নাটক

হাবিব তানভির

ভারতীয় মঞ্চনাট্যের কিংবদন্তি

মিরন মহিউদ্দীন

 

‘যুক্ত করো হে সবার সঙ্গে মুক্ত করো হে বন্ধ’ শিরোনামে নাট্যোৎসব। ১৯৯০ সালের জানুয়ারিতে, ঢাকায়। আয়োজক দল নাগরিক নাট্যসম্প্রদায়। আয়োজকদের আমন্ত্রণে হাবিব তানভির ঢাকায় আসেন। তার দল নয়া থিয়েটার নিয়ে, সঙ্গে তার দুটি নাটক; আগ্রাবাজার ও চরণদাস চোর।- যা আজও বাংলাদেশের দর্শকের হৃদয়ে অম্লান হয়ে আছে। যাকে অতি সংক্ষেপে বলা যায়, মন্ত্রমুগ্ধকর এক বিহ্বলতায় ঘোর লাগা।

সেদিনের নয়া থিয়েটার-এর নাটক দেখবার অভিজ্ঞতা একেবারে ভিন্ন। তার ভাষা আমরা বুঝি না। গানের কথা বুঝি না। কিন্তু মঞ্চ থেকে চোখ ফেরাবার সুযোগ নেই। কারণ, ভাষা না বুঝলেও মঞ্চে এত এত গতিময় নাট্যক্রিয়া ছিল, যা নাটকটির গল্প বুঝতে সাহায্য করেছে। আর নাটকে ব্যবহৃত গানের লোকজ স্বর-সুর দর্শককে আবিষ্ট করে রেখেছিল।

হাবিব তানভির আগ্রাবাজার নাটকে আঠারো শতকের প্রখ্যাত উর্দু কবি নাজির আকবরবাদী এবং তার সময়কে মূর্ত করে তুলেছেন। নাজির কবি মির্জা গালিবের বংশধর। ১৯৫৪ সালে রচিত এ নাটকে অভিনয় শিল্পী হিসেবে তিনি নির্বাচন করেন স্থানীয় অধিবাসী এবং জামিয়া মিল্লিয়া ইসলামিয়া’র শিক্ষার্থীদের। ভারতের কোনো নাটকে এমনটি আগে দেখা যায়নি। শুধু তা-ই নয়, অভিনয়ের জন্যে ছিল না কোনো মঞ্চও। একটি বাজারকে তিনি অভিনয় প্রদর্শনের জন্যে মঞ্চ হিসেবে ব্যবহার করেন। আর বাংলাদেশে ১৯৯০ সালে যখন আগ্রাবাজার মঞ্চস্থ করেন, ততদিনে তার দল নয়া থিয়েটার অনেক শক্তিশালী হয়েছে এবং দেশ বিদেশে নাট্য রসিকদের প্রশংসাধন্য হয়েছে; এবারের মঞ্চায়নে মঞ্চসজ্জা এমন সহজ-স্বাভাবিক ছিল যে জাতীয় নাট্যশালার মূল মঞ্চতেই যেন বাজার বসে গিয়েছিল।

অচেনা জনজীবন, অচেনা ভাষায় মঞ্চে প্রবল জীবন্ত বাক্সময় হয়ে ওঠে মানবিক ক্রিয়াদি বিচিত্র স্বর-সুর চলন-বলনের ক্ষিপ্রতায়। ‘আগ্রাবাজার’ যেন বা প্রাকৃতিক স্বতঃস্ফূর্ততায় সামাজিক নাট্যাখ্যান হয়ে ওঠে।

আমাদের দেখা দ্বিতীয় নাটক চরণদাস চোর। হাবিবের রচনা ও প্রথম মঞ্চায়িত হয়েছিল সেই ১৯৭৪ সালে। যা ইতোমধ্যেই ভারত ছাড়িয়ে বিদেশে বিভিন্ন মঞ্চে উপস্থাপন করেছে নয়া থিয়েটার এবং এত প্রশংসা কুড়িয়েছে যে, তা বলার অপেক্ষা রাখে না।

চরণদাস চোর নাটকটি বলা যায় একটি রাজনৈতিক স্যাটায়ার। সেই সময়ের রাজনীতির দৈন্যদশাকে ফুটিয়ে তোলা হয়েছিল এ নাটকে; যা আজকের সময়েও সমানভাবে প্রাসঙ্গিক, এই উপমহাদেশের মানুষের কাছে।

নাটকটির কাহিনি গ্রামীণ আখ্যান। অভিনেতা-অভিনেত্রীরা গ্রামের- শিল্প-আঙ্গিক গ্রামীণ। শুধু একটি চৌকি হচ্ছে মঞ্চসজ্জার উপকরণ। একজন সত্যবাদী চোরের কাহিনি নিয়ে এ-নাটকটি নির্মিত; যে মিথ্যা বলবে না, সোনার থালায় ভাত খাবে না, রাজকুমারী বিয়ে করবে না। প্রতিটি দৃশ্যই প্রবল উত্তেজনায় আর উৎকণ্ঠায় শেষপর্যন্ত দর্শককে টেনে নিয়ে যায়। এ-নাটক ইতোমধ্যেই আন্তর্জাতিক খ্যাতি পেয়েছে, যার সূত্র ধরে হাবিব তানভির বিশ্বনাট্যের আসরে অধিষ্ঠান লাভ করেন কেবলমাত্র তাঁর একান্ত নিজস্ব স্বকীয়তার জন্যে। শঠতা, ছলনা, তথা হিপোক্র্যাসি যখন আজকের সমাজ ও গোটা বিশ্বকে গ্রাস করতে বসেছে তখন হাবিব তানভীরের ‘চরণদাস চোর’ যেন হিপোক্র্যাসির গালে চপেটাঘাত।

এডিনবরা আন্তর্জাতিক নাট্যোৎসবে ১৯৮২ সালে প্রথম অভিনয় হয়ে সর্বোচ্চ মানে ফিঞ্জ পুরস্কার লাভ করে দিল্লির ‘নয়া থিয়েটার’-এর ‘চরণদাস চোর’। এবং বৃটিশ নাট্যসমালোচক ও নাট্যরসিকদের বিপুল প্রশংসা অর্জন করে। ইউরোপের নানা দেশে একইভাবে প্রশংসিত হয় এ-নাটক। হিন্দুস্থান টাইমস পত্রিকা এ-নাটকটিকে ১৯৪৭ সালে ভারতের স্বাধীনতার পর ভারতের সেরা ৬০টি নাটকের মধ্যে স্থান দেয়। নাটকটি শ্যাম বেনেগালের পরিচালনায় চলচ্চিত্রায়িত হয়। নাগিন তানভির, হাবিব তানভীরের আত্মজা, এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন, তাঁর নাটক দেখে বিদেশিরা এত অ্যাপ্রিসিয়েট করতেন এবং তাঁদের রি-অ্যাকশনও ছিল পজেটিভ। কারণ মঞ্চে এত অ্যাকশন থাকত যে গল্পটা বোঝার কোনো অসুবিধে হতো না।… থিয়েটারের ভাষা আর কুশীলবদের জীবনচর্চা বাবার নাটকে এমন একটা ক্যামিস্ট্রি তৈরি করেছে যে, কোলকাতা, দিল্লি, বম্বে, প্যারিস, ইংল্যান্ড, আমেরিকা এমনকি গ্রামের প্রত্যন্ত অঞ্চলের গ্রামবাসীদেরও বুঝতে অসুবিধে হতো না।’

ইংরেজিতে একটা কথা বলা হয় : ঝরসঢ়ষরপরঃু রং ঃযব যরমযবংঃ ভড়ৎস ড়ভ ধৎঃ. হাবিব তানভীরের সার্বিক নাট্যপ্রযোজনার ক্ষেত্রে এ কথাটি একশ ভাগ সত্য। তাঁর অন্য সমস্ত প্রযোজনাতে একটা নিজস্ব ভাষা, লোকজ আঙ্গিক, লোকজ স্বর-সুরের মেলবন্ধন ঘটানো হয়েছে। সে কারণেই হাবিব তানভির অনন্য হয়ে উঠেছিলেন এ উপমহাদেশে।

 

২.

৮ জুন ২০০৯ সালে মানুষটির মৃত্যু হয় ৮৫ বছর বয়সে; যিনি বিশ্বাস করতেন, ‘থিয়েটারের কাজ সমাজ বদল করা নয়। তার কাজ সমাজের সমস্যাকে চিহ্নিত করা। থিয়েটার সমস্যার সমাধান দেবে না। সমাধান দেবে জনগণ। থিয়েটার কর্মীদের কাজ হলো সমাজবদলের প্রয়োজন সম্পর্কে গণসচেতনতা সৃষ্টি করা। তবে সমাজবদলের কাজ করবে রাজনৈতিক কর্মীরা।’

উত্তর ভারতের ছত্রিশগড়ের রায়পুরে জন্মগ্রহণ করেন হাবিব তানভির; ১ সেপ্টেম্বর ১৯২৩ সালে। হাবিব তানভির নামে পরিচিত ছিলেন তিনি। যদিও তাঁর প্রকৃত নাম ছিল হাবিব আহমেদ খান। বোম্বেতে ‘অল ইন্ডিয়া রেডিও’তে যোগ দেন ১৯৪৫ সালে। একই সঙ্গে যুক্ত হয়ে পড়েন ‘প্রগ্রেসিভ রাইটার্স ইউনিয়ন এবং আইপিটিএ-এর সঙ্গে। ভারতবর্ষে ব্রিটিশ শাসনের অবসানে আন্দোলনে শরিক হওয়ার অভিযোগে নাটকের দল আইপিটিএ-এর অনেক কর্মীকে কারারুদ্ধ করা হয়। এই কঠিন সময়ে হাবিব তানভির সংগঠনটির হাল ধরেন। দিল্লির প্রথম পেশাদারি নাট্যদল হিন্দুস্থানি থিয়েটার প্রতিষ্ঠা করেন ১৯৫৪ সালে। ১৯৫৫ সালে বৃত্তি নিয়ে তিনি ইংল্যান্ড যান। সেখানে তিনি তিন বছর কাটান। এ-সময়ে তিনি রয়্যাল একাডেমি অব ড্রামেটিক আর্টস (রাডা)-এ অভিনয়বিষয়ক প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন। ১৯৫৬ সালে ব্রিস্টল ওল্ডভিক থিয়েটার স্কুল থেকে নির্দেশনাবিষয়ক প্রশিক্ষণ নেন। ইউরোপের বিভিন্ন দেশে ঘুরে থিয়েটার বিষয়ক কার্যক্রম পরিদর্শন করে নিজেকে সমৃদ্ধ করে তোলেন। তিনি ১৯৫৮ সালে ফিরে এসে আবার কাজ শুরু করেন। তাঁর জন্মস্থান উত্তর ভারতের রায়পুরের ছত্রিশগড়ে শিল্পীদের সংগীত ও নৃত্যে আকৃষ্ট হয়ে তিনি তাদের নিয়ে কাজ শুরু করেন। এবং তাদের মঞ্চে নিয়ে আসতে উদ্যোগী হন। এবং এটাই ছিল হাবিব তানভীরের নাট্য প্রতিভার স্বতঃস্ফূর্ত স্ফুরণের টার্নিং পয়েন্ট। তিনি তা যথাযথভাবেই কাজে লাগিয়েছেন।

এ-সময় সাংগঠনিক মতবিরোধের কারণে হিন্দুস্থানি থিয়েটার থেকে বেরিয়ে এসে ১৯৫৯ সালে নয়া থিয়েটার গঠন করেন। ছত্রিশগড়ি দেহাতি লোকশিল্পীদের তিনি মঞ্চে নিয়ে আসেন, তাদের স্বভাবজাত শিল্পপ্রতিভাকে আরও বিকশিত করতে সাহায্য করেন। কিন্তু তাদের শরীর থেকে মাটির গন্ধ মুছে ফেলেননি, যা পরবর্তীকালে তাঁর নাট্যপ্রযোজনায় অমূল্য শস্য হিসেবে কাজে লেগেছে।

 

৩.

‘জনগণই সংস্কৃতির প্রকৃত স্রষ্টা। বিরুদ্ধ স্রোতের বিপরীতে মানুষের সংগ্রামের মধ্যেই সংস্কৃতির জন্ম। জীবনের মধ্য থেকেই উৎসারিত হয় শিল্প ও সংস্কৃতি, তার নানান ফর্ম। আর তাকে মোটেই কম গুরুত্ব দেয়া যায় না।’-তাই এ দিকটাকেই সবচেয়ে গুরুত্ব দেন হাবিব তানভির।

ছত্রিশগড়ি দেহাতি মানুষগুলোর সাথে যখন তাঁর পরিচয় এবং পরে সখ্য গড়ে ওঠে, তখন তার আত্মবিশ্বাস বেড়ে যায়। দেশ-বিদেশের নানাফর্মের নাটকে কাজ করে এসেও তিনি যেন তাঁর সঠিক ঠিকানা খুঁজে পান এই ছত্রিশগড়ি মানুষগুলোর লোকজীবন ও সংস্কৃতিতে। তিনি একে একে নাটক রচনা করেন, বিশ্বের বিখ্যাত সব নাটককে তাঁর নিজস্ব ঘরানায় নির্মাণ করেন। শেক্সপিয়ারের মিড সামার নাইট ড্রিম নাটকটিকে ‘কামদেব কা আপনা বসন্ত্ ঋতু কা স্বপ্না’য় রূপান্তরিত করেন যখন তখন তা যেন ছত্রিশগড়ের আখ্যান হয়ে ওঠে। সেখানে শেক্সপিয়ারের যাবতীয় তির্যক দুষ্টুমিও রয়েছে, আবার ছত্রিশগড়ের দেহাতি জীবনের যাবতীয় সংবেদনশীলতা উঠে এসেছে।

পশ্চিমা থিয়েটার সম্পর্কে তার অগাধ পা-িত্য থাকলেও প্রাচ্যদেশিয় থিয়েটারের আদলে তিনি কাজটি করেছেন। তারই ফসল হিসেবে পাওয়া যায় ব্রেখট-এর গুড ওম্যান আব সেটজুয়ান-এর ছত্রিশগড়ি রূপ সাজাপুর কী শান্তিবাঈ।

প্রসঙ্গক্রমে দিল্লির এক নাট্যসমালোচক, রাঘুবীর সহায়, লিখেছেন, হাবিব তানভির যখন দিল্লিতে বুর্জোয়া জেন্টেলম্যান নাটকটি করছিলেন এমনকি ‘বাহাদুর কলোয়নি’ও; সব অভিনেতা-অভিনেত্রী ছত্রিশগড়ের মানুষ ছিলেন। বুর্জোয়া জেন্টেলম্যান নাটকটি একটি আধুনিক বিদেশি নাটক যার না-অনুবাদ করা হয়েছিল না-রূপান্তর। কিন্তু দুটি নাটকই তাদের নিজেদের গুণে অসাধারণ হয়ে উঠেছিল। দুটি নাটকেই কলাকুশলীদের একাত্মতা দেখবার মতো ছিল।  এই একাত্মতা নাটকের সঙ্গে নয় বরং সেই জীবনের সঙ্গে ছিল যা তাঁরা যাপন করেন।’

সংস্কৃত নাটক মৃচ্চকটিক থেকে মিট্টি কা গাড়িও ছত্রিশগড়ি রীতিতে নির্মাণ করেন। তিনি বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে ১৯৭১ সালে কুস্তিয়া কা চাপরাশি নাট্যরচনা করেন। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের রাজর্ষি ও বিসর্জন অবলম্বনে তিনি রচনা করেন রাজরক্ত। সম্ভবত এটাই তাঁর শেষ নাট্যরচনা ও নির্মাণ। প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী যতদূর জানা যায়, মোট ৭৪টি নাটক তিনি লিখেছিলেন এবং ভাবানুবাদ করেছেন। একই নাটক ছত্রিশগড়ি, হিন্দি, উর্দু বা ইংরেজি ভাষায় একাধিকবার মঞ্চায়িত হয়েছে। ছত্রিশগড়ি শিল্পীদের মহড়ার আড্ডায় গাল-গল্পে ইম্প্রোভাইজেশনের মাধ্যমে তৈরি হয়েছে কিছু নাটক যার কোনো লিখিত রূপ ছিল না।

 

৪.

১৯৯০ সালে, বাবরি মসজিদ ভাঙন-পরবর্তীকালে ধর্মের নামে প্রতারণার বিরুদ্ধে পোঙ্গা পণ্ডিত নাটক লিখে উগ্রহিন্দুদের কোপানলে পড়েন। রাষ্ট্রীয় সেবক সংঘের (আরএসএস) সমর্থকরা তাকে বারবার হেনস্তা করেছে। কিন্তু কোনো বাধাই তাকে থামিয়ে রাখতে পারেনি। তিনি তাঁর কাজ চালিয়ে গেছেন সদর্পে। কিন্তু উগ্রহিন্দুত্ববাদীরা তাঁর পিছু ছাড়েনি। নাট্যজন সুব্রত পাল হাবিব তানভীরের স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে বলেছেন, ভোপালে হাবিব ‘ভারত ভবন’-এর দায়িত্বে থাকাকালীন মধ্যপ্রদেশে বিজেপি ক্ষমতায় আসে। উগ্রহিন্দুত্ববাদীরা সঙ্গে সঙ্গে তাঁকে চাপ দিতে থাকেন ‘ভারত ভবন’ ছেড়ে দেবার জন্যে। এমন কথাও বলা হয়,-জুতো মেরে বের করে দেবো! হাবিব বলেছিলেন, জুতো মারবে মারো, দয়া করে রামের নাম মুখে নিও না। হাবিবের মৃত্যুর পর সেই বিজেপি সরকারই পূর্ণ রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় হাবিবকে সমাধিস্থ করার ব্যবস্থা করেন। মৃদুস্বরে চরণদাস চোর-এর গান গাইতে গাইতে নয়া থিয়েটারের কলাকুশলীরা হাবিবের কফিনটি সমাধিস্থলে নামিয়ে দিলেন। অবসান ঘটল একটি যুগের।

 

৫.

হাবিবের লেখালেখি শুরু হয় কবিতা দিয়ে। অভিনয়টা স্কুল জীবন থেকে। গান লেখেন চলচ্চিত্রের জন্যে। তারপর এক সময় পাকাপোক্তভাবে নাটকে আসন গেড়ে বসেন। হাবিব তানভির সংগীত নাটক একাডেমি পুরস্কার পান ১৯৬৯ সালে, পদ্মশ্রী ১৯৮৩ সালে, কালিদাস সম্মান ১৯৯০-এ, সংগীত একাডেমি ফেলোশিপ ১৯৯৬-এ, পদ্মভূষণ পান ২০০২-এ। ২০০৭ সালে ব্রেখট ও লোকজ সংস্কৃতির সমন্বয়ে অভিনব নাট্যভাষ্য উদ্ভাবনায় তাঁকে সম্মাননা দেয়া হয়। ১৯৭২-১৯৭৮ সাল পর্যন্ত তিনি রাজ্যসভার সদস্য ছিলেন।

 

৬.

হাবিব তানভীরের নাট্যকর্মকে একটি বিশেষ দিক থেকে রেখাঙ্কিত করা যায়। তিনি কখনওই নিজের কাজকে কোনো দর্শন, চিন্তাধারা, বা মতবাদের আবরণে ঢাকতে চাননি। তাঁকে একবার জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, আপনি এ-ধরনের নাটক কেন করেন? তিনি সপাটে উত্তর দিয়েছিলেন, এইসব আমি আনন্দ পাওয়ার জন্যে করি। তাঁর উত্তর সবাইকে হতাশ করেছে। কারণ তাঁরা এই কথা বিশ্বাস করতে পারতেন না যে শুধু আনন্দ পাওয়ার জন্যে কোনো নাট্য নির্দেশক তাঁর জীবনের অর্ধেক সময় কাটিয়ে দেবেন! আমরা ভুলে যাই না বিংশ-শতাব্দীর সর্বশ্রেষ্ঠ নাট্যকর্মী, চিন্তক ও নাট্যকার ব্রেখটও নাটক ও নাট্যকলার সর্বপ্রমুখ উদ্দেশ্যে এটাই বলেছেন,- প্রথমে মনোরঞ্জন এবং তার মধ্যে শিক্ষাদান।

ব্রেখট-এর অনুপ্রেরণায় হাবিব তানভির বিশ্বাস করতেন নাটকের রূপান্তর হয় সমাজ রূপান্তরের হাত ধরেই। ব্রেখট-এর ‘থিওরি অব থিয়েটার’ হাবিবের নাটকে আমরা আমাদের মতো করে পাই। তার নাটকে ব্যবহৃত সংগীত এক ধরনের ইন্টার‌্যাকশন, মঞ্চ থেকে দর্শক ফিরে গিয়ে আবার নতুন করে দৃশ্যগুলো বুঝতে সাহায্য করে। এজন্যেই হাবিব তানভির ভারতীয় থিয়েটারে এক অনন্য স্রষ্টা।

 

৭.

তার কর্ম দিয়ে তিনি শুধু উপমহাদেশের নাট্যাঙ্গনকে বিপুলভাবে ঋদ্ধ করেননি, সমগ্র বিশ্ব নাট্যাঙ্গনকে সমৃদ্ধ করেছেন। তাঁর দল নয়া থিয়েটারের নাট্য প্রযোজনা ও তার নির্দেশিত নাটককে বৈভব ও প্রাণতরঙ্গে আলাদাভাবে চিনে নেয়া যায়। তাঁর স্ব-উদ্ভাবিত নাট্যরীতি ও নাট্য নির্মাণের বিস্ময়কর বৈচিত্র্য ও বর্ণময়তা তাকে আমাদের কাছে এই উপমহাদেশের প্রধান নাট্যজন হিসেবে চিহ্নিত করে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

shares