গল্প : ভ্রুণ : মোজাম্মেল হক নিয়োগী

মগবাজার মোড়ের চৌতলা বাড়িটির থ্রি-বি ফ্ল্যাটে কোনও শব্দ সৃষ্টি হয় কি না, কারও জানা নেই। সন্দেহ হওয়াটা অস্বাভাবিক নয় যে, এই ফ্ল্যাটে কোনও মানুষের বসবাস আছে। দিনরাত চব্বিশ ঘণ্টাই নিরেট স্তব্ধতায় ফ্ল্যাটটি ডুবে থাকে। চায়ের কাপে চামচের টুনটান শব্দটিও নৈঃশব্দ্যের কফিনে ঢাকা। পাঁচ বছর আগেও এই ফ্ল্যাটটি ছিল শব্দে মুখরিত। বলতে গেলে তখন বাড়ির চালিকাশক্তি ছিল নাসিম-সাদিয়া দম্পতির মেয়ে ডায়না। সারাটা বাড়ি তখন হইহল্লা করে ব্যাপ্ত রাখত। যখন তখন কম্পিউটারে উচ্চৈঃস্বরে কনসার্ট শুনত আর সেই শব্দ জানালার চোরা ফাঁক গলিয়ে বাইরে চলে যেত। ওয়ার্ল্ড ব্যাংকের স্কলারশিপ নিয়ে ডায়না ইউকে গিয়ে সেখানে পাকিস্তানি এক ছেলেকে বিয়ে করে সেটেলড্ হয়েছে—দেশে ফেরার ইচ্ছে নেই। গত পাঁচ বছর যাবৎ শব্দ সৃষ্টি করার মতো আর তেমন কেউ নেই।

তারও আগে বাসাটি শব্দে গম গম করত। পাঁচ বছর আগের কথা। তখন নাসিম-সাদিয়ার বড় ছেলে শিশির বাসায় ছিল। লেখাপড়া, খেলাধুলা, মুভি দেখা, বন্ধুদের নিয়ে বাসায় তুমুল আড্ডায় ভরিয়ে দিত। এক সময় শিশির মাদকাসক্ত হয়ে পড়ে এবং লেখাপড়ায় ডাব্বাডুব্বা মারতে শুরু করে। বাধ্য হয়েই মা-বাবা ওকে কানাডায় পাঠিয়ে দেন। সেও সেখানে ফরিদপুরের প্রবাসী এক মেয়েকে বিয়ে করে থিতু হয়েছে। এই দম্পতির সঙ্গে যোগাযোগ প্রায় বিচ্ছিন্ন বললেই চলে। দুই সন্তান প্রবাসী হওয়াতে নাসিমের স্বপ্নগুলো বন্যার পানির স্রোতে ভেসে গেল। এখন স্বপ্নহীন খরায় চৈতমাসের নিরস মাটির মতো খড়খড়ে বুক। শিক্ষক হিসেবে সন্তানদের প্রতি আদরস্নেহের কোনও ঘাটতি রাখতেন না। ছেলেমেয়েরা দেশে থাকবে, পারিবারিক বন্ধনে একত্রে থাকার আজন্ম বাসনার এত দ্রুত সমাধি হবে নাসিম কখনও ভাবতে পারেননি। এখন সবকিছুকে নিয়তির ওপর ছেড়ে দিয়ে তিনি যেন রোবটের মতো জীবনযাপন করেন। সবকিছুতেই নির্বিকার। যা হবার হোক। যা ঘটার ঘটুক। এর বাইরে নাসিম কিছুই ভাবেন না। ফিজিক্সের অধ্যাপক নাসিম ভাবেন, এই বিশ^ব্রহ্মাণ্ড যেমন এক অমোঘ সিস্টেমে চলে, যার ওপর অতি ক্ষুদ্র প্রাণী মানুষের কোনও হাত নেই, ঠিক তেমনই প্রতিটি জীবনও তার নিজস্ব সিস্টেমে চলে। মেটাফিজিওলজিক্যাল ম্যাটার। জীবনকে তার মতো নিজস্ব গতিতেই চলতে দেওয়া উচিত। হয়ত এটিই নিয়তি। 

অধ্যাপক নাসিম কলেজে ফিজিক্স পড়ান। শুধু পড়ান পর্যন্ত থাকলে হয়ত বাসায় এসে দু-চারটা কথা বলার মতো কথা পেটে থাকত। দুরাশা। কলেজের ক্লাস শেষে পেটের সব কথাই খালাস করে আসেন কয়েক ব্যাচ কোচিং করিয়ে। রাতে যখন বাসায় ফেরেন তখন কথা থাকবে কোথা থেকে, সব খালি খটরমটর। খোলা হাট। কথা জন্ম নেওয়ার মতো সময় তো দিতে হয়। বাসায় ফিরে ক্লান্তিতে প্রৌঢ়ত্বকে আরও মহিমান্বিত করার জন্য রাত দশটা অব্দি সোফায় বসে থাকেন, তারপর টেবিলে খাবার দেওয়া হলে খেয়ে-দেয়ে বিছানায় কাত। রুমের আলো নিভে গেলে রাতের পরিপূর্ণতার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে তার দেহযন্ত্র থেকে উৎপন্ন হয় কেবল প্রবল বেগের নাকসাট।    

একই অবস্থা সাদিয়ারও। একটি সরকারি হাসপাতালে কাউন্সিলরের পদে চাকরি করার সুবাদে সারা দিন রোগীর কাউন্সিলিং করে দেহযন্ত্রে উৎপাদিত সকল শব্দ খালাস করে শূন্য হয়ে বাসায় ফিরে কিছুটা সময় মুখে কপাট সেঁটে হাঁড়িপাতিলের সুলুকসন্ধান করে দুজন একই টেবিলে খাওয়া-দাওয়া করেন বাকপ্রতিবন্ধীর মতো। কখনও আদিলের রুমে গিয়ে শয্যাশায়ী ছেলেটির মুখের দিকে একবার চোখ বুলিয়ে নিজের শয়নকক্ষে ফিরে আসেন। আদিলের মুখের দিকে তাকালে বুকের ভেতরটা হাহাকার করে সাদিয়ার। কেমন সুন্দর দাড়িগোঁফ গজিয়ে সুপুরুষ হয়ে উঠেছে। মানবাকৃতির এক পিণ্ড মাংস ছাড়া সে আর কিছু নয়, অন্তত নাসিম-সাদিয়া পরিবারের কাছে। বাকহীন, দৃষ্টিহীন, নিশ্চল শরীরের সেই ছোট্ট আদিল শিশু থেকে চোখের সামনেই বড় হয়েছে। পরিণত হয়েছে পুরুষে। কী তার অনুভূতি, কী আবেগ কে জানে ? নাসিমের মধ্যে ছেলের প্রতি পূর্বে আপত্য অনুভূতি প্রবল থাকলেও ক্রমশ সে আবেগ হ্রাস পেয়ে এখন অনেকটা জড় পদার্থের মতোই। কিন্তু মা বলে কথা, সাদিয়ার ভেতরে ভেতরে চোরাকান্না মাঝে মাঝেই উসকে ওঠে।

প্রৌঢ়ত্বের মহিমা, ক্লেদ ও ক্লান্তির ভারসাম্যময় তাড়নাহীন শিথিল বসন্তের বেরঙা নিরুত্তাপ দাম্পত্যজীবন। এক ঘুমেই রাত পার যুগলের।

জেগে থাকে শাপলা।

আর একজন জেগে না ঘুমে কেউ জানে না—সে আদিল।

শাপলার মনে কত কথা! কে শোনে ? সেই দিনের কিশোরী আজ পূর্ণ যুবতী। তার মনে হাজারো কথা। বাড়ন্ত শরীরে মনও কি বাড়ন্ত নয় ? হোক সে গরিবগুরবা ঘরের মেয়ে, তাই বলে কি কথা থেমে থাকবে ? থেমেই গেল। সারা দিন একা একা এত বড় বাসায়, দুর্বিষহ নিঃসঙ্গতার বেড়াজালে বন্দি, দক্ষিণের জানালার খড়খড়ি দিয়ে তাকিয়ে থাকে নিষ্পলক, দুটি কাকের সঙ্গে কথা বলে, দুটি দোয়েলের সঙ্গে কথা বলে, পাশের বাসার ছাদে কবুতরের বকবকম শব্দ শুনে হাসে। মাঝে মাঝে পায়রার সঙ্গম দেখে শরীর তেতে ওঠে।

হাসপাতালে চিকিৎসকদের আধিপত্য থাকলেও হিসাব বিভাগের ও প্রশাসনের দাপটও কম নয়। কিন্তু কাউন্সিলর, হাসপাতাল সমাজসেবা কর্মকর্তারা অনেকটা উপাঙ্গের মতো। অন্যরা এদের ট্যারা চোখে দেখে। একটি টিস্যু বক্সের জন্যও কমপক্ষে দুই সপ্তাহ ধরনা দিয়ে পেতে হয়। তৃতীয় শ্রেণির কর্মচারী, ক্লিনারও এদের কর্মকর্তা হিসেবে প্রাপ্য সম্মানটুকুও দেখায় না। কাজ কী কম করি ? সারাদিনই বকবক করতে হয়। কত মানুষকে পথে এনেছি কিন্তু এতটুকু সম্মান আজ পর্যন্ত জোটেনি। সাদিয়া নিজ চেয়ারে বসে গজ গজ করতে থাকেন। গজ গজ করারই কথা।  এক মাস আগে চেয়ারের জন্য একটি টাওয়েলের রিক্যুজিশন দেওয়ার পর এখনও টাওয়েল পাননি। হাতমুখ মোছার জন্য এখন কি বাসা থেকে টাওয়েল আনতে হবে ? মুখ গোমরা করে বসে থাকেন সাদিয়া।

বেশিক্ষণ গোমরা মুখে বসে থাকার ফুরসত পাননি। একজন ক্লিনার দরজার সামনে থেকে ভেতরে একজন রোগীকে ঠেলে পাঠিয়ে বলে, যান এই ম্যাডামের লগে কথা কন, ম্যাডাম রোগী—অ্যবরশনের কেইস।

মেয়েটি লাজুক মুখে আনত মুখে রুমে ঢুকে নিশ্চুপ দাঁড়িয়ে থাকে। মেয়েটির দিকে তাকিয়ে ক্রোধ-ঘৃণা ও ভালোবাসার দ্যোতনায় আবেগসিক্ত হয়ে পড়েন সাদিয়া। এমন ফুটফুটে অল্প বয়সি পরির মতো সুন্দর মেয়েটা অ্যাবরশন করাবে! গা শিউরে ওঠে সাদিয়ার। সামনের চেয়ারের দিকে ইঙ্গিত দিয়ে সাদিয়া নিজেই রুমের দরজা আটকে দিয়ে বলে, বসো এখানে।

মেয়েটি চেয়ারে ইতস্তত করে বসলে সাদিয়া কিছুটা সময় তাকে পর্যবেক্ষণ করে জিজ্ঞেস করেন, কী সমস্যা?

নিশ্চুপ মেয়েটি মেঝের দিকে তাকিয়ে থাকে স্থির দৃষ্টিতে।

কী সমস্যা বলো ? না-হয় কথা বলব কী করে ?

কনসিভ করেছি।

বৈধ না অবৈধ ?

মেয়েটি কথা বলে না। মুখে দাঁত চেপে আছে।

বলো লিগ্যাল কেস না কি ইলিগ্যাল কেস ?

মেয়েটিকে দেখে মনে হয় লেখাপড়া করে। হয়ত কলেজে অথবা কলেজ পেরিয়ে টার্সিয়ারি এডুকেশনের প্রথম দিকে। সাদিয়া মেয়েটির আপাদমস্তক পর্যবেক্ষণ করেন। মুখে বিষাদের ছায়া নেই। হাসিখুশিও নয়। চাপা কষ্ট আছে বলে মনে হয়। অনেকক্ষণ নীরবতায় কেটে যাওয়ার পর সাদিয়া জিজ্ঞেস করেন, তোমার নাম কী ?

তিন্নি।

লেখাপড়া করো ?

জি। 

কোথায় ? 

একটি প্রাইভেট ইউনিভার্সিটিতে। অনার্স সেকেন্ড ইয়ারে।

কোন সাবজেক্ট ?

মাইক্রোবায়োলজি।

খুব ভালো সাবজেক্ট। তোমার মা-বাবা কী করেন ?

বাবা সরকারি চাকরি করেন। প্ল্যানিং কমিশনে। মা একটি বেসরকারি ফার্মে।

সব সত্য কথা বলবে। কিছুই লুকাবে না। লুকালে আমি পরামর্শ দিলেও তোমার কাজ হবে না। তুমি যেহেতু বিশ^বিদ্যালয়ে পড়ো সহজেই বুঝতে পারছ যে, একজন কাউন্সিলর কোন ওষুধ দেন না। তার কথাই ওষুধ। তাই কিছু যদি গোপন করো তাহলে আমি সমস্যার কারণ বুঝতে পারব না। আর তোমাকে পরামর্শ দিলেও কাজে লাগবে না।

গোপন করব না ম্যাডাম। আপনি প্রশ্ন করতে পারেন।

সাদিয়ার হঠাৎ মনে হলো, এই কেসের নোট নেওয়া হচ্ছে না। একটি ফাইল বের করে নাম লিখে বলেন, তিন্নি তুমি আমাকে যা বলবে সবই কনফিডেনশিয়াল রাখা হবে। তোমার তথ্য কখনও কোনওভাবেই প্রকাশ করা হবে না। আমাদের ধর্মই হলো কনফিডেনশিয়ালিটি মেনটেইন করা। তোমার ঠিকানা বলতে কি দ্বিধা আছে ?

জি না ম্যাডাম।

তিন্নি নাম ঠিকানা বিস্তারিত বললে সাদিয়া লিখে নিয়ে বলেন, বাবা কোথায় থাকেন ?

আমাদের ফেমিলিটা ব্রোকেন। বাবা-মার ছাড়াছাড়ি হয়ে গেছে কয়েক বছর আগে। আমি আর মা থাকি একসঙ্গে। বাবা বিয়ে করে আলাদা সংসার করছে। আমি বাবার সঙ্গেও মাঝে মাঝে থাকি।

সাদিয়ার কপাল কুঞ্চিত হয়। সপ্রতিভ হয়ে বলেন, এখন বলো, তোমার পেটের সন্তান কী লিগ্যাল নাকি ইলিগ্যাল ?

তিন্নি অস্ফুট উচ্চারণে বলে, আমার পেটের সন্তান ইলিগ্যাল। সমস্যা আরও আছে।

কী সমস্যা ?

আমি আমার বিএফকে বললে সে হয়ত এখন বিয়ে করবে না।

সাদিয়া মনে মনে বলেন, বিএফ, মানে ব্লু ফিল্ম। নীল ছবি। কিন্তু নীল ছবির সঙ্গে পেটে বাচ্চা আসার কী সম্পর্ক ? বিষয়টি বোধগম্য না হওয়াতে সাদিয়া জিজ্ঞেস করেন, বিএফ কী ?

বয়ফ্রেন্ড।

সাদিয়া মনে মনে হেসে নিরুচ্চারে বলেন, এই যুগের ভাষাটাও রপ্ত করতে পারছি না। তারপর তিন্নির দিকে তাকিয়ে বলেন, অ্যাবরশন করতে চাইছ কেন ? তোমার বিএফকে বলো বিয়ে করতে।

আমি তাকে বিয়ে করতে বলেছি। সে বলছে অ্যাবরশন করাতে। ওর ফ্যামিলি মেনে নেবে না। লেখাপড়া শেষ করে পারিবারিক স্বীকৃতি পাওয়ার পর বাচ্চা নেব। তাছাড়া…

তাছাড়া কী ?

এই বয়সেই বাচ্চা নিলে জীবনকে উপভোগ করব কীভাবে ?

হুম। তোমার মা জানেন ?

না। আমার মা জানলেও মেনে নেবে না। দুনিয়া ওলটপালট করে ফেলবে। হয়ত আমাকে খুন করবে অথবা মা আত্মহত্যা করবে। আসলে তাদের ডিভোর্স হয়ে যাওয়ার পর মা খুব এগ্রেসিভ হয়ে পড়েছে। সবার সঙ্গে রুড বিহেভ করে। খুবই এরোগেন্ট। তার মতের বাইরে কিছু ঘটলে পদ্মার জল নিয়ে যমুনায় ফেলে।

তিন্নির শেষ বাক্যটি শুনে সাদিয়ার হাসি পেলেও পেশাগত কারণে হাসতে পারেন না। বিস্ফারিত চোখে তিন্নির দিকে এমনভাবে তাকান যেন তিন্নিকে দেখতে পাচ্ছে না। তার চিন্তার আচ্ছন্নতার আড়ালে একটি ভাসমান হালকা শরতের সাদা মেঘ যেন ভাসতে থাকে তার চোখের সামনে। প্রতিদিনই এ-রকম কত সামাজিক-মানসিক সমস্যার কাউন্সিলিং করতে হয় তাকে। কিন্তু নিজের জীবনের কাউন্সিলিং কি করতে পেরেছেন ? সেই বিয়ের সময়ে নতুন দাম্পত্যজীবনের কত সরল সুখের বহতা নদীগুলো মহাকালের মানবকলের বর্জ্যে ভরাট হয়ে গেছে। একেকটি মানুষ একেটি বিস্ময়। একেকটি মানুষ একেকটি রাসায়নিক কারখানা। মনস্তাত্ত্বিক জটিলতার জাল ছিঁড়ে মানুষেরা বের হতে পারে না। ডায়না ও শিশিরকে স্নেহভালোবাসা আদর কি কোনওভাবে কম দেওয়া হয়েছে ? জন্মের পর থেকে বুকে আগলে রাখার জন্য জীবনের সর্বস্ব দিয়ে ভালোবেসেছে। শুধু কি সাদিয়া ? নাসিম কি ওদের কম ভালোবাসত ? ওদের কখনও অসুখ-বিসুখ হলে সেও রোগী হয়ে যেত, মানসিকভাবে ভেঙে পড়ত ভীষণভাবে। সারাক্ষণ পাশে বসে থাকত। আর তারা দুজনই বলতে গেলে চিরতরে ছেড়ে গেছে। কীসের অভাবে ? বাসায় পড়ে আছে একটি ছেলে যাকে একটি মানবপিণ্ড ছাড়া আর কিছু বলার সুযোগ নেই। সাদিয়ার বুক ভারাক্রান্ত হতে শুরু করলে তিন্নির ডাকে সম্বিৎ ফিরে পান। ম্যাডাম।

সাদিয়া মুখে কৃত্রিম হাসি ফুটিয়ে বলেন, ওহ্ হা। আসলে তোমার কেসটা নিয়ে খুব চিন্তামগ্ন হয়ে পড়েছিলাম। আচ্ছা … পদ্মার জল নিয়ে যমুনায় ফেলে। ভারি সুন্দর উপমা। যাক, এখন আসল কথায় আসি…। আচ্ছা … মানে কনসিভ করার আগে তোমাদের মাথায় এমন চিন্তা আসেনি কেন ?

আসলে ম্যাডাম বয়সের ব্যাপার। সব সময় তো প্রোটেকশন দেওয়ার মতো ব্যবস্থা থাকে না। তাছাড়া আমার মেনস্ট্রুয়েশন সাইকেলের হিসাবেও একটু ভুল হয়ে গিয়েছিল।

এখন অ্যাবরশন করার জন্য তোমার ইচ্ছে কী ? তুমি কি চাও ? নাকি তোমার বিএফের কথায় বাধ্য হচ্ছ।

আমরা দুজনই চাই।

ডাক্তার কী বলছেন ?

ডাক্তার বললেন, আমরা ভ্রƒণ নষ্ট করতে চাই না যতক্ষণ না যৌক্তিক কারণ পাওয়া যায়। ভ্রƒণ নষ্ট করা আর মানুষ খুন করা একই কথা।

তিনি ঠিকই বলেছেন। যৌক্তিক কারণ ছাড়া কোনও ভ্রƒণ কেন হত্যা করা হবে ? তারা আর কী বললেন ?

আর বললেন, আমার তিন মাসের বেশি সময় হয়ে গেছে। এখন আমার জীবনের ঝুঁকি বেড়ে গেছে।

তিন মাসের বেশি সময় হলে তোমারও ঝুঁকি আছে।

কিন্তু ম্যাডাম আমি তো এখন দেখছি নানা রকম ক্রাইসিসে পড়েছি। আমার জীবনের ঝুঁকি, আমার লেখাপড়া, বন্ধুবান্ধব, আমার মা, আমার ফ্রেন্ডের পরিবার এবং সবশেষে আমার ফ্রেন্ডও আমাকে অস্বীকার করতে পারে। এখন কী করব ? আমি কোন কূলকিনারা পাচ্ছি না। অ্যাবরশন না করালে হয়ত আমাকে আত্মহত্যা করতে হবে। 

তিন্নির সমস্যায় সাদিয়া চোখে অন্ধকার দেখতে পান। তার শুধু মনে হচ্ছে যদি মেয়েটির বন্ধু ওকে সত্যিকার অর্থেই ভালোবাসে সব মিটমাট করা সম্ভব। ওর বন্ধু ওকে পরিত্যাগ করলে তিন্নির স্বাস্থ্যের ঝুঁকি নিয়েই অ্যাবরশন করতে হবে। প্রশ্ন থেকে যায়, ভবিষ্যতে সে মা হতে পারবে কি না ? একটি ফুলের মতো মেয়ের জীবনে কেন এমন কষ্ট নেমে এল! সদ্য প্রস্ফুটিত গোলাপে এ কেমন দুষ্ট ভ্রমর কালশিট ছড়িয়ে দিল। তিন্নির মুখের দিকে তাকিয়ে মায়ায় জড়িয়ে যায় সাদিয়া। বধির কান্নায় সিক্ত হয়, বুকে জড়িয়ে আদর করতে ইচ্ছে হয়।

আমি তোমাকে বলব, তোমার বন্ধুকে রাজি করিয়ে বিয়ে করে কেইসটা লিগ্যালাইজ করে ফেলো। তাকে কনভিন্স করো। অন্তত তোমার জীবন ঝুঁকিপূর্ণ এ কথাটি বুঝিয়ে বলো। অন্যান্য সমস্যা সমাধানের জন্য আমি আমার পেশার বাইরে গিয়ে ব্যক্তিগতভাবে তোমার মায়ের সঙ্গে কথা বলব। আমার দৃঢ় বিশ^াস তোমরা সবাই ভালো থাকবে। তুমি বাচ্চাটিকে নষ্ট করো না। তুমি দু-দিন পর আমার সঙ্গে দেখা করো। আমি দেখি আরও ভালো কোনও পরামর্শ দিতে পারি কি-না।

বাসায় ফিরে ক্লিনিক্যাল সাইকোলজির কয়েকটি বই বের করে পাতার পর পাতা উল্টাতে থাকেন সাদিয়া। এই জাতীয় কেসের ঘটনা অহরহ। পশ্চিমা বিশে^ও এখন ভ্রƒণ হত্যাকে নিরুৎসাহিত করা হয়। সামাজিক ও অর্থনৈতিক অবস্থার ওপর নির্ভর করে ভ্রƒণের পরিণতি। কিন্তু এত সুন্দর মেয়েটার জীবনে এই বয়সেই এত বড় ধাক্কা খাবে কেন ? কেনইবা ভ্রƒণ নষ্ট করবে না ? কীভাবে তিন্নিকে প্রবোধ দেবে ? কী পরামর্শ দেবে ? হাজার হাজার মানুষ ভ্রƒণ নষ্ট করে নিজের জীবনের নিরাপত্তার জন্য। তাহলে তিন্নির সমস্যা কোথায় ? আবার ভাবেন, কেন ভ্রƒণ নষ্ট করবে ? এটি খুনের শামিল। তিন্নির চিন্তায় সাদিয়া সারা রাত ঘুমাতে পারেননি।  

তিন্নি চলে যায় কিন্তু আর কোনও দিন সাদিয়ার কাছে আসেনি। সাদিয়া জানে না তিন্নি শেষ পর্যন্ত কী করেছে। হয়তো জীবনের ঝুঁকি নিয়েই অ্যাবরশন করিয়েছে। অথবা করেনি। প্রাইভেট হাসপাতাল বা ক্লিনিকে অ্যাবরসন করানো অতি সাধারণ ঘটনা।

একটি ঘটনা ছাড়া আর তেমন ব্যত্যয় দেখা যায়নি তাদের যাপিত জীবনের। সামান্য ঘটনাও অসামান্যের দিকে সাপের জিহ্বার মতো বের হচ্ছে আবার ভেতরে ঢুকছে। কী করে কী হয়ে গেল বুঝে উঠতে পারছেন না সাদিয়া। গোপন কথাটি নাসিমের কাছে এখনও গোপন রেখেই চলেছেন তিনি। শাপলার শরীর বদলে যাচ্ছে ক্রমাগত। আদিল কী শারীরিকভাবে সক্ষম ? কীভাবে সম্ভব ? ডাক্তার আগেই বলে দিয়েছেন যে আদিলের যৌন সক্ষমতা নেই। তাহলে শাপলা কার সঙ্গে এই ঘটনা ঘটিয়েছে ? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজে অস্থির হয়ে পড়েন সাদিয়া। কোনওভাবেই মেনে নিতে পারছেন না শাপলার গর্ভের ভ্রƒণকে।

সারা দিন এই ফ্ল্যাটে শাপলা আর আদিল থাকে। সকালের নাশতা খেয়ে নাসিম- দম্পতি কাজে যান আর ফিরে সন্ধ্যার পর। আদিলকে খাওয়ান, গোসল করান থেকে শুরু করে যাবতীয় কাজ শাপলাকেই করতে হয়। অনেক দিন হলো শাপলা এই বাসায় এসেছে। শাপলার বাবা ছিল নাসিমদের বাড়ির বছরবান্ধা গোমস্তা। সেই ছোট শাপলা ধীরে ধীরে বড় হয়। আদিলও বড় হয়। আদিলের মুখের দিকে শাপলার ভাবানুভূতি জাগাটা কি স্বাভাবিক নয়? একইসঙ্গে থাকলে ইটপাথরের সঙ্গে মানুষের কেমিস্ট্রি তৈরি হয়। তাহলে দুটি জীবন্ত শরীরে কেন কেমিস্ট্রি তৈরি হবে না ? খালি বাসায় বিপরীত লিঙ্গের দুজন মানুষের বসবাস কি সহবাসে পরিণত হতে পারে না ? শাপলার শরীর ভরা কাটাল জোয়ারে ছাপিয়ে যায়, বাঁধভাঙা ঢেউয়ের মতো আছড়ে পরে আদিলের শরীরে। আদিল মিটমিট করে হাসে, শিহরিত হয়, চলৎশক্তিহীন আদিলকে জাগিয়ে তোলে শাপলা।

হাতের কাছে একটি বঁটি নিয়ে ড্রয়িং রুমে বসে রুদ্রমূর্তি ধারণ করে চাপা ক্রোধে কাঁপতে কাঁপতে সাদিয়া শাপলাকে বলেন, বল কার সঙ্গে পেট বাজাইছিস। সত্যি করে বল। নইলে তরে আজ খুন করে লাশ ফ্রিজের ভেতর ঢুকিয়ে রাখব।

শাপলা নির্বিকার জবাব দেয়, আফনের পোলার লগে। আদিলের লগে কাম অইছে।

এই হারামজাদি। আমার আদিলের তো ক্ষমতা নাই। সত্যি কথা বল। নইলে খুন করব ? চাপা ক্রোধে ফেটে পড়েন সাদিয়া। কথা বলার সময় বঁটি হাতে নিয়ে শাপলার মাথার ওপর খাড়া করে ধরেন যেন মনে হয় এখনই এক কোপে মস্তক ছিন্ন করে ফেলা হবে। কিন্তু শাপলা উদ্বেগহীন। নির্বিকার। একই কথা বারবার বলছে এবং বলছে আমি মিছা কথা কই নাই। আফনের ফোলার লগে আমার ভালোবাসা অইছে। আমি পরতেক দিন এই কাম করি।

বেচইন সাদিয়া হায় হায় করে চিৎকারে ওঠেন, হঠাৎ করেই তার হাত থেকে বঁটি নিচে পড়ে যায় এবং শাপলাকে লাথি মেরে মেঝেতে ফেলে দিয়ে তিনি বলেন, তুই যা এখন হারামজাদি। রাতে তরে খুন করব। আদিলের বাপ বাসায় আসুক।

শাপলা নির্বিকার উঠে যায় এবং বারান্দার পাশে ছোট্ট একটা কামরায় গিয়ে শুয়ে থাকে।

রাতে নাসিম বাসায় এলে সাদিয়া শাপলার সব ঘটনা খুলে বলেন। নাসিমের বিস্ফারিত ঠোঁটে মৃদু হাসির বিভা, বলে, আদিল বাবা হবে! কী আনন্দ আকাশে বাতাসে! আমার আদিল বাবা হবে! নৈঃশব্দ্যে ঢাকা এই বাসাটি আবার কোলাহলে ভরে যাবে! আনন্দ! আনন্দ!

সাদিয়া ক্ষীপ্র চিতা বাঘিনীর মতো পারলে নাসিমের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়েন। কী আশ্চর্য! তোমার ন্যাকামিতে আমার পিত্ত জ¦লে যাচ্ছে। এই বাচ্চা কার না কার কে জানে ? ডাক্তার বলেছেন আদিল অক্ষম। কালই তাকে বাড়িতে রেখে এসো। না-হয় আমি শাপলাকে খুন করব।

নাসিম হাসতে হাসতে বলেন, পৃথিবীতে অনেক কিছুই ঘটে যা মানুষ জানে না। প্রয়োজনে ডিএনএ টেস্ট করিয়ে আদিলের সন্তানকে আমরা বরণ করব।

তা হবে না। আমি বেঁচে থাকতে হবে না। তুমি যাই বলো। ওর বাপ তোমাদের বাড়ির চাকর। একটা কাজের মেয়েকে আমার ছেলের বউ হিসেবে গ্রহণ করা আমার পক্ষে সম্ভব না। ওকে তুমি বাড়িতে রেখে এসো। নইলে আমি নিশ্চিত খুন করব। না-হয় আমি আত্মহত্যা করব। 

তা হবে না সাদিয়া। অনেক হ্যাপা আছে। থানা পুলিশ হবে।

তাহলে অ্যাবরশন করতে হবে। আমার সঙ্গে হাসপাতালে নিয়ে গিয়ে অ্যাবরশন করাব।

নাসিম বিচলতি হন কিন্তু সাদিয়ার বিরুদ্ধে কোনও কথা বলার আর সাহস পান না। শুধু আজকেই নয়, সাদিয়ার মুখের ওপর কথা বলার সাহস নাসিমের কখনই ছিল না। খুনোখুনির অবস্থা হয়।

সাদিয়া একদিন শাপলাকে বললেন হাসপাতালে যেতে। কিন্তু শাপলা গোঁ ধরে বলে, আমি কুনোহানে যামু না। আফনে আমার মাইর‌্যা ফালবাইন। মারলে এই বাসাত মারুইন। শাপলার গর্ভনাশ যতটা সহজে করবে বলে সাদিয়া ভেবেছিলেন বাস্তবে শাপলার জেদ ও শক্ত মনোভাবের কারণে ঘটে ঠিক বিপরীত। শাপলাকে বাসা থেকে বের করা সম্ভব হয়নি।

কোলাহলহীন গভীর রাতে সাদিয়ার ঘুম ভেঙে যায়। কার্তিকের শেষ দিকে হালকা কুয়াশা বাতাসে পাতলা সরের মতো ভাসছে। সারা শহর আইসবার্গের মতো সুনসান নীরবতায় ডুবে আছে। কিছুক্ষণ পর গলির মুখে কয়েকটি কুকুরের ঘেউ ঘেউ শব্দ ভেসে আসে। হঠাৎ হঠাৎ পাহারারত দারোয়ানের বাঁশির ফুরুত ফুরুত শোনা যায়। নাসিমের নাকসাট বিরামহীন। অসহনীয় বিকট শব্দ। ঝিম ধরে ছাদের দিকে তাকিয়ে থাকেন সাদিয়া। তখন মনে হয় তিন্নির কথা। তিন্নি শেষ পর্যন্ত কী করেছে ? জানতে ইচ্ছে করে। যদি কোনও একদিন তিন্নির বাসায় যেত পারতেন হয়তো জানা যেত। মেয়েটার ফোন নাম্বারে দু-একদিন খোঁজ করার চেষ্টা করে সাদিয়া সুইচ অফ পেয়েছেন। তাহলে কি ফেইক ফোন নাম্বার দিয়েছে ? শাপলার কথা ভাবতে থাকেন তিনি। কীভাবে সামলাবে শাপলার এই অবৈধ সন্তানকে। অচন্দ্রচেতন আদিল কি সত্যি সত্যি শাপলার সঙ্গে মিশতে পেরেছে ? কীভাবে সম্ভব ? কয়েক মাস ধরে শাপলার প্রতি সাদিয়ার তুচ্ছতাচ্ছিল্য ও অবহেলা ক্রমেই বেড়ে গেছে। একটি রুমে থাকতে দেওয়া হয়েছে কিন্তু কখন খায়, কখন ঘুমায়, কখন স্নান করে কিছুই খোঁজ নেন না তিনি। কোনওভাবেই জীবনের এই জটিল হিসাব মিলাতে পারেন না। শরীরের পেশি যেন ক্রমে শক্ত হয়ে আসছে। নিস্তব্ধ পূর্ণ রাতের গভীরে সাদিয়া যখন নানা রকম চিন্তায় আচ্ছন্ন হয়ে পড়েন ঠিক তখনই থ্রি-বি ফ্ল্যাটে দীর্ঘদিনের জমাট বাঁধা স্তব্ধতা ভেঙে খান খান করে এক নবজাতকের কান্না ছড়িয়ে পড়ে বাতাসে।  

সচিত্রকরণ : শতাব্দী জাহিদ

Leave a Reply

Your email address will not be published.

shares