গল্প : কালো সিংহ : বাদল সৈয়দ

মারফি কাউন্ডির মাঝরাতে ঘুম ভেঙে গেল। কোথা থেকে যেন পানি গড়িয়ে যাওয়ার শব্দ হচ্ছে। এটা হওয়ার কথা না। তাঁর বাড়িতে কোনও ফোয়ারা নেই যে মাঝরাতে পানি গড়ানোর শব্দে ঘুম ভেঙে যাবে। একবার মনে হলো, তিনি স্বপ্ন দেখছেন না তো ?  তারপর বুঝলেন জেগেই আছেন। কারণ তিনি পায়ের কাছে সাদার ওপর নীল কাজ করা কম্বল দেখতে পাচ্ছেন। স্বপ্নে কখনও রঙ ধরা দেয় না―তা হয় সাদাকালো। পানি গড়ানোর শব্দ শুনে তাঁর তৃষ্ণা পেল। তিনি বিছানার পাশে রাখা গ্লাস টেনে নিয়ে তাতে চুমুক দিলেন। স্বপ্নে পানি পান করে তৃপ্তি পাওয়ার কথা না, কিন্তু তিনি পাচ্ছেন। পানির গ্লাস রেখে তিনি বিছানা থেকে নামলেন―পানি কোথায় টুপটাপ গড়াচ্ছে তা দেখা দরকার। ভাবতে ভাবতে তিনি টয়লেটে গেলেন এবং আবিষ্কার করলেন পানির শব্দের উৎস বেসিনের কল। সম্ভবত রাতে ঘুমুতে যাওয়ার আগে তিনি তা বন্ধ করতে ভুলে গিয়েছিলেন। মারফি কাউন্ডি নিজের মনেই হাসতে হাসতে ভাবলেন, মারফি, তুমি বুড়ো হচ্ছ, এবার রিটায়ার করা উচিত।

টয়লেট থেকে বেরিয়ে তিনি বেল টিপলেন। সঙ্গে সঙ্গে দরজা খুলে ক্ষিপ্র গতি কিন্তু প্রায় নিঃশব্দে একজন  সৈনিক ঢুকল। তার ডান পা কিছুটা উঠে নিচে নামল, একই সঙ্গে ডানহাত কপালে―তবে বাম হাতে একটি উজি সাবমেশিনগান কোমর সমান উঁচুতে ধরা। বোঝাই যায় এটির সেইফটি ক্যাচ খোলা, এক মিনিটে কয়েকশ গুলি উগড়ে দেবে।

মারফি একটু গম্ভীর হয়ে বললেন, মর্নিং, সোলজার।

মর্নিং, স্যার।

তোমাকে অনেকবার বলেছি, ভেতর থেকে দরজা বন্ধ করার ব্যবস্থা করতে। ওটা খোলা রেখে ঘুমাতে আমার অস্বস্তি লাগে। এ সামান্য কাজটা হচ্ছে না কেন বুঝলাম না।

এ ব্যাপারে স্যার আপনাকে চিফের সঙ্গে কথা বলতে হবে।

মারফি কাউন্ডি দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। চিফ মানে গিনি বিসাউয়ের স্টেট সিকিউরিটি এজেন্সির প্রধান। এরাই দেশে প্রেসিডেন্টের নিরাপত্তার বিষয়টি দেখে। তিনি জানেন কথা বলে লাভ নেই। স্টেট সিকিউরিটি কখনও তাঁর রুমের দরজায় ছিটকিনি লাগাতে দেবে না। এটা সিকিউরিটি প্রটোকলে পড়ে না। দুনিয়ার কোনও রাষ্ট্রপ্রধান দরজা লাগিয়ে ঘুমাতে পারেন না। দরজা ভেতর থেকে বন্ধ থাকলে জরুরি পরিস্থিতিতে সিকিউরিটি রুমে ঢুকতে পারবে না।

মারফি কাউন্ডির মনে হলো তিনি আসলে সোনার খাঁচায় বন্দি একজন মানুষ―যার বন্ধ ঘরে একা ঘুমানোর অধিকারও নেই। তিনি কিছুটা বিরক্তি নিয়ে বললেন, কফির ব্যবস্থা করতে পার ? আজ আর ঘুম আসবে বলে মনে হয় না।

ইয়েস, স্যার―আবার খট করে বুটের আওয়াজ তুলে স্যালুট জানিয়ে সৈনিকটি বিদায় নিল। বাইরে গিয়ে সে রুম সার্ভিসকে ইন্টারকমে প্রেসিডেন্টকে কফি সার্ভ করার নির্দেশ দেবে।

মারফি কাউন্ডি জানলার কাছে গিয়ে দাঁড়ালেন। বাইরে সুনসান নীরবতার মাঝে পূর্ণ জ্যোৎস্নার আলো প্রাচীন গাছগুলোর পাতায় চিকচিক করছে; মনে হচ্ছে সবুজ বৃক্ষে কেউ দুধের বাটি উপুড় করে দিয়েছে―তফাৎ হলো দুধের রঙ ধবধবে সাদা নয়, সামান্য রুপালি। মাঝরাতে বিশাল প্রাসাদের জানালায় দাঁড়িয়ে প্রেসিডেন্ট মারফির অনেকদিন পর নোরা কাউন্ডির কথা মনে পড়ল। এ প্রাসাদ থেকে অনেক দূরে এক পাহাড়ের পায়ের কাছে নিজের গোত্রের কবরস্থানে নোরা শুয়ে আছে আজ প্রায় দশ বছর হলো। দীর্ঘশ্বাস ফেলে বৃদ্ধ রাষ্ট্রপতি ভাবছেন, তাঁর খুব ইচ্ছে ছিল স্ত্রীর কবরের পাশে তিনি একটি চমৎকার গির্জা বানিয়ে দেবেন, যার উঠানেই দাঁড়িয়ে থাকবেন মা মেরি, কিন্তু গোত্রপতিরা তাতে রাজি হননি। তাঁরা মনে করেন তাঁদের মাটি আর ছন দিয়ে তৈরি চার্চেই মাতা মেরি বেশি স্বাচ্ছন্দ্য অনুভব করেন―সুরম্য প্রাসাদে নয়। আফ্রিকার জঙ্গলে গোত্রপতিদের সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত। রাষ্ট্রপ্রধানের ইচ্ছের কোনও মূল্য সেখানে নেই। স্ত্রীর জন্য নিজের পছন্দের গির্জা বানাতে না পারার বেদনায় দীর্ঘশ্বাস ফেলে মারফি বিছানার কাছে সরে এলেন।

রুম সার্ভিস কফি নিয়ে এসেছে। তিনি মৃদু হেসে বললেন, ক্যান আই হ্যাভ সাম সুগার ?

দুঃখিত, স্যার, ডাক্তারের চিনির ব্যাপারে নিষেধ আছে।

মারফি কাউন্ডির আবার নিজেকে সোনার খাঁচায় বন্দি বাঘ মনে হলো―যার নিজের ইচ্ছেয় চিনি খাওয়ার অনুমতিও নেই। তিনি মুখ কালো করে কফির পেয়ালায় চুমুক দিলেন। জানালার ওপারে তখন হালকা বৃষ্টি নেমেছে, পূর্ণিমার আলোতে তার ফোটাগুলোকে মনে হচ্ছে মুক্তাবিন্দু।  সে বিন্দুগুলোর গা বেয়ে একটু পর আরেকটি ভোর নামবে।

কঠিন একটি ভোর।

২.

সকাল আটটা।

মারফি কাউন্ডির ডেস্কের অপরদিকের দেয়ালে চারটি টিভি স্ক্রিন। এগুলো পৃথিবীর সবচে গুরুত্বপূর্ণ চারটি নিউজ চ্যানেলের সংবাদ প্রচার করছে। প্রেসিডেন্ট তাঁর কেবিনেটের চার কোর সদস্য―প্রধানমন্ত্রী, অর্থমন্ত্রী, প্রতিরক্ষামন্ত্রী এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রীকে নিয়ে দেওয়ালে ভাসতে থাকা খবর দেখছেন। তাঁর কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম, এসির প্রচণ্ড ঠাণ্ডায়ও তিনি ঘামছেন। সবগুলো চ্যানেল দখল করে আছে একটি দেশ। যে দেশটিকে পর্তুগিজদের হাত থেকে স্বাধীন করার জন্য তিনি ঘর ছেড়েছিলেন। তাঁর চোখে ভাসছে, ১৯৭৪ সালের সেপ্টেম্বর মাসের এক উজ্জ্বল সকালের ছবি। যেদিন তিনি তাঁর ইউনিট নিয়ে স্বাধীন রাজধানী ‘বিসাউ’-এ প্রবেশ করেছিলেন। সেদিন তিনি স্বপ্নেও ভাবেননি একদিন তাঁর ছোট্ট মাতৃভূমি এভাবে দুনিয়ার সব খবরের মাথায় উঠে বসবে!

সব চ্যানেলের বিশ্লেষণ প্রায় এক। গিনি বিসাউ কি তবে সামনের দিনগুলোতে পারমাণবিক শক্তিকে নিয়ন্ত্রণ করবে ? সে ক্ষমতা কি দেশটির আছে ?  কেউ কেউ বলছে, এ শক্তির বল অপ্রত্যাশিতভাবে এমন একটি দেশের পায়ের নিচে চলে গেল, যার নিয়ন্ত্রণ নিয়ে মহাশক্তিগুলো পাগল হয়ে যাবে। কার দিকে যাবে দেশটি ? আমেরিকা ? রাশিয়া ? চীন ?

মারফি কাউন্ডি কপালের ঘাম মুছলেন। আসলে কোনদিকে যাবেন তিনি ? যেদিকেই যান কোনও সন্দেহ নেই তারা তাঁর দেশটিকে কেইক বানিয়ে তাতে ছুরি চালাবে।

গিনি বিসাউয়ের রাষ্ট্রপতি ঘামছেন কারণ দেশটির উপকূলে রাশিয়ান এক সার্ভে দল অমূল্য এক সম্পদ আবিষ্কার করেছেন।

এর নাম ইউরেনিয়াম-২৩৫। সব ইউরেনিয়ামের মধ্যে এটিই একমাত্র প্রাকৃতিক ইউরেনিয়াম, যা নিউক্লিয়ার প্ল্যান্টে সরাসরি ব্যবহার করা যায়। এত বেশি এ জিনিস অন্য কোনো দেশের মাটির নিচে নেই। সারা দুনিয়ায় এর রিজার্ভের পরিমাণ পাঁচ মিলিয়ন টন আর তাঁর মাতৃভূমি একাই এ জিনিস তিন মিলিয়ন টন নিজের জঠরে ধারণ করে আছে।

তিনি রুমাল দিয়ে কপাল মুছতে মুছতে যে আফ্রিকান কবিতাটি মনে মনে আবৃত্তি করলেন, তার বাংলা করলে দাঁড়ায় ‘জননী জন্মভূমিশ্চ স্বর্গাদপি গরীয়সী―জননী ও জন্মভূমি স্বর্গের চেয়েও শ্রেয়।’

৩.

প্রায় এক ঘণ্টা পর তাঁর কোর টিমের সদস্যদের নিয়ে নিউজ অ্যানালাইসিস দেখার পর মারফি কাউন্ডি তাঁর কেবিনেটের জরুরি মিটিং ডাকলেন। কোর টিমের সদস্যরা ছাড়া আরও তেরোজন মন্ত্রী এতে অংশ নিলেন―সঙ্গে তিন বাহিনী প্রধান, দেশের ‘ন্যাশনাল রিসোর্স অথোরিটি’-এর চেয়ারম্যানকেও ডাকা হলো। মারফি প্রথমেই রিসোর্স অথোরিটির চেয়ারম্যানকে তাঁর রিপোর্ট দিতে বললেন।

হার্ভাড-গ্র্যাজুয়েট রিসোর্স এক্সপার্টকে খুব নার্ভাস মনে হচ্ছে। খুব স্বাভাবিক, কারণ ইউরেনিয়াম-২৩৫ এর গুরুত্ব এবং এটার দখল নিয়ে যে কামড়াকামড়ি হবে তা তিনি যতটা বুঝতে পারছেন তা সামনে বসা আর কেউ পারছেন না, এমনকি সম্ভবত প্রেসিডেন্টও না। তিনি খেয়াল করলেন তাঁর হাত কাঁপছে। তা গোপন করার চেষ্টা করে তিনি বললেন, স্যার আটচল্লিশ ঘণ্টা আগে রাশিয়ান সার্ভে টিম আমাদের উপকূলে তিন মিলিয়ন টন ইউরেনিয়াম-২৩৫ এর মজুত আবিষ্কার করেছে।

মারফি হাত ঝাপটা দিয়ে বললেন, আমি সেটা জানি, চেয়ারম্যান। ক্যান ইউ মেইক ইট শর্ট ?

রিসোর্স অথোরিটির  চেয়ারম্যান আরও ঘাবড়ে গেলেন। তিনি বসে আছেন এমন এক লোকের সামনে যাকে পুরো আফ্রিকায় ‘কালো সিংহ’ ডাকা হয়―কারণ তাঁর চেয়ে সাহসী এবং ঋজু কোনও নেতা এ মুহূর্তে মহাদেশটিতে নেই। তিনি সামলে নিয়ে বললেন, আমাদের ধারণা পৃথিবীর সব পরাশক্তি তো বটেই এমনকি উদীয়মান দেশগুলোও এ সম্পদ উত্তোলনের অনুমতি চাইবে।

উত্তোলন মানে কি দখল, চেয়ারম্যান ?

ঠিক বুঝতে পারছি না, স্যার। তবে অন্য দেশে উত্তোলনের অনুমতি নিয়ে পরোক্ষভাবে দখলের ঘটনাই ঘটেছে।

তোমার লোকেরা একাজ করতে পারে না ?

সরি, স্যার, আমাদের সে সক্ষমতা নেই।

তুমি কি রাশিয়ানদের সঙ্গে একমত ? আসলেই কি এটা ২৩৫ গ্রেড ইউরেনিয়াম ?

জি, স্যার, আমরা তাদের রিপোর্ট পাওয়ার পর ল্যাবে স্যাম্পল টেস্ট করেছি।

থ্যাংকিউ, তুমি এখন যেতে পার।

ধন্যবাদ, স্যার।

গড ব্লেস ইউ।

রিসোর্স চেয়ারম্যান চলে যাওয়ার পর মারফি তাঁর পররাষ্ট্রমন্ত্রীর দিকে তাকালেন, তোমার কাছে কোনও খবর আছে ?

স্যার, ইউএস, রাশিয়া, চিন এবং ফ্রান্সের রাষ্ট্রদূতেরা আপনার সাক্ষাৎ চেয়েছেন। আমরা জানিয়েছি আপনার সিডিউল দেখে জানাব।

তারা কী চায় ?

পররাষ্ট্রমন্ত্রী একটু বিব্রত কণ্ঠে বললেন, সম্ভবত মাইনিং লাইসেন্স, স্যার।

কী আশ্চর্য! আমার দেশটা তো দেখি রাতারাতি মৌচাকে পরিণত হয়েছে। ঝাঁকে ঝাঁকে মৌমাছির ভিড়! মারফি কাউন্ডি রাগ লুকাতে পারছেন না।

পররাষ্ট্রমন্ত্রী আরও বিব্রত কণ্ঠে বললেন, আই অ্যাম সরি, স্যার।

ওদের কাল সকাল থেকে দুপুরে সময় দাও। একজন দেখুক আরেকজন এসেছে এবং আমরা সবার কথা শুনছি―কিন্তু কাকে আমাদের কাঁধে হাত রাখতে দেব তা আমাদের নিজস্ব সিদ্ধান্ত। তারপর তিনি প্রধানমন্ত্রীর দিকে তাকিয়ে বললেন, ডিয়ার, প্রাইম মিনিস্টার, তুমি কিছু বলবে না ?

প্রধানমন্ত্রী গম্ভীর কণ্ঠে বললেন, আপনি জানেন আমি ক্ষুদ্র ‘সোসো’ নৃগোষ্ঠীর সদস্য। অতি ক্ষুদ্র হলেও আমরা কখনও কোনও যুদ্ধে হারিনি। কারণ আমরা আমাদের তিরের থলে কাউকে ধার দিই না। ধনুকসহ তা আমাদের কাঁধেই থাকে। আমার মনে হয়, নতুন খনিটি অতি মূল্যবান তিরের থলে―এটি আর কাউকে বইতে দেওয়া ঠিক হবে না।

ডিয়ার প্রাইম মিনিস্টার, কিন্তু এ থলে বইবার ক্ষমতা আমাদের যে নেই।

সেক্ষেত্রে আমাদের একটি উপায় বের করতে হবে, যাতে তিরের থলে কারও হাতে দিলেও ধনুক যাতে আমাদের হাতে থাকে।

সে উপায়টি কী ?

সেটা আপনি ঠিক করার কথা।

মারফি কাউন্ডি খেয়াল করলেন প্রধানমন্ত্রী অন্যদিনের মতো তাঁকে ‘মিস্টার প্রেসিডেন্ট’ বলে ডাকছেন না। অন্যরা তাঁকে স্যার ডাকলেও তিনিই শুধু তাঁকে মিস্টার প্রেসিডেন্ট ডাকেন। তাছাড়া তাঁর কথায় উদ্ধত ভাব। তঁাঁরা দুজন অনেক পুরানো কমরেড। একসাথে গিনিয়ান ম্যানগ্রোভে স্বাধীনতার জন্য যুদ্ধ করেছেন। তবে কি কোথাও কোনও পরিবর্তন হচ্ছে ? হতেও পারে। মানুষ যে কখন বদলে যায় তা কেউ জানে না। বিশেষ করে হীরার চেয়ে বেশি দামি সম্পদ পায়ের নিচে আবিষ্কৃত হলে খুব দ্রুত বদলে যাওয়াই স্বাভাবিক। এখন সবাইকে কেনার চেষ্টা করা হবে। চেনা বন্ধু হয়ে যাবে অচেনা।

দীর্ঘশ্বাস ফেলে কাউন্ডি ভাবলেন, তাঁর সিকিউরিটি চিফ জেনারেল মোম্বাকে বলতে হবে প্রধানমন্ত্রীসহ সব মন্ত্রীদের উপর নজর রাখতে। জেনারেল মোম্বা প্রফেশনাল―তিনি ঠিকভাবেই কাজ করবেন বলে তাঁর বিশ্বাস। চিন্তাটি নিজের অতলে লুকিয়ে রেখে কাউন্ডি বললেন, জেন্টেলম্যান, উই আর ইন ক্রাইসিস। ইউরেনিয়াম পাওয়াটা আমাদের জন্য যেমন আনন্দের একই সঙ্গে মুসিবতও বটে। এই জিনিস নিউক্লিয়ার রিসার্চকে একশ বছর এগিয়ে দেবে। তাই এর দখল নিয়ে কাড়াকাড়ি হবে কোনও সন্দেহ নেই। সরি টু সে, আমাদের অবস্থা হয়েছে আদি আফ্রিকান সুন্দরী রমণীদের মতো। সে কাকে বিয়ে করবে সে ব্যাপারে তার মতের কোনও মূল্য ছিল না― জোর যার তার ঘরেই তাকে যেতে হতো। জেন্টেলম্যান, আমি কিন্তু এ ব্যাপারটি ঘটতে দেব না। আমরা আমাদের তিরের থলে অন্যকে হয়ত বইতে দেব, কিন্তু ধনুক থাকবে আমাদের হাতে―যাতে তা আমাদের দিকে ছুড়তে না পারে। এনি সাজেশন ?

এমন সময় টেবিলের এককোনা থেকে অর্থমন্ত্রী বললেন, স্যার, আমরা কিন্তু আমাদের পূর্বপুরুষদের প্রবাদ ভুলে যাচ্ছি, তাহলো, পরামর্শের জন্য কোমর বাঁকা হয়ে মাথা হাঁটু ছুঁয়েছে এমন মানুষের কাছে যাও। আমরা কেন আমাদের বহুদর্শী গোত্রপতিদের কাছে যাচ্ছি না ?

ওই বুড়োরা সূর্যের আলোই ঠিকমতো দেখেনি, জঙ্গল থেকে বেরিয়ে ওরা কী উপদেশ দেবে ? প্রধানমন্ত্রী প্রায় খেঁকিয়ে উঠলেন।

স্যার, ওই জঙ্গলে বসেই তাঁরা তাঁদের রাজত্ব চালাচ্ছেন শত বছর ধরে, কখনও কোনও সমস্যা হয়নি। আমার ধারণা আমাদের শাসকেরা তাঁদের বুদ্ধি নিলে এদেশটিকে শত বছর পর্তুগিজদের পায়ের নিচে থাকতে হতো না।

প্রধানমন্ত্রী আবার কিছু বলতে চাইছিলেন, প্রেসিডেন্ট মারফি তাঁকে থামিয়ে দিলেন, ডিয়ার প্রাইম মিনিস্টার, আমি ফিনান্সের সাথে একমত। আমাদের এ মুহূর্তে গোত্রপতিদের সাহায্য দরকার। তাঁরা হয়ত খনিটির গুরুত্ব বুঝবেন না, তবে এধরনের সমস্যায় কী করতে হয় তা তাঁরা ভালোই বোঝেন বলে আমার ধারণা। তাছাড়া সম্ভবত আমরা কঠিন একটি সমস্যার মধ্যে পড়তে যাচ্ছি, তাঁদের উপস্থিতি জাতীয় ঐক্যের জন্যও দরকার। আমি চাই কাল বিকেলে তাঁদের আমন্ত্রণ জানানো হোক। মাইন্ড ইট ফ্রেন্ডস, উই শ্যাল নট এলাউ দিস কান্ট্রি টু বি এ কেইক। এদেশকে আমরা অন্যের প্লেটের কেইক হতে দেব না। আমি ডিফেন্সকে নির্দেশ দিচ্ছি, রেড অ্যালার্ট জারি করা হোক। আমাদের সৈন্যরা আকারে ছোট, কম দক্ষ, কিন্তু তাঁরা এটা বিশ্বাস করে, আমাদের জঙ্গলের মতো সবুজ জঙ্গল আর দ্বিতীয়টি নেই। এখন সময় এসেছে এ জঙ্গলের জন্য  প্রাণ দেওয়ার। টেল দেম টু বি রেডি টু ডাই। প্রতিরক্ষামন্ত্রী উঠে দাঁড়িয়ে ডান হাতে মাথায় পরা ক্যাপ ছুঁলেন।

প্রেসিডেন্ট উঠে দাঁড়িয়ে বললেন, মিটিং ইজ ওভার, জেন্টেলমেন, আমরা খুব শিগগির আবার বসব।

৪.

মন্ত্রিপরিষদের মিটিং শেষ হওয়ার পরপরই জেনারেল মোম্বা রুমে ঢুকলেন। প্রেসিডেন্ট মারফি কাউন্ডি প্রশ্ন নিয়ে তাঁর সিকিউরিটি চিফের দিকে তাকালেন। জেনারেলের মনে হলো সে দৃষ্টিতে গভীর বেদনা। কালো সিংহের চোখের তারায় এ বেদনা মানাচ্ছে না।

তিনি নম্র কণ্ঠে বললেন, স্যার, আর্মি চিফ এসেছেন, আপনার সাথে দেখা করতে চান।

অ্যানি ফারদার ইমার্জেন্সি, জেনারেল ?

সেটা চিফ আপনাকেই বলবেন, স্যার।

ঠিক আছে, ব্রিং হিম।

ভেতরে ঢুকে আর্মি চিফ তাঁর সর্বাধিনায়ককে সামরিক কায়দায় সালাম জানালেন। গিনি বিসাউ ছোট্ট দেশ হলেও এর সেনাবাহিনীর নেতৃত্ব দিচ্ছেন আমেরিকান নেভি সিলে প্রশিক্ষণ পাওয়া একজন জেনারেল। তিনিই একমাত্র বিদেশি সৈনিক যিনি নেভি সিলের ‘মেডেল অব অনার’ পেয়েছেন। ট্রেনিংয়ের সময় একটি গাড়িতে আগুন ধরে গেলে নিজে অগ্নিদগ্ধ হয়ে বাকি সাতজন  সৈনিকের প্রাণ বাঁচানোর জন্য তাঁকে এ পদক দেওয়া হয়। বাহিনীটি ১৯৬২ সালে প্রতিষ্ঠার পর মাত্র আটজন এ সম্মান পেয়েছেন এবং জেনারেল ডোবা হচ্ছেন এ লিস্টের অষ্টম ও শেষ  সৈনিক।

মারফি তাঁর আর্মি চিফের দিকে ভ্রু কুঁচকে তাকালেন। জেনারেলের মুখের বামপাশে পোড়া দাগ। প্রেসিডেন্ট জানেন ইউনিফর্মের নিচেও জেনারেলের প্রায় পুরো শরীর নেভি সিলের অগ্নিকাণ্ডের সাক্ষ্য বহন করছে।

জেনারেল মৃদু কণ্ঠে বললেন, স্যার, উত্তর সীমান্তে সেনেগাল  সৈন্য সমাবেশ করছে।

হোয়াট! মারফি কাউন্ডির ঠোঁট থেকে বিস্ময় ছিটকে বেরিয়ে এলো। হোয়াই দেম ? ওরা কেন ? তারা কি আমাদের উপকূলের দখল নিতে চায় ?

আমি ঠিক জানি না। আমাদের হেডকোয়ার্টার থেকে এর ব্যাখ্যা জানতে চাওয়া হয়েছিল। ওরা জবাব দেয়নি। আমাদের বর্ডার গার্ড ফ্ল্যাগ মিটিংয়ের অনুরোধ করেছিল, তারও জবাব পাওয়া যায়নি।

আমি কি আমার বিখ্যাত আর্মি চিফের উপর নির্ভর করতে পারি ?

তিনি মারা না যাওয়া পর্যন্ত পারেন স্যার। তবে সামরিক বিশ্লেষণ বলছে, যুদ্ধের বারো ঘণ্টার মধ্যে আপনার সেনাপ্রধান নিহত হবেন। কারণ এর মধ্যে সেনেগাল রাজধানী দখল করে নেবে এবং আমাকে হত্যা না করে সেটা সম্ভব নয়। তারপর কী হবে জানি না। আই অ্যাম, সরি স্যার আমাদের সেনাবাহিনী খুব ছোটো। মাত্র চার হাজার সদস্য এবং তারা সবাই তাদের চিফের মতো নেভি সিলের ট্রেইনিং পায়নি; কিন্তু সেনেগালের আর্মিকে গত কয়েক বছর ধরে আমেরিকা ও ফ্রান্স প্রশিক্ষণ এবং অস্ত্র দিয়ে সাহায্য করেছে।

কিন্তু দেশটি তো সামরিক অভিযানে কখনওই আগ্রহী ছিল না, বরং আফ্রিকার অন্যান্য দেশে তারা সামরিক দ্বন্দ্ব মেটাতে সাহায্য করেছে―প্রেসিডেন্ট কাউন্ডির কণ্ঠে বিস্মিত প্রশ্ন।

জেনারেল ডোবা বড় শ্বাস ফেলে বললেন, মাটির নিচে তিন মিলিয়ন টন ইউরেনিয়াম―২৩৫ শুয়ে থাকলে অনেক হিসেবনিকেশ বদলে যায়, স্যার। তবে আমার ধারণা সেনেগাল নিজের জন্য নয় অন্য কারও পক্ষে কাজটি করছে।

কোন পক্ষ ? মারফি কাউন্ডির কণ্ঠে অস্থিরতা।

আমাদের ইন্টেলিজেন্স বলছে, চীন। আগে দেশটি আমেরিকার দিকে হেলে থাকলেও বাণিজ্য দিয়ে এশিয়ান জায়ান্ট তাদের নিজের দিকে গোত্তা খাইয়েছে। ভালোমতোই খাইয়েছে। চিন সেনেগালের দ্বিতীয় বৃহত্তম বিজনেস পার্টনার এবং খুব তাড়াতাড়ি এক নম্বর হবে।

গুড! মারফির কথায় শ্লেষ। হাজার বছরের প্রতিবেশী ভাই ছুরি ধরেছে কেবল বাণিজ্য সুবিধার জন্য!

আপনি ইতিহাস আমার চেয়ে অনেক বেশি জানেন, এক্সেলেন্সি। এ ধরনের আচরণ এর আগেও অনেকবার ঘটেছে।

তা চীন আসছে সেনেগালের কাঁধে ভর করে, আমেরিকা কোনদিক দিয়ে আসবে, জেনারেল ?

আমার ধারণা সেনেগাল মুভ করলে আমাদের পশ্চিম সীমান্তে আটলান্টিক মহাসাগরে আমেরিকান ফ্লিটগুলো বসে থাকবে না।

গুড, ভেরি গুড, রাশিয়ানরা কোনদিক থেকে মধুর চাকে কামড় দেবে ?

সম্ভবত তারা দক্ষিণ-পূর্ব দিকে গিনি সরকারকে ব্যবহার করবে। সেখানে আগে থেকেই রাশান সামরিক উপদেষ্টারা কাজ করছে।

চমৎকার! সব শকুনই তো দেখি আমার মাংস খাওয়ার জন্য  তৈরি, তা আমার চিফ কী করবে ? মারফি কাউন্ডির কথায় তীব্র আক্ষেপ।

আমার চার হাজার  সৈন্য তাদের পরিবার থেকে বিদায় নেবে স্যার, কারণ সম্ভবত কয়েকদিন পর তারা কেউ বেঁচে থাকবে না।

আই উইশ আই কুড জয়েন ইউ, সন।

মানসিকভাবে আপনি অবশ্যই আমাদের সঙ্গে থাকবেন, স্যার। আমার সৈন্যরা প্রথম গুলিটি ছুড়বে তাদের সর্বাধিনায়কের নির্দেশ পাওয়ার পর।

গড ব্লেস ইউ, জেনারেল।

আই অ্যাম ব্লেসড, স্যার।

৫.

আর্মি চিফ চলে যাওয়ার পরপরই আবার কেবিনেট সদস্যদের ডেকে আনা হলো। তাঁদের কেউ কেউ আগের মিটিং শেষ করে নিজের অফিসেও পৌঁছাতে পারেননি, তার আগেই আবার ডাক এসে হাজির। সবাইকে সেনেগালের সামরিক তৎপরতা সম্পর্কে জানানো হলো; একই সঙ্গে অন্য কোনদিক থেকে সমস্যা হতে পারে সে ব্যাপারে আর্মি চিফের আশংকার কথাও বলা হলো।

প্রেসিডেন্টের বক্তব্য শেষ হওয়ার পর পুরো রুমে পিনপতন নিস্তব্ধতা নেমে এলো। কেউ কথা বলছেন না। বলার মতো কিছু আসলে পাচ্ছেন না।

বেশ কিছুক্ষণ পর মারফি কাউন্ডি নিজেই নিস্তব্ধতা ভাঙলেন, আমাদের ফরেন অফিস কী বলে ?

পররাষ্ট্রমন্ত্রী বললেন, আমি সেনেগালের রাষ্ট্রদূতকে ডেকে পাঠাচ্ছি, স্যার, তবে তাতে কাজ হবে কিনা জানি না।

ডিফেন্স ?

প্রতিরক্ষামন্ত্রীর কণ্ঠে হতাশা, তিতা সত্য হচ্ছে, আমাদের ডিফেন্স সেনেগাল বা গিনিকে একদিনের বেশি ঠেকিয়ে রাখতে পারবে না। তাদের মিলিটারি পাওয়ার এমনিতেই আমাদের চেয়ে ভালো, তার উপর বিদেশিরা সাথে থাকলে ওরা অপ্রতিরোধ্য হয়ে উঠবে। আমি মনে করি, সামরিক নয়, কূটনীতি দিয়েই আমাদের এ সমস্যা মোকাবিলা করতে হবে।

কূটনীতি ? মারফির কণ্ঠে হতাশা―শকুনদের খেপিয়ে আমাদের পক্ষে কে দাঁড়াবে বলো ? একমাত্র ‘মাদিবা’ বেঁচে থাকলে তাঁর উপর নির্ভর করতে পারতাম। তিনি পাশে দাঁড়ালে কারও সাহস হতো না আমাদের গায়ে হাত দেওয়ার।

সবাই মাথা নিচু করে হতাশা লুকাচ্ছেন। আসলেই এধরনের পরিস্থিতিতে নেলসন ম্যান্ডেলাই ছিলেন একমাত্র ভরসা, কিন্তু প্রিয় ‘মাদিবা’ সবাইকে অভিভাবকহীন করে কয়েক বছর আগে চলে গেছেন।

কোনও সিদ্ধান্ত ছাড়াই মিটিং শেষ হলো। তবে সবাইকে বলা হলো রাজধানী ছেড়ে না যেতে, যাতে দরকার হলেই ডাকা যায়। বিশেষ করে সশস্ত্র বাহিনীকে নির্দেশ দেওয়া হলো সর্বোচ্চ সতর্কাবস্থায় থাকতে।

৬.

কেবিনেট মিটিং শেষ হওয়ার পর মারফি কাউন্ডি সিকিউরিটি চিফ জেনারেল মোম্বার সঙ্গে একান্তে বসলেন।

জেনারেল, আমাদের প্রাইম মিনিস্টার সম্পর্কে তোমার কোনো অবজারভেশন আছে ?

আছে, স্যার। সম্ভবত তিনি উচ্চাভিলাষী হয়ে উঠছেন।

আমরা পাশাপাশি যুদ্ধ করেছি, জেনারেল।

একই নৌকার কমরেডদের অবস্থান পাল্টানো নতুন কিছু নয়, স্যার।

তোমার অবজারভেশনের যুক্তি ?

আমার কাজই হলো অবর্জাভ্ করা এবং ইন্টেলিজেন্স এ অবজারভেশন সমর্থন করে।

আমি চাই তুমি ওর প্রতি নজরদারি বাড়াও।

অবশ্যই, তবে আমার পরামর্শ হলো আপনি ইমার্জেন্সি দেখিয়ে তাঁকে পেসিডেন্ট প্রাসাদেই অবস্থান করতে বলুন। বলবেন সিদ্ধান্ত গ্রহণের জন্য তাঁর সার্বক্ষণিক উপস্থিতি দরকার―তাহলে নিজের লোকজনের সঙ্গে তিনি যোগাযোগ করতে পারবেন না।

ভেবে দেখব। এরপর বলো, আর্মি চিফের ব্যাপারে তোমার অ্যানালাইসিস কী ?

আমাদের আশেপাশেই অনেক চিফ তাঁদের প্রেসিডেন্টের দিকে বন্দুক ঘুরিয়েছেন।

জেনারেল ডোবাও কি তা করতে পারে ?

স্যার, আপনার চেয়ারটা বিষাক্ত এবং তা যে কাউকে বিষাক্ত করে তুলতে পারে।

তার ব্যাপারে কী করবে ?

চিফকে এ ক্রাইসিসে আপনার প্রাসাদে আটকে রাখা যাবে না। আমি যেটা করব, তাহলো তাঁর দেহরক্ষী ইউনিটে আমার ‘অ্যাসেট’ এক্টিভেট করব।

ও মাই গড! আর্মি চিফের গার্ডদের মধ্যে তোমার লোক আছে ?

এটি স্টেট সিকিউরিটির অংশ, স্যার।

থ্যাংকিউ, মাই বয়।

আই অ্যাম অবলাইজড, ইয়োর এক্সেলেন্সি।

৭.

মারফি কাউন্ডি যখন জেনারেল মোম্বার সাথে মিটিং করছেন, ঠিক তখন আশরাফ হাসান বাংলাদেশে এক সপ্তাহের ছুটি কাটিয়ে নিউইয়র্কের জেএফকে বিমানবন্দরে নামলেন। প্রতি বছর এসময়টায় তিনি দেশে ছুটি কাটাতে যান। দীর্ঘ ভ্রমণে মাঝবয়সী ভদ্রলোককে বেশ ক্লান্ত মনে হচ্ছে।

৮.

পরদিন আমেরিকা, রাশিয়া, চীন এবং ফ্রান্সের রাষ্ট্রদূতেরা মারফি কাউন্ডির সঙ্গে দেখা করলে প্রথম এলেন মার্কিন দূত। ছ’ফুটের উপর লম্বা আমেরিকান পরম শ্রদ্ধায় কালো মানুষটির দিকে বাউ করে বললেন, গুড মর্নিং, ইয়োর এক্সেসেলেন্সি।

সেইম টু ইউ, মিস্টার এম্বাসেডার।

প্রেসিডেন্ট মরগান আপনাকে শুভেচ্ছা জানিয়েছেন।

আমার শুভেচ্ছাও তাঁকে পৌঁছে দেবেন।

অবশ্যই, এক্সসেলেন্সি।

আপনি কি দয়া করে সরাসরি কাজের কথায় আসবেন, এম্বাসেডার ? আমার সময় কম।

ওয়াশিংটনের দূত একটু বিব্রত হলেও অবাক হলেন না, তিনি জানেন টেবিলের ওপারের মানুষটি কী পরিমাণ চাপের মধ্যে আছেন।

সিউর, ইয়োর এক্সেলেন্সি। আমার সরকার আপনার দেশে অত্যন্ত মূল্যবান সম্পদ আবিষ্কৃত হওয়ায় অভিনন্দন জানিয়েছে। দয়া করে আমার ব্যক্তিগত অভিনন্দনও গ্রহণ করুন।

ধন্যবাদ। প্লিজ কাট ইট শর্ট।

সরি, এক্সেসেলেন্সি। আমরা চাই গিনি বিসাউয়ের সবধরনের স্বার্থরক্ষা করে ইউরেনিয়াম উত্তোলনের পার্টনার হতে।

আপনাদের আগ্রহের জন্য অনেক ধন্যবাদ। এগুলো মাটির নিচে থেকে এনে কাজে লাগাতে আমাদের সাহায্য লাগবে। তবে আপনাদের সাথে ডিলে যাওয়ার আগে আমার অন্যান্য দেশের সঙ্গে আপনারা কী ধরনের চুক্তি করেছেন তা দেখতে হবে।

আমি সেসব পাঠিয়ে দেব, এক্সসেলেন্সি।

অন্য দেশ কী প্রস্তাব দেয় তাও আমাদের দেখতে হবে এম্বাসেডার।

সেটার কী প্রয়োজন আছে, স্যার ? আমি গ্যারান্টি দিচ্ছি, আমাদের চাইতে ভালো প্রস্তাব কেউ দেবে না।

লেট মি চেক―এখন যদি আমাকে ক্ষমা করেন।

অবশ্যই এক্সেসেলেন্সি, আমি জানি আপনি খুব ব্যস্ত। তবে দয়া করে আমাদের ব্যাপারটি বিবেচনা করলে আমার সরকার খুশি হবে।

লেট মি চেক।

সিউর, স্যার।

বাই, এম্বাসেডার।

চীন এবং ফ্রান্সের দূতদের সাথেও মারফির প্রায় একই কথা হলো। শুধু রাশিয়ান রাষ্ট্রদূত বললেন, আমরাই ওই খনি আবিষ্কার করেছি। মাইনিং লাইসেন্স দেওয়ার সময় ব্যাপারটা বিবেচনা করলে কৃতার্থ হব, এক্সেসেলেন্সি।

মারফি মৃদু হেসে বললেন, অবশ্যই রাশিয়ার প্রতি আমরা কৃতজ্ঞ, তবে। একাজের জন্য আপনাদের পে করা হয়েছে এবং সার্ভে করার চুক্তিতে মাইনিং লাইসেন্স আপনাদের দেওয়ার কথা ছিল না।

তারপরও আমাদের প্রায়োরিটি পাওয়ার অধিকার আছে, স্যার।

পয়সা না নিলে থাকত, এখন নেই।

আপনি রাশিয়ার কথা বিবেচনা করলে আমার দেশ আপনার স্বার্থ সবচে বেশি দেখবে।

আমার নয়, আমার দেশের স্বার্থ। ওকে, লেট মি চেক। নাউ ইফ ইউ ডোন্ট মাইন্ড―

সিউর, এক্সেসেলেন্সি, বাই ফর নাও।

বাই, এম্বাসেডার, গুড ডে।

৯.

বিকেলে দূর-দূরান্ত থেকে বিভিন্ন গোত্রপতিরা এসে পৌঁছালেন। গিনি বিসাউয়ে প্রায় পনেরটি ছোট-বড় গোত্রের বাস। এদের সবার নেতারাই প্রেসিডেন্টের ডাকে সাড়া দিয়েছেন। সন্ধ্যার পর তাঁদের সঙ্গে মারফি কাউন্ডি মিলিত হলেন।

এ সভাটি রাষ্ট্রপতি ভবনের কনফারেন্স রুমে হচ্ছে না। এটি হচ্ছে লিভিং রুমে। কারণ জঙ্গলের প্রাচীন বৃদ্ধরা চেয়ার―টেবিলে বসে মিটিং করতে অভ্যস্ত নন। হাজার বছর ধরে আফ্রিকায় গোত্রনেতারা মাটিতে গোল হয়ে বসে সলাপরামর্শ করে সব সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। তাই লিভিং রুমের কার্পেট সরিয়ে চাটাই বিছিয়ে তাঁদের জন্য সেরকম ব্যবস্থাই করা হলো।

দীর্ঘ সভায় যখন কোনও সিদ্ধান্তে আসা যাচ্ছে না, তখন সবচে ছোট গোত্র ‘নালু’ সম্প্রদায়ের প্রায় শতবর্ষী নেতা ফোকলা দাঁতের ফাঁকে বাতাস ছেড়ে বললেন, ‘মোষের পাল’―

প্রেসিডেন্ট মারফি তাঁর দেশের সর্বোচ্চ সম্মানসূচক সম্বোধন করে বললেন, জ্ঞানী বৃক্ষ, আপনার কথা বুঝতে পারছি না―দয়া করে বুঝিয়ে বলবেন ?

বৃদ্ধ ‘নালু’ নেতা ফ্যাসফ্যাস করে বললেন, জঙ্গলে আমরা মোষ শিকার কীভাবে করি তা তুমি ভুলে গেছ। শহরের বিষাক্ত বাতাস এর জন্য দায়ী। তোমার উচিত জঙ্গলের হাওয়ায় ফিরে যাওয়া। আমরা যখন বুনোমোষ শিকার করি, তখন কী করি ? তির দিয়ে প্রথমে পালের একটি মোষকে আহত করি। তারপর চুপচাপ অপেক্ষা করি। শরীরে বিদ্ধ তির নিয়ে তীব্র ব্যথায় আহত মোষ খেপে গিয়ে আর কিছু করতে না পেরে পালের অন্য মোষদের আক্রমণ করে। ব্যস, লেগে যায় ধুন্ধুমার কাণ্ড। পুরো পালে মারামারি ছড়িয়ে পড়ে। মোষেরা নিজেরাই নিজেদের আহত করে। এভাবে তারা যখন দূর্বল হয়ে যায় তখন আমরা তাদের ধরে আনি।

প্রেসিডেন্ট মারফি কাউন্ডা গভীর শ্রদ্ধা নিয়ে জ্ঞানীবৃক্ষের দিকে তাকিয়ে আছেন। তিনি সমস্যা সমাধানের আলো দেখতে পাচ্ছেন।

১০.

সে রাতেই প্রেসিডেন্ট জাতির উদ্দেশ্যে ভাষণ দিলেন। তাতে তিনি ঘোষণা করলেন, গিনি বিসাউয়ে আবিষ্কৃত খনি থেকে ইউরেনিয়াম উত্তোলনের অনুমতি কোনো একক দেশকে দেওয়া হবে না। এর জন্য আন্তর্জাতিক টেন্ডার আহবান করা হবে এবং তাতে সবচে সুবিধাজনক প্রস্তাব দানকারী চারটি দেশের যৌথ কনসোর্টিয়ামকে এ দায়িত্ব দেওয়া হবে। টেন্ডারের ব্যবস্থাপনা হবে জাতিসংঘের তত্ত্বাবধানে। তিনি একই সাথে জাতিসংঘকে এ ব্যাপারে সাহায্যের অনুরোধ জানালেন।

মারফি কাউন্ডি আসলে তাঁর দেশের দিকে ওত পেতে থাকা মোষের দলের মধ্যে লড়াই লাগিয়ে দিয়েছেন। এরা নিজেদের স্বার্থেই একে অন্যকে গিনি বিসাউয়ের ক্ষতি করতে দেবে না। তবে প্রাচীন আফ্রিকান মোষ শিকারের সঙ্গে এখানে একটি পার্থক্য আছে―তাহলো আফ্রিকায় মোষ শিকারে রেফারি থাকে না, কিন্তু কাউন্ডির  ‘জাতিসংঘ’ নামের রেফারি আছে।

১১.

আশরাফ হাসান নিউইয়র্কের ম্যানহাটানে ফোর সিজন হোটেলের রেস্টুরেন্টে একটি বিশেষ দিন উদযাপন করছেন। আজ ম্যারিনার জন্মদিন। জাতিসংঘের একজন আন্ডার সেক্রেটারি জেনারেল তাঁর ব্যক্তিগত সহকারীর জন্মদিনে ফোর সিজনে পার্টি দেবেন, ব্যাপারটি স্বাভাবিক নয়; কিন্তু আশরাফ হাসানের কাছে ম্যারিনা কেবল একজন সহকারী নয়, তিনি তাকে কন্যা জ্ঞান করেন। সেরকম স্নেহই করেন। ম্যারিনা অবশ্য বুঝতে পারে তাকে দেখলেই ভদ্রলোকের গভীর অতলে এক ধরনের বুদবুদ তৈরি হয়। গভীর বেদনার বুদবুদ। ভদ্রলোক জানেন না কেন তাঁর একমাত্র মেয়ে মলি কর্নেল বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় কায়ুগা লেইকে ডুব দিয়ে আত্মহত্যা করেছিল। কী দুঃখ ছিল মা-হারা মেয়েটি যা সে বাবাকে বলতে পারেনি ? প্রথম যেদিন ম্যারিনা তাঁর অফিসে জয়েন করল, সেদিন তিনি চমকে উঠেছিলেন, কী আশ্চর্য মিল মলির সাথে মেয়েটির! গায়ের রঙ বাদ দিলে এমনকি চুল বাঁধার ভঙিটিও এক, মলির মতো হাসলে একই রকম টোল পড়ে বাম গালে। তাঁর ভেতরটা কেঁপে উঠেছিল―মনে হয়েছিল, তবে কি পরম করুণাময় তাঁর তীব্র বেদনা সইতে না পেরে মলিকেই অন্যরূপে ফেরত দিয়েছেন ?

ম্যারিনা অবশ্য বয়স্ক মানুষটির বেদনা এবং মায়ার মূল্য রেখেছে। আশরাফ হাসানের প্রতিদিনের ব্লাড সুগারের চার্টও তার মুখস্থ। কখন যে সে তাঁকে নিজের অজান্তে ‘পাপা’ ডাকা শুরু করেছে সে নিজেও জানে না। যতবার ‘পাপা’ ডাকে ততবার তার চোখ ভিজে আসে, নিজের বাবাকে সে কখনও দেখেনি। তার জন্মের আগেই তিনি তার মাকে পরিত্যাগ করে নিরুদ্দেশ হয়েছিলেন।

আগে থেকে রিজার্ভ করা টেবিলে আশরাফ হাসান যখন আঙুরের লাল রসের গ্লাস ঠুকে ম্যারিনাকে টোস্ট করতে যাবেন, ঠিক তখন বৃষ্টি নামল। বিশাল কাচের জানালা দিয়ে সোডিয়াম লাইটের আলোয় বৃষ্টির ফোটাগুলোকে মনে হচ্ছে সোনালি চাদর। সেদিকে তাকিয়ে ম্যারিনা বলল, পাপা, কী সুন্দর তাই না ?

আশরাফ হাসান হাত ঝাপটা দিয়ে বললেন, আমার দেশের বৃষ্টির পায়ের নখের সৌন্দর্যও নিউইয়র্কের বৃষ্টির নেই।

তোমার কি বাংলাদেশের সবকিছুকেই সেরা মনে হয় পাপা ?―ম্যারিনার কণ্ঠে কৌতুক।

হয় এবং সেটাই সত্যি। একমাত্র ফাইনান্সিয়াল ম্যানেজমেন্ট ছাড়া বাংলাদেশের সবকিছুই আমার কাছে সেরা মনে হয়।

যাই বলো পাপা, আমার কিন্তু তোমার দেশের অনেক কিছুই সেরা মনে হয়নি। ও মাই গড! হরিবল ট্রাফিক―

সে ট্রাফিকে জীবনের যে ছন্দ আছে তা কি এখানে আছে, সুইট হার্ট ?

ম্যারিনা হাল ছেড়ে দেওয়ার ভঙ্গিতে বলল, না, তোমার সাথে অন্তত এ ব্যাপারে কথা বলে লাভ নেই।

আসলেই লাভ নেই, সুইটি, আর মাত্র দুবছর―তারপর রিটায়ার করে আমি দেশে ফিরে যাব। একদম নিজের পাড়ায়। নিজের মাটিতে হাঁটার আনন্দই আলাদা।

 দ্যাটস গ্রেট―আমি ছুটি পেলেই তোমার পাড়ায় চলে যাব।

সেকি! তুমি  না বললে আমার দেশ হরিবল!

পাপা না থাকলে হরিবল, থাকলে মধুর একটি জায়গা, হাহাহাহা।

আশরাফ হাসান হাত বাড়িয়ে সামনে বসা মেয়েটির গাল ছুঁলেন। সে স্পর্শে গভীর মমতা। এমন সময় তাঁর ফোন বেজে উঠল। তিনি সেদিকে তাকিয়ে অবাক হয়ে বললেন, ও গড! সেক্রেটারি জেনারেল। ওনার তো জানার কথা আমি ছুটিতে আছি―বলতে বলতে তিনি উঠে গিয়ে একটু দূরে নিরিবিলিতে গিয়ে দাঁড়ালেন, যাতে ওপারের কণ্ঠ পরিষ্কার শোনা যায়।

ইভিনিং, আশরাফ।

ইভিনিং, মিস্টার সেক্রেটারি।

তুমি কোথায় ?

ফোর সিজনে, ডিনারে আছি।

প্লিজ ক্যান্সেল ইট অ্যান্ড মিট মি। ইট’স ইমার্জেন্সি।

স্যার―

প্লিজ ডু কাম। ইট’স অ্যা ক্রাইসিস।

ওকে স্যার।

ওপারে লাইন কেটে দেওয়া হলো।

আশরাফ হাসান মন খারাপ করে ম্যারিনার কাছে ফিরে এলেন। তার মাথায় হাত রেখে বললেন, সরি, ডার্লিং, সেক্রেটারি জেনারেল ডেকেছেন। আমাকে যেতে হবে, আই অ্যাম ভেরি সরি।

অ্যানি ইমার্জেন্সি, পাপা ?

মহাসচিব তাই বললেন, আমি যাই। তুমি ডিনার শেষ করো। এনজয় ইয়োরসেলফ, সুইটি।

না, আমিও যাচ্ছি, একা খেতে ভালো লাগবে না। তাছাড়া বাড়িতে কিছু কাজ জমে আছে―ম্যারিনার কণ্ঠে হতাশা।

আশরাফ মেয়েটির মাথায় আবার হাত রাখলেন। এমনিতে এ প্রাচ্যীয় রীতি ম্যারিনার পছন্দ নয়, কিন্তু এ মানুষটি মাথায় হাত রাখলে তার ভালো লাগে, খুব ভালো লাগে।

১২.

সেদিন রাত দশটায় জাতিসংঘের মহাসচিব একটি বিবৃতি দিলেন। তাতে বলা হলো, গিনি বিসাউয়ে ইউরেনিয়ামের যে মজুদ পাওয়া গেছে তাতে সে দেশটির পূর্ণ অধিকার আছে। এটি নিয়ে যে অস্থিরতা দেখা দিয়েছে তা কাম্য নয় এবং এর কারণে বিশ্ব শান্তি বিঘ্নিত হতে পারে। তাই দেশটির সরকারের অনুরোধমতো জাতিসংঘ খনি থেকে ইউরেনিয়াম উত্তোলনের আন্তর্জাতিক টেন্ডারে পর্যবেক্ষক হিসেবে কাজ করবে এবং একটি আন্তর্জাতিক কনসোর্টিয়াম যাতে কাজটি করে তা নিশ্চিত করার চেষ্টা করবে। সংস্থাটি মনে করে এতে সব পক্ষের স্বার্থ রক্ষা হবে। এব্যাপারে মধ্যস্থতা করার জন্য আন্ডার সেক্রেটারি জেনারেল আশরাফ হাসানকে বিশেষ দূত নিয়োগ করা হয়েছে। তিনি দুয়েকদিনের মধ্যে গিনি বিসাউ এবং অন্যান্য আগ্রহী সরকারের সাথে আলোচনায় বসবেন।

বিবৃতিটি প্রচারের পর আশরাফ হাসান প্রথম ফোন পেলেন আমেরিকায় বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত ওয়াহিদ হোসেনের কাছ থেকে। তাঁরা একসাথে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়েছেন। ওপার থেকে ওয়াহিদ হোসেনের উল্লসিত কণ্ঠ ভেসে এল, দোস্ত, কনগ্রাটস, ইট’স অ্যা অনার, গ্রেট অনার।

আশরাফ হাসতে হাসতে বললেন, বাট টাফ জব, দোস্ত। সবদিক সামলাতে পারব কিনা জানি না।

ওয়াহিদ সাহেব বেশ সিরিয়াস কণ্ঠে বললেন, ‘ইউএন’-এর কেউ যদি এর সমাধান করতে পারে, সে হলো একমাত্র তুমি। কলম্বিয়ায় ফার্ক গেরিলাদের সাথে সরকারের শান্তি চুক্তিও তুমিই করাতে পেরেছিলে।

আশরাফ হাসান, বললেন, দোয়া করো, এবারও যেন পারি। বুঝতেই পারছ, গিনি বিসাউয়ের কালো সিংহ আমার একমাত্র সমস্যা নয়, আসল সমস্যা অন্য জায়গায়―

ওয়াহিদ হোসেন ঝানু ডিপ্লোম্যাট। তিনি বুঝে নিলেন তাঁর বন্ধু কী বলতে চাইছেন। তাই কথা না বাড়িয়ে তিনি বললেন, শুধু আমি না, পুরো বাংলাদেশ তোমার সাথে আছে, দোস্ত।

ধন্যবাদ, বন্ধু, এখন রাখি, ফিরে এসে আড্ডা মারা যাবে। ফোন রেখে আশরাফ অনুভব করলেন, তাঁর বুক ধরফর করছে। প্রতিটি কঠিন অ্যাসাইনমেন্টে তাঁর এরকম হয়।

পরের ফোনটি করেছে ম্যারিনা। তাঁক খুব উত্তেজিত মনে হচ্ছে, সে হাঁপাতে হাঁপাতে বলল, পাপা, এ মুহূর্তে সবচে আলোচিত সেলিব্রিটি কে জানো ?

আশরাফ হাসান হাসতে হাসতে বললেন, আমি তো মুভি দেখি না, গানও তেমন শোনা হয় না―

ম্যারিনা প্রায় ধমক দিয়ে বলল, টিভি খোলো, দেখ হলিউডের কেউ নয়, এ মুহূর্তে তুমি হচ্ছো সব ব্রেকিং নিউজের সেলিব্রিটি।

আশরাফ হাহা করে আবার হেসে বললেন, সেলিব্রিটি হতে ভালোই লাগে ডার্লিং, কিন্তু টিভি দেখার সময় আমার নেই। সেক্রেটারি জেনারেলের সাথে দেখা করতে যাচ্ছি। কাল শার্প সকাল সাতটায় অফিসে চলে এসো। অনেক গুছানোর ব্যাপার আছে।

ওকে, পাপা।

লভ ইউ, ডটার।

লভ ইউ, পাপা।

রাত এগারোটায় সেক্রেটারি জেনারেলের সঙ্গে আশরাফ হাসান আবার বসলেন। কাল দুপুরেই তাঁর ফ্লাইট। তাই রাতেই ব্রিফিং নিতে হবে।

সেক্রেটারি জেনারেলকে খুব ক্লান্ত মনে হচ্ছে, চোখ টকটকে লাল, চুল এলোমেলো, টাইয়ের নট ঢিলে করা। তাঁরা প্রায় এক ঘণ্টা একান্তে কথা বললেন।

বৈঠক শেষে ওঠার সময় সেক্রেটারি জেনারেল বললেন, আই কাউন্ট অন ইউ, ফ্রেন্ড। এ মুহূর্তে তোমার চেয়ে ভালো নেগোশিয়েটর আর কেউ নেই। আশা করি, সব পক্ষ মেনে নেবে এমন একটি সমাধান তুমি বের করবে।

আমি চেষ্টা করব।

গুড লাক। ভালো কথা, আমরা জানি ‘কালো সিংহ’ দামি কোনও উপহার নেন না, তবে তুমি তাঁর জন্য এক বাক্স ডার্ক চকোলেট নিয়ে যেতে পারো। তিনি এই জিনিস খুব পছন্দ করেন।

১৩.

আশরাফ হাসানকে বহনকারী জাতিসংঘের বিশেষ বিমানটি গিনি বিসাউয়ের ‘অসাভাল্ডো’ এয়ারপোর্টে  পৌঁছালো পরদিন রাত দশটায়। এর আগে পথিমধ্যে তিনি জেনেভায় আমেরিকা, চীন, রাশিয়া এবং ফ্রান্সের প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠক করে তাঁদের অবস্থান জেনেছেন। বিমানবন্দর থেকে সেদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী তাঁকে সরাসরি রাষ্ট্রপতি ভবনে নিয়ে গেলেন।

মারফি কাউন্ডিকে দেখে আশরাফের মনে হলো, তিনি বিশাল এক টাওয়ারের নিচে দাঁড়িয়ে আছেন, যেখানে নিজেকে খুব ক্ষুদ্র মনে হয়। মন থেকে উঠে আসা শ্রদ্ধা নিয়ে তিনি বললেন, গুড ইভিনিং, ইয়োর এক্সেসেলেন্সি। আমাকে সময় দেওয়ার জন্য  জাতিসংঘের পক্ষ থেকে আমি গভীর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি।

মারফি হাসলেন, আমিও কৃতজ্ঞ। জাতিসংঘ দায়িত্বটি নিয়েছে এবং আপনাকে পাঠিয়েছে। তারপর তিনি পাশে দাঁড়ানো প্রধানমন্ত্রীর সাথে পরিচয় করিয়ে দিয়ে বললেন, মিট মাই প্রাইম মিনিস্টার জোফা পেপাল।

ইভিনিং, মিস্টার প্রাইম মিনিস্টার―আশরাফ হাত বাড়ালেন।

এবার কি আমরা আলোচনা শুরু করতে পারি, ডিয়ার আন্ডার সেক্রেটারি ? মারফি জিজ্ঞেস করলেন।

অবশ্যই এক্সেসেলেন্সি, তার আগে ছোট্ট একটি উপহার দেওয়ার অনুমতি চাইছি।

প্রেসিডেন্টের ভ্রু কুঁচকে উঠল, নিয়ম অনুযায়ী আমি একশ ডলারের বেশি দামের উপহার নিতে পারি না।

এটি একটি চকোলেটের বাক্স, দাম মাত্র পঞ্চাশ ডলার।

দ্যাট’স গ্রেট―মারফি হাত বাড়িয়ে বাক্সটি নিলেন। পুরনো অভ্যাসবশত তাকিয়ে দেখলেন বাক্সের গায়ে সিকিউরিটি চিফ জেনারেল মোম্বার সিল আছে কিনা ? আছে। তার মানে চকোলেট নিরাপদ, এতে বিষ মিশ্রিত নেই।

আলোচনা শুরুর মিনিট দুয়েকের মধ্যে ‘ক্লিক’ করে একটি শব্দ হলো। সবাই থমকে গিয়ে শব্দের উৎস খুঁজছেন। প্রধানমন্ত্রী জোফা বহুদর্শী গেরিলা যোদ্ধা। তিনিই সবার আগে ব্যাপারটি বুঝলেন এবং সজোরে ধাক্কা দিয়ে প্রেসিডেন্ট মারফিকে সরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করলেন, কিন্তু পারলেন না। তার আগেই চকোলেটের বাক্সটি প্রচণ্ড শব্দে বিস্ফোরিত হলো। মুহূর্তের মধ্যে আফ্রিকার কালো সিংহ এবং রুমে উপস্থিত সবার শরীর টুকরো টুকরো হয়ে বাতাসে ভেসে বেড়াতে লাগলো। পরে একটি খণ্ডিত কব্জিতে আটকে থাকা ঘড়ি দেখে বোঝা যাবে হাতটি ছিল আশরাফ হাসানের। তাঁর বায়ান্নতম জন্মদিনে ম্যারিনা এটি উপহার দিয়েছিল। বিশেষভাবে অর্ডার করা ঘড়িটির সাদা ডায়ালে লেখা ‘মাই পাপা, মাই হিরো’। কী আশ্চর্য! এত বড় বিস্ফোরণেও ঘড়িটি টিকে আছে!

ওয়্যারলেসে খবরটি পাওয়া মাত্র সেনেগাল সীমান্তে অবস্থানরত সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল ডোবা রাজধানীর দিকে রওনা দিলেন।

১৪.

রৌদ্রোজ্জ্বল দিনেও একতলা বাড়িটিতে আলো ঢোকে না বললেই চলে―কারণ বিশাল বিশাল পুরনো গাছ এটিকে ঘিরে আছে। তিনি জানালা দিয়ে বৃক্ষরাজির আড়ালে লুকিয়ে থাকা রোদের ছটা দেখছেন। এমন সময় নিঃশব্দে এক লোক রুমে ঢুকল। তিনি জানালা থেকে মুখ না ফিরিয়েই বললেন, অ্যানি আপডেট ?

জি, স্যার। প্রেসিডেন্ট মারফি কাউন্ডি হত্যার সঙ্গে জড়িত সন্দেহে একদল বিদ্রোহী সৈনিক জেনারেল ডোবাকে রাজধানীর প্রবেশমুখে হত্যা করেছে।

গুড, ভেরি গুড, এবার তাহলে জেনারেল মোম্বাকে চেহারা দেখাতে বলো। আমাদের প্লেটে ওই খনি তুলে দেওয়ার বদলে গিনি বিসাউয়ের সিকিউরিটি চিফ দেশটির সিংহাসন পেতেই পারে।

জি, স্যার। একটু পর তিনি টেলিভিশনে ভাষণ দিয়ে দেশে সামরিক শাসন জারি করবেন। মারফি কাউন্ডির আন্তর্জাতিক টেন্ডারও বাতিল ঘোষণা করা হবে। একই সাথে তিনি তাঁর দেশ রক্ষায় পুরানো বন্ধু হিসেবে আমাদের সামরিক সাহায্য চাইবেন।

পুওর ব্ল্যাক লায়ন! তিনি কীভাবে ভাবলেন তাঁর ইন্টারন্যাশনাল টেন্ডারের প্রস্তাব আমরা মেনে নেব ? পাগল নাকি! তা, আমাদের সৈন্যরা কখন রওনা দেবে ?

ওরা রওনা দিয়ে দিয়েছে। আশা করছি জেনারেল মোম্বার ভাষণ শেষ হওয়ার ঘণ্টা তিনেকের মধ্যে বিসাউয়ে পৌঁছাবে।

জাতিসংঘের রিয়্যাকশন কী ?

আন্ডার সেক্রেটারির মৃত্যুতে ওরা হতভম্ব। তবে তাঁর চকোলেটের বাক্সে যে বোমা লুকানো ছিল তা তারা বুঝতে পারেনি। জেনারেল মোম্বা ব্যাপারটি ভালোভাবেই সামাল দিয়েছেন―বলেছেন মারফি কাউন্ডির এডিসির আত্মঘাতী হামলায় সবাই নিহত হয়েছেন। অবশ্য এডিসি সত্যি সত্যি মারা গেছে, সে তখন প্রেসিডেন্টের পেছনেই দাঁড়ানো ছিল।

এক্সেসেলেন্ট! শুধু ছোটো দুটো কাজ বাকি।

 সেগুলো কী, স্যার ?

আমাদের এক্সপ্লোসিভ এক্সপার্টের নামে একটা বিশেষ প্রশংসাপত্র ইস্যু করো। সে বোমাটিকে এমনভাবে ‘বিশেষ চকোলেট’ দিয়ে মুড়ে দিয়েছে যে, কোনও এয়ারপোর্টের স্ক্যানার তা ধরতে পারেনি। ওর কোড নেইম ‘টর্নেডো’।  তুমি কি বুঝতে পারছ আমি কার কথা বলছি ?

বুঝতে পারছি। টর্নেডোর নামে চিঠি ইস্যু করা হবে, স্যার। অন্য কাজটি কী ?

ম্যারিনাকে এজেন্সির ‘মেডেল অব অনার’ দেওয়ার ব্যবস্থা করো। আশরাফ হাসানের চকোলেটের বাক্স বদলে বোমা গছিয়ে দিয়ে এ মেডেল সে অর্জন করেছে। তবে ট্র্যাজেডি হচ্ছে, এ গোপন পদকের কথা আমাদের এজেন্টরা এমনকি তাদের পরিবারকেও বলতে পারে না। একবার হাতে নিয়েই মেডেলটি আবার এজেন্সিকে বুঝিয়ে দিতে হয়, তারপর তা তারা চোখেও দেখে না। সেটি আমাদের সেইফ ভল্টে বাকি জীবন পড়ে থাকে। পিটি, ভেরি পিটি।

১৫.

সপ্তাহখানেক পর আশরাফ হাসানের শরীরের একমাত্র চিহ্নিত অংশ,খণ্ডিত কব্জিটি যখন দেশে এসে পৌঁছাল তখন বিমানবন্দর সড়ক লোকে লোকারণ্য। সবাই এসেছেন একজন জাতীয় বীরকে বরণ করার জন্য। এরা অনেকেই অপরিচিত মানুষটির জন্য কাঁদছেন। এদের মধ্যে এক যুবকের কাঁধে চেপে একটি তিন/চার বছরের মেয়েও এসেছে। ভাগ্যিস সে বাবার কাঁধে বসেছিল, তাই তিনি যে নিঃশব্দে কাঁদছেন তা বুঝতে পারছে না।

বাচ্চারা বাবার কান্না সইতে পারে না।

সচিত্রকরণ : শতাব্দী জাহিদ

Leave a Reply

Your email address will not be published.

shares