কবিতা

রবীন্দ্র গোপ

 

হেমন্তের মাঙ্গলিক উৎসব

 

হঠাৎ হেমন্তের  বিকেলে ঢেউ ঢেউজলে উত্তাল দোলায়

যমুনা যৌবনবতী আনন্দ উন্মত্ততায় বলে উঠল

তুমি এসেছো বন্ধু, কতদিন দেখিনি তোমাকে

তুমি আসবে বলে আলুথালু চুলে পাগল হাওয়ায়

ঢেউ ঢেউ জলে, খোঁপায় বেঁধেছি লাল শাপলা।

 

তুমি ভালোবাসো লাল শাপলা

সেতো আমার জানা, শুধু হয়নি বলা কোনোদিন

সেযে লক্ষ্মীকমল চরণে আলতা-পরা দিন-কতদিন

বিকেলের সূর্য রঙে রাঙিয়ে লাল টিপ কপালে

বসোনি বধূবেশে শানবাঁধানো ঘাটে পড়েনি পদচুম্বন!

 

তুমি আসবে বলেই ঝাঁকে ঝাঁকে নদী-বাঁকে

ভিড় করেছে যমুনার জলে রূপোলি ইলিশ

কতদিন পর তুমি আসবে বলে বসন্ত জাগানো কোকিল

গাইবে কত আপন মনে গান

কতদিন পর এলে বন্ধু- কত স্মৃতি জেগে ওঠে কেঁদে ওঠে প্রাণ-

 

ভালো থেকো বলে যমুনার ছলাৎ ছলাৎ হাত

ছোঁয়ালো তোমার সিঁথিতে, কুমারী মনে জাগলো যৌবন

ভালো থেকো বলে ভোরের শিউলি

ছড়ালো বুকের ঘ্রাণ, হেসে উঠলো ভোরের পাখিরা

এপার ওপারে আমনের ক্ষেতে সোনালি ধানেরা বলল, ভালো আছতো?

 

গাঁয়ের বধূরা হুলুধ্বনিতে শাঁখের শব্দে মাতিয়ে তুলল সন্ধ্যা

মঙ্গলপ্রদীপে ধূপদীপে জয় ঢাকে ছড়িয়ে পড়ল

তোমার  আগমনবার্তা, পিঠা পায়েসের গন্ধে ভরে উঠল মন

এ যেন বাঙলা মায়ের বুকে ফিরে আসা সন্তানের মাঙ্গলিক উৎসব।

 

 

তমিজ উদ্দীন লোদী

 

হুলস্থূল হত্যাকাণ্ডের ভেতরেও

 

আগুনমুখো সমুদ্রঘূর্ণিকে পেছনে ফেলে পলেস্তরা-খসা পুরো বাড়িতে এসে দাঁড়ালে

দেখা গেল আলো ও আঁধারের রহস্যের ঘনঘোর। অস্পষ্ট মুখের ভঙ্গুর ভঙ্গিমা।

এখানেই তোমার ছেনি ও হাতুড়ি। কাঠখোদাইয়ের নানা সরঞ্জাম। অথবা সেইসব

আয়না যা তুমি বেশ আগেই পরিত্যক্ত ঘোষণা করেছিলে। অথচ তা থেকে উঁকি

দিচ্ছে মুখ। রক্তাক্ত ব্যন্ডেজে মোড়া কিংবা পোড়া দাগে বীভৎস।

ঝড়…

যতই উৎসের খোঁজে তুমি হন্যে হচ্ছো ততই গভীরে নামছো অতল গভীরে।

গোয়েন্দার মতো তুমি রহস্যের কিনারা খুঁজতে খুঁজতে দেখছো হাড় ও পাঁজর।

করোটি ও কশেরুকা । চতুর ও অধরা হত্যাকারীর ছিন্ন সূত্রের কিয়দংশ। অনিচ্ছুক

আটকে যাচ্ছো বৃত্তের ভেতরে ‘সাইলেন্স অব দ্য ল্যাম্বের’ সেই রমণীর মতো।

ঝড়…

দেখছো পরিত্যক্ত আয়নার ভেতর লাফাচ্ছে চাঁদ। লাফাচ্ছে অসংখ্য ভাঙাচুরা মুখ।

কফিনের ভেতর থেকে মাংসহীন হাতগুলো আঙুলগুলো ঝাপটে ধরছে জীবিতের

মাংসল হাত। ঠাণ্ডা, হিম। সমূহসর্বনাশের ভেতর যারা অবিশ্বাস্য স্থির ও অটল।

হুলস্থূল হত্যাকাণ্ডের ভেতরেও যারা হিমাংকের নিচে নিশ্চল, নিথর এবং দর্শক।

 

 

ফয়সাল শাহ

 

চুম্বনশিখা

 

আমার চুম্বনগুলো বৃথা যেতে পারে না

কিছু চুম্বন এখনও দাওনি পেতে

পাব কি পাব না, তার নিশ্চয়তা চাই না

অসম্ভব এক প্রলয় আগুনে সংগোপনে

প্রজ¦লিত লেলিহান চুম্বনশিখা

শ্রাবণ আষাঢ়ে রোরুদ্যমান

পালতোলা নৌকার ঢেউয়ে ঢেউয়ে কম্পমান

চিম্বুকের চূড়ায় ভেসে যাওয়া মেঘ

নীল চোখের তীব্র আকুল চাহনি

কৃশকায় শীর্ণ কালো রাতের কান্না

লুণ্ঠনপ্রিয় দস্যুদলের মনোলিপ্সা

বাসনাবিহ্বল আলিঙ্গনে রক্তপ্রবাহ

তোমর ক্লান্ত ঠোঁটে দ্রাক্ষার সুরা

তোমার নীলাভ হতের শিরায়

অন্তর্লীন শিল্পের জীবন্ত আগুন

উজ্জ্বল উত্থানে জটিল এক নিদারুণ অনুভব।

 

 

কুমার চক্রবর্তী

 

দ্বিত্ব

 

নদীগুলো হলো রেখা

যা রচনা করে বৃত্ত…সমুদ্রের,

পাথর জানে এই ইতিহাস,

কেননা তাদের রয়েছে স্তব্ধতা

যা একাকার করে

হ্রস্ব আর দীর্ঘতার গূঢ়ৈষা

আমরা…আসলে দুটোই:

জীবন ও মৃত্যুর।

 

 

রওশন হাসান

 

গ্রহের ভাঙন

 

ধোঁয়াশা দিগন্ত, ঝাপসা চোখ

অবশেষে বৃষ্টি এল মুষলধারে

স্কাইস্ক্রাপার অট্টালিকাগুলো

ভিজে একপায়ে দাঁড়িয়ে

আকাশের দিকে তাকিয়ে

অনুধাবন করছে

আকাশ শুধু ছাদ নয় মাথার ওপরে

ক্ষমতাও তার অপরিসীম

সূর্য, চাঁদ, তারা আকাশে হেলান দিয়েই

আলোকময় করে পৃথিবী

দিন ও রাতের প্রত্যাবর্তনে জাগায়

প্রত্যাশা ও নিরাশা

পৃথিবী নামক এ গ্রহে এসেছে ভাঙন

স্থির আকাশ দণ্ডয়মান একইভাবে, প্রতিদিন প্রতিদানহীন

প্রাণীকুলের জন্যই

মানুষ নামক প্রাণীগুলো শুধু বদলে যাচ্ছে, মমতাহীন

এ গ্রহ এখন নরপশুদের দখলে

 

 

শোয়াইব জিবরান

 

লাল বসন্তের গান

 

আমাদের পিতাকে যেদিন হত্যা করা হয়েছিল পেরেক বিঁধে, গাছে ঝুলিয়ে

তখন জেরুজালেমের রাস্তায় রোদন করেছিল যে সকল নারী, আমরা সাতভাই

সে দলে ছিলাম। শুধু বোন, আমাদের একটিমাত্র বোন হঠাৎ উধাও হয়ে গিয়েছিল।

লোকেরা বলেছে, তার চিৎকার শোনা গিয়েছিল মাঠের ওপারে আর

চিরে গিয়েছিল আকাশ, দুইফালি। সাক্ষ্য আছেন ধর্মপুস্তক।

 

হত্যাকারীরা যখন ফিরে এসেছিল নগরে রক্তচক্ষু নিয়ে আমরা সাতভাই

পালিয়ে বেঁচেছিলাম।

তারপর হায়! আমাদের পিতার হত্যাকাণ্ডটি  গসপেল হয়ে গিয়েছিল।

আমরা সে গসপেলটি আমাদের নারীদের শুনিয়েছিলাম রোদনভরা  জ্যোৎস্না রাতে

তারা গর্ভবতী হয়েছিল।

আমাদের নারীরা বলেছিল, রোদন করো না দীন স্বামী,

তোমাদের সন্তানেরা ফুটবে কৃষ্ণচূড়ার ডালে ডালে ফুল হয়ে

লাল বসন্তের দিনে।

 

দ্যাখ আমাদের নারীরা আমাদের সত্য বলেছিল।

 

ওবায়েদ আকাশ

 

লোরকাও বিপ্লবী ছিলেন

 

লোরকাও বিপ্লবী ছিলেন

অথচ তাঁকে ফুঁ দিলেই উড়িয়ে দেয়া যেত-

যেমন দেয়া হয়েছিল হত্যার মুহূর্ত জুড়ে

 

অসহ গোপনে বলি, লোরকা

প্রথম ফুঁতেই শৈলসম ভর করেছিলেন

ফ্রাঙ্কোর স্বৈর-সামরিক হৃৎপিণ্ডের ডগায়

দ্বিতীয় ফুঁতে বুলেটের সাদা এবং

সর্বশেষ ফুঁতে গ্রানাডার অকল্পনীয় নিস্তব্ধতায়

 

কখনো বন্দুক ধরেননি লোরকা

লিখেননি স্লোগান সংবর্ততা

তাঁর মুষ্টিবদ্ধ হাত প্রতিদিন আকাশের গোচর এড়িয়ে

উড়ে যেত দুঃখবতী সাদা কাগজের দেশে

 

অথচ তার গ্রীবাভর্তি সুর, চোখভর্তি সাধ

স্পেনের উদাস মাঠের জন্য দুর্বিনীত প্রেম

একদিন হিংস্র বেয়নেট ঝাঁঝরা করে দিল

 

লোরকাই নাকি জানতেন কবিদের মহত্ত্বের চেয়ে

বিপ্লবের আগুন পৃথিবীর কোথাও কখনো তীব্র ছিল না

 

 

অনন্যা রাণী

 

কবিবউ

 

সবাই ডাক্তার-ইঞ্জিনিয়ার-ব্যাংকারের বউ হতে চায়।

আমি তা হতে চাইনি কখনোই,

চেয়েছি সাধারণ, অতি সাধারণ এক কবিবউ হতে।

যে-কবি নিত্য আমার খোঁপায় গুজবে জ্যোৎস্না-তারার ফুল।

সারারাত কাব্যের সাথে যুদ্ধ করে অনাবিল শান্তিতে গা ভেজাবে,

আকাশ হতে মুঠোভর্তি মেঘ এনে বুলিয়ে দেবে দু’গালে আমার।

বাস্তবতার ক্ষুধা মেটাতে হয়তো পারবো না,

আমি চাইও না।

কিন্তু মনের ক্ষুধা মেটানোর দুর্নিবার লোভ আমার।

তাই তো আমি চাই সাধারণ থেকে আরো সাধারণ

এক কবিবউ হতে।

 

রুদ্র হাসান

 

এবার হাসো

 

এতটা বিমর্ষ কেন পরী

কেন এত বিষণ্ণনতা

একটু হাসো

হ্যাঁ, তোমার সেই বিখ্যাত বাঁকা ঠোঁটের

বিষণ্নতার ঘাম মুছে দিবো

ভালোবাসার টিস্যু দিয়ে

চিবিয়ে খাবো তোমার যন্ত্রণার কাঁটাগুলো

একঢোকে পান করে নেবো চোখসাগরের

সবটুকু লোনাজল

পলক তোলো এবার

ময়ূরের-পেখম পাঁপড়ির ঝালর সরিয়ে

উঁকি দিক তোমার নয়নাভিরাম চাহনি

এবার একটু হাসো

হয়ে ওঠো ঝরনার মতো চঞ্চল

নদীর মতো ছলছল

অরণ্যের মতো শ্যামল

রংধনুর মতো সাতরঙ।

 

মনোনীতা চক্রবর্তী

 

যেতে যেতে

 

 

বিশ্বাস আর বিস্তার যখন দেওয়ালের বুকে পিঠ ঠেঁসে দেয়, ঠিক তখন মুজরোর ম্যহফিলে  আসে

নতুন আর এক অন্ধকার…

গন্তব্য বদলায় ঘণ্টার ঘনঘটায়

অথবা চিরাগের আয়ুরেখা ধরে!

রাতের বয়স বাড়ে, বেড়েই চলে অকথিত দুঃখের মতো…

আশ্চর্য আর দোলে না পরিচিত ঝুলনে…

বরং দুলছি আমি

দুলছে হাওয়া

দুলছে সুখ

দুলছে  কলসীভরা দেনা

 

নি

মি

অন্ধবাউল যেদিন ছুঁয়েছিল আমায়

যেদিন তুমিও ছুঁয়েছিলে অন্ধবাউল হয়ে

সেদিনও ছিল এমনই হাওয়ার দোলদোল দলুনি!

 

ছিল হাওয়াদের গান

ছিল রাঙামাথা

প্রতীক্ষা ছিল টুবুটুবু

 

এখন, এখন শুধু  রূপকথার রোশনাই

চিহ্ন অতিক্রম করা হাতবদলের সানাই অথবা

বেহালার গুমরে ওঠা কান্না!

 

সুখটা কুলীন

কিন্তু কান্নার কোন জাত নেই।

নেই উঁচু-নীচু তফাৎ।

একদম ক্ষিদের মতো সৎ!

 

এক ভিখিরির কাছে অজান্তে কোনো এক বোবা রাত্তির রাইফেলের টোটার মতো দাঁত দিয়ে ছিঁড়ে

আমিও পেতেছি আমার শত শতচ্ছিন্ন আঁচল

দুটো খুদ-কুড়োর জন্য!

মিলেছিল সেদিন

ক্ষিদে মিটেছিল  ঐ ভিখিরির ভালোবাসায়

 

কিন্তু আমার মতো ভিখিরি আর

কেউ নেই এ তল্লাটে

ভেবে পাঁচবার আকাশের তারা গুনলাম

দু’বার হো হো করে হাসলাম

তিনবার আগুনে ঝলসালাম চোখ।

 

এখন, হিসেব বরাবর

পাঁচ আর দুই সাত-এর থেকে তিন-এর নির্বাসন!

হাতে রইল আস্ত চার!

 

যেতে যেতে গুনগুন করে গান ধরলাম

‘চার দিনকি জিন্দেগী হ্যায়

যা রাহা হ্যায় দিন

এক গ্যয়ে তেরে মিলনে সে পহেলে

এক গ্যয়ে তেরে বিন

 

প্রিয়ে কব মিলন হোগা… কব মিলন হোগা…’

 

আতিকুর রহমান হিমু

 

শূন্যদর্শন

 

উড্ডয়নের ডানা হারিয়ে গেলে

কখনো কখনো পাখিরা মেঘ ছুঁয়ে ওড়ে

পালকের মতো ঝরে জল;

তবুও কি সবার জীবন সবুজ ছুঁতে পারে!

সুর আর পুষ্প ছোঁয় অরণ্য যেমন-

 

মাঝে মাঝে অরণ্য হতে চায় আকাশ;

ঠিক তখন তাঁর সমগ্র শূন্যতা

গিলে খায় ডানা ভাঙা মানুষ।

 

অবশ্য মানুষও আকাশ হতে চায়

কিন্তু সে জানে না

তার বিপুল শূন্যতায় আকাশের ঐটুকো নীল

অতি সামান্য।

 

 

রহমান মুজিব

 

তবুও

 

বড়ঁশিতে আজও প্রতীক্ষার চণ্ডিদাস। একচিলতে সংকীর্ণ হৃদয়ের মতো

সরু হতে থাকে প্রমিত শুদ্ধসবুজ, সবটুকু।

শিল্পের কঠিন বনে জন্ম নেয় শব্দলিপিরা আর দূষণে দূষণে উন্মুক্ত করে

সভ্যতার নামপত্র। আকাশের নীলসংলাপ রোদের তীব্রতায় লিখে রাখে

মানুষের তামাটে অভিধান, নিঃশেষ নির্বাণ

 

তবুও জীবন। তবুও চলা। তবুও একবার হারিয়ে গেলে

বারবার ফিরে আসা। তবুও মেঘমালার নিমন্ত্রণে ঝুম হয়ে আসে

প্রিয় বৃষ্টিলিরিক। দৃষ্টিরা আত্মস্থ করে উপেক্ষিত ঘাসে ডুবে থাকা

জুঁই-চামেলির মৌন হানিমুন। স্বপ্নের নিমগ্ন কাতরতায় তবুও

প্রতিরাতে অবমুক্ত হই তোমার শান্ত, স্থিত বুকে।

 

অনিকেত রাজেশ

 

কোনো একদিন

 

আমাদের বিকেলগুলি অন্যরকম হতে পারত;

আমাদের যাবতীয় ভাবনা বয়ে যেতে পারত

কেবলই সুন্দরের অন্বেষণে।

আমাদের সময় আমরা কাটিয়ে দিতে পারতাম

পরস্পরের চোখের পানে চেয়ে,

আমাদের স্বপ্নগুলি ঝরনা হয়ে বয়ে যেতে পারত-

ছড়িয়ে পড়তে পারতো পৃথিবীর সমতলে;

তাবৎ পৃথিবী ভরে যেত তবে ফসলে ফসলে।

 

আমি জানি, একদিন এইসব হবে

আমরা ভাসবো ঠিক আলোর উৎসবে;

একদিন সব অন্ধকার ঠিক মুছে যাবে

আমাদের পৃথিবী উপযোগী রং খুঁজে পাবে

একদিন আমাদেরও দক্ষিণের জানালা হবে

পুকুর হবে; হবে আম, জাম, নারিকেল, সুপুরির সার

শানবাঁধানো ঘাটে বসে দেখা হবে মাছের সাঁতার।

একদিন এইসব কংক্রিটের দেয়াল ভেঙে

সুশোভিত গ্রাম ফিরে পাবো; একদিন প্রাণহীন

সভ্যতার পিঠে টোকা দিয়ে বলব- বিদায়।

 

তারপর-

কোনো এক নতুন সকালে, সরু আলপথ ধরে

আমরা পৌঁছে যাব সবুজে সবুজে ঘেরা মায়াময় দ্বীপে

মায়ের নিকনো উঠোনে তোমারই আঁচল পেতে

ছোট্ট বাবুটির মতো বসে যাব একবাটি মুড়ি হাতে;

লিখে দেব- আরও এক সোনালি সকাল।

আমাদের নিপুণ বাসনাগুলি পূর্ণতা পেলে,

গোপন কান্নার ক্ষতগুলি ধুয়ে-মুছে যাবে;

উৎসবের মাঝে পৃথিবীর কেটে যাবে বহুকাল।

 

 

দেবাশীষ মজুমদার

 

বিস্মৃত ডাকবাক্স ঘেঁটে পাওয়া চিঠি

 

এক

খুব শোনা যাচ্ছে আমাদের শহরে এই আশ্বিনে ভ্যান গগ আসছেন। আত্মহত্যাপ্রবণ মেঘেরা ধীরে ধীরে ভেসে যাচ্ছে পাহাড়ের কাছে, সমূহ অশান্তি আঁচ করতে পেরে জানালা ছেড়ে পালিয়ে যাচ্ছে অসুখী রোদ, ঢেউয়ের দিকে হঠাৎ ঝুঁকে যাচ্ছে নদী, আর সূর্যের বুকে ফিরে যাচ্ছে নির্বাক আলোর মিছিল। একটা অতি আদুরে কচুরিপানা এইসব দেখে কিংকর্তব্যবিমূঢ়; মেঘেরা নিজেদের সামলাতে না পেরে আকাশসহ ভেঙ্গে পড়ে যদি, কোথায় লুকবে সে, কোন বিলে, কোন শাপলার নির্জন আঁচলে? মহামতি ভিনসেন্ট উইলিয়াম ভ্যান গগ এলে তাঁকে দিয়ে এই ছবিটা আঁকিয়ে নেব।

 

দুই

সমুদ্রকে সাফ জানিয়ে দেয়া হয়েছে আপাতত কিছুদিন নোনা বাতাস এইদিকে যেন না আসে। সদ্য কৈশোর পেরিয়ে আসা তরুণীদের মধ্যে বিলিয়ে দেয়া হয়েছে রাশি রাশি সূর্যমুখী ফুল, ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশে শালিখেরা জোড়ায় জোড়ায় দেখা দিচ্ছে। জিরাফের বিস্ময় নিয়ে তাকিয়ে থাকবে আগামী কিছুদিন সমস্ত ট্রাফিক পুলিশ। এর মধ্যে বিচ্ছিন্ন কোন ঘটনা যদি ঘটে যায় তবে তাকে অসমাপ্ত চুম্বনদৃশ্য বলে উপস্থাপনের জন্য সমস্ত মিডিয়াকে জানিয়ে দেয়া হয়েছে। মহামতি ভ্যান গগ সত্যিই আসছেন। গতকাল সকল মিডিয়া নিশ্চিত করেছে হাইপোথিসিস ভাঙতে চাওয়া লোকটা সাইরেন শুনে জাগতে পারেনি বলে আত্মহত্যা করেছে। চাপা স্বরে কেউ কেউ বলছে ব্যাপার মোটেই তেমন নয়, তার সুইসাইডাল নোটে নাকি লেখা ছিল, আসন্ন মৃত্যুর ভয়ে আমি আত্মহত্যা করছি।

 

তিন

খুলি-দ্বীপের ওপর দিয়ে বুল্ডোজারে চড়ে তিনি এলেন, জানালেন তাঁর মৃত্যুর আগের আঠারো মাস এখানেই থাকবেন। আলু ব্যবসায়ীরা দ্যা পটেটো ইটার্স ছবির জন্য তাঁকে আলু সম্রাট উপাধিতে ভূষিত করলেন, সেই অনুষ্ঠানে উত্তরীয় পড়িয়ে দিল এক ন্যাড়াঅষ্টাদশী,তিনি দেখলেন আশপাশে সমস্ত রমণীর মাথাও ন্যাড়া। কাপুরুষ সূর্যের অসহযোগিতার কারণে সূর্যমুখী ফুল জেগে উঠতে পারেনি সময়মত। ভ্যান গগ এ শহরের ক্যানভাসে একটা সাঁকোর ছবি আঁকলেন, এর নীচে বইতে শুরু করল একটা হাহাকারের নদী। এই একটু আগে জানা গেল তিনি একটা সুইসাইডাল নোট লিখছেন, আর তাতে তাঁকে সহায়তা করছেন শহরের সমস্ত কবি। এদের সাথে ভ্যান গগ একটা সেলফি তুলবেন, ক্যাপশন দেবেন সাইকোসিস। ছন্দের মাত্রা ভেঙে কবিদের কাছে এই বার্তা পৌঁছে দেয়া হল।

 

সুমন রায়হান

 

শিরোনামহীন

 

ভোর

 

ঘাসের শিশির তোলে কেবলই ঢেউ,

স্বপ্নের চোখ দিয়ে…খুঁজি,

শিশিরে তুলে তুমুল পদচিহ্ন

খোঁজে যদি কেউ…

 

দুপুর

 

জ্যোৎস্না বিলায় জল

নদী টলমল

জীবনে জোয়ার এলে

আঁখি ছলছল…

 

গোধূলি

নিয়ে যায় হৃদয়গাঙে

দ্রুতচারী ব্যথা নারি

শুধু অব্যক্ত বেদন…

 

সন্ধ্যা

 

হায়, সূর্যমামা বাড়ি ফিরে যায়

কবি এসে চুপটি করে বসে থাকে

সন্ধ্যার কিনারায়….

 

রাত

 

রাতটা দুপুর হলে,

চাঁদটা উপুড় হলে,

প্রণয়ের তরে হৃদয়টা পোড়ে…

 

 

 

 

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

shares