প্রবন্ধ

পিতামহীর ভুবন ও আরও কিছু কথা

সনৎকুমার সাহা

‘পিতামহীর পাখি আমাকে অবাক করেছে। একেবারে অন্যরকম লেখা। তাই বলে বিচিত্র হবার ঝোঁকে বাড়তি রং মেখে হাটের মাঝখানে সঙ সেজে দাঁড়ানো নয়। ঢাক-ঢোল পিটিয়ে লোক জুটিয়ে সবার চোখে পড়ার চেষ্টাও নয়। নিজের কথা সম্পূর্ণ নিজের মতো করে বলা। কোনো ভান নেই। সত্য অনুভবের সঠিক বাহনের খোঁজে আন্তরিক। সেই খোঁজ কথার ঝাড়াই-বাছাইতে ফুটে ওঠে। সেখানে চৈতন্যের শাসনই প্রধান। আর কোনো প্রসাধনের প্রলোভন তাঁকে বিচলিত করে না। জীবন-ভাবনার নানাছক নানাতত্ত্ব পথের পাশে ঝরে পড়ে। জীবন তবু এগিয়ে চলে। পিতামহী আপনার এই একান্ত জীবনের চলমান-ছবি পেছন ফিরে দেখেন- যতদূর দেখা যায়, ততদূর। দেখার ছবি কথায় ওই রকমই পর পর আসে। অন্য মিশেল নেই। অন্যের চোখ ধার করে তা দিয়ে নিজের দেখার চেষ্টাও নেই। কথার নির্মাণ- অবশ্যই নির্মাণ, এবং সে কারণে মেধার পরিচর্যার নিয়ন্ত্রণাধীন- আবেগে ও মননে খাঁটি হয়ে ওঠে। এই খাঁটিত্ব রচনায় প্রাণসঞ্চার করে। জীবনের অন্তর্গাঢ়, একই সঙ্গে অন্তর্গূঢ়, নির্যাস অভিজ্ঞতার চড়াই-উৎরাই বেয়ে স্মৃতি ও স্বপ্নের প্রবাহে চুঁইয়ে চুঁইয়ে পড়ে। তা শিল্প হয়।

জাহানারা নওশিনের লেখা আগেও পড়েছি। তা থেকে পিতামহীর পাখি-র সম্ভাবনার কথা মনে জাগেনি। তাঁর কোনো উপন্যাস বা বড় আকারের লেখা চোখে পড়েনি। বৃক্ষে বৃক্ষে বিষ কবরী সাহিত্য-সমালোচনার বই। এতে তাঁর পছন্দের ও মেজাজের যে আভাস মেলে তাতে আত্মগত ভাবনার পক্ষপাতিত্ব তেমন ফুটে ওঠে না। সমাজবাস্তবতায় প্রত্যক্ষের দ্বান্দ্বিক বিন্যাসেই যেন নজর পড়ে বেশি। তাঁর সাহিত্যিক রুচি ও ঔচিত্যবোধের ওপরও তার ছাপ পড়ে। গল্প সংকলন, ‘বহে না যে নদী’তে নানারকম ভাব নিয়ে একটু-আধটু পরীক্ষা-নিরীক্ষা যে নেই, তা নয়। তবে বৃহত্তর পরিসরে নিজেকে তিনি মেলে ধরবেন, এমন ইংগিত পাই না। কোনো লেখাই তার সীমা অতিক্রম করে আরও কিছুর তৃষ্ণা জাগায় না। কোথাও এমন কিছু মনে ধরে না, যা জীবনের সমস্তটার ওপর আলো ছড়ায়। আমরা পড়ি, ভালো লাগে, আবার ভুলেও যাই। তিনি লেখেন। তাঁর উপস্থিতি টের পাই। কিন্তু বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে তাঁকে দেখতে হবে, এমনটি মনে হয় না।

এখন দেখছি, আমার হিশাবে ভুল ছিল। পিতামহীর পাখি বীজাকারে লুকিয়ে ছিল বহে না সুবাতাস-এই। তিন পৃষ্ঠার এক গল্প- একই নামে- প্রকৃতপক্ষে বড় রচনাটির মুখপাত। ওইভাবে, ভাষায় কোনো রদবদল না এনে পরেরটির শুরু। আঙ্গিকে সামান্য একটুখানি তফাৎ। সামান্য, কিন্তু তাৎপর্যপূর্ণ। ছোটগল্পে প্যারাভাগ আছে। উপন্যাসে নেই। নদীর মতো ভাবনার বিরতিহীন প্রবহমানতারই বুঝি এটা ইংগিত। ছোটগল্পের ছোট পরিসরে ওই প্রবহমানতার দূরান্বয়ী ব্যঞ্জনা ফুটিয়ে তোলা মুশকিল। তবে ছোটগল্পে পিতামহীর পাখি আলাদা করে তেমন কিছু ভাবায় না। আমরা পড়ে যাই, এইমাত্র। বিপুল স্ফুরণের আয়োজন যে তার ভেতরে ভেতরে কাজ করে চলে, আমরা বুঝতেই পারি না।

আজ প্রতিমার পূর্ণাবয়ব আমাদের সামনে। ‘বড় বিস্ময় লাগে’। এই অসামান্যের প্রত্যাশা আমাদের ছিল না। ছোটগল্পে নয়, অন্য লেখাতেও নয়। বাইরের সাজ-বাজ ঝেড়ে ফেলে জাহানারা নওশিন এখানে নিজের সঙ্গে একা, মাথার ভিতরে বয়ে চলে সময়ের উজান স্রোত। তাতে ভেসে আসে- ভেসে যায় কত স্মৃতি কত তৃপ্তি-অতৃপ্তি ভরা ব্যর্থতায়- চরিতার্থতায় মেশা স্বাদ-গন্ধ-বর্ণময় চলমান জীবনের এলোমেলো ছবি। ছেদহীন। অন্তহীন। কারণ চেতনায় তাদের আসা যাওয়া ওই রকমই। তাদের অনুভব অবিকল ওইভাবে তিনি লেখায় সঞ্চারিত করায় মন দেন। ‘তপের আসনে’ বসেন। পিতামহীর পাখি সেই অশ্রুভরা বেদনাঘন তপস্যার হৃদয় নিংড়ানো ফল। বিনম্র প্রণামে তিনি তা অঞ্জলি দেন মহাকালের যাত্রাপথে নিয়ত ধাবমান জীবনেরই পদতলে। তাঁর প্রসারিত দৃষ্টি অকৃত্রিম কল্যাণ এষণায় সম্মুখের ওই জীবনের সমগ্রকে স্পর্শ করে।

তবে এইটিই তার বিশিষ্টতার একমাত্র কারণ নয়। লেখকের অভিপ্রায় অবশ্যই চিনে নেবার বিষয়; ব্যতিক্রমী হলে আমাদের দৃষ্টিও আকর্ষণ করে। কিন্তু শিল্পসিদ্ধির জন্যে তা যথেষ্ট নয়। অভিপ্রায় কীভাবে আকার পায়, অনুভবের সঞ্চয় কেমন করে শরীরী ও সচল হয়ে উদ্ভাসিত চেতনার আকাশ দৃশ্যময় করে তোলে, এবং সেই দৃশ্যপ্রবাহকে চোখের সামনে অবিনশ্বর ঝুলিয়ে রেখে তাতে অমরতার অভিসার জাগায়, এগুলো দিয়েই ওই সাহিত্যপ্রয়াস উদ্দেশ্যের চরিতার্থতায় তার পূর্ণতার বা অপূর্ণতার অভিঘাত আমাদের মনে রেখে যায়। আমরা তাকে কৃতাঞ্জলিপুটে গ্রহণ করি, অথবা তা থেকে মুখ ফেরাই। পিতামহীর পাখি এই দিক থেকেও আরও আমাদের মনোযোগ কেড়ে নেয়। উদ্দেশ্যর সঙ্গে সংগতি রেখে লেখক তাঁর আঙ্গিক রচনা করেন। শব্দচয়ন ও ভাষার নির্মাণও তার অনুসরণ করে। তাঁর উদ্ভাবনী প্রতিভার সচেতন প্রকাশ আমাদের চিনে নিতে ভুল হয় না। তা যে একেবারে দলছুট, অথবা ঐতিহ্যের আশ্রয়হীন, এমন অবশ্য নয়। কিন্তু বিশ্বসাহিত্যের পটভূমিতে ঐতিহ্যের উপকরণে তিনি যা যোগ করেন, তা একান্তই তাঁর নিজের। সর্বতোভাবে তা তাঁর উদ্দেশ্যেরই অভিমুখী। এবং এখানে তিনি আপোশহীন- গতানুগতিকতার প্রলোভনে বাঁধা পড়েন না, নিতান্ত অভ্যাসের দাসও হন না; নিজের পথ নিজেই কেটে কেটে অগ্রসর হন। সেই সঙ্গে আপন উদ্দেশ্যের রূপায়ণে সৎ থাকেন একশ ভাগ। কোনো আতিশয্যের মিশেল তিনি দেন না। পরের মুখে ঝাল খেয়ে চালাক হবার চেষ্টাতেও তাঁর অরুচি। জগৎ সংসারের বাস্তবতায় আপন অভিজ্ঞতার সত্য উপলব্ধির কাছেই তিনি শুধু দায়বদ্ধ থাকেন। প্রত্যক্ষের মায়াকে সময় প্রতি মুহূর্তে যোগ করে, আর মুছে ফেলে। চেতনায় তার সত্যের ছাপ কিন্তু সে রেখে যায়। তার বিস্তারও ঘটে। আপন জীবনের চলমানতার সঙ্গেই তার বিস্তার। মস্তিষ্কের কেন্দ্রভূমিতে তা নড়াচড়া করে, ঘুরপাক খায়, আবার নতুন নতুন পথ কাটে। জাহানারা নওশিনের তন্নিষ্ঠ চোখ নিবদ্ধ থাকে তার ওপরেই। পিতামহীর পাখি সেই একাগ্রতার ফসল।

বইটি ক্ষীণাঙ্গী। পৃষ্ঠাসংখ্যা মাত্র চৌষট্টি। প্রথম ছয়পাতা আবার রীতিমাফিক নামপত্র ও প্রকাশনার প্রয়োজনীয় তথ্যবিবরণী। তবু এ-উপন্যাসই। আমার বিবেচনায় মহৎ উপন্যাস। তার সংযম ও ঘনত্ব একদিকে যেমন তাকে সংহত করে, অন্যদিকে তেমনি তাতে অবিচ্ছিন্নতার আভাস আনে। এই অবিচ্ছিন্নতা শুধু ওপরে ভাসমান নয়, গভীরেও ডুব দেয়। ফলে ছোট পরিসরে অতি সংবেদনশীল এক মানবীর স্মৃতিসত্তায় প্রবহমান সত্য-অনুভবের পুরো ধারাটাই একরকম উঠে আসে। সব মানবীর নয়, ওই একক মানবীর। কিন্তু পড়ার পর সহমর্মিতায় একাত্মতার সুর অনুরণিত হয় আর সবার ভেতরেও। বিষয় মাহাত্ম্য উপন্যাসেরই। এবং এখানে তা পূর্ণতাও পায়। বিষয়ের পূর্ণতা; শিল্পসুষমারও। বিষয় সরাসরি ঘটনাক্রম অনুসারী নয়। আসলে ঘটনা থাকে পরোক্ষে। ক্রিয়ায়-প্রতিক্রিয়ায় ঘটনা মনোজগতে যে আলোড়ন তোলে, এবং তার স্থায়ী ছাপ স্মৃতিতে যেভাবে বসে যায়, সেইটিই বিষয় গৌরবে অগ্রাধিকার পায়। আমরা তারই চলমান ছবি দেখি। চেতনায় যে ভাবে ফুটে ওঠে, সেই ভাবে তাতে এখন-তখন-তারপরের নিয়ম উলটে- পালটে একাকার হয়ে যায়। এই একাকার হয়ে যাওয়া অনুভবের প্রবাহই এখানে প্রধান। ঘটনারা ইশারা মাত্র। অনুভবের পথ-নির্দেশই তাদের কাজ। তাই ভাঙা-ভাঙা, ছেঁড়া-ছেঁড়া। সুডৌল কাহিনির ধারাবাহিকতা বা অখ-তা নেই। আমাদের অবাধ চিন্তা যেভাবে যায়, এ যেন তারই অনুসরণ। এবং খুব নিবিষ্ট অনুসরণ। ভাবনারা ক্রমাগত কোনো নিয়মের তোয়াক্কা না করে নিজের নিজের মতো উড়ে আসে, উড়ে যায়। সব মিলিয়ে ছড়ানো অনিঃশেষ ছবির মালা। তার ভেতর থেকে কোনো একটিকে সময়ের পটভূমিতে ফেলে বেছে নিয়ে গেঁথে তুললে পূর্বাপর একটি কাহিনি আকার পায়। যেমন বনতলে ছড়িয়ে থাকা নানা ফুলের রাশি থেকে কোনো বিশেষ ফুলের, বা রং মিলিয়ে বিভিন্ন ফুলের মালা গেঁথে তোলা। এটা ভাবনার প্রকৃত প্রবাহ চেনায় না- প্রবাহ থেকে ছেঁকে তোলা এক ভাবনা-প্রতিমা দেখায়। সবার চোখ সেইদিকে টানে। আমরাও ওইভাবে দেখে অভ্যস্ত হয়ে পড়ি। গল্প বা উপন্যাস পাঠ সাধারণত ওই রকম ছেঁকে তোলা কাহিনির পুরো হয়ে ওঠার পেছনে ছোটা।

জাহানারা নওশিন এই অভ্যোসের সংস্কার থেকে বেরিয়ে আসেন। পিতামহীর সারা জীবনের প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তি-সুখ- দুঃখ-স্বপ্ন-বঞ্চনা, এগুলোর অনুভবই প্রধান হয়ে সামনে আসে। আলাদা আলাদা করে নয়, চেতনায় উঠে আসা অবিচ্ছিন্ন এক প্রবাহে ভেঙে ভেঙে জড়াজড়ি করে। অভিজ্ঞতার টুকরো টুকরো অংশ ওখানে অনুভবের স্রোতে মাথা তোলে, আবার মিলিয়ে যায়। ঘটনায় তাদের ক্রমপরিণতি দেখানোয় তিনি উৎসাহী নন। অনুভবের করুণ মাধুর্য যথাযথ রূপায়ণেই তাঁর আগ্রহ। মোটা দাগে পিতামহীর জীবনকাহিনি না পেয়ে আমাদের কারও কারও অভ্যাস-শাসিত কৌতূহল হয়ত অচরিতার্থ থাকে। কিন্তু অনুভবের নির্মাণে তিনি কোনো ফাঁক রাখেন না। ভাবনাপ্রবাহে পিতামহী সম্পূর্ণ হয়ে ওঠেন। এবং তাঁর মতো করে অনন্যও।

শুরুতেই পড়ি, ‘কতিপয় কালো পালকসহ গাঢ় হলুদ রঙের পাখিটি বাড়ির আমডালে বসলে তিনি তাড়াতাড়ি তাঁর পৌত্রীকে ডাকেন। একটি পাখি বা বাতাসে বাতাসে ডালপালার হিন্দোল দেখানোর জন্য প্রায়ই তাঁর পৌত্রীকে ডাকেন। কখও কখনও পৌত্রীর বাবা মাও ছুটে আসে। তখন তিনি কথা বলেন, তাঁর কণ্ঠে তখন সুদূর শালবন বাতাসের স্বনন অথবা অগ্রহায়ণের সাঁঝ বেলাকার কুয়াশা। কখনও ঝাপসা হয়ে আসে কণ্ঠ, কখনও আনন্দের ঝলমলে রোদের উত্তাপ। তখন তিনি অনেক দূরের একটি মাঠ বা ছোট্ট সরু একটি নদীর ধারে ঘুরে ঘুরে বেড়ান।…’ (পৃ. ৭) এই ঘুরে বেড়াবার অনুভব সারি বেঁধে আসে না। চেতনায় বাসা বেঁধে একে অন্যে মিশে থাকে। তিনি তাদের মেশানো ছবিটিই দেখেন। দেখান। কিন্তু সব মিলিয়ে পিতামহীর আন্তরসত্তা সত্য হয়ে ওঠে। ছেঁড়া ছেঁড়া ছবিগুলো ইংগিতের মতো কাজ করে। আমরা তা থেকে পিতামহীর যাপিতজীবনের রসরূপ উদ্ধার করি। সে রস সুধাবিষে মেশা। এবং পুরোটাই আত্মোপলব্ধিতে জারানো। কোনো ভান নেই। অযথা আত্মপ্রচারণা নেই। আর কারো বেঁধে দেওয়া মাপকাঠি ধরে এগোবার চেষ্টাও নেই। সবটাই নিজের মতো করে। তবে উন্মূল নয়। যথেষ্ট ঐতিহ্যসচেতন। জীবনের উন্মোচনে যেমন, তেমনি সাহিত্য নির্মাণেও। কিন্তু কোথাও নকলনবিশির ছাপ নেই।

মার্শেল প্রুস্ত্-এর টাইম রিগেইন্ড্-এর কথা স্বভাবতই মনে আসে। সেখানেও অতীতবিহারী চেতনার উন্মোচন। ‘রাতের সব তারাই আছে দিনের আলোর গভীরে’। সেই তারার মালা আবার নোতুন করে সাজানো। হারিয়ে যাওয়া সময়কে মুষ্টিবদ্ধ করার শিল্পিত সাধনা। আকস্মিকভাবে এক আসরে প্রাচীন চায়ের সুঘ্রাণ ও বেলে বিস্কুটের স্বাদ বিস্মৃতির অতলে চাপা পড়ে থাকা শৈশব স্মৃতি তাঁর জাগিয়ে দেয়। তারই হাত ধরে ফিরে আসে লুপ্ত সময়। আসে অখ- প্রেক্ষাপটে চেতনায় প্রাণ পাওয়া স্মৃতির মানুষেরা-ঘটনার ক্রম মেনে যেমন যেমন, ঠিক তেমন তেমন নয়, উলটে-পালটে একাকার হয়ে। এবং তাদের বাইরের নয়, ভেতরের চেহারাটাই সময়ের দূরত্বে ফুটে ওঠে বেশি। কাছের দেখা নয়, দূরের দেখা। সম্পর্কে ও নিঃসম্পর্কে ইতস্তত মানব-মানবীর সঙ্গে যোগাযোগের মানসিক অভিঘাত অবচেতনের গভীরে খোঁজা। মোটা দাগের বাস্তবতা গলে গলে পড়ে। কারণ স্মৃতিতে তাদের ইন্দ্রিয়গ্রাহ্যতা আর থাকে না। কিন্তু তাদের স্থায়ী বাস্তবতা-প্রকৃত বাস্তবতার পেছনে তাঁর মন ছোটে। ‘টাইম রিগেইন্ড্’ বা ‘রিমেম্ব্রেন্স্ অফ থিংস পাস্ট্’ এই অবিস্মরণীয় অন্তরলোকে যাত্রার ছাপ ধরে রাখে। অন্তর্মুখী আলো তিনি ব্যক্তিসত্তার মর্মতলে কোণে কোণে ফেলেন। আবার তাকে ঘুরিয়ে প্রসারিত করেন বাইরের সব রকম মানব-সম্পর্কের বিচিত্র সম্ভাবনায়। লুপ্ত সময় ফিরে আসে অতীত ঘটনার গতানুগতিক বস্তুনিষ্ঠ বর্ণনায় নয়, তার আন্তরসত্যের উদ্ঘাটনে। এবং তার স্থায়ীভাবের কল্পিত ভুবন নির্মাণে। এই নির্মাণ ভাষায়, যদিও বিষয় প্রত্যক্ষের ঘটনা নয়, ঘটনার সারাৎসার, যা চেতনায় ওই ঘটনারই অনুভবের ছবি কিছু রেখে যায়। তারা নিজের অগোচরেই মাথার ভিতরে অবিরাম বয়ে চলে, মনোজাগতিক এই দৃশ্যমালার সত্য-স্বরূপ ফুটিয়ে তোলাই প্রধান লক্ষ্য হয়ে দাঁড়ায়। এবং এই স্বরূপ বস্তুত বহুমুখী ও অনেকান্তিক। প্রুস্ত্ তাঁর ভাষাকেও গড়ে তোলেন এই লক্ষ্যের অনুসারী করে।

জাহানারা নওশিনের পিতামহীকে স্মৃতির জগতে টেনে নিয়ে যায় হঠাৎ হঠাৎ উড়ে আসা পাখিরা- হলুদ, কালো, নানা রঙের, এবং কালের সাক্ষী রাত জাগা পেঁচাও। প্রুস্তের সুগন্ধী চা ও বেলে বিস্কুটের মতোই তারা অনুঘটক-স্মৃতির সুতোয় টান দিয়ে যায়, আর, তারপর, পিতামহী যেমন বলেন, নিজের ‘ভেতরে গুটিয়ে রাখা সুতোর লাটাই হুড়মুড় করে পাকে পাকে’ খুলে যায় ‘ফেলে’ আসা জগৎ… ঘরের ভিতর ঢুকে পড়ে’, এবং ‘তোমার বর্তমান এবং তোমার বয়স মুছে গিয়ে তুমি তোমার অতীত জীবনের মধ্যে ঢুকে গেছো মুহূর্তের চেয়ে কম সময়ে’। (পৃ. ২১) সাহিত্য নির্মাণের এই জায়গায় প্রুস্তের ধাঁচের সঙ্গে ভাবগত মিল অবশ্যই দেখবার। কিন্তু এই পর্যন্তই। তারপরেই পিতামহীর পাখি মেজাজে ও বক্তব্যে আলাদা হয়ে যায়। পিতামহীর জগৎ প্রুস্তের জগৎ নয়। তাঁর জীবনভাবনার পরিমণ্ডল তাঁকে আপন জায়গায় নিবিষ্ট করে। তিনি সেখান থেকে বিচ্যুত হন না। প্রুস্তের মতো সন্ধানী দৃষ্টির তীক্ষ্ণ শলাকায় নিজের ভেতরে ব্যবচ্ছেদ ঘটান না,- দুঃখ-সুখের লক্ষ ধারাকে অস্তিত্বের সমগ্রতায় শুষে নেন। ওই পূর্ণ সত্তায় পিতামহীর আনন্দ-বেদনার অভিব্যক্তিই আমরা পাই। আপন অভিজ্ঞতার অনুভব থেকে এই অভিব্যক্তি উঠে আসে। তাঁর ভাবনার বিস্তার ও সীমাও তা রচনা করে। তিনি তার বাইরে পা ফেলেন না।

যদিও পিতামহীর জীবনবৃত্তান্ত এখানে পরোক্ষে, চোখের সামনে তাকে খুলে দেখানো লেখকের উদ্দেশ্যও বোধ হয় নয়, তবু ওই জীবনের বাঁকে বাঁকে যে কথা রচিত হয়, স্মৃতির কোটরে যা একটু একটু করে জমতে থাকে, আর চেতনার ঘূর্ণিপাকে ওপরে উঠে এলে স্রোতের টানে আবার ভেসে যায়, তারই রেশ ধরে ধরে মনের আঙিনায় যেমন যেমন তাদের আসা-যাওয়া, তেমন তেমন এলোমেলো আলোর ইশারায় তাদের ছুঁয়ে ছুঁয়ে এই উপন্যাস এগোয়। কাহিনি নয়, আবছা রেখায় তার ইংগিতটুকু আমরা পাই। পরিপূর্ণ অনুভবের জগতে তারা পথ দেখায়। পিতামহীর ‘জরাগ্রস্ত চামড়ায় যখন হাজার বছরের সমুদ্রের ঘূর্ণি এবং পাতালদর্শী ফাটল’, তখন ‘জলচুড়ি শাড়ির স্রোতে তিনি ভাটির টানে ফিরতে থাকেন। ভাসতে ভাসতে কুনুর নদীর কিনারা ঘেঁষে দাঁড়ালে একটি ছিপছিপে তরুণ পাশে এসে থামে। তার চোখের তারায় সমস্ত আকাশের নীলিমা ঝিম ধরে থাকে, চারপাশের হু হু বাতাস থেকে থেকে কুনুরের জলে লুটিয়ে পড়ে। হাতখানি বাড়াতেই কোথাও কিছুই থাকে না, শুধু কিছু স্বপ্ন হেসে হেসে চলে যায়।…’ (পৃ. ৮-৯) কৈশোর প্রেমের এই আভাস দিয়েই স্মৃতি অন্যখাতে বয়। পরে আবার এক জায়গায় আচমকা ভেসে ওঠে। – ‘কুনুরের মাঝির বাঁশি অক্লান্ত বাজতেই থাকে, পিঠে লম্বা বেণি ঝুলিয়ে গাছকোমর বাঁধা শাড়ি জড়ানো কৃষ্ণাঙ্গী এক তরুণী নতজানু সমর্পণে পুষ্পাঞ্জলি রাখে বংশীবাদকের দুটি পায়ে। রাতের দিগন্ত জোড়া মাঠে তখন শরতের দুপুর কি আনন্দে যে ধ্বনিত হয়ে ওঠে। পাতার মর্মরে, কাশবনের নিশ্বাসের শিসে জীবন জেগে ওঠে, জীবনের জন্যে। বংশীবাদকের কোমল দৃষ্টি ছুঁয়ে থাকে কৃষ্ণাঙ্গীর চোখ।’ (পৃ. ২৩-২৪) রূপকের আশ্রয়ে যে ছবি প্রাণময়ী হয়, সে কিন্তু অচিরেই শূন্যে মিলায়। আমরা পড়ি, ‘তারপর তারা দুজনে রেলপথের সড়ক ধরে হেঁটে চলে যায় সম্মুখে- সোজা। রেলপথের দুটি পাটি পাশাপাশি সমান্তরাল-দিগন্ত পেরিয়ে, কোথাও মেলে না।’ (পৃ. ২৪) বুঝতে পারি, কাক্সিক্ষত পরিণাম আর আসেনি। বিচ্ছেদের ব্যবধান স্থায়ী হয়ে ধরা থাকে কেবল স্মৃতিতে কাহিনির পূর্বাপর বিন্যাস ছাড়াই অনুভবে পূর্ণাঙ্গ বৃত্ত এক রচনা করে।

একই রকম একটি-দুটি অর্ধস্ফুট ছবি নববিবাহের মুহূর্তে আশাভঙ্গের নিঃশব্দ হাহাকার ধরে রাখে। আমরা দেখি তাঁর চেতনার পর্দায় ওই মুহূর্তটিকে- ‘একটু আগে ভরা পূর্ণিমার বাসররাতে বন্দনাহীন উপচারহীন, পেলব মেদুর কোন কণ্ঠে স্তুতিহীন অন্ধকারে দ্বন্দ্ববহুল মৃত্যু হলো একটি কুমারীর। ধর্ষিতা বালিকা এখন বারান্দার খুঁটিতে হেলান দিয়ে শ্রাবণের পূর্ণ চাঁদ দেখে, তারাদের নীল আলো দেখে। নীলের গোলকে ঝলকে ঝলকে পৃথিবীর সব রং ঝরে পড়ে। বালিকা চোখের জলে সেই রং গুলে নেয় তার করপুটে তারপর ঊর্ধ্বমুখে পান করে আকণ্ঠ। তার ঠোঁটে মুখে সেই রং লেগে থাকে আজীবন, ধ্বক ধ্বক করে জ্বলে, ঘন কুয়াশায় ম্রিয়মাণ হয় না, শত বর্ষার জলেও ধুয়ে যায় না- ’ (পৃ. ১২) স্বপ্নভঙ্গের বেদনা পরে আর একবার চিন্তাস্রোতে মাথা তোলে। (পৃ. ৩১) আবার মিলিয়ে যায়। এ প্রসঙ্গ আর আসে না। তবু সবটাই যেন লেখা হয়ে যায়। ঘটনার ঘনঘটার প্রয়োজন করে না

আপন সন্তানেরা পিতামহীর ভাবনায় ফিরে ফিরে আসে- বুকভরা ভালোবাসায় ও বুকভাঙা ক্রন্দনে- দেবশিশুর মতো আত্মজগণ, লীলাকমল হাতে নর্তকীর ভঙ্গিতে আত্মজা,- বেঁচে থাকার তাগিদ তাদের দূরে ঠেলে, বেঁচে থাকার আগুন তাদেরও পোড়ায়। অসহায় পিতামহী দেখেন, ‘লেলিহান শিখার ভিতর দাঁড়িয়ে মানববন্ধন, তাদের মধ্যে দাঁড়িয়ে আত্মজা ও আত্মজগণ দু’হাত তুলে মুক্তি প্রার্থনা করে। পিতামহীর জরায় পিঙ্গল দুখানি হাত উড়ে যেতে চায় আত্মজ রক্ষায় বিপুল আশ্বাসে- কোথাও কি কোনো করুণার জলে সিক্ত হবে না এই নিষ্ঠুর নিয়তির মতো অগ্নিবৃষ্টি? বদ্ধ পাখির মতো ঝটপট ডানা ঝাপ্টায় প্রাণ পাঁজরের হাড়ে, খাঁচা ভেঙে বেরিয়ে আসতে চায় হৃৎপিণ্ড-ধমনীর সমস্ত রক্তরাশি-অগ্নিনিবারক-ঢেলে দিতে চায়। নিরুপায় পিতামহী নতজানু – কার কাছে, কৃপাভিক্ষায়বিনত তাঁর দেহ কার কাছে, কার কাছে!-’ (পৃ. ২৯-৩০)

কিন্তু এখানেও কোনে কাহিনিরেখা নেই। তাতে আমরা ফাঁপরে পড়ি না। কারণ পিতামহীর বেদনার্ত আকুতি ঠিকই ভেসে আসে এবং সেইটিই এখানে মূল বিষয়।

তবে তাঁর ভাবনা এইখানেই বাঁধা থাকে না। আপনজনদের ঘিরে শৈশব সমস্ত মাধুর্য নিয়ে তাঁর জাগ্রত চেতনায় ফিরে ফিরে হাতছানি দিয়ে যায়। ফেলে আসা প্রকৃতি ও পরিবেশ সেই সঙ্গে জীবন্ত হয়ে চোখের সামনে ভেসে ওঠে। তার ভাপ মুখে এসে লাগে। আবার সেখান থেকে চেতনা স্রোত ঝট করে চলে আসে দুঃখকাতর বর্তমানে, যেখানে শুধুই মধুর স্বপ্নের অবসান, আর, বঞ্চনার হাহাকার। অকরুণ মারের সাগরে তিনি সাঁতরে চলেন একা। মানবী-সম্ভব মনের জোরে সব ক্ষতি ও ক্ষত পিছনে ফেলে কেবল আপন সন্তান-সন্ততির নয়, বিশ্ব চরাচরে সকল মানুষের সমস্ত সত্তার কল্যাণের জন্যেই প্রার্থনা করেন তিনি; হার মানেন না। এবং মানুষের অন্তর্গত শুভবোধে আমাদের ভঙ্গুর বিশ্বাসকে এই হার-না-মানা আবার সংহত করে। ‘একটুখানি মাটি একটুখানি ছায়া আর একটুখানি রোদের তাপ’কে আমরা চেতনার শেষ বিন্দু পর্যন্ত আঁকড়ে থাকার প্রেরণা পাই।

তবে এই সব নয়। বিষয়ের সঙ্গে সংগতি রেখে পিতামহীর পাখি যে ভাষার আবহ রচনা করে, তা শুধু আমাদের দৃষ্টি আকর্ষণই করে না, তার সম্মোহনেও আমরা পাকে পাকে জড়াই। নিরবচ্ছিন্ন চেতনাপ্রবাহের স্বয়ংক্রিয় ছবি কথামালার নিপুণ বিন্যাসে পরপর এঁকে যাওয়া কোন সহজ কাজ নয়। জাহানারা নওশিন উপন্যাসে রচনায় এই দুরূহের পথে পা বাড়ান, এবং সফলও হন। বিরতিহীন যেমন ভাবা, তেমন লেখা, এমন একটা ধারণার পেছনে তা ছোটে ঠিকই, কিন্তু ওই ধারণা গভীর মনঃসংযোগের পরিণাম। মনঃসংযোগ চেতনাপ্রবাহের ওপরেই। কীভাবে কারও চিন্তাস্রোত নিজের অগোচরেই মাথার ভিতরে অবিরাম বয়ে যায়, নিবিষ্টচিত্তে তারই পুঙ্খানুপুঙ্খ গতিপ্রকৃতি অনুধাবন আবশ্যকতা পায়। পরে একান্ত ভাবনার এই ছাঁচে ফেলে চেতনাপ্রবাহের একটি নমুনা খাড়া করাই লক্ষ্য হয়ে দাঁড়ায়। বিষয়টি আদৌ এলোমেলো বা বিশৃঙ্খল থাকে না। যদিও চেতনাপ্রবাহে বহুবিচিত্র পরস্পর অসংলগ্ন অসংখ্য ভাবনারাশির ছবি ক্রমাগত ওঠে আর ডোবে, ভেসে যায়-আবার ফিরেও আসে। মুক্ত অবাধ এই সমগ্রতার যথাযথ রূপায়ণে লেখককে অচঞ্চল মনে ধীরস্থির ভাবে ধ্যানে বসতে হয়। দৃষ্টি প্রসারিত করতে হয় যতদূর দেখা যায় আপন অন্তরের ভেতরেই। সেখানে যে চলমান ছবি ভেসে ওঠে, তার সবটুকুকে চেতনায় শুষে নিয়ে তারই আদলে তিনি গড়ে তুলতে চান তাঁর কথাসাহিত্যের মন্ময় জগৎ।

কবিতার একটি সংজ্ঞা আমরা অনেক আগে পড়েছি,- ‘ইমোশনস রিকলেকটেড ইন ট্রাংকুইলিটি’। চেতনাপ্রবাহের ব্যাপারটাও ‘রিকলেকটেড ইন ট্রাংকুইলিটি’। তবে শুধুই ইমোশনস নয়, চৈতন্যের পটে প্রবহমান সবকিছু- কথা, ছবি, সব। এবং তা তাদের মত করেই- অঙ্গাঙ্গি জড়ানো হরেকরকম অসংখ্য টুকরোর গতিময় সমাহার। তাদেরই নিয়ে জেগে ওঠে চৈতন্যের সুষমা। লেখকের চূড়ান্ত লক্ষ্য সেইটিই। আপাতদৃষ্টে মনে হতে পারে, এ সহজিয়া সাধনা। কিন্তু কাজটা গভীর অভিনিবেশ দাবি করে। নিজের কাছে একশভাগ সৎ না থাকলে সাহিত্যের কারবারে ভেজালের মিশেল ঢুকে পড়তে পারে। অথবা কেউ স্বেচ্ছায় তা ঢুকিয়ে দেয়। সাহিত্যের মর্যাদা তাতে ক্ষুণ্ণ হয়। সিদ্ধকাম কোনো লেখকের উদ্ভাবিত ছক সামনে থাকলে কেউ কেউ তার ফাঁদে পড়ে তাতেই মজে যান, এবং মজে থাকেন। অনুকরণ কথাসাহিত্যে প্রাণপ্রতিষ্ঠায় ব্যাঘাত ঘটায়। মেকি জিনিস তাৎক্ষণিকভাবে মন ভোলালেও ভেতরে নিজস্ব উপলব্ধির সত্য তাগিদ না থাকলে তার বাইরের রং-সাজ একসময় খসে পড়ে। শুধুই খোলসটা নির্জীব পড়ে থাকে। পিতামহীর পাখি পড়ে এমনটি মনে হয় না। এ সত্যিকারের খাঁটি জিনিশ। চেতনাপ্রবাহে পিতামহীর হৃৎপিণ্ডের স্পন্দন অব্যাহত বাজে। তাঁর নিজস্ব জগতে নিজস্ব স্মৃতির উন্মোচনে ভাষার নির্মাণ বিশিষ্ট হয়ে ওঠে। নির্মাণের অনন্যতা তার মহিমাকে নির্ভুল চিনিয়ে দেয়।

মনের ভেতরে ডুব দিলে বুঝি, চেতনাপ্রবাহে একাধিক ভাবনার এলোমেলো অবিরাম উদয় হয়। সবই যে স্বেচ্ছাকৃত বা পূর্ব-নির্ধারিত, এমন নয়। বস্তুজগতের সঙ্গে মনোজগতের বিরতিহীন সংকর্ষণ, এবং মনোজগতের অন্দরমহলেও নানা অনিয়ন্ত্রিত আলোড়ন চেতনার পর্দায় ছবির পর ছবি এঁকে যায়। তার কোনটি যদি প্রধান হয়ে উঠে পরিণতির দিকে এগোয়, অথবা সেইভাবে যদি তাকে চিহ্নিত করি, তবে চেতনাপ্রবাহে অন্য ভাবনারাশি তার পরিপ্রেক্ষিত বা পটভূমি রচনা করে। চেতনাপ্রবাহের যথাযথ প্রতিস্থাপনায় তারা কেউই অপাঙক্তেয় থাকে না। সবাই নিজের নিজের মতো এসে যায়। ভিড় করে গায়ে গায়ে লেগে থাকে। তাদের নিয়েই লেখকের নির্বাচিত প্রধান ভাব অগ্রসর হয়। চিত্রকলায় যেমন জমির কাজ, এও অনেকটা সেই রকম। ‘পরিপ্রেক্ষিত’ নামে একটি রচনায় কমলকুমার মজুমদার ইশারায় জানান (‘ঠাকুর বলেন, কথা ইশারা বটে’- এটি তাঁর কাছে বীজমন্ত্রের মতো), ‘বাক্য যখন গীতে, ঘটনাপ্রবাহ যখন বাক্যঅভিধায় তখন শুধুই যুক্তিবিতর্ক- কিন্তু আবার এমনও আছে যে গীতগোবিন্দ যখন চিত্রকল্প, শব্দায়মান মানসিকতা যখন অপরাহ্ণ অপরাহ্ণ যখন অমোঘ নির্জনতা-মহিমান্বিত দুঃখ, তখনই তাহা বাঁশির সুস্বন গাম্ভীর্য সৃষ্টি করে। আমরা জানি গ্রাহ্যবস্তুর সহিত সঙ্গীতের বস্তুর (ঙনলবপঃ সঁংরপধষ) বিভিন্নতা বর্তমান, এবং ইহাও আমাদের ধারণা গল্পের বস্তুত্বের নিজস্ব কাঠামো আছে এবং তাহাকে, গল্পত্বকে আমাদের খুঁজিয়া বাহির করিতে হইবে।’

চেতনাপ্রবাহে এই খোঁজার চেষ্টা তাঁর গল্পে-উপন্যাসে খুবই পাই। পরিপার্শ্বে গল্পত্ব মিশে থাকে। তাকে নিয়ে তার ভেতর দিয়ে গল্পের রেখা এঁকেবেঁকে ঘুরেফিরে তিনি টেনে নিয়ে যান। ‘গীতগোবিন্দ-চিত্রকল্প, শব্দায়মান মানসিকতা যেমন বাঁশির সুরের পরিপ্রেক্ষিত,  তেমনি চেতনাপ্রবাহের প্রকৃত বিস্তারে অসংখ্য পার্শ্বভাবনায় সংলগ্ন থেকে গল্পের গল্পত্বের প্রকাশ। খেই ধরে রাখা অবশ্য সহজ নয়, বিশেষ করে বিষয় যদি বিষয়ত্বে পৌঁছোয়,- বিমূর্ত ভাব স্বয়ং যদি ভাষার পিঠে সওয়ার হয়ে ফুটে উঠতে চায়। তাঁর ‘পিঞ্জরে বসিয়া শুক’ নিয়ে তাই বলতে হয়, ‘এমন কি একটি বালকের পাখির প্রতি ভালোবাসার গভীরতাও মাপা গেল না এ জীবনে’। চেতনায় পরিপার্শ্বের বিপুল বিচিত্র বহুমুখী সংবেদনার ঘাত-প্রতিঘাতের প্রতি বিশ্বস্ত থাকতে গিয়ে গল্পের গল্পত্ব থেকে চোখ সরে সরে যায়। পরিপার্শ্ব গল্পের সহযোগী না হয়ে প্রতিযোগী হয়ে ওঠে। উভয়ের ভেতর সঠিক তালমিল না থাকলে গল্পের প্রাণবস্তুর চাপা পড়ে যাবার আশংকাও উড়িয়ে দেওয়া যায় না। তবু পরিপার্শ্বের অবলম্বনেই গল্পের হয়ে ওঠা এবং জোরটাও সেইখানেই। দ্রোণের কাছে অস্ত্রশিক্ষার সময়একদিন যুধিষ্ঠির যেমন শরনিক্ষেপের লক্ষ্যবস্তু গাছের মাথায় রাখা মাটির পাখির সঙ্গে চারপাশের প্রকৃতি ও মানুষ সবই দেখেছিলেন, এও তেমনি। লক্ষ্যভেদে যদি নাও ঘটে তবু চেতনাপ্রবাহের অনুসরণে এমনটিই গ্রাহ্য। অর্জুনের একাগ্রতা শিল্পসিদ্ধির অন্তরায়। পরিপার্শ্ব অভীষ্টে গুণারোপ করে, অথবা তার অন্তর্নিহিত গুণ ফুটিয়ে তুলে, তার সত্যে পাঠককে বশীভূত করবে, বিষয়ভাবনার নির্মাণকলায় এই প্রক্রিয়াই প্রত্যক্ষের জায়গাজমি অনেকখানি দখল করে নেয়।

চেতনাপ্রবাহের কথকতায় প্রুস্ত যে অতিবিশিষ্ট ভাষাশৈলী নির্মাণ করেন এবং কমলকুমারও যাকে আদর্শ মানেন বলে প্রতীয়মান-  তাতে একটুকরো ভাবনাচিত্রের অংশ থেকে অন্যচিত্রের খণ্ডাংশে অবিরল যাতায়াতের স্বতঃস্ফূর্ত স্বাভাবিকতা বাক্যের মুক্তবিন্যাসের সম্প্রসারিত পরিসরে অবিকল অনুরূপ প্রক্রিয়ায় ফুটিয়ে তোলা একটা প্রধান লক্ষ্য হয়ে দাঁড়ায়। এতে বাক্যবিন্যাসে উদ্দেশ্য-বিধেয়র প্রথাসিদ্ধ একমুখিনতার জায়গায় বহুমুখী শাখাপ্রশাখার পরস্পর সংলগ্ন ছড়ানো চেহারা একসঙ্গে দেখা ও দেখানোর চেষ্টা অনিবার্যভাবে আমাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। বাক্যে উদ্দেশ্য বহুবল্লভা হয়ে গল্পের গল্পত্বকে টেনে নিয়ে যাবার পথ খোঁজে। চেতনাপ্রবাহের বাক্যরূপ চেতনাপ্রবাহের ক্রিয়ারূপের মতোই হাজির হতে চায়। আমাদের পরিচিত খোলস থেকে বেরিয়ে এসে বাক্য এবং সব মিলিয়ে ভাষার নির্মাণ অন্যরকম হয়ে ওঠে। আমাদের অনভ্যস্ত চোখ ও মনকে তা উদ্দেশ্যপ্রণোদিত আঘাতে সচকিত করে তোলে। অবশ্যই আমরা চমৎকৃত হই।

পিতামহীর পাখি-র ভাষার বৈশিষ্ট্য বোঝার জন্যে এই কথাগুলো বিশেষ করে বলা। চেতনাপ্রবাহের কারবারি হয়েও জাহানারা নওশিন একই পথের পথিক নন। বাইরে না ছড়িয়ে ওই প্রবাহকে তিনি প্রথমে অন্তরে উপলব্ধি করেন, তারপর তার পরম্পরার শিল্পিত ছবি ফুটিয়ে তোলেন। একই বাক্যে বহু ভাবের মিশেল তিনি দেন না। যদিও বিভিন্ন ভাবের এগিয়ে পিছিয়ে অবিরাম চলাচল তাদের সম্মিলিত যাত্রায় বাক্যপ্রবাহে পরপর আসতে থাকে। তা নৈরাজ্যিক হয় না, অষ্টাবক্রও না,- বরং বিনম্র নিবেদনে এক সুসম্বন্ধ সুষমায় পূর্ণতার দিকে ধায়। চেতনার অন্তঃস্রোত ঠিকই ধরতে পারি। তা বিশ্বাসযোগ্যতা হারায় না। সততার সঙ্গে তার অনুসরণের অনুভবেই আমরা ঋদ্ধ হই। ভাষার নির্মাণে সেজন্য কোনো আতিশয্য প্রশ্রয় পায় না। তা সত্ত্বেও ভাষা স্বয়ং বর্ণে-ব্যঞ্জনায় মেদুর হয়ে ওঠে। এবং নোতুন। স্মৃতিতে জড়ানো সত্য অভিজ্ঞান তাকে গড়ে তোলে। একান্তভাবে তা ওই পিতামহীর। যেমন :

জগদ্দল পাথরের মতো ভারী জীবন তাঁকে দু’হাতে আটকে রাখে। দুদিকে সামনে এবং পেছনে অন্ধকার ভরা অনন্ত গুহায় যেন আটকে থাকেন, হাতড়ে বেড়ান, কি যে খোঁজেন তা কি তিনিই জানেন? তবু জেগে ওঠে স্বপ্ন; হয়তো বা সহস্র স্মৃতিতে বাল্যকাল জায়নামাজ গুটিয়ে যিনি এইমাত্র অপার্থিব দৃষ্টিতে দুটি তালগাছের মাথায় সূর্যের স্থান পরীক্ষা করেন, তালগাছের কর্কশ শক্ত পাতাগুলি তরবারির মতো আস্ফালন করে যাঁকে মুহূর্তে মুহূর্তে শাসায় তবু যিনি কেবলই নিমফুলের গন্ধমাখা সন্ধ্যার মতো উষ্ণ আবেশে সংসারকে জড়িয়ে রাখেন সেই তিনিই এখন সারা উঠোন জুড়ে ধপধপে সাদা পদ্মের মতো অনেক শিশু, রাজহাঁস, কতিপয় মেষশাবক এবং তুলোর কুণ্ডলীর মতো এক ঝাঁক কুক্কুটশাবককে পরম উল্লাসে খেলা করতে দেখেন। মহাকলরবে মানুষ ও জীবজন্তু মিলে স্থানটিকে শংকাহীন একটি প্রান্তরের রূপ দিলে সেই তাঁর মুখে হাসি ফুটে ওঠে। রমণীয় সেই নিঃশব্দ হাসি ছড়িয়ে যায় বাড়ির অন্ধকার কোণাগুলো পর্যন্ত। পিতামহীর দোলনা চেয়ার দোলে চাঁদের মতো গোল কাঁসার থালায় সাদা জুঁইফুলের মতো ভাত বাড়া হয়। ভাতের নরম গন্ধে এবং বাষ্পে শিশুদের কলরব সিদ্ধ হয়। উষ্ণ কিছু শব্দ, ক্ষুব্ধ কিছু বিড়বিড়ানি এ সময় শোনা যায়। ‘খেতে দাও’ বলে পিতামহী চিৎকার করে উঠলে পৌত্রী ছুটে এসে কালো ভ্রমরের মতো চোখ দিয়ে পিতামহীকে দেখতে দেখতে হেসে ফেটে পড়ে তুমি এখন খেতে চাইছ কেন? পিতামহী পুরোপুরি জাগ্রত হন। হেসে বলেন, খেতে চাইলাম নাকি? হ্যাঁ হি হি হাসিতে পৌত্রী এঁকেবেঁকে ঢলে পড়তে চায়। পিতামহী বিরক্তিসূচক শব্দ করলে পৌত্রী থেমে যায়। তখন তিনি স্পষ্ট উচ্চারণে হাজার বছরের ফাটল ধরা ডাঙ্গাজমির অনিঃশেষ দুঃখের কথা বর্ণনা করেন বৃষ্টি নাই, আকাশের কোণে মেঘ নাই। আষাঢ় যায় শ্রাবণ যায় বৃষ্টি নাই। ভাদ্রের চাঁদি ফাটানো চড়া রোদে শুকিয়ে ওঠে কালো-পাথার দীঘি। সেঁচেও পানি নাই, হায় আল্লা পানি দাও, মেঘ দাও, জলের ঐরাবত নামাও। গ্রামের যুবকেরা বাড়ি বাড়ি চাল মাঙে ক্ষির রাঁধবো মসজিদে, কাদা মাখবো পুকুরের। সারা গাঁয়ে ছুটবো কাঁদা ছুঁড়ে ছুঁড়ে, হেই আল্লা বিষ্টি দাও গো, ম্যাগ দাও গো, বিষ্টি দাও। বৃষ্টি হয় না।…’ (পৃ. ১০-১১)

চোখ বুঁজে বই-এর যে কোন পাতা খুলে ইচ্ছামতো যেকোনো জায়গা থেকে পড়তে শুরু করলেই এই গদ্যের বৈশিষ্ট্য ধরা পড়ে। জীবনের যতটা দেখা যায়, তার সবটুকুর পটভূমিতে সময়ের ওপর তার অনায়াস চলাফেরা। এক জায়গায় থেমে থাকে না। একাভিমুখীও কখনো হয় না। কখনও পেছনে ছোটে আবার পর মুহূর্তেই সামনে। পিতামহীর অস্থির বিক্ষিপ্ত ভাবনাকেই শুধু অনুসরণ করে। এ জন্য ভাষায় হঠযোগের প্রয়োজন করে না। কিন্তু অনুভবের জগৎ ঠিকই উন্মোচিত হয়। তার স্বাদ বর্ণ-গন্ধ সবই পাঠকের চেতনায় নিবিড়তা পায়। এবং তারা পিতামহীর নিজস্বতাকেও চিনিয়ে দেয়। জাহানারা নওশিন বাংলাভাষার সমৃদ্ধ ঐতিহ্যে অনুগত থেকেছেন। বোঝা যায়, রবীন্দ্রনাথ, অবনীন্দ্রনাথ, বিভূতিভূষণ তাঁর মজ্জায় মিশে আছে। কিন্তু তিনি তাদের পেরিয়ে একান্ত আপন একটি ভূখণ্ড রচনা করেন। তা সর্বতোভাবে তাঁর চেতনার অনুসারী। এবং সে কারণে বিশিষ্ট ও অনন্য। একই সঙ্গে সার্থকতায় অসামান্য। রাঢ়বাংলার মানুষ ও প্রকৃতির ঘ্রাণ যেন উঠে আসে তাঁর ভাষায়। সরাসরি প্রত্যক্ষের মায়া রচনায় ততটা নয়, যতটা তার ভাববস্তুর অনুভবকে জাগিয়ে তোলায়। এ জন্য তাঁকে আঞ্চলিকতার আশ্রয় নিতে হয় না। স্নিগ্ধ শিষ্ট রুচিশীল ভাষাই, ওই অনুভবকে আমাদের মনের গভীরে পৌঁছে দেয়। আমরা অভিভূত হই।

তাই বলে এ বই পড়তে কোথাও যে আমার একটু-আধটু তাল কাটে না, এমন নয়। বিশেষ করে মাঝে মাঝে গোটা রবীন্দ্র সংগীতের উদ্ধৃতি যেন বাহুল্য মনে হয়। চেতনায় টুকরো টুকরো ভাসমান স্মৃতির উজানস্রোতে তা বেমানান। ভাঙা ভাঙা গানের কলি, একটি দুটি পদ হয়ত ওই প্রবহমান মিশ্রণে খাপ খেয়ে যায়। ভাবের যথার্থতা বা গভীরতাও বাড়ায়। কিন্তু গোটা গানের উচ্চারণ যেন আমাদের থামতে বলে তার দিকে মনকে সরিয়ে নিতে চায়। তাতে মূল স্রোতের বাইরে ঠিকরে পড়ার আশঙ্কা থাকে। বুঝতে পারি, প্রিয় গানগুলো জাহানারা নওশিনের চেতনায় একাকার হয়ে মিশে আছে। তাঁর কাছে কথায়-গানে ভেদাভেদ আর থাকে না। কিন্তু উপন্যাসের বিষয়ে ও তার চারিত্র্যে মাঝেমাঝে পুরো গানের বিরতি ছন্দোপতন ঘটায়। পেছনে আবহসংগীতের মতো যদি তা বাজে, তবে অন্য কথা। কিন্তু এখানে তো তার সুযোগ নেই। স্বয়ং তা চেতনার পরম্পরায় আসে। এবং এসে সবটা শুনিয়ে স্রোতের গতিতে বাধা হয়ে দাঁড়ায়।

সব শেষে আর একটি কথা বলে নিই। কোনো অভিযোগ নয়, স্বপ্নে-বাস্তবে পিতামহীর ভুবনের গণ্ডিটির দিকে শুধু নজর দেওয়া। এই ভুবনে মানুষ তার সুখ-দুঃখ আশা-নিরাশা নিয়ে বাঁচে। ভেঙে যাওয়া স্বপ্ন-কল্পনায় মুখ থুবড়ে পড়ে, আবার স্বপ্ন দেখে, ছোট ছোট চাওয়া-পাওয়ার হিসাবে জোড়া লাগায়, নিজেকে অতিক্রম করে সবার কল্যাণের প্রার্থনা উচ্চারণ করে। দ্বান্দ্বিক বাস্তবতার বিচার-বিবেচনার বা মনের অতল অন্ধকারে আত্মানুসন্ধানের চেষ্টা এখানে আসে না। এদিক থেকে পিতামহীর জগৎ অনেকটাই সরল। সব দ্বন্দ্ব-বিক্ষোভ পিছনে ফেলে তাঁর নিজের মুখোমুখি হওয়া। তিক্ততায় নয়, বিষাদঘন প্রসন্নতায়। আসলে মানুষের মৌলিক স্বরূপে তিনি স্থিতি খোঁজেন। ফলে প্রযুক্তি বিকাশ ও বৈষয়িক উন্নয়ন তার জীবনযাপনে ও জীবনভাবনায় যে জটিলতা আনে, তাকে তিনি অতিক্রম করেন, অথবা তার প্রাথমিক সারল্যে ফিরে যেতে চান। এতে চেতনাপ্রবাহে মনোবিকলনের ছবি ফোটে না, মানব বাস্তবতায় পরিবর্তনের আকাক্সক্ষাও না। এই সব ক্ষণত্বকে পেরিয়ে বিপুল বিশ্বের উত্তরহীন আয়োজনে মানুষের নশ্বরতার, অসহায়তার ও স্বপ্ন নিয়ে বেঁচে থাকার মাধুর্যের চিরকালের আর্তি ও আকুতিই প্রধান হয়ে ওঠে। আজকের পৌত্রির ভিতর পিতামহী আগামীদিনের পিতামহীকে সঞ্চারিত হতে দেখেন। এইভাবে চেতনাপ্রবাহ অনিঃশেষ জীবনপ্রবাহের বার্তা আনে। আমরা এজন্য কোনো নালিশ জানাই না; বরং পিতামহীর সত্যস্বরূপের সামনে আভূমি প্রণত হই।

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

You may have missed

shares