গল্প : নীল মিয়ার ঈদের চান : ধ্রুব এষ

চান দেখা যায়!

চান দেখা যায়!

পোলাপান চেল্লাচ্ছে। আগুনের লুক্কা আসমানে ছুঁড়ছে। খড় দিয়ে বানানো লুক্কা। আসমানের উঁচুতে উঠে ঝুপুত করে মাটিতে পড়ছে। নিভে যাচ্ছে।

তল্লাটের সব পোলাপান। শামসু, হিরু, মিনার, আবু, সানা, বাটুল, শনাই, মন্টু। মিছিল দিচ্ছে তারা।

চান দেখা যায়!

চান দেখা যায়!

চাঁদ দেখা গেছে, কাল ঈদ। সন্ধ্যার অন্ধকারে পোলাপানের মিছিল আনন্দমুখর করে দিচ্ছে চরাচর। তারা যখন লুক্কা ছুঁড়ছে আলোর রোশনাই ফুটছে অন্ধকার আসমানে। আনন্দের রোশনাই। কাল ঈদ।

দূরে চলে যাচ্ছে মিছিল। আগুনের লুক্কা। নীল মিয়া দেখছে। আট বছর মতো বয়স। পোলাপানের হল্লার দলে থাকতে পারত কিন্তু পোলাপান তাকে নেয় না। মিছিলে নেয় না, খেলাধুলায় নেয় না। সানা বাটুল পল্টু ছাড়া কেউ কথাও বলে না পারতে। অথচ নীল মিয়ার মনে বড় সাধ, পোলাপান তাকে দলে নিক, কথা বলুক, তামাশা করুক। আহা! নীল মিয়ার ভাইটা যদি থাকত। লাল মিয়া। নীল মিয়ার জন্মের আগে সে নিউমোনিয়া হয়ে মরেছে। নীল মিয়ারও নিউমোনিয়া হয়েছিল। বেঁচে গেছে সে। খারাপ ধরনের বিমার নিউমোনিয়া। নীল মিয়ার মা সাকিনা বলে, ‘তোর বড় ভাই লাল মিয়া তোর থেকেও ডাগরডোগর হইছিলো রে বাপ।’

নীল মিয়া হাসে আর বলে, ‘তুই মা তারে দেখছিস ?’

‘দেখব না ? তোরে দেখি না ?’

দেখে।

সাকিনা দেখে তার ছেলে নীল মিয়া বড় ভাই লাল মিয়ার মতো হয় নাই। নীল মিয়ার নাক বোঁচা। ডানহাতে লাল মিয়ার মতো আঙুল ছয়টা না, পাঁচটাই। এই ছেলে মা-মুখী হয়ে জন্মেছে। লাল মিয়া ছিল তার বাপের মতো দেখতে।

পোলাপানের দল অপসৃত হয়েছে। আগুনের লুক্কা আর আকাশে উড়ছে না। আগুনের লুক্কা মানে আগুনের গোলা। খড় দিয়ে বলের মতো বানায়। আগুন ধরিয়ে আসমানে ছুঁড়ে দেয়। পোলাপান যদি দলে নিত তবে তাদের সঙ্গে নিশ্চয় লুক্কা ছুঁড়ত সাকিনার ছেলে নীল মিয়াও। হল্লা করত। কিন্তু এ মনে হয় কোনওদিন হবে না।

‘নীল মিয়া রে। ও নীল মিয়া।’ সাকিনা ডাকল।

নীল মিয়া বলল, ‘মা।’

‘চান উঠছে বাপ ?’

‘উঠছে মা।’

‘তুই দেখছিস ?’

‘না।’

‘ক্যান গো বাপ ?’

‘তোরে নিয়া দেখব।’

‘আমি চান দেখব ?’

‘তুই মা সব দেখিস।’

সাকিনা হাসল, ‘দেখি তো বাপ।’

‘আয় দেখি।’

সাকিনা উঠল। গরীবের কুড়ে। দোরেই উঠান। কিছু নয়নতারার গাছ আর একটা আমলকী গাছ আছে। মা ছেলে উঠানে দাঁড়াল।

‘কোনদিকে চান ?’ সাকিনা বলল।

‘উইদিকে দেখ।’ নীল মিয়া বলল।

সাকিনা দেখল ? বলল, ‘কী সোন্দর!’

‘বাটুল শনাইরা আসমানে আগুনের লুক্কা ছুড়ে মারছে রে মা। মিছিল দিছে, চান উঠছে!’

‘তোরে নেয় নাই ?’

‘কোনওদিন নেয় ?’

কেন নেবে ?

লাল মিয়া নীল মিয়ার বাপ কালা মিয়া। জেলে আছে গত আট মাস। ঢুফীকোনার গেরস্থ সালামত মোল্লার ঘরে সিঁদ দিয়ে ধরা পড়েছিল। কিছু চুরি করতে পারে নাই। তাতে কী হলো ? সালামত মোল্লার মুনিষরা ধরে থানায় দিয়েছে কালা চোরাকে। সালামত মোল্লা থানায় গিয়েছিলেন। কী কলকাঠি নেড়ে দিয়েছেন, জেল হয়ে গেছে কালা চোরার। সে কবে কোনদিন ছাড়া পাবে সাকিনা জানে না, নীল মিয়া জানে না। মা ছেলে কিছুর অপেক্ষাও করে না। একঘরে হয়ে তারা থাকে তল্লাটে। সাকিনাকে কেউ কাজ দেয় না, নীল মিয়াকে কেউ দলে নেয় না। তারা কি এটা নিয়ে দুঃখিত ? না মোটে। নীল মিয়া জানে তার মা আছে, সাকিনা জানে তার ছেলে আছে। পৃথিবীর আর কিছু দরকার নাই তাদের।

পারতে ঘরে কুপি জ্বালায় না তারা। সন্ধ্যায় তো না-ই।

আমলকী গাছের তলায় উঠান অন্ধকার। একটা জোনাকি, দুইটা জোনাকি, তিনটা জোনাকি―জ্বলছে নিভছে, জ্বলছে নিভছে। ইস, দুইটা জোনাকি কি কোনোভাবে মায়ের চোখের ভেতর ঢুকে যেতে পারে না ?

সাকিনা বলল, ‘ও নীল মিয়া।’

‘বল।’

‘খড় নাই উডানে ? দেখ তো বাপ।’

‘খড় দিয়া কী করবি তুই ?’

‘ল তো বাপ। দেখি কী করি ?’

সাকিনা উঠানে বসল। খড়ের ছোট গাদা উঠানের কোনায়। কিছু খড় নিল নীল মিয়া, ‘নে।’

খড় নিয়ে কী করল সাকিনা ?

লুক্কা বানাল। গোল খড়ের বল।

‘নে বাপ। আগুন দিয়া উড়া।’

খুশি খুশি খুশি মহাখুশি নীল মিয়া। তার মায়ের মতো মা এই পৃথিবীতে নাই।

ঘর থেকে কুপি ধরিয়ে নিয়ে এল নীল মিয়া। আগুন ধরিয়ে লুক্কা ছুঁড়ে দিল আসমানে। কী সুন্দর! কী সুন্দর! আগুন উড়ছে! আগুন উড়ছে!

তবে নীল মিয়া রোগাভোগা, তার কব্জির জোর কতটুকু আর ? আগুনের লুক্কা ঝুপুত করে আবার তাদের এক টুকরো উঠানেই পড়ল। নিভে গেল।

হেমন্তের হিম পড়ে এর মধ্যে ভিজে গেছে চরাচর। তল্লাটের উত্তরে পাহাড়। সেই পাহাড় থেকে কনকনে উত্তরালী হাওয়া উড়ে আসছে, জুড়ে আসছে।

‘জার লাগে মা ?’ নীল মিয়া বলল।

‘না বাপ, চান দেখ তুই।’

‘তুইও দেখ মা।’

নীল মিয়া চাঁদ দেখে। ঈদের চাঁদ। ঈদের আগের দিনের। সাকিনা দেখে ? কী দেখে ?

জন্মান্ধ সাকিনা। চোখে দেখে না। তা না হলে কালা চোরার সঙ্গে বিয়ে হয় তার ? বাপ নাই মা নাই অন্ধ একটা মেয়েকে ঘরে নেবে কে ? কালা চোরা নিয়েছে। লাল মিয়া নীল মিয়া হয়েছে। লাল মিয়া থাকে নাই, নীল মিয়া আছে। এই ছেলেকে নিয়ে বাঁচে সাকিনা। লাল মিয়া কিরকম দেখতে ছিল বলে, চরাচর কিরকম দেখতে ছিল বলে, সারোকোনার হইলদা বিবির মোকামের মান্দার গাছ দুইটার কথা বলে। আর কদিন, গাছ দুটো ঝাঁ ঝাঁ লাল হয়ে যাবে। মান্দার ফুল ফুটবে ঝাঁপিয়ে।

‘তুই মা এত কী করে দেখিস ?’

সাকিনা হাসে, ‘দেখি না বাপ, আল্লাহপাক দেখায় কত কী!’

‘কেমনে মা ?’

এই কথার উত্তর সাকিনা দেয় না। তার জানা নাই সে কী করে দেখে! সব দেখে। ছেলে লাল মিয়াকে দেখত, ছেলে নীল মিয়াকে দেখে।

‘ঈদের চানের জার লাগে না মা ?’

সাকিনা হাসে, ‘না−আ-আ।’

নীল মিয়া বাপের সিঁদকাটি দেখেছে। সালামত মোল্লার ঘরের আওড় থেকে বাপ সিঁদকাটি সমেত ধরা পড়েছিল। সেই সিঁদকাটি এখন কোথায় ? টাউনের থানায় জমা করা আছে ? নাকি জেলে ? নীল মিয়া টাউনে গেছে দুইবার। মায়ের সঙ্গে। জেলগেটে বাপকে দেখেছে। কালা চোরা হাসিমুখে ছেলেকে বলেছে, ‘ফিরি, তোরে সিঁদকাটি ধরাব।’

মরি হায় হায় করে উঠেছিল সাকিনা, ‘ইয়া মাবুদ! ইয়া মাবুদ! এইসব কী বলেন আপনে! ইয়া মাবুদ। আমার ছেলে য্যান চোর না হয় মাবুদ!’

কালা চোরার হাসি কমে নাই, ‘তুই আন্ধা, আমি চোর। আমরার ছেলে ডাক্তার এঞ্জিনিয়ার হইব ? না কন্টেকদার ? হা-হা-হা! হা-হা-হা!’

‘হাসেন ক্যান আপনে ? ইয়া মাবুদ! ডাক্তার এঞ্জিনিয়ার কন্টেকদার চোর, আমার ছেলে কিছু হইব না।’

‘তোর ছেলে ? নীল মিয়ারে কী বলে মাইনষে, কালা চোরার পুত না আন্ধা বেটির পুত ? হ্যাঁ ? হা-হা-হা!’

বাপ ঈদ করবে জেলে। ঈদের দিন জেলে ভালো খাবার দেয়। তারা কী করবে ? নীল মিয়া আর তার জন্মান্ধ মা ?

সামান্য চালের গুড়ি সঞ্চয় করে রেখেছে সাকিনা। চালের রুটি বানাবে সকালে। আর গুড় আছে সামান্য। ঈদ হয়ে যাবে মা ছেলের।

সাকিনা বলল, ‘নীল মিয়া রে, ও নীল মিয়া ?’

নীল মিয়া বলল, ‘উঁ ?’

‘তোর এত কী চিন্তারে বাপ ? চান দেখ। তোর টুপি লুঙ্গি ধুয়ে রাখছি তো। শাটও। বিহানে ঘুম থেকে উঠে গোসল করে পাক সাফ হয়ে ঈদের নামাজ পড়তে যাবি ঈদগায়।’

আট বছর বয়সের নীল মিয়া, বড় মানুষের মতো বুঝদারির বিষাদ গলায় নিয়ে বলল, ‘আমি সিঁদকাটি ধরব রে মা।’

বুক ফেটে গেল বুঝি সাকিনার, ‘ও আল্লাহ গো! ইয়া মাবুদ! ও আল্লাহ! ও আল্লাহ! নীল মিয়ারে, ও নীল মিয়া, এইটা তুই কী বললি রে বাপ ? ও বাপ! ও বাপ! চোর হইবি তুই ?’

নীল মিয়া বলল, ‘একবার মা।’

‘একবার! কী করবি তুই ? কী করবি তুই ? ওরে আল্লাহ রে! ও আল্লাহ্!’

‘চিল্লাইস না মা! কান্দিস না, শোন।’

চুপ করে গেল সাকিনা।

নীল মিয়া বুঝি শব্দ হিসাব করে বলল, ‘আমি চান্দের ঘর সিঁদ দিব মা।’

‘চান্দের ঘরে ?’

‘হ। ঈদের চান চুরি করে আনব।’

এবার সহজ হলো সাকিনা। পাগল ছেলে তার। চাঁদ চুরি করবে। তাও ঈদের চাঁদ। কী করবে ?

চুরি করা ঈদের চাঁদ তার মায়ের চোখে লুকিয়ে রেখে দেবে নীল মিয়া। সব মানুষ, সব পোলাপান তার মায়ের চোখে ঈদের চাঁদ দেখবে। হল্লা করবে, আসমানে লুক্কা ছুঁড়বে আগুনের।

নীল মিয়া চোর হয় নাই। সিঁদকাটি নেয় নাই। কষ্টেছিস্টে লেখাপড়া শিখে বিএ পাশ করে পিটিআই ট্রেনিং নিয়ে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক হয়েছে। সব ঈদের চাঁদ এখনও তার অন্ধ মা সাকিনার চোখে দেখে সে।

সচিত্রকরণ : শতাব্দী জাহিদ

Leave a Reply

Your email address will not be published.

shares