সৈয়দ শামসুল হক সংখ্যা

নাম

সৈয়দ শামসুল হক

 

আশরাফ এসে হুরমত আলীকে বলল, ‘তোমার কোটটা একদিনের জন্যে নেবো কিন্তু।’ ওরা দুজনে সেই কবেকার বন্ধু। এমন বন্ধুত্ব যে সেখানে কোনো ধার চাইতে লজ্জা নেই, যে দেবে বিস্ময় নেই তারও।

‘নিও, নিশ্চয় নিও। তোমার চাকরিটা হওয়া দরকার।’

হ্যাঁ তাই, আশরাফ কেমন যেন সংশয়-চেরা কণ্ঠে বলে। বহুদিন হলো ওর কোনো কাজ নেই। একটা কাজ ছিল, কোম্পানিটা হঠাৎ উঠে যাওয়ায় বেকার হয়ে পড়ে। মাইনে মন্দ ছিল না। বউ আর দুটি ছেলে নিয়ে সংসার চলে যেত কোনো রকমে। স্বাচ্ছন্দ্য ছিল না সত্যি, কিন্তু তার বউ কি আশ্চর্য উপায়ে ঐ সামান্য কটি টাকায় মাসের শেষ অবধি সংসার চালিয়ে নিয়ে যেত। মাসের শেষ দশবারো দিন মাছ জুটতো না সত্যি, কিন্তু সামান্য ব্যঞ্জনও মধুর করে রান্না করতে পারত তার বউ। শেষের কদিন পায়ে হেঁটে ফিরত আশরাফ, কিন্তু পড়ন্ত বিকেলে দ্রুত ব্যস্ত শহর, মানুষ সূর্যাস্ত দেখতে দেখতে বাড়ি ফিরতে তার নিতান্ত মন্দ লাগতো না।

এরই মধ্যে এক নিপুণ ম্যাজিশিয়ানের মতো তার বউ কিছু টাকাও সঞ্চয় করে ফেলেছিল। আশরাফকে সে বলত, তার জন্যে এবার একটা সাইকেল কিনে দেবে। কথাটা শুনে অবধি বিস্ময় তার কাটেনি। সাইকেল কেনার মতো টাকা তার স্ত্রীর হাতে হয়েছে, তার স্ত্রী জমাতে পেরেছে, জানতে পেয়ে অবধি আশরাফের ভেতরটা মমতায় উদ্বেল হয়েছিল।

ঠিক সেই সময়ে চাকরিটা চলে গেল আশরাফের।

সে বলতে পারেনি তার স্ত্রীকে। যেন কোম্পানি তার জন্যেই উঠে গেছে এবং সমস্ত দোষ তারই। চাকরি যাবার পরদিনও সকালে উঠে অফিস যাবার মতো তাড়াতাড়ি ভাত খেয়ে বেরিয়ে পড়েছে। সারাদিন পথে পথে ঘুরে হুরমতের সঙ্গে দেখা করে, ফুটবলের মাঠে খেলা দেখে, বাড়ি ফিরেছে। যেন অফিস থেকে ফিরল এবং প্রথম দিনেই স্ত্রীকে যা সে বলতে পারেনি আজ এই এক বৎসরেও তা আর বলা হয়নি।

দ্বিতীয় দিনে হুরমতকে বলেছে সব। হুরমত আলী তার বাল্যবন্ধু। একসঙ্গে একই ইস্কুল থেকে ম্যাট্রিক পাস করেছিল ওরা। ফাইনালে ওরা পাশাপাশি সিটে বসে পরীক্ষা দিয়েছিল। হুরমতের অংকের খাতা লিখে দিয়েছিল আশরাফ। অংকে তার মাথা ছিল পরিষ্কার। অংকে তারা দুইজনেই লেটার পেয়েছিল। হুরমত এখন ব্যবসা করে।

চাকরি যাবার কথা শুনে হুরমত বলেছিল, আশরাফ যদ্দিন চাকরি না পায় সে কিছু কিছু না হয় তাকে সাহায্য করবে। বন্ধুত্বই এ রকম যে হুরমত তাকে নিজের অফিসে কেরানির কাজ নেবার জন্যে আশরাফকে বলতে লজ্জিতবোধ করেছে। আশরাফ স্বপ্নেও ভাবতে পারে না হুরমতের চাকরি সে করবে। এ যেন দুটি সহোদর ভাইয়ের মতো টান। একজন যত ছোট হোক না কেন, অভাবের দিন নিঃসঙ্কোচে সাহায্য নিতে পারে কিন্তু অধীনে কাজ করার কথা ভাবতে পারে না।

আশরাফ দুটি টিউশানি নিয়েছিল। তার স্ত্রী এই এক বৎসরেও টের পায়নি যে তার স্বামীর চাকরি নেই। মাসের পয়লা তারিখে আগের মতোই আশরাফ এনে টাকা তুলে দিল। আগের চেয়ে অংকটা কিছু কম হতো। স্ত্রী জিজ্ঞেস করবার আগেই আশরাফ কৈফিয়ৎ দিয়েছে, তুমিই তো বলেছিলে। তাই অফিসে দুপুরে ডিম দিয়ে নাশতা করছি। ক্যান্টিনের মাসকাবারি বিল দিয়ে এ-ই হাতে আছে।

হুরমত আলীও মাঝেমধ্যে চেষ্টা করেছে, তার যাতে একটা চাকরি হয়। ইন্টারভিয়ের দু’একটা ডাকও এসেছে। কিন্তু শেষ অবধি কাজ হয়নি কোথাও।

একদিনে হুরমত আলী তার কাজের জন্যে মাসের মধ্যে পনের দিন থাকে ঢাকার বাইরে। কখনো কখনো এ রকম হয় যে, মাসের পয়লা তারিখেই হয়তো সেই বাইরে। আশরাফকে তখন মিথ্যে কথা বলতে হয় বাড়িতে। বলে, এ মাসে মাইনে একটু দেরিতে হবে।

কেন দেরিতে হবে, তার কোনো ব্যাখ্যা সে ভালোভাবে দিতে পারে না। আশরাফ এই প্রথম তার স্ত্রী যে হাবাগোবা এজন্যে বিরক্ত বোধ করে না।

আজকাল হুরমত আলীর ওখানেই সারাদিন কাটে তার। সে বুঝতে পারে না, তার নিজের অজান্তে তার পৃথিবী হুরমতকে ধীরে ধীরে কেন্দ্র করে তোলে। হুরমত তাকে আশা দিলে আশান্বিত হয়, হুরমতকে বিষণ্ণ দেখলে সে বেদনাবোধ করে। আগে কত কিছু নিয়ে তর্ক করত হুরমতের সঙ্গে, এখন দেখে হুরমতের মতামতগুলো কত যুক্তিসিদ্ধ। সে তার সব কথাতেই এখন মাথা নেড়ে সায় দেয়। হুরমত যখন তার কোনো কর্মচারীর ওপর ক্রুদ্ধ হয় তখন আশরাফও বিরক্তবোধ করে সেই কর্মচারীর ওপরে। ব্যবসার নতুন কোনো পরিকল্পনার কথা যদি হুরমত শোনায় তো আশরাফ দীর্ঘকাল ধরে ব্যাখ্যা করতে থাকে যে এই পরিকল্পনার চেয়ে উত্তম কিছু আর নেই। খাতা পেন্সিল নিয়ে হিসেব করে দেখাতে থাকে এতে লাভের অংক শতকরা একভাগ বেড়ে যাবে।

হুরমত কিভাবে তা সে জানতে পারে না। কিন্তু কখনো কখনো সে এলে, কিংবা অনেকক্ষণ কথা বলতে থাকলে, হঠাৎ মাঝপথে কাগজপত্র নিয়ে বড় ব্যস্ত হয়ে পড়ে অথবা জরুরি কাজ আছে ভাই বলে বেরিয়ে যায়। আশরাফ তখন চুপ করে ঘণ্টার পর ঘণ্টা পরম ধৈর্য্যরে সঙ্গে বসে থাকে। বসে বসে হুরমতকে লক্ষ করতে থাকে, যেমন বর্শেল তাকিয়ে থাকে। যদি হুরমতের ঠোঁটের কোণে অকারণে হাসির আভা ঝিলিক দেয়, বর্শেলের মতোই সে খপ করে সুতোয় টান দেয় ঘনিষ্ঠ হবার চেষ্টা করে। সব সময় সফল হয় না। মাছ পালিয়ে যায় কখনো কখনো।

হুরমতের অফিসে বসে তারই কাগজে তারই টাইপরাইটারে লিখে দিনের পর দিন দরখাস্ত পাঠায় আশরাফ। ঠিকানাটাও হুরমতেরই দেয়া। কখনো কখনো হুরমত, দরখাস্তের সঙ্গে দেবার জন্যে। হুরমত আলীকে ঘিরে সে বাঁচতে চায়, তার অস্তিত্বের অবলম্বন খোঁজে। স্বপ্ন দেখার অভ্যেস তার ছেলেবেলা থেকে, প্রায় কোনো রাতই ফাঁকা যায় না। আজকাল হুরমত তার স্বপ্নের প্রধান চরিত হয়ে উঠেছে।

ইন্টারভিউয়ের সকালে হুরমতের কোটাটা যে চেয়ে নিল। বিদেশি একটা ফার্মে চমৎকার একটি কাজ। সেখানে কেতাদুরস্ত হয়ে না গেলে হয়ত চোখেই ধরবে না তাকে। তার ওপর ডিসেম্বর মাস, একটি কোট গায়ে না থাকলে নিজেকে বড় দরিদ্র, বড় নগ্ন মনে হয়।

কোটটা একমাপ বড় হলো তার। কিন্তু সেটা খতিয়ে দেখার অবকাশ পেল না আশরাফ। গায়ে দেবার সঙ্গে সঙ্গে এক অনির্বচনীয় উষ্ণতা তাকে ঘিরে ধরল- কোটের ভেতরে সিঙ্কের আস্তরের অসংখ্য মসৃণতা তাকে রোমাঞ্চিত শিহরিত করে তুলল। এক মুহূর্ত সে কোনো কথা বলতে পারল না। তার মুখে নির্বোধের, বালকের, একটা অর্থহীন হাসি লম্বিত হয়েই রইল।

হুরমত বলল, একটু বড় লাগছে না?

চমক ভাঙে আশরাফের। দ্রুত স্খলিত কণ্ঠে বলে, কই না। না তো। ঠিকই আছে। যেন তার ভয় হয়, এক্ষুনি কোটটা খুলে রাখতে বলবে হুরমত। মনের মধ্যে কেমন যেন ভয় হয়, সে ভয় যতটা না বিনা কোটে ইন্টারভিউ দিতে যাওয়ার সম্ভাবনায় তার চেয়ে হয়ত কোটের এই জীবন্ত উষ্ণতা থেকে বঞ্চিত হবার ভাবনায়।

সে পকেটে হাত ঢুকিয়ে আঁকড়ে ধরে। বলে, বেশ চলে যাবে। কোট একটু ঢিলাঢালা হলেইবা কি? কি বলো।

যাক, চলে যাও। উইশ ইউ গুড লাক। সাড়ে দশটায় না তোমার ইন্টারভিউ।

হ্যাঁ, সাড়ে দশটায়।

আশরাফের সবকিছু কেমন যেন স্খলিত, স্থানভ্রষ্ট হয়ে যাচ্ছে হঠাৎ। সে তড়বড় কথা কটি বলে বেরুতে গিয়ে চৌকাঠে একটা হোঁচট খায়, মুখ ফিরিয়ে অর্থহীন হাসে হুরমত আলীর দিকে, তারপর বেরিয়ে যায়। তার শরীরে যেন হালকা, নরম, উষ্ণ একটা জীব উঠে বসেছে। কাঁধের ওপর একটা প্রিয় ভার অনুভব করতে থাকে সে। কোটের ভেতরে হাত দুটো যখন দুলতে থাকে চলবার তালে তখন সিল্কের আস্তরের শিরশির মসৃণতা যেন তার হাত দুটোর সঙ্গে খেলা করতে থাকে।

এবারে মাইনে পেয়েই এ রকম একটা কোট করতে সে দেবে। এতদিনে যেন সে স্পষ্ট বুঝতে পারে হুরমত আলীর সঙ্গে তার ব্যবধান শীতের সঙ্গে উষ্ণতার। আশরাফের একটা প্রবল আকাক্সক্ষা হয উষ্ণতার জন্যে। ধার করা উষ্ণতায় গা ডুবিয়ে সে স্বপ্নগ্রস্তের মতো পথ চলতে থাকে।

সারাটা পথ তার মাথার মধ্যে উষ্ণতার ফুল ফুটতে থাকে। কোটটাকে সে বারবার স্পর্শ করে দেখে। কেমন একটা নিষিদ্ধ উত্তেজনা হয়। হুরমত আলীর চেহারা চোখের সমুখে ভাসতে থাকে। হুরমত আলীর গায়ের গন্ধ তার হয়ে যেতে থাকে; তার নিজস্ব গন্ধটা তাড়া খাওয়া কুকুরের মতো কখন পালিয়ে গেছে।

এবার শীতে সে এ রকম একটা কোট করবে।

ইন্টারভিউ যে অফিসে তার সমুখে এসে দাঁড়ায় আশরাফ। তরতর করে ভেতরে চলে যায়। রিসেপশনিস্ট তার ইন্টারভিউ কার্ড নিয়ে অনেকক্ষণ ধরে দেখে, তারপর তাকে বসতে বলে।

রেক্সিনে মোড়া লম্বা সোফার এক কোণে সন্তর্পণে গিয়ে বসে আশরাফ। পেছন থেকে কোটটা তুলে দেয়, যাতে বসার চাপে ভাঁজ না নষ্ট হয়ে যায়।

হুরমত আলী কি সুগন্ধ ব্যবহার করে? কেমন একটা মিষ্টি ঘ্রাণ পায় আশরাফ। ঘ্রাণটা তাকে স্নিগ্ধ করে না। তার চোখ ভরে হঠাৎ পানি আসে। হুরমতকে এই প্রথম, সে ঈর্ষা করে, ঈর্ষায় তার আঙুলগুলো শক্ত হয়ে উঠে সাঁড়াশির মতো পাকাতে থাকে। হুরমতের সঙ্গে দূরত্ব কি ভীষণ তা বুঝতে পারে। হুরমত যেন তাকে ফাঁকি দিয়ে বড় হয়ে গেছে। সে কেন হুরমত আলী হলো না? সে কেন আশরাফ হলো? ম্যাট্রিক পরীক্ষায় তার অংকের খাতা সে লিখে দিয়েছিল। নিজের খাতা লেখা হয়ে গেছে, তখন খাতাটা চুরি করে অদল বদল করে নিয়েছে ওরা, তারপর হুরমতের খাতা ভরে সে অংক করে দিয়েছে, পরীক্ষার পরে তাকে একটা ছবি দেখিয়েছিল হুরমত সেই সাহায্যের প্রতিদান।

কে যেন তার নাম ধরে ডাকল। সে অভিভূতের মতো উঠে দাঁড়াল। তারপর দরোজা ঠেলে গেল ভেতরে।

সেখানে হুরমত আলীর কোট যেন জীবন্ত উঠল সহসা, তাকে জড়িয়ে ধরল আরো নিবিড় উষ্ণতা দিয়ে। সে বুঝতে পারল, ঘরটা এয়ার কন্ডিশন করা। নাকের ভেতর দিয়ে শিরশির করে ঠান্ডা উঠতে লাগল। কোটটাকে সে শরীরে চারধারে আরো বেশি করে পাবার জন্যে হাত ও বুকের পেশিগুলোকে সঞ্চারিত করবার ব্যর্থ চেষ্টা করল কয়েকবার।

তাকে কেউ জিজ্ঞেস করল, আপনার নাম?

উত্তরটা তার মুখ থেকে যেন গড়িয়ে পড়ল, হুরমত আলী।

এবং সেটা নিজের কানে ধ্বনিত হবার সঙ্গে সঙ্গে সে বুঝতে পারল এ উত্তরে তার কোনো হাত ছিল না। সংশোধন করতে চাইল। কিন্তু তার বাকযন্ত্র যেন অবশ হয়ে গেছে। আর কাজ করতে চাইছে না।

দুধ-শাদা আলোয় ডোবা বিশাল টেবিলের উপরে থাবা তুলে বসে থাকা তিন প্রৌঢ়, বিরল-কেশ, চশমা পরিহিত ভদ্রলোকের দিকে তাকিয়ে সে বিড়বিড় করে কি যেন বলতে চাইল এবং সূক্ষ্ম এত সূক্ষ্ম তবু সে বুঝতে পারল বিরক্তি প্রকাশ করলেন। একজন চাপা চন্দ্রালোকের মতো হাসির আভাস তুলে বললেন, আমরা দুঃখিত। এ নামে কোনো ইন্টারভিউ ডাকা হয়নি। নিশ্চয়ই কোথাও কোনো গোলমাল হয়েছে।

এবং আরেকজন ইন্টারকমের বোতাম টিপে রিসিপশনিস্টকে আদেশ করলেন, আশরাফ হোসেনকে পাঠিয়ে দাও। আমি তাকেই পাঠাতে বলেছিলাম।

 

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

shares