বাংলা একাডেমি পুরস্কার প্রাপ্ত (২০২১) কবি ও কথাশিল্পীদের সাহিত্যপ্রভা : কবি বিমল গুহ : শব্দ-বর্ণ-গণজাগরণের চিহ্নচিত্রিত কারুকাজ অথবা ক্ষুধার বিদ্রোহ মানে না কিছুই : স্বপন নাথ

[বিমল গুহ বাংলাদেশের অগ্রসারির কবি। জন্ম ২৭ অক্টোবর ১৯৫২ সালে চট্টগ্রাম জেলার সাতকানিয়া উপজেলার বাজালিয়া গ্রামে। প্রসন্ন গুহ ও মানদাবালার জ্যেষ্ঠ সন্তান। বাংলা সাহিত্যে পিএইচডি। সাহিত্যের বিভিন্ন শাখায় বিচরণ থাকলেও তিনি প্রধানত কবি। এ পর্যন্ত তাঁর ৩৩টি গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে। এর মধ্যে কাব্যগ্রন্থ―১৬টি, কিশোর কাব্যগ্রন্থ―৭টি ও অন্যান্য গ্রন্থ―১০টি। স্বাধীনতা-উত্তরকালে বাংলাদেশের কবিতা যাঁদের হাতে নতুন বোধ ও জীবনোপলব্ধিতে নতুন মাত্রা পেয়েছে, সময়কে গেঁথে রাখার শিল্পকৌশল নতুনভাবে নির্মিত হয়েছে―তিনি তাঁদের অন্যতম। চিত্রকল্প-উপমা-রূপক সৃষ্টির মধ্য দিয়ে তিনি মানুষের স্বপ্ন আর জীবনবাস্তবতাকে উন্নীত করেছেন কাব্যশিল্পে এবং শব্দের চাতুর্য ব্যবহারে নির্মাণ করে চলেছেন জাতিসত্তার  চিরন্তন শিল্পরূপ।

সম্প্রতি বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার ২০২১ লাভ করেছেন। এর আগে পেয়েছেন―বাংলাদেশ পরিষদ, তথ্য ও বেতার মন্ত্রণালয় কর্তৃক জাতীয় পর্যায়ে শ্রেষ্ঠ তরুণ কবির সম্মান ১৯৭৯; কলকাতার চোখ সাহিত্য পত্রিকা কর্তৃক বঙ্গবন্ধু স্মারক পুরস্কার ১৪০৮; কলকাতা সৌহার্দ্য কবিতা উৎসব কবি-সম্মাননা ২০০২; ফরিদপুর নির্ণয় শিল্পীগোষ্ঠী স্বর্ণপদক ২০০৮; সাহিত্য একাডেমি নিউ ইয়র্ক কবি-সম্মাননা ২০১২; সূফী মোতাহের হোসেন সাহিত্য পুরস্কার ২০১৩; অবসর সাহিত্য পুরস্কার চট্টগ্রাম ১৪২২; টাঙ্গাইল অরণি সাহিত্য পুরস্কার ২০১৫, ও বাংলাদেশ রাইটার্স ক্লাব সাহিত্য পুরস্কার ২০২০ ইত্যাদি। তাঁর উল্লেখযোগ্য গ্রন্থগুলোর মধ্যে রয়েছে : অহংকার, তোমার শব্দ (১৯৮২), সাকোঁ পার হলে খোলা পথ (১৯৮৫), স্বপ্নে জলে শর্তহীন ভোর (১৯৮৬), ভালোবাসার কবিতা (১৯৮৯), কবিতাসমগ্র (১৯৮৯), নষ্ট মানুষ ও অন্যান্য কবিতা (১৯৯৫), প্রতিবাদী শব্দের মিছিল (২০০০), নির্বাচিত কবিতা (২০০১), বিমল গুহের কবিতা সংকলন (২০১০), আমরা রয়েছি মাটি (২০১১), প্রত্যেকই পৃথক বিপ্লবী (২০১৫) ও বিবরের গান (২০১৫)।]

ংলা কবিতার ভূগোলে কবি বিমল গুহ [জ. ১৯৫২ সালের ২৭ অক্টোবর] অন্যতম একজন। অবশ্য তিনি নির্জনতাপ্রিয় কবি। এ পর্যন্ত তাঁর রচনার পরিধি কম নয়। সৃজনশীল রচনা, গবেষণা, ভ্রমণ, শিশুতোষ রচনা, সম্পাদনা মিলিয়ে তাঁর ত্রিশের অধিক গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে। আপাতত পাঠকের সুবিধার জন্য কবিতা সংগ্রহ [২০১৬] সংকলনটি সহজলভ্য। ইংরেজি ভাষায় অনূদিত হয়েছে তাঁর গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি কবিতা।

তিনি সত্তর দশকের কবি। যদিও কবির পরিচয় দশকের সীমানায় আটকে রাখার যুক্তি নেই। কবির বাণী ও অস্তিত্ব কালোত্তীর্র্ণ। তিনি কবিতার যে ঋদ্ধ উত্তরাধিকার বহন করছেন, এমন তথ্য আমরা জেনে নিই কবির স্বীয় বয়ান থেকে। কবিতা সংগ্রহের ভূমিকায় বলেছেন :

‘আমার মাতামহ স্থানীয় লোককবি ও গায়ক রজনী সেন, যিনি বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধে শহিদ হয়েছেন, প্রায়শ আমাদের বাড়ি আসতেন। আমাকে নিয়ে তিনি কবিগানের আসর বসাতেন। যখন সেভেন-এইটে পড়ি-তখন আমি প্রতিপক্ষ কবিয়ালের ভ’মিকায় তাঁর সঙ্গে বসতাম। অবশ্য চটজলদি শব্দের সঙ্গে মেলানোর কাজটা তিনিই করে দিতেন। আমার বাবাও লোকসঙ্গীত শিল্পী ছিলেন এবং গ্রামে তাঁর নেতৃত্বে একটি সংগীতগোষ্ঠী ছিল। বাবার কাছে গান শেখারও আগ্রহ জন্মেছিল তখন। কিন্তু তা আর হয়ে ওঠেনি।’ [গুহ ২০১৬ : ০৭] এ স্বীকারোক্তি থেকেই বোঝা যায় কবি হয়ে ওঠার পরিবেশে তাঁর জন্ম ও শৈশব-কৈশোর অতিবাহিত হয়েছে। বস্তুত, সঙ্গীত, শিল্প, ও কবিতার ছন্দজ্ঞান তিনি পরম্পরায় অর্জন করেছেন।

শব্দের ভেতরে শব্দ খেলা করে

সত্তর দশকের একজন হিসেবে কবি বিমল গুহ প্রতিষ্ঠা ও স্বীকৃতি পেয়েছেন। যদিও আমরা প্রথমেই বলেছি কবির কেন দশক নেই। পরিকল্পিতভাবে না হলেও তিনি কবি। তবে আপন পরিবেশেই তিনি লাভ করেছেন কবিতা যাপনের অনুপ্রেরণা। তিনি কি তাহলে শব্দ নিয়ে খেলতে পারেননি। সময় যথানিয়মে অতিবাহিত হয়। মূলত, কবি হিসেবে প্রতিষ্ঠার অতৃপ্তি তাঁকে কবিতায় স্বতন্ত্র স্থান তৈরি করে দিয়েছে। শব্দের এই খেলা তাঁকে দিয়েছে কবির আসন। লক্ষণীয়, তাঁর কাব্যযাপন নিরন্তর। কখনও তিনি বিরতি দেননি শিল্পচর্চায়। কবি কামাল চৌধুরী বিমল গুহের কবিতানির্মাণকলা প্রসঙ্গে বলেছেন : ‘শব্দ নিয়ে খেলা, এই ভেসে যাওয়া―প্রতি ভোরে নতুন কবিতা নিয়ে শুদ্ধ হয়ে ওঠার আকাঙক্ষার অন্তর্গত এই যাত্রা কবি বিমল গুহ শুরু করেছিলেন বহু আগে―সত্তরের দশকের শুরুতে।… আমরা পেয়ে যাচ্ছি একজন কবিকে যিনি ধারণ করেছেন তার সময় ও অভিজ্ঞতাকে, যেখানে বর্ণময় হয়ে উঠছে সংবেদী মানুষের চমৎকার আত্মজীবনী ছন্দময়, তীব্র-যুগপৎ আনন্দ ও বিষাদে মোড়ান।’ [কামাল ২০১৭ : ২৭] এর মানে হলো কবি অসামান্য সচেতন ও সক্রিয় প্রযোজ্য শব্দ প্রয়োগে। কবিতা নির্মাণে অবশ্যই একজন কবিকে হতে হয় শ্রমী ও মেধাবী। এক্ষেত্রে মেধা, মনন ও আবেগের বোঝাপড়া পাঠ করি তাঁর কবিতায়। তবে অলঙ্কার ও রূপক নির্মাণের ক্ষেত্রে তিনি সেভাবে মনোযোগী নন। তা হতেই পারে। কারণ, একটি ভালো, রসোত্তীর্ণ কবিতার জন্য কোনও কিছুই পূর্বশর্ত নয়। এ প্রসঙ্গে উল্লেখযোগ্য : 

‘এ বড় বিষম খেলা

খেলতে খেলতে বছর বছর কেটে যায়

খিড়কি আড়াল থেকে মাঝেমধ্যে

বিদ্যুৎ ঝলক হানে―লোভনীয়

মেঠোপথে কখনওবা শব্দ করে

        শব্দের বেসাত রৌদ্রজ¦লা দিনে

 শস্যের প্রান্তর ছুঁয়ে দোল খায় শব্দের উপমা’।

[শব্দ শব্দ খেলা, কবিতা সংগ্রহ ২০১৬ : ২৭]

আসলে তিনি শব্দের সীমানা বা শব্দ প্রয়োগের অপ্রস্তুত সীমাবদ্ধতা নিয়ে কথা বলেননি। বলেছেন কবিতা হয়ে ওঠার প্রক্রিয়া নিয়ে। অত্যন্ত নন্দন সচেতন শিল্পী হিসেবে প্রযোজ্য ক্ষেত্রে আবশ্যিক শব্দ প্রয়োগে তিনি কবিতার জগৎ নির্মাণ করেছেন। এ পর্যন্ত সকলেই স্বীকার করেছেন যে, বিমল গুহ অত্যন্ত শব্দকুশলী কবি। তিনি যে কাল পরিসরে কাব্যচর্চা করেছেন, সে সময়ের বৈশিষ্ট্য তাঁকে আক্রান্ত করেছে ঠিকই, তবে তা কবির অন্তর্লোকে স্থায়ী হয়নি। অর্থাৎ, শুধুই স্লোগান, মিছিল, যুদ্ধ ইত্যাদি কবিতার অনুষঙ্গ নয়। কবিতাকে হতে হয় হৃদয়সংবেদী ও দূরস্পর্শী। সে প্রান্ত তিনি স্পর্শ করেছেন। উৎরে গেছেন কালিক বৈশিষ্ট্য। এ জন্য কবিতার জন্য তিনি নত হয়েছেন এবং বলেছেন ‘কবিতার দেবী তুমি পদ্মের আসনে বসে অছে/ মরাল চঞ্চুতে স্মিত হাসি, যেন/ অপগত মানুষের জড়তা ঘোচাও মায়াবলে।’ [কতটুকু নত হলে, কস ২০১৬ : ২৯] কবি আবিদ আনোয়ার তাঁর সম্পর্কে বলেছেন―‘ব্যক্তি বিমল গুহ আমার কাছে তাঁর কবিতার মতোই কোমল, অন্তর্মুখী ও নিম্নকণ্ঠ।’ বস্তুত, কবিতা ও শিল্পের কাছে শিল্পীর এ-অবনত অবস্থান। যে-অর্থে শিল্পের নান্দনিকতার কাছে আবর্ত কবির জীবন। আজীবন নত থাকতে চেয়েছেন কবি। এ সূত্রেই তিনি সাজাতে চান তাঁর কবিতার জগৎ। যেভাবে মানুষ যথেষ্ট হতাশার পরও প্রত্যয় থেকে বিচ্যুত হয় না। সাজাতে চায় তাঁর ভাবনা অনুবর্তী গৃহকোণ বা শিল্পকর্ম :

‘একদিন মাটি ও মানুষের গান তোমাকে শোনাবে বুলবুলি,

শরীরের জড়তা স্খলন হলে একদিন

আমিও তোমার পাশে সাজাব শহর,

বলো―কতটুকু নত হবো আর ?’

[কতটুকু নত হলে, কস ২০১৬ : ২৯]

শুধু শব্দ প্রয়োগের কারুকর্মে শব্দ বা কবিতার মুক্তি আসে না। মানুষের জয়গান, সত্যাদর্শ,―যা থেকে গণজাগরণ তৈরি হয়। এ জাগরণের থাকে নিজস্ব কিছু ধারা। আরও থাকে ভাষা ও ছন্দ। যেখানে মানুষের জাগরণ ঘটে স্বতঃস্ফূর্ত। ফলে মানুষের মুক্তির জন্যই সামষ্টিক একটি লক্ষ্যে ন্যূনতম শর্তে ঘটে উত্থান। এর প্রভাবে শিল্পী, কবি সকলেই সংবেদিত হন। পরিণামে নির্মিত হয় ভাষার বয়ন ও শৃঙ্খলা―শব্দের ভিন্ন প্রয়োগ ও মুক্তি :

‘শব্দ-বর্ণ-গণজাগরণের চিহ্নচিত্রিত কারুকাজ

মানুষের বিশ্বাসকে দৃঢ় করে

সত্যের স্তম্ভে নির্মাণ করে স্থায়িত্ব।

এই কোলাহল সবসময় মূর্খতা নয়―

এই কোলাহল থেকেও কখনও কখনও

উঠে আসে বর্ণময় শব্দের চাতুর্য।’

 [কোলাহলের মাত্রা, কস ২০১৬ : ১৪৬]

কারও অন্তরের কষ্ট, দহন কেউই অনুভব করে না। আসলে কেউই কারও আত্মীয় নয়। জীবনের রহস্য-গহনে কেউ প্রবেশ করতে পারে না। সে ভুবনে যে আগুন জ¦লে নিরন্তর। তা বহন করে প্রতিটি ব্যক্তি। কবি শুধু নন। কবি বিমল গুহের নিজস্বতা, ব্যক্তির অভিক্ষেপ, তাঁর কবিতার প্রকরণকেও প্রভাবিত করে। অনেকেই তাঁর সম্পর্কে যেসব মন্তব্য রেখেছেন, অংশত এসব অনায়াসে মিলে যায়। আপাত সত্য বলে মানতেই হয়। মানুষের সমস্ত কিছু না বোঝা গেলেও অন্তত তাঁর ব্যক্তিত্বের প্রকাশ ও সৃষ্টি থেকে খানিকটা উপলব্ধি করা সম্ভব। কবি আলোক সরকারের কিছু কথা কবি বিমল গুহ শুধু নয়, অনেকের সঙ্গে প্রযোজ্য হয়ে যায় :

 ‘কবিতার যে-রহস্য আমরা আকাক্সক্ষা করি তা এই রহস্য, ব্যক্তিত্বচিহ্নিত রহস্য, স্বাধীন অনন্য নিরপেক্ষ অন্ধকারের ভেতর দিয়ে হয়ে-ওঠা ব্যক্তিত্বের দৃষ্টি আর মানবতার রহস্য। এই রহস্যই কবিকে পৃথক করে জনসাধারণ থেকে, এক কবিকে অন্য কবি থেকে। এই ব্যক্তিত্বময় দৃষ্টি আর মানসতাকে পরিহার করে যে-কবিতা রচিত হয় তা জনসাধারণের নিজের সম্পত্তি, তা যৌথজীবনের সাকল্যিক আচার-আচরণ, ভাবনা-চিন্তা, জীবন-যাপন থেকেই উঠে আসা।, তা পাঠ করে জনসাধারণ এক ধরনের মজা পায়। মজা পায়, কিন্তু কাঁপায় না, স্তব্ধ করে না, তোলে না কোনও গাঢ়তর গূঢ়তর অভিভাব। কবিতা যথার্থ কবিতা মাত্রই রহস্যময়, অর্ধচেনা এবং বাকি অংশ অবগুণ্ঠিত; কবি যথার্থ কবি মাত্রই আগন্তুক, বিদেশি, তার সাজপোশাক আমাদেরই মতো, ভাষা আমাদেরই মতো, তবু সে অপরিজ্ঞাত নতুন এবং অলৌকিক।’

 [আলোক ২০১৪ : ৫৮]

তবে কবি উপলব্ধি করেন, কবির ভাষায় আমরা জানতে পারি মানুষের মনের খবর। যেমন,

‘কেউ দেখে না আমার মধ্যে গহনপুর

জলে ভরা, উছল ঢেউয়ে দুলছে দুটি পদ্মভোমর

                            তোমার গহন বুকপুকুরে

মাতাল শকুন নিত্য ওড়ে আশেপাশে

কেউ কি রাখে এসব খবর!’

 [দুঃখ বাড়ায়, কস ২০১৬: ২৮]

কবি একক ব্যক্তির যন্ত্রণা, দহনের কথা বলেছেন ঠিকই। কিন্তু এ সভ্যতার সৃজনকর্ম, বিবর্তন, ক্রমবিকাশে ব্যক্তি একক থাকছে না। সেখানে সামষ্টিক অভিঘাতই বেশি। ব্যক্তির উদ্বোধন মিশে যায় বৃহৎ পরিসরের সঙ্গে। যেখানে ব্যক্তির পরিচয় হয়ে ওঠে গৌণ। কারণ, মানুষ, প্রকৃতি বা প্রাণিজগত যা কিছু বলি―এ চলমানতার মধ্যে রয়েছে ক্রম বিন্যস্ত বাস্তবতা। আমরা সাধারণ চোখে তা দেখি না, উপলব্ধি করি না। ‘মানুষের বিচক্ষণ ছায়া’র ইঙ্গিতে কবি যা বলতে চেয়েছেন, তা প্রকৃতিবিজ্ঞানী, বিবর্তনবাদীরা বলেন ভিন্নভাবে। আমরা এ-সূত্র অস্বীকার করতে গিয়ে মানুষ ও প্রকৃতির সার্বিক অবদানকে অস্বীকার বা মুছে ফেলি। উল্টো মানুষ এ বৃত্তের মধ্যেই বাস বা কালযাপন করতে অভ্যস্ত। অভ্যস্ততার দাসত্বে মানুষ, প্রাণিকূল নিজের বিবর্তিত চেহারাকেই পাল্টে নেয়। বিশেষত মানুষ স্ববিরোধী এক ভূগোল তৈরি করে এবং এ-স্ববিরোধিতার বৈশিষ্ট্যকে স্বীকার করতে চায় না। এর ওপর বিশ^াস, ও অপদর্শনের এক প্রলেপ তৈরি করে। সেই আদিপর্ব থেকে এ পর্যন্ত বিবর্তিত ধাপগুলোতে এসব বিবেচনা লক্ষ করি। কবি যেমন অনুভব করেছেন :

১.            ‘অন্ধকারে একাকী দাঁড়ালে

               খুব ঘন অন্ধকারে

               আমি দেখি―চারপাশে তীব্র নাচানাচি করে

               যূথবদ্ধ মানুষের ছায়া।’

[পূর্বপুরুষের কাছে, কস ২০১৬: ৬৪]

২.           ‘পৃথিবী ক্ষুধার্ত হলে বৃদ্ধ ও যুবার চোখে

               বেল্লালা রোদের ছানি পড়ে

               পৃৃথিবী ক্ষুধার্ত হলে কামার্ত রমণীর মতো

               সহসাই লণ্ডভণ্ড করে দেয় রাতের গণ্ডার

               এবং উভয়ে দ্রুত মুখ গোঁজে রাতের শয্যায়।’

[ক্ষুধা, কস ২০১৬ : ৬৭]

যা কিছু নেতির উৎসব, সবই তো মানুষের সৃজন। আবার সৃজনশীলতার ভূমিও উপরিকাঠামোতে―যেক্ষেত্রে ‘সবার উপরে মানুষ সত্য’। এমন বিবেচনার অসামান্য নির্মাণ লক্ষ্য করি তাঁর কবিতায়। কখনও যদি মানুষের মানবিক অস্তিত্বের অবনমন হয়, তা হয়―বিশাল শূন্যতা। বস্তত, তিনি দেশজ ও আত্মভাবনাকে বিশ^ধারণায় স্থাপন করেছেন। বৈশি^ক প্রেক্ষিতে দেখেছেন স্থানিক সমস্যা। একটি সমস্যা শুধু কোনও অঞ্চলের বা একটি দেশের নয়, তা তিনি বৈশি^ক দৃষ্টিতে পর্যবেক্ষণ করেছেন। এক্ষেত্রে তাঁর এ-পর্যবেক্ষণ খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কবির ব্রত মানুষের জয়গানে। দেশ-কাল-বর্গের বর্ণবাদ, সাম্প্রদায়িকতার অবসান কামনা করেন এ পৃথিবীতে। কবির একান্ত লক্ষ্য―মানুষ সত্য―তা যেন বাস্তব হয় অবশেষে। আমরা মানুষ নামের পরিচয়ে যা দেখি, তা কোনওভাবে মানুষের বৈশিষ্ট্যকে ইঙ্গিত করে না। আমরা তো দেখে অভ্যস্ত, অমানবিক হিংসার আগুন জ¦লছে চারদিকে। এ প্রসঙ্গে কবির উচ্চারণ :

‘প্রবল বর্ষণে সব হিংসা ও বিদ্বেষ মুছে গেলে

মানুষ নামের এই শব্দ থেকে

মুছে যাবে হিংস্র জড়তা।

আমরাও অপেক্ষায় আছি

বর্ণবাদী মানুষের পাংশুটে এই গিঁট

খুলে যাবে―পৃথিবীর যৌথ ঘৃণায়।’

[বর্ণবাদী পাংশুটে গিঁট, কস ২০১৬ : ১০৩]

মানুষের সৃষ্টি, চেতনাকে অস্বীকার করে এক উপযাচিত অবাস্তব ক্ষমতার কেন্দ্রায়ন বা আধিপত্যকে স্বীকার করছে এই মানুষই। কবি বিমল গুহ এমন বোধ ও প্রচারণা দেখে বিস্মিত হয়েছেন। তবে মানুষের প্রথাগত অন্ধকার অস্বীকার করেননি। তবে এ বিষয়ক যন্ত্রণার অবসান কামনা করেন। তাঁর আরাধ্য সকলেই যেন মানুষের কাছে ফিরে আসে। ‘মানুষের স্বভাব হাঁটে ছায়ায় ছায়ায়। ক্ষুধা ও প্রেম-কাতরতায় কখনও কখনও হুমড়ি খেয়ে পড়ে মেঝেয়। মানুষের স্বভাব বদলায় না কখনও। বাতাসের গতিপথে ঘুড়ির মতোন মানুষের পিছু লেগে থাকে।’ [গোপনে দুরন্ত থাকে, কস ২০১৬ : ৯৭]  সকলেই জানে বৃত্ত ভাঙা খুব জটিল ও কঠিন একটি কাজ। আপাত আমাদের বৃত্তের মধ্যে সময় পার করতে হয়। জীবনের এক পর্যায়ে এ বৃত্ত ভাঙতেই হয়। বিপরীতে যেতে হয়। না হলে জীবনের রথ থেমে যায়। এজন্য তিনি মুক্ত হতে চান ভিন্নভাবে :

‘একদিন রমণীয় আঙুলও বুলাবে না বৃত্তের আঁচড়

কপোলের নম্র বেলাভূমে

বিপরীত স্রোতে আমি ছেড়ে দেব অস্থির রুমাল

                         উড়ে উড়ে যতদূর যায়!’

 [গন্তব্য, কস ২০১৬: ৩৪]

সমাজে প্রচলিত আপ্তবাক্য―‘প্রচারবিমুখ’ কথাটা কিছুটা ক্লিশে হয়ে গেছে। এখন কেউ, না-চাইলেও, নিজেকে আড়াল রাখতে পারে না। সমাজ ও বিশ^ব্যবস্থার আগ্রাসন জীবনের সমূহ উপকরণ গ্রাস করছে নিয়ত। আগ্রাসন, আধিপত্য আগেও ছিল, এখনও আছে, থাকবে বলেই আমাদের ধারণা। কারণ, মানুষের সহজাত প্রলোভনবৈশিষ্ট্য কখনওই অপসারণ বা বিনাশ করা সম্ভব নয়। পারিপাশির্^ক অস্তিত্বের ঘোরলাগা আহ্বান, আক্রমণ ঠেকানো যাচ্ছে না। বরং এর প্রতিক্রিয়া কখনও গতিশীলতাকে প্রতিরোধ করছে। তবে এর বিপরীতে যুদ্ধ করে অস্তিত্ব ও সম্ভ্রম বাঁচানো হলো একজন শিল্পীর দায়। কবি, দার্শনিক, শিল্পী এর বিপক্ষে দাঁড়াচ্ছেন ঠিকই। কিন্তু এ প্রতিবাদের মূল্যায়ন বুদবুদ আকারে খুব সামান্যই দৃশ্যমান। চারপাশের অসংখ্য উপাদান ও বিশালত্বের মাঝখানে একজন কবি কবিতার প্রকরণে মানবিক অস্তিত্বই ঘোষণা করেন। কবির ভাষায়―সমুদ্রের বিশালত্বের সঙ্গে স্থলভাগের গাণিতিক সম্পর্ক চিরায়ত। পৃথিবীর ইতিহাস ও বিবর্তনসূত্র যা বলে দেয়। ফলে, কবি বিমল গুহ ব্যক্তি হিসেবে যেমন নির্জনতা প্রিয়, তেমনি কবি হিসেবে বিজ্ঞাপনের বাইরে থাকতে ইচ্ছুক :

‘আমার অস্তিত্বে বাজে অহর্নিশ সমুদ্রের গান

মায়াবী পর্দায় ঝরে রেণু রেণু বৃষ্টির পারদ,

ভেজে মাটি-আবহাওয়া তামস চনমনে

আমার সমস্ত কাজে উচ্চারণে

             একটি গর্জন মূর্ত হয়―রোমশ ভয়াল;

প্রচলিত শব্দ নয়

মায়াবী অস্তিত্বে যেন উচ্চারিত সমস্তের সুর।

আমি নেই লোকাচারে

আমি আছি উল্লসিত মাটি ও মানুষের কাছাকাছি

আরও নিচে জলে চুপচুপ

স্রোতবাহী কাঁকরে বালিতে নিরবচ্ছিন্ন মৌন ঢেউ।’

[আমার অস্তিত্বে বাজে, কস ২০১৬ : ৫৩]

স্বদেশের দিকে মুখ

শিল্পী মাত্রেই সময় ও পরিসর সচেতন। সময়ের বৈশিষ্ট্যকে অস্বীকার করে কেউ শিল্পী হতে পারে না। ব্যক্তির ওপর সময় ও পরিবেশের প্রভাব কখনও এড়িয়ে যাওয়া যায় না। সময়ই নির্ধারণ করে দেয় শিল্পীর দায় ও শিল্পের কৌশল। সব মিলিয়ে সময়, সমাজ, প্রতিবেশ, পরিবেশ ও পারিপাশির্^ক বৈশিষ্ট্যের আলোকে নির্মিত হয় জীবনের যাবতীয় খোল-নলচে। আমরা পর্যবেক্ষণ করেছি, বিমল গুহ সময়ের বৈশিষ্ট্যে সন্দীপ্ত কবি। তিনি এদেশের আন্দোলন সংগ্রামের ভেতর দিয়ে নিজেকে নির্মাণ করেছেন। এর চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো―কবি নিজেই মুক্তিযুদ্ধের রক্তাক্ত অধ্যায় থেকে ওঠে আসা মানুষ। তাঁর পরিবার-পরিজন একাত্তর সালে আক্রান্ত হয়েছেন এবং শহিদ হয়েছেন কয়েকজন। এ দেশের গণআন্দোলন, অভ্যুত্থান, একাত্তর সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে স্নাত কবি বিমল গুহ। অনিবার্যভাবে তাঁর চিন্তাভাবনার ক্যানভাসে অঙ্কন হবে এ-দেশেরই বাস্তবতা। ইতিহাস, ঐতিহ্যের কাছে দায়বদ্ধতা তাঁর বোধ ও রক্তের ভেতরে খেলা করে প্রতিনিয়ত। ফলে আলাদাভাবে কবি সম্পর্কে আরোপিত কথা বলা নিষ্প্রয়োজন। কবিতায় প্রকাশিত দেশাত্মবোধের ভাষা তাঁর স্বোপার্জিত ও রক্তস্নাত। কবিতা সংগ্রহের ভূমিকায় একান্ত কথার সঙ্গে আরও বলেছেন একাত্তরে নিজের বেঁচে যাওয়া ও কবিচৈতন্য নির্মাণের পটভূমি। ‘গ্রামের স্কুল থেকে ১৯৬৮ সালে এসএসসি পরীক্ষা দিলাম। … কিছুদিন পর এল উনসত্তরের গণ-অভ্যুত্থানকাল। সেই আন্দোলনের জোয়ার প্রত্যন্ত গ্রামেও পৌঁছে যায়। সে সময় বঙ্গবন্ধুর ছয় দফা দাবি-সম্বলিত একটি ক্যালেন্ডার আমার পড়ার ঘরে টাঙানো হয়েছিলো। আমার স্কুলশিক্ষক ফণীন্দ্রলাল স্যারই তা এনে দেয়ালে টাঙিয়েছিলেন। সমাজভাবনা ও রাজনীতি বিষয়ে তখন আমার চোখ খোলে, জীবন সম্পর্কে নতুন ধারণা জন্মে! আসে সত্তরের নির্বাচন, বাঙালির ইতিহাস সৃষ্টির স্মারক-চিহ্নিত ঘটনা। … স্বাধীনতার সংগ্রামের জন্য যুদ্ধের রূপরেখা ও দিকনির্দেশনা দিলেন। এল ২৫মার্চের কালোরাত্রি। পাকিস্তান হানাদার বাহিনী বাঙালি নিধনযজ্ঞে মেতে ওঠে। শুরু হয়ে যায় মুক্তিযুদ্ধ। সেই মুক্তিযুদ্ধের প্রাক্কালে আমার অশীতিপর বৃদ্ধ দাদু রজনী সেন ও বড় ভাই ব্রজগোপাল গুহও পাক হানাদার বাহিনীর গুলিতে শহিদ হন। আমার জীবন ধাক্কা খেল প্রথমবারের মতো।’ [গুহ ২০১৬ : ০৯] এর আগে থেকেই প্রতিবাদের মিছিল তিনি অবলোকন করেছেন। যে মিছিলে বাংলার মুক্তি আন্দোলনের উত্থান। এ দেশ ছিল মিছিলের ভূগোল। পরিণতিতে মিছিলকে দেখেন শিল্পিত প্রকরণে :

‘আমি হাত তুললেই নদীর প্রবাহ ঢেউ দেবে

শুরু হবে সারি সারি নৌকোর মিছিল

চলন্ত মাস্তুলে বেজে উঠবে তোপধ্বনি

             কলস্বরে পেয়ে যাবে জোয়ারের নদী

ভাটিয়ালি সুর তুলে মাঝিরাও নাচাবে আঙুল।’

[ মিছিল, কস ২০১৬ : ৫১]

অতএব কবির আরাধ্য বা কবিতার বিষয়বস্তু কী হতে পারে, তা আর আলাদাভাবে বলতে হয় না। বিমল গুহ প্রকৃতি ও দেশপ্রেমে চিরজাগ্রত মানবিক কবি। এ দেশের প্রকৃতি, আলো হাওয়ায় তাঁর কর্মতৎপরতা গতিমান। ফলে কবির মন-মনন-চিন্তা ও কর্মে স্বদেশের প্রকৃতি ও মুখ আবর্তিত হতে থাকে প্রতিদিন। মাতৃভূমির প্রতি কবির দায়বদ্ধতা পাঠককেও প্রণোদিত করে। এর আলোকে সত্তর দশকের কবি হিসেবে নিজেকে গৌরবান্বিত ও উচ্চকিত করেন। ওই দশকের একজন, দেশের মুক্তি আন্দোলনের অংশীজন, ও মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ে তিনি গর্ববোধ করেন। কারণ তিনি মুক্তিযুদ্ধের প্রস্তুতি ও যুদ্ধপর্ব যাপন করেছেন। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতাকে কত না আবেগের সঙ্গে ধারণ করেন তিনি। তাঁর কাছে স্বাধীনতার মর্মার্থ হলো―

‘আমাদের স্বাধীনতা ত্রিশ লক্ষ শহীদের প্রাণের কল্লোল

 আমাদের স্বাধীনতা রক্তঝরা দশকের অজস্র কবিতা

 মুক্তিকামী মানুষের বর্ণচ্ছটা আলো ঘরময়।

 আমরা মিলেছি এসে সত্তর দশকে কাকলিমুখর

 আমরা নবীন উজ্জ্বল কবিকুল, কঙ্কাল সময় থেকে

 আমরা এনেছি তুলে সোনালি ফসল

 উত্তোলিত হাতের মুঠোয় জোড়া জোড়া রক্তগোলাপ।’

[সত্তর দশক, কস ২০১৬: ১৪২]

উল্লেখ্য যে, ১৯৭৫ সালে সপরিবারে বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের পর দেশে স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধের মূল্যবোধ ছিল অপসৃত। সামরিক, বেসামরিক লুটেরা, আদর্শহীন রাজনীতির আগাছা শ্রেণি ক্ষমতায় আসে। তারা প্রকৃতার্থে সুবিধাভোগী শ্রেণিরই প্রতিনিধিত্ব করেছে। আমরা যা-ই বলি না কেন, এ গোষ্ঠীর শক্তিও কম ছিল না। এসব ধাক্কার ফলে বিশাল শূন্যতা তৈরি হয়। ফলে, প্রগতিপন্থা ও মুক্তিযুদ্ধের আদর্শবাদ প্রতিরোধের সম্মুখিন হয়। একইসঙ্গে সমকালীন বিশে^র জটিলতা ব্যাপক হতে থাকে। প্রতিটি বিষয়ের ঘাত-অভিঘাত থেকে কোনও প্রান্তের মানুষই মুক্ত নন। সংবেদনশীল একজন হিসেবে কবি নিজেও আক্রান্ত। বিমল গুহ এ সময়পর্বে যন্ত্রণাবিদ্ধ, ক্লান্তি, ও মানসিক দ্বন্দ্ব কবিতায় রূপায়ণ করেছেন :

‘শতাব্দীর কবি বসে কবিতার বৃক্ষ সাজায়

বহুবর্ণে―কার্বন ডাই-অক্সাইড গিলে

হাতের কবজিতে মাথা রেখে

রকেট গতিতে ছোটে বিশাল শূন্যের দিকে―

আণবিক পৃথিবীর স্পর্শ থেকে।’

[বিশাল শূন্যের দিকে, কস ২০১৬ : ১৯৬ ]

এতসব দেখে তিনি কী হতাশ হয়েছেন কখনও। এক কথায় না। তবে আহতবোধ করেছেন নীরবে। কবি হতাশার বিপরীতে আলো জ¦ালাচ্ছেন প্রতিনিয়ত। সাহসে জাতিস্মর চেতনায় তিনি তোলে ধরেন বাঙালির সংগ্রামের ইতিহাস। কবি লিখে যান বাঙালি হয়ে ওঠা, পুনরায় জেগে ওঠার প্রত্যয়ী শব্দাবলি। সত্তার মুখোমুখি বসে আত্মপরিচয়ের সমৃদ্ধ ইতিহাস পাঠ করেন। সকলের মতো মৌল অবলম্বন হয়ে ওঠে বাঙালির ভাষা আন্দোলন ও একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ। যেমন :

১.            ‘মানুষ তখন বুঝতে শিখলো―সে অন্য মানুষ

               তার সত্তা আছে

               স্মৃতি আছে

               মা-কে মা বলে ডাকার সাহস জুগিয়েছে আমাদের

               আমরা স্থির পায়ে দাঁড়াতে শিখেছি।’

               [আমার একুশ, কস ২০১৬ : ২১৯]  

২.           ‘ঘর্মাক্ত পথে হেঁটে গেছি বহু দূরগ্রাম

               বালকবেলার বন্ধু যারা ছিলো

               পাড়ায় পাড়ায় যারা দিয়েছে দুরন্ত টহল একদিন

               পাখির সংসার ভেঙে বাহবা কুড়াতো যারা অস্থির সময়ে

               কার্তুজের অহমিকা বুকে নিয়ে তারাও যুদ্ধে গেছে―

               বাংলার নদীগ্রাম বটতলা দিয়েছে প্রশ্রয় তাহাদের

               আমাদের স্বাধীনতা আমাদের গ্রামের সীমানা।’

[ কর্দম, কস ২০১৬ : ২৩৩]

৩.          ‘আমাদের স্বাধীনতা বাতাসের কানে কানে

               উচ্চারিত ধ্বনিপুঞ্জ তোলপাড়-করা মহাকাল

               একাত্তর-মার্চমাস―রেসকোর্স-ধানমন্ডি ৩২ নং

               স্বাধীন স্বভাবে ফুটে-ওঠা মহাকাল মুক্ত বাতাস

               বাঙালির সব ইতিহাসÑআমাদের স্বাধীনতা দিন।’

[ স্বাধীনতা দিন, কস ২০১৬ : ২৯৭]

যদিও অসমাপ্ত যাত্রার পদধ্বনিতে প্রকম্পিত হয় এ ভূখণ্ড। তারপরও এ দেশের মাটি, প্রকৃতি এ জীবনের অবলম্বন। কবি বিমল গুহের ভাষায়।

‘আমার বুকের মধ্যে নিমেষেই ছলকে ওঠে

                          স্বদেশের মুখ

আর আমি জন্মাবধি নিজের ব্যর্থতার কথা ভেবেও

আত্মহননের গান গাইতে পারি না।’

[স্বদেশের দিকে মুখ, কস ২০১৬ : ৪৪]

কাল-ব্যবধানে আমাদের রাষ্ট্র ও সমাজে ক্ষমতার পালাবদল ঘটেছে। বিবিধ অপশক্তির প্রসারণ, ব্যাপকভাবে উপযাচকের ভূমিকায় অংশগ্রহণ ইত্যাদি কারণে বিপরীত তৎপরতা লক্ষণীয়। অশুভ অমঙ্গল ছোবল ফিরে আসে বারবার। এসব তিনি অবলোকন করেছেন এবং কবিতায় উচ্চারণ করেছেন। যেমন; বাতাসে পুরোনো গন্ধ ভেসে আসে/ … বিভৎসতা ধাওয়া করে পিছ পিছু’। এর মাঝে হঠাৎ আলোর ঝলকানির মতো জেগে ওঠে সুন্দর― ‘অন্ধকার ভেদ করে জ¦লে ওঠে/ আকাক্সিক্ষত আমার সুন্দর’।

সকলেই অবগত যে, এক বড় সময় ধরে মহান মুক্তিযুদ্ধ, স্বাধীনতার মূল্যবোধ এবং সভ্যতা-আলোকনের বিপরীতে চলে বাংলাদেশ। রাষ্ট্রের সকল অঙ্গ, সামাজিক অবস্থা চলে যায় সভ্যতার আলোকন বিরোধী গোষ্ঠীর দখলে। এদেশের মুক্তিযুদ্ধ, দেশজ ঐতিহ্য, লোকজ ভাবনার বিপরীতে তারা চলমান রাখে পশ্চাৎপদ আচরণ ও চর্চা। কবির আত্মজিজ্ঞাসা সেখানেই। তবে কী সব অর্জনের মহত্ব ভুলে এ জাতি আত্মসমর্পণ করেছে নেতির কাছে। অসুস্থতা আহ্বান জানাচ্ছে স্বপ্রণোদনায়। ‘সুন্দরের সব বোধ কেড়ে নিচ্ছে আজো অবিরত―’। অথবা, ‘সেদিন সকালবেলা হুল্লোড়ে মেতে ওঠে/ক্ষুধার্ত কুকুর রাস্তায়/ অপরাধবোধ যেন কারোরই ছিলো না/ না মানুষের, না নর্দমার কুকুরের/ না রৌদ্রের, না শান্তিকামী মেঘ ও বর্ষণের’। এর অর্থ হলো―দায়িত্ববোধহীন এক সমাজে আমাদের বসবাস। যেখানে সমাজের তকমা লাগিয়ে সমাজবিরোধী অসংগত আচরণ গ্রাস করছে অবিচল। এমন প্রশ্ন আমাদেরও। না হলে এমন পরিস্থিতি সৃষ্টি হওয়ার কথা নয়। সচেতন জনগণ তা অবলোকন করে; কিন্তু প্রতিরোধ করে না। চরম এক যাতনায় কবির জিজ্ঞাসা এসব বিষয়ে। এত রক্ত, ত্যাগ ও মূল্যে অর্জিত স্বাধীন, মুক্ত সমাজের এমন অস্বাভাবিক পরাজয় মেনে নিতে হবে কি না ?  

‘বাংলার মানুষ আজ যেন কীরকম হয়ে গেছে!

পুষ্টিহীনতায় দৃষ্টিহীন প্রেমকাতর তরুণ-তরুণী,

সৃষ্টির উদ্দামতা হারিয়ে টেবিলে ঝুঁকে আছে বুদ্ধিজীবী সাংবাদিক

কালাজ¦র ক্ষয়কাশ ও জন্ডিসে ভুগছে গ্রামের কৃষক

কী হয়েছে আজ এই মানুষগুলোর।’

[প্রতীক, কস ২০১৬ : ৭০]

দেশপ্রেম কবির রক্ত ও মগজে খেলা করে অবিচল। এর আলোকে নিজ ভূমির আলো-বাতাস, দেশের উন্নয়ন পদ্ধতি সম্পর্কে তাঁর সংবেদনা কবিতার পাঠককেও আপ্লুত করে। এ দেশের কৃষি ও কৃষক সমাজকাঠামোর অন্যতম অবলম্বন। ফলে কৃষকসমাজের অধিকার ও শ্রম সম্পর্কে তিনি সচেতন। যে উৎপাদন সম্পর্কে কৃষকশ্রেণির আত্মগর্ব অত্যন্ত নিয়ামক বলে মনে করেন কবি। এ ছাড়াও কৃষি-ঐতিহ্য, কৃষিকেন্দ্রিক সমাজকে ভেঙে দেওয়া এবং এ-শ্রেণির প্রতি উদাসীনতা, অবহেলা মূলত নিজেকে অস্বীকারের সামিল। যেক্ষেত্রে উপনিবেশের নতুন কৌশল ভোগবাদকে উৎসাহিত করে। উলটো কৃষকের গৌরবকে অবনমিত দৃষ্টিতে দেখার চর্চাও লক্ষণীয়। পরিণামে সমাজে বৈষম্য ও  অসমতা বিকাশমান। কবিতার চরণে তা বলার চেষ্টা করেছেন কবি।

‘এক-পা দুই-পা এগোতে এগোতেই

মাথার উপরে ঝাঁক ঝাঁক পালিত শকুন ওড়ে―

দল বেঁধে খেয়ে যায় সময়ের সঞ্চিত বীজ,

আশরীর কর্দমের তৃপ্ত গন্ধ শুঁকে

দরিদ্র কৃষকের দিন কাটে।

কপালের বলিরেখা ক্রমাগত দীর্ঘতর হয়।

কৃষিনির্ভর দেশে মানুষের

সুসম বণ্টনবর্জিত ভালোবাসা

দুস্থ কপালে আঁকে ক্লেদাক্ত মাটির তিলক।’

[মাটির তিলক, কস ২০১৬ : ১৪৯]

এসব নেতির বিপক্ষে কবি সমাজরূপান্তরের প্রত্যাশী। কবি লক্ষ করেছেন, চারপাশে অক্টোপাসের মতো জড়িয়ে আছে জঞ্জাল। যেক্ষেত্রে প্রতিবাদ, বিদ্রোহে এককভাবে জয়ী হওয়া সম্ভব নয়। অপশক্তির বিপক্ষে দাঁড়াতে হবে সামষ্টিকভাবে। মাটির শপথে, অস্তিত্ব মাটিতে রেখে দ্রোহ করতে হবে যূথবদ্ধভাবে। এ লক্ষ্যে তিনি এ-সমাজ ভেঙে নতুন একটি সাম্যসমাজ প্রতিষ্ঠায় সক্রিয় রয়েছেন কবিতায়। তাঁর কবিতা পাঠককে উজ্জীবিত করে নম্র সুর ও স্বরে। একইসঙ্গে ইতিহাস অভিজ্ঞতাও রয়েছে তাঁর। কেননা তিনি ইতিহাসের ভেতর দিয়ে হয়ে ওঠা মানুষ। এ শুধু সময়ের হিসেবে নয়। প্রকৃতার্থে একটি দ্রোহ, বিক্ষুব্ধ, সময়ের মানুষ তিনি। ফলে তাঁর ভেতরে সেই সাহসী প্রত্যয় আমরা লক্ষ করি :

‘গ্রেফতারি পরোয়ানা কিংবা হুলিয়া

দিয়ে কোনও লাভ নেই―ক্ষুধার বিদ্রোহ

মানে না কিছুই। তখন কোনওই মোহ

থাকে না কারুর―এমনকি কাঁটাতারে বিদ্ধ

ভয়ও থাকে না তখন। অন্ধকারে

ক্ষুধার্ত মানুষই পারে

সাহসে দাঁড়াতে

পৃথিবীতে একাকী গুহায় মাঝরাতে।’

[ ক্ষুধার্ত মানুষ পারে, কস ২০১৬ : ১১৭]

বিশ^াসহীন আগলে রাখা যৌথ জীবন

কবি বিমল গুহের প্রেম-ভালোাবাসা এবং এর প্রকাশভঙ্গিও আলাদা অন্যদের থেকে। আমরা যেমন দেখি ক্ষোভ, বিদ্রোহ উচ্চারণে তাঁর নম্রস্বর। দ্রোহের ভাষা তাঁর কাছে খুব পেলব হয়ে উঠেছে। যা কি না সাধারণ বৈশিষ্ট্যের সঙ্গে মিলে না। তেমনি ভালোবাসার ভাষাও পৃথক হয়ে গেছে। বিমল গুহ আলাদা ভাষা, ধ্বনিতে উচ্চারণ করেন প্রেমের আকুতি। প্রতিতুলনার পাঠে তা পাঠকমাত্রেই লক্ষ করবেন। ফলে, কবিস্বভাব নিশ্চিত করে চিহ্নিত করা যায়। যে বিরহ কাতরতা চিরায়ত। চিরবিচ্ছেদ বিরহের টানাপড়েন, সকল মানুষের ভেতরে জায়মান থাকে চিরকাল। যে বিরহ বিচ্ছেদের ফলে তৈরি হয় নান্দনিক পঙক্তিমালা :

‘সিঁড়ি বেয়ে ছাদে উঠে দেখি

উড়ন্ত হাওয়ায় তুমি ভেসে বেড়াচ্ছো ঝিলমিল

তোমার জন্যেই যেন আকাশে মেঘের আনাগোনা।

তুমি চলে গেলে

খোলা দরজায় বইতে লাগল এলোমেলো হাওয়া।’

[সঙ্গতি, কস ২০১৬: ১২৯]

কবি প্রেমকে অবশ্য শুধু ব্যক্তিপ্রেমে সীমাবদ্ধ রাখেননি। যে প্রেম তিনি বিস্তৃত করেছেন নানা সম্পর্ক ও অনুষঙ্গে। ভালোবাসায় নিবেদিত সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিগণের মধ্যে পরস্পর মিলনই চিরকাম্য। কিন্তু বিচ্ছেদ হয় অনিবার্য। তবে মাঝে মাঝে দূরত্ব, ব্যবধান, অবহেলা প্রেমের সম্পর্ককে গভীর থেকে গভীরতর করে তোলে। কবি সে ধরনের বিবেচনা ও অভিজ্ঞতা থেকেই কবিতায় কিছু কথা বলেন :

‘তোমার অবজ্ঞা পেয়ে ভালোবাসা তীব্র হলো আরও

তোমার অবজ্ঞা দেখে একটু চড়ুই এসে বেদনাকে

ভাগ করে নেয়।’

[অবজ্ঞা, কস ২০১৬ : ১৩৭]

শতাব্দীর বরপুত্র

জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে শতাব্দীর বরপুত্র বলেছেন কবি। আমরা মনে করি তিনি চিরকালের বরপুত্র। বঙ্গবন্ধুর প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদনে কয়েকটি উজ্জ্বল কবিতা লিখেছেন কবি বিমল গুহ। এসব কেবলই মুজিববর্ষে উপলক্ষ্যের লেখা নয়। কবি লিখেছেন প্রাণের তাগিদে, শ্রদ্ধা নিবেদন ও স্মরণে। বঙ্গবন্ধুকে তিনি নানাভাবে উপস্থাপন করেছেন কবিতায়। দেশাত্মবোধের অনেক কবিতা লিখেছেন কবি। সেগুলোতে জনকের প্রসঙ্গ রয়েছে। কবিতায় কবি বলার চেষ্টা করেছেন যে, বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার পূর্বাপর সংগ্রাম, জাতিরাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার দীর্ঘপথ অতিক্রমণে বঙ্গবন্ধুর তুলনা কোথাও কোনওকিছুতে হয় না। বিশে^ এমন নেতৃত্ব, ব্যক্তিত্বের তুলনা তিনি নিজেই। বঙ্গবন্ধু ও অন্যান্য কবিতা (২০২১) শিরোনামে আলাদা কবিতার বই রয়েছে। এ গ্রন্থভুক্ত কবিতাগুলো বিভিন্ন সময়ে রচিত হয়েছে। তিনি যর্থাথই এ-গ্রন্থের ভূমিকায় বলেছেন, ‘মুক্তিযুদ্ধ ও বঙ্গবন্ধু বাঙালির অহংকারের নাম। ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান সৃষ্টির পরের বছর, অর্থাৎ ১৯৪৮ সালে রাষ্ট্রভাষার প্রশ্নে প্রথম বিতর্ক ওঠে। ধীরে ধীরে স্পষ্ট হয় পাকিস্তান সরকারের মনোভাব। বাঙালির ন্যায্য দাবির প্রতি সরকারের অবহেলার কারণে সৃষ্টি হয় বিভাজন। এ থেকে মুক্তি পেতে ১৯৬৬ সালে বঙ্গবন্ধু ঘোষিত ৬-দফার ভিত্তিতে স্বাধিকারের দাবি ওঠে। পাকিস্তান সরকার বাঙালিকে দমাতে চেয়েছে অস্ত্রের মুখে। যার ফল শুভ হয়নি। সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণের নির্বাচিত নেতা বঙ্গবন্ধুর দিকে তাকিয়েছিলো পুরো জাতি। এক সময় পুরো কর্তৃত্ব চলে আসে বঙ্গবন্ধুর হাতে। পাকবাহিনী হঠাৎ বাঙালি নিধনে মরিয়া হয়ে ওঠে। তখন বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতার ডাক দেন। শুরু হয় মুক্তিযুদ্ধ।’ অতএব কবি আবেগ, উপলব্ধি ও সৃজনসামর্থ্যে নির্মাণ করেছেন বঙ্গবন্ধুবিষয়ক কবিতা। কবিতায় বঙ্গবন্ধু, মুক্তিযুদ্ধ, বাংলাদেশের ইতিহাস, ঐতিহ্য বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে অঙ্কনের চেষ্টা করেছেন বিমল গুহ। কবিতাসমূহে নান্দনিকতায় নির্মিত হয়েছে বঙ্গবন্ধুর ব্যক্তিত্ব, রাজনীতি, মানসপ্রবণতা, অসামান্য নেতৃত্বের বৈশিষ্ট্য। লক্ষণীয় :

‘মহাঢল নিমিষে ভাসিয়ে নেয় জাতির জঞ্জাল

                         বঙ্গোপসাগরে

বীরদর্প মুজিবের বলিষ্ঠ তর্জনী পুনর্বার

জাতির কপালে দেয় টোকা।’

 [শেখ মুজিবের তর্জনী ২০২১ : ১৭]

বস্তুত, শিল্পিত পরিচর্যা আমরা পর্যবেক্ষণ করি। ক্ষেত্রবিশেষে এ বাংলার কাব্যিক বৈশিষ্ট্যের সঙ্গে বঙ্গবন্ধুর ব্যক্তিসত্তার মেলবন্ধন আবিষ্কার করেছেন কবি। কাব্যভাষায় কবি দেখান বঙ্গবন্ধুর অতুলনীয় চশমা কালান্তরে মিথে রূপান্তরিত হয়েছে। যেমন :

‘একটি চশমা আজ বাঙালির বীরত্ব ছুঁয়েছে

একটি চশমার কাচে মানুষের প্রতিরূপ ছবি হয়ে ভাসে

একটি চশমার রূপ বঙ্গবন্ধু মুজিবের প্রতিচ্ছবি আজ।’

 [বঙ্গবন্ধুর চশমা, বঙ্গবন্ধু ও অন্যান্য কবিতা ২০২১ : ১১]  

বঙ্গবন্ধুর জন্মগ্রাম সেই টুঙ্গিপাড়া হয়ে ওঠে বাংলাদেশের প্রতিকৃতি। যেখান থেকে জন্ম নেওয়া ব্যক্তি বঙ্গবন্ধু হয়ে উঠেন বাঙালির মুক্তির জনক। ফলে, কবি চমৎকারিত্বে এ গ্রামকে অঙ্কন করেছেন বিশেষবৈশিষ্ট্যে উন্নীত একটি এলাকা হিসেবে। যা এ বাংলাদেশ, বাঙালি জাতির প্রতীক হয়ে ওঠে। এ গ্রামের প্রকৃতি, ভালোবাসায় ঋদ্ধ বঙ্গবন্ধুর টুঙ্গিপাড়া এখন একটি গ্রাম শুধু নয়। বাঙালির মুক্তি ও প্রেরণার আশ্রয় স্থল হিসেবে প্রতিষ্ঠিত। কবি যেভাবে বলেন :

১.            ‘টুঙ্গিপাড়া গ্রাম নয় আর―বঙ্গবন্ধু শুয়ে আছেন টুঙ্গিপাড়ায়

               টুঙ্গিপাড়াকে যদি ‘বঙ্গবন্ধু’ নামে ডাকি-টুঙ্গিপাড়া সাড়া দেয়।

               টুঙ্গিপাড়া সমুদ্রের সম-আয়তনে প্রসারিত দূর সীমারেখা

               যেন―সন্তানের বুকের জমিনে শুয়ে-থাকা নদী,

                টুঙ্গিপাড়া আজ এক অসাম্প্রদায়িক চেতনার নাম।

                 …

                টুঙ্গিপাড়া আজ কোনও গ্রাম নয় আর

               টুঙ্গিপাড়া আমাদেও বিবেকের স্থির রাজধানী

     চেতনায় ‘বঙ্গবন্ধু সিটি’―নব এক আলোর শহর।’

[টুঙ্গিপাড়া গ্রাম যদি, ২০২১ : ১৫]

১.            বাংলার তৃণমূল মাটি ও মানুষ জেগে ওঠে, দেখে―

     শতাব্দীর বরপুত্র শেখ মুজিবুর

          বীরদর্পে বাংলার আকাশচূড়ায় একা স্থির অবিচল।’

                                    [টুঙ্গিপাড়া গ্রাম যদি ২০২১ : ২১]

১৫ আগস্ট বাঙালির জন্য কলঙ্ক ও বিষাদময় দিন। এমনকি সারাবিশে^র জন্যও বটে। বঙ্গবন্ধু শুধু বাঙালি বা এদেশের জন্য মুক্তির দূত ছিলেন না। তিনি সারাবিশে^র নিপীড়িত মানুষের কণ্ঠস্বর। ফলে ট্র্যাজিক ওই সময় ও দিনকে কোনও কিছু দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায় না। পনেরো আগস্টের ট্র্যাজেডিকে অন্য কোনও ঘটনার সঙ্গে তুলনা ও বিবেচনা করা হয় মাঝে মাঝে। শুধু হত্যাকাণ্ড বলার মধ্য দিয়ে এর বিবরণ শেষ করা যায় না। এ দিনটি ও পুরো হত্যাকাণ্ডের ঘটনাকে বিশ্লেষণ করতে হয় আগে পিছে অনেক বিষয়ের প্রেক্ষিতে। কবি কবিত্বশক্তির উপলব্ধি, বিবেচনায় কবিতায় শিল্পিত করেছেন আবেগমথিত উচ্চারণে :

‘আজ বত্রিশ নম্বর মাথা তুলে ছুঁয়েছে আকাশ―

আজ বত্রিশ নম্বর ছুঁয়ে গেছে দীপ্ত মহাকাল!

আজ ১৫ আগস্ট―আজ শোকাবহ দিন

আজ পিতৃহীন জাতি সমবেত নতমুখ তোমার উঠোনে

―হে মানবমুক্তির অবতার।’

 [আজ ১৫ই আগস্ট ২০২১ : ২৩]

কবি শ্রদ্ধা ভালোবাসায় বঙ্গবন্ধুর মধ্যে দেখেছেন তুলনারহিত এক ব্যক্তি, ব্যক্তিত্ব ও নেতৃত্বকে। যিনি না হলে এদেশই স্বাধীন হত না। আমরা জানি কবি বিমল গুহ মুক্তিযুদ্ধের উত্থাল সময় থেকে বেরিয়ে আসা মানুষ। পরিণামে কবি নীরব নির্জনে পৃথক বিপ্লব ও বিপ্লবীর কথা উচ্চারণ করেছেন। যা এ-বিপরীতের মধ্যে পাঠককে দেশপ্রেম, সমাজ পরিবর্তনের সংগ্রামে আশান্বিত করে। ফলে, এ ভূখণ্ডে মানুষ বারবার পরাজয় দেখেও আবার জয়ের স্বপ্নে জেগে ওঠে সাহসে, দৃঢ়তায়। কবি বিমল গুহ এমনই আশাবাদ ও নকশা উচ্চকিত করেন কবিতায়। এ জন্য কবি বিমল গুহের কবিতা পাঠ করতে চাই নিরন্তর :

‘আমাদের পরিচিত পথগুলি দুস্থ কাঙাল মানুষের মতো

ভুরিভোজে তৃপ্ত থাকে সকাল দুপুর

খায় কালো পেট্রোলের ধোঁয়া, এরা

সন্ধ্যায় হাত পাতে সাধারণ মানুষের কাছে!

দেশ মাতৃকার এই ভগ্নরূপ দেখে যাঁরা

প্রতিবাদমুখর হয়, মানববন্ধন করে সারাবেলা

সদর রাস্তায়―তাঁর কাছে অবনত হয়

আমাদের পরিচিত পথ।

পথচারী খুঁজে পায় আগামীর পথের ঠিকানা।’

                     [নিত্যদিন আঁকে লাল ভোর, কস ২০১৬ : ৩০৮]

তথ্যসূত্র

১.            বিমল গুহ। ২০২১। বঙ্গবন্ধু ও অন্যান্য কবিতা। ঢাকা : য়ারোয়া বুক কর্নার

২.           বিমল গুহ। ২০১৬। কবিতা সংগ্রহ। ঢাকা : একাত্তর প্রকাশনী

৩.          বিশ্বজিৎ ঘোষ(আহ্বায়ক)। ২০১৭। কবি বিমল গুহ ৬৫তম জন্মবার্ষিকী উদ্যাপন-স্মরণিকা। ঢাকা

৪.           সুব্রত রুদ্র (সম্পাদিত)। ২০১৪। কবির ভাবনায় কবিতা। কলকাতা : প্রতিভাস

 লেখক : প্রাবন্ধিক

Leave a Reply

Your email address will not be published.

shares