ভ্রমণ

যে যায় লঙ্কায়

সেই হয় রাবণ

সাইমন জাকারিয়া

 

‘ যে যায় লঙ্কায় সেই হয় রাবণ’- এই প্রবাদবাক্যটি শোনেননি এমন বাঙালি পাওয়া দুর্লভ। যদিও এই প্রবাদবাক্যের ইশারা-ইঙ্গিতে লঙ্কা দেশটিকে সাধারণত শ্রেষ্ঠস্থান এবং রাবণকে নেতিবাচক চরিত্র হিসেবে প্রতিপন্ন করা হয়। কিন্তু বাংলাদেশের একজন রামায়ণ-গবেষক হিসেবে রাবণ চরিত্রের মাহাত্ম্যের কথা তো আমার অজানা নয়! বাঙালি কবি কৃত্তিবাসী ওঝার ‘রামায়ণে’ দেখেছি- সীতা উদ্ধারের নিমিত্তে লঙ্কায় অনুষ্ঠিত রাম-রাবণের যুদ্ধ যখন সমাপ্ত। তখন শ্রীরামচন্দ্র রাজ্য পরিচালনার রাজনৈতিক- জ্ঞান অন্বেষণে রাবণকে আশ্রয় করেছিলেন এবং রাজনৈতিক-শিক্ষার গুরু হিসেবে রাবণকেই স্বীকার করে নিয়েছিলেন। বাংলাদেশের গ্রামে গ্রামে আজও গায়কেরা সেইসূত্রেই হয়তোবা রামকে শ্রেষ্ঠত্ব দিতে গিয়ে রাবণকে তুচ্ছ করেন না, বরং তাকেও সীমাহীন শ্রেষ্ঠত্বের বন্দনায় অভিসিক্ত করেন। পাশাপাশি মাইকেল মধুসূদন দত্তের মেঘনাদবধকাব্যে-র রাবণের মানবিক অনুভূতির ইতিবাচক প্রকাশের কথাও তো আমাদের মনে পড়ে যায়। তাই শেষ পর্যন্ত আমাদের চেতনা হতে ‘যে যায় লঙ্কায় সেই হয় রাবণ’ প্রবাদটির নেতিবাচক ব্যবহার প্রশ্নবিদ্ধ হয়, বরং এর ভেতর থেকে রাবণের ইতিবাচকতার আভা বিচ্ছুরিত হতে থাকে নতুন দিনের সূর্যালোকের মতো। এই সূর্যালোকের আভার বিচ্ছুরণের মধ্যেই বিগত ১২ জুলাই ২০১৬ তারিখ দিবসের ঠিক দ্বিপ্রহরে মিহিন লঙ্কা নামের একটি উড়োজাহাজ ঢাকার হযরত শাহ জালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর হতে আমাকে নিয়ে চলল মেঘের ওপর দিয়ে, আগেই নির্ধারিত হয়েছে এই যাত্রায় আমার প্রাথমিক গন্তব্য হবে শ্রীলঙ্কার কলম্বোর বন্দরনায়েক ইন্টারন্যাশনাল এয়ারপোর্ট, তারপর চূড়ান্ত গন্তব্যে সমুদ্রের জলকল্লোল মথিত কলম্বো শহরে। সেখানে সমুদ্রের তীরঘেঁষা ওজো হোটেলে ১২-১৪ জুলাই ২০১৬ তারিখে আমেরিকার দি ইউনিভার্সিটি অব শিকাগো দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতি, নৈতিকতা ইত্যাদি বিষয়ে গবেষণার নতুন ডিজিটাল ভিত্তি রচনার জন্য বিচিত্র তথ্য সরবরাহের উপায় অনুসন্ধানের লক্ষ্যে একটি আন্তর্জাতিক কর্মশালার আয়োজন করেছে, যার বিস্তারিত শিরোনাম রাখা হয়েছে- ‘সনিক অ্যান্ড ভিজ্যুয়াল সাউথ এশিয়া ইন স্পেস অ্যান্ড টাইম- কানেক্টিং অবজেক্টস, টেক্সটস, পিপ্যুল, অ্যান্ড প্লেসেস : এ ওয়ার্কশপ অন মেটাডাটা ফর অডিও অ্যান্ড ইমেজেস অব সাউথ এশিয়া’।

কলম্বোর বন্দরনায়েক আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে নেমে কোনো বেগ পেতে হয়নি ইমিগ্রেশনে, অথবা বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা বাহক খুঁজে পেতে। প্ল্যাকার্ড হাতে লোকটার সামনে গিয়ে জানালাম-  ‘আপনাকে আর অপেক্ষা করতে হবে না, চলুন রওনা দেই।’ জেনে নিলাম লোকটা গাড়ির ড্রাইভার, আর তাঁর নাম হোসেন। কিন্তু গাড়িতে উঠতেই সে প্রশ্ন করলো- কোন পথে যেতে চাই- হাইওয়ে, নাকি জেনারেল ওয়ে?

উত্তর দেবার আগে শ্রীলঙ্কান সময়ে তখন কত বাজে তা জানতে চাইলাম। কারণ, কর্মশালার উদ্বোধনী ও প্রথম অধিবেশন শুরুর কথা বিকাল সাড়ে পাঁচটায়। সেই হিসেবে হাতে সময় খুব কম, পৌঁছেছি সাড়ে তিনটায়, মাত্র দু’ঘণ্টা সময় হাতে, কিন্তু কিছুতেই উদ্বোধনীপর্ব ও প্রথম অধিবেশন থেকে বাদ পড়তে চাই না। তাই যে পথের সময় কম সে পথেই যাবার আগ্রহ প্রকাশ করলাম। মুহূর্তের মধ্যে মিস্টার হোসেন হাইওয়েতে উঠে পড়লেন এবং ঘাড় ঘুরিয়ে বললেন- ‘স্যার এই পথে যাবার জন্য আপনাকে পে করতে হবে ৩০০০ শ্রীলঙ্কান মানি।’ তাঁর কথায় একটুখানি ভড়কে গেলাম- লোকটা বলে কী! যতটুকু মনে পড়ে, বিমানবন্দর হতে হোটেলে যাবার জন্য কোনো টাকা দেবার কথা তো ইউনিভার্সিটি অব শিকাগোর নিয়োগকৃত ট্রাভেল এজেক্ট আগে জানাননি! আবার ভাবলাম, আমরা নিজের কোনো ভুল হচ্ছে না তো? এবার ব্যাগ হতে ট্রাভেল এজেন্ট ও ইউনিভার্সিটি অব শিকাগোর ইমেলের প্রিন্ট কপি বের করে দেখে নিলাম এবং হোসেনকে বললাম- ‘আমার কাছে যে চিঠিগুলি আছে, তাতে কোথাও তো আমাকে কোনো টাকা পে করার কথা লেখা নেই।’ সঙ্গে সঙ্গে হোসেন চুপ হয়ে গেল। তারপর ফোনে কার সাথে জানি কি কথা বলল সিংহলি ভাষায় এবং কথা শেষে জানালো- ‘সরি স্যার, আমারই ভুল হয়েছে, ট্রাভেল এজেন্টের সাথে কথা বললাম, আপনাকে কোনো কিছু পে করতে হবে না।’ এরপর চলতি পথে হোসেনের সাথে শ্রীলঙ্কার ধর্ম-সংস্কৃতির সাথে বাংলাদেশের ধর্ম-সংস্কৃতির মিল-অমিল নিয়ে আলাপ শুরু হলো; হোসেন জানালেন- শ্রীলঙ্কার মুসলিমরা মহররমে তাজিয়া বের করে, আর বৌদ্ধরা তো সারা বছরই নানা ধরনের উপাসনা করে, রামায়ণের তীর্থভূমি হিসেবে সীতার স্থান হিসেবে নুরালিয়ে এবং মুসলিম-হিন্দু-বৌদ্ধ ও খ্রিষ্টান এই চারটি ধর্মেরই তীর্থস্থানখ্যাত শ্রীপদ পাহাড়ের গল্পও করলেন কিছুটা হোসেন। তিনি শুধু নিজের দেশের পরিচয় দেননি, ফাঁকে ফাঁকে বাংলাদেশের মানুষ ও সংস্কৃতির কথা জানতে চাইছিলেন, কোথায় কোথায় তাঁদের সাথে আমাদের মিল রয়েছে তা জেনে মুগ্ধতা প্রকাশ করছিলেন। কথায় কথায় খুব দ্রুতই যেন পৌছে গেলাম ওজো হোটেলের করিডোরে।

লঙ্কাসমুদ্রের দিকে কাঁচের দেওয়াল লাগানো একটি মনোরম ঘরে আমার স্থান হয়। ওজোর উন্নত ভবনের ১০ তলায় স্থান পেয়ে মুগ্ধ নয়নে রামায়ণে বর্ণিত লঙ্কাসমুদ্রের হিল্লোলের মাঝে সূর্যাস্তের রক্তিমাভ আবেগ দেখে থমকে যাই। ঘড়ির কাটায় তখনও প্রায় ঘণ্টাখানেক বাকি উদ্বোধনীপর্বের। তাই কোনো তাড়া নেই লঙ্কাসমুদ্রের উন্মাদনা হতে চোখ ফেরাবার। মনে মনে অনুভূব করি, এ এমনই এক উপলব্ধি যা কখনও কাউকে বিনিময়যোগ্য নয়। কেবল নিজে নিজেই প্রকৃতির এই মধুরিমার অপূর্বলীলা আস্বাদন করা যায়। মনে মনে ভাবি, যা ছিল কাব্যপাঠের সামান্যসীমার মধ্যে, তা আজ খুলে গেল অসমান্যে নিজস্ব দৃষ্টির ভঙ্গিমায়।

সময়ের পরিবর্তন আছে। উদ্বোধনীপর্ব শুরু হয় সন্ধ্যা ৬টায়। তখনও গুগল হতে শিশির জয়ন্ত এসে পৌছাতে পারেননি। ইউনিভার্সিটি অব শিকাগোর জ্যামস নাই কর্মশালার ভূমিকাকথনের শুরুতেই সে-কথা জানালেন; তবে, তিনি আশাবাদী যে, নিশ্চয় কিছুক্ষণের মধ্যে গুগলের শিশির জয়ন্ত পৌছে যাবেন। ঘটনাটি ঘটেও ঠিক সে রকমই জ্যামস নাইয়ের ভূমিকাকথনের পর টাটা ট্রাস্টের দীপিকা সোরাবজি যখন গবেষণায় মেটাডাটা ব্যবহারে তাঁদের পৃষ্ঠপোষকতার কথা জানান দিচ্ছিলেন- ঠিক তখনই অনেকটা ঝড়ের মতোই এক তরুণ আবির্ভূত হলেন; তিনি এসে বেশ সচকিতভাবে চারদিকে তাকালেন এবং সবাইকে ‘হ্যালো’ বলে নিজের পরিচয় দিলেন- ‘আই অ্যাম শিশির জয়ন্ত, কামিং ফ্রম গুগল, সরি ফর মাই ডিলে।’ তার কথা শেষ হতে না হতেই জ্যামস নাই বলে উঠলেন- ‘ওয়েলকাম গাই। ইউআর কাম ইন অন দি পারফেক্ট টাইম। সো, প্লিজ কাম হেয়ার অ্যান্ড প্রেজেন্টস ইউর কিনোট।’

সবাই হো হো করে হেসে উঠলেন। কিন্তু হাসির মধ্যে শিশির জয়ন্ত এক মুহূর্তে সময় নিলেন না, নিজের ল্যাপটপ অন করে সরাসরি তাঁর বক্তব্য শুরু করলেন। বললেন- ‘আমরা গুগল কালচারাল ইন্সটিটিউট নিয়ে এখন কাজ করছি। এতে আমরা প্রাথমিকভাবে যে কাজগুলি করছি তা আমি প্রথমে আপনাদের কিছুটা দেখাতে চাই। ধরা যাক, আপনি বিশ্বঐতিহ্য হিসেবে তাজমহলকে দেখতে চান, আমরা আমাদের গুগল কালচারাল ইন্সটিটিউটে এই তাজমহলকে এমনভাবে রেখেছি যেন যে কেউ এর প্রতিটি স্থান সুন্দরভাবে দেখতে পাই। আসলে, আপনি তাজমহল দেখতে গেলে যা খোলাচোখেও দেখতে পাবেন না, তা আমাদের গুগল কালচারাল ইন্সটিটিউটের ওয়েবসাইটে দেখতে পারবেন। আমরা প্রতিটি সেন্টিমিটার ধারণ করেছি এবং বিভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গিতে ছোটবড় করে এক একটি স্থান ও কর্নার দেখতে পারবেন।’ সত্যিকারের জাদুকরের মতো তিনি কথার ফাঁকে ফাঁকে তাজমহলের প্রতিটি স্থান অনলাইন হতে প্রোজেক্টরে দেখালেন। অবাক হবার মতো তাজমহলের প্রতিটি সেন্টিমিটার মুহূর্তের মধ্যে আমাদের চোখের সামনে ভাস্বর হয়ে উঠল, বিশেষত তাজমহলের বিভিন্ন স্থানের পাথর কাটা অলঙ্করণ, ফুল-পাতার নক্সা-যা কোনোভাবেই খোলাচোখে ধরা পড়া সম্ভব নয়, তা শিশির জয়ন্ত তাঁদের গুগল কালচারাল ইন্সটিটিউটের অনলাইন হতে বড় করে করে দেখাতে থাকেন। শুধু তাই নয়, তিনি বলেন- বর্তমানে গুগল কালচারাল ইন্সটিটিউট দুইটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে কাজ করছে, সে দুটি হলো-১. ইন্ডিয়ান ক্ল্যাসিক্যাল ল্যাঙ্গুয়েজ (সংস্কৃত ও অন্যান্য ভাষা সম্পর্কিত তথ্যসংগ্রহ, উপস্থাপনা, প্রামাণ্যচিত্র, সাহিত্যনিদর্শন ইত্যাদি) এবং ২. ট্রাডিশনাল ইন্ডিয়ান মেডিসিন। ভাবতেই অবাক লাগে, গুগল কালচারাল ইন্সটিটিউট আধুনিক মনোভাব ও প্রযুক্তি নিয়ে যে বিষয়গুলিকে প্রথমেই গুরুত্ব দিচ্ছে, তাকে আমরা হয়তো প্রাচীন,পরিত্যক্ত বিবেচনা করি। কিন্তু গুগল প্রথমেই শনাক্ত করেছে- ইন্ডিয়ানদের আত্মপরিচয়ের প্রধান দুটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ই হচ্ছে- ভাষা এবং চিকিৎসাপদ্ধতি। ব্যক্তিগতভাবে শিশির জয়ন্তকে বাংলাদেশের এই দুটি আত্মপরিচয়ের কথা জানাই; বাংলাদেশের অনেক কবি মধ্যযুগে, এমনকি আধুনিক কালে ভেষজ চিকিৎসার পুথি রচনা করেছেন, বাংলাদেশের একজন নারী কবির পরিচয় তুলে ধরি- যিনি কিনা মধ্যযুগের সাহিত্যধারায় নারীদের রোগের চিকিৎসাবিষয়ক পুথি রচনা করেছেন; গুগল কালচারাল ইন্সটিটিউটে এ বিষয়ে কোনো ভুক্তি অন্তর্ভুক্ত করা যায় কি-না, তা জানতে চাই শিশিরের কাছে। বাংলাদেশের নারীদের লেখা মেয়েলি রোগের পুথির খবর পেয়ে শিশির অত্যন্ত আগ্রহী হয়ে ওঠেন এবং বলেন- নিশ্চয় তিনি পরে গুগল কালচারাল ইন্সটিটিউটে বাংলাদেশকে অন্তর্ভুক্ত করবেন এবং এ ধরনের ব্যতিক্রমী বিষয় সংযোজন করবেন। শেষে শিশির জয়ন্তকে বাংলাদেশের পক্ষ হতে পৃথিবীর খ্যাতনামা নন-বেঙ্গলি বাংলাভাষা বিশেষজ্ঞ-অধ্যাপক-গবেষকদের রচিত বাংলা গবেষণাপ্রবন্ধসমৃদ্ধ ‘বঙ্গবিদ্যার আন্তর্জাতিক পত্রিকা : ভাবনগর’ প্রদান করি।

উদ্বোধনীপর্বে অনেকদিন পর দেখা পাই পরমসুহৃদ দি ইউনিভার্সিটি অব শিকাগোর সংগীত বিভাগ হতে সদ্য পিএইচডি প্রাপ্ত গবেষক রিহান্না খেসগির; তাঁর সাথে প্রথম পরিচয় ২০১২ খ্রিস্টাব্দে আমেরিকায় খোদ ইউভার্সিটি অব শিকাগোর ক্যাম্পাসে, তারপর ২০১৩ খ্রিস্টাব্দে আবার ইউনিভার্সিটি অব শিকাগোতে সংগীত বিভাগে একসঙ্গে বক্তৃতা করার সুযোগ ঘটেছিল; এছাড়া, তিনি একবার আমাদের ভাবনগর ফাউন্ডেশনের আহ্বানের বাংলাদেশে এসেছিলেন এথনোমিউজিকোলজির বিষয়ে বক্তৃতা করতে, সে সময় তিনি নাজনীন হাসান চুমকী অভিনীত আমার নাটক ‘সীতার অগ্নিপরীক্ষা’ দেখে মুগ্ধ হয়েছিলেন এবং আকাক্সক্ষা জানিয়েছিলেন- ‘সীতার অগ্নিপরীক্ষা’র মতো আমার লেখা একটি নাটকে তিনি একক অভিনয় করতে চান। তারপর রিহান্না খেগসি ব্যস্ত হয়ে পড়েন পিএইচডি গবেষণার ক্ষেত্রসমীক্ষা নিয়ে, একটানা প্রায় দুই বছর ভারতের আসামে অবস্থান নিয়ে তিনি বহু নৃত্য-গীতের উপর পিএইচডি অভিসন্দর্ভ রচনা করেন। বহু দিনের ব্যবধানে সাক্ষাৎ পাওয়ায় আমরা পুরানো গল্পগুলি ঝালাই করি।

এক ফাঁকে নেপাল থেকে আসা শমিক মিশ্র, ভারত থেকে আসা সুরেশ চান্দভ্যাঙ্কর এবং শ্রীলঙ্কা ব্রডকাস্টিং করপরেশনের পরিচালক সুদর্শী মেদেনায়েকের সাথে পরিচয় ঘটে; উদ্বোধনীপর্বের পর সুদর্শী আমাদের তিনজনকে তাঁর নিজের গাড়িতে শ্রীলঙ্কার ইন্ডিপেন্ডেন্ট স্কয়ারে নিয়ে যান। রাতের অন্ধকারের মধ্যে বিচিত্র আলোয় সজ্জিত ইন্ডিপেন্ডেন্ট স্কয়ার ও ইন্ডিপেন্ডেসি মেমোরিয়াল হল বাইরে থেকে আমাদের মুগ্ধ করে দেয়। আমরা লক্ষ করি, সিংহের নানা ধরনের ভাস্কর্যে পুরো প্রাঙ্গণজুড়ে এক ধরনের বলিষ্ঠতা ও শক্তিমত্তা বিরাজ করছে।

পরের দিন সকালটা শুরু হয় ইউনিভার্সিটি অব শিকাগোর দিল্লি সেন্টার হতে অদিতি মোদীর স্কাইপেতে দেওয়া ভাষণের মধ্য দিয়ে। এরপর একে একে টাটা ইন্সটিটিউট অব সোসাল সাইন্স (মুম্বাই অ্যান্ড লিংনান ইউনিভার্সিটি, হংকং)-এর তেজস্বিনী নিরঞ্জনা ও ইউনিভার্সিটি অব শিকাগোর মার্ক ওলসেন মেটাডাটার এপিস্টেমলজিক্যাল ও অন্টোলজিক্যাল দৃষ্টিভঙ্গি; কলিকাতার সেন্টার ফর স্টাডিজ ইন সোসাল সাইন্সের তপতী গুহঠাকুরতা ও ইউনিভার্সিটি অব শিকাগোর ব্রিগেট ম্যাডেন মেটাডাটার রাজনৈতিক ও নৈতিক বিবেচনা; রোজা মুথিয়াহ রিসার্চ লাইব্রেরির জি. সুন্দর ও বৃটিশ লাইব্রেরির ইভা ডেল রাই মেটাডাটা ব্যবহারের ক্ষেত্রে সহযোগী প্রতিষ্ঠানের ভূমিকা সম্পর্কে তিনটি গোলটেবিল বৈঠক পরিচালনা করেন। শেষে সোসাইটি অব ইন্ডিয়ান রেকর্ড কালেক্টরসের সুরেশ চান্দভ্যাঙ্কার ‘ডাউন মেমোরি লেন’ শিরোনামে ঐতিহাসিক অডিও বিষয়ে বক্তৃতা ও তথ্যচিত্র উপস্থাপনা করেন। সুরেশ অত্যন্ত নাটকীয় ভঙ্গিতে সবার মধ্য হতে আলাদা হয়ে গিয়ে অলক্ষ্যে কখন জানি নিজের পোশাকটি বদল করে সামনে এসে দাঁড়ালেন এবং রসিকতার সুরে বললেন- ‘এখন আমি অসাধারণ, কারণ আপনাদের নিয়ে যাবো ঐতিহাসিক অডিওর জগতে।’ কথার মতো করলেনও তাই; ভিডিওচিত্রের মাধ্যমে দেখালেন ভারতের প্রবীন ও নবীন- দুই প্রজন্মের দুইজন লংপ্লে অডিও রেকর্ড কালেক্টরের সংগ্রহের ভাণ্ডার ও তাঁদের জীবনকথা, একই সঙ্গে তিনি জানালেন- রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব করমচাঁদ মহাত্মা গান্ধীর নতুন পরিচয়, যা আমাদের জানা ছিল না, তিনি জানালেন- গান্ধীর স্বরচিত গানের কথা, শুধু জানালেন না, শোনালেন সেই দুর্লভ গানটি। কিন্তু এই গানটি সংগ্রহ করতে সুরেশ নিজে যে কত দিন ধরে সাধনা করেছেন, কত জায়গায় গিয়েছেন এবং শেষে আবিষ্কার করেছেন সেই গান রচনা, সুর করা, রেকর্ড করা, প্রচার করার বিস্তারিত তথ্য। হিন্দিতে লেখা মহাত্মা গান্ধীর সেই গানটি গেয়েছিলেন বাংলার অন্যতম শিল্পী মান্না দে, অবশ্য মান্না দে গানটি একক কণ্ঠে করেননি, তার সঙ্গে একদল শিল্পী কোরাসে কণ্ঠ মিলিয়ে ছিলেন। আমাদের মনে গৌরববোধ ভর করে। কেননা, সুরেশের আবিষ্কারে প্রমাণিত হয়েছে, বাঙালি শিল্পী মান্না দে গেয়েছিলেন গান্ধীজীর লেখা একমাত্র গানটি, এখন গানটিকে সুরেশ ইন্টারনেটে ছড়িয়ে দিয়েছেন, যাতে যে কেউ খুঁজে শুনতে পারেন গান্ধীজী রচিত ভজনসংগীত। সুরেশের শোনানো নানা ধরনের ঐতিহাসিক গানের সুরের সেদিন সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসে। রাতের আঁধার গভীর হবার আগেই আমরা সবাই মিলে রওনা দিই কলম্বো শহরের বিখ্যাত এক স্থপতির পরিত্যক্ত অফিসে গড়ে ওঠা গ্যালারি ক্যাফেতে। সেখানেই আমাদের রাতের খাবার নির্ধারিত স্থান। কিন্তু গ্যালারি ক্যাফেতে পৌঁছে দেখি- সেটি শুধু খাবার স্থান নয়; এর প্রবেশপথের দেয়ালে অসাধারণ কিছু চিত্রকর্ম ঝুলছে, একটু খেয়াল করলেই বোঝা যায় যে, আসলে একজন শিল্পীর চিত্রপ্রদর্শনী চলছে, এক পাশের দেয়ালে পুরাকালের মতো জ্বলছে অনেকগুলি আলোর মশাল, আরেক পাশে রয়েছে একটি অ্যান্টিকশপ, আর এত সব জীবন্ত অভিজ্ঞতা পেরিয়েই ঢুকতে হয় খাবার জন্য নির্ধারিত স্থানে। অবশ্য, খাবার স্থানের টেবিল, চেয়ার, দেয়াল জুড়ে রয়েছে নানাধরনের অ্যান্টিক ভাস্কর্য, ছবি, ব্যবহৃত বস্তু- জানা যায়, যে স্থপতির অফিসকে ক্যাফেতে রূপান্তর করা হয়েছে, সকল বস্তুই সেই স্থপতির ব্যবহৃত সামগ্রী। আমরা সেই সকল ছুঁয়ে ছুঁয়ে যেনবা সেই স্থপতির সাথেই রাতের খাবার খাই, এ এক দারুণ অনুভব।

তৃতীয় দিনের সকালটা শুরু করেন বাংলাদেশে বংশোদ্ভূত ভারতীয় নাগরিক ও আমেরিকান ইন্সটিটিউট অব ইন্ডিয়ান স্টাডিজের অধ্যাপক শুভা চৌধুরী। তিনি মেটাডাটার প্রশাসনিক কার্যক্রম এবং ডিজিটাল রিসোর্স শনাক্তকরণ বিষয়ে বক্তৃতা করেন। এছাড়া, মেটাডাটার ব্যবস্থাপনা সম্পর্কে কেস স্টাডিজ প্রদান করেন আলকাজী কালেকশন অব ফটোগ্রাফির শিল্পী গোস্বামী, ইকা কালচারাল রিসোর্স অ্যান্ড রিসার্চের প্রমোদ কুমার, বৃটিশ লাইব্রেরির জন ফ্যালকনার। পরিশেষে পুরো কর্মশালার উপসংহার টানেন যথাক্রমে ইউনিভার্সিটি অব শিকাগোর ফিলিপ ভি. বোলম্যান, জ্যামস নাই, লুরা রিং ও অ্যান্না সিস্ট্রান্ড মেটাডাটার; তাঁরা প্রকল্পের ধারাবাহিকতা রক্ষার জন্য পরবর্তী পদক্ষেপের দিক-নির্দেশনা প্রকাশ করেন। এভাবেই কর্মশালার আনুষ্ঠানিকতা সমাপ্ত হয়। আমার এবার বেরিয়ে পড়ার পালা।

বাংলাদেশ হতে রওনা দেবার আগেই মনে মনে প্রত্যয় করেছিলাম যে, শ্রীলঙ্কার শ্রীপদ পাহাড়ের শীর্ষে খোদিত আদি মানব আদমের পায়ের চিহ্ন দেখে আসবো। আমরা সেই আগ্রহের কথা জেনে এবং অনুরোধক্রমে ইউনিভার্সিটি অব শিকাগো আমার আসার তারিখ ৩ দিন পিছিয়ে দিয়ে এয়ার টিকেট পাঠিয়েছিল। অতএব, শ্রীপদে যেতে অসুবিধা কোথায়! অসুবিধা একটি আছে অবশ্যি, সেটি হলো- এটি শ্রীপদে ওঠার মৌসুম নয়। শীতের সময়টাই শ্রীপদে ওঠার শ্রেষ্ঠ সময়। এখন বৃষ্টির মৌসুম, শ্রীলঙ্কায় যখন তখন তাই বৃষ্টি হয়, আর পাহাড়ি অঞ্চলে বৃষ্টি হয় আরও বেশি; শ্রীপদ একটি পাহাড়ি এলাকা। কিন্তু শ্রীপদে যাবার আগে বই পুস্তকে বা মানুষের মুখের কথায় যা জেনেছিলাম। তাতে শ্রীপদ সম্পর্কে আসলে আমি কোনো ধারণাই করতে পারিনি আগে। তাই সম্ভবত একটুখানি বেশি ঝুঁকি নিয়েই রওনা দিয়েছিলাম শ্রীপদের উদ্দেশ্যে।

প্রথমে আমি কলম্বোর বাসস্টান্ড হতে রত্মাপুরগামী একটি বাসে উঠে বসি। তারপর প্রায় ৩ ঘন্টা যাত্রাশেষে রত্মাপুর পৌঁছি। রত্নাপুর বাস টার্মিনালে নেমে বিস্কুট, জল ও চকলেট কিনে নিই এবং শ্রীপদগামী একটি বাসে চেপে বসি। শুরু হয় পাহাড়ি রাস্তা দিয়ে এঁকেবেঁকে উর্ধ্বগামী যাত্রা, বাসের জানালা দিয়ে প্রথমে পাহাড়ি সবুজ আর মেঘ-পাহাড়ের ঢেউ ঢেউ দৃশ্য দেখে মুগ্ধ হই। কিন্তু বাস যতই শ্রীপদের দিকে এগিয়ে যেতে থাকে ততই দেখতে পাই মেঘছোঁয়া পাহাড়ের উচ্চতা। দেখতে পাই কিছু কিছু পাহাড় এতোটাই উঁচু যে তার সাথে মেঘ এসে মিশে গেছে, দেখতে থাকি মাটি ও আকাশের দূরত্ব ওই পাহাড়ে পাহাড়ে ঘুচে গেছে, কী আশ্চর্য! কিন্তু যখনই ভাবতে থাকি আমি কী হাঁটতে হাঁটতে ওই পাহাড় বেয়ে মেঘের ভেতর চলে যাবো? আমার হৃদয়ের সব সাহস এবার যেন একটুখানি কেঁপে ওঠে, গলা শুকিয়ে যাবার উপক্রম হয়। হায় হায়! এ অসম্ভব! পাহাড় বেয়ে মেঘের দেশে আমি যেতে পারবো না! আবার নিজের কাছেই প্রশ্ন রাখি- তাই বলে এতো কাছে এসে ফিরে যাবো? তা কি হয় কখনও? আচ্ছা, আগে শ্রীপদের পাদদেশে তো যাই।

প্রায় এক ঘণ্টা বা তারও বেশি সময় হবে রত্মাপুর হতে শ্রীপদের দিকে আঁকাবাঁকা পাহাড়ি রাস্তা দিয়ে উপরে উঠতে উঠতে আমাদের বাসটি শ্রীপদের পার্শ্ববর্তী একটি বাসস্টান্ডে নামিয়ে দেয়। দেখি একটি ছোট দালান ঘরে সাদা চামড়া একটি ছেলে ও মেয়ে বসে, তারা যে শ্রীলঙ্কান নয় তা বুঝে যাকে শ্রীলঙ্কান মনে হলো এমন একজনকে প্রশ্ন করি- আপনি কি স্থানীয়? তিনি জানান যে, তিনি পুলিশের লোক। আমি বললাম- তাহলে তো ভালোই হলো। আমি তো শ্রীপদে যাবো, কিন্তু কোন পথে যাবো?

তাঁর দেখিয়ে দেওয়া পথে আমি রওনা দিই, কিছু দূরে গিয়ে একটি বৌদ্ধমন্দির দেখতে পাই। কিন্তু পাহাড়ে ওঠার কোনো পথ দেখি না। শেষে পথের পাশের একজন নারীকে শ্রীপদে যাবো বলতেই তিনি আসল পথ দেখিয়ে দিলেন। এবার সেই পথ দিয়ে হেঁটে যখন শ্রীপদের পাদদেশে এসে দাঁড়ালাম এবং প্রথম সিঁড়িতে পা রেখেই উপরের দিকে তাকালাম, দেখলাম-পাহাড়ের মাথায় মেঘ ছুঁয়ে আছে, তখন আবার মনে প্রশ্ন এলো- আমি পরবো তো?

সহসা নিজেই নিজেকে প্রশ্ন করলাম- আচ্ছা, আমি যে এখানে এসেছি সে কি কেবলই আমার নিজের ইচ্ছায়, নাকি আমার ভেতর অন্য কেউ এই আকাক্সক্ষা জাগিয়েছে, আর তিনিই তো আমাকে এখানে টেনে হেঁচড়ে নিয়ে এসেছেন। অতএব, সাইমন দ্বিধা কি! যিনি এখানে টেনে এনেছেন, ওই পাহাড়ের শীর্ষেও তিনিই নিয়ে যাবেন, আমার ভয় কী!

এরপর একে একে সিঁড়ি ভেঙে উপরে ওঠার পালা। দুপুর সাড়ে ৩টা নাগাদ উপরে উঠতে শুরু করি। পাহাড়ের ৫-৭ শত ফুট উপর পর্যন্ত জনবসতি দেখতে পাই; তাই উপরে ওঠার সময় পাহাড়ের সিঁড়িতেই শিশু, কিশোর-কিশোরী, যুবক, নারী, বৃদ্ধ-বৃদ্ধাদের সাথে আলাপ হয়। জেনে অবাক হই পাহাড়ে বসবাসরত সপ্তম শ্রেণীর ছাত্রী দীপিকা ৫বার শ্রীপদ পাহাড়ের শীর্ষে গিয়ে ভগবান বুদ্ধকে ভক্তি দিয়ে এসেছেন, দীপিকার কথা শুনে আমার সাহস বেড়ে যায়- নিশ্চয় আমিও পারবো। আরেকটু উপরে উঠে সাক্ষাৎ পাই ৬৫ বছর বয়সী বৃদ্ধা গুনেদিলেকার, তিনি নিজের বাড়ির উপরের দিকে ঝোড় পরিষ্কার করছিলেন, আমি তাঁর সাথে ছবি তুলতে চাইলে বলেন যে, তিনি একা ছবি তুলবেন না, তাঁর মোরগটাকেও সঙ্গে নিতে হবে। অগত্য তাই করতে হয়। গুনেদিলেকার কাছে জানতে চাই, তিনি কী কখনো শ্রীপদ পাহাড়ের উপরের গেছেন? তিনি জানান, তাঁর জীবনে ৫০বারের বেশি শ্রীপদ গিয়েছেন এবং ভগবান বুদ্ধ তথা ‘সামান্দ’কে ভক্তি দিয়েছেন। তিনিই আমাকে জানান, শ্রীপদের সিংহলী নাম হচ্ছে- ‘লিহিনিহেলা সামেনেনে খান্দে’।

প্রায় ১০০০ ফুট উপরের উঠার পর সিঁড়িতে একজন সিদ্ধিসেবককে পাই, তাঁর মুখের গন্ধই জানান দেয় যে, তিনি একটু আগেই সিদ্ধিতে টান দিয়েছেন। সিঁড়িতে দাঁড়িয়ে তাঁকে ‘জয় গুরু’ দিতেই তিনিও ভক্তিভাবে প্রতিউত্তর দিলেন এবং একটুখানি হেসে আমার কাছ থেকে ১০০ রূপী চাইলেন। নির্জন পাহাড়ি সিঁড়ি দিয়ে হাঁটতে এবার একটু শঙ্কা জাগল, সিঁড়িতে আরও এমন সিদ্ধিসেবক নেই তো? এই শঙ্কা নিয়ে উপরে উঠতে থাকি, শরীরের ঘামে শার্ট-প্যান্ট ভিজে যায়। শার্ট খুলে হাল্কা কাপড় পরি এবং ছোট গামছায় ঘনঘন ঘাম মুছতে মুছতে উপরের উঠতে থাকি।

উপরে উঠার পথে এবার একজুটিকে উপর হতে নিচের দিকে নামতে দেখি। জিজ্ঞেস করি- আপনারা কি উপরে ঘুরে এলেন? তারা বলেন- না, ২০০০ ফুট গিয়ে ফিরে এসেছেন।

একসময় আমি ২০০০ ফুট অতিক্রম করে যাই, এরপর কয়েকজন তরুণকে নিচে নামতে দেখি। তাদের সাথেও কথা বলি, তারাও বলেন যে, তারা ৩০০০ ফুট উঠে ফিরে এসেছেন, উপরে যেতে পারেননি। আমি ভাবতে শুরু করি, সঙ্গীসাথী নিয়ে উপরে উঠতে গিয়েই এরা বিফল হয়েছে। আমি তো একা নিশ্চয় আমি সফল হবো।

এদিকে সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসে, ততক্ষণে আমি ৩০০০ ফুট অতিক্রম করেছি। কয়েকজন সাধক ধরনের লোকের দেখা পাই এবার, তারা নেমে আসছিলেন সেই সন্ধ্যায়, তারা অবশ্য জানালেন যে, তারা শ্রীপদ দর্শন করে এসেছেন এবং আমাকে বললেন- আমি যেতে চাইলে আর অতন্ত ৫ ঘন্টা সময় লাগবে।

আমি বললাম- তা আমি পারবো, কিন্তু সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসছে, যদি সিঁড়ির পথে আলো থাকতো তাহলে আমি আস্তে আস্তে চলে যেতে পারতাম। এখন তো সন্ধ্যা ঘনিয়ে এলো- কী করি বলুন তো?

তারা বলল-  আপনি আরেকটু উপরে যেতে পারেন বা এখানেও অপেক্ষা করতে পারেন, কয়েকজন লোক আসছে ওরা আপনাকে ভাল পরামর্শ দিতে পারবে।

ঠিকই কিছুক্ষণ পর ৩জন যুবকের দেখা পেলাম। তাঁদের সাথে কথা বলে জানলাম- তারা বিদ্যুতের সংযোজ পরীক্ষা করতেই উপরে উঠেছিলেন। কিন্তু এই সময় সিঁড়িতে কোনো বিদ্যুৎ দেওয়া হয় না। শুধু শীতের সময়টায় বিদ্যুতের আলো থাকে সিঁড়িতে।

আমি বললাম- ভাই, আমি উপরে উঠতে চাই। এই রাতটা থাকার জন্য পাহাড়ে কোনো জায়গা কী আমি পাবো না?

তারা বলল- যদি আরও ৪০-৪৫ মিনিট হাঁটি তো একটি মন্দির আছে, সেখানে চাইলে থাকা যাবে।

তাদের পরামর্শ মতো আরেকটু হেঁটে রাত্রি বাসের জন্য মন্দিরের দেখা পেলাম। কিন্তু সেখানে কেউ নেই। থাকতে হবে এই পাহাড়ের গায়ে অন্ধকারে আমাকে একা একা। ততক্ষণে পাহাড় ঝিঝির ডাকে মুখরিত। মন্দিরের বারান্দায় ভগ্যিস একটা ভাঙাচোরা বেঞ্চ ছিল, তার উপর ব্যাগ রেখে বসলাম একটুখানি। তারপর আমি প্যান্ট বদল করে ট্রাউজার পরার চিন্তা করে জুতা খুলতে গেলাম। জুতা খোলার পর মোজা খুলতে গিয়ে দেখি পায়ের তকের সাথে কি যেন একটা লেগে রয়েছে, হাত দিয়ে ছাড়াতে গেলাম ধরতে পারলাম না। মোবাইল মনিটরের হাল্কা আলো ধরে বস্তুটা কি তা শনাক্ত করতে চাইলাম। দেখলাম- কোনো একটি কালো কীট পায়ের ত্বকের সাথে আঠার মতো লেগে আছে, এবার মোজা দিয়ে শক্ত করে ধরে টান দিলাম, গায়ের ত্বক দিয়ে এবার গলগল করে রক্ত বের হতে থাকলো। বুঝতে পারলাম- ওটা পাহাড়ি জোঁক, ওকে না মেরে দূরে ছুড়ে ফেললাম। আর হাত দিয়ে পা চেপে ধরে রক্ত বন্ধ করার চেষ্টা করলাম। কিন্তু কিছুতেই রক্ত বন্ধ হয় না। হঠাৎ মনে হলো আমার ব্যাগে এন্টিসেপ্টিভ ক্রীম আছে। এবার তা দিয়ে অনেকক্ষণ ক্ষতস্থান ধরে বসে রইলাম। এরমধ্যে প্রচণ্ড বৃষ্টি এলো। আমার কাছে যেটুকু খাবার পানি ছিল, তা অনেক আগেই শেষ হয়ে গিয়েছিল, তাই বৃষ্টির পানি ধরে খেলাম, বৃষ্টির পানি দিয়ে ক্ষতস্থানটিও ধুয়ে নিলাম। আলোহীন অন্ধকার একটি বৃষ্টির রাত্রি যে ৪০০০ ফুট পাহাড়ের উপরে এভাবে কাটাতে হবে- তা আগে কোনো দিন স্বপ্নেও ভাবিনি। কিন্তু কথিত আদমের পায়ের চিহ্ন আমাকে একাকিত্বের এই অভিজ্ঞান দিল। রাতে কোনো রকম বেঞ্চের উপর শুয়ে বসে কাটিয়ে দিলাম, ভোর রাতে বৃষ্টি থেমে গিয়েছিল। কিন্তু সকালে যখন আবার সিঁড়ি পথে উপরে ওঠার জন্য রওনা দিবো তখন আবার প্রচণ্ড বৃষ্টি এলো। কিছুক্ষণ অপেক্ষা করে বুঝলাম এ বৃষ্টি থামবার নয়। তাই আর অপেক্ষা না করে ব্যাগ হতে ছাতা বের করে আবার সিঁড়িতে পা রাখি, ক্লান্তির মুখে ছাই দিয়ে শ্রীপদ আমাকে টেনে হিঁচড়ে উপরে তুলতে থাকে, মাঝপথে একটি কবিতার জন্ম হয়। আর পথের শেষে স্বপ্ন ও কল্পনার মতো একটি পায়ের চিহ্নের সাথে কত গল্প মিশে যেতে দেখি। কেননা, মুসলিম ও খ্রিষ্টানেরা বিশ্বাস করেন- গন্ধম খাবার অপরাধে আদম যখন স্বর্গচ্যুত হয়েছিলেন তখন পৃথিবীতে এটাই ছিল আদমের প্রথম পা, আর আদম কয়েক সহস্র বছর ওই একটি পায়ের উপর দাঁড়িয়ে নিজের পাপের প্রায়শ্চিত্ত করেছিলেন। পক্ষান্তরে বৌদ্ধরা বিশ্বাস করেন, ভগবান গৌতমবুদ্ধ যখন সাধনায় সিদ্ধি লাভ করে স্বর্গে পা রেখেছিলেন তখন ওটি ছিল পৃথিবীতের বুদ্ধের শেষ পায়ের ছাপ, আবার হিন্দুরা মনে করেন ওটি শিবশঙ্করের পদচ্ছাপ। তাই শ্রীপদের শীর্ষভাগ গড়ে উঠেছে সকল ধর্মের মানুষের তীর্থগৃহ।

শ্রীপদ পাহাড় থেকে নেমে রত্নাপুর হতে কলম্বো ফিরে আসার পথে বাসের মধ্যে দেশপ্রিয় নায়েকের সাথে সাক্ষাৎ ঘটে। তিনি কয়েক বছর ধরে বাসে উঠে কঙ্গো বাজিয়ে সিংহলি ভাষায় ভজন বা প্রার্থনা সংগীত পরিবেশন করেন। স্বচোক্ষেই দেখতে পাই- দেশপ্রিয় নায়েকের ভজন শুনে বাসের প্রায় সকল শ্রেণির নর-নারী যাত্রীরা অর্থ উপহার দেন। কঙ্গো বাজিয়ে গান গাইবার মধ্যে দেশপ্রিয় নায়েক মাঝেমধ্যে মুখে মুখেও নানা ধরনের বাদ্যযন্ত্রের ধ্বনি প্রকাশ করেন।

শুনেছিলাম কলম্বো শহরের একটি অসাধারণ তীর্থস্থান গঙ্গারাম বৌদ্ধমন্দির। হাতে যেহেতু একটুখানি সময় আছে, ছুটে গেলাম গঙ্গারাম বৌদ্ধমন্দিরে। বিচিত্র ধরনের ভাস্কর্যে, চিত্র-বর্ণে, বস্তু, স্থাপত্য, বোধিবৃক্ষ ও প্রার্থনা বৈভবে সত্যি অনন্য এই মন্দিরটি। বৌদ্ধধর্মের বৈরাগ্যের যে রূপ আমাদের চোখে মুখে ভাস্বর রয়েছে- তা মুহূর্তের মধ্যে লুপ্ত হয়ে যায় গঙ্গারামে রক্ষিত ভাস্কর্য, চিত্রকর্ম, স্থাপত্য ইত্যাদি পর্যবেক্ষণ করলে। নারীর উত্থিত যৌবনা স্তনন, কাম-পিপাসার বিচিত্র নৈববৈদ্য, নর-নারীর আলিঙ্গনভঙ্গির পাশাপাশি বৌদ্ধধর্মের মৌলিক বিষয় পরম নির্বাণ-আসক্তির নানা মুদ্রায় শোভিত বোধিজ্ঞানের বৈজ্ঞানিকমর্ম এবং জীবন্ত প্রার্থনার ভাষা ও সংস্কৃতির চলমানরূপ দৃশ্যত ভুবনে বিরল। গঙ্গারাম যেন দক্ষিণ এশিয়ার প্রাচীন ধর্মবোধ, সংস্কৃতি, শিল্পশৌকর্য ও আধুনিকতার জীবন্ত নির্দশন। বৌদ্ধধর্মের প্রাচীন ও শাশ্বত তীর্থভূমি শ্রীলঙ্কা সফরের আনন্দ ও সাফল্য শতভাগ পূর্ণতা পেয়েছে গঙ্গারামে বিহারে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

shares