সৈয়দ শামসুল হক সংখ্যা : নাজনীন হক মিমি

সৈয়দ শামসুল হক সংখ্যা

সৈয়দ শামসুল হক

একান্ত অন্তরালে

নাজনীন হক মিমি

 

ছোটবেলা থেকে নানারকম উপন্যাস, ছোটগল্প, বই পড়েছি। কবিতার বই একটু বড় হয়ে পড়া শুরু করেছি, আসলে আমাদের বাড়িতে বই পড়তেন সবচেয়ে বেশি মা। মায়ের বইপড়া থেকে আমরা ভাই-বোনেরা বইপড়া শুরু করি। ভাইজান সবসময়ে বই সংগ্রহ করত কিংবা কিনত। শরৎ বাবুর উপন্যাস আর ছোটগল্প ছিল মায়ের খুবই প্রিয়। আর সেই থেকে নানা বইয়ের ভিতর দিয়ে আমাদের বেড়ে ওঠা। পরবর্তী সময়ে জীবনের নানাপথ বেয়ে আজ যেখানে এসে পৌঁছেছি চারদিকে নানারকম মানুষজন। এটাই স্বাভাবিক যে, জীবনের পরিণত সময়ে এসে অনেক ধরনের মানুষের সাথে দেখা হবে। কিন্তু একটি বিষয়ে সব সময় মনে হয় যে, যারা লিখতে পারেন তারা সমাজের এমন একটি শ্রেণি, এমন কিছু বিশেষ মানুষ, যারা মানুষের মনের কথা চরিত্রে রূপ দান করে সমাজ, দেশ ও ইতিহাসের জন্য কাজ করে যাচ্ছেন। তারা শক্তিশালী মানুষ, হয়তো শারীরিকভাবে নয়, হয়তো বিত্তবৈভবে নয়, হয়তো আপাতত সকল মানুষের নিত্যদিনের প্রয়োজনে তাঁদের লেখনী দেবে না আহার কিংবা পুষ্টি। তবুও তারাই সৃষ্টি করেন- অমর শিল্প, কবিতা বা উপন্যাস।

আমরা যারা সাধারণ মানুষ নিজের মনের ভিতর এই মানুষদের নিয়ে ভাবি, একান্তে কথা বলি, তাঁদের ব্যস্ততার মাঝে একটুখানি সময়ের জন্য দূর থেকে দেখি তখন মনের মধ্যে নানা কথার সৃষ্টি হয়। তেমনি কয়েকটি দিনের কিছু কথা মনে হচ্ছে- ১লা ফেব্রুয়ারি ২০১৬ সাল। সকালবেলায় জাতীয় কবিতা উৎসবের অনুষ্ঠান শুরু হয়েছে। উদ্বোধনী সংগীত শেষ হয়েছে, আমি মঞ্চের কাছাকাছি পৌঁছলাম। এই বছর জাতীয় কবিতা পরিষদের ত্রিশ বছরে পদার্পণ, একটি বছর ছাড়া, প্রতিটি বছর আমি এই অনুষ্ঠানে এসেছি, এবারে মাঝামাঝি একটি জায়গায় বসলাম, মঞ্চে বসেছিলেন জাতীয় কবিতা পরিষদের সকল সদস্য, উপদেষ্টামণ্ডলী এবং বিদেশি কবি বন্ধুরা। সামনের দুই সারিতে বসে আছেন অনেক গুণীজন এবং আমার অনেক পরিচিত জন।

ছবি তোলার জন্য তৃতীয় সারিতে বসেছিলাম। ছবি ভালো তোলে তারিক আর দিব্য, কিন্তু দিব্য বিদেশে পড়তে যাওয়ার পর থেকে আমি পারি, না পারি- ছবি তুলে যাচ্ছি। শুধু মনে হয় দিনটি আর কোনোমতেই ফেরত আসবে না, এমন সুন্দর সকাল কিংবা পড়ন্ত বিকেল একইভাবে জীবনে আর আসবে না। হোক ছবি ঝাপসা, নাই বা হোক কোনো তুখোড় ফটোগ্রাফারের স্বচ্ছ স্ফটিকের মতো ছবি, তবু তুলে রাখি। মঞ্চে উপবিষ্ট কবিদের মধ্যে অনেকেই ধারাবাহিকভাবে তাদের বক্তব্য রাখলেন, আমি বসে থেকেই কিছু ছবি সংগ্রহ করলাম।

কবি সৈয়দ শামসুল হক তাঁর বক্তব্য রাখার জন্য উঠে দাঁড়ালেন। মঞ্চে যখন বসেছিলেন তখনও আমার মনে হয়েছিল অন্যদিনের তুলনায় তাঁকে একটু ক্লান্ত। বক্তৃতা শুরু করলেন, কিন্তু মনে হলো তাঁর শরীরটা বোধহয় আজ ভালো নেই।

দীর্ঘদিন তাঁর বক্তব্য শুনেছি, ২৯ বছর জাতীয় কবিতা পরিষদের মঞ্চ থেকে তাঁর বলিষ্ঠ উচ্চারণের কথাগুলো আমার বারবার মনে পড়ে; কিন্তু এবারই মনে হয়েছিল তিনি একটু ক্লান্ত। রাতে তারিককে জিজ্ঞাসা করেছিলাম হক ভাইয়ের শরীরটা কি ভালো নেই? বলল, হ্যাঁ, উনি কিছুদিন ধরে বেশ ঠান্ডায় ভুগছেন। ২ ফেব্রুয়ারি রাতে সকল অতিথি কবিসহ কবিবন্ধুরা উৎসবের পরে আমাদের বাসায় আসেন, একসঙ্গে খাওয়া-দাওয়া আর জমিয়ে আড্ডা দেওয়া ছিল সবার একান্ত ইচ্ছা। উৎসব প্রাঙ্গণের নানারকম আনুষ্ঠানিকতা শেষ না করে তারিক আসতে পারে না, তাতে কি কবিরা সবাই আমার সঙ্গে একান্তভাবে বন্ধুপ্রবণ। তাই সন্ধ্যাবেলা প্রথমেই দরজা খুলে পেলাম মনেপ্রাণে বাঙালি ইংরেজ কবি জো উইন্টারকে। আমার খুবই ভালো লেগেছিল। এর পরপরই আসলেন কবিদের অত্যন্ত শুভানুধ্যায়ী বন্ধু দীপু আপা (সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী)। তাঁর নিরাভরণ সাজগোছ আর অমায়িক ব্যবহার, তিনি কখনই আমাদের মাঝে মন্ত্রিত্ব নিয়ে আসেন না। আসেন একান্তই মনের ইচ্ছায়।

এরপর অনেকেই আসলেন সকলেই আমার খুবই শ্রদ্ধাভাজন কবি আসাদ চৌধুরী, কবি নির্মলেন্দু গুণ, কবি হাবীবুল্লাহ সিরাজী, কবি নূহ-উল-আলম লেনিন, কবি কাজী রোজী, কবি আসলাম সানী, ভারতের কবি বীথি চট্টোপাধ্যায়, কবি সেবন্তী ঘোষ, আরও অনেক বিদেশি কবি, নবীন-প্রবীণ সকলেই একসঙ্গে আসায় আমার খুবই ভালো লাগছিল। আমি ভারতের বিখ্যাত আবৃত্তিকার সৌমিত্র মিত্র দা’কে অতিথি আপ্যায়নের ভার দিলাম। আমার দুই বোন রেশমী, তানিয়া আর দুই জামাই মাহমুদ আর মিঠু হাসিমুখে সবার খাওয়া-দাওয়া দেখছিল। আমি শুধু বারবার দরজা খুলছি, আর একজনকে আশা করছিলাম। ফেব্রুয়ারি মাসে আমার মনটা ভিতরে ভিতরে খুবই বিমর্ষ ছিল। গত ডিসেম্বর মাসে আমাদের প্রাণপ্রিয় আব্বুকে হারিয়েছি। ২০১৬-এর কবিতা উৎসবে তিনি আসতে পারেননি। সব সময় তিনি শত ব্যস্ততার মাঝেও ১৯৮৭ সাল থেকে উৎসবে আসতেন। ১লা ফেব্রুয়ারি সকালের অধিবেশনে তারিক তার ভাষণে জোরালোভাবে অসুস্থ কবি রফিক আজাদের সুচিকিৎসার জন্য সরকারের প্রতি দাবি জানিয়েছিল। আমার মন খুব খারাপ হয়েছিলে কবি রফিক ভাইয়ের জন্য। আমি জানতাম রফিক ভাই এবং দিলারা ভাবি আজকের এই অনুষ্ঠানে আসতে পারবেন না। কিন্তু আমি আরও দু’জনকে ভীষণভাবে আশা করছিলাম। হকভাই আর আনোয়ারা ভাবিকে। তারিক বলল, হক ভাইয়ের শরীরটা ভালো নেই। আমি বললাম, তবুও একটু ফোন করে দেখো না। ও বলল, না, তাঁর বিশ্রাম প্রয়োজন। আমার তখন মনে হলো, আসলেই হকভাই বিশ্রাম নিয়ে তাড়াতাড়ি ভালো হয়ে উঠুন।

কয়েক মাস আগের কথায় আসি। ৫ ডিসেম্বর ২০১৫-তে আব্বুকে হারিয়ে আমাদের গোটা পরিবার মানসিকভাবে বিপর্যস্ত ছিলাম। কবি-লেখক-ভাষাসংগ্রামী তোফাজ্জল হোসেন গুরুত্বপূর্ণ নানা বিষয়ে অনেকগুলো বই লিখেছেন, সারাজীবন সাংবাদিকতার পাশাপাশি করেছেন নানা সংগঠন। হক ভাই আর আব্বু দীর্ঘদিনের বন্ধু ছিলেন। শহীদ মিনারে আব্বুর প্রতি শ্রদ্ধাঞ্জলি অনুষ্ঠানে তিনি এসেছিলেন। খুব সুন্দর করে তাঁর বন্ধু সম্পর্কে স্মৃতিচারণ করলেন।

একটি ঘটনা বিশেষভাবে উল্লেখ করা প্রয়োজন, ২৯ মে ২০১৫ সালে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে নাগরিক সংবর্ধনা দেওয়া হয়েছিল। সংবর্ধনা অনুষ্ঠান কমিটির আহ্বায়ক ছিলেন সৈয়দ শামসুল হক। এই বিশাল আয়োজনে তাঁর সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত ছিলেন তারিক। আমি দর্শক সারিতে বসে, মঞ্চে হক ভাইয়ের দীপ্ত পদচারণা দেখে অবাক হয়েছিলাম। তাঁর ভিতরে বয়সের কোনো ক্লান্তির ছাপ ছিল না। তিনি সব সময় অত্যন্ত চৌকষভাবে সব বিষয় সম্পন্ন করেন। সাধারণত তাঁর মতো দক্ষতা তাঁর বয়সী মানুষের মধ্যে খুব কম দেখা যায়।

এর কয়েকদিন পরই হক ভাই ও ভাবী আমাদেরকে বাসায় ডাকেন। সময়টা ছিল সন্ধ্যা। তরুণ কবি পিয়াস মজিদও সেখানে ছিল। হক ভাইয়ের নাতি এজরা ছোট করে পনির কেটে কেটে আমাদেরকে খেতে দিলেন। খুবই ছোট মানুষ কিন্তু এত সুন্দর করে আমাদেরকে আপ্যায়ন করেছিল যা আমি কোনোদিন ভুলব না। ডিসেম্বর ২৭ তারিখে হক ভাইয়ের আশি বছরপূর্তির অনুষ্ঠানের আয়োজন সম্পর্কে আলোচনা হয়েছিল। তারিক তার পিতার আবাল্য বন্ধুর প্রতি শ্রদ্ধাভরে অনুষ্ঠানের খুঁটিনাটি নানাদিক নিয়ে বিস্তারিত আলাপ করে এবং হক ভাইকে জন্মদিন উপলক্ষে একটি লিখিত বক্তৃতা দিতে অনুরোধ করে। বারবার মনে হয়েছিল আব্বুর জন্য এমন একটি অনুষ্ঠান করার খুব ইচ্ছে থাকলেও তাঁর অসুস্থতার জন্য যা সম্ভব হয়ে ওঠেনি।

জাতীয় কবিতা পরিষদের সভাপতি ড. মুহাম্মদ সামাদ, সাধারণ সম্পাদক তারিক সুজাত, জাতীয় কবিতা পরিষদের সাবেক সভাপতিবৃন্দ ও অন্য সদস্যরা একত্রিত হয়ে একটি অসাধারণ অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছিল। জাতীয় জাদুঘরের উন্মুক্ত প্রাঙ্গণে সৈয়দ শামসুল হকের আশি বছরের জন্মদিনের অনুষ্ঠানে তিনি দীর্ঘ এক ঘণ্টা ধরে একটি ভাষণ দিয়েছিলেন। আমি দুর্ভাগ্যবশত তাঁর বক্তব্যটি শুনতে পারিনি। কিন্তু আগের দিন রাতে তাঁকে ফুল দিয়ে শুভেচ্ছা জানাতে গিয়েছিলাম। সেদিনও আমার সাথে হক ভাই আর ভাবীর দেখা হয়নি। বাড়ির মূল ফটকে দেখা হয়েছিল দারোয়ান ভাই হান্নান মিয়ার সঙ্গে। তিনি অনেকদিন থেকেই আমাকে চিনেন। হক ভাইয়ের বাড়িতে দুটি কুকুর আছে, কুকুর দুটো দেখে আমি খুব ভয় পাই। হান্নান ভাই ওদেরকে জোরে বকা দিয়ে সরে যেতে বলল। আর তখনই তাঁর ছেলে দ্বিতীয় সৈয়দ হক বেরিয়ে আসলেন। তিনি আমাকে ঘরের ভিতরে এসে বসতে বললেন। দৌড়ে তাঁর ছোট ছেলে এলো, হক ভাই ও ভাবী বাড়িতে নাই দেখে আমি বসতে চাচ্ছিলাম না। কিন্তু হক ভাইয়ের নাতি এজরা বলল, আরে আমি তো আছি। আমার খুবই মজা লাগল। আমি বললাম, এই ফুলটা তোমার ‘দাদা’ ভাইকে দিও। ওনার জন্মদিনের জন্য এনেছি আর এই চিঠিটা তোমার ‘দিদা’কে দিও।

পরের দিন ভাবি ফোন করে আমার সঙ্গে কথা বলেছেন। হক ভাইয়ের আশি বছরের জন্মদিনে প্রদত্ত ভাষণটি দৃষ্টিভূমিতে দীর্ঘছায়া আমাদের সাহিত্যে চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে। এই অবিস্মরণীয় ভাষণটি ছোট একটি পুস্তিকারূপে জাতীয় কবিতা পরিষদ প্রকাশ করেছিল।

রবীন্দ্রনাথের আশিতম জন্মদিনে প্রদত্ত ভাষণ সভ্যতার সংকট যেমন বহুবার পাঠ করা যায়। তেমনি আমাদের প্রিয় হক ভাইয়ের এই ভাষণটি বহু বছর মানুষ পাঠ করে যাবে। তাঁর প্রদত্ত ভাষণের একটি অংশ আমার প্রাণ ছুঁয়ে গেছে :

‘আমি অনেক ভেবেছি, আমি অনেক অশ্রু নিয়ে তাকিয়ে দেখছি আমাদের পতাকায় ও আকাশে উদিত রক্তলাল সূর্যটিকে, তিরিশ লাখ আত্মার শপথ, দশ লক্ষ নারীর আর্তনাদের শপথ, আমি বলছি- এই মুহূর্তেই আমাদের কর্তব্য : আরো একটি ট্রাইব্যুনাল গঠন করা এবং সে ট্রাইব্যুনালে একাত্তরের খুনি পাকিস্তানি জেনারেল ও অফিসারদের অনুপস্থিত ধরেও বিচার করা। এবং অপরাধ প্রমাণিত করে দণ্ডদান করা। ইতিহাসে এমন বিচার ও দণ্ডদানের নজির আছে অপরাধীদের সশরীরে উপস্থিত করা না গেলেও।

সময় বহে চলে, সময় বহে যায়। সময় বহে গেলেই অপরাধের ঘটনা ধুয়ে যায় না- অপরাধ অপরাধই থেকে যায়, এমনকি হাজার বছর পার হয়ে গেলেও। আমার মনে পড়ে, প্রয়াত বিচারপতি কে এম সোবহান একবার বলেছিলেন, জুলিয়াস সিজারকে হত্যা করবার ঘটনা দু’হাজার বছর আগে হলেও, কেউ যদি অভিযোগ আনে, নিহত ও ঘাতক হাজার বছর আগে ধুলায় মিশে গেলেও আজ এতদিন পরেও তার বিচার অবশ্যই করা যাবে এবং দ-ও দেয়া যাবে।’

আমার মনের ভেতরে সব সময় নিভৃতে এরূপ একটি বিচারের কথা মনে হয়- সার্জেন্ট জহুরুল হক ১৯৬৯ সালে প্রথম সৈনিক যাঁকে নির্মমভাবে পাকিস্তানিরা হত্যা করেছিল। ’৬৯-এর উত্তাল দিনগুলোতে আসাদ, জহুর, ড. জোহার হত্যাকারীরা যদি আজ মৃত্যুর পর ধুলোয় মিশে যায় তবুও তাঁদের বিচার অবধারিতভাবে নিশ্চিত হওয়া উচিত।

সেই সময় প্রায় প্রতিদিন তাঁর সঙ্গে তারিকের টেলিফোনে কথা হতো। তারিক আর আমি হক ভাইকে ‘ভাই’ বলে সম্বোধন করি; কিন্তু তিনি তারিককে নিজের পুত্রের সমান স্নেহ দিয়েছেন। তারিক হয়তো একদিন সেসব কথা লিখবে। আমি অনেক কিছুই জানি না। আর দশটা সাধারণ মানুষের মতোই তাঁকে দেখার সুযোগ হয়েছে।

তাঁর নূরলদীনের সারাজীবন, পায়ের আওয়াজ পাওয়া যায়  কিংবা অসাধারণ কবিতাসমূহ সব সময় পড়তে পড়তে মনে হয়েছে তাঁর মতো শক্তিশালী লেখক বোধহয় আমাদের মাঝে এখন খুবই কম আছেন।

ফেব্রুয়ারি মার্চে নানা আনুষ্ঠানিকতা আর অফিসের চাপে দিনগুলো শেষ হয়ে গেল। চৈত্র শেষ হয়ে বৈশাখ এসে পড়ল। আমার শরীরটা হঠাৎ খারাপ হয়ে গেল। অনেকদিন থেকে গলা ব্যথা আমাকে ভোগাচ্ছে। আর তারিকের কিছু কাজ থাকায় আমরা ১২ এপ্রিল ২০১৬ সিঙ্গাপুরে যাই। ভোরবেলা পৌঁছাই, রাতের ফ্লাইটে একেবারে ঘুম না হওয়ায় হোটেলে গিয়ে দুজনেই ঘুমিয়ে পড়ি। দুপুরে ঘুম থেকে উঠে তারিক ফোন খুলে বলল, ঢাকা থেকে পিয়াস মজিদের একটি ম্যাসাজ আছে viber-এ। হক ভাইও বার্তা পাঠিয়েছেন। আমি বললাম, এখনই হক ভাইকে ফোন করো। হক ভাইয়ের সঙ্গে তারিকের কথা হলো। ঢাকা এয়ারপোর্টে বসে তিনি তারিককে একটি ড্রাফট তৈরি করতে বললেন। ‘তিনি চিকিৎসার জন্য আজই ঢাকা থেকে লন্ডনে যাচ্ছেন।’ পিয়াস মজিদও বিষয়টি জানতেন। হক ভাই তারিককে একটি প্রেস রিলিজ লিখতে বললেন। হোটেলের বেড সাইড টেবিলের ছোট একটি নোট প্যাডের মধ্যে তারিক দ্রুত হক ভাইয়ের অসুস্থতার (ফুসফুসে জটিলতায় আক্রান্ত) সংবাদটি তৈরি করল। আমি বললাম, একবার হক ভাইকে পড়ে শোনাও অথবা viber-এ পাঠাও। উনি তো অনলাইনে আমাদের থেকে অনেক ফাস্ট।

প্রেস রিলিজটি লিখে তারিক হক ভাইকে পড়ে শুনালেন। হক ভাই বললেন, সব ঠিক আছে, আমার কিছুই ঠিক করার প্রয়োজন নাই। এই লেখাটা ঢাকার পত্রিকাগুলোতে পাঠিয়ে দিস। আর আমার জন্য সবাইকে দোয়া করতে বলিস।

তারিক সিঙ্গাপুরে বসেই সব পত্রিকায় সংবাদ পাঠানোর ব্যবস্থা করেছিল।

এরপরের ঘটনাগুলো সকলের জানা। উনি লন্ডনে দুরারোগ্য কঠিন রোগের সঙ্গে প্রায় সাড়ে চার মাস যুদ্ধ করে দেশে ফিরে এসেছেন। এখনও তিনি ক্যান্সারের মতো কঠিন রোগের সঙ্গে যুদ্ধ করে যাচ্ছেন।

এপ্রিল মাসে উন্নত চিকিৎসার জন্য লন্ডন যাওয়া থেকে সেপ্টেম্বরের শুরুতে ঢাকায় ফেরার পর এখন পর্যন্ত তারিকের সঙ্গে ওনার সব সময় যোগাযোগ রয়েছে। নানা বিষয়ে হক ভাই আর ভাবি তারিকের সঙ্গে এত ঘনিষ্ঠভাবে আলাপ করেন যে, মাঝে মাঝে আমার মনে হয় তারিক তো তাদের পরিবারের একজন। আর সেই সঙ্গে আমিও দূরে থেকেও বোধহয় তাদের মাঝে আছি। আর সেই জন্য হক ভাইয়ের অসুস্থতার কথা ছাড়া আমার অনেক কিছু মনে পড়ছে। এমন প্রাণবন্ত মানুষ আমি কম দেখেছি। যাঁদের মাঝে প্রতিনিয়ত সৃষ্টির আনন্দ, আধুনিকতা আর প্রাচীন ঐতিহ্যকে লালন করার শক্তি রয়েছে, তাঁরা অসুস্থ হয় শারীরিকভাবে, মানসিকভাবে কোনোমতেই নয়।

আর সেই জন্য হক ভাইয়ের বিভিন্ন লেখা পড়ার স্মৃতি থেকে বোধকরি একদিন দুপুরে আমি কল্পনায় একটি দৃশ্য দেখলাম। আমার মনে হলো হক ভাই একটা ঘন সবুজ গাছ-গাছালির ভিতর দিয়ে হাঁটছেন। কখনও চিন্তামগ্ন চেহারা কখনও হাসি হাসি মুখ।

আসলে মানুষ যা কল্পনা করে তার একটা বাস্তবতা আছে। হক ভাইয়ের গুলশানের বাড়িতে অনেক গাছ। আর উঠানে উনি অনেকবারই তারিকের সঙ্গে কথা বলতে বলতে  হেঁটেছেন। আমি পিছন থেকে দেখেছি।

হক ভাইয়ের বাড়িতে এক সময় একটি গ্যালারি ছিল। মঞ্জু আর্ট গ্যালারি। তারিক আর বিল্লা ভাইয়ের উদ্যোগে সেখানে একবার একটি প্রদর্শনীর আয়োজন হয়েছিল। রবীন্দ্রনাথের পেইন্টিং-এর সিল্কের ওপর সূক্ষ্ম সুতোর কাজের নিপুণ ছোঁয়ায় মূল কাজের প্রতিলিপি। মঞ্জু আর্ট গ্যালারিটি মূলত আনোয়ারা ভাবির ছোট বোন শিল্পী বিউটি আপা এবং ওয়াদুদ ভাই দেখাশুনা করতেন। তারাই সকল ব্যবস্থাপনায় ছিলেন। আমি হঠাৎ দেখলাম অনুষ্ঠান শুরু হওয়ার আগে হক ভাই চিন্তামগ্ন হয়ে হাঁটছেন। অনেকেই অনুষ্ঠানের জন্য সংরক্ষিত চেয়ারে বসে আছেন। কিন্তু উনি বসছে না। আমি তাকিয়ে আছি দেখে উনি জিজ্ঞাসা করলেন কয়েকজনের কথা, তাঁরা এসেছেন কিনা। আমি বললাম, এখনও আসে নাই। এসে পড়বে।

উনি একটু বিরক্ত হয়ে বললেন, ‘সময়মতো আসা উচিত।’

প্রদর্শনীটি ছিল ভিন্ন আঙ্গিকের। ‘Neadle Art Creation’ বলে একটি সংস্থা বাঙালি মেয়েদের দিয়ে রবীন্দ্রনাথের চিত্রিত ছবিগুলো সিল্কের ওপর নানারঙের সুতা দিয়ে তৈরি করেছিল। রবীন্দ্রনাথের চিত্রের অবিকল রূপ চিত্রিত হয়েছিল বাঙালি নারীর ‘সুঁই সুতোর’ ভিতর দিয়ে। খুবই আনন্দঘন একটি প্রদর্শনী ছিল।

এর কিছুদিন পর মঞ্জু আর্ট গ্যালারিতে বিউটি আপা আর তারিকের উদ্যোগে আরও একটি প্রদর্শনী হয়েছিল। আর এই প্রদর্শনীটি ছিল সম্পূর্ণ ভিন্নধর্মী- কাঁথার প্রদর্শনী। আমার সেজো খালা আতিমা মওলা অসাধারণ সেলাই করতেন। তার সেলাই করা দেশি কিছু কাঁথার প্রদর্শনী হয়েছিল। আমার খালু ছিলেন চট্টগ্রামের মুক্তিযোদ্ধা লেখক এনায়েত মওলা। মঞ্জু আর্ট গ্যালারি খুব আগ্রহ নিয়ে এই প্রদর্শনীটি করেছিল। কবি খালেদা এদিব চৌধুরী এই প্রদর্শনীর প্রধান অতিথি ছিলেন।

আমার মনে আছে সেদিনও অনুষ্ঠান যথাসময়ে শুরু হচ্ছে না। অনেকেই এসে গেছেন, চেয়ারে  বসে আছেন। হক ভাই বাগানে হাঁটাহাঁটি করছেন। মাঝে মাঝে সামনের চত্বরে যেখানে অনুষ্ঠান হবে সেখানে এসে দাঁড়ালেন। আমাকে দেখে জিজ্ঞাসা করলেন, তোমরা কারও জন্য অপেক্ষা করছো? আমি বললাম, এখনও কিছু আমন্ত্রিত লোক আসা বাকি। উনি আবারও আমাকে বললেন, ‘সময়মতো আসা উচিত’।

হক ভাইকে অনেক অনুষ্ঠানে আসতে দেখেছি, তিনি কোথাও দেরি করে আসতেন না। কোথাও অতিরিক্ত সময় থাকতেন না। আমি তার যৌবনের সময়গুলোর কথা বলতে পারবো না। কিন্তু গত বিশ বছরে কোনো সময় তাঁকে কোথাও অতিরিক্ত সময় থাকতে দেখিনি। আর এই জন্য বোধহয় এত সৃষ্টিশীল কাজ করতে পেরেছেন।

হক ভাইয়ের বাসায় আমার যে অসংখ্য স্মৃতি এমন নয়, হাতেগুণে কয়েকবার গিয়েছি। কিন্তু এই ছোট ছোট মুহূর্তগুলো একসময় অনেক বড় মনে হয়েছে।

একবার হক ভাইয়ের জন্মদিনে সকালবেলায় আমি আর তারিক ফুল নিয়ে গিয়েছিলাম। সংবাদপত্র থেকে আরও কয়েকজন এসেছিল। আমরা ছবি তুললাম, গল্প করলাম, কেক খেলাম। আমি ভাবলাম এবার চলে আসা উচিত। চলে যাওয়ার জন্য উঠে দাঁড়ালাম। তিনি বললেন, আরে খাওয়া তো হয়নি এখন কি যাবে।

হক ভাইয়ের বসার ঘরের পাশে দুই সিঁড়ি নিচে ডাইনিং রুম বা খাওয়ার ঘর। সবাই ওখানে গিয়ে বসলাম। কিছুক্ষণ পর বিউটি আপা গরম গরম লুচি আর আলুর দম খেতে দিল। ভীষণ সুস্বাদু ছিল।

হক ভাই বাড়ির এই সব আয়োজনে চুপচাপ থাকতেন। কিন্তু আমার সব সময় মনে হয় ঘরের মাঝে এক নিরবচ্ছিন্ন নিরেট সুতার বাঁধন না থাকলে এমন করে এত মানুষ বাড়িতে আসতে পারেন না।

আরও একটি দিনের কথা আমার সব সময় মনে হয়। কবি সমরেন্দ্র সেনগুপ্ত কলকাতা থেকে ঢাকায় এসেছিলেন। তারিক তাঁকে নিয়ে হক ভাইয়ের বাসায় যান। আমি স্কুল থেকে দিব্যকে নিয়ে বের হয়েছি। তারিক ফোন করে বলল, তোমরা যদি গুলশানে থাকো তবে হক ভাইয়ের বাসায় আসতে পারো।

আমি আর দিব্য ঘরে ঢুকে দেখি উনি খুবই খুশি মনে সমরদা আর তারিকের সঙ্গে গল্প করছেন। দিব্যকে দেখে হক ভাই ওর দিকে মনোযোগ দিলেন। তারিক বলল, ও কবিতা লিখে। হক ভাই দিব্যকে কাছে ডাকলেন। আমার এখনও মনে আছে। দিব্যর আট বছর বয়স। স্কুল ড্রেসপরা হক ভাইয়ের পাশে গিয়ে দাঁড়াল। হক ভাই বললেন, আমাকে একটা কবিতা শোনাও। দিব্য তার ‘বৃষ্টি’ কবিতাটি শোনালো।

হক ভাই গভীর মনোযোগ দিয়ে কবিতাটি শুনলেন, তারপর হেসে দিব্যকে বললেন, ‘তোমার দাদাভাই তোফাজ্জল আমাকে হকভাই ডাকেন। তোমার বাবাও আমাকে হক ভাই ডাকেন। আজকে থেকে তুমিও আমাকে হক ভাই বলে ডাকতে পারো।’

আমরা সবাই খুব হেসে উঠেছিলাম। তারপর নানা গল্প হলো। হঠাৎ তিনি আমাকে উদ্দেশ্য করে বললেন, তোমার লেখা দেখেছি ডেইলি স্টার পত্রিকায় লেখাটির নাম বললেন, Perfume Shop. প্রথম দুই লাইন মুখস্থ বলে ফেললেন। ‘Perfumes are an inescapable part of person’s identity. A good scent can linger in the mind and work’.

আমি অবাক হলাম এত বিষয় থাকতে উনি আমার ইন্টেরিয়র বিষয়ের এই লেখাটি কেন খেয়াল করলেন, খুব ভালো লেগেছিল। এরপরেই খাওয়া-দাওয়ার পালা। ভাবি সেই সময় লন্ডনে ছিলেন।

তবুও খাওয়ার আয়োজনে বড় বড় গরম তেলাপিয়া মাছ এলো। আমি বললাম, এত বড় মাছ। উনি বললেন, তোমার ভাবি নেই, বেশি কিছু নেই। সবাই গোটা মাছই ভাতের সঙ্গে খাও। সেদিন খুব মজা করে খাওয়া-দাওয়া হয়েছিল। আমার আবার মনে হয়েছিল ঘরের প্রতি গভীর মনোযোগ না থাকলে এরকম আন্তরিকতাপূর্ণ আতিথেয়তা করা যায় না।

মঞ্জু আর্ট গ্যালারিতে একবার শাড়ির প্রদর্শনী দেখতে গিয়েছিলাম। শাড়িগুলো বিউটি আপা টাঙ্গাইলের তাঁতিদের কাছ থেকে অর্ডার দিয়ে করিয়েছিলেন। হঠাৎ ভাবি এসে পড়লেন। আমাদের সঙ্গে বন্ধু স্নিগ্ধাও ছিল, ও তখন আমেরিকাতে থাকতো, ও খুব পড়ুয়া। হকভাই ও ভাবি উভয়ের বই নিয়ে অনেক গল্প শুরু হলো। এক পর্যায়ে তারিক বলল, হকভাই কি ভিতরে আছেন? ভাবি ঘড়ি দেখে বললেন, তাঁর ঘুমানোর সময় হয়ে গেছে। আমরা কেউ তাকে বিরক্ত করতে চাইনি। কিন্তু ভাবির সঙ্গে দারুণ গল্প হয়েছিল। ভাবির তৃষিতা উপন্যাসটি আমাকে অল্প বয়সে ভীষণ আলোড়িত করেছিল। তাঁকে আমার অনুভূতির কথা জানালাম। কখনও জিজ্ঞাসা করা হয়নি তৃষিতা উপন্যাসে তাঁর ব্যক্তিগত জীবনের ছাপ আছে কিনা কিন্তু আমার বারবার মনে হয় এমন মিষ্টি রোমান্টিক কাহিনির সূত্রটি বোধহয় তাঁদের জীবনে ছিল।

গত কয়েক বছর হকভাই এবং ভাবির সঙ্গে কত যে অনুষ্ঠানে দেখা হয়েছে বলে শেষ করা যাবে না। আমি তো কবি নই। অনেক মানুষের ভিড়ের মধ্যে থেকেও তিনি স্নেহের সম্ভাষণ দিয়েছেন। তারিকের প্রতি তার অগাধ স্নেহ আমি বারবার অনুভব করেছি। কিন্তু আমাকে দেখলেই জিজ্ঞাসা করতেন, ইন্টেরিয়র ডিজাইন কেমন চলছে। ছেলে কেমন আছে, শ্বশুর মশাই অর্থাৎ তার বন্ধু কেমন আছেন।

তার বাড়ির ডিজাইনটা আমার খুব পছন্দ। বাড়ির সামনে অনেক গাছ। গাছগুলো অনেক বড়, তাঁরা সবাই এত গাছ পছন্দ করতেন, যে অনেকদিন তাঁদের ঘরের ভিতরে বসার ঘরে একটি বড় গাছের ডাল সাজানো ছিল। তার তলায় একটি টেবিলে মাটির নানারকম সাজানোর জিনিস ছিল।

বাড়িটির বসার ঘর থেকে সিঁড়ি উপরের দিকে উঠে গেছে। সিঁড়ির পাশ থেকে চিকন বারান্দা সেখানে রয়েছে লাইব্রেরি, যেখান থেকে নিচের ঘরটি উন্মুক্ত অবস্থায় দেখা যায়। উপরের তলায় শোবার ঘর। ষাটের দশকে ঢাকায় এরকম বাড়ি-ঘর তৈরি হতো। আমার আগ্রহ দেখে উনি আমাকে অনুমতি দিয়েছিলেন ঘরের ছবি তুলতে। পরে আমার Homes of Bangladesh বইটিতে তাঁর বাসার ছবি সংযোজন করেছিলাম।

বইটি ছাপার পর তাঁদের দিতে যাওয়ার পর ভাবি ও ভাই দুজনেই বাড়ির ছবি দেখে খুব খুশি হয়েছিলেন আর সেই সঙ্গে তারিক-এর গ্রাফিক্সের কাজ আর প্রকাশনা দেখে তখনই বলেছিলেন, ‘তুই এই কাজটাও খুব ভালো করিস’।

২০১৫’র জাতীয় কবিতা উৎসবে বিকেলের অধিবেশন সামনের সারিতে বসেছিলাম। ছোট একটি ছেলে বাদাম কেনার জন্য বারবার অনুরোধ করায় বাদাম কিনেছি মাত্র। এমন সময় হক ভাই আর ভাবি এলেন। আমি সরে গিয়ে ভাবিকে বসতে বললাম। কিন্তু ভাবি বললেন, তুমি তোমার জায়গায় থাকো আমরা দুজন তোমার দুই পাশে বসি। মঞ্চে কবিতা আবৃত্তি চলছে। ভাবি আমার হাত থেকে বাদাম নিল। এরপরে আমি বাদাম ছিলে ভাইকে দিলাম। সেই বছর কবিতা উৎসবের দ্বিতীয় দিনে বেঙ্গল গ্রুপের উদ্যোগে ধানমণ্ডির বেঙ্গল ক্যাফেতে রাতের খাওয়া-দাওয়া ও আড্ডার আয়োজন হয়েছিল। অতিথি কবিসহ দেশের অনেক লেখক, কবি ও শিল্পীরা ছিলেন। আনিস চাচা (ড. আনিসুজ্জামান) ছিলেন। হকভাই ও ভাবিও ছিলেন। বেঙ্গলের সিইও লুভা নাহিদ চৌধুরী সবার উদ্দেশে ছোট একটি স্বাগত বক্তব্য রেখেছিলেন। অত্যন্ত হাসি-খুশি আনন্দঘন পরিবেশ ছিল। বেশি মানুষের ভিড়ে আমি যে কবি নই তা ভুলে গিয়েছিলাম। সবার কাছে থেকে এত স্নেহ পেয়েছি যে, সবার সঙ্গেই অল্প অল্প করে গল্প করেছিলাম। কিন্তু ছবি তুলেছিলাম অনেক। আমি একটা বিষয় খেয়াল করেছি। অনেক মানুষজন থাকলে হক ভাই বেশি কথা বলতেন না। তবে তাঁর প্রাঞ্জল উপস্থিতি সব সময় দীপ্তিময়।

আমি শুধু ছোট ছোট মুহূর্তের কথা লিখছি। বঙ্গবন্ধুর ওপর প্রকাশিত ইতিহাসের মহানায়ক বঙ্গবন্ধু স্মারক গ্রন্থটি বের হওয়ার পর তারিক বইটি তাঁকে দেওয়ার জন্য গাড়িতে রেখেছিল। ঢাকা ক্লাবের প্রকাশনা কমিটির একটি মিটিং-এ তাঁকে বইটি দেওয়ার কথা। কিন্তু মজার ব্যাপার ড্রাইভার সাহেব ভুল করে বইটি আমার গাড়িতে দেন, আর আমিও সেদিন ঢাকা ক্লাবে যাই। তারিককে বললাম, বইটি তো আমার সঙ্গে চলে এসেছে। ও বলল, হকভাই থাকলে বইটি দাও, বঙ্গবন্ধুর উপর তাঁর কবিতা আছে।

বই দেখে খুব খুশি হলেন। নিজের কবিতাটি মুহূর্তের জন্য দেখে বইটির প্রচ্ছদ উল্টেপাল্টে বইয়ের সার্বিক গঠনটি মনোযোগ দিয়ে দেখলেন। জিজ্ঞাসা করলেন, তারিক করেছে, আমি বললাম, হ্যাঁ, বললেন, খুব ভালো হয়েছে। আমি সাহস করে বলেছিলাম, আপনার কবিতাটাও খুব ভালো। উনি একটু হেসে মিটিং-এ চলে গেলেন।

আমার সঙ্গে তাঁর অনেক কথা হয়েছে এমন নয়, আমিও কখনও বেশি কথা বলতে চাইনি। এই অল্প কথার ভিতর দিয়ে তাঁকে শ্রদ্ধার সঙ্গে দেখতে চেয়েছি।

২০১৪ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি লালবাগ কেল্লার লাইট অ্যান্ড সাউন্ড শো উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে হক ভাই ও ভাবির সঙ্গে দেখা হয়েছিল। লালবাগের কেল্লার ঐতিহাসিক ঘটনা নিয়ে লাইট অ্যান্ড সাউন্ড শোটি ছিল অসাধারণ। ক্রিয়েশন্স আনলিমিটেড -মাত্রা ও কালারস অব বাংলাদেশ-এর সহযোগিতায় অনুষ্ঠানটির আয়োজন করেছিল। আমাদের বন্ধু নাসিরুল হক খোকন এই অনবদ্য লাইট অ্যান্ড সাউন্ড শো-এর নির্দেশক ছিলেন। আর হক ভাইয়ের ছিল অসাধারণ স্ক্রিপ্টটি। আমরা কিছুক্ষণের জন্য মোঘল আমলের সুবেদার শায়েস্তা খানের শাসনামলে চলে গিয়েছিলাম। শায়েস্তা খান লালবাগ কেল্লার কাজটি সুসম্পন্ন করেছিলেন। হক ভাইয়ের স্ক্রিপ্টটিতে তিনি পরি বিবির মর্মান্তিক মৃত্যুর ঘটনাটি এমনভাবে উপস্থাপন করেছিলেন, যা সবাইকে স্পর্শ করেছিল।

সবচেয়ে মজার ঘটনাটি ঘটেছিল ২০১৪ সালের কবিতা উৎসবের ২য় দিন। সেদিনও আমাদের বাড়িতে খাওয়া-দাওয়ার অনুষ্ঠান ছিল। সেদিন সন্ধ্যায় আমরা সবাই খুব খুশি ছিলাম। তার একটি কারণ ছিল, এর কিছুদিন আগে আমার মা খুব অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন। কিন্তু উৎসবের আগেই উনি সুস্থ হয়ে আমাদের বাড়িতে আসেন।

সেদিন সন্ধ্যায় হক ভাই আর ভাবিকে নিয়ে তারিক সবার আগে বাসায় এসেছিল। আমি জানতাম অনেকে আসবেন তাই বাড়ি খুব পরিপাটি করে গুছিয়ে রেখেছিলাম। হক ভাই আর ভাবি ঘরে ঢুকেই বললেন, আগে তোদের বাসাটা ঘুরে ঘুরে দেখব। সব কিছু দেখে উনি মজা করে আমাকে বললেন, ‘এখানে কি তোরা থাকিস, না এরকম করে সাজিয়ে রাখিস।’ সেদিন হক ভাই ও আনোয়ারা ভাবি খুবই হাসিখুশি ছিলেন।

‘হকভাই’ সৈয়দ শামসুল হক কবি সব্যসাচী লেখক নাট্যকার। তাঁকে নিয়ে লেখা হবে অনেক। অনেকেই তাঁর কবিতা, ছোটগল্প, নাটক, উপন্যাসের তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ করবেন কিন্তু আমরা যারা ছোট ছোট ঘটনার ভিতর দিয়ে তাঁকে দেখেছি, এখনও দেখছি, শুনেছি তাঁর ছোট ছোট কথা তেমনি একদিন লন্ডনে যাওয়ার সময় তিনি এই অসুস্থতার ভিতরেও আমার সঙ্গে কথা বলেছেন।

তাঁর অসুস্থতার পর তারিক তাঁর প্রতি শ্রদ্ধাভরে কবিতা লিখেছিলেন। দৈনিক জনকণ্ঠে কবিতাটি পড়ে লন্ডন থেকে তারিকের সঙ্গে কথা বলার পর, আমার সঙ্গেও কথা বলেছেন। ঢাকায় হাসপাতালে আমাকে দেখে বসতে বললেন, তারিক তাঁর পরানের গহীন ভিতর পকেট সাইজ বইটি হাতে দেওয়ার পর, তিনি বইটি মাথায় ছুঁয়ে তারিকের হাতটা সস্নেহে ধরলেন।

আজ শুধু এ কথাই বলব, তাঁকে কখনও আমার ক্লান্ত মনে হয়নি। কোনো অসুখই তাঁর দৃঢ়তা নষ্ট করতে পারেনি। তিনি প্রভাতের প্রথম সূর্যের আলোর মতো উজ্জ্বল, চিরসবুজ ছিলেন, আছেন, থাকবেন।

* এই রচনায় উল্লেখকৃত ব্যবহৃত একটি আলোকচিত্র ব্যতীত সকল আলোকচিত্রই

নাজনীন হক মিমির ধারণকৃত।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

You may have missed

shares