গল্প : তারা মাস্টার : রাজকুমার শেখ

তারা মাস্টার একা বসে ছিল বাঁশের মাচানটার ওপর। আজ তার  পকানও কাজ নেই। বাড়ি থেকে বের হবার সময় ওর বউ বলেছিল, বাজার করতে।

কিন্তু তার কাছে  পকানও টাকা পয়সা নেই বলে বাজার করা হয়নি। বেশ কয়েক দিন হলো গ্রামে সে ফেরি করে করতে যেতে পারেনি। তার প্রধান কাজই হলো গ্রামে গ্রামে ফেরি করা। ফেরি না করলে সে খেতে পাবে না। সংসার চলা দায় হয়ে পড়বে। যা আয় হয় তার চেয়ে খরচ বেশি। সামান্য আয়টুকু দিয়ে সংসারটাকে সে ঠিক মতো আগলে রাখতে পারে না। কোথাও না কোথাও দিয়ে ঠিক কান্না বেরিয়ে আসবে। খিদে এসে মোচড় দেবে পেটে। যা সে সহ্য করতে পারে না।

আজ তার মনটা ভালো নেই। তেমন কাজ না হলে তার মন ভালোও থাকে না। তারা মাস্টার খোলা মাঠের দিকে তাকিয়ে আছে একদৃষ্টিতে। যতদূর চোখ যায় ততদূর অবধি শূন্য মাঠ খাঁ খাঁ  করছে। সবুজের  কানও চিহ্ন নেই। চাষিরা ধান তুলে নিয়েছে ঘরে। শীত এলে তবেই রবি ফসলের সময় হবে শুরু। তখন গোটা মাঠ সবুজে ভরে যাবে। মাঠ নয় যেন গর্ভবতী-মেয়ে। বড়ই ইচ্ছে করে আদর করতে।

সেই সময় তারা মাস্টারও ব্যস্ত হয়ে পড়ে। শীত মানে তার যাত্রাপালার ডাক পড়ে। তখন তারা মাস্টারকে গ্রামগঞ্জের মানুষেরা বেশি মান্য করে। তার কদর বাড়ে। তখন ফেরিওয়ালা নয়।

তখন তার মনে হয় সত্যিই সে বাংলার ছোটে নবাব। তার মতো ভরাট গলায় অভিনয় কেউ করতে পারে না।  যখন ও মঞ্চে অভিনয় করে তখন গমগম করে কালো রাত। কেঁপে ওঠে গ্রাম। মনে হয় সত্যিই যেন পলাশি প্রান্তে সে যুদ্ধ করছে। ইংরেজরা ভয়ে পালাচ্ছে দেশ ছেড়ে। গ্রামের মানুষ তার অভিনয় দেখে মুগ্ধ হয়ে যায়। পলাশির যুদ্ধের সেই ক্ষত তারা মাস্টার ভুলতে পারে না। বুকের মধ্যে জেগে ওঠে পলাশি প্রান্তর। যেন যুদ্ধটা এখনও চলছে। থামবে না কোনওদিন!

যাত্রা শেষে মানুষজন এসে তারা মাস্টারকে বুকে জড়িয়ে ধরে। তারা মাস্টারের দুচোখে জল চলে আসে। মন কেমন যেন উতলা হয়ে যায়। বুকের ভেতর কেমন মোচড় দিয়ে ওঠে। মানুষ তাকে বাহবা দেয়।

সে যখন কোনও গ্রামে ফেরি করতে যায় তখন গ্রামের বুড়ো ও ছেলে ছোকরারা ওকে ঘিরে ধরে বলে, তারা চাচা, একবার বলো না সেই যাত্রা পালার সংলাপটা। তুমি সত্যিই এই বাংলার ছোটে নবাব।

এ কথা শুনে তারা মাস্টার কিছুতেই ওদের এড়িয়ে চলে আসতে পারে না। বাধ্য হয়ে তাকে বলতে হয় সিরাজ উদ্ দৌলার সংলাপ।

সত্যি, তাকেই একমাত্র মানায় ছোট নবাব। কিন্তু এতে তো তার পেট চলে না। গ্রামে গ্রামে যাত্রাপালা হয় যখন তখন তাদের যাত্রাদলটা বেশ ব্যস্ত থাকে। যদিও সব গ্রামে তাদের ডাক আসে না। শহর থেকে যাত্রাদল আসে। যে টুকু ডাক পায় তাতেই সে দুটো পয়সার মুখ দেখে। উপহারও পায় সে। মুঠো ভরে টাকা এনে দেয় তার বউকে। বউ বেশ খুশি হয়। আর পয়সা কমে এলেই কথা শুনতে হয় তাকে। তখন তারা মাস্টার কে ? আর ছোটে নবাবই বা কে ? তখন শুধুই তারা।

তারা মাস্টারের গম্ভীর গলা কেমন চুপসে আসে। মুখ দিয়ে কথা বের হয় না। বউ রাগী গলায় কত কীই বলে। চুপ করে সে শুনে। আজ সকাল হতেই তাকে কত কীই শুনিয়েছে। সে একবারও  রা করেনি। রা করলেই  ঝগড়া বেধে যেত। আর এটা সে চায় না।

ওর মন খারাপ করে বসে থাকা দেখতে পেয়ে হারুমিয়া ওকে জিজ্ঞেস করে, কি―গো―তারা, মন খারাপ বুঝি ?

তারা মাস্টার একটু সময় নেয় হারুমিয়ার কথার উত্তর দিতে। কেমন ফ্যাল ফ্যাল  করে তাকিয়ে থাকে ওর দিকে। হারুমিয়া এসে বসে ওর পাশে।

নরম করে জিজ্ঞেস করে, কাজ নেই বুঝি ? ফেরি করতে যাচ্ছ না ? পালার সময় তো এখনও অনেক দেরি। শীত না এলে তো পালাগান হবে না। আর দিনকে দিন এ সবের চল উঠে যাচ্ছে। মানুষ এ সবের আর কদর করে না। সময় বদলে যাচ্ছে তারা মাস্টার। ছোটে নবাবদের আর যুগ নেই গো! মানুষ এসব আর চায় না। তুমি অন্য কিছু করো। সংসারের হাল না ধরলে সব ভেসে যাবে তারা মাস্টার।

হারু মিয়ার কথা শুনে তারা মাস্টার কেমন কেঁপে ওঠে। সত্যিই যদি এসব বন্ধ হয়ে যায় তাহলে সে ভেসে যাবে। জীবন ধারণের সংকট দেখা দেবে। মানুষ তো তাকে চেয়েছে এতদিন। তার অভিনয়ে মুগ্ধ হয়েছে গ্রাম গঞ্জ। তাকে ছোট নবাব বলে অনেকে ডাকে। মানুষের মনে সে বসে আছে এতকাল! তাই বলে―! কেমন সে ভেতর ভেতর ঘেমে ওঠে। তার নিঃশ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে। যেন সে হেরে যাচ্ছে। তার চারপাশে ফাঁদ পাতা হচ্ছে। এবার হয়ত সে ধরা পড়ে যাবে। তার রক্তে এখন পলাশির যুদ্ধের ঢেউ। যেন আছড়ে পড়বে এই বাংলার বুকে। সিরাজ পারেনি সে পারবে। কাঁপিয়ে দেবে বাংলা। সে এ যুদ্ধে হেরে যাবে না। তারা মাস্টার বাঁশের মাচান ছেড়ে উঠে দাঁড়ায়। তারপর হনহনিয়ে হাঁটতে থাকে।

দুই

রাত অনেক হলো। আকাশের বুকচিরে তারা দেখা যাচ্ছে। যুগ-যুগ ধরে এরা জ্বলছে। সেও তো জ্বলছে জন্ম হবার পর থেকেই। তাদের জীবনে সেভাবে কোনও আলোই নেমে আসেনি। তার বাপ মুক্লেশ মিয়া কত কষ্ট করেছেন। সংসারটার সব ভার নিয়ে চলতে চলতে একদিন ক্ষতম হয়ে গেল। সংসারটা ভেসে গেল। তারা তখন ছোট। ওর মা লোকের বাড়িতে কাজ করে ওকে মানুষ করেছে। মাও একদিন চলে গেল। তারা একা হয়ে গেল। সেই ছোটবেলায় আকাশে যেখানে তারাটি দেখেছিল আজও একই জায়গায় স্থির হয়ে আছে। অথচ তারারও  বয়স হচ্ছে। সেও নুইয়ে পড়ছে একটু একটু করে। ওর কোনও সন্তানাদি নেই। হয়তো বউটার কোনও দোষ থেকে থাকবে। বা তারও নিজের দোষ হতে পারে। সে কখনও ডাক্তার দেখায়নি। শুধু মেতে থেকেছে যাত্রাপালা নিয়ে। দূর দূর গ্রামে চলে যেত অভিনয় করতে। তারার তখন নামডাক হয়েছে। কিন্তু সেটা নামমাত্র। অভিনয় দিয়ে পেট চলে না। রাত জেগে অভিনয় করার পর আবার সকালে উঠে তাকে গাঁয়ে ফেরি করতে যেতে হয়। সে বড় কষ্টের কাজ। তবু তাকে করতে হয়। তা না হলে উনানে হাঁড়ি  চাপবে না। অভিনয় করে কিছু পায়। তাতে সংসার চলে না। প্রতিদিন এক নতুন যুদ্ধ। যুদ্ধ তার নিজের সঙ্গেও। সে যুদ্ধ যেন আদি অনন্তকাল হতে চলে আসছে। যেন থামবে না। সে যখন সিরাজের পাঠ করে তখন মনে হয় তার চারপাশে সব বেইমান ঘিরে ধরেছে। তাকে যে কোনও মুহূর্তে বধ করবে। সে তো একা পারবে না। সত্যি কি এদেশ বদলেছে ? ও ভেবে পায় না।

রাত বাড়তে থাকে। দূরে কোথায় যেন একটা শেয়াল ডেকে উঠল হুক্কা―হুয়া- হুক্কা―হুয়া করে।

অনেক রাতে চাঁদটা উঠল। ড্যাব ড্যাব করে তারা মাস্টারের দিকে কেমন এক প্রশ্ন নিয়ে তাকিয়ে আছে চাঁদটা। কতদিন সে ভালো করে চাঁদ দেখেনি। চাঁদের আলোতে তার মন পুড়ে যাচ্ছে। তার এ জীবনে কত কীই করার সাধ ছিল। কিন্তু সে বিন্দুমাত্র পূরণ করতে পারেনি। এ সংসারে শুধুই সে অভিনয় করে গেল। তার জীবন থেকে তরতর করে সময়গুলো চলে গেছে। এখন সে ক্লান্ত। অনেক যুদ্ধের জয় সে দেখেছে। কিন্তু নিজে হেরে গেছে জীবন সংসারে। এই রাতের মতোই সে একা।

তিন

গত কয়েক দিন রাতে তার ভালো ঘুম হয়নি। বেশ কয়েক দিন হল পত পত করে উত্তরের হাওয়া বইছে। তার মানে শীত দোরগোড়ায় এসে গেল। আর শীত আসা মানে তার ডাক আসবে যাত্রাপালার জন্য। এবারে তার শরীর তেমন ভালো নেই। বয়স হচ্ছে। এখন সে জমিয়ে অভিনয় করতে পারে না। যেন সে চিরক্লান্ত। এই গ্রাম বাংলা কত বাহবা দিয়েছে। কত হাততালি কুড়িয়েছে। আর আজ!

না―সে আর অভিনয় করতে পারবে না। উত্তরের হাওয়া বইলেও আজ তার মনে আনন্দ আসছে না। কেমন এক ক্লান্ত চোখে সে তাকিয়ে থাকে।

কবে থেকে যে তারা থেকে তারা মাস্টার হয়েছিল তা আজ আর মনে নেই। কত সব মধুর স্মৃতি আজ ওকে পীড়া দিচ্ছে। বেশ কয়েকদিন সে গ্রামে ফেরি করতে যেতে পারেনি। সংসার চলছে না তার। অথচ তেমন কেউ আর তার বাড়ি আসে না খোঁজ নিতে। বড় একা হয়ে গেছে তারা মাস্টার। মনে মনে সে যেন বিচলিত। সকালের রোদটা কেমন ফ্যাকাশে। উঠোন ফাঁকা। ওর বউ কোথায় গেছে কে জানে। হয়ত কারও বাড়িতে গেছে চাল ধার করতে। গত কাল হতে উনানে হাঁড়ি চাপেনি।

তারা মাস্টারের বড়ই খিদে পেয়েছে। কিন্তু সে মুখে কিছু বলতে পারছে না। তার কথা যেন সব ফুরিয়ে গেছে। এমন সময় হঠাৎ কে যেন ডাকে, ছোটে নবাব, উঠবে না ? এসো যুদ্ধ-যুদ্ধ খেলি। যুদ্ধ যে এখনও বাকি!

তারা মাস্টার চোখ মেলে চায়। দেখছে তার বাড়ির উঠোনে সার সার ইংরেজ সেপাই দাঁড়িয়ে। সে ভুল দেখছে না তো ? তারা মাস্টার কোনও রকমে উঠে দাঁড়ায়। না―সে হার মানবে না। পলাশির যুদ্ধের পতাকা তারই উড়বে। তারা মাস্টার ঝাঁপিয়ে পড়ে ইংরেজ সেপাইদের ওপর। তারা মাস্টার টাল সামলাতে না পেরে উঠোনে পড়ে যায়। মুখ দিয়ে লালা ঝরে পড়ে। সে কি যেন বলতে চায়। সে বলতে পারে না। এই মাটি তাকে আশ্রয় দিল। শুয়ে থাকল আর এক ছোটে নবাব। বাংলার ঘরে ঘরে তারা মাস্টার মরেও বেঁচে থাকল।

সচিত্রকরণ : কাব্য কারিম

Leave a Reply

Your email address will not be published.

shares