বাংলা একাডেমি পুরস্কার প্রাপ্ত (২০২১) কবি ও কথাশিল্পীদের সাহিত্যপ্রভা : বিশ্বজিৎ চৌধুরীর সাহিত্যজগৎ : সালমা আক্তার

কথাশিল্পী বিশ্বজিৎ চৌধুরী (জ. ০১ আগস্ট ১৯৬০) চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলা সাহিত্যে স্নাতকোত্তর লাভ করেন। শৈশব কেটেছে চট্টগ্রাম শহরের সবচেয়ে জনবহুল এলাকা আলকরণে। তাঁর শৈশব ছিল খুব বর্ণময়। শৈশবে পাড়ার প্রচুর বন্ধুবান্ধব মিলে খেলাধুলা, আড্ডা, গানে একসঙ্গে বড় হয়েছেন। তাঁদের পাড়ার একটা বৈশিষ্ট্য ছিল সেটা হলো―হিন্দু, মুসলিম, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান কোনও ভেদাভেদ ছিল না।

ছোটবেলায় খুব ইচ্ছে চেপে বসেছিল, যে করেই হোক লেখক হতে হবে তাঁকে। কলেজিয়েট স্কুলে পড়ার সময় সেখানেই পরিচিত হন আবু মুসা চৌধুরী নামে এক বন্ধুর সঙ্গে। সে বলেছিল, আগে ছোটদের লেখা দিয়ে শুরু কর। ছড়া লিখ। আস্তে আস্তে হাত পাকাও। তবেই বড় লেখক হতে পারবে। সেই থেকে ছড়া লেখা বা লেখালেখি শুরু করেন।

স্বপন কুমারের গোয়েন্দা সিরিজ, দস্যু মোহন, বনহুর বা বাহরাম তখন আর দশজন শিশু-কিশোরীর মতো উনিও পড়েছেন। ফাঁকে ফাঁকে মনোলোভা ছবি আঁকা রুশ শিশুসাহিত্যের বই ক্ষুদে গুলবাজ মালাকাইটের ঝাঁপি, রূপের ডালি খেলা―এসবও পড়া চলছিল। এরপর উপেন্দ্রকিশোর রায় চৌধুরী, লীলা রায়, অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর, সুকুমার রায়, সত্যজিৎ রায় পড়ে পাঠরুচিটা তৈরি হলে ভালো হতো।

 ঠিক এরকম একটা সময়েই রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের গল্পগুচ্ছ তাঁকে নতুন এক জগতের সন্ধান দিল। বিচিত্র প্রকৃতি, তারও চেয়ে বিচিত্র মানুষের মন; রবীন্দ্রনাথের হাত ধরে খুঁজে বেড়াচ্ছেন সেই মনের আলো-অন্ধকার। নষ্টনীড়, পোস্টমাস্টার, অতিথি, খোকাবাবুর প্রত্যাবর্তন, মাল্যদান, কাবুলিওয়ালা, সুভা, স্ত্রীর পত্র, ক্ষুধিত পাষাণ, একরাত্রি, জীবিত ও মৃত, ছুটি―এক একটি গল্প এক জীবনে অজস্র জীবনকে দেখা, জানা ও বোঝার সুযোগ করে দিয়েছিল।

আল মাহমুদের ছড়ার বই পাখির কাছে, ফুলের কাছে  এত প্রিয় হয়ে উঠেছিল কেন! ‘আম্মু বলেন, পড়রে সোনা, আম্মু বলেন, মন দে/পাঠে আমার মন বসে না কাঁঠাল চাঁপার গন্ধে’―এই ছন্দোবদ্ধ পঙ্ক্তি পাঠ করে এক শহুরে ছেলের নাকে এসে লাগত অচেনা ফুলের গন্ধ। তা ছাড়া কর্ণফুলীর তীরে বাস বলেই হয়ত, জ্যোৎস্নালোকিত আকাশের দিকে বিস্ময়ে তাকিয়ে ভেবেছেন―‘সবাই যখন ঘুমিয়ে পড়ে কর্ণফুলীর কূলটায়/দুধভরা ঐ চাঁদের বাটি ফেরেশতারা উল্টায়।’

আল মাহমুদ তাঁর হয়েই যেন বলেন―‘কী আর করি পকেট থেকে খুলে ছড়ার বই/পাখির কাছে, ফুলের কাছে মনের কথা কই।’

প্রেমে পড়া আর কবিতা পড়া নাকি সবার জীবনেই একই সময়ের ঘটনা। শামসুর রাহমান, আল মাহমুদ, শহীদ কাদরী, সুনীল-শক্তি, গুণ-হাসান, হেলাল হাফিজে মন মজে গেল এক সময়। তখন নিজেকে শুনিয়ে নিজেই আবৃত্তি করেছেন, ‘কাছে গেলে সবই পোড়ে/আমি পুড়ি দূরের আগুনে’, বা ‘ক্যালেন্ডারের কোন পাতাটি তোমার মতো খুব ব্যথিত …’ ইত্যাদি। কিন্তু আবুল হাসানের রাজা যায় রাজা আসে কাব্যগ্রন্থটি বালিশের পাশে রেখে ঘুমানোর অভ্যাস হয়ে গিয়েছিল।

গ্রিক নাট্যকারেরা বিশ্বাস করতেন মানুষের জীবন তার ভাগ্য বা নিয়তির নির্দেশেই চলে। সফোক্লিসের নাটক ইডিপাস (সৈয়দ আলি আহসানের অনুবাদ) পড়ে সত্যিকার অর্থেই গ্রিক ট্র্যাজেডি নামের এক ‘বিপন্ন বিস্ময়ে’র সঙ্গে পরিচিত হয়েছিলেন।

বঙ্কিমচন্দ্রের উপন্যাস কৃষ্ণকান্তের উইল পড়ে অলঙ্কারবহুল কিন্তু প্রাণবন্ত এক ভাষার সঙ্গে পরিচিত হয়েছিলেন। দুটি পঙ্ক্তির মাঝখানে ফাঁকা অংশে যে অনেক অব্যক্ত কথা লুকিয়ে থাকে তার সন্ধানও পেয়েছিলেন সেই গদ্যে। ক্রমে পাঠক হিসেবে পরিণত করে তুলছিল বিশ্বজিৎ চৌধুরীকে।

বাংলা ভাষার তিন ধারার তিনটি ভ্রমণবিষয়ক বই তাঁকে মুগ্ধ করে রেখেছে দীর্ঘকাল। অন্নদাশংকর রায়ের পথে-প্রবাসে, সৈয়দ মুজতবা আলীর দেশে-বিদেশে আর কালকূটের অমৃতকুম্ভের সন্ধানে। কলাম্বিয়ার নোবেল পুরস্কারজয়ী লেখক গ্যাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেসের  জাদু বাস্তবতা ও মার্কেস যেন প্রায় সমার্থক দুটি শব্দ।

মাত্র ১৬ বছর বয়সে পুষ্পর বিয়ে হয়েছিল সূর্য সেনের সঙ্গে। বিপ্লবী সূর্য সেন। কিন্তু বাসরঘরে মেয়েটি জানতে পারে চিরকাল স্বামীর দেহসঙ্গ থেকে বঞ্চিত হবেন তিনি। কারণ তাঁর স্বামী বিপ্লবী তো বটেই, তদুপরি ব্রহ্মচর্যের মন্ত্রে দীক্ষিত। পুষ্পকুন্তলা : বিপ্লবী সূর্য সেনের জীবনসঙ্গিনী বইটি এই পরিণত বয়সেও আবেগাপ্লুত করেছিল বিশ্বজিৎ চৌধুরীকে।

জীবনের অন্য সব ক্ষেত্রের মতো সাহিত্যও যে অপরিহার্য বিষয়, সেটা আমরা বুঝতে পারি, বিশ্বজিৎ চৌধুরীর মতো লেখকদের সপ্রাণ উপস্থিতিতে। তাঁর সমগ্র সাহিত্য মানবজীবনেরই প্রতিচ্ছবি এবং মানুষের উজ্জীবনী শক্তি, পাঠকের সুপ্রবৃত্তিকে জাগিয়ে তোলারশ্রমলব্ধ প্রয়াস লক্ষ্যণীয়। তাঁর প্রতিটি রচনা যেমন গভীর ও অতলস্পর্শী, তেমনি ব্যাপক। তাতে আছে বিষয় ও ভাষার কারুকাজ, আছে অভিনব বর্ণনা, আছে ঔদার্য ও বিস্ময়।

পত্র-পত্রিকায় সমাজ-রাজনীতি বিষয়ে নিয়মিত নিবন্ধ লিখলেও মূলত সৃজনশীল রচনার মধ্যেই নিজেকে খুঁজে পান তিনি। প্রকাশিত গল্পসংখ্যা ৩০ টির বেশি। তাঁর বহুল সমাদৃত উপন্যাস নার্গিস। তাঁর ছোটগল্প অবলম্বনে নির্মিত হচ্ছে রাষ্ট্রীয় অনুদানপ্রাপ্ত চলচ্চিত্র একটি না বলা গল্প। তাঁর লেখা অনেক নাটক দেশের বিভিন্ন চ্যানেলে ইতোমধ্যে প্রচারিত হয়েছে। পেশাগতভাবে সাংবাদিক হলেও তিনি একাধারে কবি, গল্পকার, ঔপন্যাসিক, প্রাবন্ধিক, কলামলেখক, নাট্যকার, সমালোচক ও কিশোর সাহিত্যিক। সাহিত্যে অবদানের জন্য চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন সাহিত্য পুরস্কার, প্রেসক্লাব সাহিত্য পুরস্কার, ড. মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ পদক, বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কারসহ বিভিন্ন সংস্থার সম্মাননা পেয়েছেন এই লেখক।

তাঁর কথাশিল্প : সাহিত্যের নানা শাখায় স্বতঃস্ফূর্ত ও সক্রিয় হলেও কথাসাহিত্যই তাঁর প্রধান চর্চিত মাধ্যম। এ অঙ্গনে তাঁর কাজ ব্যাপক ও উল্লেখযোগ্য। জীবন ও ইতিহাস-আশ্রিত উপন্যাস রচনা করে তিনি সমকালের অন্যতম মেধাবী কথাসাহিত্যিক হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয়েছেন।

তাঁর সাহিত্যসম্ভার থেকে কিছু উল্লেখযোগ্য সৃষ্টিকর্ম নিয়ে স্বল্প পরিসরে আলোচনা করছি―

নার্গিস :

সাম্য, সম্প্রীতির কবি নজরুল, তাঁর হৃদয়মাধুর্য দিয়ে সব শ্রেণিবৈষম্য দূর করতে চেয়েছিলেন। নজরুল ছিলেন বাঙ্গালির চিত্তজাগরণকারী গণমানুষের কবি। কবি বিশ্বজিৎ চৌধুরীর মতে, জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের সৃষ্টিকর্ম চর্চার মাধ্যমে মুক্তিযুদ্ধের মূল চেতনা লিঙ্গ-জাতি-ধর্ম নির্বিশেষে বিভেদহীন ও ন্যায়ভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠার জন্য সামাজিক সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনার মাধ্যমে দেশের গণমানুষের কাছে পৌঁছে দিতে হবে। আমাদের বর্তমান ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে তাঁর চিন্তা চেতনার বিকাশ ও উন্মেষ ঘটাতে হবে। আর সে বোধ থেকেই তিনি নজরুলের জীবনের দুই বিশেষ নারীকে নিয়ে উপন্যাস লিখেছেন। হাসান আজিজুল হক লিখেছেন :

‘ইতিহাস আর উপন্যাস এক জিনিস নয়। এই দুয়ের মাঝে এক রসায়ন থাকতে হবে। একটা কেমিস্ট্রি থাকতে হবে। এই সংমিশ্রণকে আলাদা আলাদা করা যাবে না। এই রসায়নকর্মটা যে করতে পারে না, তার লেখক হওয়া চলে না। যে বাস্তবকে অবাস্তবের সঙ্গে মেলাতে পারে না, সে বাস্তবের পেছনে পরাবাস্তব দেখতে পায় না। বাস্তবের পেছনে, গভীরে আরও কত বাস্তব আছে এটা যে দেখতে পায় না, সে বাস্তববাদী লেখক নয়। তার মানে কি এই যে, বাস্তববাদী লেখক হলে আমরা সবাই প্রতিদিন যা দেখছি তা-ই লিখব ? তা লিখলেই হয়। কিন্তু তাতে কি ঔপন্যাসিক হওয়া যায় ? সবাই ঔপন্যাসিক হয় না কেন ? এজন্য যে, সবাই জীবনের গভীরে বাস্তবতা-অবাস্তবতার সংমিশ্রণ দেখতে পায় না। চোখের আকৃতি ছোট-বড় দিয়ে সুন্দর বিবেচনা হতে পারে। কিন্তু সাহিত্য বিবেচনা হয় না।’

বিশ্বজিৎ চৌধুরী উপন্যাসে ইতিহাস আর কল্পনার সমন্বয় ঘটিয়েছেন চমৎকারভাবে। প্রতিটি উপন্যাসই স্বতন্ত্র মাত্রা ও মর্যাদায় অভিনন্দিত। নার্গিস এবং ফজিলাতুন্নেসাকে নজরুলের জীবনীর প্রচলিত আঙ্গিকে দেখবার যে ঐতিহ্য, তাকে ভেঙে দিয়ে তিনি নতুন একটি পথ রচনা করেছেন।

বিশ্বজিৎ চৌধুরী নার্গিসকে লেখা নজরুলের চিঠিটা পড়ে খুব কষ্ট পেয়েছিলেন। কুমিল্লার অজ পাড়াগাঁয়ের একটি মেয়ে সতের বছর একজন পুরুষের জন্য অপেক্ষা করেছে, যা ভাবাই যায় না। মেয়েটির মনে কতটুকু প্রেম ভালোবাসা থাকলে নজরুলের জন্যে দীর্ঘ সতেরটি বছর অপেক্ষা করতে পারে! এই ব্যাপার গুলো তাঁকে পোড়াত ও ভাবাতো। তাঁর মনে হাজার প্রশ্নের জন্ম দিয়েছিল। এই চিঠিটা একবার একজন আবৃত্তি শিল্পীকে দিয়ে একটি টিভি অনুষ্ঠানেও পাঠ করিয়েছিলেন। পাঠ করার পরে মনে আবারও নতুন প্রশ্নের জন্ম দিয়েছিল, নার্গিসকে নিয়ে কিছু একটা করতে হবে। এরপর নজরুল এবং নার্গিসকে নিয়ে নতুনভাবে জানাশোনা শুরু করলেন। প্রায় তিন বছর দেখে শুনে তথ্য উপাত্তের ভিত্তিতে বিশ্বজিৎ চৌধুরী নার্গিস উপন্যাসটি কাজী নজরুলের জীবনের অংশ নার্গিসকে নিয়ে লিখেছেন।

উপন্যাসের শুরুটাই বেশ চমকপ্রদ। ‘তোমরা একসঙ্গে রাত কাটিয়েছিলে ?’

(অধ্যায় : এক, পৃষ্ঠা : ০৯)

বান্ধবী ইন্দুর এই অমোঘ জিজ্ঞাসা দিয়ে উপন্যাসের কাহিনি শুরু।

কাজী নজরুল ইসলামের যৌবনের কিছু সময় কাটে কুমিল্লার মুরাদনগরের দৌলতপুরে। প্রায় ১১ মাসেরও বেশি সময় কাটিয়েছেন কবি। নজরুল ১৯২১ সালের এপ্রিলে কুমিল্লার দৌলতপুরে আলি আকবর খানের বাড়িতে অতিথি হয়ে আসেন। সেখানে বাড়ির পাশের কামরাঙাতলায় বাঁশিতে সুর তুলে, আর পুকুরঘাটে বসে কবিতা লিখে লিখে সময় কেটেছে তাঁর। নার্গিসের বড় ভাই আর মামাত বোনের বিয়ের উৎসব-আয়োজনের মধ্যে মুন্সিবাড়ির মেয়ে সৈয়দা আসারকে দেখে কবির দৃষ্টি আটকে যায়। মামা আলী আকবর খানকে তিনি বললেন,

 ‘এত সুন্দর মেয়েটার কী একটা নাম রেখেছেন আপনারা ? আমি ওর নাম দিলাম নার্গিস, সুন্দর না ?’

(অধ্যায় : দুই, পৃষ্ঠা : ২১)

এভাবে নজরুলের প্রথম প্রেম সৈয়দা হয়ে ওঠেন ‘নার্গিস’। ফারসি ভাষায় যার অর্থ গুল্ম। তিনি দৌলতপুর গ্রামের মেয়ে ছিলেন। প্রথম বিশ্বযুদ্ধে অংশগ্রহণকালে নার্গিসের মামা ক্যাপ্টেন আলি আকবর খানের সঙ্গে পরিচয় হয় নজরুলের। ১৯১৯ সালে যুদ্ধ শেষ হয়। কবি তখন মুসলিম সাহিত্য সমিতির (কলকাতা) অফিসে আফজাল-উল হকের সঙ্গে থাকতেন। সেখানে থাকাকালীন তাঁর সাক্ষাৎ হয় আলী আকবর খানের সঙ্গে। তিনিও তখন নজরুলের সাথে কলকাতায় থাকতেন। ধীরে ধীরে তাদের মধ্যে বেশ আত্মীয়তার সম্পর্ক বা হৃদ্যতা গড়ে ওঠে। আকবর খান নজরুলের প্রতিভায় মুগ্ধ হয়ে তাকে কুমিল্লায় নিজের গ্রামের বাড়ি ভ্রমণের আমন্ত্রণ জানান। আলি আকবর খানের আমন্ত্রণ রক্ষা করতে কলকাতা থেকে ১৯২১ সালের ৩ এপ্রিল চট্টগ্রাম মেইলে নজরুল কুমিল্লা এসে পৌঁছান।

কুমিল্লায় পৌঁছে আলী আকবর খান ট্রেন থেকে নেমে নজরুলকে প্রথমে নিয়ে যান কান্দির পাড়ে ইন্দ্রকুমার সেনগুপ্তের বাসায়। ইন্দ্রকুমার সেনগুপ্তের পুত্র বীরেন্দ্র কুমার সেনগুপ্ত ছিলেন আলি আকবর খানের সহপাঠী। তখন এই পরিবারের সঙ্গে ছিল তার গভীর সম্পর্ক। আলি আকবর খান বীরেন্দ্রের মা বিরজাসুন্দরী দেবীকে মা ডাকতেন, সে সুবাদে এবার তিনি নজরুলেরও মা হলেন। বিরোজাসুন্দরী দেবী ছিলেন অত্যন্ত অমায়িক এবং স্নেহময়ী রমণী।

এ পরিবারের সবাই ছিলেন সংস্কৃতিমনা। বিশেষ করে এ বাড়ির ছোট মেয়েরা (দুলি, বাচ্চি ও জটু) ছিল সংগীতে মুখর। নজরুলকে পেয়ে তারা অল্পদিনেই আপন করে নিলেন। কয়েকদিন কুমিল্লায় কাটানোর পর বৈশাখের শুরুতেই আলী আকবর খানের সঙ্গে তিনি তার দৌলতপুর গ্রামের বাড়িতে যান।

চার-পাঁচ দিনেই বাড়ির জ্যেষ্ঠ আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে খুব গভীর সম্পর্ক গড়ে ওঠে তাঁর। কবিতা শুনিয়ে, গান গেয়ে তাদের তো বটেই দূর-দূরান্ত থেকেও লোকজন ছুটে আসত কবির নৈকট্য লাভের আশায়। আলী আকবর খানের বোন আসমাতুন্নেসার বিয়ে হয়েছিল খাঁ বাড়ির পাশেই। অর্থনৈতিক অবস্থা খারাপ থাকায় আসমাতুন্নেসা তার ভাইয়ের বাড়িতে তেমন সমাদর পেতেন না। আসমাতুন্নেসার মেয়েই কবি নজরুলের প্রথম প্রেম নার্গিস।

এক পর্যায়ে নজরুল নিজেই বিয়ের প্রস্তাব উত্থাপন করেন। খাঁ বাড়ির মুরব্বিরা নার্গিসের বর হিসেবে নজরুলকে পছন্দ করতেন না। নজরুলকে তারা বাউণ্ডুলে হিসেবেই দেখেছিলেন। কিন্তু গ্র্যাজুয়েট আলি আকবরের জন্য প্রতিবাদ করতেন না। কারণ আলি আকবর খান চেয়েছিলেন নজরুলের সাথে তাদের পারিবারিক সম্পর্ক আরও গভীর করে তুলতে আর সেটা তাদের মেয়ের সাথে বিয়ে দিয়ে।

অবশেষে তাদের ভালোবাসার পরিণতি বিয়ে অবধি পৌঁছোয় এবং ১৩২৮ বঙ্গাব্দের ৩ আষাঢ় শুক্রবার নজরুলের সাথে নার্গিসের বিয়ের দিন ধার্য হয়। আলি আকবর খান নজরুল-নার্গিসের বিয়ের আয়োজন করলেন জাঁকজমকের সঙ্গে। নজরুলের বিয়েতে তাঁর পক্ষের অতিথি হিসেবে বিরজাসুন্দরী দেবী ও তার পরিবারকে মনোনীত করেন। বিয়ের আগের দিন সবাই দৌলতপুরে এসে উপস্থিত হন। কলকাতায় নজরুলের বন্ধুদেরও দাওয়াত দেওয়া হয়।

কিন্তু আলী আকবরের অতি আগ্রহ ও কিছু আচরণ নজরুলকে এই বিয়ের প্রতি বিতৃষ্ণ করে তোলে। সম্পর্কের অবনতি হয় যখন কাবিননামায় আলী আকবর একটি শর্ত রাখতে চাইলেন―

 ‘স্ত্রীকে নিয়ে নজরুলকে দৌলতপুরেই থাকতে হবে, অন্য কোথাও যাওয়া চলবে না।’

(অধ্যায়: পাঁচ, পৃষ্ঠা: ৩৭)

এ অপমানজনক শর্ত মেনে না নিয়ে কবি বিয়ের মজলিশ থেকে উঠে গিয়েছিলেন। পরে নার্গিসের সঙ্গে নজরুল ইসলামের ‘আকদ’ বা বিয়ে হয়ে যাওয়ার পর আনুষ্ঠানিক অন্যান্য কাজে যখন সবাই ব্যস্ত তখন অন্তর্দ্বন্দ্বে বিক্ষুব্ধ নজরুল বাসরঘরে প্রবেশ করলেন উদভ্রান্ত চেহারায়। ধপ করে বসল খাটের ওপর। ঝড়ের পূর্বাভাস টের পেল নার্গিস। কয়েকটা মুহূর্ত অপেক্ষা করে উঠে গিয়ে দাঁড়াল প্রায় গা ঘেঁষে। হাতটা ধরল গভীর মমতায়। বললেন, ‘সব ঠিক হয়ে যাবে, দেখো।’

 (অধ্যায়: পাঁচ, পৃষ্ঠা: ৩৯)

‘কী ঠিক হয়ে যাবে ? আমি সারা জীবন তোমাদের বাড়িতে পড়ে থাকব ?…কেন পড়ে থাকতে হবে এ বাড়িতে, আমি তোমার বিয়ে করা স্ত্রী, তুমি যেখানে নিয়ে যেতে চাও সেখানেই যাব আমি।…পারবে ? সত্যি পারবে আমার সঙ্গে চলে যেতে ? তাহলে চলো, আজ রাত ফুরাবার আগেই এ বাড়ি ছেড়ে চলে যেতে চাই আমি।’

(অধ্যায়: পাঁচ, পৃষ্ঠা: ৩৯ ও ৪০)

কিন্তু নজরুলের কাছে নার্গিস দুটো দিন সময় চাইলে সে বাসর ঘর থেকে বেরিয়ে গেল বিরজাসুন্দরী দেবীর কাছে। তাকে বলেন, ‘মা, আমি এখনই চলে যাচ্ছি।’ বিরজাসুন্দরী দেবী বুঝতে পারেন এ অবস্থায় নজরুলকে ফেরানো সম্ভব নয়। বিরজাসুন্দরী দেবীর সঙ্গে কথা বলে আবার ফিরে এলেন বাসর ঘরে। বললেন,

 ‘আমি ভোরে বীরেনদার সঙ্গে রওনা দেব। শ্রাবণ মাসে পরিবারের লোকজন এনে তুলে নিয়ে যাব তোমাকে।’

(অধ্যায়: পাঁচ, পৃষ্ঠা: ৪০ ও ৪১)

‘অভিমান করে নজরুল সেই রাতে দৌলতপুর থেকে কর্দমাক্ত রাস্তা পায়ে হেঁটে নজরুল ও বীরেন্দ্রকুমার কুমিল্লা পৌঁছান। তবে যাওয়ার আগে স্ত্রীকে বলেছিলেন, সপরিবারে শ্রাবণ মাসে’ এসে আনুষ্ঠানিকভাবে তুলে নিয়ে যাবেন। সেটা ১৯২১ সাল। এরপর ১৭টি বছর পেরিয়ে গেছে, শ্রাবণ ফিরে ফিরে আসলেও, নজরুল আর ফিরে আসেননি।

পরিশ্রম ও মানসিক চাপে নজরুল অসুস্থ হয়ে পড়েন। নজরুলের জীবনে নার্গিস অধ্যায় সেখানেই শেষ হয়। শচীন দেব বর্মণের সঙ্গে সংগীতচর্চা এবং একটা সুসম্পর্ক ছিল কবির। সেই সূত্রে কুমিল্লার কান্দিরপাড়ের ইন্দ্রকুমার সেনের বাড়িতে ১৯২১ থেকে ১৯২৩ সালের বিভিন্ন সময়ে অবস্থান করেন কবি। এই ইন্দ্রকুমারের বসন্ত কুমার সেনগুপ্ত ও গিরিবালা সেনগুপ্তের মধ্যম কন্যা আশালতা সেনগুপ্ত ওরফে দোলনা। ওরফে দুলির সঙ্গে নজরুলের প্রণয় পরিণয়ে রূপ নেয়, বিয়ের পর নজরুল তাকে ভালোবেসে নাম দেন প্রমীলা, তারপর থেকে তিনি প্রমীলা নজরুল, প্রমীলা সেনগুপ্ত, প্রমীলা দেবী নামে পরিচিতি লাভ করেন। প্রমীলা কাজী নজরুলের দ্বিতীয় স্ত্রী।

একবার কাউকে মন থেকে ভালোবাসলে তা কখনও ভোলা সম্ভব নয়। বিরহ বেদনা সে ভালোবাসাকে আরও খাঁটি করে। বেদনার মধ্যেও মানুষ তার হারিয়ে যাওয়া ভালোবাসার মানুষকে খোঁজে। তাকে পাওয়ার জন্য ব্যাকুল হয়। বুকে আশা রাখে এই অন্ধকার ভেদ করে একদিন সোনালি সকালে প্রেমের ডালি সাজিয়ে আসবে তার ভালোবাসার মানুষ। নজরুলের প্রতি নার্গিসের ভালোবাসা ছিল ঠিক তেমনি। তাইতো ১৭ বছর অপেক্ষা করেছে তাঁর জন্য। দিন চলে যায়; নার্গিসের অপেক্ষা আর ফুরায় না। আকবর আলী খান কলকাতা গিয়ে নজরুলকে বলেন, ‘জানি তুমি কষ্ট পেয়েছ। কিন্তু সবকিছু ভুলে আবার কি শুরু করা যায় না, নুরু ?’

(অধ্যায় : আট, পৃষ্ঠা : ৫৬)

উত্তরে নজরুল বলেছেন―‘কী ভুলে যেতে বলছেন, খান সাহেব ? বাড়ির পোষা কুকুরটিও অবজ্ঞা-অবহেলার ব্যাপারটা বুঝতে পারে। আর আমি তো মানুষ।’

(অধ্যায়: আট, পৃষ্ঠা: ৫৬)

ঠিক ১৫ বছর পরে আকস্মিকভাবে পুনরায় তাঁদের সাক্ষাৎ হয়। নার্গিস নিজেই যায় কলকাতায় নজরুলের সঙ্গে দেখা করতে। এরপর আরও কিছুটা সময় অপেক্ষা করে নার্গিস। দীর্ঘ ১৭ বছর অপেক্ষায় ছিলেন নজরুলের জন্য। অবশেষে উপন্যাসের পরিণতিতে আমরা দেখতে পাই, ১৭ বছর পর নজরুলের পাঠানো তালাকনামায় স্বাক্ষর করার পর নার্গিস কবি আজিজুল হাকিমের সঙ্গে দ্বিতীয় বিবাহে আবদ্ধ হন। মানুষের জীবন যতই কষ্টকর, হতাশাব্যঞ্জক ও ব্যর্থতায় নিমজ্জিত হোক―আশায় তার একমাত্র ভরসা। আশা আত্মার নোঙর। হয়তো নার্গিসও এই আশায় ভর করেই সে সুখকর নব জীবনের সন্ধানে দ্বিতীয়বার বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন।

নজরুল নার্গিসের বিয়ের খবরে শুভকামনা জানিয়ে শেষ চিঠি লেখেন―

‘জীবনে তোমাকে পেয়ে হারালাম, তাই মরণে পাব,―সেই বিশ্বাস ও সান্ত্বনা নিয়ে বেঁচে থাকব। প্রেমের ভুবনে তুমি বিজয়িনী, আমি পরাজিত। আমি আজ অসহায়। বিশ্বাস করো, আমি প্রতারণা করিনি। আমাদের মাঝে যারা এ-দূরত্ব সৃষ্টি করেছে, পরলোকেও তারা মুক্তি পাবে না। তোমার নব অভিযাত্রা শুভ হোক।

নিত্য শুভার্থী

নজরুল ১লা ডিসেম্বর ১৯৩৮।’

(অধ্যায়: ষোলো, পৃষ্ঠা: ১০৯)

মোট ১১১ পৃষ্ঠায়, ষোলোটি অধ্যায়ে বিন্যস্ত, নান্দনিক প্রচ্ছদের নার্গিস উপন্যাসের জন্য বিশ্বজিৎ চৌধুরী নজরুলপ্রেমীদের কাছে স্মরণীয় হয়ে থাকবেন, সন্দেহ নেই। নজরুল নার্গিসের প্রেমে পড়েছিলেন।

কবি ও রহস্যময়ী :

কথাসাহিত্যিক বিশ্বজিৎ চৌধুরী এরপর উপন্যাসের উপজীব্য করেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম বাঙালি মুসলিম গ্রাজুয়েট গণিতবিদ ফজিলাতুন্নেসার সঙ্গে কবির প্রণয়কাহিনি। এখানেও লেখককে অনেক কল্পকথার ডালপালা ছাঁটতে হয়েছে, আবার রহস্যের মোড়কে ঢাকা না-বলা কথার ছিন্ন সুতো জুড়তে হয়েছে। প্রয়োজনীয় তথ্য সংগ্রহে তাঁকে রীতিমত খেটে উপন্যাসের রসদ জোগাড় করতে হয়েছে। তবে বিশ্বজিৎ চৌধুরীর কলমে আবেগ-কল্পনা-মনন একযোগে কাজ করে। বিদ্রোহী কবির আরেকটি প্রেমের কুঁড়ি তিনি ইতিহাস ও বাস্তবের প্রতি দায়বদ্ধতা থেকেই ফুটিয়ে তুলেছেন।

নজরুলের মোহনীয় দিলখোলা হাসি, আসর জমিয়ে তোলার আশ্চর্য ক্ষমতা সেইসময়ের তাঁর সঙ্গী-সাথীদের স্মৃতিচারণে নানা লেখায় এসেছে নানাভাবে। আমরা জেনেছি তাঁর ঝাঁকড়া চুলের মায়া কিংবা ভাঙা-গলায় গাওয়া অসাধারণ সব গান এবং কবিতার চুম্বক-টান এড়ানো সহজ ছিল না কারও পক্ষে, হোক সে পুরুষ কিংবা নারী। তিনি প্রেমে জড়িয়েছেন যখন যাকে মনে ধরেছে, সে সুরেলা গলার মোহই হোক, হোক সে রূপের দ্যুতি। নজরুলের জীবনে এসেছে অনেক নারী। কখনও রানু সোম (প্রতিভা বসু), কখনও নোটন মৈত্র বা জাহানারা চৌধুরীর সঙ্গে তাঁর তৈরি হয়েছে নানা মাত্রার সম্পর্ক। কারও কারও সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক নানা কাহিনির জন্মও দিয়েছে। এমন মানুষের জীবনে সম্পর্কের দায় যেন নাটকীয় অনিশ্চয়তার চমক তৈরি করে। এসব সম্পর্কে তিনি জড়িয়েছেন সহজে, আবার বাঁধন ছেঁড়ার সহজাত নৈপুণ্যে বেরিয়েও এসেছেন। তাঁর কাছে এই সব প্রেম-বিরহ ছিল সৃষ্টির প্রণোদনা মাত্র। কী বিরহ, কী মিলন, সবই এসেছে তাঁর গানে কিংবা কবিতার পঙ্ক্তির ভাঁজে, ভাঁজে। কিছু অসাধারণ গান ও কবিতা এসব সম্পর্কের সাক্ষী হয়ে স্থায়ী থেকে গেল পাঠক-শ্রোতার হৃদয়ে।

কিন্তু ফজিলাতুন্নেসার ব্যাপারটি ছিল একেবারে ভিন্ন। এই একটি সম্পর্ক রূঢ় প্রত্যাখ্যানের রূপটি চিনিয়েছিল কবিকে। কারণ এর আগে কবি শুধু প্রত্যাখ্যাত করতে জেনেছেন কিন্তু প্রত্যাখ্যান হওয়ার যে কষ্ট তা তিনি কখনওই অনুধাবন করতে পারেননি। এতদিন তিনি অবলীলায় ছেড়ে এসেছেন পুরাতন প্রেম নতুনের টানে, এবারের ধাক্কা হয়তোবা সেই কারণেই অতি সংবেদনশীল করেছিল তাঁকে। সমুদ্রের ঢেউভাঙা জলের মতো নজরুলের নিবেদন স্পর্শ করতে চেয়েছে ফজিলাতুন্নেসার চরণ, কিন্তু কী আশ্চর্য উপেক্ষার শক্তি ছিল তাঁর! ফজিলাতুন্নেসা কঠোর সংযমে সামলেছিলেন নিজেকে। তিনি ফিরে তাকালেন না, বরং ব্যঙ্গ-বিদ্রুপ-অবহেলায় ক্ষত-বিক্ষত করেছেন কবির হৃদয়! প্রেমের শাশ্বত-সত্য-সুন্দর রূপটি কবি ধরতে পেরেছিলেন। বিরহ-অনলে পুড়ে পুড়ে তিনি হয়েছেন খাঁটি। প্রেম থেকে তীব্র বঞ্চনার শিকার হয়েছিলেন যুবক নজরুল। প্রেমের কাছে নিজেকে পুরোপুরি সঁপে দিলেও সে প্রেম অধরাই থেকে গেছে।

বিশ্বজিৎ চৌধুরী নজরুলের জীবনের সেই অধরা নারীকে নিয়েই লিখেছেন যিনি নজরুলের নাম ছাড়াই স্বমহিমায় উজ্জ্বল। তাঁর বাবা আবদুল ওয়াহেদ খান টাঙ্গাইলের করটিয়ার জমিদারবাড়িতে চাকরি করতেন। তবে ধারণা করা যায়, মেয়েকে ঢাকায় রেখে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ানোর মতো আর্থিক সঙ্গতি তার ছিল না।

এছাড়া গণিত বিষয়ে পড়া নিয়ে দ্বিধান্বিত হলে তখন ড. নলিনীমোহন ভরসা দিয়ে বলেছিলেন―

‘আমি তো কোনো অসুবিধা দেখছি না। এ মেয়ে গণিতই পড়বে, আপনি নিশ্চিন্ত থাকুন, ওর দায়িত্ব আমি নিলাম।’

(অধ্যায়: ০১, পৃষ্ঠা: ১০)

পরে বাবার উৎসাহ, অনুপ্রেরণা, স্বল্প আয়ের মানুষ হয়েও মেয়ের স্বপ্নকে আগে বাড়তে দেবার আপ্রাণ চেষ্টা করেছিলেন তিনি। বিতর্ক প্রতিযোগিতার সেরা বক্তা হবার পুরস্কার নিয়ে যে মেয়েটা আর কোনও দিকে না তাকিয়ে, ফটোশ্যুট ভুলে গিয়ে একছুটে দর্শক সারিতে বসে থাকা বাবার দিকে ছুটে গিয়েছিল, সে মেয়েটাই যে ফজিলাতুন্নেসা তা চিনে নিতে একদম কষ্ট হয় না। কষ্ট হয় না তাঁর আরও বড় হবার স্বপ্নগুলোকে চিনে নিতে। ফজিলাতুন্নেসার জীবনের লক্ষ্য যেমন ছিল সুদূর; সেই লক্ষ্য পূরণে তাঁর সাহস ও একাগ্রতাও ছিল বিস্ময়কর।

সেই আমলে রক্ষণশীল সমাজে একজন মুসলিম মেয়ের পক্ষে ঢাকায় একা থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়া কতটা কঠিন ছিল, আজকের দিনে তা কল্পনা করাও কঠিন। কিন্তু ফজিলাতুন্নেসা বৃত্তি নিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শুধু যে পড়াশোনা করেছেন তা নয়, গণিতশাস্ত্রে প্রথম শ্রেণিতে প্রথম স্থান পেয়ে তাঁর মেধার প্রমাণও রেখেছেন।

১৯২৮ সালে মুসলিম সাহিত্য সমাজের দ্বিতীয় বার্ষিক সম্মেলনে অতিথি হিসেবে ঢাকা এসেছিলেন নজরুল। এই সংগঠনের সম্পাদক কাজী মোতাহার হোসেনের বর্ধমান হাউসের বাড়িতে আতিথ্য গ্রহণ করেছিলেন। মুসলিম সাহিত্য সম্মেলনে কবিকে দেখেই এক ধরনের মুগ্ধতা তৈরি হয়েছিল তাঁর প্রতি, কী করে একান্তে আলাপ করা যায় তারই সুযোগ খুঁজতে থাকেন ফজিলাতুন্নেসা মনে মনে। কুসংস্কারাচ্ছন্ন সেই সমাজে একটি মুসলিম রমণীকে মঞ্চে দৃঢ় কণ্ঠে প্রবন্ধ পাঠ করতে দেখে বুঝে গিয়েছিলেন, এ অন্য ধাঁচে গড়া; তাঁর প্রতি অনুরাগ জন্মেছিল নজরুলের মনেও!

কবির পুরোনো বন্ধু মোতাহার হোসেনের মাধ্যমেই শুরু হয়ে গেল যোগাযোগ। নজরুল হস্তরেখা দেখে ভাগ্য গণনা করতে পারেন শুনে নিজের ‘ভাগ্য ও ভবিষ্যৎ’ জানতে আগ্রহী হয়েছিলেন ফজিলাতুন্নেসা। সোৎসাহে বন্ধু মোতাহারকে নিয়ে তাঁর বাসায় গিয়ে উপস্থিত হয়েছিলেন নজরুল। লক্ষ্য সম্পর্কে যতই সচেতন হোন না কেন, হৃদয়ের ঝঙ্কারকে কি আর চেপে রাখা যায়! কবিও হাত দেখলেন সময় নিয়ে, তারপরে, কিছু না বলে শুধু খাতায় কী সব টুকে নিলেন। গল্প করার একটা উপলক্ষ্য তো পাওয়া গেল! বন্ধু মোতাহারকে ফেলে একাই যাতায়াত শুরু করে দিলেন ফজিলাতুন্নেসার বাসায়। পরিচয় ও হস্তরেখা বিশ্লেষণ পর্যন্ত ব্যাপারটা ছিল স্বাভাবিক। কিন্তু এর পরের ঘটনাটি ছিল রহস্যময়। বিশ্বজিৎ চৌধুরীর কবি ও রহস্যময়ী উপস্যাসটিতেও একটা রহস্য আছে। পড়তে গিয়ে নেশাগ্রস্তের মতো হয়ে সে রহস্যের বেড়াজালে আটকে পড়েছি। উপন্যাসটির পরতে পরতে ছড়িয়ে আছে এ রহস্য। উপন্যাসের কাঠামো, তথ্য ব্যবহারে পরিমিতি, সময়ের বর্ণনার ভেতর দিয়ে মনে হয়েছে ইতিহাসের ভেতর দিয়ে নিজেও ক্রমাগতভাবে হাঁটছি, তাদের পাশে দাঁড়িয়ে অবলোকন করছি অদৃশ্য কোনও চরিত্রের মতো। কিন্তু সেই রহস্যের কিনারা এখনও হয়নি। তবে কাজী মোতাহার হোসেনের স্মৃতিচারণায় এটুকু ইঙ্গিত পাওয়া যায়, এরপর কোনও এক রাতে ফজিলাতুন্নেসার দেওয়ান বাজারের বাড়িতে একা গিয়ে হাজির হয়েছিলেন নজরুল। এই বিদূষী নারীর কাছে প্রেম নিবেদন করেছিলেন। কিন্তু এতকাল যে তরুণীদের সঙ্গে সান্নিধ্যের সুযোগ তাঁর হয়েছিল, ফজিলাতুন্নেসা ছিলেন তার ব্যতিক্রম। অন্য ধাতুতে গড়া এই নারী তাৎক্ষণিক প্রত্যাখ্যান করেছিলেন তাঁকে। প্রত্যাখ্যানের ভাষা ও আচরণ ছিল রীতিমতো কঠোর। এই আঘাত মানসিকভাবে বিপর্যস্ত করেছিল কবিকে।

কলকাতা ফিরে গিয়ে সম্ভবত অনুতাপ প্রকাশ করে এবং তাঁকে ভুল না বোঝার আকুতি জানিয়ে ফজিলাতুন্নেসাকে চিঠি লিখেছিলেন কবি। এতে কবির প্রতি সমস্ত অভিযোগ ভুলেছিলেন ফজিলাতুন্নেসা এমন তো নয়ই, বরং উল্টো ব্যঙ্গ-বিদ্রুপে বিদ্ধ করেছিলেন তাঁকে। সেই চিঠিতে তিনি কী লিখেছিলেন, তা হুবহু জানার উপায় নেই; কারণ সেটি উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি। কিন্তু মোতাহারকে লেখা নজরুলের চিঠি পড়ে অনুমান করা যায়, সেই চিঠির ভাষা তাঁর জীবনের স্বস্তি কেড়ে নিয়েছিল :

‘আঘাত আর অপমান এ দুটোর প্রভেদ বুঝবার মতো মস্তিষ্ক পরিষ্কার হয়তো আছে আমার। আঘাত করবার একটা সীমা আছে, যেটাকে অতিক্রম করলে―আঘাত অসুন্দর হয়ে উঠে আর তখনই তার নাম হয় অবমাননা।’

(অধ্যায়: ১৪, পৃষ্ঠা: ১২৯ )

ফজিলাতুন্নেসা সংক্রান্ত নজরুলের মোট আটটি চিঠি উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে। তার মধ্যে কাজী মোতাহার হোসেনকে লেখা সাতটি এবং ফজিলাতুন্নেসাকে লেখা একটি চিঠিতে যে ব্যথিত-অপমানিত, কাতর ও গ্লানি-জর্জরিত নজরুলকে পাওয়া যায়, তা তুলনারহিত। একথা বলা বোধহয় অপ্রাসঙ্গিক হবে না, বন্ধুকে লেখা চিঠিগুলোর প্রাপক কাজী মোতাহার হোসেন হলেও তিনি চাইতেন―এই চিঠিগুলো ফজিলাতুন্নেসাও পড়ুক, এই ইচ্ছা লালন করতেন নজরুল তাঁর মনে। এক চিঠিতে লিখেছিলেন :

‘এ চিঠি শুধু তোমার এবং আরেকজনের। একে ংধপৎবফ মনে করো। আরেকজনকে দিও এ চিঠিটা দুদিনের জন্য।’

(অধ্যায়: ১১, পৃষ্ঠা: ৯৬)

ফলে মনে হওয়া স্বাভাবিক যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন ছাত্র সৈয়দ আলী আশরাফ নজরুলের যে আটটি চিঠি উদ্ধার করেছিলেন ও পরে সংকলিত করেছেন, তার সব ক’টি চিঠিই ছিল ফজিলাতুন্নেসার জন্য কবির হাহাকার।

প্রথমবার ফজিলাতুন্নেসাকে যে চিঠি তিনি লিখেছিলেন, তার রূঢ় উত্তরটা সম্ভবত পরে আর কখনও লিখবার সাহস কেড়ে নিয়েছিল তাঁর। তবু দীর্ঘদিন বন্ধু মোতাহারের কোনও খোঁজ-খবর না পেয়ে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছেন, এই উছিলায় আরেকটি চিঠি তিনি লিখেছিলেন। সেই চিঠিতে দেখা যায়, যথেষ্ট কুণ্ঠা ও সমীহের সঙ্গে ফজিলাতুন্নেসাকে ‘আপনি’ সম্বোধন করে কবি লিখেছেন,

 ‘আপনি যদি দয়া করিয়া―জানা থাকিলে আজই দু’লাইন লিখিয়া তাঁহার খবর জানান, তাহা হইলে সবিশেষ কৃতজ্ঞ থাকিব।’

(অধ্যায়: ১৫, পৃষ্ঠা: ১৩৮)

কিন্তু ‘দয়া করিয়া’ এ চিঠির উত্তর ফজিলাতুন্নেসা কখনও দিয়েছিলেন কিনা, এমন কোনও তথ্যও পাওয়া যায়নি।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণিত বিভাগের প্রধান ড. নলিনীমোহন বসুর প্রিয় ছাত্রী ছিলেন এই ফজিলাতুন্নেসা। তিনি অধ্যবসায়ী এই ছাত্রীকে নানাভাবে বুদ্ধি-পরামর্শ দিয়ে সাহায্য করতেন, যাতে বয়সসুলভ চঞ্চলতা তাঁকে বিপথে নিতে না পারে। তাইতো নজরুল ফজিলতের হাত দেখেছেন একথা শুনেই তিনি তার ছাত্রীকে সাবধান করার উদ্দেশে বলেছেন―

 ‘দেখো, অঙ্কে জাদু নেই, কবিতায় আছে। কবি ও কবিতার এই মায়াজাল কাটিয়ে ওঠা বড় কঠিন।’

(অধ্যায়: ০১, পৃষ্ঠা: ১২ )

ঠিক এই কথা বলেই রহস্যময়ীকে সতর্ক করে দেন শিক্ষক ড. নলিনীমোহন বসু। বলা বাহুল্য, ছাত্রীকে কাক্সিক্ষত লক্ষ্যে পৌঁছানোই ছিল শিক্ষকের একমাত্র ইচ্ছা।

তবে এ তো আর অঙ্ক নয়, যে সুচিন্তিত মস্তিষ্কের দ্বারা সমাধান হবে। ভালোবাসা সকল হিসাব-নিকাশের ঊর্ধ্বে, অদৃশ্য শক্তি-বলে কোথায় নিয়ে ফেলবে, কে বলতে পারে! অঙ্কের শিক্ষক ফজিলতকে হয়তো বেধে রাখতে পারেন কিন্তু বাঁধনহারা নজরুলকে কি আর আটকে রাখা যায় ? ভালোবাসার স্বরূপ উপলব্ধি করতে কবি চলে এলেন ফজিলতের কাছে, গভীর রাতে, একা, বুঝতে চাইলেন তার মনোবাঞ্ছা। আর এখানেই ধাক্কা খেয়ে বেদনার অতল সাগরে যেন ডুবে গেলেন তিনি! বিদায় নিলেন ফজিলতের কাছ থেকে। রেখে গেলেন বেদনা-ভেজা ছোট্ট কবিতা :

  ‘সুন্দর বেশে মৃত্যু আমার আসিলে কি এত দিনে ?

বাজালে দুপুরে বিদায় পূরবী আমার জীবন বীণে।

ভয় নাই রাণী রেখে গেনু শুধু চোখের জলের লেখা

রাতের এ লেখা শুকাবে প্রভাতে চলে যাই আমি একা।’

(অধ্যায়: ০৫, পৃষ্ঠা: ৫৫)

ফজিলাতুন্নেসাও ড. বসুকে ‘দেবতার’ আসনে বসিয়েছিলেন। আলাপ-পরিচয়ের প্রথম পর্বেই এই শিক্ষকের প্রতি তাঁর অকুণ্ঠ শ্রদ্ধার কথা হয়তো নজরুলকে জানিয়েছিলেন ফজিলাতুন্নেসা। এ ব্যাপারটি একেবারেই সহ্য করতে পারেননি নজরুল। তাঁর প্রেমাকাক্সক্ষা ও মিলনের ক্ষেত্রে এই লোকটিকেই বড় একটি বাধা বলে মনে হয়েছে তাঁর। মোতাহারকে লেখা চিঠিতে তাই এই শিক্ষকের প্রতি বিষোদগার করতে ছাড়েননি নজরুল :

‘কোনো নারী―সুন্দরের উপাসিকা নারী―কোনো অঙ্কশাস্ত্রীর কবলে পড়েছে, এ আমি সইতে পারিনে। নারী হবে সুন্দরের অঙ্ক-লক্ষ্মী, সে অঙ্কশাস্ত্রের ভাড়ার রক্ষী হবে কেন ?… আর যে-কেউ তাকে দেবতা বলুক, আমি তাকে বলি প্রাণহীন যক্ষ। অকারণে ভূতের মতো রত্ন মাণিক আগলে ব’সে আছে। সে রত্নকেও গলায় নিতে পারে না―অন্যকেও নিতে দেবে না।’

(অধ্যায়: ১১, পৃষ্ঠা: ৯৪ ও ৯৫)

ঈর্ষা তাঁর এমন পর্যায়ে পৌঁছেছিল যে এ কথাও লিখেছেন :

‘অঙ্কের পাষাণ-টবে ঘিরে রেখে তিলোত্তমাকে তিলে তিলে মারাই যদি বড় দাসত্ব হয়, তবে মাথায় থাক আমার সে দেবত্ব! আমি ভালবাসলে তাকে আমার প্রাণ হ’তে মুক্তি দিই। আমি কবি, আমি জানি কী করে সুন্দরের বুকে ফুল ফোটাতে হয়।’

 (অধ্যায়: ১১, পৃষ্ঠা: ৯৫)

প্রত্যাখ্যানের বেদনা থেকে এ রকম শিশুর মতো অযৌক্তিক ও হাস্যকর কথাও লিখে ফেলতে পেরেছিলেন নজরুল,

 ‘তুমি হয়তো পরজন্ম মান না, তুমি সত্যান্বেষী গণিতজ্ঞ। কিন্তু আমি মানি―আমি কবি।’

(অধ্যায়: ০৯, পৃষ্ঠা: ৮১)

সেদিনের সেই মেয়েটা হয়তো অঙ্কবিদ্বেষী নজরুলকে বুঝতে পারত না, কিন্তু এই পরিণত বয়সে এসে অঙ্কের খেলায় বারবার হেরে যাওয়া কবির গণিত বিদ্বেষটুকু বুঝতে অসুবিধে হয় না। সফল পুরুষ, গৌরবান্বিত পুরুষ বুঝতেই পারে না কোনও নারী তাকে প্রত্যাখ্যান করতে পারে। যদিও বা পারে সেটা হয়তো ধর্মের বা সতীত্বের দোহাই দিয়ে, অঙ্কের দোহাই দিয়ে নিশ্চয়ই নয়।

 তারপরেও কবি এড়াতে পারেন না সেই বিদুষীর আকর্ষণ। কবি এ প্রত্যাখ্যানের বেদনা সহজে ভুলতে পারেন না। কিছুকাল এই বেদনা তাঁকে জর্জরিত করেছিল। উচ্চশিক্ষার জন্য ফজিলাতুন্নেসা ইংল্যান্ড চলে গেলে ধীরে ধীরে এই ঘোর থেকে বেরিয়ে আসেন কবি। এ রকম অপমানিত হয়েও কি ফজিলাতুন্নেসাকে ভুলতে পেরেছিলেন কবি ? পারেননি। নিজের ভুলকে নানাভাবে ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করেছেন বন্ধু মোতাহারকে লেখা চিঠিতে।

আঘাতে-অপমানে দীর্ণ দিনগুলো বিফলে যায়নি। আর যাইহোক বাংলা সাহিত্য পেয়েছে কিছু অবিস্মরণীয় গান ও কবিতা। ফজিলতকে ছেড়ে দিয়েছেন তার নিজের মতো; সাহিত্য পেয়েছে তাঁর সেরা প্রেমের কবিতা ‘রহস্যময়ী’, ফজিলতের বিদায় উপলক্ষ্যে রচিত ‘বর্ষা বিদায়’ সহ অসংখ্য কবিতা এবং গান। আর নিয়তির কাছে আপন মিলনকে ত্যাগ করে সৃষ্টি করেছেন অকৃত্রিম ভালোবাসার এক সুমহান দৃষ্টান্ত!

কিন্তু ফজিলাতুন্নেসা, যিনি নিজেই নজরুলের প্রতি মুগ্ধতায় আচ্ছন্ন, কেনই বা তিনি কবিকে ওভাবে অগ্রাহ্য করলেন ? তা কি কেবলই কবি বিবাহিত বলে ? নাকি, তিনি কবির ভালোবাসার প্রতি ছিলেন সন্দিহান ? তবে কি কবির ভালোবাসা একপাক্ষিক ছিল ? বইটি শেষ অবধি পড়লে এর উত্তর নিয়ে কোনও সংশয় থাকার কথা নয়। নজরুল তার সঞ্চিতা কাব্যগ্রন্থটি ফজিলাতুন্নেসাকে উৎসর্গ করতে চাইলে তীব্র শ্লেষের সঙ্গে তা প্রত্যাখ্যান করেছিলেন।

মনে মনে বলেছিলেন―

 ‘সে কিশোরী দোলন নয় যে বইয়ের মলাটে মুদ্রিত হরফে দোলন-চাঁপা দেখেই সমাজ-সংসার ভুলে যাবে!’

(অধ্যায়: ১৫, পৃষ্ঠা: ১৪০)

শেষ পর্যন্ত রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে বইটি উৎসর্গ করেছিলেন নজরুল।

তবে কবি যখন জানতে চাইলেন বিদেশ-বিভুঁইয়ে গিয়ে তার কথা মনে রইবে কিনা ? রহস্যময়ীর উত্তর ছিল,

‘একটা দীর্ঘশ্বাস বোধহয় আড়াল করল ফজিলত, কবিকে বলা যায়, কবিতা তো ভোলা যায় না। আপনার দেওয়া গানের খাতাটা সঙ্গে রইল আমার।’

(অধ্যায়: ২২, পৃষ্ঠা: ১৮২)

সবশেষ, ট্রেন ছাড়ার মুহূর্তে কবিকে একনজর দেখার যে সুতীব্র আকাক্সক্ষা, ভালোবাসা ছাড়া আর কোনও শব্দ দিয়ে কি তা ব্যাখ্যা করা সম্ভব! সত্যিই কি কবিকে তিনি পুরোপুরি এড়াতে পেরেছিলেন ? সেই প্রশ্নের ধাঁধা পাঠশেষে পাঠককেও আচ্ছন্ন করে।

আসলে, ফজিলত জানতেন, তার দিকে তাকিয়ে আছে গোটা মুসলিম বাংলা। যে সংগ্রামীজীবন তিনি কাটিয়ে এসেছেন তারপর এখানে থেমে গেলে তা হবে অত্যন্ত বেমানান, সমাজে নানারকম কটুক্তি হবে, আর ধর্মান্ধ মোল্লাদের জন্য তা হবে বিজয়স্বরূপ যার গ্লানি বয়ে বেড়াতে হবে আগামী দিনের সকল মুসলিম নারীকে। অন্যদিকে, তাঁর সাফল্য দেখেই তো এগিয়ে আসবে পরবর্তী প্রজন্মের মুসলিম তরুণীরা।

কুসংস্কারাচ্ছন্ন সমাজ কীভাবে নারীদের বঞ্চিত করে রাখত সেদিকটিও লেখক তুলে ধরেছেন তাঁর সুদক্ষ লেখনীর মাধ্যমে। অসংখ্য মেধাবী ছাত্রকে যখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় স্কলারশিপ দিয়ে বিদেশে পাঠাচ্ছে, তখন ফার্স্ট ক্লাস ফার্স্ট রেজাল্টের পরও ফজিলতকে স্কলারশিপ দেওয়া হচ্ছিল না সে নারী বলে। তবে নলিনীমোহন বসু জানতেন, যে বিশেষ কারণটি এর পিছনে লুকিয়ে ছিল এবং যে জন্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ফজিলাতুন্নেসাকে স্কলারশিপ দিতে কুণ্ঠিত হচ্ছে তা হলো সে মুসলিম! পাছে মোল্লারা ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের বিরুদ্ধে অধর্ম করার অভিযোগ আনে! তবে, অবশেষে এই সংগ্রামী নারী সফল হয়েছেন, পেয়েছেন বিলাতে যাওয়ার সুযোগ, নিজেকে নিয়ে গিয়েছেন অনন্য উচ্চতায়। রহস্যময়ী ফজিলাতুন্নেসা তাঁর দ্যুতিময় ব্যক্তিত্ব এক প্রতিভাবান কবির প্রেম স্বীকার করেছে, কিন্তু সেই প্রেম যে দিনশেষে অলীক বস্তু সেই বাস্তব বোধটুকু ধরে রেখেছে, নিজেকে যে লক্ষ্যভ্রষ্ট হতে দেয়নি।

এই উপন্যাসের বাড়তি পাওয়া হলো―দুর্লভ কিছু চিঠি, শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের সঙ্গে কাজী মোতাহার হোসেনের কথোপকথন এবং তুখোড় মনে দাগ কাটার মতো কিছু বুনন।

এতদিনে পাঠকের মনের দেয়ালেও স্পষ্ট হয় লক্ষ্যে স্থির, প্রত্যয়ী সেই নারী। এছাড়াও পুরনো ঢাকার চালচিত্র, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সায়েন্স ভবন, শিক্ষকদের বাসভবন, ছাত্রী এবং ছাত্রদের সুযোগের নানা বৈষম্য, কমনরুমের ব্যবস্থাপনার ফারাক কিংবা ছোট ছোট দৃশ্যে যেমন ছাত্রীদের শাড়ি পরার ধরন, গণিতের অধ্যক্ষের উঁচু থেকে ঠোঁট না ছুঁয়ে জলপানের বর্ণনা কিংবা কলকাতায় সাওগাত পত্রিকার সম্পাদক নাসিরুদ্দিনের স্ত্রীর খাবার পরিবেশন, মোতাহার হোসেনের বাড়ির সকালের খাবার কিংবা ছোটবোন শফিকুন্নেসার রান্নার আয়োজনে অথবা খালাতো ভাই আসাদের বাড়ির দাওয়াত…এইসব দৃশ্য সাড়ম্বরে নয় মৃদুভাবে এঁকেছেন লেখক অথচ চরিত্রদের সামাজিক অবস্থান কিংবা রুচির ফারাক, ধর্ম-পরিচয় সবই অনায়াসে পাঠকের দৃষ্টিগোচর হয়।

বাংলা সাহিত্যানুরাগী হিসেবে নজরুল-ফজিলাতুন্নেসার প্রেম সম্পর্কের কথা পড়েছিলাম এবং জেনেছিলাম কিন্তু কোথায় যেন একটা অসম্পূর্ণতা ছিল। বিশ্বজিৎ চৌধরীর শ্রম ও গবেষণালদ্ধ উপন্যাসের মাধ্যমে অনুন্মোচিত এমন সব ঘটনা, জীবন পর্ব, কবির বিরহ গাথা, আর কবির জন্য ফজিলাতুন্নেসার ইস্পাত হৃদয়ে আজীবন প্রেমের বারি বিন্দু জমা রাখার বিস্ময়কর খবর জানতে পেরেছি, যে খবর সাধারণ পাঠক কেন, কবির অনেক কাছের বন্ধু, সুহৃদ মোতাহারও জানতে পারেননি তাঁর জীবন সায়াহ্নে এসেও।

কবি কাজী নজরুল ইসলাম আর ফজিলাতুন্নেসার মধ্যে ভালোবাসার সম্পর্কটিই মূল বিষয় হলেও, সমসাময়িক নানা ঘটনাবলীও স্থান পেয়েছে এ উপন্যাসে। চারিত্রিক দৃঢ়তা, সাহসিকতা, অদম্য ইচ্ছাশক্তি আর সংগ্রামের জন্য ফজিলতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল না হয়ে পারা যায় না । আবার এই ‘রহস্যময়ী’ তাঁর রহস্যের মাধ্যমে দুর্বোধ্য ‘নারী’ চরিত্রকেও যেন তুলে ধরেছে সুনিপুণভাবে। তাছাড়া এখানে স্ত্রী-সংসার বিমুখ ছন্নছাড়া এক কবিকেও আবিষ্কার করতে পারা যায়।

ইতিহাসনির্ভর উপন্যাস লেখা সহজ নয়। তথ্য-তত্ত্বের উপাত্ত ঠিক রেখে অতীতের সেই নির্দিষ্ট সময়টিতে পাঠককে সম্পৃক্ত করা তো বটেই ঘটনা পরম্পরার বিস্তারও করতে হয় বিশ্বস্ততায়। সেকালের চেনা চরিত্রদের একালে বসে জীবনদান করার জন্যে কলমটি দক্ষ হাতে না পড়লে শব্দরা জীয়নকাঠি হয় না। বিশ্বজিৎ চৌধুরী তাঁর কবি ও রহস্যময়ী উপন্যাসে সেই দুরূহ কাজটি সফলভাবেই করেছেন।

আধুনিক ঔপন্যাসিককে একাধিক প্লটের উদ্ভাবক বা কিছুসংখ্যক চরিত্রের নির্মাতা হলেই চলে না, ইতিহাসবেত্তাবা সমাজতাত্ত্বিকের ভূমিকাও গ্রহণ করতে হয় কখনও কখনও। ইতিহাস-আশ্রিত, সমাজনিবিষ্ট দৃষ্টিভঙ্গির সঙ্গে এসে যুক্ত হয় ঔপন্যাসিকের গঠনশৈলী ও ভাষাগত স্বাতন্ত্র্য। উপন্যাসের কিছু জায়গাই টাঙ্গাইলের আঞ্চলিক ভাষা ব্যবহৃত হয়েছে।

তাঁর দৃষ্টিভঙ্গির গভীরে ইতিহাস বা সমাজবোধ না থাকলে অতীতের কোনও পটভূমির আশ্রয়ে গড়ে ওঠা কাহিনির মধ্যে বাস্তবতা বা প্রাণ সঞ্চারিত হয় না। সেখানে একটা বর্ণনা বা কিছু তথ্যের সমাবেশ ছাড়া আর কিছুই মুখ্য হয়ে ওঠে না। এজন্যই বলা যায় আধুনিক ঔপন্যাসিকের জীবন মূলীভূত যে শক্তি, তার উৎস নিহিত থাকে এই ইতিহাস বা সমাজ দর্শনের গভীরে।

নজরুল-নার্গিস, নজরুল-ফজিলাতুন্নেসা সম্পর্ক ইতিহাসের রহস্যময় অথচ কৌতূহলোদ্দীপক এক অধ্যায়। ইতিহাসের সেই ঘুমন্ত অধ্যায়কে কাহিনিভাষ্য দিয়ে কথাসাহিত্যিক বিশ্বজিৎ চৌধুরী লিখেছেন নার্গিস এবং কবি ও রহস্যময়ী উপন্যাস দুটি। নিষ্ঠাবান গবেষক ও ঐতিহাসিকের সততা দিয়ে লেখক কাহিনির চিত্রময় রূপ এঁকেছেন। এভাবে সন-তারিখ মিলিয়ে, তথ্যকে অবিকৃত রেখে ঘটনার বিন্যাস ও বিশ্বাসযোগ্য বাস্তবতা তৈরি করা সত্যি দুরূহ কাজ। বিশ্বজিৎ চৌধুরী তা চমৎকারভাবে করতে পেরেছেন। তথ্য যেখানে শেষ, সেখানেই লেখক কল্পনার বিস্তৃতি ঘটিয়েছেন।

বিশ্বজিৎ চৌধুরীর নার্গিস এবং কবি ও রহস্যময়ী উপন্যাস দুটি নজরুলের জীবনী সম্পৃক্ত হলেও নার্গিস উপন্যাসটি অধিক সমাদৃত এবং পাঠকপ্রিয়তা পেয়েছে। এর কারণ হতে পারে নার্গিস অতি সাধারণ একটি পরিবারের মেয়ে। যার পরিচয় নজরুলের মাধ্যমে উঠে আসে। আর ফজিলাতুন্নেসা নজরুল ছাড়াই স্বমহিমায় উদ্ভাসিত। তাই এক অজ পাড়াগাঁয়ের সহজ-সরল সাধারণ মেয়েটির আবেগ উত্থাপন করতে লেখক যেমন আবেগ তাড়িত হয়েছিলেন, পাঠকের হৃদয়েও সেই আবেগের বার্তা স্পর্শ করে।

বিশ্বজিৎ চৌধুরীর নার্গিস, কবি ও রহস্যময়ী উপন্যাস আমাদের বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলামের জীবনের এক মর্মন্তুদ অধ্যায়ের প্রাণস্পন্দন পাওয়া যায়। পারিবারিক জীবনের অনেক প্রসঙ্গ এখানে স্থান করে নিয়েছে। জাতীয় ইতিহাসের একটা মহৎ অধ্যায়কে উপন্যাসে প্রতিফলিত করতে গেলে সেখানে শুধু একজন শিল্পীর পর্যায়ে থাকেন না, হয়ে ওঠেন সমাজতাত্ত্বিক, রাজনীতিজ্ঞ ও ইতিহাসবিদ।

ফুটো :

‘সময়ই যেকোনো উপন্যাসের কেন্দ্রীয় চরিত্র; সময়ের সমস্ত বিধি-বিধান এবং মাত্রার বিস্তার দান ও উন্মোচন করা হলো এই সাহিত্য-আঙ্গিকের কাজ’―উপন্যাস সম্পর্কে সমালোচকের এই উক্তি সব উপন্যাসের বেলায় কাজে লাগে, তা নয়। মজার ব্যাপার হলো উপন্যাস এমন এক মুক্ত-আঙ্গিকে পরিণত হয়েছে যে, কোনও শর্ত দিয়ে একে সুনির্দিষ্ট এবং একটিমাত্র সংজ্ঞায় সংজ্ঞায়িত করা যায় না। বিশ্বসাহিত্যের সার্থক দশটি উপন্যাস পাশাপাশি রাখলে, একটিকে উপন্যাস বললে অন্যটিকে খারিজ করে দিতে হয়। তারপরও বলতে হয় যে, তলস্তয়-দস্তয়েভস্কি উপন্যাসের দুটো ধারার জন্ম দিয়েছেন এবং উপন্যাসের মূল স্রোতে এই দুই ধারারই প্রাধান্য। একটি হলো সমাজ ইতিহাসের মধ্যে ব্যক্তিকে দেখানো, মানে মানব-পরিস্থিতিকে হাজির করা ঠিক উল্টো পরিস্থিতির ভিতরে ইতিহাসকে হাজির করা; অন্যটিতে ঠিক উলটো, ব্যক্তি তথা মানব-পরিস্থিতির ভেতর দিয়ে সমাজ-ইতিহাসকে হাজির করা। দুটি ক্ষেত্রেই ‘ব্যক্তি’ হলো উপন্যাসে গরিষ্ঠ সাধারণ গুণনির্ণায়ক। দেবেশ রায় বলেছেন :

‘উপন্যাসের অন্বিষ্ট সমাজ নয়, সময় নয়, ইতিহাসও নয়। উপন্যাসের অন্বিষ্ট ব্যক্তিমানুষ। এই সমাজ, সময় ও ইতিহাস ব্যক্তিমানুষের চরিত্র ও মানুষের সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক জটিল করে দেয়। ফলে মানুষের সংজ্ঞা বরাবরই নতুন করে খুঁজতে হয়। তাই মানুষকে খুঁজতে গিয়ে এই সমাজ, সময় আর ইতিহাসকেও খুঁজতে হয়। সমাজ, সময় আর ইতিহাসধৃত ব্যক্তিমানুষ হচ্ছে উপন্যাসের অন্বিষ্ট।’

উপমহাদেশের এক ক্ষতের নাম দেশভাগ। দ্বিজাতিতত্ত্বের ভিত্তিতে হিন্দু-মুসলিম সম্প্রদায়ের জন্য দুটো আলাদা রাষ্ট্র করতে গিয়ে সাম্প্রদায়িক হানাহানিতে অনেককে প্রাণ দিতে হয়েছিল। দেশভাগের সবচেয়ে বেশি দাম দিতে হয়েছিল বাংলা ও পাঞ্জাবকে। কারণ এই প্রদেশ দুটিও হিন্দু-মুসলিমের ভিত্তিতে বিভক্ত ও বিচ্ছিন্ন হয়ে সংঘটিত হয়েছিল ভয়াবহ দাঙ্গা। বাংলা ও পাঞ্জাবে লক্ষ মানুষ প্রাণ হারিয়েছিল। বাস্তুহারা হয়েছিল কোটি মানুষ। ব্রিটিশরা যাওয়ার সময়ে এই উপমহাদেশের মানুষকে ফেলে গিয়েছিল এক অমানবিক পরিস্থিতিতে। সে এক হৃদয়বিদারক ঘটনা, নির্মম মানবিক বিপর্যয়ের ইতিহাস।

ব্রিটিশরা ভারত ত্যাগ করার সঙ্গে সঙ্গে আরেকটি মানবিক বিপর্যয় ঘটেছিল। ইংরেজরা চলে যাওয়ার সময় প্রায় উচ্ছিষ্টের মতো এদেশে ফেলে গিয়েছিল অ্যাংলো ইন্ডিয়ানদের। যারা নিজ দেহে বহন করত একই সঙ্গে ভারতীয় ও পশ্চিমা রক্ত প্রবাহ। এরা ধর্মে ছিল খ্রিস্টান, পোশাক-পরিচ্ছদ থেকে শুরু করে সবকিছুতেই ছিল পশ্চিমাদের প্রভাব। কথা বলত ইংরেজিতে। শোণিতে উপমহাদেশের হলেও এরা নিজেদের ব্রিটিশ প্রভুদের মতোই ভাবত। ফলে সাধারণ ভারতীয় এমনকি ধর্মান্তরিত এদেশীয় খ্রিস্টানদের থেকেও তারা নিজেদের আলাদা ভাবত। ব্রিটিশরা এদের ফেলে যাওয়ায় ’৪৭-এর পর এদের জীবনে নেমে আসে চরম দুর্যোগ। ভারত জুড়ে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক এই জনগোষ্ঠীর দুঃখগাথা, জীবন ও অসহায়ত্ব নিয়ে ভারতে লেখালেখি হলেও বাংলাদেশে হয়েছে অতি সামান্য। কারণ উপমহাদেশের এই প্রান্তিক অঞ্চলে অ্যাংলোদের বেশি বসবাসও ছিল না। তবে চট্টগ্রাম নগরীর আলকরণ, পাথরঘাটা এলাকায় প্রচুর অ্যাংলো ইন্ডিয়ান, যারা মূলত পর্তুগিজদের উত্তরাধিকার, বসবাস করত। পর্তুগিজ নাবিক ভাস্কো-দা-গামা এদেশে আসার জলপথ আবিষ্কার করেছিলেন। সেই সুবাদে পর্তুগিজরা এদেশে এসেছিল ইংরেজদেরও আগে।

স্থানীয় লোকেরা তাদের ফিরিঙ্গি নামে ডাকত (এখনও ডাকে)। চট্টগ্রাম শহরের ফিরিঙ্গিবাজার নামকরণের ইঙ্গিতও উপন্যাসটি পাঠ করতে করতে মনে আসাটা অসম্ভব নয়। এছাড়া পাথরঘাটা গির্জা তৈরি করেছিল পর্তুগিজরা। ‘পর্তুগিজ জলদস্যু’ ইতিহাসে তাদের এভাবেই চিনেছি আমরা। পরির পাহাড়, আজ যেটি কোর্টবিল্ডিং সেখানে একসময় পর্তুগিজ জলদস্যুদের আস্তানা ছিল বলে ইতিহাসে পাই।

ইংরেজ শাসনামলের শুরুর দিকে পর্তুগিজরা চলে গেলেও থেকে যায় ধর্মান্তরিত বাঙালি খ্রিস্টানরা। এদের জীবনযাপন হয়ে ওঠে ইংরেজদের অনুকরণে প্রভাবিত। তারা না হতে পারে পুরোপুরি ইংরেজ, না হতে পারে পুরোপুরি বাঙালি, হয়ে ওঠে অ্যাংলো ইন্ডিয়ান। তারা ইংরেজদের মতো নিজেদের বাড়িতে মদ রাখে। এসব পরিবারের মেয়েরা ইংরেজ ম্যামদের মতো হাটু পর্যন্ত স্কার্ট পরে। অনেক পর্তুগিজ পুরুষ ভালোবেসে ঘর বাঁধতে শুরু করে বাঙালি নারীদের নিয়ে। দুয়ে মিলে শুরু হলো নতুন জাত। তাদেরই উত্তরাধিকার এই ফিরিঙ্গি বা অ্যাংলো ইন্ডিয়ানরা। এদের জীবন নিয়ে বাংলা ভাষায় এণ্টনি ফিরিঙ্গি নামক চলচ্চিত্র নির্মিত হয়েছে অনেক আগে।

কথাসাহিত্যিক বিশ্বজিৎ চৌধুরীর ফুটো নামক এ উপন্যাসটি গড়ে উঠেছে একটি অ্যাংলো ইন্ডিয়ান তরুণীর সঙ্গে বাঙালি মুসলমান তরুণের সম্পর্ককে কেন্দ্র করে। আর তাতে উঠে এসেছে ফিরিঙ্গিদের জীবন, সংস্কৃতি, অবস্থান ও নানা প্রসঙ্গ।

ফুটো উপন্যাসের শুরুতে আমরা দেখতে পাই একাকী ঘরে একজনকে আটকে রাখা হয়েছে। যেখান থেকে বাইরের দুনিয়ার আলো-বাতাস প্রবেশ করে না। হঠাৎ সেই দেয়ালেই দেখা যায় একটি ফুটো, যেখান থেকে নতুন সূর্যের আলো প্রবেশ করে। পরে আমরা বুঝতে পারি, এটি আসলে একটি টর্চার সেল। এখানেই বন্দি আছে মোমিনুল।

উপন্যাসে নিয়তি চালিত একটি চরিত্র হলো এই মোমিনুল। চার-পাঁচ বছর আগে এরকম একটি ফুটো, অন্য জায়গায় অন্য একটি ঘরের দেয়ালে একটি ফুটো তার জীবনটা পাল্টে দিয়েছিল। সেই ফুটো অন্য জগৎ দেখিয়েছিল তাকে। রোমাঞ্চকর নানা অভিজ্ঞতার মুখোমুখি করেছিল। কিন্তু তার এখনকার দুরবস্থার জন্য দেয়ালের সেই ছোট ফোকরটিকে বড় একটি কারণ বলে মনে হচ্ছে এতদিন পর।

সে যাইহোক, মোমিনুলের সঙ্গে সেই টর্চার সেলে বসেই আমরা চলে আসি তার বাসায়। যার বসবাসের ঘরের দেয়ালে রয়েছে একটি ফুটো―সেটিও যেন নিয়তির হাতেই গড়া! উপন্যাসে এই ফুটো-ই যত অঘটন-ঘটন পটিয়সী! তার সঙ্গে সঙ্গে সেই ফুটোতে চোখ রাখি আমরাও। দেখি দেয়ালের ওপাশে সুন্দরী তরুণী মেরি, যে কিনা মিনি স্কার্ট পরে। রোজ সন্ধ্যায় অফিস শেষে বাসায় ফিরে মেরি একেকদিন তার টপস বা শার্ট খোলে। নিচে থাকে কোনও দিন কালো অন্তর্বাস, কোনও দিন আবার গোলাপি। এভাবে মোমিনুলের সাথে আমাদের অভ্যাস হয়ে যায় রোজ সন্ধ্যায় লুকিয়ে লুকিয়ে সুন্দরী মেরির শরীর দেখা। এরপর একদিন আবিষ্কৃত হয় মোমিনুল এবং তার পাশের বাসার মেরি একই অফিসে কাজ করে।

উপন্যাসে ফিরিঙ্গি পরিবারের তরুণী ম্যারিয়েন, বাঙালি মুসলিম পরিবারের মোমিনুল, ফিরিঙ্গি পরিবারেরই সন্তান এলেন রিবেরু―এরাই প্রধানতম চরিত্র। তবে উপন্যাসের মূল পাত্র-পাত্রী মেরি ও মোমিনুল হলেও সে মেরির প্রেমিক নয়। মেরির প্রেম এলেন রিবেরুর সঙ্গে। অনেকটা ত্রিভুজ প্রেমের উপন্যাস হলেও উপন্যাসে প্রেম ছাড়াও স্থানীয় জনগণের জীবন, সংস্কৃতি, টানাপোড়েন, সামাজিক বন্ধন এবং অবক্ষয় অনেক কিছুই উঠে এসেছে।

উপন্যাসের অন্যতম চরিত্রের নাম মোমিনুল। পুরোনো শহরের অধিকাংশ তরুণের মতো তার বেড়ে ওঠা। কৈশোরে দুরন্তপনা, তারুণ্যে ও যৌবনে উন্মাতাল আচরণ আর একটু বয়স হওয়ার পর শান্ত ও থিতু হওয়ার প্রবণতা সবকিছুই আছে তার মধ্যে। মেরি মেয়েটি খ্রিস্টান। চলাফেরায় মুক্ত ও বাধাহীন।

মোমিনুলের জীবন পাল্টে যায় এই মেরির সান্নিধ্যে এসে। মোমিনুল মেরির কলিগ এবং প্রতিবেশি ভাড়াটিয়া। মেরি প্রেম করে এলেনের সঙ্গে। যেই প্রেম কামনা-বাসনাহীন প্রেম নয়। প্রাপ্ত বয়স্ক মানব-মানবীর প্রেম। যার অসহায় ও নিরুপায় সাক্ষী হতে হয় মোমিনুলকে। মেরি এবং এলেন যখন পাশের ঘরে প্রেম করে তখন সেখান থেকে চুম্বনের মিহি ও গাঢ় শব্দ, গোপন ফিসফিস, মেরির উচ্ছ্বাসের শব্দ প্রেমিক মোমিনুলের কানে প্রবেশ করে। মোমিনুল সরে থাকতে চাইলেও পারেনি। দুটি মানুষের এক ও একাকার হয়ে যাওয়ার তীব্র আকাক্সক্ষার সময়গুলোতে তৃতীয় ব্যক্তিটির উপস্থিতি কতটা অবাঞ্ছিত, সেটুকু বিবেচনাবোধ তার ছিল। কিন্তু নদী-সমুদ্রের উচ্ছ্বসিত মোহনায় অস্পষ্ট বিভাজনরেখাটির মতো উপস্থিত থাকতে হয়েছে তাকে। এছাড়া নিষিদ্ধ জিনিস মানুষকে বরাবরই আকৃষ্ট করে একথা কে না জানে।

তার সঙ্গে মেরির সম্পর্ক কিন্তু ভালোবাসা বা প্রণয়ের নয়। মেরির কাছে এ সম্পর্ক নিখাঁদ বন্ধুত্বের হলেও, মোমিনুলের দিক থেকে হয়তো কিছুটা বেশিই ছিল। একটি বড় কোম্পানিতে এমডির পিএস হিসেবে চাকরি করে মেরি। একসময় মেরি খুন হয় আর সে খুনের মামলায় জড়িয়ে যায় মোমিনুল। উপন্যাসটি শেষ হয় খুনের রহস্যটি পুরোপুরি উন্মোচন না করেই। সিদ্ধান্ত নেওয়ার ভারটি লেখক পাঠকের ওপরই ছেড়ে দিয়েছেন। তবে পাঠকের একটুও বুঝতে অসুবিধা হয় না যে, মেরির খুনি মোমিনুল বা এলেন নয়, কোম্পানির এমডি। কিন্তু মিথ্যে খুনের মামলায় ফেঁসে যাওয়া মোমিনুল নিজেকে বাঁচাতে নিরুপায় হয়ে ফাঁসিয়ে দেয় আরেক নিরপরাধী এলেনকে। যার মধ্য দিয়ে উপন্যাসে তুলে ধরা হয়েছে ক্ষমতাশালীদের নিজেদের অপকর্ম আড়াল করার কৌশল।

কথাসাহিত্যিক বিশ্বজিৎ চৌধুরী তাঁর উপন্যাসে মোমিনুল, মেরি, এলেন―এই তিনজনের চরিত্র দিয়ে সমাজের তিন শ্রেণির মানুষের উপস্থিতি যেমন তুলে ধরেছেন। তেমনি উপন্যাস পাঠের সাথে সাথে পাঠকদেরকেও এসব চরিত্রের সুখে-দুঃখে হাসিয়েছেন, কাঁদিয়েছেন। মোমিনুল বাঙালি পরিবারের এবং মেরি ও এলেন ফিরিঙ্গি পরিবারের প্রতিনিধিত্ব করলেও তিনজনেই ভিন্ন ভিন্ন সামাজিক অবস্থার কারণে ভিন্ন ভিন্ন সমস্যায় জর্জরিত।

উপন্যাসের চরিত্রসমূহের নামের দিকে তাকালে দেখা যায় মোমিনুল নামটি এসেছে মোমিন থেকে। যার অর্থ বিশ্বাসী। অন্য চরিত্র মেরি নামটির একটি অতীত ইতিহাস রয়েছে। মেরি নামটি খ্রিস্টানদের কাছে খুবই সম্মানের। আমরা দেখি ফুটো উপন্যাসে মোমিন হয়ে ওঠে মেরির আস্থাভাজন। এমন বিশ্বাসী যে, প্রেমিকের সাথে একান্ত সময় কাটানোর মুহূর্তেও মেরি মোমিনকে পাশের কক্ষে রাখতে দ্বিধা করে না। আবার পুলিশি নির্যাতনের সময় পুলিশ অফিসার যখন মেরির চরিত্রের দিকে অশ্লীল ইঙ্গিত প্রদান করেন, তখন মোমিনুল অকপটে ঘোষণা করে―মেরি এমন চরিত্রের নয়। এই যে মোমিনুলের প্রতি মেরির এমন বিশ্বস্ততা আবার মেরির চরিত্রের প্রতি মোমিনুলের সম্মান দেখানো―এর মধ্য দিয়ে চরিত্রের নামকরণেও একটি বার্তা কথাসাহিত্যিক বিশ্বজিৎ চৌধুরী দেখাতে চেষ্টা করেছেন।

এসব চরিত্রের বাইরেও সংক্ষিপ্ত অথচ উজ্জ্বল উপস্থিতি পাওয়া যায় কাটা সেলিমের! যে একজন দাগী আসামি, যিনি দীর্ঘদিন ধরে হাজতবাস করছেন এবং আশ্চর্য হলেও সত্য জেলখানাতে বসেও তার আয় রোজগার ভালো। এখানে বসেই তিনি তার অপরাধ রাজত্বের সব খবরাখবর রাখেন। শুধু রাখেনই না, বরং রীতিমত শাসন করেন। মনে প্রশ্ন জাগতেই পারে এই চরিত্রটি লেখক কেন তৈরি করেছেন ? আমাদের রাষ্ট্রযন্ত্রের ভিতরের নানা অনিয়ম দেখানোর জন্যই।

ফুটো উপন্যাসটি ছোট হলেও এর ঐতিহাসিক ও সামাজিক গুরুত্ব বিস্তৃত। মধ্যবিত্ত সমাজব্যবস্থা, খ্রিস্টান পরিবারের চরিত্র, ছাত্র রাজনীতিতে টাকার যথেচ্ছ ব্যবহার, জেলজীবন, রিমান্ডে জেরা, দেশের ইতিহাসসহ অনেক কিছু উঠে এসেছে উপন্যাসে। দেশহীন মানুষের কথা উঠে এসেছে ফিরিঙ্গি পরিবারের হাহাকার হয়ে। বাঙালি পরিবর্তিত সমাজের উন্মুল পরিবারের উদাহরণ হয়ে উঠে এসেছে মোমিনুলের পরিবার। নিজের কর্মস্থলে নারীর নিরাপত্তাহীনতার উদাহরণ হয়ে আছে মেরিয়েন। যার রহস্যময়ভাবে খুন হয়ে যাওয়াটা, যেটা আদতে ক্ষমতাশালীদের নিজেদের অপকর্ম আড়াল করার কৌশল। তবে শেষ পর্যন্ত কথাসাহিত্যিক বিশ্বজিৎ চৌধুরী একজন নিরুপায় ও অসহায় প্রেমিকের হাহাকার দিয়ে যেভাবে উপন্যাসের ইতি টানলেন, তা পাঠকদের মনকেও সংক্রামিত করে এবং ‘মেরি … মেরি…’ বলে চিৎকার দিয়ে কেঁদে উঠল সে। অবলীলায় কবিতার মতো করে আখ্যানের ইতি টেনেছেন। আর এখানেই বিশ্বজিৎ চৌধুরীর মুন্সিয়ানা।

ফুটো উপন্যাসে যে ভৌগলিক বর্ণনা আমরা পাই, তা চট্টগ্রামের। কথাসাহিত্যিক বিশ্বজিৎ চৌধুরী চট্টগ্রামেরই সন্তান। তাই বলা যায় এ উপন্যাসের সকল চরিত্র কথাসাহিত্যিক বিশ্বজিৎ চৌধুরী খুব কাছ থেকেই দেখেছেন। ফুটো উপন্যাসের চরিত্রগুলো লেখকের সঙ্গে সঙ্গে আমাদেরও চেনা-জানা। মেরি ও মোমিনের সম্পর্কের এই টানাপড়েন, আদি চট্টগ্রামের ইতিকথা, পুরোনো ও সমকালীন জীবনধারা, খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের পারিবারিক ও সাংস্কৃতিক বিশিষ্টতা, জীবনপ্রণালী, তাদের হাসি-কান্নার অনেক অজানা কথা, সমান্তরালে আশির দশকের অস্থির সমাজ ও রাজনীতি, অচেনা ছবি উঠে আসে এই আখ্যানে। এছাড়া ফুটো দিয়ে মেরিকে দেখে উত্তেজিত হয়ে বাথরুমে যাওয়া, খুনের ঘটনায় মোমিনের জড়িয়ে যাওয়া এবং শেষে নিজে বাঁচতে এলেনকে ফাঁসিয়ে দেওয়া কোনওটাই অস্বাভাবিক লাগে না আমাদের কাছে। একটি ফুটোর ভেতর দিয়ে যেন দেখা হয়ে যায় অন্য এক অদেখা জীবন। আসল কথা উপন্যাসে রচিত হয়েছে ফিরিঙ্গিদের জীবনের গোপন হাহাকার। তাই নিজের ভূগোল ও চেনা পরিবেশ নিয়ে লেখা যেমনটা সহজ, ঠিক তেমনি দায়বদ্ধতার কারণে ঠিক ততটাই কঠিন।

উপন্যাসের ভাষা ও প্রকাশভঙ্গিতে বিশ্বজিৎ চৌধুরীর সমাজমনস্কতা ও দায়িত্ববোধের চিত্র সুস্পষ্ট। নারীর প্রতি সমাজের একশ্রেণির মানুষের যে দৃঙ্গিভঙ্গি তার প্রতিবাদ তিনি সরাসরি করেন। সে চেতনাবোধ থেকেই তাঁর সৃষ্ট চরিত্র মোমিনুল, যে সামান্য চাকুরে এবং জীবনবোধে খুব বেশি দীক্ষিত নয় তার মুখ দিয়েও তিনি উচ্চারণ করান, ‘একটি মেয়েকে কতটা সস্তা সহজলভ্য মনে করেন এই মানুষটি, যেন যেকোনওভাবেই তাকে ব্যবহার করা যায়। কেন ? মেয়েটি খ্রিস্টান ? স্কার্ট আর টপস পরে বলে, হাইহিলে শব্দ তুলে অফিসে যেত বলে ?’ বর্তমান সময়ের অনেকের অভিযোগ আর তার প্রতিবাদ যেন মোমিনুলের ভাবনায় মূর্ত হয়ে ওঠে।

গোপন একটি নাম :

জীবন নাটকীয়। অনেক সময় তাকেও হার মানাই। যদি নাটকীয় না হবে তবে আজ সকালে যে শিক্ষিকার নিষ্ঠুরতা নিয়ে আলোচনা-সমালোচনার ঝড় বয়ে গিয়েছিল, সেই কিনা সন্ধ্যা হতে না হতেই ইমারজেন্সি ওয়ার্ডে এসে পৌঁছানো! হাসপাতালের ইমার্জেন্সি ওয়ার্ডে ভর্তি হয়েছেন সে শিক্ষিকা। একগাদা ঘুমের ওষুধ খেয়ে আত্মহত্যা করতে গিয়েছিলেন তিনি। কৌতূহলবশে তার খোঁজখবর করতে গিয়ে ঘটনার পরম্পরায় এক অদ্ভুত জালে জড়িয়ে পড়ল নবীন চিকিৎসক রাহাত।

অথচ সকালে পত্রিকায় সে শিক্ষিকার নির্মম আচরণের কথা পড়েছিল মেডিকেল কলেজের তিন বন্ধু―রাহাত, সালেহ ও সঞ্জয়। সদ্য পাশ করে তারা ইন্টার্নশিপ করছে। সকালে ক্যানটিনে বসে নাস্তা করছিল। হঠাৎই পত্রিকার পাতায় একটা শিরোনামে চোখ আটকে গেলো ওদের। আগের দিন তার এক ছাত্রীকে নির্মমভাবে প্রহার করে রক্তাক্ত করেছেন এক শিক্ষিকা। কী করে একটি মেয়েকে এভাবে পেটাতে পারে তারই এক শিক্ষক―এ নিয়ে আলোচনার ঝড় বয়ে গিয়েছিল ক্যানটিনে। সারা সকালের তিন বন্ধুর আলোচ্য বিষয় ছিল এই একটাই।

কী এমন রহস্য ? যার কারণে সকালে এমন আচরণ আর সন্ধ্যায় মৃত্যুর পথ বেছে নেয়ার মতো ঘটনা ঘটতে পারে? সমস্ত রহস্য উন্মোচিত হয় কাহিনি যত সামনের দিকে এগিয়ে যায়। এছাড়া উপন্যাসটিতে রাহাতের সঙ্গে এসেছে সালেহ, বীথি, শাহানারা, জাহানারা, আনিকা, রবিন প্রমুখ চরিত্র।

আনিকা রাহাতের বাবার ধনী বন্ধু জামাল উদ্দিনের কন্যা। এই জামাল উদ্দিনের ‘আনিকা ভিলা’র চিলেকোঠায় বিনা ভাড়ায় থাকে রাহাত। শর্ত এই―মাঝে মাঝে আনিকাকে পড়া দেখিয়ে দিবে। পড়া দেখাবে নাকি জামাল উদ্দিনের চাওয়া নিশ্চিত ভবিষ্যতের ক্যারিয়ার রাহাতের সাথে কন্যার বিয়ে দিবে ?

ঘটনা পরম্পরায় আমরা তা সামান্য বুঝতে পারি। কিন্তু আনিকার সম্পর্ক গড়ে ওঠে রবিন খানের সঙ্গে। রাহাত―তার কাছে উটকো ঝামেলা। নিম্ন মধ্যবিত্ত পরিবারের রাহাতও আনিকার সাথে স্বাভাবিকসম্পর্ক বজায় রাখে।

রাহাত বরং তার চেয়ে বেশি বয়সি শাহানারার সাথে একটি অসম সম্পর্কে আবদ্ধ হয়। শাহানারাকে মনোচিকিৎসক দেখায়, চাকুরি পাইয়ে দেয়, এমনকি থাকার জন্য হোস্টেলও ঠিক করে দেয়। একদিন রাহাতের বন্ধুদের রান্না করে খাওয়ানোর জন্য শাহানারা আসে রাহাতের চিলেকোঠায়। রাহাত শারীরিক আবেগে শাহানারার প্রতি আকৃষ্ট হয়। শাহানারা নিষেধ না করলেও খুব গভীর আবেগে হারিয়ে গিয়েও পরক্ষণেই নিজেকে সামলে নেয়। তবে বোঝা যায় না এটা কি রাহাতের সাথে তার সৌজন্য সম্পর্ক, না আরও বেশি কিছু ? উপন্যাসের কিছুটা সময় এমন দ্বিধা-দ্বন্দ্বে কাটলেও শাহানারার মৃত্যুই বলে দেয় এ সম্পর্ক সৌজন্যের চেয়েও বেশি কিছু ছিল।

এদিকে আনিকার সাথে সম্পর্কের ভাঙন হয় মাদকাসক্ত রবিনের। সাইবার বুলিং শিকার হওয়ার ভয়ে আনিকা সাহায্য চায় রাহাতের। রাহাত করেও।

এভাবেই বারবার রাহাতের সাহায্যের জন্য এগিয়ে যাওয়া―নিয়তি নির্ধারিত বলেই লেখকের বয়ানে স্পষ্ট হয়।

আনিকাকে নিয়ে রাহাত যেদিন সালেহ-বীথির বাসার অনুষ্ঠানে যায়―সেদিন দুর্ঘটনায় মৃত্যু হয় শাহানারার। এটা কি দুর্ঘটনা না শাহানারার সাবেক সহকর্মী ওমর ফারুক জীবনের কোনও কারসাজির ফল―সমীকরণ মেলাতে চেষ্টা করে রাহাত।

কারণ এই ওমর ফারুক জীবনের সঙ্গে ছাত্রীর প্রেমের সম্পৃক্ততা থাকার কারণেই প্রতিশোধ-পরায়ণ হয়ে শাহানারা তার শিক্ষার্থীকে বেত্রাঘাত করেছিল। ওমর ফারুক জীবনকে শাহানারা পছন্দ করত। পরে শাহানারা নিজের ভুল বুঝতে পেরে আবার সেই জীবনের সঙ্গেই নতুন করে সম্পর্কে জড়িয়ে যান। তার মৃত্যু রাহাতের মনে সন্দেহের উদ্রেক করলে সে জীবনের সঙ্গে দেখা করতে যায়। শাহানারাকে মেরে ফেলার কারণ কী জানতে চায়। কিন্তু জীবনের সঙ্গে তার যে কথোপকথন হয় তাতেই কিছুটা চমকে উঠে রাহাত। শাহানারাকে সে ভালোবাসত তাই সে জীবনকে গ্রহণ করবে না। এমনকি পতেঙ্গাতে গিয়েও মৃত্যুর আগে শাহানারা রাহাতকে ফোন দিয়েছিল। রাহাতের সঙ্গে আনিকার সম্পর্কটাও তার মনে এক ধরনের ঈর্ষার সৃষ্টি করেছিল। তবে সেই মৃত্যুর কারণ এবং জীবনের সঙ্গে কথা বলে বোঝা যায় শাহানারা মানসিক ভারসাম্যহীন ছিল। নইলে বোনের প্রতি স্বামীর ভালোবাসাটাও সে সহ্য করতে পারত না। বাবা মারা যাওয়ার পর থেকে পারিবারিক দায়িত্ব, অনেক না পাওয়ার হিসেব, এলোমেলো জীবনের ছক তার মনের ওপর বেশ চাপ সৃষ্টি করেছিল বোঝা যায়।

রাহাত তার ক্যারিয়ার গুছিয়ে নিতে একটি আন্তর্জাতিক সংস্থাতে চাকরি পেয়ে চলে যায় টেকনাফ-রোহিঙ্গাদের চিকিৎসা সেবা দিতে। আনিকাও চাকরি পেয়ে একদিন হাজির হয় রাহাতের টেকনাফস্থ বাসায়। রাহাতের টেকনাফের বাসস্থানে পাশাপাশি রুমে রাত যাপনের মাধ্যমে পরস্পরকে চিনে নেওয়ার প্রস্তাবের মধ্য দিয়ে লেখকের মুন্সিয়ানার পরিচয় সুস্পষ্ট।

রাহাত-আনিকার একটি পরিণত সম্পর্ক হবে তা অনেক আগেই বুঝতে পারা যায়। কিন্তু রাহাতের সাথে ওপারে চলে যাওয়া শাহানারার যোগাযোগ আছে―এটুকুই বুঝতে পারি। কিন্তু সেই নামটা সে গোপন রাখতে চায়। শাহানারার সঙ্গে জীবন ও জগতেরই যোগাযোগ নেই আর, কিন্তু রাহাতের সঙ্গে আছে। সে এক অদ্ভুত যোগাযোগ! সেখানে আনিকা কেন, তৃতীয় কারও উপস্থিতিই অসম্ভব! চারপাশে কত মানুষ, কত আলাপ-পরিচয়-সম্পর্ক, তার মধ্যে এই একটি নাম গোপন রাখতে চায় রাহাত। অশ্রুবিন্দুর মতো অলক্ষ্যে রেখে দিতে চায়। জীবনের সব কথা কি সবাইকে বলা যায়? কিছু কথা থাকে একান্ত গোপন, ব্যক্তিগত কিছু মানুষ আছে যাদের কথা বলা যায় না, নিজের গোপন পৃথিবীতে যাদের বসবাস। গোপনেই চলে তার আরাধনা, বিনিদ্র রজনী কাটে তার ভাবনাতেই। এই গোপন একটি নাম―হৃদয়ের কোথাও ধারণ করে রাহাত হয়তো ছুটে চলে জীবনের লক্ষ্য পানে। তাই বলা যায় গোপন একটি নাম সার্থক। রাহাত অভিমন্যুর মত চক্রব্যুহে ঢুকতে শিখেছে, বেরিয়ে আসার পথটা এখনও চিনে উঠতে পারেনি।

শাহানারাকে ঘিরে রাহাত চরিত্রের বিভিন্নমুখী বাস্তবতা চমৎকার রূপ লাভ করেছে। সঞ্জয়-অণিমা, সালেহ-বীথি চরিত্রের মধ্য দিয়ে উত্তাল যৌবনের চিত্র বাঙ্ময় হয়ে প্রতিবিম্বিত হয়েছে। উপন্যাসের এসব চরিত্রের মধ্য দিয়ে বর্তমান বাংলাদেশের সার্বিক চিত্র ফুটে উঠেছে। বিচিত্র প্রকৃতির মানুষের সাথে পরিচিত হই, বিচিত্র তাদের মনস্তত্ত্ব, বিচিত্র তাদের চিন্তা। বর্তমানে কম বয়সী ছেলেমেয়ের আচরণ, প্রেম, বাবা-মায়ের সাথে দূরত্ব ইত্যাদি সুন্দরভাবে উপস্থাপন করেছেন লেখক। কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ে রাজনৈতিক অবস্থার বিবরণও আছে। সমকালীন সমাজ বাস্তবতার চিত্র দেখতে পাই ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে কিংবা চরিত্রের কথোপকথনে।

এছাড়া জঙ্গিবাদ, দেশীয় ও আন্তর্জাতিক রাজনীতির পাশাপাশি, রোহিঙ্গা সমস্যা প্রভৃতি প্রসঙ্গে উঠে এসেছে সাম্প্রতিক বাংলদেশের অস্থির চিত্র। আনিকা-রবিনের সম্পর্কের বাস্তবতা, উঁচু-শ্রেণির সমাজের সন্তানদের বখে যাওয়ার বাস্তব রূপায়ণ। কেন্দ্রীয় চরিত্র রাহাতকে নিয়ে মনোবিশ্লেষণ কখনও জটিল হয়ে উঠেছে। শাহানারা চরিত্রের জটিল মনস্তাত্ত্বিক রূপায়ণ ঘটেছে চমৎকারভাবে। রুদ্ধশ্বাস ঘটনা আর প্রাণবন্ত ভাষা পাঠককে একটা ঘোরের মাঝে রাখবে পুরোটা সময়। উপন্যাসের নানা চরিত্র ও ঘটনাপ্রবাহ পাঠককে যেন এই উপলব্ধি দেয়―জীবন আসলে রহস্যময় ও নাটকীয়।

উপন্যাস উঠে আসা রোহিঙ্গা সমস্যা, জঙ্গি ইস্যু নিয়ে আলোচনার সাথে একমত হলেও সংবাদপত্রের ভাষা নিয়ে ভিন্নমত আছে। ভিন্নমতটা এই-সংবাদ ভাষ্যের কারণেই ঘটনার শিকার শাহানারা সম্পর্কে আমাদের মনে ভুল ধারণা জন্মায়―যেখানে আগে শিক্ষার্থীকে বেত্রাঘাত করলে খবরের কাগজ লিখত―‘শিক্ষার্থীকে বেত্রাঘাত’ এখন লেখা হয়―‘শিক্ষার্থী কি হালের বলদ ?’

এই ধরনের শিরোনামকে হালনাগাদ বলা হয়েছে উপন্যাসে―কিন্তু এই শিরোনামই তো শাহানারাকে আমাদের সামনে নেতিবাচকভাবে উপস্থাপন করে।

সবশেষে বলা যায়, নিয়তি রাহাতকে আত্মহত্যার চেষ্টায় ব্যর্থ এক নারীর সঙ্গে পরিচয় ও ঘনিষ্ঠতায় ঝুলিয়ে দিয়েছে। আবার এই নিয়তিই তাকে আনিকার বিপদের দিনে তার পাশে দাঁড়াতে প্ররোচিত করেছে। না হলে তার পরিকল্পনাবৃত্ত যে পূর্ণ হয় না। গোপন একটি নাম আদতে নিয়তিতাড়িত উপাখ্যান। ঘুরেফিরেই আসে নিয়তির কথা।

ভাষা নির্মাণের ক্ষেত্রে লেখকের দক্ষতা সর্বাধিক উচ্চতা অর্জন করে মনোবাস্তবতার চিত্র-উপস্থাপনে। কাহিনি-বিন্যাসের ক্ষেত্রে বহির্বাস্তবতার চিত্র-নির্মাণের পরিবর্তে লেখক যেহেতু অধিকতর মনোযোগী চরিত্রের অন্তর্জগতের রহস্য উন্মোচনে, সেহেতু তাঁকে আশ্রয় নিতে হয়েছে এর উপযোগী ভাষাশৈলীর। আমরা সরাসরি দেখতে পাই বহির্জগতের চিত্র এবং তার বিবরণের উপযুক্ত ভাষা ঐতিহ্যগতভাবে আমাদের আয়ত্ত। আমরা চোখে দেখি না মনোজগতের চিন্তনক্রিয়া, কল্পনাপ্রবাহ বা স্মৃতিময়তাকে। সুতরাং একে সম্পূর্ণভাবে উপলব্ধি করতে হয় কল্পনাসহযোগে। পাঠকের বোধের কাছে লেখকের এই উপলব্ধিকে চিত্রময় করে তোলার জন্য বিশেষভাবে আশ্রয় নিতে হয় এক নতুনতর পরিচর্যারীতির। কিন্তু সহজসাধ্য নয় মনোবাস্তবতার চিত্রাত্মক পরিচর্যা রচনা। এজন্য প্রয়োজন কল্পনার বিপুল বিস্তার ঘটানো। যে কাজটা কথাসাহিত্যিক বিশ্বজিৎ চৌধুরী সুন্দরভাবেই সম্পন্ন করেছেন।

খুন ও আনন্দকুসুম :

বাংলা সাহিত্যের আধুনিক যুগে অর্থাৎ উনবিংশ শতাব্দীতে বাংলা গদ্যের সূচনা ও বিকাশ এবং এই বিকাশমান সময়ে উপন্যাসের জয়যাত্রা শুরু হয়। হানা ক্যাথেরিনের ফুলমণি ও করুণার বিবরণ, প্যারীচাঁদ মিত্রের আলালের ঘরের দুলাল; এরপর ১৮৬৫-তে বঙ্কিমচন্দ্রের হাতে রচিত হয় বাংলা সাহিত্যের প্রথম সার্থক উপন্যাস দুর্গেশনন্দিনী। বঙ্কিমচন্দ্রের হাতে উপন্যাস পূর্ণাঙ্গতা পেলেও শ্রেষ্ঠ উপন্যাস রচিত হয় রবীন্দ্রনাথের হাতে। অতঃপর জনপ্রিয় ঔপন্যাসিক শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় বাংলা উপন্যাস সাহিত্যকে সমৃদ্ধ করেছেন। পরবর্তীকালেও অনেক প্রতিভাধর ঔপন্যাসিক বাংলা উপন্যাস সাহিত্যকে সমৃদ্ধ করেছেন। পূর্বসূরীদের দেখানো এ পথে হাঁটছেন সমকালের লেখকরাও। তাঁরাও লিখছেন মানুষের মহাকাব্য খ্যাত উপন্যাস। একথা নিঃসন্দেহে বলাই যায়, কথাসাহিত্যিক বিশ্বজিৎ চৌধুরীও এর ব্যতিক্রম নন।

সাহিত্য মানবমনের প্রতিচ্ছবি। মানুষের প্রাত্যহিক জীবনের কান্না হাসি এবং ফেলে আসা অতীতে ভরা অনুভূতি সাহিত্যে প্রতিবিম্বিত হয়। এজন্য সাহিত্য ব্যক্তি হৃদয়ের মতো জাতীয় জীবনেরও প্রতিচ্ছবি বহন করে। আমাদের সাহিত্যজীবনে ব্যক্তি হৃদয়ের অনুভবপুঞ্জ প্রতিবিম্বিত হওয়ার পাশাপাশি জাতীয় জীবনের অনুভবপুঞ্জেও প্রতিবিম্বিত হয়, উঠে আসে সমাজবাস্তবতা। কথাসাহিত্যিক বিশ্বজিৎ চৌধুরীর খুন ও আনন্দকুসুম নামক উপন্যাসটি কিছুটা থ্রিলারধর্মী এবং রোমান্টিক হলেও তাতে রয়েছে সমাজবাস্তবতা। বিস্ময়ধর্মী ও অলৌকিকতার প্রতি লেখকের যে একটা সহজাত প্রবণতা আছে তা বোঝা যায়। বাস্তবের ভিত্তিভূমির ওপর দাঁড়িয়েই তিনি রোমান্সের রাজ্যে বিহার করে সাহিত্য রচনা করেছেন।

এক শ্রেণির কাহিনি আছে যেখানে সম্ভাব্যতার দাবি কম, পরমাশ্চর্য কাহিনি বাস্তবকে ছাড়িয়ে এক গভীর কল্পলোক গড়ে তোলে। এ শ্রেণির কাহিনি আমাদের বিস্মিত কৌতুহলকে জাগ্রত ও নিবৃত্ত করে। রূপকথা, উপকথা, ডিটেকটিভ উপন্যাসে এ ধরনের কাহিনি বর্ণিত হয়। আর এক শ্রেণির কাহিনি আছে, যেখানে বিস্ময়কর বস্তু অনেক আছে কিন্তু আমাদের কল্পনা বাস্তবের বন্ধন থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত হয় না। এ শ্রেণির গল্পকেই বলা হয় রোমান্স। রোমান্সের মধ্যে বাস্তব জীবনের ছবি আছে আবার কাল্পনিক জগতের মহিমাও তার মধ্যে বিরাজমান। খুন এবং আনন্দকুসুম উপন্যাসটি এমন রোমান্স, বাস্তবতা এবং কল্পনার সংমিশ্রণ।

বিশ্বজিৎ চৌধুরীর খুন ও আনন্দকুসুম উপন্যাসে। থ্রিলারের মতো রহস্যময় কাহিনির মধ্যে নিজের অজান্তেই প্রবেশ করবে খুন ও আনন্দকুসুম এর পাঠকগণ। এই উপন্যাসের শুরুটা বেশ চমকপ্রদ। একটি খুনের ঘটনা দিয়ে শুরু হয় উপন্যাসের কাহিনি এবং আরেকটি খুনের মধ্য দিয়েই হয় সমাপ্তি। আর এর মাঝখানে ঘটে যাওয়া বিচিত্র ঘটনা এবং চরিত্রগুলো আমাদের খুবই পরিচিত। পাঠ শেষে মনে হবে এটা যেন আমাদেরই জীবনের গল্প। এমন ঘটনা প্রতিনিয়ত সমাজে অহরহ ঘটছে। আমাদের সমাজের চারপাশে লাঞ্ছনা ও খুনের যেসব ঘটনা ঘটে ও সংবাদমাধ্যমে যেগুলো প্রায়ই উঠে আসে, সে রকম একটি খুনের ঘটনা নিয়েই উপন্যাস লিখেছেন কথাসাহিত্যিক বিশ্বজিৎ চৌধুরী। রহস্যের উপাদান মিশিয়ে।

উপন্যাসটির শুরুতেই রয়েছে একটি চমক। রয়েছে রহস্যাবৃত ঘটনাপঞ্জির সমাবেশ। আর সেই চমকের মাধ্যমেই রাফিয়া এবং শিবলি চরিত্রটি উন্মোচিত হয়েছে। লেখক তাদের মানসিক পরিস্থিতি অত্যন্ত জীবন্ত করে তুলেছেন এবং একইসঙ্গে পাঠকমনও রহস্য উদঘাটনের সঙ্গী হয়েছে।

সমাজের একশ্রেণির কু-পুরুষের বিকৃত মানসিক ব্যাধি হলো ধর্ষণ। এদের মাঝে বাস করে এক কুৎসিত ধর্ষণকারী মানুষ। নারী নির্যাতনের আদিম প্রতিযোগিতা দিনকে দিন বেড়েই চলেছে। পুরুষতান্ত্রিক সমাজে সেই নগ্নতার মুখ পুরুষের অবয়বে দেখতে পাওয়া যায়। আর তাদের হাতেই প্রতিনিয়ত লাঞ্ছিত, বঞ্চিত, অবহেলিত, নির্যাতিত আমাদের সমাজের নারীরা। কখনও বাইরে কখনও বা চার দেয়ালের প্রকোষ্ঠে প্রকম্পিত প্রতিধ্বনিত হয় তাদের আর্তনাদ। নারীর উপর পুরুষের নগ্নতাকে সর্বোচ্চ জঘন্যভাবে প্রয়োগ বা আঘাত করে এখানে। নিজের জঘন্য হীনতাকে চরিতার্থ করে খুব সহজেই শহরের নিয়ন আলোয় তাদের বীভৎস মুখগুলো মিশে যায় স্বাভাবিক জনস্রোতের আড়ালে। পুরুষতান্ত্রিক সমাজের প্রতিটি নারীকে পুরুষের লোলুপ দৃষ্টিতে নজরবন্দি হয়ে থাকতে হয়। তাই প্রতিটি নারীকেই বিবেকবর্জিত পচনশীল সমাজের যুদ্ধ করে বাঁচতে হয়। নারী দেখলেই যেকোনও বয়সের পুরুষ হোক না কেন ভাদ্র মাসের কুকুর হয়ে ওঠে। এদের স্থান-কাল-পাত্র লাগে না। এরা সব জায়গাতে তাদের কুপ্রবৃত্তি দ্বারা তাড়িত হয়। কুকুরদের তো তবু মাস পরিবর্তন হয় কিন্তু মানুষরূপী কুকুরদের কখনও ভাদ্র মাস যায় না, এটাই উপন্যাসের প্রেক্ষাপট বর্তমান সময়ের সমাজ বাস্তবতা। হয়তো সেদিন আর বেশি দূরে নেই যেদিন পুরুষতান্ত্রিক সমাজ তাদের পৈশাচিক আনন্দকে আইনগত বৈধতা দাবি করবে এবং আমাদের দেশের আইন এ দাবিকে স্বীকৃতি দিবে। উপন্যাসেও কিন্তু রাফিয়ার সরওয়ারের সঙ্গে বিয়ের সিদ্ধান্ত অনেকটা সে কথাই আমাদের মনে করিয়ে দেয়। যে মানুষটির হাতে চরম লাঞ্ছনার শিকার হয়েছিল, তার সঙ্গেই বিয়ে ঠিক হয়ে গেল রাফিয়ার। এলাকার ময়-মুরুব্বিদের এই মীমাংসা মেনে নিতে বাধ্য হয়েছিল সে। বারবার এ সমাজ প্রমাণ করিয়ে দেয় যে, নারীর জৈবিক অস্তিত্ব এবং শরীর-সংস্থানের কিছু বিশেষত্ব তাকে পুরুষের চেয়ে অনেক বেশি আলাদা করে দেয়। মানুষের দাবির চেয়ে অনেক বেশি সত্য হয়ে ওঠে জৈবিক সত্তার দাবি। তার ক্ষেত্রে তিনি যতই মহৎ সুস্থ স্বাভাবিক হোন না কেন, লিঙ্গগত অবস্থানের বাইরে তার অস্তিত্বের স্বীকৃতি নেই। এ প্রেক্ষাপটে ভিন্ন এক প্রেক্ষিত থেকে ঘটে খুনের ঘটনা। আর এই খুনই পুরো উপন্যাসকে ধাবিত করে রহস্যের পথে।

অন্যদিকে একটি মানসিক হাসপাতালে ভর্তি আছে শিবলি। মাথার দোষে নয় ‘কপাল দোষে’ তার জন্য বরাদ্দ এই ঠিকানা। একটি খুনের ঘটনায় জড়িয়ে পড়ে সে। বলা যায় প্রকৃত খুনিই সে।

উপন্যাসের কেন্দ্রীয় চরিত্র রাফিয়া এবং শিবলি। রাফিয়ার মতো একটি মায়াবতী মেয়ে, শিবলির মতো অকারণে শাস্তিভোগ করা নিরীহ যুবক, শেখ আহমেদের মতো বঞ্চিত কিন্তু পরোপকারী মানুষ, গোলাম সরওয়ারের মতো বিত্তশালী লম্পট এবং সম্পত্তির লোভে ছোট ভাইকে হত্যা প্রচেষ্টাকারী বেলাল আমাদের সমাজেরই অংশ। সে সঙ্গে উঠে এসেছে দেশের রিহ্যাব সেন্টারের নামে অরাজক স্বাস্থ্যব্যবস্থার চিত্রও। যে সমস্যা বাইরে থেকে মানুষ চিন্তাও করতে পারে না। মানুষের যে বিচিত্র চরিত্র তার এক অনবদ্য বয়ান এই উপন্যাসে উপস্থিত।

উপন্যাসের পরবর্তী ঘটনা জানার জন্য পাঠককে খুব দ্রুত সামনের দিকে ধাবিত করে। একধরনের উৎকণ্ঠা, আবেগ এবং ভালো লাগায় মন আচ্ছন্ন হয়ে যায়।  স্বার্থের জন্য বড় ভাই ছোট ভাইকে খুন করার উদ্দেশ্যে ছাদ থেকে ফেলে দেয়, পরবর্তীতে পাগল সাজিয়ে মানসিক হাসপাতালে ভর্তি করায়। বলা যায় মানুষের আকাক্সক্ষার শেষ নেই।

গতকালের পথ ধরে ‘আজ’ চলে যায় অতীতের পথে। ফিরে আসে না কোনও দিন। বড়ই নীরবে নিভৃতে চলে যায় সে মহাকালের গহীনে। কিন্তু আমরা মানুষ, হারিয়ে যেতে চাই না সময়ের ফাঁদে। সময়ের গলিতে খুঁজে ফিরি জীবনের রং-রূপ-গন্ধ, হাসি-আনন্দ এমনকি বেদনাও। সৃষ্টির সবটুকু রস আস্বাদনেই তো জীবনের পূর্ণতা। অতঃপর ফিরে যেতে চাই সময়ের পথে। তাই তো রাফিয়া আর শিবলিও জীবনের পরিপূর্ণতার জন্য হেঁটে চলে সময়ের পথে। সরওয়ার আর বেলালের মৃত্যুতে তাদের জীবনে আসে বসন্ত, আসে প্রেম। লুপ্ত শঙ্কা আর বিচ্ছিন্ন স্বপ্নের বাগানে ফোটে নতুন ফুল। দীর্ঘ নীরবতার চাদর ভেঙে যেন জেগে উঠেছে নতুন সূর্য আর বারান্দায় আশাজাগানিয়া একফালি রোদ্দুর। জীবন ভরে ওঠে বিচিত্র রঙের খেলায়। রাফিয়ার মতো এক প্রতিবাদী নারীর জীবন কাহিনি, প্রেম, রোমাঞ্চ সব মিলিয়ে অসাধারণএকটা উপন্যাস। শুরু যেভাবে খুনের কাহিনি দিয়ে, শেষও আরেকটা খুনের কাহিনি দিয়ে। খুন খারাপ এবং জঘন্যতম অপরাধ হলেও কখনও কখনও সে খুন মানুষের জীবনে আনন্দবার্তা নিয়ে আসে। আনন্দ কুসুম হয়ে ধরা দেয়। সেদিক বিচারে বলা যায়, খুন এবং আনন্দকুসুম সার্থক।

স্বল্প দৈর্ঘ্য প্রেমের গল্প :

প্রেম অকারণ, অর্থাৎ প্রেমের কোনও কারণ নেই। তাই প্রেম স্বভাবজাত। যখন মানব হৃদয়ে প্রেমের বর্ষা হয়, তখনই মানব ব্যক্তিত্বের জন্ম হয় এবং মানবের সম্পূর্ণতা আসে। প্রেমহীন মানব মৃতসম। এতে জীবনের লক্ষণ নেই। সেহেতু তারা অসহজ।

জীবনে প্রেমের বর্ষা নামলে ধ্যানের কিরণছটায় জ্ঞানের প্রকাশ হয়। প্রেম বা ধ্যান জীবন সাধনার পথে, আত্মউপলব্ধির জন্য একান্ত প্রয়োজন। সুতরাং ভালবাসতে থাক। ভালবাসাই পথ, প্রেম-সাধনা এবং পরমেশ্বর-লক্ষ্য। প্রেমের জন্য জগৎ। জীবন প্রেমময় একথা গুলো মাথায় রেখেই হয়তো গল্পকার বিশ্বজিৎ চৌধুরী প্রেমের গল্প লিখতে উদ্বুদ্ধ হয়েছেন। কারণ তিনি জানেন গল্প কীভাবে লিখতে হয়, কীভাবে চরিত্রের বিন্যাস ঘটাতে হয়, কখন কীভাবে গল্পের মোড় ঘুরিয়ে পাঠককে কোন ভাবের ঘোরে ফেলে গল্পের কোন চরিত্রকে কোন কাজটা কখন করিয়ে নিতে হয়। গল্প যে শুধু ঘটনার নয়, চরিত্রের ভাব-ভঙ্গি, ভাষা-ভঙ্গি, চালচলন সবকিছুতেই গল্প চারিয়ে দেবার যে কৌশলটা চাই সেটি তাঁর করায়ত্ত। কখনও সংলাপে, কখনও প্রবাদে, কখনও গানের মাঝে দিয়েই পাত্র-পাত্রীর মনের গহীনে লুকায়িত ভাব প্রকাশের মাধ্যমেই তিনি গল্পকে এগিয়ে নিয়ে গেছেন সামনের দিকে। আর তা করতেই তিনি কখনও শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, কাজী নজরুল ইসলাম, জীবনানন্দ দাশ, শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়, হুমায়ূন আহমেদ, বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, হেলাল হাফিজের বিখ্যাত লাইন বা উক্তি এবং গানের মধ্য দিয়ে কথাসাহিত্যিক বিশ্বজিৎ চৌধুরী প্রেমের গভীরতা উপস্থাপন করার চেষ্টা করেছেন। সার্থক হয়েছেন, কারণ তাঁর চরিত্রদের যাপিত জীবনের কোষে কোষে গল্প থাকে। গল্পগুলো স্বল্প দৈর্ঘ্যরে হলেও প্রেম অসীম।

স্বল্প দৈর্ঘ্য প্রেমের গল্প গ্রন্থে মোট ষোলোটি গল্প রয়েছে : (১.এমনি করিয়া…, ২.লীলাবসান ৩. মিমির খালা ৪. কাক উড়ে গেলে তাল পড়ে যায় ৫.গাঁইয়া ৬. ইন আ রিলেশনশিপ ৭. অভিনয়ের পর ৮. দুঃখিত ৯. নতুন পাগল ১০. আমি কেন আর হাত দেখি না ১১. আমাদের সানিয়া মির্জা ১২.আকাশে শুধু একটি ঘড়ি ১৩.মনোরোগ ১৪. বুকের কাছে সুগন্ধি রুমাল ১৫. যে আঁখিতে… ১৬. ষোলো, ষাট, তেষট্টি)। প্রতিটি গল্পে তরুণ-তরুণীর জীবনের আনন্দ-বেদনার নানা দিক উন্মোচিত হয়েছে। ২০১৩ সালে স্বল্প দৈর্ঘ্য প্রেমের গল্প নামের বইটি প্রথম প্রকাশিত হয়। নতুন সংস্করণে (২০২২) সালে ফেব্রুয়ারিতে যুক্ত হয়েছে আরও নতুন দুটি গল্প। বর্ণনার ছটা নেই, ঘটনার ঘনঘটাও নেই, কিন্তু নির্ভার গদ্যে এ রচনায় উঠে এসেছে এমন কিছু বিষয়, যাতে আনন্দে পরিপূর্ণ হয়ে ওঠে মন। আবার কখনও তাতে বিষাদের গাঢ় রং পাঠ শেষ করেও যার রেশ ফুরোয় না। এ অনেকটা বসন্তের এক ঝলক তাজা হাওয়ার মতো, জানালার পর্দা কাঁপিয়ে দিয়ে ঢুকে পড়ে, আর কী এক অজানা অনুভূতিতে ভরিয়ে তোলে ঘর। একটি বেদনামধুর গানের কলির মতো সঞ্চারিত হয় হৃদয়ে। সারাদিন ধরে তার গুঞ্জরণ চলতে থাকে, চলতেই থাকে। প্রতিদিনের শত ব্যস্ততার জীবনেও এই অনুভবের অনুরণন থেকে মুক্তি নেই―কারণ বিষয়টির নাম প্রেম। বইটি শুধু তরুণ-তরুণীরা নয়, বিভিন্ন বয়সের মানুষেরই পছন্দ হবে।

খুব গভীরভাবে দৃষ্টি দিলে দেখা যায় প্রেমের গল্পগুলো স্বল্প দৈর্ঘ্যের হলেও এর গভীরতা এবং বিস্তৃতি ব্যাপক।

মহাকালের স্রোতে বিস্তীর্ণ পরিসরে ব্যাপক জীবনের প্রবাহে সম্মিলিত ধারায় আগামীর পথে ধাবমান। তারই ফাঁকে বাঁকে বাঁকে জীবনের অংশ―ভগ্নাংশ, ক্ষুদ্রাংশ কিংবা অখণ্ড জীবন ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ে ইচ্ছায়, অনিচ্ছায় অথবা হেলায়, অবহেলায়। আর সেসবের ছেঁড়া ছেঁড়া টুকরো নিয়েই নির্মিত হয় গল্প। বিশ্বজিৎ চৌধুরীর গল্পে মূর্ত হয়ে উঠেছে শৈলীগত সৌন্দর্য। উপরন্তু বিষয়ভাবনার সঙ্গে শৈলীচিন্তার সমন্বয় সাধনের ক্ষেত্রেও লেখকের দক্ষতা সার্থকতামণ্ডিত। একথা ঠিক, বিষয়গত বৈভবকে তিনি লুকিয়ে রাখেন গল্পের সুসামঞ্জস্য অলংকারময় অবয়বের অভ্যন্তরে। এবং শুধু বিষয়ের জৌলুস দিয়ে তিনি দ্যুতিময় করতে চান না গল্প-শরীরকে। বিষয়ের গভীরে প্রবেশ করে তার অন্তর্সত্যকে আকর্ষণ করার ক্ষমতা রয়েছে ভাষাবিন্যাস বা শব্দ চয়নে। গল্প বলি, উপন্যাস বলি, সবক্ষেত্রে বিশ্বজিৎ চৌধুরী দক্ষতার পরিচয় দিয়েছেন। প্রেমের গল্প-নির্মাণে লেখকের এই সৃজনশীল দক্ষতা নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয়।

বিশ্বজিৎ চৌধুরীর কথাসাহিত্যের বিষয়-উপকরণ বহুবর্ণিল, নির্মাণকৌশল শিল্পরীতিসমৃদ্ধ। ঔপন্যাসিকের স্বাতন্ত্র্যের অন্যতম উপকরণ তাঁর ভাষা। স্বল্প দৈর্ঘ্য প্রেমের গল্প এ গ্রন্থের বিশিষ্টতা এর উজ্জ্বল ভাষাবিন্যাসে। ভাষায় এক ধরনের কাব্যধর্মী গতিময়তা লেখকের বাণীভঙ্গিকে স্বাতন্ত্র্য দান করেছে।

সব শেষে বলা যায় মানুষের জীবনের আনন্দ-বেদনা, হাসি-কান্না, চাওয়া- পাওয়া, আবেগ-অনুভূতি এতটা সহজ করে সাহিত্যের ফ্রেমে বন্দি করে তা সবার বোধগম্য করে সাবলীলভাবে উপস্থাপন করা কোনও সহজ কাজ ছিল না। কথাসাহিত্যিক বিশ্বজিৎ চৌধুরী তা পেরেছেন। খুব সুন্দরভাবেই সহজ কথাগুলোকে শব্দের রূপকল্পতায়, আবেগের রহস্যময়তায় কথামালায় সাজিয়েছেন।

লেখক যেহেতু সমাজেরই একজন তাই তিনি তাঁর সকল সৃষ্টিকর্মে জীবনের বাস্তব দিকগুলোকে প্রাধান্য দেন এবং তাকে নিপুণভাবে উপস্থাপন করে সমাজ- বাস্তবতার ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ করে। সমাজ জীবন থেকে সাহিত্য রসদ সংগ্রহ করে তাই সমাজবাস্তবতাই সাহিত্যের উৎকর্ষ কিংবা অপকর্ষ নির্ণয়ের মাপকাঠি অর্থাৎ সাহিত্য সমাজজীবনের প্রতিচ্ছবি। সাহিত্যের গতিধারার সঙ্গে জাতীয় জীবনের পরিবর্তনের সম্পর্ক অনেক ঘনিষ্ঠ। জাতীয় জীবনে নানা লক্ষণীয় ঘটনার সঙ্গে সঙ্গেই সাহিত্যের গতিধারার পরিবর্তন ঘটে।

লেখকের এই সমাজসচেতনতা, সমকাল-সতর্কতা, জাতীয় সংকটের স্বরূপ উপলব্ধি, সংস্কারমুক্ত উদারনৈতিকতা, নারীর প্রতি পক্ষপাত ও মানবকল্যাণ-স্পৃহা প্রভৃতি সমৃদ্ধ ও পরিপুষ্ট করেছে তাঁর বিষয়চিন্তাকে। একই সঙ্গে একবিংশ শতকের আধুনিক মনস্তাত্ত্বিক আবিষ্কারের সঙ্গে নিবিড় পরিচয়সূত্রে উপন্যাসের কাহিনি বিন্যাসে চেতনাপ্রবাহ রীতির অনুসরণ, তার উপযোগী ভাষা সৃষ্টি, সময় ও পরিসরের সংক্ষিপ্তিসাধন, নিরাসক্তি চেতনা, পরিমিতিবোধ, একমুখী গতি অব্যাহত রেখে উপন্যাসকে সুসংহত করা প্রভৃতির যৌথ সমবায়ে লেখক উপন্যাসের শরীরকে মণ্ডিত করেছেন শিল্পসৌন্দর্যে। আর বিষয়বৈভব ও শৈলীসৌন্দর্যের সুসমন্বয়েই লেখক হয়ে উঠেছেন বাংলাদেশের কথাসাহিত্যের ধারায় বিশিষ্ট ও গুরুত্বপূর্ণ।

লেখক : সহকারী অধ্যাপক, বাংলা বিভাগ, এমফিল গবেষক, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়

প্রাবন্ধিক ও সাহিত্যবিশ্লেষক

Leave a Reply

Your email address will not be published.

shares