গল্প

যান-প্রেতের বর

হামিম কামাল

 

মতিঝিল থেকে মিরপুর ফিরছি, খামারবাড়ি পেরুচ্ছে বাস। এমন সময় ওর ফোন। কাতর কণ্ঠটা শুনে বিচলিত হয়ে পড়লাম।

‘একটু তাড়াতাড়ি আসতে পারো মিলি? ব্যথাটা মনে হয় ফিরে আসছে। কতদূর তুমি? কতক্ষণ লাগতে পারে আর?’

‘চিন্তা কোরো না। এই তো, আমি তাড়াতাড়ি চলে আসছি’। কণ্ঠে যতোটা পারি আদর রেখে  বললাম আমি। ‘খামারবাড়ি কিনা, হ্যাঁ, খামারবাড়িই পেরুচ্ছি আমি। শোনো, আমার ওড়না দিয়ে মাথাটা বেঁধে নাও, বেশি চাপ দিও না আবার।’ একটু বিরতি। ওপাশ নীরব। ‘শিথানের জানালাটা কি খোলা? থাকলে থাক, বাতাস আসুক! আমি দ্রুত চলে আসছি। এসে মাথায় হাত রাখবো, এরপর সব ঠিক হয়ে যাবে। ঠিক আছে?’

দুর্বলকণ্ঠে জবাব এল, ঠিক আছে।

দ্রুত আসছি বলেছি বটে, কিন্তু কী করে যাবো? যানজটে রাস্তার বেগবান দানবরা সব ঘামছে। বাসভর্তি থিকথিক করছে তেলচিটে মানুষ। খুব ধীরে চলছে বীভৎস এই বাস, নেহাৎ নিরুপায় হয়ে চড়েছি। এপথে চলা বাসগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বাজে সার্ভিসের এটি। ক্ষণে ক্ষণে জট লাগছে। ওদিকে একআধটু ফাঁক পেলে যখন হুশহাশ করে বাকি সব একে পেরিয়ে যাচ্ছে, তখনও হেঁচকি তুলছে এঞ্জিন, চালক দুজনেই। সিগন্যাল পড়লে মহাখুশি। ইচ্ছে করে সিগন্যালে পড়ে-পড়ে আসছে এ তো মতিঝিল থেকেই দেখা। এ পর্যন্ত কোনো মাথাব্যথা ছিল না আমার। ফোনটা পাওয়ার পরই দুর্ভাবনা শুরু হলো। পেছনের গাড়ি সব একে একে চলে যায়, এ আর এগোয় না।

দরজায় দাঁড়িয়ে বিরতিহীনভাবে ডেকে যাচ্ছে হেলপার। মানুষও উঠছে। এত মানুষ আঁটছে কোথায় কেউ জানে না। দরজা থেকে শুরু করে পেছনে, বাসের অর্ধেকটা দেখলে মনে হয়, ওখানে ব্যাঙের ভ্রুণ জমাট বেঁধেছে। ঐ জমাটে দাঁড়ানো অসম্ভব বলে পেছাতে পেছাতে শেষ মাথায় এসেছি। এক কিশোর আর প্রৌঢ় বিনয় করে উঠে দাঁড়িয়েছিল, বসতে দিতে চাই। বসিনি। বলেছি, ‘প্রয়োজন নেই। বেশ দাঁড়াতে পারছি।’ মানুষের ঘামে ভিজে মরিচাপড়া লোহার রেলিং মুঠোয় ধরে দাঁড়িয়ে আছি। মাথার ওপর জ্বলছে হলুদ বাতি, ঘামছি ওটার ভীষণ তাপে। প্রবালের মতো জমাট বেঁধে শামুকের গতিতে খামারবাড়ি চত্বর পেরুচ্ছে অগণিত বাক্সবন্দি মানুষ। ভাবলাম, রাস্তার যা অবস্থা আর বাসের যা গতি, তাতে ওর সঙ্গে আগামী এক ঘণ্টার আগে আর দেখা হচ্ছে না। আমি এ মুহূর্তে ওর মাথায় একটু হাত রাখতে না পারলে বেচারা স্রেফ মারা পড়বে। শুনলে কেউ বিশ্বাস করবে না। কিন্তু আমি জানি, ঠিক মারা পড়বে।

হঠাৎ খেলাটার কথা মনে পড়ল। ‘ছিছিক্কার প্রাপ্য আমার’। আর দশজন সাধারণ মানুষের মতো বিচলিত হলে কি আমার চলে?

মাথাভরা কালোচুল আর গোঁফ মিলিয়ে ঠিক ওর মতো দেখতে এক লোক উঠে দাঁড়াল। বলল, ‘আমি নেমে যাচ্ছি। আপনি বসুন।’ ঠিক এটারই আমার দরকার ছিল। বসে ব্যাগ থেকে সেই গ্রাফ-কাগজ আর দুটো টু-বি পেন্সিলের একটা বের করলাম। পাশের লোকটা জানালার বাইরে থেকে মুখ ফিরিয়ে এনে দেখতে লাগল, আমি কী করি।

গ্রাফ-কাগজে আড়াআড়ি আর উলম্ব দুটো রেখা টেনে এর শূন্য স্থানাঙ্কে পেন্সিলটা রাখতেই হঠাৎ কোথাও যেন কিছু একটা ঘটে গেল। বিকট শব্দে র্হন দিয়ে উঠল বাস। হর্নের শব্দে বামপাশে পাশাপাশি প্রতিযোগিতা করতে থাকা দুটো রিকশার একটা ব্রেক কষে পেছনে সরে গেল। সামনের রিকশাটাকে শব্দাস্ত্র প্রয়োগে ফুটপাথের দিকে আরও সরিয়ে দিয়ে জায়গা করে নিল বাস। বিপরীত দিকের ওয়ানওয়ে ধরে একটা সাদা মাইক্রোবাস এসে, আইল্যান্ডের ফাঁক দিয়ে ইউটার্ন নিতে চাইছিল। বাসের হর্ন শুনে ব্রেক কষল। এরপরও গতি-জড়তার কারণে কিছুটা সামনে চলে এল। বাসের বাম্পার অল্পের জন্যে মাইক্রোর স্বল্পদৈর্ঘ্য বনেটটা বাঁচালো। বিপজ্জনকভাবে বাঁয়ে সরে এসে প্রথম রিকশাটার ছোঁয়াচ বাঁচালো অবিশ্বাস্য দক্ষতায়। এরপর বাঁকাপথে ক্ষিপ্র পলায়নপর বিড়ালের মতো ফাঁক গলে বেরিয়ে গেল।

স্টিয়ারিং-এর সামনে চালকের ঘাড়টা সোজা দেখতে পেলাম, কিন্তু তখনও গাড়ি সোজা হয়নি। আবার একটানা র্হন- প্রায় পাঁচ সেকেন্ড। পেরোলো আরও দুটো সিডান, একটা ট্রাক, একটা মিনিবাস। সংকীর্ণ পথ ধরে লক্কড়ঝক্কর আরও এক রিকশার ছোঁয়াচ বাঁচিয়ে চলে এল শেষোক্ত মিনিবাসটার সামনে।

খোলা দরজা। হেলপার ওয়াজ ড্যাঙ্গলিং দেয়ার। সে কোনো কাজেই আসছিল না। বাস তখন প্রবল বেগবান, পুরানো ইঞ্জিনের বিদ্রোহ তুমুলে।

আইল্যান্ডের ওপর দাঁড়িয়ে থাকা গাছগুলো সাঁটসাঁট পেরিয়ে যাচ্ছে। বামে আরও একটা মিনিবাস আর পিকআপকে গতিতে হারিয়ে সামনে এগোলো। আমার পাশের লোকটা ভুরু কুঁচকে তাকিয়ে আছে আমার হাতের কাগজটার দিকে। ওখানে লেখা বাঁকবদল করছে ক্রমাগত।

বিজয় সরণি রোডের উড়োজাহাজ চত্বরের অপরদিকে, সংসদ ভবনের রোডের শুরুতে আইল্যান্ড যেখানে শেষ, সেখানে বেশ কিছু বাস পিকআপ আর অটোরিকশা সিগনাল মেনে স্থির দাঁড়িয়ে আছে। আমাদের বাস তাদের গা করল না। সিগনালে সাড়া দেবে এমন লক্ষণই দেখাল না গতিতে। দোলনচাঁপা হাতে দাঁড়িয়ে থাকা দরিদ্র এক কিশোরী রাস্তা পেরোতে গিয়ে শেষমুহূর্তে সিদ্ধান্ত বদলালো। দেখলাম, সামনে স্থির যন্ত্রযানগুলোর দিকে শিকারীর মতো ছুটে যাচ্ছে বাস।

সিগনালে থেমে থাকা শেষ গাড়িটি মাত্র গজদশেক দূরে। হঠাৎ সেটি নড়ে উঠল। পরমুহূর্তে সিগনাল স্ট্যান্ডে গোলাকার বাতি লাল থেকে হলো সবুজ। আমাদের বাস আবার রাস্তার বাঁয়ে চলে এল। হেল্পার এতক্ষণে ধাতস্থ হয়েছে। এবার লাগাতার ধাতব দরজায় হাতের তালুতে চাপড় দিয়ে চলেছে, আর চিৎকার।

সৌভাগ্য বলতে হবে, বাঁ-দিকটা একরকম খালিই ছিল সে সময়। শুধু একটা ট্রাফিক পুলিশ মাত্র হুঁইসেল বাজিয়ে, সরে যাওয়ার অবকাশ পায়নি। তার পায়ের পাতা নির্ঘাৎ খুব অল্পের জন্যে বেঁচে গেল। দেখলাম বাঁ-পাশের জানালার খুব কাছে তাকে রেখে আমরা ছুটে যাচ্ছি। ডানপাশে পেছনে দ্রুত পিছিয়ে যাচ্ছে বিজয় সরণির নান্দনিক বিমানটা। সামনে অনেকটা পথ খালি। শিকারী চিতার বেগ ছেড়ে বাস এবার ছুটল ধূমকেতুর বেগে। এমনও মনে হলো, পেছনে বুঝি আগুন লেগেছে। বিদ্যুৎ বেগে পেরোলো চন্দ্রিমা উদ্যান, বঙ্গবন্ধু সম্মেলন কেন্দ্র। চন্দ্রিমার সামনে ওয়ে বিলে স্বাক্ষর করার জন্যে যে লোকটা চেয়ারে বসে থাকে, বাসটাকে দেখে উঠে দাঁড়াল। পরমুহূর্তে হাবভাব দেখে যা বোঝার বুঝে, বসে পড়ল আবার।

এদিকে গতি একটুও না কমিয়ে বঙ্গবন্ধু সম্মেলন কেন্দ্রকে পাশে রেখে দু’বার সাপের মতো এঁকেবেঁকে দুটো সিডানের ছোঁয়াচ বাঁচাল চালক। এবারও সামনে সিগনাল পড়ে আছে, লাল বাতি জ্বলছে। গাড়ির সংখ্যা যদিও খুবই কম, দুটি কী তিনটি। ভাবলাম এবার বাস থামাতেই হচ্ছে। কিন্তু না। যেন চালকের অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাসের কাছে হার মেনে লাল সিগনাল আবারও সবুজ হয়ে গেল।

থেমে থাকা গাড়িগুলো বেগ ফিরে পেতে না পেতে বাস বাতাস কেটে তাদের পেরিয়ে গেল। বাসের লোকজন এতক্ষণে নড়েচড়ে বসেছে। তরুণদের কেউ কেউ দাঁত বের করে হাসছে। তবে বুড়োরা ভয় পেয়েছে।

একজন বলল, ‘ক্ষেপছে নাকি!’

চালক তখন উড়ছে, সঙ্গে বাসটাও। হঠাৎ বামে চলে এল আবার। সামনের ছোট ছোট সিডানে বোধহয় বসে আছে অদক্ষ চালকেরা, নির্দেশকারী বাতিটা জ্বলছে। পেছন থেকেই তাদের গতিপথ থেকে সরে আসা গেল। একটা পাঁচটনি ট্রাকও পেরোল এরপর। চলে এল জোড়া স্পিডব্রেকারের খুব কাছে। দিনকয়েক আগে কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের দুটি হতভাগ্য ছেলে রাস্তা পেরোতে গিয়ে এখানে মারা গেছে। তাদের প্রাণের বিনিময়ে দুই ওয়ানওয়েতে দু’টা করে চারটা স্পিডব্রেকার বসানো হয়েছে। ও বলে, এ দুটো স্পিডব্রেকার নয়। বরং ছেলে দুটোর কবর। এখানে গতি না কমানোটা নিতান্ত বোকামি হয়ে যাবে। তাই যতটা না কমালেই নয় ততটুকু কমানো হলো। এই সুযোগে  দু’জন নেমে গেল। আলাদা করে তাদের জন্যে গতি আর কমাতে হলো না। পরপর দুটো ঢেউ, এরপর আবার টান। দেখলাম, যেন একপাল যান্ত্রিক ভেড়া এবারও পেছনে পড়ে আছে।

সামনে এবার আগারগাঁয়ের মাথাবাঁকা চৌরাস্তা। এখানকার রাস্তার গঠন আর গাড়ি আসা-যাওয়ার রুটিন একটু জটিল। অবশ্য এরচেয়েও অনেক জটিল রুটিনের রাস্তা পৃথিবীতে আছে। জিব্রালটারে রোডক্রসিংয়ে সিগনাল ফেলে রীতিমতো উড়োজাহাজ রাস্তা পেরিয়ে যায়।

মহাখালির দিক থেকে এসেছে যে রাস্তাটা, অর্থাৎ মাথাবাঁকা চৌরাস্তার বাঁকা আর অপরূপ অংশটা ধরে ডলফিনের মতো দেখতে একবাস আসছিল। বিশাল এবং সাদাকালো নকশা করা। ট্রাফিক পুলিশবিহীন টানটান একটা মুহূর্ত। দুটো বাসই চাইলো অপরটার আগে শেরেবাংলা বয়েজের সামনের রাস্তাটা ধরতে। ডলফিনের মতো বাসটার চালক শেষ মুহূর্তে ঝুঁকি নেয়ার আশা ত্যাগ করল। আমাদের সৌভাগ্য বলতে হবে। না হলে হয়ত ডানপাশ থেকে আসা আঘাতে আমাদের বাস ছিটকে ফুটপাথে উঠে সজোরে বাড়ি খেতো সারি সারি মেহগনি গাছের সঙ্গে। এবার তরুণদেরও মুখ শুকিয়ে গেল। দু’একজন খেঁকিয়ে উঠল চালকের বিরুদ্ধে। চালক নির্বিকার। মহাকাশ বিজ্ঞান সংস্থার দপ্তর পেরোল প্রতিষ্ঠানটির প্রতি মর্যাদা প্রদর্শক মহাকাশযানসুলভ ভরবেগ নিয়ে। হেল্পার ঘাড় ঘুরিয়ে চিৎকার করে জানতে চাইল, ‘তালতলায় কি কেউ নামার আছে?’ এক নারী বলিষ্ঠ কণ্ঠে নামতে চাইল তালতলায়।

খামারবাড়ির চত্বর থেকে যে দুর্দান্ত গতিবেগ এতক্ষণে মাত্র একমুহূর্তের জন্যে কমেছিল, তা শ্লথ হয়ে এল। বলিষ্ঠকণ্ঠী নারী গেল নেমে। গতি তুলতে চেষ্টা করল বাস। কিন্তু দুর্ভাগ্য, ততক্ষণে দুর্ভেদ্য এলাকা শুরু হয়ে গেছে।

এখানে শ্যাওড়াপড়ায় অদৃশ্য এক শ্যাওড়াগাছে পা ঝুলিয়ে বসে অশরীরী যান-প্রেত। ধাতব কিন্তু স্বচ্ছ তার শরীর, মাথার জায়গায় ধাতব গোলক, চোখের স্থলে কাচ। শুধু ল্যাম্পপোস্টের আলোয় তার দেখা মেলে। এই আছে এই নেই। ল্যাম্পোস্টের সারিতে এক অদ্ভুত নদী আছে, ওখানে সে সাঁতরায়। আমার সখা, আমার মিত্র, আমার উপদেবতা সে। এই গ্রাফ-কাগজ ওর দেওয়া বর। মানুষের যেখানটায় হৃৎপি- থাকে, প্রেতের ওখানটায় অগণিত মৃত আত্মা জোট হয়ে আলো হয়ে জ্বলে। শূন্য থেকে দুর্ভেদ্য যানজট তৈরি করা, এই তার কাজ। এই জটের প্রভাব চলতে থাকে টানা মিরপুর দশ পর্যন্ত। পেছনে অনেক জায়গায় তার ভোগ দিয়ে এসেছি বলে যানপ্রেত আগেই আমার ওপর প্রসন্ন ছিলেন। তাই তার আপন দেশে এসেও খুব একটা জটে আর পড়তে হলো না। দেখতে দেখতে কাজীপাড়া চলে এল বাস। যেন এর পরমুহূর্তেই ঘ্যাচ করে কষলো ব্রেক সেনপাড়া পর্বতায়। গজবিশেক দূরে দশ নম্বর গোলচত্বর। সিগনাল। হা করে থাকা লোকটার চোখের সামনে গ্রাফপেপারটা ছুড়ে রাস্তায় ফেলে দিলাম। বাসের আর প্রয়োজন নেই, সিগনালে থাকুক দাঁড়িয়ে। বাকিটা আমি হেঁটেই পেরুব। বাস থেকে নেমে, আঁচল ঘুরিয়ে কোমরে গুঁজে হাতঘড়িতে সময় দেখলাম। ফোন রাখার পর মাত্র আট মিনিট পেরিয়েছে।

চাবির মোচড়ে দরজা খুলে ভেতরে ঢুকে দেখি সামনের ঘর অন্ধকার। বাতি জ্বেলে পড়ার টেবিলে ব্যাগটা রেখে সোজা শোবার ঘরে।

‘কী। কেমন আছো? কেমন লাগছে এখন?’ ব্যাকুল প্রশ্ন আমার। জবাব না দিয়ে ও পাল্টা বলল, ‘তোমাকে সুন্দর লাগছে।’ আমি বলি, ‘তুমি অবাক হয়েছ?’

‘তোমার সৌন্দর্যে?’ ও বলে। আমি বলি, ‘না, এই যে, চট করে চলে এলাম!’

‘না হইনি তো! আমি বোকা নাকি। তুমি নিশ্চয়ই কাছে কোথাও ছিলে। অন্ধকারে চিনতে পারোনি। বলেছো খামারবাড়ি। আসলে ওখানে ছিলে না।’

শুনে ছদ্মরাগ দেখিয়ে ঝুঁকে ওর চুলের মুঠি ধরি। ‘টেনে তুলে ফেলবো একদম। আমাকে অবিশ্বাস! কী ভাবো, তোমার মতো মফস্বলে বড় হয়েছি? এ শহরের মেয়ে আমি, এটা মনে রেখো।’

চুল ধরে টের পেলাম, ভেজা। কপালও। এর অর্থ, ঘামে গোসল করিয়ে ব্যথা সেদিনের মতো বিদায় হয়েছে। কথা শুনে হাসতে হাসতে ও বলে, ‘তা অবশ্য। তবে, পৌনে এক ঘণ্টা না হোক, অন্তত ত্রিশ মিনিটের তো পথ। রাস্তার যা দশা, তা আবার অফিস ছুটির পর। একটা কোনো লৌকিক ব্যাখ্যা তো দাও!’

আমি বলি,‘ব্যাখ্যা আবার কী দেবো? দেখতে পাও না, আমি কপালে হাত রাখলেই যে তোমার ব্যথা সেরে যায়? এর যদি ব্যাখ্যা জানো, তো ওটার বেলায় প্রশ্ন কেন? একসূত্রেই প্রেমের সব অংক মেলে। কত পাঠ যে তোমার নেওয়া এখনও বাকি!’

গোসলের পর, খাওয়াপর্ব শেষে লেবু চা হাতে দু’জন ছাদে উঠে এলাম। কার্নিশে ঠেস দিয়ে দাঁড়িয়ে এমন আলাপে জড়াতে প্রতিদিন আরও রাত হয়। একসময় দেখি, ও পশ্চিমে, দূরে তাকিয়ে আছে। ওর দৃষ্টিপথ মেনে আমিও দেখলাম। দূরে দীর্ঘ সারি ধরে রাস্তায় দাঁড়িয়ে আছে শত শত গাড়ি। নড়াচড়ার একটা কোনো আভাস ওখানে নেই। হরেক রঙের আলো ছড়িয়ে শব্দ গড়িয়ে স্থির পড়ে আছে।

‘দারুণ! ঠিক যেন একটা ফটোগ্রাফ,’ ও বলল। পরক্ষণেই শুধরে নিয়ে বলল,‘না না, ফটোগ্রাফ না। আঁকা ছবি।’ আমি বলি, ‘জীয়ন্ত। আর ল্যাম্পোস্টগুলোকে দেখো। মনে আছে, সাঙ্গুকে ওপর থেকে কেমন দেখেছিলাম? ঠিক অমন, তাই না? এঁকেবেঁকে নদীর মতো চলে গেছে।’

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

shares