সৈয়দ শামসুল হক সংখ্যা : জাকির তালুকদার

সৈয়দ শামসুল হক সংখ্যা

আমারে যেদিন তুমি

ডাক দিলা নিজের ভাষায়

 

জাকির তালুকদার

 

নিজের ভাষা ক’জনা খুঁজে পায়? নিজের ভাষায় ডাক আসেই বা ক’জনার কাছে?

সৈয়দ শামসুল হক খুঁজে পেয়েছেন। ডাকও শুনেছেন। ডাক দিয়েছেনও।

কিন্তু সেই ডাক শুনতে পায়-ই বা ক’জন? যদি শুনতে পেত বহুজন, তাহলে বাঙালির আখ্যান অনেক অনেক বেশি সমৃদ্ধ হতো আজ।

সৈয়দ শামসুল হকের সাথে বাহ্যিক কোনো মিল না থাকলেও একটা অসাধারণ দিল রয়েছে বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের। রবীন্দ্রনাথের ভাষায় সেটি হচ্ছেÑ ‘যে পথে যেতে হবে, সে পথে তুমি একা।’ এই একাকিত্ব কিন্তু ভীত বা দ্বিধান্বিত করেনি তাঁকে। তিনি নিজেকে নিমগ্ন রাখতে পেরেছিলেন এমন সৃষ্টির মধ্যে যেখানে পৌঁছুতে পারে না বাঙালি ছাড়া অন্য কোনো মনন। এমন বাঙালি, যে কখনও তার কৌমের সঙ্গে ছিন্ন করেনি নিজের নাড়ির বন্ধন। এই ব্যাপারে সন্দেহের কোনো অবকাশ তো নেই যে রাবীন্দ্রিক মনন যত উচ্চস্তরেরই হোক না কেন, তাতে ইউরোপিয় উপাদান ছিল অনেকখানি। বঙ্কিম থেকে শুরু করে রবীন্দ্রনাথ পর্যন্ত বাংলা উপন্যাস লিখিত হয়েছে ইংরেজি উপন্যাসের একটি আদলকে আদর্শ মেনে। সেই আদলটি আবার ওয়াল্টার স্কট প্রণীত আদল। সেই সময় ইউরোপের কোনো ব্যক্তি বা ঘরানার সাথে তুলনা না করে যেন বাংলাসাহিত্যের কোনো সৃষ্টিকেই মূল্যায়ন করা সম্ভবই ছিল না। সেই কারণেই দেখি হেমচন্দ্রকে বলা হচ্ছে ‘বাংলার মিলটন’। আবার বঙ্কিমচন্দ্রকে হাস্যকরভাবে আখ্যা দেওয়া হচ্ছে ‘বাংলার ওয়াল্টার স্কট’ বলে। হাস্যকর, কারণ বঙ্কিম ছিলেন ওয়াল্টার স্কটের চাইতে অনেক বড় এবং উঁচুমাপের লেখক। ভাগ্যিস, সেই সময় বাংলার সারস্বত সমাজ রবীন্দ্রনাথকেও কোনো ইংরেজ লেখকের সাথে তুলনা করতে যায়নি! রবীন্দ্রপ্রতিভা এতই মৌলিক যে সেই তুলনার জন্য তুলনীয় নামটি ইংরেজি ভাষায় বা অন্য কোনো ইউরোপিয় ভাষায় খুঁজে পাওয়া যায়নি। তবে, অন্ধ রবীন্দ্রপূজারিও অন্তত নিজের কাছে স্বীকার করবেন যে সাহিত্যের অন্য ধারাগুলিতে রবীন্দ্রনাথের যে সিদ্ধি, উপন্যাসে সেই সিদ্ধি খুঁজে পাওয়া যায় না। রবির কর তাঁর অন্য সকল সৃষ্টিকে যেভাবে আলোকিত করেছে, উপন্যাসকে সেভাবে আলোকিত করতে সক্ষম হয়নি। এই প্রতিতুলনা অন্য কোনো লেখকের সঙ্গে করা হচ্ছে না; করা হচ্ছে রবীন্দ্রনাথের নিজেরই অন্যান্য সৃষ্টির উৎকর্ষের সাথে তাঁর রচিত উপন্যাসের। ছোটগল্পের জন্য শুরুতে ইংরেজি প্রকরণের সাহায্য নিয়েছিলেন রবীন্দ্রনাথ। কিন্তু সেগুলিকে যেভাবে বাঙালিত্ব দিতে পেরেছেন, উপন্যাসে সেই অবকাশ যেন তাঁর পাওয়া হয়ে ওঠেনি। আমরা উনিশ শতকের বাংলা সাহিত্য পরিমাপের মানদ-ের কথায় ফিরে আসি। দেখা যাচ্ছে যে-কোনো রচনা বা সৃষ্টির উৎকর্ষ-অপকর্ষ তখন নির্ণয় করা হচ্ছে কোনো-না-কোনো ইউরোপিয় মানদ- সামনে রেখে। বাঙালি লেখকরাও সেই কারণে অভ্যস্ত হয়ে উঠেছিলেন ইউরোপিয় রচনার প্রকরণকে অবিতর্কিত আদর্শ হিসেবে মেনে নিতে। তাই দেখা যাচ্ছে, বাঙালি লেখকের রচনা যতই উচ্চমার্গের হোক না কেন, সেগুলিতে বাঙালি জীবনকে বিশ্লেষণ ও উপস্থাপন করা হয়েছে ইউরোপিয় মননের মানদ-ে। বাংলার নিজস্ব পালা-উপাখ্যান-আখ্যান-পাঁচালির যে নিজস্ব প্রকরণ নিয়ে উপন্যাসে রূপলাভের সম্ভাবনা ছিল, সেদিকে দৃষ্টি আকর্ষিত হয়নি ইউরোপ-আচ্ছন্ন কোনো প্রতিভাবানেরই। ফলে এক ধরনের বিচ্ছিন্নতা শুরু হয়েছিল বাংলা সাহিত্যের সঙ্গে বাঙালি-মানসের। এই ইংরেজিনবিশি  ছাড়াও যে নিজস্ব একটি পথ-প্রকরণ থাকতে পারে, সেদিকে খেয়াল করেননি কোনো সাহিত্যরথী। তাই বাংলা উপন্যাস বাংলায় লিখিত হলেও, এবং বাঙালির জীবন নিয়ে লিখিত হলেও তাকে ঠিক বাঙালির উপন্যাস বলে মেনে নিতে কোথাও একটু দ্বিধা যেন রয়েই গিয়েছিল কোলকাতার ইউরোপিয় আলোকপ্রাপ্ত সমাজের বাইরের আবহমান বাঙালি-সমাজে। এই সময়ে বিভূতিভূষণ এলেন। এবং তখনই পরিষ্কার বোঝা গেল বাঙালি-প্রাণ আসলে কী চায়।

বিভূতিভূষণ এখানেই অনন্য যে তিনি কিছুতেই তাঁর ঐতিহাসিক পরিস্থিতি বিস্মৃত হতে রাজি হন না। চমকদারী ইউরোপিয় প্রকরণের প্ররোচনাতেও না। আসলে ইউরোপের উপন্যাসের সঙ্গে বাংলার উপন্যাসের যে পার্থক্য থাকবেই, তা বিভূতিভূষণ জানতেন। সচেতনায় এবং অবচেতনায়। ব্যক্তিসত্তার উৎকট বিকাশের সাথে সাথে ইউরোপিয় উপন্যাসের উদ্ভব। সেই রকম পরিস্থিতির সাথে কোনো মিলই ছিল না বিভূতিভূষণদের সমসাময়িক বাংলায়। অধিকাংশ বাঙালি মধ্যবিত্তের শিকড় তখনও গ্রাম আর তার কৌমজীবনে গভীরভাবে প্রোথিত। ইউরোপিয় উপন্যাসের লক্ষণ যেখানে ‘নায়কের সঙ্গে কৌমের অপ্রতিকার্য বিচ্ছেদ’ তখনও বরং বাঙালি ‘ব্যক্তি’র সাথে কৌমের সেই সময়কার অচ্ছেদ্য বন্ধনগুলির দিকেই বাঙালির দৃষ্টি আকর্ষণ করলেন বিভূতিভূষণ। অপুকে পরিস্ফুটিত হতে দেওয়ার আগ পর্যন্ত পথের পাঁচালী উপন্যাসের মুখ্য চরিত্র ইন্দিরা ঠাকরুণ তো তখনও পর্যন্ত বিরাজমান বাঙালি কৌমসমাজেরই প্রতিনিধি। সেই কারণেই ‘বল্লালী বালাই’ অধ্যায়ের শেষ পঙ্ক্তিতে লেখা হয়Ñ ‘ইন্দির ঠাকরুণের মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গে নিশ্চিন্দিপুর গ্রামে সেকালের অবসান হইয়া গেল।’

কিন্তু সেকালের অবসান আসলে ঘটেনি। অন্তত বাঙালির আখ্যানের ক্ষেত্রে। অবসান ঘটলে বিভূতিভূষণ নিজেইবা সেই হারানো সূত্র খুঁজে পেতেন কোথায়! আসলে অবসান নয়। ছেদ। সেই ছেদবিন্দুটি তৈরি করে দিয়েছে ইংরেজ তথা ইউরোপ। তাকে মেনে নিয়েছে আমাদের মধ্যবিত্ত ও উচ্চবিত্ত ইংরেজি-জানা সমাজ। কিন্তু বৃহত্তর বাঙালি সমাজ, নিজেরাও যেমন আড়ালে থেকেছেন, তেমনই আড়ালে আড়ালেই বয়ে নিয়ে চলেছেন আখ্যান, কথকতা, পাঁচালি, ব্রতকথার সাগরসমান ঐতিহ্য। সেখানে হাত পাততে অনেক দেরি করেছে বাঙালি মধ্যবিত্ত। কারণ ব্রিটিশ যুগে এদেশে যদি সত্যিকারের দাস কোনো শ্রেণি হয়ে থাকে তো তারা ছিল এই ইংরেজিজানলেওয়ালারা। চিন্তার জগতে এক সংস্কৃতির ওপর অন্য একটি সংস্কৃতির আধিপত্যের ব্যাপারটি অনেক সূক্ষè, কিন্তু তার পরিণতি প্রচ- ভয়াবহ। তার কারণ এটিকে সচরাচর অনুভব করা যায় না। যতদিন কোনো নিয়ন্ত্রণ বা আধিপত্যের ব্যাপারে মানুষের সচেতনতা থাকে, ততদিন পর্যন্ত এটিকে প্রতিহত করার বোধ কাজ করে। ফলে চেতনা ততক্ষণ স্বাধীনই থাকে। যখন এই অনুভব করার ক্ষমতাটি হারিয়ে যায়, তখনই শুরু হয় প্রকৃত দাসত্ব। সাংস্কৃতিক পরাধীনতা একমাত্র তখনই জেঁকে বসে যখন নিজের ঐতিহ্যগত ভাবধারা, নিজেদের মননের-সৃজনের বৈভব, এবং নিজেদের সূক্ষè অনুভূতিগুলি চাপা পড়ে যায় তুলনামূলক বিচার এবং প্রতিযোগিতা ছাড়াই। এই পরাধীনতাই হচ্ছে সত্যিকারের দাসত্ব। সেই দাসত্ব সম্পর্কে সচেতন ছিলেন বিভূতিভূষণ। সচেতন সৈয়দ শামসুল হক। তাই রাজনীতিতে উচ্চকিত না হয়েও সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক দায়িত্বটি তিনি পালন করেছেন সাহিত্যের মাধ্যমে।

হাজার বছর বয়সী একটি জাতির আখ্যান আসলে সেই জাতির সত্যিকারের প্রাণস্পন্দন। সেই প্রাণস্পন্দন কোনোদিনই লুপ্ত হয়নি বাঙালির। সমাজের ওপর তলার মানুষকে আপাতদৃষ্টিতে সবকিছুর নিয়ন্ত্রক মনে হলেও জাতিকে ধারণ করে রাখে অন্ত্যবাসী কর্মীসমাজ। ইউরোপিয় শিক্ষা তথা সাহিত্য-সংস্কৃতির আগ্রাসন সেই তলা পর্যন্ত পৌঁছুতে পারেনি। আবার তারও আগে তুর্কি আগ্রাসনও এই পর্যন্ত শেকড় বিছাতে পারেনি। ব্রিটিশ যুগে শরিয়তপন্থিদের স্বাধীনতা সংগ্রামের প্রতি আমাদের অনেক ঋণ। কিন্তু এই শরিয়া আন্দোলনও পরাজিত হয়েছে প্রকৃতিনিষ্ঠ বাঙালির আখ্যানকাব্যের শরীরে ফাটল ধরাতে। শেষ পর্যন্তও বাঙালির আখ্যান তাই ধর্মনিরপেক্ষই থেকে গেছে, এবং গড়ে দিয়েছে আধুনিক ধর্মনিরপেক্ষতার ভিত। ধর্মনিরপেক্ষতার চাইতেও শক্তিশালী একটি ধারা রয়েছে বাঙালির আখ্যানের। সেটি হচ্ছে সর্বধর্মের সমন্বয়বাদী আখ্যান। পৃথিবীর ইতিহাসে এর কোনো তুলনা পাওয়া যাবে না। বাঙালি তার মাটিতে আশ্রয় দিয়েছে আর্যদের, শক-হুন-মোগলদের, পাঠানদের, বৌদ্ধ-জৈনদের, তুর্কি-ইরানি-আরবিয়দের। তাদের দিয়েছে নিজের থালার অন্ন-ব্যঞ্জনের ভাগ, নিজের সংস্কৃতির সাথে মিলিয়ে নিয়েছে তাদের, নিজের ধর্মপরায়ণতার সাথে সাংঘর্ষিক হতে দেয়নি অতিথিদের ধর্মবিশ্বাসকে। তাই সকল ধর্মবিশ্বাসের বাইরের আবরণটিকে ছুঁেড় ফেলে দিয়ে খুঁজে নিতে হয়েছে ভেতরের অন্তর্নিহিত আদর্শটিকে। সেখান থেকে যেসব অভিন্ন উপাদান সংগৃহীত হয়েছেÑ যেমন সকল মানুষের প্রতি ভালোবাসা, প্রকৃতির সাথে সহাবস্থান, অন্যের ধর্মাচরণে বাধা না দেওয়া, নির্বাণ বা প্রশান্তির জন্য ধর্ম-অবলম্বন- এই সবগুলিকে নিয়ে তৈরি করেছে অভিন্ন ধর্মবিশ্বাসের কথকতা-কাব্য-পাঁচালি-পুঁথি। বিভেদের বিভ্রান্তি এসেছে কখনও কখনও, কিন্তু সমন্বয়ের সাফল্যই শেষকথা। আর আছে ভালোবাসা। ব্যক্তির জন্য ভালোবাসা, কৌমের জন্য ভালোবাসা, যে কাছে আসছে তার জন্যই ভালোবাসা, বৃক্ষের জন্য, বৃষ্টির জন্য, পিঁপড়ের জন্য, পাখির জন্য, মাছের জন্য, গায়ে পরশ বুলিয়ে বয়ে যাওয়া ঝিরঝিরে বাতাসের জন্য, প্রাণদায়ী বৃষ্টির জন্য, বিপাকে পড়া শত্রুর জন্যও, আর সর্বোপরি গর্ভধারিণী এবং হৃদয়ধারিণী মায়েদের জন্য। লিখিত হয়নি এইসব আখ্যান। রচিত হয়েছে কৌমের কোনো প্রাজ্ঞ বৃদ্ধ বা তরুণের মুখে, সঞ্চিত এবং পরিশীলিত হয়েছে বুকের মধ্যে, তারপর সঞ্চারিত হয়েছে মুখের বয়ান হিসাবে আরেকজনের কাছে, পরবর্তী জন ধারণ করেছে সেই আখ্যানকে, পুষে রেখেছে বুকের মধ্যে, তারপর ছড়িয়ে দিয়েছে পর্যটনে গিয়ে, পশুশিকারে গিয়ে, মৎস্যশিকারে গিয়ে, কৃষিক্ষেত্রে গিয়ে, ‘জলকে চল’তে গিয়ে, নাইয়রে গিয়ে। মুখে মুখে সৃষ্টি, বুকে বুকে সঞ্চয়ন, বুকে বুকে বহন, মুখে মুখে সঞ্চালনÑ এই প্রক্রিয়ায় হাজার বছর ধরে সৃষ্টি হয়েছে এবং বাহিত হয়ে এসেছে বাঙালির আখ্যান। বিদেশি আগ্রাসন পারেনি এইসব আখ্যান বন্ধ করতে, উপনিবেশিকতা পারেনি এসবের প্রবাহ রুদ্ধ করতে। মধ্যবিত্ত এবং ওপরের তলার বাঙালির একটা অংশ শাসকের সাথে তাল মিলিয়ে ইংরেজ হতে চেয়েছে, পাঞ্জাবি হতে চেয়েছে, তুর্কি হতে চেয়েছে, পারসি হতে চেয়েছে, আরবি হতে চেয়েছে। কিন্তু আবহমান বাঙালিত্ব রয়ে গেছে সেই আগের জায়গাতেই অনড়, অপাপবিদ্ধ। বাঙালির সংস্কৃতি বিকশিত হয়েছে এই আগ্রাসী এবং ভিখারি মানসিকতার বাইরে বসেই। সেই সংস্কৃতি শেষপর্যন্ত পুষ্টি জুগিয়েছে বাঙালির মুক্তির সংগ্রামে। চিরায়ত আখ্যানের সাথে যুক্ত হয়েছে বাঙালির মুক্তির আখ্যান।

ইংরেজি সাহিত্য-আঙ্গিকের সাথে সৈয়দ শামসুল হকের পরিচয় অনেক গাঢ়। আমাদের অনেক লেখক-কবিই ইংরেজি সাহিত্যের সাথে খুবই পরিচিত। কিন্তু গৌণ লেখকদের ক্ষেত্রে যা ঘটে, আত্মবিলোপ, তাদের গিলে খায় অক্ষম অনুকরণ।

সৈয়দ শামসুল হক বরং ধ্রুপদী গ্রিক-ইংরেজি আঙ্গিককে বাঙালির আবহমান আঙ্গিকের আজ্ঞাবাহী করে তুলেছেন। তাঁর মৌলিক কলমেই কথা বলে চলেছে আবহমান বাঙালিত্ব।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

shares