গল্প

ঈশ্বরকন্যা

হরিপদ দত্ত

 

প্রত্যুষ। প্রাচীন শাস্ত্রের স্বর্গদূত বা দেবতাগণ যাঁরা নির্জন রাত গভীরে মর্ত্যলোকে নেমে আসেন, তাঁরা স্বর্গে ফেরা মাত্রই নামে প্রত্যুষ। তখন গৃহবাসী সুখী মানুষরা স্বর্গদূতদের বাতাসে মিশে থাকা পবিত্র শরীরের ঘ্রাণে আয়ুষ্মান হতে প্রাতঃভ্রমণে বেরিয়ে পড়ে। নেশা আর নষ্ট মেয়েখোর বিনু বাস্কের তখন বস্তিতে ফেরার সময়। সেই কবে পিতার হাত ধরে পরিবারসমেত জঙ্গলমহল, বেলপাহাড়ি আদিবাসী গ্রাম ছেড়ে হুগলি-কলকাতায় আসা। রুটি আর ভাতের খোঁজে। সে সময় মাওবাদীরা ছিল না। নামও শোনেনি কোটেশ্বর রাও কিষানজির কথা। কিষানজিকে জঙ্গলমহলের জঙ্গলে যৌথবাহিনী গুলি করে মেরে ফেলেছে। এখনও বিনু বাস্কের মাঝে-মধ্যে মনে হয়, জঙ্গলমহলে থাকলে হয়তো সেও মিশে যেত মাওবাদীদের দলে। এটাও মনে হয়, ভালোই তো আছে এখানে চুল্লু আর মেয়ে মানুষ নিয়ে। কী লাভ মানুষ মেরে আর অকালে পুলিশের হাতে জান দিয়ে! গরিব বলে বাঁচার কি দাম নেই?

রাতে বস্তিতে ফেরেনি। চোলাইঠ্যাকে রাতভর পড়েছিল। আন্তরাজ্য মাল পরিবহনের শূন্য একটি বারো চাকার ট্রাকে পড়েছিল নেপালি একটি নষ্ট মেয়েকে নিয়ে। নেশায় শিথিল শরীর নিয়ে বৃথাই কুস্তি করেছে, কিছুই ঘটেনি। মেয়েটি প্রাপ্য তুলে নিয়ে তবেই মাঝরাতে ট্রাক থেকে নেমে দ্বিতীয় খদ্দেরের খোঁজে অন্ধকারে অদৃশ্য হয়ে যায়। এটা বিনু বাস্কের নারীর প্রতি নেশা, প্রয়োজনহীন। ঘরে রয়েছে জোয়ান বউ। সেই চাঁপাকলিকে তার স্বামীর ঘর থেকে ভাগিয়ে এনে বিয়ে করেছে বিনু। চাঁপা দেখতে ঠিক মা-কালী। কামুক শঙ্খিনী শ্রেণির নারী। পূর্বের স্বামীকে পরিত্যাগ করেছে সে তার শরীরের জ্বালা মেটাতে ব্যর্থ বলে। বিনুর ঘরে এসে দুটি বাচ্চা বিয়িয়েছে। যতই নেশাখোর, মাগীখোর হোক, বিনু স্ত্রী-সন্তানের দায়িত্ব যতদূর সম্ভব পালন করে। বউটাও আয় করে কয়লার ছাই দিয়ে ঘুঁটে তৈরি করে বিক্রি করে।

চাঁপাকলি নেশা নিয়ে ঝগড়া বাধালে বিনু বলে, ‘আরে ভয় পাস কেন? মদ খেয়ে মরলে তিন লাখ টাকা দিচ্ছে সরকার, আরে, এত ভয় তবে কেন?

‘সরকারের কথা ছাড়, ওটা ভোটের রাজনীতি। কে না জানে, একদিকে ঢালাও মদ বিক্রির লাইসেন্স, অন্যদিকে বিষ-মদ খেয়ে মরলে ক্ষতিপূরণ। এই যে তুই পুরুষটা, ভ্যানগাড়ি টেনে যা পাস তার বেশির ভাগটা ফতুর করিস মদে, খেটে মরি আমি।’ চাঁপাকলি গজরায়।

খিঁচিয়ে ওঠে বিনু, ‘আদিবাসীরা নেশা করবে, এ হচ্ছে ভগবানের বিধান। ওই যে বামুন ঠাকুর গোপাল ব্যানার্জি চোলাই মদে গলা না-ভিজিয়ে কালী পুজোর মন্তরই উচ্চারণ করে না, সে বেলায় পাপ হয় না? ওটা হিদুর ধর্ম নয়?

বউটা রণে ভঙ্গ দেয়। কোনোদিন তবে যে ঘর ছাড়বে বিনু বাস্কের! আরেকটা মরদ জোগাড় করে নেবে। কিন্তু দুটো বাচ্চাসমেত মরদ জোগাড় সহজ নয়। মাগী ঠাপানোর মরদের অভাব না থাকলেও পরের পয়দা বাচ্চার দায় নেবার বেলা কোনো ছেলেই রাজি নয়। চাঁপাকলি যেমনটা জানে, বিনুরও তা অজানা নয়।

এসব ভাবনার ভেতর বস্তির পথে সূর্য উঁকি না দেওয়া ভোরে হাঁটছে বিনু। হঠাৎ তার চোখে পড়ে দুজন ভদ্রলোক একটি কাক তাড়া করছে। কাকটি উড়ে বেশিদূর গেল না। মনে হচ্ছে, নগরকাক বলেই ভদ্রলোকদের হীনতা, স্বার্থপরতা এবং তুচ্ছতাবোধ সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা আছে। বিনু এগিয়ে যায়। একজন ভদ্রলোকের মুখে জটিল ক্রূর হাসি খল্বল্ করে। এবার সে স্পষ্ট দেখতে পায় একটি নবজাত শিশুকন্যা লাল বর্ণ কাপড়ের টুকরোয় শুয়ে আছে। নিশ্চয়ই বেজন্মা। নয়তো বিশুদ্ধ জন্ম। কিন্তু কন্যাসন্তান বলে পরিত্যাজ্য। কোনটি সত্য?

বিনু বাস্কে শিশুটির জন্মদাত্রীকে অভিশাপ দিতে পারত। সে তা দেয়নি এ-কারণে যে তার জন্মদাত্রী তাকে হত্যা করেনি; বরং বেঁচে থাকার প্রত্যাশায় করুণাপ্রার্থীদের দৃষ্টি আকর্ষণের জন্য সদর রাস্তায় ফেলে গেছে। একশ’ কুড়ি কোটির দেশে বুঝি তার জন্মানোর অধিকার ছিল না। মানবসংখ্যার এই বিস্ফোরণ নিশ্চয়ই বেআইনি। কিন্তু যৌন উন্মাদনা আর গর্ভধারণ তো আইন মানে না।

বিনু মোটেই শিক্ষিত ভদ্রলোক নয়; বরং আদিবাসী ছোট লোক। তার মনের ভেতর তখন ঝড়। কালবৈশাখী। করুণা নয়, বিদ্বেষও নয়। অবতার-পুণ্যাত্মার দয়া নয়। গোপন স্বার্থপরতায় জ্বলছে সে। ক্ষণুুুুমুহূর্ত ভেবে নিয়ে দুই হাত বাড়িয়ে শিশুটিকে তুলে নেয়। একজন বায়ুসেবী ভদ্রলোক জানতে চায়; তুমি কি ওটাকে কোনো হোমে রেখে আসবে?’

বিনু নিরুত্তর। হাতির মতো মোটা একজন মহিলা বলে, ‘ঈশ্বর তোমার মঙ্গল করুন।’

‘ঈশ্বর তো আপনারও মঙ্গল করতে পারতেন, আপনি কি মঙ্গলপ্রার্থী?’ বিনু বাস্কে এবার বাঁকা কথা বলে।

‘ওহ্ নো নো, আই হ্যাইট বাস্টার’, মহিলা পালাতে পারলে বাঁচে।

বিনু বাস্কে অজ্ঞাতকুলশীল নবজাতককে সঙ্গে করে বস্তির উদ্দেশে হাঁটতে থাকে। তখন তাদের আদিবাসী গ্রামের যারা স্বধর্ম ত্যাগ করে খ্রিস্টধর্ম গ্রহণ করেছে, তাদের কথা মনে পড়ে। আরও মনে পড়ে নব্য খ্রিস্টানদের উদ্দেশে সাঁওতাল ফাদার আব্রাহাম সোরেনের বাইবেল পাঠের কথা।

‘যিশুর মাতা মরিয়ম যোসেফের প্রতি বাগদত্তা হইলে তাঁহাদের সহবাসের পূর্বে জানা গেল, পবিত্র আত্মা হইতে তাঁহার গর্ভ হইয়াছে। স্বামী যোসেফ সাধারণের কাছে নিন্দার পাত্র হইতে অনিচ্ছুক বলিয়া গোপনে মরিয়মকে ত্যাগ করিবার মানস করিলেন। তখন ঈশ্বরের দূত স্বপ্নে দর্শন দিয়া কহিলেন, দায়ূদ-সন্তান যোসেফ, তুমি মরিয়মকে গ্রহণ করিতে ভয় করিও না। কেননা তাঁহার গর্ভে যিনি জন্মিয়াছেন তিনি পবিত্র আত্মা হইতে হইয়াছেন। তাঁহার নাম যিশু অর্থাৎ ত্রাণকর্তা। ঈশ্বরপুত্র। রাজা হেরোদ যিশুকে হত্যার জন্য অন্বেষণ করিতেছিল। ‘…ঈশ্বরের দূত স্বপ্নে যোসেফকে দর্শন দিয়া কহিলেন, উঠো, শিশু এবং তাঁহার মাতাকে লইয়া মিসর দেশে পলায়ন করো। কেননা রাজা হেরোদ শিশুটিকে বধ করিবে। রাত্রিযোগে শিশু ও তাঁহার মাতাকে লইয়া যোসেফ মিসরে চলিয়া গেলেন।’ বাইবেল, মথি লিখিত সুসমাচার।

এই প্রভাতকালে বিনু বাস্কে যোসেফ হয়ে যায়। সে বেতেলহেম থেকে মিসরের উদ্দেশে নয়, নগর কলকাতার রাজপথ ছেড়ে অনতিদূরের বস্তির নরক রাজ্যে পা ফেলে। কোলে একটি পরিত্যক্ত বেজন্মা ঈশ্বরকন্যা। বস্তিটি সত্যি ঈশ্বরের পবিত্র রাজ্য। মিথ্যা হলে ঈশ্বরের অভিশাপে সব ধ্বংস হয়ে যাবে। মানুষ আর নগর বর্জ্যের এমন সহবাসের ভেতর সাম্যসমাজ ঈশ্বরের গৌরবেরই সাক্ষ্য বহন করছে। নেশাখোর, খুনি, বেশ্যা, দারিদ্র্য, জন্ম, মৃত্যু, ধর্ম আর ভোটের রাজনীতি পরস্পর আলিঙ্গন করে আছে এখানে।

বিনুর বউ চাঁপাকলি আসলে পূর্ববঙ্গের উদ্বাস্তু ঘরের মেয়ে। বিনুর বিশ্বাস, উদ্বাস্তু মাগীগুলো ঝগড়াটে, পুরুষখোর, মিথ্যুক, চোর আর ছিঁচকাঁদুনে। এমন একটি মেয়ে মানুষের কোলে তুলে দিতে পারবে তো ‘ঈশ্বরকন্যা’কে? সহজে রাজি না হলে ভয় দেখালে যে কাজ হবে, এমন নয়। পূর্ববঙ্গের রিফিউজি বলে কথা, বঁটি নিয়ে তেড়ে আসবে। বিনুর ঘাড়ে কোপ বসাতেও দ্বিধা করবে না।

সত্যি তা-ই ঘটে। বিনু যতই সত্য কথা বলুক তা বউ বিশ্বাস করে না। চাঁপাকলি তেড়ে আসে, ‘আরে সাঁওতাল গু-ার ছেলে, দুবার তো আমার পেট বানালি, দুটো বাচ্চা পেট থেকে খালাস করলাম, তোর আদিবাসীর বীজ পেটে নিয়ে বাঙাল মেয়ে তো জাত খোয়াল। এখন কোথায় কোন্ মাগীর পেট বানিয়ে বাচ্চা নিয়ে ঘরে ফিরলি? আমি তোর বারা না কাটি তো বাঙাল মেয়ে নই।’

বিনু খুব চেষ্টা করেই নিজেকে সংযত রাখে। বস্তির মাচায় শিশুটিকে শুইয়ে দিয়ে সটান দাঁড়িয়ে থাকে। চোখে ঘুম। মাথা নিচু করলে তার চোখ পড়ে সস্তায় কেনা সিনথেটিকের গেঞ্জির ওপর। ওখানে চে গুয়েভারার ছবি। গেঞ্জিতে যাঁর মুখাবয়ব, তাঁকে চেনে না বিনু। হায় চে! ভুল সময়ে ভুল জায়গায় গেঞ্জির বাণিজ্যওয়ালারা একজন নেশাখোর, মাগীখোর, দুশ্চরিত্রের শরীরে লেপটে দিয়েছে তোমাকে! ভাগ্য ভালো, সে তোমার নামও শোনেনি।

বিনুর বউ কিছুতেই এই বেজন্মা শিশুটিকে লালন-পালন করা দূরের কথা, ঘরে রাখতেই রাজি নয়। খানিক ভেবে নিয়ে বিনু বউকে বোঝায়, ‘মোটেই বেজন্মা সে নয়, মেয়ে বলেই ওকে পরিত্যাগ করেছে বাবা-মা, ফেলে দেওয়া বাচ্চার বেশির ভাগই মেয়ে হয় কেন, ভেবে দেখেছিস?’

চাঁপাকলি গজরায়। বস্তির ভিড়ের ভেতর সবাইকে সাক্ষী রেখে ঘোষণা করে, ‘বেশ্যার মেয়েকে গলা টিপে না মেরে দিই তো আমি পদ্মাপারের বাঙাল মেয়ে নই। বাঙাল রিফিউজি যে কি চিজ সাঁওতাল কি তা জানে?’

বিনু বাস্কে চেঁচায়, ‘তোর কিছু করতে হবে না, ছুঁইবিও না, গু-মুত সাফ থেকে যতœ-আত্তি সব করব আমি, এখন চুপ কর দিকিনি?’

রাত যতই গভীর হোক, পূর্ববঙ্গ-উদ্বাস্তু, বিহার, ওড়িশা আর পশ্চিমবঙ্গ-আদিবাসীদের এই বস্তিতে নির্জলা ঘুম নেই। মানুষ নয় তো বেওয়ারিশ কুকুর কেউ না কেউ জেগে থাকে। এত রাত অবধি থেমে থেমে ঝগড়া করে বিনু বাস্কে আর চাঁপাকলি। একসময় অন্ধকার বস্তির ভেতর বউয়ের কানের কাছে মুখ গুঁজে অনেকক্ষণ ফিস্ ফিস্ কি সব কথা বলে বিনু। বউ একবারই কেবল বলে, ‘মুখ নামা, চুল্লুর গন্ধ!’ তারপর অন্ধকারের নীরবতা। হঠাৎ হেসে ওঠে বিনু। ঝুঁকে পড়ে বউকে দেখতে চায়। পচা ড্রেনের মতো অন্ধকারে কিছু দেখা না গেলেও বিনুর মনে হয় চাঁপাকলির চোখ বেয়ে আলোর স্রোত গড়িয়ে পড়ছে সারা ঘরে। এত সুখের আলো আর কবে দেখেছে বউয়ের চোখে, বিনু স্মরণ করতে পারে না।

রাত পোহালে চাঁপাকলি কুড়িয়ে আনা ঘুমন্ত বেজন্মা শিশুটিকে অপলক দেখতে থাকে। তার চোখের দৃষ্টিতে ঝলকে ওঠে ঘৃণা-বিদ্বেষ আর জিঘাংসা। অথচ পাশাপাশি বহমান স্বার্থপরতার লকলকে লালসা। সেই লিপ্সার ভেতর আশা জাগে বর্ষার টলটলা ভাগীরথীর মতো। বিনু বাস্কে তাকে বলেছে, সে তার দুমুঠোয় তুলে দেবে চান আর সুরুজ। চোখ বুজে তাই চান-সুরুজের স্বপ্নে বিভোর হয়ে থাকে চাঁপাকলি। বিনু বুঝতে পারে। মনের ভেতর হুগলি নদীর জোয়ারে হাওয়া জাগে।

আকাশে চাঁদ ওঠে। আকাশছোঁয়া অট্টালিকার চূড়ায় অফুরন্ত সুখ আর সম্পদের নাগরিক অহংকারে যেমনি গলে পড়ে জোনাক, তেমনি নগরবর্জ্য ঘিরে থাকা বস্তির নরকযন্ত্রণার ভৌতিক নৃত্যের মধ্যেও মিশে একাকার হয়ে থাকে ঈশ্বরের চাঁদ। বিনু দাঁড়িয়ে আসে বস্তির রাস্তার আবছায়া অন্ধকারে। আজ আর নেশা করেনি, করবেও না। সারা দিন কাঠের ভ্যানগাড়ির সাইকেল টায়ারের চাকা ঘোরাতে ঘোরাতে শরীর ক্লান্ত। জীবনটা তো তার যন্ত্রচালিত চাকার মতো দ্রুতগামী নয়, প্যাডেল ঘোরানো অতি মন্থর চাকার মতোই। রাস্তার যাত্রী কিংবা বাজারের দোকানির মালপত্র কারও প্রতি তার করুণা নেই। বড়লোক হওয়ার স্বপ্নে যাদের কাছ থেকে লটারির টিকিট কেনে মাঝেমধ্যে, তাদের প্রতি বরং ঘৃণা অধিক। কেননা আজ অবধি একটি টাকাও কপালে জোটেনি তার। সুখ আর শান্তি কেনাকাটার লটারির টিকিটও তাকে বারবার বঞ্চনা করে। কিন্তু সে বিশ্বাস করে, কুড়িয়ে পাওয়া এই ঈশ্বরকন্যাটি অলৌকিক। দৈবশক্তিতে সে তাকে দুনিয়ার সব সম্পদের মালিক করে দেবে। ছেড়ে আসা জঙ্গলমহলের অরণ্য দেবতা তাকে ভোলেনি। সেই দেবতাই শিশুটিকে পাঠিয়েছে তার কাছে নিশ্চয়।

চাঁপাকলির লোভ, হীনতা, স্বার্থপরতা উনুনের কয়লার ছাইয়ে তৈরি জ্বলন্ত ঘুঁটের মতো কেবলই জ্বলে। ‘ইচ্ছেটা গর্তে কেউটের মতো মাথা তোলে, সে কি দূরে কোথাও শিশুটিকে ফেলে দিয়ে আসতে পারে না? পারে না কি শ্বাসরুদ্ধ করে সাবাড় করে দিতে? চেষ্টাও করেছে কয়েকবার। পারেনি। চোখের সামনে বিদ্যুতের মতো চমকে উঠেছে হীরকের দ্যুতি। হিংসা, ক্রোধ, নিষ্ঠুরতা মুহূর্তে গলে গঙ্গাজল হয়ে গেছে। সামনেই সুখ। মাত্র দুটো বছর। বাঁচিয়ে রাখতে হবে শিশুটিকে। এমন সুখের ব্যাখ্যা চাঁপাকলির সঙ্গে ছলনা করে। কিছুই বুঝতে পারে না সে।

বস্তির বিহারি গোয়ালিনী লছমীর পোষা রামছাগলের দুধ আড়াইশ’ গ্রাম করে রোজই কেনে চাঁপাকলি। ছাগলের দুধ ঘন হয় বলে পাঁচশ’ গ্রাম জল মেশালে চাঁপাকলির ছেলেমেয়ে দুটোরই চলে যায় দিব্যি। দুধের দাম বাড়ানোর অছিলায় বিহারি লছমী জোর দাবি করে ওর রামছাগল নাকি মহাত্মা গান্ধীর ছাগলের বংশধর। সবাই হাসাহাসি করে, ঠাট্টা করে এটাও জানায়, লছমী গুজরাটি হলে দাবি করত সে নিজে লতাপাতার সম্পর্কে গান্ধীর বংশধর।

বিনু বাস্কের ঠোঁটে ঝুলে থাকে যে ক্রূর হাসি, তা ধরতে পারে না চাঁপাকলি। অথচ বিনু বুঝতে পারে, সুখের লোভের রসাল আঠায় যেভাবে সে জড়িয়ে ফেলেছে বউকে, তা থেকে বউয়ের মুক্তি নেই। নিজের পেটের সন্তান দুটোর চেয়ে অধিক যতেœ দিন কাটতে থাকা ঈশ্বরকন্যার ভেতর অন্য এক দুনিয়া জড়িয়ে থাকে চাঁপাকলির। ওখানে রূপকথার রাজবাড়ি, ধনের ভা-ার ঝলমল করে। কি ঘুম, কি জাগরণে বিনু বাস্কে দেখতে পায় তাকে ঘিরে ঘুরে বেড়ায় ছায়ামূর্তিরা। ওদের ছায়ার শরীর। চোখ নেই। মুখ নেই। ওরাই বিনুর হাতে তুলে দেবে শিশুটির বিনিময়ে একদিন দশ লাখ রুপিয়া। আস্ত মানবদেহ নয়, খ- খ- অংশ। লিভার, কিডনি, চোখের কর্নিয়া, রক্ত, খণ্ডিত অঙ্গপ্রত্যঙ্গ। ছায়ামূর্তির সঙ্গে হাসাহাসি করে বিনু। তার বাঙাল বউ দেখতে পায় না। এক যে রহস্যের দুনিয়া। এ দুনিয়ায় নরদেহের বাণিজ্যের রহস্যময় সময়কাল বয়ে চলে।

মেয়েশিশুটির প্রতি কৌতূহলের কাল ফুরিয়ে আসে মহানগরের সীমান্ত বস্তিতে। ক্ষুধা-দারিদ্র্য-নেশা-অন্ধ যৌনতার এই নরকের বাসিন্দারা যেন সব ভুলে যায় এ কয় মাসেই। অতি ক্ষুদ্র ন্যায়ের পাশাপাশি বিশাল অন্যায়-অপরাধের এই অন্ধকার দুনিয়ায় কেবল সতর্ক জেগে থাকে বিনু বাস্কে আর চাঁপাকলি। বিনু জানে, আরও একটা কি দেড়টা বছর পর ছায়ামূর্তিরা তাকে ঘিরে বৃত্তের ভয়ংকর জাল ছোট করতে করতে গুটিয়ে আনবে। পশুর মতো শিকারির জালে আটকে যাবে। দশ লাখ রুপিয়া। কুবেরের রতœভা-ার। একটি অটো-সিএনজি কিনবে। একখণ্ড জমি হবে শহরের শেষ প্রান্তে। ঈশ্বরের স্বর্গরাজ্য মুঠোয় আসবে। ওই যে ফাদার আব্রাহাম বলেন, ‘প্রভু যিশু অনেক লোক দেখিয়া পর্বতে উঠিলেন। শিষ্যরা তাঁহার নিকটে আসিলেন। যিশু বলিলেন, ধন্য যাহারা দীনহীন, স্বর্গরাজ্য তাহাদেরই।’ বাইবেল, মথি লিখিত সুসমাচার।

মহান ঈশ্বরের স্বর্গরাজ্যের স্বপ্নের ভেতরই একদিন দীনহীন ঘরে ঘাতক রোগ ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয় ঈশ্বরকন্যা। মৃত্যুদূত দুয়ারে। যিশুর ক্রুশবিদ্ধ এবং মৃত্যুর মতোই এ যেন ঈশ্বর দ্বারা পূর্বনির্ধারিত অলঙ্ঘনীয় ভাগ্য! বিনু বাস্কের সামনে মহাপ্রলয়। ক্রোধ আর আক্ষেপে ঈশ্বরের ইচ্ছার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করে সে গ্লাসের পর গ্লাস চোলাই চালাতে থাকে গলায়, ‘অরণ্য দেবতা! ঈশ্বর! এ বড় নির্মম অবিচার।’

চাঁপাকলি ঈশ্বরকন্যার নিঃসাড় দেহটি আঁকড়ে ধরে। সে চায় অজ্ঞাত কুলশীল মৃত শিশুটির প্রতি তার প্রবল ঘৃণার জন্ম হোক। কিন্তু সামনে এক গোলকধাঁধা সৃষ্টি হয়। স্বর্গরাজ্য আর স্বপ্নরাজ্য অজাগতিক কুয়াশায় মিলিয়ে যায়। মুহূর্তের মধ্যে চাঁপাকলি হ্যালোসিনেশনে আক্রান্ত হয়। মৃত শিশুটিকে হাসতে দেখে সে। তার স্বার্থপর অপবিত্র আত্মার ভেতর অলৌকিক আলোর বিন্দু ঝলমল করে ওঠে। তার কণ্ঠে আছড়ে পড়ে মাত্র একটি আর্তনাদ, ‘তুই সত্যি আমার গর্ভের জরায়ুতে জন্ম নেওয়া পবিত্র সন্তান!’

‘প্রভু যিশুর অনুগ্রহ পবিত্রগণের সঙ্গে থাকুক। আমেন।’

বাইবেল, নূতন নিয়ম, অপ্রকাশিত বাক্য।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

shares