সম্পাদকীয়

 

অমরত্বের সোনার মুকুট কি মাথায় ধারণ করোনি, কবি?

 

ইউনাইটেড হসপিটালের ৬০৪ নম্বর কেবিনে ঢোকার সঙ্গে সঙ্গে তিনি বললেন, ‘মোহিত! মোহিত! এসেছ!’

জবাব এল না মুখে। বুকের ভেতরে কেবলই প্রতিধ্বনিত হলো, ‘এসেছি কবি এসেছি।’

বেডের পাশে দাঁড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে হাত বাড়িয়ে দিলেন তিনি। আমার হাতটা ধরে রেখে প্রশ্ন করলেন, ‘শব্দঘর এনেছ ?’

‘জি এনেছি।’

‘খুলে দেখাও।’

খুলে দেখালাম তাঁর কবিতাগুচ্ছের শিরোনাম- ‘অনন্তকাল মুঠোর ভেতরে বন্দি’।

শিশুর মতো জ্বল জ্বল করে উঠল তাঁর চোখের তারা।

‘ভালো কাজ করছো! নিয়মিত প্রকাশ করতে পারছো শব্দঘর। ভালো! খুউব ভালো!’

তাঁর প্রশংসা শুনে আমার মনের মধ্যে কেবলই অনুরণিত হতে লাগল একটাই কথা- আজন্মই তুমি শিশু রয়ে গেলে, কবি!

‘তুমি তো জানো চাকরি-বাকরি করি না আমি। সাহিত্যই আমার কাজ। ছোট খাম আনোনি?’

‘এনেছি।’

‘দাও।’

বাড়িয়ে দিলাম খামটি। হাতে নিয়ে তিনি বললেন, ‘জানো, বঙ্গবন্ধুর কন্যা, জাতির পিতার কন্যা, শেখ হাসিনা, আমাদের প্রধানমন্ত্রী এসেছিলেন। আমার চিকিৎসার ব্যয়ভার তিনি তাঁর হাতে তুলে নিয়েছেন। তবু এটাই আমার একটুকরো রোজগার। নিজের রোজগার কার না ভালো লাগে, বলো?’

প্রাণজুড়ানো কথা শুনে মুগ্ধ হয়ে কবিতাগুচ্ছের সঙ্গে শব্দঘর শরৎ সংখ্যায় প্রকাশিত তাঁর ছবিটি দেখিয়ে বললাম, ‘লন্ডনের রাস্তায় বাসের আশায় বসে আছেন আপনি। আর পুরো বাঙালি জাতি বসে আছে আমাদের কবির সুস্থতার আশায়।’

তিনি হাসলেন। আত্মপ্রত্যয়ী সেই হাসি দেখে মুগ্ধ আমি আবার বললাম, ‘এটাকে কেবলই ফটোচিত্র মনে হয়নি আমার। মনে হয়েছে লন্ডনের সড়কে বসে আছে জীবন্ত এক কবি!’

আবারও হাসলেন তিনি।

বিদায় নেওয়ার সময় ফেসবুকের মেসেঞ্জারে নাজিব তারেকের পাঠানো অক্টোবর ২০১৬ সংখ্যার প্রচ্ছদের ফটোশিল্পচিত্র দেখিয়ে বললাম, ‘এটাই প্রকাশিতব্য শব্দঘর-এর প্রচ্ছদ।’

দূর থেকে একপলক দেখলেন তিনি। তারপর চট করে মাথাটা টেনে তুলে ভালোভাবে দেখে বললেন, ‘বাহ্! বাহ্!’

এক শব্দের দ্বিত্ব উচ্চারণের আনন্দধ্বনি বেরোলো তাঁর পরানের গহীন ভিতর থেকে।

শব্দধ্বনি দুটোকে আঁকড়ে ধরলাম আমি। এ যে আমার আর শব্দঘর-এর এক বিরাট প্রাপ্তি, বিরাট ঐশ্বর্য! এ মূল্যবান সম্পদ কি উড়ে যেতে দিতে পারি? না, কিছুতেই না।

ফেরার সময় দরজা থেকে আবার ফিরে তাকালাম তাঁর দিকে। দেখলাম কবির মাথায় স্বর্ণপালক খচিত কাব্যমুকুট। আরও দেখলাম বাংলা সাহিত্যের বিকীর্ণ আলোর ঢেউ। কালের গর্ভে এই ঢেউ কি কখনও হারিয়ে যেতে পারে? অনন্তকালকে কি হাতের মুঠোয় বন্দি করোনি, কবি? জীবন কি সামান্যই? চিরকালের অমরত্বের স্রোতে ভাসমান বৃহৎ নৌকার বৈঠা কি আঁকড়ে ধরেনি তোমার পঙ্ক্তিমালা? অক্ষরস্রোত কি চোখ-রাঙিয়ে দিচ্ছে না ক্যান্সার কোষের দানবীয় রণডংকাকে? অমরত্বের সোনার মুকুট কি মাথায় ধারণ করোনি,কবি?

(মোহিত কামাল)

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

shares