শোকাঞ্জলি

আমার নাম খুব হ্রস্ব আমি শহীদ কাদরী

স্বপন নাথ

 

কবিতাই আরাধ্য আমার

কবি শহীদ কাদরী কবিতার পঙ্ক্তিতে বলেছেন তিনি হ্রস্ব। অভিমানমিশ্রিত আবেগে বলেছেন হয়তো এ কথা।   মূলত, তিনি হ্রস্ব-দীর্ঘ কিছু নন, তিনি আধুনিক ও কবিতার কারুশিল্পী শহীদ কাদরী। সর্বজনে স্বীকৃত যে কথা প্রকটিত, শহীদ কাদরী বাংলাদেশের অন্যতম আধুনিক কবি। অল্প লিখে শহীদ কাদরীসহ অনেকেই খ্যাতি অর্জন করেছেন এবং চিরায়ত হয়ে আছেন। তিনি স্বল্পপ্রজ, কিন্তু প্রভাবসঞ্চরী বলাই বাহুল্য। বিরতি নিয়েই তাঁর কাব্যগ্রন্থগুলো প্রকাশিত হয়েছে। উত্তরাধিকার (১৯৬৭), তোমাকে অভিবাদন প্রিয়তমা (১৯৭৪), কোথাও ক্রন্দন নেই (১৯৭৮), আমার চুম্বনগুলো পৌঁছে দাও (২০০৯) এবং শহিদ কাদরীর কবিতা (১৯৯৩/২০১৬)। প্রকাশকাল থেকেই বিবেচনাযোগ্য যে, তিনি কবিতার পরিচর্যা ব্যতীত আত্মপ্রকাশে তৎপর ছিলেন না। সচেষ্ট ছিলেন সময় ও সমাজের চালচিত্র বোঝাপড়ায়। এছাড়া কাব্যকৃতিতে শহীদ কাদরীসহ এ-সময়ের কবিগণ তিরিশের বৈশিষ্ট্যে প্রভাবিত হয়েছেন, এর স্বীকৃতিও রয়েছে। ’৪৭ উত্তর বা ৫০, ৬০ ও ৭০ দশক বেয়ে এখনও এর প্রভাব অংশত বিদ্যমান। কবি শহীদ কাদরী নিজে এ নিয়ে বিস্তর কথা বলেছেন বিভিন্ন সময়ে। এ প্রভাব বা অনুকরণের দৃষ্টান্ত নিয়ে অনেক আলোচনা, গবেষণা চলমান। যা কখনও হাস্যকর হয়ে ওঠে। সেক্ষেত্রে মৌলিক কর্মপ্রচেষ্টা খোঁজ করাই গবেষণার আরাধ্য হওয়া উচিত বলে আমরা মনে করি। স্পষ্টত, চল্লিশ, পঞ্চাশ ও ষাটের দশক অগ্রজ-প্রভাবমুক্ত নয়। বিশেষত পঞ্চাশ ও ষাটে যাঁরা কাব্যচর্চা করেছেন, তাঁরা প্রথমপর্যায়ে আধুনিক কবিতার ভাব-ভঙ্গিতে প্রাচ্যের তিরিশ ও পাশ্চাত্য আধুনিক রীতিকে রপ্ত করতে অংশত প্রভাবান্বিত হয়েছিলেন। এ বিষয়টি আহামরি দোষের অর্থাৎ অনুকৃতি বা অনুসরণীয় শিল্পস্বভাবের বিপক্ষ কিছু নয়। সেক্ষেত্রে মৌলিক সৃজনক্ষমতাই মুখ্য। এ আবেশে প্রভাবিত ছিলেন তাঁরা, তবে ওই আবেশের বশবর্তী হননি শহীদ কাদরী। প্রাথমিক পদক্ষেপেই তিনি স্বতন্ত্র ভাষা ও বোধ তৈরিতে সমর্থ হন। সামসময়িক বিশ্বকবিতার ধারাকে ধারণ করেছেন কিন্তু ভাষা ও প্রকরণে স্বাতন্ত্র্য সৃষ্টিতে স্বীয় ভূমি কর্ষণে সচেষ্ট হন কবি শহীদ কাদরী। বন্তুত, শহীদ কাদরী তাঁর মৌলিক সৃজনপ্রতিভায় হয়ে উঠেছেন একজন মননশীল বহুমাত্রিক কবি। যথার্থই বলেছেন জুনান নিশাত :

‘যাপিত জীবনের প্রতিটি বাঁক, ব্যক্তিক জীবন ও সমাজের নানামাত্রিক স্তর প্রত্যক্ষ করার যে অভিজ্ঞতা, তাই উঠে এসেছে তাঁর কবিতার পঙ্ক্তিতে। … আবেগের কোলাহলমুখরতা ও নিঃসঙ্গতার ব্যাপ্তি যেমন রয়েছে তেমনি রয়েছে সামষ্টিক জীবনদর্শনের ছায়াপাত। স্বদেশ, সমকাল, আন্তর্জাতিক আবহ এবং পাশাপাশি ভবিষ্যৎকেও তিনি চিত্রিত করেছেন অত্যন্ত সফলভাবে।’

সংখ্যায় স্বল্প লিখেছেন, কিন্তু ধারণ করেছেন দেশজ ও আন্তর্জাতিক স্বর ও স্তর। বাংলাদেশ ও বাঙালি জনচেতনার নিবিড় পর্যবেক্ষণ ও রূপায়ণে তিনি অনন্য ও অভিনন্দিত। প্রসঙ্গত,  যে-কোনো খ্যাতিমান কবির কবিতা পাঠে তাঁর হয়ে ওঠার সমকালে ঐতিহাসিক পর্বগুলো আমাদের মনে রাখাও জরুরি। ১৯৪৭ সালে দেশভাগ, পাকিস্তান রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা কবি সাহিত্যিক শিল্পীদের সন্তুষ্ট করতে পারেনি। রাষ্ট্র চরিত্র এমন হয়, যা সব চেতনার বিপরীতমুখি। যদিও লক্ষ ছিল সম্প্রদায়গত উপনিবেশ থেকে মুক্তি আকাক্সক্ষা, তবে ফল হলো উলটো। নতুন উপনিবেশে আবার হতে হলো শৃঙ্খলিত। ফলে, চিন্তা-ভাবনায় অগ্রসর শিল্পী, লেখকগণ ঐতিহ্যে প্রত্যাবর্তন, বিনির্মাণ ও বিস্তারে সৃষ্টিশীলতার দিকে মনোনিবেশ করেন। অন্যপক্ষ উপনিবেশ-আকৃষ্ট অন্ধত্বের আবেশ, মোহ ত্যাগ করতে পারেননি। কারণ, এ-চর্চা শুরু হয়েছে ১৯৪৭-এর অনেক আগে থেকেই। প্রগতিশীল বা প্রতিক্রিয়াশীল যা-ই হোক, আবেশিত চিন্তা, চেতনা, ভাষা, সংস্কৃতির প্রভাব এত সহজে অস্বীকার করা যায় না। সাঈদ-উর-রহমানের পর্যবেক্ষণ হলো, ‘বিষয়গত বিচারে ইসলাম ও পাকিস্তানি জাতীয়বাদই সে সময়ের কবিতায় মুখ্য স্থান দখল করেছিল। ইসলামি বিষয় অবলম্বনে কবিতা রচনার রেওয়াজ শুরু হয়েছে বহুপূর্বে- লাহোর প্রস্তাব গৃহীত হবার পর এতে রাজনৈতিক দিকটি প্রবল হয়, আর পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর তা চূড়ান্ত রূপ লাভ করে।’ (পূর্ব বাংলার রাজনীতি-সংস্কৃতি ও কবিতা, পৃ ৪০)  এ ধরনের স্রোতের বিপরীতে কাব্য, সাহিত্যশিল্পচর্চা করেই বর্তমান উত্তরাধিকার প্রতিষ্ঠা পেয়েছে। এ-ধারার অন্যতম অগ্রজ কবি হলেন শহীদ কাদরী। বাংলাদেশের বাংলা কবিতার হিসেব কষলে তাঁকে স্মরণ করতেই হবে। অনেকেই কাব্যচর্চায় ব্রতী হন বলে মনে হয় যে কবিতা লিখতে মেধা মননের দরকার নেই। ওই প্রয়োজন স্মরণ করিয়ে দেন শহীদ কাদরী। শুধু অনুভূতি ও আবেগনির্ভর শব্দচয়নে কবিতা হয় না। অর্থাৎ, শিল্প সৃজনের বিষয়, কেবলই ভাবাবেগের নয়।

আমাদের দেশে দখলি সংস্কৃতির একটা বিষয় খুব জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। রাজনীতি থেকে সাহিত্য শিল্প পর্যন্ত। সেখান থেকে দূরে ছিলেন, শহীদ। তিনি তা চাইতেনও না। তাঁর কথা ও কবিতায় তা-ই বোঝা যায়। তিনি নিজেই বলেছেন, ‘এক বিবর্ণ গোধূলির শেষ বংশজাত আমি’। আর উপান্তে এসে বলেছেন : ‘আমি এক নগণ্য মানুষ, আমি/শুধু বলি : জলে পড়ে যাওয়া পিঁপড়েটাকে ডাঙায় তুলে নিন’। (আপনারা জানেন, আমার চুম্বনগুলো পৌঁছে দাও)

মেধাবী কবি একটি যথার্থ শব্দ প্রয়োগের জন্য হয়তো দীর্ঘসময় অপেক্ষা করেন। তারপরও শব্দ যুৎসই না হলে আর ওই লেখা প্রকাশ করেন না। একটি শব্দ ব্যবহারে ব্যঞ্জনার্থ কী হতে পারে এ নিয়ে ভাবেন অনেকক্ষণ। একটি শব্দে ও বাক্যে বপন করেন ভিন্ন চিন্তার উৎসবীজ। এখানেই কবির অনন্যসার্থকতা। কবি শহীদ কাদরী তা-ই করেছেন তাঁর সমগ্র জীবনে। কবি নিজে আপন ভূমি থেকে সরে গেলেও তাঁর অস্তিত্ব প্রোথিত ছিল নিজ বাসভূমে। পিলসুজ থেকে নিজের আত্মাকে ছাড়িয়ে নিতে পারেননি। কবি হিসেবে তাঁর নিজের বোধ, বৈশ্বিক উত্থানপতন, আর সমকালের বৈশিষ্ট্য মিলিয়ে নিজের সঙ্গে নিজের নিয়ত বোঝাপড়া করে গেছেন। তাঁর কবিতা পাঠেই এসব বৈশিষ্ট্য অনুভব করা যায়।

শহীদ কাদরী ভিন্ন এক কবিসত্তা, তা তাঁর উপলব্ধি, সময় ও সমাজচেতনাসহ বিবিধ অনুষঙ্গে নির্ণিত করা যায়। যেমন বলেছেন কবি ও সমালোচক খোন্দকার আশরাফ হোসেন :

‘শহীদ কাদরীকে বলা হয় পঞ্চাশ দশকের সবচেয়ে মেধাবী কবি। তাঁর কবিতায় তীক্ষ্ণ নাগরিকতা, নির্মেদ প্রকরণ এবং মনননির্ভরতা তাঁকে বিশিষ্ট করেছে। প্রেক্ষাপট একই হওয়ায় এবং প্রকাশভঙ্গিতে সাদৃশ্য থাকায় কখনও কখনও শামসুর রাহমান ও শহীদ কাদরীকে বিনিময়যোগ্য মনে হয়, কিন্তু তাঁদের কবিতার শরীরে সন্ধানী আলোক ফেললে বোঝা যায় দু’জনের পাার্থক্য। শামসুর রাহমান অন্তর্বৃত ও আবেগী (তাঁর আবেগ যদিও অন্তঃসলীলা ও লাজুক), শহীদ কাদরী বহির্বৃত ও মস্তিষ্কপ্রবণ।’

(প্রবন্ধ : আমাদের কবিতায় পাশ্চাত্যপ্রভাব, সমকালীন বাংলা সাহিত্য,

পৃ ৯৭)  উদাহরণ পর্যবেক্ষণযোগ্য।

যথা শান্ত দুপুরে দেলাক্রোয়ার ক্রুদ্ধ, রুদ্ধ মত্ত অশ্বারোহী

ট্রেনে-কাটা শূকরের লাল রক্ত, মৃত্যু, আর্তনাদ।

 

কিছুই শুনে না কেউ তলপেটে অনাস্বাদিত বিহ্বল কাম

আত্মার ভেতরে ওড়ে নীল মাছি বিরক্তির, মগজে উদ্যান।

(পাশের কামরার প্রেমিক, উত্তরাধিকার)

 

শিল্পীমাত্রই চারপাশের উপাদান নিয়ে অন্তরে বিশেষ সংবেদনা থাকে। এ সংবেদন যে-কোনো শিল্পীর স্বোপার্জিত। একইসঙ্গে স্বনিয়ন্ত্রিত বলে শিল্পীমাত্রই স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্যে নির্ণিত হন। সেক্ষেত্রে অপরের, বাইরের যাবতীয় কোলাহল, রাশি রাশি আক্রমণ তিনি পর্যবেক্ষণে অস্থির হয়ে ওঠেন। শিল্পী তাঁর নিজের অন্তরের সৃজনশীল দৃষ্টি দিয়ে বিচার বিবেচনা করেন বলেই স্বীয় কারুকর্মে শিল্পসৃষ্টি করতে সমর্থ হন। কবি শহীদ কাদরী নিজে হয়তো ঘটনার বিন্দুতে ছিলেন না, কিন্তু মন, মনন যে পড়ে থাকে এ সবুজ ঘাসের কাছে। সেভাবেই তাঁর দেশপ্রেমবোধ, নৈঃসঙ্গ্য, নস্টালজিয়া ক্রিয়াশীল থাকে কবিতার প্রতি চরণে। কবি হিসেবে তাঁর কবিতায় সাধারণ কিছু বৈশিষ্ট্য লক্ষণীয় : দেশপ্রেম, নতুন পথ নির্মাণের আকাক্সক্ষা, স্মৃতিকাতরতা, ইতিহাস ও ঐতিহ্যবোধ, প্রেম ও নিসর্গ, নাগরিক জীবনের বৈচিত্র্য, ক্ষয় ও অসুস্থতা, মানবিক বিষয়-আশয়, দ্রোহ, স্তরবহুল জীবনের রং এবং নিখাদ শিল্পিত জীবনের স্বপ্ন ইত্যাদি। এসব রূপায়ণে অনুষঙ্গী করেছেন উপলব্ধিজাত ও সর্বজনগৃহীত শব্দাবলি এবং নিসর্গের উপাদান। এসবই শহীদ কাদরীর কবিতায় হয়ে উঠেছে নতুন চিন্তা সৃজনে স্বতন্ত্র, কাব্যিক দ্যোতনায় অসামান্য। ভিন্ন ভিন্ন পাঠোত্তর প্রতিবেদন তৈরিতে সমর্থ। এছাড়াও তাঁর সৃজিত চিত্রকল্প, উপমাসহ অন্যান্য শিল্পবৈশিষ্ট্য একেবারে ভিন্ন বিবেচনায় চিহ্নিত করা যায়। শহীদ কাদরীর কবিতা সংকলন (সাহিত্য প্রকাশ, ১৯৯৩/২০১৬)-এর মলাটে তাঁর সম্পর্কে যথার্থ মন্তব্যই করা হয়েছে। তাঁর কবিতা বিভিন্ন চিন্তাভাবনা ও দর্শনের সমাবেশ। এমন বৈশিষ্ট্য সাধারণত কবিতায় লক্ষ করা যায় না। এ বিষয়টি শহীদ কাদরীর কবিতার অসামান্য একটি দিক। কবিতা পাঠের সুবিধার্থে কবিতা সংকলনের মলাটে ব্যবহৃত মন্তব্যের আংশিক উপস্থাপনযোগ্য বলে মনে করি :

‘আধুনিক মনন, বিশ্বজনীনতা ও স্বাদেশিকতার মিশেলে এক বিশিষ্ট শিল্পবোধ ও কাব্যভঙ্গি শহীদ কাদরীর অনায়াস আয়ত্ত, সন্দেহাতীতভাবে যা তাঁর অনন্যতারই পরিচয়বাহী। তিনটি মাত্র কাব্যগ্রন্থের (এ সংকলন প্রকাশ ও পুনর্মুদ্রণের পর প্রকাশিত হয়েছে আরও একটি; মোট চারটি) রচয়িতা এই কবি তাই খুব সহজেই বাংলাকাব্যে স্থায়ী আসন করে নিয়েছেন। তাঁর কবিতায় সম্পৃক্ত দীপ্র আধুনিকতা, কাব্যশক্তি আর বাকভঙ্গির বিশিষ্টতা, সেই সঙ্গে দৃষ্টিভঙ্গির চমকের সঙ্গে গভীর জীবনবোধ, অন্তর্গত বিষাদ ও বৈরাগ্যের যোগ পাঠকের জন্য সর্বদাই এক নতুন অভিজ্ঞতার সঞ্চয়ভাণ্ডার।’

 

আমি করাত কলের শব্দ শুনে মানুষ

নাগরিক জীবন শুধু নয়, সামগ্রিক জীবনের অসুস্থতা, ও পর্বের নানাবিন্যাস তিনি কবিতায় নিয়ে এসেছেন। জীবনের বিচিত্র রং আর সেখানে অলিগলির বিচিত্র রুচি। একদিকে রয়েছে ভালোবাসার হাতছানি, অন্যদিকে আধুনিক জীবনের নেতিবাচক বিস্তৃতি। এ অসুস্থতা পর্যবেক্ষণে মানবজীবনের ক্লেদাক্ত রূপকেই চিত্রিত করেছেন শিল্পের কাঠামোতে। সমালোচকরা এটাকেই বলেছেন বোদলেয়ারিয় অনুসরণ। তা হতে পারে, কিন্তু শহীদ কাদরী নিজেই স্বতন্ত্র এক কবিসত্তা। তিনি পাশ্চাত্যরীতিকে অনুসরণ করেছেন নিজস্ব অনুভূতি ও দৃষ্টিকোণ থেকে। স্তরবহুল এ জীবনের অসংগতিও একরৈখিক নয়, বহুরৈখিক। সেভাবেই তিনি চিত্রিত করেছেন অসামান্য সৃজনসামর্থ্যে । নাগরিক পরিবেশেই তাঁর জীবনের সংবেদনশীল সময় কেটেছে। বেড়ে ওঠার সঙ্গে সঙ্গে তাঁর কাব্যচর্চার শুরুতেই নাগরিক জীবনের টানাপড়েন, যন্ত্রণা, সমূহসংকট কবিতার শিল্পে রূপায়ণ করেছেন। সংবেদনশীল, সচেতন কোনো ব্যক্তি সমকালের অভিঘাত অস্বীকার করতে পারেন না, এটাই সত্য। জ্যোতিপ্রকাশ দত্তের সঙ্গে আলাপচারিতায় তিনি বলেছেন :

‘কারণ আমরা ইচ্ছায় হোক আর অনিচ্ছায় হোক কিছুটা সময়ের দাসত্ব করতে বাধ্য হয়ে যাই। আজকের সময়, আজকের সমাজ, আজকের বিশ্ব ব্যক্তি মানুষকে এমনভাবে গ্রাস করছে যে মানুষ সবকিছু থেকে নিজেকে ছাড়িয়ে আনতে চায়।… আধুনিকতার আরেকটা কথা হচ্ছে আধুনিকতা সর্বগ্রাসী। আধুনিক শিল্প, আধুনিক সাহিত্য সবই সর্বগ্রাসী। সবই আমরা স্পর্শ করতে চাই। কিন্তু আমাদের রুচি, ক্ষমতার সীমা দ্বারা আমরা নিয়ন্ত্রিত হই।’ [ নির্বাসন চিরকালই তো দণ্ড; অভিবাদন শহীদ কাদরী, পৃ ৯৩]

 

নাগরিক পরিবেশে কবিতার চর্চা করেও এ পরিবেশে মুগ্ধ হতে পারেননি কবি। যান্ত্রিক জীবন আমাদের অনেক দিয়েছে সুখ-স্বাছন্দ্যের আঙিনায়। উলটো কেড়ে নিয়েছে মানুষের জীবনের স্বাভাবিকত্ব। এ-বিষয়টি তিনি উপলব্ধি করেছেন এবং পাশ্চাত্য চিন্তক, কবি ও শিল্পীদের মতোই নগরজীবনের কৃত্রিমতা, নগ্নতা, অমানবিক শূন্যতাকে শিল্পিত করেছেন কবিতার ভূগোলে। অন্ধকার, বিবিক্তি, শূন্যতা অনুষঙ্গী করে আরও অনেকেই কবিতা লিখেছেন। তবে শহীদ কাদরী কেন তবে আলাদা স্থানে অধিষ্ঠিত? এ প্রশ্নের উত্তর হলো- একই বিষয় ভিন্ন দৃষ্টিকোণে ও পরিচর্যায় প্রতিভাস শহীদ কাদরীর কবিতায়। আবার একপেশে দৃষ্টিভঙ্গিতে তিনি নগরকে দেখেননি। দেখেছেন বিভিন্ন আঙ্গিকে, বিবেচনায়। আমরা সকলেই বিভিন্ন স্থান থেকে বিচিত্র রঙের, ধরনের মানুষ নগরে আসে জায়গা করে নেয়, তেমনি প্রকাশরূপও বিচিত্র। নাগরিক বয়ানে নিজের জীবন ও অপরাপর জীবন কীভাবে দগ্ধ হয়ে ওঠে, মানবিকতা দূরে চলে যায়; এসবই কবিতার অনুষঙ্গী। যে নেতির চিত্রায়ণ কবিতায়, তা শুধু এ আধুনিক জীবনের সংকটই নয়। মূলত, রাষ্ট্র ও সমাজের অসংগতির প্রতি তাঁর ব্যক্তিসত্তার ক্ষোভ ও বেদনারই ভাষ্য। তাঁর কাব্যপাঠে একটি কথা সরলভাবে বোঝাই যায়, তিনি দাসত্বপন্থায় কোনো আদর্শের অনুগামী ছিলেন না। তিনি অসম্ভব মুক্ত স্বাধীন একটি জীবন কামনা করেছেন। এক্ষেত্রে অমোঘ নিয়তির কাছে আটকে পড়া জীবনের জন্য তাঁর প্রচণ্ড ক্ষোভ লক্ষণীয়। সমাজের উৎপীড়নে, অনাচারের সঙ্গে নিজেকে খাপ খাওয়াতে পারেননি। ফলে এর রূপায়ণই মুখ্য থাকেনি, প্রতিক্রিয়া প্রকাশের একটি উপায় হয়েছে তাঁর কবিতা। নিঃসঙ্গতা, বিচ্ছিন্নতা ও শূন্যতার নানামাত্রিক বিস্তৃতি তাঁর কবিতার অন্যতম শিল্পভাষ্য। লক্ষণীয়, নিজের সত্তা ও ভূমিতেই তাঁর অবস্থান, তারপরও তিনি উন্মূল, নিঃসঙ্গ ও বিচ্ছিন্নতায় আক্রান্ত :

ক. সুপ্রচুর বিমুক্ত হাওয়ায় কেন তবে কষ্টশ্বাস?

কেন এই স্বদেশ- সংলগ্ন আমি, নিঃসঙ্গ, উদ্বাস্তু,

জনতার আলিঙ্গনে অপ্রতিভ, অপ্রস্তুত, অনাত্মীয় একা,

(নপুংসক সন্তের উক্তি, উত্তরাধিকার)

 

খ. আর আমি শুধু আঁধার নিঃসঙ্গ ফ্ল্যাটে রক্তাক্ত জবার মতো

বিপদ- সংকেত জ্বেলে একজোড়া মূল্যহীন চোখে

পড়ে আছি মাঝরাতে কম্পমান কম্পাসের মতো অনিদ্রায়।

(উত্তরাধিকার, উত্তরাধিকার)

 

এ বিচ্ছিন্নতা তাঁকে আশাহত করেছে, কষ্ট দিয়েছে। আর এ থেকে উত্তরণে তিনি শেষ পর্যন্ত সংস্কৃতি ও কবিতার আশ্রয়ী হয়েছেন। এখানে নেতির বিপক্ষেও তাঁর ব্যক্তি ও কবিসত্তার অবস্থান স্পষ্ট হয়ে ওঠে। নিদারুণ কষ্টের বিপরীতে তিনি চিরচেনা নিসর্গ ও রবীন্দ্ররচনাবলির কাছে ফিরে গেছেন। অর্থাৎ, কবিতায় নাগরিক জীবন, এটুকু আলাদাভাবে বোঝার জন্য শহীদ কাদরীর কবিতা পাঠ করতে হয়। যা অনুভূতির কেন্দ্র ও ইন্দ্রিয়জ চেতনাকে আন্দোলিত করে। প্রারম্ভ থেকেই তিনি খুব সচেতনভাবে এ বিষয়টিকেই গুরুত্ব দিয়েছেন :

ক. সহসা সন্ত্রাস ছুঁলো। ঘর-ফেরা রঙিন সন্ধ্যার ভিড়ে

যারা ছিলো তন্দ্রালস দিগ্বিদিক ছুটলো, চৌদিকে

ঝাঁকে ঝাঁকে লাল আরশোলার মত যেনবা মড়কে

শহর উজাড় হবে,- বলে গেল কেউ – শহরের

পরিচিত ঘণ্টা নেড়ে নেড়ে খুব ঠান্ডা এক ভয়াল গলায়

( বৃষ্টি, বৃষ্টি, উত্তরাধিকার)

খ.  উনুনের লাল আঁচে গাঁথা-শিকে জ্বলছে কাবাব,

শীতরাতে কী বিপজ্জনক ডাক দ্যায় আহ্লাদে শহর,

কালোরাস্তার বেঞ্চিতে চলো যাই পঙ্ক্তিভোজনে, ক্ষান্ত তবে

হবে কি প্রেতার্ত ক্ষুধা?

(মোহন ক্ষুধা, উত্তরাধিকার)

গ.  কেউ ঢোকে পার্কে, ঝোপে-ঝাড়ে কিংবা নেমে যায় পিচ্ছিল

কৃমির মত

স্বপ্নের সুড়ঙ্গ পথে

সহজ, অবাধ, ঠোঁট ফাটে, ঠোঁট ফাটে, ঠোঁট ফাটে

ইচ্ছার মদির চাপে যেন শুঁড়ির রুক্ষ হাতে

টলটলে দ্রাক্ষার মত

ঠোঁট ফাটে।

(ইন্দ্রজাল, উত্তরাধিকার)

 

ঘ. পার্কের নিঃসঙ্গ বেঞ্চ,

রাতের টেবিল আর রজনীগন্ধার মতো কিছু শুভ্র

সিগারেট ছাড়া

কেউ কোনোদিন জানবে না- ব্যক্তিগত ব্যাঙ্ক এক

আমারও আছে। ‘রবীন্দ্র রচনাবলী’ নামক বিশাল

বাণিজ্যালয়ের সাথে যোগযোগ আমিও রেখেছি।

(টাকাগুলো কবে পাবো?, তোমাকে অভিবাদন প্রিয়তমা)

 

শুধু সমকালের অন্ধকার, অসংগতি, যন্ত্রণার প্রণিপাত নগরে দেখেননি। দ্রোহের মাত্রাও তিনি লক্ষ করেছেন। কবির সমকালে উত্থিল ছিল এ দেশের প্রতিটি শহর। দেশভাগ-উত্তর নির্মিত ঔপনিবেশিক রাষ্ট্রের ভূমিকা, ভাষা সংকোচনের উদ্যোগ, সামরিক সরকারের নির্যাতন, শোষণ ইত্যাদির প্রতিরোধে, দ্রোহে মানুষ রাস্তায় নেমেছে। প্রতিবাদের ভাষা তিনি অবলোকন করেছেন। দেশপ্রেমে মানুষের প্রাণ বিসর্জন, নির্যাতনের মাত্রা লক্ষ করে এ শহর অনুষঙ্গ হয়েছে তাঁর  কবিতার ভাষায় :

রেস্তোরাঁ থেকে যে ছেলেটা রোজ

প্রাতঃরাশ সাজিয়ে দিতো আমার টেবিলে

তে-রাস্তার মোড়ে তাকে দেখলাম শুয়ে আছে রক্তাপ্লুত শার্ট প’রে

বন্ধুর ঘরে যাওয়ার রাস্তায় ডিআইটি মার্কেটের ভস্মাবশেষ,

প্রতিরোধের চিহ্ন নিয়ে বিবর্ণ রাজধানী দাঁড়িয়ে রয়েছে,

তার বিশাল করিডোর শূন্য।

(নিষিদ্ধ জার্নাল থেকে, তোমাকে অভিবাদন প্রিয়তমা)

নিশিদিন অভিবাদন প্রিয়তমা

নাগরিক জীবনযাত্রার বিচিত্র অসংগতি, অসুস্থতা চিত্রণে শহীদ কাদরীর রাষ্ট্র ও সমাজবোধ স্পষ্ট। তিনি ভিন্ন আঙ্গিকে রাষ্ট্র ও সমাজের চারিত্র্যলক্ষণ বিবেচনা করেছেন। এমনকি তাঁর নিজস্ব রাষ্ট্রভাবনাও রয়েছে। আবার তিনি যে কালে কবি হিসেবে প্রতিষ্ঠা পেয়েছেন, সেসময় এদেশ জাতি-রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার লড়াই ও সংগ্রামে অস্থির। ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধ, স্বাধীনতা সম্পর্কে তিনি ছিলেন খুব সচেতন। পশ্চিম পাকিস্তানের সামরিক স্বৈরাচারী শাসকগোষ্ঠীর রাষ্ট্র পরিচালনা নিয়ে তাঁর ক্ষোভ ও দ্রোহের কারণেই নাগরিক-ক্ষয়িষ্ণুতার চিত্র তিনি স্বকীয় বিবেচনায় অংকন করেছেন। এক্ষেত্রে বাঙালিত্বের পরিচয়েই তিনি আজীবন কবিতার সাধক। ঔপনিবেশিক রাষ্ট্রের বৈশিষ্ট্য নিয়ে সৃষ্টি করেছেন আস্বাদ্য শ্লেষ। এছাড়াও রাষ্ট্রযন্ত্রের চালচিত্র বিবেচনা করেছেন মার্কসিয় দৃষ্টিকোণ থেকে। বলাবাহুল্য যে, ওই সময়ে কবি-শিল্পীদের সমাজ ও মানবিক ভাবনা এ ভাবাদর্শেই বিকশিত হয়। শহীদ কাদরী এক্ষেত্রে নিরাসক্ত ছিলেন না। ’৫২-এর ভাষা আন্দোলন থেকে প্রতিটি আন্দোলন ও মুক্তিযুদ্ধ ও মুক্তিযুদ্ধোত্তর পরিস্থিতি নিজে দেখেছেন এবং কবিতায় প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন। প্রসঙ্গত, পূর্ব পাকিস্তানের ঔপনিবেশিক শাসনামলে এদেশের জনগণ ও সাহিত্যশিল্পের ভাষা এক হয়ে ওঠে। জনগণের কণ্ঠ রাজপথের সীমানা ছাড়িয়ে শিল্পী ও কবিকণ্ঠে প্রতিধ্বিনিত হয়। সংগত কারণেই সেই সময় ও শিল্পচর্চাকে বিভাজন করে বিচার করা যায় না।

বিশেষত পশ্চিম পাকিস্তানের অযৌক্তিক ঔপনিবেশিক ভূমিকা, জবরদস্তিমূলক শাসন তাঁদের আরও বেশি সক্রিয় করে তোলে। শুধু কবিতা লেখার মধ্য দিয়ে তাঁদের ভূমিকা শেষ হয়ে যায়নি। অনেকেই সক্রিয়ভাবে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছেন, না হয় সংগঠিত করেছেন। শহীদ কাদরী রাষ্ট্রযন্ত্রের নিয়ন্ত্রণে সমাজে বিকশিত অসুস্থতাকে প্রত্যক্ষ করেছেন। এ উপলব্ধি তাঁর কবিতায় নতুন মাত্রা যোগ করে। ফলে, নিজের অন্তরের গহীনে এক বিষাদের চাপ অনুভব করেন। যে চাপে তিনি সামগ্রিক একটি রূপ অঙ্কনের চেষ্টা করেছেন কবিতায়। সমকালের রাজনীতি ও সমাজের উত্থান অবলোকনে বিচ্ছিন্ন থাকেননি। দেশ ও বিশ^-ইতিহাসের বিভিন্ন পর্ব ও ঘটনাবলির নিবিড় পর্যবেক্ষণে, প্রতিক্রিয়ায় তিনি ছিলেন সচেতন। সুতরাং, তাঁর কবিতা সমাকালীনতাকে ধারণ করেও শিল্পবোধে চিরায়ত। তিনি তাঁর স্বীয় আবেগ দিয়ে উপলব্ধি করেছেন সমকাল। সেখানে অতীব সংযমী ও পরিমিতিবোধ লক্ষণীয়। সময়, সমাজ ও রাষ্ট্রের অসংগতি অঙ্কনে তাঁর শব্দ ও বাক্য চয়ন ভিন্ন এক নির্মিতির আকল্প তৈরি করে। তিনি যেখানে বলেছেন : ‘পাথর তোমার ভেতরেও উদ্বৃত্ত/ রয়েছে আর এক নৃত্য ॥’ (নর্তক) এ দু-টি চরণেই বোঝা যায় তিনি কত গভীরে ভাবেন ও চিন্তা করেন।

আগেই উল্লেখ করা হয়েছে তিনি নাগরিক অন্ধগলির সঙ্গে নিজের সংহতি রচনা করতে পারেননি। ফলে, সে জীবনের অন্তঃসারশূন্যতাকে চেপে না রেখে উন্মোচন করেছেন। এ উন্মোচনে নাগরিক রুচির সঙ্গে তাঁর সমাজিক বোধও বুঝে নেওয়া যায়। যে অভ্যস্ততার ব্যাকরণে বাহ্যিকভাবে তিনি মেনে নিয়েছেন এ ক্লেদাক্ত অসুন্দর ও বিকার, এসব তিনি মনেপ্রাণে গ্রহণ করতে পারেননি। এ মেনে নেওয়ার বিরক্তি ও বেদনাবোধ গ্রাস করে সকলকে। এ সাধারণ, সকলের কথা ও অনুভূতিই তিনি প্রকাশ করেছেন বিভিন্ন কবিতায়। চিন্তা, ভাবনা ও স্বপ্নের ইতিবাচকতার বৈপরীত্য তাঁর জন্ম থেকেই এখনও চলমান। এ বৈপরীত্য শুধু ব্যক্তি শহীদ কাদরী নয়, সামষ্টিক বোধকেও নিয়ন্ত্রণ ও গ্রাস করেছে। ‘আলোকিত গণিকাবৃন্দ’ কবিতায় ভিন্নভাবে দেখেন সমাজের মূল্যবোধ। প্রথাগত মূল্যবোধ রীতিনীতি তিনি মানতে নারাজ। বরং উল্টোভাবে দেখেন সমাজমানসকে। সমাজমানসের অসুস্থ বিকারগ্রস্ততাকে ইংগিত করেন। ‘ক্ষণকাল সে নকল স্বর্গলোকের আমি নতজানু রাজা/ … ভ্রাম্যমানেরে ফিরিয়ে দিলে ঘরের আঘ্রাণ/তোমাদের স্তব বৈ সকল মূল্যবোধ যেন ম্লান।’ এ কবিতা পাঠ করে অনেকেই পাশ্চাত্যরীতির প্রভাব শনাক্ত করেছেন। তাহলে কী ক্ষতি হয়েছে। কিছুই হয়নি, বরং বাংলা কবিতা দর্শনের দিক থেকে সমৃদ্ধ হয়েছে। তবে প্রতিটি পদক্ষেপেই দেখেছেন চরম অসংগতি, অসুস্থতা। লক্ষণীয়, ‘ব্যারাকে-ব্যারাকে থামবে কুচকাওয়াজ/ক্ষুধার্ত বাঘ পেয়ে যাবে নীলগাই/ গ্রামান্তরের বাতাস আনবে স্বাদু আওয়াজ/ মেয়েলি গানের- তোমরা দু’জন একঘরে পাবে ঠাঁই/প্রেমিক প্রেমিকার সাথে মিলবে ঠিক-ই/ কিন্তু শান্তি পাবে না, পাবে না, পাবে না…’। কীভাবে কেন তিনি নিশ্চিত হন শান্তি আসবে না। শহীদ কাদরী ব্যক্তিগতভাবে অনিশ্চিতি বা নৈরাজ্যবাদিতার পক্ষে নন। কিন্তু তাঁর গভীর দৃষ্টি যেখানে, সেখানের অনিশ্চিতি তাঁকে কথাগুলো বলতে বাধ্য করেছে। জীবনের বিকার পর্যবেক্ষণে তিনি নিজের অভিজ্ঞতাকে সমৃদ্ধ করেছেন। অভিজ্ঞতাজারিত কবিতার পঙ্ক্তিমালা :

ক.  জন্মেই কুঁকড়ে গেছি মাতৃজরায়ন থেকে নেমে-

সোনালি পিচ্ছিল পেট আমাকে উগ্রে দিলো যেন

দীপহীন ল্যাম্প্পোস্টের নীচে, সন্ত্রস্ত শহরে

নিমজ্জিত সবকিছু, রুদ্ধ সেই ব্ল্যাক- আউটে আঁধারে।

(উত্তরাধিকার, উত্তরাধিকার)

 

খ.  পায়নি তো খুঁজে মিত্রতা কারও

প্রাণের শ্রমের ক্লান্তির শেষে শুয়ে,

অথবা ব্যর্থ কালির আঁচড়ে কেঁদে

বিবর্ণ ভোরে মাথা কুটে তার দোরে

ফিরেছে আবার নরকের টানে

অমোঘ প্রহরে একা,

শত্রু যে তার শত্রুর সাথে মিতালী!

(শত্রুর সাথে একা, উত্তরাধিকার)

 

গ.   নির্বিবেকী কাফনের মতো

আর আমার ওয়ার্ডরোব থেকে অনর্গল বেরিয়ে আসছে

আমারই কাপড়-চোপড় ফুলে যাওয়া লাশের মতো

যেখানেই হাত রাখি সবকিছু মৃতের দেহের মতো

শীতল, ঠাণ্ডা, হিম

ফ্রিজের হাতল, নিজেকে দেখার আর্শি, ক্ষুরের শক্ত কাঠ

সবকিছুই ঠান্ডা তুহিন।

(একটি ব্যক্তিগত বিপর্যয়ের জার্নাল, কোথাও কোনো ক্রন্দন নেই)

 

একটি আংটির মতো তোমাকে পরেছি স্বদেশ

দেশ ও এদেশের মাটিসম্পৃক্ত সংস্কৃতির প্রতি তাঁর টান অপরিসীম। যদিও তিনি দীর্ঘকাল ধরে ছিলেন স্বেচ্ছা নির্বাসনে। বাঙালি সংস্কৃতি ও প্রকৃতি ও দেশপ্রেম তাঁর অন্বিষ্ট ও আবেগের বিষয়। তাঁর মন-চিন্তা-চেতনায় তাগিদ অনুভব করেছেন এ মাটির গন্ধে ও প্রেমে। প্রবাস জীবনে অধিবাস সত্ত্বেও তাঁর শৈশব-কৈশোরক স্মৃতি কাতরতা তাঁকে অস্থির করেছে কখনও কখনও। যে প্রকৃতির কোলে তাঁর বেড়ে ওঠা, এ প্রকৃতিই তাঁর কোষে, মগজে অনুরণিত হয়েছে বারবার। উত্তরাধিকার কাব্যগ্রন্থের প্রথম কবিতাই বৃষ্টির অনুষঙ্গে লিখা- বৃষ্টি, বৃষ্টি। আরও কয়েকবার এ বৃষ্টি প্রসঙ্গ এসেছে কবিতায়। ২০০৮ সালে এক সাক্ষাৎকারে কবি আক্ষেপ করেছেন এ প্রকৃতির জন্যে। ‘এই আমেরিকাতেও বাংলাদেশের মতো অবিরাম বর্ষা হয়। কিন্তু বাংলাদেশের মতো এত সুন্দর বর্ষা পৃথিবীর আর কোথাও দেখতে পাব? বাংলাদেশে বৃষ্টি মানেই ছোট ছোট ছেলেমেয়ে কাগজের নৌকা পানিতে ভাসাচ্ছে, প্যান্ট গুটিয়ে মানুষগুলো রাস্তা পার হচ্ছে। এই দৃশ্যগুলোকে কল্পনা করলে আমার কাছে উৎসবের মতন মনে হয়। বাংলাদেশের আকাশ অনেক সুন্দর। আমি স্বপ্ন দেখি কবে আবার সেই সবুজ দেশটাকে দেখব।’ এক ধরনের চাপা কান্নাই স্পষ্ট হয়ে ওঠে তাঁর কথা ও কবিতায়। পাশ্চাত্য উপলক্ষ তাঁর জীবনে বহির্জাগতিক প্রয়োজন পূরণ করেছে। কিন্তু অন্তরের নিষ্ঠায় সব সময় জাগ্রত থেকেছে এ মাটি, ঘাসফুল, কাদাজলের বাংলাদেশ। বিভিন্ন সময় সাক্ষাৎকার, কথা ও কবিতায় অকপট স্বীকারোক্তি দিয়েছেন। নিজেই বলেছেন, ওই জীবন তাঁর কাছে গ্রহণযোগ্য নয়। মানুষের নিয়তি এখানেই- যা অরুচিকর, অপছন্দ, তা-ই ঘিরে ধরে এ ক্ষুদ্র জীবন। ‘নিরন্তর গাড়িগুলো পার্ক-করা নির্দিষ্ট রাস্তার বাঁকে/ সিনেমার কিউ ধ’রে অনন্তকাল আমি আমার ইয়ার্কি আর মস্কারা/ ইন্দ্রধনু রঙের সরু বেল্ট্ নিয়ে অফুরন্ত দরাদরি/- আমি কিছুই কিনবো না!’ তাহলে তিনি কী চেয়েছেন এ জীবনে। তিনি কবিতায় অন্য কোনো প্রসঙ্গ প্রকাশেও অনুষঙ্গী করেছেন তাঁর চিরচেনা এদেশেরই নিসর্গের উপাদান। তিনি লক্ষ করেছন সাম্রাজ্যবাদ ও উপনিবেশের কৌশল আমাদের অনেক কিছুই হরণ করেছে। এ ঐতিহ্যের, গৌরবের উপকরণ বিকৃত ও ধ্বংসের চেষ্টা করা হয়েছে। এ অবস্থায় নিরাশ্রয়ের প্রান্তে আশ্রয়ের আলো জ্বালাতে থাকেন বাঙালি সংস্কৃতির অনন্যসারথি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর :

ক. আমাদের চৈতন্যপ্রবাহে তুমি ট্রাফিক আইল্যান্ড

হে রবীন্দ্রনাথ!

তুমি সে রাতের পার্কে আমার আলো-জ্বলা

অন্তিম রেস্তোরা!

(রবীন্দ্রনাথ, তোমাকে অভিবাদন প্রিয়তমা)

 

খ.  অথচ আজ ভোরে নৈশকালীন বাতাস ও বৃষ্টির পর

দরোজা খুলেই দেখি- উঠোনের কিছু প্রগাঢ় সবুজ

লতাপাতার মধ্যে একটা হলুদ মরা শালিক কাৎ হয়ে পড়ে আছে

তারপর সারাদিন সেই মরা শালিকটা

ঘুরে বেড়ালো আমার সঙ্গে সঙ্গে

আশ্চর্য নাছোড়বান্দা-ঘর থেকে ঘরে।

(একটা মরা শালিক, কোথাও কোনো ক্রন্দন নেই)

 

নাগরিক পানশালাতে তিনি অভ্যস্ত হয়েও বিরক্তি প্রকাশ করেছেন অনায়াসে। অবশেষে এ কৃত্রিম শ্বাসরুদ্ধকর পরিবেশ থেকে মুক্তি চেয়েছেন কবি। যে জীবনে বস্তুগত দ্রব্যাদির আড়ম্বর থাকলেও আন্তরিকতাশূন্য। ধাতব খোলসে নিমজ্জিত পরিবেষ্টিত জীবনশূন্যতা আর বিচ্ছিন্নতায় মুখরিত। ফলে, লোকবাংলার অকৃত্রিম পরিবেশে পুনরায় তিনি নিজেকে পরিশুদ্ধ করতে আগ্রহী। আপাত বিচ্ছিন্ন হওয়া যন্ত্রণার গ্রাসে নষ্ট হওয়া বোধ আবার নিজস্ব ঠিকানায় ফিরিয়ে আনতে চেয়েছেন। কিন্তু সেখানেও যন্ত্রণা বিস্তৃত হয়ে আছে। সেই চিরায়ত গ্রাম ও প্রকৃতির জীবন আবেগ অনুভূতিশূন্য। নগরের জটিলতা থেকে পরিত্রাণে তাঁর গ্রামের দিকে যাত্রা, আবার গ্রামের সংবেদনহীনচর্চা তাঁকে পথহীন করে দিয়েছে। এ দু-য়ের দ্বন্দ্বে তিনি দোলায়িত। এ দ্বন্দ্বের উৎস সকলের জানা- কেননা, এখন কোনো অসংগতি, কোনো নির্যাতন মানুষের ভেতরে আলোড়ন তৈরি করে না। শুধুই প্রয়োজনের নিরিখে পরিমাপ করা হচ্ছে জীবন। লক্ষণীয় তাঁর দ্বন্দ্বমুখর পদাবলি :

ক. ফুটপাতে শুয়ে থাকা ন্যাংটো ভিখারির নাভিমূলে

হীরার কৌটোর মতো টলটল করছে শিশির

এবং পাখির প্রস্রাব;

সরল গ্রাম্যজন খরগোশ শিকার ক’রে নিপুণ ফিরে আসে

পত্নীর ঘনিষ্ঠ সান্নিধ্যে, চুল্লির লাল তাপে

একটি নরম শিশু খরগোশের মাংস দেখে আহ্লাদে লাফায়

সব রাঙা ঘাস স্মৃতির বাইরে পড়ে থাকে

বৃষ্টি ফিরিয়ে আনে তার

প্রথম সহজ রং হেলায়- ফেলায়

কোথাও কোনো ক্রন্দন তৈরি হয় না।

(কোনো ক্রন্দন তৈরি হয় না, কোথাও কোনো ক্রন্দন তৈরি হয় না)

 

খ.  চায়ের ধূসর কাপের মতো রেস্তোরাঁয়- রেস্তোরাঁয়

অনেক ঘুরলাম।

এই লোহা, তামা, পিতল ও পাথরের মধ্যে

আর কতদিন?

যারা গাঁও-গেরামের মানুষ,

তাদের গ্রাম আছে, মসজিদ আছে

সেলাম-প্রণাম আছে।

…। তাদের খড়ের ভিটে আছে

খররৌদ্রে জিরোনোর জন্যে পাথর ও চত্বর আছে। বটচ্ছায়া?

সে তো আছেই, বদ্যিবুড়োর মতো আদ্যিকাল থেকে,

আর তাছাড়া সরপুঁটি, মৌরালা, ধপধপে চিতল-

এরা তো গ্রামেরই মানুষ।

(এবার আমি, কোথাও কোনো ক্রন্দন নেই)

 

তাঁর কিছু কবিতা সতর্কভাবে অনুধাবন ও পাঠ করতে হয় অখণ্ড পাঠকসত্তায়। মনে রাখতে হয় কবির আত্মজিজ্ঞাসা ও সমাজবোধ। তা না হলে মনে হতে পারে জিজ্ঞাসা ও সত্য রূপায়ণে তিনি উলটো কথা বলছেন কি না। একইসঙ্গে বিশ্ব পরিস্থিতির পর্যবেক্ষণও ছিল। এর প্রতিফলন রয়েছে কবিতায়। দেশে দেশে যুদ্ধ ও মারণান্তিক দৃশ্য দেখে ক্ষুব্ধ হয়েছেন। ফলত, সংক্ষুব্ধ মনের শিল্পিত প্রতিক্রিয়া রয়েছে তাঁর কাব্যে। শুধু বাংলাদেশ নয়, অন্যসকল তৃতীয় বিশ্বে সাম্রাজ্যবাদী আক্রমণ তিনি মনে করেছেন অসহনীয়। যুদ্ধের বিরুদ্ধে দ্রোহী অবস্থান কবি শহীদ কাদরীর। স্কিৎসোফ্রেনিয়া কবিতায় বলেছেন, ‘আমাদের সচ্ছল কিচেনে/ অনর্গল রান্না হ’য়ে চলেছে আপন-মনে/ নানা ধরনের মাংস-/ নাইজেরিয়ার, আমেরিকার, সায়গনের, বাংলার কালো, শাদা এবং ব্রাউন মাংস।’

এছাড়াও কবিতা, অক্ষম অস্ত্র আমার; নিষিদ্ধ জার্নাল থেকে; পাখিরা সিগন্যাল দেয়; ব্ল্যাক আউটের পূর্ণিমায়; স্বাধীনতার শহর; একুশের স্বীকারোক্তি প্রভৃতি কবিতায় বাংলাদেশের মুক্তিসংগ্রাম, তাঁর দেশেপ্রেমের কথাই রূপায়িত হয়েছে। তাঁর কবিতায় প্রতিফলিত রাষ্ট্রের সংজ্ঞার্থ ভিন্ন- একবারে অমানবিক একটি ধারণা। তিনি লক্ষ করেছেন রাষ্ট্রপুঞ্জের ব্যর্থতা আরও বেশি সংকট তৈরি করে। তা হলে দেশে দেশে গণমানুষের বদলে বিশেষ কায়দায় রাষ্ট্রযন্ত্র পরিচালিত হতে থাকে। তিনি এ ব্যর্থতাকেই বিদ্রƒপ করেছেন। অগণতান্ত্রিক, সামরিক, স্বৈরাচারী রাষ্ট্রযন্ত্রের প্রতি তাঁর তীব্র ঘৃণা ও শ্লেষ প্রকাশ করেছেন। ‘একধরনের শ্লেষাত্মক সংজ্ঞায়ন- রাষ্ট্রযন্ত্রের’ :

রাষ্ট্র বললেই মনে পড়ে রেসকোর্সের কাঁটাতার,

কারফিউ, ১৪৪- ধারা,

রাষ্ট্র বললেই মনে পড়ে ধাবমান খাকি,

জিপের পেছনে মন্ত্রীর কালো গাড়ি,

রাষ্ট্র মানেই রাষ্ট্রসংঘের ব্যর্থতা

রাষ্ট্রসংঘের ব্যর্থতা মানেই

লেফট্ রাইট,  লেফট্ রাইট, লেফট্-!

(রাষ্ট্র মনেই লেফট্ রাইট লেফট্,  তোমাকে অভিবাদন প্রিয়তমা)

 

জনগণের সঙ্গে কবি হিসেবে তিনিও অবলোকন করেছেন, ১৯৭১ সালে বাংলাদেশকে কীভাবে ধ্বংসস্তূপে পরিণত করা হয়েছে। কাব্যিক প্রকরণে তিনি পাঠককে নিবিষ্ট করে নিয়েছেন এ ভয়াবহ পরিস্থিতির দিকে। বস্তুত, কবিতা তাঁর স্লোগান নয় বলেই তিনি স্বাধীনতা, রাষ্ট্রযন্ত্র, স্বদেশচেতনাকে নিবিড় ও গভীর অনুভূতির চেতনায় স্থাপনে আগ্রহী। এসব বিষয়ে তাঁর রাজনৈতিক দৃষ্টিভংগিকে শিল্পিত করছেন কবিতায় :

ক. স্বাধীনতার সৈনিক যেমন উরুতে স্টেনগান বেঁধে নেয়,

কিম্বা সন্তর্পণে গ্রেনেড নিয়ে হাঁটে,

তেমনি আমিও

গুপ্তচরের দৃষ্টির আড়ালে অতি যত্নে লুকিয়ে রেখেছি

যেন তুমি নিদারুণ বিস্ফোরণের প্রতিশ্রুতিতে

খুব বিপজ্জনক হ’য়ে আছো।

যদি পারো গর্জে ওঠো ফীল্ডগানের মতো অন্তত একবার…

(কবিতা, অক্ষম অস্ত্র আমার, তোমাকে অভিবাদন প্রিয়তমা)

 

খ.  ভোরের আলো এসে পড়েছে ধ্বংসস্তূপের ওপর।

ধ্বংসস্তূপের পাশে, ভোরের আলোয়

একটা বিকলাঙ্গ ভায়োলিনের মতো- দেখলাম তে-রাস্তার মোড়ে

সমস্ত বাংলাদেশ পড়ে আছে আর সেই কিশোর, যে তাকে

ইচ্ছের ছড় দিয়ে নিজের মতো ক’রে বাজাবে ব’লে বেড়ে উঠছিলো

সেও শুয়ে আছে পাশে, রক্তাপ্লুত শার্ট পরে।

তবে কি এই নিয়তি আমাদের, এই হিরন্ময় ধ্বংসাবশেষ,

এই রক্তাপ্লুত শার্ট আজীবন, এই বাঁকাচোরা ভাঙা ভায়োলিন?

(নিষিদ্ধ জার্নাল থেকে,  তোমাকে অভিবাদন প্রিয়তমা)

 

অতুলনীয় অসামান্য তাঁর দেশপ্রেম। অবিচ্ছিন্ন সত্তায় তিনি তা প্রোথিত করেছেন অভিনব নান্দনিকবোধে। যতই নির্যাতন হোক, নিপীড়ন চলুক অবিরাম, এখানেই তাঁর মর্মমূল। শৃঙ্খল মুক্তির আকাক্সক্ষায়, আঁধার অতিক্রম করে বিদ্রোহী পূর্ণিমায় আলো হাতে নিজ গৃহে ফিরেছে সবাই। যা কবিরও একান্ত আরাধ্য। অনন্য নান্দনিক তাঁর দেশপ্রেম। যেক্ষেত্রে উচ্চকিত তাঁর প্রতিজ্ঞা ও দায়িত্ববোধ :

গ.  একটি আংটির মতো তোমাকে পরেছি স্বদেশ

আমার কনিষ্ঠ আঙুলে, কখনও উদ্ধত তলোয়ারের মতো

দীপ্তিমান ঘাসের বিস্তারে,

ব্ল্যাক আউট অমান্য করে তুমি দিগন্তে জ্বেলে দিলে

বিদ্রোহী পূর্ণিমা। আমি সেই পূর্ণিমার আলোয় দেখেছি :

আমরা সবাই ফিরছি আবার নিজস্ব উঠোন পার হ’য়ে

নিজেদের ঘরে।

(ব্ল্যাক আউটের পূর্ণিমায়,  তোমাকে অভিবাদন প্রিয়তমা)

 

কবি স্বপ্ন দেখেছেন বিধ্বস্ত দেশ নিয়ে। তাঁর স্বপ্ন ছিলো সাধারণ মানুষের মতোই, যারা এ দেশের জন্য লড়াই করেছে ও প্রাণ দিয়েছে অকাতরে। যুদ্ধোত্তর সময়ে রাষ্ট্র ও সমাজের সংকটে তিনি কষ্ট বোধ করেছেন। স্বপ্নভঙ্গের বেদনায় তাঁর হাহাকার স্পষ্ট তাঁর কবিতায়। জাতি-রাষ্ট্র নির্মাণের আদর্শ থেকে ক্রমশ অপসৃত ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনা থেকে বিচ্যুত হওয়া বিষয়গুলোকে তিনি মেনে নিতে পারেননি। তিনি চেয়েছেন সাধারণ মানুষের মতোই সহজ ও সরলভাবে একটি দেশ :

স্বীকার করি, স্বীকার করি

ভালোবাসার জন্যে আমি শহরভরা প্ল্যাকার্ডগুলো

দারুণ যতেœ পড়েছিলাম, অন্ধকারে, একলা রাতে

পিস্তলের সে ঠাণ্ডা বাঁটের ধাতব কঠিন

শিউরানি সব পেয়েছিল এই করতলে,

তোমার উষ্ণ স্তনের কাছে নিরাপদে যাবেই ব’লে

বিপ্লবীদের আত্মচরিত ঘেঁটেছিলো রাত্রি জেগে

আমার ব্যর্থ আঙুলগুলো।

(জতুগৃহ, তোমাকে অভিবাদন প্রিয়তমা)

 

ব্যর্থতার বিপরীতে তিনি শান্তিময়, শিল্পিত রাষ্ট্র ও সমাজব্যবস্থার স্বপ্ন দেখেছেন। এক্ষেত্রে তিনি দায়বদ্ধতা নিয়েই তাঁর স্বপ্নকে ভাষায় বলে দিয়েছেন। যেখানে গ্রাম ও নগরের ক্লেদ, অস্বস্তি, অসংগতি থাকবে না। রাষ্ট্র মানেই লেফট্ রাইট হবে না। ব্যক্তি ও সামষ্টিক শোষণ পীড়ন বন্ধ যেখানে, সে ধরনের রাষ্ট্র ও সমাজব্যবস্থারই কামনা করেছেন। এক্ষেত্রে শোষণমুক্ত রাষ্ট্রব্যবস্থার স্বপ্ন থেকে তিনি বিচ্যুত হননি। প্রসঙ্গত, সাদ কামালীর সঙ্গে সাক্ষাৎকার (দৈনিক সংবাদ ১ সেপ্টেম্বর ২০১৬)-এ তিনি বলেছেন, ‘শ্রেণি বৈষম্যের অবসান এবং সম্পদের সুষম বণ্টনে আমি এখনও বিশ্বাসী। পণ্ডিতেরা যাই বলুক না কেন, এবং পূর্ব ইউরোপের রক্তাপ্লুত রাজধানীগুলোতে লেনিনের ভূলুণ্ঠিত মূর্তি দেখে যতই উল্লসিত হোক না কেন তাঁরা, আমি এখনও বিশ্বাস করি  আমার দেশে সমাজতন্ত্র সুপ্রতিষ্ঠিত হলেই মুদ্রাস্ফীতি কমে গিয়ে শিল্পোত্তীর্ণ কবিতার সংখ্যা বেড়ে যাবে।’ একইসঙ্গে নয়া বিশ্বব্যবস্থার প্রতি তাঁর সচেতন দৃষ্টি লক্ষণীয়। শোষণমুক্ত সমাজ, রাষ্ট্র ও বিশ্ব যে তাঁর আরাধ্য এবং তাঁর বিশ্বাসের নিষ্ঠা প্রকাশ করেছেন অবশেষে :

শ্রেণিসাম্যের আদর্শে যারা একদা সংহত হয়েছিল এক

স্বপ্নজাত সোভিয়েত বলয়ে এখন কী অভিপ্রায় তাদের

বোঝা দায়।

তারা আজ পরস্পরের শোণিতে রাঙিয়ে নিয়েছে হাত

এবং আপাত মনোরম সূর্যাস্তের বর্ণালি বিভার সাথে

হয়ে গেছে একাকার।

(স্বতন্ত্র শতকের দিকে, আমার চুম্বনগুলো পৌঁছে দাও)

 

দেশকে প্রিয়তমা সম্বোধনে তাঁর দায় ও দায়িত্ব থেকে চমৎকার একটি রাষ্ট্র নির্মাণে তিনি প্রতিজ্ঞাবদ্ধ। যেখানে কোনো নেতি বা ক্ষয়িষ্ণুতা শক্তি নিয়ে দাঁড়াতে পারবে না। সেক্ষেত্রে তিনি গণমানুষের কল্যাণকর শিল্পিত রাষ্ট্রকাঠামোর স্বপ্ন দেখেছেন এবং অংগীকার করেছেন :

ক. ভয় নেই

আমি এমন ব্যবস্থা করবো মুদ্রাস্ফীতি কমে গিয়ে বেড়ে যাবে

শিল্পোত্তীর্ণ কবিতার সংখ্যা প্রতিদিন

আমি এমন ব্যবস্থা করবো গণরোষের বদলে

গণচুম্বনের ভয়ে

হন্তারকের হাত থেকে প’ড়ে যাবে ছুরি, প্রিয়তমা।

(তোমাকে অভিবাদন প্রিয়তমা, তোমাকে অভিবাদন প্রিয়তমা)

 

ক.  রাষ্ট্রপ্রধান কি মেনে নেবেন আমার প্রস্তাবগুলো?

গীতবিতান ছাড়া কিছু রপ্তানি করা যাবে না বিদেশে

হ্যারিবেলাফোন্তের রেকর্ড ছাড়া অন্য কোনো আমদানি.

প্রতিটি পুলিশের জন্যে আয়োনেস্কোর নাটক

অবশ্য পাঠ্য হবে,

সেনাবাহিনীর জন্যে শিল্পকলার ইতিহাস ;

রাষ্ট্রপ্রধান কি মেনে নেবেন আমার প্রস্তাবগুলো,

মেনে নেবেন?

(রাষ্ট্রপ্রধান কি মেনে নেবেন ?, তোমাকে অভিবাদন প্রিয়তমা)

 

কবিতায় তিনি বলেছেন, ‘বেরিয়েছে সকালবেলায় সে তো- শহীদ কাদরী বাড়ি নেই’। সত্যি তিনি বাড়িতে আর আসেননি। প্রথাকে ভেঙেছিলেন নতুন কিছু নির্মাণের প্রতিজ্ঞায়। কবিতায় এনেছেন নতুন বাঁক ও ভংগি। তাঁর কবিতায় আবেগের সঙ্গে স্বীয় অভিজ্ঞতা ও মননশীলতার ভিন্ন বোঝাপড়া। তাঁর স্বকীয় দৃষ্টিভঙ্গি, জীবনদর্শনের বীক্ষায় চিরায়ত অভিবাদনের কবি শহীদ কাদরী।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

shares