চিত্রকলা

কারু তিতাসের বিষয়-রোমান্টিকতা

দীপ্তি দত্ত

 

বর্তমানকে অস্বীকার করে পূর্বতন স্মৃতির মধ্যে যে ভ্রমণ করে তাকে রোমান্টিক বলা যেতে পারে। যে রোমান্টিকতা দেখা গিয়েছিল, ইংল্যান্ডে শিল্পবিপ্লবকে অস্বীকার করা একশ্রেণির শিল্পীগোষ্ঠীর মধ্যে। অংশত অষ্টাদশ শতকের দ্বিতীয়ভাগে ইংল্যান্ডের এই দৃশ্যশিল্পীদের নগর বিরোধিতার বিপরীতে কাজ করেছিল প্রকৃতিচেতনা।

নগরী হিসেবে ঢাকার উত্থানপর্বের ইতিহাসের সঙ্গে নাগরিক শ্রেণির কথিত আধুনিক দৃশ্যশিল্পের উত্থানপর্বের ইতিহাস সমান্তরাল। বাংলাদেশের এই আধুনিকশিল্পের ইতিহাসে বিষয়বস্তু হিসেবে গ্রামবাংলা বা নগরের প্রান্তিক অবস্থানে টিকে থাকা গ্রামীণ দৃশ্যপট অন্যতম বিষয় হিসেবে এসেছে। এবং এখনও এর চর্চা অব্যাহত আছে। গ্রামীণ দৃশ্যপট ছাড়াও ভাঙাঘরবাড়ি বা দালান, অচেনা প্রকৃতি বা গোষ্ঠীর মানুষ ও তার শরীর-সংস্কৃতি বিষয় হিসেবে দৃশ্যমান। অনুশীলন হিসেবে প্রাধান্য পাওয়া এসব বিষয় আস্তে আস্তে বাংলাদেশের দৃশ্যশিল্পের বাজারে জলরং মাধ্যমে জনপ্রিয়তা লাভ করে। বিষয়বস্তুর দিক থেকে প্রায় একই ছিল-ইংল্যান্ডের রোমান্টিক ভূ-দৃশ্যেগুলো।

এখন প্রশ্ন হলো, আমাদের দেশের এই বিষয়চর্চার মূল স্বরূপ কি? ঢাকার নগর থেকে মহানগরীতে রূপান্তরকালে এবং বর্তমানেও চলমান এই ধারা কি একটি শিল্পআন্দোলন? ইংল্যান্ডের শিল্পীরা ইন্ডাস্ট্রিয়াল নাগরিক বাস্তবতার বিরোধিতা করেছিলেন। তাই বিপরীতজনের কাছে তা একটা শিল্পান্দোলনের ধারণা তৈরি করেছিল। তবে বাংলাদেশের শিল্পীরা কি বিরোধিতা করছেন এই নগরের? এই বিরোধিতা থেকে কীভাবে নগরের বাইরের দৃশ্যপটের উপর দৃষ্টি আরোপ করছেন? চলে গেছেন কেউ নগর ছেড়ে? কোনো বিষয়ের বিরোধিতা করা ও তা ধারণ করা কি রোমান্টিকতা? যদি তা না হয়ে থাকে তবে, আপাতভাবে বলতে পারি, এক বাস্তবতায় শরীরের বাস ও ভোগ আর ভিন্ন বাস্তবতায় মনের বিচরণ করার নাম রোমান্টিকতা। আমাদের দৃশ্যশিল্পের ইতিহাসে গণমাধ্যমে স্থান পাওয়া শিল্পীদের মধ্যে শিল্পী সুলতান একমাত্র ব্যতিক্রম। তার গ্রাম, গ্রামীণ দৃশ্যপট ও তার মানুষ স্মৃতিচারণের হাতিয়ার নয়। নগরের কাছে দ্বিতীয় বা অন্য সত্তা হিসেবে বিবেচিত হয় গ্রাম। তার ছবি সেই গ্রামের বাস্তবতা ও তার অন্তর্নিহিত শক্তির দৃশ্যরূপ। গ্রাম সুলতানের ছবিতে প্রথম সত্তা এবং দ্বিধাহীন একমাত্র মানবভূমি হিসাবে হাজির হয়েছে। তিনি এই সত্তায় বহিরাগত নন। তিনি এই সত্তার লালনকর্তা। কিন্তু বাংলাদেশের নগরবহির্ভূত এই জলরঙিয় বিষয় চর্চায় বেশিরভাগ শিল্পীই নাগরিক না হলেও নগরের সুবিধাভোগী। ঢাকা শহরের কলেবর যত বৃদ্ধি পেয়েছে, তত শিল্পীরা তাদের দৃষ্টি গারোপাহাড় থেকে পার্বত্য চট্টগ্রাম পর্যন্ত বিস্তৃত করেছেন।

জয়নুল থেকে শুরু করে আজকের দিন পর্যন্ত শিল্পীদের শহরের বাইরে বিষয়ের জন্য হন্যে হওয়ার এই দীর্ঘকাল কি নিঃশব্দ নগরবিরোধী আন্দোলনের সূচক?

শিল্পীরা বান্দরবান, খাগড়াছড়ি বা ময়মনসিংহের গারোপাহাড় ঘুরে-ফিরে আসেন ঢাকার কেন্দ্রে। এখানেই তার বাজার। জলরঙে করা এসব দৃশ্যচিত্র শিল্পীর আর্থিক দুরাবস্থা উত্তরণের সঙ্গে যতটা সম্পর্কিত, এর ততটা সম্পর্ক নেই শৈল্পিক সত্তা প্রকাশের সাথে। এসব ছবির ক্রেতা উচ্চবিত্ত, বিশেষ করে নাগরিক মধ্যবিত্ত। তবে কি নাগরিক মধ্যবিত্তের রোমান্টিক বোধই বাংলাদেশের এই নগরত্যাগী ভূ-দৃশ্যচিত্রের মূল চালিকাশক্তি?

তথাকথিত কোম্পানি চিত্রকলার ভিন্ন সংস্কৃতির দলিল নির্মাণ প্রবণতা বা ইংল্যান্ডের শিল্পবিপ্লবের বিরোধিতায় জন্ম নেয়া ভূ-দৃশ্যচিত্র-যাই আমাদের প্রাথমিককালে এই ‘অন্য’ সংস্কৃতির শরীর নির্মাণে  প্ররোচিত করে থাকুক না কেন, শুরুর পরবর্তী ধাপে সেই প্ররোচণা স্থায়ী অনুকরণে রূপান্তরিত হয়েছে কিনা তা খুঁজে দেখা জরুরি। খুঁজে দেখা জরুরি নাগরিক মধ্যবিত্তের সংস্কৃতি কাঠামো।

শিল্পী কারু তিতাসের ‘জলযাত্রা’ শিরোনামের প্রদর্শনীকে কেন্দ্র করেই এইসব ভাবনার অবতারণা। শিল্পাঙ্গন গ্যালারির এই প্রদর্শনীর কাজগুলোতে শিল্পী শহর, উপ-শহর ছাড়িয়ে খুঁজে এনেছেন পাহাড় ও নদীর পটভূমিকে। যেখানে মানুষ প্রকৃতির একটা অংশ হিসেবেই যাপন করে কাল। যদিও তিনি নিজে দীর্ঘদিন নগর-বৈশিষ্ট্যের অনুগামী। কৈশোর ও তারুণ্যের প্রথমভাগে ছিল গ্রাম ও শহরতলি জীবনের অভিজ্ঞতা। তবে তার এই নগর-বর্হিমুখিনতাকে আমরা কি বলব? শিল্পী নিজেই এর উত্তর দিয়েছেন। তিনি নিজেকে এই কারণেই রোমান্টিক বলছেন।

তিনিও মাধ্যম হিসেবে বেছে নিয়েছেন জলরং। তবে তার কাজে জলরং ব্যবহার পদ্ধতি অস্বচ্ছ। এই পদ্ধতিই বোধহয় রৌদ্র-ছায়ার পৃষ্ঠতল নিমার্ণের প্রবণতা থেকে শিল্পীকে কিছুটা দূরে সরিয়ে নেয়। আমার দেখা তার আগের কাজগুলোর মধ্যে ভঙ্গুর, মরিচাপড়া, পুরানো বস্তুর কম্পোজিশনের কথাই মনে পড়ে। পূর্বতন সেসব কম্পোজিশনে একরৈখিক দূরত্বের ধারণায় স্পেস আপাতভাবে সমতলীয় মনে হয়। কিন্তু তার কাজে ভঙ্গুর ফর্ম জমে জমে বহুস্তরিক স্পেস ধারণা তৈরি করে। যা অন্ধকারের মতো গভীর। ধারাবাহিক পর্যবেক্ষণে মনে হয়, মানসিক কোনো অবস্থার সূচক এই স্পেস।  তার এসব কাজের সঙ্গে ‘জলযাত্রা’র কাজে অস্বচ্ছ জলরং ব্যবহারের ধরন ও তার কাঠিন্যের মৌলিকত্বই কারু তিতাসকে চিনতে সাহায্য করে।

এই প্রদর্শনীর কাজগুলোতে যদিও তিনি ঘুরে বেড়িয়েছেন আনুভূমিক রেখার বিস্তৃত পরিসরে বা উলম্ব পাহাড়ের সঙ্গে পথিকের অনুভূমে, তবুও বিস্তৃত স্পেস ও তার মুহূর্তস্থায়ী রোদ্র-ছায়া ছবিতে গুরুত্ব পায়নি। যেমনটা সাধারণত জলরঙের স্বচ্ছ প্রয়োগে এসব ভূ-দৃশ্যচিত্রে হয়ে থাকে। প্রকৃতি কারুতিতাসের হাতে ভঙ্গুর, জীর্ণ পুরাতন হয়ে যায়। চলমান জীবন প্রবাহের সঙ্গে দর্শককে সচল করার বদলে বিদ্ধ করে অন্ধকার। তার ছবিতে আলোর রেখা ক্ষীণ। এতটাই ক্ষীণ যেন অন্ধকারের গভীরতার সঙ্গে ভাসমান আলোর রেখা অস্তিত্বের প্রশ্নে সংগ্রামরত। কোনো কোনো ছবির পৃষ্ঠতল অনুপাতে বেশি সাদা হলেও অন্ধকারের গভীরতাকে তা অতিক্রম করতে পারে না। শিল্পীর সচেতন বা অবচেতন অবস্থার এই নিজস্ব রূপ প্রকাশের মধ্য দিয়ে কোনো কোনো ক্ষেত্রে ছবির কম্পোজিশন নির্মাণে শিল্পী রফিকুন নবীর প্রভাবও গৌণ হয়ে যায়। বিষয়বস্তুর বিবেচনায় শিল্পী নিজেকে রোমান্টিক মনে করলেও, আমার মনে হয় তার ছবিতে অন্ধকারের দৌরাত্ম্য, শিল্পীর অন্তর্নিহিত বোধেরই এক বাস্তবতা।

 

 

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

shares