ভ্রমণ

৯/১১-এর স্মৃতিসৌধ

আকাশছোঁয়া দালান

আশরাফুন নাহার লিউজা

 

মেঘের উপরে বাড়ি হয় নাকি! নন্দিত কথাসাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদ মেঘের উপর বাড়ি নামে একটা উপন্যাস লিখেছেন। অবশ্য এ লেখাটি প্রিয় লেখকের সেই উপন্যাস নিয়ে নয়। এটি ৯/১১-এর স্মৃতিসৌধ ও আকাশ ছোঁয়া একটি দালান নিয়ে। অনেকে হয়তো প্রশ্ন করতে পারেন, ভবন আবার আকাশ ছোঁয় নাকি? হয়তো এটা কথার কথা! কিন্তু এই ভবনটি উঠে গেছে, এতটাই উঁচুতে যা কি-না, স্পর্শ করেছে মেঘেদের রাজত্ব।

সব মানুষ কমবেশি প্রকৃতিপ্রেমী। গাছ আমরা খুব ভালোবাসি। সে ঘরে রাখার ছোট্ট শো পিস কিংবা মাটির উপর সগর্বে দাঁড়িয়ে থাকা উঁচু উঁচু বৃক্ষরাজি। সমুদ্র, নদী, ঝরনা, পাহাড়ি পথ-েএসবই ভালো লাগে। মন যেমন জুড়িয়ে যায়। ইট কাঠ কংক্রিটের সৌন্দর্য কখনওই তেমন কাছে টানে না। তবে এবার বোধ হয়, সেই ভুলও ভাঙলো। নিউইয়র্কের ওয়ান ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টার কিংবা ওয়ান ট্রেড সেন্টার, যে নামেই ডাকি না কেন, এটি যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে উঁচু ভবন। ভবনটির ১০২ তলায় পৌঁছে ভালো লাগার অন্য এক অনুভূতি হয়, যা আধুনিক স্থাপত্যের প্রতি আমাদের অনেক বেশি আগ্রহী করে তুলেছে। আকাশ থেকে পুরো নিউইয়র্ক দেখার দারুণ সুযোগ। যেখান থেকে স্ট্যাচু অব লিবার্টিকে দেখতেও খেলনা বলে মনে হয়। উঁচুঁ ভবনের ফাঁকগুলো এঁেকবেঁকে যাওয়া সর্পিল গতির রাস্তা, চমৎকার ব্রিজ আর দৃষ্টিনন্দন নদী। সেই সাথে সমুদ্রের মোহনা। চারিদিকে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে সৌন্দর্যের পসরা। বিস্ময়ের শুরুটা অবশ্য একেবারে নিচ থেকেই।

২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বর। ভয়াবহ সন্ত্রাসী হামলায় বিধ্বস্ত হয়ে যায় যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কের ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টার বা টুইন টাওয়ার। সেখানকার একপাশে এখন এই ওয়ান ট্রেড সেন্টার গড়ে তোলা হয়েছে। এটিকে ফ্রিডম টাওয়ার নামেও ডাকা হয়। সন্ত্রাসী হামলায়, নিহতদের স্মরণে সেখানে একটি কমপ্লেক্স তৈরি করা হয়েছে। পানির স্রোতধারা, কংক্রিটে খোদাই করা নিহতদের নাম, অনেক গাছ আর একটি জাদুঘর।

নাইন ইলেভেন মেমোরিয়াল নির্মাণ করা হয়েছে, সেই সন্ত্রাসী হামলায় নিহত প্রায় ৩ হাজার মানুষের স্মৃতিকে ধরে রাখতে। নিহতদের স্মরণে এক ধরনের ভাবগম্ভীর পরিবেশ রয়েছে সর্বত্র। আর রয়েছে কঠোর নিরাপত্তার ঘেরাটোপ। সব মিলিয়ে, সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে শান্তির এক প্রতিবাদ ও প্রতিরোধের বার্তাই যেন চারিদিকে। সেখানে নিহতদের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে প্রতিদিনই অনেক মানুষ আসেন। আসেন স্বজনেরা। সেই ঘটনায় ৬ হাজারেরও বেশি মানুষ আহত হয়েছিলেন। আসেন তারাও। নীরবে ফুল দিয়ে সম্মান জানান।

যাহোক, এখন আবার আসি ওয়ান ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারের নির্মাণশৈলি ও আধুনিক প্রযুক্তির কথায়। ভবনটি ১০৪ তলা। উচ্চতা ১ হাজার ৭৭৬ ফুট। তবে দর্শনার্থীরা যেতে পারেন এই ভবনের ১০২ তলা পর্যন্ত। বুকে হাত দিন, এরপর বলছি, এই ১০২ তলায় পৌঁছাতে একজন দর্শনার্থীকে খরচ করতে হবে মাত্র ৬০ সেকেন্ড। বিশ্বাস হচ্ছে না! হ্যাঁ, বিস্ময়ের ঘোর আমারও লেগেছিল অনেকক্ষণ। আর এই ৬০ সেকেন্ডেই লিফটের দেয়ালে, নিউইয়র্ক নগরীর গড়ে ওঠার একটি ভিডিও চিত্র দেখে, আপনার অনুভূতি আরও ভালো লাগায় ভরে উঠবে। একই সাথে, ১০১ এবং ১০০ তলার অবজারভেটরি টাওয়ার থেকে নিউইয়র্কের সৌন্দর্য দেখতে পাবেন দর্শনার্থীরা। আর এই তিনটি তলার পরতে পরতে ছড়িয়ে আছে অন্যরকম এক সৌন্দর্য। রয়েছে রেস্টুরেন্ট, স্যুভেনির শপও। চারিদিকে কাচঘেরা। তাই দিন কিংবা রাতের নিউইয়র্ক সহজেই ধরা পড়বে আপনার কাছে। আর একটি মজার ব্যাপার রয়েছে এখানে। ভবনে ওঠার সময় সবাইকেই দাঁড়াতে হয় ক্যামেরার সামনে। পরিবার হলে, সবাইকে নিয়ে। আর একা হলে, একাই। দলবদ্ধভাবে দাঁড়ানোর সুযোগ আছে। পরে ভবন ত্যাগ করার সময়, সেই ছবি প্রিন্ট ও ডিজিটাল ভার্সন নিয়ে নেয়ার সুযোগ রয়েছে। তবে ছবি নেবার ব্যাপারটি ঐচ্ছিক ও এর জন্য গাটের কিছু ডলার খরচ করতে হবে। ছবির মজার ব্যাপারটি হচ্ছে, তোলা হবে এটি পর্দার সামনে, প্রিন্ট হয়ে আসবে অনেক উঁচুতে দাঁড়ানো, পেছনে নিউইয়র্কের অসংখ্য দালানের সামনে। এমনকি রাত ও দিনের ছবি প্রিন্ট হয়ে আসে। আরও আশ্চর্য ব্যাপার হচ্ছে, আপনি দাঁড়িয়ে আছেন যে টাওয়ারে, পেছনে সেই টাওয়ারকেই দেখা যায়। ভাবছেন এটা আবার কেমন কথা! আসলে এক ধরনের প্রযুক্তি ব্যবহার করে ক্রোমা করে এই ছবিগুলো করা হয়। তাতে যেকোনো কিছুই আপনার ব্যাকগ্রাউন্ডে স্থাপন করা সম্ভব। তবে ভবনটির উপরে উঠে, পেছনে নিউ ইয়র্কের স্কাইলাইন রেখে আপনি কিন্তু নিজের মতো করে ছবি তুলে নিতেই পারেন। সেই সুযোগ আপনার হাতেই রয়েছে।

জানিয়ে রাখি, ১০৪ তলার এই ভবনটি উচ্চতার দিক থেকে সারা পৃথিবীতে চতুর্থ। প্রথমটি সংযুক্ত আরব আমিরাতের বুর্জ আল খলিফা। দ্বিতীয়টি চীনের সংহাই টাওয়ার। আর এরপরেই রয়েছে সৌদি আরবের মক্কায় অবস্থিত আবরাজ আল বাইয়াত ক্লক টাওয়ার।

লোয়ার ম্যানহাটনের ফুলটন স্ট্রিট এবং ভিসে স্ট্রিটের মধ্যে এই ভবনটি পড়েছে। কিছু সীমানা পড়েছে ওয়াশিংটন স্ট্রিটের মধ্যেও। নিউ ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টার কমপ্লেক্সের প্রধান ভবন এই ফ্রিডম টাওয়ারের নির্মাণ কাজ শুরু হয় ২০০৬ সালের ২৭ এপ্রিল। আর নির্মাণে ব্যয় করা হয়েছে ৩ দশমিক ৯ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। আমেরিকান ডেভিড চিলডস এবং পোলিশ আমেরিকান ড্যানিয়েল লিবেসকিন্ড এই টাওয়ারটির স্থাপত্যবিদ। নির্মাণ কাজ শেষে ভবনটি সবার জন্যে উন্মুক্ত করে দেয়া হয় ২০১৪ সালের ৩ নভেম্বর। ভবনটি সকাল ৯টায় সবার জন্যে খুলে দেয়া হয়। শীতের সময় রাত ৮টায় বন্ধ হলেও, গ্রীষ্মে বন্ধ হয় রাত ১০টায়। ভেতরে ঢুকতে অবশ্যই টিকেট লাগবে। এক্ষেত্রে প্রাপ্তবয়স্কদের জন্যে ৩২ ডলার ও ১২ বছরের কম বয়সী শিশুদের জন্য ২৬ ডলারে টিকেট কিনতে হবে। তবে ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বর সন্ত্রাসী হামলায় নিহতের স্বজন ও ওই সময় উদ্ধার কাজে অংশ নেয়া লোকজন বিনাটিকেটে প্রবেশ করতে পারবেন। মনে রাখা ভালো, ভবনটির ভেতরে ঢুকতে দীর্ঘ সময় লাইনে দাঁড়াতে হতে পারে। সেই সাথে যেতে হবে নিরাপত্তা তল্লাশির মধ্য দিয়ে। নিরাপত্তার স্বার্থে, অনেকেই নিশ্চয়ই হাসি মুখে এই বিড়ম্বনাটুকু মেনে নেবেন। তাহলে প্রস্তুতি নিন, অসাধারণ এক অনুভূতি নিজের করে নেয়ার। চলুন যাওয়া যাক ফ্রিডম টাওয়ারে। আধুনিক স্থাপত্যকলার সৌন্দর্যের অনবদ্য ভুবনে।

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

shares