লিটল ম্যাগ

আবুল মনসুর আহমদ :

বাংলা সাহিত্যে ব্যঙ্গরচনার কারিগর

ড. ফজলুল হক সৈকত

 

রাজনীতি, সাংবাদিকতা এবং সাহিত্যের প্রতি অপার নিষ্ঠা আর সমাজ-গঠন ও মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার চলমান সংগ্রামে নিবেদিত-প্রাণ এক সাধক আবুল মনসুর আহমদ (জন্ম : ৩ সেপ্টেম্বর ১৮৯৮ ধানিখোলা, ময়মনসিংহ; মৃত্যু: ১৮ মার্চ ১৯৭৯ ঢাকা)। কখনও রাজনীতির মঞ্চে ও সরকারের মন্ত্রিসভায়, কখনও সংবাদপত্র সম্পাদনায় বা কলামে, কখনও সাহিত্যে, কখনওবা আইনজীবী হিসেবে নিজের নামের মহিমা প্রচার ও প্রতিষ্ঠার পথ তৈরি করেছেন এই মনীষী। ১৯৩০-৩৮ সময়কালে ময়মনসিংহ জজকোর্ট ও কলকাতার আলীপুর জজকোর্টে আইন পেশায় নিয়োজিত থাকার সময়টুকু বাদ দিলে ১৯২০ থেকে প্রায় আমৃত্যু ৬ দশককাল তিনি চিন্তা-মনন ও কর্মে গৌরবোজ্জ্বল ভূমিকা রেখেছেন।

তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়নের পদার্থবিজ্ঞান ও গণিত বিশারদ এবং সাহিত্যিক আলেক্সন্দর সল্জনিৎসিন, যিনি নৈতিকশক্তি আর প্রাতিস্বিক ঐতিহ্যকে ধারণ করে বন্দিশিবির থেকেও শিল্পের গোলাপ ফুটিয়েছেন, ১৯৭০ সালে সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার গ্রহণকালে বক্তৃতায় বলেছিলেন :

‘আদিম মানুষের মতো কেউ একজন, এক অদ্ভুত সামুদ্রিক প্রাণীকেÑ সে এক অদ্ভুত হয়ত বালির মধ্যে লুকিয়েছিল, অথবা এমন কিছু যা হঠাৎ করেই আকাশ থেকে পড়েছেÑবেশ অদম্য আর বক্র, আবার বোধহীনের মতো চকচকে, ভেতর থেকে উজ্জ্বলপ্রভা বেরিয়ে আসছে, একেক সময় একেক রূপ নিচ্ছে, মনে হচ্ছে, যেন  একে যে-কোনো রূপেই ব্যবহার করা যাবে, হাতের মুঠোয় নিয়ে কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে ওঠে…সে রকমই শিল্পকে আমরা আমাদের হাতের মুষ্ঠিতে ধরে রেখেছি, আত্মপ্রত্যয়ীর মতো মনে করিÑএ আমাদের নিজস্ব সম্পদ, এর লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য নিয়ন্ত্রণ করি, একে নতুনত্ব দিই, পুনর্নির্মাণ করি, এর ফতোয়া দিই, টাকার জন্য বিক্রি করি, একে নিয়ে প্রভাবশালীদের সঙ্গে বাকবিত-া করি এবং বিনোদনের সামগ্রীতে পরিণত করি বিভিন্ন সঙ্গীতের আসরে আর রাতের ক্লাবগুলোতে এবং এক সময় এটি গতিনিরোধক কিংবা লাঠিতে পরিণত হয়, দিক-পরিবর্তনের রাজনীতির অথবা ক্ষীণ সামাজিক প্রয়োজনে।’

(মামুদ, ২০০৮, ৫৩)

 

আবুল মনসুর আহমদের রাজনীতিলগ্নতা এবং সাংবাদিক ও সাহিত্যিক দায়বোধের বিবেচনায় এই কথাগুলো বিশেষভাবে স্মরণ করার প্রয়োজন পড়ে। মধ্যবিত্ত কৃষক-পরিবারের সন্তান আবুল মনসুর আহমদকে জীবনের পথ পারি দিতে হয়েছে নানান প্রতিকূলতার ভেতর দিয়ে। তাঁর কর্ম-পরিসরের পুরোটি ভুবনজুড়ে সমানতালে চলেছে রাজনীতি-সাধনা ও সাহিত্যচর্চা। তিনি তাঁর প্রতিবেশকে ধারণ করেছেন প্রজ্ঞা আর আশাবাদের প্রবল তাড়নায়। সমাজচিন্তক মনসুর ছিলেন সমাজ-রাজনৈতিক লেখক। সাধারণ মানুষের বোধের ভুবনে আলোড়ন তুলতে চেয়েছিলেন এই দার্শনিক। কখনও কখনও তিনি আবেগতাড়িত হয়েছেন, হয়েছেন নিজের ধর্ম ও জাতির প্রতি পক্ষপাতী। কিন্তু সর্বোপরি তাঁর লক্ষ্য ছিল শান্তি, উদার-নৈতিকতা ও মানবতাবাদ। আর সাধনার সমস্ত প্রহরজুড়ে তিনি নির্ভর করেছেন আত্ম-অনুভব আর আত্ম-বিশ্বাসের ওপর। আর সে কারণেই, সত্য-সুন্দর আর কল্যাণের পথে প্রসারিত তাঁর রাজনৈতিক মনীষা এবং সাহিত্যিক অভিলক্ষ্য। ব্যক্তিগত ও সামাজিক জীবনে অর্জনের দিক থেকে অবশ্যই কীর্তিমান মানুষ আবুল মনসুর আহমদ। তিনি সময়ের এক নিরন্তর যাত্রী। যেন একটা দূরগামী ট্রেন সময়ের বিশাল প্রান্তর পেরিয়ে স্টেশন থেকে স্টেশনে নিয়ে গিয়ে অবশেষে নামিয়ে দিয়েছে এক জংশনে। পথ পেরোনোর সময় এত মুখ এত ছবি দেখেছেন তিনি- তার সবগুলো সামাজিক-রাজনৈতিক অভিজ্ঞানকে আশ্রয় করে হয়ে উঠেছে তাঁর সাহিত্যের উপাদান। কোনো আত্মপ্রচার বা কীর্তিগাথা নয়, মনসুর এঁকেছেন  স্রেফ জীবনের ছবি। জীবনের ছবি আঁকতে গিয়ে তিনি পরিচিত ভুবন থেকে আর জীবন-জিজ্ঞাসা থেকে সংগ্রহ করেছেন সারি সারি খণ্ডচিত্র। চিত্রগুলো হয়ত ক্ষুদ্র, আঁচড়গুলো মিহি, কিন্তু সবকিছু মিলিয়ে তৈরি হয়েছে এক অপূর্ব কাহিনি-ছবি। আবুল মনসুর আহমদের কাছে শেষপর্যন্ত অনুভবঘন-জীবনযাপনই জীবনের বৃহত্তর মহত্তর কাজ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

আবুল মনসুর ‘ধর্মীয় কড়াকড়ি’র পারিবারিক ঐতিহ্যের মধ্য দিয়ে শৈশব-কৈশোর পার করেছেন। ‘ফরাযী’ পরিবারের ছেলে আহমদ আলী ফরাযী পরবর্তীকালে আবুল মনসুর আহমদ হিসেবে পরিচিতি লাভ করেছেন। তাঁর চাচা মুনশী ছমিরুদ্দিন ফরাযীর মক্তবে শিক্ষায় হাতেখড়ি। বাড়ির বৈঠকখানায় বসত এই ফ্রি মাদ্রাসা। কায়দা- আমসেপারা-কোরআন এবং বর্ণ ও বানান শিক্ষা ছিল তাঁর প্রাথমিক পাঠের তালিকায়। ১৫ বছর বয়সে ৬ষ্ঠ শ্রেণিতে পড়ার সময়ে দরিরামপুর মাইনর স্কুলের শিক্ষক কৈলাস বাবুর প্রেরণায় সাহিত্যচর্চা শুরু করেন আবুল মনসুর আহমদ। ১৯২০ সালে ঢাকা কলেজে দর্শনশাস্ত্রে অনার্স পড়ার সময়ে জড়িয়ে পড়েন সক্রিয় রাজনীতিতে। তৎকালীন খেলাফত ও অসহযোগ আন্দোলনে অংশগ্রহণ করেন তিনি। ওই বছরেই যোগ দেন দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশের স্বরাজ পার্টিতে। পরবর্তীকালে ১৯২৯ সালে কলকাতা রিপন কলেজ থেকে অর্জন করেন এলএলবি ডিগ্রি।

১৯২৩ সালে মওলানা মনিরুজ্জামান ইসলামাবাদীর সাপ্তাহিক ‘ছোলতান’ পত্রিকায় সহ-সম্পাদক হিসেবে মনসুরের সাংবাদিক-জীবনের আরম্ভ। তিনি বাঙালি মুসলমান সমাজে সাংবাদিকতার অন্যতম পথিকৃৎ। সমকালে কাজী নজরুল ইসলাম অবশ্য সাংবাদিকতা ও সাহিত্যে প্রবল প্রভাবের সাথে বিচরণ করেছেন। আবুল মনসুরের খানিকটা বিশেষত্ব হলো সমকালে শিক্ষিত বাঙালি মুসলমান তরুণসমাজকে সাংবাদিকতা পেশায় প্রবেশে অনুপ্রেরণা প্রদান। অবশ্য তিনি মনে-প্রাণে সাহিত্যিকই হতে চেয়েছিলেন। কিন্তু মওলানা আকরম খাঁ-র সাপ্তাহিক ‘মোহাম্মদী’, মৌলবী মজিবর রহমানের ‘দি মুসলমান’, ‘দৈনিক কৃষক’, এ কে ফজলুল হকের ‘নবযুগ’, শহীদ সোহরাওয়ার্দীর ‘দৈনিক ইত্তেহাদ’ প্রভৃতি পত্রিকায় নিরলসভাবে দায়িত্ব পালন এবং অসীম নিষ্ঠার পরিচয়ের কারণে সাংবাদিক ও সম্পাদক আবুল মনসুর আহমদ প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেলেন। তৎকালীন সময়ে সংবাদপত্র ছিল রাজনীতির প্রচারমাধ্যম বা মুখপত্র। সাংবাদিকতার মধ্য দিয়ে সমাজ-রূপান্তরের কারিগরেরা ব্রিটিশ শাসিত ভারতে বাঙালির চিন্তা ও স্বাধীনতার চেতনাকে নানানভাবে প্রচার করেছেন। রাজনৈতিক কর্মসূচি, দাবি ও ভাষা, অভিলক্ষ্য ও আদর্শ প্রচারে যে অনন্যভূমিকা রেখেছিল সংবাদপত্রসমূহ তাঁর পেছনে নজরুল-মনসুরদের অবদান অসামান্য। তখন যেন সাংবাদিকতা ও রাজনীতি ছিল একই সুতোয় বা শেকলে বাঁধা! মনসুর ছিলেন পেশাদার সাংবাদিক। স্বরাজ-প্রতিষ্ঠা এবং হিন্দু-মুসলিম বন্ধুত্ব স্থাপনে তাঁর চিন্তা ছিল অগ্রগামী।

১৯২০ সালে রাজনীতির পাঠ গ্রহণ করা তরুণ আবুল মনসুর আহমদ পরবর্তীকালে বর্ণাঢ্য রাজনৈতিক জীবন পার করেছেন। ১৯৩০ সালে ‘নিখিল বঙ্গ প্রজা সমিতি’র ময়মনসিংহের সেক্রেটারি নিযুক্ত হন। ১৯৪৪ সাল থেকে পাকিস্তান-আন্দোলনে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন। তিনি ছিলেন কৃষক-প্রজা পার্টির অন্যতম কর্ণধার, মুসলিম লীগের প্রচার সম্পাদক এবং আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাতা-নেতা। ১৯৪৬-এ মুসলিম লীগের প্রার্থী হিসেবে গণপরিষদ সদস্য নির্বাচিত হন। ১৯৫৩-১৯৫৮ পর্যন্ত আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতির দায়িত্ব পালন করেছেন। যুক্তফ্রন্ট নির্বাচনের ২১ দফার অন্যতম প্রণেতাও তিনি। ১৯৫৪ সালে যুক্তফ্রন্টের পক্ষ থেকে নির্বাচিত হয়ে প্রাদেশিক স্বাস্থ্যমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৫৬ সালে আতাউর রহমানের নেতৃত্বে আওয়ামী কোয়ালিশন মন্ত্রিসভায় শিক্ষামন্ত্রী এবং ১৯৫৬-৫৭ সময়কালে পাকিস্তান কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভা- সোহরাওয়ার্দীর মন্ত্রিসভার শিল্প ও বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব লাভ করেন। রাজনীতি-সমাজ-সংস্কৃতি প্রভৃতি ক্ষেত্রে আবুল মনসুর আহমদের অবদান কালের পরিক্রমায় অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ।

রাজনীতিবিদ আবুল মনসুর আহমদের আত্মজৈবনিক রচনা আমার দেখা রাজনীতির পঞ্চাশ বছর (প্রথম প্রকাশ : ১৯৬৮) আমাদের রাজনৈতিক-সামাজিক- সাংস্কৃতিক ইতিহাসের এক বিরাট দলিল। সাহিত্য, সাংবাদিকতা, আইন-ব্যবসা- প্রভৃতি বিচিত্র পেশার নানান অভিজ্ঞতার সমন্বয় ঘটেছে এখানে। বাস্তব- অভিজ্ঞতার আলোয় তিনি সাজিয়েছেন রাজনৈতিক ও সামাজিক ইতিহাস। বর্তমান ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে এটি একটি অবশ্য-পাঠ্য গ্রন্থ। ভারতবর্ষে ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে প্রজা-আন্দোলন, খিলাফত ও অসহযোগ-আন্দোলনসহ নানাবিধ আন্দোলন-সংগ্রাম, সাম্প্রদায়িক- চেতনা, অবিভক্ত ভারত ও পাকিস্তানে বিভিন্ন রাজনৈতিক-সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠন ও সংস্থার ক্রম-জনপ্রিয়তা, সভা-সমিতি, নিখিল ভারতের নির্বাচন, পাকিস্তান-আন্দোলন, দেশভাগ, ভাষা- আন্দোলন, পাকিস্তানের যুক্তফ্রন্ট নির্বাচন, সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা, শিক্ষা-সংকট, বাণিজ্য-বিস্তার, পূর্ব-পাকিস্তানের জনগণের প্রতি পাকিস্তান সরকারের অবিচার, স্বাধিকারের চেতনা, স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশের অভ্যুদয়, বাংলাদেশের প্রথম জাতীয় নির্বাচন, শেখ মুজিবর রহমানের রাজনৈতিক দূরদর্শিতা এবং ভ্রান্তি, পার্লামেন্টারি ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা, স্বাধীন বাংলাদেশের সংবিধান-প্রসঙ্গ – বিরাট-ব্যাপক ক্যানভান এঁকেছেন লেখক-শিল্পী এই গ্রন্থে। গ্রন্থটি সাধু ভাষারীতিতে রচিত। এই সুবৃহৎ বইটির ‘দুসরা অধ্যায়’-এর ‘ধর্ম-চেতনা বনাম রাজনীতি-চেতনা’-অংশ থেকে খানিকটা পাঠ গ্রহণ করছি :

শিক্ষকদের প্রভাব ছাত্রদের উপর অবশ্যই পড়িয়া থাকে। এক আরবী- ফারসী শিক্ষক ছাড়া আমাদের স্কুলের পঁয়ত্রিশ জন শিক্ষকের সবাই হিন্দু। এঁরা প্রকাশ্য রাজনীতি না করিলেও কথা-বার্তায় ও চালে-চলনে স্বদেশী ছিলেন। এঁদের দুই-তিন জনকে আমি খুবই ভক্তি করিতাম। এঁদের প্রভাব আমার মনের উপর ছিল অসামান্য। হঠাৎ একদিন একদল পুলিশ স্কুলে আসিয়া কয়েকজন ছাত্রকে গ্রেফতার করিয়া নিল। এদের মধ্যে দুই-চার জন আমার সুপরিচিত। তাদের জন্য খুবই চিন্তিত ও দুঃখিত হইলাম। গ্রেফতারের কারণ খুঁজিলাম। ‘রাজবন্দী’, ‘অন্তরীণ’ ইত্যাদি শব্দ এই প্রথম শুনিলাম। কানে রাজনীতির বাতাস গেল। কিছু-কিছু আন্দায করিতে পারিলাম। ইংরেজের প্রতি বিদ্বেষ বাড়িল। যুদ্ধে জার্মানির জয় কামনা করিলাম। জার্মানির পক্ষে যাইবার একটা অতিরিক্ত কারণও ছিল। জার্মানির সম্রাটের উপাধি কাইযার। হাকিমভাই নামে এক ‘সবজান্তা’ বন্ধু আমাকে বলিয়াছিলেন এটা আরবী-ফারসী কায়সার শব্দের অপভ্রংশ। শাহনামান কায়সার নিশ্চয়ই মুসলমান ছিলেন। সুতরাং জার্মান স¤্রাটও আসলে মুসলমান এমন ধারণাও আমার হইয়া গেল। মুসলমান কায়সারকে খৃষ্টানী কাইসার বানাইবার মূলে নিশ্চয়ই ইংরাজের দুষ্ট মতলব আছে। আমরা মুসলমানরা যাতে জার্মানির পক্ষে না যাই সে জন্যই এই বদমায়েশি করিয়াছে। এই অবস্থায় যেদিন শুনিলাম তুর্কির সুলতান মুসলমানদের মহামান্য খলিফা জার্মানির পক্ষে যুদ্ধে নামিয়াছেন, সেদিন এ ব্যাপারে আমার আর কোনই সন্দেহ থাকিল না। মুসলমানদের খলিফা মুসলিম বাদশা-কে সমর্থন করিবেন না? তবে কে করিবে? এর পরে সমস্ত ইচ্ছা-শক্তি দিয়া জার্মানির জয় অর্থাৎ ইংরাজের পরাজয়ের জন্য মোনাজাত করিতে লাগিলাম।

(আহমদ, ২০০২, ২০-২১)

গত শতকের বিশ ও ত্রিশের দশকে তরুণ বাঙালি মুসলমান সাহিত্যিকদের মধ্যে যে প্রগতিশীল আন্দোলন গড়ে ওঠে তার সঙ্গেই আবুল মনসুর আহমদের মন-মানসিকতার সাযুজ্য ছিল অধিক। সাহিত্য-সাধনায় তিনি ছিলেন প্রবলভাবে সমাজলগ্ন। ব্যঙ্গরচনা তাঁর প্রধান অবলম্বন। সমাজের মুখোশধারী মানুষের স্বরূপ প্রকাশে তিনি আন্তরিক শিল্পী। মূলত কথাশিল্পী তিনি- গল্প আর উপন্যাস তাঁর বিচরণের ক্ষেত্র। এছাড়া প্রবন্ধ, শিশু-কিশোরতোষ রচনা এবং আত্মজীবনী লিখেও খ্যাতি অর্জন করেছেন। সাহিত্যচর্চার জন্য ১৯৬০ সালে পেয়েছেন বাংলা একাডেমি পুরস্কার। ১৯৭৯ সালে পেয়েছেন সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় পুরস্কার স্বাধীনতা পদক। সমাজের ভেতরে দৃষ্টি প্রসারিত করে তিনি বাস্তবকে তুলে ধরতে চেষ্টা করেছেন। প্রসঙ্গত, সালভাদর দালির ডায়েরি শুরুর দিক থেকে খানিকটা বর্ণনা উদ্ধৃত করছি :

লিখবার জন্য আমি প্রথমবারের মতো পরিধান করেছি একজোড়া পেটেন্ট চামড়ার জুতো, যা অস্বাভাবিক আঁটসাঁট বলে অনেকদিন পর্যন্ত পায়ে দিতে পারিনি। সাধারণত কোনো লেকচার দেবার আগে জুতোজোড়া আমি পায়ে দেই। কেননা যেই বেদনাকীর্ণ চাপ সৃষ্টি হয় পদযুগলে, তা আমার কণ্ঠনিঃসৃত শব্দকে বাড়িয়ে দেয় অনেকাংশে। সৃষ্ট বেদনায় আমি নাইটিঙ্গেল পাখির মতো কিংবা সেইসব নিওপলিটান গায়কদের মতো গাইতে পারি, যারা পরিধান করে এমনই আঁটসাঁট জুতো। এই অন্তরযন্ত্রীয় দৈহিক আকাক্সক্ষা, এই প্রবল নিপীড়ন বাধ্য করে শব্দকোষ থেকে পরিশোধিত ও উন্নত সত্যকে বের করে আনতে। আর তাই আমি এই জুতো পরে কোনো দ্বিধা ছাড়া আত্মনিগ্রহে নিপীড়িত হয়ে লিখতে শুরু করেছি পরাবাস্তববাদী আন্দোলন থেকে বেরিয়ে আসবার পেছনের সম্পূর্ণ সত্য এক কাহিনী।

(সূত্র : কালি ও কলম, ২০০৪, ১৩৩)

 

আবুল মনসুর আহমদ লেখালেখি শুরু করেছেন বিশ শতকের বিশের দশকে। তখন সাহিত্য-শিল্পের প্রবল পরিবর্তনের সময়। কল্লোল যুগের লেখকেরা সক্রিয়, ছিল মুসলিম সাহিত্য সমাজের মুখপত্র ‘শিখা’ (১৯২৬)। সাংবাদিকতা, রাজনীতি আর লেখালেখি চলেছে সমান তালে। তবে, ষাটের দশকের দ্বিতীয়ার্ধ থেকে সত্তরের দশকের প্রায় শেষ অবধি সক্রিয় রাজনীতি থেকে স্বেচ্ছায় অবসর নিয়ে আমৃত্যু লেখালেখিতে ব্যাপৃত ছিলেন। সমকালীন বাঙালি মুসলমান সমাজের দুঃখ-দুর্দশা, অশিক্ষা-কুশিক্ষা, অনাচার- কুসংস্কার প্রভৃতি তাঁকে বিশেষভাবে আলোড়িত করেছে। কেবল ধর্মচিন্তায় নয়Ñ প্রায় সমগ্রজীবন এবং সমস্ত ভাবনা জুড়েই বর্তমান ছিল তাঁর স্বাজাত্য-প্রীতি। তিনি সমাজকে দেখেছেন ব্যক্তির অভিমত, চিন্তা আর নানান প্রবণতার ভেতর দিয়ে। তাঁর প্রথম প্রকাশিত গ্রন্থ আয়না (প্রথম প্রকাশ : ১৯৩৫) গল্পগ্রন্থের প্রথম গল্প ‘হুজুর কেবলা’র আরম্ভটি এরকম :

এমদাদ তার সবগুলি বিলাতি ফিনফিনে ধূতি, সিল্কের জামা পোড়াইয়া ফেলিল; ফেøক্সের ব্রাউন রঙের পাম্পশুগুলি বাবুর্চিখানার বঁটি দিয়া কোপাইয়া ইলশা-কাটা করিল। চশমা ও রিস্টওয়াচ মাটিতে আছড়াইয়া ভাঙ্গিয়া ফেলিল; ক্ষুর স্ট্রপ, শেভিংস্টিক ও ব্রাশ অনেকখানি রাস্তা হাঁটিয়া নদীতে ফেলিয়া দিয়া আসিল; বিলাসিতার মস্তকে কঠোর পদাঘাত করিয়া পাথর বসানো সোনার আংটিটা এক অন্ধ ভিক্ষুককে দান করিয়া এবং টুথক্রীম ও টুথব্রাশ পায়খানার টবের মধ্যে ফেলিয়া দিয়া দাঁত ঘষিতে লাগিল।

এর পরের ২টি বাক্যে লেখক জানাচ্ছেন- ‘অর্থাৎ এমদাদ অসহযোগ আন্দোলনে যোগদান করিল! সে কলেজ ছাড়িয়া দিল।’ প্রত্যেক লেখকই যে নিজের আত্মজীবনী লেখেন তাঁর সমস্ত লেখার ভেতর দিয়ে, আবুল মনসুর আহমদের এই গল্পটিও তারই নিদর্শন। গল্পের নায়ক এমদাদ। ‘কলেজে এমদাদের দর্শনে অনার্স ছিল।’ সত্যি কথাটি হলো- লেখক নিজেই ১৯২০ সালে ঢাকা কলেজে দর্শন বিষয়ে অনার্স পড়ার সময়ে অসহযোগ আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে সম্পৃক্ত হয়ে পড়েন। তিনি অনার্স ডিগ্রি সম্পন্ন করতে পারেননি- ডিগ্রি পাস কোর্সের সার্টিফিকেট অর্জন করেছিলেন ১৯২৩ সালে।

কর্মময় রাজনৈতিক জীবন মনসুরকে রাজনৈতিক বিষয়ে ব্যঙ্গ-রচনায় উদ্বুদ্ধ করেছে প্রবলভাবে। দুর্নীতিগ্রস্ত সমাজ, রাজনৈতিক নেতাদের চিন্তার অস্বচ্ছতা, টিপিক্যাল বাঙালি প্রবণতা এবং তথাকথিত সমাজসেবকদের প্রকৃত রূপ তুলে ধরার চেষ্টা করেছেন। সমকালীন সামাজিক দুর্গতি মনসুরের সমাজ-সাহিত্য ভাবনার মূল বিচরণ-ভূমি। সমাজ-রূপান্তরের কারিগরদের কাজ সত্যের সন্ধান। নামাজ-ধর্ম-পির প্রভৃতি বিষয়ে বিভিন্ন মনীষীর ভিন্ন ভিন্ন মত রয়েছে। আবুল মনসুর আহমদ আমাদের সমাজের ধর্মলগ্নতা বিষয়ে তাঁর নিজস্ব চিন্তা প্রকাশের চেষ্টা করেছেন। ধর্মীয় ফিলোসফি তাঁর রাজনৈতিক চেতনাকেও প্রভাবিত করেছে। তাঁর মুক্তবুদ্ধি, উদারচিন্তা ও সৎসাহস শিক্ষিত বাঙালি বুদ্ধিজীবীদের অহঙ্কার ও আত্মতৃপ্তিকে কিছুটা হলেও নাড়িয়ে দিয়েছে। সামাজিক প্রতারণা আর কল্যাণবিমুখতা থেকে পাঠ নিয়ে তিনি মানবিক বোধে স্নাত হতে পেরেছেন। রাষ্ট্রের অধিকাংশ মানুষ যেখানে প্রশ্নহীন- জিজ্ঞাসাবিমুখ, সেখানে তিনি সমাজসেবাকে জীবনের ব্রত ও চূড়ান্ত ধ্যান-জ্ঞান হিসেবে গ্রহণ করেছেন। রাজনীতি ছিল তাঁর মঞ্চ আর সাহিত্য ছিল অস্ত্র। তিনি উনিশ ও বিশ শতকীয় সাহিত্য-প্রবণতাকে আত্মস্থ করেছিলেন। প্রসঙ্গত, ‘উনিশ ও বিশ শতকের গোড়ার দিকে বাঙালি মুসলমানের নবজাগরণের ঊষালগ্নে সৃষ্টিমুখর সাহিত্য জাতীয় দিক-নির্দেশনা প্রদান ও আত্মপরিচয় প্রতিষ্ঠার প্রয়াসে অপরিসীম অনুপ্রেরণা জুগিয়েছিল।’ (মাহমুদ, ২০০৫, ৪) আয়না গ্রন্থটির জন্য কাজী নজরুল ইসলাম ‘আয়নার ফ্রেম’ শিরোনামে ভূমিকা লিখে দিয়েছিলেন। প্রথম প্রকাশের ওই ভূমিকার শেষাংশ এখানে উদ্ধৃত করছি :

আবুল মনসুরের ব্যঙ্গের একটা অসাধারণ বৈশিষ্ট্য এই যে, সে ব্যঙ্গ যখন হাসায় তখন হয় সে ব্যঙ্গ কিন্তু কামড়ায় যখন, তখন হয় সে সাপ; আর সে কামড় গিয়ে যার গায়ে বাজে তার মুখের ভাব হয় সাপের মুখের ব্যাঙের মত করুণ। কিন্তু সে হাসির পিছনে যে অশ্রু আছে, সে কামড়ের পিছনে যে দরদ আছে, তা যাঁরা ধরতে পারবেন, আবুল মনসুরের ব্যঙ্গের সত্যিকার রসোপলব্ধি করতে পারবেন তাঁরাই। বন্ধুবরের এই রসাঘাত কশাঘাতের মত তীব্র ও ঝাঁঝালো। কাজেই এ রসাঘাতের উদ্দেশ্য সফল হবে, এটা নিশ্চয়ই আশা করা যেতে পারে। (উৎস : আবুল মনসুর আহমদ রচনাবলী, প্রথম খণ্ড, ১৯৯৮, ৪৭১)

প্রসঙ্গত, ১৯২৬ থেকে ১৯২৯ সালের মধ্যে ‘সওগাত’ পত্রিকায় কাজ করার সময় আয়না-র গল্পগুলো প্রথম সে পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। যার মধ্যে ছিল হিন্দু ও মুসলমান সম্প্রদায়ের সাম্প্রদয়িকতা-বিষয়ক রচনা ‘ধর্ম-রাজ্য’, আর্যসন্ন্যাসীদের গো-হত্যা বন্ধের আন্দোলন-সংক্রান্ত ‘গো দেওতাকা দেশ’, ধর্মীয় ভ-ামি-বিষয়ক লেখা ‘হুজুর কেবলা’ রাজনৈতিক-সামাজিক চেতনা-সম্পৃক্ত গল্প ‘বিদ্রোহী-সংঘ’। আয়না গ্রন্থাকারে প্রকাশের অল্পকালের মধ্যেই আবুল মনসুর আহমদ বাংলা সাহিত্যে একজন শক্তিশালী ব্যঙ্গ-রচয়িতার মর্যাদা লাভ করতে সমর্থ হন। পরবর্তী গল্পগ্রন্থ ফুড কন্ফারেন্স (প্রথম প্রকাশ: ১৯৪৪)-এর রচনাগুলো ১৯৩১ থেকে ১৯৩৭ সময়কালে রচিত। তৎকালীন শেরে বাংলার মন্ত্রিসভার আমলকে এই গ্রন্থের গল্পগুলোর স্যাটায়ার স্পর্শ করেছিল বলে মনে করা হয়। বিশেষ করে নামগল্পসহ ‘সায়েন্টিফিক বিযিনেস’ ও ‘জনসেবা ইউনিভার্সিটি’ বেশ সাড়া জাগানো কাহিনি। দুঃশাসন, দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতির প্রতিবাদে প্রবলকণ্ঠ এইসব রচনা। ‘ফুড কন্ফারেন্স’ গল্পের কিছু অংশ তুলে ধরা যেতে পারে :

দেশে হাহাকার পড়েছে; কারণ নাকি খোরাকির অভাব। সে হাহাকার অবশ্যি ভদ্রলোকেরা শুনতে পাননি; ভাগ্যিস অভুক্ত হতভাগ্যদের গলায় চিৎকার করে কাঁদবার শক্তি নেই।… অভুক্ত কঙ্কারসার আধ-ল্যাংটা হাজার হাজার নর-নারী প্রাসাদশোভিত রাজধানীর রাস্তঘাটে কাতার করছে। তাতে রাস্তায় সৌন্দর্য নষ্ট হচ্ছে। এইসব রাস্তায় আগে-আগে গাউন শাড়িপরা পরীর ভিড় হতো। আর আজ কিনা সেখানে অসুন্দর অসভ্য কুৎসিত অর্ধোলঙ্গ স্ত্রীলোকেরা ভিড় করছে! কি অন্যায়!… গ্র্যান্ডহোটেলে ফুড কমিটির বৈঠক। শেরে-বাংলা মহিষে-বাংলা সিংগীয়ে-বাংলা টাটুয়ে-বাংলা গাধায়ে -বাংলা কুত্তায়ে-বাংলা পাঁঠায়ে-বাংলা বিল্লিয়ে-বাংলা শিয়ালে-বাংলা প্রভৃতি নেতৃস্থানীয় সমস্ত বাঙালিই ফুড কমিটির সদস্য মনোনীত হয়েছেন। মন্ত্রীরা এক্স অফিসিও মেম্বার। তাঁরা অবশ্য কমিটির মেম্বর হিসেবে আর মাইনে পাবেন না; তবে মিটিং-এ হাজির হওয়ার জন্য ফিস্ পাবেন। সদস্যের মধ্যে শেরে-বাংলার ভাগ্নের সংখ্যাই বেশি। কিন্তু তাতে কারুর আপত্তি করার উপায় নেই; শেরে-বাংলার সঙ্গে চুক্তি হয়েছে সেই শর্তেই। আর খোদ শেরে-বাংলা বলেন, শেরে বাংলার ভাগ্নে হলে ব্রিলিয়েন্ট হতেই হবে, যথা, শিয়ালে-বাংলা। (আবুল মনসুর আহমদ রচনাবলী, প্রথম খ-, ১৯৯৮, ৮৭-৯০)

প্রায়শই আমরা খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনের কথা বলি। কিন্তু সেই ব্রিটিশ ভারত থেকে স্বাধীন বাংলাদেশ পর্যন্ত আজ অবধি বিদেশের পণ্যের ওপর আমাদের নির্ভরতা রয়েছে বহাল-তবিয়তে। এই নির্ভরতা, পণ্য-উৎপাদন, বাজার- অর্থনীতি- এসবের পিছনের কথা আবুল মনসুর তুলে ধরেছেন তাঁর ‘গ্রো মোর ফুড’ গল্পের ক্যানভাসে। তিনি লিখেছেন :

ভারতবর্ষ দেশটা ছিল বরবারই উর্বর। এ দেশের মাটিও ছিল আগে থেকেই খুব লায়েক। আমরা ইচ্ছা করলেই বে-এন্তেহা ফসল আবাদ করতে পারতাম। কিন্তু আমরা এতদিন ইচ্ছেই করিনি। ইচ্ছেটা আমাদের হলো না দুটো কারণে। প্রথমত বেশি ফসল আবাদ করার দরকার ছিল না; দ্বিতীয়ত বেশি রকম ফসল আবাদ করা আইনসঙ্গত ছিল না। দরকার ছিল না এই জন্য যে, এদেশে বেশি ফসল হলে বিদেশ থেকে আমদানি বন্ধ হয়ে যেতো। এটা ঠিক হতো না, কারণ ভারতবর্ষ ধলা আদমিদের মার্কেট- বাংলা ভাষায় যাকে বলা হয় বাজার। বাজারটা হচ্ছে গিয়ে বেচাকেনার জায়গা। বাজারে ফসল আবাদ হয় কে, কবে শুনেছেন! ভদ্দরলোকদের সুবিধের জন্য ধানক্ষেত ভেঙ্গে বাজার বসানো নতুনও নয়, অন্যায়ও নয়। অতএব ভারতবর্ষ স্বভাবতই এবং আইনানুসারেই ভাল মানুষদের বাজার হয়েই থাকলো- চাষা-ভুষোদের আবাদের ক্ষেত হতে পারলো না। (আবুল মনসুর আহমদ রচনাবলী, প্রথম খ-, ১৩৮-১৩৯)

আবুল মনসুর জানতেন ‘রেসপনসিবিলিটি উইদাউট রাইট’ এবং ‘রাইট উইদাউট পাওয়ার’ অসম্ভব।- অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য দায়িত্ব আর দায়িত্ব পালনের নিমিত্ত ক্ষমতা- এই দর্শনের ওপরেই যে আমাদের দেশের রাজনীতি দাঁড়িয়ে গেছে, সেই সত্য অনুধাবন করতে সমর্থ হয়েছিলেন তিনি। এদেশে স্থানীয় সরকার যে দুর্বল, মন্ত্রীরা যে ক্ষমতাহীন, আর ‘প্রাদেশিক স্বায়ত্তশাসন একটা ধোঁকাবাজি’ তা অবলীলায় বলতেও পেরেছেন মনসুর। বাঙালি জাতীয়তাবাদ, বাঙালির ভাষা ও সংস্কৃতি-সম্বন্ধে তিনি সতর্ক সৈনিক। চিন্তায়, কাজে, বক্তৃতায় সরব ছিলেন বাংলা ভাষার মর্যাদা প্রতিষ্ঠার দাবিতে। আর বাঙালির সাহিত্যের ভাষাও যে বাংলা হওয়াই উচিত, সে বিষয়ে তিনি ছিলেন সোচ্চার।

বাংলা সাহিত্যে আবুল মনসুর আহমদের যে খ্যাতি তা মূলত ব্যঙ্গ রচনার জন্য। তবে উপন্যাস, প্রবন্ধ-নিবন্ধ ও স্মৃতিচারণমূলক রচনায় তিনি যে কৃতিত্বের ছাপ রেখেছেন তাও অতুলনীয়। গতানুগতিক ধারা পরিহার করে তিনি প্রবন্ধ-নিবন্ধে রেখেছেন মৌলিক চিন্তার পরিচয়। বিশ শতকের সমাজ সংস্কার ও শোধনের বিষয়টি ঘুরে-ফিরে এসেছে তাঁর রচনায়। চারপাশের যাপিতজীবনের চালচিত্রে যে সঙ্গতি-অসঙ্গতি তা সাহিত্যে ফুটিয়ে তোলার সাথে সাথে তিনি মুখোশ উন্মোচন করেছেন সেই সব ছদ্মবেশী ভ-দের যারা আমাদের সমাজে দিব্যি ভালো মানুষটি সেজে সাধারণ মানুষকে বোকা পেয়ে ধোকা দিচ্ছে।’ (একুশের প্রবন্ধ, ২০০৯, ১৩৩)

বিশ শতকের প্রথমার্ধের আর্থ- সামাজিক-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে বাঙালি মুসলিম জীবনের নিবিড় পর্যবেক্ষক ছিলেন আবুল মনসুর। রাজনীতির হালচাল, অর্থনীতির নাজুক দশা, খাদ্যাভাব ও দুর্ভিক্ষ, বিশ্বযুদ্ধ, ভাষা-আন্দোলন প্রভৃতির ন্বরূপ রূপায়নে এবং সঠিক দিক-নির্দেশনায় তিনি সমকালের সতর্ক শিল্পী। তাঁর কলমের সাধনা উত্তরকালেও সম্প্রসারিত। দেশ-বিভাগের আশাবাদ এবং পরবর্তীকালে সৃষ্ট হতাশা তাঁর সাহিত্যের উপাদান হয়ে উঠেছে অনিবার্যভাবে। গ্রাম্য দলাদলি, আইনের শাসন-প্রতিষ্ঠায় দুর্বলতা, ধর্ম-ব্যবসা ও কুসংস্কারকে তিনি সাহিত্যে স্থান দিয়েছেন পরম মমতায়। জোহান বোয়ার-এর দ্য পাওয়ার অব লাইফ গ্রন্থের বাংলা রূপান্তর সত্যমিথ্যা (প্রকাশকাল : ১৯৫০) আবুল মনসুর আহমদের প্রথম উপন্যাস। এর বিষয় সমকালীন সমাজ ও রূপান্তরের চিন্তা। পরবর্তী উপন্যাস জীবনক্ষুধা (প্রকাশকাল : ১৯৫৫) এবং আবেহায়াত (প্রকাশকাল : ১৯৬৮)-তে স্থান পেয়েছে রাজনীতির ক্রম-বিকাশ আর প্রচলিত জীবনধারার বিবরণ ও প্রত্যাশিত পরিবর্তনের প্রবল আশাবাদ। মূলত সমকালীন রাজনৈতিক-সামাজিক সংকটকেই তিনি চিহ্নিত করতে চেষ্টা করেছেন চিন্তা-প্রকাশ-প্রচেষ্টার মধ্য দিয়ে। এই প্রসঙ্গে সাহিত্যিক ও দার্শনিক আহমদ ছফার একটি মন্তব্য উদ্ধৃত করছি :

ইতালীয় দার্শনিক বেনেদিত্তো ক্রোচের মতে প্রতিটি জাতির এমন কতিপয় সামাজিক আবেগ আছে যার মধ্যে জাতিগত বৈশিষ্ট্যসমূহ নির্যাসের আকারে পুরোমাত্রায় বিরাজমান থাকে, রাজনৈতিক পরাধীনতার সময়ে সে আবেগ সাপের মতো কুণ্ডলী পাকিয়ে ঘুমিয়ে থাকে এবং কোনো রাজনৈতিক এবং সামাজিক মুক্তির দ্বারপ্রান্তে উপস্থিত হলে সে আবেগই ফণা মেলে হুঙ্কার দিয়ে ওঠে। সাহিত্যেই প্রথমে এই জাতিগত আকাক্সক্ষার রূপায়ণ ঘটতে থাকে। জাতিগত আকাক্সক্ষার সঙ্গে যুক্ত হতে না পারলে কোনো মহৎ সাহিত্য যে সৃষ্টি হতে পারে না, একথা বলাই বাহুল্য।’ (সূত্র : ছফা, ১৯৯৬, ১৯)

স্কুলের সিলেবাসে থাকার কারণে বাংলাদেশে আবুল মনসুর আহমদের ‘রিলিফ ওয়ার্ক’ গল্পটি বেশ পরিচিত। এই গল্পে সামাজিক দুর্নীতি আর অমানবিকতার বাস্তবচিত্র অঙ্কনে লেখকের সাফল্য ঈর্ষণীয়। বিজ্ঞানী আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায়ের ‘ধর্মের জন্য ব্যবসা’, ‘সেবার জন্য ব্যবসা’, ‘দেশপ্রেমের জন্য ব্যবসা’, ‘কৃষ্টি-সভ্যতা ও মানবতার জন্য ব্যবসা’-র আধ্যাত্মিক রূপায়ণের পরিকল্পনার পরিণতিকে বিষয় করে আবুল মনসুরের লেখা ‘সায়েন্টিফিক বিযিনেস’ বর্তমান বিশ্বে সামাজিক ব্যবসা বা সোশ্যাল বিজনেস-এর প্রাক-ধারণা বলে ধরে নেয়া যেতে পারে। বাঙালির কেরানি চাকরিপ্রীতি দূর করে তেজারতি বা ব্যবসাবাণিজ্য বিস্তার যে সমাজ-সভ্যতার জন্য কল্যাণকর, তা সমাজ-রূপান্তরের কারিগর আবুল মনসুর উপলব্ধি করতে পেরেছিলেন। তাঁর ‘আদুভাই’তো বাংলাসাহিত্যে খুব জনপ্রিয় এবং সুপরিচিত গল্প। বিদ্যালয়ের ছেলেমেয়েরা আদুভাইয়ের নাম শোনেনি, এমন নজির বিরলপ্রায়। আমাদের শিক্ষা-ব্যবস্থা, শিক্ষা-সংস্কার আর চিন্তাভুবনে প্রবলভাবে নাড়া-দেওয়া এই গল্পটির ভাবার্থ অনুধাবন করা সত্যিই দুঃসাধ্য। পিছিয়ে পড়া এই সমাজে শিক্ষা যে আজও আমাদের চেতনাকে জাগ্রত করতে পারেনি, শিক্ষা যে সাংস্কৃতিক বিপ্লব সৃষ্টি করতে পারেনি, তা বোধকরি ঢোল পিটিয়ে বলার প্রয়োজন নেই। শিক্ষা এবং ভাষা-সংস্কৃতি প্রসঙ্গে আবুল মনসুর আহমদের চিন্তা নানানভাবে বাঙালি বিদ্বৎসমাজকে প্রভাবিত করে। ইতিবাচক-নেতিবাচক প্রতিক্রিয়াও ব্যক্ত করেছেন কেউ কেউ। তাঁর ভাষা- সংস্কার-চিন্তা বিষয়ে প্রখ্যাত কথাশিল্পী হাসান আজিজুল হক মন্তব্য করেছেন :

আবুল মনসুর আহমদ এক সময় আমাদের লেখ্য বাংলা ভাষাটিকে দেশজ অনন্যতা দেবার যুক্তিতে কিছু পরিবর্তনের প্রস্তাব এনেছিলেন। নে-সব প্রস্তাবের সামান্যই ছিল ভাষাবিষয়ক; ধর্মীয় সাংস্কৃতিক ও আঞ্চলিক বিবেচনাই তাঁর মন দখল করে ছিল বেশি। ভাষার প্রমিত রূপটি অক্ষত রেখেই যে ধর্মীয়, সাংস্কৃতিক, এমন কি আঞ্চলিক বৈশিষ্ট্য ভাষাদেহে সংস্থিত করা সম্ভব, এ কথা তাঁর মনেই হয়নি। (অপ্রকাশের ভার, রচনাসমগ্র, ৪র্থ খ-, ২০০৩, ১৬৯)

আবুল মনসুর আহমদের স্যাটায়ার, ক্রিয়েটিভ রচনা ও নিবন্ধে সমকালীন অবিভক্ত বাংলা ও পূর্ব-পাকিস্তানের রাজনৈতিক, সামাজিক প্রতিবেশের বিশেষত, মুসলমান মধ্যবিত্ত সমাজের বিকাশের ক্রমধারার ছবি লিপিবদ্ধ হয়ে আছে। আর আত্মজৈবনিক বচনে রয়েছে অবিভক্ত ভারত, পূর্ব-পাকিস্তান ও বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক সংঘাতের পরিচয়। সমাজ-রূপান্তরের ক্রমধারায় তিনি অনন্য এক কারিগর। তিনি ‘তাঁর রাজনৈতিক, সাংবাদিক ও সাহিত্যজীবনে বাংলার নতুন মধ্যবিত্ত শ্রেণীর একজন সচেতন প্রতিনিধিরূপে সর্বদা সমাজের মূলস্রোত বা ধারার অন্তর্গত ছিলেন। তিনি বামপন্থী রাজনীতিক ও বৃদ্ধিজীবীদের মতো সমাজের বাইরে অবস্থান করে সমাজকে ব্যঙ্গবিদ্রুপ বা নসিহত করার চেষ্টা করেননি।’ (রফিকুল ইসলাম, ভূমিকা, আবুল মনসুর আহমদ রচনাবলী, প্রথম খণ্ড) কবি-কথাশিল্পী, সাহিত্য-সমালোচক ও সাহিত্য-সম্পাদক বুদ্ধদেব বসুর ‘সাহিত্যে পাকিস্তান অসম্ভব’ শীর্ষক একটি প্রকাশিত নিবন্ধের প্রতিক্রিয়া-ব্যক্ত- করার-প্রসঙ্গে ১৯৪২ সালের ১ নভেম্বর ‘পাকিস্তান রেনেসাঁ সভা’য় আবুল মনসুর আহমদ ‘সাহিত্যে সাংস্কৃতিক স্বাতন্ত্র্য’ শিরোনামে একটি রচনা পাঠ করেন। বক্তব্যের বিষয় এবং পরিবেশনের ঢঙে লেখাটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। নিবন্ধটির এক-অংশে তিনি বলেন :

সাহিত্য মানব-জীবন হইতে বিচ্ছিন্ন একটা হাওয়াই জিনিস নয় এবং মানব-জীবনকেও রাজনীতি হইতে বিচ্ছিন্ন করা অসম্ভব। সুতরাং সাহিত্যের সঙ্গে রাজনীতি অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। বুদ্ধদেব বাবুর উপন্যাসে স্বীকৃত না হইলেও, তাঁর নিজের জীবনেরই প্রতি পরতে পরতে এটা তিনি দেখিতে পাইবেন যে, যৌন-ক্ষুধার চেয়ে মানুষের পেটের ক্ষুধা কম শক্তিশালী অনুভূতি নয়। অপরের বিয়ে করা বউয়ের প্রতি লোভ হওয়ার নামকে ‘প্রেম’ আখ্যা দিলে অপরের অনাবশ্যক ধনের প্রতি লোভ হওয়াটাকেও কিছুতেই ‘অপ্রেম’ আখ্যা দেওয়া যায় না। দুনিয়ার হাজার মেয়ে মানুষ পড়িয়া থাকিতে একজনের বউ চুরি করিয়া লইয়া যাওয়াকেই আমরা আর্টের রূপ দিতেছি। অথচ দরিদ্রদের ক্ষুধার অন্ন কাড়িয়া-নেওয়া ধনস্তূপের দিকে যদি অন্নহীনেরা বেআইনীভাবে একটু হাত বাড়ায় তবে আমরা তাকে ঘৃণা করিতেছি। এ-ব্যবস্থার প্রতিবাদকে বাঙলার লেখক সমাজ রাজনৈতিক আবর্জনা ও আর্ট-বিরোধী পার্থিব ব্যাপার বলিয়াই আসিতেছেন। স্বয়ং বুদ্ধদেব বাবু এই আর্টবাদীদের গ-ি হইতে ‘স্বতন্ত্র’ হইবার চেষ্টা করিতেছেন বলিয়াই বোধ হয়। তাই তিনি রাজনীতি হইতে মুক্ত নন। এটা ভালো কথা। এইখানেই বুদ্ধদেব বাবু আমাদের নমস্য।

(উৎস : পূর্ব বাংলার ভাষা, ২০০৪, ১১)

বিশ শতকের প্রায় পুরো অংশের রাজনৈতিক-সামাজিক তরঙ্গক্ষুদ্ধ ঘটনাপ্রবাহের কালদ্রষ্টা আবুল মনসুর আহমদ। ১৯২০ থেকে ১৯৭৯- প্রায় ৬০ বছরের ঘটনা-নির্যাস নিংড়ে-নিংড়ে তিনি বিশ্লেষণ করেছেন সাহিত্যে, আত্মজীবনীতে। যাপিতজীবনের চালচিত্র উপস্থাপনে তাঁর রচনায় কোনোরকম কৃত্রিমতার প্রলেপ নেই। কখনো গল্পের খ-ছবিতে, কখনো উপন্যাসের বিরাট ক্যানভাসে, কখনো মননশীল রচনায় কিংবা বক্তব্যের প্রৌঢ়-ভঙ্গিতে সমাজকে তুলে এনেছেন পাঠক-শ্রোতার সামনে। বর্ণাঢ্য রাজনৈতিক জীবনের বিচিত্র বাঁক-পরিবর্তনেও তিনি সাহিত্যচর্চা থেকে দূরে সরে যাননি। নিরন্তর সাধকের মতো কাজ করেছেন। সাহিত্যকে গ্রহণ ও প্রতিপালন করেছেন কৃষ্টির আত্মনিয়ন্ত্রণ ও আত্মবিকাশের লীলাভূমি হিসেবে। আর উত্তরকালের প্রজন্মের জন্য রেখে গেছেন চিন্তার কিছু উপাদান এবং বিচরণের খানিক খোলা বারান্দা।

 

তথ্য-উপাদান সূত্র

১।           হায়াৎ মামুদ (সম্পাদিত), নোবেল-ভাষণ : বাক্ থেকে পামুক (পাঁচ মহাদেশের দশ সাহিত্যরথী), প্রথম প্রকাশ: একুশে বইমেলা ২০০৮, ইত্যাদি গ্রন্থ প্রকাশ, ঢাকা।

২।            সেলিনা হোসেন, নূরুল ইসলাম (সম্পাদিত), চরিতাভিধান, পরিমার্জিত ও পরিবর্ধিত দ্বিতীয় সংস্করণ, প্রকাশকাল : ফেব্রুয়ারি ১৯৯৭, বাংলা একাডেমি, ঢাকা।

৩।          আশরাফুল হক রাজিব, কাজল ঘোষ, অনন্যা রুমা (সম্পাদিত) হাজার বছরের সেরা বাঙালি, প্রথম প্রকাশ: বইমেলা ২০০০, অনন্যা, ঢাকা।

৪।           বাংলাপিডিয়া (ন্যাশনাল এনসাইক্লো- পিডিয়া অব বাংলাদেশ); http://www. banglapedia.org/HT/A_0120.htm

৫।           আবুল মনসুর আহমদ, আমার দেখা রাজনীতির পঞ্চাশ বছর, দশম সংস্করণ জুলাই ২০০২, খোশরোজ কিতাব মহল, ঢাকা।

৬।          সালভাদর দালি, ডায়েরি অব আ জিনিয়াস, সৃষ্টি পাবলিশার্স অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউটরস, নিউ দিল্লি। সূত্র : কালি ও কলম (আবুল হাসনাত সম্পাদিত), প্রথম বর্ষ : পঞ্চম সংখ্যা, জুন ২০০৪, ঢাকা।

৭।            আবুল মনসুর আহমদ, আয়না, চতুর্দশ মুদ্রণ জানুয়ারি ২০০৭, আহমদ পাবলিশিং হাউস, ঢাকা।

৮।          হোসেন মাহমুদ, বাঙালি মুসলমানের আলোকবর্তিকা ও অন্যান্য প্রবন্ধ, প্রকাশকাল : জুন ২০০৫, ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ, ঢাকা।

৯।           আবুল মনসুর আহমদ রচনাবলী, প্রথম খ- (রফিকুল ইসলাম সম্পাদিত), প্রথম প্রকাশ : জুন ১৯৯৮, বাংলা একাডেমি, ঢাকা।

১০।        মুহম্মদ মতিউর রহমান, বাংলা সাহিত্যে মুসলিম ঐতিহ্য, প্রথমপ্রকাশ: ফেব্রুয়ারি ২০০২, বাংলাদেশ ইসলামিক সেন্টার, ঢাকা।

১১।         আবুল মনসুর আহমদ, বাংলাদেশের কালচার, পরিমার্জিত দ্বিতীয় মুদ্রণ ১৯৭৬, আহমদ পাবলিশিং হাউস, ঢাকা।

১২।         ড. সৈয়দ মোহাম্মদ শাহেদ (প্রধান সম্পাদক), একুশের প্রবন্ধ ২০০৬, প্রথম প্রকাশ : জানুয়ারি ২০০৯, বাংলা একাডেমি, ঢাকা।

১৩।        আহমদ ছফা, বাঙালি মুসলমানের মন, দ্বিতীয় প্রকাশ ফেব্রুয়ারি ১৯৯৬, বুক পয়েন্ট, ঢাকা।

১৪।         হাসান আজিজুল হক, ‘প্রমিত বাংলা ভাষা’, অপ্রকাশের ভার, হাসান আজিজুল হক রনাচাসমগ্র, ৪র্থ খ-, প্রকাশকাল : ২০০৩, সাহিত্যিকী, ঢাকা।

১৫।        এবাদুর রহমান ও অন্যান্য (সম্পাদিত), পূর্ব বাংলার ভাষা, প্রকাশকাল : ২০০৪, ঢাকা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

shares