সৈয়দ শামসুল হক সংখ্যা : হাসান আজিজুল হক

সৈয়দ শামসুল হক সংখ্যা

আমাদের সৈয়দ শামসুল হক

হাসান আজিজুল হক

 

সৈয়দ শামসুল হক আমার বয়োজ্যেষ্ঠ। আজ তাঁকে নিয়ে আমি আমার কিছু স্মৃতির কথাই লিখতে চাই। তাঁর কবিতা, কথাসাহিত্য, নাট্যকাব্য এসব নিয়ে কথা বলা আমার জন্যে একেবারে অসম্ভব না হলেও সেটা করার জন্যে যে পরিশ্রম ও মেধার প্রয়োজন আমি তার অধিকারী কি না বলতে পারি না। তবে এই মানুষটিকে নিয়ে আমার যে অনেক কথা বলার আছে সেটা ঠিক। আমি তাঁকে নিয়ে নিশ্চয় বিশদ কিছু আলোচনা করতে খুবই ইচ্ছুক, তবে এখনও সে জন্যে পুরোপুরি প্রস্তুত নই।

আমাদের সাহিত্যের ধূসরপটে যে কয়েকটি নক্ষত্র দীপ্তি বিলিয়ে যাচ্ছেন তাঁদের সংখ্যা সত্যিই বেশি নয়। এ রকম একটি নক্ষত্র সৈয়দ শামসুল হক। কখনও তাঁকে আমার শুকতারা বলে মনে হয়, যে তারাটি সন্ধ্যাকে স্নিগ্ধ করে তোলে, কর্মক্লান্ত সারাদিনের পরে শান্তি হয়ে দেখা দেয়। এই তারাটিই তো আবার ভোরবেলায় দেখা দেয়। তখন সে আরও বড় ও উজ্জ্বল। ওটা দেখলেই দিনের আশ্বাস মেলে। সৈয়দ হককে তেমনি আমাদের শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতির আকাশে শুকতারা আর ভোরের তারা বলে মনে হয়।

আমি আজকালকার কবিতা তেমন বুঝতে পারি না। শেষ পর্যন্ত আমার অবলম্বন শামসুর রাহমান, রফিক আজাদ, মোহাম্মদ রফিক, আল মাহমুদ- এই রকম কয়েকজনকেই আনন্দের সঙ্গে পড়তে পারি। আর এই দলেই অত্যুজ্জ্বল রয়েছেন আরেকটি তারা- তাঁর নাম সৈয়দ শামসুল হক। তাঁর কবিতা যে খুব আলাদা সেটা আমি সহজেই বুঝতে পারি।

তাঁর গদ্যও অসাধারণ। যদি মাত্র দুটি বাক্য লেখেন তাতেও তাঁর অমোচনীয় স্বাতন্ত্র্যের চিহ্ন অঙ্কিত থাকবে, সঙ্গে সঙ্গেই চেনা যাবে এই গদ্য সৈয়দ শামসুল হকের। এত পরিপাটি, নিপাট, বুদ্ধিদীপ্ত গদ্য তিনি লেখেন তাতে আমরা যারা তাঁর লেখা পড়ি তারা শুধু মুগ্ধতাতেই ডুবে থাকেন। বিষয়বৈচিত্র্যেও তাঁর সঙ্গে তুলনায় আর তেমন কাউকে পাওয়া যাবে না। প্রয়োজন হলে তিনি তাঁর সাহিত্যে একটা কঠোর অবস্থান নিয়েও অতিরেক কিছু লিখে বসেন না।

সবাই তাঁকে কবি বলে জানেন। তিনি নিজেকে প্রধানত কবি হিসেবেই পরিচয় দিতে আগ্রহী, অথচ তাঁর উপন্যাস, গল্প, কাব্যনাট্য পরস্পরকে একইভাবে স্পর্ধা করতে পারে। একেবারেই ভিন্ন বিষয় নিয়ে তিনি প্রচুর লেখা লিখেছেন, কিন্তু সেগুলো যত বিচিত্রই হোক না কেন, গুণ-মানে পরস্পরের প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবেই দেখা দিক না কেন, মালার ভিতরে সুতোর মতো আছেন একজনই- সৈয়দ শামসুল হক। এইসব মানুষকেই বহুমুখী প্রতিভাধর বলে আমরা মনে করি।

বৈশাখে রচিত পঙ্ক্তিমালা থেকে শুরু করে এক কবিতার ক্ষেত্রেই তিনি এত বিচিত্র অথচ স্পষ্টভাবে পার্থক্যচিহ্নিত পথে হেঁটেছেন, সব সময়ে সৈয়দ শামসুল হক সেসব বিচিত্র পথের যে স্রষ্টা তাতে কোনো সন্দেহ থাকে না। তাঁকে ছাড়া বাংলা সাহিত্য যে কতটা দরিদ্র হয়ে পড়ত তা আমি কল্পনা করতে পারি না। তাঁর কলম এখনও সচল, তাঁর মুষ্টি এখনও বজ্রকঠিন, মনোবল ইস্পাততুল্য, অক্ষয় ও ঝকঝকে। সবচাইতে বড় কথা তিনি যে শাখাতেই কাজ করেছেন সেখানেই সফল হয়েছেন। কবিতা, উপন্যাস, গল্পে তিনি সেরাদের সেরা। তাঁর কাব্যনাট্য, অন্তত তিনটি, বাংলা সাহিত্যে চিরস্থায়ী হবে বলে আমি মনে করি। বহু কবিতাও সুদীর্ঘ আয়ু লাভ করবে তাতেও কোনো সন্দেহ করি না। গল্প, উপন্যাসের মান আকাশছোঁয়া না হলেও আমাদের সাহিত্যের ভা-ারে সঞ্চয় যে বাড়িয়েছে তাতে সন্দেহ নেই।

এই লেখাটি তো প্রায় ব্যক্তিগত পর্যায়ের, সে জন্যেই এটাও আমার জানানো দরকার যে, বহু বিষয়ে তাঁর সঙ্গে আমার মতপার্থক্য ছিল। বিশেষ করে সাহিত্যের নন্দনমূল্য নিয়ে। তাঁর লেখা কখনও কখনও নিখুঁত নির্মাণকর্ম বলে আমার মনে হয়। তার ফলে তাঁর চমৎকার সৃষ্টিগুলিতেও যেন একটা রক্তাল্পতা থেকে যায় বলে আমার মনে হয়। কখনও কখনও মনে হয় ঝোঁকটা প্লেটোর বিশুদ্ধ ‘আকার’-এর মতো। প্লেটো আকারকেই বাস্তব বলেছেন। এরিস্টোটল তা বলেননি। আকার আর বস্তু মিলিয়েই বাস্তব। সৈয়দ শামসুল হকের রচনাকে পাল্লায় তুললে আকারের পাল্লাই ভারি বলে মনে হবে। বাস্তবতাটা খানিকটা নির্মিত বলে মনে হবে। এইসব বিষয় নিয়ে তিনি নিজেই সব কিছু ওজন করে নিয়েছেন। এই জন্যেই কথা সামান্যই, মার্জিনে মন্তব্য এই বই দু’খানি লেখা। দুটো অসাধারণ গ্রন্থ তাতে সন্দেহ নেই। বাংলা ভাষার সেবা যাঁরা করতে চান এই দু’খানি গ্রন্থই তাঁদের জন্যে অবশ্যপাঠ্য। মানুষী বাস্তবতার তো কোনো একটি মাত্র গ্রাফ তৈরি করা যায় না। সেটা কেউ কখনও করতে পারেন না। পারলে এক লেখকের সঙ্গে আরেক লেখকের তফাৎ করা সম্ভব হতো না।

সৈয়দ শামসুল হক মানুষ হিসেবে আমার খুবই প্রিয়। ঝুনো নারকেলের মতো খোলসটা একবার ভাঙতে পারলে যে স্নেহশীল, দরদী মানুষটি আমি দেখতে পাই সেই মানুষটিই কিন্তু তাঁর সমগ্র রচনার মধ্যে সদা উপস্থিত আছেন।

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

shares