উপন্যাস : প্রাচীনকালের যত নির্জনতা : ইমতিয়ার শামীম

সে অনেক দিন আগের কথা,―এ রকমভাবে কত গল্প যে শুরু হয়েছে এই পৃথিবীতে! অন্নপূর্ণার ধারণা ছিল, এভাবে শুধু গল্পই শুরু হয়। পৃথিবীটা এ রকম অনেক―অনেক অনেক দিন আগের গল্পে ভরা।

কিন্তু কী আশ্চর্য, একদিন অন্নপূর্ণার নিজের দিনও শুরু হলো এ রকম গল্পের মতো করে, এমন অনেক―অনেক দিন আগের কথা দিয়ে। অথবা, হতে পারে, সেটা ঠিক অত আগের কথা নয়; কিন্তু পড়ে থাকতে থাকতে, মনে না হতে হতে তাতে বোধহয় মরচে পড়ে গেছে, তাতে বোধহয় কেমন ফাঙ্গাস জমেছে, আর তাই মনে হচ্ছে, সে অনেক দিন আগের কথা …

অন্নপূর্ণা দুই হাঁটুতে আটকে রাখা শাকের ডালি এক পাশে সরিয়ে রাখে। দুই-চারটা দইনাচা পাখি আজ সকাল থেকেই খুব নাচানাচি করছে। রহস্যময় শব্দে কিচিরমিচিরও করছে মাঝেমধ্যে। এ রকমভাবে সে দইনাচাকে কোনও দিন ডাকতে শোনেনি। সচরাচর পাখিগুলো উড়ে এসে মাটিতে বসার আগে ডেকে ওঠে; আকাশের দিকে ওড়ার আগে মৃদু লহরি তুলে কিচিরমিচির করে। কিন্তু আজ সেরকমভাবে নয়; আজ তারা ডাকছে এক্কাদোক্কা খেলার ভঙ্গিতে, কখনও উঠোনের ঠিক মধ্যে, কখনও আবার উঠোনের কোণের অল্প অল্প ঘাসের মধ্যেও হাঁটতে হাঁটতে অথবা বিশেষ কোনও মুদ্রায় নাচতে নাচতে চলে যাচ্ছে। সেই দিকে তাকিয়ে থাকে সে কেমন আনমনা হয়ে। কিন্তু আনমনা হয়ে তাকিয়ে থাকলেও সে ভুলতে পারে না, কী আশ্চর্য, অনেক দিন আগে তার বিয়ে হয়েছিল, কিন্তু সেই কথা সে একদমই ভুলে গিয়েছিল। যেমন ভুলে গিয়েছিল বিয়ের পর বিধবা হওয়ার কথা।

কিন্তু যা কিছু অন্তত দুজনের স্মৃতি, তা বোধহয় পৃথিবী থেকে কখনওই হারিয়ে যায় না। যত প্রতিজ্ঞাতেই বাঁধা থাকুক না কেন, কেউ না কেউ বিশ্বাসঘাতকতা করে, কোনও না কোনও আদলে তা রেখে যায় অন্য কারও কাছে। আর তাই কোনও না কোনওভাবে সব কিছুই কারও না কারও ফের মনে পড়ে, কেউ না কেউ একদিন ভুলে যাওয়া কথা ফের খুঁজে বের করে নাড়াচাড়া করে দেখে। যেমন, আজ সে নিজেই নেড়েচেড়ে দেখছে সেই অনেক দিন আগের কথা। আর তার মনে পড়ে যাচ্ছে, মাঝখানে অনেক-অনেক দিন দুপুরের পর ট্রানজিস্টর আর না-বাজানোর দিনগুলোর কথা। মনে পড়ে যাচ্ছে, অনেক অনেক দিন সাইকেলের ক্রিং ক্রিং শব্দ শুনে তার বিকেলের দিকে ঘুম ভাঙেনি; আসলে অনেক অনেক দিন তো সে বিকেলবেলা ঘুমানোর সুযোগই পায়নি। এও দিব্যি টের পাচ্ছে অন্নপূর্ণা, আরও অনেকেরই মনে আছে অনেক কথা, এসব কথা। না হলে এমন ঘটবে কেন! সাতসকালে হনহনিয়ে কোত্থেকে যেন সুমিত কাকা আসবে কেন। সুমিত কাকা এল, দূর থেকেই সে দেখতে পেল চোখেমুখে আনন্দ উপচে পড়ছে তার। বহুদিন পর কাকা এসেছে দেখে অন্নপূর্ণাও তার পিছে পিছে এসে ঢুকেছিল বাবা-মায়ের ঘরে আর কাকা কোনও ভনিতা ছাড়াই বলে উঠেছিল, পূর্ণার জন্যে খুব ভালো একটা পাত্রের খোঁজ পাওয়া গেছে দাদা। আপনারা কিন্তু না করতে পারবেন না। লোকজনকে পাত্তা দেওয়ার কোনও মানে আছে ?

পূর্ণা,―মানে অন্নপূর্ণা বলতে চেয়েছিল, এতদিন পরে এলেন কাকা ? কিন্তু কাকা যেভাবে কথাবার্তা শুরু করল, তাতে তা আর বলার সুযোগ থাকল কই। শুধু বলার কেন, ওখানে তার দাঁড়িয়ে থাকার মতো পরিস্থিতিও থাকল না আর। আস্তে করে ঘর থেকে বেরিয়ে এল সে। বেরুতে বেরুতে মনে হলো তার, অনেক-অনেক দিন আগে তার বিয়ে হয়েছিল, ছাড়াছাড়িও হয়েছে অনেক দিন।

২.

মেঘের গর্জন নয়―আকাশে যেন আনন্দধ্বনি বাজছে এখন। ঢেউয়ের ওপর ঢেউ তুলে সেই ধ্বনি ছড়িয়ে পড়ছে সারা পৃথিবীতে। আসুক, এই মেঘ বৃষ্টি হয়ে নেমে আসুক দুনিয়াজুড়ে। চোখ দুটো একেবারে মেলে ধরে এ রকম ভাবতে ভাবতে আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকল জামাল। অনেক দূরে বিরাট মাটির একটা ধান সিদ্ধ করার কোলা অল্প অল্প ধোঁয়া ছড়াতে ছড়াতে হঠাৎ করেই যেন অবিশ্বাস্য গতিতে বিশাল এক কুণ্ডলি মেলে ধরল আর এক ফোঁটা বৃষ্টি এসে পড়ল তার ঠিক নাকের ওপর। ভ্যাঁপসা, ভীষণ ভ্যাঁপসা মনে হচ্ছে এই পুরনো সব খড়ের গাদা, গোয়ালঘর, গোবর জমিয়ে জমিয়ে সার করে ফেলার জায়গাটুকু; মনে হচ্ছে, সব কিছু থমকে গেছে হঠাৎ করেই, বৃষ্টি আর হবে না কোনও কিছুতেই। খুব হতাশা নিয়ে নিজের অজান্তেই গরুটার লেজ মুঁচড়ে দিলো সে, তাতে গরুটা তরাক করে একটু সরে দাঁড়ালো, পেছনের পা দুটিকেও উদ্দেশ্যহীনভাবে ছুড়ে মারল, কিন্তু ছুড়ে মেরেই যেন গুটিয়ে নিলো আবারও মোচড় খাওয়ার ভয়ে।

হতাশ জামাল এবার সিদ্ধান্ত নিলো, এক ছিলিম তামাক খাবে। আকাশ আর দুনিয়াটা তো একটু আগে থেকেই কেমন কালো হয়েছিল। কিন্তু সে হুকার টানে ছাপরার দাওয়ার দিকে পা ফেলতেই কড়ড়―কড়ড়―আওয়াজে আকাশটা ঝলসে উঠল, তীব্র বজ্র ছড়িয়ে পড়ল কোথায় যেন। তবে একবারই মাত্র। তার পরই ঝমঝমিয়ে বৃষ্টি নামতে শুরু করল পৃথিবী জুড়ে। কোনও তাড়াহুড়া নেই, জামাল ভিজতে ভিজতে উঠে এল ঘরের দাওয়ায়। আসলে তার ইচ্ছে করছিল একেবারে ভিজে যেতে। কিন্তু সেটা এই বয়সে, এই ৩০-৩১ বছর বয়সে ভালো দেখায় না। তার ওপর এইখানে ইদানীং ১০ রকমের লোকজন যখন তার ওপর ১১ রকম চোখে তাকিয়ে থাকে। তবে এই খেদ নাকি শঙ্কা, তাকে তেমন আটকাতে পারে না। মাঘের একেবারে শেষে, বসন্তকাল ছুঁতে ছুঁতে এই বৃষ্টি নেমে এল। তা ভালোই হলো। এখন নির্বিবাদে ক্ষেতে নতুন হাল দেওয়া যাবে। নরম মাটিতে রুয়ে দেওয়া যাবে নতুন চারা। যদিও কতটুকুই বা চেনে সে এখানকার মাটিকে! কিন্তু তাতে সমস্যা নাই। সমস্যা আসলে মানুষজনকে নিয়ে। মানুষজন তার দিকে তাকিয়ে থাকে কখনও অনিশ্চয়তা নিয়ে, কখনও জিজ্ঞাসা নিয়ে, কখনও কেমন কৌতুকজ্বলা দুই চোখ নিয়ে আর সে দিকে তাকিয়ে থাকতে নিজেকে ভীষণ ন্যাংটা ন্যাংটা লাগে। মনের কোনওখানে যে কু ডেকে ওঠে। কী এক অনিশ্চয়তার নৌকায় দোল খেতে থাকে সে। মনে হয়, অকুল এক দরিয়ায় ভীষণ অরক্ষিত সে।

তা মানুষজন যে এইভাবে তাকিয়ে থাকে, সেটার কারণও আছে। মানুষজন নিশ্চয়ই ভাবে, উড়ে এসে জুড়ে বসছে জামাল। এখন শামসুল সওদাগরের ক্ষেতখোলা দেখছে, কে জানে ব্যবসাবাণিজ্যও হয়ত দেখভাল করে একটুআধটু, আর দুই দিন বাদে পরিবারেরও দেখভাল করবে। তার পর কোনও একদিন সওদাগরের মেয়ের সঙ্গেই হয়ত বিয়ে হবে তার। একটা ছেলেও তো নেই লোকটার; যে চারপাঁচটা মেয়ে হয়েছিল, সেগুলোর মধ্যেও বেঁচে আছে এখন সাকল্যে এই সাহানাই। জামাল নিজে অবশ্য সেরকম ভাবে না, সেরকম সম্ভাবনাও দেখে না। পায়ের নিচে মাটি তার এই আছে, এই নেই; লোকজনের চাউনি আর ব্যবহারে ওরকম ইঙ্গিত যতই থাকুক, নিস্পৃহ ভঙ্গিতে না-বোঝার ভঙ্গিতে এড়িয়ে যায় সে। কিন্তু তার পরও লোকজন দেখে! কেউ দেখে ক্ষোভ-আক্রোশ নিয়ে, কেউ দেখে নির্দয় কৌতুক আর ছ্যাবলামো নিয়ে। তা দেখুক, সে যে এখনও নির্বিবাদে আছে এখানটাতে, এটাই তার বড় পাওয়া। সওদাগর তো ইচ্ছে করলেই তাকে তাড়িয়ে দিতে পারে। চাষের কাজ আর কতটুকু জানে সে! হয়ত জানত খানিকটা, কিন্তু যেটুকু জানত, সেটুকুও ভুলে গিয়েছিল; যদিও লোকজন বলে, চাষাবাদ, নাও বাওয়া আর সাঁতার কাটা মানুষজন নাকি কোনও দিনই ভোলে না। আরও একটা কথা বলে বটে, কিন্তু নিচু স্বরে―তা নাকি গুপ্ত বিদ্যা, কখনওই বলতে নেই; সে বিদ্যার নাম তির চালানো। তা হতেও পারে। কাজটা তো দেখা যাচ্ছে, সে খুব একটা খারাপ করছে না। শামসুল সওদাগর খুব ঘোড়েল মানুষ, প্রশংসা কখনও করতে জানে না, আর করলেও তার সঙ্গে সামান্য ‘কিন্তু’ রেখে দেয়। তবে এটা তো পরিষ্কার, কাজে না লাগলে সে এতদিন তাকে আটকে রাখত না। এইখানে এসে পড়েছে সে নিতান্তই দৈবপাকে। নইলে শামসুল সওদাগরের কেন আরও এক নৌকা বাড়তি মালপত্র কেনার ইচ্ছা হবে! কোথাকার কোন সোনাতলা বন্দর থেকে শুকনা মরিচ খুঁজতে খুঁজতে লোকটা গিয়েছিল চন্দ্রহারা চরে। আর সেখানকার শুকনা মরিচ তার এতই পছন্দ হয়েছিল যে, বাড়তি আরেকটা নৌকার দরকার হয়েছিল। তার চার ছিপনৌকা আর এক বজরা তো বোঝাই হয়ে গেছে কত কিছুতে।

জামাল সেই নাওঅলা না হোক, নাওয়ের মাঝি তো বটে। আকাশের দিকে তাকিয়ে তাকিয়ে দেখেছিল খুব ভালো করে। কেবল সে নয়, সওদাগর নিজে। এমনকি নাওঅলা মফিজ ব্যাপারিও। তার গুদারায় কত যে নৌকা আছে। কোনওটা মাল টানার, কোনওটা গরু কিংবা মহিষের গাড়ি টানার, কোনওটা আবার যাত্রী টানার। লোকে বলে, ১৩ নদীর পরেও নাকি লোকজন জানে এই মফিজ ব্যাপারিকে। আকাশ আর বাতাসের নাড়ি-নক্ষত্র তার মতো ভালো কে আর জানে! কী শলাপরামর্শ সে সওদাগরের সঙ্গে, কে তা জানে। বদর বদর বলে নাও ছেড়েছিল তারা ভোর রাতের দিকে। চাঁদটা তখন এসে চন্দ্রহারা চরের নাভিটাকে স্পর্শ করছে বলা চলে।

বাকিটুকু এখন আর ভাবতে চায় না জামাল। যা হয়েছে, ভালোই হয়েছে। চন্দ্রহারা চর তাকে ছাড়তেই হতো। ছেড়েছুড়ে কোন্ দিকে যে রওনা হতো নিজেও জানে না। কিন্তু নৌকাডুবি হলো বলে কোনও মতে সাঁতরে সওদাগরের নাওটায় ঠাঁই নিয়ে চলে আসতে পারল এই নিঝুমগাঁয়ে। নাওঅলা মফিজ ব্যাপারির এই খবরে খুশি হওয়ার কথা নয়। কিন্তু অখুশিও সে নিশ্চয়ই হয়নি, সওদাগর বোধহয় তাকে দাম একটু বেশিই দিয়েছিল ডুবে যাওয়া নৌকার। বাঙালি নদীতে শেষ রাতের জল কি একটু ঠাণ্ডাই হয় ? নাকি ক্লান্তি আর ভয়ে তার নিজের শরীরই ঠাণ্ডা হয়ে এসেছিল সেইদিন ?

তা আর কেইবা মনে করে!

সওদাগর হুকো ধরাতে বলেছিল তার মাঝিমাল্লাদের। বলেছিল, ‘চিন্তা কইর না, ব্যাপারিকে তো আমি কইয়াই নিছি, নাও যদি ডোবে, তাইলে ক্ষয়ক্ষতি সব আমার। মোহর গুনমু আমি।’

তা হলে শামসুল সওদাগর নিজেই কি চেয়েছিল, নাও ডুবে যাক ?! তা যদি সত্যি হয়, তা হলে এটাও ধরে নেয়া যায়, জামালকে সঙ্গে করে নিয়ে যাওয়ার কথাও সে ভেবেই রেখেছিল। তার মানে, সওদাগর হয়তো আরও আগে থেকেই খেয়াল করেছে তাকে আর এ-ও জেনে গেছে, যেন বানে ভেসে আসা একটা মানুষ সে, তার কোনও শিকড় নেই এই চন্দ্রহারা চরে। তবে কে-ইবা থাকতে চায় এই চরে, যেখানে ১২ মাসই শুটকির গন্ধ ভাসে, যেখানে প্রচণ্ড বৃষ্টির পানিতেও কেমন অঞ্জলির মতো ঘন হয়ে থাকে একরাশ চ্যাপা শুটকির ঘ্রাণ। মানুষজন এখানে থাকবে কেন ? আর যদিও বা থাকে, শেষ পর্যন্ত কয়দিনই বা থাকতে পারে! কতজনকে পালিয়ে যেতে দেখেছে তিন বছরে! কিন্তু তার কোনও সমস্যা হয়নি, বরং লোকজন যে পালিয়ে যেত, তাতেই বড় ভালো লাগত―যাক, আপদ গেল; নতুন কেউ এলে আসুক, তাকে ঘিরে তেমন কোনও কৌতূহল জেগে ওঠার আগেই শুঁটকিময় এ চরকে ভীষণ বিশ্রী লাগতে শুরু করবে তার, তার পর নিজেই একদিন বিদায় নেবে চন্দ্রহারা থেকে।

তবে আর সবাইকে না হয় সামাল দেওয়া গেল, ব্যাপারির কৌতূহলকে সে আটকিয়ে রাখবে কোন বাঁধ দিয়ে! দিন দিন তার দৃষ্টি হয়ে উঠছিল জিজ্ঞাসু থেকে দুর্বোধ্য অনির্দিষ্ট অস্থিরতাময়। অতএব সওদাগরের প্রস্তাবে সে না করেনি, চুপচাপ চলে এসেছিল। আর কী অদ্ভুত ব্যাপার―এখন মাঘের শেষে বৃষ্টি পড়ছে। নিশ্চয়ই তার যেমন, সওদাগরেরও এখন একইভাবে মনে পড়ছে খনার কথা―যদি বর্ষে মাঘের শেষ, ধন্যি রাজা পুণ্যি দেশ। যদিও সওদাগর বাড়িতে নেই, তার সদাগরি নাও আবারও ভেসেছে নদীতে―বাঙালি হয়ে সে যাবে করতোয়া দিয়ে মহাস্থানগড় বন্দরে। নাকি অন্য কোনওখানে ? বাড়ি থাকুক বা না থাকুক, সব কিছুই নাকি টের পেয়ে যায় সে পিঁপড়া আর পাখিদের মতো! ভাবতেই অবাক লাগে জামালের। কিন্তু সত্যিই কী এই রাজাকে ধন্যি বলা চলে ? এই জমিদারকে ? প্রশ্নটা নিয়ে নাড়াচাড়া করতে করতে কেমন থমকে যায় জামাল। এগোতেও পারে না খুব বেশিদূর, চিন্তাটা অন্যদিকে চলে যায়। সওদাগর এখন বাড়িতে নেই―এখন তার আরও অনেক সতর্ক থাকার সময়। গেল সপ্তাহেও নাকি ডাকাতি হয়েছে তালগাছিতে, এগারো ঘরের পুরো পাড়া একরাতেই ফকির হয়ে বসে আছে। তা এমন শীতের দিনেও যদি এমন ডাকাতি হয়, তাহলে বর্ষা আর শরতে অবস্থা না জানি কেমন দাঁড়ায়। কপালে ঠিক ভাঁজ-টাঁজ পড়ল কি না, অনুমান করতে পারে না জামাল। নিজের কপালের খবর এখন সে নিজেই জানে না। কল্কিতে তামাক পুরে ঢোকসা থেকে তুষের আগুন তুলে নিয়ে যত্ন করে ঢেকে দিয়ে শুধু হালকা টান দেয়।

আর তখনই বাড়ির মধ্যে থেকে সাহানার কথা ভেসে আসে, ‘গরু তোলা হইছে ভাইজান ?’

উত্তর দিতে থতমত খায় জামাল; কিন্তু দেরি করে না, ‘জে না। চাড়িত বাইন্ধা দিছি। আজান পড়ুক। হেরপর তুলি ?’

এ কথার আর কোনও উত্তর আসে না। কিংবা উত্তর দেওয়ার প্রয়োজন বোধ করে না সওদাগরের মেয়ে। তবু জামাল কয়েক মুহূর্ত অপেক্ষা করে। কিন্তু সত্যিই সাহানা আর কিছু বলে না। তবে যত নিচু গলাতেই বলা হোক না কেন, বুড়ির মানে সাহানার দাদির খনখনে, হিসহিসানো তীক্ষè কথাটা সে স্পষ্ট শুনতে পায়, ‘কামলা-জামলার সঙ্গে অত কথা কিসের তোর ?’

সেটা ঠিক, কামলাই তো জামাল। মুহূর্তে সে তার অতীতের সব কিছু ভুলে যায়, মুহূর্তে তার পুরো শরীরটা কেমন নির্ভার হয়ে পড়ে। নিশ্চিন্তে সে হুকো টানতে টানতে আকাশ দেখতে থাকে। নাহ্, মনে হয় না, বৃষ্টিটা নামবে। তা হলে, কী মুসিবত, ক্ষেতে লাঙল বসাতে তো ভারি সমস্যাই হবে দেখা যাচ্ছে। এতে তার কিছু যায় আসে না। সে তো আর জমির মালিক না, বর্গাদারও না। বৃষ্টি না হলে, মাটি না ভিজলে, ঠিক সময়ে বীজ ছড়াতে না পারলে ক্ষতি যদি হয়, তা হবে শামসুল সওদাগরের। আবার ক্ষতিই যে হবে, সেরকমও না। অনেক জমি সওদাগরের। সারা বছরের খাইখরচা অন্য কোনও জমিজমা থেকে পুষিয়ে যাবে তার। তাছাড়া, সবচেয়ে বড় কথা হলো, খাওয়া-পরার জন্যে কি সওদাগর এইসব জমিজমার ধার ধারে না কি ? তার হলো ব্যবসার হাত। সব মানুষের হাত একরকম হয় না, এ জামাল ছোটবেলা থেকে দেখে আসছে। তার এক চাচা আছে, (আছে নাকি এতদিনে মরে গেছে কে জানে!), তার হাত গাছ লাগানোর। কী যে বরকত আছে তার হাতে, যা লাগায় তাই থনথনিয়ে বাড়ে, তাই ফুলেফলে ভরে যায়, বেলেমাটিতেও ঘন সবুজ ফসল জন্মায় তার হাতে। পাশাপাশি ক্ষেতে চাষবাস করত তার বাপে আর চাচাতে, কিন্তু ফসল দেখেই বোঝা যেত, কোন্টা তার বাপের আর কোন্টা তার চাচার। সওদাগরও তেমন―তার হাত ব্যবসার। নিজের চোখেই তো দেখছে জামাল, সওদাগরের এক নাও ভাসানোর মানেই সাত নাও ধন নিয়ে ফেরা। সওদাগরের এক নাও দরিয়ায় ডুবে যাওয়ার মানে সাত নাও ভেসে ওঠা। নাও ডুবলেই বোধহয় বেশি খুশি হয় সওদাগর। তখন সে বোধহয় নিশ্চিত হয়ে যায়, সাতগুণ করে আল্লায় ফিরিয়ে দেবে ওই এক নাওয়ের মাল।

কিন্তু কী আশ্চর্য, এখন পর্যন্ত, একদিনও সওদাগর শুনতে চায়নি কোন মুল্লুকের মানুষ জামাল। শুনতে চায়নি কার ছেলে সে। নাও যখন ডুবে গেল, সেও তো তখন ডুবু-ডুবুই, আর শীতও লাগছিল ভীষণ রকম; তখন মাঝিদের উদ্দেশে তাকে শুইয়ে দেয়ার কথা বলার পর সওদাগর শুধু বলেছিল তাকে, ‘ব্যাপারি কি গাইলমন্দ কইরবে তোমাক ?’

তা করবে না আবার! নৌকার দাম, সওদাগরের মালপত্রের দাম আর তার ‘অবহেলার’ দাম নিশ্চয়ই দিতে হবে তাকে। উত্তর না দিয়ে জামাল তাই ঘুমিয়ে পড়ার চেষ্টা করেছিল। আর ঘুমিয়েও গিয়েছিল। ঘুম থেকে উঠেছিল অনেক বেলায়। আর চোখ মেলতে পারছিল না তীব্র রোদের ঝাঁজে। কোনওমতে তাকিয়ে দেখেছিল, চারপাশে কেবল জল আর জল। এই জল, এই নদীবাসই নাকি বড় বেশি প্রিয় সওদাগরের।

কিন্তু আজ কি আর ঘুম আসবে ? বৃষ্টি বোধহয় একটু জোরেই আসছে এখন। খোলা খোয়াড়ে বাঁধা গরুগুলো অস্থির হয়ে কয়েকবার ডাক ছাড়ল, মনে হয়। কিন্তু সে ডাক ছাড়িয়ে তারস্বরে চিৎকার করছে সওদাগরের মা, ‘জামাল―এই জামালের বাচ্চা―কোনে গেলি ? গরুগুলা ভেজে আর তুই বইসা বইসা হুকা টানিস ?’

হোক না বাড়ির মধ্যে থেকে, হোক না আড়ালে দাঁড়িয়ে মুখ না দেখিয়ে, কিন্তু কথা তো বলেছে সাহানা তার সঙ্গে! বুড়ির খুব লেগেছে তাতে। এখন তাই এইভাবে চিল্লাচিল্লি করে রাগ খসাচ্ছে। হুকা নামিয়ে হাসতে হাসতে জামাল দৌড় দেয় গোয়ালে গরু তুলতে।

৩.

বজরার ছাদে শুয়ে আকাশের দিকে এইভাবে তাকিয়ে থাকতে কী যে শান্তি লাগে! শামসুল সওদাগর এই মজা পেয়েছে ঘোর শৈশবকালেই। সেই বজরা এসেছিল অমর ব্যানার্জীদের ঘাটে। অমর ব্যানার্জীর কন্যাকে বিয়ে করতে এসেছিল বালিয়ার জমিদার রঞ্জন রায়ের ছেলে। বজরায় পাহারাও ছিল বটে। কিন্তু কীভাবে কোন ফাঁকে সে যে সেই বজরার ছাদে গিয়ে চড়েছিল, এখন নিজেরও ভালো করে মনে পড়ে না। তবে ব্যাপারটা যে দুঃসাহসিক ছিল, তাতে কোনও সন্দেহ নেই।

সবচেয়ে বড় কথা, ওইভাবে ছাদে গিয়ে ওঠার পর সেখানে শুয়ে আকাশ দেখতে দেখতে কখন যেন সে ঘুমিয়েও গিয়েছিল। অনেক রাতে, কোনও এক মাঝি এসে আবিষ্কার করেছিল তাকে। তবে কোনও হূলস্থূল হয়নি। সেয়ানা মাঝিমাল্লা, বুঝতে পেরেছিল, কোথাকার কোন চাষার ছেলে এসে বিয়ের বজরার ওপর ঘুমাচ্ছে, এ খবর জানাজানি হলে তাদেরই ক্ষতি হয়ে যাবে। তারচেয়ে চেপে যাওয়া ভালো।

তার মানে, ক্ষতি হয়―সবারই ক্ষতি হয়। ক্ষতি যাতে না হয়, সেজন্যে কখনও কখনও ক্ষতি চেপে যেতে হয়, ঢেকে রাখতে হয়। ঘাড় ধাক্কা আর চড়থাপ্পড় খেতে খেতে বজরা থেকে নেমে দৌড়াতে দৌড়াতে শামসুল দেখেছিল সেইদিন, কে যেন কিসের জন্যে বজরার ছাদে জল ছিটাতে শুরু করেছে।

এখন কেমন ঘটনা এটা, সেই শামসুলের নামের সঙ্গে, কথায় কথায় চড়থাপ্পড় মারা শামসুলের নামের সঙ্গে মানুষজনকে কি না সওদাগর বলতে হয় এখন অষ্টপ্রহর। কতটুকুই বা তার ব্যবসা-বাণিজ্য! তবু নাও নিয়ে বলতে গেলে সারা বছরই নদীবাস করে বলে লোকজন সওদাগরই বলে তাকে, সমীহও করে। এইভাবে আর ১০ জন শামসুল থেকে আলাদা হয়ে পড়েছে সে। বালিয়াতে এখন এত মশা, সেটা তার জানা ছিল না। জানা থাকলে আরও একটু এগিয়ে সোলাপুরে নাও ঠেকাতে বলত সে। হয়ত সেখানেও মশা আছে, আপাতত এই সান্ত্বনা নিয়ে ছাদে উঠে এসে শুয়ে আছে সওদাগর। রাত বাড়ছে আর তাই এখন শান্ত নিঃস্তরঙ্গ নদীর জলের ধ্বনি যেন ধীরে ধীরে সুস্পষ্ট হয়ে উঠছে। খুব ধীরে একটা স্রোত বয়ে যাওয়ার শব্দ সব কিছুকে ছাপিয়ে অবিরাম বয়ে চলেছে তার কানের ভেতর দিয়ে।

আসার আগে সাহানা বলেছিল তাকে, ‘আর ক্যান আব্বা ? আর কত ? কম তো নাই তোমার। আর যা আছে, তাও তো বারো ভূতে খাবে। তাও তুমি বছর বছর দেশান্তরী হও!’

সাহানার এই কথা কি আর ভাই না থাকার আক্ষেপ থেকে বলা! সেরকম নিশ্চয়ই নয়। বয়স বাড়ছে তার। হয়ত সে কারণেই বলা। আবার এমনও হতে পারে, নিজের দাম নিয়ে কষ্ট থেকে বলা। তবে সবচেয়ে বড় তো ওই দেশান্তরী হওয়ার ব্যাপারটা।

যে গাঁয়ে তার বাস, তা থেকে কেউ পাঁচ-ছয় ক্রোশ দূরে এলেই সে মানুষ দেশান্তরী হয়ে যায়। আর শামসুল সওদাগর কোনখানে যাবে, তা ঠিক করে নদীতে নাও ভাসিয়ে। তাহলে মেয়ে তাকে দেশান্তরী বলতেই পারে, নাকি ? তবু এমন কোথাও কি যেতে পারে সওদাগর, যার ফলে বলা চলে, আরেক দেশে চলে এসেছে সে ? তার পরও এ বোধহয় দেশান্তরীই হওয়া। দিনের পর দিন সে আছে নদীবাসে এই বজরায়। মাঝে মধ্যে, ধারে কাছের বন্দর হলে অবশ্য ছোট নৌকাই ভাসায় সওদাগর। আর সেগুলোকে লোকে কেন যে বোট বলে, সেটা তারাই জানে। কিন্তু তার পছন্দ বজরাই। তবে নৌকার কথা থাক, সাহানা যে বলেছিল, বারো ভূতে খাবে তার সব কিছু, এ তো আর নতুন কিছু নয়। নিশ্চয়ই লোকজন আড়ালে আবডালে সেরকরমই বলাবলি করে। আর লোকের কথা বলে কী হবে, তার মা-ই তো তার বউকে শুনিয়ে শুনিয়ে কতবার ওই কথা বলেছে। তা শুনে কিংবা শোনার আগেও রমিজাকে কখনও সখনও সান্ত্বনা দিতে গিয়ে কতবারই তো তার মনে হয়েছে, একদিন না একদিন একটা ছেলে নিশ্চয়ই হবে। অথচ মানুষের আশা কখনও কখনও বিপজ্জনক, কেননা তা তাকে বিভ্রান্ত করে ফেলে। আর বিভ্রান্তির জাল যখন ছড়িয়ে পড়ে, তখন একদিন চলে যায় যে, ছিঁড়ে বেরিয়ে আসার শক্তি খুঁজে পাওয়া যায় না। বরং নিঃসাড় বিভ্রান্তিতে ডুবে থাকতেই বড় ভালো লাগে। তার এখন তেমনই এক কাল―নইলে চন্দ্রহারা চরে প্রতি বছরই তাকে যেতে হবে কেন! যে চর তাকে শুকনা মরিচ ছাড়া আর কিছুই দিতে পারে না, কেন সে বার বার ছুটে যায় সেই চরে! একদিন না একদিন একটা ছেলেপুলে হবে―চন্দ্রহারা তো তার এই মোহ ভেঙে দিয়েছে, হাতে কলমে জানিয়ে দিয়েছে তাকে, সবার ছেলে হয় না, কারও কারও কেবল মেয়েই হয়; তবু কেন বার বার ছুটে যায় সে চন্দ্রহারাতেই ? মোহ থেকে পাওয়া এত যে যন্ত্রণা, তা থেকে সে কেন মুক্ত হতে চায় দায়িত্ববোধ দেখিয়ে ?

শামসুল সওদাগর আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকে, তারা দেখে, মনে মনে হিসেব কষে―ওই যে, ওইটা বোধহয় কালপুরুষ। বসন্তের ছোঁয়ায় কেমন উজ্জ্বল হয়ে উঠছে। হঠাৎ কী মনে হয় তার, গলা চড়িয়ে বলে ওঠে, ‘তুমি তারা নক্ষত্র চেনো না, আবদুল গাফফার ?’

ধড়ফড়িয়ে সোজা হয়ে উঠে বসে আবদুল গাফফার। নৌকা নোঙর করেছে, এই পূর্ণিমাবিহীন রাতে আর হাল ধরে পাল তোলার কোনও সম্ভাবনা নেই। তবু সে বজরার গলুইয়েই শুয়েছিল। হয়ত ঘুমিয়েও গিয়েছিল। আসলে এইভাবে গলুইয়ে শুয়ে ঘুমিয়ে পড়া তার অভ্যাস হয়ে গেছে। হোক না নোঙর করা, হালের মাঝিকে থাকতে হয় হালের কাছেই, এ ভিন্ন অন্য কিছু চিন্তা করা এখনও শেখেনি সে।

‘ঠিকঠাক চিনি না চাচা। দরকার হইলে আল্লার নামে আসমানের দিকে চাই―খোয়াজ-খিজির চিনায়ে নেয়।’

‘হ, তারাই তো চিনায়।’―টিটকারি নয়, কিন্তু বিশ্বাস থেকেও নয়, কী এক অনিশ্চিত নির্ভরতার স্বর বেজে ওঠে সওদাগরের গলায়। লোকে বোধহয় তাকে এই স্বরের কারণেই সমীহ করে, কখনও কখনও এ রকম মনে হয়।

আবদুল গাফফার অনুমান করার চেষ্টা করে, তার মালিক আসলে কী বলতে চায়। কিন্তু কিছুই যখন বুঝতে পারে না, তখন সংশয়ে দুলতে দুলতে শেষ পর্যন্ত বলেই ফেলে, ‘নোঙর তুইলবার কন, চাচা ?’

‘নোঙর ক্যান তুইলবা ? ঘুমায়া নাও। আর কইতেছি যে, এমুন কেউ নাই, তারা-নক্ষত্র চেনে ? একটু চিইনা রাখতাম।’

এই ব্যাপারে সওদাগর তো মফিজ ব্যাপারির সঙ্গেই কথা বলতে পারে। কিন্তু বলে না কেন, ঠাহর করতে পারে না আবদুল গাফফার। এখন বুড়ো মাঝি একাব্বরের কথা বলা যায় সওদাগরকে; কিন্তু কেমন যেন ঈর্ষা কাজ করে আবদুল গাফফারের মধ্যে। তার এই মাতব্বরির মধ্যে কোত্থেকে কোন একাব্বর এসে ঢুকবে আর সে চেয়ে চেয়ে দেখবে! অতএব ব্যাপারটা সে ঝুলিয়ে রাখে, ‘তা হলে চাচা, খোঁজখবর নিয়া দেহি।’

‘তা নেও। কাইল দুপুরের আগে বন্দরে পৌঁছাইতে পারবা না ?’

আবদুল গাফফার নদীর দিকে তাকায়। স্থির নদী, কেবল গভীরভাবে চোখ অনুভব করা সম্ভব, কত সূক্ষè মরিচিকা ঢেউ তুলছে তার জলস্রোতে। বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এই স্রোত নিশ্চয়ই উজানের দিকে গড়াবে। তা হলে দুপুরের আগে কী করে বন্দরে পৌঁছান সম্ভব! একি আর ছেলের হাতের মোয়া! কিন্তু সে কথা কি সওদাগরের মুখের সামনে বলা ঠিক হবে!

‘চেষ্টা করমু চাচা।’

‘পারবা না বোধহয়।’

বলে শামসুল সওদাগর চুপ হয়ে যায়। মাঝিমাল্লার সঙ্গে এর বেশি আলাপ-সালাপ আর কতটুকু হতে পারে! কিন্তু তার তো ইচ্ছে করছে, আজ সারা রাত ধরে কথা বলতে। তাদের পরিবারের লোকজন কত তাড়াতাড়ি মরে যায়, অথচ সে এখনও এই ৬০ পেরিয়েও কেমন দিব্যি সুস্থে বেঁচে আছে! এখন আর বেঁচে থাকা নিয়ে কোনও স্বপ্নই নেই তার। তাই বলে মরেও তো যেতে চায় না। আবার স্বপ্ন একদমই নেই, সে কথাই বা বলে কী করে! যেমন মাঝে মাঝে যে মরে যেতেও ইচ্ছে করে, সে কথাও তো অস্বীকার করতে পারবে না সে। এমনকি হতে পারে না, হঠাৎ কোনও এক কৃষ্ণরাতে আবারও জেগে উঠবে তাদের শরীর, আর মাসদশেক পরে দেখা যাবে নবজাতক ছেলের চিৎকারের সঙ্গে সঙ্গে ছড়িয়ে পড়ছে তার মায়ের আনন্দউল্লাস, ‘আজান দিতে কও―আজান দিতে কও শামসুক―’…

এসবই কল্পনা, নিছক কল্পনা, কল্পনার সুখ। কিন্তু তবু বজরার ছইয়ের ওপর শুয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে তাকিয়ে ভাবতে ভালো লাগে শামসুল সওদাগরের। মাকে নাতির মুখ দেখাতে পারল না আর বউকে একটা ছেলে দিয়ে নির্ভাবনায় ভাসাতে পারল না বলে আবার মৃত্যুর সঙ্গে মিশে যেতেও তো ইচ্ছে করে ভীষণভাবে। জীবন ভারি অদ্ভুত, এ কথা এখন ভাবতে পারে সে। আর এ-ও তো জানা হয়ে গেছে যে, জীবনের কাছে জীবনটাকে বন্ধক দিয়েই বেঁচে থাকতে হয় প্রতিটি মানুষকে। তবু কেন তার এমন ক্ষোভ আর ঘৃণা জেগে ওঠে নিজের ওপরে! যতবার নারীর কাছে গেছে সে, গেছে নারীদের কাছে, ততবারই কি এই ক্ষোভ আর ঘৃণাই জমেছে শেষ পর্যন্ত ?

কিন্তু কোথাও দূরে কি কোথাও কোনও চিৎকার শোনা যাচ্ছে ?

সওদাগর কান পাতে আকাশের পানে, বাতাসের পানে। কিন্তু কোনওখান থেকেই কোনও সাড়া আসে না। তবে তার এই অস্থিরতা খেয়াল করেই বোধহয় কেবল আবদুল গাফফার বলে ওঠে, ‘তামাক সাজামু চাচা ?’

‘সাজাইবা ?’―খানিকক্ষণের জন্যে বোধহয় দিশেহারা লাগে সওদাগরকে। এরকম দিশেহারাই তো হয়েছিল সে প্রথমবার বাণিজ্যে বেরিয়ে। তা যদি না বের হতো জীবন যে এত ঐশ্বর্যময়, তাও কি জানা হতো তার! তাছাড়া বন্দরে একটা দোকান তুলে বসে থাকা কিংবা গাঁয়ে একটা ছাপরা দিয়ে বসে থাকা―ওকে কি আর বাণিজ্য করা বলে ? বাণিজ্য তো নিজের হাতে নিজের ভাগ্য নিয়ে খেলা করা। তা কি আর সবাই করতে পারে ?

হয়ত তার আত্মগত প্রশ্নটিকেই উত্তর ভেবে নেয় আবদুল গাফফার। তাই নিজে থেকেই তামাক সাজিয়ে হুকার নলটা বাড়িয়ে ধরে সওদাগরের দিকে। রাতের আকাশ এখন কেমন ফিকে হয়ে আসছে। টানতে টানতে সেদিকে তাকিয়ে হঠাৎ থেমে যায় সওদাগর। অস্পষ্ট কণ্ঠে সে বলে আবদুল গাফফারকে, ‘সকালে নাও চালাইবা সিধা। দুপুরের আগেই ভরা নদী পাড়ি না দিতে পারলে সোজা বাম দিকে কাইটা যাইবা, কেমুন ?’

আবদুল গাফফারের মুখ কেমন হা হয়ে আসে। কিন্তু আগেও তো এমন হয়েছে―হঠাৎ এইভাবে সওদাগর অন্যদিকে নৌকা নিয়ে যেতে বলেছে। তবু এখন কেন যেন প্রতিবারই অবাক হয়ে যায় সে। প্রতিবারই কারণ জানার সংগোপন কোনও ইচ্ছা জেগে ওঠে মনের মধ্যিখানে।

৪.

সখিনা বেওয়া―এখন আর কেউ তাকে এই নামে ডাকে না। আর না-ডাকার কারণও তো আছে। সে তো এখন শামসুল সওদাগরের মা। শামসুল যদি সওদাগর না হতে পারত, তা হলে হয়ত তাকে এখনও ‘বেওয়া’ বলা যেত; কিন্তু এখন তাকে নাম ধরে ডাকতে কেমন লাগে না! তবে তার পরও এখনও তাকে সালমা নাম ধরেই ডাকে। যদিও মাঝেমধ্যে দ্বিধাগ্রস্ত হয়, তবু সখিনা বেওয়ার আন্তরিকতাই তাকে বার বার উৎসাহিত করে ‘সখিনা’ বলে ডাকতে। একবারই এই দ্বিধা এসেছিল খুব শক্ত করে। পাল্টে যাওয়ার চিহ্ন তখন স্পষ্ট হয়ে উঠছে শামসুলের। এর আগে তা ছিল কেবল খাওয়াদাওয়ায়, কাপড়চোপড় আর কেরোসিন তেল কেনায়। কিন্তু সেবার ঘর তুলতে লাগল সওদাগর, টিনের চৌদুয়ারি ঘর, কিন্তু মেঝে যাকে বলে শান করা। সেইবার সখিনা বেওয়ার কাছে যেতে যেতে সালমার জবান কেমন বন্ধ হয়ে আসছিল। জন খাটিয়ে ঘর তুলছে শামসুল, তাও একজন দুই-তিন জন নয়, কয়জন তা গুনে দেখতে হয়।

বাড়ির মধ্যে উঠানে জলচৌকির ওপর বসে পান চিবুচ্ছিল সখিনা বেওয়া। মনে হচ্ছিল, আগের চেয়েও ফর্সা হয়েছে।

এ কি সেই সখিনা, যাকে সে দেখেছিল শ্বশুরবাড়িতে এসে চোখ আর নাকের জল এক করে কাঁদতে ? তাকে সান্ত্বনা দিতে গিয়ে কানের কাছে মুখ নিয়ে খুবই নিচু স্বরে বলেছিল সালমা, ‘কাইন্দ না বইন, এই গাঁয়ে তুমিও পরের বাড়ি থাইক্যা আসা, আমিও আরাক গেরাম থেইক্যা আসা―’

কোনও কোনও কথার নিশ্চয়ই শক্তি আছে। না হলে এ কথা শোনার পর ধীরে ধীরে সকিনার কান্না কমে এসেছিল কেন। আর প্রতিটা গ্রামই তো আরও কত গ্রাম থেকে চিরতরে চলে আসা কত নারীরও আবাস। কিন্তু তার গুনে গুনে কেবল এই সালমার সঙ্গেই এত খাতির হয়ে যাবে কেন!

কিন্তু জলচৌকির ওপর বসে থাকা সখিনাই তার সব দ্বিধাদ্বন্দ্ব দূর করে দিয়েছিল, ‘এতদিনে তোমার আসার সময় হইল বইন ?’

তা এই অভিযোগ করতেই পারে সখিনা বেওয়া। একই গ্রামে বাস, কিন্তু আরেক গাঁয়ের মেয়ে বলে কথা। সন্তান জন্ম দিয়ে, নাতিপুতির দাদি-নানি হয়েও আরেক গাঁয়ের গন্ধ কিছুতেই দূর করা যায় না। তাই বধূ হয়ে আসার পরও চলতে হয় রয়েসয়ে। ভাগ্য ভালো থাকলে পুকুর কিংবা পাগাড়ের ধারে দেখা হয়ে যায়। না হলে কোনও উছিলার অপেক্ষায় দিন কাটাতে হয়।

তবে এখন বয়স এতই হয়েছে যে, উছিলা পেলেও আসার শক্তি জোটে না। না শরীর থেকে, না মনের মধ্যে থেকে। কিন্তু আজ যা ঘটেছে, তাতে না এসে উপায় নেই। হাঁপাতে হাঁপাতে দাপাতে দাপাতে সে যেন পারলে লুটিয়ে পড়ে সখিনারই পায়ে।

সালমা বেওয়াকে দেখেই সখিনা বেওয়া বলেছিল মর্জিনাকে, ‘কাঁসার গ্লাসে কইরা পানি নিয়া আয় তো …’

কিন্তু সালমার কি আর সেই পানি পানের সময় আছে ? সে শুধু কাঁদে আর কাঁদে। কাঁদতে কাঁদতে কী যে বলে, তা কেবলই জড়িয়ে যায়, কিছুতেই বোঝা যায় না। অনেকক্ষণ পর অনেক কষ্টে তার সেই কান্নার অর্থ খুঁজে পাওয়া যায়। সালমার ছেলে আর নাতিকে নাকি জমিদারের পাইক-পেয়াদা ধরে নিয়ে গিয়েছিল কাল সন্ধ্যায়। তাদের নাকি আর কোনও খবরই মিলছে না। শুধু কি তাই, জমিদারের পাইক-পেয়াদা নাকি বলছে, তারা নাকি কাউকে ধরে নিয়ে যায়নি।

জমিদার মানে কৃষ্ণ বল্লভ রায়। শুধু নামই শুনেছে তার সখিনা বেওয়া। কখনও দেখা হয়নি, দেখা হওয়ার কখনও দরকার পড়েনি, কখনও ইচ্ছেও জাগেনি। স্বামী তার মারা গেছে অল্প বয়সেই; তার পরও শামসুল কী করে যে দাঁড়িয়ে গেল, কে তা জানে! টাকাপয়সা আর জায়গাজমি নিয়ে শামসুল কখনও তার সঙ্গে তেমন কথা বলে না। তাছাড়া বললেও সে বুঝতে পারত না। এটা ভাগ্য কি না জানে না সখিনা, কিন্তু তার মনে হয়, সে যে রান্নাবান্নাটা ভালোভাবে করতে পারে, ঘরদোর দেখাশোনা করে রাখতে পারে, কোন সময় কোন বীজ কোন ক্ষেতের জন্যে দিতে হবে, সেই বীজ কীভাবে রাখতে হবে―এইসবও ভালোভাবে বলে দিতে পারে, এটাই বা কম কিসে ? সে না থাকলে এসব নিয়ে শামসুল যে কী মুশকিলে পড়বে, তা ভাবতে গেলে, তার মাথার ওপর আকাশ ভেঙে আসে। শামসুলের একটা বউ আছে বটে, কিন্তু সেই হালিমাকে এতদিনেও কী এইসব ভালো করে শেখাতে পারল সে! এই অতৃপ্তি অবশ্য গভীর এক তৃপ্তিও দেয় তাকে। এতই সহজ কি, উড়ে এসে জুড়ে বসে তার এতদিনের এই বিদ্যা অর্জন করা ? তবে কথা সেখানে নয়, কথা হলো, কৃষ্ণ বল্লভও নাকি একবার বেশ মোটা টাকার ঋণ নিয়েছিল শামসুলের কাছ থেকে। শামসুলের কাছে কখনও সে অবশ্য জিজ্ঞেস করেনি এসব; কিন্তু এতে কোনও সন্দেহ নেই, টাকাটা সত্যিই ঋণ দিয়েছিল তার ছেলে। তবে ফেরত পেয়েছে কি না বলা মুশকিল। অথবা এটাও হতে পারে, শামসুল আসলে ফেরত পাওয়ার জন্যে ওই ঋণ দেয়নি। খাজনার টাকা সেই দিনই নাকি জমা দেয়ার কথা ছিল কৃষ্ণবল্লভের। চাইলে শামসুল জমিদারকে টাকাটা কর্জ না দিয়ে জমিদারিটাই নীলামে কিনে নিতে পারত। কিন্তু সেটা সে করতে যায়নি। বউকে নাকি বলেছিল, ‘এক এলাকায় থাকি। এইসব কইরা ফ্যাসাদ বান্ধানের কোনও মানে হয় ?’

তা কথাটা অবশ্য ঠিক। কিন্তু সখিনা বেওয়া বিস্তারিত শোনেনি। অথবা বিস্তারিত শোনার ক্ষমতাও ছিল না তার। সূক্ষè একটা ঈর্ষা বয়ে গিয়েছিল শরীরের মধ্যে দিয়ে। ছেলে ব্যাপারটা নিয়ে বউয়ের সঙ্গে কথা বলেছে, অথচ তাকে কিছুই বলেনি, এই অধিকারহীনতা লুকিয়ে রেখেছিল ব্যাটার বউয়ের সামনে সে ভীষণ এক ঔদাসীন্য দিয়ে, ‘আমিও তো তাই কই―ফ্যাসাদে যাওয়ার দরকার কী ? ট্যাকাটুকা দিছ, ঠিক আছে। যদি কইলজা থাকে, সারাজীবন স্বীকার কইরবে, অমুকের ব্যাটা আমাক বিপদের দিনে রক্ষা করছিল’। তার সে কথা শুনে নিশ্চয়ই ব্যাটার বউয়ের মনে হয়েছিল, ছেলে তার সঙ্গেও পরামর্শ করেছে!

সেই জমিদার কৃষ্ণ বল্লভ সালমার ছেলে-নাতিকে তুলে নিয়ে গেছে; পাইক-পেয়াদা পাঠিয়ে তুলে নিয়ে যাওয়া মানে তো আসলে নিজে এসেই তুলে নেওয়া। আবার এও হতে পারে, জমিদার কিছুই জানে না এইসবের, পাইক-পেয়াদা নিজেরাই দুই-চারটা পাই-পয়সা পেতে এই কাজ করে বসে আছে। কোনটা ঠিক আর কোনটা বেঠিক, কে বলবে।

গুমড়ে গুমড়ে এখনও হা-পিত্যেস করছে সালমা। আর তাতে বাড়ির সবাই উঠানে এসে জড়ো হয়েছে। সবাই মানে মহিলারা; সওদাগর না থাকলে এই বাড়িটা একেবারেই নারীদের ঘরদোর হয়ে হয়ে যায়। অনেক চেষ্টায়ও তো শামসুলের আর কোনও ছেলেপুলে হলো না, যারা হলো সবই মেয়ে―তাও মরে গেল কেমন পটপটিয়ে! ভাবতেই গা হাত পা হিম হয়ে আসে সখিনার। এখন একমাত্র একজন এই সাহানা এসে তার গা ঘেঁষে বসেছে, জলচৌকিতে না বসে ছোট একটা পিড়ি নিয়ে বসেছে তার মা হালিমা। কাজের মেয়ে মর্জিনা এত কাছে আসার সাহস রাখে না, খোলা রান্নাঘর থেকে বেরিয়ে একটু সামনে এসে কাঠাল গাছটার নিচে দাঁড়িয়ে আছে সে। এই বাড়িতে একজনই পুরুষ এখন―সে ওই জামাল। তাকে কখনও খুবই কাজের মনে হয় সখিনার, কখনও মনে হয় একেবারেই অকর্মা। তার ওপর এই ব্যাপারে ভরসা করা তো ঠিক হবে না।

তবু দোমনা গলায় বলে সখিনা, ‘কামলাক পাঠায়া খোঁজ নিতে পারি সালমা। কিন্তু কাজ কি হইবে তাতে ? শামসু থাকলে একখান কতা ছিল।’

হালিমাও সায় দেয় তার কথায়, ‘হ―ঘটনা যাই ঘটুক, মুখ দিয়া একখান কথা বাইর কইরা ফ্যালাইছে; কামলা পাঠায়া কি আর নতুন কিছু জানা যাবে ? আপনের ছেলে থাকলে, আপনে যদি বলতেন, হে গেলে তখন একখান কথা আছিল।’

এই ২০-২১ বছরের সংসারে বেশ ভালো করেই বোঝা হয়ে গেছে হালিমার, শাশুড়ির সঙ্গে গলাটা কেমন করলে তার মন গরমকালের তরমুজ হয়ে যায়। ভেবেচিন্তে এ-ও দেখেছে সে, সব কিছু নিয়ে কথা বাড়িয়ে নিজের দাপট দেখানোর কোনও মানে নেই। সংসারে যা ঘটার, তা আপন নিয়মেই ঘটবে। তাছাড়া এই সংসার এখন আর তার ভালোও লাগে না। সাহানার বিয়ে হলে গেলে এই সংসারটার দশা কী হবে, তা মনে হলেই দুনিয়া থেকে নাই হয়ে যায় সে। এমন একটা ছেলে যদি পাওয়া যেত, যার কোনও বাড়িঘর নাই, অথচ জ্ঞানবুদ্ধিতে ভারি টনটনে, ভক্তিশ্রদ্ধাও করতে জানে―তাহলে না হয় কথা ছিল। সাহানার সঙ্গে বিয়ে দিয়ে তাকে ঘরেই রেখে দিতো। কিন্তু ওরকম কি আর এই যুগে পাওয়া সম্ভব!

তবে বৈধব্য এলেও সখিনাকে বৈরাগ্য এখনও পায়নি। ব্যাটার বউ এইভাবে কথা বললে তার বেশ ভালো লাগে। খুশি-খুশি গলায় সে-ও সঙ্গে সঙ্গে বলে, ‘আমার বলা আর তোমার বলা বইলা কথা না, মুখ দিয়া একখান ক্যান―শতখান কথা বাইর কইরা ফ্যালানও কুনু ব্যাপার না―শামসু থাকলি তো এমনিতেই যাইত। সে কবে আইসপে, তারও তো কুনু ঠিক নাই।’

শুনে হাতের নড়িটা শক্ত করে ধরে সালমা ‘খোদা রে―ও খোদা রে’ বলে হাহাকার করে ওঠে। আর সেই হাহাকার বাতাসে মিলিয়ে যাওয়ার আগেই সাহানা তার দাদিমার গলার জড়িয়ে ধরে বলতে থাকে, ‘ভাইজানরে একবার পাঠায়া দ্যাহেন না দাদি। এট্টু খোঁজ কইরা আসুক। ডাকমু ? ডাকমু ভাইজানকে ?’

ভাইজান মানে জামাল―মেয়েটা ছুতো পেলেই এইভাবে তার সঙ্গে কথা বলার চেষ্টা করে। তাতে কি সখিনা, কি হালিমা দুইজনেরই মেজাজ খারাপ হয়। তরতরিয়ে বাড়ছে সাহানা, যত দরকারই হোক না কেন, তাকে দিয়ে তো এখন বাড়ির কামলাকে ডাকাডাকি করানো যায় না। তাই গলা চড়িয়ে ধমকায় সখিনা, ‘চুপ কর তুই। খালি মুরব্বিগারে কতার মধ্যে কতা কইস―’

‘অ দাদী―আপনে মুরব্বি না কি ?’

সাহানার এই কথা এমন পরিস্থিতির মধ্যে একেবারেই বেমানান। আর তা আরও বেমানান হয়ে ওঠে মর্জিনা ফিক করে হেসে ফেলায়। পরিস্থিতি সামাল দিতে সখিনা দুই আঙুল দিয়ে সাহানার গাল মুচড়ে দেয় আর মর্জিনার উদ্দেশে বলে, ‘মর্জিনা, যা তো জামালেক ডাইকা নিয়া আয় তো।’

বলেই মনে হয় সমস্যা আরও বাড়ল। বছর চারেক আগে বিধবা হওয়া মর্জিনাকে খুব বিশ্বাস করে ওর বাপে এই বাড়িতে রেখে গেছে আড়াই বছর আগে। মর্জিনার বাপ মানে আবদুল গাফফারেরও বাপ। জ্ঞাতিগোষ্ঠীরই মানুষ তারা; হোক গরিব, তাই বলে ফেলে তো আর দেওয়া যায়। বিধবা হওয়ার মাস পাঁচেকের মধ্যেই মেয়েটা ঝামেলা বাধিয়ে বসেছিল, বাপে তাই নিজের বাড়িতে রাখার সাহস পাচ্ছিল না। এখানে এখন পর্যন্ত তো ভালোই আছে; তার পরও সাবধানের মার নেই। জামালের সঙ্গে মর্জিনার যেন কথা বলতে না হয়, সেজন্যে সব সময় সতর্ক থাকে সখিনা, হালিমাকেও সেরকমই বলা আছে। কিন্তু তারপরও কথাবার্তা না হওয়ার কি কোনও উপায় আছে ? তিন বেলার খাবারদাবার তো এই মর্জিনাকে দিয়েই পাঠাতে হয়। ওই তিন বার যেন চার বার না হয়, সেজন্যে ২৪ ঘন্টা তটস্থ থাকতে হয় তাকে। অথচ এখন সেই ঘটনাটাই ঘটল।

সওদাগর বাড়িতে কামলা রাখার পর বেশ স্বস্তি লেগেছিল তাদের। ব্যবসার দোকানপাট, গুদাম সবই তো তার বাজারের মধ্যে। সেজন্যে তার আলাদা লোকজনও আছে। তাদের দেখাসাক্ষাৎ বলতে গেলে পায়ই না সখিনা, হালিমারা। ক্ষেতখোলা সবই বলতে গেলে বর্গা দেওয়া। বাড়ির পাশের পালানে একটুআধটু শাকসব্জি হয়, তা এতদিন তো বলতে গেলে সখিনাই করে এসেছে। বাড়িতে একটা রাখাল ছিল আগে, সেও অবশ্য তার সঙ্গে হাত লাগিয়েছে। জামাল আসার পর শুধু পালানে কেন, বাড়ির কাছে ক্ষেতখোলায়ও সব্জি-ডালের চাষবাস শুরু হয়েছে, গরুগুলো ভালো খাওয়া পাচ্ছে, তাই ভালো দুধও দিচ্ছে, বিল-পাগাড় থেকে সে দৈনিক মাছ-টাছও ধরে নিয়ে আসছে মহাউৎসাহে, বেলে মাছ কিংবা টাকি মাছের ভর্তা আর মাগুর মাছের তরকারি সখিনার বড়ই প্রিয়, সেসব মাছ সে এখন প্রতি সপ্তাহেই পাচ্ছে। কিন্তু তার পরও জামালের ওপর ক্ষেপে ওঠার সুযোগ সে হাত ছাড়া করে না।

ফটক দিয়ে জামালের শরীরের অর্ধেকটা বাড়ির আঙিনায় ঢুকতে না ঢুকতেই সখিনার জেরা শুরু হয়, ‘সারাদিনই তো আফজালের দোকানে বইসা থাক। গাঁয়ের লোকজন যে হাওয়া হইয়া গেছে, শোন নাই কিছু ?’

জামাল থতমত খায়, ‘হাওয়া হইয়া গেছে ?’

‘আরে, এই যে সালমার ছেলে আর নাতিকে জমিদারের লোক ধইরা নিয়া গ্যাছে। শুইনছ কিছু ?’

‘জ্বে না। যার কতা কইলেন, তারেও তো চিনি না দাদি।’

ছেলে জব্বর চালাক―সরাসরি সালমা নামটা সে মুখে নিলো না, কে জানে, তাদের কোনও আত্মীয় হয় কি না; চমৎকৃত হয় হালিমা। কিন্তু সখিনার মুখ দেখে কিছুই বোঝা যায় না। নতুন একটা পান মুখে দিতে দিতে সে শুধু বলে, ‘তোমাক আমি ধইরা ধইরা প্রত্যেককে চিনামু নাকি ? কারু কাছ থাইকা শুইনা নিও। যাও, জমিদারবাড়ি যাও―খোঁজ লাগাও―’

‘আমি ?’―ঘটনা কী ঘটতে চলেছে তা আগেই বুঝে নেয়ার চেষ্টা করে জামাল।

‘হ, তুমিই তো। এ বাড়িতে এহন আর কুনু পুরুষ আছে ? ছেলে তো আমার তোমাকেই রাইখা গ্যাছে, নাকি ? না বাজারে খবর দিতে হইব ?’

‘তা ক্যান দিবেন ? কী খোঁজ লাগামু, সেইডা একটু ভালো কইরা―’

‘কইলাম তো―সালমার পোলা আর নাতিডাক কাইল জমিদারের লোকজন তুইলা নিয়া গ্যাছে। এহন কইতাছে, তারা নিয়া যায় নাই। তুমি একটু খোঁজ লাগাও।’

জামালের মনে হয়, তার সুখের দিন এবার শেষ হতে চলেছে। এইরকম একটা খোঁজ করতে যাওয়ার মানে নিজেকেও আর সবার খোঁজখবরে পৌঁছে দেয়া। চন্দ্রহারা থেকে যে সুখের খোঁজে সে এইখানে এসেছিল, তা যে আর থাকছে না, তা এখন স্পষ্ট।

‘সালমা হইল আমার দাদীর সই। বুইঝছেন তো ? ভালো কইরা খোঁজ লাগান। সাবধানে খুঁইজেন। জমিদার কইল ভালো মানুষ না।’―সাহানা তার উদ্দেশে এ কথা বললে জামাল আর দাঁড়ায় না। আগেও দেখেছে সে, সাহানার সঙ্গে কথা বলতে গেলেই তার মা আর দাদি ঝামেলা করে। কামলা-জামলা মানুষ সে, এদের কেউ কি আর তার সঙ্গে ভালবেসে কথা বলে ? ঠ্যাকায় পড়েই বলে। তাতেও ঝামেলা! কী দরকার মহিলাদের এত প্যাঁচের মধ্যে পড়ার।

দ্রুত পা ফেলে বাড়ির বাইরে বেরিয়ে পড়ে জামাল। খোঁজখবর হচ্ছে দেখে তখন সালমার আত্মাও বোধহয় একটু ঠাণ্ডা হয়। তা দিন ১৫ তো হয়েই গেছে, দেখা হয় না সখিনার সঙ্গে তার। আর এই ১৫ দিনের মধ্যে কত কিছুই তো ঘটে গেল! সেসব কি শোনেনি সখিনা ? শোনেনি হালিমা ? এতক্ষণে কান্না থামিয়ে, থান কাপড়ের আঁচলে নাকমুখ মুছে কণ্ঠ ছড়িয়ে সালমা বলে ওঠে সখিনার উদ্দেশে, ‘শুইনছো তো বু, ব্যানার্জি বাড়িত কী হইছে ?’

‘না তো! কেউ কয় নাই তো! কী হইছে ব্যানার্জীগারে ?’

‘কী আর হইব ?’―মনে হয় কতদিন বাদে সালমা বেওয়ার মুখে হাসি ফোটে একটু। আর পান খাওয়ার জন্যেও মনটা বেশ উদ্গ্রীব হয়। মিটি মিটি হাসতে হাসতে তার চোখ সখিনার পানের ডালা খোঁজে, খুঁজতে খুঁজতে বলে, ‘পূর্ণা আছে না ? পূর্ণার বিয়া নিয়া আইছে তার কাকায়। হ্যার বাপের মাথা অ্যাহন খারাপ হয়্যা গ্যাছে।’

‘অ-অ―মাতা খারাপের কী আছে ? ১৭/১৮ বছর না পূর্ণার ?’

‘অ বু-উ-উ… তোমার তো বয়সও খেয়াল আছে! হ, ১৩ বছরে বিয়া হইল এত ভালো লগ্ন দেইখা, তাও দেড় বছরের মধ্যে সব শেষ। জামাই দেখছিলা তুমি ? দ্যাহ নাই ? … দেইখলে বুইঝতা। আমার কইল দেইখাই মনে হইছিল―এইডার দশা মরো মরো।’

‘হ্যাগারে না একবার বিয়া হইলি আর বিয়া অয় না ?’ ―অনেকক্ষণ কথা না বলে থাকলেও এবার আর না বলে থাকতে পারে না মর্জিনা। আর সে কথায় সখিনা কিংবা হালিমার মধ্যেও কোনও বিরাগ দেখা দেয় না। সালমা মিটমিটিয়ে কুটকুটিয়ে শোনায় তাকে, ‘হইত না। এতদিনে বুঝবার পাইরছে, দরকার আছে―’

সে হয়তো আরও কিছু বলতে চেয়েছিল আর সাহানা না থাকলে বলেও ফেলত; কিন্তু শেষ পর্যন্ত ক্ষান্তি দেয় তার কথাতে। কিন্তু হাসি―সেটা কিছুতেই থামে না। হয়তো নিগূঢ় কোনও মানে আছে বলেই হাসি আসলে কখনওই থামে না, কখনও থমকে যায়, কখনও লুকায়, কিন্তু থামে না কিছুতেই।

৫.

সেদিন সন্ধ্যা ঘন হয়ে নামার আগেই নিঝুমগাঁয়ের প্রত্যেকেই জেনে যায়, এই গাঁয়ের হিন্দু জেলেদের পূব পাড়া যে এক ঘর মুসলমানও থাকে, মাছ ধরে বিক্রি করে আবার চাষবাসও করে, সেই ঘরের কাজেম আর নাজেমকে কিছুতেই খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না আগের দিন থেকে। হয়ত তারা এমনিতেই জানত; জানতে পারত সালমার কান্না থেকে, কাজেমের বউ আর নাজেমের মায়ের কান্না থেকে, কিংবা নাজেমের বউয়ের ফোঁপানি থেকে; কিন্তু সেই জানাটা ভারি দ্রুত হয়ে যায় জামালের এত খোঁজখবরের ভারে।

জামাল অবশ্য অনেক তত্ত্ব-তালাশ করেও নতুন কিছু জানতে পারে না। কিন্তু লাভের মধ্যে এটুকু ঘটে যে, তার সঙ্গে সুজিত ব্যানার্জীর পরিচয় ঘটে। আর তা বেশ ভালো করেই। আরও পরিচয় ঘটে পূর্ণার সঙ্গে; অবশ্য সেটাকে ঠিক পরিচয় বলা যায় কি না, তা নিয়ে সময় থাকলে চিন্তা করা যেতে পারে।

তবে এক কথায়, সুজিত ব্যানার্জি ভীষণ বিরক্ত হয়ে আছে সুমিতের ওপরে। এটা কোনও কাণ্ডজ্ঞানের কথা ? এই নিঝুমগাঁয়ে এসেছে সে বিধবা বিয়ে দিতে ? ওই কলকাতায়ই ঈশ্বরচন্দ্র পর্যন্ত দৌড়ের ওপর আছে, সকালবিকাল মানুষের গালমন্দ শুনতে হচ্ছে নাকি লোকটাকে আর সুমিত কি না এসেছে এই গাঁয়ের মধ্যে বিধবা বিবাহের অগ্রদূত হতে। এর মধ্যে সিপাইগুলো ওইভাবে ক্ষেপে না উঠলে আর পরিস্থিতি শান্ত থাকলে মনে তো হয় না, ঈশ্বর চন্দ্র খুব বেশি কল্কে পেত কারও কাছে। সিপাইগুলোকে থামিয়ে দেয়ার অজুহাতে এখন ইংরেজরা যে আরও কত কিছু করে বেড়াচ্ছে, তার কোনও ঠিকঠিকানা আছে! তা বিয়ে না হয় দেয়া যাবে। ইংরেজরা বলছে দেওয়া যাবে, তার সঙ্গে সঙ্গে আরও কত জনও বলছে! বিয়ে কি আর কেউ থামাতে পারবে ? বরং থামাতে এলে থানা থেকে পুলিশ-সেপাই এসে একেবারে খবর করে দেবে। কিন্তু তাকে এখানে বসবাস করতে হবে না ? মরতে হবে না ? মরার পর চিতায় উঠতে হবে না ? এখন তাও জমিদার কৃষ্ণ বল্লভ মাঝেমধ্যে ডেকেডুকে খবরটবর নেয়, তখন কি আর খবর নেবে ? মরার পর কোনও পুরোহিতকে কি খুঁজে পাওয়া যাবে তার চিতা সাজানোর জন্যে ? ঠাস ঠাস করে চড় মেরে কানের পর্দা ফাটিয়ে দেয়া দরকার ছিল সুমিতের।

কিন্তু সেটা তখন করা হয় নাই। বড় ভুল হয়ে গেছে। সুমিত যে তার বিধবা মেয়ের জন্যে একটা প্রস্তাব নিয়ে এসেছে, এই খবর ছড়াতে তো খুব বেশি সময় লাগবে না। অথবা কে জানে, এর মধ্যেই ছড়িয়ে পড়েছে কতখানে। জমিদারের ভাই মহাদেব বল্লভ কারণে অকারণে যেরকম ছোঁক ছোঁক করে, তাতে তো মনে হয়, খবরটা কানে উঠলে সেও বিয়ের কথা বলে পাঠাবে! ভুলটা না করলে, ঠাস করে একটা চড় বসাতে পারলে সেই খবরের সঙ্গে এটাও তার জানা হয়ে যেত যে, সুজিত সেই প্রস্তাব শুনে সঙ্গে সঙ্গে একটা ডাঁসা থাপ্পড় মেরেছে তার ছোট ভাইয়ের গালে। ব্যস, ঝামেলাই চুকে যেত। তখন আর পূর্ণাকে নিয়ে তাকে ছুটতে হতো না কোনও আত্মীয়বাড়ির দিকে। এখন কিছুদিন মেয়েটিকে অন্য কোথাও রাখা দরকার। মেয়েরও কি ইচ্ছে আছে, আবারও ঘর-সংসার করার ? এই কথা কোনও দিন ভালো করে জিজ্ঞেস করে দেখেনি তাকে সুজিত। আর দেখার দরকারও তো পড়েনি। স্বামী মরলে মেয়েরা বিধবা হয়, বিধবা থাকে―নিয়ম তো এইরকমই, নাকি ? এই যে মুসলমানরা এত বিধবা বিয়ের কথা বলে, তারাই বা কয়টা বিধবার বিয়ে দিতে পারে ? খালি বললেই হয় নাকি ? গাট্টি গাট্টি অবিবাহিতা কুমারী মেয়ে থাকতে, কার এত দায় পড়েছে, বিধবাকে বিয়ে করার ? ও হতে পারে, যদি ভালোবাসা জাগে। তা ভালোবাসা জাগা কি এতই সহজ ? এই যে বছরের পর বছর এত মানুষজন ঘরসংসার করছে, তাদের কয়জনের মনে ভালোবাসা জেগেছে ? এই যে সে এত বছর ধরে বিয়ে করেছে, ছেলেমেয়েগুলোর জন্ম না হলে তারই কি আদৌ কোনও ভালোবাসা জাগত বউয়ের প্রতি ?

যতবারই চিন্তা করতে যাচ্ছে, ততবারই এইসব হাবিজাবি কথাবার্তা তার মনের মধ্যে ঘুরপাক খাচ্ছে, একটার সঙ্গে আরেকটা কাটাকুটি খেলছে। সে জন্যেই বোধহয় অসতর্ক হয়ে পড়েছিল। যদিও সতর্ক থাকলেও কোনও লাভ হতো না। মহিষ দুটো তো প্রাণপণ চেষ্টা করছিল গড়ান থেকে সড়কের দিকে উঠে আসতে, আর গাড়োয়ানও ভীষণ জোরে চাবুক হাঁকছিল। কিন্তু তার পরও গাড়িটা গড়াতে গড়াতে হালটের আধা বুক পানির মধ্যে পড়েছিল। সেটা খানিকটা সৌভাগ্যই বটে। কারণ মহিষ যে কী করে সাঁতার জানে, তা কেবল তারাই জানে। গাড়োয়ান তো প্রথমেই লাফ দিয়ে নিজের জান বাঁচিয়েছিল। সুজিত তার ধুতির কোঁচা ধরে কোনও মতে জলের মধ্যে পা-টা ঠেকানোর চেষ্টা করছিল। মেয়ের কথা তো তার মনেই ছিল না।

তখনই তার চোখে পড়েছিল, কেউ একজন মেয়েকে পাঁজাকোলে করে নিয়ে গিয়ে সড়কের ধারে হিজল গাছটার শিকড়ের ওপর বসিয়ে দিল। জলের মধ্যে হাবুডুবু খাচ্ছিল, শীতও লাগছিল একটু একটু। কিন্তু সেসব ভুলে গেল সুজিত। হিজলের ঝুড়ি নেমে এসেছে সড়কের ঢালুর দিকে,  এলোমেলো শিকড়ের নিচে কোনও মাটি নেই, তারপরও সে কত রকমের কায়দাকানুন করে পৌঁছে গেছে মৃত্তিকার নিচে। আর সেসবের ওপর বসে আছে তার ভীতা মেয়ে, আলগোছে শাড়ির পাড় নিচের দিকে টেনে নামিয়ে চেষ্টা করছে পায়ের অনাবৃত গোড়ালিকে ঢাকবার। সেদিকে তাকিয়ে হঠাৎ মনে হয় সুজিতের, সুমিতকে না করা ঠিক হয়নি তার। জীবনের ধর্ম থেকে মেয়েকে বঞ্চিত করার কী অধিকার রাখে সে কেবল বাবা হয়েছে বলে ?

তবে তা আর কতক্ষণ, ছেলেটা এসে তাকেও হাঁচড়ে পাঁচড়ে ওপরে তুলেছিল। তার পর জলের মধ্যে নেমে মহিষের কাঁধ থেকে যখন সে জোয়াল খুলছিল, তখন মনে হচ্ছিল, নিজেও সে এক বুনো মহিষ। তারপর সড়কের ওপর উঠে এসে বসে হাঁপাচ্ছিল। সুজিত ব্যানার্জি কোনও কারণ ছাড়াই বলেছিল তাকে, ‘… অন্নপূর্ণা―আমার মেয়ে।’

তা না বললেও চলত। কেননা জামাল তো সুজিত ব্যাণার্জীর নামও শোনেনি। নিঝুমগাঁ এখনও অচেনা তার। দরকার ছাড়া সে সওদাগরের বাড়ি থেকে দূরে যায় না। যদিও সওদাগরের মায়ের ধারণা, সুযোগ পেলেই সে সে এদিক সেদিক দাপিয়ে বেড়ায়। কিন্তু তার যাওয়ার জায়গা বলতে সওদাগরের বাড়ি থেকে একটু এগিয়ে ওই আফজালের দোকান অবধি। তাও সেটা বলতে গেলে সন্ধ্যার পরে। সওদাগরের বাড়িতে অন্তত খাওয়াদাওয়ার শান্তিটুকু আছে, ঘুমানোরও আছে। সবচেয়ে বড় কথা হলো, তামাকেরও কোনও অভাব নাই। তাহলে কোন দুঃখে সে এদিকওদিক দাপিয়ে বেড়াবে!

কোনও কথা না বলে জামাল দাঁড়িয়েছিল। তার পর হঠাৎ মনে পড়েছিল, গা ভিজে একসা হয়ে গেছে। মাজার গামছাটা নিয়ে কোনও মতে মাথা আর গা মুছেছিল সে। জল ঝেড়ে সেটা এগিয়ে দিয়েছিল সুজিতের দিকে।

সুজিত ইতঃস্তত করছিল, বলেছিল, ‘তুমি কে ? এর আগে দেখি নাই।’

‘সওদাগরের বাড়ি জন খাটি আমি।’ বলতে বলতে নিজে থেকেই সে গামছাটা ফিরিয়ে নিয়েছিল। মাজায় বেঁধে রওনা হওয়ার আগে জানতে চেয়েছিল, জমিদারের বাড়ি কোন পথে যেতে হয়।

ততক্ষণে গাড়োয়ান ফিরে এসেছে। সুজিত ব্যানার্জি তার ওপর চোটপাট করছে। জামাল আর দাঁড়াতে চায়নি। কিন্তু ব্যানার্জি তাকে দাঁড়াতে বলেছিল, ‘যাত্রা নাস্তি। আর যাব না। তুমি আমার মেয়েকে একটু বাড়িতে পৌঁছে দিয়ে যাও। আমি জিনিসপত্র উদ্ধার করে ফিরি। চিন্তা করো না, সওদাগর আমাকে চেনে।’

এইভাবে জামাল পূর্ণাদের বাড়িও চিনেছিল।

কিন্তু পূর্ণাদের বাড়ি চিনে তো লাভ নেই। তার দরকার কাজেম-নাজেমের খবর। একে-ওকে জিজ্ঞেস করতে করতে এই গাঁয়ে আসার মনে হয় মাসসাতেক বাদে তার গ্রামটাকেই চেনা হয়ে গেল। অবশ্য সওদাগর বাড়ি থেকে বেরিয়েই জামাল ঠিক করেছিল, জমিদারের বাড়ি চিনে আসবে, কিন্তু সেখানকার কারও কাছে কিছু জানতে চাইবে না। সওদাগরের মা-বউ যাই বলুক না কেন, সওদাগর তো নিজে নেই বাড়িতে। এখন এই হুজ্জতে যাবে না।

তবু খানিকটা হুজ্জত হয়েই গেল। কৃষ্ণ বল্লভের ঘরদোরের কাছে যাওয়ার আগেই কোত্থেকে যেন দুই পেয়াদা আকাশ ফুঁড়ে বেরিয়ে এল। জামালের মনে হলো, অচেনা লোকজন কাউকে দেখলে এ গাঁয়ের সবাই বোধহয় এই একটা কথাই বলতে জানে, ‘তুমি কেডা ? অ্যার আগে তো দেহি নাই।’

‘আমি জন খাটি। সওদাগরের বাড়ি।’

তাতে আগের চোটপাট একটু কমে আসে; কিন্তু জিজ্ঞাসাবাদ থামে না। তারা জেনে নিতে চায়, এদিকে সে কোনদিকে যাচ্ছে।

‘কুনু দিকে না রে ভাইজান। রাস্তা চিনতাছি। এই রাস্তা কতদূর গ্যাছে ?’

‘এই রাস্তা ম্যালা দূর গ্যাছে। অতদূর তোমার যাওয়ার দরকার নাই। দেইখতেছ না নেওর পইড়তেছে, বাড়ি গিয়া কাথা গায়ে দিয়া ঘুমাওগা।’ বলে তারা ফিরিয়ে দিয়েছিল জামালকে। সে তাতে আপত্তি করেনি। সে শুধু একবার খেয়াল করার চেষ্টা করেছিল, রাস্তাটা বিবর্ণ কি না। তখন বুঝতে পেরেছিল, এই গাঁয়ে প্রচুর হিজল গাছ, এত হিজল গাছ সে আর কোনওখানে দেখেনি। আর হিজলের ছায়ায় কী এক মাধুর্য্যও আছে। না হলে এই শেষরাতে গা শিন শিন করে ওঠা আশ্বিনেও রাস্তার মরা মরা ঘাসদলকে এত তাজা তাজা লাগবে কেন।

তবে তাড়াতাড়িই জামাল ফিরে এসেছিল। আর ফেরার তাড়াও ছিল। গরুগুলোকে তুলতে হবে। নতুন লাগানো নারকেল সুপারি আর দেবদারু গাছগুলোয় পানি দিতে হবে। এটা কার বুদ্ধি জানা নেই তার, তবে সওদাগর যাওয়ার আগে বলে গেছে তাকে, বাড়ির উত্তর দিকটা কেমন ন্যাংটা লাগে, সেখান সার বেধে একটা দেবদারু তো দুইটা করে নারকেল আর সুপারি, তার পর ফের আরেকটা দেবদারু―এইভাবে গাছ লাগিয়ে দিতে। জামাল অবাক হয়ে গিয়েছিল, চারাও ফেলা আছে দেখে। হয়তো বাড়ির এই দিকটা আগে বেশ বুনো ছিল। কিন্তু সওদাগর বাড়ির পেছনের পাগাড়টাকে পুকুর করে তুলতে গিয়ে জায়গাটাকে কেমন ন্যাড়া করে ফেলেছে।

কিন্তু ফেরার আগে, কী এক বুনো আকর্ষণে হিন্দু জেলে পাড়াটাকে চিনতে গেল জামাল। আর তাতেই সব কিছু এলোমেলো হয়ে গেল। সেটা তার নিজের, নাকি অন্য কারও তাও টের পেল না। আর কী আশ্চর্য, এখানেও সেই একই কথা শুনল প্রথমে, ‘আপনে কেডা ? আগে তো দেহি নাই আপনেক। বাড়ি কোনে ?’

বলেছিল বেশ শক্ত পোক্ত জোয়ান। নেংটি কাছা দেয়া। মনে হয় না এই জেলেপাড়ায় ভর দুপুরেও সূর্যের আলো ঢুকতে পারে। তবু বোঝা যাচ্ছিল, ভীষণ কালো সে। আর চোখজোড়া বড় বড়। সে চোখের দিকে তাকিয়ে কেন যেন জামালও কেমন শির শির করে উঠেছিল। আর কিছু না হোক চোখ চেনে সে, এটুক বোঝে এই চোখের মানুষগুলো খুনও করতে পারে।

‘সওদাগর বাড়ির কামলা আমি।’―উত্তরটা কেন যে আগের দুই জায়গার চেয়ে একটু অন্যরকম হয়ে গেল, তা ধরতে পারল না জামাল নিজেই।―‘এই পাড়ায় কাজেম-নাজেম থাকে না ?’

জোয়ান ছেলেটি উত্তর দিতে অবশ্য দেরি করল না, ‘হ, থাকে তো!’―তবে বলার পর খানিকক্ষণ একদৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকল জামালের দিকে। তার পর জানালো, ‘আমি নামদার। জাইলা নৌকার মাঝি। খ্যাও-ও ফেইলবার পারি।’

এইভাবে নামদার সুনিশ্চিত করে নিলো, সে জেলের চেয়েও বেশি কিছু, তবে জেলের যা কাজ, তাও সে করতে পারে অনায়াসে। ফেরার পথে জামালের সঙ্গীও হলো সে। ছোট ছোট ছনের ঘর, উঠোন অবশ্য বেশ নিকোনো, কিন্তু উঠোন পেরিয়ে হাঁটতে গেলেই গা ছম ছম করে। আর নামদার বোধহয় ইচ্ছে করেই আরও গা ছমছমানো রাস্তা দিয়ে নিয়ে যেতে লাগল তাকে। যখন নিশ্চিত হলো আশপাশে কেউ নেই, পেছন থেকেও আসছে না কেউ, আর সামনে দিয়ে কেউ আসলে তো অনায়াসেই দেখা যাবে, তখন সে বলল, ‘আমি আইজকাই ফিরছি গাঁয়ে। সওদাগর গাঁয়ে নাই, আপনে সওদাগরের মানুষ, কহন কী অয়, এট্টু জানায়া রাখি―কাজেম-নাজেম দুইটাই আর নাই।’

‘নাই মানে ?’―নিজের কণ্ঠ নিজের কাছেই ভূতুড়ে লাগে জামালের।

‘নাই। সওদাগরের নাওয়ে ডাকাতি কইরতে কইছিল। হ্যারা রাজি অয় নাই। জমিদার মাইরা ফেলাইছে।’

‘তুমি তো আছিলা না। তুমি জানো কী কইরা ?’

‘জানি, একসাতে ডাকাতি করি বইলা। আমাক খবর দিয়া নিয়া আইছে না ? আইসা দেখি এই ঘটনা।’

‘এইসব আমাক কইতেছো ক্যান ?’

‘আমাকও মারতে কতক্ষণ ? জানায়া রাখা ভালো। তুমি সওদাগরের কামলা না ? তোমাক না পাইলে আর কাউক কইতে হইত। কাক কমু খুঁইজা পাইতেছিলাম না।’

তখনই শোঁ শোঁ আওয়াজ তুলে তির ছুটে এসেছিল। ভাগ্য ভালো, তাতে শোঁ শোঁ আওয়াজ উঠেছিল, মুহূর্তে তারাও সচকিত হয়েছিল, হিজল গাছের কাণ্ড জড়িয়ে তারা নিজেদের আড়াল করে ফেলেছিল। তিরটা এসে ঠক করে গেঁথেছিল কাণ্ডের ঠিক সামনের দিকে। জামালের শরীরে বিদ্যুৎ খেলেছিল, এঁকেবেঁকে দৌড়াতে দৌড়াতে লোকটাকে সে ধরে ফেলেছিল। আর দেখেছিল, পেয়াদা―সেই পেয়াদাটা। তার মানে সেই থেকে পেছনেই আছে লোকটা! কিন্তু অত সময় নেই তো তখন, ট্যার থেকে হিংস্র খুনে ড্যাগারটা বের করেই বসিয়ে দিয়েছিল সে লোকটার বুকে। ঠেসে ধরে বসেই ছিল, যতক্ষণ না তার উগলে ওঠা না থামে, যতক্ষণ না সে স্থির হয়ে পড়ে। তারপর ড্যাগারটা আস্তে করে মাটির সঙ্গে মুছে নিয়েছিল।

‘তুমি বাড়ি ফেরো―যাও। এইসব আমি সামলাইতেছি।’ বলে নামদার। কিন্তু তবু লাশটাকে ধরাধরি করে কোষা নৌকায় তোলা পর্যন্ত থেকেছিল জামাল।

ততক্ষণে সন্ধ্যা নেমে এসেছে। ঘুটঘুটে অন্ধকার আজ। আর শীতও যেন ফিরে এসেছে হঠাৎ করে। সাবধানে আস্তে আস্তে পা ফেলে ফিরতে থাকে জামাল। ফিরতে ফিরতে ভাবে, তাহলে আরেকটা খুন করতে হলো তাকে! কোনও কিছু বুঝে ওঠার আগেই তাহলে খুন করে ফেলতে পারে সে! কিন্তু কেন ? রক্ত দেখে তো সে এখনও ভয় পায়। কিন্তু খুন করতে ভয় লাগে না কেন!

৬.

এমন গাঁ কোনওখানে নেই, যেখানে কোনওদিন কোনও খুনখারাপি হয়নি, কেউ গুম খুন হয়নি ? তেমনি নিঝুমগাঁয়েও এরকম ঘটনা নিশ্চয়ই ঘটেছে। কিন্তু সেসব কি আর কারও মনে আছে! মানুষ তাই আশ্চর্য হয়, আঁতকে ওঠে, ‘কও কি বাপু, কবে থাইকা পাওয়া যায় না তাদের ?’ নিঝুমগাঁ নিয়ে কোনও কিংবদন্তি নেই বটে, কিন্তু হঠাৎ করেই গ্রামটিকে অদ্ভুত রহস্যময় একটি জনপদ মনে হয়; যদিও মানুষের তা আকস্মিক কোনও উদ্ঘাটন বলে মনে হয় না, বরং মনে হয় সেই প্রাগৈতিহাসিক কাল থেকেই এ গ্রামটি এমন রহস্যময় সব ঘটনার জন্ম দিয়ে চলেছে। স্মৃতিঘরের জানালা-কপাট সব কিছু খুলে যায় সকলের। দেখা যায়, সকলের ভাণ্ডারেই রয়েছে অদ্ভুত রহস্যময় কোনও ঘটনাসংগ্রহ, এমনকি ১৩-১৪ বছরের বালকটিও পিছিয়ে নেই এমন রহস্যময় ঘটনার সাক্ষী হিসেবে। ঘরে ঘরে এসব কেচ্ছাকাহিনি বলাবলি হতে থাকে। যেমন বলাবলি হয় আফজালের দোকানেও। আফজাল নিজেও গলা উঁচিয়ে বলে, ‘দেইখছ, কেউ কুনুদিন একখান তাল গাছের আগায় চইড়া দেইখছ, নিঝুমগাঁডারে কেইব্যা দেখা যায় ?’

শুনে গা শিউরে ওঠে … তালগাছের আগায় চড়ে দেখবে, কেমন দেখা গেছে এই গ্রামটাকে, যেগ্রামে ঘটে অদ্ভুত সব ঘটনা―তেমন সাহস আছে কোন মানুষটার ? তবে আশ্চর্য, তেমন মানুষও খুঁজে পাওয়া যায় শেষমেশ। জানা যায়, বছর দুয়েক আগে যে জানে আলম মারা গেল, সে তো তালগাছের আগায় উঠে গ্রামটাকে দেখার পরই মারা গেল। তালগাছের আগায় উঠে সে দেখেছিল, এইখানে কি পশ্চিমে কি পূবে, কি দক্ষিণে কি উত্তরে―যেদিকেই তাকান যাক না কেন, মনে হয় সবুজের ঢেউ দুলছে, কোথাও কোথাও সেই ঢেউয়ের মাথা বড় স্থির ও উদ্ধত, কোথাও এই ঢেউয়ের মধ্যে দিয়ে অন্ধকার প্রণালি, কোথাও আবার এই অন্ধকার প্রণালি আর ঢেউয়ের সঙ্গে এসে মিশে যাওয়ার চেষ্টা করছে আকাশের নীল। কিন্তু মনেই হয় না, এই অবিচ্ছিন্ন নীল আকাশ আর সবুজ অরণ্য কিংবা খোলা মাঠ ও অন্ধকার প্রণালি―এসব কিছুর মধ্যে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে অসংখ্য মানুষ। যে মানুষগুলোর হিংস্র ধাওয়ায় বন ক্রমশই দূরে সরে গেছে এবং দূরে সরতে সরতে একসময় হঠাৎ করেই যেনবা অদৃশ্য হয়ে গেছে কোনও অনন্তলোকে। এতে আর কোনও সন্দেহ নেই, এই যে মানুষগুলো আছে, বসবাস করছে কেবল নিঝুমগাঁয়ে কেন, আশপাশের আরও সব গাঁওগেরামে, এই পরগণাতে এবং আশপাশের আরও সব পরগণাতে, সেইসব মানুষদের সবাইকেই এখানে জায়গা করে নিতে হয়েছে গায়ের জোরে, বাঘ তাড়িয়ে, বুনো শুয়োর মেরেকেটে। বাঘ, বুনো শুয়োর, গয়ালদের দল চলে গেছে চলনবিলের আরও ভেতরে। কিন্তু পাখিদের এখনও কমাতে পারেনি এই মানুষ। এখনও প্রতি বছর অজস্র পাখিতে ভরে যায় বিল, নদী, চর। গাঁওয়ালাদের তীক্ষè তির ও ফাঁদ প্রতিদিনই ক্ষতবিক্ষত করে তাদের। কিন্তু তারপরও অন্য কোথাও চলে যায় না তারা। যেন মৃত্যু এভাবেই ঘটে, যমরাজের বিস্মিত চোখ দেখে হাজার হাজার মাইল দূরে গিয়েও রেহাই নেই―এসবই জানা আছে তাদের।

যাকে মনে হয় অন্ধকার প্রণালি, তা বোধহয় এ গ্রামের চার পাশের গভীর খাড়ি―যা জল ধরে রেখে এই নিঝুম গাঁকে বিচ্ছিন্ন করার পরও অবিচ্ছিন্ন করে রেখেছে বাইরের জগতের সঙ্গে। অনুমান করে জামাল, মানুষই হয়তো এই গভীর খাড়ি সৃষ্টি করেছে, যাতে নিরাপদে থাকা যায়, যাতে জলপথে আসতে থাকা হিংস্র মানুষের দলকে দেখে দূর থেকেই সতর্ক হওয়া যায়, হত্যাও করা যায় এবং বেকায়দায় পড়লে পালিয়েও যাওয়া যায়। তার মানে মানুষের শেষ পর্যন্ত বড় ভয় আসলে মানুষকে নিয়েই; মানুষ জানে, তাকে হত্যা করার মতো প্রতাপশালী হিংস্র শেষ পর্যন্ত কেবল মানুষ নামের জন্তুটির পক্ষেই হওয়া সম্ভব। দিনের মধ্যে বেশ কয়েকবারই গাছে উঠতে হয় তাকে, বিশেষ করে সকালে ওই বিরাট নারকেল গাছটায় উঠে বেশ কিছু পানের পাতা পেড়ে নিয়ে আসা তার জন্যে একেবারে ফরজ কাজ। কিন্তু এতদিন ওপর থেকে এই রহস্যময় চারপাশকে উপলব্ধি করতে পারেনি সে। আজ একদিনের মধ্যেই বেশ কয়েকবার কখনও নারকেল, কখনও বিশাল ওই গাবগাছ আর খেজুরগাছটায় উঠতে হয়েছে তাকে। বার বারই সে তাকিয়ে থেকে দূরের দিকে―মনে হয়েছে আকাশ থেকে পাখির মতো সে দেখছে অচেনা এক জগতকে, যার অন্তরীক্ষে, জলে-স্থলে কত কিছু যে লুকিয়ে আছে, সেসবের কোনও কিছুই জানে না সে। বনকে বার বার হটিয়ে দূরে পাঠিয়ে দিয়েছে নিঝুমগাঁয়ের মানুষ, কিন্তু তার পরও কত বা অসহায় সে এখনও এই বনের কাছে, জলস্রোতের কাছে, কত না আপস করে সে ফসল রোপন করে, বড় করে, ঘরে তোলে!

কিন্তু এত কিছু এত খুঁটিয়ে দেখছে কেন সে ? ―নিজেই নিজেকে প্রশ্ন করে জামাল। তাহলে সেও কি আশঙ্কা করছে কোনও বিপদের ? অথবা সে আরও বেশি সুরক্ষিত করতে চায় সওদাগরকে। এতক্ষণে তার নিজের কাছে আরও একটি ব্যাপার পরিষ্কার হয়ে ওঠে, সওদাগর নিজেও যেনবা তার ভিটার চারপাশে জলের প্রবাহ বইয়ে দিতে চায়, বিচ্ছিন্ন করে ফেলতে চায় অন্য সব বসতি আর চাষবাদের ভূখণ্ড থেকে। তার বাড়ির মুখোমুখি দক্ষিণের আকাশ। পুব থেকে সড়ক এসে চলে গেছে যেনবা দক্ষিণ-পশ্চিম কোণের দিকে। সড়ক ঢেউ তুলে এমনভাবে এগিয়েছে বর্ষায় অনায়াসেই জল আসতে পারে আর নৌকাও চলতে ফিরতে পারে। তা ছাড়া এমনিতেও সড়কের এ পাশে ও পাশে রয়েছে টানা নয়ানজুলি। যেখান দিয়ে বছরের সারা বছরই ছোটখাটো কোষা নৌকা চলতে পারে―মাছও পাওয়া যায় সারা বছরই। এই নয়ালজুলি গিয়ে ঠেকেছে এদিক ওদিক দুই দিকেই বাঙালি নদের সঙ্গে। বাড়ির উত্তর দিকে বড় পুকুর কেটেছে সওদাগর। যদিও সেখানে বাড়ির লোকজন আর এলাকার মেয়েরা ছাড়া আর কারও প্রবেশাধিকার নেই, কেউ কাপড়চোপড়ও ধুতে পারে না সেখানে। এই পুকুরে কেবল স্নানই করা হয়, এই পুকুরের পানি কেবল পানই করা হয়। এখন শোনা যায়, পূর্ব ও পশ্চিম দিক মিলিয়ে সওদাগর নাকি চিন্তা করছে দীঘি খননের। তা, যার জায়গা সে করবে, জামালের তাতে কী! তবু বার বার ঘুরে ফিরে একই কথা মনে হচ্ছে আর কেবলই এই বিষয়টা বড় হয়ে দেখা দিচ্ছে যেন, আজকের দিনটা শেষ হচ্ছে না কিছুতেই।

তবে যখন দিনটা শেষই হলো, মনে হয়, ঝুপুত করে শেষ হয়ে গেল এবং এত ভয় ছড়িয়ে পড়ল যে, আফজাল তার হ্যারিকেনের সলতেটাকে আর সব দিনের মতো একেবারে বিন্দু বানিয়ে রেখে দিল না। বরং আজ তা জ্বলতে লাগল বেশ শিখা চড়িয়েই। আর অনেক দিন পর আজ আফজালের মেজাজও বেশ ফুরফুরে তার দোকানকে ঘিরে এত লোকের সমাহার দেখতে পেয়েছে। কেনাকাটা না করুক, মানুষজনের যদি আনাগোণা থাকে, তা হলে এক সময়ই ঠিকই বেচাবিক্রি বেড়ে যায়। চারদিন না কিনুক, পাঁচদিনের মাথায় ঠিকই একটা কিছু কিনে বসে। এই যেমন, পাতার বিড়ি―প্রথমে তো মনে হয়েছিল,ওই জিনিস খাওয়া যায় ?

তারপর প্রতিদিনই আফজালের দোকানে ভিড় জমতে শুরু করল। সন্ধ্যার পর মানুষের যাওয়ার জায়গা নেই। লোকজন তাই আগেও তার এখানে হানা দিত। কিন্তু এখন অনেক অনিয়মিত মানুষের মুখও অনেকটা নিয়মিত হয়ে উঠল। আশ্বিনের অন্ধকারে কণ্ঠস্বর আর শারীরিক আকৃতি থেকে তারা একজন আরেকজনকে বিলক্ষণ চিনে ফেলে, নাম ধরে ডাকে, কথাও বলে; যদিও বলার মতো খুব বেশি কথা তাদের নেই। এইখানে এলে স্পষ্ট বোঝা যায়, নিঝুমগাঁ এখন একটা রহস্যপুরী। যেখানে দুজন মানুষ উধাও হয়ে গেছে, যেখানে জমিদারের এক পেয়াদাকেও খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না।

জেলেপাড়াটা কাছে না হলেও একেবারে দূরে তো নয়। দিনের বেলা ঠিক কানে বাজে না, কিন্তু বিকেল হলেই বড় প্রলম্বিত হয়ে ওঠে সালমা বেওয়ার কান্না। তার সঙ্গে সঙ্গতি দেয় তার ব্যাটার বউয়ের মিহি অস্পষ্ট বেদনার ভার। আকাশ-বাতাস সব কিছু ভুতুড়ে হয়ে ওঠে।

সেদিন সকালে মালামাল আনতে আফজাল গিয়েছিল বড় বাজারে। ফিরে এসে মাথা থেকে বোঝাটা নামাতেও পারেনি, এরই মধ্যে তার বউ খোলা রান্নাঘরের কাছে থেকে ছিটকে বেরিয়ে আসে, ‘আপনের খোঁজে জমিদারের পেয়াদা আইছিল-ও-ও-ও…’ ভয়ে, আতঙ্কে কিংবা তার বেশি কোনও ত্রাসে তার কথাবার্তা কেবলই জড়িয়ে যায়। এটুকু বলে সে নিজের অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ নিয়ে অস্থির হয়ে মাটির ওপর বসে হাত-পা ছুড়তে থাকে, ‘আমার অ্যাহন কী হইবে গো-ও-ও… কী হইবে গো-ও-ও… আমি অ্যাহন কোনখানে যামু রে…’

ধুকুরপুকুর করে ওঠে, আফজালের হৃৎপিণ্ডও ধক করে ওঠে। কী ভয়ঙ্কর ব্যাপার, তার খোঁজে কেন লোক আসবে জমিদারের কাছারি থেকে! কিন্তু তার পরও বউয়ের এই উদ্বেগে বিরক্ত হয় সে, আর ধমক দেয়ার এমন সুযোগ হাতছাড়া করে না, ‘চুপ করছেন তুই। আইছে তো কী হইছে ? চুপ কইরা খাড়া। ঠিকঠাক মতো ক’ছেন, কী দিয়া কী হইছে ? কহন আইছে ? কতক্ষণ আছিল ?’

বলে আর ঘন ঘন এদিকওদিক তাকায় আফজাল। স্বভাব খুব খারাপ জমিদারের। আবার যত না জমিদারের, তারও বেশি তার নায়েবের, আর যত না নায়েবের তারও বেশি পাইক-পেয়াদার। হয়ত আশপাশেই কোনও ঝোপঝাড়ের মধ্যে লুকিয়ে আছে। তাকে দেখলেই বেরিয়ে এসে ঝাপিয়ে পড়বে। তখন আর পালানোর উপায় থাকবে না।

মেয়ে মানুষ এইভাবে বাইরের উঠানে এসে বসে থাকবে, আছড়েপিছড়ে কান্নাকাটি করবে, এইটা পছন্দ নয় আফজালের। কিন্তু উপায়ও তো নেই। দোকান দেয়ার সময় সে অনেক চেষ্টা করে, খরচ-টরচ বাঁচিয়ে, আশ্বিনকালের কৃষ্ণপক্ষে এর-ওর উঠান থেকে টান মেরে এনে জমানো শোলা দিয়ে একখান বেড়া তুলেছিল। তাতে বাড়ির ভেতরের উঠানটা ঢাকা পড়েছিল, যেইখানে মাটির চুলাটা আছে, সেই জায়গাটাও চোখে পড়ত না। কিন্তু দিন গেছে, ঝড়বৃষ্টিতে শোলাও কমজোরী হয়ে পড়েছে, এখন যে কোনও মুহূর্তে বেড়াটা ভেঙে পড়বে। কিন্তু বেড়া দিয়ে আর কী হবে, আকলিমাকেই তো তাকে মাঝেমধ্যে পাঠাতে হচ্ছে পরের বাড়িতে কাজকাম করতে। তা টাউনেই নাকি কাজকাম মেলে না, এই গাঁয়েগঞ্জে আর মিলবে কেমন করে। আকলিমাকে পাড়া বেড়াতে হয়, পাড়া বেরিয়ে কায়দা করে খাবার জোগাতে হয়। সে দৈনিক সকালে বাড়ি থেকে বেরিয়ে গল্প করতে করতে গাঁয়ের এধার থেকে ওইধারের দিকে যেতে শুরু করে। হয়তো সওদাগরবাড়িতে গিয়ে তাদের রান্নাঘরের সামনে দাঁড়ালো। তারপর বিরাট একখান কেচ্ছা জোড়া দিলো। সেই কেচ্ছা শুনতে শুনতে হয়তো সওদাগরের বউ একটা পিড়ি এগিয়ে দিলো। তার পর গল্প চলতেই থাকল। এরই মধ্যে এল মাছের খালই, সেটা উপুর করতেই মাটির ওপর লাফালাফি করতে শুরু করল মাগুর, টাকির দল কিংবা একটা আস্ত শোল মাছ। তা দেখতে দেখতে আকলিমা বলল, ‘আপনে ছাই লাগায়া হাত নষ্ট কইরবেন চাচী ? … দ্যান, দ্যান, আমাক দেন, আমি কাইটা দিতেছি।’ এইভাবে কাজ করে দিয়ে আসার সময় সওদাগরের মা কিংবা বউ হয়ত দয়া করে বলে, ‘ইট্টু তরকারি নিয়া যাও আকলিমা।’ কিংবা তার কোঁচড়ে দিয়ে দেয় এক মগ চাল, দুই-একটা কাঁচা মাছের টুকরা, অথবা কয়েকদিন ধরে পড়ে থাকতে থাকতে ভুখা পড়ে যাওয়া কাঁচা পেঁপে। আফজালের বউ সেসব নিয়ে বের হতে হতেই হয়তো সওদাগর বাড়ির জাংলার দিকে তাকায়, বলে, ‘আপনেগারে কুমড়া তো জাঙলায়ই পইচা যাইতেছে চাচি … আমি একখান নিয়া যাই।’ কথা শেষ করে উত্তর পাওয়ার আগেই অবশ্য তার কুমড়া ছেঁড়া হয়ে যায়। এইভাবে আকলিমা সারা পাড়া ঘোরে, গালমন্দ খায়, কিন্তু কোনও কিছু মনে করে না, কোনখান থেকে সে পেয়ারা কুড়ায়, কোনখান থেকে কুড়ায় আম-কাঠাল, কোনখান থেকে আবার শসা-বেগুন―যখন যে ঋতু থাকে, যখন যা হয়, তার সবই এইভাবে আদায় করে নেয় সে চারপাশ থেকে। আবার কোনও কোনও সময়, বাড়িতে অতিথি এলে সওদাগর বাড়ি থেকেই ডেকে নিয়ে যাওয়া হয় তাকে। অথবা আকলিমা নিজেই কী করে খবর পেয়ে যায়, অমুকের ছেলে কিংবা মেয়ের বিয়ে হচ্ছে। দশ বাড়ি থেকে এইভাবে এগারো রকম জিনিসপত্র কুড়িয়ে খেতে হলে কি আর পর্দা করা যায়! দুই-চারটা চড়-থাপ্পড় দিতে পারলে হয়তো ব্যাপারটা ঠিক করা যেত। কিন্তু তাহলে তার এই সংসারে আবার আগুন ধরে যাবে। বাপ-মা আছে, ছয় ছেলেমেয়ে আছে, তাদের মুখে আহার যোগানো কী মুখের কথা! তার এই দোকান থেকে আর কয়টাকা আসে!

আয়উন্নতি অবশ্য হতো―সে যদি গঞ্জের ওই তরফদারের মতো হতে পারত, বাড়ির মধ্যে গোপনে এক-দুইটা কেরোসিনের ড্রাম রাখার উপায় করতে পারত আর একদিনের জায়গায় দুই-তিন দিন আটকে রাখতে পারত, তাহলে নিশ্চয়ই তাহলে নিশ্চয়ই তার কপাল খুলে যেত। কিন্তু তার কি আর অত সাহস আছে! একবারই তার সেই সাহস হয়েছিল। হিল্লি-দিল্লি সবখানে নাকি তখন বেদম গণ্ডগোল লেগে গেছে। তলোয়ার বন্দুক কামান নিয়ে সিপাইরা সব রাস্তায় নেমে এসেছে। তাদের ওই বন্দুকের গুলির সুতায় নাকি শুয়োর-গরুর চর্বি মেশানো আছে। আফজাল নিরীহ শান্তিপ্রিয় মানুষ, এখন পর্যন্ত বুঝতে পারে না, এতে ঝামেলা করার কী আছে, ইংরেজদের ওপর ঝাপিয়ে পড়ারই বা কী আছে। তার হিসাব সোজাসাপ্টা হিন্দু সিপাইদের তাহলে শুয়োরের চর্বিমেশানো গুলি দাও আর মুসলমান সেপাইগুলোকে গরুর চর্বি মেশানো গুলি দাও। তাহলে তো ঝামেলা চুকে যায়। কিন্তু তার এই সহজ বুদ্ধিটা সে আজ পর্যন্ত কাউকে পুরোপুরি শোনাতেই পারল না। তা সেই সেপাই আর ইংরেজরা  দাবড়াদাবড়ি করতে করতে অবশ্য এতদূর আসেনি। কিন্তু জিনিসপত্রের দাম হঠাৎ করেই বেজায় বেড়ে গিয়েছিল। তখনই সে কোত্থেকে যে একটু সাহস পেয়েছিল, কয়েকদিন তার এই দোকান থেকে কেরোসিন তেল উধাও করে ফেলেছিল।

মানুষজন এই গাঁয়ে অবশ্য সূর্য ডোবার আগেই খেয়ে নেয়। কেরোসিন তেলের পিদিম জ্বালিয়ে সন্ধ্যার পর খাওয়াদাওয়া করবে, অমন নবাব আর কয়জনই বা আছে। জমিদাররা খায়, ব্যানার্জীরাও খায়। আর সওদাগর বাড়ির লোকজনও খায়। অবশ্য জামাল সেদিন বলছিল, সন্ধ্যার পর কেরোসিনের আলোয় খাওয়াদাওয়া করা নাকি তারা পছন্দ করে না। আলো জ্বললেই পোকামাকড় ছুটে আসে, উইপোকার দল উড়ে বেড়ায়, অ্যারাটি পোকার গন্ধে তো খাওয়াদাওয়াই লাটে ওঠে। ঘরে তারা কেরোসিনের আলো জ্বালালেও খাওয়াদাওয়া নাকি বেশির ভাগ দিনই সন্ধ্যার আগেই সেরে ফেলে। মানুষজনের কথা বলবে কী, আফজাল নিজেই তো কেরোসিন জ্বালে না। রাঢ়ির তেল বানাতে পারে তার বউ। দরকার হলে সেটাই জ্বালানো হয়। তার ধারণা ছিল, কেরোসিন লুকায়ে তেমন কোনও লাভ হবে না। কিন্তু আশ্চর্য, মানুষজনের মধ্যে মনে হয় হাহাকার পড়ে গেল, ‘কও কী রে বাপু রে… ত্যাল নাই ? …কী কও তুমি ?’ মাত্র দুই-তিনজনকে না করেছিল সে, ওতেই সারা গাঁয়ে খবর হয়ে গেল। আর সে বুঝল, সন্ধ্যার পর বাতি জ্বালুক বা না জ্বালুক, একটু আধটু কেরোসিন তেল লাগেই মানুষজনের। নাই, নাই করতে করতে গোপনে এদিকসেদিক বিক্রি করে যে পয়সা জমল, তার সঙ্গে আর কিছু মিলিয়ে সে কয়েকটা মুরগি কিনেছে―আর এই প্রথম মনে হয় বউয়ের কাছে তার একটু দাম বেড়েছে। তবে মুরগি পালতেও অনেক ঝামেলা। পাশের বাড়ির হাশমতের বউটা খুবই দজ্জাল; এতই দজ্জাল যে ওর নামই হয়ে গেছে ‘ঝগুড়ি’ আর এরকম নাম নিয়ে কোনও বিকার নেই তার, কেউ তাকে এই নামে ডাকলে স্বাভাবিক কণ্ঠেই সাড়া দেয় সে, তা দেখে মনে হয় জন্মের পর বাপ-মায়েই আদর করে তার এই নাম রেখেছে। মুরগি-টুরগি উঠানে গেলেই ধেই ধেই করে তেড়ে আসে ঝগুড়ি, শাপশাপান্ত, গালিগালাজ কোনওটাই বাদ যায় না। এখন ঘটনা হলো, আফজালের মুরগি থাকলেও মোরগ তো নেই। নেই মানে, দুই-চারটা মোরগের ছাও যে জন্মায়নি, তা কিন্তু না; কিন্তু মোরগ বলেই হয়তো বেচে দিয়েছে, হয়তো খেয়ে ফেলেছে। মুরগি গেলেই তাই ঝগুড়ি তারস্বরে চিৎকার শুরু করে, ‘আইছে, পাল খাইতে আইছে। ক্যা, মোরগ নাই তো, নিজেরাই পাল দ্যাও না ক্যা ? আমার বাড়িত পাঠাও ক্যান ?’ হাশমতের বাড়ির মোরগটার মনে অবশ্য ঝগুড়ির মতো অত হিংসা-দ্বেষ নেই, নিষিদ্ধ আকর্ষণে সে নিজেই বরং ছুটে আসে মাঝেমধ্যে। তাতেও ঝগুড়ির মহাআপত্তি।

এইবার আফজাল আর তার বউ দুজনেই ভেবেছিল, মুরগিটা বাতে পড়লে আর ডিম ফুটে মোরগের বাচ্চা বেরুলে পেলেপুষে বড় করবে। কিন্তু পাইক-পেয়াদা যদি এইভাবে আসাযাওয়া শুরু করে, তাহলে মুরগির ডিম ফুটে বাচ্চা বের হওয়া দূরে থাক, মুরগিই তো জবাই করে দিয়ে দিতে হবে। নাকি আবারও সে কেরোসিনের তেল দোকান থেকে গায়েব দেবে ? নাকি তরফদারদের কাছে থেকে একবার জেনে নেবে, কেরোসিনের খেলা ফের কবে হবে ? ওইবার সব কিছু শান্ত হয়ে যাওয়ার পর সে শুনেছিল, তরফদাররা নাকি টানা ১০ দিন কেরোসিন গায়েব করে রেখে দিয়েছিল। এহ্, এই কাজটা যদি সে করতে পারত, তা হলে মুরগি কেন, তার তো মনে হয় একটা খাসিও কেনা যেত।

কিন্তু আকলিমা তারস্বরে কেঁদেই চলেছে। যদিও এইটাকে ঠিক কান্না বলা যায় কি না, বলা মুশকিল; কেননা মুখটা কাঁদো কাঁদো দেখালেও তার চোখে একফোটা পানিও নেই। এইভাবে আর কিছুক্ষণ কাঁদলে সারা গাঁ তার বাড়িতে ভেঙে পড়বে, তা ভেবে শশব্যস্ত হয়ে ওঠে আফজাল, ‘আচ্ছা, তুমি এইরহমভাবে ভ্যাবাইতেছো ক্যান ? কইবা তো কী হইছে ?’

‘কী আবার হইবো, তোমার খোঁজ কইরতেছে, তোমাক এবার ধইরা নিয়া যাইব রে…’ আবারও উচ্চ কণ্ঠে হাহাকার ছড়াতে থাকে আকলিমা। এই সমাজ সংসারে কারও কাছে তার স্বামীর কোনও গুরুত্ব আছে বলে কখনওই তার মনে হয়নি। আবার জমিদারের পাইক-পেয়াদা এসে খুঁজে বেড়াবে, স্বামী তার এমন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠুক, সেটাও তো সে চায়নি।

‘এই ব্যাক্কল, থামবি তুই ? খালি চিল্লাস। চিল্লালি কাম হইব ?’

তা শুনে আকলিমার কণ্ঠ একটু মিইয়ে আসে। ভারী, উদভ্রান্ত লাগে।

‘কইলি না, কী কইছে পেয়াদায় ?’

‘কয়, জমিদার নাকি খুঁইজতেছে আপনেক।’

‘তে তুই জাইনবার চাইস নাই, খুঁইজতেছে ক্যান ?’

‘চাইছি তো’―বলে ডুকরে কেঁদে ওঠে আকলিমা।

‘ফের কান্দিস তুই ?’―একটু একটু করে ভয় বাড়ছে এখন আফজালের। আর ভয়ের চোটে ভয়ানক রেগেও উঠছে সে, ‘কী কইল, সেইডা ক, তাড়াতাড়ি ক। তুই কইস নাই, আমার তো কুনু খাজনা বাকি নাই, আমাক খোঁজে ক্যান।’

‘কইছি তো! কইছি, হ্যার তো কুনু খাজনা বাকি নাই, তাক খোঁজেন ক্যা ? আমাক কয়, এই দুনিয়ায় খাজনাই কি সব ? কয় আর আপনের দোকানের দিকে চায়া থাকে। চায়া থাইকতে থাইকতে কয়, দোকান তো ভালোই দিছিস তোরা। আয়উপার্জন তালি ভালোই করতিছিস।’

‘তুই কইস নাই ? কইস নাই, আমার কুনু আয়উপার্জন নাই―মহাজনের ঘরে বাকি পইড়া আছে, দোকানে মাল নাই ? কইস নাই, মুরগিক পাল দেয়ার জইন্যে একটা মোরগ যে পালমু, আমার সেই ক্ষমতাও নাই ?’

‘কইছি তো। … না, না, মোরগ-মুরগির কতা কিছু কই নাই। কইছি, দোকানে মাল তুলতে পারতিছি না, মহাজনের ঘরে বাকি পইড়া আছে। কইছি, মনে কয় দোকান বেইচা ধার শোধ করা লাইগবো। তা শুইনা আমাক কয়, গপ্পো দিস না। আয়উপার্জন হয় বইলাই তো খাজনা আর বাকি পড়ে না। … ও আমরা বুঝি না, মনে কইরছোস ?’

আফজাল তার দোকানের সামনের মাচালে ধপ করে বসে পড়ে।

এই যখন পরিস্থিতি, আফজালের তখন কেন যেন জামালের কথাই প্রথম মনে হয়। অথচ তার কথা মনে হওয়ার স্পষ্ট কোনও কারণ নেই। বেশিদিন হয়নি, ছেলেটা এই গ্রামে এসেছে। এখনও তাকে কেউ চেনেই না ভালো করে। সেও যেন এক প্রহেলিকাময় মানুষ। এ গাঁয়ের লোকজন বাইরের মানুষের সামনে পড়লেই কেমন আড়ষ্ট হয়ে যায়, নিজেকে গুটিয়ে নেয়। জামালের ক্ষেত্রেও হয়তো সেরকমই হতো। কিন্তু সওদাগর তাকে নিয়ে এসেছে, কেবল এই একটা দিকই যেন তার রক্ষাকবচ হয়ে উঠেছে। সে নিজেও এদিকসেদিক যেতে খুব একটা ভালোবাসে না। তবে আফজালের কেন যেন মনে হয়, খুব আস্তে করে হলেও ছেলেটা যেন জমিয়ে নিতে শুরু করেছে। তাছাড়া নিশ্চয়ই তার কোনও কেরামতিও আছে। নইলে সওদাগর এত ভরসা করবে কেন ? এইটুকু একটা পোলার ওপর এতবড় বাড়িঘর সংসারের দায়িত্ব দিয়ে বাণিজ্যে চলে গেল ? ভারি তাজ্জব ব্যাপার!

তা গাঁয়ের মধ্যে জামালের চলাফেরা বলতে তার এই দোকান। সন্ধ্যা হলে এখানে এসে সে বসে, কথাবার্তা কখনওই বলে না, মাঝেমধ্যে প্রয়োজনে-অপ্রয়োজনে শুধু গামছা দিয়ে নিজের মুখটা মোছে আর শরীরে বাতাস করে। কেউ নিজে থেকে হুকা এগিয়ে দিলে টানে, না হলে চুপ করে বসে থাকে। তার পর একসময় কাউকে না বলেই উঠে চলে যায় সবার অজান্তে। তবে তার কাছে গেলে সে নাকি খুব পেয়ার করে হুকো টানায়।

জামাল অবশ্য খুব পেরেশানিতে আছে―যে পেরেশানির কথা কারওরই ঠিকঠাক জানার কথা নয়। ওইদিন বাড়ি ফেরার পর থেকে সে কেমন গুমোট মেরে গেছে। সখিনা বেওয়া একবার জিজ্ঞেস করেছিল, কোনও খবর সে জোগাড় করতে পেরেছে কি না। জামাল একথার সরাসরি উত্তর দেয়নি। শুধু বলেছে, ‘বেশি দূর তো যাইতে পারলাম না দাদি। আগেই জমিদারের পেয়াদা ফেরৎ পাঠায়া দিলো। সওদাগর চাচা না ফেরা পর্যন্ত কোনও খোঁজখবরে না জড়ানোই ভালো।’

তবে সখিনা বেওয়ার এই কথাবার্তা খুব বিস্বাদ লেগেছিল। ঠাণ্ডা গলায় বলেছিল, ‘আমাক ওইভাবে দাদি দাদি কখনও বলবে না।’

জামাল অবাক হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু সম্ভাষণজনিত এই জটিলতায় কোনও কিছুর বিস্তারিত বর্ণনাতেই আর যেতে হয়নি তাকে। ধান এখন বাড়ছে ধেই ধেই করে। ওদিকে সবজি লাগানোর দিনও চলে এসেছে। এখন এসব নিয়ে চিন্তা করার সুযোগ কোথায়। দুপুরে এই বাড়িঘরের দিকে তাকিয়ে অনেকক্ষণ ধরে ভেবেছে জামাল―সামনে ধান কাটার পর কোনখানে ধানের পালা সাজাবে, কোনখানে রাখলে মলন দেওয়া আর রোদে শুকানোর কাজটা বেশ সহজ হবে। চন্দ্রহারাতেও এমন কাজ করতে হয়েছে তাকে। কিন্তু সেই করায় না-ছিল আগ্রহ, না-ছিল উত্তেজনা। অনেকটা দায়িত্ব পালন করার মতো করে মাঝেমধ্যে এইসব দেখতে হতো তাকে নির্ধারিত কারও অনুপস্থিতিতে। কিন্তু এখানে নিজেই সে সর্বেসর্বা; ভাবতে তার ভালো লাগে আবার খারাপও লাগে।

জামালের অবশ্য এসব ভাবার বালাই নেই। কিন্তু তারপরও মনে মনে সে একটা ছক কেটে ফেলে। সব কিছু ঠিক থাকলেও সওদাগরের আসতে আরও কমপক্ষে ১৫-২০ দিন। তার আগেই ধানের আগাছা নিড়ানি দিয়ে ফেলতে হবে। এখন কামলা কিনেও কি সম্ভব আর নিড়ানি দেওয়া! শুধু কামলা কেন, গাঁয়ের মহিলাদের পাওয়াও মুশকিল হয় এই সময়ে। এতদিন টের পায়নি সে, কিন্তু কয়দিন হলো বুঝতে পারছে, চাষের কাজ মানে মহিষের মতো কাপড়ের গাঁট নিয়ে তাড়াতাড়ি হাটে যাওয়া। এর মধ্যে সেদিনের সন্ধ্যার সেই ঘটনা এখনও তাড়িয়ে ফিরছে তাকে। নামদার যদি ওইটাকে গুম করে ফেলতে না পারে, আরেক বিপদ। আরও বড় বিপদ হয়ত নামদারকেই আর খুঁজে পাওয়া না গেলে। এরকম অনিশ্চয়তা নিয়ে সে কীভাবে এই গাঁয়ে দিন কাটাবে ?

গরুগুলোকে খোয়াড়ে বেঁধে, বাঁশপাতা কেটে খড়ের সঙ্গে মিশিয়ে চাড়িতে দিয়ে সে কেবল একটু বসে তামাক সাজাচ্ছে, তখনই আফজালকে চোখে পড়ল। হুড়মুড়িয়ে আসছে সে এইদিকে। দোকান ছেড়ে সে বড়জোর যেতে পারে ওই গঞ্জে, সেই লোক তার কাছে আসছে কী কারণে!

‘বসেন ভাই। কী হইছে ?’

‘আরে রাহো তোমার বসাবসি। জমিদারের পেয়াদা আমাক খুঁইজা বেড়াইতেছে। তুমি কও বসতে!’

বুক ধক করে ওঠে জামালেরও। কিন্তু তা তার চোখমুখ দেখে বোঝা যায় না। পাপে পাপে সেকি একেবারে টইটম্বুর হয়ে গেল নাকি ? পাইক পেয়াদার আনাগোনা বেড়ে গেছে, সেটা তো সেও শুনেছে। কিন্তু আফজালকে খুঁজবে কেন ? ‘কয়দিন গা ঢাকা দিয়া থাকেন ভাই …’ বলতে গিয়েও বলে না জামাল। নিজের কাজের দায় সে আগবাড়িয়ে আরেকজনের কাঁধে চাপিয়ে দেবে ? আফজাল গা ঢাকা দিলেই জমিদারের লোকজন ভাববে, নিশ্চয়ই কোথাও একটা কিন্তু আছে।

‘আরে বসেন তো। পেয়াদা আইছিল, এই তো ? যাইতে কইছে ?’

‘তা কয় নাই। খুঁইজা গেছে। বউ কইছিল, খাজনা তো দেয়া আছে। শুইনা কইছে, হ, দোকান তালি ভালোই চইলতেছে―খাজনা আর বাকি পড়ে না।’

শুনে হেসে ফেলে জামাল, আফজালের দোকানেও নাকি এত লাভ হয় যে খাজনা দিতে সমস্যা হয় না! এবার অবশ্য এমন খরা কিংবা বান কোনওটাই হয়নি যে ধান নষ্ট হয়ে যাবে। কিন্তু আফজালের কি আর অত জমি আছে যে কামলা রাখতে হবে কিংবা বর্গা দিতে হবে। সেই জমি চাষবাদের পরও সে বেকার বসে থাকে; আবার তার শরীরেও অত তাগদ নেই যে, কামলা খেটে বেড়াবে। ছেলেপেলেগুলো এখনও তেমন ঝরঝরে হয়নি যে শক্ত কাজ করবে। আফজাল তাদের জন্ম দিতে দিতে শুধু নিজের শক্তিই ক্ষয় করেছে, কোনও লাভই হয়নি তার।

তবে এ নিয়ে না হয় পরেই ভাববে সে। এখন ভালো করে না তাকিয়েও টের পাচ্ছে সে, ভেতরবাড়ি থেকে সওদাগরের মা শ্যেনদৃষ্টিতে ঘরের টিনের বেড়ার ফুটো দিয়ে তাকিয়ে তাকিয়ে দেখছে, কী করছে সে। অতএব কথাবার্তায় দাড়ি টানে সে, ‘চিন্তা করেন ক্যান ? আপনের খোঁজে আইছিল, এইটা তো ধরেন এহন সগ্গলেই জানে। আবার আসুক, দেখেন কী কয়। … যাবোনে, দরকার হলি আমরাও যাবোনে আপনের সঙ্গে। ভয় করেন ক্যা ?’

এতক্ষণে আফজাল একটু শান্তির হাসি হাসে, ‘না, ভয় ক্যান পামু ? তোমরা আছো, না ? তয় মানুষটা তো খুবই খচ্চর।’

‘তাই ?’―কথার পিঠে কথা বলে জামাল। এ তো জানাই, বেশির ভাগ জমিদার এরকমই হয়। ভাগ্য ভালো, বর্তমান সব সময় ভবিষ্যতের কাছে কোনও অঙ্গীকার না করেই অতীতের গহ্বরে ডুবে যেতে ভালোবাসে; না হলে কী যে হতো! তাই মরে যাওয়ার পর তাদের বানানো দীঘি কিংবা পুকুর দেখে, শ্মশান কিংবা গোরস্থান দেখে, রাস্তার ধারে বানানো ইঁদারা দেখে মানুষজন তাদের আসল চেহারাটা কখনওই ভাবতে পারে না। আফজাল না বললেও সে এরকমই ভাবত জমিদারের সম্পর্কে।

কিন্তু কথা হলো, সে নিজেও কি খুব ভালো একটা কিছু জমিদারের থেকে, অন্য কারও থেকে ?

হুকোটা আফজালের দিকে বাড়িয়ে দিয়ে গামছা দিয়ে বুকটা মুছতে মুছতে জামাল এগিয়ে যায় গোয়ালঘরের দিকে।

৭.

সকাল থেকে এই ঘটনাটা ঘটছে। সালমা বেওয়া বার বার গাঁয়ের একদিক থেকে অন্যদিকে যাচ্ছে। হাতের কাছে যাকে পাচ্ছে, তাকেই বলছে, ‘হোনো, কাজেম-নাজেম কইল হারায় নাই। ওরা বাড়িতই আছে। জমিদারের পেয়াদা অগারে ধইরা নিয়া যায় নাই।’

এ খুব ভালো খবর; কিন্তু বার বার বলতে হবে কেন! পরে দেখা গেল, তার ছেলের বউও বাড়ি বাড়ি ঘুরছে আর বলছে, ‘মানুষজন হুদাই কয়… হ্যারা তো বাড়িতেই আছে। পাতলা পায়খানা হইছিল। চুনের পানির সাতে লবণ আর খয়ের মিশায়া খাওয়াইয়া দিলাম, একদিনেই থাইমা গ্যাছে। তয় শরীর খুবই দুর্বল। নড়াচড়া কইরবার পারে না।’

আফজালের কাছে সালমা বেওয়া এ কথা বললে সে খুশিই হলো। খবর দিয়ে সে ঢুকে পড়ল বাড়ির ভেতর। তার পর কতক্ষণ যে থাকল, সওদাগরের মায়ের সঙ্গে কত কী কথা হলো, তা কে জানে! কখন সে বেরিয়ে গেছে তা জানা নেই জামালের। সে গিয়েছিল জলাভূমি আর বনের ধারে, যেখানে খানিকটা উঁচু গড়ানের জমি আছে সওদাগরের। আর তাতে ছিটিয়ে দেয়া হয়েছিল মাষকলাইয়ের বীজ। খুব একটা যত্নআত্তি করতে হয় না। তবু ফসল তোলার সময় ঘনিয়ে এসেছে, তা ছাড়া এই মাষকলাইয়ের ডাল জিনিসটা আবার তার নিজেরও ভারি প্রিয়। সে তাই গিয়েছিল একটু দেখভাল করতে। তবে রোদটা বড় ভারী, রুক্ষ্ম হয়ে উঠল হঠাৎ করেই। তাছাড়া মন তার বার বার চাইল, বনের মধ্যে ঢুকে পড়ে অযথাই কোনও একদিকে হাঁটতে। মনের সেই ডাককে সামাল দিতে বাড়ি ফিরল সে দুপুর গড়িয়ে পড়ার আগেই। আর তখন কী আশ্চর্য, সালমা বেওয়ার ছেলের বউ এসে ফের একই খবর দিলো। শুনে সে বলল, ‘শুনছি তো। সকালে দাদি আইছিল। কয়্যা গ্যাছে।’

‘তাও আরাকবার কইবার আইল্যাম। মানুষজন খালি খালি সন্দেহ কইরতেছে জমিদারেক―’

ভারি তাজ্জব লাগে আফজালের, ‘মানুষজন ক্যান সন্দেহ কইরব ? তোমরা কইছিলা জমিদার নিয়া গ্যাছে, মানুষজনও তাই মনে করছিল। অ্যাহন আবার কইতেছ, নিয়া যায় নাই, ঘরেই আছে; তাই সই। তাগারে খবর কি তোমাগারে চে’ আমরা বেশি ভালো জানমু, কও ?’

‘সেডাই তো। সেই জন্যেই কইলাম আরকি।’

বলে সে যেন একটু তাড়াতাড়িই কোনও কিছু লুকানোর জন্যে চলে গেল। তখনই বাড়ির ফটকটা একটু সরিয়ে গলা বাড়িয়ে সাহানা ডাকল তাকে, ‘দাদি আপনেক বাড়ির ভেতর ডাকে। তাড়াতাড়ি আসেন।’

এরকম হয় না―সওদাগরের মা পারতপক্ষে কাউকে দিয়ে তাকে ভেতরবাড়িতে ডেকে পাঠায় না। তার নিজের গলাই তো অনেক চড়া। একটু গলা উঁচিয়ে সে কথা বললেই এ বাড়ির গাছগাছালির সব পক্ষী ডান ঝাপটিয়ে নতুন কোনও ডালে গিয়ে বসে। সে হাতের পাঁচনটা ঘরের ডোয়াতেই রেখে ফটক ঠেলে ভেতরে ঢুকে দেখে সাহানা তখনও দাঁড়িয়ে আছে। তার মুখে একরাশ চিন্তা জমে আছে।

‘সোজা দাদির ঘরে চইলা যান।’

লম্বা ঘরের পূব দিকের বারান্দা দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে সে সওদাগরের মায়ের ঘরের বাইরে দাঁড়ায়। গলাখাকারি দেয়, ‘আমাক ডাইকছেন দাদি ?’

পেছন থেকে সাহানা নিম্নকণ্ঠে জানায় তাকে, ‘দাদির বুক খালি ধড়ফর কইরতেছে, শ্বাসকষ্ট হইতেছে।’

সওদাগরের মায়ের কণ্ঠ শুনে জামালের অবশ্য সেরকম কিছু মনে হয় না। বরং সে যেন আগের চেয়েও পাকাপোক্ত গলায় বলে, ‘ভেতরে আসো তুমি।’

চৌকাঠ ডিঙিয়ে ভেতরে ঢোকার আগে লুঙ্গিটা পায়ের দিকে আরও একটু নামিয়ে গিট্টু দিয়ে ভেতরে ঢোকে জামাল। দেখে বিছানায় টান হয়ে শুয়ে আছে সওদাগরের মা, চোখ একটু বোজা, হালিমা তার মাথা টিপে দিচ্ছে। তার দিকে তাকিয়ে বলে সখিনা বেওয়া, ‘তুমি এহন যাও, ইট্টু পরে আসো হালিমা।’

সখিনা বেওয়া চোখটা পুরোপুরি মেলে হালিমার চলে যাওয়া দেখে। মুখ ফিরিয়ে বলে, ‘তোমার মালিক কবে আসবে জামাল ?’

‘তা তো জানি না দাদিজান।’

‘আমরা না জানি, তোমার তো জানা থাকা দরকার, নাকি ? তোমার উপুর তো সে এই বাড়িঘরের দায়িত্ব দিয়া গেছে। … নাকি যায় নাই ? … এত বড় দায়িত্ব, তুমি জিজ্ঞাস কর নাই, কবে ফিরবে ? … নাকি তোমার মতো নাদানরে পাইয়া তার পাঙখায় আরও বাতাস লাইগছে ?’

কথা বাড়ানোর মানে হয় না; বলতে ইচ্ছে বলতে থাকুক। তাই চুপ করে তার সামনে দাঁড়িয়ে থাকে জামাল। তবে প্রশ্নও জাগে মনে, এত সুন্দর করে তার সঙ্গে কোনও কথাবার্তা তো বলার কথা নয় এর। কিন্তু এখন যে বলছে, কী কারণে বলছে, তাও তো তার জানা দরকার।

‘তুমি দাঁড়ায়ে আছ ক্যান ? তুমিও যাও সাহানা।’

সখিনা বেওয়া এ কথা বললে জামাল বোঝে, এতক্ষণ ধরে সাহানাও তার পিছে দাঁড়িয়ে আছে। সে চলে গেছে এটা নিশ্চিত হলে সওদাগরের মা ফের মুখ খোলে, তবে এবার তার গলা অনেক নিচু হয়ে যায়, ‘তুমি কি মনে করো, আমার কাছে কুনু খবর আসে না ? তুমি কইলেও আসে, না কইলেও আসে। আমাক কিছু কও নাই, ঠিক আছে। কিন্তু বোকামি কইর না। শামসু কোনখানে আছে, খোঁজ ন্যাও, হের কাছে খবর পাঠাও। সব কিছু লণ্ডভণ্ড হয়্যা যাইতেছে―সব কিছু।’

বলে শরীরটা টান করে শোয় সখিনা বেওয়া। চোখ তার বুজে গেছে। হাত হাতের সামনের আঙুলগুলো যেভাবে নড়ে, তা থেকে জামাল বুঝতে পারে, তাকে চলে যেতে বলা হচ্ছে। অতএব ঘর থেকে বেরিয়ে পড়ে সে। এখন কোত্থেকে খবর পাবে সে যে, সওদাগর কোনখানে আছে ? তার হদিস পাওয়া কি আর এতই সহজ ?

জামাল আবারও বাড়ির ফটকের বাইরে এসে দাঁড়ায়। মূল বাড়িটা থেকে থেকে একে কি আলাদা একটা বাড়িই বলা যায় না ? বাড়ির ভেতরে যেমন উঠান, বাইরেও তাই। ধান-পাট কিংবা সরিষা-তিল এইসব উঠলে বাড়ির কামলাদের কাজে লাগে এই উঠান। এবার তো এই উঠানে তাকেই মলন দিতে হবে। কিংবা পাট শুকাতে দিতে হবে। আর বাইরেও একটা গোলাঘর, গোলাঘরের পাশেই গোয়াল ঘর। বেশ পোক্ত এই গোয়ালঘর। প্রায় দুই মানুষ উঁচু গোয়ালঘরের বেড়া দেওয়া হয়েছে চ্যাগানো বাঁশ দিয়ে। সওদাগরের মতে, তাতে গরমের দিনে গরম যেমন কম লাগে গরু-বলদ-ষাড়ের, ঠিক তেমনি শীত কম লাগে পৌষ-মাঘ এলেও। গোয়ালঘরের বাইরে খোয়াড়ের তিন পাশই খোলা, কিন্তু ছাউনি দেওয়া। খাওয়ার জন্যে ষাড়-গরু বাঁধা হয় এখানে, বিশ্রামের জন্যে নিয়ে রাখা হয় গোয়ালঘরে। এ গোয়ালঘর দেখলে হিংসা করবে না, এমন মানুষ খুঁজে পাওয়া মুশকিল।

সেই খোয়াড়ের পাশে উদভ্রান্তের মতো সে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে সমীরণকে। এই লোকটার সঙ্গে তার যে তেমন পরিচয় আছে, সেরকম না; কথাবার্তাও হয় না তেমন, সবচেয়ে বড় কথা সে এটাও জানে না, এই লোকটা আসলে কে, কী তার কাজ এই গাঁয়ে। কিন্তু নামটা জানে, কী করে যেন জানা হয়ে গেছে, হয়ত আফজালের দোকানে মাঝেমধ্যেই দেখা হয় বলে।

‘কিছু কইবেন আপনে ?’

জিজ্ঞেস করে জামাল। সমীরণ যেন ভাবে, কোনও কিছু বলবার মতো আছে কি না মনে করার চেষ্টা করে। তার চোখমুখ আরও বেদিশা লাগে। যেন কোনও কথা খুঁজে পাচ্ছে না, কিন্তু কিছু একটা বলতেই হবে, তাই সে বলে ওঠে, ‘সওদাগর কোনে ? আমি বাণিজ্যে যামু।’

বড় অদ্ভূত কথা। পাশ কাটিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে জামাল, ‘ঠিক আছে, যায়েন। সওদাগর তো নাই, সে ফিইরা আসুক, সামনের বার যায়েন। এহন কন, বাণিজ্যে যাইতে চান ক্যান।’

‘ম্যালা লম্বা কতা। তোমাক কইয়া তো লাভ নাই। সওদাগরেক দরকার।’

কী মনে হয় জামালের, বলে, ‘এক কাম করেন, চন্দ্রহারা চরে যান। সেইখানে খোঁজেন তারে। পাইলেও পাইতে পারেন।’

আর কিছু বলতে ইচ্ছে করে না তার। তাছাড়া বলার পর মনে হয়, কিসের জন্যে সে বলতে গেল চন্দ্রহারা চরের কথা ? সওদাগরকে যে সেখানে এবার পাওয়া যাবে না, সেটা সেও মোটামুটি নিশ্চিত। তাহলে মুখ ফসকে যে এমন কথা বেরুলো, তার কারণটা কী ?

কিন্তু সমীরণ দাঁড়িয়েই থাকে। আবারও জানায় তাকে জামাল, ‘বেলা এহন দুইপহর। আমাক খাইতে হবে, বুইঝছেন।’

‘তোমার কাম তুমি করো। মনে করো আমি নাই। আমার মনে কুনু শান্তি নাই জামাল। বড় অশান্তি, মনে কয় দেশান্তরী হই।’

‘তালি আর বাণিজ্যে যায়্যা কী কইরবেন ? মন যহন দেশান্তরি হয়, তারচে বড় আর কুনু দেশান্তরী নাই।’

বলে জামাল খাবার আনতে চলে যায় বাড়ির ভেতর। গিয়ে দেখে রান্নাঘরের একচিলতে বারান্দায় সানকিতে ভাত রাখা হয়েছে তার জন্যে। সওদাগরের বউ ঘরের মধ্যে শিকায় পাতিল তুলছে। দুই-তিনটা বিড়াল ঘুর-ঘুর করছে তার পায়ের কাছে। জামাল সানকি, বাটি সব কিছু নিয়ে বাইরের দিকে রওনা হচ্ছিল। তখনই সওদাগরের বউ বলে ওঠে, ‘জামাল, বাইরে তো মানুষজন আছে মনে কয়। তুমি এহানে বইসাই খাইয়া যাও।’

রান্নাঘরের পাশেই ইঁদারা। বালতি ফেলে পানি তুলে হাতমুখ ধুতে ধুতে মনে হয় জামালের, আহ্, এই টলটলা পানিতে একদিন গোসল করতে পারলে কত শান্তিই না হতো। তা কি আর তার ভাগ্যে আছে! সে যে এই ইঁদারা থেকে তোলা এক কুঁজো পানি দৈনিক খেতে পারে, তাই তো তার সাতজন্মের ভাগ্য। হাতমুখ ধুতে ধুতে তার এ-ও মনে হয়, কেউ যেন তার দিকে তাকিয়ে আছে। সোজা হয়ে বালতির শেষ পানিটুকু দুই পায়ের পাতার ওপর ঢেলে দিয়ে ঘুরে উঠতেই কারও মুখ যেন সওদাগরের দাদির ঘরের পাশের ঘরটার জানালা থেকে সরে গেল চট করে।

খাওয়া শেষ করে বাইরে এসে দেখতে পেল জামাল, তখনও আছে সমীরণ। এর আগের বার বেরিয়ে দেখেছিল গোয়ালঘরের পাশে দাঁড়িয়ে থাকতে, এখন সে এসে ন্যাটা দিয়ে বসে আছে কামলাদের ছাপরাঘরের বারান্দায়। ঘরের বাঁশের খুঁটিটায় হেলান দিয়ে বসে থাকতে থাকতে একটু বোধহয় ঘুমও এসে গেছে। তার ঘুম ভাঙায় না জামাল। ধীরেসুস্থে তামাক সাজতে বসে। এই এতক্ষণের অভিজ্ঞতায় এখন পরিষ্কার, তাকে এ বাড়ির কেউ আর ডাকাডাকি হাকাহাকি কোনটাই করবে না। চারটা অসহায় প্রাণী এই বাড়ির মধ্যে কোনও অজানা আতঙ্কে গুটিয়ে আছে। আর তার শুরু সালমা বেওয়াদের পাগল হওয়ার মধ্যে দিয়ে। কিন্তু সত্যিই কি পাগল হয়েছে বুড়িটা ? নাকি কোনও ভান ? কেন এই ভান ? তা যা হোক, সওদাগরের দাদি তার দিকে আর শ্যেনদৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকবে না, এই বাড়ির জন্যে যা করার তাকে নিজেকেই করতে হবে। নিজের দায়িত্বে। যেমন নিজের দায়িত্বে লুকিয়ে রাখতে হবে পেয়াদা খুনের কথা, লুকিয়ে রাখতে হবে আসামের বন্দরে সেই এক ইংরেজকে খুনের কথা। আবার শান্তিতেও রাখতে হবে নিজেকে। কঠিন বিপদ তার। এর চেয়ে হয়তো চকমকির বিলে আর জঙ্গলে মহিষ-শুয়োর পোষ মানানোই অনেক ভালো ছিল; আবার কে জানে, হয়তো এখন যা করছে সে, সেটাই অনেক ভালো। তামাক সাজিয়ে, আরও একটুখানিক মতিহার পাতায় করে তুলে ট্যারে গুঁজে গায়ে ঠেলা দিয়ে জাগিয়ে তোলে সে সমীরণকে, ‘ও কাকা―চলেন, জলার ধারে গিয়া বসি―’

হুড়মুড় করে, হয়ত বা খানিকটা চমকেই সোজা হয়ে বসে সমীরণ। যেন সে নিশ্চিহ্ন হয়ে গিয়েছিল ক্লান্তির ভারে, কিন্তু ফের প্রাণ ফিরে পেয়েছে। ধীরে ধীরে ফিরে আসছে স্মৃতি, ধীরে ধীরে সে টের পাচ্ছে পৃথিবীর ঘ্রাণ, গায়ের ওপর এই হেমন্ত ছুঁই ছুঁই বাতাসের ছোঁয়া। আর তাতে একেবারে নতুন মনে হচ্ছে সব কিছুকে। যেতে যেতে বলে সে, ‘কেইবা শয়তান জমিদার, দেইখছ ? এমন ভয় দেখাইছে কাজেমের মা আর বউয়েক, বাড়ি বাড়ি ঘুইরতেছে আর কইতেছে―’

‘এই দুঃখে আপনে বাণিজ্যে যাইতে চান ?’

থতমত খায় সমীরণ, ‘না, তা না। আমাগারে নায়েব চায় ইছামতির চরে পাঠাইতে। চর জাগতাছে।’

‘তে যানগা। সমস্যা কী ?’

‘সুখে আছাও তো! তুমি কী বুঝবা! তুমি যাইবা ?’

হাতপা ছড়িয়ে জলার ধারে বসে তারা। হুকো টানে আর কথা বলে। বিকেলের রোদ এসে লুটোপুটি খায় কপালে, পায়ে। হিজল গাছগুলো শেষবারের মতো রোদ শুষে নিচ্ছে সূর্যের কাছ থেকে। শান্ত হয়ে আসছে পৃথিবী।

‘আপনেরা কয়জন ?’

‘১৭ জন।’

‘মাইয়া মানুষ ?’

‘যে পারে নিবে।’―একটু থেমে বিরক্তমাখা কণ্ঠে সে ফের বলে, ‘জঙ্গল সাফ করতে করতে জীবন গেল।’

জলা পেরুলেই বিস্তৃত মাঠ। তা হয়ত বর্ষাকাল চলে গেছে বলেই। সেই মাঠের ওপারে স্পষ্টই চোখে পড়ে এখনও কিছু কাঁশ বেঁচে আছে ঘন শালের বনের ধারে। সেদিকে হাত উঁচিয়ে সমীরণকে বলে জামাল, ‘ওইদিকে ওই বনের ওই ধারে কোনও গাঁও আছে ?’

‘গাঁও কোনখানে নাই ? জঙ্গলেও আছে। ঢুইকা খোঁজো, পাইয়া যাবা। মানুষও একডা জানোয়ার, মনে রাইখো। সবখানে আছে।’

তা ঠিক। মানুষের চেয়ে বড় জানোয়ার আর কে আছে! আর জামালের চেয়ে সে কথা কে আর ভালো করে জানে। তবু জানোয়ারটার নাম মানুষ,―ওইটাই বড় সুখ। যখন সে এই নিঝুমগাঁয়ে এল, বোধহয় একটু স্বস্তিই পেয়েছিল; নোঙর ফেলার স্বস্তি তার প্রাণে জেগেছিল। মানুষ বোধহয় এই স্বস্তিটুকুই খুঁজে ফেরে। কিন্তু একসময় এই স্বস্তিই তার ফাঁস হয়ে ওঠে। এখন, এই মুহূর্তে সে টের পাচ্ছে, সওদাগর আসলে বাণিজ্যে যায় না―সে যায় নদীবাসে।

দু’ ছিলিম হুকা খাওয়ার পর সমীরণের নিশ্চয়ই প্রাণটা খোলে। আর বোঝা যায়, জামালকে তার বেশ পছন্দ হয়েছে। কণ্ঠ তার এখন খুবই স্বচ্ছ, ওই ইঁদারার জলের মতো, ‘ঝামেলার সোময় আসতেছে পরদেশি। … তোমাক জমিদার ক্যান য্যান সন্দ করে! কয়, সওদাগর বাড়ি পওর দেওয়ার জইন্যে একটা ডাকাত নিয়া আইছে।’

‘তা যদি হয়, তার কী সমস্যা ? মোহরের কলস যার কাছে, গোখরা সাপ তো সেই পোষে। নাকি কন আপনে ?’

‘এইটা তুমি খুব ভালো কতা কইছ। কিন্তু জমিদার নাকি নামদারেক খবর দিয়া নিয়া আসছিল। যেদিন সে আইছে, সেইদিন থাইকাই নাকি সে উধাও হয়্যা গ্যাছে―আর সেই থাইকা তার এক পেয়াদাও নাই।’

‘নামদার কেডা ?’

‘চিনবা। এই গাঁয়ে থাইকলে, বাঁইচা থাইকলে একদিন ঠিকই চিনবা।’

‘বুঝলাম না। বাঁইচা থাইকলে একদিন চিনব মানে ? সেই নামদারের কি মরার দশা ?’

গভীর দৃষ্টিতে তাকে নেড়েচেড়ে দেখে সমীরণ। তার পর বলে, ‘তুমি তো কতা আরাক দিকে নিয়া গ্যালা। এইডা তো ভাবি নাই!’

সমীরণ হিসাব কষতে থাকে। নামদার খুব একটা গাঁয়ে থাকে না, কখন আসে কখন যে যায়, তাও সবাই ঠিকমতো বলতে পারে না। তার পরও সে কি আর শামসুল সওদাগর! সে কোনখানে গেল, খোঁজ করতে সেটা তো নিশ্চিত জানা যায়। তাহলে কোনখানে আছে সে এখন!

‘জমিদার আমাক সন্দ করে, এখন য্যান আপনেও আমাক সন্দ করতেছেন, কাকা ?’ ―হাসতে হাসতে বলে জামাল।

‘করতিছি তো। সন্দ করব না ? তুমি আসতে না আসতেই সওদাগর উধাও, এ উধাও ও উধাও। আর এইডা কি জানো, ব্যানার্জীর বিধবা মেয়ে নাকি জমিদারের ছোট ভাইয়ের চোখে পইড়ছে ? সেই বিধবা মেয়ের আবার নাকি বিয়ার প্রস্তাব আসতেছে! কিন্তু বাপে আবার রাজি না তাতে। তা রাজি না হইয়া কী হইছে ? সে খবর জাইনা জমিদারের ভাই নাকি উন্মাদ হয়্যা গ্যাছে। সেও চায় বিয়া কইরতে। তাতে আবার জমিদার রাজি না। আর রাজি হইলেই বা কি, বিয়া হইলেইবা কী ? ওইডাক কি বিয়া কয় ? এ কি মুসলমানগারে বিধবা বিয়া যে ঘরসংসার করে ? মাঝেমধ্যে রাইত কাটাইব আর সারা বছর ফেলায়া থুইব। রাম―রাম―কত কেচ্ছাকাহিনি গাঁয়ে!’

মহাউত্তেজিত হয়ে উঠে দাঁড়ায় সমীরণ। তাকে আর বাধা দেয় না জামাল। হুকো নিয়ে তাড়াতাড়ি সেও বাড়ির দিকে এগোয়। প্রথমে মনে হয়েছিল, এটা নেহাৎই ফাও আলাপ, খালি খালি খানিকটা সময় নষ্ট। কিন্তু এখন অন্তত সে এটুকু জানে, জমিদার তার কথা জানে আর তাকে ভালো চোখে দেখে না। আর এখন অন্তত এটাও বোঝা গেল, তার কোনও ক্ষতি করতে হলে জমিদার সেটা সওদাগর ফিরে আসার আগেই করে ফেলবে।

৮.

সারা রাত খুব সাবধানেই ছিল জামাল। এমনকি রাতে তিন-চার বার উঠে বাড়ির আশপাশে ঘুরেও এসেছিল। কখনও তক্ষক ডাকছে, কখনও রাতের পাখি উড়ে যাচ্ছে সরসরিয়ে, কখনও আকাশে কোনও তারা যেনবা খসে পড়ছে। কী মনে করে একবার ঘরের কাছে থাকা খেজুরের গাছ বেয়ে সে অনেক উপরে উঠে পড়ল। রাতের বিচিত্র চেহারা আর আলো ছুঁতে চাওয়া স্তব্ধ অন্ধকার তাকে স্তব্ধ করে রাখল। আফজাল এখন আর সন্ধ্যায় দোকান খুলে বসে না। রাতে ঘরেও থাকে না। তার পরও প্রতি সন্ধ্যাতেই তার সঙ্গে জামালের খানিকক্ষণ ফিসফাস আলাপসালাপ হয়; তার পর সে চলে যেতেই যেনবা আফজালের দোকান এখন বন্ধ থাকে বলেই গ্রামটা যেন আরও নিঝুম হয়ে ওঠে ইদানীং। ত্রাস―সবখানে ভয়ঙ্কর এক ত্রাস লুটোপুটি খেলে। তবে মনে হলো, রাত পেরিয়ে সেই ত্রাস এবার দিনকেও স্পর্শ করেছে। তবে ঘটনাটা সে-রাতে ঘটল না। ঘটল পরের রাতে। আর তার চিহ্ন যেন সে সন্ধ্যাতেই খুঁজে পেল সে। অবশ্য সে খুঁজে পাবে না তো, কে পাবে! গুইসাপগুলোর দু-চারটা হঠাৎ ছাপড়ার পাশ দিয়ে চলে গেল এদিক সেদিক, পাখিরা যেন আজ ঘুমঘর বানাচ্ছে নতুন করে, আর নতুন বলে ঘুম আসছে না অন্য কোনও দিনের মতো। অতএব সে ফটক ভেতর থেকে বন্ধ হওয়ার আগেই বাড়ির ভেতর গেল। গিয়ে দাঁড়াল সওদাগরের মায়ের শিয়রের কাছে।

চোখ মেলে তাকাল সখিনা বেওয়া, ‘কিছু কইবা তুমি ?’

‘আইজ মনে কয় খুব কষ্ট হইব দাদিমা। ঘরে থাকা ঠিক হইব না।’

‘কোনখানে যামু এই ঘরদোর ছাইড়া ?’

‘ঘরদোরের মায়া বাদ দ্যান দাদিমা। জান বাঁচানো ফরজ। বাতিবুতি নিভায়া দ্যান, চেঁচামেচি কইরা য্যান বা ঘুমাইতে যাইতেছেন, এমন করেন। আমি ফটকের সামনে আছি। জলার ওই পাড়ে দিয়া আসমুনে।’

‘ফটক দিয়া বারাইবা ?’

‘ওইটাই ভালো দাদি। আর সব দিকে কোনখানে কী আছে, কেডা জানে!’

আশ্চর্য, বুড়ি সব কিছু কি পরিষ্কার বুঝতে পারে! কথা বাড়ায় না। ঘরের বাইরে বেরিয়ে জামাল সাহানার সামনে পড়ে যায়।

‘কী হইছে ? মা দাদি কিছু কয় না―আপনেও আমাক কিছু কন না ক্যান, কন তো ?’

‘কওয়ার জইন্যে আমাগারে সারাজীবন পইড়া আছে। অ্যাহন ভেতরে যান।’―বলে নিজের কাছেই কেমন যেন লাগে জামালের। সারাজীবনের কথা বলতে গেল কেন বেহুদা!

নিজের ছাপড়ায় গিয়ে ঘরের মধ্যে পিদিমটাকে আরও একটু উস্কে দেয় জামাল। আর ছোট জানালাটাও খুলে দেয়, যাতে চোখে পড়ে আলোটা বাইরে থেকে। লোকে দেখুক, সওদাগরের বাড়ির কামলা এখনও জেগে আছে।

তার পর ঘটনাটা যে কখন ঘটে! মনে হয়, আকাশের অন্ধ চাঁদটা তখন হেলে পড়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে। ঠিক তখনই হই-হই রই-রই শব্দে মশাল জ্বলতে শুরু করে। সারা দুনিয়া যেন আলোকিত হয়ে উঠবে মশালের আলোতে। তার বেশ আগেই অবশ্য জামাল বাড়ির চারজন মানুষকে নিয়ে জলাভূমির অল্প পানি খচতে খচতে পৌঁছে গেছে আরেক ডাঙায়। সেখানে কী মনে করে সওদাগর একটা একটা টং-ছাপড়া তুলিয়েছিল কামলাজামলাকে দিয়ে বছর কয়েক আগে। ক্ষেতে ক্ষেতে এখন পাট কিংবা আখ। এই পথে যদিও বা আসে ডাকাতের দল, কোনও সমস্যা নেই, ওইসব ক্ষেতে ঢুকে পড়া যাবে।

আরও খানিকক্ষণ অপেক্ষা করে জামাল। আরও খানিকক্ষণ দেখে। না, এখন আর মশালের আগুন না―বাড়িঘরেও আগুন জ্বলতে শুরু করছে। ঘরে কেউ নেই; তা জেনে বোধহয় আরও ক্ষিপ্ত হয়ে উঠেছে ডাকাতের দল। তাদের ক্ষেপামির আগুন ছড়িয়ে পড়ছে চারপাশে। আকাশ আলো হয়ে গেছে। মানুষজনের চিৎকার ছড়িয়ে পড়ছে আকাশে, পুড়ে মরছে আগুনে, ডুবে যাচ্ছে অন্ধকারে। এদিক ওদিক, কত দিকে জ্বলছে মশাল, কতদিকে পুড়ছে ঘর বাড়ি―চোখ ঘুরিয়ে কত আর দেখবে জামাল! ভয়ে নির্বাক হয়ে গেছে সওদাগরের মা আর বউ। বিস্ফোরিত চোখে আগুন দেখছে সাহানা আর মর্জিনা।

কিন্তু দু’একজনকে তো রেখে দিতে হবে―কী এক বুনো জিঘাংসা জেগে ওঠে জামালের মধ্যে। যা কেবল সে টের পায় জেগে ওঠার পরে। আবার নিজেই অবাক হয় তা হারিয়ে গেলে।

‘আপনারা তালি এইহানেই থাহেন। অবস্থা বুইঝা ব্যবস্থা নিয়েন।’

কেউ কোনও উত্তর দেয় না। কারণ এখন নিজের জীবনই সবচেয়ে বেশি প্রিয় সবার কাছে। তারা সবাই এখন অন্ধকার খুঁজে ফিরছে, সন্দেহের চোখে দেখছে আলোকে, ভীত হচ্ছে আলোর স্রোতে কারও চোখে পড়ে যেতে পারে বলে।

তির-তূণ নিয়ে জলাভূমির দিকে এগিয়ে যায় জামাল।

৯.

তার পর কী দিয়ে যে কী হয়েছিল, জামাল তা নিজেও বলতে পারবে না ভালো করে। এ-ও তার মনে নেই, কী করে সে পেয়েছিল অন্নপূর্ণাকে সেই রাতে আর তাকে নিয়ে ফিরে এসেছিল জলাভূমির ধারে, টং ঘরটায়। যেখানে তার জন্যে অপেক্ষা করছিল চারজন উৎকণ্ঠিত মানুষ। শেষ রাত পেরিয়ে ভোর হই ভোর হই করছে তখন নীল আকাশটা। জামালের শুধু মনে পড়ে, ‘আপনি আইসছেন ?’ বলে তার হাতজোড়া সাহানা আঁকড়ে ধরেছিল আর জামালের মুখের দিকে একপলক তাকিয়েই তীব্র বিস্ময়ে দুই চোখ পুরোপুরি মেলে ধরেছিল অন্নপূর্ণার দিকে। তার সাদা শাড়ি এখানে-ওখানে ছিঁড়ে গেছে; মুখে, ঘাড়ে, কাঁধে আঁচড়ের অথবা কামড়ের দাগ; কিন্তু চোখে কোনও ভাষা নেই, বোবা বনে গেছে সে। তাকে কোনওমতে টংঘরের সামনের বাঁশের মাচালে শুইয়ে দিয়েই পরিত্যক্ত ধানখেতটার মধ্যে ধপাস করে পড়ে গিয়েছিল জামাল। অজ্ঞান নয়, ঘুমিয়ে পড়েছিল সে। সওদাগরের বউ হায় হায় করে উঠেছিল। তাতে সাহানা সম্বিৎ ফিরে পেয়েছিল। ঈর্ষা তার এমনিতেই কম, যাওবা জেগে উঠছিল, তাও চিরতরে মরে গিয়েছিল জামালকে মৃত ভেবে।

সওদাগর ফিরে এল এসবেরও দুদিন পর। ঘুমে-আধো ঘুমে, এমনকি অচেতনে বেশ কয়েকবার তাকে দেখল জামাল, আর শুনতেও পেল, দূর থেকে যেন কারও কথা ভেসে আসছে, ‘কেইব্যা আছ জামাল ? কেইব্যা আছো ?’ কিংবা শুনতে পেল, ‘কেইব্যা আছ ? কী হইছিল, ইকটু কও তো।’ কিন্তু কী করে তার কাছে এইসব বলবে জামাল ? জাগতে জাগতেই হারিয়ে যায় সে ঘুমের রাজ্যে। জাগলেও কোনও কিছু মনে আসে না স্পষ্ট করে। তাছাড়া নিজের কথা আর নিজে-নিজে কী করে বলবে সে ? বলবে, তার ভাগ্য ভালো, প্রথম তিরটাই গিয়ে লেগেছিল জমিদারের ছোট ছেলের বুকে ? নিশ্চয়ই সে-ই দলনেতা হয়ে এসেছিল। কে জানে, কী বোঝাপড়া হয়েছিল তার নিজের বড় দাদার সঙ্গে। তবে বড় ভুল করেছে সে, একই দিনে দুই জায়গায় ফাঁদ পাততে গিয়ে। ব্যানার্জীবাড়ির কাজটা অবশ্য খুব সহজেই হয়ে গিয়েছিল। সেখানে লুটপাট বলতে তো শুধু একজন মেয়েকে নেয়া। তা ছাড়া তারা কি আর জানে না, কয়টা মোহর থাকতে পারে ওই বাড়িতে! কিন্তু মহাদেব বল্লভের উচিত ছিল, সেখান থেকেই ছিপ নৌকায় অন্নপূর্ণাকে নিয়ে নিরুদ্দেশে যাওয়া। তবে এসব এখন আর কে ভাবতে যাচ্ছে। নিঝুমগাঁয়ের মানুষ তো শুধু জানে, ডাকাত এসেছিল সেই রাতে, ভয়ঙ্কর সেই রতন ডাকাতের দল, যে থাকে জঙ্গলের ভেতরকার কোন এক হাওরে সারা বছরই নাওয়ের ওপর। এরকম সময়ে একটা লাশ পড়লেই ডাকাতের দল কু-এর ডাক শোনে, পিঠটান দেয় সন্তর্পণে। কিন্তু জামালের তির কেড়ে নিয়েছিল তিনজনকে। ভাগ্য ভালো, আফজাল, নামদার আর সমীরণদের সেই রাতে সে খুঁজে পেয়েছিল। আর পরে যখন আকাশ ফরসা হয়ে আসছে, তখন পা দিয়ে উল্টেপাল্টে মহাদেব বল্লভের লাশটাকে ভালো করে দেখে নিয়ে সবচেয়ে ভালো পরামর্শটাই দিয়েছিল তাকে, ‘এইসব চিহ্ন রাইখা ঝামেলা বাড়ানোর কুনু মানে আছে ?’ তখনও আগুন জ্বলছিল বাড়িঘরে, মানুষজন তখনও লুকিয়েছিল কে কোনখানে। একটা আগুনজ্বলা কাঠের টুকরা নিয়ে নামদার ঠেসে ধরেছিল মৃত মহাদেব বল্লভ রায়ের মুখে। তারপর জ্বলন্ত কাঠটাকে শুইয়ে দিয়েছিল বুকের ওপর, আরও কিছু শুকনো কাঠ-ডাল আর পাতা নিয়ে এসে সে একটা ছোটখাটো চিতাও সাজিয়ে দিয়েছিল। তার হাসি-হাসি মুখটা কালো কালিঝুলিতে খুব বিভৎস লাগছিল। হাসতে হাসতে সে বলেছিল, ‘মুখাগ্নি কইরা দিছি।’

যদি কেউ বলতে চায়, বলবে এইসব। কিন্তু নিজে থেকে আর বলতে চায় না জামাল। নিজে থেকে সে ভুলে যেতে চায় এইসব। তাছাড়া ঠিক ঘাড়ের ওপর বর্শার ঘা লেগেছে তার। অনেক চেষ্টা করছে কবিরাজ; কিন্তু তার পরও পচতে শুরু করেছে। সওদাগর এসে সে ঘা দেখার সঙ্গে সঙ্গে আবদুল গাফফারকে পাঠিয়েছে রূপসা বিলের বন থেকে কোন এক বুনোকে নিয়ে আসতে। তখনও ঘুমের ঘোরেই ছিল জামাল, যখন সওদাগর এসে বনের ধারে জলের খাঁড়িতে নাও থামিয়ে পা ফেলেছিল ডাঙার ওপর। শূন্য, পুড়ে যাওয়া বাড়িঘরের দিকে তাকিয়ে সে নাকি হাসতে হাসতে বলেছিল, ‘ভালোই হলো। কাঠের দোতলা ঘর বানামু ভাবছিলাম। আবার খুব কষ্টও লাগতেছিল, এত মেহনত কইরা ঘর বানাইছি, সব ভাইঙ্গা নতুন কইরা বানামু! তা খোদাই ফয়সালা কইরা দিল! তো আবদুল গাফফার, মিস্ত্রির কাছে খবর পাঠাও।’ আবদুল গাফফার সঙ্গে সঙ্গে ছুটেছিল মিস্ত্রির খোঁজে। একটা ভাঙা কাঠের গুঁড়ির ওপর বসতে বসতে বলেছিল সওদাগর, ‘আপনেগারে উপুর খুব কষ্ট যাইতেছে মা। মাফ কইরা দিয়েন।’

‘কষ্ট তো তুমিই ডাইকা আইনছ শামসু। খালি খালি উপকার কইরতে গেছ, লোভ জাগাইয়া দিছো।’

‘যার যা কপাল মা। এই নিয়া আক্ষেপ করেন ক্যান ? আপনেরা আছেন, খোদার কাছে হাজার শুকর।’

বলে সওদাগর প্রশ্নবোধক দৃষ্টিতে তাকিয়েছিল বাড়ির পেছনের দিকে। যেখানে কাঁঠাল গাছের গুড়িতে বসে অন্নপূর্ণা দুই হাঁটুর মধ্যে মুখ গুঁজেছিল। আর ফিসফিসিয়ে উত্তর দিয়েছিল তার বউ, ‘ব্যানার্জীর মাইয়া। অক তো আর ঘরে তুলতেছে না!’

‘না তুলুক। আমরা মইরা গেছি নাকি ?’

বলতে বলতে সওদাগরের মনে পড়েছিল, কী ভীষণ ঘূর্ণিতে পড়তে হয়েছিল এইবার। সে এগিয়ে গিয়েছিল অন্নপূর্ণার দিকে। পূর্ণা শশব্যস্ত হয়ে উঠে দাঁড়িয়েছিল। আর সওদাগরও ব্যস্ত হয়ে পড়েছিল, ‘বসো বসো―তুমি ক্যান উঠতেছো ? বসো।’

কিন্তু পূর্ণা আর বসেনি, ডান পায়ের বুড়ো আঙুল দিয়ে মাটির ওপর এলোমেলো দাগ দিতে দিতে বলেছিল, ‘আমাক যদি গয়া-কাশী কুনুখানে পাঠায়ে দেওয়ার ব্যবস্থা কইরতেন কাকা―’

‘তুমি যদি চাও, নিশ্চয়ই পাঠাব মা। তাড়াতাড়ির তো কিছু নাই, আর যাওয়ার দরকার কী, বলো ? গয়া বলো, কাশী বলো আর বৃন্দাবনই বলো, তোমার তো, আমার মন কয়, আরও বিপদ হবে।’

হাউমাউ করে কেঁদে উঠেছিল অন্নপূর্ণা। কিন্তু কে আর তাকে সান্ত¦না দিতে মাথায় হাত রাখবে! সওদাগর তার কান্নার বেগ একটু কমে এলে বলেছিল, ‘এইখানে তোমার কুনু অমর্যাদা হবে না মা।’ বলে এগিয়ে গিয়েছিল সে কাঠাল গাছের নিচে মাচালের ওপর শুইয়ে রাখা জামালের দিকে। ঘুমিয়ে আছে সে। শুধু মাঝেমধ্যে শরীর তার কেঁপে উঠছে আর কোন এক অব্যক্ত যন্ত্রণায় মুখটা কুঁচকে উঠছে। সওদাগর আস্তে করে তার কপালে হাত রাখে, আবার হাত তুলে মাচালের পাশে পড়ে থাকা তির আর তূণ হাতে নিয়ে নেড়েচেড়ে দেখতে থাকে।

‘ছেলের কাম কইরছে আপনের কামলায়। বাঁইচা আছি হে আছিল বইলা।’ ―বলে সওদাগরের বউ।

বিচিত্র করুণ এক হাসি জেগে ওঠে সওদাগরের ঠোঁটে। চোখ দিয়ে জলও গড়িয়ে পড়ে বড় নিষ্ঠুর সওদাগরের। বলে সে আপনমনে, ‘বসো বউ। একটা কথা বলি তোমাক। পুরুষের জীবন পাপেতাপে ভরা―পাপ না কইরা সে থাকতেই পারে না, হারামজাদা পুরুষের জীবনই এইরহম। নারীর জীবনে কিন্তু কুনু পাপ নাই, তার জীবনে যতটুকু পাপ, তা আসলে ওই পুরুষেরই দেওয়া। … তুমি আমাক মাফ কইরা দিও।…অক বাঁচায়া তোলো।’

কী যে বোঝে সওদাগরের বউ, কাঁদতে থাকে সে, ‘আগে কন নাই ক্যান ?’

‘কোন মুহে কই, কও ?’

‘অ্যাহন যদি কিছু অয় ?’

‘হইবে না কিছু, হইবে না। তোমরা আছো না ? আর আমার মতো পাপীর জইন্যে খোদা আরও বড় শাস্তি লেইখা রাইখছে। এইসব ছোটখাটো শাস্তি তো আমাক দিবো না।’

ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদতে থাকে হালিমা। কখনও শব্দ জেগে উঠতে নিলেও প্রবল নিষ্ঠুরতায় গিলে নেয় সে বুকের ভেতর। সওদাগর আবারও আলত করে জামালের মাথায় হাত বুলিয়ে দেয় আর তাকিয়ে থাকে। যেন কোনও চিহ্ন খুঁজে বেড়ায়। পোড়া কাঠ, বাঁশ আর টিনের গন্ধমাখা বাতাস সওদাগরের মুখে এসে ঝামটা মারে। আর সাহানা ধীরে ধীরে চলে যায় সেখান থেকে। বাড়ির পেছনদিকে পুকুরের ধারে গিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে উত্তরের আকাশে। সেখানে অনেক পাখি উড়ছে, কোত্থেকে এসেছে, কোনওখানে যাচ্ছে, কে তা জানে! এত দূরে তারা যে, মনে হয় উড়ছে না, শূন্য আকাশে স্থির হয়ে আছে। সাহানার চোখ দিয়ে দরদরিয়ে অশ্রু ঝরতে থাকে। কেন যে কাঁদছে, নিজেই সে তা বুঝতে পারে না। কিন্তু নিঃশব্দে কেঁদে চলে।

সচিত্রকরণ : ধ্রুব এষ

Leave a Reply

Your email address will not be published.

shares