সৈয়দ শামসুল হক সংখ্যা : টোকন ঠাকুর

সৈয়দ শামসুল হক সংখ্যা

‘ধরো, কবে চলে যাই’

টোকন ঠাকুর

 

বৃষ্টি হচ্ছে। সমস্ত শহর ভিজে যাচ্ছে বর্ষণে বর্ষণে। এমন তো নয় যে, এটা বর্ষাকাল। শ্রাবণ পেরিয়ে গেছে কবেই। শরৎ তো তো যায় যায়। এসময়, এত বৃষ্টি হয়! হয় না, এখন হচ্ছে। বৃষ্টিতে ধুয়ে যাচ্ছে মেট্টোপলিটন, বৃষ্টিতে ভিজছে না মন। মন কি ভেজে, এত সহজেই? ঘরের বাইরে ছাদের কোণে চুপ করে বসে আছে একটি শালিক। শালিকের মন ভালো নেই? কেন? শালিক কি আমার প্রশ্নের উত্তর দিতে পারবে-

মন ভালো নেই কেন তার? কবি শুয়ে আছেন হাসপাতালের বিছানায়, কবিতা শুয়ে আছে কবির বালিশের নিচে, কবির শরীরে ক্ষয় লিখে যায় কর্কট-বিছে! সৈয়দ শামসুল হক বিদেশি হাসপাতাল থেকে ফিরে ঢাকার হাসপাতালে শুশ্রুষায় আছেন। অপেক্ষা করছি, দ্রুত তিনি সুস্থ হয়ে গুলাশান ১-এর ৬ নম্বর রাস্তার ৮ নম্বর বাড়ি, ‘মঞ্জুবাড়ি’তে ফিরবেন। কবি বাড়িতে ফেরার পর এবারের আড্ডা হবে বৃশ্চিকের জাল নিয়ে, হেমন্তের প্রথম কুয়াশা নিয়েও আড্ডা হবে। সৈয়দ হকের সঙ্গে আড্ডার স্বাদ পেতে মন ছটফট করছে। কবিতা, চিত্রকলা, সিনেমা নিয়ে আড্ডা আমার হকের সঙ্গে, যে হক সব্যসাচী, যে হক রবীন্দ্র-উত্তর বাংলা সাহিত্যে সবচেয়ে বহুমুখী সৃজনে বিস্তৃত। সৈয়দ শামসুল হক একদিন কথায় কথায় বললেন, ‘সেই ১৯৪৯ সালে কুড়িগ্রাম থেকে ঢাকায় এলাম। সেদিনের সেই ছিমছাম ছোটমোটো ঢাকা শহরকে এক বিরাট ব্যাপ্ত মহানগরীতে পরিণত হওয়া দেখলাম চোখের সামনেই।’ বলাই যায়, ঢাকা শহরের মতোই ছোট্ট থেকে পরিব্যাপ্ত, বিশাল, বিস্তৃত হয়ে উঠলেন গতশতকের পঞ্চাশের দশকের তরুণ কবি সৈয়দ শামসুল হক, যিনি এই মুহূর্তে আছেন হাসপাতালে, বয়স তিনি অতিক্রম করে যাচ্ছেন বিরাশি বছর। মনে, সৃজনে সদাতরুণ, মননে দৃপ্ত তিনি সফল চাষা। চাষ করলেন বাংলা ভাষা। প্রকাশিত হলো কবিতা, ছোটগল্প, উপন্যাস, কাব্যনাটক, মঞ্চনাটক, শিশুসাহিত্য, নানারকম উৎকর্ষ-ভাবনার টেক্সট। অনুবাদ করেছেন। চিত্রকলা নিয়ে কাজ করেছেন। সিনেমা নির্মাণ করেছেন। সিনেমার চিত্রনাট্য লিখেছেন, গান লিখেছেন। এতভাবে তিনি নিজেকে ঢেলেছেন কাগজে, ক্যানভাসে, চিত্রে-বৈচিত্র্যে, তাকে সবাই সব্যসাচী বলে থাকেন, ডাকেন। এবং এরকম সব্যসাচী লেখক, রূপকার বাংলা সাহিত্যে বিরল। সংস্কৃতির এত শাখায় বিচরণ এই মানুষটির, ভাবলে অবাক হতেই হয়। যা অনেকের জন্যে অবাক করে দেয়, সৈয়দ হক তাই সৃষ্টি করেছেন একের পর এক। সেই কবি, সেই লেখক অসুস্থ এখন। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী থেকে শুরু করে সমাজের নানান স্তরের মানুষ বিচলিত, হওয়ারই কথা। কবির শুশ্রƒষা চলছে। ডাক্তার, নার্স, ঔষুধ কবির চৌদিকে পাহারা বসিয়েছে। দেশের গণমাধ্যম সৈয়দ হকের অসুখ কিংবা চিকিৎসা নিয়ে বেশ সতর্ক। যদিও তাদের এই সতর্কতার মধ্যে একটি ব্যবসায়িক প্রতিযোগিতার মনোবৃত্তি লুকিয়ে আছে। সমকালীন বাংলাভাষার এত বড় এক স¤পদ, সৈয়দ শামসুল হক, এই স¤পদের শক্তি তো ভালো করেই জানে গণমাধ্যমের লোকেরা। ফলে, তারা একটু বাড়তি লেন্স তাক করে রেখেছে

হাসপাতালের রোগী সৈয়দ শামসুল হকের দিকে। এসব আমার চোখ এড়াচ্ছে না। সোশ্যাল নেটওয়ার্কের রিপার্কেশন এখন সবচেয়ে প্রভাবশালী, সেখানে তরুণরাই লিড করে। ফেসবুকসহ নানারকম অনলাইন ব্লগেও সৈয়দ হকের রোগব্যাধির খবর নিয়ে সবাই টানটান নজর রাখছে। এও সত্য, এতে করে সব্যসাচী লেখক সৈয়দ শামসুল হকের ক্ষমতাকে স্বীকার করে নিচ্ছে সবাই। এটা সফল  স্রষ্টার সৃজন কর্তৃত্বের খেলা। সৈয়দ শামসুল হক আমাদের দেখা এমন এক কবি বা নাট্যকার বা ঔপন্যাসিক বা গল্পের লেখক, তাঁকে সৃজনে ঈর্ষা করার সমতুল্য বর্তমান বাংলা সাহিত্যে আর তো কেউ নেইই। আগেই বলেছি, সফল চাষা তিনি, বাংলা সাহিত্যে। তাঁকে আমাদের শ্রদ্ধা জানাই। শিগগিরই তিনি সুস্থ হয়ে বাড়িতে ফিরবেন, এটা খুব চাই। কারণ, হক ভাইয়ের সঙ্গে আমার কিছু কাজ রয়ে গেছে। তিনি সুস্থ হয়ে ফেরার পরই আমি তাকে নিয়ে সেই কাজ সমাপ্ত করতে চাই। সেই কাজ, সিনেমা বানানো। সিনেমার নাম, খেলারাম খেলে যা, যেটা সৈয়দ হকের সবচেয়ে নন্দিত-নিন্দিত-বিতর্কিত-বেশি পঠিত সাহসী উপন্যাস।

আমি খেলারাম খেলে যা নিয়ে ছবি বানাব, এ নিয়ে হকের সঙ্গে দুতিন বছর আলাপ-আলোচনা চলছে। এমনিতেই এই কবির সঙ্গে আমার একটা ব্যক্তিগত সম্পর্কের বোঝাপড়া প্রতিষ্ঠিত হয়েছে অনেকবছরের লেখালেখির পাঠশালায়। আমি তাঁর লেখার ভক্ত পাঠক মাত্র। শিখি তাঁর কাছে। লেখাকে, মানুষের জীবনকে দেখা শিখি তাঁর সঙ্গে আড্ডা দিতে দিতে। এ আমার ভাল্লাগে। আমি একটি সাহিত্য-সংস্কৃতির সংকলন ‘সামান্য কিছু’, ইংরেজিতে যার নাম, ‘অ্যা লিটল বিট’-এর সম্পাদক। ‘সামান্য কিছু’র একটি সংখ্যাই প্রকাশিত হয়েছে ২০১৩-তে, সেটা সৈয়দ শামসুল হক স্মারক সংখ্যা। সৈয়দ হকের ৭৯ তম জন্মদিন উদযাপন করেছিলাম বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমিতে, ‘সামান্য কিছু’ সেই অনুষ্ঠান উপলক্ষে প্রকাশিত। ক্রাউন সাইজ, ২৫ ফর্মা। সৈয়দ হক আমাদের সেই অনুষ্ঠানে প্রাণবন্ত নায়কের মতো উপস্থিত থেকেছেন, যেভাবে তিনি বাংলা সাহিত্যেও নায়ক হয়েই আছেন।

আমি খেলেরাম খেলে যা উপন্যাস থেকে চিত্রনাট্য শুরু করলাম। এই নিয়ে হক ভাইয়ের সঙ্গে আমার আলোচনাও হলো কয়েক প্রস্থ। সৈয়দ হক জানালেন, ১৯৭০ এ ‘সন্ধানী’তে প্রকাশের পরপরই জহির রায়হান উপন্যাসটি নিয়ে ছবি বানাতে চেয়েছিলেন এবং এরপর আর কেউ এটিকে নিয়ে ছবি বানাবার কথা বলেননি তাঁকে। প্রায় চারদশক পর আমি ফের ছবি বানানোর অভিপ্রায় ব্যক্ত করলাম। কিন্তু আমি খেলারাম খেলে যা উপন্যাস থেকে চিত্রনাট্য শুরু করলাম বটে, অর্থাৎ বাবর আলী আখ্যানকে চিত্রনাট্যে ধরলাম বটে, এ নিয়ে একদিন হক ভাইকে বললাম, খেলারাম খেলে যা নিয়ে ছবি বানাব বটে, বাবর আলীর মনোজগৎ- বহির্জগৎ প্রজেকশন করা হবে বটে, বাবর আলীর গার্লফ্রেন্ডদেরও দর্শক দেখবে বটে, কিন্তু আমি একটু এক্সপেরিমেন্ট করতে চাই।

সৈয়দ হক জানতে চান, কি রকম?

তাঁকে বলেছি এবং আমার চিত্রনাট্য আমি যেভাবে গড়েছি যে, বাবর আলীকে দেখানো হবে ১৯৭০ সালের ঢাকা শহরের একটি চরিত্র হিসেবে যেমন, তার সঙ্গে স্ক্রিনে দর্শক দেখতে পাবে বাবর আলীর নির্মাতা স্বয়ং সৈয়দ শামসুল হককেও। অর্থাৎ সৈয়দ হককে স্ক্রিনে থাকতে হবে প্রামাণ্য চরিত্র হিসেবে। হক ভাই বললেন, ‘তোমার চিত্রনাট্য লেখা শেষ হলে দেখিও তো।’ চিত্রনাট্য লেখা শেষ। সরকারি অনুদানের ছবি শহীদুল জহিরের কাঁটা নির্মাণে সময় বিলম্ব হওয়ায় আমি খেলারাম খেলে যা’র চিত্রনাট্য কম্পোজের পর প্রিন্ট আউট করিয়ে হক ভাইয়ের কাছে যেতেও পারছি না, এ নিয়ে আমার মধ্যে একটা চাপ তৈরি হয় বা হচ্ছে। হলেও, সরকারি অনুদানপ্রাপ্ত কাঁটা শেষ না করে তো আমি বেরুতেও পারছি না। একদিন কথায় কথায় হক ভাই বললেন, ‘হুম, কাঁটা শেষ করো। মাধ্যমটি তো আমার অজানা নয়।’

হক ভাই এও বললেন, ‘তোমার খেলারাম খেলে যা’ চিত্রনাট্যে আমাকে স্ক্রিনে রাখতে চাও, রেখো, বেশি রেখো না। ধকল তো!

প্রথম কথা, আদ্যোপান্ত সৈয়দ হকের উপরে প্রামাণ্যচিত্র তৈরি করছে দুজন ছেলেমেয়ে। তারা গুলশানের চমৎকার বাড়িতে এসে এসে হকের উপরে ক্যামেরা ফেলে কাজ করছে। এই দুজন কি শুধুই দুজন সহকর্মী? না, দেখে তা মনে হয় না। বাড়তি সম্পর্ক আছে তাদের। সেই বাড়তির নাম, ভালোবাসা। ভালোবাসাই তো সব। সৈয়দ হকের উপরে ডক্যুমেন্টরি করতে আসা যুবক-যুবতী, তারা হয়তো প্রেমিক-প্রেমিকাও এবং তারা সৈয়দ হকের লেখার ভক্ত। তারা ডক্যুমেন্টরি করতে সৈয়দ হককে বাড়ির ভেতরেও ক্যামেরায় ধরে, কখনও কখনও তারা হক সাহেবকে নিয়ে বাড়ির বাইরে যাবে। বিউটি বোর্ডিং যাবে? হ্যা, যাবে। সেকালের বুড়িগঙ্গায় যাবে? যাবে। কিন্তু সেটা পাবে কোথায়? তা নির্মাতারা জানে। নির্মাণ করে নেবে। নির্মাতা তো এই জন্যেই। যেরকম, সৈয়দ শামসুল হক বাংলা সাহিত্যের এক বড় নির্মাতা। তো সেই ছেলেমেয়ে ‘সৈয়দ হক-প্রামাণ্যচিত্র’ নির্মাণকালীন খেলারাম খেলে যা প্রসঙ্গে গিয়ে বাবর আলীতে মজে যাবে। বাবর আলী তো সেভেনটিজ থেকে এখন পর্যন্ত পাঠকের কাছে এমন এক ফেনোমেনা প্রোটাগনিস্ট, যার প্রতি পর্যবেক্ষণ আমাদের বাড়িয়ে দিতেই হয়। সে অধ্যায়ে একাধিক নারীর সঙ্গে বাবরের যৌনতা হাজির, তীব্রভাবেই। আবার দেশভাগও সেখানে একটা ফ্যাক্টর। ফলে, হলো কি? সৈয়দ হক নিজেই কি বাবর আলী- এই লক্ষ পাঠকের প্রশ্নও ক্যারি করছিল প্রামাণ্যচিত্রের নির্মাতারা। সৈয়দ হক নারীদের কাছে এক যাদুকর। বাবর আলীর মধ্যেও সেই যাদুর শক্তি দেখা যায়। তাই যে প্রশ্নে সৈয়দ হককে ঘায়েল করতে চেয়েছিল মেয়েটি, ডক্যুমেন্টরি করতে আসা এই মেয়েটিও প্রেমে পড়ে গেল ফের, সৈয়দ হকের। এই নিয়ে তার ছেলে বন্ধুর কী গোস্বা! শুরু হলো কী তার দহন! ফলে, তাদের যৌথভাবে ‘সব্যসাচী সৈয়দ হক’ প্রামাণ্যচিত্র নির্মাণের গতি বাঁধাপ্রাপ্ত হয়। বলা যায়, ভালোবাসা এসে বাঁধা দেয় কাজে। ভালোবাসা ভাসিয়ে নিয়ে যেতে চায়…

এই অবস্থায় খেলারাম খেলে যা চিত্রনাট্য এগিয়েছে। এমন কি ১৯৭০ সালের প্রোটাগনিস্ট বাবর আলীর সঙ্গে ২০১৬ কি ১৭ সালের, বয়সে ৮০ উত্তীর্ণ সৈয়দ হকের দেখা হবে এক নদীর ব্রিজের নিচেয়। তাদের বাতচিৎ হবে। স্ক্রিনে। সৈয়দ হক সেখানে প্রণেতা, পিতা, বাবর আলী হচ্ছে প্রণয়ন। মজা আছে। সৈয়দ হকের হাতে থাকবে সেলফোন। বাবর আলী সেলফোন দেখে মজা পায়। কারণ, ‘৭০ সালে সেলফোন ছিল না। কিন্তু বাবর ছিল ১৯৭০ সালে ঢাকা শহরে চল্লিশ-ছুঁই প্রতিষ্ঠিত পুরুষ। যে ভালোবাসত না, কিন্তু নারীসঙ্গ ভোগ করত। হক ভাই খুব আনন্দিত, বাবর আলীকে মানুষ ছবিতে দেখবে। বললেন, ‘তাইলে বলছ বাবর আলীর অস্তিত্ব এখনো আছে?’

বললাম, আছে। বাবর আলীর সংখ্যা বেড়েছে হক ভাই।

হক ভাইয়ের বাসায় আড্ডা আমার। লেখক আনোয়ারা সৈয়দ হক আমার অনেক আপনজন, আমরা যশোরের মানুষ। সম্পর্ক  বেশি। হক ভাইকে নিয়ে আনোয়ারা আপার সঙ্গেও আমার কথা হয় মাঝেমধ্যে। তিনি লেখকের স্ত্রী, পেশায় মনোরোগের ডাক্তার। মাঝেমধ্যেই আমাকে বলেন, ‘বাসায় এসো তো। হক সাহেবের শরীরটা ভালো যাচ্ছে না, তুমি এসে আড্ডা দিলে উনি খুব নড়েচড়ে বসেন। আমিও যাই। হক ভাইয়ের সঙ্গে আড্ডা মানেই আমার কিছু শেখার সুযোগ, কারণ এক জীবন্ত লাইব্রেরি তিনি। হকের বন্ধু জহির রায়হান, আলমগীর কবির, কাইয়ুম চৌধুরী, শামসুর রাহমান, সুনীল গাঙ্গুলি, শক্তি চট্টোপাধ্যায়, আবু জাফর ওবায়দুল্লাহ। হকের বন্ধু আমিও, আমারও এক পিতৃতুল্য শ্রদ্ধাভাজন শিক্ষক বন্ধু সৈয়দ হক। আই ফিল ইট। গত মাসে, কলকাতায়, রবীন্দ্রসদনে ছোটকাগজ অহর্নিশ-এর কুড়িবছর পূর্তির অনুষ্ঠানে ‘জীবনানন্দ সভাঘর’এ কবিতা পড়ার ফাঁকে পাশে উপবিষ্ট শঙ্খ ঘোষের সঙ্গে কথা হচ্ছিল, বললাম, ‘হক ভাই তো লন্ডনে, শরীরে ক্যান্সার।’ শঙ্খ ঘোষ বললেন’, ফোনে কথা হয়েছে।’ তো সেদিন কথায় কথায় বললেন, ‘কি তোমার কাঁটার খবর কি?’

‘চলছে’

খেলরারাম খেলে যার কি অবস্থা?

‘চিত্রনাট্যের কাজ এগুচ্ছে। আপনাকে অ্যাক্টিং করতে হচ্ছে।’

হক ভাই হা হা করে হাসলেন। হাসতে হাসতেই বললেন, ‘ধরো, কবে চলে যাই’।

এখন, আমি ‘কাঁটা’র কাজ করছি। ‘কাঁটা’ শেষ করে খেলারাম খেলে যা ধরব। হক ভাই তার প্রামাণ্য চরিত্রে ক্যামেরার সামনে দাঁড়াবেন। একদিন হক ভাই বললেন, ‘আচ্ছা, বাবর চরিত্রে কাউকে ভেবেছ?’

‘খুঁজছি।’

‘পেলে একদিন ওকে বাসায় নিয়ে আসো, দেখি। কথা বলি।’

এরকমই এগিয়ে যাচ্ছি আমরা। এর মধ্যেই অসুখ, সৈয়দ হকের। কিন্তু অসুখ থেকে তাকে সুস্থ হতেই হবে। হক ভাই সুস্থ না হলে আমি ‘খেলারাম খেলে যা’ ধরব কিভাবে? চিত্রনাট্যে বিশেষ পরিবর্তন আনতে চাই না, হক ভাই। সেটা আপনাকে বুঝতে হবে। তা না হলে আমি বাবর আলীকে ধরব কীভাবে?

বাবর আলী আসলে কে?

চলমান দৃশ্যের সত্যকে আমরা কিভাবে এড়িয়ে যেতে পারি, যখন দেখি, মানুষ রাস্তা দিয়ে হেঁটে যাচ্ছে সামনে। অবশ্য আমরা জানি না, সে কতদূর যাবে, কার কাছে যাবে? সত্য যে, মানুষের পেছনে ফেরার রাস্তা নেই, যেতে হয়-যেতে হবে সামনেই। কিন্তু পেছনের যা কিছু রেখে আসা, ফেলে আসা ঘরবাড়ি-ঘটমানতা বা স্মৃতিসমগ্র, তা কি আমরা দেখতে পাব রাস্তায় আমাদের চোখের সামনে দিয়ে এগিয়ে যাওয়া কোনো মানুষের দিকে তাকিয়ে? আমরা কি টের পাব, কোন তাড়না তাকে ডেকে নিয়ে যাচ্ছে, কোন প্রতারণা তাকে খেলিয়ে নিয়ে যাচ্ছে স্বরচিত ইচ্ছে-সুখের গুপ্ত-সুড়ঙ্গে? যে সুড়ঙ্গের অন্ধকার থেকে তার আর বার হওয়া হবে না! স্বীকার করে নিই, গোপনে-প্রকাশ্যে আমরাও চলেছি যে-যার মতো ব্যক্তিগত অভিযাত্রায়, এই অনিবার্য অভিযাত্রা থেকে আর ফেরা হবে না আমাদেরও। যদিও, ‘আমরা’ বলে আসলে নির্দিষ্ট কেউ নেই, কিন্তু বাবর আলী বলে একজন সুনির্দিষ্ট লোক আছে, আমরা তাকে চিনি, আমরা তাকে দেখি, আমরা তাকে খেয়াল করে দেখি এবং সে দেখায় প্রথমত তাকে অপছন্দই করি বেশি। এই অপছন্দের কারণ আছে। কারণগুলো খুব পরিষ্কার, আবার কারণগুলো খুব বিমূর্তও। এই স্পষ্ট-বিমূর্ত জীবনের বাহক বাবর আলী ঘোরাফেরা করে শেষাবধি অগাধ অপবাদ-নিন্দার মধ্যেই। নিন্দা তার প্রাপ্য বটে! জীবনপাতের উদ্দেশ্য যখন একটাই, পুরুষ হিসেবে, কম বয়েসি নারীর ভেতরে যাওয়া, এক নয়, একাধিক নারীর মধ্যে যেতে থাকা- তখন তা নিন্দাতেই সীমিত থাকবার কথা নয়, হতে পারে তা অপরাধও বটে! সুতরাং বাবর আলী অপরাধী। তার শাস্তি প্রাপ্য। কিন্তু যে অপরাধ তাকে শাস্তিযোগ্য করে তোলে, সে অপরাধ একান্ত মনে পোষণ করেনি অন্তত এমন পুরুষপ্রাণী পৃথিবীতে কি খুব সচরাচর? কিংবা অর্থনৈতিকভাবে সচ্ছল ও স্বাধীন হলে নারীও কি মিলবে তেমন? তাহলে বাবর আলীর দোষ কোথায়? যদিও, সামাজিক ছকে বেধে দেয়া এই দোষ তর্কাতীত নয়, এই দোষ দোষই বটে। সভ্যতা বলছে। বাবর আলী শনাক্ত হয়ে গেছে, এই তার দোষ? বাবর আলী তুলনামূলক খ্যাতিমান, দোষের এও এক কারণ। সামষ্টিকের জন্য বেঁধে দেয়া প্রবহমান নৈতিকতার দরোজার ছিটকিনি সে খুলে ফেলেছে, এ তার দোষ! এটা দেখা যাচ্ছে, জন্ম-মৃত্যুর মধ্যবর্তী পৌরুষেয় সময়ে চূড়ান্তভাবেই যৌনতাকে তার ব্যক্তিগত সাংবিধানিক সত্যে পরিণত করেছে সে। যে কিনা, বাবর আলী, চল্লিশ ছুঁই ছুঁই অবিবাহিত লোকটি, সুন্দর করে মিথ্যে বলা যার করায়ত্ত, তার তো দোষ আছেই। তার প্রতি ব্যাপক সন্দেহ আছে। তাকে যতখানি সম্ভব আমাদের এড়িয়ে চলাও আছে, কারণ, বাবর আলীর প্রাপ্ত দার্শনিকতাকে আমরা প্রকাশ্যে পছন্দ করতে পারি না কিন্তু গোপনে অনুগামী হয়ে থাকি সেই মোহময়তার। মাত্র একটি বাক্যের মধ্যেই নিহিত দর্শন, সেই দর্শনটা কি? দ্রষ্টব্য, এয়ারপোর্টের বাথরুমের দেয়ালে কোনো যুবক লাল পেন্সিলে লিখে রেখে যায় খেলারাম খেলে যা। যুবকটি বাথরুম থেকে বেরুনোর পর বাবর আলীই হয়তো সেই দর্শনবাক্যের প্রথম পাঠক কিংবা প্রকৃত পাঠক কিংবা সে দর্শনতত্ত্বের প্রায়োগিক প্রথম বিপ্লবী! কিংবা আরও কেউ বাবর আলী আছে যাকে আমরা চিনি না। এ দেশে বা দেশে দেশে বাবার আলীর সংখ্যা কতজন, তার কোনো পরিসংখ্যান আছে? যে যুবক বাথরুমের দেয়ালে লিখে রাখে খেলারাম খেলে যা- আমাদের পরিচিত বাবর আলী টের পায়, এই অমোঘ বাক্যের দার্শনিক যুবক নিঃসন্দেহে প্রতারিত। প্রতারণা থেকে প্রাপ্ত অভিজ্ঞানই তাকে যেন জানিয়ে দিয়েছে, খেলারাম খেলে যা পরাজয় থেকে, ব্যর্থতা থেকে যে অংক ফলিত হয় মননে, সেই অংক বড় নিষ্ঠুর এবং সত্য। যদিও, এই সত্য পরাজয়ের পর অর্জিত, ব্যর্থতার ভেতর দিয়ে প্রাপ্ত। হয়তো, এ শুধু জ্ঞানার্জিত সত্য। প্রস্রাব করার পজিশনে দাঁড়িয়ে, বাথরুমের দেয়ালে সেই সত্যই লিখে রেখেছে যে যুবক, হয়তো পরবর্তী সময়ে তাকে আমরা আর চিনব না, তাকে দেখব না, কিন্তু তার রচিত বাক্যটি দেখব কিংবা পড়ব কিংবা সেই বাক্য আমাদের মনোজগৎকে খেলিয়ে নিয়ে বেড়াবে। এই বাক্যে প্রাণিত হয়ে সামর্থ্য-সাধ্য অনুযায়ী প্রয়োগ-সাফল্যে দৃশ্যমান দার্ঢ্য বাবর আলীকে আমরা চিনব, দেখব, তার গতি-বিধি লক্ষ করব, তার মিথ্যে বলার কৌশলেও আমরা মুগ্ধ হব এবং লতিফা, বাবলী, মিসেস নফিস, ক্ষণমুহূর্তের দেখা সুষমা কিংবা জাহেদাকে বশ করে সম্ভোগ পর্যন্ত গমনে আমরাও বাবর আলীর সঙ্গে থাকব এমনকি বাবর আলীকে দেখে আমাদের না-পারা জীবনীতে একটুখানি পারার সুখ নেব কিন্তু সামাজিক নৈতিকতায় নিজেকে শুদ্ধ প্রমাণের প্রয়োজনীয় হিপোক্রেসি বা বহিরাচরণে ভদ্রতা ছড়িয়ে বলব- বাবর আলী একজন ল¤পট, মিথ্যেবাদী! আমরা যে এরকমই করে থাকি বা এরকম বিশুদ্ধ হিপোক্রেসিতে অভ্যস্ত, সিদ্ধ, চলনে-বলনে- বাবর আলী তা জানে, ভালোভাবেই জানে। বাবর আলী তাই আমাদের পাত্তা দেয় না, সে বরং তার অর্জিত বাক্যনির্দেশ চর্চা করে চলে- খেলারাম খেলে যা। বাবর আলী, তুমি কে ভাই? তুমি কোথায় যাচ্ছ, আর কোথা থেকে এলে? আসবার সময় কি কি সঙ্গে নিয়ে এলে, কি কি হারিয়ে বা ফেলে এলে? এমন প্রশ্নের উত্তর লেখা আছে অকপট ভঙ্গিতে রচিত একটি উপন্যাসে। সৈয়দ শামসুল হকের আশ্চর্য ক্ষমতাময় এই ফিকশন- খেলারাম খেলে যা। প্রায় সাড়ে চারদশক আগে রচিত বাংলা সাহিত্যের সাহসী, সত্যপ্রবণ কিন্তু জিগীষা-চেতনায় এক ধরনের কৌশলগত কারণে মিথ্যেবাদী, কিশোরী-নারী পটিয়সী চরিত্র বাবর আলী- যে কিনা ‘খেলারাম খেলে যা’র প্রধান চরিত্র। জীবনের গভীরতম সত্যকে শুধু জ্ঞানে নয়, বেঁচে থাকবার মধ্যে বা দৈনন্দিনতার মধ্যে নিয়ে এসেছে বাবর আলী। এটি তার ক্ষমতা। ফলে, স্বীকার করে নিতে হবে, সে ক্ষমতাবান। পুরো উপন্যাসে বাবর আলীর চূড়ান্ত কর্তৃত্ব বিরাজমান। খেলেরাম খেলে যা-তে বাবর আলীই হচ্ছে একমাত্র পরাশক্তি। তারপরেও বাবর আলীর ব্যর্থতা, পরাজয়-গ্লানি- তা কি আমরা বিচক্ষণ-বিশ্লেষণের মাপকাঠিতে নিয়ে একটুও জোটনিরপেক্ষ হয়ে ভাবব না? আমলে আনব না? তাই প্রায়-প্রায়ই, সদা কৌতূহলী মনে প্রশ্ন জাগে- কে তুমি ভাই, বাবর আলী? কুড়িগ্রামের মনসুরদা নামক এক পরিচিত দারোগার কাছ থেকে লেখক সৈয়দ শামসুল হক কোনো এক সন্ধ্যায় শোনেন, যা, কাহিনিও নয়, একটি বিবরণ মাত্র। কী একটা অপরাধের কারণে এক লোককে ধরে আনা হয় থানায়। অপরাধ স্বীকারকরণের পুলিশি উপায়- প্রহার। প্রহারে প্রহারে বিপর্যস্ত লোকটি একসময় তার অতীতের কথা বলতে শুরু করে যে, সে কতবড় হতভাগা। দেশভাগের পর লোকটি ভারত থেকে পাকিস্তান চলে আসে। দেশভাগের কিছু আগে তার এলাকায় হিন্দু-মুসলমানের দাঙ্গা হয়। আর, সেই দাঙ্গার সময় তার ছোটবোনটি ধর্ষিত হয় গুণ্ডদের হাতে। সে আর তার বোন বিকেলে বাড়ি ফিরছিল, তার কাছ থেকেই ছিনতাই হয় কিশোরী বোনটি। সে তাকে বাঁচানোর বদলে নিজেই প্রাণ নিয়ে পালায়। বোনটি চিৎকার করে তাকে ডাকতে থাকে- দাদা! দাদা! দূর থেকে দূরে মিলিয়ে যায় সে স্বর। লোকটি বলে, এখনও সে মাঝেমাঝেই বোনের ওই আর্তচিৎকারটি শুনতে পায়, তখন তার জগৎ ভেঙে পড়ে, সে আর বাস্তব-অবাস্তব পাপ-পুণ্য ন্যায়-অন্যায় আর ভেদ করতে পারে না। দেখতে পাই,  খেলারাম খেলে যা ফিকশনের শিরোনাম-প্ররোচিত চরিত্র বাবর আলীর উৎসবীজটি লুক্কায়িত অপরাধের মধ্যে, থানায় বসে, অপরাধী লোকটির বিপর্যস্ত, ঘোরাক্রান্ত স্বীকারোক্তির মধ্যে। দেখতে পাই, একটি দেশভাগ এই ক্যানভাসের গোড়ায় রয়েছে, রয়েছে হিন্দু-মুসলমান ঐতিহাসিক দাঙ্গা। দেখতে পাচ্ছি, কিশোরী বোনকে বিকেলে মাঠের মধ্যে টেনে-হিঁচড়ে নিয়ে যাচ্ছে কয়েকজন মানুষ, তাদের গুণ্ডা বলি আর যাই বলি, তারাও মানুষ। যেন স্বাভাবিক, তবু প্রশ্ন জাগে মনে, থানায় ধরা পড়া লোকটি কিংবা উপন্যাসে রূপান্তরিত বাবর আলীকে না নিয়ে গিয়ে তারা তার কিশোরী বোন হাসনুকে কেন তুলে নিয়ে গেল? সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা তো সম্প্রদায়গত, ধর্মাচ্ছন্ন। এতে করে কোনো কিশোরী মেয়েকে চূড়ান্ত খেসারত দিতে হবে কেন? বাড়ন্ত পৃথিবী থেকে হঠাৎ হারিয়ে যেতে হবে

কেন? লক্ষণীয়, থানার লোকটি কিংবা বাবর আলী পালিয়ে নিজেকে বাঁচিয়েছে। এই গ্লানি-পরাজয় তাকে আমৃত্যু তাড়া করে ফেরে। যদিও, উপন্যাসের চরিত্র বাবর আলী নিজে তার অতীত ভাবতে চায় না, সে নিজেও বলে, ভাবনা তার শত্রু। কিন্তু এই শত্রু তাকে খেলারাম খেলে যা প্ররোচিত জীবনের মধ্যেও হঠাৎ হঠাৎই আকস্মিক কোপ মারে। বাবর আলী বোনকে হারানোর ভাবনায় পিষ্ট হয় নিজের মধ্যে, বাইরের কেউ তা জানে না। আমরা জেনেছি, একদিন বাবর আলীর নিজের একটা দেশ ছিল, এখন তা অন্যদেশ, বর্ধমান, যা ভারতের অংশ। তার বাল্যকাল, বয়ঃসন্ধিকালের দেশটা আজ আর তার দেশ নয়। সেই দেশ ভাগ হয়ে গেছে। কে ভাগ করেছে? একশ পার্সেন্ট সত্য, সেই ভাগ সে নিজে করেনি। অন্যের ইচ্ছায় সে তার দেশহারা, বাল্যকালহারা। এমনকি ঝাপসা হয়ে যাওয়া বাবা-মা’র স্মৃতিও তাকে অতটা তাড়িত করে না, কিশোরী ছোটবোন হাসনুকে হারানোর অক্ষমতা-পরাজয় যতটা ছোবল দেয় তার স্মৃতি-সিন্দুকের ডালায়, হঠাৎ হঠাৎ! তাহলে এসব দেশভাগ-খেলার খেলারাম কে, বা কারা? জীবনের ব্যক্তিগত ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে তাদের, বাবার আলীর মতো? যে দেশে এসেছে বাবর আলী, সে মনে করে, এটি তার নিজের দেশ নয়। এখানকার কিছুই তাকে বাবা-মা-বোন বাড়িঘরদোর বা বাল্যকাল দেখাতে পারবে না, এটা সত্য। ফলে, শহর ঢাকার নাগরিক পেশায় প্রতিষ্ঠা পাওয়া যে জীবন বাবর আলীর, টেলিভিশনে অনুষ্ঠান করে যেটুকু পরিচিতি তার- এসবের সামাজিক মূল্য তাকে বেশি আপ্লুত করে না। যদিও এই প্রতিষ্ঠার বুনিয়াদে তার খেলারাম খেলে যা জীবন একটা সুবিধা তাকে দিয়ে থাকে বটে, সেই সুবিধা তার অর্জিত। এই অর্জন সে ইচ্ছে মতো, খেলে খেলে খরচ করে চলে। এই অর্জন সে ব্যয় করে যৌনাবেগ তাড়িত হয়ে, প্রবিষ্ট হয়ে, কিশোরী-যুবতীর ভেতর, ভোগের নেশায়। দেখতেই তো পাচ্ছি, ভোগই জীবন- এই প্ররোচনা তাকে সারাক্ষণ আবিষ্ট, আচ্ছন্ন, আক্রান্ত, ধাবমান করে রাখে। গত শতাব্দীর বাংলাদেশে ৭০ সালে প্রথম প্রকাশিত হয় তখনকার জনপ্রিয় সাময়িকী সন্ধানীতে ‘বাবর আলী নামা’- খেলারাম খেলে যা। ক্রমবিকশমান নগর জীবনের নাগরিক গন্তব্যে বাবর আলী মানবজীবনের এক রক্তমাতাল-পাতালপ্রবাহিত সত্য প্রতিষ্ঠা করে চলে। যদিও সেই কারণে, লা¤পট্যের দায় তার ঘাড়ে চাপিয়ে আমরা কিছুটা ভাল থাকতে পারি। সব্যসাচী কারিগর সৈয়দ শামসুল হক সময়ের চেয়ে অনেক এগিয়ে থাকা মানুষ, যা শক্তি। সৈয়দ হক সেই শক্তিতে চিত্রিত করেছেন বাবর আলীকে, প্রকারান্তরে বাবরের মধ্য দিয়ে যে সত্যগুলো প্রতিভাত করেছেন- রচনাকালের সাড়ে চার দশক সময় পাড়ি দিয়ে এসেও সেই সত্য এখনো সত্য, হয়তো এ এক চিরকালের প্রভাবশালী সত্য। ফলে, খেলারাম খেলে যার বাবর আলী সবসময়ই বিরাজমান, বর্তমানেও বাবর আলী ঘুরছে-ফিরছে। তার উপরে, ক্রমশ জীবন যেভাবে উন্মুল-ছিন্নমূল-শেকড়ছাড়া হয়ে উঠছে সনাতনী ব্যবস্থা ভেঙে ফেলে বা ছেড়ে এসে- এরকম সময়ে বাবর আলীদের সংখ্যা বেড়েছে কিনা, মনে মনে অনুমান করা যেতে পারে। বাবর আলীর উদ্দেশ্য লক্ষ্য করি: কৈশোরত্তীর্ণা তরুণীদের পটিয়ে সঙ্গমের দিকে নিয়ে যাওয়া, এতে তার কোনো অপরাধবোধ তো নেইই বরং আছে এক আগত জয়ের নেশা। চরিত্রটিই এমন যে, ঝুঁকির মধ্যে দাঁড়িয়ে থাকার প্রবল একটা আকর্ষণ চিরকাল অনুভব করেছে বাবর। বিপদ তার স্বাভাবিক পরিবেশ। উদ্বেগ তার পরিচ্ছেদ। এই দুয়ের বিহনে সে অস্বস্তি বোধ করে, মনে হয় বিশ্বসংসার থেকে সে বিযুক্ত। তাই বেঁচে থাকার প্রয়োজনে, স্বাভাবিকতার প্রয়োজনে, সে অবিরাম সৃষ্টি করে বিপদ আর ঝুঁকি। অথবা তার কেবলই মনে হয় কেউ যেন তাকে খুঁজছে। বাসা থেকে বেরুলেই মনে হয় যেন কেউ তাকে খুঁজে পাচ্ছে না। তখন বাসায় ফেরার জন্য অস্থির হয়ে ওঠে। আবার বাসায় ফিরলে মনে হয় বাইরে, শহরে, কী যেন হয়ে যাচ্ছে যা সে জানতে পারছে না। আপাত অর্থে বাবরকে যৌনাকাক্সক্ষায় ছুটে বেড়ানো একজন নিঃসঙ্গ মানুষ মনে হলেও আদ্বন্দ্বে অবতীর্ণ সে এমনভাবে, যেন তার মুক্তি নেই, যেন তার বিশ্রাম নেই, যেন তার কোথাও স্থিত হবার নেই। স্থিতি আর বাবর আলী কখনও একসঙ্গে যাবে না- খেলারাম খেলে যার প্রধান চরিত্রটি তাই প্রতিষ্ঠা করে চলে সারাক্ষণ। কিন্তু এরকম বহুমুখী কামুক চরিত্রের মধ্যে রক্তবসতি গেঁড়েও, থেকে থেকে, হঠাৎ হঠাৎ তার মনে এসে তাকে ধাক্কা দেয় সেই পরাজয়, সেই ভয়াবহতা, দেশভাগের সময়কার সেই অমোচনীয় গ্লানি, সেই অক্ষমতা- তার ছোটবোন হাসনুকে টেনে নিয়ে গেল কয়েকজন গুণ্ড, বোনকে না বাঁচিয়ে সে নিজেকে নিয়ে পালিয়ে এল! বাঁচবার জন্য হাসনুর শেষ আর্তনাদ তাকে শিকার করে ফেরে ক্ষণে ক্ষণে, আমৃত্যু তাকে ছোবল মেরে যায় তার চলমানতার ফাঁকে ফাঁকে- ‘দাদা! দাদা!’ হাসনুকে সে বাঁচাতে পারেনি। এ প্রসঙ্গে, কথাসাহিত্যিক আহমাদ মোস্তফা কামাল খেলারাম খেলে যা নিয়ে একটি রচনা লিখেছেন। আমি মনে করি, আহামাদ মোস্তফা কামালের লেখাটি লেখবার প্রয়োজন ছিল এ উপন্যাস গ্রন্থকারে প্রকাশের পরপরই কিংবা সন্ধানীতে প্রকাশের পরেই। বাবর আলী ও তার বাস্তবতা যথার্থ প্রাসঙ্গিক দৃষ্টিভঙ্গিতে তুলে ধরেছেন আমাদের প্রজন্মের শক্তিশালী কথাসাহিত্যিক, আমার তর্কাতর্কির বন্ধু আহমাদ মোস্তফা কামাল। খেলারাম খেলে যা স¤পর্কে অশ্লীলতার যে গুজব আমাদের মধ্যবিত্ত সমাজে প্রতিষ্ঠিত হয়ে আছে প্রায়, তা যে খুবই বালখিল্য ও নিতান্তই নবশিক্ষিত এক রক্ষণশীল সমাজের আলস্যচর্চা- আহমাদ মোস্তফা কামাল সেই গুজবের প্রয়োজনীয় জবাব দিয়েছেন তাঁর রচনায়। কামালের রচনা পত্রিকায় প্রকাশ হয় ২০০১ সালে। যদিও ততদিনে সৈয়দ শামসুল হক বিরচিত প্রবল শক্তিমত্তায় চিত্রিত খেলারাম খেলে যা লোকমুখে প্রায় ‘পর্নোগ্রাফি’র গালি বা ভর্ৎসনা অর্জন করে ফেলেছে। এটি কোনো অগ্রসরমানতার উদাহরণ নয়, এটি দুর্ভাগ্যপীড়িত বাস্তবতা। সেক্ষেত্রে, প্রথম পাঠে খেলারাম খেলে যা লুকিয়ে পড়বার আবেগে অনেক পাঠকেরই বাবর আলীকে এপিঠ-ওপিঠ ধরতে ব্যর্থতা তৈরি হয় কিন্তু পাঠক হিসাবে আরেকটু ম্যাচিউর হয়ে উঠবার দায় মিটিয়ে নিলে কিংবা জীবন-জগৎ-যৌনতা -ক্ষমতা -অর্থ-রাজনীতি-ইতিহাস-পাতিহাঁস মোদ্দাকথা জীবনচাষ সম্পর্কে অভিজ্ঞতার স্তর পুরু হয়ে উঠলে, তখন একবার হাতে নেয়া প্রয়োজন রবীন্দ্রোত্তর বাংলা সাহিত্যের বহুমুখী ক্ষমতার লেখক সব্যসাচী সৈয়দ শামসুল হককে, আলোচ্য খেলারাম খেলে যা তো বটেই। একথা আজ আমিও স্বীকার করছি একজন পাঠক হিসেবে, এত আধুনিক, এত এগিয়ে থাকা অভিনব লেখক সৈয়দ শামসুল হকের সৃষ্টির প্রতি যে সম্মান প্রাপ্য ছিল, যে কদর যথার্থ তার সৃষ্টিকলার জন্য, আমরা তা দিতে কার্পণ্য করেছি অনেকটাই, সে হয়তো আমাদের চিরায়ত কৃপণসর্বস্ব স্বভাবের দোষে। তাই বাবর আলীর মতো একজন ‘দশহীন’ স্মৃতি-ছিন্ন চরিত্রকে বুঝতেও আমরা সমানভাবে ব্যর্থ হই। তা না হলে, খেলারাম খেলে যা নিয়ে একটি দুর্দান্ত ছবি কেন বানানো হয়নি আজও? ছবি হলে, বাংলা চলচ্চিত্রে বাবর আলীকে তখন দেখতে পাবে আমাদের আপামর দর্শক, যারা হয়তো সরাসরি উপন্যাসের পাঠক হবার সুযোগ ও সামর্থ রাখে না। কারণ, বাবর আলীর অস্তিত্ব, অসহায়ত্ব, পলায়নপরতা এবং তা থেকে একদিন একগুঁয়ে প্রতিশোধ-পরায়ণতা- একে আমরা আমাদের সচেতন প্রজ্ঞায় ওভারলুক করতে পারি না। ‘কোনটা স্বাভাবিক? পালিয়ে আসা? না, লড়াই করা?’ গল্পে উপন্যাসে মানুষের আদর্শে রুখে দাঁড়ানোটাই চিরকাল নন্দিত। সিনেমা হলে তালি পড়ে। বই পড়তে পড়তে প্রশংসায় পাঠকের মুখ লাল হয়ে ওঠে। কিন্তু সে নিজে, নিজের প্রাণ নিয়ে পালিয়ে এসেছে। সে কি ঘৃণিত বলে চিহ্নিত হবে? নাকি আদর্শটাই ভুল? খেলারাম খেলে যার এই অংশ উদ্ধৃতির পরই কথাসাহিত্যিক আহমাদ মোস্তফা কামাল বিশ্লেষেণে গেছেন,হ্যাঁ, বাবরের নিজের কাছেই প্রশ্ন আছে, ক্ষরণ আছে, দ্বন্দ্ব আছে। যদিও উপন্যাসের দু-একটি জায়গায় বাবর আলী বলেছে যে, অনুতাপ তার স্বভাববিরুদ্ধ, তার মধ্যে কোনো অনুতাপ নেই- কিন্তু কথাটি সত্য বলে মনে হয় না। ‘আমার মধ্যে কোনো অনুতাপ নেই’-কথাটি বলার অর্থই হচ্ছে- এ নিয়ে আমার মধ্যে প্রশ্ন-দ্বন্দ্ব-ক্ষরণ আছে, নইলে আর ফলাও করে অনুতাপহীনতার কথা বলা হতো না। এ হচ্ছে নিজেকে আড়াল করার এক পদ্ধতিমাত্র। বাবর চরিত্রটি এখানে এসেই দ্বন্দ্ববহুল-বহুমাত্রিকতার পরিচয় দেয়, তার অন্তর্গত এই রক্তক্ষরণ আর দ্বন্দ্বটি খেয়াল না করলে পুরো উপন্যাসটির কোনো মূল্যই থাকবে না। এবং সেটিই এই উপন্যাসের ভাগ্যে জুটেছে। যেসব পাঠক এ উপন্যাস সম্বন্ধে বিরূপ ধারণা পোষণ করেন তারা সম্ভবত বাবরের চরিত্রটিকে একমাত্রিক হিসেবেই চিহ্নিত করেছেন- সে লম্পট, কামুক, বিকৃত। তার মধ্যে খুব গভীর কিছু কষ্ট আছে, চোখ-ভিজে ওঠা কিছু বেদনা আছে, দ্বন্দ্ব আর ক্ষরণ আছে, অন্যমনষ্ক পাঠক তা খেয়ালই করেননি। শুধু বোনকে পশুদের কাছে ফেলে রেখে পলায়নই কি তার বেদনার একমাত্র কারণ? না, তা-ও নয়। সে নিঃসঙ্গ। যে অনিবার্য, পরিত্রাণহীন অন্তর্গত নিঃসঙ্গতায় প্রতিটি মানুষ যাপন করে তার দুর্বহ জীবন, বাবরের নিঃসঙ্গতা তার চেয়ে খানিকটা অধিক। দেশভাগ তাকে টেনে এনেছে এখানে। এ দেশ তার নয়। এ মাটির জন্য জন্মগত টান নেই তার, এবং সঙ্গত কারণেই সে এখানকার কোনো কিছুর সঙ্গে সংলগ্ন বোধ করে না। তার যা কিছু মমতা বর্ধমানের জন্য, শৈশব-কৈশোরের স্মৃতি যেখানে ফেলে এসেছে সে। এমনকি ঘরের কোণে লেবু গাছটির জন্যও তার গভীর প্রেম। সে স্বজনহীন। মা-বাবা প্রকৃতির অমোঘ নিয়মে অন্তর্হিত, বোন অপহৃত ও নিহত, যার জন্যে বাবরের ভেতরে আছে গভীর গ্লানি ও কান্না। তার স্মৃতি বলতে আছে এই একটিমাত্র ঘটনা, যা তাকে ক্ষতবিক্ষত করে দেয়।’ এই পর্যবেক্ষণের পর খেলারাম খেলে যা থেকে কয়েকটি বাক্য যদি আমরা কোট করি, এক জায়গায় দেখব, লেখা: ‘এখন আরো একা লাগল বাবরের। রক্তের সঙ্গে যাদের সম্পর্ক তাদের কথা মনে পড়তেই এই বোধ বিরাট হয়ে উঠেছে- এখন তার চারপাশে এদেশে কেউ নেই। আপন কাকে বলে সে ভুলে গেছে বলেই যারা আপন তারা তাকে এমন একা করে যাচ্ছে। আমার কেউ নেই। কেউ নেই। কোনো কিছু আমার নয়। না মাটি, না মন, না মানুষ। পৃথিবীতে, বাবর লড়াই করে পৃথিবীর সঙ্গে। যেন তার কোনো বড্ড প্রতিশোধ নেবার আছে। এমনকি তার যে বোনকে যৌনতার শিকারেই ছিনতাই হতে হয়েছিল, পরবর্তী সময়ে আমরা দেখি একদিন বাবরই আবার যৌনতার শিকারে বেরিয়ে পড়ে। বাবর জিততে চায় যৌনতার সামাজিক ট্যাবু ভেঙেও, পৌঁছুতে চায় একজনের পর একজন নবীনার রক্ত-মাংসের নব নব অজানাকে আবিষ্কারের আনন্দে। আমরা দেখছি, বাবরের কোনো দেশ নেই, পৃথিবীর মধ্যে থেকেও বাবর যেন পৃথিবীর কারও আর হয়ে উঠতে পারে না। তবু খেয়াল করে দেখলে টের পাওয়া যায়, নানামাত্রায় প্রতিভাত যে বাক্য, যে মন্ত্র, যে মধুর নির্দেশ তার চক্ষু খুলে দেয়, খেলারাম খেলে যা তা শুধু যৌনতাপ্রসূতই নয়। শক্তি-ক্ষমতা কাঠামো অনুসারে মানুষের ইচ্ছার সমস্ত করাল-ভয়াল-দখলের মাঠে মাঠে এ খেলা যেন চলতেই থাকে। কারণ, সত্য যে, কথিত ‘সভ্যতা’র উপরেই আদ্যপান্ত প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেছে এই দর্শন- খেলারাম খেলে যা। জাগতিক কর্তৃত্বের সেই সত্য সত্য বটে। কিন্তু কই, জগতে গণমানুষকে শোষণ করা ‘সভ্যতা’র অভিভাবকদের সেই কর্তৃত্বকে নিয়ে তো কোনো কুৎসাপরায়ণতা নেই! তাতে তো আমাদের সবিশেষ নিন্দাজ্ঞাপন নেই! উচ্চারিত কোনো অভিযোগ নেই। বরং একটু খোশমেজাজের উপাদান হিসেবে আমরা অবগত- রাসপুটিনের যৌনাঙ্গ নাকি মমি করে রাখা আছে খুবই খরচবহুল কোনো জাদুঘরে, মানুষ গিয়ে টিকিট কেটে সেই লিঙ্গ দেখে আসে। মানুষের ভেতরে এ কোন নেশা? কোন আনন্দ? তাহলে বাবর আলী দোষ করল কি? নাকি বাবর আলীকে দোষী সাব্যস্ত করলে, খুব অন্তর্গত ইচ্ছেকে গোপন রেখেও আমরা বিশুদ্ধ থাকতে পারি কিংবা আমরা এরকম বিশুদ্ধতার আচরণ দেখিয়ে চলতে পছন্দ করি, তাই? হ্যাঁ, বাবর আলী আমাদের এই পছন্দকে পছন্দ করে না। তদুপরি বাবর তার পরাজয় ভেঙে একবার জয়ী হতে চায়। সে তার বোনকে বাঁচাতে না পারার ব্যর্থতায় ক্রনিক্যালি আক্রান্ত হয়ে থাকে। ফলে, আমরা দেখতে পাই, খেলারাম খেলে যা ফিকশনের প্রায় শেষ দিকে এসে বাবরের জীবনের শেষ তরুণী জাহেদাকে সে অর্জন করে, সত্য বললে শিকার করে। তারপর, ঘোর বিপদে এই জাহেদাকেও যখন তার কাছ থেকে আবার কয়েকজন যুবক ছিনিয়ে নিয়ে ধর্ষণ করতে যথাসাধ্য সচেষ্ট, কেন জানি, তখন জাহেদাকেই তার মনে হয় নিজের ছোটবোন হাসনু। কর্তৃত্ব ও আত্মরক্ষার সেই বিভ্রান্তির ভেতরে বাবর আলী জাহেদাকেই হাসনু বলে ডাকে। সে তার বোন হাসনুকে বাঁচাতে পারেনি কিন্তু সে জাহেদাকে বাঁচাতে চায়। সে এবার লড়াই বেছে নেয়। সাভারের শালবনের সন্ধ্যায়, কাঁঠালপাতা কেটে ফেরা তাগড়া গ্রামবাসীত্রয়ের সঙ্গে সে জীবনপণ আক্রমণ-প্রতিআক্রমণে যায়। গ্রামবাসী তিন যুবকও বাবর আলীকে পরাজিত করে তরুণী জাহেদাকে সম্ভোগে পেতে চায়, ধর্ষণ করতে চায়- এই চাওয়া যেন কালে কালে, জনে জনে চলতেই থাকে। প্রাণীজগতে এই চাওয়া এক খেলা। ফলত, খেলা চলতেই থাকে। খেলা যেন কখনওই শেষ হয় না। তাহলে এয়ারপোর্টের বাথরুমের দেয়ালে লাল পেন্সিলে যে যুবক লিখে রেখেছিল- খেলারাম খেলে যা সে কি তবে ভুল লিখেছিল? বাবর আলীকে আমরা চিনব বটে, কিন্তু সেই অজ্ঞাত যুবককে আমরা হয়তো আর মনে করতে পারব না। চিনব না তবু আমাদের মর্মে গেঁথে থাকবে আজীবন তার পৃথিবী সম্পর্কে চূড়ান্ত মুল্যায়ণ- খেলারাম খেলে যা। যে জীবন প্রতারিত, বঞ্চিত, যেন সেই প্রতারণা-বঞ্চনাহেতু সে রেখে যায় এই অমোঘ সত্য- খেলারাম খেলে যা। যেন পরাজিত কেউ গোত্রের অন্যদেরকে পরাজয়ের হাত থেকে বাঁচিয়ে দিতে লাল পেন্সিলে বাথরুমের দেয়ালে এই মধুর নির্দেশ কিংবা উপদেশবাণী রেখে যাচ্ছে পৃথিবীতে। সেই নির্দেশ কি? আমরা ভুলব না এয়ারপোর্টের বাথরুমের দেয়ালে লাল পেন্সিলে যা লেখা ছিল নদী-নিমজ্জিত, নক্ষত্র-পীড়িত, ল্যান্ডস্কেপ-বর্ণিত বাংলা উপন্যাসের সারিতে বহু বহুকাল অপবাদে ডুবে থেকেছে সৈয়দ শামসুল হকের এই বিরচনা। এই ডেসপারেট শিল্পকর্ম। ষাটের দশকের শেষ পর্যায়ের শহর ঢাকার চরিত্র হলেও বাবর আলীর অস্তিত্ব এখনও বর্তমান তদুপরি দাপুটে। উপন্যাসের শেষে দেখলাম, ক্ষতবিক্ষত রাতের অন্ধকারে বাবরের গাড়িটা ব্রিজের রেলিঙ ভেঙে জাহেদাসহ সে নদীর মধ্যে পড়ে মৃত্যু-প্রতিপন্নতার দিকে গেলেও, গাড়িতে তখন হাসনু ছিল। কিন্তু হাসনু কোথায়? গাড়িতে তো জাহেদা। লংড্রাইভে জাহেদাকে সে রংপুরে নিয়ে গিয়েছিল। রাতে একসঙ্গে ছিল ডাকবাংলোতে। প্রথমরাতে সফল না হলেও পরের রাতে বাবর আলী জাহেদাকে নিজের করায়ত্তে পায়। সেই জাহেদার মুখের আদলের মধ্যে বাবর আলী তার এই বাঁচামরার অন্তিমে এসে, দেখতে পায় বহুদিন আগে বর্ধমানের মাঠের মধ্যে গু-াদের কাছে ছিনতাই হয়ে যাওয়া তার বোন কিশোরী হাসনুর মুখ। পোকায় খাওয়া দাঁত ছিল হাসনুর। তবে এবার সে হাসনুকে বাঁচাতে পারল! বাঁচাল জাহেদাকে। গ্রামবাসী যুবকদের কাছ থেকে বাঁচালেও, উদ্ভ্রান্ত এই এন্ড অব দ্য জার্নিতে ব্রিজের রেলিঙ ভেঙে গাড়ি পড়ে গেল রাতের নির্মমতায়, নদীর মধ্যে। সব শেষ। কিন্তু বাবর আলী বিদ্যমান, থাকবেও। হয়তো বাবর আলী উপন্যাস থেকে বেরিয়ে এখনও হেঁটে বেড়ায়, গাড়ি চালায়। কৌশলে মিথ্যে কথা বলে কৈশোরোত্তীর্ণাকে মুগ্ধ করে দেবার জন্য বা সম্ভোগে পাবার জন্য। তার দেশ নেই, স্মৃতিলগ্ন পরিবার নেই, আপনজন নেই। এ কথা সত্য, সিনেমা নির্মাণচর্চার কয়েক বছর ধরে বাবর আলীকে চিত্রায়ণের স্বপ্ন ঘাই মারে আমার মাথায়। আমি দেখতে পাই বা দেখাতে চাই, বাংলাদেশের সিনেমায় সংযোজিত একটি সাহসী ছবি খেলারাম খেলে যা দর্শকের সামনে প্রদর্শিত হচ্ছে। আমি বিশ্বাস করি, উপন্যাসকে যতখানি অপবাদ নিতে হয়েছে বাংলাদেশে বা বাংলা ভাষায়, খেলারাম খেলে যা চলচ্চিত্ররূপে সেই অপবাদের দায়মুক্তি নেবার ক্ষমতা রাখে। দায়মুক্তি দিতে পারে আপামর দর্শক। সম্ভবত পাঠকের চেয়ে দর্শকের ক্ষমতা বেশি, তাছাড়া তুলনামূলক দর্শক সংখ্যাতেও অধিক। দর্শক নানামাত্রার, পাঠক সাধারণত একমাত্রিক। বাংলাদেশের কথাসাহিত্যের চলচ্চিত্রায়ণ কিছু কিছু হয়েছে সত্য, এখনও হচ্ছে কিন্তু খেলারাম খেলে যাকে কেউ দর্শকের সামনে তুলে ধরতে চায়নি কেন- কথায় কথায় এমন কৌতূহল একদিন এক ঘরোয়া আড্ডায় সৈয়দ শামসুল হকের কাছে পেশ করেছি, সেদিন বিপজ্জনক চরিত্র বাবর আলীর লেখক আমাকে উত্তর দিলেন, ‘৭০ সালে যখন এটি সন্ধানীতে বেরোয়, জহির রায়হান ছবি করতে চেয়েছিলেন, তারপর তো মুক্তিযুদ্ধ শুরু হয়ে গেল, যুদ্ধশেষে আমরা আরও অনেকের সঙ্গে জহির রায়হানকেও হারালাম।’ প্রায় সাড়ে চার দশক পরে দ্বিতীয়জন হিসেবে যখন আমি প্রস্তাব করি খেলারাম খেলে যা নিয়ে ছবি বানাব- তখন দুর্ধর্ষ বাবর আলীর প্রণেতা সব্যসাচী হক শোনালেন অনেক কথা। আস্থার সঙ্গে শুনিয়ে চললেন, খেলারাম খেলে যা নিয়ে তার ব্যক্তিগত জীবনেও নানান জায়গায় বিব্রত হওয়ার কথা। তারুণ্যে উজ্জ্বল ব্যক্তিত্ব সৈয়দ হক ডাক দিলেন তার স্ত্রী লেখক আনোয়ারা সৈয়দ হককে। আমার স্বপ্নের গন্তব্যে তার সমর্থন প্রচ্ছন্ন রেখে তিনি স্ত্রীকে বললেন, ‘টোকন ছবি করতে চায়।’ আনোয়ারা সৈয়দ হক জানতে চান, ‘কি নিয়ে ছবি? ছবির নাম কি?’ সে-ক্ষণে, এয়ারপোর্টের বাথরুমের দেয়ালে সেই অজ্ঞাত যুবকের লাল পেন্সিলে লেখা কিংবা বাবর আলীর জীবনদর্শনই উচ্চারণ করলেন সব্যসাচী লেখক, যিনি সময়ের চেয়ে অনেক অগ্রসরমান, সৈয়দ শামসুল হক, তার মুখ থেকেই বেরুল- খেলারাম খেলে যা।

০২ অনেকদিন তো হল, শতবর্ষ পাড়ি দিয়ে দ্বিতীয় শতকে প্রবেশ করেছে বিশ্বচলচ্চিত্রশিল্প। এদিকে বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের ইতিহাসও ছদশক অতিক্রম করে চলেছে। কিন্তু আর্ন্তজাতিকভাবে পৌঁছে নানানভাষার, নানানজাতের, নানান নিরীক্ষা প্রবণতার চলচ্চিত্রের মুখোমুখি হতে পারা থেকে, ভালোমন্দের মোকাবেলার যোগ্যতায় অংশ নেয়া থেকে কেন জানি এখনও বাংলাদেশ অনেক দূরেই থেকে যাচ্ছে। এই উষ্মা নিশ্চয়ই ভালো নয় কোনোভাবেই। আমাদের ছবি এখনো মেলোডি স্টোরি, নায়ক-নায়িকানির্ভর। তারা যে করেই হোক পর্দায় প্রেম করে চলে। নায়ক-নায়িকার নামেই ছবি দেখতে যায় দর্শক। লজ্জার কথা, এটি পিছিয়েপড়া সিনেমা-বাস্তবতার কথা। ভালো ছবির কথা নয়। নিরীক্ষায় নতুন কিছু নির্মাণরুচির কথা নয়। এখনও আমাদের ছবির ‘নায়ক’ মানেই ‘নায়িকা’কে স্বপ্নে দেখে নাচানাচি করে, তার কোমর ধরে গান গায়, অকারণে বিভোর হয়ে পড়ে। ‘নায়ক’ এখনও মারপিট করে অসংখ্য প্রতিপক্ষকে পরাজিত করতে সক্ষম। ‘নায়ক’ এখনও ইউনিভার্সিটিতে পড়ে, কেউ কেউ কলেজে পড়ে। সে পরীক্ষায় প্রথম শ্রেণিতে প্রথম হয়, তারপর পুলিশ ইনস্পেক্টর হয়ে চোর-ডাকাত- গুণ্ডা ধরে বেড়ায়। নায়কের কোনো চরিত্র বিচ্যুতি হয় না, নায়ক যেন স্বপ্নালোকের কল্পনার মহৎ মানব, কিংবা নায়ক সব সময় প্রতিবাদী, পরোপকারী। চরিত্রে যুবক, তবু মাস্টারবেশন করে না। নায়ক যেন কখনওই নিঃসঙ্গ হয় না। মিথ্যে কথা বলে না। খুব লাল্টুপল্টু দেখতে ছোকরারাই ‘নায়ক’ চরিত্র করে সিনেমায়। কিংবা নায়ক খুব দুঃখী, সমাজের অন্যান্য দুঃখী মানুষের মুখে হাসি ফোটাতে ব্যস্ত থাকে। এ কী? এ তো রূপকথা! এ তো হীরামন-হারামন কাহিনিচিত্র! এই বাজার অর্থনীতির বিধিব্যবস্থার মধ্যে হাবুডুবু খেয়েও এ রকম ‘নায়ক’ থাকতে পারে বর্তমান সমাজে? থাকলে, একদমই কল্পিত ‘নায়ক’ সে। এদিকে আমাদের এই ফেটে যাওয়া দর্পণ-বিম্বিত বহতা সময়টা কি রকম? এই সমাজে ‘নায়ক’ কে? কী তার রোল-প্লে? এখন কি ‘নায়ক’ প্রতিভাত হয় খুব সহজে? যার যার প্রতিপার্শ্ব বা নিজের বাস্তবতা কী দেখায়? এটা খুবই হাস্যকর চলতি সমাজে যে ধরনের কেউ নেই সেই রকম চরিত্র বানিয়ে ‘সিনেমা’ নির্মাণের বাস্তবতা আর কোথায়, উপমহাদেশ ছাড়া? অবশ্য এই রকম নায়কোচিত চরিত্র যে পৃথিবীর সব চলচ্চিত্র ইন্ডাস্ট্রি থেকেই উধাও হয়ে গেছে- তাও বলার দিন আসেনি। তবে এ কথা আমরা জানি, বিভিন্ন দেশের বিভিন্ন ভাষার চলচ্চিত্রশিল্পের নব নব বিকাশ ঘটে চলেছে। বাংলাদেশ, বাংলাভাষার চলচ্চিত্রও কি চলচ্চিত্রের বদলে যাওয়া নবতরঙ্গের মুখে নিজেকে বদলে নেবে না? শিল্পের অন্যান্য মাধ্যম সৃজনকলায় কত কত বাঁক পরিবর্তন ঘটিয়ে চলেছে, কিস্তু পুঁজি বিনিয়োগনির্ভর ও টেকনোলজিনির্ভর চলচ্চিত্রশিল্প কি সেই পরিবর্তনের মুখে নিজেকে বদলের জন্য দাঁড় করাবে না? তারপর নব চেতনার স্বাতন্ত্র্য বিকাশে এদেশের চলচ্চিত্রও কি মুখোমুখি দাঁড়াবে না স্যাটেলাইট যুগের বাংলাভাষার দর্শক বা অন্যান্য ভাষার দর্শকের সামনে? সে-ক্ষমতা কি নেই আমাদের লালিত স্বপ্নের, পরিশ্রমের? কিংবা ক্ষমতা কি নেই আমাদের ছবি-নির্মাণচিন্তার স্বপ্নগ্রস্ত-শ্রমিকদের কিংবা ছবিতে বিনিয়োগকারী কোনো প্রতিষ্ঠানের? না থাকার কি আছে? বাংলাদেশের চলচ্চিত্রশিল্পের নবতরঙ্গের জাগরণ নিশ্চয়ই সমাসন্ন। বহুমুখীচর্চা ও সময়ের দাবিতেই সে বাস্তবতা অনুভব করছি। নানারকম চিন্তা-স্বপ্ন-প্রেম ছটফট করছে আমার মাথায়। ক্রমাগত সেই স্বপ্ন নির্মাণের লে-আউট প্রসারিত হয়েই চলেছে আমার করোটির মধ্যে। সত্য যে, লেখালেখিতে বাস করবার অভিজ্ঞতা, ছবি আঁকানো বিশ্ববিদ্যালয়-ইনস্টিটিউটের বিদ্যানুশীলন আমাকে শেষপর্যন্ত ছবি বানানোর দজ্ঞযজ্ঞে ঠেলে দিয়েছে। সেই ভঙ্গিতেই আমি ব্ল্যাকআউট বানিয়েছি। ৯৭ মিনিটের ছবি ব্ল্যাকআউট। সাম্প্রতিক শহর ঢাকার আর্ট-কালচারে জীবন জড়ানো দুই যুবকের স্বপ্ন-স্বপ্নভঙ্গ-নৈরাশ্যবেদন -যৌন অবদমনকে কেন্দ্রে রেখে ইমেজপ্রধান ছবি-স্টোরি উইদাউট স্টোরি: ব্ল্যাকআউট। এরপর মুক্তিযুদ্ধ- সাম্প্রদায়িকতা এবং বর্তমানের ঘূর্ণাবর্ত- চক্রাকারে আটকে পড়ে অতীত-ভবিষ্যৎ সময়ের কাঠামো ভেঙে পড়া পুরনো শহরের একটি মহল্লার মানুষের মনোজগতে ঘটমান জাদুবাস্তবতা নিয়ে শহীদুল জহিরের কাঁটা গল্পটি সরকারি অনুদানে নির্মাণাধীন ছবি। এবং খুব শিগগিরই কাঁটা ছবির কাজ শেষ হয়ে যাচ্ছে। কিস্তু কয়েকবছর ধরেই, ইতিহাসের সঙ্গে ব্যক্তির আদ্বন্দ্বের জটিলতায় একটি ছবি বানাবার নেশায় আমি আক্রান্ত। সেই নেশাদ্রব্য খেলারাম খেলে যা- সাড়ে চার দশক আগেই নেশাদ্রব্যের যোগানদাতা হয়ে আছেন সৈয়দ শামসুল হক। মনে মনে দেখতে পাই, পাঠকের অহেতুক বালখিল্য বিতর্কযুগ পেরিয়ে এসে খেলারাম খেলে যা চিত্রায়ণের পর অন্ধকার প্রেক্ষাগৃহে বসে ছবির মধ্য দিয়ে দেখছে অগণন দর্শক, নিশ্চয়ই ‘খে. খে. যা’র দর্শক বাবর আলীকে মিসট্রিট করবে না! দেশভাগ, গ্লানি-পরাজয়, ক্ষরণমুখি হয়েও ছবিতে, স্ক্রিনে দাবড়ে বেড়াবে বাবর আলী, তার সঙ্গে যুক্ত লতিফা, মিসেস নফিস, বাবলি বা জাহেদা যেমন, বারবার স্ক্রিনেই বাবর আলীর মুখোমুখি হবেন প্রণেতা সৈয়দ শামসুল হক। এতে করে প্রামাণ্যচিত্রের সঙ্গে ফিকশনের সম্পর্ক, দূরত্ব মাপা যাবে। এবার মাপতে চাই। ফলে, উপন্যাস হিসেবে এটি আর আমার মাথায় নেই- এটি এখন ফটোগ্রাফি হবার আকাঙ্কায় উন্মুখ স্বাধীনতার অবাধ পটভূমি- বাথরুমের দেয়ালে উৎকীর্ণ প্রতারিতের অভিজ্ঞান, ভাবনায় নির্মাণাধীন ছবি- খেলারাম খেলে যা।

কিন্তু এই মুহূর্তে চাই সৈয়দ হকের সুস্থতা। কারণ, মানুষ যারা এসেছে, জন্মেছে, সবাই চলে যাব। আমিও যাব। আসা-যাওয়ার নামই জীবন-পরিক্রমা। জল যেমন চক্রাকারে ঘোরে, জীবনও। আমাদের সব্যসাচী সুস্থ হবে শিগগিরই, আমি তাকে ভালোবাসি। শ্রদ্ধা করি। ‘ধরো, কবে চলে যাই’ এই সত্য মাথায় রেখেই আমি ঘুমুতে যাই আর মনে মনে বলি, ‘হ্যাঁ, ছবিটা ধরব।’ হক ভাই আপনার কথাই রাখতে চাই। আপনাকে রেখেই আমি খেলারাম খেলে যা নির্মাণ সমাপ্ত করতে চাই। বলেইছি তো, চিত্রনাট্যে পরিবর্তন আনায় আমার আগ্রহ নেই, ফলে, আপনাকে আমি পাচ্ছি আপনার উপরে প্রামাণ্যচিত্রটা নির্মাণ শেষ করতে, এটাই আমার কথা। আর কবিতা নিয়ে, মানুষ নিয়ে কত আড্ডা অপেক্ষা করছে আপনার সঙ্গে, সে তো অন্যেরা জানে না। আপনি জানেন, আমি জানি। প্রামাণ্যচিত্র বা খেলারাম খেলে যা শেষ হলে দেখবে দর্শক, জানবে তারাও।

কুড়িগ্রামের বাদশা, আপনার কাছে আরও ঋণী হতে চাই। সেই সুযোগ আপনি দেবেন না?

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

shares