঠেছিল বৌঠান, ‘না, না। এইগুলান কী কথা কও! তোমার লজ্জা শরম নাই ?’

হরদাকে দমানো যায়নি, ‘আরে নীলু তো তোমার দ্যাবর, মানে দ্বিতীয় বর। অরে লজ্জা কিসের!’

খিলখিলিয়ে হেসেছিল বৌঠান, ‘কী সব যে কও, আমি কি দৌপদী নাকি!’

সেই হাসির তোড়ে নীলুর ভেতরকার বাঁধ ভেঙে গঙ্গা পদ্মা একাকার।

বৌঠান ম্যাজিকটা দেখিয়েছিল। অনেকক্ষণ চুপ করে থেকে তারপর ঠোঁটটা দুটো হাতের পাতা দিয়ে আড়াল করে ডেকে উঠেছিল, ‘কু উ উ।’

এটা আবার কী ধরনের ম্যাজিক! হেসে উঠতে গিয়েছিল নীলু। ইশারায় চুপ করে থাকার নির্দেশ দিয়েছিল হরদা। খানিকক্ষণ নিস্তব্ধ থেকে ফের ডেকে উঠেছিল বৌঠান, পরপর তিনবার ‘কু উ উ উ। কু উ উ। কু উ উ।’

এবার বিরক্ত হয়েছিল নীলু, কী পাগলামো হচ্ছে! না অদৃশ্য হচ্ছে হরদা, না ঘরের মধ্যে হাজির হচ্ছে আলাদিনের দৈত্য। এমন কী বৌঠানও শূন্যে উঠে যাচ্ছে না, তাহলে কীসের ম্যাজিক ?

কিন্তু নীলুকে অবাক করে দূর থেকে আচমকা ভেসে এসেছিল একটা ডাক, ‘ কু উ উ।’

ফিসফিসিয়ে উঠেছিল হরদা, ‘আইছে, আইছে।’

বৌঠান ফের ডেকেছিল। উত্তর দিয়েছিল অদৃশ্য পাখিটাও। অনেকক্ষণ চলেছিল এই ডাকাডাকির পালা। প্রতিবার পাল্টা ডাকটা এগিয়ে এসেছিল কাছে। হয়তো নীলু না থাকলে পাখিটা এসে বৌঠানের কোলে বসত।

বিয়ের পর রোজগারের অজুহাত দেখিয়ে ফের উধাও হয়েছিল হরদা। যথারীতি বাড়ির লোকরা খোঁজখবরের চেষ্টা করেনি। কিন্তু বৌঠান পারেনি নিস্পৃহ থাকতে। বাধ্য হয়ে নীলুকেও সঙ্গ দিতে হয়েছিল। কোথায় যায়নি দুজনে! একবার তো দমনপুর অবধি চলে গিয়েছিল। খবর এসেছিল রেললাইনে একজন কাটা পড়েছে, চেহারা নাকি হুবহু হরদার মতো। যদিও সবটাই গুজব ছিল। ফেরার পথে নীলুর হাত দুটো ধরে বৌঠান বলেছিল, ‘তুমি না থাকলে আমার যে কী দশা হইতো নীলু!’

বেশি দিন সঙ্গ দিতে পারেনি নীলু। মা আপত্তি তুলেছিল, ‘অই বাড়ি যাবি না।’

প্রথমে মেনে নিতে পারেনি নীলু, ‘ক্যান ?’

নানান লোকে নানান আকথা কুকথা কয়।

কউগ গিয়া। আমি ডরাই না।

তর জ্যাঠার কানে কিন্তু কথাটা উঠছে।

জ্যাঠার অভিভাবকত্বে থাকা বাপ মরা ছেলের যেহেতু এরপর সাহস দেখানো চলে না তাই নিজেকে সামলেছে নীলু। তবে পুরোপুরি নয়। গোপনে দেখা হোত দুজনের। হাতে ধরে কোকিল ডেকে আনার ম্যাজিকটা শিখিয়ে দিয়েছিল বৌঠান।

সেই হরদার ছেলে দাঁড়িয়ে আছে সামনে! এটা কি সত্যি, নাকি স্বপ্ন ?

একবার আমাগো বাড়িতে পায়ের ধুলা দিতেই হবে নীলুকাকা। সবাই আপনারে দ্যাখার জন্য পাগল।

কথাটা শুনে উৎসাহিত হলেন নীলেশ, ‘বেঁচে আছে হরদা ?’

নীলেশের প্রশ্নের উত্তরে শূন্যে হাত ঘোরায় ভবশঙ্কর। সঙ্কেত বুঝতে পারেন না নীলেশ। বাধ্য হয়ে খুলে বলে ভব, ‘এখনও বাইচা আছে কি না জানি না। তারে তো আপনি জানেন। ডুব মারা পাবলিক। জন্মের পর থিকা কয়বার বাপরে দেখছি সেইটাও হয়তো গুইনা বলতে পারব।’

বৌঠানের কথা জিজ্ঞেস করতে পারলেন না নীলেশ। তেমন কিছু হলে তো বলতই হরদার ছেলে। তাছাড়া জিজ্ঞেস করারই বা কী আছে, বাড়ি গেলেই তো দেখা হবে।

শিবু জ্যাঠার বাড়িটা একই আছে। অর্থাৎ ভবশঙ্করও তেমন কিছু করে উঠতে পারেনি। ক্ষয়াটে চেহারার এক মহিলা এসে প্রণাম করলো নীলেশকে। সঙ্গে দুটো মেয়ে। ভবশঙ্কর পরিচয় করিয়ে দিলে, ‘আপনের বউমা আর নাতনিরা।’

এরপর ভবশঙ্কর রীতিমত বক্তৃতা শুরু করে দিল তার নীলু কাকাকে নিয়ে। কান দুটো ওদের দিয়ে চোখ দুটোকে স্বাধীন করে দিলেন নীলেশ। কোথায় সে ? দেবরের আসার খবরটা পায়নি ? একবার চোখের দেখাটুকুও তো দেখতে আসতে পারে! যদি লজ্জা পেয়ে থাকে তাহলে চায়ের কাপ দিতে আসার ছল করে আসুক। না হলে যে মাদারীপুরে আসাটাই মিথ্যে হয়ে যাবে।

তবে কি নীলুর না বলে কয়ে মাদারীপুর ছেড়ে চলে যাবার অপরাধটা এখনও মাফ করতে পারেনি বৌঠান ? এবার রাগ হলো নীলেশের। কী করতেন তিনি, সারাজীবন ভবঘুরে হরশঙ্করের স্ত্রীর চৌকিদারি করে জীবন কাটিয়ে দিতেন ? বীরেন বসু তো আর শিবশঙ্কর বসু ছিলেন না, সত্যি সত্যি বের করে দিতেন। তারপর নীলেশ কি বাকি জীবন জঙ্গলে জঙ্গলে কোকিল ডেকে বেড়াতেন ?

এবার চলি ভবশঙ্কর। অনেকক্ষণ বেরিয়েছি, বাড়ির লোকেরা হয়তো চিন্তা করছে।

যাবেন, যাবেন। অতো হুড়াপারা কিসের ? চা টা খাইয়া তারপর যাবেন।

আমি কিছু খেতে পারব না। বাড়ি গিয়ে আগে ওষুধ খেতে হবে, তারপর। চলি।

মায়ের লগে দেখা করবেন না ? বৌঠান তো আপনের খুব প্রিয় আছিল।

ভবশঙ্করের কথায় চমকে তাকালেন নীলেশ। এটাও কি আবেগ, নাকি কোনো শ্লেষ ? নাকি অপমান! বুঝে নিতে হরদার ছেলের মুখের দিকে তাকালেন নীলেশ। কিন্তু ঘোলা চোখে যথারীতি শুধুই আবেগ, আর কিছুই স্পষ্ট বোঝা গেল না।

ঘরের মধ্যে উঁকি দিয়ে মেজাজ চড়ে গেল নীলেশের। বড্ড বাড়াবাড়ি করছে ভবশঙ্কর। কি মনে করেছে সে, নীলেশ বসু ইয়ার্কির পাত্র ? জানে তার স্ট্যাটাস! ভবর স্ট্যান্ডাডের্র কোনও মানুষের ঠাট্টা তামাসা তো দূরস্থান, নীলেশের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে কথা বলারই সাহস হবে না। মায়ের পরিচয় দিয়ে যাকে দেখাচ্ছে সে তো বৌঠান নয়ই, এমন কী কোনো মানবীও নয়। নির্ঘাত কোনও ডাইনি। মাথা ন্যাড়া। গাল দুটো তুবড়ে ঢুকে গিয়েছে মুখের ভেতর। পরনে শতচ্ছিন্ন শাড়ি। উবু হয়ে বসে আছে নোংরা বিছানার ওপর। চোখ দুটো মেঝের দিকে।

মা দ্যাখো, কে আইছে! নীলুকাকা। তোমার না খুব দ্যাখার ইচ্ছা আছিল, তাই নিয়া আইছি। দ্যাখো, তাকাও।

ভবশঙ্করের লাগাতার আহ্বানেও ডাইনির কোনও প্রতিক্রিয়া হয় না। এমন কী চোখ তুলে তাকায়ও না। বিড়বিড় করে ভব, ‘কয়েক বচ্ছর হলো এই দশা। কাউরে চিনতে পারে না। কোন কথাও কয় না কারুর সঙ্গে। খাওয়া দাওয়াও করতে চায় না।’

ডাক্তার দেখাওনি ?

হ্যাঁ।

কী বলেছে ডাক্তার ?

কঠিন অসুখ। আলজিম না কী যেন নাম! চিকিচ্ছা নাই।

নীলেশের ইচ্ছে হয় বৌঠানের পাশে গিয়ে বসার, নিজের হাতের মধ্যে হাত দুটো টেনে নেয়। কানের কাছে মুখ এনে জিজ্ঞেস করার, ‘কিছু খাইছ ?’

উত্তরে বৌঠান কি পারবে মেঝের দিকে তাকিয়ে বসে থাকতে ? খিলখিলিয়ে হেসে উঠে বলতে বাধ্য, ‘খাইছি তো, তোমার মাথাটা। ট্যার পাও না ?’

ভব অবাক হয়ে দেখবে ডাক্তার যা পারেনি নীলুকাকা অনায়াসে সেটা করে করে দেখিয়ে দিল।

খানিকক্ষণ নিশ্চুপ দাঁড়িয়ে থেকে ঘর থেকে বেরিয়ে আসার উদ্যোগ নেন নীলেশ।

চলি ভব।

বাধা দেয় না ভবশঙ্করও। বেরিয়ে আসে পিছুপিছু। চৌকাঠ পেরুনোর মুহূর্তে আচমকা ভেসে আসে মৃদু ডাক, ‘কু উ উ।’

চমকে ফিরে তাকান নীলেশ। কিন্তু বৌঠানের চোখ সেই মেঝেতেই নিবদ্ধ। বাধ্য হয়েই ভবশঙ্করের মুখের দিকে তাকান। মুখ একই রকম ভাবলেশহীন। কিছু শোনেনি ভব ?

পাশাপাশি হাঁটতে হাঁটতে ভবশঙ্কর বললো, ‘আপনেরে দ্যাখার খুব ইচ্ছা ছিল আমার। ক্যান জানেন ? মা কইত, আমি নাকি একদম আপনের মতন। আপনের মতন কথাবার্তা, স্বভাব, চ্যাহারা।’

এরপর যতই ইচ্ছে হোক ভবশঙ্করের মুখের দিকে তাকাননি নীলেশ। বরং দূরে সুপারিগাছে লটকে গিয়ে পাক খেতে থাকা একটা ঘুড়ির দিকে চোখ রেখে বলেছিলেন, ‘তুমি ফিরে যাও ভব। আমি একাই যেতে পারব।’

চার

ট্রেন আসতে এখনও খানিকটা দেরি আছে। শেষবারের মতো চারপাশ দেখে নিচ্ছেন নীলেশ। স্টেশানের চেহারার পরিবর্তন হলেও জায়গাটা একই রকম আছে। রেল লাইনের পাশে পাশে এখনও সার সার কৃষ্ণচূড়া। খোলা মাঠ দিয়ে হু হু করে ধেয়ে আসছে হাওয়া। সেই হাওয়ার তোড়ে টুপটাপ করে খসে পড়ছে কৃষ্ণচূড়া ফুল। এই দৃশ্য যদি পূর্ব পরিচিত না হোত তাহলে ভাবা যেতেই পারত মাদারীপুর বুঝি ফুল ছড়িয়ে চিরবিদায় জানাচ্ছে। কিন্তু নীলেশ বসু ততটা অবাস্তববাদী নন। যেমন কি না ঝর্না বসু। রাতারাতি চলে যেতে হওয়ার দুঃখে এমন বিলাপ করছে যেন মাদারীপুর নীলেশের নয়, ঝর্ণার। কে বলবে এই মহিলাকে এখানে নিয়ে আসার জন্য সাধ্য সাধনা করতে হয়েছে!

চুপচাপ সেই বিলাপ শুনে চলেছেন নীলেশ। হয়তো শুনছেন না, কিছু ভাবছেন। কী ভাবছেন সেটাও নিশ্চিত বলতে পারবেন না।

দ্যাখো, দ্যাখো।

স্ত্রীর ধাক্কায় অন্যমনস্কতা ভাঙে নীলেশের। তাকান। ঝর্না সামনের কৃষ্ণচূড়া গাছটার দিকে আঙুল তুলে ছেলেমানুষের মতো উচ্ছাস প্রকাশ করেন, ‘কাকিল। দ্যাখো, দ্যাখো।’

চমকে উঠে তাকান নীলেশ। হঠাৎ কোথা থেকে এসে হাজির হলো পাখিটা! কেন এল ? কেউ তো ডাকেনি! নাকি কেউ পাঠিয়েছে বিদায় জানাতে ?

কলকাতা থেকে

সচিত্রকরণ : ধ্রুব এষ

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button