বইকথা

মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে

অনন্য সংযোজন

চা বাগানে গণহত্যা : ১৯৭১

কামাল লোহানী

 

জননী জন্মভূমিশ্চ স্বর্গাদপি গরিয়সী।’ আমাদের প্রিয় মাতৃভূমি এই বাংলাকে দখল করে নিয়েছিল এক সাম্প্রদায়িক হানাদার রাজনীতি। ব্রিটিশ বেনিয়া শাসক চক্রের সাম্রাজ্যলোভী শাসন-শোষণের কবল থেকে (১৯৪৭)। মুক্তির প্রত্যাশা প্রথমেই হোঁচট খেল মাতৃভাষাকে পাকিস্তান রাষ্ট্র এবং রাষ্ট্রের  সাম্প্রদায়িক ও শোষক মনোবৃত্তির কারণে। বাংলা আমাদের মাতৃভাষা, প্রথমেই এই পূর্ববঙ্গের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের ভাষাকে অন্যতম রাষ্ট্রভাষা করতে অস্বীকৃতি, ফলে তরুণ ছাত্রসমাজ যে প্রতিরোধের সিদ্ধান্ত নিয়েছিল, তাতে গুলি চালিয়ে ছাত্র হত্যার ঘটনা বাংলাকে উন্মাতাল করে তুলেছিল। সেখানেই উপ্ত হলো মুক্তির আকাক্সক্ষা কারণ পূর্ববাংলার মানুষ বুঝতে পেরেছিলেন পাকিস্তানি চক্রান্ত। সেই থেকে শুরু করে পূর্ববাংলার অমিত তেজ মানুষ নির্ভয়ে মাথা উঁচু করে মুসলিম লীগ কিংবা সামরিক জান্তা, তারপর স্বৈরশাসন নিপীড়নে জর্জরিত মানুষের ক্ষোভ একদিন ক্রোধে পরিণত হলো এবং বাংলার অকুতোভয় সন্তানেরা  ১৯৭১-এ দারুণ বিস্ফোরণ ঘটালেন দখলদার পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর সশস্ত্র আক্রমণ প্রতিরোধ করে। নিরস্ত্র বাংলার মানুষ ধর্মবর্ণ, দল ও মতনির্বিশেষে সম্মিলিত গণশক্তি নিয়ে রুখে দাঁড়ালেন ঔপনিবেশিক সাম্প্রদায়িক হানাদার-লুটেরাদের বিরুদ্ধে। সশস্ত্র যুদ্ধ হলো নিরস্ত্র মানুষের সঙ্গে। জয়ী হলেন মানুষ অমানুষ পশু শক্তিকে পরাভূত করে। তিরিশ লক্ষ কৃষক, শ্রমিক, ছাত্র-যুবক, নারী-পুরুষ, আবালবৃদ্ধবনিতা অকাতরে প্রাণ বিসর্জন দিলেন মাতৃভূমি পুনরুদ্ধার করতে। জয় হলো মানবের, পরাজিত দানবশক্তি আত্মসমর্পণ করে বিতাড়িত হলো আমাদের প্রিয় মাতৃভূমি থেকে। পাশব হানাদার অপশক্তির বিরুদ্ধে নিরস্ত্র মানুষের অভ্যুত্থান এক ইতিহাস হয়ে রইলো জগৎজুড়ে।

তখন আমরা ছিলাম সাড়ে সাতকোটি বাঙালি, আদিবাসী পাহাড়ে-সমতলে। জান কোরবান মুক্তিযুদ্ধের এই গণশক্তির মধ্যে ছিলেন চা-বাগান শ্রমিকদের সংঘবদ্ধ শক্তি। এঁরা সবাই এদেশিয় নয়, কিন্তু চা-বাগানে কাজ করতে এসেছেন উড়িষ্যা-বিহার মধ্য প্রদেশ থেকে, বহু বছর আগে। বংশ-পরম্পরায় ওরা কাজের খোঁজে এসেছেন এইখানে। ভাষামিশ্রিত হয়েছে, পূজা-আচার কিংবা সংস্কৃতি তাঁদের ভিন্ন। তারপরও তাঁরা এ মাটিরই সন্তান। তাই কর্মসূত্রে এসে বসতি করেছেন বাগানে বাগানে কিন্তু যখন ডাক এসেছে নতুন লড়াইয়ের, তখন কিন্তু তাঁরা পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর কাছে আত্মসমর্পণ কিংবা করুণা প্রার্থনা করেননি। লড়েছেন বাংলার মানুষের সঙ্গে মুক্তির লড়াইয়ে, প্রাণ দিয়েছেন হায়েনাদের হাতে, তবু আত্মসম্মানবোধকে বিসর্জন দেননি। বিশ্বাসঘাতকতা করেননি এই দেশের জনগোষ্ঠীর সঙ্গে।

একটি নির্দিষ্ট এলাকার মধ্যে বিশেষায়িত কাজে নিযুক্ত থেকেও এই শ্রমজীবী মানুষ শাসক শ্রেণি এবং মালিক গোষ্ঠীর দ্বারা নির্যাতিত-নিপীড়িত হয়েছেন। অথচ জীবনের প্রয়োজনে মাটি কামড়ে পড়ে থেকেছেন। নিজ ভাষা-সংস্কৃতি ভুলে যাননি কিন্তু ভালোবেসেছেন এই বাংলার জলবায়ু, আকাশ-বাতাসকে। ভালোবেসেছেন এদেশিয় জনগোষ্ঠীকে। একেবারে মিশে যাননি একান্ত অত্যাচার অনাচার এবং বৈষম্যের শিকারে যখন পরিণত হয়েছেন, তখন তাঁরা এক হয়ে গেছেন গণশক্তির বিপুল শক্তির অংশ হিসেবে। উৎপীড়িত জীবনযাপনেই সৃষ্টি হয়েছে সংগ্রামী মন-মানসিকতা। লড়েছেন শাসকগোষ্ঠীর শোষণ নিপীড়নের বিরুদ্ধে নিরন্তর। মালিকদের কোনও ছাড় দেননি এই বিচ্ছিন্ন ভিনদেশি জনগোষ্ঠীও। সংগ্রামের দর্শনে-আদর্শে ওরা মিলেছেন বৃহত্তর জনগণের বিপুল ঐক্যের সঙ্গে। এই মেহনতি মানুষগুলোর ভিন্ন সংস্কৃতি হলেও তাঁরা যে মাটিতে জীবনসংগ্রামে লিপ্ত, সেই মাটি আক্রান্ত হলে অমিতবিক্রমে মুক্তিযোদ্ধার ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছেন। লড়েছেন তথাকথিত ‘দুর্ধর্ষ’ সেনাবাহিনীর সঙ্গে। মহান মুক্তিযুদ্ধের প্রেরণায় প্রাণপণ জান দিয়েছেন তবু মান দেননি যাঁরা, তাঁদের এই গৌরব গর্বিত লড়াই ও প্রতিরোধের মহিমাম-িত উপাখ্যান উল্লেখযোগ্যভাবে উঠে আসেনি। লেখক-সাংবাদিক অপূর্ব শর্মা অনন্য এক কর্মযজ্ঞ সাধন করেছেন, তাঁর অনুসন্ধানী মন এবং মানবিক সাংবাদিকতার গৌরবোজ্জ্বল আন্তরিকতায়। হত্যাযজ্ঞে শহিদদের খুঁজে ফিরেছেন বাগানে বাগানে এবং শহিদপরিবারের স্বজনদের সঙ্গে কথা বলে জেনেছেন সেই মর্মন্তুদ ঘটনাবলি। লিপিবদ্ধ করেছেন বাস্তবের সেই কাহিনি, নির্মমতার নৃশংসতার হিংস্রতার। লেখক সাংবাদিক এবং গবেষক-সংগ্রাহক হওয়ায় তাঁর অনুসন্ধানী দৃষ্টি এবং আবেগতাড়িত বর্ণনা মানুষকে প্রলুব্ধ করবে সেই মানুষগুলোর সাহসী প্রতিরোধ আর বীরত্বপূর্ণ লড়াইয়ের কাহিনি। বাগান থেকে বাগানে ঘুরে ঘুরে গণহত্যার সরেজমিন বিবরণ সংগ্রহ করায় প্রতিটি হত্যার সহিংসতার নির্মম কাহিনি তুলে ধরেছেন এই প্রথম গ্রন্থাকারে।

আমাদের মুক্তিযুদ্ধে এদেশের যাঁরা নন, এদেশের ভাষা, সংস্কৃতি ধারণ করেন না কিন্তু এই মাটির প্রবল টানে সুদীর্ঘকাল থেকে এ মাটিতেই প্রজন্মের পর প্রজন্ম বেড়ে উঠলেও যখন এই দেশের আপামর জনগণ ঔপনিবেশিক দুশমনদের হাতে মৃত্যুর মুখোমুখি, আপন ভাষা-সংস্কৃতি এবং দেশ ও ইতিহাসকে রক্ষা করতে, তখন এই অবাঙালি জনগোষ্ঠী, কীভাবে এই বাংলার মুক্তিসংগ্রামে নিজেদের উৎসর্গ করেছেন, এরই ইতিহাস খ- উদ্ঘাটন করেছেন সাংবাদিক অপূর্ব শর্মা তাঁর চা বাগানে গণহত্যা : ১৯৭১ গবেষণা গ্রন্থে। তাঁর অতীব গুরুত্বপূর্ণ এই সংযোজন মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসকে সমৃদ্ধ এবং পূর্ণাঙ্গ করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। সাংবাদিকতার চৌকস বর্ণনায় অপূর্ব শর্মা অনন্য এই রচনায় বাগানে বাগানে কীভাবে হত্যাকা- ঘটিয়ে ৫৩৯ জন শ্রমজীবী চা-শ্রমিককে হত্যা করেছে, এর নির্মম ইতিহাস এদেশের অগণিত মানুষের কাছে তুলে ধরেছেন বলে আমরা মুক্তিযুদ্ধের সঙ্গে সম্পৃক্ত মানুষ কৃতজ্ঞ হয়ে রইলাম। কী অসাধারণ এই কষ্টসাধ্য ইতিহাস? এটি রচনায় তাঁকে যাঁরা সাহায্য-সহযোগিতা করেছেন তাঁরা হলেন মুক্তিযোদ্ধা শিব শঙ্কর তাঁতি, আদিবাসী নেতা পরিমল সিং বাড়াইক ও চা-শ্রমিক আন্দোলনের প্রখ্যাত নেতা, ট্রেড ইউনিয়ন সংগঠক রাজেন্দ্র প্রসাদ ব্যানার্জী। এঁদের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছেন গ্রন্থকার । কিন্তু সাংবাদিক অপূর্ব শর্মার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করতে চাই নিগৃহীত উপেক্ষিত চা-শ্রমিকদের মুক্তিযুদ্ধের অপ্রকাশিত অমর কাহিনি জনসমক্ষে গ্রন্থ আকারে উপস্থিত করায়।

অপূর্বকে ধন্যবাদ এজন্য যে, চা-বাগানে শ্রমিকজীবনটাই অবহেলা, বঞ্চনা ও শোষণের মোড়কে ঢাকা তাদের জীবনসংগ্রাম, শ্রমের মর্যাদা বঞ্চিত এই বিপুল জনগোষ্ঠী ভিনদেশি মানুষ হয়ে এবং ভাষা ও সংস্কৃতির বৈচিত্র্য থাকার পরও ওই জনগোষ্ঠী দীর্ঘদিন এই জনপদের কর্মস্থল চা-বাগানে মেহনত করে কাটালেও এদেশের মানুষের, বাঙালিদের জীবন-মরণ লড়াইয়ে দুশমনকে রুখে দাঁড়াতে বিন্দুমাত্র দ্বিধা করেননি। আর সে-কারণেই এ-পথে নির্মম-নিষ্ঠুর নিপীড়ন-নির্যাতনে প্রাণ বলিদান করেছেন। একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধের বহু কাহিনি আজও অজানা অলিখিতই রয়ে গেছে। সংঘবদ্ধ কোনোও প্রয়াসে আজও এই চূড়ান্ত লড়াই ও প্রাণোৎসর্গের বিস্তারিত ইতিহাস লেখা হয়নি। তাই আমরা সেই সব অধ্যায় সম্পর্কে অজ্ঞাত, যাঁরা এদেশের ভাষার, সংস্কৃতির না-হয়েও একাত্তরে প্রাণ বিসর্জনে দ্বিধা করেননি। মানুষ মানুষের জন্য, সেটাই প্রমাণ হয় অপূর্ব শর্মার চা বাগানে গণহত্যা : ১৯৭১ গ্রন্থে। লেখককে ধন্যবাদ, কৃতজ্ঞতা, তাঁর এই প্রয়োজনীয় ইতিহাস খণ্ড রচনার জন্য। তিনি ওই অঞ্চলের মানুষ, পেশায় সাংবাদিক এবং মানসিকতায় মুক্তিযুদ্ধের প্রকৃত উত্তরাধিকারী বলেই এই উপেক্ষিত জনগোষ্ঠী অবরুদ্ধপ্রায় জীবন ও সংগ্রামের বীরত্বপূর্ণ কাহিনি তুলে ধরেছেন জনসমক্ষে, এজন্য যাঁরা অজ্ঞাত, তাদের কাছে অপূর্ব শর্মার এই গ্রন্থ চা বাগানে গণহত্যা : ১৯৭১ ভবিষ্যতে ‘মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস’ রচনায় আকর গ্রন্থ হিসেবে গ্রাহ্য হবে। যারা মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কে গবেষণা করছেন এবং জানতে ইচ্ছুক, তাঁদের দারুণ উপকার হবে এ-ধরনের ইতিহাস জানতে পারলে।

পরিশিষ্ট হিসেবে গ্রন্থকার শেষদিকে শহিদদের নাম, ঠিকানা, বাবার নাম, ঘটনাস্থল ও সময় উল্লেখ করে বিভিন্ন স্থানের তালিকা প্রস্তুত করে দিয়েছেন। এ-এক শ্রমসাধ্য ও গুরুত্বপূর্ণ কাজ। তিনি অধ্যবসায় ও সময় দিয়ে সহযোগীদের সহায়তায় এ-কাজটি সাধন করেছেন। শুধু গণহত্যার তালিকাই প্রণয়ন করেননি, ইতিহাসকে লোকগ্রাহ্য করার জন্য চা-বাগানসমূহের জেলাওয়ারি বাগান কতগুলো, কত এর আয়তন, কী পরিমাণ জমিতে চা চাষ হয়, এরও বর্ণনা তুলে ধরেছেন। সেই সঙ্গে উল্লেখ করেছেন শ্রমিকরা কীভাবে বাগানে কাজ করতেন, এরও তালিকা, সেখানে অপূর্ব শর্মা এই শ্রমজীবী মানুষগুলোর আদি বাসস্থান, ভাষা ও মৌলিক পেশা কী ছিল, এরও তালিকা তৈরি করে দিয়েছেন, যতটা সম্ভব। এ থেকে প্রমাণিত হয়, এ অনন্য অজানা কাহিনি জানবার জন্য তাঁকে দুর্গম দুস্তর পথ পাড়ি দিয়ে, ভ্রমণ করতে হয়েছে বহুপথ, অঞ্চল, যেখানে চা-বাগান আছে।

এমন একটি সহযোদ্ধা জনগোষ্ঠীর অজ্ঞাত ইতিহাস গ্রন্থাকারে প্রকাশ করতে দেশের বরেণ্য সংস্কৃতিজন, লেখক, গবেষক মফিদুল হক তাঁর প্রকাশনা সংস্থা ‘সাহিত্য প্রকাশ’-কে ব্যবহার করে দেশ ও জাতির মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস রচনায় সহায়তা প্রদান করেছেন, তা সত্যিই অমূল্য। এজন্য মফিদুলকে ধন্যবাদ। তবে এ ধরনের ধন্যবাদ পাবার মতো অসংখ্য কাজ তিনি করেছেন। তাঁকে অভিনন্দন। প্রিয় শিল্পী অশোক কর্মকার করেছেন এর প্রচ্ছদ, তাঁকে সাধুবাদ জানাই।

৮৮ পৃষ্ঠার গণহত্যার বিস্তৃত বিবরণ রয়েছে বটে এই বইতে কিন্তু পরিশিষ্টসহ ১২০ পৃষ্ঠার গ্রন্থ চা বাগানে গণহত্যা : ১৯৭১ তথ্যবহুল, ঘটনাপঞ্জি এবং ভিনদেশিয় মানুষের বাংলার মুক্তিযুদ্ধের প্রাণোৎসর্গের অনন্য ইতিহাস।

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

shares