গল্প

গুপ্তধন

রাজকুমার সিংহ

 

রাতের আঁধার তখনও নামেনি। তবে সূর্য ডুবে গেছে বেশ কিছুক্ষণ হলো। নিমাই সিংহের দোকান কাম চা স্টলে বিভিন্ন বয়সের লোকজনের আগমন শুরু হয়েছে। চা স্টলের সামনে বারান্দায় তিনটা ছাড়াও রাস্তার একেবারে পাশে আরও দুটি বাঁশের বেঞ্চে বসার ব্যবস্থা আছে। মুরব্বি গোছের যারা আছেন তারা বারান্দায় বসে, আর একটু কমবয়সীরা রাস্তার বেঞ্চে বা দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়েই আড্ডা দিতে থাকে, চা চলতে থাকে, ধূমপান চলতে থাকে, গল্পগুজব চলতে থাকে। দোকানটি গ্রামের ঠিক মাঝখানে হওয়ায় সারা গ্রামের মানুষেরাই এখানে এসে মিলিত হয়। বিকেল থেকে রাত দশ এগারটা পর্যন্ত এ আসর চলতে থাকে। সবাই পুরো সময় যে বসে থাকে তা নয়, কেউ আসে কেউ যায়, কেউ পাশের বাড়ির কাউকে পেলে তেলটা, লবণটা ‘আমারাং দিয়াদিস (আমার বাড়িতে দিয়ে দিও) বলে আড্ডায় যোগ দেয়। মহিলাও এক দু’জন মাঝে মাঝে আসে তবে তারা আড্ডা দেয় না। খরচপাতি কিনে নিয়ে চলে যায়। নিমাই এবং নিমাই’র বউ চামেলী দু’জনে মিলেও কোনো কোনো দিন দোকান এবং চা স্টল সামাল দিতে পারে না।

এ-জায়গাটিকে বলা যায় ভানুবিল গ্রামের বিবিসি বা ভয়েস অব আমেরিকা। অবশ্যি স্যাটেলাইট চ্যানেলের এ যুগে মানুষ রেডিও শোনে না, টিভিই দেখে। তখন কিন্তু বয়স্ক মানুষেরা নিমাই’র দোকানকে বিবিসি বা ভয়েস অব আমেরিকা বলেই আরাম পেতো বেশি। গ্রামের ও গ্রামের বাইরের এমন কোনো খবর নেই, যা এখানে আলোচনা হতো না।

আজ কুতু এসেছে একটু আগেভাগেই। কালকে রাত্রে সে যে জিনিসটি দেখেছে তা সে সবাইকে জানাবে। সবাইকে না জানানো পর্যন্ত তার ভাত হজম হবে না। কিন্তু এসে দেখে লোক সমাগম কম। কম লোকের মাঝে এসব খবর বেশি জমে না। আচ্ছা আসুক, আসুক আরও দু’চারজন। কুতু চায়ের অর্ডার দেয়, পাশে মনিলালদা বসা, তার জন্যও এককাপ দিতে বলে।

আস্তে আস্তে লোকজন আসতে থাকে। পনেরো-বিশ মিনিটে মোটামুটি খবর চাউড় করার একটা পরিবেশ তৈরি হয়ে যায়। কুতু প্রস্তুতি নেয়, একবার কাঁশে। তার গলার স্বরটা বড়। সে শুরু করে, আমার কাদাহার অগতে এইনতাহা রাঙা ইল নাই হে। (আমাদের কাছের জন তো এবার লাল হয়ে গেল)।

অনেকেই জিজ্ঞেস করে, ‘কার কথাহান মাতরটা কুতু?’’ (কুতু তুমি কার কথা বলছো?)

নিশিকান্তর ঘরগর পিছহাট্টো কালিকা রাতি কলো দু’গ নিকারলা হে।’ (নিশিকান্তর ঘরের পিছন থেকে কাল রাতে দুইটা কলস বের করেছে।)

‘কিতার কলো? (কিসের কলস?) মনিলাল বাবু জিজ্ঞেস করলেন, কুতু অবাক হওয়ার ভঙ্গি করে বলল, ‘কিতারতা আকমু আঙকরানি লাগের থাং, হুনার কলো’ (কিসের আবার জিজ্ঞেস করা লাগে, সোনার কলস)

অনেকেই অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করে, ‘কিহান মাতর হানহে কুতু, হুনার কলো? (কি বলছো কুতু, সোনার কলস?)

কুতু খবরটা প্রকাশ করে বেশ আরাম পায়, সে নাকি কালকে রাত বারটার পর নিজের চোখে দেখেছে। কিছুদিন ধরে নিশিকান্তের বাড়িতে যে কবিরাজ আসা-যাওয়া করছে, সেই নাকি গতকাল রাত্রে এটা করে দিয়েছে।

বিষয়টা বেশ বাজার পায়, উপস্থিত লোকজন সবাই কানাঘুষা করতে থাকে। কুতু বলে, নাতে ফঙকরিয়ো, কোঙগও হারপাছিহান নাবে।’ (প্রকাশ করবেন না কিন্তু, বিষয়টা কেউ জানে না)

নিমাই’র দোকানে এটা আলাপ হলে যে আর গোপন থাকবে না সেটা সবাই যেমন জানে কুতুও জানে। তবুও সে একথা বলল।

দু’একদিনের মধ্যে গ্রামের সবাই জেনে গেল, নিশির দিন পাল্টেছে, সে দুইটা সোনার কলস পেয়েছে। সবাই ঐ কবিরাজকে পেতে চায় কিন্তু কবিরাজ ধরা দেয় না। এর মধ্যে শোনা গেল, নিশিকান্ত পনের শতক জমি বিক্রয় করেছে কবিরাজকে টাকা দেয়ার জন্য।

অনেকেই বলে কবিরাজ গোপনে গোপনে গ্রামে আসে কিন্তু কেউ তার আদিঅন্ত বলতে পারে না। এভাবে চার-পাঁচ দিন যায়। গুঞ্জন কিন্তু থেমে নেই।

হঠাৎ একদিন দেখা গেল, নিশিকান্তর পরম সুহৃদ তারাপদ নিশিকান্তর বাড়ি থেকে কবিরাজকে নিয়ে যাচ্ছে তার বাড়ির দিকে ভরদুপুরে। কৌতূহলী লোকজন অনেকেই খবর পেয়ে যার যার বাড়ির সামনে বের হয়ে দেখতে থাকে কবিরাজকে। কবিরাজ কোনোদিকে তাকাচ্ছে না, তারাপদকেও দেখা গেল খুবই ব্যস্ত, অনেকেই অবাক হয়ে মনে মনে ভাবছে, তারাপদেরও মনে হয় কিছু একটা হবে।

গৌড় বাড়ির কাছে আলুক্ষেতে বেড়া দিচ্ছিল, কবিরাজের কথা শুনে তাড়াতাড়ি রাস্তায় এসে, তারাপদকে জিজ্ঞেস করল, ‘তারাপদদা এগথাং মাত্তারা কবিরাজ ও গো?’ (তারাপদদা, ইনিই নাকি সেই কবিরাজ?)।

তারাপদদা মৃদুকণ্ঠে বললেন, ‘হাই এগোহে।’ (হ্যা, ইনিই)

গৌড় মুখ হা করে কিছু সময় তাকিয়ে থাকল, ইতিমধ্যে পাড়ার আরও দু’চারজন সেখানে জমায়েত হয়েছে। সবাই বলতে লাগল, ‘তারাপদরতাও কামহান ইয়াবরতইগাছাৎ।’ (তারাপদেরও মনে হয় কাজ হয়ে যাবে)।

এর দু’দিন পর সত্যি সত্যি তারাপদ বাবুর কাজ হয়ে গেল এবং তাও দিনে-দুপুরে। ঘরের ভিতরে মাটি খুঁড়ে প্রায় আধ কেজি ওজনের একটা সোনার গোলক আবিষ্কার হয়েছে। এসব খবর যার বাড়িতে ঘটে, সে কাউকে বলে না কিন্তু কেমনে কেমনে জানাজানি হয়ে যায়। এর দু’দিন পর তারাপদ তার দুধেল কালো গাইটা বাজারে নিয়ে বিক্রি করে আসে।

গুঞ্জন বাড়তে থাকে। ভানুবিল ছাড়িয়ে অন্য গ্রামেও শুধু গুঞ্জনই নয়, অন্য গ্রামেও গুপ্তধন বের হওয়ার খবর শোনা যেতে থাকে। কয়েকদিন ধরে তিনচারটা মনিপুরী গ্রামে আলোচনার প্রধান বিষয় ঐ একটাই কবিরাজ আগই গুপ্তধন নিকালার (একটা কবিরাজ গুপ্তধন বের করে)।

 

২.

শৈবাল ইন্টার মিডিয়েট পড়ে, তার সমবয়সি জেঠতুতো ভাই (আপন নয়) মাখনের সাথে সে গরু চড়াচ্ছিল। মাখন শৈবালের কানের কাছে মুখ এনে বলে, ‘কথা আহান মাত্তু?’ (একটি কথা বলব?)

কিহান? (কী)।

কোঙগরেও নামাতিস কিন্তু’ (কাউকে বলবেনা কিন্তু)।

‘নামাতিম’ (বলবো না)।

‘আজি রাতি আমারাং হুনা নিকালতইগা’ (আজ রাতে আমাদের বাড়িতে সোনা বের করতে আসবে)।

শৈবাল মাখনের দিকে তাকিয়ে থাকে। মাখনের মুখটা খুব উজ্জ্বল দেখাচ্ছে। গরিব এবং পড়ালেখা না করা ছেলেটার মুখে কথাগুলো শুনে শৈবালের একটু ঈর্ষা জাগছে। মনে মনে ভাবছে, তুমি অতাইলে নুঙি ইয়া বরতাওগা (তোমরা তাহলে ধনী হয়ে যাবে)। প্রকাশ্যে সে কী বলবে খুঁজে পাচ্ছে না কিন্তু মাখন তাকে সে সময় না দেওয়ায় সে বেঁচে গেল। মাখন সোনাটা পেলে কীভাবে বন্ধক দেয়া জমি ফিরিয়ে আনবে, ঘরবাড়ি কী রকম করে বানাবে, বড় বোনটির বিয়েতে কত টাকা খরচ করবে ইত্যাদির বিবরণ খুব রসিয়ে রসিয়ে দিতে লাগল। শৈবাল শুধু শুনেই যাচ্ছিল। তার মনে শুধু একটা জিনিসই খেলা করছিল, ‘আমিয়ও পেইলেতে!’ (আমরাও যদি পেতাম!)।

বাড়িতে এসে সে তার মাকে মাখনদের কথা জানাল, মায়ের কাছ থেকে বাবার কানেও কথাটা গেল। হরিমোহন বুদ্ধিমান মানুষ, গুপ্তধন বের করার এ ব্যাপারটাকে সে একটু অবিশ্বাসের চোখে দেখছিল কিন্তু তার একটা দুর্বলতা আছে, তার ভিটাটা এ বংশের পূর্ব-পুরুষের ভিটা। পূর্বপুরুষের ভিটায় এরকম কিছু একটা থাকা আশ্চর্যের কিছু না। তাই একবার কবিরাজকে পাকড়াও করার চিন্তা তার মাথায় আসে। এদিকে তার স্ত্রী বিনতাও অস্থির হয়ে উঠেছে কবিরাজকে একবার বাড়িতে আনার জন্য।

খোঁজ নিয়ে জানা গেল কবিরাজ তিলকপুরে বিধুর বাড়িতে প্রায়ই ওঠে। হরিমোহন সেদিনই সন্ধ্যায় বিধুমুখীদের বাড়িতে যায়। বিধুমুখী এ গোষ্ঠীরই মেয়ে, তার তিলকপুর বিয়ে হয়েছে। সম্পর্কে সে হরিমোহনের বোন। তাদের বাড়িতে গিয়ে কবিরাজ সম্পর্কে সে বিস্তারিত জেনে আসে। বিধুমুখীও হরিমোহনকে সমর্থন দেয়, বলে, ‘দাদা তোমার ঘর অগতে পুরানা ভিটাগ নাই, আকমু চাবেলেই।’ (তোমাদের বাড়িতো পুরনো ভিটা, একবার দেখে নাও)।

সেদিন রাতে হরিমোহন, তার স্ত্রী বিনতা এবং শৈবাল ওৎ পেতে রইল, ব্রজদার বাড়িতে কী হয় দেখার জন্য। মাখনের বাবা ব্রজদা গত হয়েছেন অনেকদিন আগে, ব্রজদা হরিমোহনের গোষ্ঠীতুতো বড়ভাই, পাশাপাশি বাড়ি।

অনেকরাত হলে পরে দেখা গেল, মাখন, মাখনের বড়ভাই ভুবন এবং কবিরাজ দরজা খোলে এবং হারিকেন হাতে সন্তর্পণে ঘরের পেছনে যায়। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই দেখা গেল কবিরাজ হাত দিয়ে একটি জায়গা দেখিয়ে দিতেই ভুবন এবং মাখন জায়গাটা খুঁড়তে লাগল। বেশি সময় লাগেনি। তিন চারমিনিট পরই তারা খোঁড়ার কাজ বন্ধ করে ঐ জায়গাটায় হাত দিয়ে খোঁজাখুঁজি করতে লাগল এবং অল্পক্ষণের মধ্যেই কাক্সিক্ষত জিনিসটি পেয়ে বাড়িতে ফিরে এল। হরিমোহন এবং তার পরিবার সব কিছু দেখতে পেলো। হারিকেনের আলোয় তারা যে দেখছে তা বুঝার উপায় ছিল না ভুবনদের।

বাড়ির পেছন থেকে বাড়িতে এসেই এরা বাড়িতে  ঢোকে না। হরিমোহন দেখতে পায়, কবিরাজ ভুবনদের কি যেন নির্দেশ দিচ্ছে। তার নির্দেশ পাওয়ার পর মেয়েছেলেসহ পরিবারের সবাই বারান্দায় বের হয়ে এসে প্রাপ্ত জিনিসটিকে সামনে রেখে সাষ্টাঙ্গে প্রণাম করে থাকে বেশ কিছুক্ষণ। তারপর ঐ জিনিসটা নিয়ে সবাই বাড়ির ভেতর ঢোকে।

 

৩.

আরও দু’তিনদিন যায়। হরিমোহন আর কবিরাজের নাগাল পায় না। ইতিমধ্যে একদিন সে বিধুমুখীদের বাড়িতে যায় কবিরাজের খবর নিতে। কিন্তু বিধুমুখী বলে কয়েকদিন ধরে তারাও কবিরাজের খবর পায় না। হরিমোহন আরও আগে থেকে কেন কবিরাজের পিছু নিলো না এজন্য আফসোস করতে থাকে। বিনতাও স্বামীকে ভর্ৎসনা করতে ছাড়ে না’ বলে, ‘তোর আলিয়া এহানে হাব্বি মাঙুইলতাহে।’ (তোমার আলস্যের জন্য সব নষ্ট হয়ে গেল)।

শৈবাল মাখনের সাথে কিছু একটা বলতে চায় কিন্তু মাখন এখন অন্য মানুষ হয়ে গেছে, সে এখন ধরাছোঁয়ার বাইরে, শৈবালের কাছাকাছি হতেই চায় না।

এমতাবস্থায় একদিন কবিরাজের আবির্ভাব ঘটে। এবার কবিরাজকে পাকড়াও করেছে রাইচরণ। শৈবাল কলেজ থেকে আসছিল। আসার পথে দেখে, রাইচরণকাকু কবিরাজকে নিয়ে আসছে। শৈবাল হেলিকপ্টারের বেগে সাইকেল চালিয়ে বাড়িতে আসে এবং খবরটা তার বাবার কানে দেয়। হরিমোহন তখন দিবানিদ্রায় ছিল। লাফ দিয়ে বিছানা থেকে উঠে সে গেঞ্জিটা গায়ে চড়িয়ে সোজা রাইচরণের বাড়ি যায়। রাইচরণ হরিমোহনকে দেখে অস্বস্তি বোধ করে, কিন্তু মুখে বলে, ‘দাদা বহ।’ (দাদা বসেন)।

হরিমোহন তার সাথে কথা না বলে কবিরাজকে নমস্কার জানায় এবং রাইচরণের বাড়িতে কাজ শেষ হলে তার বাড়িতে একটু পান খেয়ে যাওয়ার আমন্ত্রণ জানায়। কবিরাজ মুচকি হেসে মাথা নাড়ায়, মানে সে সম্মত।

 

৪.

হরিমোহন বাড়িতে এসে শৈবালকে দোকানে পাঠায়, বাড়িতে চাপাতা নেই, একটু চাপাতা আর ভালো বিস্কুট যেন আনে। কবিরাজকে খুিশ করতে হবে। বিনতা ঘরদোর পরিষ্কার করে, এতদিনে ভগবান তাদের দিকে দৃষ্টি দিয়েছেন। কবিরাজকে তারা হারাতেই বসেছিল, ভগবান তাদের কৃপা করে কবিরাজকে ফিরিয়ে এনেছেন। মনে মনে একটা কীর্ত্তন মানসা করে বিনতা।

রাইচরণের বাড়িতে বেশিক্ষণ লাগলো না, মাত্র কয়েক মিনিট পর দেখা গেল রাইচরণ কী একটা দু’হাতে প্রণাম করার ভঙ্গিতে ধরে নিয়ে যাচ্ছে পূর্বদিকে। পাড়ার অনেকেই দূর থেকে তাকে লক্ষ্য করছিল, দেখা গেল রাইচরণ পূর্বের বড় দীঘিতে হাতে থাকা জিনিসটা ছুঁড়ে ফেলে আবার হাত জোড় করে প্রণাম করতে করতে চলে এল।

এদিকে কবিরাজ হরিমোহন বাবুর বাড়িতে এসে উপস্থিত। শৈবাল তখনও দোকান থেকে ফেরেনি। কবিরাজ এ বাড়ির বারান্দায় উঠেই অপ্রকৃতিস্থের মতো বিকৃতস্বরে আছে…, আছে….বলে চতুর্দিকে উন্মাদের মতো তাকাতে লাগলো। হরিমোহন এবং বিনতা এক ধরনের আনন্দমিশ্রিত ভয়ে, আতঙ্কে কবিরাজের কর্মকা- দেখতে লাগল। কবিরাজকে বসতে বলার কথাও মনে ছিল না তাদের। হঠাৎ সম্বিত ফিরে পেয়ে হরিমোহন কবিরাজকে দুহাতে যত্ন করে ধরে বসেন, বসেন বলে মৃদু শক্তি দিয়ে চেয়ারে বসাতে চাইলেন। কবিরাজ বসল না।

গম্ভীর গলায় বলল, আজ কি বার?

হরিমোহন বলল, আজ তো রবিবার কবিরাজ মশায়।

গম্ভীর গলায় কবিরাজ বলল, ‘মঙ্গলবারে হবে, মঙ্গলবারে আসবো, জিনিস আছে।’

মঙ্গলবারে কোন্ সময় আসবেন?

কবিরাজ গম্ভীর গলায় বলল ‘দুপুরে, এখানে এসে খাবো?’

‘আচ্ছা, আপনি বসেন না।

কবিরাজ গম্ভীর গলায় বলল, বসব না। ঐ যে রাইচরণ না কী নাম যেন ওর, ওর বাড়িতে ধেনুশঙ্খ পাওয়া গেছে। আরও কিছুদিন গেলে ঐ পরিবারের একজন লোক মারা যেতো নির্ঘাত।

বিনতা হরিমোহনকে বললো, ‘আমারাং কিতা আছেতা আঙকর বেনাই? (আমাদের বাড়িতে কী আছে জিজ্ঞেস করো না?)।

হরিমোহন তা জিজ্ঞেস করতেই, ‘ভালো জিনিস আছে, ব্যস্ত হলে সব মাটি, আমি চললাম’ বলে কবিরাজ চলে যাচ্ছে। হরিমোহন এবং বিনতা একটু চা, একটু চা বলে সাধতে লাগল। কবিরাজ মৃদুস্বরে আজ না, আজ না বলে হাত নাচিয়ে বারান্দা থেকে নেমে হাঁটতে লাগলো জোর পায়ে।

 

৫.

মঙ্গলবার সকাল থেকে হরিমোহন এবং বিনতা খুবই অস্থিরতার মধ্যে সময় কাটায়। কবিরাজ মাছ মাংস খায় না, সেজন্য আগের দিন বাজারে গিয়ে হরিমোহন বিভিন্ন জাতের ডাল, শাকসবজি, লতাপাতা অনেককিছুই এনেছে। বিনতা সেগুলো একটার পর একটা রাঁধছে তো রাঁধছেই। কবিরাজ এখানে এসে খাবে। আজ তাদের ভাগ্য ফেরার দিন। শৈবাল আজ কলেজে গেলো না। ছোট বোনটাও স্কুলে গেলো না। সবাই সাগ্রহে অপেক্ষা করছে কবিরাজের। হরিমোহন বারবার রাস্তার দিকে তাকাচ্ছে, কিন্তু কবিরাজ তো আসছে না। একটু দেরি করে আসবে মনে হয়। দেখি আর একটু অপেক্ষা করে। ওঁকে রেখে খেয়ে ফেলাটা কী ঠিক হবে? দেখি, দেখি।

কিন্তু না কবিরাজ এল না। শেষপর্যন্ত হরিমোহনের পরিবারের লোকজনকে কবিরাজ ছাড়াই ভাত খেতে হলো। কবিরাজ কী তাহলে ফাঁকি দিয়ে চলে গেল?

 

৬.

সন্ধ্যার সময় হরিমোহন চলল, তিলকপুর, বিধুদের বাড়ি। তার মনে আশা, কবিরাজ হয়তো বিধুমুখীর বাড়ি থাকবে। কোনো কারণে সে দিনে আসতে পারেনি, রাতে আসার পরিকল্পনা করেছে হয়ত। ভগবানকে সে স্মরণ করে, ভগবান মঙ্গল করো।

তিলকপুর বেশি দূরের পথ নয়। হাঁটতে হাঁটতে সে একসময় বিধুমুখীর বাড়ি পৌঁছে যায়। রাস্তা থেকেই সে বিধুকে ডাকতে থাকে। বিধু ‘দাদা তি আহবরলেগাথাং?’ (দাদা তুমি এসে পড়েছ?) বলতে বলতে বাড়ির বাইরে আসে।

কবিরাজগো তুমারাং আছে থাং? (কবিরাজ তোমাদের বাড়িতে আছে?)

হাই, হাই আছে, এপাগা আহিতো বুলিয়া ইছেগোহে। (হ্যা, আছে। এখন আসার প্রস্তুতি নিতেছিল)

আমারাং বারো মাদানে খেইতই বুলিয়া-(আমার বাড়িতে দিনে খাওয়ার কথা ছিল)।

তখনই কবিরাজ ঘরের ভেতর থেকে বের হয়ে আসে। হরিমোহনকে যত্নের সাথে ধরে বিধুমুখীর বাড়ির ভেতর নিয়ে যায়। বিছানায় বসিয়ে বলে, সে একটু অসুবিধায় পড়ে গিয়েছিল তাই দিনে যেতে পারে নি। রাতে যাবে। তাছাড়া রাতের অন্ধকারেই কাজটি করা ভালো।

হরিমোহন কবিরাজের কথা শুনে পুলকিত হয়। হাসি হাসি মুখে বলে, সে কবিরাজ মশায়ই ভালো জানেন।

৭.

হরিমোহন এবং কবিরাজ বিধুমুখীর বাড়িতেই রাতে খাওয়াদাওয়া করে। তারপর রাত দশটার দিকে তারা ভানুবিলের উদ্দেশ্যে রওয়ানা দেয়। রাণীরবাজার আসার পর কবিরাজ সিগারেট কিনে, হরিমোহন পয়সা দিতে গেলে কবিরাজ প্রবল আপত্তিতে হরিমোহনের হাত সরিয়ে দেয়। তারপর হরিমোহনকে একটি দিয়ে নিজে একটি ধরায়, হরিমোহনের সিগারেটটিতেও আগুন ধরিয়ে দেয়। সিগারেট ফুঁকতে ফুঁকতে দুজন ভানুবিলের দিকে এগুতে থাকে, হরিমোহনের মনে আনন্দ, এতদিন পর তার ভাগ্যটা প্রসন্ন হতে চলেছে, সে হয়ে যাবে বড়লোক। এই করবে, সেই করবে এসব চিন্তা করতে করতে সে কবিরাজের সাথে কথা বলার কথা ভুলে গিয়েছে। একসময় কবিরাজ বলে, আপনি একটু সামনে আগান, আমি প্রস্রাব করে আসি। হে, হে বলতে বলতে হরিমোহন একটু সামনে গিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। কবিরাজ ছোট নদীটির পাড়ে একটু নিচের দিকে নেমে বসে পড়ল।

হরিমোহন অবাক হলো এই কারণে যে, প্রস্রাব করতে কবিরাজের যথেষ্ট সময় ব্যয় হয়ে গেল। তাহলে কী পায়খানা করছে? হলে হতেও পারে, ছোট নদীটিতে একটু পানি অবশ্য আছে। বাঙালিরা তো মনে হয় পায়খানা করতে কাপড় চোপড় বদলায় না। মনিপুরীদের যে কাপড়চোপড় পরে পায়খানা করা হয় তা ধুয়ে নিতে হয় অন্যথায় সে অপবিত্র থাকে।

বেশ কিছু সময় পর কবিরাজ উঠে এল। আবার দুজন হাঁটতে লাগলো। কবিরাজ হরিমোহনকে বাড়িতে যাওয়ার কোনো সংক্ষিপ্ত এবং গোপন রাস্তা আছে কিনা জিজ্ঞেস করল। হরিমোহন তাতে সায় দিয়ে বাড়ির পশ্চিম দিকে ক্ষেতের জমির আইল দিয়ে নিয়ে এলো কবিরাজকে।

 

৮.

কবিরাজকে আসতে দেখে বিনতার মুখ খুশিতে উজ্জ্বল হয়ে উঠল। বাড়ির সবাই শশব্যস্ত, কবিরাজ কী বলে না বলে সেদিকে সবার দৃষ্টি। কবিরাজ বলল, ধূপ, আগরবাতি দিতে, ঘর পবিত্র করতে হবে। সে বসলো হরিমোহন বাবুর বিছানায়। অবশ্য বিনতা কবিরাজ ওখানে বসতে চাওয়ার আগেই পরিষ্কার সুন্দর একটা মনিপুরী চাদর বিছিয়ে দিয়েছিল বিছানায়।

এবার কবিরাজ ধ্যানে বসল, ধ্যানের মধ্যেই সে বলে দেবে কোথায় জিনিসটি পাওয়া যাবে।

হরিমোহনের পরিবার ব্যাকুল দৃষ্টিতে অপেক্ষায় আছে, কবিরাজ কী বলে শোনার জন্য।

দু’তিনমিনিট পর একটা অদ্ভুত শব্দ দু’বার করল কবিরাজ, সে আগেই বলেছিল একসময় সে অপ্রকৃতিস্থ হয়ে যাবে, তখনই সে জিনিসটি কোথায় আছে বলে দেবে।

অদ্ভুত শব্দ হতেই হরিমোহন কবিরাজকে গিয়ে জিজ্ঞেস করল, কবিরাজ মশায় এখন কী করতে হবে?

কবিরাজ রীতিমতো অপ্রকৃতিস্থ। নাকেমুখে ফেনা বের হচ্ছে। ঐ অবস্থায় সে আঙুল দিয়ে সামনে রাখা চুলাটার বামদিকটা দেখিয়ে বলল, ঐ জায়গাটা খুঁড়ো।

সাথে সাথে হরিমোহন কোদাল নিয়ে ঐ জায়গাটায় চলে গেল, তারপর মাটি খুঁড়তে লাগল। দু’তিনমিনিট খুঁড়ার পর কবিরাজ বলল, ঐ মাটির ভিতরে খুঁজে দেখো।

পরিবারের সবাই রুদ্ধশ্বাসে মাটির ভিতরে গুপ্তধনের সন্ধান করছে কিন্তু পাচ্ছে না। এক পর্যায়ে কবিরাজ নিজে উঠে এসে তাদের সাথে যোগ দিলো। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই কবিরাজের হাতে উঠে এল গুপ্তধনটা। একটা গোলাকার পিণ্ড।

এই তো বলে হাত উঠিয়ে আনতেই সবাই হুমড়ি খেয়ে পড়লো ওটার ওপর, সবাই একটু হাত দিয়ে স্পর্শ করতে চায় কিন্তু কবিরাজ তাদেরকে ধরতে দেয় না বলে এখন না, এখন না। তবে ঐ বাচ্চাটা পুতপবিত্র, সে ধরতে পারবে। কবিরাজ শৈবালের বোন মিনাক্ষীর হাতে ঐটা দেয়। মিনাক্ষী ভয়ে ভয়ে ওটা হাতে নেয়। কবিরাজ মিনাক্ষীর হাতে রেখেই একটু জায়গা নখ দিয়ে আচড় কাটে। দেখা যায় মাটির ভেতর সোনাটা চিক চিক করছে।

‘না, এখন আর না, একটা পরিষ্কার গামছা আনো।’ কবিরাজ বলে।

বিনতা ভাঁজ করে রাখা সুন্দর একটা গামছা বের করে আনে, কবিরাজ তা মেলে ধরে মিনাক্ষীকে বলে ওটাতে জিনিসটা রাখতে। মিনাক্ষী গামছার ওপর বলটা রেখে দিলো। কবিরাজ তাতে দুদিক থেকে একটা গিথ দিয়ে হরিমোহনকে দেয়। বলে এটা গোপন স্থানে রাখতে এবং নয়দিন পর্যন্ত এটাকে স্পর্শ না করতে।

হরিমোহন তাই করে।

কবিরাজ আর দেরি করল না, চা ও খেলো না।

হরিমোহন তিনশত টাকা কবিরাজের জন্য সংগ্রহ করে রেখেছিল, কোন দরদাম না করে ঐ তিনশ’ টাকা নিয়ে দশদিন পর আসবো, ঐটা কীভাবে বিক্রি করা যায় তা সেদিন এসে বলব বলেই বাড়ির পশ্চিমে যেদিক দিয়ে হরিমোহন তাকে নিয়ে এসেছিল সে পথ ধরল। হরিমোহন একটু এগিয়ে দিতে চাইছিল কিন্তু কবিরাজ প্রবলভাবে আপত্তি করল, হরিমোহনকে সে বুঝাল এখন তার কাছে গুরুদেব ভর করেছে। গুরুদেব যেখানে নিয়ে যাবে সে সেখানেই যাবে।

 

৯.

কবিরাজ যাওয়ার পর হরিমোহনরা সবাই খেতে বসল। কবিরাজ যে কিছুই খেলো না। তাড়াহুড়া করে চলে গেল, তার জন্য সারাদিন তারা কি কষ্টই না করল, এসব আলোচনা চলতে লাগল। হঠাৎ হরিমোহনের মাথায় এল অন্য চিন্তা, কবিরাজ কোন ঠগ্টগ্ না তো? তিনশ’ টাকা দিতেই ও চট্পট্ পকেটে ঢুকিয়ে পলায়ন করল কেন? এখন ও যাবে কোথায়? এত বড় একটা সোনার পি- পেয়েও হরিমোহনের আনন্দ জাগছে না তো? সে বিনতাকে বলল, এই আমার কাম এহান হাইহান? (আমাদের কাজটা কী ঠিক হল?)

বিনতা বলল, হায়ে কিহান আহান ইলহান পারাইছে (হে, কি যেন একটা উল্টাপাল্টা হয়ে গেল মনে হচ্ছে)।

‘আকমু চাবেলতাং’ (একবার দেখে নেবো নাকি?)

‘চানা নাদলো অহানতে?’ (দেখতে যে মানা করে গেল?)

শৈবালের মনেও সংশয়, সে বলল, চেইলে কিতা ইতয়তা, কিত্তাউ নাইবো, চাবেলিক।’ (দেখলে কিছুই হবে না, দেখে নিই)।

এসব আলোচনা করতে করতে তাদের খাওয়া হয়ে গেল। হরিমোহন একপ্রকার নিশ্চিত হয়ে গেল, কবিরাজ খুব সম্ভব তাদেরকে ধোঁকা দিয়ে চলে গেছে। আর দেরি না, জিনিসটা দেখে নিতে হবে।

সে প্রেটি আলমারিটা খুলল, জিনিসটাতে হাত দিতে একটু একটু ভয় করছিল তবু সে ওটাতে হাত দিল। ‘ভগবান মঙ্গল করেদিস’ বলে সে ওটা ওখান থেকে নামিয়ে মাটিতে রাখল, গামছার গিথটা খুলল। গোলকটা হাতে নিয়ে ওজন অনুমান করল, না তেমন তো ভারি মনে হচ্ছে না, হাল্কাই মনে হচ্ছে। সোনা কী এত হাল্কা? ততক্ষণে সবার মধ্যেই একটা অবিশ্বাস জন্ম নিয়েছে। শৈবাল বলল, মাতি থেইকর চেইক (মাটি সরাও দেখি)।

মাটি সরানো হলো, সব মাটি সরাতেই বের হলো একটি পিতলের ছোট কলস। কলসের ভেতরেও মাটি।

হরিমোহনের মনে পড়লো, নদীর ধারে কবিরাজের ঐ প্রস্রাব বা পায়খানা করার কথা। আর কোন সংশয় রইল না, কবিরাজ তখনই কাজটা করেছে। কলসের ভেতরের মাটিতে ঘাসটাস লেগে রয়েছে।

 

১০.

পরেরদিন রাত থাকতেই হরিমোহন রওয়ানা দিলো বিধুমুখীর বাড়ির উদ্দেশ্যে। তারা তখনও ঘুমে। উঠান থেকে হরিমোহন ডাকতে থাকে, ও বিধু, বিধু….

ললিতের ঘুম ভাঙে আগে, সে বিধুকে ডাক দেয়, বলে, হরিমোহনদা এসেছেন।

বিধু তাড়াতাড়ি দরজা খুলে বের হয়। বলে, দাদা কিদিয়া চাঙঅহান বিয়ানতো? (দাদা এত সকালে কেন?)।

‘কবিরাজগো আছেতা তুমারাং?’ (কবিরাজ তোমাদের বাড়িতে আছে?)।

না, কালি নাহিছে। কিতা ইয়েথাং? (না কাল আসেনি, কী হয়েছে?)।

 

১১.

কবিরাজকে আর পাওয়া যায়নি। সে নাকি তার ঠিকানা বলেছিল শায়েস্তাগঞ্জের কোনো একটি গ্রামে। তারাপদ সূক্ষ্মবুদ্ধির মানুষ। সে তার দুধেল কালো গাইটার কথা ভুলতে পারেনি। সে খুব বুদ্ধি খাটিয়ে লোকজন লাগিয়ে শায়েস্তাগঞ্জে নাকি গোপনে গোপনে খোঁজ লাগিয়েছিল কিছুদিন কিন্তু কবিরাজ যে লাপাত্তা হয়ে গেল তার আর খোঁজ পাওয়া গেল না। এখন নিমাই’র দোকান নেই। নিমাই মারা গিয়েছে, এখন ভানুর দোকানে সবাই আড্ডা দেয়। ভানুর দোকানেই কবিরাজের ঐ প্রসঙ্গ মাঝে মাঝে ওঠে।

 

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

You may have missed

shares