বিশেষ প্রবন্ধ

রোমান মহাকবি লুক্রেৎসউস :

তাঁর মহৎ কাব্য বস্তুসমূহের প্রকৃতি

বিরঞ্জন রায়

 

১। লুক্রেৎসউস (Lucretius) এবং রোমান যুগ

রোম নগরীর পত্তন হয় খ্রিস্টপূর্ব ৭৫৩ অব্দে। এটি ছিল একটি কৃষিভিত্তিক নগর। খ্রিস্টপূর্ব ৫০৯ অব্দে রোম প্রজাতন্ত্র গঠিত হয়। এতে পাত্রিৎসিউস (patrician) বা অভিজাতেরা সাধারণ সভায় মিলিত হয়ে নিজেদের মধ্য থেকে এক বছরের জন্য দুজন কোন্সুল বা শাসক এবং কয়েকজন সেনাতোর বা আইন সভার সদস্য নির্বাচিত করতেন। প্লেবেইউস (plebeian) বা সাধারণ জনগণ প্রায় দু’শ বছর সংগ্রাম করে খ্রিস্টপূর্ব পাঁচ শতকে তাদের নিজেদের প্রতিনিধি বা ত্রিবুনুস (tribunus) নির্বাচনের অধিকার আদায় করে। এক বৎসরের জন্য নির্বাচিত এই ত্রিবুনুস সেনেতে প্লেবেইউস সংক্রান্ত বিষয়ে ভেটো দেওয়ার অধিকারী ছিলেন। খ্রিস্টপূর্ব তৃতীয় শতাব্দী থেকেই রোম তার সামরিক শক্তি বাড়িয়ে সাম্রাজ্যের ক্রমবিস্তার শুরু করে। খ্রিস্টপূর্ব দুই শতকেই বিশাল রোমান সাম্রাজ্য গড়ে উঠে। এতে অভিজাতরা ফুলে-ফেঁপে উঠে, কৃষকরা ভূমিহীন হয়। উৎপাদনের সকল ক্ষেত্রে দাসশ্রম নিয়োজিত হয়। সে সময়ে যার ভূসম্পত্তি আছে এমন লোকই (কৃষক) রোমান সেনাবাহিনীতে যোগ দিতে পারত। কৃষকরা ভূমিহীন হতে থাকায় সৈন্য সরবরাহে বিঘ্ন ঘটে। কৃষকসমাজে অসন্তোষ দানা বাঁধে। এ সংকট থেকে উত্তরণের পথ হিসাবে তিবেরিউস ও গাইউস এই দুই ভাই ভূমি সংস্কারের উদ্যোগ নেন। তিবেরিউস খ্রি.পূ. ১৩৩ অব্দে ত্রিবুনুস নির্বাচিত হয়েছিলেন। তিনি ভূমি আইন প্রণয়নে উদ্যোগ নেন। এ আইনে পরিবার প্রতি সর্বোচ্চ জমির পরিমাণ ২৫০ হেক্টর নির্ধারণ করে উদ্বৃত্ত জমি ভূমিহীন কৃষকদের মধ্যে বন্দোবস্ত দেয়ার প্রস্তাব করা হয়। কৃষকরা এ বন্দোবস্তকৃত জমি ভোগ করতে পারবেন, বিক্রি করতে পারবেন না। প্রস্তাবিত আইনটি ব্যাপক জনসমর্থন লাভ করে এবং একটি বিশাল জনসভায় তা গৃহীত হয়। তিবেরিউস এটি বাস্তবায়ন শুরু করলে অভিজাতদের স্বার্থে ঘা লাগে। তাদের প্রতিনিধি সেনাতোর’রা  তিবেরিউস-এর নামে ক্ষমতা দখলের  মিথ্যা অভিযোগ এনে ‘প্রজাতন্ত্র রক্ষা’র নামে তাকে হত্যা করে। তিবেরিউস-এর ছোটভাই গাইউস খ্রি.পূ. ১২৩ অব্দে ত্রিবুনুস নির্বাচিত হয়ে আইনটি কার্যকর করা শুরু করেন। অভিজাতরা এর বিরোধিতা করলে অভিজাত ও সাধারণের মধ্যে গৃহযুদ্ধ বেঁধে যায়। এ-সংগ্রামে গাইউস ও তার তিন হাজার সমর্থকের মৃত্যু হয়। ফলে কৃষকদের নিঃস্বকরণ ঠেকানো সম্ভব হয়নি। তখন আগের নিয়ম পরিবর্তন করে সেনাবাহিনীতে ভাড়াটে লোক নিয়োগ দেওয়া শুরু হয়। এসব ভাড়াটে সৈন্যরা রাষ্ট্রের অনুগত না থেকে ক্রমেই সেনাপতির অনুগত হয়ে পড়ে। অন্যদিকে অভিজাত ও সাধারণের মধ্যকার দ্বন্দ্ব তীব্র হতে থাকলে, অভিজাতরা চাচ্ছিলেন রাষ্ট্র শাসনে গণতান্ত্রিকতাকে বিসর্জন দিয়ে তাদের স্বার্থের অনুকূল একনায়কতন্ত্র কায়েম করতে। অন্যতম সেনাপতি ইউলিউস কেজার (জুলিয়াস সিজার) এ অবস্থার সুযোগ নিয়ে ৪৯ খ্রি.পূর্বাব্দে নিজেকে স্থায়ী ইম্পেরাতোর (সম্রাট) ঘোষণা করেন। আগে শুধুমাত্র যুদ্ধের সময় প্রধান সেনাপতি এ উপাধি ব্যবহার করতেন। একনায়কতন্ত্রী ও প্রজাতন্ত্রীদের মধ্যে বিরোধ চলতে থাকে। সিজার প্রজাতন্ত্রীদের হাতে খুন হন। কিন্তু তারই আত্মীয় আরেক সেনাপতি ওক্তাভিয়ান ৩০ খ্রি.পূর্বাব্দে আবার ইম্পেরাতোর হয়ে বসেন। তখন যদিও আপাত আগের প্রজাতান্ত্রিক সব প্রতিষ্ঠানই বহাল রইলো, কিন্তু কার্যত সেগুলো হয়ে দাঁড়ালো ইম্পোরাতোর-এর ইচ্ছাপূরণের হাতিয়ার। অবশ্য শতাব্দীব্যাপী অস্থিরতার অবসান হয়ে সাম্রাজ্যে স্থিতিশীলতা ফিরে এল। সম্রাটকে আউগুস্তুস (পবিত্র) উপাধিতে ভূষিত করা হ’ল।

রোম সাম্রাজ্যের পরবর্তীকালের অধিকাংশ সময়ই ছিল স্থিতিশীল। কারণ রোমান সাম্রাজ্যের সীমানায় কোনো প্রতিদ্বন্দ্বী সাম্রাজ্য  ছিল না। সাম্রাজ্যের অভ্যন্তরীণ বিদ্রোহ দমন করা হ’ত বল ও মনস্তাত্ত্বিক কৌশল প্রয়োগ করে। মাঝে মাঝে শাসকদের মধ্যে অন্তর্দ্বন্দ্ব দেখা দিত। সম্রাট দিওক্লেতিয়ান (২৮৪-৩০৫ খ্রি) শাসকদের অভ্যন্তরীণ বিরোধ নিরসনে, ওক্তাভিয়ান যে প্রজাতান্ত্রিক খোলসটুকু বজায় রেখেছিলেন, তা-ও ঝেড়ে ফেলেন। তিনি তার অনুগত রাজ কর্মচারীদের নিয়ে শাসনকাজ পরিচালনা শুরু করেন।সম্রাটের যে-কোনো নির্দেশই আইন বলে গণ্য হ’ল। সেনাবিদ্রোহ দমনের জন্য তিনি বর্বর উপজাতিদের মধ্য হ’তে সেনা নিয়োগ শুরু করেন। এতে আপাত সুফল ফলেছিল। কিন্তু আখেরে বর্বররাই রোমান সাম্রাজ্যকে ধ্বংস করেছিল।

খ্রিস্টপূর্ব দ্বিতীয় শতকের মাঝামাঝি হেলেনায়িত সাম্রাজ্য, রোমান সাম্রাজ্যের অধিকারভূক্ত হয়। রোমানরা গ্রিক সংস্কৃতির সংস্পর্শে আসে এবং এর দ্বারা অভিভূত হয়। জনৈক রোমান কবি লিখে গেছেন, ‘বন্দিদশায় আবদ্ধ গ্রিস তার বর্বর বিজয়ীকে শিল্পের দ্বারা নিষ্ঠুর লাৎসিউম-এ (লাতিন জাতির বাসভূমি) বন্দি করে রেখেছে।’ অবশ্য গ্রিক সংস্কৃতির প্রভাব উচ্চবর্গে ব্যাপ্ত হয়েছিল। নিম্নবর্গ আকৃষ্ট হয়েছিল সাম্রাজ্যের এশিয় অংশ থেকে আসা বিচিত্র ধর্ম ও কুসংস্কারের প্রতি। ধর্মসমূহের মধ্যে জরথুস্ট্র ধর্মজাত মিত্র-ধর্ম এবং ইহুদি ধর্মজাত খ্রিস্ট-ধর্মই ছিল প্রধান। এরা ছিল পরস্পর প্রতিদ্বন্দ্বী। প্রতিদ্বন্দ্বিতায় খ্রিস্টধর্ম এগিয়ে গিয়েছিল। কারণ, রোমান সাম্রাজ্যের দাসরা ও বিজিত জাতির জনগণ, পরাক্রান্ত রোমান সাম্রাজ্যে নিজের অবস্থা পরিবর্তনের কোনো বাস্তব সম্ভাবনা হারিয়ে ফেলেছিল। কাজেই তারা প্রতীক্ষা করতে লাগল কোনো ‘দয়াবান দেবতা’র, যিনি তাদের এ-যন্ত্রণা ঘোচাতে পারেন। খ্রিস্টধর্ম সেই প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। শুরুর দিকে অভিজাতরা দরিদ্রদের মধ্যে প্রচারিত ‘কমিউন’-এর মতো চার্চে সংগঠিত খ্রিস্টধর্মকে সন্দেহের চোখে দেখত এবং তাদের উপর অত্যাচার চালাত। পরে তারা উপলব্ধি করল, খ্রিস্টধর্ম পরলোকের কথা বলে এবং বাধ্য ও সহনশীল হতে শিক্ষা দেয়; পার্থিব কর্তৃত্বের বিরুদ্ধে বিদ্রোহকে অনুমোদন করে না। কাজেই সম্রাট কনস্তান্তিন (৩১২-৩৩৭ খ্রি.) ৩১৩ খ্রিস্টাব্দে এ-কে রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি দেন। রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতাপ্রাপ্ত খ্রিস্টধর্ম, ক্রমেই নির্যাতিতের ধর্ম থেকে নির্যাতনকারীর ধর্মে রূপান্তরিত হয়। শাসকরা জনগণের ক্ষোভকে প্রশমিত করতে একদিকে ধর্ম ও কুসংস্কারের মদত দিতেন, অন্যদিকে তাদেরকে গ্লাদিয়াতো’র দের লড়াইয়ের মতো স্থূল উত্তেজনার নেশায় মাত করে রাখতেন। সাম্রাজ্যে নতুন ধরনের চিন্তাকে নিরুৎসাহিত করা হ’ত। দাসশ্রম সহজলভ্য ও সস্তা হওয়ায়, উৎপাদনক্ষেত্রে প্রযুক্তিগত উন্নয়নের তাগিদ ছিল না। এসব কারণে রোমান যুগ সাধারণভাবে জ্ঞান-বিজ্ঞানে গ্রিক ঐতিহ্য বহন করেছে মাত্র, নতুন বিশেষ কিছু যোগ করতে পারেনি। তাদের কৃতিত্বের ক্ষেত্র, রাষ্ট্র-শাসন, আইন রচনা, বৃহদায়তন স্থাপনা এবং সভ্যতার বিস্তার।

সাধারণভাবে রোমান যুগ স্থিতিশীলতার যুগ বলে চিহ্নিত হলেও লুক্রেৎসউস-এর কালটি ছিল ঝঞ্ঝাবিক্ষুব্ধ। গ্রাক্খি ভ্রাতৃদ্বয়ের ভূমি সংস্কারের উদ্যোগ (১৩৩ খ্রি.পূ.) থেকে অক্তাভিয়ান-এর সম্রাটে রূপান্তর (৩০ খ্রি.পূ.), এ-শতকটি রোমান সাম্রাজ্যের এক ক্রান্তিকালীন শতাব্দী। তখন একদিকে চলছিল অভিজাতদের বিরুদ্ধে সাধারণ নাগরিকদের ও দাসদের তীব্র শ্রেণিসংগ্রাম এবং অন্যদিকে অভিজাতদের মধ্যে অন্তর্দ্বন্দ্ব। স্পার্তাকাসের নেতৃত্বে ইতিহাসের সবচেয়ে স্মরণীয় দাস-বিদ্রোহটি সংঘটিত হয়েছিল এ শতাব্দীতেই (৭৪-৭১ খ্রি.পূ.)। এ পর্বে স্বাধীন ক্ষুদে কৃষকের সমাজ রূপান্তরিত হয় বৃহৎ ভূস্বামীদের দাসতান্ত্রিক সমাজে। আর প্রজাতান্ত্রিক রাষ্ট্র পরিণত হয় একনায়কতান্ত্রিক সাম্রাজ্যে। এ ঝঞ্ঝাবিক্ষুব্ধ শতাব্দীটি আবার লাতিন সাহিত্যের স্বর্ণযুগও বটে। বিখ্যাত রোমান রাজনৈতিক কর্মকর্তা, বাগ্মী ও দার্শনিক মার্কুস তুল্লিউস কিকেরো (সিসেরো) (১০৬-৪০ খ্রি.পূ.), ডি রেরাম নেচুরার বস্তুসমূহের প্রকৃতি রচয়িতা তিতুস লুক্রেৎসউস কারুস (৯৯-৫৫ খ্রি.পূ.), মহাকাব্য এনেঈদ-এর রচয়িতা পুব্লিউস ভের্গিলিউস মারোনিস (ভার্জিল) (৭০-১৯ খ্রি.পূ.) এবং বিখ্যাত লাতিন গীতিকবি কুইন্তুস হোরাতিয়ুস ফ্লাক্কুস (হোরেস) (৬৫-৮ খ্রি.পূ.), এ যুগেরই সন্তান।

ভের্গেলিউস ও হোরাতিয়ুস ছিলেন লুক্রেৎসউসের চেয়ে বয়সে ছোট। আর এদের সবার বয়োকনিষ্ঠ সমসাময়িক ছিলেন আরেক বিখ্যাত লাতিন কবি, মেটামরফসিস কাব্যের রচয়িতা পুব্লিউস ওভিদিউস নসো (ওভিদ) (৪০ খ্রি.পূ.১৭ খ্রি.)। উপরে উল্লিখিত লাতিন সাহিত্যের স্বর্ণযুগের সব কবিই লুক্রেৎসউস দ্বারা প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে প্রভাবিত হয়েছিলেন। কিকেরো, ভের্গিলিউস, হোরাতিয়ুস ও ওভিদিউস তাদের জীবিতাবস্থাতেই খ্যাতির শিখরে পৌঁছেছিলেন, কিন্তু লুক্রেৎসউস-কে এজন্য অপেক্ষা করতে হয়েছে দেড় হাজার বছর। অবশ্য ততদিনে তার বিখ্যাত সহযাত্রীরা ‘প্রাচীন’ হয়ে গেছেন, কিন্তু তিনি রয়ে গেছেন ‘সমসাময়িক’। লুক্রেৎসউস-এর ‘সমসাময়িকতার’ নিদর্শন হিসাবে তার সম্বন্ধে কার্ল মার্ক্স-এর মূল্যায়নটি উল্লেখ করা যায়। ‘লুক্রেৎসউস তীক্ষ্ণ সজীব বিশ্বকাব্যাচার্য। …তার কবিতা রক্তে বান ডাকানিয়া সংগীত।’ আর তিনি যে সমসাময়িক ও পরবর্তী লাতিন কবিদেরকে প্রভাবিত করতে পেরেছিলেন, তার কারণ তিনি ছিলেন ‘খাঁটি রোমান মহাকবি। তার কবিতায় মূর্ত হয়েছে রোমান চৈতন্যের সারসত্তা। হোমার সৃষ্ট চরিত্ররা শক্তিমত্তা আনন্দোচ্ছলতা প্রভৃতি গুণাবলীতে পূর্ণ সুসমন্বিত । এরা গ্রিক চৈতন্যেরই মূর্তরূপ। এর বিপরীতে আমরা লুক্রেৎসিউস-এ পাচ্ছি, সশস্ত্র অভেদ্য নিরেট বীরদের, যাদের আর কোনো গুণ নেই (যেমন পরমাণু)। সেখানে অস্তিত্ব নিজের জন্যই অস্তিত্ববান এবং প্রত্যেকে প্রত্যেকের বিরুদ্ধে যুদ্ধমান। সেখানে আমরা এমন এক প্রকৃতিকে পাচ্ছি, যাতে ঈশ্বর নেই, আর এমন এক ঈশ্বরকে পাচ্ছি, যিনি বিশ্বের প্রতি উদাসীন।’

(এপিকুরীয় নোটবই, চতুর্থ খণ্ড- কার্ল মার্ক্স)

 

লুক্রেৎসউস-এর সমকালে প্লাতনের আকাদেমি ও আরিস্ততেলেসের লাইকিয়ুম সক্রিয় ছিল।সাম্রাজ্যের শেষ পর্যায়ে প্লাতনের দর্শন, প্লতিনস-এর (২০৪-২৭০ খ্রি.) মাধ্যমে রূপান্তরিত হয়েছিল নব্যপ্লাতনবাদে। কিন্তু রোমান সাম্রাজ্যে প্রাধান্যশীল দর্শন ছিল স্টোয়িকবাদ। রোমান রাজনৈতিক কর্মকর্তা ও দার্শনিক কিকেরো ও লুসিয়াস অ্যানিয়াস সেনেকা (খি.পূ. ৬-৬৫ খ্রি.) এবং রোমান সম্রাট মার্কস অরেলিয়স (১২১-১৮০ খ্রি.), ছিলেন স্টোয়িকবাদের প্রবক্তা। সেখানে এপিকুরিয়রা ছিল একটি ক্ষীয়মান ধারা।

লুক্রেৎসউস-এর জীবন কেটেছে রোমে। তিনি কৈশোরেই এপিকুরিয়দের সংস্পর্শে আসেন এবং তাদের দ্বারা প্রভাবিত হন। লুক্রেৎসউস তার বইটি উৎসর্গ করেছিলেন একজন রোমান অভিজাত গাইউস মেমিউস-কে। এতে শ্রোতা হিসাবেও মেমিউসকেই সম্বোধন করা হয়েছে। মেমিউস, রোমান কন্সুল ও ডিক্টেটর লুসউস কর্ণেলিউস সুল্লা-র কন্যাকে বিয়ে করেছিলেন এবং ৫৭ খ্রি.পূর্বাব্দে বিথনিয়া-র প্রদেশপাল পদে আসীন ছিলেন। উৎসর্গ-পত্রে লুক্রেৎসউস মেমিউসকে বন্ধু বলে সম্বোধন করেছেন। এতে মনে হয় লুক্রেৎসউস নিজেও ছিলেন অভিজাত। তিনি তার বইটি লেখা শুরু করেছিলেন তার মৃত্যুর দশ বৎসর আগে। এটি তিনি সম্পূর্ণ করে যেতে পারেন নি। তার মৃত্যুর পর কিকেরো এটি সম্পাদনা করে প্রকাশ করেন ৫৪ খ্রি.পূর্বাব্দে।

আমরা এপিকুরস সম্পর্কে আলোচনায় উল্লেখ করেছি, উদ্দেশ্যের দিক থেকে এপিকুরস বিপ্লবী ছিলেন না। দেবতাদের অস্তিত্বও তিনি অস্বীকার করেননি। তার উদ্দেশ্য ছিল নির্বিরোধ আনন্দময় জীবনযাপন। কিন্তু তার দর্শনের মর্মবস্তু ছিল প্রাচীন যুগ ও মধ্যযুগ সাপেক্ষে বিপ্লবাত্মক। ধর্মের প্রবক্তা কিংবা স্থিতাবস্থার সমর্থকরা তার দর্শনের এ-দিকটি পাঠ করতে ভুল করেননি। ইহুদি ধর্মযাজকরা তাকে এতই ঘৃণা করতেন যে, এখনও হিব্রু ভাষায় ‘এপিকুরিয়ান’ শব্দটি একটি গালিবিশেষ। খ্রিস্ট ধর্মের স্থপতি সেন্ট পল্ দর্শনকে ধর্মের জন্য ক্ষতিকর বলে চিহ্নিত করেন। আলেকজান্দ্রিয়ার ক্লিমেন্ট এর ব্যাখ্যা দেন, সেন্ট পলের মূল লক্ষ্য এপিকুরিয় দর্শন। কারণ একমাত্র এপিকুরিয় দর্শনই কোনোরকম ঐশ্বরিক করুণা বা হস্তক্ষেপের বিষয়টি সমর্থন করে না। খ্রিস্টিয় ধর্মগুরুরা এপিকুরসের উল্লেখ করতেন ‘শুকর’ বলে। সমগ্র মধ্যযুগে এপিুকরস ছিলেন নিষিদ্ধ ধর্মদ্রোহী। দান্তে (১২৬৫-১৩২১ খ্রি) তার কমেডিয়া মহাকাব্যে এপিকুরিয়দের স্থান নির্ধারণ করেন নরকের ষষ্ঠ চক্রে (inferno), অন্য ধর্মদ্রোহীদের সঙ্গে। চার্চ সর্বপ্রযত্নে তার দর্শনের চিহ্ন মুছে ফেলতে উদ্যোগী হয়। প্লাতন চেয়েছিলেন দেমক্রিতস-এর সব রচনা ধ্বংস করতে। প্লাতন-এর উত্তরসূরিরা দেমক্রিতস-এর উত্তরসূরীদের উপর তার ইচ্ছাটি কার্যকর করেছিলেন।

তাদের অজান্তে লুক্রেৎসউস লিখিত বিখ্যাত কবিতা De Rerum Natura-র (বস্তুসমূহের প্রকৃতি) একটি কপি ধ্বংসযজ্ঞ থেকে রক্ষা পায়। ১৪১৭ খ্রিস্টাব্দে জার্মানির একটি খ্রিস্টিয় মঠ থেকে এটিকে আবিষ্কার করে এর পুনঃপ্রচার শুরু করেন ইতালিয় পণ্ডিত ও মানবতাবাদী পোগগিও ব্রাক্কিওলিনি (১৩৮০-১৪৫৯)। পোগগিও ছিলেন পোপের সচিব। পুরানো পুঁথি সংগ্রহ ছিল তার নেশা। শীঘ্রই এর বিপুল সংখ্যক প্রতিলিপি সমগ্র ইউরোপে ছড়িয়ে পড়ে। বিভিন্ন ইউরোপিয় ভাষায় গদ্যে ও পদ্যে এর অনুবাদ হয় এবং একের পর এক সংস্করণ প্রকাশিত হয়। সাধারণ্যে রেনাসাঁ থেকে এনলাইটেনমেন্ট পর্যন্ত এটিই ছিল এপিকুিরয় দর্শনের প্রধান প্রণালিবদ্ধ নির্ভরযোগ্য উৎস। অন্য উৎসটি দিঅগেনেস লাএরতিয়স-এর (খ্রিস্টিয় তৃতীয় শতাব্দী) রচনা। কেবলমাত্র ঊনবিংশ শতাব্দী নাগাদ গবেষকগণ এপিকুরিয় দর্শনের অন্যান্য নিদর্শন আবিষ্কার করতে সক্ষম হন।

 

২। বস্তুসমূহের প্রকৃতি (De Rerum Natura)

আগেই উল্লেখ করেছি, লুক্রেৎসউস রচিত এ মহৎ কাব্যটিই এপিকুরিয় দর্শনের সবচেয়ে সুসংবদ্ধ প্রামাণিক এবং প্রভাব বিস্তারকারী রচনা। কাব্যটির ছয় খণ্ড এ-পর্যন্ত সংরক্ষিত আছে। এতে পঙ্ক্তির সংখ্যা ৭৪০০টি। লাতিনে রচিত শিক্ষামূলক এ কাব্যের শৈলী ‘ষট্পার্বিক চরণ’ (hexameter verse)। অর্থাৎ এর প্রতি পংক্তিতেই ছয়টি পর্ব। এ বিশিষ্ট কাব্যশৈলীটি ধ্রুপদী গ্রিক ও লাতিন মহাকাব্যে বহুব্যবহৃত শৈলী। এ কাব্যে লুক্রেৎসউস, এপিকুরস-এর On Nature রচনাটি অনুসরণ করেছেন। এতে এপিকুরিয় দর্শনের ভৌত, মানসিক ও জ্ঞানতাত্ত্বিক বিষয়াবলী আলোচিত হয়েছে, বাদ পড়েছে নীতি-দর্শন। আমরা কাব্যটির (ইংরেজি অনুবাদের) সূচিপত্র সংযুক্ত করলাম। এতে এর আলোচ্য বিষয়ের স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যাবে:

 

Book- I
Poem
Substance is Eternal
The Void
Nothing Exists Per Se Except Atoms and the Void
Character of the Atoms
Confutation of Other Philosophers
The Infinity of the Universe

Book- II
Poem
Atomic Motions
Atomic Forms and Their Combinations
Absence of Secondary Qualities
Infinite Worlds

Book- III
Poem
Nature and Composition of the Mind
The Soul is Mortal
Folly of the Fear of Death
Cerberus and Furies, and that Lack of Light

Book- IV
Poem
Existence and Character of the Images
The Senses and Mental Pictures
Some Vital Functions
The Passion of Love

Book- V
Poem
Argument of the Book and New Poem Against Teleological Concept
The World is Not Eternal
Formation of the World and Astronomical Questions
Origins of Vegetables and Animal Life
Origins and Savage Period of Mankind
Beginnings of Civilization
Book- VI
Poem
Great Meteorological Phenomena, Etc
Extraordinary and Paradoxical Telluric Phenomena
The Plague Athens

 

প্রতিটি খণ্ডের শুরুতে একটি ভূমিকা (Poem) এবং তারপর অধ্যায় ভাগ করে বিষয় ভিত্তিক আলোচনা। প্রথম দুটি খণ্ডে আলোচিত হয়েছে পরমাণু-তত্ত্ব এবং মহাবিশ্ব। তৃতীয় ও চতুর্থ খণ্ডের বিষয় মন ও আত্মা, মানসিক প্রক্রিয়া এবং প্রজনন প্রক্রিয়া। পঞ্চম খণ্ডে বর্ণনা করা হয়েছে পৃথিবীর উৎপত্তি, জীবনের উদ্ভব ও বিবর্তন, মানুষের উদ্ভব ও মানবসমাজের বিবর্তন। ষষ্ট খণ্ডের আলোচ্য আবহাওয়া, পৃথিবীর ব্যতিক্রমী ও হতবুদ্ধিকর প্রাকৃতিক ঘটনাবলী এবং আথিনায় প্লেগের আক্রমণ। কাব্যটি এখানেই আকস্মিকভাবে শেষ হয়ে গেছে। আমরা আগেই উল্লেখ করেছি, লুক্রেৎসউস এটি সমাপ্ত করে যেতে পারেন নি।

 

লুক্রেৎসউস তার সমসাময়িক ভের্গেলিউস-এর মতো কোনো সম্রাট বা দেবতার বন্দনা করেননি। তিনি জীবনবাদী বস্তুবাদী এপিকুরসের জয়গান গেয়েছেন। তিনি এপিকুরসের দর্শন দ্বারা উদ্বুদ্ধ হয়েছিলেন এবং তার যথাযথ মূল্যায়ন করেছিলেন:

‘তোমাকে আমি অনুসরণ করি

তুমিই সেই ব্যক্তি যে

ছিদ্রহীন অন্ধকারে জীবনের জন্য

উজ্জ্বল আলোকবর্তিকা তুলে ধরেছিলে।’

 

কবি লুক্রেৎসউস-এর অমর কীর্তি এই যে, তিনি এপিকুরসকে নতুনভাবে মানুষের মহৎ ঐতিহ্যের উপাদানে পরিণত করে গেছেন। এপিকুরসকে ইতিহাসের মধ্যে ধরে রেখেছেন। তাই তার কবিতায় যে প্রশস্তি তিনি এপিকুরসের প্রতি নিবেদন করেছেন তা আজও আমাদের মনে একটি সতেজ জীবনবোধের সৃষ্টি করে। কবি বলেছেন :

‘সেদিন যখন

ধরাপৃষ্ঠে মানুষের জীবন ছিল

ধর্মের নিষ্ঠুরতায় নিষ্পিষ্ট, পদদলিত।

যখন

ঊর্ধ্বদেশের স্বর্গ থেকে ভাগ্যদেবী

মরলোকের মানুষের দিকে তার মুখ ব্যাদান করছিল

সেদিন

গ্রিসের সেই একটি মানুষই

তার নির্ভয় দৃষ্টি নিক্ষেপ করেছিল নিষ্ঠুরা সেই দেবীর মুখে।

হ্যাঁ, একটি মানুষ।

সে মানুষ অস্বীকার করেছিল দেবতাকে, দেবীকে।

তার সম্মুখে দাঁড়িয়েছিল সে নিষ্কম্প পদভরে

নিষ্কম্প হৃদয়ে।

দেবতাদের কাহিনি,বর্জ্ররে নির্ঘোষ কিংবা ঊর্ধ্ব লোকের দ-ের হুঙ্কার

পারেনি তার উন্নত শিরকে আনত করতে,

তার বিদ্রোহের অগ্নিকে নির্বাপিত করতে।

বরঞ্চ সেই মানুষটির আত্মা

সকল ভ্রুকুটিকে উপেক্ষা করে

অমিত তেজে কৃপাণ হয়ে

ঝলসে উঠেছিল।

আর ঘোষণা করেছিল,

প্রকৃতির রহস্যের রুদ্ধদ্বারকে ভেঙ্গে,

আলোকের অভিসারকে অবারিত করার দুর্বার প্রতিজ্ঞা।

এবং

সেই মানুষটি

সেই দুর্বার প্রতিজ্ঞা,

তার আত্মার অমিত তেজ জয়ী হল।

বিজয়ী সে আত্মা অগ্রসর হল

সম্মুখের দিকে।

সে অতিক্রম করে গেল

পৃথিবীর অগ্নিময় প্রাচীরকে

তার আত্মা

দিকদিগন্ত পরিভ্রমণ করল।

বারণহীন হল তার গতি

সীমাহীন বিশ্বে।

এবং সবশেষে

সেই মানুষটি, তার আত্মা, তার সাহস, তার তেজ, তার প্রজ্ঞা

বিজয়ী হয়ে ফিরে এল আমাদের কাছে।

সে আমাদের দৃষ্টি দিল,

আমাদের সে জ্ঞান দিল

অস্তিত্বের রহস্যের।

আমরা জানলাম বস্তুর প্রকৃতি কী,

তার নীতি কী,

তার অস্তিত্বের সীমা কী।

আর তাই আজ সেই দলিত,

পিষ্ট মানুষের পায়ের নিচে,

সেই মানুষের পদতলে

যে মানুষকে সে দাস বানিয়েছিল একদিন,

সেই দেবতা, সেই ধর্ম।

স্বর্গ থেকে দেবতা আজ চ্যুত,

স্বর্গকে আজ দখল করেছে মানুষ

সুউচ্চ স্বর্গ বিজয়ী মানুষ,

তার বিজয় দণ্ড আজ স্বর্গলোকে সমুদ্যত।’

 

এরপর লুক্রেৎসউস পৌরাণিক গ্রিক দেবতা ও বীরদের বিবরণ দিয়েছেন, যারা কোনো পৌরাণিক জন্তু বা দৈত্যকে হত্যা করেছেন, কিংবা মানুষকে শিখিয়েছেন চাষাবাদ বা মদিরা প্রস্তুত প্রণালি বা এরকম অন্যকিছু। তারপর বলেছেন এসব কীর্তি থেকেও এপিকুরসের কীর্তি মহৎ। কারণ বনে-জঙ্গলে-পাহাড়ে-পর্বতে এখানও নানারকম ভীতির কারণ বর্তমান আছে। কিন্তু এসবের হাত থেকে আত্মরক্ষার উপায় এখন আমাদের আয়ত্তে রয়েছে। কিন্তু আমাদের অন্তঃকরণের ভার যদি লাঘব না হতো, তবে আমাদের কতই না বিপদ দেখা দিত এবং আমাদের কতই না সংগ্রাম করতে হতো। জৈবিক ক্ষুধা ও লালসায় উদ্বিগ্ন হয়ে আমরা কতই না বিপদ ও আশঙ্কায় জীবনযাপন করতাম। আর অহংকার, ক্ষুধা, উচ্ছৃঙ্খলতা, বিলাসিতা ও অলসতা এগুলোর জন্য কতই না সঙ্কটাপন্ন জীবনযাপন করতে হতো। বাহুবলে নয়, যুক্তিবলে যিনি আমাদের মন থেকে এগুলো দূর ও দমন করার ব্যবস্থা করেছেন, তিনি দেবতাদের কাতারে শামিল হওয়ার অধিকারী নন কি? তার শ্রেষ্ঠত্বের আরও প্রমাণ এই যে তিনি ঈশ্বরসুলভ সুন্দর ভাষায় আমাদের মূল্যবান উপদেশ দিয়েছেন এবং বস্তুর সকল প্রকৃতি সম্পর্কে আমাদের শিক্ষাদান করেছেন।

লুক্রেৎসউসের ভাষায়:

‘কিন্তু কেমন করে ধারণ করতাম আমরা আমাদের জীবনকে,

যদি সেই মানুষটি

আমাদের বক্ষ থেকে নিষ্কাশিত না করত

মৃত্যু ও দেবতার ভীতিকে?

আমরা শিকার হতাম

সহস্র বাসনার,

অহঙ্কার ও হীনতা

লালসা ও আত্মরতি

এবং পৌনঃপুনিকতার ক্লান্তি

আমাদের জীবনকে

শত আঘাতে বিদীর্ণ করত।

কিন্তু সেই মানুষটি

মুক্ত করেছে মানুষকে

এই হিংস্র প্রকৃতির আঘাত থেকে।

কোনো শানিত কৃপাণ দিয়ে নয়,

প্রজ্ঞার শক্তিতে।

আর তাই

আসন যদি উচ্চ হয় দেবতার

উচ্চ হবে মানুষের মুক্তিদাতা এই মানুষটির আসন

দেবতাদের সেই সুউচ্চ সারিতে।’

 

এপিকুরিয়দের প্রতি বিরোধীদের আনীত ‘নীতিহীনতার’ অভিযোগটি সম্বন্ধে লুক্রেৎসউস সচেতন। তাই তিনি বলেন, ‘আমার ভয় এই যে, সবাই মনে করতে পারেন, আমি যুক্তির পথ অনুসরণ করে পাপের রাজ্যে পৌঁছাতে চাই।’ কিন্তু সেই সঙ্গে তিনি পাঠককে একথাও স্মরণ করিয়ে দেন যে, ‘তার যুক্তি নয় বরং ধর্মই পাপের জন্ম দেয়। এবং অপবিত্র ও খারাপ কাজে মানুষকে উৎসাহ যোগায়।’ ধর্মের নামে যে কত খারাপ কাজ করা হয়, তার প্রমাণ হিসাবে আওলিস-এর দানাই গোত্রের একটি প্রচলিত প্রথার দৃষ্টান্ত তুলে ধরেন তিনি। একটি অবাধ, সুখী ও সফল সমুদ্রযাত্রা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে দানাই গোত্রের প্রধানগণ, দেবতার সামনে ইফিজিনিয়া নামের এক সুন্দরী ক্রীতদাসীকে বলি দেওয়ার আয়োজন করেন। বেদির চারপাশে জমায়েত অশ্রুভারাতুর জনতার সামনে, ইফিজিনিয়ার বাবা দুঃখ-ভারাক্রান্ত মনে, ভয়ে কম্পমান নিজের মেয়ের মাথাটি ধড় থেকে আলাদা করেন। রক্তে সমস্ত বেদিটা লাল হয়ে যায়।লুক্রেৎসউস কেন প্রকৃতিকেই তার কাব্যের বিষয় করেছেন, তারও উত্তর দিয়েছেন। তিনি বিশ্বাস করেন, মানুষকে সুখী করতে হলে,মানুষের মনের আতঙ্ক ও অন্ধকার দূর করাটাই সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন।মানুষের মনে যে আতঙ্ক ও অন্ধকার বাসা বেঁধেছে, সূর্যরশ্মি বা দিনের উজ্জ্বল আলোয় তা দূর হবে না। কেবলমাত্র প্রকৃতির বাহ্যরূপ এবং এর অন্তর্নিহিত নিয়ম সম্বন্ধে যথাযথ জ্ঞানই তা দূর করতে পারে:

 

‘Therefore this terror and darkness of the mind
Not by the sun’s ray’s, nor the bright shafts of the day,
Must be dispersed, as is most necessary,
But by the face of Nature and her laws.’

এবার আমরা বস্তুসমূহের প্রকৃতি কাব্য থেকে কিছু কিছু অংশ উদ্ধৃত করব, লুক্রেৎসউস-এর বক্তব্য এবং তার চিন্তাপ্রণালি অনুধাবনের জন্য। এর মধ্যে কতটুকু তার নিজের উদ্ভাবন আর কতটুকু পরমাণুবাদী ঐতিহ্য থেকে পাওয়া, তা নির্ণয় করা সম্ভব নয়।

 

২.১। প্রথম খণ্ড

রোমান প্রেমের দেবী ভেনাসকে প্রশংসা করে লুক্রেৎসউস প্রথম খণ্ড-টি শুরু করেছেন। তারপর দুই আদি সত্তা বস্তু ও শূন্যতার অস্তিত্ব প্রমাণ প্রসঙ্গে এসেছেন। ‘যেহেতু শূন্য থেকে কিছুই উৎপন্ন হয় না, সুতরাং আমরা আরও  দৃঢ়ভাবে এই সিদ্ধান্তে আসতে পারি যে, নিশ্চয়ই এমন কোনো বস্তু আছে, যা সকল বস্তুতে উপস্থিত থাকে; সকল বস্তু সেই মৌলিক বস্তু থেকে প্রস্তুত এবং তা তৈরি হতে ঈশ্বরের কোনো সাহায্যের দরকার হয় না।’

কেন এরকম কোনো বস্তুর অস্তিত্ব স্বীকার করা প্রয়োজন, এ প্রসঙ্গে লুক্রেৎসউসের যুক্তি : ‘যদি শূন্য থেকে কোনো কিছুর সৃষ্টি সম্ভব হয়, তাহলে যে-কোনো বস্তু থেকে যে-কোনো বস্তু সৃষ্টি হতে পারে। কোনোকিছুর জন্য কোনো বীজের দরকার হবে না। তাহলে সমুদ্র থেকে মানুষের জন্ম হতে পারে। আকাশ থেকে পাখির জন্ম হতে পারে। তাহলে একই গাছে একই ফল ধরত না। যে-কোনো গাছে যে-কোনো ফল ধরত। কোনোকিছুর নির্দিষ্ট একজন জন্মদাত্রী মা থাকতো না। সুতরাং আমাদের স্বীকার করতেই হবে যে, শূন্য হতে কোনোকিছুই সৃষ্টি হতে পারে না। সুতরাং সকল বস্তুর যেমন শুরু আছে, তেমনি সকল বস্তুর একটি বীজ আছে। আমরা দেখতে পাই যে অচাষকৃত জমি অপেক্ষা চাষ করা জমিতে অধিক ফসল ফলে। এ থেকে আমরা এ রকম সিদ্ধান্তে আসতে পারি যে, পৃথিবীতে আদিবস্তু বলে কিছু আছে, যা যতেœর সাহায্যে বিভিন্ন বস্তুতে পরিণত হয়। তদুপরি প্রকৃতিতে সব বস্তুই সেই আদি বস্তুতে ফিরে যেতে চায়। প্রকৃতি আদি বস্তুকে ধ্বংস করে না। সত্যি কথা বলতে কি, ধ্বংসযোগ্য নয় এমন এক বস্তু দ্বারাই সকল ধ্বংসযোগ্য বস্তু গঠিত। প্রকৃতির সকল আদি বস্তুই মানুষের চোখের অন্তরালে অদৃশ্য অবস্থায় থাকতে পারে। কেননা সেই মৌলিক বীজটি এতই ছোট যে তা চোখে দেখা যায় না। যেমন বায়ু, বাষ্প চোখে দেখা যায় না।’ তাই লুক্রেৎসউস বলেন, ‘প্রকৃতি অদৃশ্য বস্তুর মাধ্যমে কাজ করে।’

লুক্রেৎসউস মনে করতেন যে প্রতিটি বস্তুর মধ্যে শূন্যতা (Void) রয়েছে। অর্থাৎ প্রতিটি বস্তুতে অতিক্ষুদ্র অদৃশ্য ছিদ্র রয়েছে। ‘তা যদি না থাকত, তাহলে দেয়াল ভেদ করে কথা আসত না, কিংবা বরফের শৈত্য শরীর ভেদ করে হাড়ে আঘাত করত না। যদি শূন্য না থাকত, তাহলে আমরা বিভিন্ন ওজনের জিনিস দেখি কেন? সমপরিমাণ তুলা ও সিসার ওজন সমান হয় না কেন? এক বস্তা তুলার ওজন ছোট এক টুকরা সিসার ওজনের সমান হয় কেন? কারণ তুলার মধ্যে ‘শূন্যের’ সংখ্যা প্রচুর, সিসার মধ্যে কম। তাই এই ওজনের হেরফের। এতে প্রমাণ হয় ‘শূন্যের’ কোনো ওজন নেই।’

‘সুতরাং বস্তুর মৌল কণার সঙ্গে ‘শূন্যের’ সম্পর্ক আছে। সুতরাং আমরা এই সিদ্ধান্তে আসতে পারি যে, প্রকৃতি দুটি সত্তার মধ্যে অস্তিত্বশীল। এক, বস্তু; দুই, শূন্য। শূন্যের মধ্যে বস্তু স্থাপিত এবং শূন্যের মধ্যে সেগুলো চলাফেরা করে। প্রকৃতির এই লুক্কায়িত অদৃশ্য বস্তু ও শূন্য, মানুষ তার যুক্তি দিয়ে উপলব্ধি করতে পারে। ক্রীতদাস প্রথা, দারিদ্র্য, ঐশ্বর্য, স্বাধীনতা, যুদ্ধ এবং অন্য সবকিছুই ক্ষণস্থায়ী- আসে আর যায়; কিন্তু বস্তুর প্রকৃতি চিরস্থায়ী। তার কোনো ধ্বংস নেই। সময় নিজেও নিজে থেকে অস্তিত্ববান নয়। বস্তুই সময় নির্ধারণ করে। অতীতে কি ছিল, কি ঘটনা ঘটেছিল, বর্তমানে কি আছে এবং ভবিষ্যতে কি থাকবে বা হবে; সবই বস্তুর অস্তিত্ব দ্বারা নির্ধারিত হয়। যেহেতু আমি প্রমাণ করেছি যে শূন্য থেকে কিছুই সৃষ্টি হয় না এবং যা সৃষ্টি হয়েছে তা পুনরায় শূন্যে ফিরে যেত পারে না। শুরুতে যে বস্তু সৃষ্টি হয়েছিল, তা অবশ্যই অবিনশ্বর। সব বস্তু সেই আদি বস্তুতেই মিলিত হয় এবং তা থেকে বৈচিত্রময় প্রকৃতির জন্ম হয়। সুতরাং সেই আদি বস্তু একটি কঠিন সত্তা, যা ভাঙা যায় না।’

 

২.২। দ্বিতীয় খণ্ড

দর্শন ও বিজ্ঞান, যেসবের মাধ্যমে আমরা প্রকৃতির নিয়ম জানতে পারি, তারই প্রশস্তি দিয়ে শুরু হয়েছে দ্বিতীয় খণ্ড। এ খণ্ডের মূল প্রতিপাদ্য বিষয় পরমাণুর গতি। এ গতির মূলে ঈশ্বরের কোনো ভূমিকা নেই। পরমাণুর গতি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেছি ‘এপিকুরস ও হেলেনিয় যুগ’ এবং ‘মার্ক্সের এপিকুরস’ প্রবন্ধে। এখানে উদ্ধৃত করেছি পড়ন্ত বস্তুর নিয়ম।

‘শূন্যতা কখনও কোনো কিছুর গতিপথে কোনোরকম প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে না। তাই প্রকৃতির নিয়ম অনুসারে বস্তু অবিরাম গতিতে এগিয়ে যায়। সে কারণেই বিভিন্ন ওজনের বিভিন্ন বস্তু সমান গতিতে অবাধ শূন্যের মধ্যে পরিচালিত হয়।’ অর্থাৎ শূন্যের মধ্যে ভারী ও হাল্কা বস্তু সমান গতিতে নিচে এসে পড়বে। এটা প্রমাণ করার জন্য তিনি নিম্নলিখিত যুক্তিধারা অনুসরণ করেন। ‘যারা মনে করেন ভারী জিনিস হাল্কা জিনিস থেকে অনেক দ্রুতগতিতে পতিত হয়, তারা সত্যিকারের যুক্তির পথ থেকে অনেক দূরে অবস্থান করেন। যেমন কোনো বস্তু যখন পানি বা পাতলা বায়ুর মধ্য দিয়ে পতিত হয়, তখন অবশ্যই তাদের ওজন অনুসারে যে বস্তু ভারী তা দ্রুতগতিতে পড়বে। কারণ পানি বা বায়ু পড়ন্ত বস্তুকে বাধা দেয়। যেহেতু পানি ও বায়ুর ঘনত্ব সমান নয়, সেজন্য পানি ও বায়ুতে একই বস্তুর গতি সমান হবে না। ভারী জিনিস পানির মধ্যে যে গতিতে নিচে পড়বে, সেই একই বস্তু বায়ুর মধ্যে আরও দ্রুত গতিতে নিচে পড়বে। কেননা পানি ও বায়ুর চেয়ে পড়ন্ত বস্তুটিকে বেশি বাধা দিবে। শূন্যতা যেহেতু কোনো বাধা দিতে পারে  না, তাই শূন্যে ভারী ও হালকা বস্তু সমান গতিতে নিচে পতিত হয়।’

আরিস্ততেলেস শূন্যতার অস্তিত্বে বিশ্বাস করতেন না। তাই তিনি আমরা প্রাত্যহিক অভিজ্ঞতায় যা দেখি, (ভারী বস্তু হালকা বস্তুর তুলনায় দ্রুত পতিত হয়), তা-ই সদা সত্য বলে মানতেন। আরিস্ততেলেস-এর প্রজ্ঞায় নিচ্ছিদ্র বিশ্বাসী মধ্যযুগীয় পণ্ডিতেরা (তিনি মুসলিম, ইহুদি বা খ্রিস্টান, যাই হোন না কেন), সেই ধারণাটি আধুনিক বিজ্ঞানের সূচনা পর্যন্ত ধরে রেখেছিলেন। গ্যালিলিও পিসার হেলানো মিনার থেকে একই ধাতুতে তৈরি ছোট ও বড় (হাল্কা ও ভারি) গোলক ছেড়ে দিয়ে প্রমাণ করেন, ভারি ও হাল্কা উভয় বস্তুই সমান গতিতে নিচে পড়ে।

 

২.৩। তৃতীয় খণ্ড

তৃতীয় খণ্ডের শুরুতেই তিনি গ্রিক জাতির গৌরব এপিকুরস-এর প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। কারণ তিনিই সর্বপ্রথম অজ্ঞতার অন্ধকার দূর করে আলোর পথ দেখিয়েছিলেন। লুক্রেৎসউস বর্ণনা করেন: মানুষ অজ্ঞতার জন্য জীবনভর কী দুর্ভোগ পোহায়। মানুষেরা চরম দুঃখের দিনে, তাদের অজ্ঞতার জন্য ধর্মে আত্মসমর্পণ করে। এই সুযোগ নিয়ে ধর্মব্যবসায়ীরা তাদেরকে প্রতারিত করে ও আজ্ঞাবহে পরিণত করে। লুক্রেৎসউস এটিও লক্ষ্য করেন, ‘সন্দেহ ও বিপদের মধ্যে আপনি মানুষকে ভালোভাবে চিনতে পারবেন, প্রতিকূল অবস্থার মধ্যে আপনি মানুষ চিনতে পারবেন। কারণ তখন কেবল তার অন্তরের গভীরতম প্রদেশ থেকে সত্য বেরিয়ে আসে। মুখোশ খুলে পড়ে; বাস্তবতা মুখ ব্যাদান করে বেরিয়ে আসে।’ তারপর তিনি আলোচনা করেন মন, আত্মা, মৃত্যু এবং মৃত্যুর পরবর্তী জীবন নিয়ে ধর্মব্যবসায়ীদের রচিত বিভিন্ন ভয় দেখানো কাহিনি সম্বন্ধে।

‘আমি এখন যা বলব তা হলো মন ও আত্মা একীভূত অবস্থায় থাকে। বুকের ঠিক মাঝখানটায় মন ও উপলব্ধির স্থায়ী আসন নির্ধারিত। এখানে আশঙ্কা ও বোধশক্তি ধুকধুক করে। আবার এখানেই বাস করে আনন্দ ও শান্তি। সুতরাং এখানে বাস করে মানুষের বোধশক্তি ও মন। অবশিষ্ট আত্মা সমস্ত শরীরে ছড়িয়ে থাকে। মনের নির্দেশ মেনে চলে এবং ইচ্ছামতো শরীরের বিভিন্ন অংশে ঘুরে বেড়ায়। যখন আমাদের কোনো বিশেষ অঙ্গ অসুস্থ হয়ে পড়ে, যেমন হাত-পা-মাথা-চোখ ব্যথায় কাতর হয় আমরা একই সঙ্গে সে ব্যথা শরীরের সর্বত্র অনুভব করি না। আবার মন যখন দুঃখে ভারাক্রান্ত হয় কিংবা আনন্দে উৎফুল্ল হয়, তখন সমগ্র অঙ্গপ্রত্যঙ্গ সে দুঃখে কাতর হয় না বা আনন্দে উৎফুল্ল হয় না। কিন্তু মনটা যখন ভীষণভাবে আতঙ্কিত হয়, তখন সে আতঙ্ক একই সঙ্গে সারা শরীরের প্রতিটি অঙ্গপ্রত্যঙ্গে ছড়িয়ে পড়ে। সারা শরীর ঘেমে ওঠে। সর্বশরীর ভয়ে সাদা হয়ে যায়। জিহবা জড়িয়ে আসে। গলা থেকে স্বর বের হতে চায় না। চোখ ঝাপসা হয়ে আসে। কানে ঝিঁ ঝিঁ পোকা ডাকে। হাত-পা সব সেঁধিয়ে যায়। সংক্ষেপে বলতে হয় মনের ভয়ে মানুষ মৃতপ্রায় হয়ে পড়ে। সুতরাং যে কেউ এ সিদ্ধান্তে আসতে পারে যে আত্মা মনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত। মনের প্রহারে আত্মা জর্জরিত হয়, সঙ্গে সঙ্গে তা শরীরকেও আক্রান্ত করে।’

‘একই তত্ত্ব আমাদের এই শিক্ষা দেয় যে মন ও আত্মার প্রকৃতি দেহগত। কারণ মানুষ যখন ঘুমিয়ে থাকে, তখন অঙ্গুলির এক খোঁচায় তার ঘুম ভেঙে যায়। তখন তার মুখের অভিব্যক্তির পরিবর্তন হয়। কিন্তু আমরা যখন দেখি যে স্পর্শ ছাড়া তার মধ্যে তেমন কোনো প্রতিক্রিয়া হয় না, তখন কি আমাদের এমন মনে হয় না যে মন ও আত্মার প্রকৃতি দেহগত? আবার আপনি নিশ্চয়ই বুঝতে পারেন যে, আমাদের শরীরের খাঁচার মধ্যে মনটা শরীরের সাথে একই রকম দুঃখে ভারাক্রান্ত হয় কিংবা আনন্দে উল্লসিত হয়। আবার শরীরের মধ্যে যদি তীক্ষ্ম একটি অস্ত্র ঢুকিয়ে দেয়া যায়, তাতে যদি জ্ঞান হারিয়ে মাটিতে পড়ে যাই, মাটিতে পড়ে আমাদের মনটা দারুণভাবে পীড়িতবোধ করে। সুতরাং মনের প্রকৃতি অবশ্যই দেহগত। কারণ শরীরে আঘাত করলে তা মনকেও আঘাত করে, মনকে পীড়া দেয়।’

‘এবার আমি ব্যাখ্যা করব কি ধরনের বস্তু দ্বারা মন গঠিত এবং কিসের থেকে মনের সৃষ্টি। প্রথমেই বলব যে, মন অত্যন্ত ক্ষুদ্র ও সূক্ষ বস্তু দ্বারা গঠিত। আপনি সহজেই ধারণা করতে পারবেন যে, যা দেখা যায় না, তা মনের গতির সমান গতিতে যাতায়াত করে। যা চোখে দেখা যায় মনের গতি তার চাইতে অনেক বেশি। সুতরাং যার গতি এত প্রচণ্ড, যা এত বেশি তৎপর, তা অবশ্যই অতি সূক্ষ ও মসৃণ গোলাকৃতি বস্তু দ্বারা গঠিত। সামান্য শক্তিতে তা দ্রুতগতি প্রাপ্ত হয়। পানি ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র কণা দ্বারা গঠিত, যা সহজেই গড়িয়ে যেতে পারে। সামান্য শক্তি প্রয়োগে তা অতি দ্রুতগতিতে গড়িয়ে যেতে পারে। কিন্তু মধু তা পারে না। কারণ মধুর প্রকৃতি অনেক বেশি জমাট বাঁধা। নিশ্চয়ই তার প্রকৃতি মসৃণ, সূক্ষ ও গোলাকার  নয়।’

‘কোনো মানুষ যখন মৃত্যুর প্রশান্ত ঘুমের কোলে ঢলে পড়ে এবং মন ও আত্মা দেহত্যাগ করে, তখন আপনি লক্ষ্য করবেন যে তার দেহের আকৃতি ও ওজনের সামান্য হ্রাসপ্রাপ্ত হয় না। মৃত্যু তার দেহের অপরিহার্য উপলব্ধি এবং তাপ ছাড়া অন্য সবকিছুই অপরিবর্তিত রাখে। সুতরাং এতে প্রমাণ হয় যে সমগ্র আত্মা অতিশয় ক্ষুদ্র বীজ দ্বারা গঠিত, যা দেহের শিরা উপশিরা, মাংস ও পেশির সাথে মিশে থাকে। মৃত্যুর পর সমস্ত দেহ থেকে তা যখন অপসারিত হয় বা দেহ ত্যাগ করে, তখন অঙ্গপ্রত্যঙ্গের পূর্বের সীমারেখা অক্ষুন্ন থাকে; ছোট হয়ে যায় না এবং বিন্দুমাত্র ওজন কমে না। একই রকমভাবে যখন মদের সুগন্ধি নষ্ট হয়ে যায়, কিংবা কোনো সুগন্ধির মনোরম সৌরভ বাতাসে উড়ে যায়, কিংবা কোনো জিনিসের ঘ্রাণ বা স্বাদ তার দেহত্যাগ করে, তখনও সেসব বস্তুকে চোখে ছোট মনে হয় না। কিংবা তার ওজন কমে না। কারণ ওইসব সুগন্ধি, ঘ্রাণ, স্বাদ বা সৌরভ যেসব বস্তু দ্বারা গঠিত, সেগুলো অতিশয় ক্ষুদ্র ও সূক্ষ। এভাবে আমি বার বার প্রমাণ করেছি, মন ও আত্মা অতিশয় ক্ষুদ্র ও সূক্ষ বস্তু দ্বারা গঠিত। তাই তা দেহত্যাগ করলে বিন্দুমাত্র ওজন সঙ্গে করে নিয়ে যায় না।’

‘বিভিন্ন বিষয়ে মানুষের প্রকৃতি ও মেজাজের বিভিন্নতা আমরা অস্বীকার করি না। যদিও এই মুহূর্তে এই বিভিন্নতার কারণ সম্পর্কে কিছু বলতে পারব না। তবে আমি এ ব্যাপারে নিশ্চিত যে, আদিম প্রকৃতির যেটুকু আমাদের মধ্যে রয়ে যায়, যুক্তি দিয়ে তা দূর করা যায় না একথা ঠিক, কিন্তু তার পরিমাণ এতই কম যে, তা আমাদেরকে দেবতার মতো পূতপবিত্র জীবনযাপন থেকে সরিয়ে নিতে পারে না।’

‘আদিতে দেহ ও আত্মা একত্রে সৃষ্টি হয়েছিল। দেহ ও আত্মা পরস্পরের সঙ্গে জড়িত ছিল। কাজেই এটা সত্য কথা যে, দেহ ও আত্মার প্রকৃতিকে আলাদা করা যায় না। একের অস্তিত্ব ছাড়া অপরের অস্তিত্ব সম্ভব নয়। সুতরাং কোনো অনুভূতি উভয়ের দ্বারা অনুভূত হওয়ার ব্যাপার। অনুভূতি আমাদের দেহে প্রজ্বলিত হয়। কিন্তু তা উভয়ের যৌথ ব্যাপার। তদুপরি মৃত্যুর পর আত্মাহীন দেহ যেমন বৃদ্ধিলাভ করতে পারে না, তেমনি তার অস্তিত্ব রক্ষা করতে পারে না।’

‘যেহেতু তাদের অস্তিত্বের কারণ তাদের উভয়ের উপর নির্ভর করছে, সুতরাং তাদের প্রকৃতিও তাদের উভয়ের যৌথ অস্তিত্বের ওপর নির্ভরশীল। তেমনি দেহ ছাড়া মন তার অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে পারে না। শরীর মনের পাত্র হিসেবে কাজ করে। আপনি চিন্তা করলে দেখতে পাবেন যে, দেহের সঙ্গে মনের সম্পর্ক ঘনিষ্ঠতর। দেহ ও মন ঘনিষ্ঠভাবে বাঁধা।’

‘পুনরায়, যদি আত্মার প্রকৃতি অবিনশ্বর হয় এবং জন্মের সময় তা আমাদের দেহের মধ্যে ঢুকে পড়ে, তাহলে তার আগের সময় যা অতিবাহিত হয়ে গেছে, তার কথা আমাদের মনে পড়ে না কেন? মনের শক্তি যদি এমনভাবে পরিবর্তিত হয়ে যায় যে, অতীতের সব স্মৃতি মন থেকে মুছে যায়, তাহলে আমার মনে হয় যে, তার সঙ্গে মৃত্যুর পার্থক্য খুব কম। সুতরাং আপনাকে স্বীকার করতেই হবে যে, যে আত্মা আগে ছিল তা ধ্বংস হয়ে গেছে এবং এখন যে আত্মা আমাদের দেহে আছে তা নতুনভাবে সৃষ্টি হয়েছে। সুতরাং আমি বারবার বলছি যে, আত্মার জন্ম ও মৃত্যু আছে।’

‘তাই মৃত্যু আমাদের কাছে কিছু না। তা আমাদের বিন্দুমাত্র উদ্বেলিত করে না। কারণ প্রমাণ হয়েছে যে, মনের প্রকৃতি মরণশীল।’ অনেক যুক্তির অবতারণা করে তিনি এ ধারণা প্রমাণ করেন যে, ‘আপনি নিশ্চিত হতে পারেন যে মৃত্যুর পরের কথা চিন্তা করে আমাদের ভয় পাওয়ার কিছু নেই। কারণ মরণের পর আমাদের অস্তিত্ব থাকে না। যার কোনো অস্তিত্বই নেই, তার অবস্থা কখনও শোচনীয় হতে পারে না।’

‘সুতরাং আপনি যখন কোনো মানুষকে এই বলে বিলাপ করতে দেখেন যে, মৃত্যুর পর তার সুন্দর দেহখানা হয় পচে যাবে, না হয় তার দেহ কবরের মধ্যে শুইয়ে রাখা হবে, কিংবা আগুনে পুড়িয়ে ফেলা হবে, কিংবা কোনো হিংস্রমাংসাশী প্রাণী তার দেহকে ছিন্নভিন্ন করে ফেলবে; তখন আপনি মনে করবেন না যে এটি তার ভান। প্রকৃতপক্ষে সে তার মনের মধ্যে মৃত্যুপরবর্তী দেহের জন্য আশঙ্কা পুষে রাখে। আমার মনে হয়, যদি কেউ মনে করে যে, মৃত্যুর পর তার দেহ পশুপাখিতে ঠুকরিয়ে ছিন্নভিন্ন করে ফেলবে এবং নিজের প্রাণহীন দেহের জন্য দুঃখ প্রকাশ করে, তখন সে নিজেকে দেহ থেকে ভিন্ন একটি সত্তা (আত্মা) বলে কল্পনা করে, মৃত্যু যাকে দেহ থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলেছে। তবু যে মৃতদেহটা ফেলে দেওয়া হয়, তার সঙ্গে সে তার মানসিক বিচ্ছিন্নতা ঘটাতে পারছে না। সে কল্পনা করে, তার আত্মাটি তার দেহের কাছাকাছি থাকে এবং একসময় তার সঙ্গে পুনরায় একাত্ম হয়ে যাবে। সে বুঝতে পারে না যে, মৃত্যুর পর আর কোনো সত্তা (আত্মা) অবশিষ্ট থাকে না। এজন্যই সে দুঃখ করে যে, একদিন মৃত্যু এসে তার জীবনকে কেড়ে নিয়ে যাবে। মৃত্যুর পর দেহটিকে যাই করা হোক না কেন, তাতে অবস্থার কোনো হেরফের হয় না। মৃত্যুর পর দেহটিকে মধুর মধ্যে শুইয়ে রাখা হোক, কিংবা মসৃণ বরফ বিছিয়ে রাখা হোক, কিংবা মাটি চাপা দেওয়া হোক, অথবা আগুনে পোড়ানো হোক, আমি তার মধ্যে কোনো পার্থক্য দেখি না।’

‘এখন তোমাকে তোমার গৃহ আর আনন্দের সঙ্গে সংবর্ধনা জানাবে না। তোমার পুণ্যময়ী স্ত্রী এবং আদরের পুত্রকন্যারা আর সর্বাগ্রে চুমু ছিনিয়ে নেওয়ার জন্য তোমার দিকে দৌড়–বে না। নীরবে তোমার অন্তর আনন্দে আর ভরে তুলবে না। তোমার কাজের মাধ্যমে তুমি আর নিজের উন্নতি সাধন করতে পারবে না। হে ভাগ্যহীন মানুষ! একটা ভয়ঙ্কর দিনে মৃত্যু তোমার জীবনের সমস্ত উপহার কেড়ে নিয়েছে।’ কারও মৃত্যুর পর জীবিতরা সাধারণত এ কথাগুলোই বলে থাকে। কিন্তু কখনও এ কথা বলে না যে, ‘এবং এসব জিনিসের জন্য তোমার মন আর কখনও কাতর হবে না।’ তারা যদি এ ব্যাপারটি অন্তর দিয়ে উপলব্ধি করে এবং সেই মতো চলার চেষ্টা করে, তাহলে তারা মনের আতঙ্ক এবং ভয় থেকে মুক্ত হতে পারবে। ‘এখন যেমন তুমি মৃত্যুর কোলে চিরকালের মতো ঘুমিয়ে আছ, আগামী অনন্তকাল তুমি সেই ঘুমেই আচ্ছন্ন থাকবে। কোনো আঘাত তোমাকে স্পর্শ করবে না। কিন্তু আমরা যারা জীবিত থাকি, তারা দুঃখভারাক্রান্ত মনে তোমার জন্য কান্নাকাটি করেও পরিতুষ্ট হই না। আমরা যখন তোমার ভয়ঙ্কর চিতার নিকটবর্তী হই, তখন আমাদের চেহারা মলিন ও পা-ুর রং ধারণ করে। সহজে আমাদের মন থেকে তোমার বিচ্ছেদের ব্যথা ভুলতে পারি না।’ এ প্রশ্ন বর্তমান কথকের। এর চেয়ে কষ্টকর আর কি হতে পারে? শেষমেশ সবাইকে চিরনিদ্রার কোলে আশ্রয় নিতে হবে। যে দুঃখের কোনো শেষ নেই, তার জন্য কি সবার শোক প্রকাশ করা উচিত?’

‘সমস্ত বিজ্ঞানের ও বিদগ্ধ কলার আবিষ্কর্তাদের কথা চিন্তা করুন। তারাও আজ সাধারণ মানুষের মতো চিরনিদ্রায় শায়িত আছেন। দেমক্রিতস-এর কথা চিন্তা করুন। বৃদ্ধ বয়স তাকেও সাবধান করে দিয়েছিল যে, তার স্মরণশক্তি ক্রমে লুপ্ত হয়ে আসছে। তিনিও আজ মৃত্যুর কোলে আশ্রিত। এমনকি এপিকুরসও চলে গেছেন। যিনি চিন্তায়, জ্ঞানবিজ্ঞানে সকলকে ছাড়িয়ে গিয়েছিলেন, তিনিও আজ চিরনিদ্রায় শায়িত। তাহলে আপনি কি মৃত্যুকে ভয় পাবেন?’

 

২.৪। চতুর্থ খণ্ড

চতুর্থ খণ্ডের সূচনা লুক্রেৎসউস-এর আত্মঘোষণায়। তিনি নিজেকে এর যোগ্য মনে করেন, কারণ তিনি এমন সব মহৎ বিষয় নিয়ে লিখছেন, যা ধর্মের শ্বাসরুদ্ধকর নাগপাশ থেকে মানুষের মনকে মুক্ত করবে। তিনি এমন সব অন্ধকার বিষয়ে আলোকসঞ্চারী সঙ্গীত রচনা করেছেন, যা স্বয়ং কলাদেবীরও বিস্ময় উদ্রেক করবে। এ খণ্ডের আলোচ্য, মানসিক প্রক্রিয়া এবং যৌন প্রজনন। মানসিক প্রক্রিয়া সম্বন্ধে এপিকুরিয় দর্শনের ধারণা, ‘এপিকুরস ও হেলেনিয় যুগ’ প্রবন্ধে আলোচিত হয়েছে। এখানে নজর দিয়েছি মানুষের প্রজনন সম্পর্কে লুক্রেৎসউস-এর দৃষ্টিভঙ্গির প্রতি ।

‘যে দুটো বীজের সাহায্যে শিশুর জন্ম হয়। তার একটা বীজ পুরুষ, অন্যটি নারী সরবরাহ করে। শিশু মা কিংবা বাবা যারই চেহারা পাক না কেন, শিশুর জন্মে মা-বাবা সমান বীজ সরবরাহ করে।’ প্রজনন সম্বন্ধে লুক্রেৎসউস-এর ধারণাটি কেবল আধুনিক বিজ্ঞানই প্রতিষ্ঠিত করেছে।

‘যে বীজের কথা বলা হয়েছে বয়সকালে তা শরীরের মধ্যে উত্তেজনা ছড়ায়। যেহেতু ভিন্ন ভিন্ন কারণ ভিন্ন ভিন্ন গতির সৃষ্টি করে এবং তা বিভিন্ন বস্তুকে উত্তেজিত করে। সুতরাং মানুষের ক্ষেত্রে সে বীজ মানুষের শরীরকে উত্তেজিত করে। সেই বীজ যখন তার নির্দিষ্ট সঠিক জায়গায় একত্রিত হয়, সে জায়গাটি উত্তেজিত হয় এবং বীজ দ্বারা স্ফীত হয়ে উঠে। তখন সে উপযুক্ত পাত্রে বীজ উদগীরণের জন্য হন্যে হয়ে উঠে। সমগ্র দেহ তখন সেই পাত্রের জন্য উদগ্রীব হয়ে উঠে, যা মনকে ভালোবাসা দ্বারা আঘাত করে। তাই কেউ যদি প্রেমের দেবী ভেনাসের দ্বারা আক্রান্ত হয়, তখন সে বিপরীত লিঙ্গের সঙ্গে মিলিত হওয়ার জন্য উদগ্রীব হয়ে উঠে। দেহের সঙ্গে দেহ জোড়া লাগে এবং সুখানুভূতির পূর্বলক্ষণ সারা শরীরে ছড়িয়ে পড়ে।’

‘পাখি, গবাদিপশু, জংলি প্রাণী, ভেড়া, ঘোটকী প্রভৃতি একইভাবে তাদের পুরুষ সঙ্গীর কাছে আত্মসমর্পণ করে।…এর মধ্যে উভয়েরই এক পারস্পরিক ভালো লাগার ব্যাপার আছে। মোটেই তা একতরফা নয়।’

‘যখন নারীর বীজ পুরুষের বীজের সঙ্গে মিশ্রিত হয়, তখন নারীরা পুরুষের দ্বারা বশীভূত এবং অধিকৃত হয়। তখন মাতৃগর্ভে উভয়ের মিশ্রিত বীজের মাধ্যমে সন্তানের জন্ম হয়। নারী-পুরুষের বীজের শক্তি সমান। কারো শক্তি কম বা বেশি নয়। শিশুরা মা-বাবার চেহারা প্রাপ্ত হয়। কখনও কখনও শিশুরা তাদের প্রপিতামহ কিংবা তাদের পিতার মুখাবয়ব লাভ করে। তার কারণ পিতামাতা তাদের মনের গহিনে তাদের মা-বাবা বা প্রপিতামহের ছবি লুকিয়ে রাখে। ভেনাসের মাধ্যমে তা পরবর্তী প্রজন্মে স্থানান্তরিত হয়। সুতরাং কন্যাসন্তান কখনও বাবার বীজ থেকে সৃষ্টি হয় এবং পুত্রসন্তানের বীজ সরবরাহ করে মায়ের শরীর। সুতরাং সব সময় দুটি বীজের সংমিশ্রণে সন্তানের জন্ম হয়।’

‘ঐশ্বরিক শক্তি কাউকে সন্তান উৎপাদনের ক্ষমতা থেকে বঞ্চিত করে না। তবু নিঃসন্তান নারী ও পুরুষ বৃথায় ঈশ্বর বন্দনায় রত হয় এবং পবিত্র ভাগ্যে বিশ্বাস করে। তাদের বীজের ঘনত্বের কারণে তারা কিছুকালের জন্য বন্ধ্যা হতে পারে। কখনও বা বন্ধ্যা হতে পারে বীজের অতিরিক্ত তারল্য ও সূক্ষতার কারণে। কারণ বীজ যদি খুব পাতলা হয়, তাহলে তা সঠিক স্থানে আটকে থাকতে পারে না। আবার বীজ যদি প্রয়োজনের চাইতে বেশি ঘন হয়, তাহলে অনেক চেষ্টা করে বীর্যপাত হয় না, কিংবা হলেও ঘনত্বের  কারণে তা সঠিক জায়গায় পৌঁছাতে পারে না। তাই নারী-পুরুষের মধ্যে সমকক্ষতা নিরূপণ করা খুবই গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার। কোনো কোনো পুরুষ অন্য অনেকের চাইতে দ্রুত নারী গর্ভধারণে সাহায্য করতে পারে, আবার কোনো নারী অতি দ্রুত অন্য পুরুষের কাছে খুব দ্রুত গর্ভধারণ করতে পারে। দেখা যায় যে, কোনো নারী কয়েকটি বিয়ের পরও বন্ধ্যাই থেকে যায়। কিন্তু শেষে এমন জুটি পায়, যার দ্বারা সে গর্ভধারণ করে এবং সুন্দর ফুটফুটে সুন্দর শিশুর জন্ম দিতে পারে। এটা অতিশয় গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার। সে ঘন বীজ পাতলা বীজের সঙ্গে মিশ্রিত হোক, কিংবা পাতলা বীজ ঘন বীজের সঙ্গে মিশ্রিত হোক না কেন, বীজের সঙ্গে বীজের মিলনে গর্ভসঞ্চার হয় এবং শিশুর জন্ম হয়। এখানে খাদ্য একটা গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। কারণ কোনো কোনো খাদ্য যৌনাঙ্গে বীর্যকে ঘন করে, আবার কোনো খাদ্য পাতলা করে, সেই সঙ্গে অপব্যয় করে। কিভাবে যৌনসঙ্গম করা হয়, সেটাও বেশ গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। কারণ জন্তু এবং চতুষ্পদ প্রাণীর ক্ষেত্রে মহিলারা তাড়াতাড়ি গর্ভধারণ করতে পারে বলে সবাই বিশ্বাস করে। কোনো মহিলা স্ত্রীসুলভ আচরণ করে না। এর ফলে সে নিজেই নিজের গর্ভধারণের পথে বাধার সৃষ্টি করে। সে বীজের গতিপথ থেকে নির্দিষ্ট স্থান সরিয়ে নেয়। সেজন্য নারীর বীজ পুরুষের বীজের সঙ্গে মিশতে পারে না। সেই জন্য গর্ভধারণ না করার জন্য বেশ্যারা নড়াচড়া করে। ভেনাসের বদৌলতে তারা পুরুষের কাছে বেশি আকর্ষণীয় হয়। আমাদের স্ত্রীদের এমনটা করা উচিত নয়।’

‘আবার কখনও কখনও কুশ্রী মেয়ের জীবনে ভালোবাসা আসে। এটা ঈশ্বরের কোনো করুণা বা ভেনাসের তিরের জন্য নয়। কারণ, স্ত্রী তার নিজের কাজ ও মানিয়ে নেওয়ার ক্ষমতার গুণে মার্জিত ও পরিপাটি ব্যবহারের জন্য স্বামীর ওপর প্রভাব বিস্তার করতে পারে এবং আপনি সারাজীবন তার সঙ্গে সংসার করতে পারেন। তদুপরি আচার আচরণ ভালোবাসাকে আকর্ষণীয় করে তোলে। আপনি যদি স্ত্রীর শরীরে ধীরে ধীরে ভালোবাসার চাপড় মারেন, অনেকক্ষণ পরে আপনি দেখতে পাবেন সে আপনার কাছে ধরা দিয়েছে এবং যৌনক্রিয়ার সম্মতিদান করেছে। আপনি কি দেখেননি একটি পাথরের ওপর দীর্ঘদিন ফোঁটা ফোঁটা পানি পড়ে পাথরের গায়ে ছিদ্র তৈরি হয়েছে?’

 

২.৫। পঞ্চম খণ্ড

এ-খণ্ডের ভূমিকা এপিকুরস-এর গুণকীর্তন। এ-খণ্ডের আলোচ্য বিষয়ে লুক্রেৎসউস-এর নিজের বক্তব্য শোনা যাক। ‘তার (এপিকুরস-এর) পথ অনুসরণ করে এবং তারই যুক্তি শৃঙ্খলার সাহায্যে আমি আমার রচনায় দেখাতে চাই, কোন নিয়মে পৃথিবীর সকল বস্তুরাশি গঠিত হয়েছে, কেনই বা সেগুলো প্রকৃতির নিয়ম মেনে চলবে এবং কেনইবা তারা কালের অমোঘ নিয়ম অস্বীকার করতে অক্ষম। এসব বস্তুর মধ্যে সর্বপ্রথম আসে মনের প্রকৃতির কথা। কারণ মন এমন উপাদান দ্বারা গঠিত বলে প্রমাণিত, যা জন্মগত। সে মন কালের মহাচক্রে অক্ষত থাকতে পারেনি। নিদ্রাবস্থায় সে মন সামান্য একটি পুতুলেরও বিদ্রুপের যোগ্য। এরপরে আমাকে দেখাতে হবে যে, এই পৃথিবী যেসব উপাদান দ্বারা গঠিত সেগুলো নশ্বর এবং পৃথিবীর জন্মের ইতিহাস আছে। বস্তুর সঙ্গে বস্তু যুক্ত হয়ে কিভাবে পৃথিবী, চন্দ্র, সূর্য, তারা ও সমুদ্র গঠিত হয়েছে, আমাকে সেটাও দেখাতে হবে। কিভাবে নানারকম জীবজন্তুর উদ্ভব হয়েছে এবং যেসব পশুপাখির এখনও উদ্ভব হয়নি, ভবিষ্যতে হবে। কিভাবে মানুষ বিভিন্ন বস্তুর নামকরণ করে একে অপরের নিকট নিজের মনোভাব প্রকাশ করে। কিভাবে মানুষের মনে অদৃশ্য ঈশ্বরের আশঙ্কার উদ্ভব হয়েছে এবং কিভাবে এখনও বিশ্বব্যাপী পবিত্র উপাসনাগার, সরোবর, কুঞ্জবন, বেদি ও ঈশ্বরের প্রতিমূর্তি প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে, এসব বিষয় আমাকে দেখাতে হবে। এছাড়া আমি আরও স্পষ্টভাবে দেখাব যে, কোন শক্তিবলে চন্দ্রসূর্যের গতিবিধি নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে। তা না হলে আমাদের মনে এই ভুল ধারণা থেকে যেতে পারে যে, এগুলো পৃথিবীর শস্য ও জীবের কল্যাণে স্বেচ্ছায় অনুগ্রহপূর্বক আপন কক্ষপথে পৃথিবী ও স্বর্গের মাঝখানে পরিভ্রমণ করছে। কিংবা আমরা এও মনে করতে পারি যে, এগুলো ঈশ্বরের পূর্ব পরিকল্পনা অনুসারেই আবর্তিত হচ্ছে। কারণ যারা জানেন যে দেবতারা নির্ঝঞ্ঝাট জীবনযাপন পছন্দ করেন, তারা সঠিকই জানেন। সেই দেবতাদের যদি বিশ্বের বস্তুরাশি- বিশেষ করে উর্ধ্বকাশের ইথার প্রান্তের বস্তুসমূহের গতিবিধি সম্পর্কে সচেতন থাকতে হয়, তাহলে তা হবে তাদের জ্ঞানের পরিপন্থী। এসব জানা না থাকলে সধারণ মানুষ আবার তাদের প্রাচীন ধর্মীয় সংস্কারের ওপর বিশ্বাস স্থাপন করতে উদ্বুদ্ধ হতে পারেন। কি থেকে কি হয়, তখন আর তা জানার দরকার মনে করবেন না। এক কথায়, কোন নিয়মে কোন সীমারেখায় প্রত্যেক বস্তুর ক্ষমতা নির্ধারণ হয়েছে, সে সম্পর্কে সম্পূর্ণ অজ্ঞ থেকে, প্রতারকরা যেসব দেবতাকে সর্বশক্তিমান বলে প্রচার করে, সাধারণ সহজ সরল মানুষ সে-সব দেবতাকেই প্রকৃত নিয়ন্তা বলে ধরে নিতে পারেন।’

এরপর তিনি আহ্বান জানান, ‘শুধু আমার বক্তব্যের অপেক্ষায় না থেকে আপনার সম্মুখের জলস্থল নভোম-লের দিকে দৃষ্টিপাত করুন।’ তার পর্যবেক্ষণ থেকে দেহের সঙ্গে মন ও আত্মার অচ্ছেদ্য সম্পর্ক বিষয়ে নিশ্চিত হয়ে তিনি যুক্তি দেন : ‘কোনো বস্তু কোথায় জন্মাবে এবং থাকবে তা পূর্ব থেকেই নির্দিষ্ট এবং নির্ধারিত। কাজেই দেহ ছাড়া মনের প্রকৃতি থাকতে পারে না। স্নায়ু ও রক্তের আধার ছাড়া মনের প্রকৃতি বলে কোনো কিছুর অস্তিত্ব থাকতে পারে না। এমনকি মনের শক্তি যদি মাথায়, কাঁধে কিংবা পায়ে কিংবা শরীরের অন্য অংশে জন্মাত, তাহলেও সেই শক্তি একটি ব্যক্তি বা পাত্রে অবস্থান করত। কিন্তু যেহেতু আমাদের দেহেই মনের স্থান নির্ধারিত এবং মন ও আত্মা কোথায় সৃষ্টি হবে তা সুনির্দিষ্ট। তাই দৃঢ়তার সঙ্গে একথা বলা যায় যে, দেহ ব্যতীত মাটির ঢেলায়, সূর্যের আগুনে, পানিতে বা আকাশে ইথারের সীমান্তে মন থাকতে পারে না। যেহেতু উল্লিখিত বস্তুসমূহের কোনো চৈতন্য থাকতে পারে না, তেমনি থাকতে পারে না দৈবজ্ঞান।’

‘আপনারা হয়তো এটাও বিশ্বাস করতে চাইবেন না যে, পৃথিবীর কোথাও দেবতাদের আবাস রয়েছে। দেবতাদের সূক্ষ্ম প্রকৃতি আমাদের থেকে এতদূরে যে, মননশক্তির সাহায্যে তারা কখনও অধিগম্য হন না। যেহেতু দেবতাদের কখনও হাত দিয়ে স্পর্শ করা যায় না, কাজেই আমরা স্পর্শ-ইন্দ্রিয় দ্বারা যা স্পর্শ করি, তারা তা স্পর্শ করেন না। কারণ যাকে স্পর্শ করা যায় না, তা অপরকেও স্পর্শ করতে পারে না। কাজেই তাদের আসন আমাদের আসন থেকে আলাদা হতে বাধ্য এবং দেবতাদের আসন তাদের দেহের মতো সূক্ষ্ম। এসব প্রতিপাদ্য বিষয়ই আমি সপ্রমাণ করব। আবারও বলি, যদি এমনটি মনে করা হয় যে, দেবতাদের ইচ্ছায় মানবকল্যাণের প্রয়োজনে বিশ্বপ্রকৃতিকে সুবিন্যস্ত ও সুশৃঙ্খলাভাবে সাজানো হয়েছে, তাই দেবতাদের স্তবস্তুতি করা মানুষের একটি অতি পবিত্র কর্তব্য, তাহলে সেটা হবে চরম হঠকারিতা। কিংবা যদি মনে করা হয়, এই বিশ্ব-প্রকৃতির বিন্যাস চিরন্তন, শাশ্বত ও অবিনশ্বর এবং দেবতারা সেই সুদূর অতীতে মানুষের মঙ্গলের জন্য চিরকালের জন্য যেখানে যা স্থাপন করেছেন, সেগুলোকে তার সেই নির্দিষ্ট শাশ্বত আসন থেকে জোর করে বিচ্যুত করা কিংবা বাক্য দ্বারা বিদ্ধ করা কিংবা উল্টে দেওয়া বা নতুন কিছুর সংযোগ করা অতীব গর্হিত পাপ, তবে সেটাও হবে চরম হঠকারিতা। আমাদের কৃতজ্ঞতা প্রকাশে দেবতাদের অমর ও সমুন্নত আত্মার কি এসে যায়? আমরা তাদের কি উপকার করতে পারি যে, তারা আমাদের কল্যাণে ইহজাগতিক কার্যকারণের পরিচালনার গুরুভার গ্রহণ করবেন, ইহজাগতিক সকল কাজ নিয়ন্ত্রণ করবেন? বস্তুরাশির সাবেক নির্বিঘ্ন অবস্থানে এমন কি ঘটেছে, যার জন্য দেবতারা সেই অবস্থার পরিবর্তন সাধনে নিজেদের পূর্বের জীবনের পরিবর্তন সাধন করবেন?’

প্রকৃতি সম্বন্ধে দৈবজ্ঞান ও প্রকৃতিতে দেবতাদের হস্তক্ষেপের ধারণা খণ্ডন করে তিনি প্রকৃতির নিয়ম বর্ণনা শুরু করেন। তিনি বলেন, ‘বস্তুর প্রকৃতি বা পদ্ধতি একেবারে হাল আমলের আবিষ্কার। আমিই সর্বপ্রথম এ-সকল বিষয়ে দেশি ভাষায় ভাব প্রকাশ করছি।’

‘প্রারম্ভিক আদি বস্তুসত্তাসমূহ তাদের সৃষ্টির পর থেকে নিজেদের ওজন নিয়ে গতিশীল থেকেছে এবং পরস্পরের সঙ্গে ক্রিয়া-বিক্রিয়ার মাধ্যমে যত ধরনের বস্তু উৎপাদন করা সম্ভব, তা প্রস্তুত করার জন্য পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে এসেছে। তার ফলেই বর্তমান বস্তুরাশি অবিরাম নবজীবন লাভ করছে।’

‘কিন্তু বস্তুরাশির প্রারম্ভিক অবস্থা সম্পর্কে আমার যদি কোনো জ্ঞানই না থাকত, তবুও আমি আকাশের বিভিন্ন বস্তুর বিন্যাস লক্ষ্য করে এবং অন্যান্য বিষয়ের দ্বারা আমি সিদ্ধান্তে উপনীত হতাম যে, বস্তুরাশির প্রকৃতি কোনো অবস্থাতেই দৈবশক্তির দ্বারা নির্মিত হয়নি। কারণ এতে বিরাট রকমের সব ত্রুটি বিদ্যমান রয়েছে।’ এটি কৌতুহল উদ্দীপক, প্রায় দু’হাজার বছর পর প্রজাতির উৎপত্তিতে দৈব হস্তক্ষেপের ধারণাটিকে খণ্ডন করতে গিয়ে, ডারউইনও প্রকৃতির ত্রুটির নজিরই হাজির করেছিলেন।

‘প্রথমত পৃথিবীর জলস্থল নভোমণ্ডলের যাবতীয় দ্রব্য এমন সব উপাদানে গঠিত, যার জন্ম ও মৃত্যু আছে। তাই গোটা বিশ্বপ্রকৃতিকে একটি একক সত্তা হিসেবে গণ্য করা উচিত। কারণ যেসব উপাদানের জন্ম ও মৃত্যু আছে সেইসব উপাদান দ্বারা যেসব বস্তু গঠিত হয়, সেসব বস্তুরও জীবন ও মৃত্যু আছে বলে আমরা মনে করতে পারি। তাই বিশ্বের প্রধান প্রধান অংশ ও অঙ্গপ্রত্যঙ্গের মৃত্যু হতে পুনর্জন্ম লাভ করতে দেখা যায়। অতএব এ কথা নিশ্চিতভাবে বলা যেতে পারে যে, স্বর্গ ও মর্ত্যলোকের কোনো এক সময়ে জন্ম হয়েছে এবং কোনো এক সময়ে এদের বিলুপ্তি ঘটবে।’

‘যা সমগ্র পৃথিবীকে নিজের আলিঙ্গনের মধ্যে ধরে রেখেছে, একবার তার দিকে তাকান। কেউ কেউ বলেন, তা নিজ থেকে পৃথিবীর সকল বস্তু সৃষ্টি করে এবং ধ্বংসের পর সকল বস্তুকে নিজের মধ্যে ফিরিয়ে নেয়। তা যদি সত্যি হয় তাহলে বলতে হয়, সেই আদি সত্তার জন্ম আছে এবং তা নশ্বরদেহী। কারণ যা তার আপন সত্তা থেকে অন্য বস্তুর সংখ্যা বৃদ্ধি করে এবং অন্যের খাদ্য যোগায়, তা নিজে অবশ্যই হ্রাস পেতে থাকবে এবং ফিরিয়ে নেওয়ার ভেতর দিয়ে নতুন করে রসদ জোগাড় করে তার সেই ঘাটতি পূরণ করতে হবে।’

‘আবার যেসব বস্তু চিরদিন টিঁকে থাকে, সেগুলো নিশ্চয়ই কঠিন পদার্থ দ্বারা গঠিত। সেগুলো নিশ্চয়ই আঘাত প্রতিহত করতে সক্ষম। সেগুলো নিশ্চয়ই অন্য বস্তুতে রূপান্তরিত হয় না। আমি পূর্বে এ ধরনের বস্তুর উল্লেখ করেছি। এতে আঘাত লাগে না বলে সবসময় টিঁকে থাকতে পারে। যেমন শূন্যের গায়ে কোনো আঘাত লাগে না এবং তা ধরাছোঁয়ার বাইরে। এ কারণে তার চারধারে এমন কোনো স্থান নেই, যেখানে সে ভেঙে অবস্থান নিতে পারে। এভাবে সকল সমষ্টির সমষ্টিই চিরন্তন। কারণ তার চারধারে এমন কোন স্থান অবশিষ্ট নেই, যেখানে সে ভেঙ্গে অবস্থান নিতে পারে। কিংবা এর বাইরে এমন কোনো জিনিস থাকতে পারে না, যা প্রচণ্ড আঘাতে এ-কে ভেঙে ফেলতে পারে। কিন্তু সত্য হলো এই যে, বিশ্বপ্রকৃতি তেমন কোনো কঠিন পদার্থ দ্বারা গঠিত নয়। কারণ শূন্য সব জিনিসেই বিদ্যমান থাকে। আবার বিশ্বপ্রকৃতি শূন্যের মতো নয়। কারণ এতে সব সময় পদার্থ বিদ্যমান এবং সেসব পদার্থ যেকোনো সময়ে একত্রিত হয়ে প্রচণ্ড ঘূর্ণিবাত্যা সৃষ্টি করে সবকিছু ওলটপালট করে দিতে পারে। আবার এতে কোনো শক্তি বা স্থানের অভাব নেই, যার ফলে বিদ্যমান কিছু, যেকোনো মুহূর্তে আঘাত পেয়ে চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে যেতে পারে। কাজেই আকাশ-পৃথিবী-সূর্য বা সমুদ্রের জন্য ধ্বংসের দ্বার রুদ্ধ নয় বরং লোলুপ দৃষ্টি নিয়ে ধ্বংস মুখ ব্যাদান করে আছে। এ কথাও মানতে হবে যে, এসব জিনিসের কোনো এক সময় জন্মও হয়েছে। যে বস্তু নশ্বর, তা কালের করাল গ্রাস তুচ্ছ করে চিরদিন অটুট রয়েছে, তা বিশ্বাসযোগ্য নয়।’

‘এরপর বস্তুরাশির সংমিশ্রণ ও সম্মেলনে পৃথিবী, আকাশ, গভীর সাগর, সূর্য ও চন্দ্র কিভাবে গঠিত হলো, তাই আমি বর্ণনা করব। কারণ কোনো পূর্ব পরিকল্পনা ও তীক্ষ বুদ্ধি দ্বারা বস্তুরাশির প্রারম্ভিক অবস্থা নিশ্চয়ই যথাস্থানে সন্নিবিষ্ট হয়নি। কিংবা কার গতি কেমন হবে, তা শান্তিপূর্ণ আলাপ আলোচনার দ্বারা নির্ণীত হয়নি। বরং প্রারম্ভিক অবস্থায় বস্তুরাশি বহু আগে থেকেই আপন আপন ভার অনুসারে বিভিন্নভাবে স্থাপিত হয়েছে, গতি লাভ করেছে। ওইগুলো আপনা থেকেই নানাভাবে মিশ্রিত ও সংমিশ্রিত হয়ে নানান বস্তু গঠনের মধ্য দিয়ে কালের আবর্তন ও রূপের পরিবর্তনের ফলে অকস্মাৎ এই আকাশ, পৃথিবী, সমুদ্র ও প্রাণীজগত সৃষ্টির প্রারম্ভিক সূচনা ঘটিয়েছে।’

নভোবস্তুসমূহের উৎপত্তি ও গতি সম্বন্ধে সে সময় প্রচলিত বিভিন্ন বৈজ্ঞানিক ধারণা আলোচনা করে লুক্রেৎসউস বলেন, ‘এদের যে কোনো একটি নিশ্চয় নক্ষরাজির গতির সঠিক কারণ হবে। তবে কোনটি যে সঠিক, তা নিশ্চিত করে বলা কোনোক্রমেই মানুষের উচিত নয়। কারণ মানুষের অগ্রগতি হয় ধীরে।’ এখানে লুক্রেৎসউসের মুক্ত  মনোভঙ্গিটি লক্ষ্য করার মতো। ‘আবার চন্দ্র যে বিভিন্ন স্থান আলোকিত করে, সে আলো চন্দ্রের নিজস্ব, না কি অপরের কাছ থেকে পাওয়া, যাই হোক না কেন, এ কথা সত্যি যে চন্দ্রের যে আকৃতি আমাদের কাছে প্রতীয়মান হয়, তা অবশ্যই তেমনি হবে।’ এখানে লুক্রেৎসউস ইন্দ্রিয়লব্ধ প্রত্যক্ষ জ্ঞানকে নিশ্চিত ধরছেন, কিন্তু যুক্তিলব্ধ পরোক্ষ জ্ঞানকে সম্ভাব্য। সূর্য প্রসঙ্গে তার বক্তব্যটি লক্ষ্য করুন। ‘হয়তো সূর্যের চারপাশেও প্রভূত পরিমাণে আগুন ও তাপ আছে, কিন্তু আমাদের তা চোখে পড়ে না। হয়তো সে আগুনের তেমন উজ্জ্বলতা নেই। তবুও সেই আগুন থেকে প্রচুর তাপ বের হয়ে চারদিকে কিরণ ছড়াচ্ছে।’

নক্ষত্রের গতিবিধির তত্ত্বের সমর্থনে তিনি অগ্রসর হয়েছেন একটি প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা থেকে। ‘এইভাবে আমাদের অবশ্যই ধরে নিতে হবে যে, চন্দ্র ও নক্ষত্ররাজি বছরের পর বছর ধরে মহাকক্ষপথে আবর্তন করে এবং সেগুলো বায়ুপ্রবাহের সাহায্যে পরস্পরের বিপরীত অভিমুখে পরিচালিত হয়। আপনি কি দেখতে পান না যে, দুটি ভিন্ন ভিন্ন বায়ুস্রোত পরস্পরের বিপরীত দিকে চলতে থাকলে তাদের প্রভাবে উপরের ও নিচের মেঘরাশিও একে অন্যের বিপরীত দিকে চলতে থাকে? তাহলে, তার দূরবর্তী তারকাপুঞ্জও ঠিক এমনিভাবে বিপরীতমুখি বায়ুপ্রবাহের দ্বারা মহাকক্ষপথে পরস্পরের বিপরীতে চলবে না কেন?’

‘চন্দ্রের গায়ে সূর্যের আলো প্রতিফলিত হয় বলে চন্দ্র আলোকিত হয় এবং প্রতিদিন সে সূর্যের বৃত্ত থেকে যতই সরে আসে চন্দ্রের আলোও ততই আমাদের চোখে বেশি পড়ে। এইভাবে সরতে সরতে একদিন সে সূর্যের বিপরীত দিকে অবস্থান গ্রহণ করে বলে সেদিন চন্দ্র পূর্ণরূপ ধারণ করে। অতঃপর ধীরে ধীরে সে আবার পূর্বের স্থানে ফিরে যায় এবং ক্রমশ সূর্যের নিকটবর্তী হওয়ায় চন্দ্রের আলো ক্রমশ লোপ পায়। চন্দ্রকে যারা বলের মতো মনে করেন এবং মনে করেন যে তার গতিপথ সূর্যের নিচে দিয়ে, এটা তাদের মত। এটাও সম্ভব যে চন্দ্রের নিজের আলো আছে এবং সে আলোর হ্রাস-বৃদ্ধি আছে। কারণ এমনও হতে পারে চন্দ্রের গতিপথে তারই আগে আগে আর একটি বস্তু পরিভ্রমণ করে এবং চন্দ্রকে সব রকমের বাধা দান করার চেষ্টা করে। কিন্তু তার কোনো আলো নেই বলে তাকে চোখে দেখা যায় না। অর্ধভাগ আলোতে নিমজ্জিত রেখেও সেই গোলাকার চাঁদ আবর্তন করতে পারে। এই মণ্ডলের চারধারে ঘোরার সময় সে হয়ত তার আপন অবস্থার পরিবর্তন করতে থাকে এবং শেষে তার আলোকিত অর্ধভাগ সম্পূর্ণভাবে আমাদের দিকে ঘুরে আসে। তারপর সে ধীরে ধীরে বিপরীত দিকে ঘুরে গোলকের আলোকিত অর্ধাংশ আমাদের দৃষ্টির বাইরে নিয়ে যায়। ব্যাবিলনের ক্যালডিয়দের বিজ্ঞান, জ্যোতির্বিদদের মতামত খণ্ডন করেছিল এবং এটাই প্রমাণ করার চেষ্টা করেছিল। তবে এ ব্যাপারে উভয় পক্ষের মতামত সমানভাবে সত্য নাও হতে পারে। কারণ এক মতের চেয়ে অপর মত গ্রহণের কোনো সঙ্গত কারণ থাকতেও পারে। আবার আকার ও অবস্থার নিয়মিত ক্রমিক পরিবর্তনের  ফলে প্রতিদিন একটি করে নতুন চাঁদ কেন সৃষ্টি হবে না এবং প্রতিদিন একটি করে চাঁদ নিশ্চিহ্ন হলে সেখানে আর একটি চাঁদ কেন গড়ে উঠবে না, তা যুক্তি বা কথার সাহায্যে বোঝানো সহজ নয়। কারণ এ রকম নিয়মিত ক্রমপর্যায়ে বহু জিনিসই জন্ম দিতে পারে।’

‘তেমনি আবার সূর্যগ্রহণ ও অমাবস্যার অনেক কারণ থাকতে পারে। তা যদি নাই হবে, তাহলে চন্দ্র কি করে সূর্যকিরণের সামনে দাঁড়িয়ে তার কালো অন্ধকার দেহের আড়াল দিয়ে পৃথিবীতে সূর্যকিরণের আসার পথ বন্ধ করে দিতে পারে? আর কোনো অনুজ্জ্বল বস্তু এরকম করতে পারে না, তা মনে করার কোনো সঙ্গত কারণ আছে কি? সূর্য বায়ুর মধ্যে দিয়ে নিজ গতিপথে চলার সময় নির্দিষ্ট সময়ে তার শক্তি ও আগুন হারিয়ে গেলে কিংবা বিপজ্জনক স্থানে আগুন নিভে গেলে পুনরায় আলো দান করতে পারবে না কেন? কেনই-বা পৃথিবী নিজের ছায়া শঙ্কুর (cone)  ভিতর দিকে সূর্যকে আড়াল করতে পারবে না? অথবা অন্য কোনো বস্তু চন্দ্রের নিচে দিয়ে যাওয়ার সময়, কিংবা সূর্যের গমনপথের উপর দিয়ে যাওয়ার সময়, সূর্যের আলো ও কিরণ আসার পথে বাধার সৃষ্টি করতে পারবে না কেন?’

উপরের অধ্যায়গুলিতে, মহাজাগতিক বিভিন্ন প্রপঞ্চ সম্বন্ধে তার সময়ে প্রচলিত বিভিন্ন তত্ত্ব-প্রস্তাবকে (hypothesis) পর্যালোচনা করেছেন লুক্রেৎসউস। এখানে তার মুক্ত মনোভঙ্গিটি লক্ষ্য করার মতো। কোন তত্ত্ব-প্রস্তাবের সমর্থনে যুক্তি-প্রমাণ বেশি জোরালো তা-ও নির্ণয়ের চেষ্টা করেছেন তিনি। তিনি সতর্ক করেছেন, যেসব বিষয়ে অনুমানের সাহায্যে সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে হয়, সেসব বিষয়ে তাড়াহুড়ো করে কোনো নিশ্চিত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো বোকামো। নিশ্চিত সিদ্ধান্তে পৌঁছার জন্য আমাদেরকে ধৈর্য্য ধরতে হবে। কারণ, এসব ব্যাপারে মানুষের অগ্রগতি হয় অত্যন্ত ধীরে।

‘এজন্য আমি বার বার বলছি যে পৃথিবীকে জননী বলে অভিহিত করা যথার্থ হয়েছে। কারণ পৃথিবী নিজেই মানবজাতির জন্ম দিয়েছে এবং নির্দিষ্ট সময়ে সকল প্রকার বন্য পশুপাখির সৃষ্টি করেছে। কিন্তু পৃথিবীরও জন্মদান ক্ষমতা সীমাবদ্ধ। তাই কালক্রমে স্ত্রীলোকের মতো তারও গর্ভধারণ ক্ষমতা শেষ হয়ে যায়। কারণ কালক্রমে সমগ্র বিশ্বের প্রকৃতি পরিবর্তিত হয়ে যায়। সকল জিনিসই এক অবস্থা থেকে অন্য অবস্থায় এসে উপস্থিত হয় এবং কোনোকিছু সবসময় এ রকম থাকে না। সব জিনিসেরই স্বাভাবিক পরিবর্তন ঘটে। সকল জিনিস কালক্রমে দূর্বল, ক্ষয়প্রাপ্ত ও ধ্বংস হয়ে যায়। তারপর অন্য জিনিস সগৌরবে সেখানে মাথা তুলে দাঁড়ায়। এইভাবে সমস্ত বিশ্বের প্রকৃতি কালক্রমে পরিবর্তিত হয় এবং এক অবস্থা থেকে অন্য অবস্থায় পৃথিবীর রূপান্তর ঘটে। এককালে সে যা পারত, এখন তা পারে না, এককালে যা সে পারতনা, এখন তা পারার জন্য পৃথিবী পরিবর্তিত হয়ে যায়।’

‘এ-ধরনের আরো বহু বিকট জন্তুর আবির্ভাব ঘটতে পারত। কিন্তু প্রকৃতি তাদের জন্মপথে নানা ধরনের বিঘ্ন সৃষ্টি করে দেয়। কারণ আমরা দেখতে পাই যে, কোনো বস্তু বা প্রাণীর বৃদ্ধি ও রক্ষার ব্যাপারে অনেক কারণ ও অনুকূল অবস্থা বর্তমান থাকা প্রয়োজন। প্রথমত দরকার খাদ্য ও প্রাণীদের প্রজনন ক্ষমতা এবং নারী যেন পুরুষের সঙ্গে মিলিত হতে পারে, সেজন্য উভয়ের আনন্দভোগের উপযোগী অঙ্গ থাকা দরকার।’ জীবজগতের উৎপত্তি ও বির্তন সম্বন্ধে লুক্রেৎসউস-এর ধারণাটি, আধুনিক জৈববিবর্তন-তত্ত্বের সাক্ষাৎ পূর্বসূরি।

‘কিন্তু পুরাকালের কল্পিত জীব ‘সেন্টরস’, যার মাথা ঘোড়ার মতো কিন্তু বাকি অঙ্গ মানুষের মতো, এমন অদ্ভুত জীবের অস্তিত্ব¡ কখনও ছিল না। দুই রকম অঙ্গপ্রত্যঙ্গের সমন্বয়ে গঠিত বিসদৃশপূর্ণ অঙ্গপ্রত্যেঙ্গের বৃত্তি বা ক্ষমতাসম্পন্ন দ্বি-প্রকৃতির প্রাণীর অস্তিত্ব কখনও ছিল না- থাকতে পারে না। নিচের দৃষ্টান্ত থেকে এই নির্বুদ্ধিতা ঘুচে যাবে। প্রথমেই বলতে হয় তিন বছর বয়স্ক একটি অশ্বশাবক যথেষ্ট তেজি ও বীর্যবান। অথচ তিন বছর বয়সের মানবশিশু তখনো নিদ্রাবস্থায় মায়ের দুধ পান করে। পূর্ণতাপ্রাপ্তির পর ঘোড়ার অঙ্গপ্রত্যঙ্গ নির্জীব হয়ে পড়ে- তার জীবনের ভাঁটা পড়ে। অন্যদিকে মানবশিশু তখন নবযৌবনের উদ্দামতা লাভ করে। সুতরাং মানুষের সঙ্গে অশ্বের তথাকথিত মিশ্রণে সেন্টরস-এর জন্ম ও অস্তিত্ব বিশ্বাসযোগ্য নয়। তেমনি আবার স্কিলাস (মৎস্যদেহী কুকুর) কিংবা এ ধরনের অন্যান্য প্রাণীর অস্তিত্ব সম্ভব নয়। একই দেহের অসামঞ্জস্যপূর্ণ অঙ্গপ্রত্যঙ্গধারী প্রাণী, একই সময়ে কৈশোর বা যৌবনপ্রাপ্ত অথবা বয়োপ্রাপ্ত অথবা বয়োবৃদ্ধ হয় না। তারা একই রকম অনুভূতিসম্পন্ন হয় না। কিংবা তাদের দেহ একই জিনিস থেকে একই রকম সুখানুভূতি পায় না। আমরা নিজেরাই দেখে থাকি যে হেমলক রস পান করে ছাগল পরিপুষ্টি লাভ করে অথচ মানুষের জন্য তা হচ্ছে বিষ।’ বিভিন্ন প্রতিদ্বন্দ্বী বৈজ্ঞানিক তত্ত্ব-প্রস্তাব পর্যালোচনার জন্য লুক্রেৎসউস সদা প্রস্তুত। মহাজাগতিক প্রপঞ্চ মূল্যায়নের বেলায় আমরা তা দেখেছি। তাই বলে যে কোনো কল্পনাকেই তিনি বিবেচনা-যোগ্য ভাবেন না, তাতে যতই প্রাচীনত্বের কিংবা ধর্মের সিল মারা থাকুক না কেন। সুতীক্ষ্ণ অভিজ্ঞতা-ভিত্তিক যুক্তি প্রয়োগে এসবকে তিনি ছিন্নভিন্ন করে দেন।

জীবজগতের উদ্ভব বর্ণনার পর লুক্রেৎসউস মানুষের উদ্ভব এবং উদ্ভবের পরবর্তী অবস্থার বর্ণনা করেন। ‘তারা তখন সর্বসাধারণের মঙ্গল অথবা কোনো নিয়মকানুনের ধার ধারত না। প্রত্যেকেই তখন শুধু নিজের কথা ভাবত। নিজের জীবিকার চেষ্টা করত এবং প্রকৃতি প্রদত্ত সুযোগসুবিধা নিয়ে আপন মনে জীবনযাপন করত। প্রেমের দেবী ভেনাস প্রেমিক-প্রেমিকার দৈহিক মিলন ঘটাতেন। …কারণ আশৈশব তারা দিনরাতের আসা-যাওয়া দেখতে অভ্যস্ত ছিল। সেজন্য তারা কখনও ভীত ও বিস্ময়াভিভূত হতো না। …এখন যেমন খাদ্যের প্রাচুর্য মানুষের ক্ষতিসাধন করছে, তখন তেমনি খাদ্যের অভাবে অনেক মানুষ কংকালসার হয়ে মারা যেত।’

তারপর বর্ণনায় আসে মানব সমাজের বিবর্তনের প্রসঙ্গ। ‘এরপর মানুষ কুঁড়েঘর বানাতে, আগুন জ্বালাতে ও চামড়ার ব্যবহার শিখল। তারা স্বামী স্ত্রী হিসেবে বাস করতে শিখল। বিবাহের মর্যাদা সম্পর্কে সজাগ হলো। দৈহিক মিলনে শিশুর জন্ম হতে দেখল। আর সেই থেকেই মানুষের মন ও দেহ সুকোমল হতে শুরু করল। আগুন ব্যবহার করে তারা প্রচণ্ড শীত থেকে দেহকে রক্ষা করতে শিখল। ফলে দেহ ক্রমে তীব্র শীত সহ্য করার অনুপযুক্ত হয়ে পড়ল। ভেনাস তখন তাদের শক্তি জোগাত এবং সন্তানসন্ততির আদর সোহাগে মাতাপিতার রুক্ষ মেজাজের পরিবর্তন হলো। অতঃপর পড়শিদের মধ্যে একটা সম্প্রীতির ভাব দেখা দিল। কেউ কারও ক্ষতি করতে চাইত না। কারো দ্বারা কেউ ক্ষতিগ্রস্ত হতো না। এভাবে মানুষে মানুষে প্রীতির বন্ধন শুরু হতে লাগল। শিশু ও নারীদের প্রতি মনোভাব নমনীয় হয়ে আসতে লাগল। বিপদগ্রস্ত হয়ে তারা আকারে-ইঙ্গিতে সাহায্য প্রার্থনা করলে সবাই দূর্বলের প্রতি কৃপা করতে শিখল। সর্বত্র শান্তিশৃঙ্খলা না থাকলেও অনেকেই সরল বিশ্বাসে নিজেদের দায়িত্ব সম্পর্কে সজাগ হয়ে উঠল এবং কর্তব্য পালন করতে শিখল। তা না হলে মানবজাতি তখনই ধ্বংস হয়ে যেত। আজ পর্যন্ত তাদের বংশধর টিকে থাকতে পারত না।’ লক্ষ্য করুন, লুক্রেৎসউস-এর ভাষ্যে মানব-প্রকৃতিও কোনো শ্বাশ্বত বিষয় নয়, পরিবেশ পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে তা-ও পাল্টায়।

মানুষের ভাষার উৎপত্তি এবং ক্রমবিকাশ প্রসঙ্গে লুক্রেৎসউস-এর বক্তব্যও গুরুত্বপূর্ণ। ‘সুতরাং কোনো একজন ব্যক্তি যে সকল বস্তুর নামকরণ করেছিল এবং তার কাছ থেকে অন্য সকলে সে নাম শিক্ষা লাভ করেছিল, এমন ধারণা করা ভুল। কারণ শুধু একজন বিশেষ ব্যক্তিই যে সকল বস্তুর নাম কথায় ব্যক্ত করতে এবং সকল প্রকার ধ্বনি উচ্চারণ করতে পেরেছিল অথচ আর কেউ পারেনি, এর কোনো সঙ্গত কারণ থাকতে পারে না। তাছাড়া তার সময়ে যদি আর সকলে শব্দ ও ধ্বনির ব্যবহার না জানত, তবে তার মনেই বা ওই শব্দগুলো ব্যবহারের প্রয়োজনবোধ কি করে এল? বা তাকে কাজে লাগাবার ধারণা তার মনে কোত্থেকে এল? সে একাই-বা তাবৎ জ্ঞান ও চিন্তাশক্তির অধিকারী হ’ল কি করে? উপরন্তু একজন ব্যক্তি সকলের ইচ্ছা ও অভিরুচি দমন করে সকলকে তার পছন্দসই নাম ও শব্দ মেনে নিতে বাধ্য করতে পারে? বধিরকে প্রয়োজনীয় শিক্ষা দেওয়া ও বোঝানো সহজ নয়। কারণ সে কখনো শব্দ ও ধ্বনি শুনতে ও বুঝতে পারে না, তাকে কোনো কিছু বললে কোনো লাভ হয় না। কিন্তু যে স্বর উচ্চারণ ও ভাষা ব্যবহার করতে জানে এবং বিভিন্ন ভাব প্রকাশ করতে জানে, শব্দের দ্বারা সে বিভিন্ন জিনিস বুঝাবে, এতে আশ্বর্য হওয়ার কি আছে? কারণ মূক পশু ও বন্য জন্তু ভয়, ব্যথা, দুঃখ আনন্দ প্রকাশের জন্য পৃথক ও ভিন্ন ভিন্ন ধরনের শব্দ ব্যবহার করে থাকে।’

মানব সমাজ প্রাথমিক পর্যায় অতিক্রম করে যখন সম্পদের সঞ্চয় করতে সক্ষম হ’ল, তখন তাতে কী রূপান্তর ঘটল, এবার তারই বর্ণনা। ‘বিচক্ষণ ও বুদ্ধিমান ব্যক্তিগণ ক্রমে তাদের পুরাতন জীবনযাত্রার পদ্ধতি পরিবর্তন করে নতুন পদ্ধতি শিক্ষা দিতে লাগল। নরপতিগণ নিজেদের শক্তি ও আশ্রয়স্থল হিসেবে বিভিন্ন শহর ও দূর্গ নির্মাণ করতে লাগলেন এবং জনসাধারণের মধ্যে বুদ্ধি, সৌন্দর্য ও শক্তি অনুপাতে ভূমি ও গবাদি পশু ভাগ করে দিলেন। তখনকার দিনে শক্তি ও সৌন্দর্যের খুব কদর ছিল। পরে সোনা ও অন্যান্য সম্পদ আবিষ্কার হলে দৈহিক শক্তি ও সৌন্দর্যের কদর কমে যায়। কারণ যত সুন্দর ও শক্তিশালী হোক না কেন, মানুষ ধনী ব্যক্তির অনুগত হয় সর্বাধিক। কিন্তু মানুষ যদি প্রকৃত বুদ্ধি ও জ্ঞানের সাহায্যে জীবনকে পরিচালিত করত, তবে সামান্য জীবিকা ও পরিতৃপ্ত মনই মানুষের নিকট শ্রেষ্ঠ সম্পদরূপে গণ্য হতো। কারণ তখন তেমন অভাব অনটন ছিল না। কিন্তু সৌভাগ্য যেন চিরস্থায়ী হয় এবং সারাজীবন মানুষ যেন অর্থসম্পদের দ্বারা পরম সুখে জীবনযাপন করতে পারে, সেজন্য মানুষ প্রতাপশালী ও যশস্বী হতে চাইল। কিন্তু কোনো ফল হলো না। কারণ যশ ও গৌরবের শীর্ষে আরোহণের সংগ্রামে মেতে তারা তাদের পথকে বিপদসংকুল করে তুলল। এমনকি যশের পথ প্রশস্ত হলেও প্রতিহিংসার আগুনে মানুষ ধ্বংসের শেষ সীমায় উপনীত হ’ল এবং মানুষ তার স্বভাব হারিয়ে  ঘৃণ্য জীবে পরিণত হ’ল। গৌরব ও সম্পদের আকাক্সক্ষা ও অন্যান্য পদমর্যাদার জন্য প্রায়ই মানুষ প্রতিহিংসার আগুনে পুড়ে ছারখার হয়ে গেল। রাজ্যের অধীশ্বর হয়ে সার্বভৌম ক্ষমতার অধিকারী হওয়ার চেয়ে নীরবে ও শান্তিপূর্ণভাবে শাসন মেনে চলা অনেক ভালো। মানুষ জ্ঞানবুদ্ধির ওপর নির্ভর না করে অন্যের মুখে শোনা কথা বিশ্বাস করে এবং নিজের চৈতন্য বা অভিজ্ঞতার পরিবর্তে জনশ্রুতির ওপর বিশ্বাস করে কাজ করে। এ মনোভাব কেবল অতীতেই বিরাজমান ছিল তাই নয়, বর্তমানেও বিরাজিত আছে এবং ভবিষ্যতেও থাকবে।’

এর পরই হ’ল রাষ্ট্রের উৎপত্তি। ‘কারণ পশুর মতো জীবনযাপন ও বিবাদ বিসম্বাদে মানবজাতি ক্রমান্বয়ে নিস্তেজ হয়ে পড়েছিল। তাই অতি সহজেই স্বেচ্ছায়  তারা সে আইন মেনে নিল এবং স্বৈরশাসনের অধীনস্থ হলো। যুক্তিসম্মত ও আইনানুমোদিত শক্তির বদলে প্রত্যেকেই অবৈধ বল প্রয়োগ করে নিজের ক্রোধ চরিতার্থ করে প্রতিশোধ নিতে চাইল বলে, সকলেই পশুশক্তির সাহায্যে জীবনযাপন করতে অসমর্থ হয়ে পড়েছিল।’ এ-বর্ণনা পড়ে মনে হয় না কি, আধুনিক রাষ্ট্রবিজ্ঞানের জনক টমাস হব্স্ তার লেভিয়াথান গ্রন্থে রাষ্ট্রের উৎপত্তি বিষয়ে লুক্রেৎসউস-এর মতবাদটিই ব্যবহার করেছেন?

লুক্রেৎসউস এবার এসেছেন কীভাবে দেবতা বিষয়ে মানুষের বিশ্বাস জন্মাল তারই বর্ণনায়। ‘তখনকার দিনে মানুষ সত্যিই জাগ্রত অবস্থায়, বিশেষত নিদ্রা ও স্বপ্নাবস্থায় মহিমান্বিত দেবমূর্তি দেখতে পেত। সেইসব দেবতার ইন্দ্রিয় বা চেতনা আছে বলে তারা মনে করত। কারণ এঁরা এঁদের অসীম ক্ষমতা ও গৌরবের প্রকৃতি অনুযায়ী পবিত্র বাণী উচ্চারণ ও অঙ্গ সঞ্চালন করত বলে তারা মনে করত। সবসময় দেবদেবীর দেখা মিলত। তাই তখনকার মানুষ এদের জীবন ও আকৃতি চিরস্থায়ী বলে মনে করত। তাছাড়া তারা এও বিশ্বাস করত যে দেবদেবীদের ক্ষমতা ও শক্তিকে কেউই পরাজিত করতে পারে না। তারা মনে করত যে দেবদেবীরা পরম সুখে থাকেন। কেননা এঁরা কেউ মৃত্যুভয়ে ভীত নন। তদুপরি তারা স্বপ্নে দেখতে পেত যে, দেবতাগণ বহু অলৌকিক কাজ করেও ক্লান্ত হচ্ছেন না। আবার তারা নভোমণ্ডল ও বছরের বিভিন্ন ঋতুকে পর্যায়ক্রমে আসতে দেখত। কিন্তু এসবের কোনো কারণ খুঁজে পেত না। কাজেই তারা সমস্ত ব্যাপারে দায়িত্ব দেবতাদের ওপর চাপিয়ে দিয়ে স্বস্তি অনুভব করত এবং দেবদেবীরাই সবকিছু করছেন মনে করে তারা শান্তিতে থাকার চেষ্টা করত। তাদের মতে দেবতাদের বাসস্থান ও আসন আকাশে। কারণ দিবারাত্রি, চন্দ্র, সূর্য, নক্ষত্র, ধূমকেতু, উল্কা, মেঘ, বৃষ্টি, তুষার, বায়ু, বিদ্যুৎ, শিলাবৃষ্টি, বজ্র ও মেঘের গর্জন সব আকাশ থেকেই আসে।’

এবার পুণ্য সম্বন্ধে লুক্রেৎসউস-এর নিজের মত। ‘মাথা ঢেকে ঘন ঘন দেবতার মন্দিরে যাওয়া, প্রতিটি বেদির সামনে হাজির হওয়া, গড় হয়ে প্রণাম করা, দেববিগ্রহের দিকে হস্ত প্রসারিত করা, পশুরক্তে বেদি রঞ্জিত করা, প্রণামের পর প্রণাম করা, কোনোটাই সৎ কাজ নয়। বরং প্রশান্ত মনে সবকিছুর দিকে তাকানোই পুণ্যের কাজ।’

কোনো জিনিসের মূল্যায়ন সময়ের সঙ্গে কিভাবে পাল্টে যায়, লুক্রেৎসউস তারও বর্ণনা করেন। ‘কোনো কাজে লাগত না বলে তখন সোনা ও রূপার কোনো কদর ছিল না। বরং তামার মূল্য অনেক বেশি ছিল। আর এখন তামাই অবহেলিত এবং সোনা শীর্ষস্থান অধিকার করেছে। তাই প্রমাণ হয় যে সময়ের সাথে সাথে জিনিসের গুরুত্বের ও মূল্যের পরিবর্তন হয়।’

এরপর বর্ণনায় এল হাতিয়ার ক্রমোন্নয়নের বিষয়টি। ‘মেমিয়াস! এখন আপনার পক্ষে সহজ হবে লোহার প্রকৃতি কীভাবে আবিস্কার হলো তা জানা। প্রাচীনকালে হাতিয়ার ছিল হাত, নখ, দাঁত, পাথর ও গাছের ভাঙা ডাল। আর আগুন আবিস্কার হওয়ার পর থেকে আগুন। পরে তামা ও লোহার ব্যবহার জানা গেল। লোহার ব্যবহারের আগে তামার ব্যবহার প্রচলিত ছিল। কারণ তখন প্রচুর পরিমাণে তামা পাওয়া যেত এবং তা সহজে কাজে লাগানো যেত। তামার তৈরি অস্ত্র দিয়ে তারা মাটি খুঁড়তো, যুদ্ধ করত, শিকার করত এবং জমি দখল করত। তামার তৈরি অস্ত্র দিয়ে অন্যের জমি ও গবাদি পশু দখল করত। কারণ যারা অস্ত্রে সজ্জিত থাকত, তাদের সঙ্গে নিরস্ত্রমানুষেরা পেরে উঠত না। তারপর ধীরে ধীরে লোহার তরবারি ও নানা ধরনের অস্ত্র তৈরি হলে তামার কাস্তে ক্রমশ প্রবাদ বাক্যে পরিণত হ’ল। মানুষ লোহার লাঙ্গল দিয়ে জমি চাষ করতে লাগল এবং যুদ্ধে উভয় পক্ষে লোহার অস্ত্র ব্যবহৃত হওয়ায় শক্তির ভারসাম্য প্রতিষ্ঠিত হলো। দুই অশ্বচালিত রথে চড়ে যুদ্ধ করার প্রথার চেয়ে ঘোড়ায় চড়ে এক হাতে লাগাম ধরে অন্য হাতে সবিক্রমে অস্ত্র চালনা করার প্রথা অনেক বেশি পুরনো। আবার অস্ত্র সজ্জিত রথে আরোহণ বা চার অশ্বচালিত রথ ব্যবহারের চেয়ে দুই অশ্বচালিত বাহন ব্যবহারের নিয়ম আরও বেশি পুরানো।’

‘এরপরে যুদ্ধে তারা ষাঁড় ও শূকর ব্যবহার করার চেষ্টা করে। আগে কেউ কেউ সাহসী ও দক্ষ পরিচালকের পরিচালনায় যুদ্ধে বিক্রমশালী সিংহ পাঠাত। কিন্তু এতে কোনো লাভ হতো না।’ এ-বিষয়টি কৌতূহল উদ্দীপক।

লুক্রেৎসউস তারপর ক্রমে ক্রমে বর্ণনা করেন কাপড় বুনা, কৃষিকর্ম উদ্ভাবন ও সংগীত সৃজনের প্রক্রিয়া। ‘তাঁতে বুনা কাপড়ে তৈরি পোশাক প্রচলিত হবার পূর্বে এক ধরনের হাতে বুনা বস্ত্র শরীরে বাঁধবার চল ছিল। তাঁতে বুনা কাপড়ের  প্রচলন হয় লোহা আবিষ্কারের পরে। কারণ বয়ন কাজে লোহা অপরিহার্য। কারণ তাতের মাকু, টাকু প্রভৃতি সূক্ষ্মতর জিনিসগুলো লোহা ছাড়া অন্য কিছুর সাহায্যে প্রস্তুত করা যায় না। প্রকৃতিগত কারণেই পুরুষরা মেয়েদের আগে এ কাজে অগ্রণী হয়েছিল। কারণ পুরুষেরা মেয়েদের চেয়ে বেশি বুদ্ধিমান ও দক্ষ। (লুক্রেৎসউস এ-ক্ষেত্রে তিনি যে পুরুষতান্ত্রিক সমাজে বাস করতেন, সেখানকার অধস্তন মেয়েদের পর্যবেক্ষণ করেই সিদ্ধান্ত টেনেছেন। নৃবিজ্ঞানীরা বলেন, কাপড় বুনন মেয়েদেরই উদ্ভাবন।) কিন্তু পরে রুক্ষ প্রকৃতির গ্রামবাসীগণ এ কাজ এতই অপছন্দ করল যে, তারা নারীজাতির হাতে এ কাজ তুলে দিয়ে নিজেদের কঠোর শ্রম লাঘব করল। এ ছাড়াও অন্য যেসব কাজে হাত ও দেহ শক্ত হয়, সেই শ্রমসাধ্য কাজগুলো আনন্দের সাথে মেয়েদের হাতে তুলে দিল।’ (পুরুষতান্ত্রিক সমাজের এ-বিষয়গুলো সম্বন্ধে তার পর্যবেক্ষণ যথাযথ।)

‘সুনির্দিষ্ট মৌসুমে বেরি ও ওক ফল গাছ থেকে মাটিতে পড়লে আপনাআপনিই তাদের চারা জন্মে। তাই বলা যায় যে প্রকৃতি মা নিজে হাতে মানুষকে বীজ বপন করা ও গাছের কলম করার কাজ শিখিয়েছে। সেই থেকে গাছের ডালের কলম করা ও চারা লাগাবার নিয়ম প্রবর্তিত হয়। তারা একের পর এক চাষাবাদের চেষ্টা করে। দেখতে পায় যে তাদের প্রিয় জমিকে যদি ভালোভাবে চাষ করা যায়, কর্ষণ করা যায়, তাহলে অনেক বেশি ও ভালো ফসল জন্মে। ধীরে ধীরে তারা পাহাড়ের ঢাল বেয়ে জঙ্গল সাফ করে কর্ষণযোগ্য জমি উদ্ধার করে এবং সেগুলো চাষের আওতায় আনে। তারা বনজঙ্গল সাফ করে জমি উদ্ধার করে এবং উচ্চভূমি, সমতলভূমি, পুকুর, নালা ইত্যাদি শস্যক্ষেত ও আঙ্গুর বাগান করে।’

‘সুরলহরিপূর্ণ মধুর সংগীতে অভ্যস্ত হবার অনেক আগে থেকেই পাখির ডাক ও পাখির গান মানুষ অনুকরণ করত। ফাঁকা নলের মধ্য দিয়ে মৃদুমন্দ বাতাস বইলে যে শব্দ হয়, চাষীরা তাই শুনে ফাঁপা নলে ফুঁ দিয়ে বাঁশি বাজাতে শেখে। তারপর ধীরে ধীরে তারা মধুর বিষাদময় সুরে বাঁশি বাজানো আয়ত্ত করে। হাতের আঙ্গুল দিয়ে কৌশলে চাপ দেওয়াতেই বাঁশিতে এই সুর বাজত। ঘন বনের মধ্যে, ফসলের মাঠে, চারণভূমিতে এবং নির্জনে কোনো স্থানে বসে রাখালেরা বা অন্য কেউ সুর করে সেই বাঁশি বাজাত। আহারের পরই চিত্তবিনোদন ভালো লাগে বলে তৃপ্তিসহকারে আহারের পর বাঁশির সুরমাধুর্যে তারা আনন্দ উপভোগ করত।’

লুক্রেৎসউস দেখান, মানুষ নিজের সম্বন্ধে অজ্ঞতার জন্য লোভী হয়। এর ফল শুধু নিজের জীবনে দুঃখ নয়, ফল যুদ্ধ এবং অন্যের জীবনেও দুঃখ। ‘কাজেই দেখা যায় মানুষ বৃথাই সম্পদের পিছনে ছোটে এবং মিথ্যা মোহে জীবন নষ্ট করে। কারণ এ কথা সত্যি যে, কিছু পাওয়ার প্রকৃত উদ্দেশ্য যে কি এবং প্রকৃত আনন্দের সীমা যে কতদূর বৃদ্ধি পেতে পারে, মানুষ তা শেখেনি। তাই জীবন অতল সমুদ্রে নিমজ্জিত হয়েছে এবং সেই তলদেশ থেকেই জেগে উঠেছে যুদ্ধের বিশাল লহরি।’

‘বর্ণমালাও খুব বেশিদিন আগে আবিষ্কৃৃত হয়নি। সুতরাং অতীতে যা ঘটে গেছে তা জানার আজ আর কোনো উপায় নেই। যুক্তির মাধ্যমে কিছু সূত্র খুঁজে পেলে কিছু জানা যেতে পারে।’ লুক্রেৎসউস লিখিত ইতিহাসের সীমাবদ্ধতা সম্বন্ধে সচেতন। তিনি এই সীমাবদ্ধতা কিছুটা পুষিয়ে নিতে চান যুক্তির মাধ্যমে ইতিহাসের পুনর্গঠন করে।

‘মানবজাতি উৎসুক পদক্ষেপে ধীরে ধীরে উন্নতির পথে অগ্রসর হয়েছে। অভিজ্ঞতা এবং অনুশীলনের মাধ্যমে ক্রমে ভূমি কর্ষণ, জাহাজ নির্মাণ, প্রাচীর নির্মাণ, আইন প্রণয়ন, অস্ত্রশস্ত্র তৈরি, রাস্তাঘাট নির্মাণ, পোশাক-পরিচ্ছদসহ জীবনের যাবতীয় প্রয়োজনীয় সামগ্রী ও ভোগের উপকরণ উৎপাদন করতে শিখেছে। মানুষ সৃজন করতে শিখেছে কাব্য, চিত্রকলা ও ভাস্কর্য। পরে  অভিজ্ঞতা ও অনুশীলনের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে যুক্তি। তাই বর্তমানে মানুষের কৃতীগুলোর চরম উৎকর্ষ সাধিত হয়েছে।’

 

২.৬। ষষ্ঠ খণ্ড

এ-খণ্ডের শুরু আথিনার প্রশংসা দিয়ে। আথিনার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কৃতি এপিকুরস। এপিকুরস প্রকৃতি বিষয়ে জ্ঞান দ্বারা মানুষের সুখী হওয়ার পথ বাৎলেছেন। লুক্রেৎসউস সেই জ্ঞানকেই পথপ্রদর্শক হিসাবে পেতে চান। বৈষয়িক সমৃদ্ধি সত্ত্বেও মানুষ যখন লোভের তাড়নায় এবং ভয়ের পেষণে অমানবিক জীবনযাপন করছিল, এপিকুরস ‘তখন তার নৈতিক শিক্ষা দ্বারা মানুষের মনকে জঞ্জালমুক্ত করলেন। তিনি মানুষের লোভ ও ভয়ের একটা সীমা নির্ধারণ করে দিলেন। মানুষের জীবনের সবচেয়ে বড় অর্জন কি হতে পারে তা ব্যাখ্যা করলেন। সেই সঙ্গে তা অর্জন করার সহজ সরল রাস্তার হদিসও দেখিয়ে গেলেন। তিনি প্রমাণ করেন যে, যত পাপ তার সব শেকড় ইহজাগতিক বিষয়ের মধ্যেই প্রোথিত।’ কারণ, পারলৌকিক বলে কোনো কিছুর অস্তিত্বই নেই।

এ-অসমাপ্ত খণ্ডটিতে লুক্রেৎসউস-এর আলোচ্য : (ক) আবহাওয়া সংক্রান্ত বিষয়াবলী, যেমন ঋতু পরিবর্ত, বায়ুপ্রবাহ-ঝড়, মেঘ-বৃষ্টি-বজ্রপাত ইত্যাদি। সাধারণের বিশ্বাস, প্রকৃতির এসব নিয়মিত ঘটনাবলী ঘটে ঐশ্বরিক নিয়মে। লুক্রেৎসউস এসবকে ব্যাখ্যা করে দেখাতে চান, এসবের পেছনে প্রাকৃতিক নিয়মই কার্যকর, দৈব নিয়ম নয়। (খ) ব্যতিক্রমী ও দুর্বোধ্য প্রকৃতিক ঘটনাবলী, যেমন অগ্নিগিরি, নীলনদের প্লাবন, চুম্বক ইত্যাদি। এসব বিষয় মানুষের মনে বিস্ময় জাগায় এবং দৈবে বিশ্বাসীরা এসবকে ঐশ্বরিক হস্তক্ষেপের সাক্ষাৎ প্রমাণ বলে প্রচার করে। লুক্রেৎসউস এসবেরও প্রাকৃতিক ব্যাখ্যা দিয়ে মানুষের দৈবে বিশ্বাসকে খ-ন করতে চান। (গ) প্লেগের মতো মহামারি, যা মানুষের ভয় ও কুসংস্কারের গুরুত্বপূর্ণ উৎস, লুক্রেৎসউস তারও প্রাকৃতিক ব্যাখ্যা করতে চেয়েছেন। উদ্দেশ্য, মানুষের মনকে কুসংস্কার ও ভয়মুক্ত করা। তার যুক্তিধারার নমুনা হিসাবে বজ্রপাত সম্বন্ধে আলোচনার একটু উদ্ধৃত করছি।

‘কিন্তু আমরা বজ্রপাতের শব্দ শুনি বিদ্যুৎ চমকানির আলো দেখার পর। কেন?  কারণ বস্তু সবসময় ধীর গতিতে কানে পৌঁছায়। অন্যদিকে চোখে পৌঁছায় অত্যন্ত দ্রুত গতিতে। যখন তুমি দূরে একটি লোককে গাছের ডাল কাটতে দেখেছো, কুড়ালের আঘাতের দৃশ্যটা তোমার চোখে আগে আসে, তারপর তুমি শব্দটি শুনতে পাও। তাই আমরা বিদ্যুৎ চমকানি আগে দেখি, তার অনেক পরে বজ্রপাতের শব্দ শুনি। যদিও ঘটনা দুটি একই সময়ে সংঘটিত হয়েছিল।’

মানুষের অবিমৃষ্যকারী কর্মে যে প্রকৃতি পরিবর্তিত (ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে তা-ও লুক্রেৎসউস-এর দৃষ্টি এড়ায়নি। মানুষেরা যে খনি খুঁড়ে বায়ু দুষণ করছে, অতিরিক্ত চাষাবাদে ভূমিকে অনুর্বর করছে, নির্বিচারে বন উজাড় করছে, এজন্য লুক্রেৎসউস তার কাব্যে সতর্কবাণী উচ্চারণ করেছেন।

(প্রবন্ধের অন্তর্গত লুক্রেৎসউস-এর কাব্যের কাব্যানুবাদ অংশগুলো সরদার ফজলুল করিম কৃত। গদ্যানুবাদে সাহায্য নিয়েছি শহিদুল ইসলাম রচিত ‘বিজ্ঞানের দর্শন’-এর। গদ্যানুবাদগুলি ভাবানুবাদ মাত্র।)

 

৩. উপসংহার

আমরা দেখলাম, লুক্রেৎসউস এপিকুরীয় প্রকৃতি-দর্শনের মূল তত্ত্ব, ‘পরমাণু ও শূন্যতা’কে অভিজ্ঞতা-ভিত্তিক যুক্তির মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। (তিনি দাবি করেননি, এসব ঐশ্বরিক প্রত্যাদেশ কিংবা অভ্রান্ত শাস্ত্রবচন, অতএব এসব বিশ্বাস করতে হবে।) এই মূল তত্ত্ব দিয়েই তিনি অভিজ্ঞতার জগৎকে ব্যাখ্যা করেছেন। (ব্যাখ্যার জন্য তিনি অলৌকিক কিছু আমদানি করেননি।)  কোনো বিষয়কে ব্যখ্যা করতে তিনি কার্য-কারণ পরম্পরার আশ্রয় নিয়েছেন। অর্থাৎ বিষয়টি কিভাবে সংঘটিত হয় তা বর্ণনা করেছেন। তার ব্যাখ্যাটিকে পাঠকের কাছে বোধগম্য ও প্রতিষ্ঠিত করতে, পাঠকের অভিজ্ঞতার কোনো বিষয়ের সঙ্গে তার বর্ণিত বিষয়টির তুলনা করেছেন। লুক্রেৎসউস তথা প্রাচীন বিজ্ঞানে যা অনুপস্থিত, তা ‘পরীক্ষণ’ (experiment)। লক্ষ্য করা প্রয়োজন, লুক্রেৎসউস-এর কাছে প্রকৃতি শুধু ভৌত প্রকৃতি নয়; মানুষের মন ও সমাজও এর অন্তর্গত। কোনো অলৌকিকতার সাহায্য না নিয়ে, পর্যবেক্ষণ থেকে যুক্তি প্রয়োগে তত্ত্ব গঠন, এবং সেই তত্ত্বের  মাধ্যমে (যুক্তির সাহায্যে) অভিজ্ঞতাকে ব্যাখ্যা করা, বিজ্ঞানেরই মৌলপদ্ধতি। এ-পদ্ধতির সঙ্গে ‘পরীক্ষণ’কে যুক্ত করেই আধুনিক বিজ্ঞানের সূচনা।

প্রকৃতি ব্যাখ্যাকে অলৌকিকতা মুক্ত করে থালেস গ্রিক প্রকৃতি-দর্শনের সূত্রপাত করেছিলেন। লুক্রেৎসউস-এ গ্রিক প্রকৃতি-দর্শন এর পূর্ণতা পায়। থালেস-এর প্রশ্ন ছিল, ‘বিশ্ব কী দ্বারা গঠিত’। তিনি যুক্তির মাধ্যমে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, ‘জল দ্বারা’। আমরা দেখেছি, লুক্রেৎসউস ‘বিশ্ব পরমাণু ও শূন্যতা দ্বারা গঠিত’, এটি প্রতিষ্ঠিত করেই থেমে যান নি। তিনি এ-তত্ত্বের মাধ্যমে শুধুমাত্র ভৌত বিষয়াবলীকেই ব্যখ্যা করেন নি, ব্যাখ্যা করেছেন মানুষের মন, আত্মা, দেবতা এবং সমাজকেও। ‘বস্তুসমূহর প্রকৃতি’ মহাকাব্যের আলোচ্য, নীতি-দর্শন নয়, প্রকৃতি-দর্শন। কিন্তু নীতি-দর্শনের সঙ্গে প্রকৃতি-দর্শনের সম্পর্কটিতে তিনি আলোকপাত করেছেন। তার মতে প্রকৃতি-দর্শনের উদ্দেশ্য মানুষকে সুখী হতে সাহায্য করা। মনে রাখা প্রয়োজন, সে সময়ে বর্তমান সময়ের মতো বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির মেলবন্ধন গড়ে উঠেনি। এটি গড়ে ওঠা শুরু হয় আধুনিককালে। তাই লুক্রেৎসউস-এর কালে বিজ্ঞান, ভোগ্যপণ্য তৈরিতে সাহায্য করে মানুষকে সুখী করতে পারত না। বিজ্ঞান, ভৌত-প্রকৃতি, মানবমন ও মানবসমাজ সম্বন্ধে অলৌকিকতা ও কুসংস্কার-মুক্ত জ্ঞান দিতে পারত। এতে মানুষ নিজেকে, তার সমাজকে এবং তার পরিবেশকে চিনতে পারত। ফলে মানুষ মৃত্যুর ভয়, পরকালের ভয়, জীবিতকালে দেবতার শাস্তির ভয়- ধর্মব্যবসায়ীদের প্রচারিত এসব বিবিধ ভয় থেকে মুক্ত হতে পারত। মানুষ জানতে পারত, সুখী হওয়ার জন্য তার করণীয় কী এবং তার বর্জনীয়ই বা কী। কাজেই আমরা দেখতে পাচ্ছি, লুক্রেৎসউস-এর মতে বিজ্ঞান উদ্দেশ্যহীন নয়। এর উদ্দেশ্য মানুষকে সুখী হতে সাহায্য করা। এটিই বিজ্ঞানের নৈতিক ভিত্তি। নীতি-দর্শন এভাবেই প্রকৃতি-দর্শনের সঙ্গে সম্পর্কিত। বিজ্ঞান তার কাজটি করে মানুষকে অলৌকিকতা ও কুসংস্কার-মুক্ত জ্ঞান দিয়ে। যা মানুষকে নীতিনিষ্ঠ জীবনযাপনে সাহায্য করে। প্রকৃতি-দর্শন এভাবেই নীতি-দর্শনের সঙ্গে সম্পর্কিত।

আধুনিক বিজ্ঞান নির্মাণে অন্যতম ভিত্তি যুগিয়েছিল লুক্রেৎসউস ব্যাখ্যাত এপিকুরিয় প্রকৃতি-দর্শন। আধুনিক বিজ্ঞান এপিকুরিয় প্রকৃতি-দর্শনের পদ্ধতিটির সঙ্গে পরীক্ষণ যুক্ত করে এটিকে নতুন পর্যায়ে উন্নীত করেছিল। কিন্তু ‘বিজ্ঞানের নৈতিক ভিত্তি থাকা প্রয়োজন’ এবং এটি হওয়া উচিৎ ‘মানুষকে সুখী করা’; এপিকুরিয় দর্শনের এসব ধারণাকে আধুনিক বিজ্ঞান গ্রহণ করেনি। এর ফলাফল কি মানবসমাজের জন্য কল্যাণকর হয়েছে ?

 

তথ্যসূত্র :

১।        ফিওদর করোভকিন, পৃথিবীর ইতিহাস : প্রাচীন যুগ, অনুবাদ : হায়াৎ মামুদ, প্রগতি প্রকাশন, মস্কো, ১৯৮৩।

২।       http://classics.mit.edu/Carus/nature_things.mb.txt

৩।      www.wikipedia.org

৪।       Karl Marx, Notebooks on Epicurean Philosophy, Lawrence & Wishart Electronic Book, 2010.

৫।       সরদার ফজলুল করিম, (এপিক্যুরাস), প্রবন্ধ সমগ্র-২, অন্বেষা প্রকাশন, ঢাকা, ২০১২।

৬।       শহিদুল ইসলাম, (বস্তুরাশির প্রকৃতি প্রসঙ্গে লুক্রেশিয়াসের বিজ্ঞানচিন্তা), বিজ্ঞানের দর্শন, কথাপ্রকাশ, ঢাকা, ২০১৩।

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

shares