সৈয়দ শামসুল হক সংখ্যা : পিয়াস মজিদ

সৈয়দ শামসুল হক সংখ্যা

সৈয়দ শামসুল হক :

কবিতায় যাঁর জন্ম-জন্মান্তর

পিয়াস মজিদ

 

নিসর্গে তুমি             নতুন বৃক্ষ

নতুন বর্ষা            নতুন ফুল

দিগন্তে          নতুন  মাস্তুল

পিতৃপুরুষের            চিত্রিত দণ্ড

দাউদাউ                       নাপামের

মধ্যে তুমি             হেঁটে যাও

উদ্যত           একাকী

জনশূন্য জনপদে             উজ্জ্বল এক চিতা।

(গেরিলা)

 

সত্তরের দশকে লেখা সৈয়দ শামসুল হকের কবিতা ‘গেরিলা’র পাশাপাশি মিলিয়ে পড়ি ২০০৬-এর একটি কবিতা-

প্রতিবিম্ব জলে যে সুস্থির :

সেও ক্ষণকাল মাত্র।

বালক মৃত্যুর মতো ঢিল হাতে দাঁড়িয়ে কিনারে

কিছুকাল তাকিয়ে দেখল-

তারপর ছুড়ে দিলো হাতের পাথর।

জীবনেরও কিছু কিছু থেকে যায়-

চূর্ণিত হওয়ার নয়-

বরং তা বৃত্তের আকারে

জলে ভেসে যায়-

যেতে থাকে তীরে যেতে যেতে তারপরও।

(প্রতিবিম্ব)

 

দুস্তর সময়-ব্যবধানের এ দুটো কবিতাই সাক্ষ্য দেবে সৈয়দ হকের বিরামহীন নিরীক্ষালগ্নতা। এ নিরীক্ষা যেমন ভাষাকাঠামোর তেমনি আঙ্গিক সংস্থানেরও। একদা এক রাজ্যে দিয়ে যে কবিতা যাত্রা তা ক্রমশ বিচিত্র-বর্ণিল বাঁক ঘুরে পৌঁছেছে সাম্প্রতিক পর্বের নিরাভরণ কবিতামালায়। বৈশাখে রচিত পঙ্ক্তিমালা থেকেই দীর্ঘাবয়বে জাজ্বল্য করা শুরু করলেন সমসাময়িক যাবতীয় তিতবাস্তবতা :

আমার সন্তান।

যেন বাংলার শ্মশানে থাকে দুধে-ভাতে।

 

শ্মশানবাংলা থেকে অতঃপর পাড়ি দেন জগৎ ও জীবনের অনেকানেক নিগূঢ় পরিস্থিতির পানে। আমার শহর কাব্যে চেনা-অচেনা গলি-ঘুপচির সমান্তরালে ইতিহাসের সরল-বক্র পথে পরিভ্রমণের অভিজ্ঞতাকে বাক্সময় হতে দেখি। পরানের গহীন ভিতর সনেটগুচ্ছে তিনি বললেন :

আমার থিকাও দুঃখী যমুনার নদীর কিনার,

আমার তো গ্যাছে এক, কত কোটি লক্ষ গ্যাছে তার।

 

এভাবে সৈয়দ হক হয়ে ওঠেন দুঃখী যমুনাবাদী। দুঃখী বাংলাবাদী।

জীবনানন্দ দাশ কবিতার কথায় ভবিষ্যতে বাংলায় দীর্ঘ কবিতার সম্ভাবনার কথা বলেছিলেন। সৈয়দ হকের কাব্যকাজ যেন তারই সাক্ষ্য। কারণ খ-কবিতার ঔজ্জ্বল্য সত্ত্বেও দীর্ঘ কবিতাতেই যেন তার গরিমা পরিস্ফুট। ১৯৮৪-তে প্রকাশিত অন্তর্গততে কথাকাব্যের অবয়বে বিধৃত হয়েছে রক্তাক্ত একাত্তর। যেখানে আমাদের অপূর্ব ও নৃশংস অভিজ্ঞান :

চোখ ভিজে আসে, চোখ ভিজে যায়,

চোখ ভেসে যায় মানুষের চোখ,

মানুষের তো চোখ আছে,

সে চোখ শুধু দ্যাখে না,

সে চোখ কাঁদে, সে চোখ ভিজে আসে, ভেসে যায়…।

 

অতঃপর কবির সঙ্গে আমাদের চোখও কাঁদে,

অবিরাম ভিজে আসে,

ভেসে যায়,

ভেসে যেতে থাকে।

 

পূর্ণিমার চানের লাহান

… বাংলাদেশের প্রধান দুর্ভাগ্য, ভাষা নিয়ে রাজনৈতিক কূটচাল বহুদিন থেকে চলেই চলেছে… ইংরেজি ভাষার আওতার ভেতরই একজন মার্কিন নিগ্রো কবি, একজন স্কটিশ কবি, একজন আফ্রিকান কবি যদি লৌকিক বাকভঙ্গি, শব্দ এবং উচ্চারণ ব্যবহার করে সার্থক ও স্মরণীয় কবিতা লিখতে পারেন, আমরাই বা বাংলার সে সম্ভাবনা পরীক্ষা করে কেন দেখব না? কখনো কখনো?- পাশাপাশি? অথবা, একই সঙ্গে?

(ভূমিকা-কথন, পরানের গহীন ভিতর ; সৈয়দ শামসুল হক)

ভাষাকে ভালোবাসার দুঃখ কম নয় জেনেও একজন সৈয়দ শামসুল হক চাইলেন জননীভাষা বাংলার সামগ্র্যকে ভালোবাসতে। ভাবলেন নিজের মায়ের সাথে কথোপকথনের ভাষারূপটি কবিতা করে তুলতে। কারণ কবি-মহৎ বলেই তিনি জানেন কবিতার ভিত্তি ভাষা আর সন্তানের ভেতর প্রথম ভাষাবোধ সঞ্চারের ধাত্রীদেবী তো জননী। তাই বলে কোন রকম ভাষা-সাম্প্রদায়িকতার সাথেও তিনি মিত্রতা করেন না। কারণ জননী বাংলার কাব্যভাষার কোনো বিভাজনে তিনি বিশ্বাসী নন। কবি তো জানেন তার থেকেও দুঃখী বাংলার বিস্তীর্ণ যমুনার কিনার। তাই ভাষার বিশেষ ভঙ্গিকে ব্যবহার করেও তিনি নির্বিশেষ বাংলার জননীকণ্ঠের ভাষ্যকার। এভাবে তিনি হয়ে ওঠেন বৃহৎ বাঙালির কবি।

জলেশ্বরীর কবি নিশ্চয়ই অনুভব করেন এই যে আধকোষা নদী, এই যে উত্তরে মান্দারবাড়ি, হরিশাল, হস্তিবাড়ি আর দক্ষিণে নবগ্রাম, শকুনমারি, বুড়িরচর- এই সুদীর্ঘ ল্যান্ডস্কেপজুড়ে ধু-ধু মঙ্গাবাস্তবতা। এখানে থালায় ভাতের বদলে ছড়ানো থাকে পাথর। এখানে জনৈক করিমন বেওয়া একরত্তি ঘুমোবার জায়গা পায় না। শুধু এক করিমন বেওয়াই নয়, এমন লক্ষ করিমন বেওয়ার পায়ে যেন সাঁটা আছে ভূমিহীনতার দুর্লঙ্ঘ্য নিয়তি। তবু এখানে ধরলা-পদ্মা- যমুনা-মেঘনার বাঁকে ভুখানাঙ্গা মানুষের মনে নিত্যই পলি পড়ে। তাই তার আর কিছু না থাকুক পরানটা থাকে। এই পরানটায় আঘাত পড়লে সে তখন  বোঝে না এক মানুষ আরেক মানুষকে ক্যান দুঃখু দ্যায়।

না, লাতিনের কবি নিকানর পাররার মতো প্রতিকবিতা লেখেননি সৈয়দ হক। বরং সনেটের রীতিবদ্ধ আঙ্গিকের ভেতরেই শক্ত হাতে পুঁতে দিলেন তাঁর বিদ্রোহের জয়পতাকা। এই বিদ্রোহ আসলে আত্মআবিষ্কারের পক্ষে কবির দৃঢ় অবস্থানেরই নামান্তর। আধুনিক কবিতার বিরুদ্ধে জনযোগাযোগহীনতার যে অভিযোগ ছিল কবি মনে হয় সে সম্পর্কে পূর্ণ সচেতন। তিনি তো জানেন কবিতা একদা সুর করে জনজমায়েতে গীত হতো। তাই কবিতার কেবল পাঠগ্রাহ্যতা নয়, শ্রুতিগ্রাহ্যতার দিকেও নজর ছিল তার। আর লোকভাষায় ভূ-বাংলার যে লোকনন্দন সংকলন করলেন কবি- তাতে কত যে সপ্তসিন্ধু ও দশদিগন্তের বিস্তার। বাংলার মাটি-জল, বাংলার আলো-হাওয়া, বাংলার পুরাণ-ইতিহাস, বাংলার অশ্রু-রক্ত- হাহাকার, বাঙালির সংগ্রাম ও স্বপ্ন, স্বেদ এবং শিশিরের সাক্ষাৎ পেতে হলে কাল-কালান্তরের পাঠককে এই সনেটমালার কাছে আসতেই হবে।

একশ কিংবা একহাজার বছর পর হয়তো আমাদের বাংলাদেশ আর এখনকার রূপে থাকবে না। হয়তো তেরোশত নদীর স্রোত রুদ্ধ হয়ে যাবে। ছায়াপ্রধান বৃক্ষসকলের মূলে পড়বে বিনাশী কুঠার। রৌদ্র-মেঘের লুকোচুরিও লুট হয়ে যাবে। হয়তো গোটা বাংলায় নেমে আসবে আগ্রাসী অন্ধকার। জেমস জয়েসের লেখায় যেমন ভবিষ্যতের আইরিশ পাঠক খুঁজে পাবে বিলুপ্ত ডাবলিনকে ঠিক তেমনি ভবিষ্যতের বাঙালি পাঠকের স্মৃতিতে আমাদের এই বিশাল বাংলাকে পূর্ণিমার চানের লাহান জ্বলজ্বল রাখবে পরানের গহীন ভিতর নামের একখানা পবিত্র পুস্তক।

ধ্বংসের ভেতর গোলাপজাগরণ

আমাদের স্মরণে আছে সৈয়দ হকের গোলাপের বনে দীর্ঘশ্বাস বইটির কথা। সেখানে উর্দু প্রেম-বিরহের কবিতার মোহন বাংলাভাষ্য তিনি উপহার দিয়েছেন। তবে ধ্বংসস্তূপে কবি ও নগর (২০০৯) বিরল ব্যতিক্রম।

এ কবিতাগুচ্ছ মূলত ১৮৫৭ সালের ভারতবর্ষের আপাতব্যর্থ সিপাহি বিপ্লবের অভিঘাতে কবি-মহান মির্জা আসাদুল্লাহ খাঁ গালিবের দ্বন্দ্বরক্তিম মনোপরিস্থিতির কাব্যভাষ্য :

ছিলো দিল্লি, নগরের মধ্যে ছিলো দিল্লি শাহজাদা,

আরো ছিলো কবি এক। ধ্বংসস্তূপে তামাম সমাধা।

 

চাঁদের মিলাদ নাকি কুলখানি ওখানে এখন!

আরবে নবীর জন্ম বয়ানের জ্যোৎস্নার গুঞ্জন?

 

শোকের ছায়ার তলে ওঠে ওই জিকির তরাসে?

লোবানের ঘ্রাণ পাই, বসে যাই আমিও ফরাসে।

 

আমিও মেলাই কণ্ঠ- উঠছে ক্রন্দন।

জন্ম আর মৃত্যু দেখি পাশাপাশি একই অভিধানে।

 

গাছের পায়ের নিচে ঝরে পড়ে যায়- ফুল ঝরে!

কারো বা গলায় মালা, একই ফুল কারো বা কবরে ॥

(একই ফুল)

এলিজি সৈয়দ শামসুল হকের প্রিয় কবিতাফর্ম। আমাদের অনেকেরই মনে পড়বে তার আকবর হোসেন সিরিজের কবিতার কথা। তবে তার এলিজির বৈশিষ্ট্য একটু আলাদা। কোনো ব্যক্তিকে ঘিরে তার কবিতা যদিও কুঁড়ি মেলে তবে শেষাবধি ফুলে ফুলে তা বৃহত্তর কোনো অভিজ্ঞানে গিয়ে বসন্ত লভে। ধ্বংসস্তূপে কবি ও নগর কবিতামালায়ও আমরা এমনটি লক্ষ করব।

কবিতার ভূভাগে প্রবেশমুখে পাঠ করি কবির ‘ভূমিকা : সবিনয় নিবেদন’। এখানে কবি আলোচ্য কবিতামালা মুঞ্জরণের নেপথ্য উন্মোচন করেন। মির্জা আসাদুল্লাহ খাঁ গালিব (১৭৯৭-১৮৬৯) উপমহাদেশীয় সাংস্কৃতিক মণ্ডলের কবি-মহৎ। ১৮৫৭ সালে যখন ভারবর্ষে ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে হিন্দু-মুসলিমের মিলিত সিপাহি বিদ্রোহ (কার্ল মার্কসের মতে ভারতের প্রথম ঐক্যবদ্ধ জাতীয় সংগ্রাম) সংঘটিত হয় তখন গালিব ষাটোর্ধ্ব কবি; মোগল রাজধানী দিল্লির বাসিন্দা, বাহাদুর শাহ জাফর মোগল বাদশাহ। শাহি প্রতাপ অস্তমিত হলেও সংগীত ও কাব্যসংস্কৃতির চন্দ্রাতপস্নিগ্ধ ছিল দিল্লির লালকিল্লা। বাহাদুর শাহ জাফর নিজে কবিতা লিখতেন। তার নেতৃত্বে লালকিল্লায় নিয়মিত মুশায়েরা বসত। যমুনায় সন্ধ্যাকালীন হাওয়া বইত, রুপার শামাদানে মোম জ্বলত, কবিতা পড়তেন কবি গালিবও। মোগল দরবারের রাজকবি হতে পারেননি গালিব তবে তাই বলে পররাজ্যলিপ্সু দস্যুদের হাতে যখন দেশের স্বাধীনতা বিপন্ন তখন তার দেশপ্রেমী কবিসত্তা নিষ্প্রতিক্রিয় থাকেনি। সিপাহি বিপ্লব ইংরেজ সরকার নিষ্ঠুরভাবে দমন করে। বাহাদুর শাহ জাফর হন নির্বাসিত আর গালিব তার বিল্লীমারানের গলিতে গণহত্যা ও নগরধ্বংসের কালো হাওয়ায় কালাতিপাত করতে থাকেন। থেমে থাকে না কবির কলম। গালিবের হাত থেকে উচ্ছৃত হয় প্রাচীন ফারসি গদ্যভাষায় সাতান্নর বিদ্রোহের স্মৃতিকথা দাস্তাম্বু অর্থাৎ কুসুমগুচ্ছ। কুসুমগুচ্ছ-এ বিধৃত বিপ্লবকালে তার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা, অনুভূতি ও অবস্থান। রক্তাক্ত চরাচরে কবির বিপন্নতা বাক্সময় হয়ে ওঠে স্মৃতিকথার পৃষ্ঠায় পৃষ্ঠায়।

সৈয়দ শামসুল হক গালিবকে নিয়ে কবিতা লেখার কৈফিয়ত দিতে গিয়ে যেন জাজ্বল্য করেন সৃষ্টিশীলতার কতক গুপ্ত সূত্র আর সেখানে গালিবের স্মৃতি আমাদের সত্তায় মিলে তৈরি করে অনুপম এক যুগলবন্দি :

১৮৫৭-র গালিবকে আমি দেখে উঠেছি জীবন্ত প্রত্যক্ষ এক কবি হিসেবে। তার আত্মবিতর্ক এখনো আমার ভেতরে ভাবনার জন্ম দিয়ে চলে। ধ্বংসস্তূপের সম্মুখে আমি দেখে উঠি সৃজনশীল কিন্তু আত্মায় রক্তাক্ত একটি মানুষ, মহত্তম এক কবিকে। তাঁকে নিয়ে একটি রচনার জন্যে আমি নড়ে উঠি, ভাবি, একটি কাব্যনাট্যই বুঝি আমাকে লিখে ফেলতে হবে ১৮৫৭-র গালিবকে নিয়ে। শেষ পর্যন্ত, নাটক নয়, আপাতত নয়, কোনো একদিন হয়তো, এখন হলো এই কবিতা-এই কবিতামালা সাতাশটি কবিতা নিয়ে। আমার এ কবিতামালার পটভূমি ১৮৫৭ সাল ও গালিবের দিল্লি। এর কোনো কোনো কবিতা গালিবের সরাসরি উক্তি হিসেবে কল্পিত, কোনো কোনোটি তার তখনকার মানসিক অবস্থা বিবৃত করে এমত রচিত। রচনায় আমি গালিবের সমান্তরাল একটি কবিকণ্ঠ ধরে কথা কইবার ইচ্ছে রেখেছি। এমন ভেবেছি, গালিব যদি লিখতেন, হয়তো এই কবিতামালা তারই কলম থেকে আসতে পারতো। আমার এ কবিতামালা গালিবের প্রতি শ্রদ্ধা ও ভালোবাসার রচনা।…এই কবিতামালা ব্যর্থ ওই বিপ্লবের (সিপাহী বিপ্লব) প্রতিও আমার এক স্মরণ নিবেদন।

আমি তো গালিব নই, আত্মার ভেতরে আত্মা,

গালিবের আত্মা করে ভর।

কবির ভেতরে কবি, গালিব দাঁড়ান এসে

প্রতি ধ্বংসস্তূপের ভেতর ॥

(অনিবার্য মিল খুঁজে পাই)

 

কবিতা তো বটে, কবিতার ছলে আত্মোন্মোচন।

গালিবের, সৈয়দ শামসুল হকের, আমাদেরও। ধ্বংসের দামামায় মিলিয়ে যায় সমস্ত আনন্দ-নিনাদ। হয়ত সে ধ্বংসের ভেতরই আমাদের মহত্তম জাগরণ লেখা। গোলাপজাগরণ। এ বইয়ে কবিতাকথনের ধরন সৈয়দ শামসুল হকের অপরাপর কাব্যগ্রন্থ থেকে সম্পূর্ণ পৃথক। ভূমিকায় কবি বলেছেনই উল্লেখিত কবিতামালায় গালিবের সমান্তরাল কাব্যকণ্ঠ নির্মাণের চেষ্টা করেছেন। তার পরিচিত কণ্ঠের বিপ্রতীপে এখানে এক অভিনতুন স্বর-কেলাসন। করাল-কালকে চিত্রিত করতে গিয়েও তার কণ্ঠ মধুহরা নয়। মুশায়েরার ঢঙে এখানে বিধৃত যাবতীয় রক্তাক্ত নিগূঢ়। আর সৈয়দ হক ১৮৫৭-কে যখন ১৯৭১ এ আর ১৯৭১-কে যখন ১৮৫৭তে প্রতিস্থাপিত করেন তখন তা আর কাব্যনিরীক্ষা থাকে না বরং তাতে ধরা পড়ে ইতিহাসের সত্য :

তিনিও স্তম্ভিত হন মির্জা আসাদুল্লা খাঁ

গালিব হঠাৎ একদিন

যেদিন দিল্লীর বুকে আগ্রাসন নেমে আসে,

লক্ষ লাশ সড়কে যেদিন।

 

উনিশ শ’ একাত্তরে পঁচিশে মার্চের রাতে

আমাদের ঢাকাতে আগুন।

নির্বিচারে পথে পথে মৃত্যুর তাণ্ডব নাট্যে

হানাদার করে চলে খুন।

(প্রাগুক্ত)

আর অতঃপর গালিব আর আমাদের কবি একান্ন হয়ে পড়েন এই বিন্দুতে-

গালিবের কণ্ঠস্বর কী ছিলো কেমন ছিলো

যদিও আমার জানা নাই

আমার স্তব্ধতা আর গালিবের স্তব্ধতায়

অনিবার্য মিল খুঁজে পাই

(প্রাগুক্ত)

 

কিন্তু না কবি আমাদের স্তব্ধ থাকেননি। গালিবের হয়ে আমাদের জন্যে করেছেন  স্তব্ধতার অনুবাদ; এই কবিতাগুচ্ছ। কখনো-সখনো বিপ্রতীপতা বাক্সময় করে চলেন কবি :

একদা সম্রাট কবি, আজ খানসামা!

হে গালিব, কহো-কেয়াবাৎ!

(ঘরবন্দী গালিবের স্বগতোক্তি)

 

কিংবা

গাছের পায়ের নিচে ঝরে পড়ে যায় ফুল-ঝরে?

কারো বা গলায় মালা, একই ফুল কারো বা কবরে ॥

(একই ফুল)

 

নৃশংস পরিস্থিতিকে যখন কবি কবিতার ঘেরাটোপে বন্দি করেন তখন তা থেকে যেন বিচ্ছুরিত হয় শাশ্বতসুন্দর। কবিতার এ এক সোনালি শস্ত্র।

দেখছি, দীর্ঘকবিতার প্রতি সৈয়দ শামসুল হকের ঝোঁক ধবংসস্তূপে কবি ও নগর-এও বিস্তৃত। এ বইয়ের দীর্ঘতনু কবিতা ‘সাতান্নর স্মৃতিকথা দাস্তাম্বু লিখছেন গালিব’। সিপাহি বিপ্লবের তাপের ভেতরে থেকে যে স্মৃতিকথা লিখেছিলেন গালিব তার ছবি আলোছায়ার খেলায় নয় বরং নিভৃত অক্ষরের সম্পাতে চিত্রায়িত করেন কবি। অঘ্রান মাসের নিষ্ঠুর শিশিরসিক্ত কবির বিপ্লবকালীন মনোদ্বন্দ্বের রূপ এখানে পরিস্ফুট। প্রাচীন শাস্ত্র যেমন বলে, কবিরা দিব্যদৃষ্টির আধিকারিক তেমনি সৈয়দ শামসুল হক মির্জা গালিবের উপলব্ধির যে কায়া হাজির করেন তাতেও দেখি বিপ্লবকে একতরফাভাবে মহীয়ান করার বদলে তোলা হয়েছে মৌলিক প্রশ্ন কিছু। যে প্রশ্নের জবাবের সাথে মানুষের মুক্তি ব্যাপারটি মূলগতভাবে জড়িত :

সত্য থেকে মিথ্যার দূরত্ব কত? বলো,

সিংহাসন থেকে কত দূরে থাকে গণ

প্রজাগণ- মানুষ এবং সেই কোটি

মানুষের প্রাত্যহিক সংসার জীবন?

বিপ্লব কি ছিলো সেই মানুষেরই লক্ষ্যে

পরিচালিত সংগ্রাম, নাকি শুধু এক

ক্ষমতাবদল, এক শাসক বদল,

মর্মে সেই একই সব, যেমন যা ছিলো

প্রজার জীবন সেই কুকুরেরই মতো!

আস্তাকুঁড়ে খাদ্য খুঁটে চলা, কিন্তু তার

ভাগ্যে জোটে রাজশক্তিধরের প্রহার!

 

বুঝি রক্ত বদল হলেই হৃদবদল হয় না। তাই যুগে যুগে অজস্র রক্তপাত বৃথা যায়। আলোচ্য কবিতার অন্তিমাংশ যেন শেষের পর আরেক অনন্য অবতারণা :

প্রেম শুধু নারী নিয়ে নয়, কাব্যকলা

শুধু বাতায়নে স্থাপিত যে নারী তার

মুখচ্ছবি আঁকবার জন্যে নয়, ওহে!

নারীর ভেতর দিয়ে মানবজীবন

জীবনের প্রবাহের প্রতিই সে প্রেম।

গালিব তো বোঝে, কিন্তু সকলে বোঝেন?

 

উর্দু কাব্যে হৃদয়ানুভূতিকে যে উচ্চমূল্য দেয়া হয়েছে তার সরলীকৃত ব্যাখ্যাতেই আমরা অভ্যস্ত। কবি সৈয়দ শামসুল হক এ কবিতাসূত্রে দেখালেন প্রকৃত প্রেম শুধু  সংকীর্ণ ব্যক্তিবলয়ে ঘূর্ণায়িত নয়। সে দশানন। ‘নারীর ভেতর দিয়ে মানবজীবন’, অর্থাৎ খণ্ড-সুন্দরের ভেতর দিয়েই সম্ভব সুন্দরের বৃহৎপট আবিষ্করণ। উর্দু কবিতায়, বিশেষত গালিবের কাব্যের ইতিউতি যে সর্বগ্রাসী প্রেমের বিস্তার তার যথাব্যাখ্যা পেতেও এ বইয়ের কাছে আমাদের আসতে হবে।

‘জাম হাতে দাঁড়িয়ে’ কবিতায় কবি গজলের শবের কথা বললেও কবির কাব্য শেষাবধি মৃত্যুময় নয় বরং জীবনের উজ্জীবক-অর্থ সন্ধান করে চলে সে নিরন্তর। কবিতার অনশ্বরতায় আস্থা আছে বলেই কবি নিঃসংশয় বলতে পারেন :

কবি তো মরণশীল কিন্তু তার কবিতার হয় না কবর ॥

(শিষ্যকবি তুফ্তার কাছে চিঠি)

 

কবরের কথা ফিরে ফিরে আসতে দেখি ধ্বংসস্তূপে কবি ও নগর-এ

মৃতের গন্ধই শুধু? মানুষের হৃদয়েরও মৃতগন্ধ নয়?

গালিব কবরে যান।

কবিতা কাফন হবে আমারও নিশ্চয়!

(কবিতা কাফন হবে)

 

কবিতাকে কাফনজ্ঞান করা যতই মর্বিড মনে হোক অন্তঃশীলে তা মৃত্যুভেদী এবং স্বপ্নদ্যোতক কেননা কবি পূর্বেই আমাদের জানান, কবি মরণশীল হলেও কবিতা মানবের চিরন্তন বৈজয়ন্তী।

কবি আর কবিতাকেন্দ্রিত ভাবনাবিচিত্রা যেন কবির অজানিতে বিপুলভাবে সংকলিত হয়ে আছে আলোচ্য কাব্যগ্রন্থে। এই ভাবনাসমুদয় কি গালিবের? সৈয়দ হকের? না, এই ভাবনামালা দেশকালহারা। সময় ও সীমানাভেদী। ‘এক সন্ধ্যার বিবরণ’ কবিতায় আমরা দেখি কবি জাগতিকভাবে চূড়ান্ত ব্যর্থ, তিনি দোকানির চোখে নিকৃষ্ট কারণ তিনি কপর্দকহীন। এক বিপর্যস্ত রাত্রিতে নিজের গজলের পুরো সংকলন বন্ধক রেখে নিজ প্রয়োজন মেটাতে চাইলেন কিন্তু দোকানির কাছে তার গজলের কানাকড়ি মূল্য নেই। তবে রাত্রির হাওয়া সে অনাদৃত গজলকে পরম মমতায় উড়িয়ে নেয়। তাই তো অপ্রাপ্তির ভেতর সংগুপ্ত কবির অর্জন :

সুরাহীন নিদ্রাহীন, দেখি দৃষ্টি করে

গজলের ছিন্ন পাতা ঘরময় ওড়ে!

দোকানি নেয়নি বটে, নিয়েছে তো হাওয়া!

কবিদের ভাগ্যে এই একমাত্র পাওয়া ॥

(এক সন্ধ্যার বিবরণ)

গালিবের এমত যে চিত্র কবি অঙ্কন করে যেন লেখায় রেখায় তার সাথে আমরা অবলীলায় একই কাতারে দেখতে পাই কোনো কোনো বাঙালি কবিকেও। এই যেমন- জীবনানন্দ দাশ; চারদিকের কেঁচো বাস্তবে বিপন্ন কবি আশ্রয় খুঁজে পেতেন অশ্বত্থের পাতায় কিংবা রাত্রির হাওয়ায়। তাই  ‘এক সন্ধ্যার বিবরণ’  শুধু কোনো এক কবির একটি সন্ধ্যার ঘটনামাত্রই নয় বরং তা যেন কবিদের চিরকালীন বিষণ্ণ বিধিলিপির ছাপচিত্র।

মির্জা আসাদুল্লাহ খাঁ গালিবের কাব্যদর্শনের কেন্দ্রভাগে মানুষ। সৈয়দ শামসুল হকেরও তাই। ফলে ধ্বংসস্তূপে কবি ও নগর পরিণত হয়েছে যুগল কবিকণ্ঠে মানবতার জয়ভাষ্যে :

স্বদেশ যখন পোড়ে, বিপ্লবীরা হয় পরাজিত

তখনও কবিরা নন বাক্রুদ্ধ অথবা পতিত।

(সত্য এই দেখেন গালিব)

 

কে না জানে- কবিরাই সভ্যতার পাহারাদার? নিখিল নিদ্রার কালে জাগরণের সল্তে জ্বালায় কবিরা:

কবিরাই জেগে থাকে

ঘুমায় মানুষে ॥

(গালিবের স্বগতোক্তি)

 

ধ্বংসস্তূপে কবি ও নগর-এর ছন্দিত কাব্যস্পন্দে অবলম্বিত উপমা, রূপক, চিত্রকল্পের সিংহাংশই মৃত্যু, তা-ব আর রক্তাভায় ভরপুর তবে দ্রাক্ষারস কিংবা জামের জমজমও এখানে দুর্লভ নয়। সৈয়দ শামসুল হক তার নিজের জন্মতারিখ এবং গালিবের জন্ম তারিখ সাতাশে ডিসেম্বর দেখে, এক আশ্চর্য কাকতালে চমকে ওঠেন আর আমরাও চমকে উঠি যখন দেখি গালিবের জন্মতারিখের সাথে এ গ্রন্থের কবিতাসংখ্যার আশ্চর্য মিল– সাতাশ!

সৈয়দ শামসুল হক কখনও কবিতার ধরাবাঁধা সড়কে পথ চলেন না। রবার্ট ফ্রস্ট কথিত কবিতার সেই কুমারীপথ খনন করে চলেন সবসময়। মির্জা গালিবের ছায়াকে ভিত্তিভূমে রেখে তিনি আলো ফেলেছেন ইতিহাসের ঝাপসা হয়ে আসা অধ্যায়ে। ইতিহাসের ভেতর ব্যক্তির অন্তর্চাপ আধুনিক শিল্পীর আগ্রহের বিষয়। আর সে ব্যক্তি যদি হয় গালিবের মতো শিল্পী তবে তো তা আরো কৌতূহলোদ্দীপক।

ধ্বংসস্তূপে কবি ও নগর এসব বিবেচনায় আমাদের কবিতায় একটি নতুন নিরীক্ষার স্বাদবাহী। নির্মেদ ভাষাবৈশিষ্ট্যের বলে তার এই কবিতামালা আয়াসহীন যোগাযোগ স্থাপন করে চলে পাঠক-সাধারণে। সৈয়দ শামসুল হক এ কবিতায় যুক্ত করেছেন মুশায়েরা-গুণ। যেন কেউ দূর যমুনার হাওয়ায় যুগপৎ দ্রুত এবং ধীরলয়ে পাঠ করে চলেছে অজর পঙক্তিমালা। আর তা বিদ্যুৎবেগে উপস্থিত শ্রোতৃমণ্ডলীতে ছড়িয়ে গিয়ে জন্ম দিচ্ছে সহস্র পূর্ণিমার।

লোবানের ঘ্রাণ। সড়কময় লাশ। সুরহারা বুলবুল। নিথর নীরব লালকিল্লা। বারুদ পোড়া প্রহর। বাগান উৎসন্ন দেখে উড়ে যায় বাদুড়। রক্তলাল স্বদেশ। শুভ্র শুধু কবরের মর্মর পাথর। তবে তাবৎ এই ধ্বংসের রোলের ভেতরেই থেকে গোলাপজাগরণের অবশ্যম্ভাবিতা। কারণ তামাম স্তব্ধতাকে গজলের গীতে ফেরাতে বসে আছে সে; একলা এক কবি।

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

shares