সৈয়দ শামসুল হক সংখ্যা : রামেন্দু মজুমদার

সৈয়দ শামসুল হক সংখ্যা

এখনও অনেক বাকি

রামেন্দু মজুমদার

 

সপ্তাহখানেক আগে সৈয়দ হককে দেখতে হাসপাতালে গিয়েছিলাম। অনেক দিন পর দেখা, অসুস্থ হবার পর এই প্রথম। শরীর অশক্ত, কিন্তু চোখে অনেক স্বপ্ন। মানসিকভাবে বেশ চাঙ্গা দেখলাম। অনেক লেখার পরিকল্পনা। চারটা নাটক তাঁর মাথায় ঘুরছে। আমি বললাম, একটা নিশ্চয়ই আমি পাব। তিনি বললেন, অবশ্যই। আমার প্রথম নাটক পায়ের আওয়াজ পাওয়া যায় আপনার হাতেই তুলে দিয়েছিলাম।

বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে একটি ইংরেজি নাটক লিখছেন বললেন। In Search of Bangabandhu। তাছাড়া বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকী ও বাংলাদেশের স্বাধীনতার সুবর্ণ জয়ন্তীও দেখার ইচ্ছা। পরম করুণাময়ের কাছে প্রার্থনা করি তাঁর ইচ্ছা যেন পূর্ণ হয়।

একজন মানুষের বয়স ৮০ পেরিয়েছে। এ সময়ে আবার ক্যানসারের মত ব্যাধি কেন হতে হবে? তাছাড়া সৈয়দ শামসুল হকের মত সৃষ্টিশীল মানুষের? হাসপাতালে শুয়ে শুয়েও লিখে চলেছেন কবিতা অবিরাম। ভাবি (আনোয়ারা সৈয়দ হক) কে বলে যাচ্ছেন, ভাবি লিখছেন।

জীবনের এই প্রান্তে এসে যখন নিজের কথা ভাবি, তখন দেখি কত সময় কর্মহীন আলস্যে ব্যয় করেছি। জীবন তো একটাই। কিন্তু সেই জীবনের সময়টার সদ্ব্যবহার করিনি। কিন্তু হক সাহেবকে সবসময় দেখেছি কিছু না কিছু করছেন। হাতে সবসময় বই আর লেখার খাতা। সময় পেলেই পড়ছেন বা কিছু লিখছেন।

তাঁর সাথে যখনই সময় কাটিয়েছি, নতুন কিছু না কিছু শিখেছি। সেজন্যে তাঁর সঙ্গ একসাথে উপভোগ্য ও শিক্ষণীয়। তাঁর একটা বই আছে কথা সামান্যই। অসাধারণ বই। শব্দ নিয়ে যে কত খেলা করা যায়, কত ধরনের অর্থ হয়, আমরা কখনও কখনও যে কত ভুল প্রয়োগ করি- এ বই পড়লে জানা যায়। অথচ আশ্চর্য, এ বইটির প্রচার তেমন হল না। ভাষার উপর তাঁর দখল ঈর্ষণীয়। এক সময়ে গল্পের কলকব্জা বলে লেখায় তিনি বিখ্যাত লেখকদের গল্প ব্যবচ্ছেদ করে দেখাতেন লেখার কী কৌশল লুকিয়ে আছে তাতে।

গদ্য-পদ্য সমান শক্তিশালী তাঁর। কাব্যনাটককে তিনি আমাদের দেশে একটা শক্ত ভিতের উপর দাঁড় করিয়েছেন। আগে আমাদের ধারণা ছিল কাব্যনাট্য দর্শকের হৃদয় স্পর্শ করে না। কিন্তু পায়ের আওয়াজ পাওয়া যায়-র মধ্য দিয়ে সৈয়দ হক প্রমাণ করলেন, যদি কুশলী হাতে লেখা হয় এবং দক্ষতার সাথে প্রযোজিত হয়, তবে কাব্যনাট্যও দর্শকের মন জয় করতে পারে। তার উপর নাটকটি ছিল আঞ্চলিক ভাষায়। গীতল ভাষা। পরে তাঁর অনেক নাটক আমরা করেছি- এখানে এখন, যুদ্ধ এবং যুদ্ধ, ম্যাকবেথ, টেমপেস্ট। শেক্সপিয়র অনুবাদের জন্যে তিনি স্মরণীয় হয়ে থাকবেন। চিরায়ত সাহিত্যের চিরায়ত অনুবাদই বটে। অথচ অভিনয়ে কোনো সমস্যা হয় না তৎসম শব্দবহুল সে সব অনুবাদে। এখানেই তাঁর দক্ষতা।

আমি যেদিন প্রথম লন্ডন যাই, ঘটনাচক্রে একই বিমানে তিনিও যাচ্ছিলেন। আমাকে পরামর্শ দিয়েছিলেন কী কী করতে হবে, কোন নাটক দেখতে হবে। একটা ঘটনার কথা আমার সবসময় মনে পড়ে। একদিন তোপখানা রোডে আমার সে-সময়ের অফিস থেকে আমরা দু’জন রিক্সায় মতিঝিল যাচ্ছি। তিনি বারবারই রিক্সাওয়ালাকে এভাবে যাও, আস্তে চালাও – এসব বলছিলেন। আমাকে বললেন, বুঝলেন রামেন্দু, রিক্সায় উঠলে এটাই মুশকিল। আদ্দেকটা নিজেই চালাতে হয়।

সৈয়দ হকের কাছ থেকে এখনও আমাদের অনেক পাওয়ার আছে। মরণ ব্যাধি জয় করে তিনি সুস্থ শরীরে আবার ফিরে আসুন আমাদের মাঝে – এ কামনাই করি।

 

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

shares