বইকথা

একটি জনপদের মর্মানুসন্ধান

হামীম কামরুল হক

 

একটি অঞ্চলের ভূগোল, জনগোষ্ঠী, ইতিহাস, প্রাতিষ্ঠানিক ও অপ্রাতিষ্ঠানিকচর্চার কথা নিবিড়ভাবে জানাটা যেকোনো বিবেচনায় কৃতিত্বের বিষয়। এই কাজটি করতে পারলে কেউ লিখতে পারেন একটি প্রামাণ্য আঞ্চলিক ইতিহাস, যা হয়ে উঠতে পারে সৃজনশীল সাহিত্যচেতনার মৌল মালমশলা, কেউ এখান থেকে উপাদান উপকরণ নিয়ে লিখতে পারেন উপন্যাসও। সুরঞ্জন রায় নড়াইলের কালিয়া নিয়ে দীর্ঘদিনের গবেষণায় লিখেছেন একটি ইতিহাসের বই। তাঁর মতো একটি অঞ্চল নিয়ে এমন গবেষণার পর উপন্যাস না লিখে উপায় থাকত না আমার। ছোটবেলা থেকেই শহরতলী ও শহর অঞ্চলেই বেড়ে উঠেছি। গ্রামের একটু আধটু যে ছোঁয়া পাইনি তা নয়, কিন্তু গ্রামকে ভেতর থেকে দেখার সৌভাগ্য আমার হয়নি, কিন্তু কোনো বই পড়ার ভেতর দিয়ে যে এতটা কাছাকাছি যাওয়া যায়, সেটি নতুন করে টের পেলাম সুরঞ্জন রায়ের লেখা ‘কালিয়া জনপদের ইতিহাস’ বইটি পড়তে পড়তে।  সম্প্রতি এই বইটি প্রকাশিত হয়েছে র‌্যামন পাবলির্শাস, ঢাকা থেকে।

আমরা ‘মাটির গুণ’ বলে একটি কথা শুনে থাকি। আসলে তো তা সেখানকার মানুষের গুণ। কালিয়ায় এমন সব মানুষ জন্মেছিলেন, যারা সেই সময়ের তো বটেই সারা পৃথিবীর ইতিহাসে স্মরণীয়-বরণীয় হয়ে আছেন। সুরঞ্জন রায় খুলনার দাকোপ উপজেলার মানুষ। কিন্তু তার কর্মময় জীবনের বড় অংশটাই পার হচ্ছে নড়াইল জেলার কালিয়া উপজেলার শহীদ আব্দুস সেলিম ডিগ্রী কলেজে বাংলা বিভাগে অধ্যাপনায়। তিনি তাঁর অগ্রজ সহকর্মী সত্যেন্দ্রনাথ কুণ্ডুর কাছে থেকে একটু একটু করে এই অঞ্চলের ইতিহাস জানতে শুরু করেন। মূলত সত্যেন্দ্রনাথবাবুর কাছ থেকে এই এলাকার সতেরোজন আই.সি.এস-এর প্রসঙ্গই তাঁর কৌতূহল বাড়িয়ে দেয়। আর সেই কৌতূহলের পথে পা দিয়ে তিনি রওন হন আঞ্চলিক ইতিহাসচর্চার একটি মহাসড়কে। আর সেই সূত্রে রচনা করলেন এই গ্রন্থ, আর আমাদের নিয়ে গেলেন একটি জনপদের মর্মমূলে।

কৃতজ্ঞতাস্বীকার ও ভূমিকার পর ১৭টি অধ্যায়, ৫টি পরিশিষ্ট এবং শেষে কালিয়া জনপদের বিশিষ্টজন ও স্থাপত্য নিদর্শনের প্রায় কুড়ি পৃষ্ঠা চাররঙা আলোকচিত্র সম্বলিত এই গ্রন্থটি এক দিক থেকে বিন্দুতে সিন্ধু দেখার আয়োজন।  নিঃসন্দেহে কালিয়া একটি প্রসিদ্ধ জনপদ, কিন্তু এমন না হলেও কাছাকাছি যাওয়ার মতো অনেক এলাকা আছে এই দেশে, আছে অখ্যাত অনেক এলাকাও, সেই এলাকাগুলিকে কালিয়ার সঙ্গে তুলনা করলে সহজেই জানা যেতে পারে- সেখানে কী ছিল আর কী আছে- তার হদিস।

প্রথম অধ্যায়ে সুরঞ্জন রায় কালিয়ার ভৌগোলিক অবস্থান, নামকরণের কথা জানানোর পাশাপাশি এই এলাকার বৈদ্যসম্প্রদায়ের মানুষদের বিশেষ পরিচয় দিয়েছেন। সেন, সেনগুপ্ত, দাশগুপ্ত পদবির বেশ কিছু মানুষের কর্মদক্ষতার সুবাদে কালিয়ার সুনাম ছড়িয়ে পড়েছিল সারা উপমহাদেশে। দ্বিতীয় অধ্যায়ের কালিয়ার সমাজ, সংস্কৃতির অতীত বর্তমান তুলে এনেছেন। এলাকায় বিভিন্ন সম্প্রদায়ের ধর্মীয় উৎসব আয়োজনের বর্ণনা যেমন এসেছে, তেমন এসেছে তাদের মধ্যেকার দ্বন্দ্ববিবাদের কাহিনি। তৃতীয় অধ্যায়ে এই জনপদের নৃতাত্ত্বিক পরিচয়, বিশেষ করে রাজবংশী, বৈদ্যসমাজ, ব্রাহ্মণশ্রেণি, কায়স্থ, ঘোষসম্প্রদায়, মাহিষ্য সম্প্রদায়, পরামাণিক, স্বর্ণকার, সূত্রধর, পাল সম্প্রদায়, নমঃশূদ্র, চণ্ডাল, চন্দাল, রজক, ধোপা ঋষি সম্প্রদায়ের উৎপত্তি, লোকাচার ও বর্তমান অবস্থা তুলে ধরেছেন। মুসলিম সমাজের কথাও বলেছেন গুরুত্বের সঙ্গে। চতুর্থ অধ্যায়ে এসেছে জনপদের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের কথা। কালিয়া জনপদের এগিয়ে যাওয়ার পেছনে কাজ করছে শিক্ষা ও জ্ঞানার্জনে এই জনপদের মানুষদের বিপুল উৎসাহ ও উদ্দীপনার প্রবণতা। সেখানে এরই সূত্রে গড়ে উঠেছে নানান প্রতিষ্ঠান, স্কুল, কলেজ, লাইব্রেরি, নানান মত ও পথের বিচিত্র সব সামাজিক সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান। চতুর্থ ও পঞ্চম অধ্যায় দুটিতে এসবের বিস্তৃত পরিচয় দিয়েছেন সুরঞ্জন রায়। ষষ্ঠ অধ্যায়ে এসেছে এই এলাকার ঘরবাড়ির কথা। কালিয়ার সাংবাদিক ও প্রকাশিত সাহিত্য সাময়িকীর পরিচয় পাওয়া যাবে সপ্তম অধ্যায়ে। ধর্মীয়, সামাজিক, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের নিবিড় পরিচয় মিলবে অষ্টম অধ্যায়ে। নবম অধ্যায়ে জনপদের বিশিষ্ট ব্যক্তিদের কথা আলাদাভাবে এনেছেন লেখক। বিশেষ করে বড় কালিয়া, রামনগর, ছোটকালিয়া ও মির্জাপুর, বেন্দা ও চাঁদপুর গ্রামের নামিদামি মানুষদের কীর্তিগাথা হয়ে উঠেছে এই অধ্যায়টি। কালিয়া সংগীত, নৃত্যগীতে, যাত্রাশিল্পে, অভিনয়কলাচর্চায়ও অত্যন্ত বিখ্যাত এলাকা ছিল। এই উপমহাদেশের অসামান্য সুরকার কমল দাশগুপ্ত, বিশ্ববন্দিত সেতারবাদক রবিশঙ্কর, ভারতখ্যাত নৃত্যশীল্পি উদয়শঙ্করের নাম এর ভেতরে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য। একাদশ অধ্যায়ে এসেছে কালিয়ার লেখক, কবি ও গবেষকদের কথা। উমেশচন্দ্র বিদ্যারত্ন থেকে সাম্প্রতিককালের লেখক শেখ তাসলিমা মুনের কথা এসেছে এখানে। কালিয়া জনপদের বিভিন্ন উপলক্ষে হাজির হয়েছেন খ্যাতনাম অসংখ্য মানুষ, তাঁদের কথা আছে দ্বাদশ অধ্যায়ে। ত্রয়োদশ অধ্যায়ের এসেছে কালিদা-বেন্দা প্রীতি সম্মেলনের কথা। চতুর্দশ অধ্যায়ে কালিয়া ইউনিয়ন পরিষদ, পৌরসভা ও উপজেলা পরিষদের বিবর্তনের কথাসহ নানান সময়ে এর গুরুত্বপূর্ণ পদে থেকে ভূমিকা পালন করা মানুষদের কথা এসেছে। পঞ্চদশ অধ্যায়টিতে এসেছে কালিয়া জনপদের রাজনৈতিক চেতনা, ভোট ও এ অঞ্চলের রাজনীতিবিদদের কথা। ষোড়শ অধ্যায়টি মুক্তিযুদ্ধে কালিয়ার গৌরবোজ্জ্বল ভূমিকার কথা বলেছেন লেখক। দেশভাগ ও দেশত্যাগের মর্মান্তিক কাহিনিমালা লেখা হয়েছে সপ্তদশ অধ্যায়। সূচিপত্রে এই অধ্যায় দুটোর পৃষ্ঠানির্দেশ ঠিক নেই, অধ্যায় দুটো উলটাপালটা হয়েছে, ষোড়শ হয়েছে সপ্তদশ, আর সপ্তদশ হয়েছে ষোড়শ। এই ত্রুটিটি সহজেরই এড়ানো যেত।

বইটির পাঁচটি পরিশিষ্টের দুটোতে ভামিনীরঞ্জনের বাড়ির ন্যাসপত্র ও তাঁর বাড়ি থেকে থানা অপসারণের কথা। পরিশিষ্ট তিনে কালিয়ায় কলেজ প্রতিষ্ঠাকে কেন্দ্র করে পত্রিকায় প্রকাশিত চিঠি, পরিশিষ্ট চারে গ্রন্থপঞ্জি ও পাঁচে সাক্ষাৎকার প্রদানকারীদের তালিকা দিয়েছেন সুরঞ্জন। বলাবাহুল্য এমন একটি বইতে নির্ঘণ্ট বড়ই জরুরি ছিল। যদিও সুরঞ্জন রায় বইটির বিন্যাস এমনভাবে করেছেন, যাতে কোনো ব্যক্তি প্রতিষ্ঠানের নাম ও পরিচয় পেতে খুব একটা বেগ পেতে হয় না। তবুও এটি যেহেতু একটি গবেষণামূলক ও আঞ্চলিক ইতিহাসের গ্রন্থ, এতে নির্ঘণ্ট থাকাটাই স্বাভাবিক ছিল। তাতে বইটির আরও ব্যবহারযোগ্য হতে পারত। আশা করি এর পরের সংস্করণে সেটি করা হবে।

কালিয়া জনপদের সূত্রে ভারতবর্ষে মানুষের ধর্মকর্ম, জাতিগোষ্ঠীর বিবর্তনের পরিচয় পাওয়া যায়। তিনি একজায়গা লিখেছেন, ‘‘একসময় হিন্দু জনগোষ্ঠীর কৌলিন্য নির্ভর করত জন্মের ওপর। আধুনিককালে তা পরিবর্তিত হয়ে দাঁড়াল অর্জিত বস্তুতে। অর্থাৎ Born-status পরিণত হলো Achieved-status-এ।’’ তিনি এরই সমর্থনে লিখেছেন,‘‘কালিয়ার মানুষেরা, বিশেষত বৈদ্য সম্প্রদায়ের মানুষেরা, ব্রিটিশ আমলে ইংরেজি ও মোগল আমলে ফারসি ভাষা শিক্ষার মাধ্যমে উচ্চশিক্ষা অর্জনের সাহায্যে তাদের জন্মগত পেশা চিকিৎসা বৃত্তি পরিহার করে অন্য যে-কোনো অর্জিত পেশা গ্রহণে আগ্রহী হয়ে ওঠে। তাদের পূর্বপুরুষদের কেউ কেউ মোগল ও নবাব দরবারে লিপিকর বা কেরানি বা খাজনা গ্রহণকারীর কাজ করতেন। এ-সব পরিবারে ছিল বিদ্যাশিক্ষার ঐতিহ্য। সংখ্যায় কম হলেও, কালিয়ার বৈদ্যসমাজ শুধু বঙ্গদেশে নয়, তৎকালীন ভারতবর্ষে  একটি বিশেষ পর্যায়ে উন্নীত হতে পেরেছিল।’’

সুরঞ্জন রায় লিখেছেন জনপদের ইতিহাস, প্রসঙ্গ জনপদের মানুষেরা এখানে এসেই পড়েছে। আমরা দেখেছি বিচিত্র সব চরিত্রের সমাহার ঘটেছে। সৃৃষ্টিশীল মানুষদের পাশাপাশি পেশাদার ও রাজনীতিচর্চাকারীদের কথা বিভিন্ন অধ্যায়ে বিন্যস্ত করেছেন তিনি। তাদের আচার, ব্যবহার, সফলতা ও ব্যর্থতার কথাও আলোচিত হয়েছে। ফলে অনেকের এতে নিহিত অনেক গল্প পাবেন, ইতিহাস থেকে উঠে আসা জীবনের গল্প। সবচেয়ে মর্মান্তিক বিষয়গুলি এসেছে এই জনপদের হারিয়ে যাওয়া মানুষের কাহিনি, যা এসেছে এর সপ্তদশ অধ্যায়ে। লেখকের বর্ণনায়, ‘এক সময় কালিয়া জনপদের পাশ্ববর্তী গ্রাম, যেমন চালনা, হরিশপুর, কাশীপুর, জয়পুর, মির্জাপুর, কার্তিকপুর রায়পুর, নলডাঙা, বলাডাঙা, বৈদ্যহাটী, ভাউরিরচর প্রভৃতি হিন্দু প্রধান গ্রামগুলিতে বর্তমানে হিন্দুদের নেই কোনো অস্তিত্ব। সেখানে মুসলমানরাই হলেন সংখ্যাগরিষ্ঠ। এখন থেকে একশো কিংবা সোয়াশো বছর আগে কালিয়ার বৈদ্য বসতিপূর্ণ জনপদে বাস করতেন অল্প কয়েক ঘর মুসলমান। আজ সেখানে তাদেরই প্রাধান্য। বৈদ্যদের পরিত্যক্ত বাড়িগুলিতে তাঁরা কেউ ডি.সি. আর.এর মাধ্যমে, কেউ জাল দলিলের মাধ্যমে, কেউ বা কোর্টের ডিক্রির সাহায্যে বসবাস নিশ্চিত করেছেন। এঁদের অনেকে আবার ক্রয়সূত্রে জমির মালিকানা স্বত্বভোগ করছেন।’ এইসব তথ্য তিনি হাজির করেছেন বর্তমানে সেখানে বসবাস করা মুসলমানদের কাছ থেকেই। সুরঞ্জন রায় বইয়ের কৃতজ্ঞতাস্বীকার অংশেই বলে রেখেছেন যে, এই বইটি রচনা করতে তাঁর ভূমিকা কখনও ঘটকের, কখনও অনুঘটকের। ‘ঘটকের এজন্য, কালিয়াবাসী তথ্যদাতা আমি যোগসূত্রকারী। আর অনুঘটকের কারণ, এ গ্রন্থে আমার মতামত দেয়া থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত রেখে যাবতীয় বিষয়ে অংশগ্রহণ করেছি মাত্র।’ সেদিক থেকে এটিতে সুরঞ্জনের একটি নৈব্যর্ক্তিক নিরাসক্ত মনের পরিচয় মেলে। ইতিহাস রচনার জন্য যেগুণটি বোধকরি সবচেয়ে জরুরি। আমাদের সৌভাগ্য তেমন গুণের অধিকারী ব্যক্তির হাতে এমন একটি গ্রন্থ রচিত হয়েছে। এই বইয়ের ব্যাপক প্রচার ও পাঠকপ্রাপ্তির প্রত্যাশা তো করতেই হয়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

shares