প্রবন্ধ

সাক্ষী ছিলো শিরস্ত্রাণ

মুকুট নামের মানুষটির গল্প

মুনতাসীর মারুফ

 

‘এই কাহিনী একটি যুদ্ধের। সেই যুদ্ধের দেয়ালে নানা চলকের লুকোচুরি, দেশপ্রেমের ঢেউ আর বিশ্বাসঘাতকতার চোরাস্রোত, দাবার বোর্ডের গুটি হয়ে বহু মানুষের হাঁটাচলা।’- সেই যুদ্ধ বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধ। ‘সাক্ষী ছিল শিরস্ত্রাণ’ গ্রন্থটির ‘পূর্ব খণ্ড’-এর দুইশত তেইশ পৃষ্ঠার পরতে পরতে সেই গৌরবময় ইতিহাসের মর্মস্পর্শী, রোমাঞ্চকর বিবরণ।

‘এই কাহিনী একটি যুদ্ধোত্তর দেশের। সেখানে বহুমাত্রিক সব জটিল গণিত, আলোকের যত অনন্তধারার সঙ্গী দুর্ভাগ্যের অন্ধকার।’- গ্রন্থের ‘উত্তর খ-’-এর দুইশত দুই পৃষ্ঠা মুক্তিযুদ্ধ-পরবর্তী বাংলাদেশের রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের আখ্যান- যার সমাপ্তি টেনেছেন লেখক ১৯৭৫-এর নভেম্বরের ‘সিপাই বিপ্লব’-এর কাহিনির মাধ্যমে।

এটি ইতিহাসের বই নয়, মুখবন্ধেই পরিষ্কারভাবে তা উল্লেখ করেছেন লেখক সুহান রিজওয়ান- ‘ইতিহাসের সাথে হাত ধরাধরি করে হাঁটলেও ‘সাক্ষী ছিলো শিরস্ত্রাণ’ কোনোভাবেই ইতিহাস গ্রন্থ নয়।’ ঐতিহাসিক তথ্যের ‘টুকরো টুকরো সুতা জোড়া লাগিয়েই’ একটি কাহিনি বলতে চেয়েছেন লেখক, কিন্তু এই ‘কাহিনি’র গুরুত্ব কোনোক্রমেই ইতিহাসগ্রন্থের চেয়ে কম নয়- এই গ্রন্থের পাঠকমাত্রেই তা অনুধাবন করবেন। এবং এই ‘টুকরো টুকরো সুতা’ সংগ্রহে লেখক কি পরিমাণ একাগ্র, বিশ্বস্ত ও অধ্যবসায়ী ছিলেন তা কেবল কাহিনির শেষে একটি নির্ঘণ্টে জুড়ে দেয়া সহায়ক গ্রন্থ তালিকা দেখেই নয়, কাহিনির পাতায় ইতিহাসের বর্ণনায় পাঠক তা বুঝতে পারবেন। এই তালিকায় ১০৩ টি গ্রন্থের নাম রয়েছে। এর বাইরে চারটি প্রবন্ধ এবং এক জোড়া তথ্যচিত্রও ব্যবহৃত হয়েছে তথ্যসূত্র হিসেবে। লেখক বলছেন- ‘এই কাহিনিতে ব্যবহৃত সমস্ত ঐতিহাসিক তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে বিভিন্ন গ্রন্থ হতে। প্রায় সকল উদ্ধৃতি, এমনকি কিছু ক্ষেত্রে ঘটনাও, সহায়ক গ্রন্থটি থেকে অবিকল তুলে দেয়া হয়েছে।’ তাজউদ্দীন আহমদের কন্যা সিমিন হোসেন রিমি তথ্য ও সময় দিয়ে এ গ্রন্থটিকে সমৃদ্ধ করতে সহায়তা করেছেন- এজন্য লেখক অকুণ্ঠচিত্তে তাঁর প্রতি কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করেছেন।

ইতিহাস-আশ্রয়ী এই কাহিনি খণ্ড খণ্ড অংশে শিরোনাম ব্যবহার করে বর্ণনা করেছেন লেখক। শুরুটা করেছেন ৩০ মার্চ, ১৯৭১-এর একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা দিয়ে, যার শিরোনাম- ‘সীমান্তের সন্ধ্যা’। ঘটনাটি হচ্ছে স্বাধীন বাংলাদেশের দুই রাষ্ট্রীয় প্রতিনিধির পরিপূর্ণ সামরিক মর্যাদায় ভারতে প্রবেশ। প্রতিনিধিদ্বয়ের একজন আমীর-উল ইসলাম। দ্বিতীয়জন যুদ্ধদিনের সেই ‘শিরস্ত্রাণ’-তাজউদ্দীন আহমদ, যিনি ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনীর পূর্বাঞ্চলীয় কমান্ডের আইজি গোলোক মজুমদারের কাছে নিজের পরিচয় দেন এভাবে-‘আমি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের একজন প্রতিনিধি মাত্র।’ কাহিনির শুরুতেই ‘বঙ্গবন্ধুর প্রবল ব্যক্তিত্বের আড়ালে চিরকাল অনালোকিত থেকে যাওয়া এই মানুষটি’র বঙ্গবন্ধুর প্রতি একনিষ্ঠ ভালোবাসা, আনুগত্য ও নিবেদনের পরিচয় ফুটিয়ে তোলেন লেখক এই একটি উক্তিতেই।

তারপরই লেখক কাহিনি বর্ণনা করেন আরেকটু পিছিয়ে গিয়ে – ১ মার্চ, ১৯৭১ থেকে। সেদিন ঢাকা স্টেডিয়ামে পাকিস্তান একাদশ আর কমনওয়েলথ একাদশের মাঝের ক্রিকেট ম্যাচের দর্শক-সারিতে লেখক-সৃষ্ট চরিত্র তারেকুল আলম, আলাউদ্দীনদের আবির্ভাব। এই চরিত্রগুলোর হাত ধরে এগিয়ে যায় ইতিহাসের আখ্যান- জাতীয় পরিষদের অধিবেশন স্থগিত রাখার ইয়াহিয়া খানের ঘোষণা ইথারে ভেসে আসার পর স্টেডিয়ামের দর্শকদের বিক্ষোভ, এরই জের ধরে পল্টন ময়দানে উন্মুক্ত সমাবেশ, সেখান থেকে হোটেল পূর্বাণীতে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের প্রেস কনফারেন্স, মিছিলের ঢাকা শহর, প্রকাশ্য রাস্তায় পাকিস্তানের পতাকা আর জিন্নাহ্-এর ছবিতে অগ্নিসংযোগ – লেখক বর্ণনা করেন উত্তাল মার্চের প্রথম দিনের খণ্ড খণ্ড চিত্র।

ইতিহাসের পথ ধরে এগিয়ে যায় কাহিনি। ৭ মার্চ রেসকোর্সে বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ভাষণের পূর্বাপর ঘটনাবলির বিবরণের পাশাপাশি লেখক তুলে ধরেছেন ভাষণ প্রচারে বাধা দেয়ায় রেডিও পাকিস্তানের ঢাকা কেন্দ্রের আঞ্চলিক পরিচালক আশফাকুজ্জামান খানের নেতৃত্বে রেডিও-র বাঙালি কর্মকর্তা- কর্মচারীদের প্রতিবাদের ঘটনাটিও। লেখক শুধু স্বাধীনতা-সংগ্রামের বহুল আলোচিত ঘটনাগুলোই তুলে ধরেননি, আড়ালে চাপা পড়া বা কম আলোচিত অথচ ঐতিহাসিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ অন্যান্য ঘটনাবলীও পরম যত্নে তুলে ধরার চেষ্টা করেছেন। এই গ্রন্থের পাতায় পাতায় এর অনেক উদাহরণ পাবেন পাঠক।

মুক্তিযুদ্ধ কেবল সম্মুখ সমর নয়, এর অন্তরালে নানা মানুষের নানা ভূমিকা রয়েছে, রয়েছে দেশি-বিদেশি নানা অনুঘটক। সকল অনুঘটকের একত্রে এক মলাটে অবস্থান নিঃসন্দেহে কঠিন বিষয়। এই কঠিন বিষয়টিই সার্থকভাবে করে দেখিয়েছেন লেখক। এই উপন্যাসে যেমন আছেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, তাজউদ্দীন আহমদ, সৈয়দ নজরুল ইসলাম, কামারুজ্জামান, মনসুর আলী, তেমনি মাওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী, মুক্তিযুদ্ধের সমস্ত সেক্টর কমান্ডের প্রধান কর্নেল আতাউল গণি ওসমানী, সেক্টর কমান্ডার মেজর খালেদ মোশাররফ, মেজর জিয়াউর রহমান, মেজর শফিউল্লাহ, মেজর নুরুজ্জামান, ক্যাপ্টেন হায়দার, শেখ মনি, তোফায়েল আহমেদ, সিরাজুল আলম খান, আবদুর রাজ্জাক, আমীর-উল ইসলাম, গণহত্যার প্রতিবাদে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পদত্যাগী ভাইস চ্যান্সেলর বিচারপতি আবু সাঈদ চৌধুরী, ‘বাংলাদেশ মিশন’-এ পরিণত হওয়া পাকিস্তানের কলকাতা দূতাবাসের ডেপুটি হাইকমিশনার হোসেন আলি, দৈনিক ইত্তেফাকের সিনিয়র রিপোর্টার থেকে প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীনে জনসংযোগ কর্মকর্মতার দায়িত্ব পাওয়া নজরুল ইসলাম, রেহমান সোবহান, আনিসুজ্জামান, আবদুল গাফফার চৌধুরী, জাহানারা ইমাম, শরীফ ইমাম, রুমী, ‘ঝিলু, দ্য গ্রেট’ আলতাফ মাহমুদ থেকে ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী, ভারতীয় সেনাপ্রধান স্যাম মানেকশ, মিত্রবাহিনীর প্রধান লেফটেন্যান্ট জেনারেল জগজিৎ সিং অরোরা, মেজর জেনারেল নাগরা, মেজর সুজন সিং ওবান, ভারতীয় সীমান্তরক্ষীদের মহাপরিচালক কে এফ রুস্তমজি, জাস্টিস সুব্রত রায় চৌধুরী, ‘ট্যাঙ্কস ক্রাশ রিভোল্ট’-এর প্রতিবেদক সাংবাদিক সায়মন ড্রিং, ‘দ্য সাইলেন্ট বিটলস’ জর্জ হ্যারিসন, প-িত রবিশঙ্কর, আইরিশ মানবাধিকারকর্মী শন ম্যাকব্রাইডরাও বাদ পড়েননি। এসেছে ইয়াহিয়া খান, টিক্কা খান, রাও ফরমান আলী, জুলফিকার আলী ভুট্টো, এম. মালিক, লেফটেন্যান্ট জেনারেল আমীর আবদুল্লাহ খান নিয়াজীদের ঐতিহাসিকভাবে স্বীকৃত ঘটনাবলির পাশাপাশি লেখক-কল্পিত কথোপকথনও। পঁচিশ মার্চের কালোরাত্রি, অপারেশন সার্চলাইট, স্বাধীনতা ঘোষণা, পাকিস্তানি সেনাদের হাতে বঙ্গবন্ধুর বন্দিত্ব, প্রবাসী সরকার গঠন, সরকার গঠন নিয়ে শেখ মণি-তাজউদ্দীন দ্বন্দ্ব, বৈদ্যনাথতলার মুজিবনগরে রূপান্তর, কলকাতার সিআইটি রোডে মন্ত্রিসভার সদস্যদের বসবাস, শরণার্থী শিবির, মতিনগর ক্যাম্প, শিলিগুড়ির সভা, ওয়ার কাউন্সিল গঠন নিয়ে তরুণতর সেক্টর কমান্ডারদের সাথে সর্বাধিনায়কের মতবিরোধ, মুক্তিযুদ্ধে বামপন্থীদের অংশ গ্রহণ ও তাদের অন্তর্গত বিরোধ, ক্র্যাক প্লাটুন-এর ‘অপারেশন হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টাল, হিট এন্ড রান’, ঢাকার নানা জায়গায় গেরিলা হামলা, বিশ্রামগঞ্জে হাবুল ব্যানার্জির লিচুবাগানে বাংলাদেশ হাসপাতাল, বীরশ্রেষ্ঠ মতিউর রহমানের বীরত্ব, কাদের সিদ্দিকীর ‘কাদেরিয়া বাহিনী’, স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র, জয় বাংলা- বাংলার বাণী পত্রিকা, বহির্বিশ্বে স্বাধীনতার সপক্ষে জনমত গঠন, সাইকোলজিক্যাল ওয়ারফেয়ার, মুক্তিবাহিনী-মুজিববাহিনী দ্বন্দ্ব, স্বাধীনতার বিরুদ্ধে খন্দকার মোশতাকের ষড়যন্ত্র, পাঁচদল নিয়ে সর্বদলীয় জাতীয় উপদেষ্টা কমিটি গঠন, ম্যাডিসন স্কয়ার গার্ডেনে কনসার্ট ফর বাংলাদেশ, গড়ের মাঠে ইন্দিরা গান্ধীর ভাষণ, ভারতের স্বীকৃতি, জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে স্বাধীনতা যুদ্ধ নিয়ে আন্তর্জাতিক নেতাদের বিতর্ক, বুদ্ধিজীবী হত্যা, রেসকোর্সে মিত্রবাহিনীর কাছে পাকিস্তানের আত্মসমর্পণ-স্বাধীনতা যুদ্ধের ময়দান আর নেপথ্যের অনেক ঘটনাই উঠে এসেছে এ-উপন্যাসের ‘পূর্ব খণ্ড’-তে।

তবে পূর্ব খণ্ডের কাহিনি এখানেই শেষ নয়। ১৬ ডিসেম্বরের পরদিন সকালে ঢাকা রেডিও থেকে বিজয়ের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দিলেন মেজর হায়দার, সেদিন বিকেলে টিভি পর্দায় প্রথমবারের মতো দৃশ্যমান হলো বাংলাদেশের জাতীয় পতাকা। সংস্থাপন সচিব নুরুল কাদেরসহ কয়েকজন নতুন দেশের সচিবালয় নতুন করে সাজাতে বসলেন। শত্রুমুক্ত স্বদেশে ফিরে এলেন প্রবাসী সরকারের সদস্যরা। ‘বাংলাদেশ রূপকথার মিডাস’ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের মধ্য দিয়ে লেখক যবনিকা টেনেছেন ‘পূর্ব খণ্ড’-এর।

‘উত্তর খণ্ড’-এর শুরু বাংলাদেশের নতুন সরকারের অর্থমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ-এর দাপ্তরিক ব্যস্ততার বিবরণ দিয়ে। উঠে এসেছে বিজয়-পরবর্তী বিধ্বস্ত দেশের অর্থনৈতিক দুরবস্থা, আইনশৃংখলা পরিস্থিতির অবনতি, স্বজনপ্রীতি-দুর্নীতির কথা। শেখ মনির মুজিববাদ আর সিরাজুল আলম খানের বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্রের মতবাদে ছাত্রলীগের বিভক্তি, ডাকসু-রাকসু নির্বাচনে ছাত্র ইউনিয়নের জয়, মওলানা ভাসানীর ‘মুসলিম বাংলা’ কায়েমের প্রচারণা, স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম বিরোধী দল হিসেবে জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল বা জাসদের আত্মপ্রকাশ, সিরাজ শিকদারের সর্বহারা পার্টিÑ লেখক তুলে ধরেছেন সে-সময়কার গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ঘটনাগুলোও। বর্ণনা করেছেন রক্ষীবাহিনী ও বাকশাল নিয়ে বিতর্ক, সেনাবাহিনীতে নানা কারণে চাপা বিক্ষোভ আর অসন্তোষের চিত্রও। পাশাপাশি বিশ্ব মানচিত্রে নতুন দেশটির উপর আন্তর্জাতিক চাপের খ-চিত্রও। পাকিস্তানের অপপ্রচারে বিভ্রান্ত মুসলিম দেশগুলো স্বীকৃতি দিচ্ছিল না বাংলাদেশকে। পাকিস্তানের যুদ্ধবন্দিদের ছেড়ে দেয়ার এবং দেশের নাম পাল্টে ‘ইসলামিক রিপাবলিক অফ বাংলাদেশ’ করার ব্যাপারে চাপ দিচ্ছিল পাকিস্তানের মিত্র মুসলিম দেশগুলো। এদিকে যুদ্ধের পরের বছর খরা, এরপর বন্যায় আরও বিপর্যস্ত হয় দেশের অর্থনীতি, দেখা দেয় দুর্ভিক্ষ। অন্যদিকে নানা ঘটনায় শেখ মুজিব এবং তাজউদ্দীনের মধ্যে দূরত্ব বাড়তে থাকে। এক পর্যায়ে মন্ত্রিসভা থেকে পদত্যাগ করতে বাধ্য হন তাজউদ্দীন আহমদ। খন্দকার মোশতাক শেখ মুজিবের ঘনিষ্ঠ হতে থাকে। উত্থান ঘটে স্বাধীনতাবিরোধীদের। সেনাবাহিনীর জুনিয়র কিছু অফিসার ষড়যন্ত্রের জাল বিছাতে থাকেন। এরই জের ধরে সপরিবারে শেখ মুজিবের মর্মান্তিক হত্যাকা-, পরবর্তীসময়ে জেলের অভ্যন্তরে চার নেতা হত্যা, সেনাবাহিনীতে অভ্যুত্থান-পাল্টা অভ্যুত্থান- ১৯৭৫ সালের নভেম্বর পর্যন্ত বাংলাদেশের ইতিহাসের অনেক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় ধারণ করেছে উপন্যাসটির ‘উত্তর খণ্ড’।

লেখক মুখবন্ধেই প্রকাশ করেছেন বাংলাদেশের প্রথম প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদকে নিয়ে তাঁর মুগ্ধতার কথা। যুদ্ধদিনে এই অন্তর্মুখী মানুষটি অসম্ভব দৃঢ়তা দেখিয়ে স্বাধীনতার শত্রুদের হতাশ করেছেন বারবার, জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের অনুপস্থিতিতে একাত্তরের উত্তাল দিনে সকল দেশি-বিদেশি ষড়যন্ত্রের মুখে অবিচল দাঁড়িয়ে মুক্তিযুদ্ধকে সংগঠিত করেছেন, স্বাধীন বাংলাদেশে ক্রমশ সেই ‘বঙ্গতাজ’কে নিঃসঙ্গ হয়ে পড়তে দেখাটা অন্য অনেকের মতো লেখকের জন্যও ছিল তীব্র বেদনার। মূলত সেই বেদনাবোধ ছড়িয়ে দিতেই তিনি লিখেছেন এই গ্রন্থটি। সেই হিসেবে এই গ্রন্থটির কেন্দ্রীয় চরিত্র তাজউদ্দীন আহমদ। লেখক বলছেন, সাক্ষী ছিল শিরস্ত্রাণ মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতা-উত্তরকালের ‘দুই সর্পিল সময়ের পটে দাঁড়ানো একজন সরলতম মানুষের গল্প’। তাজউদ্দীনের প্রতি লেখকের মুগ্ধতা, শ্রদ্ধাবোধ কাহিনির নানা পর্যায়ে বারে বারে পাঠকের সামনে দৃশ্যমান হয়। এর একটি টুকরো উদাহরণ তাজউদ্দীনের হত্যা-দৃশ্যের বর্ণনায় :

‘প্রাণের দাবী ছয় দফাকে ফাইলবন্দি করে টেকনাফের নীল জল থেকে তেঁতুলিয়ার তপ্ত মাটি স্পর্শ করে গিয়েছিলেন যে মানুষটি, একাত্তরের উত্তাল মার্চে শেখ মুজিবের তর্জনি উঁচানো ভাষণের বাস্তব দিক নির্দেশ যিনি দিয়েছিলেন অভূতপূর্ব সাংগঠনিক দক্ষতায়, সীমান্ত আকাশে অক্লান্ত ওড়াউড়ি করে নড়বড়ে এক কাঠমঞ্চে যে মানুষটি গঠন করেছিলেন বাংলাদেশের প্রথম স্বাধীন সরকার, মুজিব ভাইয়ের প্রত্যাবর্তনে হাসতে হাসতে তার কাছে সিংহাসন ফিরিয়ে দেয়া সেই তাজউদ্দীন- দুইশত ছেষট্টি দিনের অকথিত এক গল্পের অভিমান বুকে নিয়ে স্তব্ধ হয়ে গেলেন চিরদিনের জন্য। বুলেটবিদ্ধ শরীর নিয়ে মুকুট নামের এই নশ্বর মানুষটি, জায়গা করে নিলেন এই অশুভ জনপদের অবিনশ্বর পুরাণে।

কুহকী এ-সময়ের নাটাই কখনও হাতে ছিল না মানুষটির, হাহাকার নিয়ে দাহকাল প্রত্যক্ষ করার সাথে সাথে আগুনে পুড়ে যাওয়াটাই যেন ছিল তার নিয়তি।

সিংহাসনের রাজমুকুট হয়ে না ওঠা যেমন, যুদ্ধদিনের শিরস্ত্রাণের নিয়তি।’ (শিরস্ত্রাণের সাক্ষ্য, পৃষ্ঠা-৪২০-৪২১)

 

বঙ্গবন্ধুর প্রতি তাজউদ্দীনের ভালোবাসা ও নিঃশর্ত আনুগত্য কাহিনির বাঁকে বাঁকে দৃশ্যমান। যুদ্ধের মাঝে তৈরি হওয়া মন্ত্রিসভা পদত্যাগের পর শেখ মুজিবুর রহমান যখন প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নিলেন, তখন সাংবাদিকরা তাঁর অনুভূতি জানতে চাইলে তাজউদ্দীন আহমদ এক বুক গর্বের সুরে বলেছিলেন :

‘আজ তো আমি পৃথিবীর সবচাইতে সুখী মানুষ!… আমরা পার্লামেন্টারি গণতন্ত্র চেয়েছিলাম, আমাদের নেতা সেই পার্লামেন্টারি গণতন্ত্র গ্রহণ করেছেন। আমাদের মুজিবনগর সরকার তো বঙ্গবন্ধুর সরকার ছিল।’ (মুকুট নামের মানুষ, পৃষ্ঠা-২৫২)

বঙ্গবন্ধুর সাথে তাজউদ্দীনের সম্পর্কের সূত্রপাত স্বাধীনতারও বহু বছর আগে। এই উপন্যাসে স্বাধীনতার বাইশ বছর আগের এক ঘটনায়, বঙ্গবন্ধু ও তাজউদ্দীন আহমদকে একত্রে ছাত্ররাজনীতির ময়দানে দেখতে পাওয়া যায়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক আন্দোলনে সাধারণ ছাত্রদের নেতৃত্ব দিচ্ছিলেন শেখ মুজিব। আন্দোলনের এক পর্যায়ে পুলিশী হুমকির মুখে শেখ মুজিব আরও কয়েকজনসহ যখন ধরা দেবেন সিদ্ধান্ত নেন, তখন তাজউদ্দীনের উপর নির্দেশ ছিল বাইরে থেকে আন্দোলন চালিয়ে নেয়ার। পুলিশী তৎপরতার সংকটময় মুহূর্তে তাজউদ্দীনকে ‘চোখ টিপি’ দিয়ে শেখ মুজিব যে ইঙ্গিত দেন, তাতে ধূর্ততার সাথে তাজউদ্দীনের উপর তাঁর বিশ্বাস আর আস্থার প্রকাশও দেখা যায়। (বিপ্রতীপ কোণ, পৃষ্ঠা-৫৫)। এ আস্থা, এ বিশ্বাস-এক দু’দিনে গড়ে ওঠে না-দীর্ঘদিনের ঘনিষ্ঠ পথচলার এক অন্যতম নিদর্শন সেটি।

স্বাধীনতা-পূর্ববর্তী সময়ে শেখ মুজিবের প্রতিটি রাজনৈতিক কাজের অন্যতম প্রধান সহযোগী হিসেবে দেখতে পাওয়া যায় আওয়ামী লীগের তৎকালীন সাধারণ সম্পাদক তাজউদ্দীন আহমদকে। ১৯৭০-এর নির্বাচনের ক’দিন আগে গাড়ি দুর্ঘটনায় যখন তাজউদ্দীন আহমদের পা ভেঙে যায়, তাঁকে দেখতে এসে জোহরা তাজউদ্দীনকে উদ্দেশ্য করে শেখ মুজিবকে বলতে শুনি- ‘তোমরা কিন্তু ওকে দেইখ্যা রাইখো। ওর য্যান কোনো অসুবিধা না হয়। তাজউদ্দীন কিন্তু আমার দলের সব থেইক্যা গুরুত্বপূর্ণ লোক!’ (রিমির ভাবনা, পৃষ্ঠা-২৫)। একাত্তরের মার্চে তাজউদ্দীন আহমদের বাসায় ঘন ঘন রুদ্ধদ্বার বৈঠকে বসতে দেখা যায় শেখ মুজিবকে, পত্রিকায় শেখ মুজিবের বিবৃতির খসড়া দেখে দেওয়ার দায়িত্ব থাকে তাজউদ্দীনের উপর, এমনকি শেখ মুজিবের ঐতিহাসিক ৭ মার্চের ভাষণের খসড়াও আবদুস সামাদ আজাদ আর আবদুল মমিনকে নিয়ে দুদিন ধরে প্রস্তুত করতে দেখা যায় তাজউদ্দীন আহমদকে। তাজউদ্দীন আহমদও শেখ মুজিবের নির্দেশ পেলে তা দ্রুত বাস্তবায়নের জন্য অস্থির হয়ে পড়তেন। রিমির জবানীতে- ‘মুজিব কাকু কোনো কাজ করতে বললে আব্বুর আর মাথার ঠিক থাকে না, খাওয়া-দাওয়া ভুলে আব্বু বসে যান সেই কাজ করতে।’

ভুট্টো যেমন তাজউদ্দীন সম্পর্কে বলতেন- ‘শেখের যোগ্য লেফটেন্যান্ট’, জেনারেল হামিদের সাথে ইয়াহিয়া খানের কথোপকথনেও সেই সুর স্পষ্ট- ‘মুজিব আর তাজউদ্দীন, তাজউদ্দীন আর মুজিব, ভীষণ নাছোড়বান্দা রকমের মানুষ এরা দুইজন। গোটা পূর্ব পাকিস্তানে এই দুইজন মানুষকে নিয়ে খুবই পেরেশানিতে আছি আমরা।…এই মানিকজোড়কে নিয়ে কি করা যায় বলো তো হামিদ?’ (ধানমন্ডি ৩২ নম্বর, পৃষ্ঠা-২৩)

স্বাধীনতা-পরবর্তী সময়ে নানাবিষয়ে মতদ্বৈধতার কারণে শেখ মুজিবের সাথে রাজনৈতিক দূরত্ব বাড়তে থাকে তাজউদ্দীন আহমদের। এতে অভিমানাহত হলেও শেখ মুজিবের প্রতি আনুগত্য ও শ্রদ্ধা কখনও বিন্দুমাত্র কমেনি তাঁর। শেখ মুজিবের নির্দেশে মন্ত্রিসভা থেকে পদত্যাগের পর নতুন পার্টি তৈরি করার গুজবসংক্রান্ত সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি তাই বলিষ্ঠ কণ্ঠে উত্তর দেন- ‘… আমার বিন্দুমাত্র কোনো পদক্ষেপে, কোনো কথাতে শেখ সাহেব বা আওয়ামী লীগের ক্ষতি হতে পারে, এমন অ্যাকশন আমি কখনোই নেবো না।’ সমবেদনা জানাতে আসা মতিউর রহমানের সাথে আলাপচারিতায়-ও বঙ্গবন্ধুর প্রতি তাজউদ্দীনের এই নিবেদন প্রকাশিত- ‘সবকিছুর পরেও আমি উনার সাথে থাকবো! .. বঙ্গবন্ধু ছাড়া এই দেশ যে কখনো স্বাধীন হইতো না, এইটা কক্ষণো ভুলে যাবেন না মতিউর রহমান।’ (আলোকের অতীত থেকে বিহ্বল বর্তমানে, পৃষ্ঠা-৩২০-৩২২)।

রাজনৈতিক নানাবিষয়ে মতপার্থক্য ও দূরত্ব তৈরি হলেও শেখ মুজিবের সাথে ব্যক্তি আর পরিবার পর্যায়ে যোগাযোগ অটুট ছিল তাঁর, এমনকি তাঁর পদত্যাগের পরও, ১৯৭৫-এর ১৭এপ্রিল গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের শপথ অনুষ্ঠানের চতুর্থ বার্ষিকীর অনুষ্ঠানে তাঁকে উপেক্ষার পরও। শেখ কামালের বিয়ের অনুষ্ঠানে তাজউদ্দীন আহমদ পরিবারসহ বরযাত্রী হয়েই যান বেইলি রোডের অফিসার্স ক্লাবে। হঠাৎ ঠিক হওয়া শেখ জামালের বিয়ের ঘরোয়া অনুষ্ঠানেও আমন্ত্রণ পেয়ে স্ত্রীসহ উপস্থিত তাজউদ্দীন। ‘এত দিনের টান, ভোলা যায় কি করে!’ সে কারণেই আর্মির ভেতরে শেখ মুজিব সরকারকে উৎখাতের পরিকল্পনার খবর পেয়ে লুঙ্গি-গেঞ্জি পরেই অস্থিরচিত্তে ৩২ নম্বরের দিকে ছুটে যান তাজউদ্দীন, বঙ্গবন্ধুকে খবরটি দিয়ে দ্রুত কোনো ব্যবস্থা নেয়ার অনুরোধ করেন। ১৫ আগস্ট রেডিওতে মেজর ডালিমের উদ্ধত কণ্ঠে বঙ্গবন্ধু হত্যার খবর শুনে অদ্ভুত বিষণœতায় তাজউদ্দীনের মুখ রক্তশূন্য হয়ে যেতে দেখে তাঁর পরিবার। তাজউদ্দীনের স্বগতোক্তিতে প্রকাশ পায় তাঁর ভাবাবেগ :

‘মুজিব ভাই জেনেও গেলেন না কে তার আসল বন্ধু, আর কে তার শত্রু। আমি যদি উনার কাছে থাকতে পারতাম, আল্লার কসম কারো সাধ্য ছিল না মুজিব ভাইয়ের গায়ে হাত ছোঁয়ায়। উনি বন্ধু চিনলেন না…’..‘মুজিব ভাই, আমাকে মাফ করে দিয়েন। বিপদের সময় আমি আপনার কোনো কাজে লাগলাম না…’। (রাজনীতির অঙ্ক, পৃষ্ঠা ৩৭৬-৩৭৭)

মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতি, দেশের আপামর জনমানুষের প্রতি কি গভীর মমত্ব ছিল তাজউদ্দীন আহমদের হৃদয়ে, তার বেশ কিছু কাহিনি বর্ণনা করেছেন লেখক। মুক্তিযুদ্ধের সময় মুক্তাঞ্চল পরিদর্শনে গিয়ে পাকিস্তানি সেনাদের ক্যাম্পের কাছাকাছি থাকা মুক্তিযোদ্ধাদের সাথে দেখা করার জন্য তীব্র খরস্রোতা নদী পাড়ি দিতে বিপদের আশঙ্কা উপেক্ষা করে একাই কলাগাছের ভেলায় চড়ে বসেন তিনি, সফরসঙ্গীদের সঙ্গ ছেড়ে মুক্তিযোদ্ধাদের সাথে মাটিতে বসেই টিনের থালায় খাবার খান, প্রোটোকলের তোয়াক্কা না করেই আচমকা বুকে জড়িয়ে ধরেন এক মুক্তিযোদ্ধাকে। কলকাতার থিয়েটার রোডের দোতলা বাড়িতে দাঁড়িয়ে আনিসুজ্জামানকে বলেন- ‘কলকাতার বুকে জানালা বন্ধ করেই ঘুমিয়ে যাচ্ছি আমরা, অথচ এই বৃষ্টিতে শরণার্থী শিবিরের মানুষেরা, আমাদের মুক্তিযোদ্ধারা কোথায় ঘুমাচ্ছে, কীভাবে ঘুমাচ্ছে, চিন্তা করতে পারেন?…ওদের কথা চিন্তা করে আমার আর সারারাত ঘুম আসল না, বুঝলেন। পারলাম না। নিজেকে খুব ছোট বলে মনে হলো।’ (কাঁটার মুকুট, পৃষ্ঠা-১১৩)।

তাজউদ্দীন আহমদের রাজনৈতিক দূরদর্শিতা, বাস্তব অবস্থা হৃদয়ঙ্গম করার এবং সে অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষমতা, উপস্থিত বুদ্ধি আর প্রজ্ঞার পরিচয় পাওয়া যায় উপন্যাসে উঠে আসা নানা ঘটনায়। উপন্যাসের একদম প্রথম দিকেই দেখতে পাওয়া যায়, তাজউদ্দীন আহমদ প্রথমেই নিজে ভারতে প্রবেশ না করে দূত মারফত বার্তা পাঠান ভারত সরকারের কাছে, সার্বভৌম বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় প্রতিনিধি হিসেবে যথাযোগ্য সামরিক মর্যাদা আদায় করে নিয়েই পা রাখেন প্রতিবেশী রাষ্ট্রের মাটিতে, যা বাংলাদেশের স্বাধীনতার প্রতি আন্তর্জাতিক সমর্থন আদায়ের উল্লেখযোগ্য সফল পদক্ষেপ। শিলিগুড়ির সভায় অনাহূত ছাত্রনেতা ও যুবনেতাদের সরকারবিরোধী অবস্থানের মুখেও প্রবাসী সরকারের প্রতি নির্বাচিত গণপ্রতিনিধিদের আস্থা ও বিশ্বাস স্থাপনে তাজউদ্দীনের বলিষ্ঠ ভূমিকায় তাঁর প্রজ্ঞা দৃশ্যমান। জেড ফোর্স গঠন নিয়ে সৃষ্ট জটিলতা নিরসনে কর্নেল ওসমানীকে কে. ফোর্স আর এস. ফোর্স গঠনের পরামর্শ দিয়ে সেনাবাহিনীতে সম্ভাব্য বিশৃংখলা এড়ানোর ক্ষেত্রেও ভূমিকা রাখতে দেখা যায় তাজউদ্দীনকে।

তাঁর রাজনৈতিক দূরদর্শিতার পরিচয় পাওয়া যায় স্বাধীনতা-উত্তর দুর্ভিক্ষের সময়ে একান্ত সচিব আবু সাইদ চৌধুরীকে সাক্ষী রেখে শেখ মুজিবের সাথে তাঁর টেলিফোনের আলাপেও। সেই পরিচয় পাওয়া যায় আবু সাইদ চৌধুরীর সাথে দেশ, রাজনীতি, প্রশাসন নিয়ে কিছু কথোপকথনেও। খন্দকার মোশতাক সম্পর্কে তিনি বলেছিলেন- ‘চৌধুরী সাহেব, আপনারা কেউ ওই লোকটাকে চিনতে পারেন নাই। কিন্তু ওই লোকটা একটা ভাইপার। আমি জানি, সাপের চেয়েও বিষাক্ত ঐ মানুষটা।’ (শিকারি গুজব, সহযাত্রী সরীসৃপ, পৃষ্ঠা-২৭৬)। পরবর্তীকালে সেই বিষেই নীল হয়েছে বাংলার ইতিহাস। বঙ্গবন্ধু হত্যার পর খন্দকার মোশতাকের নির্দেশে পুলিশ যখন তাজউদ্দীন আহমদকে বাড়ি থেকে ধরে নিয়ে যাচ্ছে, জোহরা তাজউদ্দীনের ‘কী মনে হয়, কখন ছাড়বে তোমাকে?’ প্রশ্নের উত্তরে বলেন- ‘টেইক ইট ফর এভার। ধরে নাও, সারা জীবনের জন্য যাচ্ছি।’ সাংবাদিক লরেন্স লিফশুলজ তাঁকে জিজ্ঞেস করেন- ‘কি মনে হয়, আপনাকে মন্ত্রিসভায় যোগদানের জন্যে ধরে নিয়ে যাচ্ছে?’ তাজউদ্দীন উত্তর দেন, ‘মনে হয় না। তারা এতো বড় নির্বোধ না।’ (চতুর্ভুজ, পৃষ্ঠা-৩৮৪)।

বক্তা হিসেবে তাজউদ্দীন আহমদের দারুণ সুখ্যাতি দেখতে পাওয়া যায় না, কিন্তু যুক্তি-তর্কের ডুয়েলে বারংবার তাকে অনন্য হিসেবেই দেখতে পাই আমরা উপন্যাসে। ১৯৬৬ সালের মার্চে ‘মুজিব-তাজউদ্দীন জুটি’ যখন পল্টন ময়দান কাঁপিয়ে দিচ্ছেন ছয়দফার দাবিতে, জুলফিকার আলী ভুট্টো শেখ মুজিবকে চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিয়েছিলেন- প্রয়োজনে তর্কে নেমে এই দাবির অসারতা তিনি প্রমাণ করে দেবেন। শেখ মুজিবের হয়ে পাল্টা চ্যালেঞ্জ ছুঁড়েছিলেন তাজউদ্দীন আহমদ। ২১ মার্চ পল্টন ময়দানে সেই তর্কযুদ্ধ হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু এর আগে ‘রুদ্ধদ্বার এক প্র্যাকটিস ম্যাচে’ই তর্কের ডুয়েলে তাজউদ্দীনের কাছে নাকাল হয়ে ভুট্টো আর পল্টনে হাজির হননি, মান বাঁচাতে নীরবে ঢাকা ছেড়েছেন। মুক্তিযুদ্ধের সময়টাতেও বিপরীত ধ্যান-ধারণার দলীয় বা বিরোধী দলীয় নেতা-কর্মী, ভারতীয় গোলোক মজুমদার, কে এফ রুস্তমজি বা ইন্দিরা গান্ধীÑ সবার সাথেই যুক্তি-তর্কের আলোচনায় শেষ বিচারে জয়ী তাজউদ্দীন আহমদই। স্বাধীনতা-পরবর্তী সময়ে অর্থমন্ত্রী থাকাকালীন আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বিভিন্ন দেশ ও দাতাসংস্থার প্রধান ও প্রতিনিধিদের সাথেও আলাপ-আলোচনায় তাজউদ্দীন আহমদের এই বৈশিষ্ট্য অক্ষুণ্ণ। উদাহরণস্বরূপ এই উপন্যাসে দেখতে পাওয়া যায়, ওয়াশিংটনে আন্তর্জাতিক অর্থব্যবস্থা সংস্কার কমিটির মিটিংয়ে পাক যুদ্ধবন্দিদের বিচারের বিপক্ষে দাঁড়ানো মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী উইলিয়াম রজার্সের সাথে তাজউদ্দীনের বাক-যুদ্ধ, কিংবা আমেরিকার সাবেক ডিফেন্স সেক্রেটারি ও বিশ্বব্যাংকের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট রবার্ট ম্যাকনামারার সাথে আলোচনায় বাংলাদেশের যৌক্তিক দাবির স্মার্ট উপস্থাপনায় তাকে প্রভাবিত করার ঘটনা।

বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ ও তৎপরবর্তী সময়ে তাজউদ্দীনের ভূমিকার পাশাপাশি তাঁর ব্যক্তিজীবন, শৈশব-কৈশোর, শিক্ষাজীবন, বিয়ে, স্ত্রী সৈয়দা জোহরা তাজউদ্দীন, সন্তান রিপি-রিমি-মিমি- সোহেল- আবশ্যিক অনুষঙ্গ হিসেবেই এসেছে এ-উপন্যাসে। কাপাসিয়া থানার দরদরিয়া গ্রামের মৌলবি মোহাম্মদ ইয়াসিন খান আর মেহেরুন্নেসা খানমের ছেলে তাজউদ্দীন ছাত্র হিসেবে ছিলেন অত্যন্ত মেধাবী। দেবর মফিজের মুখ থেকে জোহরা তাজউদ্দীন শুনতে পান- ‘ভাইজান কিন্তু এক্সট্রা অর্ডিনারী ব্রিলিয়ান্ট ছিল লিলি ভাবী! ম্যাট্রিকে ভাইজান বোর্ডে বারোতম হইছিল! আবার ইন্টার পরীক্ষায় ফোর্থ স্ট্যান্ড!’ (ক্যানভাসের এপাশে, পৃষ্ঠা ৯৪)। সহপাঠী-বন্ধু নাসের আলী, ওয়াহেদুজ্জামান, মা মেহেরুন্নেসার জবানিতেও পাওয়া যায় মেধাবী, পরোপকারী, শিক্ষকদের প্রিয়পাত্র তাজউদ্দীন আহমদকে। আর সিমিন হোসেন রিমির সূত্র ধরে নানা অংশে খুঁজে পাওয়া যায় পিতা তাজউদ্দীনকে।

পরিবারের আগে তাঁকে দেশকেই স্থান দিতে দেখা যায় সবসময়। ২৫ মার্চের কালো রাতের পর তাজউদ্দীন পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন হন। স্ত্রী-সন্তানরাও বাসা ছেড়ে পালিয়ে বেড়াতে থাকেন। প্রায় দু মাস পর তাঁদেরও আনা হয় কলকাতায়। জোহরা তাজউদ্দীনের হিসেব অনুযায়ী, দীর্ঘ চৌদ্দশো একান্ন ঘণ্টা অদর্শনের পরের সাক্ষাতে বাংলাদেশের প্রথম প্রধানমন্ত্রী তাঁর পরিবারকে সময় দেন সাত মিনিট। সেই সাক্ষাতেও তিনি বলেন :

‘… তোমাদের সাথে কিন্তু আমার থাকা হবে না। আমরা মন্ত্রিসভার সবাই মিলে শপথ নিয়েছি দেশ স্বাধীন না হওয়া পর্যন্ত পরিবারের সাথে থাকবো না। আমাদের কত মুক্তিযোদ্ধা ঘর ফেলে বনে জঙ্গলে গিয়ে ট্রেনিং নিচ্ছে, ওরা যদি পরিবারকে ফেলে থাকতে পারে, তাহলে মন্ত্রী হয়ে আমরা পারবো না কেন?’

(‘হে নাবিক, জীবন অপরিমেয় নাকি!’, পৃষ্ঠা-৯১-৯২)। তাজউদ্দীনকে একলা পাওয়ার মুহূর্ত স্ত্রীর এসেছিল হাতে গোণা। জ্ঞান হবার পর থেকে সন্তানরা পিতা তাজউদ্দীনকে কাছে পেয়েছে খুব কম-ই। জীবনের প্রথম তিন বছরের কথা মনে নেই রিমির, কিন্তু একাত্তর পর্যন্ত এর পরের আর কোনো জন্মদিনেই দেশের কাজে ব্যস্ত বাবার দেখা পায়নি সে। একাত্তরেও তিনি আসতে পারেননি মেয়ের সাথে দেখা করতে, তাজউদ্দীনের অসুস্থতার খবর শুনে রিমির মা তাদের নিয়ে স্বামীকে দেখতে গিয়েছিলেন থিয়েটার রোডে প্রধানমন্ত্রীর অফিসে। স্বাধীনতাপরবর্তী সময়ে অর্থমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ বড় মেয়ের শান্তিনিকেতনে পড়ার ইচ্ছাতেও বাধ সাধেন দেশের পরিস্থিতি বিবেচনা করেই- ‘দেশের অবস্থা এখন ভালো না, রাজনীতির অবস্থা আরো বেশী খারাপ। এই সময় আমার মেয়ে ভারতে পড়তে যাবে, এটা তো মা ঠিক না।’ (একলা লড়াই, পৃষ্ঠা-২৯৩)। কিন্তু তা বলে, স্ত্রী-সন্তানদের প্রতি তাঁর ভালোবাসার কমতি ছিল- এমনটা মনে করারও কারণ নেই। ছয় দফার কারণে তিনি যখন জেলে বন্দী, কারাগার থেকে পাঠানো একটি চিঠিতে কোনো এক পত্রিকা থেকে কেটে নেয়া একটা বিস্কুটের বিজ্ঞাপন জুড়ে দিয়েছিলেন তিনি। চিঠিতে লিখেছিলেন, বিজ্ঞাপনের ছোট মেয়েটা অনেকটা রিমির মতো, তাই কেটে পাঠিয়েছেন। বাবার কাছ থেকে পাওয়া সে এক অনন্য উপহার রিমির। অর্থমন্ত্রীর দায়িত্ব থেকে পদত্যাগের পর অবশ্য পরিবার ও সন্তানদের বেশ সময় দেন তিনি। বাগান করেন, সুঁই সুতো দিয়ে সন্তানদের জন্য রাফ খাতা বানান, সকালে সন্তানদের স্কুলে পৌঁছে দেন, তাদের নিয়ে বিকেলে বেড়াতে যান, রাতে খাবার পর বালিশে হেলান দিয়ে সোহেলকে বুড়ি আর দুই কুকুর রঙ্গা-ভঙ্গার গল্প শোনান।

স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম প্রধানমন্ত্রী এবং মুক্তিযুদ্ধ-পরবর্তী সরকারের অর্থমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করলেও কোনো ধরনের আত্ম-অহমিকা দেখা যায় না তাঁর, ক্ষমতার অপব্যবহার করে ব্যক্তিগত সুবিধা আদায় করতেও না। জীবনযাপনেও দেখা যায় বেশ সাধারণ। উপন্যাসে আমরা দেখতে পাই, আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক হয়েও টাইপিস্টের অনুপস্থিতিতে সংবাদপত্রের জন্য বিবৃতি লিখতে টাইপ-রাইটার নিয়ে বসে যাচ্ছেন তিনি নিজেই। মুক্তিযুদ্ধের সময়ে প্রধানমন্ত্রীর অফিস-সংলগ্ন বাথরুমে নিজের ময়লা শার্ট নিজেই পরিষ্কার করেন তিনি, জ্বরে অসুস্থ অর্ডারলির মাথায় নিজেই পানি ঢেলে শুশ্রুষা করেন। অর্থমন্ত্রী থাকাকালীন এক ঘটনার বর্ণনায় দেখা যায়, একদিন ক্যাবিনেট মিটিংয়ে যাওয়ার প্রবেশপথেই দায়িত্বরত পুলিশ তাকে চিনতে না পেরে আইডি কার্ড চেয়ে বসে- ‘পুলিশের আর কি দোষ। নিরাপত্তারক্ষী বা আমলাদের কোনো জটলা নেই মানুষটিকে ঘিরে, তাজউদ্দীন যে একদম একা। তার পরনে একটা কালো প্যান্ট, পায়ে সাধারণ স্যান্ডেল, গায়ে ইন না করা সাদা ফুলহাতা শার্ট। পুলিশ তো বিভ্রান্ত হতেই পারে।’ (নতুন দিনের গান, পৃষ্ঠা-২৪১)। ছেলে-মেয়েসহ জোহরা তাজউদ্দীনের পালিয়ে বেড়ানোর দিনগুলোয় ধানমন্ডির এক গৃহকর্তা অন্য বাড়িতে নিয়ে যাওয়ার কথা বলে তাদের মাঝরাস্তায় ফেলে আর ফিরে আসেন না, অনেক অপেক্ষার পর সেই গৃহকর্তার বাড়িতে গেলেও দরজা খোলেন না তিনি। পরবর্তীকালে স্বাধীন বাংলাদেশে সেই গৃহকর্তার প্রমোশনের একটি ফাইল আসে অর্থমন্ত্রী তাজউদ্দীনের কাছে। প্রতিশোধ নেবার ইচ্ছে কাজ করেনি তাঁর, কাগজের রেকর্ড অনুযায়ী প্রাপ্য প্রমোশনের অনুমোদন দিয়ে দেন তিনি। এ ঘটনার সাক্ষী তাঁর একান্ত সচিব আবু সাইদ চৌধুরীর ভাবনা প্রতিফলিত লেখকের বর্ণনায়- ‘ব্যক্তিগত ক্রোধ, ঈর্ষা বা প্রতিশোধ নেবার ইচ্ছা, এগুলোকে উপেক্ষা করার ক্ষমতা সাধারণ মানুষের থাকে না। এমন নৈর্ব্যক্তিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা থাকে অত্যন্ত বিরলপ্রজ কিছু মানুষের, তার সামনে বসে থাকা চশমাপরা মানুষটিও সেই দলে পড়েন।’ (ফাইলের দিন, রাজনীতির আলাপ, পৃষ্ঠা-২৬৩)।

কেউ কেউ তাজউদ্দীনকে ক্ষমতালোভী হিসেবে চিহ্নিত করতে চেয়েছেন। এমনও প্রচারণা চলেছে, ২৫ মার্চের কালো রাতে শেখ মুজিবকে পাকিস্তানিদের হাতে ধরিয়ে দিয়েছেন তিনি-ই। খন্দকার মোশতাক ও তার অনুসারীরা রটিয়েছে- তাজউদ্দীন শেখ মুজিবের স্বদেশ প্রত্যাবর্তন চাননি, ষড়যন্ত্র করেছেন যাতে তিনি আর দেশে ফিরতে না পারেন, চেয়েছেন নিজেই আজীবন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী থাকতে। যুদ্ধের সময় গোপন চুক্তি করে দেশকে ভারতের কাছে বেচে দিয়েছেন- এমন অপবাদও সইতে হয়েছে তাঁকে। কিন্তু- ‘তাজউদ্দীন ফাইল বের করে দিয়ে সহকর্মীদের দেখান ইন্দিরার সাথে তার নোট বিনিময়। সেখানে কেউ খুঁজে পায় না কত দামে বিকিকিনি হলো নতুন রাষ্ট্রটি। পরের চারটি দশকেও কেউ কেউ রাজনৈতিক সুবিধা লাভের আশায় প্রমাণ করার চেষ্টা করে যে তাজউদ্দীন বিক্রি হয়েছেন। কিন্তু তারা সফল হয় না।’ (শিকারি গুজব, সহযাত্রী সরীসৃপ, পৃষ্ঠা-২৭৪)। শেখ মুজিবকে হত্যার পর খন্দকার মোশতাক ‘দুর্নীতি-স্বজনপ্রীতি- সরকারি ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগে’ জেলে পোরেন তাজউদ্দীন আহমদকে, কিন্তু কোনো অভিযোগের পক্ষেই প্রমাণ খুঁজে পায় না মোশতাকের অনুগত সেনা ও গোয়েন্দা বাহিনীও।

ইতিহাসগ্রন্থের মতো কেবল তথ্যের ভারে আক্রান্ত নয় এই গ্রন্থটি। মুখবন্ধে ও শেষে লেখক কোনো কোনো সময় ‘সাক্ষী ছিল শিরস্ত্রাণ’কে ‘উপন্যাস’ বলে আখ্যায়িত করেছেন, আবার কখনও কখনও ‘কাহিনি’। এক জায়গায় তিনি বলেছেন, ‘সেই কাহিনি উপন্যাস হয়েছে কি হয়নি তার বিচার ভার পাঠকের।’ কাহিনি বর্ণনায় কিছু কাল্পনিক চরিত্রও স্থান পেয়েছে। প্রধান কাল্পনিক চরিত্রগুলোর নাম-ও শেষে উল্লেখ করেছেন লেখক। এই কাল্পনিক চরিত্রগুলোর আশ্রয়ে ইতিহাসের সূত্রগুলোকে যে চমৎকার সাবলীল ভাষা ও ভঙ্গিতে সমন্বয় করেছেন লেখক, তা পাঠককে উপন্যাস পাঠের গতি ও রোমাঞ্চ উপহার দেবে, কাঠ-খোট্টা ইতিহাস-গ্রন্থ পাঠের একঘেঁয়েমিতে পাঠক আক্রান্ত হবেন না।

কাহিনিতে যেসব ঐতিহাসিক চরিত্র রয়েছেন, তাদের অনেকেই এখনও জীবিত। বাংলাদেশের ইতিহাসের ঘটনাবহুল সময়ের সাক্ষী অন্য চরিত্ররাও সুপরিচিত ও বিখ্যাত। তথ্যের যথার্থতা নিয়ে তাই লেখককে নিশ্চিতভাবেই সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন করতে হয়েছে। ফলে, গ্রন্থটির ঐতিহাসিক মূল্য অনস্বীকার্য। যদিও রাজনৈতিক মেরুকরণের কারণে কিছু চরিত্রের সেই সময়কার ভূমিকা নিয়ে তাদের বর্তমান অনুসারীরা ঐতিহাসিক তথ্যগুলোকে যে চ্যালেঞ্জ করে বসবেন নাÑতা নিশ্চিত করে বলা যায় না। আবার এ কথাও সত্য, একই ঘটনাকে বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে দেখার চেষ্টা করা হলে ঘটনাটিকে নানাভাবেই ব্যাখ্যা করা যায়, তা নির্ভর করে ব্যক্তির দৃষ্টিভঙ্গির উপর। সে-কারণে, কোনো কোনো ঘটনায় লেখকের ব্যক্তিগত অথবা উল্লিখিত সূত্রের মতানুসারে প্রদত্ত ব্যাখ্যা বিপরীত দৃষ্টিভঙ্গির পাঠকের কাছে গ্রহণযোগ্য না-ও হতে পারে।

তবে লেখক যে উদ্দেশ্য নিয়ে বইটি লিখেছেন, তা অবশ্যই বিবেচনার দাবি রাখে। লেখক বলেছেন, তাজউদ্দীনের প্রতি যে তীব্র শ্রদ্ধাবোধ তিনি ধারণ করেন, পাঠক যদি এই উপন্যাস পড়ার পর সে আবেগ অনুভব করেন, ইতিহাসের পাতা উল্টে দেখেন তাজউদ্দীনকে আরেকটু ভালোভাবে জানার প্রত্যাশায়Ñ তাহলেই তার লেখা সার্থক। উপন্যাস বা কাহিনিটি পড়ার পর ব্যক্তিগতভাবে আমার মনে হয়েছে, কেবল তাজউদ্দীন নয়, বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধকে, মুক্তিযুদ্ধের সাথে জড়িত প্রতিটি চরিত্রকেই আরও ভালোভাবে জানার ব্যাপারে পাঠককে উদ্দীপিত করবে এটি। বাংলাদেশ নামক দেশটির অভ্যুদয় এবং পরবর্তী সামগ্রিক ঘটনাপ্রবাহ পাঠককে দেশপ্রেমের আবেগে উদ্বেলিত করবে।

বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ ও পরবর্তী চার বছরের পুরো ইতিহাস ধারণ করার জন্য মাত্র প্রায় সাড়ে চারশ পৃষ্ঠা যথেষ্ট নয়। লেখক সে দাবিও করেননি। তিনি মূলত বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের সাথে তাজউদ্দীনের যে সম্পর্ক, তার কিয়দাংশ তুলে ধরার প্রয়াস পেয়েছেন। সেই প্রয়াসে যে তিনি সার্থক- সে কথা বলাই যায়। উপন্যাসের শেষে নিশ্চিতভাবেই পাঠকের মনে হাহাকার জাগবে জেলে বসে লেখা তাজউদ্দীনের হারিয়ে যাওয়া ডায়েরিটির জন্য। অদ্যাবধি নিখোঁজ সেই ডায়েরি উদ্ধার করা গেলে উন্মোচিত হবে বাংলাদেশের ইতিহাসের অনেক অজানা অধ্যায়।

উপন্যাসটি লেখকের প্রতি পাঠকের দাবি আর চাহিদা আরও বাড়িয়ে তুলবে। পাঠকমাত্রেই চাইবেন, উপন্যাসটির পরবর্তী সংস্করণে তাজউদ্দীন আহমদ এবং মুক্তিযুদ্ধের জানা-অজানা আরও কাহিনি যুক্ত হবে, কলেবরে আরও বড় হবে গ্রন্থটি। বিজয়ের পর প্রবাসী সরকারের বিলুপ্তি থেকে নতুন সরকারে তাজউদ্দীন আহমদের অর্থমন্ত্রীর দায়িত্ব লাভ পর্যন্ত ঘটনাবলী আরও বিস্তৃতভাবে জানার আগ্রহ জাগবে পাঠকের। উপন্যাস বা কাহিনিতে উঠে আসা প্রতিটি ঐতিহাসিক চরিত্রের বর্তমান অথবা সর্বশেষ অবস্থা/অবস্থান পরিশিষ্টে জুড়ে দিলে তা নতুন প্রজন্মের পাঠকের জন্য সহায়ক হবে। তাজউদ্দীন আহমদের ব্যক্তি ও কর্মজীবনের বাছাই করা কিছু স্থিরচিত্রের সংযোজন গ্রন্থটির আবেদন আরো বাড়িয়ে তুলবে বলেই মনে করি। যেহেতু একজন বীরশ্রেষ্ঠ (মতিউর রহমান)-এর আত্মত্যাগের কাহিনী এতে বিবৃত হয়েছে, বাকি বীরশ্রেষ্ঠদের কাহিনিও একই মলাটের ভেতর স্থান দেয়া যায় কি না তা-ও ভেবে দেখতে পারেন লেখক।

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

shares