গল্প

মানুষপাখিরা

আহমেদ খান হীরক

 

সহস্র পাখির শিস দেয়া শব্দের অদ্ভুত স্বপ্ন দেখতে থাকা রুহানের ঘুম ভেঙে গেলে মনে হয় সে গত সাড়ে সাতাশ বছর কোনো পাখির ডাক শোনেনি। পাখি কীভাবে ডাকে, ডাকলে কেমন লাগে তার কিছুই যেন মনে নেই। এমনকি, একটা ঘুম-অঘুমের মধ্যে কোনো পাখির চেহারাও তার মনে আসে না। বাথরুমে অনেকক্ষণ নিজের সমস্ত অসিÍত্ব নিচের দিকে ঠেলে দিতে দিতে, সতের তলার ভেতরে বসে রুহান পাখির শিসের কথা মনে করার চেষ্টা করে। তখনই তার মায়ের শিসের কথা মনে আসে। খুব ছোটবেলায়- যখন সে হাফপ্যান্ট পড়তো- কোমর থেকে প্যান্টটা নামিয়ে তার মা বলত, সিসিসিসি…আর সেই শিসে আরেকটু বিকশিত হয়ে সে ছড়ছড় করে প্রস্রাব করত। রংধনুর মতো বেঁকে একটা রূপালি-ধারা এগিয়ে যেত। মা হাসতেন। রুহানও তখন মুখে বলে উঠত সিসিসিসি। তবে ততক্ষণে তার রূপালি-ধারা ক্ষীণ হয়ে আসত। কিছুক্ষণের মধ্যেই ক্ষীণ হতে হতে তা মিলিয়েও যেত। ছোট্ট রুহান বিস্মিত হতো। আর মাকে আবার শিস দিতে বলত। আর মা না দিলে সে নিজে আরও কিছুক্ষণ শিস দিয়ে ফিরত। চেষ্টা করত। কিন্তু আর কিছুই বেরিয়ে আসত না। সেদিনের মতোই আজও, তার নিজস্ব শীতাতপে বসে আরেকবার শিস তোলে মুখে–সিসিসিসি!

রুহান অপেক্ষা করতে থাকে একটা রূপালি স্রোতের, যেন তা এক্ষুনি বেরিয়ে আসবে। কিন্তু কোনোক্রমেই রূপালি স্রোতটা বেরিয়ে আসে না। রুহান আরও একবার শিসের আওয়াজ তোলে। সিসিসিসি। আর অপেক্ষা করতে থাকে। অপেক্ষা করতে থাকে। অপেক্ষা করতেই থাকে। বাইরে থেকে ঘরোয়া আওয়াজ আসে। কিন্তু রুহান উৎকর্ণ অন্য কোনো আওয়াজের জন্য। যদিও আওয়াজটা তৈরি হয় না। একটা লম্বা সময় কেটে যায়। আর এর মধ্যে ভেতর থেকেও কোনো তাড়া অনুভব না করলে রুহানের ভ্রুকুচকে আসে। প্রতিদিনের অমনটি হওয়ার না-হওয়ায় বদলে যাওয়ার সঙ্গে কি পাখির শিসের স্বপ্নের কোনো যোগসূত্র আছে? যোগসূত্র আছে কি শৈশবের মাতৃত্বের শিসের? এরকম আরও কিছুক্ষণ ভাবার চেষ্টা করে রুহান। কিন্তু ভাবনা স্থায়ী হয় না। সে মুখে আওয়াজ তোলে- সিসিসিসি! না,কিছুই আসে না। কোনো রূপালি সোনালি স্রোত না, কোনো কিচ্ছু না। রুহান দেখে তার উত্থান ফুরিয়ে আসছে, বিদ্যুতের তারে উল্টে থাকা বাদুরের মতো ঝুলে যাচ্ছে, কিন্তু কোনো ধারা বেরিয়ে আসার কোনো সম্ভাবনা তৈরি হচ্ছে না।

দুশ্চিন্তা হয় রুহানের। তাহলে কি এটা আর কোনোদিন বেরোবে না? একটা লম্বা সময় কেটে গেলে রুহান ক্লান্ত ও ব্যর্থ ও বিষণ্ণভাবে বাথরুম থেকে বেরিয়ে আসে। বাথরুম শেষে সাধারণত সে ব্যালকনিতে দাঁড়ায়। দাঁড়িয়ে একটা সিগারেট ধরায়। অর্পা তখন চা বা কফি দিয়ে যায়। সেটা খেতে খেতে সে নিউজ-পেপার দেখে। কিন্তু অন্যদিনের মতো সে আজকে আর ব্যালকনিতে যায় না। সোজা ডাইনিঙে বসে। ফোনরত অর্পা তাতে কিছুটা বিস্মিত হয়। ব্যালকনি প্রসঙ্গ উঠালে রুহান হতাশকণ্ঠে পাখিদের কথা জানতে চায় যে ব্যালকনিতে তারা আর কেন আসে না? এতে অর্পা কিছুটা চুপ থাকে। রুহান তখন পাখির শিসের শব্দের কথাও বলে ফেললে অর্পা ফোন রেখে নাস্তা নিয়ে আসায় মনোযোগী হয়। তবে নাস্তা নিয়ে টেবিলে বসলে তাকে আগের চেয়ে সপ্রতিভ দেখায়। জানায়, ব্যালকনিতে আগে যে পাখিগুলো আসত সেগুলো খুব বদও তো ছিল। ছুটির সকালে কিচির-মিচির করে ঘুম ভাঙিয়ে দিতো আর তখন রুহানেই তো চেঁচামেঁচি করত! খুব বিরক্তও হতো রুহান।

রুহানের অবশ্য এসবের কিছুই মনে পড়ে না। তার মন পড়ে থাকে বিলের ধারে। যেখানে শীতকালে শীতের পাখিরা আসত। একসাথে বসলে পুরো বিলকে একটা পাখির নদী মনে হতো। মনে হতো যেন একটা উড়ন্ত চাদর এসে শুয়ে আছে শান্তিতে। আর ছিল তাদের শিস। সিসিসিসিসি…ক্রমাগত সেই শিসে রুহান বিহ্বল হয়ে পড়ত। মাকে এসে গল্প শোনাত সে। শিস দেয়া পাখি…শত শত পাখি। মা হাসতেন। রুহানের মনে হতো সেই হাসি পাখির শিসের মতোই সুন্দর। অর্পা বলে যে, পাখিরা এখন অনেক দূরে দূরে ওড়ে, মানুষের কাছে আসতে চায় না। রুহান তখন সহস্র পাখির শিসের শব্দঅলা স্বপ্নের কথা বলতে যায় অর্পাকে; কিন্তু অর্পা সে কথায় মনোযোগ দেয় না। খাবার তুলে রেখে দেয় ফ্রিজের ভেতর। আর ফিরলে শোনায় তার নানির গল্প। যে নানি ছোটবেলায় তাকে পাখিদের গল্প শোনাত। সে-সব গল্পে খুব আজগুবি আজগুবি ব্যাপার হতো। কোনো এককালে নাকি পাখির সাথে মানুষের বিয়ে হয়ে যেত। উঁচু আকাশের সুন্দর সুন্দর পাখিরা প্রেমে পড়ে মানুষকে বিয়ে করে ঘর বাঁধত। কিন্তু পাখির জন্য তা সহজ তো ছিল না খুব। মানুষকে বিয়ে করার জন্য তাদের মানুষ হতে হতো। আর মানুষ হতে হলে যা করতে হতো- পাখিরা তাদের ডানা খুলে ফেলত। লুকিয়ে ফেলত কোথাও। আর ডানা লুকালে যা হতো- পাখিরা আর উড়তে পারত না। কিন্তু উড়তে না পারার ব্যর্থতা আর আকাক্সক্ষা আর স্মৃতি তাদের ভেতরে গাঢ় বাতাসের মতো গুমড়ে গুমড়ে উঠত। তাতে কেমন অদ্ভুত শব্দ হতো। যেন বাতাস কেটে যাচ্ছে হাওয়ায়। রুহান জানতে চায় সে শব্দ কি শিসের মতো হতো? সিসিসিসি?

অর্পা হাসে শুধু। বলে, এসব তো গল্পকথা শুধু। সত্যিই কি আর এমন হয়? আসলে তার নানি একটু পাগলি কিসিমের ছিল বলে এরকম আজগুবি গল্প করতে পারত। ওই সব গল্পে কেউ মন দিতো না। নানি একা একা গল্প করে গেলে অর্পা মাঝে-সাঝে নানির কাছে বসত। আজগুবি হলেও গল্পটা ভালো লাগে রুহানের। বলে, সব কিছু তো আর আজগুবি হয় না। নানির গল্প সত্যিও তো হতে পারে। পারে না? অর্পা ভাবে। বলে তার নানি নাকি অনেক মানুষপাখি দেখেছে যারা মানুষের প্রেমে মজে কিছুদিন মানুষের সাথে থেকে আবার আকাশে উড়ে গেছে। কারণ উড়বার স্মৃতি নিয়ে জমিনে থাকা খুব মুস্কিল! খুব কষ্টের! আর একবার ওই দূর আকাশে চলে গেলে ওই মানুষ পাখিরা আর কখনও ফিরে আসে না। কখনওই না! দূর আকাশে চলে যাওয়া মানুষপাখিদের কথা ভেবে কেমন একটা বিষণ্ণতা অনুভব করে রুহান। আর সেই সঙ্গে তলপেটে একটা চাপ! রুহানের মনে হয় কেউ একজন শিস দিতে শুরু করেছে- সিসিসিসি! রুহান আশপাশে তাকায়। কাউকে দেখতে পায় না। অথচ তার মনে হয় কোনো এক পাশে বসে তার মা শিস তুলে চলেছেন… সিসিসিসি!

 

২.

অফিসে কোনো এক ইভেন্ট থাকায় সবাই এতই ব্যস্ত যে ইউরিনালের সামনে দীর্ঘক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকতে পারে রুহান। কিন্তু কোনোভাবেই তার ভেতর থেকে রূপালি স্রোত বেরিয়ে আসে না। সে প্রথমে ধীরে ধীরে, পরে প্রায় জোরেই শিস দিতে থাকে…সিসিসিসি বলতে থাকে কিন্তু কিছুই বেরিয়ে আসে না। এরকম অবস্থায় পাশের ইউরিনাল থেকে জুনিয়র মমিন উঁকি দিয়ে তাকিয়ে থাকলে রুহান সৌজন্যসুলভ হাসে। তাতে জুনিয়র একটু সাহস পায় আর বলে, স্যার, চেষ্টা চালায়ে যান। ভেতরের মাল আটকায়া রাখা বহুত কষ্টের! বলেই সে জিভ কাটে। এভাবে কথা বলা তার অপরাধ হলো কিনা জানতে সে আবার উঁকি দেয় কিন্তু ততক্ষণে রুহান নিজের ডেস্কে ফিরে যায়। আর ডেস্কে ফিরতেই পিয়ন ছুটে আসে। জানায় এক তরুণী অনেকক্ষণ থেকে রুহানের জন্য নাকি বসে আছে। ফলে রুহান ওয়েটিং রুমে গিয়ে সুরাইয়া বা সুমাইয়াকে আবিষ্কার করে। সুরাইয়া বা সুমাইয়া জানায় তার সাথে সাকিবের একটা সম্পর্ক আছে বা বলা ভালো ছিল কী সম্পর্ক আছে বা কী সম্পর্ক ছিল। তা অবশ্য বলে না। রুহানও তেমন কোনো কৌতূহল দেখাতে পারে না। বস্তুত সাকিব কে তা-ই সে জানে না। কিন্তু মেয়েটা ধরে নেয় রুহান সাকিব স¤পর্কে সবই জানে। ফলে দীর্ঘক্ষণ সাকিবের বর্ণনা দিতে থাকা সুরাইয়া আর সুমাইয়াকে রুহান বুঝে উঠতে পারে না। তখন, সব শেষে, সুরাইয়া বা সুমাইয়ার সন্দেহ হলে জানতে চায়, আপনি কি সত্যিই সাকিবকে চেনেন না? রুহানের খারাপ লাগে যে সাকিবকে তার হয়ত চেনা উচিত ছিল, কিন্তু সে চেনে না, ফলে সে চুপ করে বসে থাকে। সুরাইয়া বা সুমাইয়া তখন উঠে চলে যায়। আর যাবার আগে রুহানকে বলে, আপনিও কিন্তু আমার মতোই সাধারণ মানুষ, মনে রাখবেন! মনে রাখবেন আপনি পাখি না!

এসব কেন বলে মেয়েটা তাও বুঝতে না পারলে রুহানের তলপেটে আটকে থাকা রূপালি স্রোতটা আরেকবার ঝলমল করে ওঠে। তাতে রুহানের শুধু সিসিসিসি মনে আসে। আর সে ছুটে যায় ইউরিনালের কাছে। নিজেকে মুক্ত করে সত্যিকারের মুক্তি পেতে চায় সে। নিজের ভেতর গুঞ্জরণ তোলে…সিসিসিসি…কিন্তু কিছুই হয় না। আরেকটি ব্যর্থতা রুহানকে জাপটে ধরে। সুরাইয়া বা সুমাইয়াকে তার আবারও মনে পড়ে। মনে পড়ে সে জানিয়ে গেছে সে পাখি না। অথচ পাখির স্মৃতি তার আছে। অনেক পাখির মধ্যে দাঁড়িয়ে তার মধ্যে সে তার মাকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখেছে। পাখিগুলো তখন শিস কেটে যেত অনি:শেষ…আর রুহান শিউরে উঠত। আর মা পাখিগুলোকে হাত দিয়ে সরিয়ে দিতে দিতে তাকে জড়িয়ে ধরত। বলত, ভয় পায় না ছাওয়াল, ভয় পায় না! পাখিগুলো তখন সাঁই সাঁই করে উড়ে যেত আকাশের দিকে।

 

৩.

ইভেন্ট শেষ করে বাসায় ফিরতে ফিরতে রুহানের দেরি হয়ে যায়। হাতে করে ঝুলিয়ে বেস্ট এমপ্লিয়ের ট্রফিটাও নিয়ে আসতে হয় তাকে। ট্রফিটা তাকে আনন্দ বা বিষাদ কোনো কিছুই দিতে পারে না। তার সমস্ত মনোযোগ তলপেটের রূপালি স্রোতে কেন্দ্রীভূত হয়ে থাকে। লিফটের ভেতরেও সে আরও কয়েকবার শিস দিয়ে ওঠে। আর এরকম শিস দেয়ার মধ্যেই লিফটটা কখন সতের তলা পেরিয়ে একেবারে টপে উঠে যায় রুহান তা খেয়াল করতে পারে না। লিফটের দরজা খুললে রুহানের পায়ের কাছে একফালি জ্যোৎস্না এসে আছড়ে পড়ে। রুহান তাতে আপ্লুত হয়। জ্যোৎস্নায় কি কোনো পাখি শিস দেয়? আসে কোনো পাখি ছাদে? মৃদু পায়ে হাঁটে? রুহান খোলা ছাদে গিয়ে দাঁড়ায়। একটা দারুণ চাঁদ মাথার ওপরে ঝুলে থাকে। যেন একটা আতাফল, আর তার পাশে একটা তোতাপাখি। কিন্তু কোথায় তোতাপাখি? কতগুলো মেঘ উড়ে যায়। তাতে চাঁদ ঢাকা পড়ে। চাঁদ ঢাকা পড়লে পাখির আশায় ধোঁয়ার আকাশে অনেকক্ষণ তাকিয়ে থাকে রুহান। নেই, পাখি নেই কোনো। তখন রুহান ফিরে যেতে চায়, কিন্তু ফেরার আগেই রুহান দেখে অর্পাকে। অর্পা, কেমন দারুণ, সাদা মোমের মতোন শরীর নিয়ে, নগ্ন, একা, দাঁড়িয়ে আছে ছাদে। মেঘে ঢাকা জ্যোৎস্নায় রুহান দেখে অর্পার পিঠে ডানা। সাদা ঘোড়ার ডানার মতো দুধসাদা দুই ডানা। যমজ দুই ডানা। পাখির মতো ডানা। পাখিরই কি ডানা? আর অর্পার মোমসাদা শরীরে উড়বার এক তুমুল ভঙ্গি। একটা শিসের শব্দ তুলে, ডানার খসখস শব্দ তুলে মুহূর্তেই অর্পা উড়ে যায়। সাঁই সাঁই করে উড়ে যায়। রুহান বিস্মিত হতে গিয়েও হতে পারে না। তার তখন মায়ের কথা মনে পড়ে। অর্পার করা গল্পগুলো মনে পড়ে। অর্পার ডানা আর অর্পা শিস তুলতে থাকে। সিসিসিসি। তারপর একটা মেঘের ভেতর চক্কর কেটেই অর্পা ফিরে আসতে থাকে। আসতে আসতে অর্পা হাতটা বাড়িয়ে দেয়। রুহান হেসে ওঠে। সেও বাড়িয়ে দেয় তার হাত। তাহলে ওই সুরাইয়া বা সুমাইয়া ভুল বলেছে! তাহলে সেও আসলে পাখি! সেও তাহলে উড়বে ওই আকাশে। সাঁই সাঁই করে উড়বে! রুহান বাড়ানো হাতটা আরেকটু মেলে ধরে। আর ঠিক তখনই দেখে তার পাশেই দাঁড়িয়ে আছে একটা তরুণ। দুধসাদা শরীর। তরুণটাকে চেনে কি রুহান? তার ফ্ল্যাটের উল্টোদিকেই কি থাকে? এই তরুণের নামই কি কেউ বলেছিল তাকে? কী ছিল যেন তার নাম? রুহান তরুণটিকে তার নাম জিজ্ঞেস করতে যায় আর ঠিক তখনই ছেলেটি হেসে ওঠে। আর সেই হাসি দেখে মনে পড়ে তরুণটির নাম সাকিব। এই সাকিবের সাথেই কি সুরাইয়া বা সুমাইয়ার স¤পর্ক আছে বা ছিল? তরুণটিকে জানাবে তরুণীটির আসল নাম কী সুরাইয়া নাকি সুমাইয়া?

 

কিন্তু ততক্ষণে হাসতে হাসতে ছেলেটিও তার হাত বাড়িয়ে দিয়েছে সামনে। আর সেই হাতের ওপর পড়ে অর্পার মোমসাদা হাত। আর লহমায় অর্পা সাকিবকে তুলে নেয় শূন্যের দিকে। আর তখনই রুহান খেয়াল করে সাকিবেরও পিঠে রয়েছে দুটি ডানা। খসখসে ডানা। পাখিদের ডানা। তারা উড়ে যায়। সাকিব আর অর্পা উড়ে যায় আকাশের দিকে। তারা উড়ে যায় চাঁদের দিকে আর মেঘের দিকে। উড়ে যেতে যেতে ডানার আওয়াজে ওঠে তীব্র শিসের শব্দ। তারা যতই ওপরে উঠতে থাকে শিসের শব্দ ততই বাড়তে থাকে। যেন তারা অর্পার নানির গল্পের মানুষপাখিরা…যেন তারা প্রেমে পড়ে মিশে যাচ্ছে জ্যোৎস্নায়…মেখে নিচ্ছে মেঘ। আর তাদের উড্ডীন প্রেমে চারপাশ কাঁপিয়ে শিস উঠছে সিসিসিসি…সিসিসিসি…! আর তখনই তলপেট থেকে একটা তীব্র স্রোতের উন্মাদ গর্জন অনুভব করে রুহান। প্রচণ্ড চাপের মধ্যে সে হাঁটুমুড়ে বসে পড়ে ছাদে। আর রুহান দেখে তার পাশেই দাঁড়িয়ে আছেন তার মা। মোমসাদা শরীর। আর কী আশ্চর্য মায়ের পিঠেও একজোড়া ডানা। পাখিদের ডানা। এই ডানা মেলেই মা কোনো এক গভীর রাতে উড়ে গিয়েছিল? উড়ে গিয়েছিল তাদের নিজস্ব ঘর আর আঙিনা ছেড়ে? মায়ের চোখে জাদু আর মায়ের ঠোঁটে সেই আশ্চর্য শিস। সিসিসিসি!

বিক্ষুব্ধ প্লাবনের মতো রুহানের ভেতর থেকে এক ধাক্কায় বেরিয়ে আসে কাক্সিক্ষত রূপালি স্রোত। মা হেসে ওঠেন। রুহান খেয়াল করে মায়ের শরীরে উড়ে যাবার এক অদ্ভুত ভঙ্গি। রুহান আর তাকাতে পারে না, চোখ বন্ধ করে নেয়। একটা তীব্র সিসিসিসি শব্দে কাঁপতে থাকে তার জগৎ। ডানার সাঁই সাঁই শব্দে মেঘের গর্জনের মতো দশদিক কাঁপাতে থাকে। শিসের শব্দ বাড়তে থাকে। রুহান চোখ খোলে। কোথাও কিছু নেই। শুধু তার ভেতর থেকে একটা রূপালি স্রোত এক অতিকায় রংধনু হয়ে চাঁদের দিকে ছুটে চলেছে, ছুটেই চলেছে। চারপাশে আর কোনো শব্দ নেই। কিছু নেই।

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

shares