বড় গল্প

গোপনীয়তার অলিগলি

মাহবুব আলী

 

‘হে…হেহ্…হেহ্!’

রাত ভোর। খাদেমুল বেশ জোরে জোরে কোপানো শুরু করে। কোপের তালে তালে নাক-মুখ দিয়ে ভোঁস ভোঁস করে আওয়াজ উঠছে।

রাহেলার দুচোখজুড়ে রাজ্যের ঘুম। ভোরে দুধের সরের মতো মোলায়েম আর গাঢ় হয়ে আসে সব। দৃষ্টি মেলে দিতে ইচ্ছে করে না। তারপরও উপায় নেই। কথা বলতে পারে না। আপত্তি তো দূরের কথা। সে শুধু একটু নড়ে ওঠে। পুরানো দিনের পুরানো কাঠের পালঙ্ক। ক্যাঁচ ক্যাঁচ শব্দ তুলে যায়। অবশেষে পিটপিট করে চোখ খুলে মৃদুস্বরে অস্বস্তি ঝেড়ে দেয়।

‘কী করো এই সাত-সকালে? আশপাশের লোকজন জেগে উঠবে যে! কি লজ্জা কি লজ্জা!’

‘এটা নাগরিক জীবন রাহেলা। কার বাড়িতে কী হচ্ছে, কে কোথায় কী করছে; এসব হিসাবের মধ্যে নিলে চলে? কেউ নেয়ও না।’

তারপর আবার কোপ। আবার। আর সেই ধ্বনি। খাদেমুলের কপাল বেয়ে ঘাম নামে। শরীর থেকে বিদ্ঘুটে গন্ধ। দুর্গন্ধ। ওয়াক। রাহেলা কী করে? অবশেষে পালঙ্ক থেকে আস্তে করে নেমে পড়ে। ধীর পায়ে বারান্দায় এসে দাঁড়ায়। ছবি ঘুমিয়ে আছে। তার কানে এ শব্দ যায় না। মেয়ের গভীর ঘুম। রাহেলা মায়াময় মুখের দিকে তাকিয়ে আপ্লুত হয়। অনেক কাজ। সকালের নাস্তা। মেয়ের জন্য টিফিন। তবে এত তাড়া নয় যে, ভোরবেলা ঘুম ছেড়ে দিতে হয়। খাদেমুল কোপায়। ধাস ধাস ধাস শব্দ। মুখ দিয়ে হুংকার।

সকালের আলো ঠিকমতো ফুটতে এখনও আধঘণ্টা কি চল্লিশ মিনিট বাকি। অথচ এত ভোর থেকে লোকটি এসব কাজ করে। ছোটলোক, জাত ছোটলোক। কিন্তু উপায় নেই। কথা বলা যায় না। স্বামী বড় ধন। মাথা গোঁজার ঠাঁই। একে নিয়ে কাটাতে হবে জীবন। সারাজীবন। তাই তার কাজে বাধা দিয়ে কি লাভ?

‘কয়টা পেলে আজ?’

‘গুনে দেখিনি। হবে হয়ত পঁচিশ-ত্রিশ। গুপ্তধন, বুঝলে তোমার বাবা গুপ্তধন রেখে গেছেন।’

খাদেমুল কথা বলতে বলতে মাটির গর্ত হাতড়ায়। অনেক যতেœ তুলে আনে গুপ্তধন। পোড়া মাটি ইট। ইটের মধ্যখানে খোদাই… পিডিবি। এখন ইটের হাজার কত? জানা আছে তার। এক একটি ইট আট টাকা। শালটিগুলোই তো সাড়ে ছয়-সাত হাজার টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। তার ঠোঁটে হাসির সূক্ষ্ম রেখা। সত্যি গুপ্তধন। শ্বশুর সাহেব যা করে রেখেছেন, অতীব বুদ্ধিমান।

আর কয়েকদিন কোপালে হাজার পার হয়ে যাবে। তারপর আবার। সেগুলো দিয়ে দক্ষিণের কোণায় একটি রুম। ছবির জন্য। দেখতে দেখতে মেয়ে যে ডাঙ্গর হয়ে উঠল। ক্লাস ফাইভ শেষ করেছে। মেয়েরা খুব দ্রুত বড় হয়ে যায়। বদলে যায় চেহারা আর শরীর কাঠামো। তাই ক’বছর গেলে নতুন হিসাব কষতে হবে।

হিসাবের গণনায় তার দক্ষতা আর অভিজ্ঞতা কম নয়। গ্রামের স্কুল শেষ হতে না হতে বাড়ি ছেড়ে শহরে এসেছে। একলা রাস্তায় হিসাবের সেই শিক্ষা আরও মজবুত তার। জীবন হলো হিসাবের খাতা। গানের খাতা নয়। জীবন হলো জুয়া। সতর্ক থাকতে হয় প্রতিটি মুহূর্ত। আলাদিনের প্রদীপ কারও হাতে থাকে না যে, জিন এসে সব করে দিয়ে যাবে। হিসাব বুঝে গুনে গুনে পা ফেলতে হয়। তার কপাল অবশ্য এই গুণের সঙ্গে ম্যাজিক মানিকজোড়। দেখে দেখে গুনে গুনে পনেরো বিঘে জমি, একটি মাছভরা পুকুর, শহরের বাড়ি আর ফাউ হিসেবে রাহেলা। বয়স একটু বেশি। আগে একবার বিয়ে হয়েছিল। কোন পাগলা কে জানে। কি তার আফশোস! মাস ছয়-সাতের মধ্যে একদিন ট্রাকের নিচে বুক পেতে দিল। আহ-হা হা! হক সাহেবের দুই নম্বর মেয়েটি অকালে বিধবা হয়ে গেল! মানুষের চোখে-মুখেও বিষণœ ছায়া। মেহেদির রং মুছে যায়নি। মিলিয়ে যায়নি কাঁচা হলুদের ঝাঁজ। সেই মেয়ের কপালে এমন! খাদেমুল পরে কিছু গুজব শুনেছিল, সত্য-মিথ্যে কতটুকু কে জানে, তবে যা রটে তার কিছু তো বটে! বিশ্ববিদ্যালয়ে কয়েকজন মঘা ছিল রাহেলার। কোথায় কি করেছে, সে কাহিনি কি; না তাকে ঠকানো হয়েছে। সে প্রতারিত মানুষ। সেই গল্প শুনেই হয়ত দুঃখে দুঃখে আমিনুল স্বেচ্ছায় মরেছে। পুওর ম্যান। বিয়ে করলে আর পেছনে তাকাতে হয়? কোন্ মেয়েমানুষ বিয়ের আগে কোথায় কী করেছে, কাকে কাকে লাট্টু-চক্কর খাইয়েছে, কতবার এমআর বা ডিএন্ডসি করিয়েছে এমন গবেষণা করলে দুঃখ ছাড়া কি মিলবে? নরক হয়ে যাবে সবকিছু। তুমি মিয়া কিছু করো নাই? নিজের বেলায় ষোলো আনা আর অন্যের বেলায়…।

আতিকুল হক কি করেন! কথা যা সরাসরি। খাদেমুল সামনে বসে আছে। তার পাশে একটু দূরে চুটকি-দাড়ি ঘটক মুন্সেফ আলি।

‘মেয়ের নামে ধানিজমি পনেরো বিঘা। একটি পুকুর, দেড় বিঘার মতো। শহরে আধা-কমপ্লিট বাড়ি…বাইশ শতক জায়গা।’

‘সরকারি না হোক, বেসরকারি কলেজে-টলেজে একটা চাকরি নিয়ে দিতে হবে। কে জানে মেয়ের পেটে কিছু আছে কি না!’

আতিকুল হক ধৈর্যশীল মানুষ। সহজে দমে যান না। কিন্তু যে পাত্র বিয়ের আগেই এমন সন্দেহ পোষণ করে…না না চলবে না। মুন্সেফ আলি হকচকিয়ে ওঠে। বড় বেহায়া লোক খাদেমুল মিয়া। অনেক ছেলে অনেক মেয়ের বিয়ে দিয়েছে। ছয়কে নয়…নয়কে ছয়, সব চলে আজকাল। কিন্তু কথা হয় রয়ে-সয়ে। এত ন্যাংটো নয়। এ লোক পিকিউলিয়ার কেস। পদে পদে হিসাব কষে। কৃপণও বটে। মেয়ে দেখা, বিয়ের আলাপ, মানুষ অত্যুৎসাহে নানা পদের তিন-চার কিলো মিষ্টি কিনে ফেলে। আর এ লোক সেই আদ্যিকালের রসে জবজবে রসগোল্লা। সেও সাড়ে সাত’শ গ্রাম। রেস্তেরাঁয় দুই-পাঁচ টাকার জন্য সে কি জোরাজুরি! অনেক পাত্রপাত্রি, তাদের অভিভাবক মোটা টাকা দেয়। এ লোক হাতে দিয়েছে মাত্র একশ টাকার দুটি নোট। অবশ্য কাজ হলে এক-দু হাজার দেবে বলেছে। সে হতাশ বিব্রত মুখে মেয়ের বাবার দিকে তাকিয়ে থাকে। অনেক ধনী মানুষ আতিকুল হক। কী বলেন কে জানে! মুন্সেফ আলির চোখে-মুখে হতাশা। বড় একটা দাও মারা যেত। সব বিফলে যেতে বসেছে।

‘চাকরির কথা তো বলতে পারব না বাবা। সেটা আপনাকে খুঁজে নিতে হবে। ডনেশন যা লাগে, দেয়া যাবে।’

ব্যস আর কি চাওয়া পাওয়া, লেনা-দেনা থাকতে পারে? রাজকন্যা আর রাজ্য দুটোই যখন হাতের কাছে। এক সপ্তাহের মধ্যে দুইয়ে দুইয়ে-চারে চারে হাত মিলে গেল। টাকা থাকলে কি না হয়! এখন খাদেমুল অনেকটা পোষা কুকুরের মতো লেজ নাড়ে। শ্বশুর বাড়ির ধারেকাছে একটি ফাযিল মাদরাসার সাধারণ বিভাগের প্রভাষক। কাজ বা চাকরি জুটিয়ে দেয়া হয়েছে। আতিকুল হক জমি বিক্রি করে গুনে গুনে চার লাখ টাকা দিয়েছেন। প্রিন্সিপাল আত্মীয় মানুষ। খাদেমুল যথাসময়ে এন্ট্রি দেবে, ক্লাস নেবে; তারপর চলে যাবে। শহরের বাসায় কয়েক শিফট কোচিং চলে। এ তার আগের পেশা। সেটি বাদ দেয়া যাবে না। খাদেমুল কোচিং মাস্টার থেকে প্রভাষক হয়ে গেল। দরজায় নেমপ্লেট বসিয়ে দিল একদিন। মাদরাসা হয়ে গেল কলেজ। মাদরাসা বলতে তো সেই প্রতিষ্ঠান বোঝায়, যেখানে একদল হুজুর টাইপের মানুষ থাকে; তারা গরিব মানুষের ছেলেমেয়েদের ‘আলিফ যবর আ, বে যবর বা’ শেখায়। ছোট ছোট ছেলেমেয়েরা দলবেঁধে মাথা ঝুঁকিয়ে দুলে দুলে পড়ে। তারপর কোথাও চল্লিশা বা মিলাদের দাওয়াত পেলে হুড়মুড় করে হাজির হয়। খাদেমুলের শরম করে। কলেজ-টলেজ হলে ভালো হতো। অগত্যা কি আর করা! নেমপ্লেটে ফাযিল মাদরাসা শব্দ দুটি কেটে ডিগ্রি কলেজ লিখে দেয়। সমাজে ভারিক্কি মর্যাদা আসে। সকালের দুই শিফট কোচিং শেষ করে বাস ধরে। দুপুরে ফিরে এসে দম নিতে না নিতেই পরপর দুটি শিফট। পরীক্ষার সিজনে রাতেও আরেক শিফট। রাহেলাকেও বসিয়ে রাখেনি। বিয়ের দু-তিন মাস যায়নি, একদিন বলে উঠে,-

‘তুমি তো বায়োলজি বোটানি পড়াতে পারো। আমার সাথে সাথে পড়াবে। শহরে বেশকিছু কোচিং সেন্টার আছে, আমার জানাশোনা; সেখানে দু-একটি ক্লাস নিলে নগদ টাকা।’

রাহেলা কি বলে! এ লোক অদ্ভুত! টাকা ছাড়া কিছু বোঝে না। হিসাবের আদায় কড়ায়-গ-ায় নিতে ব্যস্ত। নইলে বাসর রাতে টর্চ জ্বালিয়ে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে কী দেখে? সেই রাতও এল বিয়ের কুড়ি দিন পর। খাদেমুলের এক কথা। নতুন বউকে এমন কথা কেউ বলে? কোনো সংকোচ বা লাজলজ্জা নেই। কত সহজে বলে ফেলল, ‘তোমার পিরিয়ড মাসের কোন তারিখে হয়েছে?’ তারপর অপেক্ষা। অবশেষে সেই রাতে আরব্যরজনীর কাহিনি। রাহেলার মনে হয় কোনো তামাশা। ভেবেছিল লোকটি জীবনের প্রথম মেয়েমানুষ দেখছে। যদিও তেমন মনে হয় না। ঘাগু মানুষ। সে চুপ করে থাকে। দেখা যাক কী হয়! পুরুষ মানুষ, নারীর প্রতি অদম্য কৌতূহল আর আকর্ষণ থাকে। কেউ কেউ এই রাতের জন্য দীর্ঘকাল অপক্ষো করে। তার দ্বিতীয় বাসর নাকি কত কে জানে। মনে করতে চায় না। জীবন নতুন করে শুরু হোক, ভালোভাবে কেটে যাক; এই প্রার্থনা তার। সে লোকটির কা-কারখানা দেখে অবাক। দেখা নয়-পরীক্ষা। অন্ধকার ঘর। হাতড়ে হাতড়ে টর্চ খুঁজে জ্বালিয়ে তাকে দেখতে শুরু করে। তারপর চলে ভয়ংকর প্রশ্নবাণ। রাহেলা হিস হিস করে চিৎকার দেয়।

‘করেন কি? বন্ধ করেন… বন্ধ করেন। উম্মা!’

‘দাঁড়াও দাঁড়াও একটু। এই তোমার বোঁটা এত কালচে কেন? ফরসা মেয়েদের তো…পেটের সাইডে ফেটে যাওয়া কুঁচকানো দাগ? তোমার বাচ্চা হয়েছিল? সে কোথায়? নাকি গর্ভপাত? কয় মাসের? এসব তো বলেনি কেউ। ঠকবাজ মানুষ।’

‘কিছু হয়নি তো আমার।’

‘মিথ্যে বলছ তুমি।’

‘মিথ্যে বলব কেন? আমার তো আগে বিয়ে হয়েছিল। সে মানুষ তো দেবতা ছিল না যে চেখে দেখেনি।’

‘দেবতা বলো আর দৈত্য, সব শালা মামদোবাজ; চান্স পেলে কে ছাড়ে?’

রাহেলার ইচ্ছে হয় জিজ্ঞেস করে, ‘আপনি কতগুলো চান্স মেরেছেন? কোচিং সেন্টারে তো অনেক ছাত্রী আসে। দেখতে সুন্দরী থাকে কেউ কেউ। তাদের কাউকে কিছু করেন নাই এমন তো নয়।’ কিন্তু কিছু বলে না। যে লোক বিয়ে করতে এতকিছু দেখে, হিসাব কষে কি কি পাওয়া যাবে; আর যা হোক সে চান্স-মিঞা না হয়ে যায় না। তখন খাদেমুল তার বুকে চেপে বসেছে। সে দম নিতে নিতে ফিস ফিস করে,-

‘টর্চ বন্ধ করবেন!’

খাদেমুল টর্চ নিভিয়ে কানের কাছে বিড়বিড় করে,-

‘শালা ডাল মে কুছ কালা হ্যায়। তোমার আগের লোক কিছু রাখেনি আর।’

রাহেলা মাথা কাত করে বুঝে নেয়, এই জানোয়ারের সঙ্গে জীবন কাটাতে অনেক মূল্য দিতে হবে। অনেক কষ্ট হবে তার।

তারপর একদিন দুপুরে দুজনে রাস্তায় বের হয়। খাদেমুলের তর সইছে না। ততদিনে বাসায় শিফট হয়েছে কোচিং সেন্টার। সকাল সাতটা থেকে আট, আটটা থেকে নয়। দুই শিফটে পঁয়ত্রিশ-চল্লিশজন ছাত্রছাত্রী। সিজন পিরিয়ডে পঞ্চাশ-ষাটজন। মাস গেলে সাড়ে দশ কিংবা এগারো-বারো, সিজনে পনেরো-আঠারো হাজার টাকা আসে। সে জানে টাকা কি জিনিস! টাকা হলো ঈশ্বর। তার ক্ষমতা অনেক। কালোকে সাদা…অচলকে সচল খুব সহজে করতে পারে। রাহেলা যদি দিনে দু-একটি ক্লাস নিয়ে একশ-দুশ টাকা ঘরে আনতে পারে…মন্দ কি! বেশ হয়…আনুক না। তারপর গণেশতলা মডার্ন মোড়ের পশ্চিম পাশে বর্ণমালা কোচিং সেন্টার। দূরের পথ অথচ একটি রিকশা বা অটো ডেকে নিল না। রাহেলা কোন আবদার করে! চার মাস চলছে। কচ্ছপের মতো থপ থপ হেঁটে পার হয়ে আসে আধ-কিলো রাস্তা। মাথার উপর গনগনে রোদ। ক্লান্তি বাড়ে। বাড়ে নতুন কাজের বোঝা। পরিচালক জানা-শোনা পরিচিত মানুষ। খাদেমুলের সব কথা অনুরোধ শুনে অবশেষে বলে,-

‘আপাতত তিনদিন তিনটি ক্লাস চালান। প্রতিটির জন্য পঞ্চাশ, তবে পরের মাস থেকে পেমেন্ট।’

‘হ্যাঁ হ্যাঁ চলুক। শুরু তো হোক। আপনারাও দেখেন, সেও বুঝে নিক; তারপর না হয় ছয়দিন ক্লাস নেবে।’

খাদেমুল খুশিতে আটখানা। রাহেলা কিছু বলতে পারে না। সে মুহূর্তখানেক ভাবলেশহীন দৃষ্টিতে তার দিকে তাকিয়ে থাকে। সপ্তাহে সাড়ে চারশ টাকা। এই সামান্য কয়টি টাকার জন্য লোকটির দুচোখ দিয়ে লালা ঝরছে। এত টাকা কী করবে সে? দু-দিনের পৃথিবীতে ভালোভাবে চলার মতো পর্যাপ্ত সহায়-সম্পদ তাদের আছে। তারপরও টাকা আর টাকা। জাত ছোটলোক! সে টাকাও যদি খরচ করে। এখানে জমা করে। ওখানে সুদে খাটায়। দ্রুত ধনী হওয়ার সকল কৌশল প্রয়োগ করতে ছাড়ে না। ভোগ-বিলাসে নেই। কৃপণ…হাড়কৃপণ। আর তার যে সময়ে একটু বিশ্রাম, ভালো খাবার দরকার; একটি পয়সা খরচ করে না। এই যে এতটা রাস্তা, একটি দিন রিকশাভাড়া হাতে তুলে দিল না। বলল না, ‘তোমার কষ্ট হচ্ছে না তো?’

খাদেমুল বাথরুমে ফ্রেশ হতে থাকে। রাহেলা ভাত, ডাল, ভাজি অথবা নিয়ম মতো যা যা রান্নার একে একে সব করে। এরই মধ্যে বাড়ির কোচিং-এ একটি বা দুটি ক্লাস নেয়। ছবিকে স্কুলের জন্য রেডি করে। রাস্তায় গিয়ে ঠিকে করা রিকশার জন্য অপেক্ষায় দাঁড়ায়। মেয়েকে তুলে দিয়ে ঘরে এসে খেতে বসে। এখন তাকে ছয়দিন যেতে হয়। দুটি করে ক্লাস। দিনে দেড়শ টাকা। সপ্তাহে নয়শ। মাস দুয়েক হলো, নিজের নামে অ্যাকাউন্ট করেছে। খাদেমুলের এককথা। এক হিসাবে এত টাকা থাকা ঠিক নয়। মানুষের দৃষ্টি খারাপ। সরকার থেকেও চাপ আসতে পারে…বলবে আয়কর দাও। যদিও সে-সব নিয়ে তেমন কোনো আপদ নেই। তবে চেক-বই তার কাছে জমা থাকল।

হাজার কাজ। এতসব ঠিক ঠিক করার পর কখনও বাপের বাড়ি যেতে হয়। খাদেমুলের প্রশ্ন, সম্পত্তি ভাগ-বাটোয়ারা কবে হবে? শ্বশুর সাহেব কি দুই শত বছর বাঁচবেন? কোনো আলোচনা হচ্ছে কি? এদিকে সকলকিছু যে সম্বন্ধি আয়েজুদ্দিন গাজা-ভাঙ খেয়ে আর ফুর্তি করে উড়িয়ে দিল! এসব কথা শুনতে ভালো লাগে না। কিন্তু বলার কিছু নেই। বাবার সম্পত্তি জমিজমা ফারায়েজ অনুসারে তিন মেয়ে আর এক ছেলের মধ্যে বণ্টন করে দিলেই ভালো। এতে সকলের স্বস্তি হবে কিনা জানা নেই, তবে খাদেমুল একটু ঘুমোতে পারে।

এদিকে খাদেমুল প্রতিদিন সকালে মাদরাসায় যায়। শ্বশুরের নাম-ডাকে তারও খাতির জোটে। মানুষ সম্মান করে কথা বলে। কেউ কেউ কাছে ডেকে চা খাওয়ায়। তারপর প্রায়শ অন্যের পয়সায় চা খেলে তো হয় না, নিজেকেও খরচ করতে হবে। অথবা অন্য কোনো ভাবনায় একটু একটু করে সীমারেখা টেনেছে সে। মাদরাসার প্রিন্সিপাল আবু তালেব শ্বশুরের দুঃসম্পর্কের ভাতিজা। বয়স্ক লোক। কথা রেখেছে। লাখ চারেক টাকা খরচ করে জুটিয়ে দিয়েছে প্রভাষকের চাকরি। অনেক সুযোগ-সুবিধা। তার ক্লাস সকালে শিডিউল করে দিয়েছে। সে ক্লাস পর্যন্ত থাকে। তারপর বাস ধরে শহরে। বাড়িতে কোচিং চালাতে হয়। শ্বশুরের দেয়া পনেরো বিঘা জমি লোক দিয়ে চাষ-আবাদ করায়। মাঝখানে বর্গা দিয়েছিল, কিন্তু মন কেমন কেমন করে। সন্দেহ জেগে ওঠেÑ হয়ত সে লোক ঠকাচ্ছে। গ্রামের মানুষ আস্ত টাউট, ধড়িবাজ; ধরা মুস্কিল। সে বাস থেকে নেমে এক দোকানে রাখা সাইকেল নেয়। কোনোদিন ঠিকে করা লোককে ডেকে বীজ, সার, কীটনাশকের জন্য খরচ দেয়। কোনোদিন শহর থেকে কিনে নিয়ে ওই লোকসহ ক্ষেতে কাজ করে। পুকুরে লোক লাগিয়ে মাছ মারে। বিক্রি করে বেশ মোটা টাকা হাতে আসে। কোনোদিন সাইকেল ঠেলে শ্বশুরবাড়ি গিয়ে হাজির। প্রথম প্রথম ভালোই যতœ-আত্তি হতো। এখন কম কম মনে হয়। তারপরও নানাপদের তরকারি দিয়ে পেট ভরে খায়। শাশুড়ি নয়তো সম্বন্ধির বউ রিতা বেগম বসে বসে খাওয়ায়। হাতপাখায় মিঠেল বাতাস তোলে। এক-আধটু বিব্রত যে হয় না সে নয়। কেননা তার প্লেটের দিকে অলক্ষ্যে গভীর মনোযোগ রাখে কেউ। এটা ওটা তুলে দেয়। শাশুড়ি বলে,-

‘জামাই খান বা খান।’

রিতা বেগম বলে,-

‘ভাই এটা খেলেন না যে! টাটকা মাছের মাথা। শহরে কোথায় পাবেন? খান।…দইটুকু খান। আমি করেছি খেয়ে বলেন।’

খাদেমুল সবটুকু খায়। খেতে বসে আহম্মকের মতো লজ্জা করতে নেই। এতে সমূহক্ষতি…আপশোস। আর এভাবে যেতে যেতে একদিকে ফিকে হয়ে আসে আদর, অন্যদিকে বাড়ে। নজর এড়ায় না তার। রিতা বেগমের সঙ্গে সম্বন্ধি আয়েজুদ্দিনের বনিবনা নেই। তিন তিনটি সন্তান জন্ম দিতে দিতে অবসন্ন বউয়ের মধ্যে আর কোনো মজা পায় না সে। কয়েক মাস হলো ফুলবাড়িতে কলেজ মেলা হলো। সেখানে এক ছুকরির সঙ্গে ভাব হয়ে গেছে তার। কতদিন বন্ধুদের সঙ্গে চানাচুর চিকেন ফ্রাই আর বোতল হয়েছে, মাঝে মধ্যে গরিব গৃহস্থ বাড়ির বউ-বেটি বা ভাসমান পথকলি। দুনিয়া কা মজা লে লো টাইপের আয়েজুদ্দিনের মনমেজাজ সব পালটে দিয়েছে সেই মেয়েমানুষ। ঘর ছেড়েছে, বউ ছেড়েছে; ছেড়েছে সন্তান। এখন তার পেছনে পেছনে স্বজন মানুষ ঘুরে চলে। আতিকুল হক বলেন, ‘আওরাত কা মক্কর…ঘোড়ে কা চক্কর।’ সে যতই চক্কর বা ঠক্কর খাক না কেন, ভাবি ভুলবার নয়। আয়েজুদ্দিন ঘরে ফেরে না। খাদেমুল শোনাকথায় কান পাতে। এরমধ্যে কতটুকু সত্য কতটুকু মিথ্যে হিসাব করে বুঝে নেয়। শহর থেকে মাদরাসার পথে বাস থেকে নেমে মোড়ের মাথায় পরিচিত কাউকে দেখে পরিমাপের চেষ্টা করে নেয় সেদিনের অবস্থা। আর কোনো নতুন খবর আছে কি না! রায়হানের টেইলরিং দোকানে সাইকেল থাকে। সেটি বের করতে করতে সকালবেলায় জিজ্ঞাসা ছুঁড়ে দেয়,-

‘নতুন কোনো খবর আছে না কি রায়হান?’

রাত জেগে জেগে কাজ করে রায়হান। দুচোখে ঘুমের ক্লান্তি অথবা নিমের দাতন ঘষছে দাঁতের উপর, একমুখ থুতু বাইরে ফেলে জবাব দেয়,Ñ

‘না স্যার খবর ওইংকাই। একদিন যায়া দেখেন না কেনে, কী অবস্থা।’

খাদেমুল কী বলে? সব বিষয়ে নাক গলানো ঠিক নয়, এবং যেহেতু শ্বশুরবাড়ির কেউ কিছু বলেনি, সে কিছু দেখেনি বা শোনেনি। নইলে বেশকিছু মালামাল হাতে এসে যায়। সে সুযোগের অপেক্ষায় থাকে। সুযোগ এসে গেল একদিন। মাদরাসা থেকে ফিরে রায়হানের দোকানে সাইকেল রাখতে খবর পেল সে। শ্বশুর ডেকেছেন। সেখানে গেলে দুপুরের খাবার না খেয়ে কেউ আসতে দেয় না।

সেদিন পশ্চিম বারান্দায় খেতে বসেছে। শ্বশুর সঙ্গে বসেছেন। শাশুড়ি পরিবেশনে। আকাশে জ্যৈষ্ঠের রোদ। ঘরের ভেতর থেকে পাকা আম-কাঁঠালের গন্ধ ভেসে আসে। শাশুড়ি অনেক মনোযোগের সঙ্গে পাতে এটা ওটা তুলে দেয়। খাদেমুল দেখে দু-জনেরই চোখ-মুখ শুকনো। নিজেদের সঙ্গে যুদ্ধ করছে। মেঘ জমেছে মনে। বৃষ্টি ঝরবে কিংবা বজ্রপাত। ঠিক কি হতে পারে, কোনোকিছু ঠাহর করা গেল না; তবে কিছু তো আছে। সে অপেক্ষা করে। জানা জিনিস দ্বিতীয়বার জানার মধ্যে কোনো মজা নেই। মজা অন্যখানে।

‘বাহে জামাই, একটা কথা বলি বলি করি বলা হয় না… আপনে ফির রাগ করিবেন না কি?’

‘কি যে বলেন বাবা! রাগ করব কেন? বলে ফেলেন বলে ফেলেন। কী বিষয় বলেন তো?’

‘না তেমনকিছু নয়, আবার অনেককিছু।’

আতিকুল হক দম নেন। খাদেমুলের পাতে কাতলার মাথা এসে পড়ে। শাশুড়ি তাকে খুব আদর-সম্মান করে। কথায় বলে, জামাই যতদিন খুশি… মেয়ের জীবন ততদিন নিশ্চিত আনন্দময়।

‘কথা হলো কী, আয়েজ তো আপনার কথা শোনে; একটু কথা বলেন তো…ঘরে বিয়া করা বউ আছে। পনেরো-ষোলো বছরের সংসার। এসবের মধ্যে যাত্রাদলের মেয়েছেলে নিয়া কী করোছে সে? এসব কী? তিন তিনটা মেয়ের বাপ। পরির মতো সুন্দর। তাদের বিয়া দিতে হবে না? মানুষ তার কাজকারবারে ভালো বলছে? এমন বাপের মেয়েকে কে বিয়া করবে?… এসব একটু বোঝান বাবা।’

‘বুঝতে পারছি। জি আলাপ করব। এ ঘটনার কথা তো আমাকেও শুনতে হয়। বড়ভাই হয়…কী বলি! কী করি! আচ্ছা আমি কথা বলব। চিন্তা করবেন না। এরমধ্যেই গল্প করে আসব আমি।’

শাশুড়ির মুখ গুমোট আকাশের মতো ভার ভার। কোনো অনন্ত প্রত্যাশায় তার মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে। সেখানে এবার হয়ত কিছু আলোক এসে দাঁড়ায়। এরপর আলোচনা সভা শেষ হলে, রিতা বেগম খয়ের জর্দা দিয়ে পান সাজিয়ে হাতে দেয়। খাদেমুল মুখে পুরে সাইকেলে হাত রাখে। যেতে হবে। বাড়ির দরজার কাছে আসতে আসতে শাশুড়ি বড় থলে হাতে এগিয়ে আসে। নিশ্চয়ই ওর মধ্যে পুকুরের তাজা মাছ, বাড়িতে পোষা-মুরগি, বাগানের সবজি কিংবা পাকা আম আর ঠান্ডা পানীয়’র পুরোনো বোতলে গাভির দুধ রয়েছে। এ হলো তার বাড়তি লাভ। এখানে এলে কোনোদিন শূন্যহাতে ফিরতে হয় না। কিছু না কিছু পেয়ে যায়। সেদিন সে যখন সাইকেলের হ্যান্ডেলে থলে সাজাতে ব্যস্ত, শাশুড়ি আলগোছে হাতে কিছু গুঁজে দেয়। খাদেমুলের সতর্ক অভিজ্ঞ শিক্ষা, হাতে যে কিছু মাল চলে এসেছে বুঝতে অসুবিধা হয় না। অনেকদিন পর শ্বশুরবাড়ি থেকে কিছু টাকা পাওয়া গেল। বাসে বসে সে খামটি খোলে আর দেখে হাজার তিনেক টাকা। বাসের জানালা দিয়ে অবাধ বাতাস মনকে আরও ফুরফুরে করে দেয়। ঘরে ফিরে সেটি রাহেলার হাতে দিতে দিতে বলে,-

‘কাল আমার অ্যাকাউন্টে জমা করে দিও তো।… আর শোনো তোমার ভাইয়ের কীর্তি!’

‘সে আর আমি জানি না? নিশ্চয়ই ভাবির মধ্যে কিছু ব্যাপার আছে।’

‘কি যা তা বলছ? ষোলো বছর ঘর-সংসার করার পর গলদ বেরোল? ভাবি তো অনেক শান্ত-শিষ্ট মানুষ। চেহারা-সুরত-স্বাস্থ্য মাশআল্লাহ। তিন-তিনটা মেয়ের মা, এখনও শরীর কাঠামো কত সুন্দর-মজবুত। তোমার ভাইটাই আসলে লম্পট মানুষ…চরিত্রহীন।’

রাহেলা কথা বাড়ায় না। যে লোক অন্যের স্ত্রীর শরীর কাঠামো পরিমাপ করে, সে যে কত চরিত্রবান; এমন প্রশ্নও রাখে না। আর কোথায় কি ঘটেছে, মা-বাবা কী বলল কোনোকিছু জানার আগ্রহ হলেও ধৈর্য থাকে না।

‘তোমার ভাই যাত্রাদলের নটি নিয়ে মিশনরোডে বসবাস করছে। নটি বোঝো? আজকাল মেলাগুলোতে লাইভ ড্যান্স হয়। সেখানে মেয়েমানুষেরা নাচতে নাচতে কাপড় খোলে। উদোম হয়ে সব গুপ্তধন দেখায়, বুঝলে? লাসভেগাসের স্ট্রিপ ড্যান্স।’

রাহেলার বিস্মিত দৃষ্টি, কিন্তু কিছু বলে না; জিজ্ঞেস করে না। জানে অনেক ঘাটের পানি খাওয়া লোক স্বামী মহাজন। পুরুষ মানুষ ডুবে ডুবে সবকিছু খেতে ওস্তাদ, মজা পায়; কেউ ধরা পড়ে… কেউ পড়ে না। পানি দিয়ে ধুয়ে নিলে সব সাফ। যত কলংক মেয়েমানুষের। তার একবার বিয়ে হয়েছে। সাত মাসও টিকল না। সকলই তার সরল স্বীকারোক্তির পরিণতি। সে কেন বলতে গেল? কত মানুষ বুকের মধ্যে কত কথা লুকিয়ে রাখে। কবরে চলে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তার সমাপ্তি হয়ে যায়। আর সে ভুরভুর করে বলে দিল সাঈদুলের সঙ্গে সম্পর্কের কথা। সে আবার কি সম্পর্ক? প্রেম-ভালোবাসা তো নয়। কৈশোর বয়সে যখন তেমনকিছু জানত না, বুঝত না; কুৎসিত কালো ঢ্যাঙা লোকটি তার সঙ্গে কী কী করে, তার শুধু ঘুম পায়; কষ্টে-আরামে স্বপ্ন-দুঃস্বপ্নের দেশ ঘুরে আসে। তারপর একসময় ডেকে দিয়ে বলে,-

‘যা বাড়ির ভেতরে যা, আর কাউকে কিছু বলবি না।’

সে কোনেদিন কাউকে কিছু বলেনি। কিন্তু কথায় বলে অনেককিছু চাপা থাকে না। একদিন প্রকাশ পায়। হয়ত তখন কিছু বুঝতে শিখেছে। মনের কোনো কোণায় কেউ একজন বাধা দেয়, এসব করো না; পাপ। পাপ কখনও চাপা থাকে না। প্রকাশ হয়ে পড়ে। সেদিন সন্ধের আগে আগে ‘কেমন লাগছে’ বলতে বলতে বমি করে ফেলে। বাজার থেকে হোমিও ডাক্তার ডেকে আনা হয়। সেই ডাক্তার কী ওষুধ দিল, তার বুকচাপা ব্যথা, পেটের ব্যথা সব চলে গেল। তাড়িয়ে দেয়া হলো সাঈদুলকে। নচ্ছার মানুষ। দুশ্চরিত্র। এমন চরিত্রহীন মানুষে ভরে গেছে আমাদের চারপাশ। এই আলোচনার মধ্য দিয়ে কথা ওঠে। আর সে সরল মনে সকল কথা বলে বসে। আমিনুল প্রথমে স্তম্ভিত হয়। তারপর বুকচাপা কান্না। কয়েকদিন গুমোট আকাশের মতো মেঘ করে থাকল। অবশেষে প্রাণ জুড়োল ট্রাকের তলায়। হায় জীবন! জীবন দিয়ে তার জীবনের উপর সকল শোধ তুলে নিল লোকটি; অথচ কত ভালোবেসেছিল তাকে। বিশ্বাস করেছিল। তার আনন্দময় সকল দিনরাত অন্ধকার করে চলে গেল সে। রাহেলা ফিরে এল বাপের বাড়ি। কী হবে এবার? কী করবে? অথবা যদি আবার নতুন করে জীবন শুরু করা যায়। সে একা চলতে চেয়েছিল। কিন্তু নারীর জীবন পুরুষ ছাড়া চলে? অবশেষে এমন মানুষও পৃথিবীতে আছে, যারা পেছনে তাকাতে চায় না, নগদ যা পাওয়া যায়, সেটি হাতিয়ে নিয়ে সবকিছু জেনেশুনে মেনে নেয়। খাদেমুল তেমন একজন মানুষ। রাহেলা তার দিকে অভিব্যক্তিহীন দৃষ্টিতে তাকিয়ে সুদূরে চলে যায়।

ভাইয়ের জন্য তার সকল লজ্জা-দুশ্চিন্তা-শ্রদ্ধা- ভালোবাসা… সব আছে। বুকের মধ্যে কখনও অবিমিশ্র একাকার উপলব্ধি হয়। তার ভাই খারাপ নয়। মানুষ তাকে খারাপ করেছে। সঙ্গদোষ। এতকিছুর পরও মানুষ তাকে খারাপ বলে না। যদি কেউ বলে, আড়ালে। সে রকম কথা তার কানে যে আসেনি তা নয়।

‘আয়েজুদ্দিন ম-ল হলো গিয়া বাপের প্রায়শ্চিত্ত। আতিকুল হক যত টাকাকড়ি সম্পদ লুটপাট আর ঘুষ খায়া বানাছে, সব এই একটা ছইলেই ধ্বংস করিবি। কথায় বলে, ফুকোতের মাল ফোকতে যায়; একটাও হাতত্ থাকিবি না। তিন পুরুষ গেইলে যেইংকা ফকির আবার সেইংকা।’

কথা যা কানে আসে, শুনতে যেমন; ভাবতে ভালো লাগে না। মানুষ তাদের সমৃদ্ধিতে জ্বলে। জ্বলেপুড়ে খাক হয়। সামনে তো কিছু বলতে পারে না। আড়াল-আবডালে বলে নিজেদের মনের খেদ ঠান্ডা করে। সে করুক। তাদের স্বভাব ওটা; সে-সবে কান দিয়ে সময় আর মনমেজাজ অস্থির করতে চায় না রাহেলা।

আতিকুল হক ম-ল সাধারণ পরিবারের তৃতীয় পুত্র। আপন মায়ের সঙ্গে সঙ্গে আরও দুজন মহিলাকে মা ডাকতে শিখেছেন। তিনি হলেন আজরফ ম-লের দ্বিতীয় স্ত্রী’র একমাত্র সন্তান। মধ্যবর্তী মানুষ। তাই নিচ থেকে যেমন ঠ্যালা পেয়েছেন, সহ্য করেছেন উপর থেকে চাপ। বিশাল পরিবারে ষোলো-আঠারোজন ভাইবোনের মধ্যে কখনও কখনও নিজেকে খুঁজে পাওয়া দুষ্কর। স্বার্থবুদ্ধি-হিংসা-ক্লেশ-বিষাদ-আনন্দ- ভালোবাসা সবকিছু ভাগ-বাটোয়ারা হয়। এ পক্ষ ও পক্ষ হিসাব নিকাশ হয়। আজরফ ম-লের অধিক প্রিয় তৃতীয় পক্ষ। সে ঘরের সন্তান সাতজন। এ থেকেই প্রমাণ মেলে বুড়ো ছোট বউয়ের প্রতি কত মনোযোগ দিয়েছিলেন। বিছানায় পড়ে যাওয়ার পর মৃত্যুর আগে আগে এক-দেড়শ একর জমি, কয়েকটি পুকুর, আম-জাম-কাঁঠালের বাগান, জঙ্গল-বাঁশখোপের বেশি অংশ সে ঘরেই ওঠে। এমন কি এইচএমভি কলেরগানও সে ঘরে বাজতে থাকে। এসব স্বার্থপর হীনম্মন্য কুটিলতা থেকে সবসময় দূরে থাকার চেষ্টা করেছেন আতিকুল হক। সেটি কোনো চাপে, না উন্নাসিকতা, দুর্বলতা নাকি অমনোযোগ তা ভেবে দেখেননি। তার ভালো লাগত না। সবসময় নিরাপত্তাহীনতায় আচ্ছন্ন থেকেছেন। হয়ত তাই একদিন কাউকে কিছু না বলে ঘর থেকে বের হয়ে যান। ভাসমান শ্যাওলা-পানার মতো এদিক ওদিক ভাসতে ভাসতে ঘুরতে ঘুরতে অবশেষে ঠাঁই পেলেন ঠাকুরগাঁও নেকমরদ এলাকার এক পরিবারে লজিং মাস্টার হিসেবে। গৃহকর্তা অর্থশালী মানুষ। জমিজমা ছাড়াও শহরে ব্যবসা-বাণিজ্য দোকানঘর সবকিছু আছে। তারই একমাত্র মেয়েকে পড়াতে পড়াতে একদিন টেকনিক্যাল ডিপ্লোমা পাশ করলেন। সেই দীর্ঘ সময়ে অনেক অনেক বদলে গেছেন, বদলাতে পেরেছেন নিজেকে। বদলে গেছে তার ভাগ্য আর সম্ভাবনা। সুখ আর সমৃদ্ধির সকল বদ্ধ দরজা খুলে গেছে। রাজকন্যা আর রাজ্য হাতে পাওয়ার মতো। তারপরও বসে থাকেননি। কোনো উপায়ে সরকারি এক চাকরি জুটিয়ে ফেলেছেন।

আজরফ ম-ল ততদিন আর বেঁচে নেই। আতিকুল হক একদিন ফিরে এসে হিসাব বুঝে পেলেন সামান্য পাঁচ বিঘা জমি আর বাড়ির পাশে ঝোপজঙ্গলে পরিপূর্ণ ভূতুড়ে এক বাঁশবাগান। সেটি কেটেকুটে সাফ করে দোতালা বাড়ি তুললেন। সেখানে মা’কে এনে উঠলেন। ক্রমে সৎভাইদের সম্পদও খুব অল্প দামে কিনতে শুরু করলেন। তারা ভোগাসক্ত আর দেউলিয়া মানুষ। ঠাঁট-বাট বজায় আর ফুর্তি করতে টাকা লাগে। জমিজমা বিক্রি ছাড়া টাকা আসবে কোত্থেকে? আর এভাবে আজরফ ম-লের আসল সন্তান হিসেবে এলাকায় তার নাম-ডাক জেগে উঠল। সেই নামের সঙ্গে যুক্ত হলো সরকারি চাকরির রাজটিকা। একেবারে রোডস অ্যান্ড হাইওয়ের থানা ইঞ্জিনিয়ার। অনেক ক্ষমতা তার। আসতে শুরু করল টাকা। টাকা আর টাকা। টাকায় কি না হয়! বাড়তে শুরু করল সম্পদ। কেউ কেউ দুচোখ উপচে হিংসা ছড়ায়। কেউ বলে, ‘হক সাহেব জিনের টাকা পেয়েছে গো… গুপ্তধন!’

এর সকল কাহিনি জানে রাহেলা। সবকিছু বোঝে। য্যায়সা দেশ ওয়সা ভেশ। বাবার মধ্যে কোনো দোষ দেখে না সে, বরং মনের কোণায় দৃপ্ত অহংকার রয়েছে। বাবার সঙ্গে বড়ভাই বা অন্য বোনদের তুলনায় তার সম্পর্ক আর গভীরতা অনেক বেশি। বাবা তাকে খুব ভালোবাসে। বড়ভাইও ভালোবাসে। তাই ভাইয়ের বিষয়ে কোনো কথা শুনলে মন বেজার হয়। চেহারায় প্রকাশ করে না এই যা। মানুষের হাজার কথায় তেমন ভাবনা বা প্রতিক্রিয়া নেই। এসব মানুষের মধ্যে আত্মীয়-অনাত্মীয় আছে। তাদের হাতে প্রচুর সময়… অবসর। তারা চায়ের দোকানে আড্ডা মারে। নানান বিষয়ে পরচর্চা চলে। কার বউ কার সঙ্গে পালিয়ে গেল, কোথায় কোন্ বিয়ে ভেঙে গেছে, কোন্ বাড়ির মেয়েটির আজও বিয়ে হচ্ছে না, ধিঙ্গি হয়ে উঠছে; কার বউ পোয়াতি, পেট ঝুলে পড়েছে ইত্যাদি হেন বিষয় নেই; তাদের খোশগল্পে থাকে না। আতিকুল হকের আলোচনা থাকে। চোর-ডাকাত-ঘুষখোর নানা সন্বোধনে কথা বলে। মূলত তারা মন্দ মানুষ। নিজেদের হীনম্মন্যতা-হতাশা- ব্যর্থতা-ঈর্ষা কোনোকিছুই লুকোতে পারে না। এদের মুখ বন্ধ করা সম্ভব নয়। রাহেলা জানে। রাস্তার কুকুর ঘেউ ঘেউ করবে। করুক। তাতে কার কি এসে যায়! তবে কখনও কখনও মনের কোণায় সুপ্ত ক্ষোভ জেগে উঠে, অস্থির করে তোলে… সে তো সত্য। বড়ভাই কেন এমন আচরণ করে? বাবাকে কষ্ট দেয়? মানুষের সামনে, যাদের কোনো মূল্য নেই বা দু-পয়সা দাম দেয় না; তাদের সামনে উঁচু মাথা নিচু করার পথ করে দেয় কেন? তাদের সকল অহংকারের জায়গায় এই একটি দুষ্টক্ষত কখনও মর্মপীড়ার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। সে চুপ করে খাদেমুলের সকল কথা হজম করে চলে। একটি কথাও বলে না।

‘আজ তো বৃহস্পতিবার, হাফ মাদরাসা। সকাল সকাল ফিরে এসে একবার মিশনরোড যাব। দেখি তোমার ভাইয়ের সাথে গল্প করে। তুমি যাবে?’

‘না।’

রাহেলার ছোট জবাব। খাদেমুল আর কোনো কথা বলে না।

শেষবিকেলে খাদেমুল ঠিক ঠিক হাজির হলো। সন্ধ্যের আগমনী আলোছায়া গোধূলি আকাশ। মিশনরোডের  সেই দক্ষিণ কোণা আরও অন্ধকার। বিশাল বিশাল দেবদারু দৃষ্টি ঢেকে রেখেছে। নিচে চওড়া ড্রেন। স্থবির, থমকে আছে। গলির শেষমাথায় ছোট মাঠ, তার উত্তরে এককোণায় একাকী দাঁড়িয়ে আছে ছোট একটি বাসাবাড়ি। সিঁড়িতে দু-ধাপ পা রেখে ঘরে প্রবেশ করতে হয়। নাকি উঠতে হয়? তার মনে হয়, নিচে নেমে গেল। আসলেই সিঁড়ির ধাপের সমতলে ঘরটি নেই। একটু নিচু। একটি ক্লিয়ার বালব ভেতরের অন্ধকার তাড়াতে হাঁসফাঁস করছে। মশার ভন ভন গান। আয়েজুদ্দিন মশার কয়েল ধরাতে ব্যস্ত। তার চোখ-মুখ কুঞ্চিত। বিদঘুটে ধোঁয়ায় ঢেকে গেছে চারপাশ। খাদেমুল থমকে যায়। অথচ এ লোক কিনা নিজ বাড়ির প্রতিটি ঘরে যখন তখন দামি এয়ার ফ্রেশনার উড়িয়ে বেড়ায়। পৈতৃক সম্পত্তি কেউ বাড়িয়ে তোলে- কেউ উড়িয়ে দেয়। এ লোক দ্বিতীয় দলে। তারপর কি এমন রূপ-সৌন্দর্য না কি মোহমায়া, যাকে দেখে বিয়ে করা বউ, তিনটি সন্তান ছেড়ে একটি ঘিঞ্জি ঘরে সুখ খুঁজে পেয়েছে এই লোক; দেখতে তীব্র সাধ হয়। তবে আলোচনাই মুখ্য। একটি সমাধান করে দিতে পারলে চারদিক থেকে লাভ। আয়েজুদ্দিন যেমন অনেকটা চমকে উঠে, খাদেমুলের দুচোখ বিস্ফারিত। সম্বন্ধির পেছনে যাত্রাদলের সেই নটি বিছানার কোণায় বসে আছে। তার চোয়াল আলগোছে ঝুলে পড়ে।

‘ভাইজান, আসসালামু আলায়কুম।’

‘কে? ও খা…দে…মুল, ওয়ালেকুম। তারপর?…সাঈদা আমার ভগ্নিপতি, রাহেলার…।’

‘সালামালেকুম ভাই।’

ঘরের মধ্যে দু-জনের লম্বা ছায়া। আর সে এসে আরও অন্ধকার করে দিয়েছে। তারপর দু-জনে সরে দাঁড়ালে বেশ স্পষ্ট হয়। খাদেমুল ততক্ষণে নিজেকে সামলে নিয়েছে। যেমন ভেবেছিল, কল্পনায় মুখছবি এঁকেছিল, এ তো তেমন নয়। যেমন দেখতে আর শরীর কাঠামো একেবারে অনবদ্য। পাথর কেটে কেটে তৈরি ভাস্কর্য। আর বুক? আয়েজুদ্দিন হয়ত এ জন্যেই…খাদেমুলের দৃষ্টি পলক ফেলতে ভুলে গেল নাকি? তার মাথায় তখন স্ফুলিঙ্গ ছুটে চলেছে, বড় ভাগ্যবান সম্বন্ধি মানুষটি; সাত জনমের ধন হাতে পেয়ে গেছে। তাই তো বলি, কেমন করে মানুষ সব ভুলে যায়! কোথায় খুঁজে পেল এমন গুপ্তধন? কীভাবে আবিষ্কার করল? তার বুকের মধ্যে কেউ হয়ত জোরে মোচড় দেয়।

‘ভালো আছেন আপনারা?’

‘আর ভালো থাকা!… তোমরা ভালো আছ? রাহেলাকে নিয়ে আসতে। আসতে চায় না নাকি?’

‘না ভাই তেমন কিছু নয়। বাড়ি চেনা হলো, একদিন নিয়ে আসব। আপনারা তো অনেকদিন আসেন না। ছবি খুশি হবে খুব।’

আয়েজুদ্দিন ভাগিনিকে খুব ভালোবাসে। কয়েলের ধোঁয়া ধীরে ধীরে সহনীয় হয়ে উঠেছে। খাদেমুল বুঝি কিছুতেই দৃষ্টি সরাতে পারছে না। প্রায় স্থির চোখে তাকিয়ে আছে সাঈদার দিকে। কি জন্য অথবা কী ভেবে আসা, সব গুলিয়ে ফেলে। মনে এসে জড়ো হয় কেমন কেমন ইতস্তত অবস্থা। কীভাবে কথা শুরু করে? অথচ কি কি আলোচনা করবে তার সবগুলো স্টেপ বাই স্টেপ ভেবে রেখেছিল।

‘ভাবির দেশের বাড়ি কোথায়?’

সাঈদা চকিতে আয়েজুদ্দিনের মুখের দিকে দৃষ্টি ফেলে। হয়ত সে জন্যে অথবা কে জানে জবাব দেয় সে।

‘ওর বাড়ি বগুড়া। রওনক সার্কাসের নাম শুনেছ? ওখানের ট্রাপিজ আর্টিস্ট।’

‘বাব্বা… মানে অনেক উঁচুতে দড়ির উপর ঝোলাঝুলি খেলা! সাংঘাতিক!’

‘হ্যাঁ। তারপর বলো কী বলতে এসেছ? হাওয়া খাওয়ার মানুষ তুমি নও।’

‘এমন করে বললেন ভাইজান! দেখতে এলাম। অনেক কষ্টে আছেন মনে হচ্ছে। কথা হলো কি…।’

‘কষ্ট তো একটু আছে, টাকা পয়সা নাই।’

‘ভাইজান আপনি যে দিঘি বন্ধক রেখে পাঁচ লাখ টাকা নিয়েছিলেন, ব্যাংক থেকে নোটিশ আসছে; কোনো ব্যবস্থা নিলেন? কেস হবে শুনছি। তখন তো অনেক সমস্যা হবে। বাবা টেনশন করছেন।’

‘বাবাকে বলো বটতলা মোড় বাজারের যে দুটো দোকান আছে, তার একটা বিক্রি করে দিক। সাত-আট লাখ খুব সহজে হয়ে যাবে।’

‘শিল্প ব্যাংক থেকে ত্রিশ লক্ষ। মিল চালু করবেন, কিন্তু কিছু তো নাই।’

‘ওটা বাবার নামে… বুড়া বুঝবে।’

‘ভাইজান টাকা তো…।’

‘সে টাকা আর আছে না কি?’

আয়েজুদ্দিনের বলিরেখা আরও কুঞ্চিত হয়। খাদেমুল নিরুপায়। সাঈদা বিছানার এককোণায় বসে থেকে থেকে ভেতরে উঠে গেছে। কিছুক্ষণ পর চায়ের সুবাস বাতাসে ভেসে এল। খাদেমুল এবার সহজ হওয়ার সুযোগ নেয়। সে খুব নিচু গলায় বলে বসে, –

‘ভাইজান ভাবির প্রতি আপনার অন্যায় হলো না? তিনটা মেয়ে আপনার, তারা তো বাপের আদর স্নেহ পেতে চায়। আর এই বয়সে আবার বিয়া… সে আপনি করতে পারেন। ধন সম্পদের তো অভাব নাই। দুটা কেন, চারটা করবেন; কিন্তু যাত্রাদলের মেয়েমানুষ। বুঝলেন কি না…।’

‘সে তো যাত্রাদলের নয় খাদেমুল, ট্রাপিজ আর্টিষ্ট। তোমাদের চোখে খারাপ লাগছে, কিন্তু সাঈদা খুব ভালো মেয়ে।’

কথা ফুরোতে না ফুরোতে সাঈদা ট্রে হাতে ভেতরে এসে পড়ে। একটি টুল টেনে সাজিয়ে দেয়। খাদেমুল দেখে দু-কাপ লাল চা, এক পিরিচে কিছু চানাচুর আর অন্যটিতে টোস্ট বিস্কুট। আসলে বড় কষ্টে আছে বোঝা যায়।

তারপর আলোচনা আর হলো না। আয়েজুদ্দিন বড় জেদি মানুষ। খাদেমুল প্রতিটি কথা যা যুক্তি মনে করে তুলে ধরে, সে ফিরিয়ে দেয়। খাদেমুল অগত্যা বেশ কষ্টে নির্বিকার থাকার চেষ্টা করে। ফেরার পথে ঘর থেকে বেরিয়ে সিঁড়ির দুটি ধাপ অন্ধকারে ভয়ংকর সাদা মনে হয়; তার উপর পা রেখে রাস্তায় নামে সে। মনে করেছিল উপরে উঠে সমস্যার সমাধানের চেষ্টা নেবে। ব্যর্থ হবে না। কোনোদিন হয়নি। এখানেও হবে। এতে অনেক লাভ। কিন্তু মনে হচ্ছে সমস্যার আরও গভীরে তলিয়ে গেল। সে একটি দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে দেয়। আরেকদিন আসতে হবে। হাল ছেড়ে দেবার পাত্র সে নয়। তখন সন্ধেরাত গভীর হতে শুরু করেছে। হেঁটে যেতে যেতে রাস্তার পাশে বিশাল ড্রেনের ঝাঁক ঝাঁক মশা তার চারপাশ ঘিরে ধরে, কানের মধ্যে পোঁ-পোঁ গান শুনিয়ে যায়; তার মাথায় হাজার বিরক্তি বাড়ে। কোনো কাজ হলো না। এমন অস্বস্তির মধ্যে সাঈদার মুখ, বুক আর সম্পূর্ণ কাঠামো দুচোখে ভেসে উঠতে শুরু করে। আয়েজুদ্দিন মানুষটি বড়ই ভাগ্যবান। আর সে কি না…খাদেমুল তার সঙ্গে নিজের তুলনা করে করে চারপাশে দগদগে ক্ষত তুলতে থাকে।

রাহেলার কোনো আগ্রহ নেই জানার অথবা ক্ষীণ কৌতূহল ছিল। স্বভাবমতো দমন করে রাখে। খাদেমুল যখন বেশ রাতে ফিরে আসে, ভেবেছিল নিজ থেকে অভিযান বলবে। বকবকিয়া মানুষ। বলেনি। তার চোখ-মুখ গম্ভীর। গুমট মেঘলা আকাশ। সারাদিনের তাপদাহ শেষে নৈর্ঋত কোণায় মেঘ জমে বর্ষণ হবো হবো আবহ তৈরি করে নেয়; অবশেষে হয় না। আর সকালে বিছানা ছেড়ে সেই চেপে রাখা কথা ককটেলের মতো ফাটিয়ে দেয় সে।

‘বুঝলে তোমার ভাই এটা ঠিক করেনি। কি এমন আহামরি আছে সেই মেয়েমানুষের মধ্যে? শুধু শুধু সকলের মান-সম্মান গেল। এখন কষ্ট আর নানান টেনশন।’

‘ভাই অবশ্যই ভালো কাজ করেনি। কে বোঝায় তাকে? কার বুদ্ধিতে যে চলে কে জানে।’

‘তোমার ভাই কচি খোকা, এখনও মায়ের দুধ খায়! বদলোক। একটা লম্পট-উয়োম্যান মোঙ্গার। আ রে তিনটাকা ফেললে মেয়েমানুষ পাওয়া যায়। তোমার টাকা আছে, টাকা ফেলো; ফুর্তি করো ব্যস। বিয়া করার কি দরকার পড়েছে?’

‘এভাবে বলছ কেন? নিশ্চয়ই কারও চক্রে পড়েছে। সঙ্গীসাথি তো ভালো নয়।’

‘আমি জানি না তোমার ভাইকে? ঘোড়েল মানুষ। ঘরে তিন তিনটা মেয়ে, আর দু-চার বছর পর মেয়ের জন্য পাত্র খুঁজতে হবে; সে কিনা সার্কাসের মেয়েমানুষ বিয়া করে! করবি তো ভালো দেখে কর। সব মাগিই তো এক। এখন কেমন কষ্ট! বোঝো ঠ্যালা!…শোনো কাল হাজার টাকা দিয়ে এলাম। দেখে-শুনে মনে হয় ভালোমতো খাওয়া হয় না।’

রাহেলা নিশ্চুপ। কথার পিঠে কথা বলা যায়, কিন্তু ওতে সময় নষ্ট; তিক্ততা বাড়ে। কোন্ মেয়েমানুষ স্বামীর সঙ্গে পেরে উঠেছে? খাদেমুল হাজার টাকার শোক সামলাতে পারছে না। এখন কথা বললে তেলে-বেগুনে জ্বলে উঠবে। গায়ে হাত তুলে বিপর্যয় ঘটাতেও বাদ যাবে না। কি দরকার! সুতরাং চুপ করে থাকা ভালো। বোবার কোনো শত্রু নেই। সে হাতের কাজে মনোযোগ দেয়। বিছানা-বালিশ ঠিক করে সাজিয়ে রেখে রান্নাঘরে গিয়ে বসে। আজ শুক্রবার। কোচিং বন্ধ। দম ফেলার এই একটি দিন তার নিজের। সকল কাজ ধীরেসুস্থে করে। সপ্তাহের জমে থাকা কাপড় ধোয়া, শো’ কেস মোছা, ঘর সাজানো ইত্যাদি কাজ। কোনোদিন শখ করে ছবিকে সাজিয়ে দেয়। মেয়ে তার বড় হয়ে উঠছে। জীবনে শত অভিযোগ বিতৃষ্ণার মধ্যে একটি ছোট প্রত্যাশা, মেয়ের মনে যাতে কোনো ক্লেদ না জমে। ভালোভাবে তৈরি হোক তার আগামী দিন। অবশ্য সামনে কী হবে…কীভাবে চলবে কে বলতে পারে!

খাদেমুল যথারীতি প্রাত্যহিক কাজের মতো দক্ষিণ-পশ্চিম কোণায় চলে গেছে। হাতে কোদাল। সে মাটি কোপায়। অদ্ভুত হুংকার তোলে। বের করে আনে পোড়ামাটি ইট। কোনো কোনোটির বুকে পিডিবি ছাড়া এমআইবি খোদিত। এর মানে কী? পাওয়ার ডেভেলপমেন্ট বোর্ড আর ম্যান ইন ব্ল্যাক? সাদা-কালো মানুষ। লোকটি সাদা-কালো নয়। জটিল মন মেজাজ। রহস্যময়। সে এই কাজ করবে দু-আড়াই ঘণ্টা। রাহেলা জানে। এরপর বের করে আনা ইট বালতির পানিতে ডুবিয়ে পরিষ্কার হবে। যতœ করে সাজিয়ে রাখবে। গুপ্তধনের সম্পদ।

প্রায় পানির দরে এ জায়গা কেনা। ছিল পানা-পুকুরের খাল। আশপাশের সকল নোংরা আবর্জনা ফেলার কেন্দ্র। ড্রেনের পানি এসে জমতো এ খালে। রাহেলা শুনেছে সে গল্প। তখন অনেক রমরমা অবস্থা বাবার। গ্রামের মাথা উঁচু বর্ণিল দোতালা বাড়ি অনেকদূর থেকে দেখা যায়। কারও দৃষ্টিতে লাগে। তবু শহরে একটি বাড়ি থাকা দরকার। নইলে চলবে কেন? কিন্তু জমির খোঁজ, কাগজপাতি দেখা, দরদাম, কেনাবেচা এসবের সময় সুযোগ বা অবসর কোথায়? অবশ্য টাকার কমতি নেই। আরও আছে ক্ষমতা। তার একটি স্বাক্ষরের জন্য লক্ষ লক্ষ টাকা আটকে থাকে। দম বন্ধ হয়ে মরতে বসে ঠিকেদার। তারা তাই শুধু অফিসে নয়, বাসাতেও আসে। সঙ্গে মিষ্টির হাঁড়ি বা প্যাকেট, নদীর বড় বড় মাছ, গরু বা কচি পাঠার মাংস। আসে ব্রিফকেস। সে-সবের ভেতরে টাকা।

রাহেলা জানে না, এগুলো তার তিক্ততা না কল্পনা। তেমন করে ভাবেও না। দেখে না দোষের তেমনকিছু রয়েছে কি না। যেমন সমাজ আর নিয়মকানুন, তেমন করেই বাঁচতে হয়। সৎ উপার্জনে কেউ খুব সহজে ধনী হতে পারে না। সকলের হাতে আলাদিনের জিন নেই। সকলে গুপ্তধন পায় না। বাবা পেয়েছিলেন। তার ছিল দক্ষতা আর কৌশল। মাঠে গাভি ছেড়ে দেয়া আছে, ওকে ধরো। তারপর কী করবে তোমার মর্জি। গর্ভবতী করবে নাকি দুধ খাবে, তোমার শক্তি, ক্ষমতা আর কৌশল।

বাবার মুখে শোনা, সেই ঠিকেদাররাই ইট-বালু-মাটি-পাথর ফেলে ভরে দিয়েছে খাল। হাজার হাজার ইট। ট্রাকলরির পর লরি বালু-মাটি-পাথর। খাদেমুল আজ সেই গুপ্তধন খুঁজে পেয়েছে। আলাদিনের প্রদীপ হাতে পাওয়ার স্বপ্ন দেখে দিন কাটে তার।

‘বুঝলে আজ প্রায় ষাট-সত্তর বের হলো। মাসখানেকের মধ্যে দু-তিন হাজার হয়ে যাবে।’

‘একজন লেবার নিলে তো দু-তিন দিনে হয়ে যায়। তোমাকেও খাটতে হয় না।’

‘লেবারের পার ডে মজুরি জানো? তিন শত টাকা। আমার টাকা সেভ হলো… ব্যায়ামও হলো।’

‘তাই।’

রাহেলা জানে, এসব কথা তার পছন্দ হবে না। নিজের কাজ নিজে করলে অসম্মান নেই, কিন্তু আশপাশের মানুষ কথা বলতে ছাড়ে না। পয়সা বাঁচানোর ফন্দি অথবা ভিখিরি নাকি? সে তাই সব চেপে রাখে। যে লোক নিজের স্যান্ডেল সুঁই-সুতো দিয়ে সেলাই করে এক-দুই টাকা বাঁচাতে সচেষ্ট বা তৃপ্তি পায়, তার কাছে বলা বৃথা।

‘একটা সমস্যা অবশ্য হলো…দেখি কী করা যায়।’

খাদেমুল বিড়বিড় স্বগতোক্তি করতে থাকে। এই একটি বিষয় রাহেলার অপছন্দ নয়। লোকটি সেল্ফ-হেল্পে চলে। অনেকটা বাবার মতো। কারও পথচেয়ে বসে থাকে না। অবশ্য…সে কথা না হয় থাক। সে আনমনে জিজ্ঞেস করে বসে, –

‘কি সমস্যা হলো আবার?’

‘খাল হয়ে যাচ্ছে না! এটা ভরাই কী দিয়ে…আচ্ছা আচ্ছা দেখি কী ব্যবস্থা করা যায়।’

একদিকে মাটি কাটলে বা খনন করলে খাল হবে, এটিই নিয়ম। অন্যদিকের কিছু এনে সেটি ভরতে হয়। পিছুটান অন্যটান নিয়ে আসে। আর এ তো খাল কেটে কুমির আনা নয়। ব্যবস্থা একটা হয়ে যাবে। দু-চার ট্রলি মাটি এনে ফেলা দরকার। শহরের অনেক জায়গায় বড় বড় বিল্ডিং হচ্ছে। আন্ডারগ্রাউন্ডসহ বিশাল মার্কেট। সে-সবের ফেলে রাখা মাটি তুলে নেয়া যায়। মানুষজন নিয়ে যাচ্ছে। রাহেলা ভাবে, কথাটি নিশ্চয়ই তার পছন্দ হবে। এসব ভাবনার মধ্যে দুম করে গতকালের ঘটনা মনে পড়ে যায় আকস্মিক আচম্বিত। তার সারা শরীর শিহরে উঠে।

গতকাল দুপুরে যখন সে বর্ণমালা কোচিং সেন্টারে এসে দাঁড়ায়, হাতেপায়ে চমকে উঠে। সেই লোক যে কি না তার অনেক ক্ষতি করে গেছে, মনের কোণায় লেপে দিয়েছে কুৎসিত দিনরাত; সাঈদুল অফিসরুমে বসে আছে। রাহেলা যথারীতি অফিসে গিয়ে পরিচালককে সালাম দেয়। সে দেখে পরিচালক দুজন মানুষের সঙ্গে বেশ ব্যস্ত সিগারেটের ধোঁয়ায় ঘরের ভেতর উৎকট গন্ধে ভরে গেছে। এসি বন্ধ। জানালা দিয়ে সেই ধোঁয়া তখনও বেরিয়ে যেতে পারেনি। সাঈদুল তার দিকে তাকিয়ে যেমন বিস্ময় ছুঁড়ে দেয়, রাহেলা স্থবির। তার বুকের মধ্যে কেউ একজন হাতুড়ির ঘা মারতে শুরু করে। সে কোনোমতো শিডিউলড ক্লাস নিতে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। আর আধঘণ্টার মধ্যে সেই লোক ক্লাসের বাইরে এসে দাঁড়ায়। রাহেলা কি করে! তখন মডার্ন সিনেমা হলে ম্যাটিনি শো শুরু হবে। বাইরের লাউডস্পিকারে পুরোনোদিনের গান বাজছে। সেই গানের মধ্যে ভায়োলিনের বাদন করুণ না কি ছড়টানা ভয়ংকর কিছু বোঝা যায় না। তার সম্মুখে প্রায় বিস্মৃত অতীত এসে হাজির। তার মাথা ঝিমঝিম করতে থাকে। আলোছায়া অন্ধকার করিডোর হয়ে যায় বিশাল দীর্ঘ সুড়ঙ্গ। সে তার মধ্যে পড়ে গেছে। তলিয়ে যাচ্ছে। তারপর কী ভেবে মনে সাহস এনে উঠে দাঁড়ায়। মনের মধ্যে সাহস আর উন্নাসিক উপলব্ধি এসে সঞ্চিত হতে থাকে। সময় মানুষকে কত সহজে বদলে দেয়। প্রলেপ লাগিয়ে দেয় সকল অতীতে। হয়ত ক্ষতেও সেই ছায়া পড়ে।

‘কেমন আছিস? অনেকদিন পর দেখলাম। ভালো আছিস?’

রাহেলা মাথা নাড়ে। সে ভালো আছে। সত্যি বলতে ভালো ছিল, এখন নেই। বুকের মধ্যে অদ্ভুত শূন্য অনুভূতি হতে থাকে। মনে হয় মাথা ঘুরে পড়ে যাবে।

‘হ্যাঁ! আপনি এখানে?’

‘এবার আমার দায়িত্ব রে। শফিকুল সাহেব রংপুর চলে যাচ্ছেন।’

‘আপনি প্রিন্সিপ্যাল?’

‘ওই রকমই। আয় অফিসে বসি। এখানে কাজ করিস?’

তারপর সরু করিডোরের আলোছায়া অন্ধকারে হয়ত কিছু ছায়া কিছু অতীত আর বর্তমান হেঁটে চলে যায়। কিংবা তেপান্তরে হাতছানি দিয়ে ডাকতে শুরু করে।

‘কয়টা ক্লাস? কোনো কলেজে-টলেজে আছিস নাকি? কোন্ সাবজেক্ট?’

‘না কোথাও নাই। এখানেই…চারটা ক্লাস নিই।’

‘বাচ্চাকাচ্চা?’

‘মেয়ে ক্লাস ফাইভে।’

‘বেশ তো! হাজব্যান্ড কী করে? সচিব-টচিব বোধহয়।’

রাহেলার মনে হয় একটু সহজ হতে পেরেছে। তার হাসি পায়, কিন্তু হাসে না। বিষাদ অতীতে ভেসে বেড়ানো মানুষের মুখে আনন্দ থাকে না। আর যদি সেই হারিয়ে যাওয়া দিনের দুঃসহ স্মৃতি আকস্মিক জেগে উঠে, সে বড় ভয়ংকর। জটিল কেউ সামনে এসে দাঁড়ায়, নরক যন্ত্রণা আর কাকে বলে! সে আর ক্লাস করতে পারে না। এদিক ওদিক সামলে চুপিসারে দ্রুত বের হয়ে যায়। ফেরার পথে বারবার তার মনে হয়, এখানে আর কাজ করা যাবে না। লম্পট লোকের অধীনে কোনোমতেই নয়। এখানে সপ্তাহে হাজার টাকা আয় করলেও আতঙ্ক তার পিছু ছাড়বে না। সবসময় তাড়া করে ফিরবে। তারপর জানা গেল খাদেমুলের চেনা লোক। রংপুরে এক মেসে থেকে পড়ালেখা করেছে। কে জানে কোনো ফাঁকে কৈশোরের সেই গল্প তার কানে তুলে দিয়েছে কি না! কোথাও কোনো মেয়েকে বিছানায় ফেলে দেয়া তো পুরুষের ক্রেডিট। সে গল্প বলে মজা পায়। পুরুষ মানুষ বটে। নাকি কুকুর…জানোয়ার? রাহেলা জানে না…বোঝে না। তার বিশ্বাস, এখন আরও জানাজানি হলে স্বামীধন হয়ত আমিনুলের মতো প্রাণ দেবে না… কেড়ে নেবে।

এসব ভাবনা-দুর্ভাবনায় তার পা কাঁপতে থাকে। হেঁটে চলার গতি ভেঙে যায়। ছন্দপতন ঘটে। দু-একজন রিকশাওয়ালা পাশ দিয়ে যেতে প্রায় ধাক্কা মেরে বসে। অবশেষে বাড়ির আঙিনায় পা রেখে সিদ্ধান্ত নেয়, আর কোনোদিন যাবে না; কাজ করবে না। যেভাবে হোক খাদেমুলকে জানিয়ে সম্মতি আদায় করে নেবে। কিন্তু কীভাবে…কোন্ কারণ বা যুক্তিতে ভেবে কুল পায় না।

খাদেমুল কোনো সুখবর বয়ে নিয়ে যেতে পারেনি। আট-দশদিন পর শ্বশুরবাড়ি উপস্থিত হয়েছে। হাতে দইয়ের দুটি প্যাকেট। মাছের তেলে মাছ ভাজা আর কি! মাদরাসার পথে রওয়ানা দেবে খানিক পর। এই ফাঁকে সাইকেল মেরে হাজির। কানে এসেছে সম্বন্ধি এসেছিল এরমধ্যে। ঘটনা কি? জানতে হবে। আলাপ আলোচনা করতে হবে। দরকার হলে যেন রাতে থেকে যায়, শুনবে সকল ইতিহাস। আঙিনায় পা রাখতেই বুঝে ফেলে সে কোনো সুসংবাদ নিয়ে না আসলেও ইতোমধ্যে সুবাতাস বয়ে গেছে এখানে। চারদিকে স্বস্তির সূক্ষ্ম একটি রেখা প্রতিভাত। শ্বশুরের চেহারা অভিব্যক্তিশূন্য হলেও শাশুড়ির চোখে-মুখে সেই গুমোটভাব নেই। সেখানে প্রচ্ছন্ন আনন্দ বা প্রশান্তি। অন্ধকার নেই। সহজেই বোঝা যায়, কিছু বোঝাপড়া বা আন্ডারস্ট্যন্ডিং হয়েছে। মায়ের কাছে সন্তানের কোনো অপরাধই দোষের নয়। অবশ্য বউ-সন্তান উপস্থিত থাকতে থাকতে সার্কাস দলের দড়িঝোলা মহিলাকে বিয়ে করা অপরাধ কি না কে জানে। অন্যায় হলেও সেটি আর দাম পায় না। গুরুত্বহীন। আয়েজুদ্দিন দুটি কেন, চারটি বিয়ে করুক; সে সক্ষমতা-অর্থ-সম্পদ সব আছে তার। এতে কার কি এসে যায়? আত্মীয়-স্বজন সমাজের কাছে সেটি লঘু বা গুরু কোনো অপরাধ নয়। কবিরা বা ছগিরা বলে কেউ ফতোয়াও দেবে না। এখন যার হাতে মাল, দুনিয়া তার পক্ষে। এসব উদ্ভট ভাবনার মধ্যে কেউ একজন তার মাথায় টোকা মারে। কোনো ফুর্তি বা মজা করার জন্য তো নয়, সম্বন্ধি বিয়ে করেছে; এতে কার কি সমস্যা? তার সমস্যা আছে? কি জানি কে জানে।

সে মনে মনে হাসে, রিতা বেগমের কি অবস্থা এখন? দেখতে বড় সাধ হয়। সাধ পূরণের অসুবিধা কোথায়? সে দু-পা এগিয়ে সব দেখে আসে। রিতা বেগমের মুখ-চোখ গম্ভীর। স্বাভাবিক। কোনো স্ত্রীই তার স্বামীর ভাগ অন্য কাউকে দিতে রাজি নয়। সব ভাগ-বাটোয়ারা হয়, কিন্তু…অথচ সমাজে তো এসব চলে আসছে। তবে সেই কঠিন চেহারার উপর কোনো মুখোশ সেঁটে আছে কি না, খাদেমুল বুঝতে পারে না। মানুষ কখনও কখনও ছদ্মবেশ ধারণ করে বটে। সেটিই হয়ত আসল আত্মরক্ষা। সে প্যাকেট দুটো শাশুড়ির হাতে তুলে দিয়ে দ্রুত সাইকেলের কাছে এসে দাঁড়ালে শুনতে পায়, পেছন থেকে কেউ ডাকছে,Ñ

‘দুলাভাই নাস্তা খেয়ে যান।’

‘এখন সময় নেই ভাবি… দুপুরে আসব।’

খাদেমুলের ফুরসত নেই। দশটা পার হয়ে গেছে। ক্লাসের তাড়া। সে নিয়মের মানুষÑ নিয়মে চলে। নিয়মের মধ্যে থেকে শত অনিয়ম করলে কেউ দেখতে পায় না। নিজেকেও ফ্রেস রাখা যায়। অঙ্কের এই সূত্র তার জানা। শহরের বাসস্ট্যান্ডে জোরকদমে এসে নয়টা সাতের বাস ধরে। বটের মোড়ে নামিয়ে দেয় নয়টা সাতান্ন-আটান্ন কিংবা দশ। রায়হানের টেইলরিং দোকান থেকে সাইকেল নিয়ে পাগলের মতো দেড় কিলো রাস্তা ছোটে। প্রায় দিন ‘আমার সোনার বাংলা’ ধরা যায় না। স্থানীয় মাস্টার মৌলভিরা মাঝে মধ্যে ক্ষেপে ওঠে। চাকরি কি শুধু তারাই করে? এই লোক শহর থেকে উড়ে এসে জুটেছে, উড়ে উড়ে আসে; আবার কোন ফাঁকে কাউকে কিছু না জানিয়ে উড়ে উড়ে পালায়। কোন্ মহারথী? এত সুযোগ-সুবিধা কেন? প্রিন্সিপালের এক কথা।

‘ছোটভাই দেখে-শুনে চলেন। আপনি বাঁচেন…আমাকেও বাঁচতে দেন। গভর্নিং বডির লোকজন কথা বলে। দশটা টু চারটা পর্যন্ত থাকতে হবে।’

‘কথা ঠিক ভাইজান। আচ্ছা দেখি কি করা যায়!’

খাদেমুল এরপর গুনিনের বাটি কড়ি চালানের মতো গোপন কিছু কৌশল চালিয়ে দিল। কোন্ কোন্ শিক্ষক আর সদস্য তার সমালোচনা করে? তাদের ডেকে নিয়ে বটতলা মোড়ের রেস্তোরাঁয় গিয়ে খুব খাতির করে ভালোমতো খাইয়ে দেয়। কথায় বলে হাড্ডি পেলে কুকুর লেজ নাড়ে… খাবার পেলে গদগদ হয় মানুষ। একদিন পরে প্রিন্সিপাল তাকে ডেকে বলে,Ñ

‘ছোটভাই কি জাদু করিছেন, যারা আপনার বিপক্ষে কথা বলত; একদম চুপ। আবদুস সাত্তার তো সাপোর্ট করল সেদিন। দূরের মানুষ একটু বিবেচনা করা লাগবে। আমি তো বিবেচনা করি। কি বলেন করি না?’

‘জি স্যার।’

খাদেমুল কখনও খুশি করার জন্য প্রিন্সিপালকে ‘স্যার’ বলে। আত্মীয় মানুষ। সম্পর্কে বড় সম্বন্ধি হয়। তারপরও যখন যেখানে যে অস্ত্র সেটির প্রয়োগ করা উচিত।

‘শোনেন ছোটভাই, এই আবু তালেব যতদিন আছে; কোনো ভয় নাই। ক্লাস শেষ করে চুপচাপ চলে যাবেন। তবে সামনে যে কোনোদিন অফিসের লোকজন আসতে পারে। মিনিস্ট্রি অডিট। সাবধান থাকা ভালো। এমপিও বন্ধ হলে করার কিছু নাই।’

খাদেমুল এখন সে চেষ্টা করে। শিক্ষা অফিসের মনিটরিং চলছে। তারা কোনোদিন এখানে হামলে পড়ে কে জানে! তাই যতটুকু সময় পারে লাইব্রেরি রুমে বসে থাকে সে। কম্পিউটার রুমে গিয়ে নামিদামি হুজুরের ওয়াজ দেখে। কখনও ছাত্রছাত্রীদের উপদেশ দেয়। নিজেকে বেশ ‘প্রফেসর-প্রফেসর’ মনে হয়। তার এই আচরণে কেউ আর কোনো কথা বলে না। সে জানে, দুনিয়ার মজা পেতে হলে…নিতে গেলে চলমান নিয়মের মধ্যে থেকেই হাজার কৌশলে বের করে আনতে হয়। এটিই অঙ্ক এটিই নিয়ম। সেই নিয়ম কোথায় কখন অনিয়ম হয়ে যায়, সে নিয়ে ভাবলে চলে না; আলগোছে এড়িয়ে যাও। কোনো অসুবিধা নেই। ব্যস আর কি চাই! ‘দুনিয়াকা মজা লে লো…দুনিয়া তুমহারি হ্যায়।’ বাড়ির সামনে রাস্তায় সেলুনে প্রতিদিন এই গান বাজে। শুনতে শুনতে মুখস্থ হয়ে গেছে। সে যা হোক, দিস ইস ম্যাজিক। ইহাই জাদু। জাদুর মায়া রিতা বেগমের চোখে-মুখে। প্রকাশ নেই, কিন্তু সেই বিষাদ চেহারার মধ্যে কি অপূর্ব মায়া! খাদেমুলের বুকে ধক করে ভালবাসার আগুন জ্বলে উঠে।

সেদিন প্রায় শেষদুপুর খেতে বসে এই ভাবনার দোলাচলে মন ভেসে যায়। কি হবে এখন রিতা বেগমের? আয়েজুদ্দিন কি আর মুখ ঘুরিয়ে তাকাবে? কোথায় তার অসুবিধা এমন চমৎকার বউকে ছেড়ে দিতে? সে তো ঠিক ছেড়ে দেয়া নয়…আবার ছেড়ে দেয়া নয় কেন? সেই লোক কি আর সাঈদার দিক থেকে সহজে চোখ ফেরাতে পারবে? হয়ত সময় লাগবে। কত মাস কে জানে! বিকেলে বারান্দায় বসে থাকতে থাকতে কিছু গল্প হয়। শ্বশুর-শাশুড়ি বেশ আলাপ করে। তারা মোটামুটি আশ্বস্ত। তাদের বখে যাওয়া ছেলে পায়ে হাত দিয়ে অঙ্গীকার করেছে। ভবিষ্যতে আর কিছু করবে না। এমন ঘটনা কখনও ঘটবে না। এবার সত্যি সত্যি মিল চালু করবে। ফুড অফিসে যোগাযোগ চলছে। সরকারের একটি অ্যালোটমেন্ট পেয়ে গেলে সব ঋণ-মহাজন ঠান্ডা। সাঈদাকে মেনে নিতে হবে। রিতা বেগমের পরপর তিনটি মেয়ে। তার কাছে পুত্র পাওয়া যাবে না। একটি পুত্র সন্তান খুব দরকার। পুত্র না হলে বংশরক্ষা কি করে হয়? ঠিক ঠিক…কথা ঠিক। আতিকুল হকের সব সম্পদ যে জামাইরা খেয়ে ফেলল! ছেলেকে ত্যাজ্য করতে চেয়েছিলেন। কি অপরাধ হয়ে যেত তার! কত বড় পাপ!

আতিকুল হকের মন গলে। না গলে যায় কোথায়? দশটি নয় পাঁচটি নয়, একটি পুত্র; আদর-সোহাগে মানুষ করেছেন। তার মনের অবস্থা তো দেখতে হবে। কোথায় যাবে সে? মায়ের চোখে অশ্রুর বাষ্প। আহা ছেলে তার কত কষ্ট বুকে ধরে রেখেছে! বড় বুকচাপা ছেলে! তার কষ্টে মায়ের বুক ফেটে যায়। একটি কেন চার চারটি পুত্র সন্তানে আঙিনা ভরে দিক। রিতা বেগম পারল না। ষোলো বছরের সংসার জীবন। এত দীর্ঘ সময়ে পরপর তিনটি মেয়ের জন্ম দিয়েছে। শরীর-মন ক্লান্ত। আবার মেয়ে হবে না নিশ্চয়তা কোথায়? তার পরের বার?

‘বুঝলেন জামাই আয়েজের আবদার না মেনে উপায় নাই। একটামাত্র ছেলে, তাকে ফেলে তো বাঁচা যায় না। আপনার মত কী?’

খাদেমুল শ্বশুর-শাশুড়ির মুখের দিকে তাকায়। একবার যা ডিসাইডেড, তার বিপক্ষে মতামত দেয়ার মতো আহাম্মক সে নয়। এসব অর্থহীন জিজ্ঞাসা কেন? সে জানে, যেদিকে বাতাস সেদিকে পাল তুলতে হয়; যেদিকে স্রোত সেদিকে দাঁড়। সে চেহারায় যথাসম্ভব খুশি এনে জবাব দেয়।

‘যা হোক সমস্যার সমাধান হয়ে গেল। বাবা এই কথাই বলতে চেয়েছিলাম। ভালো হয়েছে।’

‘সে ঠিক আছে। আপনি হলেন জামাই মানুষ, আপনার মতামতের দাম আছে। তাই বলছি…তবে একটু খটকা থেকে গেল।’

‘যেমন?’

‘যাত্রাদল না কি সার্কাস যাই হোক, বাজারি মেয়ে; আত্মীয়স্বজনের সামনে মাথা হেট হলো আর কি!’

‘কি যে বলেন বাবা! ওরা কি মানুষ না? কেউ সংসার করছে না? দ্বিতীয়ত তিনি তো আর সার্কাসে ফিরে যাচ্ছেন না। চিন্তা কি?’

খাদেমুল নিজেকে বাহবা দেয়। কখনও কখনও নিজের উপর মন খুশি ধরে রাখতে পারে না। বেশ ভালো লাগে। জীবন যে অঙ্ক, আর হিসাবনিকাশে সে মোটেই অদক্ষ নয়; তাই সবদিক থেকে লাভ। তারপর বেলা বাড়তে বাড়তে আরও কথাবার্তা চলে। রাত আসে। সে রাতের খাবার খেয়ে দোতালার ঘরে শুয়ে পড়ে। অনেক দামি দামি খাবার। চাখতে চাখতে বেশি হয়ে যায়। রিতা বেগম বারবার পাতে এটা ওটা তুলে দিয়েছে। শেষে একবাটি দই দিয়ে সমাপ্তি। খেতে বসে আবার কিছু আলোচনা। সম্বন্ধি মিল চালু করতে চায়। চাতাল তৈরি আছে। দু-মাস পরে ধান উঠবে। খাদেমুলের সহযোগিতা দরকার। শহরে থাকে। তাকে মাঝে মধ্যে বালুবাড়ি ফুড অফিসে যোগাযোগ করতে হবে। এসব অনুরোধ-উপরোধ। সে মাথা নাড়ে। সম্মতি জানায়। যত কাজ তত লাভ। পকেটে কিছু টাকা এলে কার না ভালো লাগে! টাকা তো মুর্দারও দরকার পড়ে। সুতরাং বিবিধ কাজে প্রত্যক্ষ সহযোগিতা থাকবে তার। কোনো ভুল হবে না। কথায় কথায় কথা বাড়ে…রাত বাড়ে আরও।

রাহেলার ঘর। প্রায় সময় তালাবদ্ধ থাকে। কখনও খুলে পরিষ্কার করা হয়। যখন সে অথবা তারা এখানে আসে, খোলা হয়; জ্বলে ওঠে বালব। আলোকিত হয় চারপাশ। দক্ষিণ জানালার দিকে কয়েকটি শুপারি গাছ। ঝিরঝিরে পাতাগুলো হাওয়ায় দোলে। জানালা দিয়ে হাত বাড়ালে স্পর্শ করা যায়। সামনে বিস্তৃত ফসলের ক্ষেত। সন্ধের বাতাস কচিধানের ডগার উপর ভাসতে ভাসতে হামলে পড়ে ঘরের মধ্যে। শহরের ধুলোময় ডিজেল-পোড়া তপ্ত বাতাস নয়। সে জানালা আর চিরল পাতার ফাঁকফোকর দিয়ে মেঘলা আকাশ দেখতে দেখতে ঘুমিয়ে পড়ে। সারাদিন নানান কাজের ভারে ক্লান্ত শরীর। চোখ বুঁজলেই নেই। ঘুমের মধ্যে হিসাব কষে, অঙ্ক করে; নাকি স্বপ্নের ঘোরে চলে যায়। একসময় মনে হয় কেউ একজন দরজায় টোকা দিচ্ছে। সে কোনোমতো দৃষ্টি মেলে দেয়। অন্ধকার। বিদ্যুৎ চলে গেছে। তখন বাইরে বৃষ্টির ঝিমঝিম শব্দ। থেকে থেকে ঝলসে উঠছে বিদ্যুৎ স্ফুলিঙ্গ। রাতের আকাশ। প্রতিফলিত হয় ঘরের চারপাশ-দেয়াল থেকে দেয়ালে। তারপর আবার মনের ভুল ভেবে দুচোখ বোঁজে। আবার টোকা।

কেউ একজন দরজায় দাঁড়িয়ে আছে মনে হয়। তাকে ডাকছে। কে হতে পারে? এসব ভাবতে ভাবতে বিছানা থেকে নেমে যায় সে। দরজা খুলে অবাক। একটি ছায়া, পরিচিত অবয়ব; রিতা বেগম। আলোছায়া অন্ধকার আর দমকা বাতাসের বৃষ্টির ছাটে ভৌতিক লাগে। বেশ জোরে বৃষ্টি হচ্ছে। ছায়াটি একরকম ধাক্কা মেরে ঘরে এসে পড়ে। তারপর ফিসফিস করে বলে উঠে,-

‘বাইরে বৃষ্টি, কম্বল নিয়ে এলাম; যদি শীত করে।’

‘কোথায় শীত?…যাক আনছেন যখন।’

রিতা বেগম নিশ্চল দাঁড়িয়ে থাকে। কিংবা বিদ্যুৎ চমকের মতো থেকে থেকে কাঁপছে। অন্ধকারের ছায়ামানবী। খাদেমুল কী ভেবে নেয়…কিছু বলে না। মহিলা কি কিছু বলবে? অথবা…

‘একটা কথা বলব ভাই? কাউকে বলবেন না তো!’

‘বসেন ভাবি বসেন, শুনি কী বলতে চান।’

ছায়ামানবী ইতস্তত করে। তেমনই দাঁড়িয়ে থাকে। বাইরের বৃষ্টি রেলিং পেরিয়ে ঘরের মধ্যে এসে পড়ছে। কখনও আলো কখনও নিকষ অন্ধকারে ডুবে যায় রাত।

‘রুম্পার বাবা কি শুধু ছেলে সন্তানের জন্য বিয়ে করেছে? আপনাকে কী বলে? বিশ্বাস করেন ওর কথা?’

‘আমার সাথে কোনো কথা হয়নি। শ্বশুরের কাছে শুনলাম।’

‘আপনি বিশ্বাস করেন? আমার কি ছেলে…।’

‘এসব কথা থাক না হয়। আপনার আমার বিশ্বাস অবিশ্বাসে কি যায় আসে বলেন?’

‘মিথ্যা কথা। বাজে মানুষ। ফাতরার একশেষ। নিজের কোনো শক্তি নেই আর…আমাকে ছেড়ে দেবে না কি?’

‘মনে হয় না। তেমন কথা তো শুনিনি। পরিবারের মান যাবে না তাতে?’

রিতা বেগম খুব কাছে এগিয়ে এলে খাদেমুলের কি হলো, সে আকস্মিক তার হাত হাতের মধ্যে খুঁজে নেয়। বাইরের বৃষ্টির ঝিমঝিম হয়তবা বেশি হতে থাকে। বিদ্যুৎ স্ফুলিঙ্গ চারপাশে আরও ছড়িয়ে পড়ে। আলোছায়া অন্ধকারে রহস্যময় হয়ে ওঠে নিস্তব্ধ রাত। তার সাহস বাড়ে। নিজ থেকে হাতের কাছে এগিয়ে আসা ধন-সম্পদ ছেড়ে দেয়ার মতো তত বোকা সে নয়। সুযোগ বারবার আসে না। সে সজোরে ছায়ামানবীকে বুকের কাছে টেনে নেয়। ওদিক থেকে কোনো বাধা আসে না। হয়ত এমনকিছুর প্রতীক্ষায় অধৈর্য হয়ে উঠেছিল সে।

রাহেলা তাড়াহুড়ো করে। সকাল এগারো বেজে গেছে। কোচিংয়ে যেতে হবে। আর ব্যস্ততায় বেশি বাধা পড়ে। ভুল হয়। গুছিয়ে রাখা ব্যাগ, ঘরের তালা, বাইরের দরজার তালা কোথায় রেখেছে মনে থাকে না। সেই থেকে মাথার মধ্যে আজগুবি ভাবনা কিলবিল করছে। আজ যেয়ে হিসাবনিকাশ করে ফেলবে। যেখানে সাঈদুল সেখানে থাকবে না। লম্পট লোক। তার অনেক ক্ষতি করেছে। বারবার ক্ষতি করেছে। তার তখন বয়স কত? কিছু জানত না…বুঝত না। সেই লোকের সঙ্গে আবার যে দেখা হয়ে যাবে, নিয়তি এমন পরিহাস করল কেন? কোচিং ছেড়ে দিলে খাদেমুল অবাক হবে। জানতে চাইবে। ব্যাখ্যা চাইবে। কী জবাব আছে তার? সে না হয় ভেবে দেখা যাবে। আট-নয়শ কিংবা হাজার টাকার মায়া তো! রাহেলা না হয় নিজে থেকে দিয়ে দেবে টাকা। কোথাও অন্য কোচিং খুঁজে নেবে এই সময়ে। পেতে হয়ত অসুবিধা হবে না।

বাইরে গনগনে রোদ। ভাবনার মধ্যে হাজার আশঙ্কা ছটফট করে। আঙিনার দক্ষিণে ইউকেলিপ্টাস গাছ। তার নিচু ডালে একটি কাক তারস্বরে চিৎকার করে চলে। তখন নজরে পড়ে, এঁটো থালাবাসন টিউবওয়েলের পাড়ে পড়ে আছে। মনেই ছিল না। পরিষ্কার করা হয়নি। সেজন্যই কেমন ফাঁকা ফাঁকা মনে হচ্ছিল। হয়ত কোথাও ভুল হচ্ছে। কিন্তু এখন সময় নেই। সেগুলো রান্নাঘরে তুলে রাখতে গিয়ে দেখে সাবানও পড়ে আছে। নতুন সাবান। তোলা হয়নি। কাক তুলে নিয়ে গেলে বাড়ি মাথায় নিয়ে তুলকালাম করত খাদেমুল। আজ তার সঙ্গে কেন এমন হচ্ছে? তারপর সবকিছু ধীরে ধীরে গুছিয়ে ঘরের দরজায় তালা দেয়। তারপর বারান্দা থেকে আঙিনায় দাঁড়াতে হাতেপায়ে চমকে উঠে। দৃষ্টির সামনে অন্ধকার লম্বা ছায়া। এ যে তার চেনা। জানাশোনা আতঙ্ক। গাল টসকানো ঢ্যাঙা…কুচকুচে কালো দৈত্য সাঈদুল।

‘আপনি…এখানে?’

‘বের হচ্ছিস না কি? দাওয়াত তো দিবি না, নিজেই এলাম।’

‘হ্যাঁ…আপনার সেন্টারেই যাচ্ছিলাম।’

সাঈদুল আশেপাশে দৃষ্টি রাখে। কুতকুতে সতর্ক চোখ তার। রাহেলার মনে হয়, আতঙ্কের কোনো হিমস্রোত শরীর বেয়ে বুকে উঠে এসেছে। চারিদিক আশ্চর্য নির্জন নিস্তব্ধ। গাছের ডালে প্রায় সবসময় বসে থাকা কাকটিও নেই। সে বুঝতে পারে না কি করা উচিত। তার ভেতরে অদ্ভুতরকম খা খা অনুভূতি হতে থাকে। সেই আগে যেমন হাত-পা-শরীর অসাড় আর শক্তিহীন হয়ে যেত।

‘বাহ্ খাদেমুলের বাড়ি তো বেশ খাসা। চল একটু বসা যাক। আজ আর তোকে যেতে হবে না। সম্মানী পেয়ে যাবি।’

‘আমি আর কাজ করব না। আপনি যান।’

‘কেন…কেন? এখন তো আমি আছি। তোর সকল সুযোগ-সুবিধা করে দেব। আসবি-যাবি-বাড়িতে থাকবি, সপ্তাহ শেষে বিল নিবি ব্যস।’

রাহেলা উদ্ভ্রান্ত শূন্য দৃষ্টিতে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকে। বড় অস্থির হয়ে উঠেছে মন। কী করবে ভেবে উঠতে পারে না। হয়ত কোনো ঘোরের মধ্যে আলগোছে দরজার তালা খোলে। হাত বাড়িয়ে ফ্যানের সুইচ অন করে দেয়। তখন ঘরের মধ্যে চারপাশে জমে থাকা গুমোট বাতাস হাত-পা ছড়িয়ে বসে। কোনো অন্ধকার ছায়া দীর্ঘ হয়ে যায়। সাঈদুল সোফায় বসে জুলজুল করে কিছু খুঁজতে থাকে। অথবা তেমনকিছু খোঁজে না। কুমিরের মতো নিশ্চুপ তার দৃষ্টি। রাহেলা হয়তো এ চোখের মানে বোঝে। তারপর…আজ সে সেদিনের মতো নয়। এ একটি কথা তার মধ্যে সাহস জাগিয়ে তোলে। সন্দিগ্ধ সতকর্তা আরও দৃঢ় হতে থাকে। এবার সে কী করবে?

‘চা খাবেন?’

‘এই গরমে?…নাহ্। তুই বোস না, দুটো কথা বলি। খাদেমুল তো কলেজে…না?’

‘কথা তো আপনার ওখানেও বলা যায়। চলেন। এখন বাসায় কেউ নেই।’

রাহেলা পালঙ্কের এককোণায় প্রায় নিশ্চুপ দাঁড়িয়ে থাকে। চোখের সামনে ভেসে উঠে কৈশোরবেলা। এই লোকটি তার অনেক ক্ষতি করেছে। জানোয়ার। কত অত্যাচার আর ভয় দেখিয়েছে। কুৎসিত মানুষ। এখন কোনোকিছু দিয়ে সজোরে মাথায় বাড়ি দেবে নাকি?

‘সেই হিসাব করেই তো এসেছি। তোর স্বামী কলেজে, মেয়ে স্কুলে আর তুই একা। আমার রানি!’

‘বাজে কথা বলবেন না। আমি আর সেদিনের মানুষ নই।’

‘সে তো বটেই। তারপর তোর সংসার তো বেশ সাজানো-গোছানো। হামারা পেয়ার…সুখী পরিবার।’

‘আপনার বউ কী করে? বাচ্চা-কাচ্চা?

রাহেলা স্বাভাবিক হওয়ার অদম্য চেষ্টা করতে থাকে। অতীত হলো অতীত, সেখানে বিচরণ করে আহাম্মকেরা। তাদের বুক জুড়ে বিষাদ। সে দুঃখ চায় না। নতুন করে বাঁচতে চায়। সাঈদুল দাঁতে দাঁত ঘষে কিছুক্ষণ হাসে। আলোছায়া অন্ধকারে ঝলসে উঠে হলুদ দাঁত। তারপর হিসহিস করে জবাব দেয়।

‘সে মাগি তো তিন-চার বছর হলো পালিয়েছে। একটা ছেলে হয়েছিল। নিয়ে গেছে।’

‘সে কি!’

‘সে অনেক কথা। আমি তো তোকে বিয়ে করতে চেয়েছিলাম। তোর বাবা রাজী হলো না। না বুঝে বের করে দিল।’

রাহেলা কিছুতেই সেই হারিয়ে যাওয়া অতীত মনে করতে চাইছিল না। তবু মনের সকল ফাঁকফোকর গলিয়ে উঁকি মারতে শুরু করেছে অন্ধকার দিন। অনেক কষ্টে সহ্য করে যায় সে। অজানা আশঙ্কা তাড়া করে ফেরে। মনে মনে আকাক্সক্ষা, কোনোমতে সেই কথা যাতে না ওঠে। কিন্তু…উঠে গেল। তখন সাঈদুল সোফা ছেড়ে তার দিকে এগিয়ে আসে। তার কাঁধ দু-হাত দিয়ে চেপে ধরে চাপা গলায় বলে চলে,Ñ

‘তোর সে-সব কথা মনে পড়ে না? মনে নেই? আমি তোকে কত ভালোবাসি। খুব ভালোবাসি রাহেলা। এখনও।’

‘তুই ধন-সম্পদের লোভে ছিলি। বাবার জমিজমা টাকা-পয়সার উপর চোখ ছিল। লম্পট কোথাকার!’

‘হ্যাঁ…হ্যাঁ চাইতাম। কোন্ শালা অঢেল সম্পদ চায় না?’

‘এখন তুই যা। আমার সংসার আছে। স্বামী সন্তান আছে। অতীতকে কবর দিয়েছি।’

‘সবকিছু তো কবর দেয়া যায় না মাই ডিয়ার। প্রেতাত্মা হয়ে কবর ফুঁড়ে বেরিয়ে আসে। আদায় করে নেয় তার যা চাওয়ার।’

‘মানে? কী বলতে চাস? কী চাই তোর? ভয় দেখাচ্ছিস?’

‘ভয় কিসের? একটু আধটু ভালোবাসা। আমাদের গোপন প্রেম। কেউ জানবে না…টের পাবে না। সেই আগের মতো। বুঝলি।’

‘তুই বেরিয়ে যা এখনি। কুত্তা কোথাকার!’

‘তুই বললেই যাব? অনেকদিন অ…নে…ক দিন বুঝলি! এখন তুই হলি আমার হিডেন ট্রেজার। ভাঙাব, মজা করব আর চলব। বাধা দিলেই…বুঝতে তো পারছিস। হে হে হে!’

রাহেলার হাত-পা জমে আসে। সে হয়ত আগের চৌদ্দ-পনেরো বছরের কিশোরী হয়ে যায়। কোনেকিছু বোঝে না। জানে না। প্রতিরোধের কোনো শক্তি নেই। তার আলোছায়া অন্ধকার ঘর আর ঘর নেই, দীর্ঘ এক সুড়ঙ্গ; বিস্তীর্ণ গভীর তার গহ্বর। তার সম্মুখে কুৎসিত ভয়াবহ এক দানব। সে কী করে যায় বুঝতে পারে না। তার খুব কষ্ট হয়। বাধা দিতে পারে না। তারপর আকস্মিক নিচ্ছিদ্র ঘুম…ঘুম…সে নড়তে পারে না। সাঈদুল আবার তার কাঁধ ঝাঁকিয়ে দেয়। তখন রাহেলার চেতনা আসে। দ্রুত বুঝে নেয় সময়। তার হাতে আলগোছে শক্তি এসে জমা হতে থাকে। সে কোনোমতো তাকে সরিয়ে খুব স্বাভাবিক বলে উঠে,-

‘তুই বোস…গল্প করি। চা-টা খা।’

‘এই তো লাইনে এসেছ রানি।’

সাঈদুল তাকে ছেড়ে সোফার পাশে রকিং চেয়ারে গিয়ে বসে। ছবির চেয়ার। ওর নানা দিয়েছে। খুব ভালোবাসে নাতনিকে। রাহেলা এখন কী করে? মাথায় কোনোকিছু আসছে না। সব জট বেঁধে যাচ্ছে। অথচ যা করার দ্রুত সারতে হবে। সে এই ফাঁকে রান্নাঘরে গিয়ে শক্ত কিছু হাতড়াতে থাকে। ছুরি বটি বা অন্যকিছু। সাঈদুল ও ঘরে রকিং চেয়ারে দুলছে। মনে বড় আনন্দ। চেয়ারটি বিকট শব্দ তুলতে তুলতে অদ্ভুত ঢেউ আঙিনায় ছড়িয়ে দেয়।

‘ক্যাঁচ ক্যাঁচ ক্যাঁচ।’

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

You may have missed

shares