গল্প : শোকগাথা : আফসানা বেগম

তার সঙ্গে আমার শেষ দেখা বাহাত্তর সালের অক্টোবরে। একাত্তরের মতো দীর্ঘমেয়াদি বর্ষাকাল ছিল না সেবার। সেপ্টেম্বর শেষ হতে না হতেই আকাশ পরিষ্কার, চারদিকে শীত শীত গন্ধ। বাড়ির পেছনে যতদূর চোখ যায় চাষের জমি। সেদিকটায় প্রতি বর্ষায় দিগন্তবিস্তৃত স্রোতের মেলা, অন্যসময়ে ফসলে সবুজ। সদ্য যুদ্ধ-সমাপ্ত লণ্ডভণ্ড দেশটায় তখনও আয়োজন করে ফসল বোনা হয়নি। তাই ফসলের বদলে ঝোপঝাড় আর কাশফুলের সমুদ্র তখন। বাতাসে পলকা অথচ বেজায় লম্বা কাশগাছগুলোকে এলোমেলো নাড়াতো। ঢেউয়ের পরে আরও বড় ঢেউ আসত। ঘরের কাজকর্ম হয়ে গেলে, নির্জন দুপুরে জানালার শিকে মাথা ঠেকিয়ে রানি একভাবে সেদিকে তাকিয়ে থাকত। কাশগাছের মতো তার চুলগুলোতেও বাতাসে ঢেউ খেলত। ওই ঘরে কেউ ঢুকলেই চমকে শাড়ির আঁচল টেনে বসত। হেসে বলতাম, ও রানি, তোর দেখি চমকানোর রোগটা আর গেল না!

কথা বলতে বলতে কখন আমি বাহাত্তরের শীতের আভাস লাগা দিনগুলোতে চলে গেছি, জানি না। জোরে শ্বাস নিই, আজকাল দীর্ঘ কথা বলতে গেলে হাঁপাই। শরীরের শক্তি ক্রমশ ফুরিয়ে আসছে, টের পাই। এর মধ্যে আমার বয়সি কিংবা সামান্য ছোট-বড় আত্মীয় বন্ধুরা একাধারে মারা গেল; কেউ করোনায়, কেউ হৃদ্রোগে। এই সমস্ত মৃত্যুর ন্যূনতম প্রভাব এড়াতে পারি না। মনে হয়, বেঁচে আছি শুধু প্রিয়জনদের মৃত্যু দেখব বলে। প্রায় প্রতি সপ্তাহেই শোক বার্তা লিখি। মৃতের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে তার সঙ্গে কাটানো দিনের স্মৃতিচারণ করি। পত্রিকাওয়ালারা আমাকে প্রতি মৃত্যুর পরে লিখতে অনুরোধ করে। কেউ চাপ দেয়, কেউ বিনয়ী গলায় বলে, আপনি উনার কাছের মানুষ, কিছু না লিখলে কীভাবে চলে! প্রায় প্রতি সপ্তাহে নিজের লেখা থেকে পিছিয়ে পড়ি। একেকটা শোকগাথা লেখার পরের দিন দুয়েক স্মৃতির মধ্যে ডুবে থাকি। আরেকটি প্রিয়জন-বিয়োগ না ঘটা পর্যন্ত একটা ঘোরে থাকি। পরবর্তী মৃত্যুর পর ঢুকে যাই অন্য ঘোরে। আজ আরেক ঘোরের খবর নিয়ে এল রেবা―মুক্তা মারা গেছে। তিয়াত্তর সাল পর্যন্ত মুক্তা পুনর্বাসন কেন্দ্রে ছিল। সেই হিসেবে আমার আপনজন। মুক্তা আর রানি, দুজনকে আমি একইসঙ্গে উদ্ধার করেছিলাম নারায়ণগঞ্জের রেপ ক্যাম্প থেকে।

মুক্তার মৃত্যু মুক্তাকেই মনে করিয়ে দেওয়ার কথা। মুক্তার হাসি … আমি বলতাম, কে রেখেছিল নাম তোমার ? হাসিতে মুক্তো ঝরে বুঝি তোমাকে বোঝাতেই বলা! শুনলে খিল খিল হেসে লজ্জায় মুখে আঁচল-চাপা দিত মুক্তা। অথচ মুক্তার চোখ চকচক করা অর্ধ উন্মুক্ত মুখের পরিবর্তে নিদারুণ বেদনার অতল থেকে চোখের সামনে রানির মুখটা ভেসে উঠছে। রানির মুখের উপস্থিতির আধিক্যে মুক্তার মুখটা ঠিকঠাক মনে করতে পারছি না। মুক্তাকে প্রায়ই দেখেছি, বছর বছর এসেছে দেখা করতে। তাকে টেলিভিশনেও দেখেছি, বড় শিল্পী, হাজার মানুষ তার তুলির আঁচড়ের ভক্ত। কিন্তু সব ছাপিয়ে চোখে কেবল রানি ভাসে, আকুল হয়ে জানতে চাই, ‘তোমার কী মনে হয়, রেবা, রানি বেঁচে আছে ? কত বড় হয়েছে সে ? তার কি আমাদের কথা মনে আছে ?’

রেবা কেন যেন উত্তর দেয় না। তার চোখেমুখে অস্বস্তি। প্রশ্ন কিংবা আস্ত আমাকেই এড়াতে সে জানালার বাইরে তাকায়। অকারণে শাড়ির আঁচলের প্রান্তের পিকুটাকে চিমটি দিয়ে চেপে ধরে লম্বালম্বি আঙ্গুল চালায়। তার দিকে একভাবে তাকিয়ে থাকি, যেন সত্যিই উত্তরের অপেক্ষায় আছি। তার অস্বস্তি বাড়ে। তারপর রেবা মুখ খোলে, হড়বড় করে বলে, ‘আমরা তো তাকে অনেকবার ওদের সঙ্গে যেতে মানা করেছিলাম, আপা। বলেন, আমরা কি চেয়েছিলাম ওই অমানুষগুলোর সঙ্গে রানি ইন্ডিয়ায় যাক ?’

সত্যি, কত চেষ্টাই না করেছিলাম রানিকে পুনর্বাসন কেন্দ্রে রাখতে। পারিনি বলে আমার বাড়িতে এনেছিলাম। সেখানেও থাকবে না। যদি বলি তাকে আগলে রাখব, কাউকে তার দিকে আঙুল তুলতে দেব না, রানির তাতে মন ভরে না। ঠোঁট উলটে বলে, ‘আপনে একদিন মরবেন না ? সেদিন ? সেদিন তো সবাই বলবে, ওই পাকিস্তানি কুত্তাগুলো আমাকে খাবলে খেয়েছে, তখন ? তখন কে দেখবে ?’ আমার চোখ ভিজে আসে… রানি, এসে দেখে যাও, আমি মরিনি। এখনও বহু মানুষের মৃত্যু দেখার জন্য অবলীলায় বেঁচে আছি। এই যে আমার সামনে মুক্তা মরে গেল। কত মানুষ যে এই বছর দুয়েকে মারা গেল … স্মৃতির বিস্তার ছোট হয়ে আসছে। বহু মানুষের মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গে স্মৃতির একেকটা অধ্যায় হারিয়ে যাচ্ছে, টের পাচ্ছি আমার কিছু অংশ প্রতিদিন মরে যাচ্ছে। রেবার দিকে তাকাই। নির্লিপ্ত মুখে বসে আছে। ভেতরে ভিতরে আছে কোনও টেনশনে। মুক্তার মৃত্যু আমাকে কি আরও দুর্বল করে দেবে না ? রেবা হয়ত আমাকে নিয়ে চিন্তিত। আমার লজ্জাই লাগে। মুক্তার মৃত্যুর কথা জানতে না চেয়ে হঠাৎ রানিকে নিয়ে ব্যস্ত হলাম কেন!

ছোট নিঃশ্বাস ফেলে বলি, ‘রেবা, কী করে মারা গেল মুক্তা ? কী ভীষণ শক্তিশালী মেয়ে! কিছুই তো তাকে টলাতে পারেনি।’

‘হ্যাঁ, আপা। কিন্তু করোনা পেরেছে টলাতে।’

‘তোমার জন্যই পেয়েছিলাম তাকে। কে যেন নারায়ণগঞ্জের ওই রেপ ক্যাম্পের কথা জানিয়েছিল, মদনগঞ্জ রেললাইন ক্রস পয়েন্টে। খবর পেতেই আমরা ছুটে গেছিলাম। সম্ভবত ডিসেম্বরের আঠারো তারিখ রাতে, না ?’

‘আপনার সবই মনে আছে, আপা। খবরটা পাওয়ার পর থেকে আপনি স্থির থাকতে পারছিলেন না। তাড়াহুড়ো করে যেতে গিয়ে আমাদের মনেও পড়েনি, তাদের জন্য কিছু কাপড়চোপড় নেওয়া দরকার। কল্পনার দৌড়ে কুলায়নি, মেয়েগুলোকে ওভাবে উলঙ্গ করে রাখা হয়েছে, ওই পর্যন্ত কি আমরা ভাবতে পেরেছিলাম ?

আমাদের অজান্তে বুক থেকে জোড়া দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে আসে। একজন আরেকজনের নিশ্বাসের শব্দ শুনে সযত্নে লুকিয়ে রাখা স্মৃতির ভারে কেঁপে উঠি। উহ্ কী ভয়ানক … মুখে না বললেও জানি, সেই দুঃসহ সময়ের মধ্যেই দুজনে আনাগোনা করছি।

মধ্যরাতে ঢাকা থেকে রওনা দিয়ে ভোরের আগে রেলক্রসিংয়ের পাশে ভাঙাচোরা বিল্ডিংটার সামনে গিয়ে দাঁড়াই। মনে হয়নি ভেতরে কেউ আছে। দোতলা অদ্ভুত বিল্ডিং যার কোনও বারান্দা নেই, জানালার ধারে সানশেড নেই। দোতলায় স্বাভাবিকের চেয়ে ছোট তিনটা জানালা। জানালার শিকগুলো অস্বাভাবিক মোটা, জং ধরা। বন্ধ কপাট, শ্যাওলায় সবুজাভ, ঝুরঝুরে। নীচের একমাত্র দরজার কপাটের নীচে নানান উচ্চতায় ক্ষয় ধরা। দমবন্ধ পরিবেশটায় মনে হয়েছিল, দরজা সরালেই বিল্ডিংয়ের আধা খসা প্লাস্টারের আরও কিছুটা খসে আসবে। বৃদ্ধ দরজাটায় হাত দিতে শরীরে আতঙ্কের বিদ্যুৎ খেলে যাচ্ছিল। আমাদের নিয়ে গিয়েছিল চঞ্চল, পুনর্বাসন কেন্দ্রে খাবার দেওয়ার কাজ করত। চঞ্চল নামসুলভ চাঞ্চল্যে এগোচ্ছিল, অস্থির চোখে পেছনে তাকিয়ে বলছিল, ‘আসুন, থেমে গেলেন যে ?’ আমি আর রেবা মুখ চাওয়াচাওয়ি করছিলাম, ‘তুমি সত্যিই জানো, মানে, এই বাড়িতে মানুষ থাকে ?’ চঞ্চলের কাছে আমি জানতে চেয়েছিলাম। আবছা আলোতে মুখটা দৃঢ়, ‘পাক্কা খবর।’

হালকা স্পর্শে দরজা দুদিকে ক্যার ক্যার শব্দে সরে গেলে চঞ্চল মুখ বাড়ায়। দেশ স্বাধীন হয়েছে কিন্তু তখনও নয় মাসের আতঙ্ক থেকে বেরিয়ে আসতে পারিনি। মনে হচ্ছিল ভিতরে ঢোকামাত্র কোনও দিক থেকে গুলি ছুটে আসবে। তবে পিছিয়েও আসতে পারিনি। প্রথম ঘরটায় ঢুকে আধা খোলা দরজা চোখে পড়ে। ওদিকে উঠান। বাড়িটা এতই সরু যেন দ্বিমাত্রিক ছবি। উঠানের মাঝখানে প্রায় অন্ধকারে আমরা দাঁড়িয়ে থাকি। চঞ্চল দিয়াশলাইয়ের কাঠি জ্বালিয়ে ওপর-নীচে মিলিয়ে সাত-আটটা ঘর দেখে হতাশ হয়, ‘বুঝলাম না কী ব্যাপার। মনে হয় চলে গেছে।’ বুক কেঁপে ওঠে। এখান থেকে কেউ যদি একা যায়, কোথায় যাবে ? নিজের বাড়ি! কেউ নেবে তাকে ? যে যায় সে নিজেকে শেষ করে দিতে যায়, ততদিনে জেনেছি। আহা, পারলাম না বাঁচাতে! আমরা ঠায় দাঁড়িয়ে থাকি। ভোরের সামান্য আলো ফোটে, চোখ পড়ে উল্টো দিকের পাঁচিলঘেঁষা খড়ের গাদার দিকে। কখনও হয়ত গরু ছিল, চিহ্ন বর্তমান―ভুসির বস্তা, মাটির চারি, ছেঁড়া দু-এক টুকরো চট। কাছে যেতে শুকনো গোবরের গুমোট গন্ধ নাকে লাগে। খড়ের গাদার পেছনে কিছু নড়ে ওঠে। চঞ্চল বলে, ‘কে, কে ওখানে ?’ নড়াচড়া বন্ধ হয়ে যায়। আমি আদুরে উচ্চারণে বলি, ‘কেউ আছ এখানে ? তোমাদের নিতে এসেছি, মা। আসো দেখি, ভয় নেই, চলো।’ সাড়া পাওা যায় না। খড়ের গাদার  পেছনে পাঁচিলের প্রতিবন্ধকতায় অন্ধকার তখনও। রেবা ধীর পায়ে এগোয়, ‘কেউ কি আছেন ? আমরা নিতে এসেছি। আছেন কেউ ?’ একই কথা রেবা বারবার বলে আর এগোয়। খড়ের গাদার শেষ প্রান্তে রেবা আর্তনাদ করে, ‘আপা, কাপড়।’ আমি শাড়ির আঁচল ছিঁড়ে তার দিকে ছুঁড়ে দিই, রেবা নিজের ওড়নাসহ খড়ের গাদার পিছনে চালান করে। তারপর দুটো মেয়েকে বের করে আনে। মানুষ না পাতলা কাপড়ে জড়ানো দলাপাকান মাংসের দলা, বোঝা যায় না। ‘আসুন আসুন, মায়েরা,’ বলে চঞ্চল সরে দাঁড়ায়। ‘আর কেউ আছেন ?’ প্লাস্টার খসে পড়া গুমোট ঘরগুলোর দিকে তাক করে চঞ্চল বাজখাই গলায় চেঁচায়। খাঁ খাঁ ঘরগুলোতে কথাটা ঘুরে ঘুরে বাজে, ‘কেউ কি আছেন, মায়েরা ? দেশ স্বাধীন হয়েছে! বেরিয়ে আসুন। বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছে।’ বলতে বলতে হাউ মাউ করে কেঁদে ফেলে দীর্ঘকায় সুঠাম ছেলেটা। মেয়েগুলোর নির্লিপ্ত চোখের দিকে তাকাই, হাজার বছরের স্তব্ধতা থমকান চোখগুলোতে ভাষা খেলে না। তারা কি সত্যিই জানে, আজ বাংলাদেশে তৃতীয় সূর্যোদয় ? পর মুহূর্তে মনে হয়, এই স্বাধীনতার হয়ত তাদের কাছে কোনো মানে নেই। তাদের জীবন আর আগের মতো হবে না। ভাবনার মাঝখানে দেখি চঞ্চল হাতের উল্টা পিঠে চোখ মুছে নিচ্ছে। কেন্দ্রে খাবার পৌঁছানোর গাড়ির দরজা খুলে দাঁড়ায় সে। মেয়েদুটোকে হাত ধরে রেবা সেদিকে নিয়ে যায়। দুদিকে চাপাচাপি করে বসি আমি আর রেবা। সবাই যেন পাথর হয়ে গেছি। শরীরে শরীর লাগে, গাড়ির ঝাঁকিতে নড়েচড়ে আবারও স্থির হই, কিন্তু স্পষ্ট আন্দাজ করতে পারি পাশের শরীরটাতে প্রাণ নেই।

আমরা যখন নারায়ণগঞ্জ শহর পার হই, কুয়াশা ফুঁড়ে আলোর রশ্মি তখন নীচে নামার পথ খোঁজে। পাশে বসা মেয়েটার কোলের উপরে মুঠপাকানো হাতটা ধরব ভাবি, সান্ত¦না দিতে ইচ্ছে করে, কেন যেন পারি না। পাতলা আবরণের নীচে মেয়েটার শরীরের বাঁকগুলো স্পষ্ট, সন্তান ধারনের চিহ্ন ফুটে বেরিয়েছে। মেয়েটা একটু পর পর বমির ভাব করে। আমি গাড়ি দাঁড়াতে বলি। আমাকে উৎরে সে হুড়মুড় করে নামে। রাস্তায় নেমে বমি করার প্রাণপণ চেষ্টা করে। কেন যেন করতে পারে না। অন্য মেয়েটা বলে, ‘হবে না।’

‘কেন ?’

‘দুই-তিনটা দিন তো কিছুই খায় নাই।’

তাকিয়ে দেখি হাড় জিরজিরে শরীরের এক কিশোরী সে, গোলগাল মুখের লাবণ্য যেন অবাধ্য, তখনও টিকে আছে কিছু। নির্লিপ্ত গলায় বলে, ‘তিন দিন হলো কেউ আসেনি।’

চঞ্চল মুড়ির প্যাকেট বের করে। মেয়েদুটো মুঠো ভরে নেয়। তাদের না দেখার মতো করে দেখি। তারা খাওয়ায় মনোযোগী। চঞ্চল কোথা থেকে জগে ভরে পানি আনে। তারা একের পর একজন জগে মুখ লাগিয়ে পানি খায়। পরপরই হড় হড় করে বমি করে ফেলে। মুখ মুছে আবারও মুড়ি খায়। তাদের আচরণ ঠিক মানুষের মতো লাগে না, যেন মানুষের মতো দেখতে বন্য প্রাণী কোনও। বমি করতে গিয়ে শাড়ির ছেঁড়া আঁচল সরে যায়, প্রায় উলঙ্গ শরীরটার দিকে চোখ আটকায় উরু আর হাতের বাহুতে অসংখ্য কাটাছেঁড়ার দাগের কারণে। কোনওটা শুকিয়ে গেছে, কোনওটা প্রায় দগদগে। জোর করে চোখ ফিরিয়ে নিই।

সামান্য মুড়ি পেটে পড়তেই মেয়েদুটো গাড়ির সিটে এলিয়ে পড়ে। অশ্রু শুকিয়ে রক্ত জমাট বাঁধা চোখগুলো সামান্য ফাঁক রেখে মুদে থাকে। পাশের জনের মাথা আমার ঘাড়ে এমনভাবে পড়ে থাকে যেন ঘুম নয়, সাময়িক অজ্ঞান অবস্থা। কপালে হাত রাখি, হালকা জ্বর। ঢাকার কাছাকাছি আসতে রোদ-ওঠা সকাল। ছোট ছোট মিছিল দেখি। কারও হাতে প্ল্যাকার্ড, কারও হাতে উদ্যত অস্ত্র। খোলা আকাশে ফায়ার করছে মুক্তিবাহিনীর ছেলেরা। দুমদাম শব্দে তাদের ঘুম ভাঙে। সরু চোখ খুলে বোঝার চেষ্টা করে কোথায় আছে। খানিকটা বুঝতে পেরে গুহায় সেঁধিয়ে যাবার মতো করে সিট থেকে নীচে পিছলে যেতে থাকে। আমরা ধরে ফেলি, ‘ভয় নেই, চলে এসেছি প্রায়,’ কানের কাছে বলি। তারা যেন লুকাতে পারলে বাঁচে। খড়ের গাদার অন্ধকারেই হয়ত বেশি ভালো ছিল, চারদিকের এই আলো-আনন্দ যেন বড়ো হৃদয়বিদারক।

আমার পাশে যে বসেছিল, সে মুক্তা। দুদিন বোবার মতো পড়ে থাকার পরে উঠে বসেছিল। স্যালাইনের সূঁচটা টেনে খুলে ফেলেছিল। ফিনকি দিয়ে রক্ত ছুটলে চিৎকার করছিল, ‘বাঁচালেন কেন ? আমাকে মরতে দেন।’ তাকে স্বাভাবিক অবস্থায় আনতে সময় লেগেছিল। জড়িয়ে বসে থাকতাম। গাছের ডাল থেকে পড়ে যাওয়া পাখির বাচ্চার মতো বুকের মধ্যে কাঁপত। ভাবলে এখনও স্পর্শটা অনুভব করতে পারি, সেই ক্রন্দনবিহীন কম্পন। মাথায়-পিঠে হাত বোলাতে বোলাতে একসময় কাঁপুনি থামত।

অনেকদিন চুপচাপ থাকার পরে যখন মুক্তা কথা বলা শুরু করেছিল, একদিনেই অনেক কিছু বলে ফেলেছিল। স্বামী তাকে ডাকত, মুক্ত। তাই তো সে মুক্ত হলো! ‘কিন্তু মুক্ত কি আসলে হয়েছি আমি!’ বলে আবার চিন্তায় পড়ে যেত। ‘বাড়ি ফিরতে পারব না,’ বলতে বলতে নিজের স্ফীত পেটের উপরে হাত বোলাতো। তারপর শূন্য দৃষ্টিতে নিজের মনে বলতে থাকত, ‘আমার স্বামী মুক্তিবাহিনিতে গেছে। সেই মে মাসে বাড়ি থেকে বের হলো, আর আসেনি… অবশ্য আসছে কি না বলতেও পারব না। আমি তো জুন মাসের পরে আর বাড়ি যাইনি। জুন মাসের গরমে যখন মানুষে জানালা খুলে ঘুমায়, আমরা তখন বাড়ির বাইরে ইয়া বড় একটা তালা ঝুলায়ে ঘুমাতাম। ভিতরে অন্ধকার। জোরে একটা নিশ্বাসও নেয়া যাবে না। দুই বছরের বাচ্চাটা আমার, বিয়ার বছর ঘুরতে না ঘুরতেই আমার কোলে আসছিল। কে জানত তখন দেশে যুদ্ধ লাগবে! বাচ্চাটা শব্দ করলে মুখ চেপে ধরতে হতো। এত চেষ্টার পরেও পাড়ার রাজাকাররা ঠিকই খবর দিয়ে দিছিল যে ওর বাবা মুক্তি হইছে আর আমরা বাড়ির মধ্যেই আছি। তাই একদিন গভীর রাতে আর্মি আসলো। দরজার তালার মধ্যে গুলি করল। সেই শব্দে বাচ্চাটা ঘুম ভেঙে কাঁদতে শুরু করল। লাথির ঠেলায় দরজার দুই কপাট দুইদিকে ছিটকায়ে পড়ল। তারা জিজ্ঞাসা করল, আমার স্বামী কোথায়। বললাম, জানি না। তারা বিশ্বাস করল না। বাচ্চাটাকে আমার কোল থেকে ছোঁ মেরে উঠিয়ে নিল একজন, বলল, উ কাব আয়েগা ? বললাম, জানি না তো। তারপর বাচ্চাটাকে মাথার উপরে তুলে ধরল, না-বললে নাকি মেরে ফেলবে। একজন ওকে ধরে থাকল আরেকজন আমার গলা টিপে ধরে ওর বাবার কথা জানতে চাইল। আমি বারবার বললাম জানি না। সত্যি কথা। সে যাওয়ার পরে আর একবারও আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ করে নাই। বাচ্চাটা শূন্যে হাত-পা ছুড়ে চিৎকার করে কাঁদতেছিল। কত কাকুতি মিনতি যে করলাম … আহা আমার বাচ্চাটা… ছয় ফুট উঁচা-লম্বা লোকটা আছাড় মেরে ওকে ফেলল মেঝেতে। মাথা ফেটে রক্ত এঁকেবেঁকে চলে গেল। কান্না নাই তখন আর, হুট করে বন্ধ হয়ে গেল। তারপর আমার শ্বশুড়-শাশুড়িকে গুলি করে আমাকে চুলের মুঠি ধরে টেনে উঠানে নিয়ে গেল ওরা। উঠানের মাঝখানে একটা ছোট্ট গর্ত করে আমার সোনা-বাচ্চাটাকে ঠেসে তার মধ্যে ঢোকালো। মাটি চাপা দিয়ে দিল। ভালোমতো ঢাকেনি, জানেন, রক্তমাখা চুল দেখা যাচ্ছিল। আমি যত্ন করে সেদিন তেল লাগায়ে আঁচড়ায়ে দিছিলাম। বেড়া থেকে একটা বাঁশ খুলে নিয়ে বাচ্চাটার গায়ের মাটির ওপরে ঠেসে গেড়ে দিল। আর গাড়ি থেকে ওদের পাকিস্তানি পতাকা এনে খুঁটিতে টাঙিয়ে দিল। বলল, ইস ঘার মে কোই মুক্তি নেহি রাহে গা। হামারা ফ্ল্যাগ রাহে গা ইঁয়াহা। আমাকে ধাক্কা দিয়ে ত্রিপল টাঙানো গাড়িটাতে তুলে দিল, এরপর…’

একটানা কথা বলতে বলতে হাঁফায় মুক্তা। আমি তার মাথায় আর ঘাড়ে হাত বুলিয়ে বলি, ‘থাক মুক্তা।’ মুক্তা আমার কথা শুনতে পায় না বা শুনতে চায় না। ঘাড় থেকে আমার হাত সরিয়ে বলে, ‘তারপর আমি আর কোনও দিনও বাড়ি যাইনি। কাপড় পরিনি। কাপড় থাকলে নাকি গলায় পেঁচিয়ে আত্মহত্যা করব, তাই কাপড় প্রথমেই খুলে উধাও করে ফেলল। তারপর দিনে দিনে আসলে আমরা ভুলে গেছিলাম আমরা কে, কোথা থেকে আসছি। পেটে বাচ্চা আসার পর মনে হইছিল এবার তারা আমাদেরকে মেরে ফেলবে। কিন্তু না, তখন যোগ হলো আরেকটা ব্যাপার, তারা যেন জিতে গেছে। বলত, হামারা বাচ্চা প্যায়দা কারনা হোগা। হামারা বাচ্চা ইস মুল্ককো নারাক বানা দেগা … এটুকু পর্যন্ত বলে মুক্তা নিজের পেটের ওপরে কিল ঘুসি মারা শুরু করত। আমিসহ তিন জন মিলেও তার হাতদুটোকে শান্ত করতে পারতাম না।

এর বহুদিন পর জেনেছিলাম একজন পাকিস্তানী কর্নেল জেলখানায় চিৎকার করে বলেছিল, ‘উই উইল মেক দিস কান্ট্রি আ ল্যান্ড অব প্রস্টিটিউটস, আ ল্যান্ড অফ স্লেভস, আ ল্যান্ড অফ বেগারস্।’ এই কথাটা যতবার ভেবেছি, মুক্তার কথা মনে পড়েছে। সে তার মতো করে পাকিস্তানিদের জবাব দিয়েছে। পতিতা সে হতে যায়নি, নিজের বাচ্চাকে একদিন দুধ খাওয়ানোর নাম করে গলা টিপে প্রায় মেরে ফেলেছে। আমরা চেষ্টার পরেও আধামরা বাচ্চাটাকে বাঁচাতে পারিনি। হতভম্ব হয়ে মুক্তার নারকীয় উল্লাস দেখেছিলাম, ‘আমার বাচ্চা তোরা মারছিলি, এই দেখ, তোদের বাচ্চা আমি মারছি। মারছি!’ ভেবেছিলাম মুক্তা পাগল হয়ে গেছে। কিন্তু সে পাগল না হয়ে হয়েছিল শিল্পী। কাগজ আর পেনসিল চেয়েছিল। এনে দিয়েছিলাম। একদিন দেখি শত শত শিশু এঁকেছে সে। নানান ভঙ্গি করা শিশু, ঘুমন্ত কিংবা জেগে থাকা। প্রত্যেকটা শিশুর হয় মাথা ফাটা কিংবা গলা টিপে ধরা। অসংখ্য মৃত শিশুর শিল্পিত চিত্র পুনর্বাসন কেন্দ্রে আমাদেরকে বিমোহিত করেছিল, আতঙ্কিতও করেছিল। ছবিগুলো টেবিলের ওপরে মেলে আমরা মূক হয়ে বসেছিলাম। তারপর দেখলাম মুক্তা আঁকতেই থাকল আর আঁকতে আঁকতে একদিন একদম স্বাভাবিক একটা মানুষ হয়ে উঠল। ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ কাউকে এতটা বদলে দিতে পারে জানা ছিল না। একদিন সেই অসহায় মুক্তা কিংবা খুনি মুক্তা অথবা শিল্পী মুক্তা আমাকে এসে বলে, ‘এখানে আর কতদিন থাকতে হবে? আমাকে আর্ট শেখার কলেজে ভর্তি করে দেন।’ ওইরকম একটা কলেজ আছে ঢাকায়। আমার বাড়িতে থেকেই সে পড়াশোনা করত। তার মতো শক্ত মানুষ জীবনে খুব কম দেখেছি। বড়ো শিল্পী হবার পরে সে নিজের জন্য বাড়ি ভাড়া করেছিল। আমার মন খারাপ হতো। সে বলত, ধরেন আপনার মেয়ের বিয়ে হয়েছে। হ্যাঁ, কন্যাই সে ছিল আমার, আমার শরীরের নয়, আত্মার অংশ ছিল। ভাবনার মাঝখানে উচ্চারণ করেই বলে ফেলি, সন্তান-বিয়োগের কপাল জুটেছে আমার, সন্তান-বিয়োগ!

রেবা বলে, ‘সত্যি আপা। সে তো আপনারই সন্তান ছিল। তাকে নতুন জন্ম দিয়েছিলেন আপনি। আমি তার দিকে তাকিয়ে বলি, ‘তুমিও কি কম করেছ এই মেয়েগুলোর জন্য ?’

‘করেছি, আপা যতটুকু সাধ্য। কিন্তু সবাইকে তো জীবন দিতে পারিনি। রানির কথাই ধরেন, কিছুই করা গেল না তার জন্য! জেদের কারণে বলব, নাকি বাস্তবতার, সে তো সবকিছুর ঊর্ধ্বে চলে গেল।’

আবারও আমাদের মধ্যে নীরবতা নেমে আসে। দুজনেই মনে মনে রানির ভাবনায় ডুবে যাই।

অল্প সময় সে পুনর্বাসন কেন্দ্রে ছিল কিন্তু প্রত্যেকের মন জয় করেছিল। তার একটা কারণ অবশ্য ছিল তার কৈশোর বয়স আর গালসর্বস্ব মায়াবী চেহারা। দেখলেই জড়িয়ে ধরে আদর করতে ইচ্ছে করত, বসিয়ে বসিয়ে চারটা ভালোমন্দ খাওয়ালে আনন্দ হতো। মুক্তাকে নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়াতে প্রথম প্রথম তার দিকে সেভাবে তাকানো হয়নি। সে-ও থম মেরে পড়ে থাকত। টপ টপ করে স্যালাইনের ফোঁটা তার শরীরে ঢুকত ঠিকই তবে বোঝা যেত না বেঁচে আছে কী নেই। পরে সেরে উঠল। মিষ্টি হাসি দেখলে আমি তার থুঁতনিতে হাত রেখে বলতাম, ‘তুই আমার হৃদয়ের রানি।’ সে মুখ নীচু করে বলত, ‘খালি রানি না, শ্রীমতি রানি দেবী।’ আমি বলতাম, ‘ওরে বাবা, আবার দেবীও!’ শ্রীমতি রানি দেবী ছিল কেন্দ্রের প্রাণ। কিশোরীসুলভ চটপটে কণ্ঠে কখনও নিজের কাহিনি বলত, ‘আমরা মালো তো, পাকিস্তানিরা আমাদেরকে পেলেই কাটে। বাবু আর দাদু বলেছিল, আমাদের ওই সব স্বাধীনতা-টাধিনতা দেখা হবে না। বুঝলে না ? মানে, পাকিস্তানের মুসলমানরা আমাদেরকে রাখবে না। মালোদেরকে কচুকাটা করা হবে। তাই আমাদের চলে যেতে হবে কোলকাতায়। ভারত হবে আমাদের নতুন দেশ। ওইখানকার হিন্দুরা আমাদেরকে থাকতে দিলে থেকে যাব। কিন্তু আজ যাব কাল যাব করতে করতে তিন দিন কেটে গেছিল। সেদিন রাতেই আমরা হাঁটাপথে রওনা দিতাম। মা জরুরি জিনিসপত্র পোটলায় বাঁধছিল। বিকেল নাগাদ জানতে পারলাম বাজারে নাকি বাবুর লাশ পড়ে আছে। বাবু বাজারে গেছিল দুপুরের পর। বাবু আর দাদুরা বাইরে বেরোলে মুসলমান সেজে যেত, না পৈতা, না চন্দন। সাদার বদলে চেক লুঙ্গি পরত। শুনলাম বাজারের বট গাছের নীচে এক লাইনে তিন জন মানুষকে দাঁড় করিয়ে গুলি করা হয়েছে। দুইজন মুক্তিবাহিনির। সেখানে বাকি যারা ছিল তাদেরকে লুঙ্গি খুলে দেখাতে বলা হয়েছে। যে দেখিয়েছে সে পার পেয়েছে। বাবু জানত, দেখালেও পার পাবে না। তবে জান কী, দেখালে বেঁচে যাবে বললেও কিন্তু বাবু দেখাত না, সে আমি জানি। আমি তার কন্যা তো, তাকে খুব ভালোমতো জানতাম―ভাঙবে কিন্তু মচকাবে না। বহুবার বলার পরেও বাবু নাকি দেখায়নি। লুঙ্গির প্যাঁচ চেপে ধরে বলেছে গুলি করলে করো, আমি জীবন থাকতে সম্মান বিসর্জন দেব না। বারবার আদেশ দিতে দিতে রেগে গিয়ে গুলি করেছে। পরে নাকি বাবুর লঙ্গি তুলেও দেখেছে একজন, বুঝলে ? দেখে বলেছে, বিলকুল ঠিক কিয়া, ইয়ে সালা মালাউন হ্যায়।’

রানি গল্প বলতে গিয়ে কাঁদত না, থামত না, যেন সত্যিই গল্প বলছে কোনও। একই গল্প সে আমাদেরকে বলত, ডাক্তার-নার্স বা খাবার পৌঁছে দেয়ার লোকদের বলত। তার কাহিনি সবার মুখস্ত। বাবার গল্পের পরে সে ফিরে আসত নিজের গল্পে। তার মুখে বাবার মৃত্যুক্ষণের মতো বিকেলের সূর্য হেলে পড়ত, কেউ যেন রঙ-রস শুঁষে নিচ্ছে। মাথাটা নীচু হয়ে থুঁতনি ঠেকত বুকে, অভিমানের ফোলা ঠোঁটে বলত, ‘যাবার সময়ে মা বলল, তোকে নেয়া যাবে না, রাস্তায় দুর্ঘটনা হবে। তারা যুবতী মেয়ে দেখলে ছাড়ে না।’

লকলক করে বেড়ে ওঠা পনেরো বছর বয়সি রানির পুষ্ট শরীরটাকে যুবতীর শরীর বলেই মনে হতো বটে। মা তাই তাকে রেখে গিয়েছিল প্রতিবেশি এক মুসলমান বাড়িতে, মুসলমানের মেয়ে সাজিয়ে। যাবার সময় জড়িয়ে ধরে জন্মের কান্না কেঁদেছিল, মুখে থুতুভরা অস্পষ্ট উচ্চারণে বলেছিল, ‘আর দেখা হয় কি না…’ রানি সে বাড়িতে আরামেই ছিল। কিন্তু মাসতিনেক পরে, অক্টোবরে সেখানে আর্মি আসে। তাদের কাছে খবর ছিল, ওই বাড়িতে হিন্দুর মেয়ে লুকিয়ে আছে। তাকে যেন ভালোয় ভালোয় বের করে তাদের হাতে দিয়ে দেয়া হয়। স্বীকার করে না। বাড়ির উঠোনে দাঁড়িয়ে বর্ষীয়সী নারী বলেন, ‘ছি ছি কী বলছেন, হিন্দুর মেয়েকে বাড়িতে জায়গা দেব কেন, আমাদের কি ধর্মকর্ম নেই ?’ নারীটি আরও একটু আশ্বস্ত করার জন্য সৌজন্য করেন, ‘তা বসে যান একটু, পানি আনতে বলি ? এই, চেয়ারটা আন তো… ’ তখন রানি একটা মোড়া হাতে সেখানে উপস্থিত হয়ে বলে, ‘চেয়ারে দাদু বসে আছেন, পিসিমা, মোড়ায় চলবে ?’

তার মুখে ‘পিসিমা’ শুনে এক মুহূর্তের জন্য সবাই চুপ হয়ে যায়, সে-ও ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকে পিসিমার দিকে। পাকিস্তানী ছয় ফুট লোকটা খপ করে তার হাত ধরলে মনে হয় লোহার বেড়ি পরানো হয়েছে, কবজি গেছে আটকে। তারপর হিড় হিড় করে সোজা ক্যাম্পে।

সুস্থ হয়ে রানি ছুটে চলে গিয়েছিল আশ্রয়দাতা বাড়িটিতে। পিসিমা মুখ ঝামটা দিয়েছিলেন, ‘কে বলেছিল তখন পিসিমা ডাকতে ? ছি ছি ঘরে উঠিস না বলছি, পাকিস্তানিরা তোকে ছুঁয়েছে। তোদের বাড়িও তো মুসলমানেরা দখল করে নিয়েছে। এখন কোথায় থাকবি ?’ রানি নিরুত্তর। সে বাড়ি থেকে বেরিয়ে নিজেদের বাড়ির পাঁচিলের ওপর দিয়ে উঁকি দিয়েছিল একবার। তুলসিতলাটা গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে, সেখানে একটা কাঠগোলাপ গাছের চারা। গেটের পাশে জবা ফুলের বড় গাছদুটোও নেই। তাই দেখে বাড়িটাতে আর ঢুকতে ইচ্ছে হয়নি। ঢুকলেইবা কী হতো, যারা থাকে, নিশ্চয় দূর দূর করে তাড়িয়ে দিত। তাই কেন্দ্রে ফেরা ছাড়া উপায় ছিল না। কিন্তু সেখান থেকেও কেন যেন কিছুদিন পরে উধাও হয়ে যায় সে। কতখানেই না খুঁজেছি আমি আর রেবা!

একদিন জানতে পারলাম ৩০-৪০ জন রেপক্যাম্প-ফেরত নারী নাকি যুদ্ধবন্দিদের সঙ্গে ভারতে চলে যাবে। শুনে রেবা আর আমি পরস্পরের তাকিয়ে থাকি। জানতাম আমরা তাদের ফেরাতে যাব। যুদ্ধবন্দিদের নিয়ে অনেক টানাপড়েনের পর তাদের বিভিন্ন উপায়ে ভারতে পাঠানোর সিদ্ধান্ত হলো। বঙ্গবন্ধু নারীদের ‘বীরাঙ্গনা’ উপাধি দিলেন। তারা নাকি দুই থেকে তিন লাখ। কে গুনল কে জানে! আমাদের কেন্দ্রে মাত্র সাতাশ জন। অন্য কেন্দ্রেও এমনই। তাহলে বাকিরা কোথায়! এরকম কিছু একটা ভাবনা এলেই মনে হতো বোকা আর অভিমানী মেয়েটা কোথায় যে চলে গেল! রানি চলে যাবার পর থেকে আত্মীয়-বিয়োগের বেদনা আমাকে কাঁদাচ্ছিল। তারই মধ্যে যুদ্ধবন্দিদের সঙ্গে মেয়েদের স্বেচ্ছায় দেশত্যাগের কথা শুনে যারপরনাই অস্থির হয়ে উঠি। ঠিকানা যোগাড় করে আমি আর রেবা সেখানে উপস্থিত হই। যাবার সমস্ত আয়োজন শেষ। শুকনো মুখে দাঁড়িয়ে থাকা মেয়েগুলোর মধ্যে বিস্ফারিত চোখে রানিকে আবিষ্কার করি। অন্যদের মুহূর্তে বিস্মৃত হয়ে বলি, ‘সে কী, তুই এখানে! এখানে কী করছিস ?’

‘আমি ভারতে চলে যাচ্ছি এদের সঙ্গে,’ দৃঢ়কণ্ঠে রানি জবাব দেয়। কথা বলার সময়ে আমাদের দিকে তাকায় না। এই কয়েক দিনে খানিকটা বড় হয়ে গেছে কি ? তার চোখে-মুখে টুলটুলে গালের আমাদের সেই পুতুল মেয়েটিকে কোথাও খুঁজে পেলাম না। আমরা তার হাত ধরলাম, সে ছাড়িয়ে নিল না আবার ধরলও না।

‘তুই কি পাগল হয়ে গেলি ? ওরা তোকে কী করবে জানিস ? এই শয়তান পাকিস্তানিগুলো তোকে ভারতে নিয়ে গিয়ে বিক্রি করে দেবে। তোর বাকি জীবন অন্ধকার একটা পতিতালয়ের বদ্ধ ঘরে …’ রেবা বলে যেতে লাগল।

‘তাই হোক। আর এখানে কী হবে আমার ?’ রানি অদ্ভুত অচেনা দৃষ্টিতে রেবার দিকে তাকাল। আমি তার ঘাড়ে হাত রেখে বললাম, ‘এখানে আমরা আছি না ? আমার কাছে থাকবি তুই। আর জানিস তো, বঙ্গবন্ধু মেয়েদেরকে বীরাঙ্গনা খেতাব দিয়েছেন ?’

‘নাহয় এখন তোমার কাছে থাকলাম, কিন্তু তারপর ? তুমি যখন থাকবে না তখন লোকে কি বলবে না যে ওই শয়তান পাকিস্তানিগুলো আমাকে ছুঁয়েছে ? আর খেতাব দিয়ে আমি কী করব বলো তো, মাসি ? ধুয়ে পানি খাব ? ওই খেতাব জপতে থাকলে লোকে কিন্তু আমায় মন্দ বলবে। আচ্ছা, আমি কি প্রতিরোধ করিনি ? আমি কি ইচ্ছে করে রেপ ক্যাম্পে গেছি ? এটা আমার মুক্তিযুদ্ধ নয়, আমি মুক্তিযোদ্ধা হতেও পারিনি, বরং এই যুদ্ধটা এসেই আমার সব লণ্ডভণ্ড করে দিল, গো।’

রানির কথা শুনে তার হাতের উপর থেকে আমার হাতটা শিথিল হয়ে আসে। সে তো সত্যিই এই ক’দিনে অনেক বড়ো হয়ে গেছে! তাকে আর পথ বাতলে দেয়ার কিছু নেই। রানি হয়ত আমার মনোভাব বুঝতে পারল। আমার জন্য, হতে পারে, মায়াই হলো তার। বলল, ‘যারা মারা গেছে তাদের পূজা করছে মানুষ। যারা ফিরে এসেছে, তাদের কত সম্মান, তাদের আত্মীয় স্বজনেরা বুক ফুলিয়ে বলছে, আমার ভাই মুক্তিযোদ্ধা, আমার ছেলে মুক্তিযোদ্ধা। কিন্তু আমার মতো যারা ফিরে এসেছে, তাদের পরিবারের মুখ দেখানোর জায়গা নেই। বীরাঙ্গনা বলে তাদেরকে আরেকবার উলঙ্গ না করলেই চলছে না ? যা হোক, ভারতে যাই, যদি মায়ের সন্ধান পাই, ছোটো দুটো ভাই-বোনকে যদি …’

‘আরে পাগলি, ভারত কি এতটুকুন জায়গা ? তাদের তুই কোথায় খুঁজবি ?’ রেবা হাল ছাড়ল না। রানিও দমবার পাত্র নয়, ‘খুঁজব কোথাও। আমাকে আটকাতে চেয়ে না। এখানে আমার জন্য কিছু নেই।’

‘কিছু নেই মানে ?’

‘কী আছে বলো তো ? আমাকে তুমি লুকিয়ে রাখতে পারো, ওই যে পিসিমা রেখেছিল। কিন্তু তারপর ? ধরা তো পড়তেই হয়। পারবে আমাকে সমাজের লোকগুলোর চোখে বীর বানাতে ? একজন মুক্তিযোদ্ধার মতো ? তার চেয়ে এই ভালো, এমন দূরে যাব যেখানে কেউ আমাকে চিনবে না।’

আমি আর রেবা কেউ তার এলোপাতাড়ি প্রশ্নগুলোর উত্তর দিই না। বাইরে থেকে বাসের হর্ন শোনা যায়। অন্যরা আগেই চলে গেছিল। রানি মেঝে থেকে ব্যাগ হাতে তোলে। আমরা তার চলে যাওয়ার দিকে তাকিয়ে থাকি।

রানি আমাদের কাছে সেদিনই মরে গিয়েছিল। আর মুক্তা মরল আজ। রানির জন্য আমার কিছু লেখা হয়নি যা তার প্রাপ্য ছিল। অন্যায় হয়েছে আমার। তবে আজ মুক্তার জন্য কিছু লিখতে ইচ্ছা করছে, ছোট একটা শোকগাঁথা, এক ফোঁটা অশ্রু গড়িয়ে পড়বার মতো। আজ কেউ অনুরোধ না করলেও লিখব।

সচিত্রকরণ : ধ্রুব এষ

Leave a Reply

Your email address will not be published.

shares