সৈয়দ শামসুল হক সংখ্যা : সৈকত হাবিব

সৈয়দ শামসুল হক সংখ্যা

সৃজনসবুজ তিনি

সৃষ্টি তাঁর প্রার্থনার মতো

সৈকত হাবিব

 

এত কাতর এর আগে কখনও দেখিনি তাঁকে!

সৈয়দ শামসুল হক মানেই আমার কাছে তারুণ্যের সমনাম। যিনি আশি পেরিয়েও ঋজু, টানটান; জিন্স-গ্যাবাডিনের শার্ট-প্যান্টে চল্লিশের প্রবুদ্ধ তরুণ। এই মূর্তি মনে এমনই গেঁথে আছে, তিনি যে মানব-আয়ুর প্রায় পরিণতিতে পৌঁছে গেছেন এবং তিনি যে রোগে-শোকে শয্যাশায়ী হতে পারেন এ কথা তেমন মনেও হতো না। কিন্তু সেই দৃশ্যটি যেন এই বিশ্বাসে বড় একটা ঘা দিল।

ঘটনাটা একটু খুলেই বলা যাক। গত জানুয়ারির শেষ কী ফেব্রুয়ারির শুরুর এক সকালে তাঁর গুলশানের বাড়িতে যাই। উদ্দেশ্য, তাঁর ৮০-পূর্তিকে উপলক্ষ করে সারাজীবনের কাব্যসম্ভার থেকে বাছাই করে ৮০টি বিশিষ্ট কবিতা নির্বাচন করে একটি বই প্রকাশ, যার প্রস্তাব তাঁকে মাসকয়েক আগে দিয়েছিলাম। তিনি এতে সম্মতি দিয়ে কবিতা নির্বাচনের ভার আমার ওপরই ছেড়ে দিয়ে বলেছিলেন, চূড়ান্ত করার পর আমি যেন তাঁকে একবার দেখিয়ে নিই। সেই উদ্দেশ্যেই সেদিন যাওয়া। এমনিতেই তাঁর ‘মঞ্জুবাড়ি’ আমাদের জন্য প্রায়-অবারিত। তিনি এবং আনোয়ারা আপা সস্নেহে আপ্যায়ন করেন। কিন্তু সেদিন ঘরে ঢুকেই সবকিছু কেমন নিথর-শীতল-প্রাণহীন মনে হলো। গৃহকর্মী ঘরে বসিয়ে দিয়েই কোথাও যেন হাওয়া। হক ভাইয়েরও কোনো সাড়াশব্দ নেই। বেশ কিছুক্ষণ পর দোতলার সিঁড়ির গোড়ায় দেখা গেল তাঁর মুখ। অতিশয় ক্লান্ত, বিষাদগ্রস্ত। খুব ধীর পায়ে নেমে আসছেন। অস্বাভাবিকরকম ধীরে, যেন শরীরের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে। আমাকে বললেন ডাইনিং টেবিলের উজ্জ্বল আলোর নিচে গিয়ে বসতে। তিনিও এসে বসলেন। আমি তাঁকে কবিতাসমগ্র থেকে বাছাই করা ও পেন্সিল মার্ক করা কবিতাসকল সভয়ে সামনে মেলে ধরতেই কয়েক সেকেন্ড উল্টালেন। তাঁরপর বললেন, তুমি তোমার মতোই কাজটি করে ফেলো। আমি স্বস্তির নিশ্বাস ফেললাম। কিন্তু তাঁকে দেখে এত কাতর লাগল যে, ভয়ে ভয়ে জিজ্ঞেস করলাম, হক ভাই, আপনার কি শরীর খারাপ? বেশ দুর্বল লাগছে! তিনি খুব সংক্ষেপে ‘হ্যাঁ, একটু খারাপ যাচ্ছে’ বলে উঠে পড়লেন, আমাকে বিদায় দিলেন। অনেকেই জানেন, হক ভাই ব্যক্তিগত বিষয় বা কোনো দুর্বলতা নিয়ে বেশি আগ্রহ দেখালে বিরক্ত হন। সেজন্য মনে অনেক জিজ্ঞাসা থাকলেও কথা না বলে বেরিয়ে আসি। কিন্তু মনে বেশ মেঘ জমে ওঠে।

ব্যাপার যে কী গুরুতর জানা গেল আরও কিছুদিন পর যখন লন্ডনের হাসপাতালে চিকিৎসা-অবস্থায় তাঁর পরিবার গণমাধ্যমকে সব খুলে জানালেন। তার পরের ঘটনাপরম্পরা সম্পর্কে মোটামুটি সবাই জানেন। কিন্তু এ খবর আমার জন্য ছিল অবিশ্বাস্য, এখনও যেন এর জন্য মনকে প্রস্তুত করতে পারিনি।

২.

কেমনভাবে জীবন দেখেন মানুষ

সৈয়দ হক?

তাঁর ৮০তম জন্মদিনের প্রাক-মুহূর্তে ইত্তেফাকের অনুরোধে একটি দীর্ঘ সাক্ষাৎকার নেওয়ার সুযোগ পেয়েছিলাম। বলে রেখেছিলাম, গৎবাঁধা প্রশ্নোত্তর নয়, বরং তিনি যে ঊনআশি বছর পৃথিবীতে কাটিয়ে এলেন এবং ষাট বছরের বেশি সময় ধরে শিল্প-সংস্কৃতির প্রায় সব মাধ্যমে পথ হাঁটলেন এবং জীবনের প্রাণ-প্রাচুর্য-বিস্তার দেখলেন- এর মধ্য দিয়ে তাঁর যে অভিজ্ঞতা ও জীবনবেদ- সেসব শুনবো। তিনি সানন্দে রাজি হয়েছিলেন এবং আমাদের আলাপচারিতা খুবই সার্থক হয়েছিল। নিজেও বিপুলভাবে ঋদ্ধ হয়েছি। কারণ বাংলাদেশ, উপমহাদেশ এবং বিশ্বের সবচেয়ে ঘটনাবহুল ও গুরুত্বপূর্ণ সময়ের ভেতর দিয়ে তিনি জীবন পাড়ি দিয়েছেন। বিংশ শতাব্দীর মতো জটিল, বিস্ময়কর, ঘটন-অঘটনের সময়ে তিনি অন্তত ছয়টি দশক সজ্ঞান ও সক্রিয়ভাবে কাটিয়ে দিয়েছেন। সঙ্গে বিপুল পঠন, ভ্রমণ ও চিন্তন। আর একজন সৃজনশীল মানুষের নিজেরও তো আলাদা একটি সমান্তরাল পৃথিবী তৈরি হয় এবং বাস্তব ও কল্পপৃথিবীর মাঝখানে দাঁড়িয়ে তিনি একটি সেতুর ভূমিকা পালন করেন। এ কাজটি সৈয়দ হক বহু মাত্রা ও মাধ্যমে এতভাবে করেছেন যে, তার নেপথ্যকাহিনিও গভীর তাৎপর্যময়।

তাই জানতে চেয়েছিলাম তাঁর জীবনদর্শন। অকপটে বললেন : ‘আমাকে দেখে হয়তো অনেকে ভাবেন- আমি এখন যেমন আছি, হয়তো সবসময় তেমনি ছিলাম। আসলে আমার জন্ম খড়ে-ছাওয়া একটি কুটিরে, নদীর পাড়ে। আবার বাবা খুব পরিশ্রম করে নিম্নমধ্যবিত্ত-পর্যায়ে পৌঁছেছিলেন। কুড়িগ্রামে যে ঘরে আমরা থাকতাম তার চালে টিন থাকলেও বেড়া ছিল বাঁশের, মেঝে ছিল মাটির। বাবা মাঝে মাঝে আমাকে উচ্চাশা দিতেন- ‘তোমাকে ইটের দালানের দিকে পৌঁছুতে হবে।’ এটা একটা প্রতীক, এবং বলতেন, ‘ইটের দালানের দিকে যাত্রাটা মনে রেখো।’ এই বাড়িটা যখন শুরু করি, প্রথম ভিত স্থাপন করতে যাই, তখন বাবার কথাটা খুব মনে পড়েছিল। বাবা হঠাৎ চলে গেলেন, আমার আঠারো বছর বয়সে। তাই অনেক কষ্ট করেই বড় হয়েছি। সাত-সাতটা ভাইবোন ছিলাম, যা পেয়েছি তা পরিবারের সবাই মিলে ভাগ করে খেয়েছি। তবে ঝুঁকি যেমন ছিল, তেমনি আমার ভেতর জেদও ছিল। ভেবেছি- হবে না কেন, অবশ্যই হবে। কখনও হাল ছেড়ে দিইনি। তুমুল নিরাশার সময়ও আশাকে বিদায় করিনি। অন্ধকারের ভেতর থাকলেও তাকে অন্ধকার মনে করিনি। কখনও অনুতাপ করিনি। আমি সব সময় নিজের জীবনকে ভেতর থেকে যেমন দেখি, তেমনি বাহির থেকেও দেখি। আমার অনেক কঠিন সময়ে নিজেকেই নিজে দর্শক হিসেবে দেখেছি, যেন এসব ঘটনা আমার জীবনে ঘটেনি। আর নিজেকে নিরাসক্তভাবে বাইরে থেকে দেখা একজন লেখকের জন্য জরুরি। আমার মধ্যে একটা নিরাসক্তি আছে। আর একটা ব্যাপার, আমি কখনও কোনো কিছু নিয়েই অনুতাপ করিনি।’

এই যে বাবার বলা, ‘তোমাকে ইটের দালানের দিকে পৌঁছুতে হবে।’ তারপর ‘অনেক কষ্ট করে বড় হওয়া’, জীবনে অনেক ‘ঝুঁকি’ থাকা সত্ত্বেও ‘ভেতরে জেদ’ থাকা, ‘হাল না ছেড়ে দেওয়া’ এবং ‘তুমুল নিরাশার সময়ও আশাকে বিদায় না করা’-  এ-ই তো সৈয়দ শামসুল হক। সঙ্গে এ উক্তিটাও প্রণিধানযোগ্য, ‘আমি কখনো কোনো কিছু নিয়েই অনুতাপ করিনি।’ কারণ, যিনি নিজেই নিজের কাক্সিক্ষত জীবনকে গড়ে তুলেছেন, যার পেছনে আছে অনেক ক্ষুধা-শ্রম-ঘাম, তার পথ তো সরলরৈখিক হবে না, তাই ‘অনুতাপ’-এর বদলে একটু ‘নিরাসক্তি’ বেঁচে থাকার জন্যই দরকার। তবে এই নিরাসক্তি আসলে তাঁর মতো জীবনবাদী মানুষের ক্ষেত্রে জীবনের প্রতিই প্রগাঢ় আসক্তি।

আর তৃতীয় বিশ্বের এক দরিদ্রতম ও পরাধীন দেশে পিছিয়ে পড়া এক জনগোষ্ঠীর সদস্য হিসেবে যাঁর জন্ম, যাদের স্বাজাত্যবোধ মাত্র জন্ম নিচ্ছে, ‘আধুনিক’ শিক্ষার ক্ষেত্রে যারা প্রথম কি দ্বিতীয় প্রজন্ম, কেবল স্বপ্ন ও আশা যাদের প্রধান ভরসা, সে রকম জায়গা থেকে উঠে আসার লড়াইটা কী প্রচণ্ড, আমরা যারা স্বাধীন দেশে জন্ম নিয়েছি, তাদের পক্ষে বুঝে ওঠা বেশ কঠিন। এই দীর্ঘ পথ মাড়িয়েই তো তিনি আজকের সৈয়দ হক। ফলে তাঁর জীবনের বোধ ও পিপাসা যে তীব্র হবে এ-ই তো স্বাভাবিক। বললেনও নিজেই, ‘এই যে সময়টা পার করে এলাম, তাকিয়ে দেখি এটা খুবই উত্তেজক, উদ্বোধক, নাটকীয়, সংঘাতপূর্ণ… এই সময়টা আমাকে এমনভাবে নিয়ে এসেছে, মরে যদি আবার জন্ম হয়, তাহলে এমনভাবেই আসতে চাইব, এই জীবনই চাইব।’ তাই আশিতে পৌঁছেও তিনিই বলতে পারেন, ‘এখনো মনে হচ্ছে না যে, হাল ছেড়ে দেবার সময় এসেছে বা বসে পড়বার জন্য ডাক এসেছে। আগের মতোই তো আছি।’ এই মানুষই তো তাঁর আত্মজীবনীর নাম দিতে পারেন, ‘প্রণীত জীবন’। জৈবিক কারণের বাইরে এ জীবনের প্রণেতা তো তিনি স্বয়ং!

জীবনের সঙ্গে মৃত্যু ওতপ্রোত। আর প্রত্যেক লেখক-শিল্পীর মধ্যেই বিশেষ ধরনের মৃত্যুচেতনা কাজ করে। খুব দামি একটা কথা বললেন, ‘মানুষের জীবনে জন্ম কোনো ঘটনা নয়। মৃত্যুই ঘটনা। কারণ জন্মকালে তার কোনো বোধ থাকে না, একটা সময় বোধ কাজ করে, তারপর মৃত্যুর দিকে এগিয়ে যায়।’ লালনের মতো তাঁরও আক্ষেপ, এমন মানব জনম আর কি হবে?

 

সৃজনই তাঁর জীবন আর আনন্দ-উৎসার।

জীবনের প্রায়-প্রতিটি মুহূর্তে শরীরে ও মনে শিল্পিত থাকা, মগজে কিংবা কলমে নিয়ত সৃষ্টি করার এক আশ্চর্য সহজাত ক্ষমতা, না ‘সহজাত’ বলা বোধহয় ভুল হলো, বরং বলা যাক অর্জিত ক্ষমতা (কারণ এর জন্য তাঁর সজ্ঞান ও শ্রমশীল অনুশীলন রয়েছে)। খুব বিস্মিত হয়েছিলাম তাঁর এ কথা শুনে যে, ‘আমি আমার জীবনের সবচেয়ে কঠিন মুহূর্তেও সকালে কখনো গোসল না করে এবং ভালো পোশাক-আশাক না পরে লিখতে বসিনি। কোনো দিন লুঙ্গি পরে বা হেলাফেলা করে লিখিনি। শীত বা গ্রীষ্ম, দেশ কিংবা বাইরে সব অবস্থায় আমি এই রুটিন মেনে চলি।’ এ কথা যদি সত্যি হয়, তাহলে বলতেই হয় সৃজন তাঁর কাছে প্রার্থনার মতো। এবং এই সাধনা অন্যভাবে রোগশয্যায় শুয়েও করছেন। ইউনাইটেড হাসপাতালে তাঁকে শুয়েই থাকতে হচ্ছে। কিন্তু মহাবিশ্বে ধাবমান তাঁর মস্তিষ্ক তাঁকে দিয়ে লিখিয়ে নিচ্ছে, লেখার ভাষা আসছে মুখে, আর তাঁকে কাগজে নামিয়ে নিচ্ছেন সহধর্মিণী ও সুলেখক আনোয়ারা সৈয়দ হক। যে ‘অলৌকিক আনন্দের ভার’ বিধাতা তাঁকে দিয়েছেন, তার বুকের অপার বেদনা (আসলে আনন্দ) যেন শেষ পর্যন্ত প্রকাশমান থাকে বিধাতার কাছে এ সুযোগে বিনীত নিবেদন করি।

সৃজনকে ঘিরে কেমন তাঁর ‘অলৌকিক আনন্দ’, চলুন তাঁর মুখেই শুনি : ‘লিখেই আমি সর্বোচ্চ আনন্দ পাই।…কাজটা করতেই খুব আনন্দ। এমনকি লেখার টেবিলে বসার সঙ্গে সঙ্গেই মনে হয় আমি একটি আনন্দের দরোজায় দাঁড়িয়েছি, এবার আমাকে ভেতরে প্রবেশ করতে হবে…। কখনো কখনো এমন হয় একটা তৃপ্তিকর লেখা শেষ করার পর নিজেকে বাইরে নিয়ে যাই। তাকে নানা কিছু উপহার দিই। কোনো ভালো রেস্তোরাঁয় ডিনার করাই। এবং নিজেকেই বলি, বয়, ইউ হ্যাভ ডান এ গুড জব। এর মানে, আমি লেখাটাকে প্রচণ্ড এনজয় করি।’

দৃষ্টান্ত হিসেবে বললেন : ‘একটা কোনো পঙ্ক্তি হয়তো চলতে চলতেই মাথায় এল, কবিতায় যেমন হয়, একটা-দুটো লাইন উড়ে আসে, তখনই মনে হয়, একটা প্রজাপতি কাঁপছে, পাখা নাড়ছে, কোথায় বসবে বুঝতে পারছে না। আমি স্পষ্টই দেখতে পাই লাইনটা উড়ছে… উড়ছে…। ‘এখানে থেমো না তুমি’ এ একটা কথা সেদিন মাথায় এল, কী করব আমি জানি না, কিন্তু লাইনটা প্রজাপতির মতো কাঁপছে… এই যে তোমার সঙ্গে কথা বলছি, এখনো মাথায় কাজ করছে ‘এখানে থেমো না তুমি’। মনে হচ্ছে একটা পয়ার পয়ার ভাব আছে। কিন্তু হয়নি এখনো, মনে হচ্ছে এখনো ডানা ঝাপটে চলেছে…।’

এর পরেই যোগ করলেন একটি বাক্য : ‘ইউ নো, মাই রাইটিংস অ্যান্ড মি, ইটস রিলেটেড টু ইচ আদার…।’

পয়ারের প্রসঙ্গ বলার পরই মাথায় একটা প্রশ্ন এল ‘দীর্ঘদিন ধরে আপনার কবিতা পাঠ করে মনে হয়, যেন স্বভাবকবির মতোই আপনার ভেতরে…।’ আমার কথা শেষ করতে দিলেন না সৈয়দ হক : ‘স্বভাবকবি বলে কিছু নেই। একটু আগে বললাম না, কবিতার একটা-দুটো লাইন আসে, এরপর একে বানাতে হয়।’ খানিক পরেই বললেন, ‘তুমি যে বললে স্বভাবকবির মতো, তা নয়, এখানে আমার সচেতন কাজ রয়েছে। মূলত আমি মিস্ত্রি তো। ধরো এখানে কিছু কাঠ আছে বা কিছু কাঠের টুকরো পড়ে আছে- কিছু তো বানাতে হবে। কারণ হাত তো নিশপিশ করে।’

মনে পড়ে আইনস্টাইনের সেই উক্তিটা ‘আমার কাছে প্রতিভার মানে হচ্ছে পরিশ্রম।’ কাজেই আমরা যারা প্রতিভা ধুয়ে পানি খাই কিংবা বিনাশ্রমে ‘মৌলিক সৃষ্টি’ নামে অনেক সময় সাহিত্যবর্জ্য উৎপাদন করি, কথাটা তাদের কাছে বেদনাদায়কই মনে হতে পারে। কিন্তু শিল্পীর কাজ তো অনেকটাই মিস্ত্রির মতো, ক্রাফটস্ম্যানশিপ, প্রতিভার জোরে ভেতর থেকে কিছু এলেও তাঁকে কি হুবহু ছেড়ে দেওয়া যায়, কারুকাজহীন? জীবনানন্দের কবিতার পাণ্ডুলিপিতে অজস্র কাটাকুটি দেখলেই টের পাওয়া যায়, একটি খসড়া কবিতা যেন টুকরো কাঠ বা পাথর, আর তাকেই তিনি করে তুলেছেন অসামান্য ভাস্কর্য। সৈয়দ হক এই শ্রমঘন মিস্ত্রিগিরি করেছেন বলেই তাঁর রচনা বিপুল ও বহুবর্ণিল।

আর এই সৃজনসবুজ মানুষটি যদি এসবের জন্য কলাদেবীর পাশাপাশি লক্ষ্মীদেবীরও কৃপা লাভ করে থাকেন, আমরা কেন আনন্দিত হবো না! এ তো তাঁর জীবনব্যাপী রক্ত ও ঘামেরই উপার্জন অথবা পরিণাম। না হয় কিছু উপরি তিনি পেলেনইবা।

তিনি আধুনিক, অন্তহীন জীবনপিপাসু, চিরতরুণ প্রাণ!

আজ যখন তিনি অনারোগ্য ব্যাধিতে শয্যায়, আর আমরা তাঁর সুস্থভাবে ফিরে আসার জন্য অদৃশ্য প্রার্থনায়, তখনও তাঁর তারুণ্যমূর্তিই যেন আমার চোখে ভাসছে। হাসপাতালে শুয়েও তিনি এমন দৃঢ়, বলিষ্ঠ, সৃষ্টিমত্ত আর সহাস্য, উল্টো আমাদেরকেই যেন সাহস দিচ্ছেন, অভয় দিচ্ছেন। যে অগণন বাঙালি ঝড়ে-ঝঞ্ঝায়-বন্যায়- আগুনে নিঃশেষ হতে হতেও ঘুরে দাঁড়ায় তিনি যেন সেই জাতির সুযোগ্য আধুনিক উত্তরাধিকার। তাঁর সৃষ্টিবিশ্বে তো এই সাহসের কথাই উচ্চারিত হয়েছে বারবার। আর এ জাতির প্রেম-যৌবন -স্বপ্ন-সংগ্রামকেই তো তীব্র তারুণ্যে তিনি পরানের গহীন ভিতর থেকে তুলে এনেছেন। এ যৌবনের উৎস কোথায়? বললেন : ‘জীবনকে আমি ভালোবাসি। প্রতি মুহূর্তে জীবনকে উপভোগ করতে চাই। এই তাড়না এবং প্রেরণা আমাকে অক্ষয় যৌবনে রেখেছে এটা তোমরা বলতে পারো। কিন্তু আমি মনে করি এটা আমাকে সপ্রাণ রেখেছে।’

আর কবিতায় এত প্রেমেরই বা কী রহস্য? বিশদেই নিজেকে মেললেন : ‘বাংলা কবিতার মূল রসই হচ্ছে প্রেম। এটা রাধাকৃষ্ণ থেকে এসেছে। এর একদিকে যেমন প্রেম আছে, অন্যদিকে আছে কাম। একদিকে দৈহিক আছে, অন্যদিকে মানসিক আছে। তবে এর ভেতরে বিরহ-বিচ্ছেদের তাপটা বেশি ধ্বনিত। যেমন রাধাকৃষ্ণর- তাদের কিন্তু সর্বক্ষণের সংসার নয়, মাঝে মাঝে, কখনোসখনো…। প্রতিটি জাতিরই কিন্তু কল্পনার একটা মহানীলনকশা থাকে। বাংলা কবিতায়ও এর প্রধানতম নীলনকশা হচ্ছে রাধাকৃষ্ণ। যখন রবীন্দ্রনাথের কবিতা, জীবনানন্দের কবিতা পড়ি, তখন দেখি কোথাও না কোথাও এই মহানীলনকশার একটা ছায়াপাত আছে। আমার কবিতায়ও এটা করেছি। আরেকটা জিনিস যেটা ফিরিয়ে এনেছি, তা হলো কাম। বাংলা কবিতা থেকে কামভাবটা চলে গিয়েছিল। এর কারণ স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ। তিনি প্রথমদিকে দেহ-চুম্বন এসব নিয়ে সনেট লিখলেও পরের দিকে নিজেকে গুটিয়ে পরে বিমূর্ত স্তরের দিকে চলে গেছেন। এরপর বুদ্ধদেব বসুর ‘বন্দীর বন্দনা’য় প্রথম দেখেছি দৈহিক ক্ষুধার চিৎকার। যেমন ক্ষুধার্ত মানুষ অন্ন দাও অন্ন দাও বলে, তেমনি ক্ষুধার্ত যৌবন চিৎকার করে- আমাকে সঙ্গ দাও, আমাকে তৃপ্ত করো, আমাকে উষ্ণতা দাও। এই জিনিসটা অনেকটাই দূরে চলে গিয়েছিল বাংলা কবিতা থেকে। যেজন্য আমি খুব সচেতনভাবে কিছু কামজ কবিতাও লিখেছি।’

তিনি সর্বার্থেই একজন আধুনিক মানুষ। আর আমরা তো জানি, আধুনিক মানুষ একই সঙ্গে বীর ও ভাঁড়, ভোগী ও ত্যাগী, সাহসী ও পলায়নপর, প্রেমিক ও কামুক, সুস্থ ও বিকারগ্রস্ত, নির্লিপ্ত ও সুযোগসন্ধানী। তার আছে নানান ছদ্মবেশ ও মুখোশ, আলো ও আঁধার…। উনিশ শতকের গোড়াতেই তো দস্তয়েভস্কি দেখিয়ে দিয়েছেন, মানুষের ক্ষেত্রে নিরঙ্কুশ ভালো বা মন্দ বলে কিছু নেই। তার ভিতর দেবতা ও শয়তান জড়াজড়ি করে আছে, যাকে আলাদা করা খুব কঠিন। আর নিশ্চয়ই মনে আছে ড. জেকিল আর মিস্টার হাইডের সেই গল্পটা, যেখানে দিনে যিনি পরম সাধু ও সজ্জন, রাতে তিনিই ভয়ংকর খুনি!

কাজেই, এত চেঁচামেচির তো কিছু নেই। আর বাঙালি-চরিত্রের বাজে দিকটাও তো আছে। আমরা মানুষের নেতিবাচক দিকটাই আগে দেখি এবং কাউকে নিন্দামন্দ করতে পারলে বর্তে যাই। কিন্তু এখন কি এর সময়, যখন… আমাদের মূল্যবোধ কী বলে? আর এই ভয়াল বিশ্বে আমরা কেই-বা অকলুষ!

বরং চলুন না, তিনি যে এত তীব্র নিবেদন নিয়ে সৃজনের পথ রচনা করে এলেন সেজন্য তাঁকে জাতীয়ভাবে অভিনন্দিত করি এবং তাঁর সৃষ্টিপ্রণত চিরতারুণ্যকে জয়-উৎসবের মধ্য দিয়ে উদযাপন করি।…

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

shares