গল্প

একদিন মলিন নক্ষত্র থেকে

পিয়াল খন্দকার

 

ভ্রষ্ট চিত্রাবাসী, এক

একদিন মলিন নক্ষত্র থেকে গলিমুখে নেমে এল সে, নাম তার সোনালি, যদিও তার আরেকটি প্রবর্তিত নাম আছে চম্পা।

সোনালির পৃথিবীটা ছিল ভিন্নতর, সেই পৃথিবীতে ছিল নাগর নদী, কাঁচাধানের গন্ধ, হরিৎ ঝাউপাতা এবং অনেক অনেক স্বপ্ন, সোনালি তার নিজস্ব পৃথিবীতে ধেয়ে বেড়াত অস্থির কাঠবেড়ালির মতো। বাবা বললেন, ‘সোনালি, দিনরাত কিসের এত মাতামাতি?’

কিন্তু সোনালি তার কথা কিছুই শুনতো না। সে দিনরাত নাচতো, গাইতো, হাসতো, খেলতো আরও কত কি।

রফিক ঢাকার রিকশাওয়ালা। শুধু তাই নয়, সে-ই ছিল সোনালির স্বপ্ন, স্বপ্নের স্বপ্নে সোনালির হৃৎসমুদ্রে অকস্মাৎ ঝড় ওঠে, সোনালি তার স্বপ্নের পেছনে হাঁটতে হাঁটতে পিছনে ফেলে এল নাগর নদী, কাঁচা ধানের গন্ধ, হরিৎ ঝাউপাতা এবং তার নিজস্ব পৃথিবীটা।

বাবা বললেন, ‘সোনালি তোর সর্বনাশ হবে।’

মা বললেন ‘সোনালি স্বপ্নের সাথে যাস না।’

কিন্তু সোনালি কিছুই শুনলো না। সে হেঁটে যেতে থাকলো স্বপ্নের পিছু পিছু। হেঁটে হেঁটে সোনালি এখন ক্লান্ত, অবসন্ন। তার ধূমাভ চোখের গর্ভ থেকে ছিটকে গেছে সমস্ত স্বপ্ন, আলো আর উজ্জ্বলতা। এক সময় সোনালির স্বপ্ন বেনিয়ান হয়ে আড়ং-এর রেশমি চুড়ির মতো সোনালিকে তুলে দেয় নিশাচর প্রাণীদের হাতে। সোনালি উন্মাদিনীর মতো চতুর্দিকে চোখ বুলায়, কিন্তু কোথাও স্বপ্ন নেই, নেই স্বপ্নের শাখা-প্রশাখাও।

একদিন মলিন নক্ষত্র থেকে গলিমুখে নেমে এল সে, নাম তার সোনালি, যদিও তার আরেকটি প্রবর্তিত নাম আছে চম্পা।

চম্পার পৃথিবীটা এখন অন্য রকম। সেই পৃথিবীতে আছে নিশাচর হলুদ দন্তুর, অন্ধকার, গরম নিশ্বাস, ঘাম আর শুক্রের দুর্গন্ধ এবং অনেক অনেক দুঃস্বপ্ন। চম্পা এখন তার সেই নিজস্ব দুঃস্বপ্নের পৃথিবীতে ধেয়ে বেড়ায় মুমূর্ষু শকুনির মতো। অন্ধকারে চম্পাকে সেইসব অসভ্য নিশাচর প্রাণীরা ছিঁড়েখুঁড়ে ফেলে। চম্পা মৎস দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে নক্ষত্রমাখা আকাশের দিকে। ক্রমশ অন্ধকার ধূমাভ হয়ে আসে, চম্পা তার ভাঙাচোরা দেহটা নিয়ে উঠে দাঁড়ায়। শিরদাঁড়া আটকে যায় অস্থির খিলে। প্রচ- অস্বস্তি নিয়ে এলোমেলো পায়ে হাঁটতে হাঁটতে ও এসে দাঁড়ায় উদ্যানের সামনে। এই মাতৃপ্রতিম উদ্যান চম্পাকে দেখলেই এক অপার্থিব উচ্চারণে কাছে ডাকে। ফিসফিসিয়ে বলে ‘ঘুমিয়ে পড় মা সারারাতই তো জেগে ছিলি।’ উদ্যানের শালপ্রাংশু সবুজ বৃক্ষ, পতনোন্মুখ হলুদ ঝাউপাতা, ভাসমান ফড়িংগুচ্ছ আর হৃদের অকৃত্রিম চলন চম্পাকে প্রতিদিনের মতো ফিরিয়ে নিয়ে যায় তার অতীতের স্বপ্নময় দিনগুলোতে। উদ্যানের তৃণক্ষেত্রে ক্ষয়িষ্ণু চম্পা নিজেকে বিলিয়ে দেয়। তৎক্ষণাৎ পৃথিবীর তাবৎ তন্দ্রা এসে ভর করে ওর দুচোখে।

প্রতিদিনের মতো উদ্যানের সবুজ পিঠে মাথা রেখে সূর্য উঠছে। চম্পা ঘুমিয়ে যাচ্ছে সূর্য উঠছে চম্পা ঘুমিয়ে যাচ্ছে…।

 

ভ্রষ্ট চিত্রাবাসী, দুই

একদিন মলিন নক্ষত্র থেকে গলি মুখে নেমে এল সে, নাম তার সোনালি, যদিও তার আরেকটি প্রবর্তিত নাম আছে চম্পা।  চম্পার পৃথিবীটা এখন অন্যরকম। সেই পৃথিবীতে আছে নিশাচর হলুদ দন্তুর, অন্ধকার, গরম নিশ্বাস, ঘাম আর শুক্রের দুর্গন্ধ এবং অনেক অনেক দুঃস্বপ্ন। চম্পা এখন তার সেই নিজস্ব দুঃস্বপ্নের পৃথিবীতে ধেয়ে বেড়ায় মুমূর্ষু শকুনির মতো। অন্ধকারে চম্পাকে সেইসব অসভ্য নিশাচর প্রাণীরা ছিঁড়ে খুঁড়ে ফেলে। চম্পা মৎস দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে নক্ষত্র মাখা আকাশের দিকে। ক্রমশ অন্ধকার ধূমাভ হয়ে আসে, চম্পা তার ভাঙাচোরা দেহটা নিয়ে উঠে দাঁড়ায়। শিরদাঁড়া আটকে যায় অস্থির খিলে। প্রচণ্ড অস্বস্তি নিয়ে এলোমেলো পায়ে হাঁটতে হাঁটতে ও এসে দাঁড়ায় উদ্যানের সামনে। এই মাতৃপ্রতিম উদ্যান চম্পাকে দেখলেই এক অপার্থিব উচ্চারণে কাছে ডাকে। ফিসফিসিয়ে বলে ‘ঘুমিয়ে পড় মা সারারাতই তো জেগে ছিলি।’ উদ্যানের শালপ্রাংশু সবুজ বৃক্ষ, পতনোন্মুখ হলুদ ঝাউপাতা, ভাসমান ফড়িংগুচ্ছ আর হৃদের অকৃত্রিম চলন চম্পাকে প্রতিদিনের মতো ফিরিয়ে নিয়ে যায় তার অতীতের স্বপ্নময় দিনগুলোতে। উদ্যানের তৃণক্ষেত্রে ক্ষয়িষ্ণু চম্পা নিজেকে বিলিয়ে দেয়। তৎক্ষণাৎ পৃথিবীর তাবৎ তন্দ্রা এসে ভর করে ওর দুচোখে।  প্রতিদিনের মতো উদ্যানের সবুজ পিঠে মাথা রেখে সূর্য উঠছে। চম্পা ঘুমিয়ে যাচ্ছে সূর্য উঠছে চম্পা ঘুমিয়ে যাচ্ছে…।  একদিন মলিন নক্ষত্র থেকে গলিমুখে নেমে এল সে, নাম তার দুরন্ত। যদিও তার আরেকটি প্রবর্তিত নাম আছে, ফ্যাকাসে মানুষ। একজন রক্তশূন্য মুমূর্ষু রোগীর জন্য প্রায় রক্তশূন্য ফ্যাকাসে মানুষটা সারারাত ধরে ফাঁদ পেতে বসে থাকে। গ্লানযানের বাঁশি, দুর্ঘটনা, খুন এসবের গন্ধ পেলেই ফ্যাকাসের মন আনন্দিত হয়। মনে মনে স্মরণ করে, ‘নিশ্চয় আমারই গ্রুপ।’ এবং ঠিক তখনই মানুষটার খটখটে শরীরের অবশিষ্ট রক্ত ছলবলিয়ে ওঠে। চিকিৎসা-কেন্দ্রের চত্বরে স্থাণুর মতো বসে থাকতে থাকতে মাঝরাতের দিকে ফ্যাকাসের ঝিমুনি ধরে এবং ঠিক তখনই লুঙ্গি হাঁটুর ওপর তুলে শ্যাওলাঅলা হলুদ দাঁতে আনন্দের জেল্লা ছড়িয়ে একজন হৃষ্টপুষ্ট মানুষ ফ্যাকাসেকে নাড়া দেয়। ফ্যাকাশে তাকে দেখে ভীষণ আনন্দে লাফিয়ে ওঠে। চোখ ঘষতে ঘষতে বলে, ‘আমার গ্রুপ, তাই না গুরু?’ হৃষ্টপুষ্ট হ্যাঁ-সূচক মাথা নাড়িয়ে ফ্যাকাশেকে অনুসরণ করতে বলে, ফ্যাকাশে তার পরিচিত পথ ধরে মন্ত্রমুগ্ধের মতো এগিয়ে যায়। ভোরের দিকে ফ্যাকাশের রগে সূচ ঢুকিয়ে প্রবর্তিত নিয়মে একথলি রক্ত নেয়া হলো। এভাবে প্রায়শঃই নেওয়া হয়। আজকাল ফ্যাকাশের বড্ড ভয় হয়, কারণ তার দেহ হতে যে লাল রংয়ের তরল পদার্থটা বের হয় সেটা রক্ত না অন্য কিছু, এ-বিষয়ে সে বেশ সন্দিহান হয়ে পড়ে। প্রায়ই তার মনে হয় একদিন বুঝি রগে সূচ ঢুকিয়ে দেয়া হবে কিন্তু সেদিন আর কোনো রক্তই বের হবে না। ভোরের আলো একটু স্বচ্ছ হলে রক্তদানপর্ব শেষ করে সামান্য টাকা নিয়ে রক্তশূন্য, ক্লান্ত অবসন্ন মানুষটা নিজেকে টেনে হিঁচড়ে কোনোমতে তার প্রিয় উদ্যানটার মধ্যে নিজেকে ছুঁড়ে দেয়। উদ্যানের দক্ষিণ বাহু রাজপথ আর তার বুক চিরে ছত্রাকবাহী জলস্রোত। উদ্যানের সতেজ স্পর্শে ক্ষয়িষ্ণু ফ্যাকাসের বুক থেকে স্বস্তির বড় বড় শ্বাস পড়তে থাকে। ভোরের আকাশটা নতুন মার্বেলের মতো চকচক করছে। ফ্যাকাসে ভুল করে শূন্যের দিকে তাকায় এবং ঠিক তখনই তার চোখে পড়ে খাদযুক্ত স্বচ্ছ রৌপ্যমুদ্রার মতো প্রাচীন চাঁদের খণ্ডাংশ। ল্যাম্পোস্টের বাল্বের আলোকে ভোরের চাঁদ মনে করে ধূমের মতো অতীতের অসংলগ্ন রোজনামচা তার পাঁজর ধরে টান মারে। ও তখন অবলীলায় বলে যেতে থাকে ‘আয় আয় চাঁদমামা টিপ দিয়ে যা, চাঁদের কপালে চাঁদ…।’ ফ্যাকাসের কণ্ঠটা জড়িয়ে যায় কান্নার তীব্র চাপে, চোখ থেকে শীতল তৃণের উপর গড়িয়ে পড়ে ফোঁটা ফোঁটা উষ্ণ জল। আজ কতদিন পর সে কাঁদলো তা সে নিজেই জানে না। তার প্রিয় উদ্যানের শালপ্রাংশু সবুজ বৃক্ষ, পতনোন্মুখ হলুদ ঝাউপাতা, ভাসমান ফড়িংগুচ্ছ আর হৃদয়ের অকৃত্রিম চলন এক মায়াবী উচ্চারণে ফ্যাকাসেকে তাদের সমস্ত আবেগ ঢেলে দিয়ে জানতে চায়, কেন এই আত্মহননের পথ ধরে তুমি হাঁটছো হে মানব সন্তান?

উদ্যানের চাপা তৃণক্ষেত্রে মুখ রেখে ফ্যাকাসে এবারে ত্রন্দন করে। ভালোবাসাহীন এই জীবনে উদ্যানের এই অপার্থিব ভালোবাসায় সমস্ত উদ্যানে তখন অকস্মাৎ বয়ে যায় মৃদু ভূকম্পন। ফ্যাকাসের অন্তর আলোকিত হয়ে ওঠে আশার আলোয়। ভোরের আলোয় ফ্যাকাসে দেখতে পায় তার শৈশব, শৈশবে মানুষটা খুব দুরন্ত ছিল। ফ্যাকাসের সামনে স্পষ্ট দৃশ্যমান কানামাছি খেলতে গিয়ে কাচের টুকরোর ওপর পড়ে গিয়ে হাত কেটে ঝরঝর করে রক্ত ঝরছে। আর সে বারবার তার সেই রক্ত বাঁচাবার জন্য চুমুকের পর চুমুক দিয়ে রক্তগুলো চেটেপুটে খেয়ে নিচ্ছে।

শৈশবের সেই দুরন্ত শিশুটি এখন বোধশূন্য প্রাণীর মতো সারাদিন এই উদ্যানে শুয়ে শুয়ে ঘুমায়। ইদানীং প্রায়শঃই ভোরে এই উদ্যানে ফ্যাকাসে ঘুমিয়ে পড়লে সে ঐ শৈশবের স্বপ্নটাই বারংবার ঘুরে ফিরে দেখতে থাকে। উদ্যানে সূর্যের উজ্জ্বলতা যতই প্রখর হয় ফ্যাকাসে ততই ডুবতে থাকে তার শৈশবের ঐ স্বপ্নটার মধ্যে। কানামাছি খেলতে গিয়ে কাচের টুকরোর ওপর…।

 

ভ্রষ্ট চিত্রাবাসী, তিন

একদিন মলিন নক্ষত্র থেকে নেমে এল সে, নাম তার কেউ জানে না। যদিও তার আরেকটি প্রবর্তিত নাম আছে আগন্তুক।

অন্ধকারের জটে আটকে গিয়ে এই কিছুদিন আগে সে গ্রাম ছাড়া হয়ে নতুন আলো ঝলমলে শহরে এসেছে। শহরে সবকিছু আছে শুধু মাথার উপরের আচ্ছাদন অন্ন আর নিজস্ব কিছু স্বপ্ন ছাড়া, আলোচ্ছ্বাসে ভ্রষ্টের সাময়িক মতিভ্রম ঘটে।

রাত তার নিজস্ব নিয়মে এখন বেশ গাঢ় হয়ে এসেছে। কিন্তু আগন্তুক এখনও তার মাথার আচ্ছাদন অন্ন আর নিজস্ব কিছু স্বপ্নেব সন্ধান পায়নি। রাস্তার সোডিয়াম বাল্বের হলুদ আলোয় নিজের ভুতুড়ে ছায়াকে অবলম্বন করে ফুটপাত ধরে সে নিরিবিলি হেঁটে যায়। মাঝে মাঝে সম্মুখে পড়ে থাকা দুএকটা জঞ্জালের পাত্র ঘাটে কিন্তু উৎকট গন্ধছাড়া আর কিছুই নেই তাতে। সবকিছু কাক আর কুকুরে মিলেমিশে খেয়ে গেছে। তবে তাদের সঙ্গে সম্ভবত দুএকজন মানুষও ছিল, ঠিক ঐ আগন্তুকের মতো। আগন্তুকের চোখ এখন ছিটকে যেতে থাকে ঘুমে। ও একটা বাড়ির সিঁড়ি বারান্দার নিচে শুয়ে পড়তেই কিছু হিংস্র কুকুর আগন্তুকের মাংস ছিঁড়ে খেতে ক্ষিপ্রগতিতে দৌড়ে আসে। আগন্তুক ভয়ে দিশেহারা হয়ে ছুটে যায় অন্যত্র।

হাঁফাতে হাঁফাতে রেলস্টেশনের প্লাটফর্মে কিছু কু-লী পাকানো নোংরা মানুষের পাশে শুয়ে পড়তেই আবারও ঐ হিংস্র কুকুরদের মতোই হৈ হৈ করে আগন্তুকদের দিকে ছুটে আসে নিরাপত্তা রক্ষীরা। আগন্তুকের হাত থেকে তার শেষ সম্পদের পুটলিটা তারা কেড়ে নিয়ে তার পাছায় মোটা লাঠির দু’ঘা বসিয়ে দিয়ে চিৎকার করে বলতে থাকে, ‘এই শালা বাইনচোৎ, এটা কি তোর শশুর বাড়ি পেয়েছিস নাকি…।’ আগন্তুুক এখন তার মাথার উপর একটু আচ্ছাদন পাবার আশায় হন্যে হয়ে ঘুরতে থাকে নগরীর পথ থেকে পথে। ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে হাঁটতে হাঁটতে আগন্তুুক এক সময় দেখতে পায় চারদিকে হালকা ফর্সা রংয়ের আভা। সেই আভায় আগন্তুক দেখে একতাল সবুজের প্রলেপ অনিচ্ছায় ছেড়ে আসা ঠিক তার আপন গ্রামটির মতো, আগন্তুক প্রকৃতির ভাষা বুঝতে পারত। তাই সে ক্রমশই এগিয়ে যেতে থাকলো ঐ সবুজকে কেন্দ্র করে। তার দেহ আর চলতে চায় না। নিদ্রা, ক্লান্তি, ক্ষুধা আর বিষণ্ণতায় সে এলোমেলো হয়ে যায়। সবুজের কাছে এসে এক সময় আগন্তুক দেখতে পায় যে এটি একটি উদ্যান। উদ্যানের দক্ষিণ বাহু রাজপথ আর তার বুক চিরে ছত্রাকবাহী জলস্রোত। আগন্তুুক উদ্যানে ঢুকেই মাতালের মতো সতেজ ঘাসের মাঝে মুখ গুঁজে শুয়ে পড়ে। আগন্তুুককে দেখে উদ্যানের শালপ্রাংশু সবুজ বৃক্ষ পতনোন্মুখ হলুদ ঝাউপাতা, ভাসমান ফড়িংগুচ্ছ, হৃদের অকৃত্রিম চলন এক অপার্থিব উচ্চারণে তাদের সমস্ত মমতা ঢেলে দিয়ে জানতে চায়, ‘কেন শিকড় ছিন্ন হলি রে মানব সন্তান?’ হতাশার মাঝেও তার বুকের ভেতর জ্বলে ওঠে লক্ষ কোটি আশার আলো। একরাশ ঘুম আর ক্লান্তির মধ্যেও আগšু‘ক ফুঁপিয়ে ওঠে। সমস্ত উদ্যানে তখন আকস্মাৎ বয়ে যায় মৃদু ভূকম্পন।

 

ভ্রষ্ট চিত্রাবাসী, চার

একদিন মলিন নক্ষত্র থেকে গলিমুখে নেমে এল সে, নাম তার শুভংকর। যদিও তার আরেকটি প্রবর্তিত নাম আছে বড় বড় দীর্ঘশ্বাসের মতো। মাথার নিচে হাত রেখে উদ্যানের সবুজ ঘাসের গালিচায় শুয়ে আছে সে, উদ্যানের দক্ষিণ বাহু রাজপথ এবং তার বুক ছিঁড়ে ছত্রাকবাহী জলস্রোত। আকাশটা স্থাপিত হয়েছে তার চোখ বরাবর যদিও ভোরের সূর্য বর্তমান তবে তাতে কিছু যায় আসে না। এভাবে শুয়ে থাকা তার দীর্ঘদিনের অভ্যাস। একটু পরেই সে ঘুমিয়ে পড়বে। ঘুমাবার আগে সে মনে মনে আওড়াতে থাকে, ‘আত্মহননের প্রয়োজন তীব্র হলে তোমাকে মনে পড়ে, তোমাকে মনে পড়া মানে স্বপ্নাক্রান্ত দিনযাপন করা।’

সে নিজেই নিজেকে প্রশ্ন করে, ‘আচ্ছা আজ রাতে তুমি কি করলে?’ শুভংকর নিজেই প্রশ্নের উত্তর দেবার জন্য চোখটা বন্ধ করে এবং অবলীলায় বলে যেতে থাকে, ‘রাত ১১টার দিকে বিষাক্ত ধূম উড়াবার সভায় বসেছিলাম, যদিও ভালো লাগেনি তবুও উড়িয়েছি। কারণ ঐসব ঘোলা ধূম উড়ালে আমার আত্মহননের প্রয়োজন তীব্র হয়। তুমি তো জানোই রাতে আমার আত্মহননের প্রয়োজন ফিকে হয়ে আসে আর সুন্দর সব স্বপ্ন দেখি। স্বপ্ন দেখতে আমার একদম ভালো লাগে না। তুমি তো জানোই, আমি যখন গুরুগৃহ থেকে একজন সফল মানুষ হয়ে বের হলাম তখন কত সব বাহারি স্বপ্ন দেখতাম লাল, নীল, সবুজ, হলুদ আরও কত কি? তারপর যখন বাস্তবতার নিষ্ঠুর অলি গলি একে একে পাড়ি দিতে থাকলাম, তখন বুঝলাম, খুব ভালোভাবে বুঝলাম যে, গুরুগৃহের একজন সফল মানুষ পৃথিবীর বাস্তবতায় প্রতিনিয়তই ব্যর্থ হয়ে ক্রমশই এগিয়ে যাচ্ছে অন্ধকারের পথে। জীবনের সঙ্গে আমি আর কত সংগ্রাম করব। এখন তাই ঐসব স্বপ্ন থেকে নিষ্কৃতি পাবার জন্য সারারাত ধরে এই নগরীর নাড়িভুঁড়ি চষে বেড়াই। ও হ্যাঁ কি যেন বলছিলে? সারারাত কি করলাম তাই না? রাত দেড়টা পর্যন্ত বিভিন্ন কৌশলে ধূম উড়িয়ে প্রতিদিনের মতো অন্ধকার রাস্তায় ঝাঁপিয়ে পড়ি। নগরীর নাড়িভুঁড়ি ধরে হাঁটতে হাঁটতে কালকে যা যা দেখেছি সেগুলো আমার মনকে দুঃখিত করেছে। আমার মতোই একজনকে কাল রাতে জঞ্জালের পাত্রে খাদ্য অন্বেষণ করতে দেখেছি। বড্ড ক্ষুধা পেয়েছিল ওর। ক্ষুধা খুব খারাপ জিনিস। আর আমার পাশেই ঐ যে মেয়েটা বেঘোরে ঘুমাচ্ছে নাম চম্পা। ওকে কাল রাতে তিনজন লোক এক সঙ্গে…। না থাক এসব শুনলে তুমি কষ্ট পাবে।’

হতাশায় কর্মহীন পরাজিত লোকটার বুকের পার্শ¦দেশ ভেঙে বেরিয়ে আসে দীর্ঘশ্বাস।

উদ্যানের শালপ্রাংশু সবুজ বৃক্ষ, পতনোন্মুখ হলুদ ঝাউপাতা, ভাসমান ফড়িংগুচ্ছ আর হ্রদের অকৃত্রিম চলন এক অপার্থিব উচ্চারণে পরাজিত লোকটাকে তাদের সমস্ত মমতা ঢেলে জানতে চায় ‘কি কষ্ট তোমার হে মানব সন্তান’ উদ্যানের মমতামাখা প্রশ্নে পরাজিত লোকটার ভেতর জেগে ওঠে জীবনের আশার আলো। মাথার নিচে হাত দিয়ে উদ্যানের সবুজ ঘাসের গালিচায় শুয়ে আছে সে। আকাশটা স্থাপিত হয়েছে তার চোখ বরাবর। যদিও ভোরের সূর্য বর্তমান। তবে তাতে কিছু যায় আসে না। এভাবে শুয়ে থাকা তার দীর্ঘদিনের অভ্যাস। একটু পরেই সে ঘুমিয়ে পড়বে। ঘুমাবার আগে সে মনে মনে আওড়াতে থাকে, আত্মহননের প্রয়োজন তীব্র হলে তোমাকে মনে পড়ে। তোমাকে মনে পড়া মানে স্বপ্নাক্রান্ত দিনযাপন।

 

ভ্রষ্ট চিত্রাবাসী…।

একদিন মলিন নক্ষত্র থেকে গলিমুখে নেমে এল… ।

নাম তার… ।

যদিও তার অরেকটি প্রবর্তিত নাম আছে… ।

চিত্রা ভ্রষ্টের সংখ্যা দিয়ে এই ব্যাপ্ত উদ্যান চরাচর ক্রমে পরিপূর্ণমান, তারা দিবালোকে নিদ্রা যায়, তারা অন্ধকারের।

 

 

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

shares