সৈয়দ শামসুল হক সংখ্যা : লুৎফর রহমান রিটন

সৈয়দ শামসুল হক সংখ্যা

অদ্বিতীয় সৈয়দ শামসুল হক

লুৎফর রহমান রিটন

 

সচিত্র সন্ধানী নামে একটা দৃষ্টিনন্দন সাপ্তাহিক পত্রিকা বেরোতো। পত্রিকাটির শিল্পসম্পাদক ছিলেন কাইয়ুম চৌধুরী। সাপ্তাহিক বিচিত্রা ছিলো সেই সময়কার সবচে জনপ্রিয় সাপ্তাহিক। বিচিত্রার পাশাপাশি আলাদা আঙ্গিক ও উপস্থাপনভঙ্গির কারণে সন্ধানীও তখন সচেতন পাঠকের সমীহ ও ভালোবাসা অর্জনে সক্ষম হয়েছিলো। সন্ধানীর প্রায় নিয়মিত পাঠক ছিলাম আমি। সত্তরের শেষ দিকে ১৯৭৯ কিংবা আশির শুরুতে সন্ধানীর একটি সংখ্যায় নবী মুনশি নামের নতুন এক কবির একগুচ্ছ কবিতা ছাপা হলো, কাইয়ুম চৌধুরীর চমৎকার কিছু স্কেচসহ। কবিতার অনুরাগী এবং একনিষ্ঠ পাঠক হওয়া সত্ত্বেও নবী মুনশির নাম এর আগে আমি কখনও শুনিনি। তাছাড়া একজন অচেনা অজানা অনামা কবিকে সন্ধানীর মতো একটা প্রতিষ্ঠিত রুচি স্নিগ্ধ পত্রিকা এতো গুরুত্ব দিয়ে প্রকাশ করলো কেনো? ব্যাপারটা আমার কাছে খুবই ইন্টারেস্টিং মনে হলো। পড়তে শুরু করলাম। পড়ি আর বিস্মিত হই। সত্যি বলতে কি এক ধরনের ঘোর লাগা মোহ তৈরি হলো আমার মধ্যে। আমার বুকের মধ্যে এবং করোটির ভেতরে কয়েকটি কবিতার কিছু কিছু পঙ্ক্তির বিপুল অনুরণন অনুভব করলাম। ‘এ বড় দারুণ বাজি তারে কই বড় বাজিকর/যে তার রুমাল নাড়ে পরাণের গহীন ভিতর’…‘মানুষ এমন তয় একবার পাইবার পর/নিতান্তই মাটির মনে হয় তার সোনার মোহর’…আহা একেকটা পঙ্ক্তির একেকটা চিত্রকল্প একেকটা বোধ আমাকে ভাসিয়ে নিয়ে গেলো মুগ্ধতার অনিঃশেষ সমুদ্রে।

কে এই নবী মুনশি? এতো অসাধারণ কবিতা যিনি নির্মাণ করতে পারেন তিনি এতোদিন লোকচক্ষুর অন্তরালে ছিলেন কেনো? সন্ধানীর এই ‘নবী মুনশি আবিষ্কার’ আমার কাছে সাহিত্যের ক্ষেত্রে বিশাল একটা ঘটনা বলেই মনে হলো। নবী মুনশিকে কবিদের প্রথম সারিতে জায়গা দিতেই হবে। নবী মুনশিকে রোখার শক্তি আমাদের কবিদের নেই। একে ওকে জিজ্ঞেস করি। কেউই নবী মুনশিকে চেনে না। এই নামে কোনো কবিকে কেউই চেনে না। শেষে বাধ্য হয়েই আমি গিয়ে হাজির হলাম পুরানা পল্টন জোনাকি সিনেমা হল লাগোয়া সচিত্র সন্ধানী অফিসে। সদ্য গোঁফ গজানো বেপরোয়া তরুণ লেখক তখন, আমি। সন্ধানী অফিসে গিয়ে নবী মুনশি সম্পর্কে জানতে চাই। আমাকে এই টেবিল সেই টেবিল ঘোরায় ওরা। কিন্তু কেউই নবী মুনশির সুলুক সন্ধান বা ঠিকানা বলে না। এটা ওদের অফিসিয়াল গোপনীয়তা। এই গোপনীয়তা প্রকাশ করা যাবে না। মালিকের মানে কর্তৃপক্ষের নিষেধ আছে। কিন্তু আমি ‘কোথায় পাবো তারে’ টাইপের দিওয়ানা তখন। শেষমেশ আমার নাছোরবান্দা কৌতূহল, সাহিত্যিক উদ্যম আর উচ্ছ্বাসের সজীবতার কাছে পরাজিত হলেন একজন। নাম প্রকাশ না করার শর্তে। যেনো সংসারের খুব গোপন একটা রহস্যজনক ঘটনার নেপথ্যের চতুর কুশীলবের অবিশ্বাস্য কীর্তি তিনি ফাঁস করছেন আমার কাছে, মন ভঙ্গিতে ফিঁসফিস করে বললেন… ‘নবী মুনশি নামে কেউ নাই। এইটা হক ভাই, সৈয়দ শামসুল হক।’

সৈয়দ হকের এক ধরনের নিরীক্ষা ছিলো পরাণের গহীন ভিতর। কবিতার পাঠক এই নিরীক্ষাকে কী ভাবে গ্রহণ করেন সেটা দেখার জন্যেই সৈয়দ হক একজন কল্পিত নবী মুনশির পরিচয় ধারণ করেছিলেন।

তারপর, পাঠকের বিপুল সমর্থন পাবার পরেই ১৯৮০র ফেব্রুয়ারির বইমেলায় বই আকারে প্রকাশিত হয়েছিলো পরাণের গহীন ভিতর নামের দুর্ধর্ষ কবিতার বইটি। কিন্তু বইয়ের প্রচ্ছদে নবী মুনশি নামটি ছিলো না। বইটির প্রচ্ছদে নবী মুনশির জায়গায় পাঠক দেখেছিলো সৈয়দ শামসুল হককে! লেখালেখির নানান ফর্মে সৈয়দ শামসুল হকের অবিরাম এক্সপেরিমেন্টে পাঠক হিশেবে আমি চমৎকৃত হয়েছি বারবার। সন্ধানীর একটি ঈদ সংখ্যায় পড়েছিলাম তাঁর উপন্যাস বালিকার চন্দ্রযান। পটভূমি ইউনাইটেড কিংডম। লন্ডনে বেড়ে ওঠা প্রবাসী বাঙালি পরিবারের সন্তান এক তরুণীকে এবং তার জীবন যাপনকে কেন্দ্র করে রচিত এই উপন্যাসের চরিত্রগুলোর কেউ যখন কথোপকথনের সময় ইংরেজি বাক্য উচ্চারণ করে তখন সৈয়দ হক অভাবনীয় দক্ষতায় সেই বাক্যটি লেখেন সাধু ভাষায়। পাঠকের জন্যে এ এক দুর্লভ অভিজ্ঞতা। লেখক বলে দিচ্ছেন না যে পাঠক, কথোপকথনের ক্ষেত্রে ইংরেজিতে উচ্চারিত সংলাপগুলো আমি সাধু ভাষায় লিখিব। কিন্তু কিছুক্ষণ পর পাঠক নিজেই সেটা উপলব্ধি করে অনুধাবনের আনন্দে মুগ্ধ হবেন। মনে আছে, ঈদ সংখ্যায় সৈয়দ হকের এই নীরিক্ষায় মুগ্ধ হয়ে একটা চিঠি লিখেছিলাম সন্ধানী বরাবর। পাঠকের চিঠি বিভাগে সেটা ছাপাও হয়েছিলো। কোনো পত্রিকার পত্রলেখক হতে আমার কোনো আগ্রহ কোনো কালেই ছিলো না কিন্তু আমার মনে হচ্ছিলো এই লেখককে মুদ্রিত একটি অভিনন্দন

জানানোটা সমকালীন একজন সচেতন তরুণ লেখক হিশেবে আমার কর্তব্যেরই অংশ।

সাপ্তাহিক বিচিত্রায় সৈয়দ শামসুল হক লিখেছিলেন অসাধারণ একটি উপন্যাস… নিষিদ্ধ লোবান। এই উপন্যাসে ১৯৭১ সালের অবরুদ্ধ বাংলাদেশে ক্যাম্পে ধরে আনা বাঙালি নারীর প্রতি পাকিসৈন্যের নির্মম পাশবিকতার বয়ানে সৈয়দ হক যুক্ত করেছিলেন নতুন একটি মাত্রা। ধর্ষণের নতুন আরেকটি কদর্য রূপ প্রত্যক্ষ্য করেছিলো পাঠক এই উপন্যাসে। পাকি সেনারূপী পুরুষটির নিষ্ঠুর ধর্ষণের শিকার হচ্ছিলো হতভাগ্য অসহায় এক বাঙালি হিন্দু নারী। পাকিপশুটি তাকে ধর্ষণ করছিলো চোখ দিয়ে কথা দিয়ে বাক্য দিয়ে সংলাপ দিয়ে।

১৯৮৯ সালের একুশের বইমেলায় বাংলা একাডেমীর মূল ফটকের কাছাকাছি একটি স্টলের সামনে দিয়ে যাচ্ছিলাম, এক সন্ধ্যায়। স্টলটা ছিলো বিদ্যাপ্রকাশের। আমাকে দেখেই ভেতর থেকে উচ্চকণ্ঠে ডাকলেন সৈয়দ শামসুল হক। খুবই আনন্দিত ভঙ্গিতে আমি স্টলের সামনে দাঁড়ালাম। হক ভাই আমাকে স্টলটির ভেতরে গিয়ে তাঁদের সঙ্গে বসার আমন্ত্রণ জানালেন। হক ভাইয়ের পাশে আমার চেনা নন এমন একজন ভদ্রমহিলা ছিলেন। হক ভাই তাঁর সঙ্গে আমাকে পরিচয় করিয়ে দিলেন। তিনি মানসী বড়ুয়া। বিবিসি রেডিওর বিখ্যাত ব্রডকাস্টার। খুব উচ্ছ্বাসের সঙ্গে হক ভাই বললেন… এই মেলায় আমি তোমার দলে আছি।

আপনি তো সব সময়ই আমাদের দলেই থাকেন। আপনার তারুণ্যের কাছে আমরা তরুণেরা তো পেরে উঠি না হক ভাই। নিজস্ব বৈশিষ্ট্যপূর্ণ নিঃশব্দ মুচকি হাসিতে উদ্ভাসিত হয়ে হক ভাই বললেন… সেটা নয়। আমি তোমার দলে বলতে তোমাদের ছড়াকারদের দল বলতে চাইছি। আমার একটা ছড়ার বই বেরুলো তো, আজকেই! এই খোকা একটা বই দাও তো, রিটনকে লিখে দিই।

বিদ্যাপ্রকাশের হাস্যোজ্জ্বল প্রকাশক মজিবর রহমান খোকা একটা বই এগিয়ে দিলেন হক ভাইয়ের দিকে। হক ভাই সেটা আমার হাতে দিলেন। বইটা হাতে নিতেই মনটা প্রফুল্ল হয়ে উঠলো আমার। ধ্রুব এষের চমৎকার বর্ণাঢ্য প্রচ্ছদে একটা টিয়ে পাখির ছবি। টিয়েটা উজ্জ্বল সবুজ রঙের। টিয়ের ঠোঁট দুটো টকটকে লাল। যেনো বা ঠোঁট দুটোকে গাঢ় লাল লিপিস্টিকে রাঙানো হয়েছে! বইয়ের নাম ‘লাল টুকটুক টিয়ে’। লেখক সৈয়দ শামসুল হক। আমি তো হই হই করে উঠলাম। আমার আনন্দ দেখে হক ভাই আমার হাত থেকে বইটা টেনে নিয়ে বললেন… দাও, লিখে দিই তোমাকে। তারপর তাঁর ফাউন্টেন পেন দিয়ে চকচকে কালো কালিতে লিখলেন… ‘রিটন তোমার ছড়া/আমার অনেক পড়া/এখন আমার পদ্য নিয়ে বই/তুমি, পড়লে খুশি হই।’ …এরপর স্বাক্ষর করলেন, সেই চিরচেনা স্বাক্ষর… সৈয়দ শামসুল হক। হক ভাইয়ের কাছ থেকে পাওয়া এটা আমার দ্বিতীয় অটোগ্রাফ। প্রথম অটোগ্রাফটা পেয়েছিলেম এর বছর ছয়েক আগে, বৈশাখে রচিত পঙ্ক্তিমালার অসাধারণ একটা সংস্করণ বেরিয়েছিলো। প্রচ্ছদে কাগজের বদলে ছিলো লাল শালুকাপড়। এবং সেই কাপড়ের ওপর বই আর লেখকের নাম গোল্ডেন ব্লকপ্রিন্টে। সেই বইতে সৈয়দ হক অটোগ্রাফ দিতে গিয়ে টানা হস্তাক্ষরে লিখেছিলেন… ‘লিখে যাও রিটন।’ একজন তরুণ লেখকের জন্যে ওটা ছিলো আশীর্বাদতুল্য।

১৯৮২ সালে আমার প্রথম বই ধুত্তরির জন্যে আমি সেই বছর প্রথম ঘোষিত সিকান্দার আবু জাফর সাহিত্য পুরস্কার পেয়েছিলাম। পত্রিকার পাতায় আমার পুরস্কার প্রাপ্তির খবরের সঙ্গে ছাপা হয়েছিলো মনোনয়ন কমিটির সদস্যদের নামও। সেই সদস্যদের তালিকায় জ্বলজ্বল করছিলো সৈয়দ শামসুল হকের নামটি। এর বহু বছর পর, হক ভাইয়ের সঙ্গে আমার স¤পর্কটা ঘনিষ্ঠ হবার পর এক সন্ধ্যায় বইমেলার আড্ডায় আমার দুষ্টুমিতে অতিষ্ঠ হয়ে হক ভাই বলেছিলেন… তোকে প্রথম শনাক্ত করেছিলাম আমি। সিকান্দার আবু জাফর সাহিত্য পুরস্কার দেবার সময়। আমার সঙ্গে থাকা আহমাদ মাযহার মিটিমিটি হাসছিলো হক ভাইয়ের কথা শুনে। কারণ আমাকে থামিয়ে দেবার লক্ষ্যেই হক ভাই অস্ত্রটা ব্যবহার করেছিলেন। কারণ সেই সন্ধ্যায় হক ভাইকে পেয়ে বসেছিলাম আমি। না,

কোনো বেয়াদবি নয়, কেবল কথার পিঠে কথা। যুক্তি তক্কো গপ্পো আর কী! আমাদের মধুর বিতর্কটা মজাদার ছিলো। হক ভাইয়ের সঙ্গে আনোয়ারা সৈয়দ হকও ছিলেন। আমার কা-কীর্তিতে ভাবিও হাসছিলেন। আমরা বসেছিলাম বট তলার পেছনে, লেখককুঞ্জে (এখন যেটা নজরুল মঞ্চ।) একসময় হৃৎ কলমের টানে এবং মার্জিনে মন্তব্য নামে দৈনিক সংবাদের সাহিত্য পাতা এবং সাপ্তাহিক বিচিত্রায় সৈয়দ শামসুল হকের দুটি কলাম প্রকাশিত হতো। নিয়মিত পাঠক ছিলাম আমি কলাম দুটির। নতুন একটি পর্ব পড়বো বলে কতো আগ্রহ নিয়েই না অপেক্ষা করতাম। সৈয়দ শামসুল হকের একটা দুর্দান্ত বই মার্জিনে মন্তব্য। ওখানে গল্পের কলকব্জা ও কবিতার কিমিয়া শিরোনামে আলাদা দুটি আখ্যান রয়েছে। গল্প এবং কবিতাকে ব্যবচ্ছেদ করে বাংলা ভাষায় এমনভাবে দ্বিতীয় আর কেউ লিখেছেন কী না আমার জানা নেই। ক্রিয়াপদের নানা রকমের ব্যবহার সংক্রান্ত বিষয়টি বুঝিয়ে বলার জন্যে সৈয়দ হক একই প্যারা একাধিকবার লিখেছেন। একেবারে যাকে বলে চোখে আঙুল দিয়ে দেখানো।

গত বছর মার্চের প্রথম সপ্তাহে চ্যানেল আই স্টুডিওতে সব্যসাচী লেখক সৈয়দ শামসুল হকের একটা সাক্ষাৎকার নিয়েছিলাম আমি। অনুষ্ঠানের নাম ছিলো ‘শ্রদ্ধায়’। ‘শ্রদ্ধায়’ একটা সিরিজ অনুষ্ঠান। আমাদের দেশের শিল্প-সাহিত্য-রাজনীতিসহ বিভিন্ন অঙ্গনের বরেণ্য ব্যক্তিদের সঙ্গে আলাপচারিতার সেই অনুষ্ঠানের জন্যে ধারণ করা অনুষ্ঠানটির অনেকগুলো পর্ব ইতোমধ্যে প্রচারিত হয়েছে। সৈয়দ শামসুল হকের পর্বটি এখনও প্রচারিত হয়নি। প্রচারিতব্য সেই অনুষ্ঠানে এক পর্যায়ে আমি তাঁকে তাঁর শিশুসাহিত্য বিষয়েও প্রশ্ন করেছিলাম। হক ভাই জানিয়েছিলেন, এখলাসউদ্দিন আহমদ সম্পাদিত মাসিক টাপুর টুপুর-এ সীমান্তের সিংহাসন নামে একটা ধারাবাহিক উপন্যাস লিখেছিলেন তিনি। ১৯৮৮ সালে সেই কিশোর উপন্যাসটি বই আকারে বেরিয়েছিলো। এর আটাশ বছর পর ১৯৯৬ সালে তিনি সর্বশেষ কিশোর উপন্যাসটি লিখেছিলেন আমার প্ররোচনা ও তাগিদে। ১৯৯৬ সালে আমার সম্পাদিত মাসিক ‘ছোটদের কাগজ’-এর ঈদ সংখ্যায় সৈয়দ শামসুল হক লিখেছিলেন দারুণ সেই কিশোর উপন্যাস ‘হডসনের বন্দুক’। সম্পাদক হিশেবে এটা আমার গৌরব ও আনন্দের স্মৃতি।

গেলো মার্চে বেশ কয়েকটা দিন তেজগাঁও চ্যানেল আই ভবনে আমীরুল ইসলামের কক্ষে ‘রিটন-আমীরুল- মাযহার’ ত্রয়ীর সঙ্গে ব্যাপক সাহিত্যিক আড্ডায় মেতে উঠেছিলেন বাংলা ভাষার মহাশক্তিমান লেখক সৈয়দ শামসুল হক। কতো যে ঋদ্ধ হয়েছি আমরা, প্রতিদিন। লিখতে গেলে একজন লেখককে কতো যে সচেতন থাকতে হয়, জানতে হয় কতো যে পদ্ধতি! ভাষার এক্সপ্রেসনে তিনটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ অভিধা-লক্ষণা-ব্যঞ্জনা- সম্পর্কিত তাঁর অসামান্য আলাপচারিতায় আমরা মুগ্ধ হয়েছি। হক ভাই হচ্ছেন প্রচণ্ড মেধা বিপুল শ্রম আর বিচিত্র অভিজ্ঞতার সমন্বয়ে গঠিত একজন আলোকিত ও সম্পন্ন মানুষের প্রতিকৃতি। আমাদের শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতির হেন শাখা নেই যেখানে সৈয়দ হকের মেধার কুসুম ফোটেনি। আমাদের চলচ্চিত্র-মঞ্চ নাটক- গল্প-কবিতা-উপন্যাস-শিশুসাহিত্য-প্রবন্ধ নিবন্ধ-স্মৃতিগদ্য-জীবনী-কলাম-রেডিও টিভিতে অনুষ্ঠান উপস্থাপনা-সাংবাদিকতা- ছবি আঁকা কী করেননি একজন সৈয়দ হক! একই সঙ্গে সৃজনশীল ও মননশীল উভয় ক্ষেত্রে একজন মানুষের এরকম প্রবল কার্যকর উপস্থিতি একটি বিস্ময়কর রকমের বিরল ঘটনাই বটে। আমাদের পরম সৌভাগ্য যে আমরা আমাদের কালে একজন সৈয়দ শামসুল হককে পেয়েছিলাম।

আমাদের কালের সাংস্কৃতিক অঙ্গনের সবচে মেধাবী পুরুষ সৈয়দ শামসুল হক অসুস্থ। সৈয়দ হকের অসুখ সারাতে অপারগ পৃথিবীর চিকিৎসা বিজ্ঞান। ইংল্যাণ্ডের চিকিৎসা অসমাপ্ত রেখেই তাই ফিরে গিয়েছেন তিনি,বাংলাদেশে। ঢাকার ইউনাইটেড হাসপাতালের মন খারাপ করা কেবিনে শুয়ে থাকা সৈয়দ শামসুল হককে দেখে বিষণ্ণ আমি বাংলাদেশ থেকে বারো হাজার তিনশ কিলোমিটার দূরের দেশ কানাডায় বসে এই রচনাটি যখন লিখছি, তার কিছুক্ষণ আগে কথাশিল্পী আনোয়ারা সৈয়দ হক আমাকে জানিয়েছেন যে কর্কট রোগের সঙ্গে লড়াই করে প্রচণ্ডভাবেই সচল এবং সজীব আছেন আমাদের হক ভাই। প্রতিদিন কবিতা লিখছেন, গল্প লিখছেন। তবে লেখাগুলো তৈরি হচ্ছে শ্রুতিলিখন পদ্ধতিতে। হক ভাই বলছেন আর আনোয়ারা সৈয়দ হক সেটা লিখছেন। জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণের এই চরম লগ্নেও অভাবনীয় সৃজনশীলতায় দীপ্যমান অদ্বিতীয় ও অনন্য সৈয়দ শামসুল

হক।

প্রিয় হক ভাই, অন্তহীন শুভ কামনা আপনার জন্যে।

অটোয়া ২৩ সেপ্টেম্বর ২০১৬

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

shares