গল্প : ধুমুলদুপুরে কাকপোড়াগন্ধি বাতাস : পাপড়ি রহমান

ইলেকট্রিক খাম্বাগুলো একটার পাশে অন্যটা মোটামুটি চেহারা দেখা দূরত্বেই দাঁড়িয়ে আছে। এই ঢাকা শহরে জলসঙ্কট, বিদ্যুৎ সঙ্কট, গ্যাস সঙ্কট, অর্থ সঙ্কট ইত্যাদি নানান সঙ্কটের সঙ্গে স্থান সঙ্কটও তীব্র। ফলে খাম্বাগুলো শরীর টান টান রেখে অনেক দূরে, অদেখা অবস্থানে যেতে পারবে এমন নয়। বরং চেহারা দেখা দূরত্বে রাজ্যির তারতুর জড়িয়ে পেঁচিয়ে দিব্যি আছে। ইলেকট্রিক তারের সঙ্গে টিএন্ডটির তারও কোনও কায়দা করে ঢুকে পড়েছে আল্লা মালুম। নানান কায়দার শহর এই ঢাকা। এই কায়দা টায়দা  ঝেড়ে সামান্য দূরে যেতে পারলেই নদী চোখে পড়ে। নদী না হোক নিদেনপক্ষে জলজ হাওয়ার স্পর্শ তো পাওয়া যায়! জলজ হাওয়া গায়ে লাগিয়ে আরও খানিকদূর গেলেই আরও কিছু দৃশ্যাবলি। এই শহর পেরিয়ে কোনও মফস্সল শহরে যাত্রাপথেই দেখেছি কত দৃশ্য! খাম্বাগুলো প্রায় খাল পেরোবার দূরত্বে দাঁড়ানো। আর খাম্বার মাথায় মাথায় দড়ির মতো টেনে নেওয়া তারগুলো কি নিপাট! টান টান! এই মফস্সলি তারগুলোতে বয়স যেন থাবা বসাতে পারে নাই। ফলে তাদের শরীরে সামান্য কুঞ্চন বা ঢিলাভাব নাই, শুধু ধুলাকার হয়ে থাকা ছাড়া। মফস্সলি ওই ধুলাকার তারগুলোতে বসে কাক না  চিল না শকুন নিদেনপক্ষে কোনও পথভোলা টিয়াপক্ষীকেও শক খেয়ে মারা পড়তে দেখি নাই। হতে পারে আমার যাওয়া বা আসার পথে তারা অন্য কোথাও মারা পড়েছিল।

এই সদ্য, মুহূর্তমাত্র আগে দুপুর কালো করে দিয়ে সূর্য সটকে পড়ল! সূর্য সটকে পড়ল না মেঘ তাকে তাড়িয়ে দিল বুঝে উঠতে না উঠতেই আগুনের ফুলকি উঠল। সেই ফুলকি ছরছর শব্দ তুলে মিলিয়ে যেতে না যেতেই দেখি একটা কাক ঝুলে আছে। লহমায় পুড়ে গেছে তার পালকগুলো। পুড়ে একেবারে কুঁকড়ে-মুচড়ে গেছে। কাকটা কি বেবরদ্দ ছিল ? এলোমেলো, ঢিলে বা টান টান তারের কোথায় যে বিপদ সে কি বুঝতে পারে নাই ? আমিও যেমন বিপদ আন্দাজ করতে পারি না। আমি কিছুতেই বিপদ চাই না, কিন্তু বিপদ আমাকে ছাড়ে না। এই যেমন এখন, এই পোড়া কাকের চাইতে বিপদ আমারই বেশি।  মুহূর্তে বেশুমার কাক ইলেকট্রিক খাম্বা আর আমার  ব্যালকনি ঘিরে ফেলেছে। অবিশ্রাম কা-কা শব্দ তুলে আমার মগজ খেয়ে ফেলার উপক্রম করছে। আমি কতক্ষণ ঠোঁট দুটো সরু করে হুশ-হুশ করলাম। হাতের আঙুল তুলে বন্দুকের গুলি ছোঁড়ার ভঙ্গি করলাম। কে শোনে কার কথা ? ঝুলন্ত মৃত সঙ্গীটিকে জীবিত করার জন্য, না উদ্ধারের জন্য তাদের এমন সেøাগান ঠাহর করতে পারলাম না।

দপ করে দুপুরের আলো নিভে যাওয়া মাত্রই কাকটি মরে যাবে কে জানত। যখন সুর্মারঙা মেঘেরা অল্প অল্প জড়ো হতে শুরু করেছিল। আর গাপগুপ করে গিলে ফেলছিল আলোর কণা। তখনও সে দিব্যি ছিল। মানে দিব্যি বসেছিল। যেন সামান্য বিষণ্ন, করুণ। চুপচাপ। চোখের টলটলান জল কিছুটা ঘোলা। দুই-একবার পাখনা ঝাপটে আড়মোড়া ভাঙছিল। পাখনার ঝাপটায় কি না, কে জানে ? আগুনের হলকা এসে তাকে পুড়িয়ে দিল পলকে। যখন সে পুড়ছিল একবারও ডেকে ওঠে নাই! কোনও শব্দ সে করে নাই। কা-কা শব্দ তোলে নাই। ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে কাকের পুড়ে মরা দেখতে দেখতে আমি চলে গিয়েছিলাম দ্য কলোসাস অথবা এরিয়েলের কাছে। এমনই নিঃশব্দভাবে কি সিলভিয়া প্লাথ পুড়ে গিয়েছিল ? ওভেনে মাথা ঢুকিয়ে দেওয়ার পরও কি সে নিঃশব্দ ছিল ? পাশের ঘরে তখন তার শিশু দুটি ঘুমন্ত। কাকটা কি আত্মহত্যা করল না এটা স্রেফ দুর্ঘটনা ?

And I

Am the arrow

The dew that flies

Suicidal, at one with the drive

Into the red.

হঠাৎ হঠাৎ এমন উদ্ভট বিষয় আমার মাথায় আসে। এই তারে পোড়া কাক আর সিলভিয়ার মৃত্যু কি এক হলো ? এইসব আঁতলামির কোনও মানে হয় না। তবু আমি মাথা থেকে এই উদ্ভট কল্পবোধ তাড়াতে পারি না! কাকটা পুড়ে মরেছে এবং আমেরিকায় জন্ম নেওয়া কবি সিলভিয়া প্লাথও।

Please call Mr. Horder!

কাকের পালকগুলো বিশ্রীভাবে পুড়ে যাওয়ায় বাতাস যেন থেমে আছে! এখন অন্তত ঢাকা শহরেরর কোথাও বাতাসের চলাচল নাই। আর আমার এই ব্যালকনিটা জারের মতো। জার-আবদ্ধ বাতাস!

বেলজার!

সিলভিয়া প্লাথের লেখা একমাত্র উপন্যাস।

কাকপোড়াগন্ধি বাতাসের সঙ্গে সিলভিয়ার তরুণ দেহ পোড়া গন্ধ কখন এসে মিশল ? বুঝতে পারছি না।

তবে পোড়া উৎকট গন্ধে আমাকে দুই চারবার বাথরুমে দৌড়াতে হয়েছে। আমি পাকস্থলী খালি করে এসেছি।

বমি আমি সকালেও করেছিলাম আরও বারদুয়েক। ইলতুৎমিশ যখন বাসা থেকে বেরোয় তার পরপরই আমি বমি করেছি। সে আজ অফিস কামাই করে ফাতেমা, জরিনা বা রহিমার সঙ্গে সেক্স করতে যাচ্ছে বলে। আমি এসব বুঝতে পারি। এসব আসলে বোঝা যায়। ইলতুৎমিশ সেদিন সাজগোঁজ বেশি করেও চোরাভাব লুকাতে পারে না। সুন্দর মুখটাতে চোর বসে থাকে। মানুষের ভেতরের চোর এসে কীভাবে যে  মুখের ওপর ছায়া বিস্তার করে!

চুরি কম-বেশ সব মানুষই করে। সব মানুষই ভেতরে বা ওপরে চোর। এই যে ইলতুৎমিশ চুরি করছে আমার সঙ্গে। আমি চুরি করছি তার সঙ্গে। এই বেশ ভালো। চোর চোর খেলা। ইলতুৎমিশ শরীর বা মন দেয় ফাতেমাদের। আমিও রহিম বা করিমকে না দিলেও রুদ্রকে তো দিই। ইলতুৎমিশ আর আমার পলান্তি পলান্তি খেলা। রুদ্রের সঙ্গেও আমার পলান্তি পলান্তি খেলা। ইলতুৎমিশ একবার আমাকে টিলো দেয়। আমি টিলো দিই রুদ্রকে। রুদ্র হয়ত আর কাউকে। এবং টিলো নিয়ে আমি এখন গোলমালের ভেতর। পলান্তি, টিলো, ইলেকট্রিক খাম্বা, কাকপোড়া অথবা সিলভিয়া-পোড়া গন্ধ, ইলতুৎমিশ এবং রুদ্র!

রুদ্রও যে মহাচোট্টা তাও আমি জানি। চোট্টাভরা দুনিয়া! এবং আমি যথারীতি বমি করি। ইলতুৎমিশের চোর চোর খেলার জন্য প্রায়ই আমি হিন্দি সিরিয়ালের দৃশ্য আঁকি।

ইলতুৎমিশ যেদিন ফাতেমাদের সঙ্গে সেক্স সারতে যায় সেদিনের সিরিয়ালে তাকে আমি মৃত দেখাই। ইলতুৎমিশ মারা গেছে ওই কাকটার মতো পুড়ে। অথবা সিলভিয়া প্লাথের মতো ওভেনে মাথা ঢুকিয়ে। স্বেচ্ছামৃত্যু! জীবনানন্দ দাশ কি স্বেচ্ছামরণে মরেছিল ? আমার মগজে ফের গণ্ডগোল! ইলতুৎমিশের হাড়গোড় যদি ওভাবে ভেঙেচুরে যেত। কিন্তু কিভাবে তা সম্ভব ? ইলতুৎমিশ কখনও স্বেচ্ছামরণে যাবে না। যা   চতুর সে! তাছাড়া ঢাকা শহরে কোনও ট্রাম নাই যে দুর্ঘটনা ঘটবে। ধুর ট্রাম নাই তো কি হয়েছে ? ট্রেন তো আছে। ইলতুৎমিশ যদি ট্রেনের তলায় একদিন…!

ইলতুৎমিশের মতো ঘোঁতঘোঁতে শুয়োরকে আমি জীবনানন্দ দাশের সঙ্গে এক করে ভাবছি কেন ?

কিসের ভেতর কি ? জীবনানন্দ দাশ মহান কবি। লেখা-পড়া পাগল নির্জন মানুষ। স্ত্রী লাবণ্য দাশ তাকে যন্ত্রণার এক শেষ করেছে। কিছু না, আমি আসলে চাই ইলতুৎমিশের হাড় গুঁড়োগুঁড়ো হয়ে যাক ট্রেনের তলায় চাপা পড়ে। আর জীবনানন্দ দাশ আমার নির্জন, বিষণ্ন কবি। জীবনানন্দ দাশ বেঁচে থাকলে আমি রুদ্রকে ছেড়ে দিতাম। পাছায় লাত্থি মেরে ছেড়ে দেওয়া যাকে বলে। জীবনানন্দের সঙ্গে ঘুরতাম তাল-সুপারির বনে। আওড়াতাম-বাংলার মুখ আমি দেখিয়াছি। অথবা মাঠের ওপারে মাঠ। আকাশের ওপারে আকাশ।

এই ধুমুলদুপুরে কাকপোড়াগন্ধি বাতাস।

ইলতুৎমিশ যদি পুড়ে মরে কি বলব তাহলে ?

ইলতুৎমিশপোড়াগন্ধি বাতাস।

ইলতুৎমিশ! আমার স্বামীর নাম।

কলেমা পড়ে বিয়ে করা স্বামী!

দিল্লি গিয়ে কুতুবমিনারের আঙিনার ভেতরে আমি ইলতুৎমিশের টম্ব দেখে এসেছি। প্রায় দেড় মানুষ সমান উঁচা!

ইলতুৎমিশ মারা গেলে আমি দুই মানুষ সামন উঁচা টম্ব বানিয়ে দেব। শ্বেত পাথরে। মানুষ মারা গেলে যত্ন করে টম্ব বানান উচিত। বিস্তর টাকা পয়সা খরচ করে হলেও। যাতে তা হাজার বছর টিকে থাকে।

মোঘলরা এই বিষয়টি খুব ভালো বুঝত। ভারতবর্ষ ঘুরলে অগণন টম্ব ছাড়া তেমন আর কী দেখার আছে ? তাজমহলও তো টম্বই, নাকি ?

তাজমহল এখন কেন ঢুকল মাথায় ?

রুদ্রর সঙ্গে আমি যদি তাজমহলের ভেতর একরাত্রি ঘুমাতে পারতাম! জড়াজড়ি করে। চুম্বনাবদ্ধ হয়ে।

যদিও জানি ও একটা কুত্তার বাচ্চা।

একে-ওকে চেখে দেখে। চোখ সেঁকে। আমি আসলে বুঝি না ভিন্ন ভিন্ন দেহে গমনের মাঝে এত কি আনন্দ ? ওই তো একই যোনিকন্দর, স্তন, পাছা, শিশ্ন। নাভি, উরু, জংঘা। চিবুক, করতল। রক্ত আর মাংস। মাংস আর রক্ত! দেহ আর দেহ। দেহ ছাপিয়ে যা আমার কাছে আরাধ্য তা আকাক্সক্ষা। আকাক্সক্ষা মানে-কথা বলা, গল্পবলার আকাক্সক্ষা। নিজের আনন্দ বা বিষাদকে ঢেলে দেয়ার আকাক্সক্ষা। ইলতুৎমিশ কি এত ঢালে যোনি থেকে যোনিতে ?

রুদ্রই বা কি এত ঢালে ? বা অন্যরা ?

একজীবনে এত মানুষের দরকার কি ? এক মানুষে কি হয় না মানুষের ?

এক মানুষ-একমানুষের স্পর্শ, স্বপ্ন, আকাক্সক্ষা, বোধ, রুচি, কল্পনা, স্নেহ, প্রেম, ঘৃণা নিয়ে কি বেঁচে থাকা যায় না ?

কাকপোড়া গন্ধের ভেতর ঘুরপাক খেতে খেতেই আমি ঘরের ভেতর।

Black lake, Black boat

two black, cut paper people

where do the black tress go

that drink here ?

কালো কাকটা পুড়ে কালো  হয়ে আছে! ঘরে ফিরে যাবে না সে আর ? কাকটা কি নারী না পুরুষ ? কাক কালো। কোকিলও কালো। আর কালো কি? মানুষের জীবন। মানুষের জীবন অন্ধকারে ভরা। প্রতিক্ষণেই মানুষ কিন্তু ঢুকে পড়ছে অন্ধকার গহ্বরে। মানুষেরা তা টের পায় না। যখন সে বিলীন হয়ে যায় তখনও। মানুষের অজানা থেকে যায় এই আলোহীনতার কথা।

খাম্বার ওপরে-নিচে-চারপাশে কাক। ব্যালকনিতে কাক। ঘরের ভেতরও কাক। অগণন কাক এবং তারা ওড়াউড়ি করছে-

Black lake, black boat, black crow

পৃথিবীকে কালো করে দিয়ে সূর্য মেঘের আড়ালে ঘুমিয়ে পড়ল নাকি ?

খুব দ্রুত কাকেরা সংখ্যায় বাড়তে থাকে। সংখ্যার সঙ্গে তাদের কা-কা চিৎকারও বাড়তে থাকে।

Black lake, black boat, black crow, black hole…

ইলতুৎমিশের টম্বের পাথর সাদা না দিয়ে কালো দেব। মেহগনি কাঠের মতো কালো। আগুনের ধোঁয়ার মতো কালো। তেলাকুচের পাতার মতো কালো। রুদ্রর কি আরেকটা প্রেম হয়েছে ?

লাগামহীন যৌনতায় কি সে ওঠা-নামা করছে ?

কুত্তার বাচ্চা!

বেশুমার কাকে ভরে গেছে আমার ঘর-দোর, ব্যালকনি। তাদের চিৎকারে আমি দুই হাতে কান চাপা দিয়ে রাখি। আমার ভয় করতে থাকে। কিন্তু কাক তাড়ানোর কোনও ফন্দি আমার মাথায় আসে না। আবার দৌড়ে বাথরুমে ঢুকে দরজা বন্ধ করে দিই। ভাবি, হয়ত নিস্তার পেলাম। কিন্তু তাকিয়ে দেখি বাথরুমের শাওয়ার থেকে, কমোড থেকে অগণন কাক চিৎকার করে উড়ে আসে। আমার চারপাশে তারা বৃত্তকারে উড়তে থাকে। আমি ভয়ে চিৎকার করি। দরজা খুলে ফের ঘরে দৌড়াই। ঘরে ঢুকে ভয়ানক এক দৃশ্যে আমি প্রায় মরার মতো হয়ে যাই। খানিক আগেও যারা জীবিত ছিল তারা সবাই এখন মৃত! ড্রেসিং টেবিল, কার্বাড, বিছানা, খাটপোষ ইত্যাদি এখন মৃতদের দখলে।

আজ আমার রুদ্রর সঙ্গে দেখা করার কথা।

আমি ফের ব্যালকনিতে। কা-কা শব্দে ইলেকট্রিক খাম্বা, তার ভরে আছে। ব্যালকনির নিচে তাকালে ফের কাকদের মৃতদেহ দেখি! পালকগুলো আগুনে ঝলসান।

And I

Am the arrow

The dew that flies

Suicidal, at one with the drive

Into the red

ব্যালকনির বাতাস এখন উড়ন্ত। দুদ্দাড় ছুটে এসে আমাকে শীতল স্পর্শ দিয়ে যাচ্ছে। আমার মাথাটা আপনা আপনিই নিচে ঝুঁকতে শুরু করে। আধখোলা ব্যালকনি দিয়ে আমি অনেক দূরে নীচে তাকাই। পিচ ঢাকা রাস্তা আমাকে দুর্মর আকর্ষণ করতে থাকে …!

সচিত্রকরণ : শতাব্দী জাহিদ

Leave a Reply

Your email address will not be published.

shares