প্রবন্ধ

নারীর মর্যাদা ও অধিকার

এবং নজরুল

আখতার হুসেন

 

তাঁর জীবন ও কর্মসাধনার মাধ্যমে বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম যুগ যুগ ধরে অবহেলিত নারীর সামাজিক মর্যাদা, জ্ঞান-বিজ্ঞান ও শিক্ষার ক্ষেত্রে তাঁদের অধিকার প্রতিষ্ঠায় কতভাবেই না চিন্তা-ভাবনা করেছেন! বাংলা ১৩৪৩ সালে ফরিদপুর জেলা মুসলিম ছাত্র সম্মিলনী উপলক্ষে দেওয়া তাঁর সভাপতির অভিভাষণে তিনি নারীসমাজের কঠোর অবরোধের বিরুদ্ধে তাঁর প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে বলেছিলেন, ‘ইসলামের প্রথম ঊষালগ্নে, সুবহ-সাদেকের কালে যে কল্যাণী নারী শক্তিরূপে আমাদের দক্ষিণ পার্শ্বে অবস্থান করে আমাদের শুধু সহধর্মিণী নয়, সহকর্মিনী হয়েছিলেন-যে নারী সর্বপ্রথম স্বীকার করলেন আল্লাহকে, তাঁর রসুলকে-তাঁকেই আমরা রেখেছি দুঃখের দূরতম দুর্গে বন্দিনী করে সব আনন্দের, সব খুশির হিস্সায় মহরুম করে। তাই আমাদের সব শুভ্রকাজ, কল্যাণ, উৎসব আজ শ্রীহীন, রূপহীন, প্রাণহীন। তোমরা অনাগত যুগের মশাল বর্দার। তোমাদের অর্ধেক আসন ছেড়ে দাও কল্যাণী নারীকে। দূর করে দাও তাদের সামনের ওই অসুন্দর চটের পর্দা-যে পর্দার কুশ্রীতা ইসলাম জগতের মুসলিম জাহানের আর কোথাও নেই। দেখবে তোমাদের কর্তব্যের কঠোরতা, জীবন পথের দূরধিগম্যতা হয়ে উঠবে সুন্দরের স্পর্শে পুষ্পপেলব।’ মোল্লাতন্ত্রের অন্ধত্বের পরিণতিতে নারীর অবরোধের অর্গল কীভাবে বিস্তৃত হয় এবং তা কতদূর ভয়াবহ হয়ে উঠতে পারে, সে সম্পর্কে বলতে গিয়ে নজরুল বলেছেন, ‘আমাদের পথে মোল্লারা যদি হন বিন্ধ্যাচল, তাহা হইলে অবরোধ প্রথা হইতেছে হিমাচল।- আমাদের বাংলাদেশের স্বল্পশিক্ষিত মুসলমানদের যে অবরোধ, তাহাকে অবরোধ বলিলে অন্যায় হইবে, তাহাকে একেবারে শ্বাসরোধ বলা যাইতে পারে।’ নারীদের জন্য পর্দা ও অবরোধের কঠোরতা থাকার ফলে তাদের অন্যতম মৌলিক চাহিদা প্রাতিষ্ঠানিক-অপ্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাও সুদূরপরাহত হয়ে যায়। সে যুগের বিদুষী মুসলিম মহিলা ফজিলতুন্নেসা মুসলিম নারীর অধোগতি, তাদের শোষণ-বঞ্চনার কার্যকারণ হিসেবে অশিক্ষাকেই চিহ্নিত করেছিলেন। পুরুষের অবরোধ আরোপের পথকে সুগম করেছে মূলত নারীর অশিক্ষা। একটি প্রবন্ধে তিনি বলেছিলেন, ‘সমস্ত নারীমন আজ বিদ্রোহী হয়ে উঠেছে। কিন্তু যুদ্ধ করবার যে প্রধান অস্ত্র শিক্ষা ও জ্ঞান, তাই তাদের নাই- আছে কেবল দারুণ একটা আত্মগ্লানি, মর্ম্মভেদী একটা অনুশোচনা, আর সর্বোপরি মুক্তির জন্য দুর্দ্দমনীয় আকাক্সক্ষা। পাপীর অনুতাপই যে রূপ তার পাপকে আগুনে পুড়িয়ে বিশুদ্ধ ও খাঁটি করে তোলে, সেইরূপ নারীর এই আত্মগ্লানিই তাকে মনুষ্য পদবাচ্য করে তুলবে এবং এরজন্য সর্বপ্রথম আবশ্যক শিক্ষা। ‘নজরুল নারী শিক্ষার গুরুত্ব যথার্থভাবে উপলব্ধি করে জোরালো ভাষায় বলেছেন ‘কন্যাকে পুত্রের মতোই শিক্ষা দেওয়া যে আমাদের ধর্মের আদেশ তাহা মনেও করিতে পারি না। আমাদের কন্যা-জায়া-জননীদের শুধু অবরোধের অন্ধকারে রাখিয়াই ক্ষান্ত হই নাই, অশিক্ষার গভীরতর কূপে ফেলিয়া হতভাগিনীদের চিরবন্দিনী করিয়া রাখিয়াছি। আমাদের শত শত বর্ষের এই অত্যাচারে ইহাদের দেহ-মন এমনি পঙ্গু হইয়া গিয়াছে যে, ছাড়িয়া দিলে ইহারাই সর্বপ্রথমে বাহিরে আসিতে আপত্তি করিবে। ইহাদের কি দুঃখ কিসের যে অভাব তাহা চিন্তা করিবার শক্তি পর্যন্ত ইহাদের উঠিয়া গিয়াছে।’

নজরুল ইসলাম নারীসমাজের অধিকার প্রতিষ্ঠা ও শৃঙ্খলমুক্তির জন্য কেবল বক্তৃতা-বিবৃতি প্রদান করেই ক্ষান্ত হননি। তাঁর প্রতিষ্ঠিত ধূমকেতু পত্রিকায় ‘সন্ধ্যাপ্রদীপ’ নামে নারীদের জন্য একটি বিভাগ ছিল। নারীসমাজ তাদের সার্বিক মুক্তির কথা অকপটে এখানে লিখতে পারতেন। এই বিভাগে নারীশিক্ষা, তার অধিকার, পুরুষতন্ত্রের বিরুদ্ধে সোচ্চার প্রতিবাদ এবং যুগ সভ্যতায় এগিয়ে আসার ক্ষেত্রে নারীদের স্বাধীন মতামত, এমনকি এসব বিষয়ে বিতর্কেরও আয়োজন করেছিলেন নজরুল। ধূমকেতুর দ্বিতীয় সংখ্যায় ‘সন্ধ্যাপ্রদীপ’ বিভাগে প্রকাশিত জনৈক অজ্ঞাতনামা লেখকের ‘ভূতের মুখে রাম নাম’ শীর্ষক প্রবন্ধ এবং তৃতীয় সংখ্যায় প্রকাশিত কমলাবালা গঙ্গোপাধ্যায়ের ‘নারীবাঘিনী’ প্রবন্ধ নিয়ে বিতর্কের সূত্রপাত হয়। শুধু লেখক নয়, পুরুষের কাতারে দাঁড়িয়ে সমানভাবে কার্যসম্পাদনে নারীরা যে অসমর্থ, কমলাবালা গঙ্গোপাধ্যায়ের লেখাতেও তা সুস্পষ্টভাবে ফুটে ওঠে। এর প্রতিবাদে মিসেস এম. রহমান, শৈলবালা ঘোষ জায়ার পাশাপাশি আরও অনেকে তাঁদের কলম তুলে ধরেন। ‘সন্ধ্যা-প্রদীপে’ নারীর মুক্তি ও অধিকারের পক্ষে ও বিপক্ষে নারীরাই লেখনী ধারণ করেন। একজন গবেষক বলেছেন : অভিযোগ, অনুযোগ, উত্তর-প্রত্যুত্তর, দাবি এবং বিদ্রোহ নিয়ে আরও অনেক লেখা ধূমকেতু তে ছাপা হয়। সব রচনাই মহিলাদের। হিন্দু মহিলাদের মধ্যে বিন্দুবাসিনী রায়, চঞ্চলা দেবী, মহামায়া দেবী, চারুশীলা মিত্র এবং আরও অনেকেই এই বাগযুদ্ধে অংশ নেন। মুসলিম নারীসমাজের মুখপাত্র হিসেবে একমাত্র মিসেস এম. রহমানেরই পাঁচটি প্রবন্ধ-নিবন্ধ প্রকাশিত হয়। কাজী নজরুল ইসলাম সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক পরিম-লে নারীর অবস্থানকে যেমন সুদৃঢ় করতে চেয়েছিলেন, তেমনি অবরোধ ও আবরণের বোঝাকে তুচ্ছ করে তারা সংস্কৃতির স্পর্শে উজ্জীবিত হোক, এটাও ছিল তাঁর হার্দিক কামনা। ধূমকেতু-র ‘সন্ধ্যা-প্রদীপে’ নারীদের মতামত ছাড়াও ছেপেছেন তাদের মুক্তি কামনা-সম্পৃক্ত কবিতার পর কবিতা। নজরুল ইসলামের চোখে শ্রেণিবিভক্ত সমাজে নারীকে শোষণের বিচিত্র কৌশল ধরা পড়েছে। নজরুল তাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্থ অগ্নিবীণা উৎসর্গ করেছিলেন ‘ভাঙা-বাঙলার রাঙা যুগের অনাদি পুরোহিত সাগ্নিক বীর শ্রী বারীন্দ্রকুমার ঘোষ’কে। তৃতীয় কাব্যগ্রন্থ বিষের বাঁশি উৎসর্গ করেছিলেন ‘বাঙলার অগ্নিনাগিনী মেয়ে মুসলিম মহিলা কুলগৌরব… মিসেস এম. রহমানকে’।

নজরুলের সমকালে নারীসমাজের মুক্তির লক্ষ্যে যাঁরা একনিষ্ঠভাবে সংগ্রামে অবতীর্ণ হয়েছিলেন, তাঁদের মধ্যে অগ্রণী ছিলেন বেগম রোকেয়া। তাঁর ঘনিষ্ঠ সহচর হিসেবে কাজ করেছিলেন মিসেস এম. রহমান, বেগম শামসুন্নাহার মাহমুদ ও বেগম সুফিয়া কামাল প্রমুখ। নজরুল তাঁদের সঙ্গে শুধু চিন্তা-চেতনাতেই একাত্ম ছিলেন না, তাদেরকে কর্মপ্রেরণায় উদ্দীপ্ত করার ব্যাপারেও ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত ছিলেন। এ কারণে বিষের বাঁশি প্রকাশের পর তাঁর সাম্যবাদী ও সর্বহারা প্রকাশিত হলে সেখানে তাঁর নারীজাগরণের সার্বিক চেতনা বাক্সময় হয়ে ওঠে। সাম্যবাদী কাব্যগ্রন্থের ‘নারী’ কবিতায় নজরুল যে বিষয়টির প্রতি সমধিক গুরুত্ব আরোপ করেছেন, সেটা আর কিছু নয়, নারী ও পুরুষের সমানাধিকারের প্রসঙ্গ। পুরুষতান্ত্রিক সমাজে কখনও কখনও মৌখিকভাবে নারী ও পুরুষের সমানাধিকারের ব্যাপারটি স্বীকার করা হলেও কার্যত তা থেকে যায় অপাঙ্ক্তেয়। ‘নারী’ কবিতায় তাই তাঁর ঘোষণা :

‘সাম্যের গান গাই,

আমার চক্ষে পুরুষ রমণী কোন ভেদাভেদ নাই।

বিশ্বের যা-কিছু মহান সৃষ্টি চিরকল্যাণকর,

অর্ধেক তার করিয়াছে নারী, অর্ধেক তার নর।

বিশ্বে যা-কিছু এল পাপ-তাপ বেদনা অশ্রুবারি,

অর্ধেক তার আনিয়াছে নর, অর্ধেক তার নারী।’

 

নজরুল দেখেছেন পৃথিবীর সব কাজেই নারীর অংশীদারিত্ব রয়েছে। সমাজ-প্রগতির চাকা পুরুষ একাই সচল রাখেনি, সেখানে সতত প্রয়োজন হয়েছে নারীর উৎসাহ আর প্রেরণা, সর্বোপরি তার সাহচর্য। তিনি দৃষ্টান্ত হিসেবে তুলে ধরেছেন জগদ্বিখ্যাত তাজমহলের কথা, সম্রাট সাজাহানের কথা, যাঁর অন্তরের প্রেমবোধে উদ্দীপ্ত হয়ে সহস্র শ্রমিকের শ্রমের ফসলস্বরূপ যাঁর স্মরণে গড়ে ওঠে সেই শ্বেতমর্মরের স্মৃতিসৌধ, তিনি হচ্ছেন একজন নারী। এমনকি পথিবীর যুদ্ধ-বিগ্রহে বিজয় কেবল একজন বীরের শক্তিমত্তায় অর্জিত হয়নি, সেখানেও প্রয়োজন হয়েছে একজন নারীর অনুপ্রেরণা। কবি তাই বলেন :

‘কোনকালে একা হয়নি ক’ জয়ী পুরুষের তরবারি,

প্রেরণা দিয়াছে, শক্তি দিয়াছে বিজয় লক্ষ্মী নারী।’

 

কিন্তু নারীর সেই মহিমা স্বীকার করা হয় না, রচিত হয় না তার যথাযোগ্য ইতিহাস। কবি তাই যথার্থই বলেন :

‘জগতের যত বড় বড় জয় বড় বড় অভিযান,

মাতা ভগ্নী ও বধূদের ত্যাগে হইয়াছে মহীয়ান।

কোন রণে কত খুন দিল নর, লেখা আছে ইতিহাসে,

কত নারী দিল সিঁথির সিঁদুর, লেখা নাই তার পাশে।

কত মাতা দিল হৃদয় উপাড়ি কত বোন দিল সেবা.

বীরের স্মৃতি-স্তম্ভের গায়ে লিখিয়া রেখেছে কেবা?’

 

নারীর কাছ থেকে প্রেরণা, এত সাহচর্য গ্রহণ করেও পুরুষ জাতি যুগ যুগ ধরে তাদের নানাভাবে কোণঠাসা করে রেখেছে, অবরুদ্ধ করে রেখেছে তার সত্তাকে, হরণ করেছে তার স্বাধীনতা। তাই নজরুলের ঘোষণা : ‘পুরুষ আজ জালিম নারী আজ মজলুম।’ পুঁজিবাদ যেমন সব কিছুকে পণ্যে পরিণত করে, সব-কিছুর মধ্যেই যেমন অর্থের সদর্থকতা খোঁজে, নারীদেরও তেমনই মানবিক মহিমার দৃষ্টিতে বিবেচনা করে না কোনোভাবেই। ফলে এই সমাজে নারীর বিপর্যয় অবধারিত। নজরুল নারীর এই অবমাননা সম্পর্কে তাঁর রুদ্রমঙ্গল গ্রন্থে একটি ঘটনার বিবরণ দিয়ে অবহেলিত নারীর প্রতি পুরুষের মনোভাবের ছবি এঁকেছেন এইভাবে, ‘মারামারি চলিতেছে। উহারি মধ্যে এক জীর্ণা-শীর্ণা ভিখারিণী তাহার সদ্যপ্রসূত শিশুটিকে বুকে চাপিয়া একটি পয়সা ভিক্ষা চাহিতেছে। শিশুটির তখনও নাড়ি কাটা হয় নাই। অসহায় ক্ষীণ কণ্ঠে সে যেন এই দুঃখের পৃথিবীতে আসার প্রতিবাদ করিতেছিল। ভিখারিণী বলিল, ‘বাছাকে আমার একটু দুধ দিতে পারছি না বাবু। এইমাত্র এসেছে বাছা আমার। আমার বুকে একফোঁটা দুধ নেই।’ তাহার কণ্ঠে যেন বিশ্ব-জননী কাঁদিয়া উঠিল। পাশের একটি বাবু বেশ একটু ইঙ্গিত করিয়া বিদ্রুপের স্বরে বলিয়া উঠিল, ‘বাবা! এই ত চেহারা, এক ফোঁটা রক্ত নেই শরীরে, তবু ছেলে হওয়া চাই।’

‘ভিখারিণী নিষ্পলক চোখে তাকাইয়া রহিল লোকটার দিকে। সে কি দৃষ্টি। চোখ দুটো তার যেন তারার মতো জ্বলিতে লাগিল। ও যেন নিখিল হতভাগিনী নারীর জিজ্ঞাসা। এমনি করিয়া নির্বাক চোখে তাহারা তাকাইয়া থাকিয়াছে তাহারই দিকে- যে তাহার সর্বনাশ করিয়াছে। আমি যেন তার দৃষ্টিতে অর্থ বুঝিতে পারিলাম। সে বলিতে চায়, ‘পেটের ক্ষুধা এত প্রচণ্ড বলিয়াই ত দেহ বিক্রয় করিয়াও সে ক্ষুধা মিটাতেই হয়।’

নারী জাগরণের অন্যতম অগ্রদূতী, মিসেস এম. রহমানও উপলব্ধি করেছিলেন পুরুষ জাতি আপনার স্বার্থসিদ্ধির জন্যই নারীদের বন্দিনী করে রাখে হেরেমের চার দেয়ালের মধ্যে। এখানে লোভী পুরুষের পাশব প্রবৃত্তি ছাড়া আর কিছুই সম্পৃক্ত থাকে না। নজরুল তাঁর নাগ-মাতা মিসেস এম. রহমানের জবানিতেই যেন বলেছেন :

‘নারীদের এই বাঁদি করে রাখা অবিশ্বাসের মাঝে,

লোভী পুরুষের পশু-প্রবৃত্তি হীন অপমান বাজে।

আপনা ভুলিয়া বিশ্বপালিকা নিত্য কালের নারী

করিছে পুরুষ জেল দারোগার কামনার তাবেদারী।’

 

যারা কোরআন, হাদিস, ফেকার দোহাই দিয়ে নারীদের সভ্যতার আলোক থেকে দূরে রাখতে চায়, তাঁদেরকে মিসেস এম. রহমান ‘ব্যবসায়ী’ বলেছেন। এই ব্যবসায়ী শাস্ত্রানুসারীরা নিজেদের সুবিধাবাদকে অটুট রাখার জন্যই সুবিধা মতো ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ করে থাকে। নজরুল এরই জের ধরে বলেছেন :

‘বলে না কোরআন, বলে না হাদিস, ইসলামী ইতিহাস,

নারী নর-দাসী, বন্দিনী রবে হেরেমেতে বারোমাস?

হাদিস কোরআন ফেকা লয়ে যারা করিছে ব্যবসাদারী,

মানে নাক তারা কোরানের বাণী- সমান নর ও নারী।

শাস্ত্র ছাঁকিয়া নিজেদের যত সুবিধা বাছাই করে

নারীদের বেলা গুম হয়ে রয় গুমরাহ যত চোরে।’

 

বস্তুত নজরুল তাঁর কাব্যসাধনার অন্তর্লোকে এ সত্যটুকু উপলব্ধি করেছিলেন যে, পৃথিবী থেকে অন্যায়-অত্যাচার ও অবিচার দূর করতে হলে প্রতিবাদ আর বিদ্রোহ ছাড়া অন্য কোনো পথ নেই। তাই তিনি নারী জাতিকে অধিকার সচেতন হওয়ার আহ্বান জানিয়েই ক্ষান্ত হননি। এ ক্ষেত্রে পুরুষ জাতিকে যুগ-যুগান্তের বদ্ধমূল ধারণা আর নারীকে দমিত করার মনোভাব পরিত্যাগেরও আহ্বান জানিয়েছেন সমগুরুত্বের সঙ্গে। নারীকে দাসীরূপে রাখা হয়তো যুগপ্রাচীন প্রচল। কিন্তু বর্তমান সভ্যতার আলোকে উদ্ভাসিত পুরুষদের নারীকে শোষণ ও তাকে দাসত্বের নিগড়ে বেঁধে রাখার পুরোনো মনোভাবের পোষকতার বিরুদ্ধতা করে বলেছেন :

‘সে যুগ হয়েছে বাসি,

যে যুগে পুরুষ দাস ছিল নাকো, নারীরা আছিল দাসী!

বেদনার যুগ, মানুষের যুগ, সাম্যের যুগ আজি,

কেহ রহিবে না বন্দি কাহারও, উঠিছে ডঙ্কা বাজি।’

 

শুধু যুগের দাবিই নয়, মানবতাবাদী দৃষ্টিতেও পর্যবেক্ষণ করলে দেখা যাবে যে পরপীড়ন অন্যায় ও গর্হিত। পুরুষ জাতি যেভাবে নারীদের ওপর অত্যাচার ও পীড়ন চালায়, হয়তো কালক্রমে যুগের ধর্ম পাল্টালে পুরুষকেও তার স্বাদ নিতে হতে পারে। নজরুলের তাই ঘোষণা :

‘নর যদি রাখে নারীরে বন্দী, তবে এর পর যুগে

আপনারি রচা ঐ কারাগারে পুরুষ মরিবে ভুগে!

যুগের ধর্ম এই-

পীড়ন করিলে সে পীড়ন এসে পীড়া দেবে তোমাকেই।

শোনো মর্ত্যরে জীব!

অন্যেরে যত করিবে পীড়ন, নিজে হবে তত ক্লীব।’

 

এছাড়া কবি এও উপলব্ধি করেছেন যে, পৃথিবীর বিনির্মাণে যে ‘জ্ঞানের লক্ষী, গানের লক্ষী, শস্যলক্ষী নারী’ পুরুষের পাশাপাশি অংশ নিয়েছে, তাদের উপেক্ষিত রেখে এককভাবে পুরুষের অবিমিশ্র সাফল্য আসতে পারে না। ফলে তাকে উপেক্ষা করা এক হিসেবে দেশের ও জাতির অকল্যাণেরই নামান্তর। নজরুল পুরুষ জাতিকে তাই নারী সম্পর্কে সজাগ করতে চেয়েছেন এই বলে :

যে দেশে নারীরা বন্দিনী, আদরের নন্দিনী নয়,

সে দেশে পুরুষ ভীরু কাপুরুষ জড় অচেতন রয়।

অভিশপ্ত সে দেশ পরাধীন, শৌর্য-শক্তি-হীন,

শোধ করেনি যে দেশ কল্যাণী সেবিকা, নারীর ঋণ।

নারী অমৃতময়ী, নারীকৃপা-করুণাময়ের দান,

কল্যাণ কৃপা পায় না, যে করে নারীর অসম্মান।’

 

শুধু নারীমুক্তির বাণী নয়, পুরুষ কর্তৃক নারীর স্বাধিকার ও স্বাতন্ত্র্য হরণের বিরোধিতা করেই ক্ষান্ত হননি, নারীজাতির উত্থান ও বিজয় সম্পর্কে সুনিশ্চিত আশার বাণীও ঘোষণা করেছেন নজরুল উদ্দীপ্ত ভাষায় এই বলে :

‘সেদিন সুদূর নয়

যেদিন ধরণী পুরুষের সাথে গাহিবে নারীরও জয়।’

 

দেশ ও দেশান্তরে বর্তমানে পুরুষের কণ্ঠে নারীমুক্তির যে জয়গান শোনা যায়, সে তো কাজী নজরুল ইসলামেরই মিশনারিসুলভ কর্মযোগেরই কল্যাণে। আমার এই উচ্চারণে অতিরঞ্জনের কোনো অবকাশ নেই।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

You may have missed

shares