বাংলা একাডেমি পুরস্কার প্রাপ্ত (২০২১) কবি ও কথাশিল্পীদের সাহিত্যপ্রভা : আসাদ মান্নান : একজন প্রকৃতিনিমগ্ন বিক্ষুব্ধ কবির কথা : নিঝুম শাহ্

[আসাদ মান্নান ১৯৫৭ সালের ৩ নভেম্বর চট্টগ্রাম জেলার সন্দ্বীপ উপজেলায় জন্মগ্রহণ করেন। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলাসাহিত্যে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। তিনি বাংলাদেশ সরকারের নানা গুরুত্বপূর্ণ পদে বিভিন্ন সময়ে দায়িত্বপ্রাপ্ত ছিলেন। বর্তমানে বাংলাদেশ কর্ম কমিশনে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে আসীন আছেন। আসাদ মান্নানের কবিতার চর্চা মূলত সত্তরের উত্তাল সময় থেকে সূর্যাস্তের উল্টোদিকে, সুন্দর দক্ষিণে থাকে, সৈয়দ বংশের ফুল, দ্বিতীয় জন্মের দিকে, ভালোবাসা আগুনের নদী, তোমার কীর্তন, হে অন্ধ জলের রাজা, তাঁর উল্লেখযোগ্য কাব্যগ্রন্থ। বেরিয়েছে প্রেমের কবিতা, নির্বাচিত কবিতা, শ্রেষ্ঠ কবিতা সংকলন। ষাটের দশকে বাংলা কবিতার উত্তরাধিকারে নগর ও নাগরিক জীবন যে অর্থে একটা সমূহ সম্ভাব্যতা তৈরি করে নিয়েছে, আসাদ মান্নানের কবিতায় সে অর্থে নগর বা যন্ত্রের কোলাহল দৃষ্টিগোচর হবে না। নাগরিক জীবন সেখানে প্রতিনিয়ত ঘষতে ঘষতে ক্ষয়ে যাওয়া নাগরিক নৈরাশ্য নয় বরং স্বাভাবিক যাপনের অংশ। হর্নের মুহুর্মুহু শব্দের বিপরীতে সমুদ্রের ঢেউয়ের গর্জন, পাহাড়ের নিমগ্নতা, মা-মাতৃভূমি-নারী মিলিত হয়ে ত্রিবেণী সঙ্গমের উল্লাসে অভিষিক্ত নিয়েছে। এরপর সে পৌঁছেছে পুরাণে, ইতিহাসে, অভূতপূর্ব ও সুনিশ্চিত আত্মার সংকল্পে। আসাদ মান্নান একটা দিব্যচেতনা থেকে নদী, নারী, সমুদ্র বা প্রকৃতিকে নিয়ে খেলায় মেতে ওঠেন। কবিতা তখন যাবতীয় বিষয়কে স্পর্শ করে দৈবভাবে। সাধারণ নিত্যদিনের সময়সূত্রকে অর্পণ করেন অনিবার্য ও স্বাতন্ত্র্যের প্ররোচনায়। এক্ষেত্রে কিছু আত্মমগ্নতা বা আত্মলীন অনুভবও হানা দেয় মাঝে মাঝে। বিশেষ করে প্রকৃতির সমর্থনে পুনরুত্থিত ঐতিহ্যিক শব্দবন্ধে, জন্ম-যৌনতা সেখানে স্বাভাবিক, পর্যবসিত হয় শীতল কাব্যালঙ্কারে। সনেটে ফিরে আসে ইতিহাস, সমকালের সঙ্গে সমান্তরালে। সমাজ নৃতত্ত্বের অতীত পুনরায় বর্তমানে ফেরে, সংগ্রাম আর ভঙ্গুর অর্থনীতি, রাজনৈতিক প্রসঙ্গ নতুনত্ববিলাসী করে তোলে কাব্যশরীরকে। বিশ্বাসের মর্মমূলে থাকে সমাজ-সমভূত চেতনা, কবিভাষায় নির্মিত হয় বিবর্তিত সমাজ ও দর্পিত স্বদেশ। কবিতায় অবদানের জন্য অর্জন করেছেন বাংলাদেশ সাহিত্য পরিষদ পুরস্কার, জীবনানন্দ দাশ পুরস্কার, কবিকুঞ্জ পদক, কবিতালাপ সম্মাননা ও পদক, বাংলা একাডেমি পুরস্কার-২০২১।]

অদৃশ্য জগৎ চিরন্তন, অপরিবর্তনীয়, পূর্ণ; দৃশ্যমান জগৎ তারই একটা অপূর্ণ প্রতিচ্ছবি। কবির কাজ অপূর্ণের মধ্যে পূর্ণের, খণ্ডের মধ্যে অখণ্ডের আবিষ্কার ও প্রকাশ। একজন কবিকে সাধারণের চেয়ে আলাদা করে তাঁর কবিত্ব। নইলে মোটা দাগে কৃষকও তো গেয়ে যায় মাটির গান এবং তা অপেক্ষাকৃত শুদ্ধভাবে। সংবেদনশীলতা, কল্পনা, প্রকাশ ও আলোড়নই তাঁকে আলাদা করে সবার থেকে। সে আলোড়নে সবুজ হয় পৃথিবী, চাষির হাতেও ওড়ে লাল প্রেমের পতাকা। কিংবা স্বপ্নের গন্ধকে জন্ম নেয় অন্ধকারের তারাবাতি, চন্দ্রবাতি! ২০২২ এসে যখন বাংলাদেশের স্বাধীনতার ৫০ বছর কেটে গেছে, অনেক প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তির কাটাকুটি নিয়ত প্রশ্নবিদ্ধ করছে, তখন অর্জনের খাতায় অবশ্য আমরা আমাদের সাহিত্যকে গ্রহণ করতেই পারি। বিশেষ করে বাংলা কবিতার ধারায় স্বাধীনতা পূর্ববর্তী সময় থেকেই তা নিজস্বতায় ফুলে-ফলে তার জৌলুশ ছড়িয়ে আসছে। বাংলাদেশের কবিতার শেকড় খুঁড়তে গেলে ত্রিশকেই শনাক্ত করা যায়। চল্লিশ পেরুনো ফুল-প্রকৃতির কবিরা পঞ্চাশে আরও বেশি বিশ্বমাত্রায় আসর জমাতে চাইলেন। পঞ্চাশে বাংলা কবিতা এগোতে থাকে প্রধানত মধ্যবিত্ত বাস্তবতাকে অঙ্গীভূত করে। ভাষা আন্দোলনের রাষ্ট্রশক্তির বিপক্ষে জয়, মাতৃভাষা বাংলার স্বীকৃতি, যুক্তফন্ট্রের জয়―এসব কবিতার পক্ষে নতুন সূর্যোদয়। বায়ান্ন থেকে আটান্ন―এর মধ্যে বাংলাদেশের কবিতায় নবস্ফূর্তি আসে। বিভাগোত্তর সময়ে কবিতাকে মুসলমানকরণের যে সাম্প্রদায়িক উন্মাদনা দেখা দিয়েছিল তা ’৫২ এর ভাষা আন্দোলনের পরে ক্রমেই অপরিহার্য বিলীয়মানতার দিকে অগ্রসর হয়। ফলে বাংলা কবিতার মূল অন্বেষণ ভিত্তিভূমি রচিত হয়েছিল মূলত বায়ান্নর পরেই। উত্তরাধিকারে তা ষাটের দশকের পরেই নিজস্ব রঙ-রূপে স্বকীয়তা পেয়েছিল। নতুন রাষ্ট্র গঠনের আবেগ ও নব্য-নাগরিক জীবন, মধ্যবিত্ত যাপনের পাশাপাশি লোকজ ঐতিহ্যিক অবকাঠামো, সংস্কৃতিতে ফিরেছেন অধিকাংশ কবিই। জাতিগত পরিচয়ের স্বরূপ উন্মোচনের চেষ্টা এ দশকের প্রায় সব কবির মধ্যেই মাত্রাগত পার্থক্যে পাওয়া যায়। স্বাধীনতার পর রাষ্ট্র পরিচালনার ক্ষেত্রে ঐক্যের পরিবর্তে বিভ্রান্তি-বিশৃঙ্খলা―ফলে বিপর্যস্ত অবকাঠামো থেকে গেছে ভঙ্গুর। অনির্মিত, প্রগতির আদর্শ অচিরেই বিপর্যস্ত হয়েছে। একাত্তরের পরের প্রজন্ম তাই বিভ্রান্তিতে হাবুডুবু খায়। দশকের এই বিধ্বস্ততা, হতাশার মুখে যাঁরা বাংলা কবিতায় এসেছিলেন আসাদ মান্নান তাঁদের মধ্যে একজন। ফলে ব্যর্থ রাজনৈতিক নেতৃত্ব, অপশাসন, স্ববিরোধিতা চলতে থাকে আর কবি আসাদ মান্নানও পরিণত হতে থাকেন সে সত্তার স্ববিরোধিতায়, নিয়ত অন্ত-বহিঃর্মুখী দ্বন্দ্বে। নারী ও শ্যামলী নিসর্গ তাঁর কাব্যে যোজনা করে নতুন মাত্রার। প্রথমদিকের কাব্যগ্রন্থ সূর্যাস্তের উল্টোদিকে (১৯৮১) নতুন সূর্যোদয়ের বার্তা নিয়েই আবির্ভূত হয়েছিল। সমকাল যে কবির গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হতে যাচ্ছে এ কাব্য থেকেই তার আভাস অনেকটাই সুনিশ্চিত হয়। এখানেই প্রথম তাঁর রোমান্টিক শান্ত পেলব জলজ গভীর দিকটিও ধরা পড়ে, যদিও কলিরূপে―ফোটার আকাক্সক্ষায় উদগ্রীব, যা পরবর্তী কাব্যগুলোতে শতদলে প্রস্ফুটিত হতে খুর বেশি সময় নেয়নি। কিন্তু বিরোধ সেখানে দুর্লক্ষ্য নয়, পরিতৃপ্তির পথ তাই অবমুক্ত। ঐতিহ্য সেখানে গুরুত্বপূর্ণ, ইন্ধন ইতিহাসের কিন্তু প্রখর উপস্থিতি রোমান্টিক ব্যক্তিসত্তাটিরও। ‘সমুদ্রগোলাপ’, ‘কোথাও জীবন মরে’, ‘মানুষ ছেড়েছে ঘর’, ‘এই ভাই অন্ধকার’, ‘কবিকে আমলার স্ত্রী ও কন্যা’ বা ‘সূর্যাস্তের উল্টোদিকে’ কবিতাগুলোতে বিষণ্ন বাংলাদেশ তার বিভীষিকাময় অস্থিরতা, বহিঃ ও অন্তঃকাঠামোর অসামঞ্জসতা অর্থাৎ দগ্ধ সমকাল নিয়ে বিরাজমান কিন্তু আত্মার স্নিগ্ধ, শান্ত, গীতল আহ্বানটি প্রশংসার ও রসনিষ্পত্তিস্বরূপ জীবনানন্দীয় নিমগ্নতায় দ্বিধাহীনচিত্তে প্রকাশিত :

সত্তার গভীরে কবি উৎসারিত আত্মার অসুখ

নিঃশব্দে লুকিয়ে রাখে; নিসর্গের শান্ত পাটাতনে

ক্ষণজন্মা  উদ্ভিদের ছায়া ঝরে, পাতা ঝরে নদীর চড়ায়;

রক্তের ভেতরে ওড়ে ডানাহীন অর্পূব ধূসর

এক নারকীয় পাখি : অই দূরে রাজবাড়ি জ্বলে;

রাজপথে বেশ্যালয়―তার পাশে স্বর্গের টিকেট

বিক্রি করে নির্বোধ লালন আর লালনদুহিতা এই বাংলাদেশ

বাঁ পাশে আমলার স্ত্রী ও তার কন্যা সারাদিন অন্ধ করে রাখে।

(কবিকে আমলার স্ত্রী ও তার কন্যা)

স্বাধীনতা-উত্তর সময়ে সাধারণ মানুষের আত্মার অসুখ নিসর্গের ‘শান্ত পাটাতনে’ লুকানো ছাড়া আর কোনও পথ রাখেনি অস্থির রাজনৈতিক পরিবেশ। রাজবাড়িতে হত্যাকাণ্ড হবার পর তাই ঘরে ঘরে ফেরি হয়েছে ‘স্বর্গের টিকিট’, মানবতার লালন পুড়ে মাথাচাড়া দিয়েছে পুরনো মৌলবাদ। আমলারা লুটেপুটে খেয়েছে, ফেলেছে বিষ নিঃশ্বাস। এ অবস্থায় কবির দগ্ধ চিত্ত, ক্ষোভ, অস্থিরতা, নৈরাশ্যের একমাত্র প্রকাশ্য হাতিয়ার কবিতা। ফলে এই সময়ে আসাদ মান্নানসহ অগ্রজ ও সমসাময়িক অনেকেই লিখেছেন স্লোগানাত্মক বিক্ষুব্ধ কবিতা। বাংলাদেশের কবিতায়, আরও স্পষ্ট করে বললে অন্যান্য কবিতার পাশাপাশি জাতীয়বাদী ধারায় যাঁরা বেশ সক্রিয় ছিলেন আবু জাফর ওবায়দুল্লাহ, মোহাম্মদ রফিক, মুহম্মদ নূরুল হুদা, রুদ্র মুহম্মদ শহীদুল্লাহর সঙ্গে আসাদ মান্নানকেও সমান্তরালে চিহ্নিত করা যায়। দেশের ঐতিহ্য ও জাতিগত চেতনার জায়গায় সকলে একবিন্দুতে প্রোথিত হলেও তাঁদের প্রত্যেকের ভিন্ন স্বকীয় স্বর সহজেই আলাদা করা যায়। ওবায়দুল্লাহ যেখানে উচ্চ ঘোষণার স্বর, নূরুল হুদা ও রফিকের অনিবার্য অস্ত্র মুক্তিযুদ্ধ-জাতি-পরম্পরা, শহিদুল্লাহ যেখানে শুধু নামে নয়, প্রকাশেও রুদ্র-আসাদ মান্নান সেখানে জীবনানন্দের মতোই সমকালচেতন-বিক্ষুব্ধ হলেও প্রকাশে প্রকৃতি নিমগ্ন। রুদ্র মুহম্মদ শহীদুল্লাহ যখন লিখছেন―‘জাতির পতাকা খামচে ধরেছে আজ পুরনো শকুন’, ওবায়দুল্লাহ যখন লিখেছেন ‘আমি কিংবদন্তির কথা বলছি’ তখন মান্নান লিখছেন :

এখানে প্রেমিক যারা তারা বড়বেশি ক্ষণিকের

স্মৃতির পাথরে গড়ে অস্তিত্বের  চলন্ত বাসর;

বিরুদ্ধ জলের মুখে সমর্পিত দেশজ লাবণ্য

আত্মার সঙ্গীত শোনে; অর্ফিয়সী বাঁশির আসর

মন্দিরে-গির্জায় ঘোরে। শকুন-শিয়াল আর বন্য

হাওয়ার শরীরে নাচে নরলোভী  মৃত্যুর শহর―

জননীর স্তন জ্বলে জনকের নেশাখোর চোখে;

স্বপ্নের সমুদ্রে ভাসে প্রিয় দ্বীপ সন্দ্বীপের চর :

(সমুদ্রগোলাপ)

অথবা,

কোথাও আকাশ নেই―আকাশের বুকে কোনও নদী,

নদীর ধূসর লজ্জা, বহমান খোঁপার মর্মর―

কেবল অদৃশ্য চোখ। মধ্যরাতে লোকালয় ছেড়ে

আমাকে ভোরের আগে যেতে হবে নদীর ওপারে;

আমাকে ভাঙতেই হবে ভ্রাম্যমাণ জলের সাধনা―

মানুষ ছেড়েছে ঘর গোলাপের কবর বানাতে।

(মানুষ ছেড়েছে ঘর)

কাব্য-উত্তরাধিকারে আসাদ জীবনানন্দের সুধাগ্রাহী। অগ্রজ শামসুর রাহমানের প্রভাব অনেক ক্ষেত্রে লক্ষণীয় হলেও তিনি শ্রেষ্ঠ কবিতার ভূমিকায় নমস্য করছেন―‘আমার কবিতার জন্য আমি নিয়ত একটি আশ্রম চেয়েছি। জীবনানন্দ দাশ আমার সেই আরাধ্য আশ্রম,―এ আশ্রমে সেই কৈশোর থেকে আমি এক অন্ধ পুরোহিত।’ জীবনানন্দ ইতিহাসচেতন কবি। ইতিহাসচেতনাই তাঁকে সমাজচেতনার দিকে ধাবিত করেছে, অতীত থেকে সে পথ ধাবিত হয়েছে ভবিষত্বে। কিন্তু মান্নান উত্তরাধিকারী হলেও অন্ধ অনুকারক নন। সমাজচেতন বলেই তিনি যেন খুঁড়ে চলেছেন ইতিহাস, সভ্যতার কানাগলি কিংবা আশ্রয় নিয়েছেন পুরাণে, সঙ্গে যুক্ত হয়েছে মিথ আর লৌকিক নানা অনুসঙ্গ। তাই জীবনানন্দ যখন ‘সুরঞ্জনা’ তে প্রশ্ন তোলেন :

গ্রিক হিন্দু ফিনিশীয় নিয়মের রূঢ় আয়োজন

শুনেছ ফেনিল শব্দে তিলোত্তমা-নগরীর গায়ে

কী চেয়েছ ? কী পেয়েছ ?―গিয়েছে হারায়ে।

তখন আসাদ মান্নান উত্তরাধিকারে খোঁজেন :

আমি এ বন্দুক কাঁধে সাত লক্ষ নক্ষত্রের ছায়ার ভেতর

পৃথিবীর সর্বশেষ কুমারীর চুলের খোঁপায় হেঁটে যাব :

একেকটি বুলেট থেকে বের হবে সাত লক্ষ মানুষের ঘর

প্রত্যেক ঘরের মধ্যে জন্ম নেবে মুহম্মদ সক্রেটিস যীশু

প্রত্যেক যীশুর বুকে বন্দুকের নলাঘাতে গোলাপ ফোটাব

প্রত্যেক গোলাপ থেকে জন্ম নেবে পৃথিবীর সর্বশেষ শিশু

এবং এ শিশু হবে ঈশ্বরের একমাত্র উত্তরাধিকারী,

মানবমনীষাজুড়ে এই নামে তৈরি হবে কবিতার বাড়ি।

(আসাদ মান্নান, সুন্দর দক্ষিণে থাকে)

বাঙালির চেতনার মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস, কুমারীর চুলের খোঁপা বেয়ে তাই হেঁটে আসে। সাত লক্ষ নক্ষত্রের ছায়ার ভেতর যে স্বাধীনতা অর্জিত হয়েছে তার ঘরে ঘরে কবি প্রত্যাশা করেছেন মানবিকতার জন্ম, বন্দুকের নলে সেখানে গোলাপ ফোটানোর স্বপ্ন দেখিয়ে ঈশ্বরকে করতে চেয়েছেন সাধারণের। গড়তে চেয়েছেন কবিতার মতো সংবেদনশীলতা! আবু জাফরের কবিতায় ‘মা’ একটা বিপুলতা নিয়ে হাজির হয়। কিন্তু মান্নানের মা আর্থ-সামাজিক-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটের তুলনায় অনেক বেশি প্রাসঙ্গিক প্রকৃতিসংলগ্নতায়। মাতৃভূমি ‘মা’ আর জননী ‘মা’ মিলেমিশে একবিন্দুতে গ্রথিত হয়ে যায়, অনর্গল গেঁথে চলে নদী-নারী-ভূমিকে। কবি নিজেই বলছেন ভূমিকাতে―‘আমি গৌরবের সঙ্গে অনুভব করি যে, আমার রক্তে মা আর মাতৃভূমি এক হয়ে মিশে আছে। মা এখন মৃত। কিন্তু মাতৃভূমি তার সবকিছু নিয়ে―সকল শক্তি ও সম্ভাবনা, ঐশ্বর্য ও সৌন্দর্য নিয়ে মায়ের প্রতিমা হয়ে সারাক্ষণ আমাকে ঘিরে আছে। কাজেই আমি হলফ করে বলতে চাই : আমার জীবনবোধ সৃষ্টির ক্ষেত্রে সেই সব মহৎপ্রাণ মানুষের প্রভাব নিরন্তর অনুভব করি, যারা আমার এ প্রিয় মাতৃভূমিকে ভালোবেসে জীবন দিয়েছেন, একে নির্মাণ করেছেন নিজেদের রক্ত দিয়ে।’ ফলে রক্তাক্ত বাংলাদেশের ছিন্ন-বিচ্ছিন্ন রূপ তাঁর নিজস্ব নিমগ্নভঙ্গিতে বারবার ঘুরেফিরে এসেছে তাঁর স্বকীয় ভঙ্গিমায়, সাবলীল শব্দে এবং অবশ্যম্ভাবীভাবেই সেখানে মিলে যায় মা এবং মাতৃভূমির রূপ :

সবুজ আতরজলে ঈশ্বরের প্রিয় উপহার―

সমুদ্রগোলাপ তুমি! আজ কার কোন অভিশাপে

আজন্ম শিশুর মতো প্রোজ্জ্বলিত সবুজ সংসার

কেবল হারিয়ে ফেলেছ হিংস্রতম সভ্রতার পাপে :

তোমার চারদিকে ভাসে বেহুলার বিশ্বাসের ভেলা,

ইন্দ্রের সভায় নাচে পৃথিবীর কৃষ্ণ অবহেলা।

(সমুদ্রগোলাপ)

সৈয়দ বংশের ফুল (১৯৮৩) রোমান্টিক আসাদ মান্নানকে বিধৃত করে। সনেটের মাত্রাগত জটিলতার চ্যালেঞ্জ সত্ত্বেও এখানে এক অন্যরকম প্রতিভাবান মান্নানের দিকে চোখ পড়বে পাঠকের। অষ্টক-ষষ্টকের সীমারেখার ঘেরাটোপের মধ্যে ‘তুমি’র যে শাশ্বত নানামাত্রিক রূপ নিজস্ব উপমা প্রবণতাকে ছাপিয়ে ইমেজের পর ইমেজ তৈরি করতে সক্ষম হয়েছে এবং আশ্চর্যজনকভাবে তাতে সনেটের ধারাবাহিকতাও রক্ষা পেয়ে একটা মূলবিন্দুতে এসে ভাবের একটা সিদ্ধান্তকেই প্রতিষ্ঠিত করতে পেরেছে এবং ‘তুমি’র সঙ্গে মাতৃভূমি মা এসে মিশে গেছে সে কৃতিত্বের জন্য আসাদ মান্নানকে এ কাব্যে আলাদাভাবে ধরা যায়। এ যেন নিজেকেই নিজে চ্যালেঞ্জ করে বসা এবং নির্দ্বিধায় বলা যায়, তাতে তিনি সাফল্যের সঙ্গে উৎরে গেছেন। 

আসাদ মান্নান বিপুল শব্দসম্ভারে বুনতে থাকেন সনেটের গাত্র, অমোঘ হয়ে আসে প্রাচীন-মধ্যযুগের ধারাবাহিক সমুজ্জ্বল পুননির্মিত বার্তা।

ষাটের দশকে বাংলা কবিতার উত্তরাধিকারে নগর ও নাগরিক জীবন যে অর্থে একটা সমূহ সম্ভাব্যতা তৈরি করে নিয়েছে, মান্নানের কবিতায় সে নগর বা যন্ত্রের কোলাহল দৃষ্টিগোচর হবে না। নাগরিক জীবন সেখানে প্রতিনিয়ত ঘষতে ঘষতে ক্ষয়ে যাওয়া নাগরিক নৈরাশ্য নয় বরং স্বাভাবিক যাপনের অংশ। হর্নের মুহুর্মুহু শব্দের তুলনায় সেখানে সমুদ্রের ঢেউয়ের গর্জন, পাহাড়ের নিমগ্নতা, মা-মাতৃভূমি-নারী মিলিত হয়ে ত্রিবেণী সঙ্গমের উল্লাসে অভিষিক্ত হয়েছে। এরপর সে পৌঁছেছে পুরাণে, ইতিহাসে, অভূতপূর্ব ও সুনিশ্চিত আত্মার সংকল্পে। আসাদ মান্নান একটা দিব্যচেতনা থেকে নদী, নারী, সমুদ্র বা প্রকৃতিকে নিয়ে খেলায় মেতে ওঠেন। কবিতা তখন যাবতীয় বিষয়কে স্পর্শ করে দৈবভাবেই। সাধারণ নিত্যদিনের সময়সূত্রকে অপর্ণ করেন অনিবার্য ও স্বাতন্ত্র্যের প্ররোচনায়। এক্ষেত্রে কিছু আত্মমগ্নতা বা আত্মলীন অনুভবও হানা দেয় মাঝে মাঝে। সৈয়দ বংশের ফুল কাব্যে প্রথম শক্তিশালী এক কবিচিত্তকে আবিষ্কার করা যায়। বিশেষ করে প্রকৃতির সমর্থনে পুনরুত্থিত ঐতিহ্যিক শব্দবন্ধে, জন্ম-যৌনতা সেখানে স্বাভাবিক, পর্যবসিত হয় শীতল কাব্যালঙ্কারে। সনেটে ফিরে আসে ইতিহাস, সমকালের সমান্তরালে। সমাজ নৃতত্ত্বের অতীত পুনরায় বর্তমানে ফেরে, সংগ্রাম আর ভঙ্গুর অর্থনীতি, রাজনৈতিক প্রসঙ্গ নতুনত্ববিলাসী করে তোলে কাব্যটিকে। ৫১টি সনেটের কাব্য পরিক্রমায় মাতৃভূমির ইতিহাস, সমকাল স্থিতভাবে উন্মোচিত হয়েছে প্রতিটি সনেটে। বিশ্বাসের মর্মমূলে থাকে সমাজ-সম্ভূত চেতনা, কবিভাষায় নির্মিত হয় বিবর্তিত সমাজ ও দর্পিত স্বদেশ। ছন্দ এখানে পরিশুদ্ধতার দিকে ঝুঁকেছে, চিত্রকল্প স্বভাবসুলভ স্বপ্নমেদুর, চেতনাপ্রবাহে আক্রান্ত বাক্য, রাজনৈতিক রক্তাক্ত কুশলতা, খেদোক্তি  ও ক্ষোভও থাকে তাতে। ৫১ টি সনেট শেষে কাব্যটির শেষে সংযোজিত হয়েছে দেশকে ‘টাওয়েল’ উপমার প্রতীকায়নে এক খেদোক্তি খচিত কবিতা :

এই বাংলাদেশ কী একটি সেনিটারি টাওয়েল―

যে শুধু রক্তই কুড়োবে!

যে শুধু মৃত্যুই কুড়োবে!

মাছির পাখার মতো ভনভন লেজ নাড়ে

একপাল জাতীয় ইঁদুর।

সমালোচক মহীবুল আজিজ বলছেন―‘সৈয়দ বংশের ফুল কাব্যগ্রন্থটি আমাদের হাতে আসে, আমাদের মনে পড়ে কবি জীবনানন্দ দাশকে। মনে পড়ে, কারণ তিনিও দাশকবির মতন সনেট-রচয়িতা। তাঁর প্রায় সব কবিতাই ছন্দানুসারী। নিরেট গদ্যের কবিতা খুব কমই পাই তাঁর। সেই আদি আসাদ মান্নান পরবর্তীকালে তাঁর সেই পূর্ববিন্যাসের ধ্রুপদী-চরিত্রেই গাঁথা রয়ে যান।’ ৫ সংখ্যক সনেটে কেমন সে বিন্যাস :

পরনে শাড়ি তো নয় তারাজ্বলা সুতোর আকাশ :

কুয়াশা জড়ানো চোখে রাত জাগা গাড়ল সবুজ;

কখনও নির্জন হ্রদে সূর্যাস্তের আজ্ঞাবহ দাস

পায়ের গোড়ালি তার : অন্ধকার নিরীহ অবুঝ―

চতুর গ্রীবায় রেখে রৌদ্রসুঁই শুধু অহেতুক

ট্রাফিক বাতির মতো জ্বলে তার হাতের ইশারা;

আদেশ-নিষেধ নেই-নির্বিকার অরণ্যের বুক:

রবীন্দ্রভক্তের চোখে তার চুল শ্রাবণের ধারা।

’৭১ এ স্বাধীন ভূখণ্ড অর্জনের পরপরই প্রকৃতপক্ষে যুদ্ধ শুরু হয়েছিল নতুনভাবে জাতি হিসেবে স্বতন্ত্রতা অর্জনের। একপাশে যেমন ছিল খণ্ডিত বাংলার অন্তর্দহন অন্যদিকে ছিল এ ভূখণ্ডের স্বতন্ত্রতার প্রশ্ন। এরপর শুরু হল যুদ্ধ পরবর্তী নানান প্রতিক্রিয়া। যুদ্ধবিধ্বস্ত ধ্বংসাবশেষের বিপরীতে লুটপাট, হত্যা, ধরপাকড়। গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষতা ও বাঙালি জাতীয়তাবাদের মূলমন্ত্র নিয়ে যে দেশের সংবিধান যাত্রা শুরু করেছিল সে দেশের মাটিতেই ঘটেছে মুজিব হত্যা, সামরিক অভ্যুত্থানের মতো হতাশাজনক ঘটনা। জাতির রক্তাক্ত পতাকা খামচে ধরেছে পুরনো মৌলবাদ। জনগণ ভয়ানক সব অপারেশন দেখেছে স্বাধীন স্বদেশেই, যেখানে ট্রাকের নিচে পিষে ফেলা হয়েছে মানুষকে অবলীলায়। আবার, তাদেরই বাঁচানোর জন্য মহান সংসদে সংবিধানের ব্যবচ্ছেদ করা হয়েছে লজ্জাহীনভাবে, খুনিরা দাপুটে গলায় বর্ণনা করেছে নির্মমতার। মানুষ দেখেছে সাংবাদিক, লেখকদের অবস্থা, দেখেছে তালেবান গণতন্ত্রের সক্রিয় কর্মকাণ্ড। ফলে স্বাধীনতা পরবর্তী এই সময়টুকু বিশেষ করে ’৭২ থেকে ’৯১ পর্যন্ত সময় বাংলাদেশের সাহিত্যে গুরুত্বপূর্ণ একটা বাঁক নেবার সময়। হুমায়ুন আজাদ যেমন লিখছেন :

তোমাকে মিনতি করি কখনও আমাকে তুমি বাংলাদেশের কথা তুলে কষ্ট দিয়ো না।

জানতে চেয়ো না তুমি নষ্টভ্রষ্ট ছাপান্নো হাজার বর্গমাইলের কথা; তার রাজনীতি,

অর্থনীতি, ধর্ম, পাপ, মিথ্যাচার, পালে পালে মনুষ্যমণ্ডলি, জীবনযাপন, হত্যা, ধর্ষণ,

মধ্যযুগের দিকে অন্ধের মতোন যাত্রা সম্পর্কে প্রশ্ন ক’রে আমাকে পীড়ন কোরো না;

৬ ডিসেম্বর ১৯৯০ হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ পদত্যাগ করেন। এ প্রেক্ষাপটে ‘তুমি মৃত অজগর পালাবে কোথায়’ (১৯৯০) তে প্রতীকায়নে বাঙালি সাধারণ মানুষের কাহিনিকাব্যই যেন রচনা করলেন। সমরশাসক প্রেত ও আর্থ-রাজনীতিক চাপে উম্মূল সত্তা, জীবনের অনেক সূক্ষ্মবোধ ১ থেকে ২৪ সংখ্যক একনামে গ্রন্থিত কাব্যে সুন্দরী বিটিভি ঘোষিকার ‘অদ্ভুত মায়াবী কালো তিল’ এর রূপকের আশ্রয়ে শুরু করে স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের একটা কাব্যিক ধারাভাষ্য এনেছেন শৈল্পিক দ্যোতনায়। ১৮ সংখ্যক কবিতায় স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের ব্রিফিং করছেন :

মা গো! আর কোনো শোক নয়,

এই দেখো, শোক জমে জমে পাথর হয়েছে;

মা গো! আর কোনো অশ্রু নয়,

এই দেখো, অশ্রু জমে জমে আগুন হয়েছে;

পাথর আগুন নিয়ে রাজপথে আমরা নেমেছি―

অজগর কোথায় পালাবে ?

দ্বিতীয় জন্মের দিকে (১৯৯৩) শুধু নামে নয়, কাব্যনির্মাণের পথেও আসাদ মান্নানের দ্বিতীয় জন্মের দিকেই নির্দেশ করে। সূর্যাস্তের উল্টোদিকে বা সৈয়দ বংশের ফুল-এ তাঁর কবিসত্তার যে রোমান্টিকপ্রবণতার জায়গাটি বিক্ষুব্ধ সমাজ-পারিপার্শ্ব খানিকটা গ্রাস করেছিল তা আবার স্বীয় আলোয় উদ্ভাসিত এবং বেশ পাকাপোক্তভাবেই দিশা খুঁজে পায় এ কাব্যে। সংযত আবেগের নিঃশ্বাসে শহুরে চিত্তে ভর করে গ্রাম। ধীরলয়ের দীর্ঘ পঙ্ক্তিমালার প্রকরণে পাওয়া যাবে স্বাধীনতাউত্তর বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অবস্থার পরিমণ্ডলে অস্তিত্বের সংকটের উদীয়মান দ্বন্দ্ব। এক্ষেত্রে তিনি ইউরোপীয় বা বহির্দেশীয় বলে কোনো সীমারেখা রাখেননি বরং দেশীয় ঐতিহ্য ও ইতিহাসকে যেমন নিজস্বতায় আলোকিত করেছেন, তেমন প্রাসঙ্গিকভাবে গ্রিকপুরাণ ও প্রাচ্যপুরাণকেও অবলীলায় গ্রহণ করেছেন―‘তুমি সে রমণী নও, যার জন্য ট্রয়ের প্রলয় অথবা সোনার লঙ্কা পুড়ে হয়েছিল ছাই;’ অভিন্ন উপমানে সাদৃশ্য রচিত হয়েছে হেলেনার জন্য ট্রয় নগরীর বিধ্বস্ততা ও সীতার জন্য লঙ্কাপুরী কাণ্ডের। নারী-নগরীকে উপমান-উপমিতের সম্পর্কে বেঁধে প্রাচ্য-পাশ্চাত্যকে এক সুতোয় গ্রথিত করেছেন। তা সবেও লোকায়ত নন্দনের ব্যাপারটি তাঁর কবিতার একটা ভিত্তিভূমিতে ধ্রুবভাবে অবস্থান করেছে সর্বত্র, যেখানে জল ও নদী একটা গুরুত্বপূর্ণ নিরাপদ স্থানে সবসময় থাকে। ‘আমার নিয়তি’ কবিতায় :

সৌন্দর্যে নিথর জল কাদামাটি জ্যোৎস্না―রোদ। কখনো হঠাৎ

যদি সে আঘাত করে-মেনে নেব, তবু তাকে বানাব প্রতিমা;

কপালে চন্দন দেব আর দেব মধ্যরাতে পদতলে ফুল

গাভীর প্রথম দুধ পাকাকলা মিহিচাল আশ্বিনের জল।

যদি সে আমার বুকে তুলে রাখে চিরদিন নদীর দু’কূল

জলের আঘাত হবে স্মৃতির নিয়তি আর স্বপ্নের ফসল।

কাব্যভাবের প্রয়োজন তৈরি হয় ‘অ সড়সবহঃ ড়ভ ঢ়ঁৎব ৎবধষরুধঃরড়হ ড়ভ নবরহম ঃযধঃ রং, রঃ ধঃঃবসঢ়ঃং সবৎবষু ঃড় নৎরহম ারারফষু ঃড় ঃযব ৎবধফবৎ ংড়সব ংপবহব ড়ৎ ংবহংধঃরড়হ.’ প্রসঙ্গত ‘ংরমযঃ ধহফ ংড়ঁহফং’ , ‘ ংসবষষ’ কবিতায় ‘রসধমব’ তৈরি করতে অনিবার্য। ‘কাদামাটি’, ‘জ্যোৎস্নারোদ’, ‘গাভীর প্রথম দুধ’, ‘প্রতিমা’, ‘কপালে চন্দন’, ‘পাকাকলা’, ‘মিহিচাল’, ‘আশ্বিনের জল’, ‘নদীর দু’কূল’  লোকায়ত নন্দনের যে আবহ তৈরি করে সেটিই তাঁকে তাঁর উপমাপ্রবণ পঙ্ক্তিগুলোতে নিজস্বতা এনে দেয়। এতে করে যে শাব্দিক ইমেজে অনিবার্য প্রত্ম-কাঠামোটি দাঁড়িয়ে যায় সেটিই আসাদ মান্নানের কবিতার মূল শিল্প-সৌকর্য।

আসাদ মান্নানের কবিতার নির্মিতে ইমপ্রেসনিস্টদের একটা বিশেষ স্থান অস্বীকার করা যায় না। ফলে বৈপরীত্য তৈরির একটা প্রবণতা তাঁর কবিতাতেও পাওয়া যাবে। জীবনানন্দের ‘ক্যাম্পে’ কবিতার মিলনাতুর হরিণীর সঙ্গে ঘাই হরিণী বা ‘নগ্ন নির্জন হাত’ কবিতায় বর্তমান যুগের ম্লান পৃথিবীতে দাঁড়িয়ে কমলালেবু রঙের রোদ, তরমুজ মদ ও রক্তাক্ত স্বেদময় অতি উজ্জ্বল পৃথিবীর বৈপরীত্যের মতো ইমেজ মান্নানে বারবার চোখে পড়বে ‘ধ্যানমগ্ন বুড়ো চিতাবাঘ’ এর বিপরীতে ‘হরিণ শিশুর স্বাধিকার’ বা ‘সমস্ত বন্ধ দরজা’র বিপরীতে ক্যানারি পাখির ফসলের মাঠে উড়ে আসা :

গভীর অরণ্যে দেখি : তসবি হাতে ধ্যানমগ্ন বুড়ো চিতাবাঘ

হরিণ শিশুর ক্ষুরে স্বাধিকার বেঁধে দিলে তার লেজ নেড়ে

শিয়াল সাঁতার কেটে গঙ্গাজলে ভুলে যায় সব অনুরাগ;

 … সমস্ত দরজা বন্ধ হয়ে গেলে নক্ষত্রের জামার মতন

একটি ক্যানারি পাখি উড়ে আসে জনকের ফসলের মাঠে:

লোবান জলের মধ্যে কিছু প্রেম ক্রন্দনের  করে আয়োজন;

(সবুজ রমণী এক দুঃখিনী বাংলা, সুন্দর দক্ষিণে থাকে)

সমালোচক, অধ্যাপক মহীবুল আজিজ প্রকরণ আঙ্গিক দৃষ্টিকোণ, ছন্দ ও প্রবহমানতার ধাঁচে তাঁকে ‘দাশকবির সম্প্রসারণ’ বলেছেন। সে অর্থে আসাদ মান্নানের প্রকৃতির কাছে ফিরে যাওয়া, প্রাত্যহিক লোকজ শব্দের সাবলীল ব্যবহার আর স্থিত নিমগ্নতাকে দাশকবির সার্থক উত্তরাধিকার বলতেই পারি এবং তা ইতিবাচক অর্থেই। প্রভাব তখনই নেতিবাচক হয় যখন তা শুধু অন্ধ অনুকরণে হয়। আসাদ মান্নান ত্রিশ ও ষাটের বাংলা কবিতার উত্তরাধিকারে লালিত ও পুষ্ট হলেও নিজস্ব স্বরকে ভিন্নব্যঞ্জনায় স্বকীয় করে তুলতে পেরেছিলেন। প্রসঙ্গক্রমে লক্ষ্যণীয় যে, আসাদ মান্নানের কবিতায় এই বৈপরীত্য তৈরির ক্ষেত্র সবসময় ইতিবাচক। জীবনানন্দে এই বৈপিরীত্য ব্যবহারের আধিক্য থাকলেও তাতে নিমজ্জন অবশ্যম্ভাবী। জীবনানন্দে নৈরাশ্য অবশ্য উপাদান কিন্তু মান্নানে তা আশাব্যঞ্জক। ‘অন্ধকার, নক্ষত্র, রক্ত, শিয়ালের ধূর্ততা’ সেখানে যেমন স্থান পেয়েছে, তেমন শেষাংশে ইতি হয়েছে ‘দুধেল গাভীর মতো তার মাঝে স্বাধীনতা―পরম সুন্দর’, ‘রক্তের ভেতর এক শিশু―তার হাতে ধরা সবুজ বাগান’। তবে ইমপ্রেসনিস্টদের মতো সাধারণ বস্তুকে তিনি অবহেলা করেননি বরং ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র বিষযগুলোকে জুড়ে দিয়ে বির্নিমাণের একটা প্রয়াস সর্বত্র লক্ষণীয়। সাধারণ মৌখিক ভাষার শব্দ, দেশজ এবং গদ্যগন্ধী শব্দ সহজেই জায়গা করে নিয়েছে তাঁর কবিতার গায়ে :

হত্যার বিচিত্র বন্ধু বিন্দুময় সিন্ধুর ভেতর

নিশ্চুপ লুকিয়ে আছে; পায়ে পায়ে গোপন আস্তানা

গেড়েছে বিশাল বনে, রক্তমাখা মাটির বগলে;

মানুষে মানুষ এসে শুনতে চায় অরণ্যের বীণা―

বহতা নদীর মতো তরঙ্গিত স্বচ্ছ নীরবতা

যে বীণা আপন স্বরে বাজিয়াছে প্রথম ঊষায়;

মানুষের মৃত্যু দেখে, উদ্ভিদের পাতাঝরা দেখে

সে-বীণা এখন বাজে মানুষের কান্নার ভেতর।

‘সধশবং ঃযব ংড়ঁহফ,  ঃযবরৎ ংড়ঁহফ, ৎঃযুস, ধহফ রসধমবৎু, ফড় ধষষ ঃযব ড়িৎশ.’ সাধারণ জীবনযাপন শৈল্পিক দৃষ্টিভঙ্গির ছাঁকনে ও বর্ণনায় নতুন দীপ্তি পায়, যেভাবে সাধারণ প্রাত্যহিক প্রয়োজনের নৌকাটানা চিত্রকর্মে শিল্পীর হাতের ছোঁয়ায় নতুনভাবে সৌন্দর্যের দ্যুতি ছড়ায়। ইমেজ, শব্দ আর কল্পনার সমন্বয়ে বিপন্ন অস্তিত্বের যাবতীয় স্বপ্নসুখের অবলম্বনও তেমন কবিতা হয়ে ওঠে। আসাদ মান্নানের হাতে অনিবার্যভাবে স্ফটিকায়িত হয়ে ওঠে লোকনন্দনের হৃদয়াবেগ। কবিতায় শরীর প্রসঙ্গ উপকরণে ভরপুর, কিন্তু উদ্ধত, অস্থির নয়-স্থিত। শরীর ঠিক শরীরের মতোই স্পষ্ট সেখানে। সেখানে ভাবের লাম্পট্য যেমন নেই, তেমন নেই দাশকবির মতো নিরাসক্ততাও। কামজ খেলার উদগ্রতা সেখানে অধিকাংশ সময়ের জন্যেই ঢুকে যায় শৈশবের নিরীহ নদী কিংবা ইমেজের পর ইমেজের ধাক্কায় সহসাই পাঠক নিজেকে আবিষ্কার করবে অরণ্যের গহীনে। বলা চলে পঙ্ক্তিমালার রূপসৃষ্টির বৈপরীত্যে কবিদৃষ্টির অপরিমেয় এক আশাবাদের রূপরেখাও প্রকাশিত করে তোলে। কবি যেহেতু সমাজের ভেতর থেকেই প্রকাশিত, পলে পলে সমাজের উদগারিত বিষ বা অমৃত দু-ই তাঁর প্রাপ্য। কবি তাই প্রকাশে বিষের বেদনা যেমন ছড়াতে পারেন, তেমন নীলকণ্ঠ হয়ে আশাও জাগাতে পারেন। স্বাধীন বাংলাদেশ পাবার পর বিধ্বস্ত ভূমি, ধেয়ে আসা দুর্ভিক্ষ, রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক ধাক্কা, ’৭৫, সামরিক, আধা-সামরিক শাসন, মৌলবাদ-দুর্নীতির অবাধ বিস্তার, বৈষম্য, শ্রেণি-শোষণ, দারিদ্রপীড়িত ধুকতে থাকা বাংলা মায়ের অবস্থায় ডুকরে ওঠে দ্বান্দ্বিক কবিসত্তা। কিন্তু এত নেতিবাচকতায় পথ হারান না আসাদ মান্নান। অন্ধকারকে তিনি ধারণ করেছেন কণ্ঠে কিন্তু গেয়েছেন আশাবাদের গান। রিক্ত হয়েছেন, নৈরাশ্যে নিমজ্জিত হয়েছেন, ক্ষুব্ধতায় ছিন্ন-বিচ্ছিন্ন হয়েছে মন-সত্তা, কিন্তু নেতি তাঁর কবিতাকে গ্রাস করতে পারেনি। তিনি প্রত্যাশা করেছেন নতুন করে স্বপ্ন দেখবার, নতুন করে ভাববার, নতুন করে ভেঙে সাজাবার :

তো পেছনে দাঁড়িয়ে কেন, সামনে আয়―লক্ষ্মী ভাই!

মাতৃভূমি―এ প্রাচীন ভূখণ্ডকে

চল, রেখে আসি নদীর ওপারে―

আমাদের নতুন মা ও মাতৃভূমি চাই।

আবার আঙ্গিকের দিক থেকে ধ্রুপদী শিল্পীদের শৃঙ্খল ও শৈলীগত দিকগুলোকেও নানাভাবে ভেঙেছেন, গড়েছেন। সনেটের ক্ষেত্রে সবসময়ের জন্যই যে মাত্রাকে বাধ্য করে ভাবকে সংকুচিত করেছেন তাও নয়, অনেকক্ষেত্রেই স্বাধীনভাবে তাকে ছেড়ে দিয়েছেন বা একেবারে গদ্যের মতো নিরীক্ষায় ফেলেছেন। বিনয় মজুমদারের ছিল পয়ার-মহাপয়ার-অক্ষরবৃত্তের সারিবদ্ধ দৃশ্যমানতা, মান্নানে তেমন আছে দীর্ঘ পঙ্ক্তির ধীরলয়ের প্রবাহমানতা। নানা ঢঙে, ফর্মে আকারে ভেঙে নিজেকেই প্রতিবার নতুন করে বিনির্মাণের চেষ্টা করেছেন। প্রথমদিকের কাব্যে জীবনানন্দের ও শামসুর রাহমানের ব্যাপক প্রভাব তাঁর কাব্যে পাওয়া যাবে, তবে অনুকরণ অর্থে তা নয়, বরং প্রাকরণিক আদলে :

হয়তো কোথাও তাকে পাওয়া যাবে ভাসমান তরল আঁধারে

আদিম গ্রহের মতো খুব একা খালি গায়ে তন্দ্রিল হাওয়ায়

কখনো গলির মোড়ে, পার্কের কোনায় বিপুল খেয়ালে মারে

দীঘল সেয়ানা শিস, কখনো বা বিকেলের নিষিদ্ধ পাড়ায়

জুয়ার টেবিলে কিংবা প্রায়দিন স্বাস্থ্যবান মদের আসরে

অসহ্য সুন্দর খুব নির্জনতা নির্বিকার কুড়োতে কুড়োতে

হয়তো কখনো তাকে ভোর রাতে দেখা যাবে ফিরে আসে ঘরে,

আরোগ্য স্নানের জলে নৈরাশ্যের কালো হাঁস তাড়াতে তাড়াতে।

তবে শামসুর রাহমানের প্রাত্যহিক জীবনের ডিটেইলিং ও জীবনানন্দীয় প্রকাশ থাকা সত্তেও নিজস্ব নিমগ্ন প্রকৃতিচেতনার সাথে লোকজ শব্দবন্ধ ও কুশীলবতার কারণে সৈয়দ বংশের ফুল থেকেই আসাদ মান্নানকে সহজেই আলাদা করা যায়। শ্রেষ্ঠ কবিতার ভূমিকায় মান্নান বলছেন―‘আমি কখনও কারও মতো কবিতা লিখিনি―লিখতে চাই না। সম্ভবত সব কবির বেলায় একথা খাটে―সব কবিই নিজের মতো করে নিজেরই কবিতা লেখেন। আমিও আমার কবিতা লিখেছি―লিখতে চাই। আমি জোর করে কবিতা লিখি না। একটি কবিতা যতক্ষণ না আমার কবিতা হয়ে উঠছে ততক্ষণ পর্যন্ত আমি অবিরাম অপেক্ষায় থাকি। খ্যাতির বাজারে উঠে নির্লজ্জ চিৎকার করতে আমার ভালো লাগে না। কে আমাকে কবি বলল, কে বলল না―এ নিয়ে বাড়তি কোনও উদ্যম বা উদ্যোগ নিতে আমার তেমন মনোযোগ নেই। আবার এও অস্বীকার করি না যে কবিতা ছাড়া আমার বেঁচে থাকার আর কোনও অর্থ নেই। কবিতাই আমার প্রেম―আমার প্রেমিকা আমার জীবন।’

‘ঢ়ড়বঃৎু রং হড়ঃ সধফব রিঃয রফবধং নঁঃ রং সধফব ড়ভ ড়িৎফং’ আসাদ মান্নানের ক্ষেত্রে একথা আমরা বলতেই পারি। ‘ড়িৎফং’ এখানে গুরুত্বপূর্ণ, প্রতীকায়নে, উপমায় বা চিত্রকল্প তৈরি করতে। ‘রফবধং’ সেখানে উপেক্ষিত নয়। প্রকৃতি, নারী, মাতৃভূমি, সংস্কৃতি, বৈশ্বিক পরম্পরা বা ঐতিহ্যিক সূত্রে তার গ্রহণ-বর্জন ক্রিয়া অনুপুঙ্খ নিরূপিত হতে থাকে তাঁর কাব্যে। বিশেষত ‘অন্ধকার’, ‘নক্ষত্র’, ‘জল’, ‘নদী’, ‘যীশু, ‘গোলাপ’, ‘শিয়াল’, ‘ভল্লুক’, ‘সাত লক্ষ’, ‘মেহেদি’ তাঁর কবিতায় নতুনভাবে সিচুয়েশন ডিমান্ডে ভিন্ন অর্থ বহন করেছে, তরঙ্গায়িত ওঠানামায় খেলা করে প্রায়ই শব্দগুলো নানা মাত্রায় সামনে এসেছে। একটা নতুন ধরনের প্রবণতা নিবিড়পাঠ মাত্রই ধরা যায়, এই কবিতার সমান্তরালে চেতনে অথবা অবচেতনে ‘আমি’ সত্তাটিকে কবি সামনে আনেন। নাম উল্লেখ করেও প্রায় প্রতি কাব্যগ্রন্থেই দেখা যায় ভণিতার সুরের মতোই ‘আসাদ’ নামটিকে তিনি ব্যবহার করেন। ‘তোমার সুষমা তুমি নিরালোকে সাজিয়ে রেখেছ―ওখানে রবীন্দ্রনাথ―তার পাশে আসাদ মান্নান’, ‘প্রেমের রাখালি হাত কড়া নাড়ে আসাদের ঘরে’, ‘আহত আসাদ এসে স্বপ্ন বুনে ঘাসের আলয়ে’ অথবা সুন্দর দক্ষিণে থাকে কাব্যগ্রন্থের ‘আসাদ মান্নান’ নামক কবিতার কথা বলা যায়। মধ্যযুগে বা বৈষ্ণব পদাবলিতেও আমরা ভণিতার যে রূপ পাই তারই একটা সমার্থক প্রকাশ হয়তো ‘আসাদ’ নামটিকে বারবার ব্যবহার। অথবা কবি এখানে ‘আসাদ’কে একটা ফিগার করে  তোলার প্রত্যাশী, যা যে কোনও সাধারণ মানুষের সামষ্টিক রূপকেই ধারণ করে নির্মিশেষে। ক্রিটিক্যাল ইনকয়ারি পত্রিকায় প্রকাশিত ‘নাউ অ্যান্ড ইন ইংল্যান্ড’ শীর্ষক প্রবন্ধে হিনি কবি এলিয়টের বরাত দিয়ে লেখেন ‘কবির কাজ হচ্ছে তাঁর উৎসের দিকে ফিরে যাওয়া; কিন্তু সেখানে স্থির না থেকে আবার ফিরেও আসা আর সে আসাটা শূন্য হাতে নয়, কিছু হাতে নিয়ে।’ আসাদ মান্নানের ক্ষেত্রে তা গুরুত্বপূর্ণ এইজন্য যে তিনি উৎসমুখেই তাকিয়ে আছেন। তাঁর কবিতার অংশ, উদ্ভব সবই এই উৎসকে কেন্দ্র করে এবং তা প্রকৃতি ও মাতুভূমিকে কেন্দ্র করেই ঘূর্ণায়মান।

শৈল্পিক প্রকরণে ও মাধুর্যে ‘যে-পারে পার নেই সে পারে ফিরবে নদী’ আসাদ মান্নানের সনেটের আরেকটি ভিন্নধর্মী সংকলন। দুটো অংশে বিভক্ত করে প্রথমে ১৬টি সনেট নামকবিতা সিরিজ হিসেবে বিবেচনা করা যেতে পারে এই বিবেচনায় যে, এই ১৬ টি সনেটের প্রত্যেকটিতে শৈশবের নদী-পাহাড়-সমুদ্র-প্রকৃতির এক অনির্বচনীয় আবহ তৈরি করেছেন সনেটগুলোতে। নদী সেখানে উচ্চতম অনুষঙ্গ হয়ে আশ্রয়-প্রশ্রয় এবং অবশেষে মুক্তির পথ। সেখানে তাঁর স্বপ্নাতুর মনে জাগে ‘সূর্যকে ন্যাংটো করে’ নদীর পাড়ে নিয়ে যাবার বা কুয়াশা নদীর জলে ‘অভিমানে মুখ ধুয়ে শুয়ে’ থাকার অপার দোলাচলতা। পরবর্তী অংশকে বলা যেতে পারে ‘নিঃসঙ্গ নদীর যিশু’, যেখানে আরও ১২টি সনেট সংযোজিত হয়েছে। জাতির জনককে ‘নিঃসঙ্গ নদীর যিশু’ প্রতীকায়নে বঙ্গবন্ধুর জীবন, তাঁর কর্ম ও নানা অনুসঙ্গ সনেটের প্রকরণে এনে এমন শৈল্পিক উপস্থাপনা আর কোনো কবি সম্ভবত করেননি। বঙ্গবন্ধু যেহেতু এটা আদর্শ ও বাঙালির আবেগের জায়গা, ফলে অনেক অগ্রজ ও সমসাময়িক কবি তাঁকে নিয়ে লিখেছেন, কিন্তু সনেটের প্রকরণে মুজিবকে ধরা নিঃসন্দেহে জটিল, দুরূহ এবং দিনশেষে প্রশংসনীয়। আরেকটি কাব্যগ্রন্থ জলের সানাই ও বিষয়বৈচিত্র্যে স্বতন্ত্র। এর আগে জীবনানন্দ, রবীন্দ্রনাথ, মুজিবকে তিনি কবিতায় গ্রথিত করেছেন সত্য, কিন্তু এ কাব্যগ্রন্থটিতে তিনি বহু স্বনামধন্য মানুষকে উৎসর্গ করে বা তাঁকেই বিষয়বস্তু করে কবিতা লিখেছেন। বঙ্গবন্ধু ছাড়াও গুপ্ত ঘাতকের হাতে নিহত মায়ের স্মরণে ‘মিতুর জন্য এলিজি’, ড. আনিসুজ্জামানকে, মুনতাসীর মামুন, সৈয়দ শামসুল হক, সন্তানদের প্রতি, শহিদ জসিমকে নিয়ে এ গ্রন্থে কবিতা আছে। শেষে ‘জলের সানাই’ শিরোনামে যুক্ত হয়েছে আরও ২৮টি সনেট। সমালোচক বলছেন―‘আসাদ মান্নানের ‘পিতা’ ‘জনক’ ‘দুঃখিনী অবলা বাংলা’ এসব প্রকাশকে কোনওভাবেই রাজনৈতিক বলা যাবে না, বস্তুত রাজনৈতিক কবিতার রচয়িতা তিনি ননও। তাঁর রাজনীতি বাংলাদেশ, বাঙালি এবং প্রবল বৈরিতার মধ্যেও চলমান এ দেশের সমষ্টিবদ্ধ মানুষের জীবনের চμমণ। প্রকৃতপক্ষে বাঙালিকে, বাংলাদেশকে বঙ্গবন্ধু ছাড়া তো চিত্রায়ণ অসম্পূর্ণ। ফলে আদর্শে, বাঙালির অস্তিত্বে যিনি মিশে আছেন তাঁকে নিয়ে লেখা কাব্যগ্রন্থ ঠিক কতটা রাজনৈতিক সীমারেখায় ফেলা যায় তা আরও বড় পরিসরে ব্যাখ্যার দাবি রাখে।

আসাদ মান্নানের কবিতায় আমরা কী পাব বা কী পাব না ? এ প্রশ্নের সুরাহা না করে বরং পাঠকের হাতে, সময়ের হাতেই তা তুলে দেওয়া ভালো। কবিতা তবে কেন লেখে কবি ? কবিতা কী শেষ পর্যন্ত আনে কোনও অর্থনৈতিক স্বাচ্ছন্দ্য, বাড়ি, গাড়ি, বাসর অথবা সংসার ? তবে কেন পড়ব শব্দের অবাঞ্ছিত লকেট! উত্তর খুঁজি, একজন প্রকৃতি নিমগ্ন অথচ বিক্ষুব্ধ কবি আসাদ মান্নানের কবিতায় :

আমিও তোমার সাথে একমত; তবে এও ঠিক

আমার কবিতা থেকে তুমি পাবে বিগত যৌবন

স্মৃতির হারানো রঙ; ফিরে পাবে তোমার সঠিক

সত্তার বিশাল ছায়া প্রেমিকের বিদেহী চুম্বন;

অদৃশ্যের ক্যানভাসে, হে নির্মম কুসুমদুহিতা!

তোমাকে বরণ থেকে তুলে নেবে আমার কবিতা।

 লেখক : প্রাবন্ধিক

Leave a Reply

Your email address will not be published.

shares