গল্প

যোগ-বিয়োগের ধারাপাত

মণীশ রায়

 

ঘুটঘুটে অন্ধকার চারপাশে।

মনে হচ্ছে চোখদুটো যেন গ্লু দিয়ে লাগানো ; হাজার চেষ্টাতেও পাপড়িরূপী  পাল্লাদুটি  খুলতে চাইছে না।

অথচ একটু একটু করে মগজ তো সাড়া দিচ্ছে ; হউক না  ঘন অন্ধকারের ভেতর নদীর বুকে ভাসমান নৌকায় বাধা হারিকেনের শিখার মত আবছায়া এক আভাস। তবু তো বোধগুলো মাথা তুলে জেগে উঠতে চাইছে ; হয়তোবা ক্ষণে ক্ষণে থিতিয়ে পড়ছে। তবু তো পা-ভাঙা কোন পথিকের মতো স্মৃতির রাস্তা ধরে হাঁটার চেষ্টাটুকু উসকে উঠছে। সেইবা কম কি?

তিনি এখন কোথায় আছেন কিংবা কি করছেনÑকোনোকিছুই এখন আর স্পষ্ট নয়; চেতনার বিশাল একনদী নিতান্তই কম্পনশূন্য ও স্থির; বহতা ধারার বেগময়তা ধরা দিতে চেয়েও মুখ লুকিয়ে ফেলছে বারবার।

শুরুতেই  প্রথম ও অন্তিম  যে জিজ্ঞাসাটি প্রাণপণে ওর সমস্ত সত্তায় অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে চাইছে সেটি হলো, ‘আমি কে?’

আরও একবার, ‘কি নাম তোমার?’

আরও একবার, ‘কোথায় থাকো?’

চেতনার পিঁপড়েগুলো বোধের গভীরে চিলবিল করছে ; মুঠো মুঠো স্মৃতি ও অনুভবের রোদ ঝলসানো বালির চেকনাই দিয়ে তৈরি যে বোধ- ভূমি, চেতনার পোকাগুলো  সেখানেই আঁতিউতি করে কিছু একটা খুঁজছে; বারবার প্রশ্ন করছে, ‘আমি কে?’

ফের প্রশ্ন,‘ কি নাম তোমার?’

ফের জিজ্ঞাসা, ‘কোথায় থাকো?’

চোখের সামনে একটা ক্ষীণ আলোর রেখা। যা একটু আগেও অস্পষ্ট ছিল তা এখন বড় একটি গোলকে পরিণত হচ্ছে। অন্ধকার মাঠের উপর জ্বলে উঠতে চাইছে ফ্লাড-লাইটের আলো। ভাসিয়ে দিতে চাইছে ভেতরের সব আঁধার। সমস্ত সংশয় ও দ্বিধাকে জয় করে দপ্ দপ্ করে বাতিগুলো জ্বলে উঠে লোকটিকে পরিচয় করিয়ে দিতে চাইছে,‘ তুমি নিজেকে চেন না? তোমার নাম জমিরউদ্দিন ব্যাপারি। ক্ষমতাধর এক মানুষ। তোমার অবস্থান সমস্ত দেশজুড়ে। তোমার নাম নিয়ে এলাকার মানুষ হয় ধন্য। তোমার সামান্য করুণা সবাইকে পতিত অবস্থা থেকে উত্তরণ ঘটায়। তুমি এমনি ক্ষমতাধর আর পরাক্রমশালী এক মানুষ। তুমি চিনতে পারছ না নিজেকে? এত কাহিল, এতই তুমি দুর্বল?’

‘আমি এখানে কেন?’ একটা পোষা রোগা বিড়ালের চাইতেও ¤্রয়িমাণ কণ্ঠস্বর লোকটির ।

‘ভেবে দেখ জমির উদ্দিন? ভাবো একবার, তুমি কেন এখানে এলে? স্মৃতির পাতায় টোকা লাগাও। তোমার চেতনা নিভে যায়নি। বোধের গভীরে মুখ গুঁজে বসেছিল। এখন তুমি জাগছ। আলো তোমার চোখে পড়ছে। ক্ষীণ আলোটা বড় হচ্ছে ধীরে ধীরে। তুমি মনে করার চেষ্টা কর। তাড়াতাড়ি?’

একটা টনটন করা ব্যথা কুঁচকির এখানটায়; হাত দিয়ে জায়গাটা স্পর্শ করবার বাসনা হলো। কিন্তু হাতদুটোর একটিও সে নড়াতে পারছে না। শরীরে মোচড় কেটে এই অস্বস্তিবোধ থেকে রেহাই পাওয়ার ইচ্ছে জাগছে। কিন্তু সাধের এ শরীরটাও অনড়। একটুও নড়তে চাইছে না।

চোখের নাজুক পাপড়ি এবার তিরতির করে কাঁপতে শুরু করে। একটু বাদে চিচিং ফাঁক বলে আপনা আপনি  খুলে যাচ্ছে চোখজোড়া। কিন্তু একি! চায়নিজ রেস্তোরাঁর মতো আলো-আঁধারি দৃষ্টি-সীমানায়; ছাদের গ্রেটবিম ছাড়া আর কিছইু নজরে আসছে না। মাথাও নড়ছে না। শরীরের মতই চলাচলহীন অথর্ব।

নাকে আসছে ওষুধের গন্ধ, সুড়সুড়ি দিতেই গা কেমন গুলিয়ে উঠছে।

ওর মতো একজন মানুষ যেখানটায় হাত-পা বাঁধা অবস্থায় অসহায়ের মতো শুয়ে রয়েছে সেটা কোন্ জায়গা? আসলে কোথায় ওর অবস্থান?

প্রশ্নটা ভ্যাবাচেকা এক অনুভবের কাদার ভেতর নিষ্ফল তীরের মতো নিমিষে সেঁধিয়ে গেল।

পরক্ষণে চট করে একটা ছবি ভেসে উঠল মনের আয়নায়। এরপর একটা। এরপর আরও একটা। এভাবে হাজারটা। এবার  স্পষ্ট দেখতে পাওয়া যাচ্ছে নিজেকে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একটা মিছিল। আর্টস ফ্যাকালটি হয়ে মধুর ক্যান্টিনে গিয়ে থামল। একটা উঁচু লম্বা লিকলিকে টাইপ যুবকÑ গায়ে পাঞ্জাবি, চোখে চশমা, মুখে খোঁচা-খোঁচা দাড়িÑ হাত নেড়ে সমবেত ছাত্রদের জাগাতে চাইছে। যুবকটির মুখে মার্কিন সা¤্রাজ্যবাদ ধ্বংসের অঙ্গীকার। সে যা বলছে তার সার-সংক্ষেপ হলোÑ বর্তমান যে সমাজব্যবস্থা তা পুঁজিপতিদের তৈরি নষ্ট সমাজ; শোষণ আর বঞ্চনার আঁতুড়ঘর। এখান থেকে মেহনতি মানুষের মুক্তি নেই। যদি মুক্তি পেতে হয়তো এই অর্গল ভেঙে নতুন এক সমাজ গড়ে তুলতে হবে, যা লেনিন ও কার্লমার্কস দেখিয়ে গেছেন।

ভাষণ শেষ হবার পর ছেলেটি কজন বন্ধু নিয়ে ক্যান্টিনের ভেতর ঢুকে পড়ল। দুকাপ চা চারকাপ হয়ে হাতে হাতে ঘুরতে লাগল। সঙ্গে বিড়ি ; যুবকটির পকেটেই ছিল।

আলোচনা চলছে। তুমুল তর্ক-বিতর্ক। ক্রোধে ফেটে পড়তে চাইছে যুবকগুলো। এ অথর্ব সমাজ-সংসার ভেঙে নতুন কিছু সৃষ্টি করার এক দূরন্ত আকুলতা ঝরছে ওদের কন্ঠ থেকে।

কে যেন পাশ থেকে কঁকিয়ে উঠল, ‘মা, মাগো।’

পরক্ষণে অতি পরিচিত এক কণ্ঠস্বর, ‘আব্বা, কাল সকালেই আপনি ক্যাবিনে চলে যাবেন। কোনো অসুবিধা নাই।’

ঝাপসা আলোয় তার মুখের উপর একটি মুখ। চেনার চেষ্টা করছেন তিনি। এর আগেই পরিচিত মুখটি বলে উঠল, ‘আব্বা, আপনি আমাকে চিনতে পারছেন না? আমি আপনার মেয়েজামাই। আম্মা ও আপনার মেয়ে বাইরে রয়েছে। ডাকব?’

চোখ বুঁজে ফেললেন তিনি। তিনি আবার নিজের কাছে ফিরে এলেন। একটা বড় অনুষ্ঠান চলছে। চারপাশে চোখ ধাঁধানো আলো। প্রচুর খাওয়া-দাওয়া। এর মাঝে একজন  সামরিক পোশাকের মানুষ হাসি হাসি চেহারা নিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছেন।

হঠাৎ ওর কাছে এসে থমকে দাঁড়ালেন। হাত বাড়িয়ে দিয়ে হ্যান্ডশেক করলেন। তারপর বলে উঠলেন, ‘বামপন্থী হয়েই জীবন কাটাবে নাকি এমপি-মন্ত্রী হবে? সামনে ইলেকশন, যোগাযোগ রেখো।’

রাতভোর হয়ে গেল; ঘুম এল না।

নতুন একটি মুখ ভেসে উঠল চোখের সামনে। এর নাম আয়েশা। টানাটুনির সংসার। অমুক-ভাই, অফিসের তমুক বড়কর্তার অফিসে ধর্না দিয়ে যা আয় হয় তা  দিয়ে জোড়াতালির সংসার আর চলছে না। ক্ষমতার কাছাকাছি না থাকলে কেউ হাতভরা চাঁদাও দিতে চায় না; কিছুটা চক্ষুলজ্জা, কিছুটা করুণা ও দয়াদাক্ষিণ্যÑ এসব নিয়েই নতুন সংসারটিকে সচল রাখতে হচ্ছে ওকে।

এরই মাঝে দেশপতির এমন প্রস্তাব ওর ক্ষুধার্ত মন-মানসিকতায় ঝড় তুলে ফেলল। রাতভোর নির্ঘুম কাটল স্বামী-স্ত্রীর। নিজেদের তোশক পাতা চৌকি-বিছানা শরশয্যা বলে মনে হতে থাকে। দুজনারই বুকভরা অস্বস্তির এলার্জি। সুস্থির হতে দিচ্ছে না কিছুতেই। বারবার মনে হচ্ছে, মাথার উপর দিয়ে সুখ-পাখিটা উড়ে যাচ্ছে; ওকে ধরতে বলছেন দেশপতি; ধরবে কি?

তিনি যত ‘আদর্শচ্যুত হওয়া কি ঠিক?’ বলে প্রশ্ন করে-করে নিজেকে সামলে রাখতে চান তত অভাব-অনটনে দীর্ণ-জীর্ণ আয়েশা ওকে বোঝাতে থাকেন, ‘সুযোগ সবসময় আসে না। তুমি পেয়েছ। ছাড়বে কেন?’

দেশপতি বললেন, ‘দেশে চলে যাও। ইলেকশন কর। আমার লোকজন যা যা করার দরকার সব করবে।’

‘এখন ক্যামন ফিল করছ?’ ওর মুখের উপর চশমা দেয়া একটি  অভিজাত মুখ। ঠোঁটদুটো কেঁপে উঠল। জিহ্বাটা শুকিয়ে কাঠ। চিনতে পারলেও কথা বেরোচ্ছে না।

‘কষ্ট হচ্ছে? কাল সকালেই ক্যাবিনে চলে যাবে। পরশু, ডাক্তার বলেছে, বাসায় যেতে পারবে। বুঝলে?’ আয়েশা বলে উঠলেন।

এসময় রুমটার ভেতর বিকট একটা চিৎকারে সবাই চমকে ওঠে।

‘মইরা যাইতাছি। অ মাগো। অই সালাইম্যা, তুই কই? কই গিয়া বইয়া রইছস? কই তুই মদনার পো?’

নিস্তরঙ্গ কক্ষটির স্তব্ধতা নিমিষে খান খান হয়ে যায়। ধড়ফড় করে ওঠে বুক। মুখ দিয়ে কথা বেরোচ্ছে না; তবু মনে মনে চেঁচিয়ে ওঠে, ‘গার্ড? আমার গার্ড কোথায়? আমি সবাইকে সাসপেন্ড করব? ইডিয়টস কোথাকার?’

জমির উদ্দিন নিজের ভেতর ফিরতে শুরু করেন। একটু একটু করে তিনি  চিনতে পারছেন নিজেকে।

তার পরিচয়Ñ তিনি একজন নেতাÑ ক্ষমতাধর এক এমপি।

ওর করুণা পেলে অনেকেই উজ্জীবিত হয়ে ওঠে। অনেকের হয়ে ওঠার পিছনে ওরই হাত।

‘তুমি ভয় পেয়ো না। ইনি তোমার পাশের বেডের, যন্ত্রণা সহ্য করতে পারছে না তো। তাই নিজের বাড়ির কেয়ারটেকারকে ডেকে উঠছে। প্রাক্তন আইজিপি ছিল। একসঙ্গে তিনটা রিং বসিয়েছে।’ আয়েশা ওর কানে কানে ফিসফিস করে বলে ওঠে।

এবার জমির উদ্দিনের বুঝতে আর অসুবিধা হয় না যে তিনি এখন একটি হসপিটালের কারাগারে বন্দিজীবন যাপন করছেন। এলাকায় বক্তৃতা করতে গিয়ে হঠাৎ করেই বুকে ব্যথা হলো। ইচ্ছে ছিল বামরুনগ্রাদে কিংবা মাউন্ট এলিজাবেথে গিয়ে চিকিৎসা নেবার। ওর যা স্ট্যাটাস তাতে স্থানীয় কোন হাসপাতালে চিকিৎসা নেয়া ঠিক মানায় না। তাঁর মৃত্যু হলেও বিদেশের নামিদামি হাসপাতালে হওয়াটাই বাঞ্ছনীয়। কিন্তু ব্যথাটা এতই ভয়ানক যে গ্রাম থেকে ঢাকার এ হাসপাতালটিতে আশ্রয় নিতে হলো অনেকটা বাধ্য হয়েই। অবশ্য মৃত্যুর হাত থেকে তো বাঁচা গেল আপাতত!

ইচ্ছে আছে, কিঞ্চিৎ সুস্থ হয়ে উঠলেই তিনি বিদেশে গিয়ে বেশ কদিন ফাইভস্টার হোটেল কাম হাসপাতালে থেকে আসবেন। নইলে এত সম্পদ আর এত বৈভবের সার্থকতা কিসের?

জমির উদ্দিন কঁকিয়ে উঠলেন, ‘পানি, একটু পানি।’

আয়েশা সামান্য পানি ঢেলে দিলেন ওর ঠোঁটের ফাঁকে। জিহ্বা স্বাদশূন্য; পানি নাকি এসিড কিছুই বোঝা যাচ্ছে না।

তবে এবার ওর মগজ পুরো কাজ করতে শুরু করেছে। অন্ধকারেও সে নিজের অবস্থানটি স্পষ্ট অনুভব করছে। খুব খারাপ লাগছে। সময়মতো সে বিদেশে গিয়ে চিকিৎসা নিতে না পারার জন্য অপরাধবোধ তাড়া করে ফিরছে ওকে। ওর সহকর্মীদের সবাই যেখানে কথায় কথায় চোখ-নাক-কান-পেট-মন-মুখ সব দেখাতে সরকারি খরচে বিদেশের দামি হাসপাতাল থেকে বেরিয়ে আসে,  সেখানে তিনি কি না দেশি এই হাসপাতলটিতে মড়ার মতো পড়ে রয়েছেন?

গ্রামে গিয়েছিলেন খোঁজখবর নিতে। বক্তৃতা দেয়াটাই ছিল মুখ্য বিষয়। বক্তৃতা দেবার মাঝে সুখ রয়েছে। এ এক মোহের মতো সারাক্ষণ আগলে রাখে ওর মতো নেতাদের। চোখের সামনে জনগণ যত রোদে পেড়ে আর বৃষ্টিতে ভিজে ওর জন্য অপেক্ষা করে দাঁড়িয়ে থাকে খোলা আকাশের নীচে তত মন ভরে ওঠে আনন্দে। গলার জোর তত বাড়ে আর বক্তৃতা তত তেলে-বেগুনে জ্বলে ওঠে। এবারের যাত্রার মূল লক্ষ্য ছিল দলের সবাইকে আশ্বস্ত করা যে আগামীতে ওর দল অবশ্যই ক্ষমতায় আসবে, বক্তৃতা-বিবৃতির মধ্য দিয়ে সেটুকু নিশ্চিত করাই ছিল ওর মূল কাজ।

দুষ্টু এক সাংবাদিক চট করে প্রশ্ন করে বসল, ‘যদি এ দল বেকায়দায় পড়ে তো বি দলে পল্টি খেয়ে ঢুকে পড়বেন কি স্যার?’

‘আমি সেরকম মানুষ নই সাংবাদিক সাহেব। সারাজীবন আদর্শের জন্য লড়ে চলেছি। আমি আপামর জনতার খেদমতগার। আমার সততা নিয়ে এসব প্রশ্ন অবান্তর।’

‘প্রশ্নটা করলাম, কারণ, এর আগেও তো দুবার পল্টি দিয়েছেন। ছিলেন বামপন্থি, হলেন মাঝপন্থি, এখন ডানপন্থি। তাই না এমপি মহোদয়?’

জমির উদ্দিন সেখানে বেশিক্ষণ থাকেননি। এলাকার আলেম-ওলেমাদের নিয়ে একটা ধর্মীয় সভা ছিল, তিনি সোজা চলে গেলেন সেখানে।

আনন্দের সুবাতাস বয়ে গেল অন্তরজুড়ে। এই পড়ন্ত বয়সে এসে এসব বুজুর্গদের সান্নিধ্য এত ভালো লাগে যে ওদের জন্য সব করতে ইচ্ছে করে।

জমির উদ্দিন তখনও হাসে। ধর্মকর্ম নিয়ে একসময় বামপন্থি হবার কারণে কিঞ্চিৎ উদাসীনতা ছিল বটে, এখন আর তা নেই। এ পর্যন্ত অর্জিত অঢেল সব সম্পদের রক্ষণাবেক্ষণ করতে গিয়ে ফুরসত খুঁজে পাচ্ছেন না তিনি। সেখানেই আয়েশার যত আপত্তি। অয়েশা চায় জীবন পুরোটাই হউক আল্লাহনির্ভর। কোরান হউক সমস্ত প্রাত্যহিক প্রেরণার উৎস। সেখানে জমির উদ্দিনের কিছুটা খামতি রয়েছে। সেটুকু পুষিয়ে দেবার তাগিদও রয়েছে ওর ভেতর। কিন্তু হয়ে উঠছে না আর কি।

আয়েশাকে কথা দিয়েছিলেন, মেয়ের বিয়ের পর তিনি পুরোপুরি নিজেকে ইসলামের পথে সঁপে দেবেন।

ডাক্তার জামাইর সঙ্গে একমাত্র মেয়ের বিয়ে হয়েছে তিনবছর। তবু ওর সময় হচ্ছে না দ্বীনের পথে নিজেকে সঁপে দেবার। এমন কী, মেয়েজামাই কিরণ পর্যন্ত পাঁচওয়াক্ত নামাজের একটিও কাজা হতে দেয় না; হাজার ব্যস্ততা থাকা সত্ত্বেও।

আয়েশা আঙুল দিয়ে জামাইকে দেখিয়ে ওকে ভর্ৎসনা করেন,‘দেখো, কচি জামাইটা পর্যন্ত এবাদত-বন্দেগি করে পরকালের জন্য সঞ্চয় করতেছে। আর তুমি বুড়া মিঞা, খালি ওজরআপত্তি করে বেড়াও। তুমার উপর গজব পড়ব আল্লাহমাবুদের। কইয়া দিলাম। হ্যা।’

অথচ বছরপাঁচেক আগেও আয়েশার অত মাথাব্যথা ছিল না ধর্মকর্ম নিয়ে। ওর ছোটবোন নাদিয়া ওকে এপথে টেনে নিয়ে আসে। এখন দুবোন মিলে এসব নিয়ে গবেষণা চালায়। গায়ে হলুদÑপয়লা বৈশাখ বেদাত নাকি বেদাত  নয় , কোন খাবারটা হালাল কিংবা কোনটা হারাম এসব নিয়ে ওদের ভেতর চলে চুলছেঁড়া বিশ্লেষণ। কোন মসজিদের কোন হুজুরের বেশি পড়াশুনা, কোন দরবার শরীফের কোন তরিকতÑওসব ওদের ঠোঁটস্থ।

পোশাক আশাকেও ওরা দুই বোন এগিয়ে রয়েছে; কোন দেশের হিজাব-বোরখা বেশি আরামপ্রদ আর কোন দেশেরটা নয় তাও ওদের অজানা নয়। নাদিয়ার স্বামী ব্যবসায়ী; বছর দুই আগে হজ্বব্রত পালন করে এসেছেন নাদিয়াকে সঙ্গে নিয়ে। ফেরার পর নাদিয়ার মুখ থেকে সৌদি আরবের গল্প আর থামে না। ওখানকার খেজুরের স্বাদ, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাস্তাঘাট, ওখানকার পুলিশি ব্যবস্থা, লক্ষ লক্ষ হাজীদের ব্যবস্থাপনা সব নিয়ে নাদিয়ার গল্প অবিরাম অবিশ্রান্ত ধারায় বইতে থাকে। কথা শুরু হলেই নিজের অগোচরে সে মক্কা-মদিনায় চলে যায়। খেজুর, তসবিহ, জায়নামাজ, জমজমের পানিÑ সব যেন ওর কাছে স্বপ্নময় এক  মোহ হয়ে  রয়েছে। সুযোগ পেলেই বেরিয়ে আসে, ‘‘আপা, কী যে কমু? রোজার দিনে যদি তুমি ওমরাও করতে যাও ওদের দেশে তো তুমার ইফতারি কিনারই ত প্রয়োজন নাই। কত খাইবা তুমি ? ওখানকার মানুষ রোজদারগো মাঝে ইফতারি বিলাইয়া শেষ করবার পারে না।  আহা! একবার রোজার মাসে যাইতে পারতাম?’ নাদিয়া আনমনা হয়ে যায়।

আয়েশার এসব গল্প মুখ বুঁজে শুনতে হয়। সোয়াবের আশায় ছোট বোনের হাত থেকে জমজমের জল, খেজুর, তসবিহ, জায়নামাজ হাত পেতে নিলেও বুকের গভীরে কোথায় যেন একটা কাঁটা খচখচ করতে থাকে। এমপি সাহেবের স্ত্রী হওয়া সত্ত্বেও ওর কেন এখনও হজ্বব্রত পালন করা হয়নি, সেজন্য জমির উদ্দিনের চুল ছিঁড়ে ফেলতে  ইচ্ছে করে। অবশ্য, মালয়েশিয়া, ব্যাংকক ও সিংগাপুরে এমপি সাহেবের সঙ্গে বেশ কবার ঘুরে আসবার সুযোগ হয়েছে আয়েশার। অথচ মুসলমান হিসাবে যে-কাজটি করা সবচেয়ে জরুরি, সেই পবিত্র মাটিই স্পর্শ করা হয়নি ওদের, এই দুঃখে কদিন কথা পর্যন্ত বলেনি আয়েশা স্বামীর সঙ্গে।

এমন কী, স্ত্রীর কণ্ঠে জমির উদ্দিনকে  গালি পর্যন্ত শুনতে হয়েছে, ‘তুমি খ্রিষ্টান নাসারার থেইক্যাও বদ। তুমার লগে কতা কইতেও গুনাহ গুনাহ লাগে।’

খুব মনে পড়ছে একে একে। কোনোকিছু বাদ পড়ছে না। জমির উদ্দিন স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছে নিজেকে।

‘আমি চললাম। আমারে ছাইড়া দে। ঢাকা শওরে আমার পাঁচটা বাড়ি তিনডা ফ্যালেট কোন হালায় দেখব? আমারে ছাইড়া দে হালার পোয়া। আমারে ষড়যন্ত্র কইরা বাইন্দা রাখছস? আমার সম্পত্তি দখলের কারসাজি। সব হালারে আমি শায়েস্তা করুম। ছাইড়া দে আমারে কইলাম।’ কে যেন চেঁচিয়ে উঠল তারস্বরে।

একটা মেয়েলি কণ্ঠ মৃদুস্বরে বলে উঠল, ‘আব্বা, এইটা হাসপাতাল। আপনে চিল্লাইতাছেন ক্যালা? আপনের হার্ট এটাক অইছে। এইখানে থাকন লাগব কদিন।’

‘চুপ থাক মাইয়া। আমি কি তর বুঝ লইয়া চলি? আমার রুকন উদ্দিন ম্যানেজারটারে ডাক। হালায় কদিন ধইরা হিসাব দিতাছে না ক্যালা? আমার বুকে অপারেশন অইছে বইলা কি সব হারাইয়া গেছে? হালার পোরে যেখানে পাছ বিলাইটার মতন ধইরা আন। বহুৎ গড়বড় করনের ছভাব। আমি ছাড়া কেউ হ্যারে টাইট দিবার পারব না। ডাক হালারে, হিছাব দিবার ক?’

‘আব্বা চুপ করেন। বাইপাস অইছে আপনের। ছিইরা যাইব চিল্লাইলে। চুপ করেন।’

‘আমি চুপ তাকলে ব্যবছা চালাইব কেঠা? লেখাপড়া শিখাইয়া ত তগোরে গাছে তুইলা ফেলাইছি। গদিত বইছে তর ভাইজানেরা কেউ?’

‘আব্বা চুপ করেন। আপনের পাশে এক এমপি ছাব আছেন। উনার অসুবিধা হইতেছে।’ মেয়েটি একরাশ বিরক্তিবোধ নিয়ে নিজের আব্বাকে থামাবার চেষ্টা করে।

‘আমি এমপি মন্ত্রীরে থোড়াই কেয়ার করি। বহুত চান্দা দিছি, আর পারুম না। না কইরা দে। হালার পো হাসপাতালেও পিছ ছাড়ে না? এইখানেও চান্দা চায়? হালা মায়রে বাপ।’ চেঁচিয়ে ওঠে বয়স্ক লোকটি।

বড় বড় নিঃশ্বাস নেবার শব্দ কানে এল জমির উদ্দিনের। হয়তো ক্লান্ত হয়ে পড়েছে। লেডি ডাক্তার একজন ছুটে আসে এদিকে। লোকটিকে বোঝাবার চেষ্টা করে কথা না বলতে। তাতেও কাজ না হলে ভয় দেখায় আবার ওটিতে নিয়ে যাবার। এবার কাজ হয়। লোকটি নিশ্চুপ হয়ে যায় ওটির ভয়ে।

জমির উদ্দিনের বড় হাসি পেল। সঙ্গে সঙ্গে দুঃখবোধও। এখানে এই পরিবেশে ওকে রাখা হয়েছে? ভাবতেই নিজেকে বড় ছোট বলে মনে হয়। তিনি এখন মন্ত্রী হবার চেষ্টা করছেন। এ লাইনে অনেকদূর এগিয়ে পর্যন্ত গেছেন। কোন কোন মহল জোরালোভাবে তাকে সমর্থন দিয়ে যাচ্ছে। অথচ এরকম একটা সময়ে তিনি অসুস্থ হয়ে পড়লেন? এটা জীবন গড়বার সময় , অসুস্থ হয়ে পড়ে থাকলে কি হয়? একটা সিমেন্ট ফ্যাক্টরি, দুটো বড় শপিং মল, জমি-ফ্ল্যাট  কেনা বেচার কোম্পানি, কিছু অদৃশ্য আয়-রোজগারÑএসব কি মন্ত্রী হবার কাজে কম প্রভাব ফেলে? এখন উপরমহলের একটুখানি নেকনজর পেলেই তো তিনি হতে পারেন মন্ত্রী।

মনটা বিষণœ হয়ে পড়ল। এরকম একটা দিশি হাসাপাতালের আইসিইউতে পড়ে থাকার যাতনায় মনটা টনটন করে ওঠে ব্যথায়।

এসময় আয়েশার মুখটা ভেসে উঠল ওর চোখের সামনে। ফিসফিস করে আয়েশা  বললেন, ‘কিছু বলবা?’

‘আমি মরতে চাই না আয়েশা। আমার উন্নত চিকিৎসা দরকার। তুমি আমারে বামরুনগ্রাদে নেয়ার ব্যবস্থা কর।’

‘আল্লাকে ডাক। হায়ত মউত সব আল্লাহপাকের হাতে। ডাক্তার বলেছে, তুমার শরীর এখন ভালো। কালই ওরা তুমারে ছেড়ে দেবে।’

‘আমি যা বলছি তাই কর। এদের আমি বিশ্বাস করি না।’

আয়েশা চুপ করে থাকেন কিছুক্ষণ। তারপর একটা বড় দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে উত্তর দেন, ‘ঠিকা আছে।’

জমির উদ্দিন আর কথা বলেন না। একটুতেই জিহ্বা শুকিয়ে কাঠ। তিনি চোখ বুঁজে ফেলেন।

এসময় ওর চোখের সামনে বিদেশি হাসপাতাল ও  ডাক্তার-নার্সরা চলাফেরা করতে থাকে। মনে হচ্ছে ওরা ওকে আদর করে ডাকছে, ‘আয় আয়। আমার এখানে আয়। মরে গেলেও সাতদিন বাঁচিয়ে রেখে দেব তোকে। যন্ত্রপাতি তোকে শেকড়ের মতো আগলে রাখবে। কিছু টাকাকড়ি খরচ হবে এই যা। তাতে কি? টাকাকড়ি দিয়েই তো স্ট্যাটাস ক্রয় করতে হয় । এটুকু এখনও বুঝিস না? আয় আয়।’

আয়েশার মুখটা ফের ভেসে উঠল ওর মুখের উপর। বলল, ‘তুমি চিন্তা করবা না। সব ব্যবস্থা হচ্ছে। তুমার জামাই সব করে দিচ্ছে।’ চোখেমুখে আদর চুবানো আঙুল বুলিয়ে দেয় আয়েশা।

নিমিষে আবেগতপ্ত হয়ে পড়ে জমির উদ্দিন। ওর হাত-পা বাঁধা, কুঁচকির নীচে টনটনে ব্যথা। একটুও নড়াচড়ার উপায় নেই। কণ্ঠতালু শুকিয়ে কাঠ। তবু সে মরিয়া হয়ে বলে ওঠে, ‘এইবারের হজ্বটা আর মিস অইব না দেইখ। তুমারে আর কষ্ট দিমু না। মন্ত্রী হইয়াই তুমারে লইয়া হজ্বে যামু। কতা দিলাম।’ চোখ বেয়ে অশ্রু ঝরে জমির উদ্দিনের।

‘তুমি ভালো হইয়া নাও। আল্লাহকে স্মরণ কর।’ জমির উদ্দিনের একসময়ের সহপাঠী ও স্ত্রী ওকে শান্ত রাখার চেষ্টা করেন।

জমির উদ্দিন সহসা স্ত্রীর হাত জড়িয়ে ধরে ভেঁউ ভেঁউ করে কেঁদে ফেলেন, ‘মন্ত্রী না অইয়া আমি মরবার চাই না আয়েশা। আমি মন্ত্রী অইবার চাই একবার।’

অয়েশা আর কথা বাড়ান না। নীরবে স্বামীর মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে থাকেন আইসিউ-র ভেতর।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

You may have missed

shares